বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

কবিতাভাবনা - এসো শূন্য, এসো হে নিবিড়

বেবী সাউ

কবিতা এক ধরণের দান। মুক্তি। অন্তরের দান। এই বিশ্বাসে আমি ভিখারীর মতো হাত পেতে দাঁড়াই। দয়াপরবশ হয়ে একটা দু'টো টুকরো যদি কখনও ভেসে ওঠে! কখনও জাগর চোখে তার অপেক্ষা করি। অপেক্ষা করি। কিন্তু আসে কি! অসম্ভব ঔদাসীন্যভাব তার। হবেই নাই বা কেন! কতটুকু সাধনা করতে পারি আমি? অন্তরের কাছে পৌঁছানোর জন্য কতটুকুই বা চেষ্টা আমার! আর মুক্তি! ছোটবেলা থেকে আমি মৃদুভাষী। বুকের মধ্যে অসংখ্য কথা, শব্দ, অক্ষর কিন্তু প্রকাশ করতেই যত বাধা। ভাইবোনদের বললেই ওরা হেসে কুটিপাটি। মায়ের সংসার। অবসর নেই! একা বারান্দায় এসে দাঁড়াই। রাতের কালপুরুষ কথা বলে, সকালের রোদ কথা বলে, শব্দ দেয় প্রবল নৈঃশব্দ। এরাই একদিন বন্ধু হয়ে ওঠে। এই প্রবল বাধার ঝাপটে খুলে যায় মাঝে মধ্যে জানলার কাচ। হু হু করে শব্দ ঢুকে। আমি সাজাই তাকে। নিভৃতে, যতনে। একটি দুটি শব্দ তৈরি হয়। তারপর বাক্য। তারপর ...তারপর... জানি না ওসব কবিতা কিনা! কিন্তু একটা ভালোলাগা এসে জড়িয়ে ধরে। একটা বিরাট প্রাপ্তিযোগে নেচে ওঠে ছন্দের যাতায়াত। আমার ওইসব পোষা একাকীত্ব ও নির্জনতাকে দেখতে পাই, অক্ষরের স্রোতে; একেই মুক্তি বলে বুঝি! এমনই এক সকালে...


এক
পুরু হয়ে পড়ে আছে হেমন্তকাল। হালকা শীতের আমেজে মৌজ করে বসছে খোলা ব্যালকনি। এর মাঝেই এই তোমার ঘর ঘর খেলা, এই পেতে রাখার মায়ার বাঁধন-- কোথাও কি বিরাট এক শূন্যতাকে ডেকে আনছে না! বলছে না-- এসো দু'দন্ডের এই অবসরে তুলে আনা যাক জমানো নদী ঘাট! পুজো-পার্বণ। উদোম গ্রীষ্মাবকাশ। ঝরার শব্দ। লোভী হয়ে আমিও চেয়ার টেনে বসি। শুনি অলকানন্দার মিথ্যেমিথ্যি সুচতুর অভিমান। ভেঙে তুলি কবীর সুমন। প্রিয় কবিতার খাতা। তুমিও পেতে ধরলে হাত। টুপটুপ করে ঝরল শিশির। ঘাসের মধ্যে হাঁটতে গিয়ে, ভেজা পা কতটা যে অস্বস্তিকর! বোঝালে। আর আমি দশ বাই বারো ফুটের মধ্যে এঁকে তুললাম এক বিরাট মানচিত্র। আলোকের গ্লোব। সমস্ত জারণ ক্ষমতা অপসরণ করে প্যাস্টিকের ফুলে সেজে উঠল ড্রয়িং রুমের স্পেস। হাততালির শব্দে নিভে যাওয়া মোমের গলন আসলে সমস্ত অন্ধকারের জন্মক্ষণের মুহূর্ত-- যেদিনই স্পষ্ট হয়েছিল। আর সমস্ত শহর ব্যতিব্যস্ত হয়ে খোঁজ করছিল আগত শীতের সব্জী মার্কেট।

*অ্যানিভার্সারি *

উনুনে জমে আছে গতজন্মের ওম
লেপ বালিশের ঘামনুন
ভাদ্রমাস

ধনেশ পাখি নিয়ে এই যে
শিকারের আসবাব
এইযে আদা রসুন
সংসার গড়ার ভান শিখছে বিবাহিত বেনারসী
দুই
আসলে মুক্তি নেই কোথাও। মুক্তি? সেটা আবার কি? মুক্তি মণ্ডল? কবি?
নিজেকে জাজের আসনে বসানো, আর তাতেই সমস্ত প্রকৃতি যে অতলে হারাচ্ছে-- এটা তুমি মানতে পারোনি। হিসহিস শব্দে কবিতা নামছে। ধীরে ধীরে প্রকাশ হচ্ছে শব্দ আর তুমি মুগ্ধ চাতকের মতো খোঁজ করছ ছোট্ট এক আশ্রয়ের। বেদমন্ত্র ভাসছে ঈশান কোণে। দক্ষিণের বারান্দাতে গীতবিতান আওড়াচ্ছে সদ্যজাত কবি। শ্রদ্ধাবোধে নত হয়ে আসা এই পালকের গান বিরাট এক আলোর লোভে খুঁজে বেড়াচ্ছে ওম। তখনই সমস্ত বাস্তবতা ভেঙে, সুদূরের ডিসট্যান্স ভেঙে গড়ে ওঠা বিরাট এক থিম-- যেখানে আমিই ঈশ্বর, আমিই প্রকৃতি, আমি সেই ছন্দবেশী বেদুইন, প্রকাশ্য জাদুগর--- আমিই আমি। আমি আর আমি আর আমি। আমি। আমি।

# বিপ্লব#

ফাঁকা পথ বন্ধ হয়; ফেরা পড়ে থাকে
ক্ষোভের গোলক জেনে তুমিও চতুর--
ললাট লিখন ভেবে হত্যা করো তাকে
চারপাশে বেজে ওঠে কুহকিনী ক্ষুর

সোহাগের গল্প আর বিরহের খুন
জিঘাংসার রক্তস্রোতে যে চড়ুইভাতি
প্রিয় স্বজনের কাছে আমিও করুণ
চারপাশে পুঁতে রাখি লোহার চাপাতি

হাতের রেখায় ফোটে বিষাদের ক্ষোভ!
কে আজ বিজয়ী হবে! আরো হিংস্র মনে
সশস্ত্র বাহিনী এসে বলে, 'চোপ চোপ'
তুমি তাকে পুজো দেবে দেবতা সজ্ঞানে?

বেজে যায় হত্যা আর রক্তবর্ণ খেলা
শহরের কোণে জাগে মৃত্যুরূপী চেলা---
তিন
এইসব ভালোলাগা মন্দলাগা নিয়ে কখনোই পাল্টে যাওয়া দেখিনি মায়ের । চুপচাপ আর চুপচাপ । ছোট্ট গ্রাম আমাদের । মাঠভর্তি রবিশস্য । পুবের সূর্য ঢেলে দিচ্ছে কলসী ভর্তি আলোর দরজা । চাঁদ মায়া ছড়িয়ে রেখেছে ছাদময় । নদী নেই । ধূধূ বিস্তারিত সংসার শিখছেন মা ।শরীরে আবহমানের সুখ। এক আশ্চর্য ব্যাপার নিয়ে ওইসব আমার না- জন্মানো কালটা কে খুঁজে ফিরি । একা একা ওইসব নির্জন দুপুর , মা আর আমি , আমি আর মা এক শরীর একাত্মা হয়ে চোখ তুলি মেঘের দিকে --- রোদের দিকে । একাকীত্ব ভরে কখনও কখনও নাইতে যাই পৃথিবীর নির্জনতম ঘাটে । ভাবি , পৃথিবী কারো নয় । নিজস্ব কোন অনুধাবন নেই তার। এই সমাযোজন প্রক্রিয়া বুঝতে বুঝতে কলেজ ক্যাম্পাসের বি. এড ক্লাস বেজে ওঠে । মনোবিজ্ঞান আসলে মনকে কেটে ছেঁটে দুটুকরো করার প্রণালী-- বুঝতে পারি। রক্ত সেখানে ছাপার কালি । জন্মদিনের সুদৃশ্য রঙ ।তখন আধুনিকতার মোড়ক মুড়ে উন্মোচন হয় ভাষার সাথে অ্যাডজাস্ট । মানিয়ে নেওয়ার হিউলেশন । সুর্বণরেখার জলে মায়ের শাঁখা বাজে ধীরে - সিঁদুর বাজে । আমার মেয়েজন্ম তখন --

#মেয়েজন্ম#

জলকে আজকাল মায়ের মত
লাগে
আধারহীন, আকৃতিহীন

আর বাবা!

শূন্যে লক্ষ্য স্থির হলেও, জেনো
গাছ জল ছুঁয়ে থাকে
চার
খরাপ্রবণ এলাকা। চারপাশে অসংখ্য মানুষের হাহাকার ভাসছে। বাতাসে ছুটছে আগুনের হলকা। দশটা বাজতে না বাজতেই নিস্তব্ধ হয়ে আছে রাজপথ। অলিগলি শুনশান। অথচ, অসম্ভব অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ছুটে চলেছে রাতের গাড়ি। পৌঁছাতে হবে পৌঁছাতে হবে! কোথায়? তখনই দেখি বাসস্ট্যান্ডে লড়াইয়ে দাগ। কালো পিচ ঢালা পথ, বেঁকে যাচ্ছে সুদূরের প্রতি। ডিসট্যান্স বাড়ে। ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ ছোটে জলের দিকে, জীবনের দিকে। তৃষিত মরু-চোখ চেয়ে চেয়ে দেখে। হাসে। রোজকার যাতায়াতে আমি তাদের পাওয়া না-পাওয়া দেখি। আর অবাক হই। ধৈর্য মানুষকে সচেতন করে তোলে? নাকি বিভ্রান্ত? হঠাৎ! হ্যাঁ হঠাৎই দেখি, একজোড়া কপোত চেয়ে আছে পরস্পরের দিকে। খরা কবলিত এলাকার ভ্রম ভেঙে তারা তৈরি করছে সবুজ কৃষিকাজ। রঙিন বসন্তের বন। আর সমস্ত রাজপথ দেখছে-- এপ্রিলের খাসনামা

# বৈশাখ #

এভাবে সুমধুর চোখ গিফট দিও না প্রিয়
আয়না পুড়ে যাচ্ছে

দহন আলোয় শহর হাঁটছে
তৃষ্ণা বুকে কাক

মরণ ওগো
শরম ওহে

স্নান করাও দৃশ্যমান
মুগ্ধ করাও বিদগ্ধ রোদ্দুর

রাধার আঁচল উড়ছে বিকেল রোদে
পাঁচ
মানুষ কাঁদে। উচ্চস্বরে। নিরর্থ নির্বাকে। থমথম করে ওঠে শহর। চারপাশে সমাজ বাজে। কলহ বাজে। সকালের নিউজ পেপারে সেইসব কান্নার শব্দ; আর তার কারণ হিসেবে ফুটে উঠছে হাজার বছরের জমা তথ্য। ভীত হয়ে আছে দিনরাত। কাকে বলবে মনের কথা! কাকে জানাবে শোক! কেউ নেই? আছেন একজন। বলা ভালো, ছিলেন। কিন্তু আজ সকাল থেকে তাঁর আর ঘুম ভাঙছে না। আর তাঁকে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে আগুনের লোলুপ চোখ। জেগে থাকা মানুষেরা বিড়বিড় করে কিছু বলছে। নিজেদের মধ্যে সেরে নিচ্ছে ব্যক্তিগত আলাপন। তিনি স্থির। হাস্যময়। শান্ত। ধীরে ধীরে আরও শীতল হচ্ছেন তিনি। পুজোর মতো করে সাজানো হচ্ছে ধুপের ধুনো; তুলসী পাতা। সামান্য এই গন্ধ কী তাকে ফিসফিস করে ফেরার কথা জানাচ্ছে? বলতে চাইছে, যাওয়াটা অতটা সঠিক না এই মুহূর্তে! ছলছল শব্দে বাজছে শহরের শব্দ, অক্ষর। নেই! স্বদেশ সেন নেই!

* মৃত্যু *

চলে যাওয়ারও একটা গন্ধ আছে
একটা রঙ
একটা হাওয়া

আমরা ধূপ জ্বেলে
নোনা জলে
ওই হাওয়ার সাথে
গন্ধের সাথে
যুদ্ধ করি

মুছে দিতে চাই
ছয়
আলোর খোশবু নিয়ে হেঁটে আসছে ভোরের শীত। আমিও বোধগম্য মন নিয়ে ভাবছি এই মায়া; এই জড়িয়ে রাখা ঘুম চোখ---কার কথা বয়ে আনার জন্য নিয়োজিত হয়েছে! কাকেই বা উপাসনা ভেবে দিনরাত পেতে ধরেছে মন্ত্রগানবই। ধীর লয়ে ফুটে ওঠা সমস্ত সম্ভব-অসম্ভবের অনুযোগ, মাদুলি-তাবিজ মিথ্যে করে দিয়ে পেতে বসেছে মহুলডাংরির গান! তবে কী যুগ যুগ স্রোতে বয়ে আসা শব্দ--- কুহকের মায়া এর কাছেই নতজানু মানুষ! এখানেই মুক্তি? শব্দের পিয়াসী হতে হতে ছুঁয়ে ফেলবে সমস্ত শূন্যের জারণ চিহ্নকে। আলো মালার মত সাজিয়ে তুলবে গোপন ডাইরির পাতা! তুমি তাকে কি ভাবে স্নেহ দেবে? কি ভেবে পেতে ধরবে শ্রদ্ধার আসন? বলো!

#সংশোধনাগার#

আরও বিলম্বিত ঢঙে
বোবা সেজে থাকো তুমি

অকালের মেঘ কেটে যাবে ভেবে
রটন্তী মন্দিরে দাও তাজা জবাফুল
বেলপাতা

ছিটকে ছিটকে আসে তার ফোঁপানো কান্নার সুর
দুহাতেই চেপে ধরো কান
শব্দ আয়াতের মানে

শিশুটি নাছোড় বড়
শেষতক তোমাকেই পিতা ডেকে বসে

আর সেদিন তুমিও আত্মহত্যা শেখাও নিজেকে
সাত
চারপাশে জেগে উঠছে রাতের শুশুক। রক্তের লোভে আড়ি পেতে শুনছে ভাঙার আওয়াজ। আর খিল খিল করে হেসে উঠছে। ঘুমের ঘোরে চমকে চমকে মাতৃবর্ণফুল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে মাতৃজন্ম। সন্তান আজ অচেনা তার কাছে। অসংখ্য ফাটল। ছায়ার নীচে জেগে উঠছে ভাতঘুম। হিংস্র অঙ্গ। কী আর বলি! ভাবতেও মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে। ভেসে ওঠে লম্বা লম্বা নখ, আঙুল। বাবা টিভি বন্ধ করে দেন। মা আরও সাবধান হন আমার প্রতি। মেয়েজন্মের প্রতি। বারবার ফোন। কোথায়? কখন ফিরবি? যেন এই মুহূর্তেই ঘটে যেতে পারে সবচেয়ে অকাঙ্খিত বিষয়টি। এখুনি এক্ষুনি...

নিথর, নিস্পৃহ--

*ধর্ষক*

কাঙ্খিত ধুলো মেখে
অবহেলায় পড়ে আছে
কালো পিচ রোড
পিষো পিষো আর
পিষো
ওহে লরির চালক
আট
আমার জন্য কতটুকু ত্যাগ শিখেছ তুমি? কতটুকু হত্যা বয়ে হাঁটতে পারো রাজপথে? জানতে চাই। নামাজের ঢঙে সেও নতজানু হয়ে বসে। বাদামী রঙা বালির শরীর এই। ছুঁয়ে দিলেই মিলিয়ে যাবে নোনা জলে। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, কামনার মতো শব্দও জেগে ওঠে। ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করি আমি। চুপচাপ সরে দেখি জীবনের পর্ব জুড়ে শুধু কুহকের টান । শুধু রঙ রঙ খেলা । এইসব রঙের জাদুঘরে মা চিরকালীন এক আশ্রয়- -- ছায়াময় আশ্রম । প্রতিদিনের জমানো আত্মহত্যাগুলোকে এনে ছড়াই মায়ের আঁচলে । আদরে যত্নে মা বের করে আনেন পুরোনো প্যাটরা , আলমারীর দেরাজ । এত জমানো কষ্ট নিয়ে মা আমার ঈশ্বরী হয়ে উঠেন । হাতে বরাভয় , বামহাতে সন্তানের মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলেন ---

# কর্ণ #

দেখছি , দুটি মন জমতে জমতে
কেমন পাহাড় খেলছে ঢালু সমতলে
এইসব দৃশ্য নিয়ে তোমার কী কৌতুহল
শৈল্পিক প্রয়াস
এই রাত্রি অর্ধেক হল
এই সাইরেন বাজিয়ে ফিরছে আগুন নেভানো গাড়ি
এখুনি ফিরতে হবে আমাকে
এখুনি ফিরতে হবে তোমার কাছে
সারাগায়ে হাঁড়িকাঠের রক্ত বিন্দু
মাথায় প্রণামের ধুলো
চোখমুখ শুকিয়ে নিদারুণ কারিগর
তুমি কী দয়াপরবশ হয়ে কাছে টেনে নেবে এবার ?

বলবে , বাছা আমার কতদিন কাঙালের মতো বাড়ি বাড়ি ফিরেছে!
নয়
যে রেখা আমি চিনি না , যেখানকার দিগন্তে আমার রাজপুত্রের পক্ষীরাজ ভাসে না -- এই সীমানা কখনো আমার না । দৃশ্যের পর দৃশ্য জুড়ে শুধু দৈনন্দিন উচ্চারণ , মৃদুমন্দের ব্যর্থতা আর কিছু নিঃসঙ্গতার দেওয়াল ডিঙিয়ে এইসব চিরসত্য; দেখি, কেমন অলীকে পরিণত হয়। আমি তখন ক্লাস এইট । আমি তখন কৃষ্ণচূড়া চিনি । তখন আমি প্রথম পিরিয়ড । লাল দাগে মানিয়ে নিতে নিতে মায়ের আগলে রাখা শিখছি । বিছানার চাদর ভর্তি শুকনো রঙ সামলাতে সামলাতে শুনছি একুশের মিছিল । ফাগুন জুড়ে ফ্রেবুয়ারি তখন । ফাগুন তখন স্কুলের পোস্টার । মায়ের আলতা শিশি থেকে রঙ চুরি করছি । পোস্টারে আঁকছি রফিক সালাম বরকত এর নাম । পোস্টার এত লাল কেন ? অক্ষরে অক্ষরে রক্ত কেন !

আরও আরও শব্দহীন হোক এই উচ্চারণ । আরও বিস্তারিত হোক এই লালের ফসিল । আরও কেঁদে উঠুক শহীদ মিনার, আসামের খানাখন্দ । পাহাড়ের গোপন হোলিখেলা । বুক জুড়ে তখন রক্ত বমি । অ্যামেনিমা র ট্যাবলেট খেতে খেতে রক্ত সংগ্রাহকের ভূমিকা যখন আমার হঠাৎই দেখি চোখে কেমন হলুদ সর্ষের ক্ষেত পেতে বসে আছেন মা । কপালে টগবগে সূর্য বাবার জন্য , দশআঙুলের রেখায় সন্তানের বরাভয় পুষতে পুষতে আমার মায়ের চোখ চুরি করে নিয়েছে সেই মাইথোলজির রাক্ষসী । বেদজ্ঞ পুরুষ শক্তি বলেছে যাকে । পুজো আসলে শত্রুকে ঈশ্বর সাজানোর এক নিপুণ কৌশল ।

দেখি একদিন -- এইসব রক্তবমি সেরে আমিও কেমন মায়ের কাছে ভীড়ে গেছি । মা আর আমি তখন সমবয়সী । কোন দেশ নেই , কাল নেই , ধর্ম নেই , লিঙ্গ নেই । শুধু সন্তান আর মা । মা আর সন্তান ।

#কুন্তী#

কতবার মুখ এগিয়ে নিয়ে গেছি , বলবো বলবো করেও গলা আটকে রেখেছি সেফটি পিনে ।শব্দ এত অপ্রতুল , এত শব্দহীন দুনিয়া । চুলের ক্লিপ বেয়ে নামতে থাকে সস্তা তেলের গন্ধ তখন । আলো আর রাত্রি তখন খেলা করে ব্যারিকেডে , ভাঙা কার্ণিশে বেয়ে চাঁদের বয়ে চলা ।চুম্বনকালীন এই দৃশ্য নিয়ে নিজেকে মা ভেবে বসি । হাজারটা স্পর্শ ছাড়িয়ে আমি তখন বৌ বৌ তোর । তোর সন্তানের হাজারো নিশ্বাস ঘিরে আমার বাঁচা বাড়া , কিশোরী বেলা ।আমি ছুটতে থাকি , ছুটতে থাকি।এক একটি তীরে থাকে আমার জরায়ুর লক্ষ্যভেদ । হৃদযন্ত্রে ঢোকানো ভয় নিয়ে খাদে এগিয়ে রাখি পা ।হঠাৎ মোড় ঘুরে দেখি লক্ষাধিক আঙুল রোজ ছুটে আসে ,ছুটে আসা থুতুতে চোখে মন্দাকিনী । এই অবগাহন তোর বোঝার কথা নয় । এই সমগ্র তরল কেমনভাবে আশ্রয় নেয় সাপের কপালে , বুঝবি না কোনদিনও । এই সস্তার টিন-চুড়ি পেরিয়ে আমার সিলেবাস , বুঁদ হয়ে থাকা সেকেন্ডে বিজাতীয় প্রশ্ন । মফসসলে আগুন লাগে বেশী , এত পুকুর , এত খানাখন্দ পেরিয়ে দুদন্ড বসি বকুলতলায়।তোর বাঁশির স্বরে তলপেটে মোচড় দিয়ে ওঠে রক্তাভ লাল । ঠোঁটে ঝুঁলে থাকে তারাখসার ভস্ম । আর ...

এই ভস্ম মেখে এক জরাজীর্ণ শিব ওঠে আসেন , ছেঁড়া ব্লাউজ নিয়ে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র শিখি আর সন্তানের স্কুলের খাতায় লিখে রাখি অবৈধ পিতার গোপনতম নাম ।
দশ
পথ এতটাই বিভ্রম হয়ে ওঠে কখনও কখনও ! মহুলের গন্ধে ভরে ওঠছে পটমদার শাল পলাশের দেহ । সুবর্ণরেখার রুনুঝুনু শব্দ । কলসী কাঁখে ওই যে মহুল ফুল নেয়ে আসছে নদী ছেড়ে দুটুকরো চাউনি কি ছুঁড়ল আমার দিকে । শরীরে শিহরণ জন্মালেই জন্ম হয় নতুনের । কতদিন এই শিহরণ নেই ! কতদিন আগে চোখে ড্রপ ফেলতে ফেলতে ক্ষুদ্রতম জলবিন্দু টিকেও দান করে বসে আছি ফোর জি নেটওয়ার্ক এর কাছে ! খসখস শব্দ আজকাল বড্ড অচেনা লাগে, ভয় করে এই পিঠ ঠেকে যাওয়া দুনিয়ায় আবার কি নতুন কারো পদচারণ । আবার মানিয়ে নেওয়ার তোড়জোড় ! আবার ভেঙে ফেলা এতদিনের পোষ মানা অভ্যাসের ! খুঁটে খাওয়া প্রতিটা জীবের জন্মগত ব্যাপার । মানিয়ে নেওয়াই তোর আমার সম্পর্কের দীর্ঘ পাঁচ বছর । তারপরেও কেমন ভাবে গোপন কেমন নিজস্ব জায়গা করে রাখে দেখ ! দেখ কেমন ভাবে ছুঁতে চায় আলোকধারার দুটুকরো গলি ! এখানে তুই নেই , কলেজ ক্যাম্পাস নেই , আমার জন্য বরাদ্দ চোখের লাল রঙ নেই । এখানেই মিশেছে যাবতীয় দিগন্তের সূত্র । আর ঠিক এখানেই পাখি হওয়ার বিস্তারিত স্বাদ । ভুবনডাঙার মাঠ ছুঁয়ে , জলজ্যান্ত নদী টপকে শুধু ডানা আর ডানা ।

#বাতিল#

আসলে জল যা, তা যে কারোর একার নয়
মেঘ ভালো জানে

গাছেদের স্থায়ী রুম নেই
বর্ণপ্রথা নেই

শুধু দুফোঁটা জল চেয়ে চেয়ে
মরে যাওয়া গাছেরা
শৌখিন আসবাব হয়ে আছে

ততদিনে আমিও অভিমানী। ছোঁয়ার নেশা পেয়ে বসেছে আমাকে। শব্দকে। ধ্বনি ভেঙে ভেঙে শানিত করি প্রতীক্ষার জাল। অন্তর খুঁড়ে বেরিয়ে আসে লাভা, রঙ, রক্তস্রোত। শব্দের গভীরে বেড়ে ওঠে কান্না। হাসি। গোপনে গোপনে ভরে ওঠে ডাইরির পাতা; ল্যাপটপের মেমরি। ছুঁতে পাওয়ার নেশায় অসংখ্য কবিকে সাজাই আমার বুক সেলফে। কলেজের ব্যাগে। কবিতা বাজে। ঘরদোর ভরে ওঠে। আর ফিসফিস করে জন্ম নেয় কথনের বুননশিল্প। এক আশ্চর্য জন্ম।



কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা  কাব্যি 
শেয়ার করুন


Avatar: Atoz

Re: কবিতাভাবনা - এসো শূন্য, এসো হে নিবিড়

ভালো লাগল।
Avatar: i

Re: কবিতাভাবনা - এসো শূন্য, এসো হে নিবিড়

শুধু একগুচ্ছ কবিতাও হতে পারত। প্রেক্ষাপটের আভাস যে গদ্যাংশে, যেন চালচিত্রের মত ধারণ করে আছে কবিতাগুলি। ভালো লাগল।
নিয়মিত লিখুন।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন