বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

উনিশতম অশ্বারোহী

মলয় রায়চৌধুরী

এক
বেগম সুফিয়া কামাল, আব্বাসউদ্দীন আহমদ প্রমুখ অনেকে নজরুলের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনার্ধে তাঁদের বিশেষ আচরণটিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘কদমবুছি’ নামক শব্দটির দ্বারা । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা অধ্যাপকগণ কর্তৃক সংকলিত ও সংশোধিত ‘সংসদ বাংলা অভিধান’ গ্রন্হে শব্দটি নেই । অর্থৎ অভিধানে অভিধা নেই ।এই বহু ব্যবহৃত ও প্রচারিত বইটির উপদেষ্টাবৃন্দের মধ্যে আবদুল ওদুদ, আবুল হাসনাৎ, মুহম্মদ আবদুল হাই, ও সৈয়দ মুজতবা আলীর নাম আছে । অর্থাৎ অভিধানটি কেবল পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু উচ্চবর্গ-উচ্চবর্ণ ভাষাবিদ ও সাহিত্য অনুরাগীদের তত্বাবধানে বিরচিত, এমন মনে করার কারণ নেই । ঢাকায় প্রকাশিত যে বাংলা অভিধানগুলো কলকাতায় বিক্রি হয়, তাতেও শব্দটি নেই । কিন্তু এই একটিমাত্র উদাহরণের দ্বারা প্রতিপাদিত হয় যে ভাষা, তা সে বাংলা, উর্দু, ইংরেজি, ফরাসি যা-ই হোক না কেন, একটি ঐকিক প্রণালী নয় । একবর্গীয় অভিব্যক্তি-বিন্যাস নয় । ভাষাকে যদি কাঠামিবদ্ধ ঐকিক নিয়মের অন্তর্গত মনে করা হয়, এবং সেই ভাষাপ্রণালীটিকে সাংস্কৃতিক স্ফূরণের কাজে ব্যবহার করা হয়, তাহলে একটি এজমালি সংস্কৃতি, অথবা একটি প্রভাবশালী, এমনকী আধিপত্যবাদী, ভাবতত্বের চাগিয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দেয়, যার দরুন সমাজটির অন্তর্গত সাংস্কৃতিক জটিলতার যৌগিক প্রক্রিয়াটি আমাদের অনুসন্ধানের আড়ালে থেকে যেতে পারে । বলনকেতা এবং লিখিত ভাষার কার্যসম্পাদন সর্বদা সংঘটিত হয় একটি কালখণ্ডের বিশেষ সামাজিক অবস্হায়, আলোচ্য সমাজটির সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক টানাপোড়েনে ।

একটি ভাষা বহুবিধ ছোট-ছোট প্রণালী বা ডিসকোর্সের সংমিশ্রণে গঠিত । যেমন লেটোর গান, সনেট, অভিভাষণ, চিঠি, বৈজ্ঞানিক পরিভাষা, মর্সিয়া, কীর্তন, গালাগাল, আবৃত্তি, কোরাস, গজল, গল্প, প্রতিবেদন, বকবক, আঞ্চলিক বাচন, অমার্জিত কথাবার্তা, প্রেমালাপ, বকুনি, অফিস-নোট ইত্যাদি । ব্যবহৃত শব্দাবলি এবং অভিব্যক্তির নিহিতার্থ, সন্দর্ভ অনুযায়ী পালটায়, প্রয়োগকারীর সামাজিক সাংস্কৃতিক অবস্হানের পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে ওঠে তাদের অর্থবোধকতার সম্পর্ক । শব্দাবলির বা অভিব্যক্তিসমূহের নির্গলিতার্থ ভাষা-বিশেষটির দরুণ রূপায়িত হয় না, তা হয় ডিসকোর্স-বিশেষটিতে অন্তর্ভুক্তির কারণে । শ্রেণি, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, বর্গ, জাতপাত, ধর্ম ইত্যাদির অন্তর্গত দ্বন্দ্বের মাধ্যমে বলনকেতার জন্ম হয়, এবং তা ভাবাত্মক স্হিতিগুলোর পরস্পর-বিরোধিতার সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত । অতএব, সমাজটির সূক্ষ্ম প্রতিদ্বন্দ্বিতার জাল ছেয়ে ফেলতে পারে অভিব্যক্তির স্ফূরণ ও তার মধ্যেকার আধিপত্য বা দুর্বলতাকে, মানে বা নিহিতার্থ নামের পুরো ব্যাপারটাকে, আর অভিধান প্রণেতাদের । আমরা জানি, একই অভিব্যক্তির ট্রেড ইউনিয়ন মঞ্চে একরকম মানে হয়, আবার আমলাদের সভায় আরেকরকম মানে হয় । অভিব্যক্তি চেপে যাওয়াটাও এক ধাঁচের অভিব্যক্তি । পশ্চিমবঙ্গের এবং বাংলাদেশের বহু অভিধানে, সজ্ঞানে অথবা অজান্তে, বহু অভিব্যক্তি চেপে যাওয়া হয়েছে, এবং তা সচেতনভাবে বা অবচেতনায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত । সমাজের অন্যান্য বর্গের মতন, সাহিত্যের আলোচক ও ইতিহাসকার, ভাষার ক্ষমতা ও দক্ষতাকে প্রয়োগ করেন । যাঁরা সাহিত্য পড়েন এবং আলোচনা করেন, তাঁরা কেউই সাংস্কৃতিক-মূল্যবোধ নিরপেক্ষ নন । কোনও লোকের পক্ষে অমন নিরপেক্ষ হয়ে সাহিত্যের মূল্যায়ন করা সম্ভব নয় । সংস্কৃতি বলতে জীবনের সবকিছু বোঝায়, সমস্ত ব্যাপার, এমনকী ডাক্তারির মতন নিরপেক্ষ জ্ঞানের এলাকাও ।

অভিব্যক্তির সাহায্যে সমাজের ক্ষমতাকেন্দ্রগুলো রূপায়িত হয়, আর তাকে দাঁড় করিয়ে রাখে মূর্ত বা বিমূর্ত সমসাময়িক জ্ঞান, বিশেষ করে সেই সব জ্ঞানাধিকারীদের কার্যকলাপ, যাঁরা এই জ্ঞানকে একচেটিয়া করে রাখতে চান । বিশেষ একটি জ্ঞানের সাহায্যে যে-ব্যাপারটিকে পঞ্চাশ বছর আগে আমরা বলতুম পাগল হয়ে যাওয়া, এখন তাকে বলি মানসিক অসুস্হতা । সমাজে অন্যত্র তাকে বলা হয় ভুতে পাওয়া । মানসিক অসুস্হতাও যে অনেক ধরণের হয়, তা আমরা আজ জানতে পেরেছি । একশো বছর আগে সুন্দরী বলতে যে দেহকাঠামো ও মুখাবয়ব অনুমোদিত ছিল, এখনকার সুন্দরীর সংজ্ঞা তা থেকে একেবারে আলাদা । তখনও, এবং এখনও, সংজ্ঞা তৈরি করা হয়েছে জ্ঞান প্রয়োগ করে । জ্ঞানের প্রয়োগে সাহিত্যের মান বা অনুশাসন বা মানদণ্ড বা ক্যানন বানানো হয় । অমন নানা জ্ঞান নানা বিষয়ে স্ফূরিত হতে থাকে সমাজের ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে, মসনদটির মূল্যবোধ থেকে । জ্ঞান ব্যাপারটি হল সমাজিক নিয়ন্ত্রণের ফর্ম । জ্ঞান থেকে ক্ষমতার উৎসারণ ঘটে । যেমন-যেমন নতুন নতুন জ্ঞানের উদ্ভব হয়, তেমন-তেমন বিকশিত হয় ক্ষমতার নবীন আদরা । কোনটা উৎকৃষ্ট বা কোনটা নিকৃষ্ট, কাকে স্বাভাবিক বলা হবে আর কাকে অস্বাভাবিক, কী হলে ভালো আর কী হলে খারাপ, নির্ধারিত হয় ক্ষমতাকাঠামোর চরিত্রের দ্বারা । কেননা ক্ষমতা দেয় বিচার করার অধিকার, এবং সেহেতু শাস্তি দেবার বা উপেক্ষা করার যোগ্যতা । প্রাচীনকালে সাহিত্যিক-ভাবুক-দার্শনিকদের শারীরিক শাস্তি দেবার চল ছিল । ক্রমশ শাস্তিকে করে তোলা হয়েছে মানসিক । বহু কবি লেখক আঁকিয়ে আজও সমাজ থেকে একঘরে বা স্বদেশ থেকে নির্বাসিত হন ক্ষমতাকেন্দ্রে আঘাত হানার কারণে, এমনকী তাঁদের গুমখুন করে লোপাট করে দেয়া হয়, কিংবা খুন করে খুনিরা লুকিয়ে পড়ে । অভিধান থেকে নির্বাচিত ও চিহ্ণিত অভিব্যক্তিসমূহকে বাদ দিয়ে যেমন একদল মানুষকে শাস্তি দিতে পারে সমাজ, তেমনি একজন সাহিত্যিককে শাস্তি দিতে পারে তাকে ম্লেচ্ছ, নেড়ে, কাফের, মালাউন, ক্ষ্যাপা, আধপাগল বদনাম দিয়ে । অথবা সাংস্কৃতিক চত্বর থেকে তার অপসারণ ঘটিয়ে, বা তাকে হীনম্মন্য চিহ্ণিত করে । কিংবা এরকম রটনাও বাজারে ছেড়ে দেয়া যেতে পারে, যে অমুক লোকটি ছোটোলোকদের জন্য লেখেন, নোংরা লেখেন, মাগিবাজ ছিলেন, মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পান, গলায় গানের মাধুর্য নেই, মেয়েটিকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেন ইত্যাদি । ক্ষমতার অবয়ব ব্যতিরেকে কুৎসার প্রসার ঘটে না । কুৎসা সর্বদা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ।

প্রশ্ন হল, এই যে ক্ষমতা তা আসে কোথা থেকে ? যে গোষ্ঠী শাসন করে, তারাই ক্ষমতার উৎসসূত্র । ক্ষমতা দখলের জন্য ভোটাভুটির নামে কতো খুনোখুনি হয় তা আমরা প্রতিটি নির্বাচনে দেখি । যারা ক্ষমতা দখল করে তারাই শাসক । শাসকের মূল্যবোধ চেপে বসে সমাজের সর্বত্র । বিশ্ববিদ্যালয়-অ্যাকাডেমি-প্রশাসন-রাজকোষ তাদের মূল্যবোধকে এবং মূল্যবোধপ্রসূত অনুশাসনকে, মানদণ্ডকে, ক্যাননকে, মাপকাঠিকে, নানন্দনিকতাকে প্রতিষ্ঠা দান করে । এই ক্ষমতাকেন্দ্রটিই প্রতিষ্ঠান । রাজকোষ যাদের, উৎপাদনক্রিয়ার মালিকানা এবং ভোগের সুযোগ তাদের । সমঝোতার বুদ্ধিবৃত্তি আকৃষ্ট হয় সেইদিকেই । কিন্তু শাসকবর্গের মধ্যে নানা ব্যক্তি ও গোষ্ঠী তাদের আধিপত্য প্রয়োগ করে ক্ষমতাকেন্দ্রটি নিজেদের দখলে রাখতে চায়, যার ফলে বিকল্পের সম্ভাবনা দেখা দেয় । বিকল্পগুলোর অবিরাম টানাপোড়েন চলতে থাকে । সাংস্কৃতিক বিকল্পের যাতে উদ্ভব না হয়, বা হলেও তাকে দাবিয়ে দেয়া যায়, তাই রাষ্ট্রকাঠামো নিজেকে নাৎসি, ফ্যাসিবাদী, সাম্যবাদী, হিন্দুত্ববাদী, বৌদ্ধ বা ইসলামি, অথবা যে-কোনও ভিত্তিবাদী দর্শন ঘোষণা করতে পারে, এবং করেও, যেমন সাম্প্রতিক কালের চীন। পাকিস্তানের কথাও বলা চলে, যেদেশে শিয়া, বোহরা, আহমদিয়া, ফকির, সুফি ইত্যাদিকে ধ্বংস করার প্রয়াস চলে, যদিও তারা ইসলাম ধর্মাবলম্বী । এইসব ক্ষেত্রে মূল্যবোধটির মাল-মশলা আগে থাকতে তৈরি পাওয়া যায় । নৈতিক এবং বৌদ্ধিক উৎকর্ষের প্রতিষ্ঠা বিভিন্ন উপায়ে করার চেষ্টা করে শাসকগোষ্ঠী, বা আধিপত্যের কর্তৃত্বধারী ব্যক্তিগণ । উৎকর্ষের সংজ্ঞা তাদেরই বানানো । সংজ্ঞাটির বাইরের ব্যক্তিকে তখন বাধ্যহয়ে বিরোধী ভাবধর্ম ও শৈলী থেকে সূত্র আহরণ করতে হয় । এর দরুণ সংস্কৃতি বিশেষটির চেহারায় ফুটে ওঠে বহুত্বের আভাস, আর ক্ষমতায় চোট লাগার ভয়ে, সে-সমস্ত বিরোধিতাকে নাকচ করার প্রয়াস হয় ।

আইডিওলজি ব্যাপারটা তো কোনও বিমূর্ত, ওপর থেকে চাপানো প্রত্যয়ের বিন্যাস নয় । আর আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অনুমানসমূহ এবং ভাবনা ও অভ্যাস কেবল অন্যের দ্বারা কলকাঠি নাড়ার ফলাফল নয় । কিংবা তা প্রত্যক্ষ প্রশিক্ষণ নয়, যে, যখন ইচ্ছে থামিয়ে দেয়া চলে বা গুটিয়ে নেওয়া যায় । তা যদি হতো তাহলে সংস্কৃতিকে যেদিকে যেমন ইচ্ছে চালনা করা যেতো । ইরানের শাহ শত চেষ্টা করেও নিজের ইচ্ছেমতন চেহারা দিতে পারেননি সেদেশের সংস্কৃতিকে । আবার খোমেইনিও সফল হননি । সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত চাপের দরুন পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙে দু’টুকরো হয়ে গেল । সোভিয়েত দেশও ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়ে গেল এবং টুকরোগুলো নিজের সংস্কৃতিতে ফিরে গেল । যোগোস্লাভিয়া ছিৎরে গেল । অথচ চাপিয়ে দেয়া নান্দনিকতার রেশ থেকে সংস্কৃতিটির বিশুদ্ধ মুক্তি বেশ কঠিন, বলা যায় অসম্ভব — পদাবলী বা মঙ্গলকাব্যে আর ফেরা যায় না । পক্ষান্তরে, তৃণমূল স্তরে প্রতিরোধগুলো যতদিন টিকে থাকে ততদিন সংঘর্ষ চালিয়ে যায় ।

নিচুতলাটিকে তাঁবেদারির কাছে আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়াটি হল হিগেমনি । এই হিগেমনি শব্দটি কিছু বিদ্যায়তনিক মহলে উচ্চারিত হয় ‘হেজিমনি’, কেননা আমেরিকানরা বলে হেজিমনি, আর বর্তমান দুনিয়া জুড়ে আধিপত্য তো আমেরিকার । শব্দার্থ যার মুলুক তার । অবশ্য প্রান্তিক ইংরেজিভাষী দেশগুলো যে পপতিরোধ তুলেছে, তা থেকে উদ্ভূত হয়েছে গ্লোবাল ইংলিশ, যে ইংরেজির মালিকানা কারোর একচেটিয়া নয় । হিগেমনি একটা লাগাতার সংঘর্ষের প্রক্রিয়া যা চলতেই থাকে । চলতেই থাকবে । যারা ক্ষমতাকাঠামোর বাইরে, তারা অধস্তন, তারা নিচুতলার, তারা নিম্নবর্গের । নিচুতলা মানেই দারিদ্র্য নয় । সংখ্যাগরিষ্ঠের তুলনায় সংখ্যালঘু থাকবে নিচুতলায়, বাংলাদেশে হিন্দুরা আর ভারতে মুসলমানরা নিচুতলার, উঁচু জাতের তুলনায় দলিতরা থাকবে নিচুতলায়, শাসকদলের ট্রেড ইউনিয়ানের সামনে বিরোধিদলের ট্রেড ইউনিয়ান হতে পারে নিচুতলার, পুলিশ প্রশাসনের আশ্রিত গুণ্ডা-মাস্তানের তুলনায় স্বনির্ভর গুণ্ডা-মাস্তান হতে পারে নিচুতলার । ব্রাহ্মসমাজের মূল্যবোধ যদি সমাজটিতে ছেয়ে থাকে তবে ব্রাহ্ম কবি হবেন উঁচুতলার, বামপন্হী শাসকের রাজত্বে বামপন্হী লেখক-কবিরা উঁচুতলার এবং শাসকের পুরস্কারগুলো তাঁদেরই প্রাপ্য । সমাজটি উর্দুভাষীর কিংবা হিন্দিভাষীর নিয়ন্ত্রণে থাকলে তাদের ভাবুকরা অন্য ভাষাভাষীর তুলনায় হবে ওপরতলার । একটি সমাজব্যবস্হায় যেমন-যেমন ব্যতিহার্য অনুমোদনের আচরণ গড়ে ওঠে, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে জন্মায় অর্থবোধকতা এবং মূল্যমানের বিন্যাস । ফলে এককালের ভালো পরবর্তীকালে তেমনকিছু আহামরি মনে হয় না । ও যে মানে আর মূল্যায়ন, সেটাই কিন্তু সমাজের বেশির ভাগ লোকের কাছে বাস্তবতা । ক্ষমতাকেন্দ্রটি যদি ঘোষণা করে শতফুল বিকশিত হোক, তাহলে তার বাইরে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ হবে যে একরকম ফুলের নাম বুঝি শতফুল ।

ক্ষমতাকাঠামো সম্পর্কে প্রাগুক্ত বক্তব্যের সমর্থনে একটি ছোট উদাহরণ দেয়া যাক । ইকবাল ও নজরুল দুজনেই ইসলাম ধর্মাবলম্বী । ইকবাল প্রদত্ত ভাবকল্প থেকে পাকিস্তান তত্বের জন্ম । তিনি কবি অথচ সাম্প্রদায়িক । তিনি রুটমার্চের গান লেখেননি । অথচ ভারতীয় সৈন্যবাহিনীতে তাঁর লেখা গান ( সারে জহাঁ সে অচ্ছা হিন্দুস্তাঁ হমারা ) নেওয়া হয়েছে । সেতারবাদক রবিশঙ্কর তাতে সুর দিয়ে কুচকাওয়াজের উপযোগী করে তুলেছেন । নজরুলের বহু গান আছে রুটমার্চের, এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে তা উৎসাহ-উদ্দীপনার জন্য ব্যবহৃত । নজরুল পাকিস্তান চাননি । ধর্মান্তরিত অন্ত্যজ হিন্দু পরিবার তাঁর অতীত নয় । তিনি ছিলেন সাম্প্রদায়িকতার তুমুল বিরোধী । ভারতীয় সৈন্যবাহিনীতে তাঁর গান নেওয়া হয়নি ( বাংলাদেশে নেওয়া হয়েছে কিনা জানি না ) । পণ্ডিত রবিশঙ্কর তাঁর কোনও গানের সঙ্গে সম্পর্কে গড়ে তোলেননি । সম্ভবত ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর কর্তারা তাঁর নামই শোনেননি । ভারতবর্ষের স্বাধীনতা-উত্তর ক্ষমতাকাঠামোটিতে সুভাষচন্দ্র বসুর হাত থাকলে, ব্যাপারটা হয়তো অমন হতো না । ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পরেই, যে নৈতিক এবং সাংস্কৃতিক নীতিমূল্য দিল্লির মসনদ থেকে স্ফূরিত হয়েছিল, তাতে সুভাষচন্দ্র বসু ও কাজী নজরুল ইসলাম, উভয়েই পর্যবসিত হয়েছিলেন নিচুতলায় । তাছাড়া বাংলা, যে ভাষাটিতে গান লিখেছিলেন নজরুল, সেটি ভারতের মসনদ দখলকারীদের ভাষা নয় । দেশভাগের পর পূর্বপাকিস্তানের, অর্থাৎ বাঙালিদের, মসনদের ভাষা বেশ কিছুকাল ছিল উর্দু । হিগেমনিটির বিরুদ্ধে তাঁদের সংশস্ত্র সংগ্রাম করে মসনদে বাংলা ভাষাকে বসাতে হয়েছে ।

ভারতবর্ষে, শিক্ষিত বাঙালি বালক-বালিকারা, ‘সারে জহাঁসে অচ্ছা হিন্দুস্তাঁ হমারা’ গানটির সঙ্গে যতোটা পরিচিত, ততোটা নন ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার’-এর সঙ্গে, যদিও প্রথমটির তুলনায় দ্বিতীয়টিতে ভাষা, শব্দবিন্যাস ও ধ্বনিক্রীড়ার আধিক্য নজরুলকে প্রথম থেকেই বিতর্কিত করেছিল, কেননা তাঁর অহং-পাত্রটিকে সংজ্ঞায়িত করা তাঁর নিজের পক্ষেও ( বেঙ্গল রেজিমেন্টের হাবিলদার ও লেটোর দলের ঢোলক-বাজিয়ের শৃঙ্খলায় গঠিত ) কঠিন ছিল । জীবনযাপনের উচ্ছৃঙ্খলতার ভারসাম্য গড়ে তুলতে ঢোলবাদক ও কুচকাওয়াজকারীর শৃঙ্খলাবোধ কাজ করে থাকবে যা পরবর্তীকালে গানের বিমূর্ত নান্দনিকতায় হয়ে গিয়ে থাকবে জটিল । রবীন্দ্রনাথ যে সময়ে তাঁর ফোটোগুলো আচার্য-সুলভ পোজ দিয়ে তোলাচ্ছিলেন, সেসময়ে নজরুল কমনীয় কবি-কবি পোজ দিচ্ছিলেন, এই জন্যে যে, বঙ্গসমাজে ঢোলবাদক ও হাবিলদার নিচুতলার । বস্তুত নিচুতলার তকমা দিয়ে সমগ্র বেঙ্গল রেজিমেন্টকেই ভেঙে ফেলা হয়েছিল, যদিও অন্যান্য রাজ্যের নামে রয়েছে বিভিন্ন রেজিমেন্ট ।

বঙ্গীয় রেনেসাঁসের দরুন কবো ও গায়কের তুলনায় একজন সাধারণ মানুষকে নিকৃষ্ট মনে করার চল আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল । তদানীন্তন সাহিত্য আলোচকদের নজরুল-বিরোধী উপপাদ্য ছিল যে, তাঁর পদ্যের ধ্বনিক্রীড়াটি শহুরে বাঙালি অভিজাত সমাজকে মানসিক ও শারীরিকভাবে বিব্রত করে । লক্ষণীয় যে তদানীন্তন কলকাতাভিত্তিক সাংস্কৃতিক ক্ষমতাকেন্দ্রটি অভিজাতবর্গের কুক্ষিগত থাকার দরুন, বাঙালির কোনও নিজস্ব নাচ গড়ে ওঠার সুযোগ হয়নি, যেভাবে অন্যান্য ভাষাভাষীদের ভাঙড়া, বিহু, লাওনি, কুচিপুড়ি, কথ্থক, ওড়িসি, কথাকলি, গরবা, ডাণ্ডিয়া ইত্যাদি নাচগুলো, সেই ভাষাভাষী নারী-পুরুষকে শ্রেণি নির্বিশেষে দৈহিক বিভাস দিয়েছে । বাঙালি সমাজের ছৌ, সাঁওতাল এবং রায়বেঁশে উপেক্ষিত থেকেছে খালি গায়ে ছোটলোকদের নাচ হিসাবে, এবং দেশভাগের পর এই তিনটি নাচকে পর্যটক আকর্ষণের জন্য ব্যবহার করা হয় ।

নাচ ব্যাপারটি ধ্বনিক্রীড়াকে শরীরের মাধ্যমে রূপায়িত করে । বাঙালি জমিদারবাবুরা নাচের জন্য বঙ্গসংস্কৃতির আওতার বাইরে সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতি থেকে নর্তকীদের আমদানি করে ধ্বনিক্রীড়ার আশ মেটাতেন । এখনও নৃত্য বঙ্গসমাজে তুলনামূলকভাবে অপাঙক্তেয়, শরীরকে ধ্বনিক্রীড়ার কাছে সোপর্দ করতে হবে বলে । নৃত্যানুষ্ঠান নামের ব্যাপারগুলো ঘটে শহরের মঞ্চে, মধ্যবিত্তের খোরাকের জন্য । পুরুষের নাচ তো আজও প্রায় নিষিদ্ধ বলা চলে । নাচের গুরুত্ব না থাকায়, উচ্চবিত্তের অধিকাংশ বাঙালির শরীর মেদবহুল এবং শরীরের ফর্ম বীভৎস । উনিশ শতক ও বিশ শতকের শুরুতে নাটকে নারীচরিত্রে অভিনয়ের জন্য সমাজ বাধ্য হয়ে মঞ্চে এনেছিল বারবনিতাদের । বস্তুত সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিগুলোকে নিচুতলার হাত থেকে কেড়ে নেয়ার পরই সেগুলোকে শিল্পের খেতাব দেয়া আরম্ভ হয় । কারণ ওই হিগেমনি । শিল্প নামক তথাকথিত ব্যাপারটির মালিকানা উচ্চবর্গের, কেননা কাকে শিল্প নামে অভিহিত করা হবে তার একচেটিয়া জ্ঞান তো তাদের । এই জ্ঞান এনেছিল সাম্রাজ্যবাদীরা । উপনিবেশগুলোয় শিল্প নামের ভাবকল্প তারাই জাহাজে চাপিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

কাজী নজরুল ইসলামের কাজকে শিল্প নামে অভিহিত করা হবে কিনা, তা তাঁর আবির্ভাব থেকেই তর্কের প্রসঙ্গ হয়ে দেখা দিয়েছিল, এবং সে সংশয় আজও মধ্যবিত্ত-নিয়ন্ত্রিত বিদ্যায়তনিক মহলে বজায় আছে, পশ্চিমবঙ্গে বামপন্হীদের সাড়ে তিন দশকের মৌরসিপাট্টা সত্বেও যায়নি । যদিও ইতোমধ্যে সমাজ তার নিজস্ব প্রক্রিয়ায় নাপিত, ছুতোর, দর্জি, স্যাকরা, পেইনটারের দোকানে দোকানে আর্ট বা শিল্পের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছে । তাঁরা বাধ্য হয়েছেন আর্ট বা শিল্পের ভাবকল্পকে এভাবে আক্রমণ করতে, কেননা বাজারচালু মূল্যবোধ অনুযায়ী শিল্প হল ওপরতলার কিন্তু লোকসংস্কৃতি নিচুতলার । আসলে বাঙালির মূল সংস্কৃতির নামে গত দেড়-দুশো বছরে যা চালানো হয়েছে, তা হল শিক্ষিত ও হাফলিটারেট মধ্যবিত্তের কাজ-কারবার, যা সমগ্র বাঙালিসমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশমাত্র । কাজ-কারবারটি গড়ে উঠেছে আধুনিকতার তাগিদ, জাতয়তাবাদ আর ইংরেজি শিক্ষার প্রভাবে । নজরুলের ক্ষেত্রে বক্তব্যটির প্রাসঙ্গিকতা আমরা পরে আলোচনা করব ।

১৯২৭ সালে ইব্রাহিম খাঁকে লেখা চিঠিতে নজরুল এই সংশয়টির মোকাবিলা করেছিলেন এইভাবে, প্রাতিস্বিক স্তরে : “আমি আর্টের সুনিশ্চিত সংজ্ঞা জানিনে, জানলেও মানিনে । এই সৃষ্টি করলে আর্টের মহিমা অক্ষুন্ন থাকে, এই সৃষ্টি করলে আর্ট ঠুঁটো হয়ে পড়ে, এমনিতরো কতকগুলি বাঁধা নিয়মের বলগা কষে-কষে আর্টের চরম সুন্দর নিয়ন্ত্রিত প্রকাশ হলো — একথা মানতে আর্টিস্টের হয়তো কষ্টই হয়, পরান হাঁপিয়ে ওঠে । জানি, ক্লাসিকের কেশো রুগিরা এতে উঠবেন হাড়ে-হাড়ে চটে, তাঁদের কলম হয়ে উঠবে বাঁশ । এর মধ্যে হয়েও উঠেছে তাই । তবু আজ একথা জোর গলায় বলতে হবে নবীনপন্হীদের । এই সমালোচকদের নিষেধের বেড়া যাঁরাই ডিঙিয়েছেন, তাঁদেরই এঁদের গোদা পায়ের লাথি খেতে হয়েছে, প্রথম শ্রেণি হতে দ্বিতীয় শ্রেণিতে নেমে যেতে হয়েছে । ….আমার হয়েছে সাপের ছোঁচো গেলা অবস্হা । ‘সর্বহারা’ লিখলে বলে কাব্য হল না, ‘দোলনচাঁোপা’, ‘ছায়ানট’ লিখলে বলে ও হল ন্যাকামি ! ও নিরর্থক শব্দঝংকার দিয়ে লাভ হবে কী ? ও না শিখলে কার কী ক্ষতি হত ?”

নজরুলের ক্ষোভ থেকে টের পাওয়া যায়, বহুকাল সাম্যবাদী নেতা মুজফফর আহমেদের সংস্পর্শে থাকলেও, ‘কবি’, ‘আর্টিস্ট’ ইত্যাদি নতুন গড়ে ওঠা এবং সাম্রাজ্যবাদ-উদ্ভূত তকমার আগ্রহ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারেননি তিনি । ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ আরও নানা তকমা এনেছিল যা সনাতন ভারতীয় অথবা ইসলামি চিন্তায় ছিল না, যেমন ‘প্রতিভা’, ‘মাস্টারপিস’ ইত্যাদি ।

দুই
মানবেতিহাস প্রকৃতপক্ষে লাগাতার সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের বহুমুখী ইতিহাস । তা সিংহাসনে রাজা-রানি বদলের গল্প নয় । ইতিহাসকে রাজা-রানি বদলের গল্পতে সীমিত রাখলে তা কেবল ক্ষমতাকেন্দ্রের ছত্রপতিদের কেচ্ছা নিয়ে মেতে থাকে । অবহেলিত থেকে যায় বিস্তীর্ণ ভুগোলের জনমানব । ঔপনিবেশিকতা আসার আগে বাঙালির বিশাল ভূগোলের অজস্র ঘটনা-এলাকা ছিল, এবং সেসব স্হানের নিজস্ব সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার নাট্যস্ফূরণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ । গৌড়, রাঢ়, বঙ্গ, বরেন্দ্র, পুণ্ড্রবর্ধন ইত্যাদি এলাকার সাংস্কৃতিক গতিপ্রকৃতি একে আরেকের থেকে পৃথক ছিল বলে অনুমান করা যায় ; স্হাপত্য ও হাতের কাজ থেকে তেমনটাই মনে হয় । জনসমাজের প্রতিটি বর্গের জীবনকাহিনি ছিল আলাদা । শিক্ষাকেন্দ্রগুলো, যেমন ভাসুবিহার, জগদ্দল বিহার, বিক্রমপুরী বিহার, পণ্ডিত বিহার, কণকস্তূপ বিহার, দেবীকোট বিহার, সোমপুর বিহার ছিল বাঙালির ভূগোলের নানা এলাকার স্হানিক বৈভিন্ন্যে ছড়িয়ে । ঔপনিবেশিক হস্তক্ষেপে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে বিপুল ও গভীর রদবদল সূচিত হয় । সাংস্কৃতিক নকশা এবং সামাজিক কাঠামোটিকে ছিৎরে দেবার মাধ্যমে বহিরাগত সমাজটি তার কর্তৃত্ব কায়েম রাখে । কর্তৃত্ব ছাড়া অন্য সমাজের সাংস্কৃতিক নকশা পালটানো যায় না । পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশে যে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, বিকাশ, পরিব্যপ্তি ও সংঘর্ষ দেখা যায় তা সাম্রাজ্যবাদী কত্তাত্তির কারণে । পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবদী অধিপতি-সমাজটি ফেরত যাবার পর উপনিবেশের মননবিশ্বে নিজের এমন সমস্ত ছাপ ছেড়ে যায় যা আর কখনও সম্পূর্ণ মুছে ফেলা যাবে না । অথচ কর্তার সংস্কৃতি থেকে যায় উৎকৃষ্ট চেহারায়, এবং বাঙালির আদি ও সনাতন সংস্কৃতি নিকৃষ্ট চেহারায় । ক্ষমতার চরিত্রই অমন । এর কোনো স্বকীয় নান্দনিক যুক্তি নেই। ফলে মর্সিয়ার চেয়ে এলেজি হয়ে ওঠে উৎকৃষ্ট, যাত্রাপালার চেয়ে উৎকৃষ্ট প্রতীয়মান হয় প্রসেনিয়াম থিয়েটারকে, লেটোর গানের চেয়ে রক অ্যান রোলকে, পয়ারের চেয়ে স্প্রিং রিদমকে, অগুরুর চেয়ে ইন্টিমেটকে, এবং নিদারুণ গ্রীষ্মেও জুতোমোজা পরে চাকরি করতে যায় লোকে, লোডশেডিং আক্রান্ত দপতরে ।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের গ্রেকোরোমান অধিবিদ্যাগত মননবিশ্বটি যেহেতু প্রজ্ঞাকে কৌম-নিরপেক্ষ ব্যক্তিলক্ষ্ণ মনে করত, সেহেতু সমাজের সুফলকে আত্মসাৎ করে সৃজন-কর্মকে ব্যক্তি মালিকানাধীন মেধাজাত পণ্যে পর্যবসিত করা হয়েছে । লোকসংস্কৃতির কাজগুলো তো সৃষ্টিকারী ব্যক্তি-মালিকের নয় । তা স্বতঃস্ফূর্ত যৌথতার অভিব্যক্তি । অথচ ব্যক্তিপ্রজ্ঞার কাজ না হলে সে-কাজের মৌলিক হবার সম্ভাবনা নেই । ‘মৌলিক’ নামের ভাবকল্পটিও ইউরোপের । অধিপতির অনুমোদন ছাড়া কোনও কাজ ‘মৌলিক’ তকমা পায় না, কেননা মানদণ্ড, অনুশাসন, ক্যানন তৈরি করার অধিকার কেবল কর্তার, মসনদের । উপনিবেশগুলোর স্হানিক সংস্কৃতির ওপর ইউরোপ থেকে আমদানি-করা সংস্কৃতি চাপানোর ফলেই চাটগাঁর বাঙাল, পাকিস্তানের বালুচ, আমেরিকার নাভাহো, অস্ট্রেলিয়ার মাওরি, আফ্রিকার জুলু, চিলির উপজাতি সবাই একইরকম লিরিক, এলেজি, সনেট, তের্জারিমা, ভিলানেল লিখে আহ্লাদে আটখানা হয়েছেন ।

পর্তুগিজ, ব্রিটিশ, ফরাসি উপনিবেশবাদীরা যখন বাংলা ভূখণ্ডে এসে ভিড়েছিল, তখন তাদের উদ্দেশ্য কেবল রোজগার করা আর আর স্বদেশে লভ্যাংশ পাঠানোয় সীমাবদ্ধ ছিল না । তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত যে, তারা আদিম কুসংস্কারাচ্ছন্ন দেশের লোকগুলোকে ( ফ্রেডরিক হেগেল যাদের মনে করতেন ‘বর্বর’ ) সুসভ্য এবং সংস্কৃতিবান করতে এসেছে । তাই তাদের নিজেদের বিশ্বাস, ধর্ম, আচার-আচরণ, রুচি তারা সুপরিকল্পিতভাবে , এবং শুরুতে অসহ্য জোরজুলুমসহ, চাপিয়ে দিয়েছিল শাসিত সমাজটির ওপর । শাসক যাকে সমর্থন করেছে তাকে উৎকৃষ্ট বলে গ্রহণ করেছে উপনিবেশের লোকেরা । তাদের ভাষায় তারা যে সমস্ত ব্যাপারকে ভালো বলে মনে করেছে, সে সমস্ত তারা চারিয়ে দিয়েছে শাসিতের ভাষায় । বস্তুত ব্রিটিশরা এসে গদিতে জমিয়ে বসার কিছুকাল পরেই আমাদের অলঙ্কারশাস্ত্র লোপাট হয়ে যায় । সাম্রাজ্যবাদের জাহাজ সুতানুটি-গোবিন্দপুরে নোঙর না ফেললে, স্বদেশের নিজস্ব অনুশাসন ও অলঙ্কারশাস্ত্র প্রয়োগ করে উপনিবেশের লোকেরা নিজেদের সাংস্কৃতিক উত্তরণের মূল্যবোধ নির্ধারণ বহুলাংশে বজায় রাখতে পারত । কিন্তু নবাগত ইউরোপীয় হস্তক্ষেপে তাদের চাপিয়ে দেয়া কাজগুলো হয়ে গেল ‘সংস্কৃতি’ এবং ভূমিপুত্রদের নিজস্ব কাজগুলো হয়ে গেল ‘কৃষ্টি’ । তাদের সরবরাহ করা নান্দনিকতার নকল করলে তা হল ‘আর্ট’, কিন্তু বাঙালির ভূমিজ নান্দনিকতা রূপায়িত হলে তাকে বলা হল ‘ক্র্যাফ্ট’ । কেননা সংস্কৃতি এবং আর্টের তুলনায় কৃষ্টো ও ক্র্যাফ্ট নিকৃষ্ট । ইংরেজরা যেহেতু সমাজের মানদণ্ড নির্ধারণের মালিক, এবং আর্ট ও সংস্কৃতি উৎপাদনের নেতৃত্বটি তাদের, অতএব বাঙালি সমাজের যে অংশটি তাদের ছত্রছায়ায় প্রতিপালিত, সেই অংশের লোকগুলোর কাজই আর্ট ও কালচার দাবি করার যোগ্যতা পেল । আর ইংরেজদের সংস্কৃতির কাছাকাছি থাকার জন্য জরুরি হল কলকাতায় থাকা, এবং সামর্থ থাকলে বিলেতে গিয়ে থাকা, অন্তত কিছুদিনের জন্যে । বাইরে যে বিস্তীর্ণ অঞ্চল, সেখানের বাঙালিদের কাজগুলো হয়ে গেল অপাঙক্তেয় । আর্থিক মানদণ্ডের পরিবর্তে, সাংস্কৃতিক মানদণ্ডে নির্ধারণ করা হল কারা ছোটলোক, নির্ধারণ হল ভদ্র ও অভদ্র, সভ্য ও অসভ্য, সুরুচি ও কুরুচি, বিশুদ্ধ ও অশুদ্ধ, সংস্কৃতিবান ও ‘আনকালচার্ড’-এর সীমা ।

ঔপনিবেশিক আমলের গোড়াপত্তন থেকেই, বাঙালির সংস্কৃতিতে, পাশ্চাত্য নান্দনিকতার জ্ঞান ব্যতীত, স্বীকৃতি পাওয়া, উনিশ শতকে ও বিশ শতকের প্রথম দিকে প্রায়-অসম্ভব তো ছিলই, এখন একেবারেই অসম্ভব হয়ে গেছে । স্বদেশি নন্দন-অনুশাসনের কাঠামো গ্রহণ করলেও, তাতে পাশ্চাত্য নান্দনিকতার মিশেল ছাড়া কোনও কাজকে ‘আর্ট’ হিসাবে মেনে নেয়া যাবে না । আসলে সাম্রাজ্যবাদ হল ভূমিপুত্রের স্মৃতিবিপর্যয় । ভূমিপুত্রের ইতিহাসকে বেমালুম লোপাট করে সেখানে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল ইউরোপীয় মননবিশ্বটি । জেমস লঙ ভারতচচন্দ্রের ‘বিদ্যাসুন্দর’কে বলেছিলেন ইতে ও অশোভন, এবং বাঙালির উচিত চসার-মিলটন পড়া । দেড়শো বছর যাবত তাইই করছে বাঙালি, এবং ভারতচন্দ্রকে ভুলে গেছে । প্রচলিত পাঁচালিগুলোকে জেমস লঙ বলেছিলেন নোংরা, লালসা উদ্রেককারী, মোটাদাগের কাজ । তারপর থেকেই অভিজাত বাঙালির পারিবারিক ধর্মকর্ম থেকে বিদেয় করা হল পাঁচালিগুলোকে । আজ সেগুলো নিম্নবর্গের নগণ্য পরিবারে কোনও রকমে টিকে আছে । বাঙালি বিদ্ব্যজ্জনদের মাথার ওপরে চেপে বসে গেছে ভিকটোরীয় আমলের ঔপনিবেশিক হাউসকোট ।

ইংরেজরা আসার আগে, ইসলামি সংস্কৃতির প্রভাবে, বাঙালির জীবনে সনাতন ভারতীয় সভ্যতা একটি নবতর দার্শনিক আধেয় গ্রহণ করেছিল, যার দরুন উন্মেষ ঘটে একটি লৌকিক বাঙালি সংস্কৃতির । সারা বাংলা জুড়ে, গড়ে ওঠে স্হানিক ছোট-ছোট ইতিহাস, যা, অভিজাত মুসলমান সমাজের বাইরে জন্ম দিয়েছিল ধর্ম, আচার-আচরণ, সাহিত্য, সঙ্গীতের তৃণমূল কৌমসংস্কৃতি । তুর্কি, আফগান, মোগল, ইরানি, বাগদাদিরা সেই অর্থে কোনও ব্যক্তি-প্রজ্ঞাবাদী মননবিশ্ব আনেনি, যেমনটা এনেছিল ইউরোপীয়রা । তাঁদের ব্যক্তিনির্মাণ প্রকল্পটি ছিল সম্পূর্ণ ধর্মনির্ভর । কাজী নজরুল ইসলামের উন্মেষ ঘটেছিল এই খাঁটি বাঙালি কৌমদর্শনের পৃষ্ঠভূমিতে। সম্ভবত তিনিই তার শেষ প্রতিভূ । ওই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের বাইরে নজরুলের মূল্যায়ন যে কেবল ভুল, তাইই নয়, তা অসম্ভব । ভারতবর্ষের সংস্কৃতিতে এই ধরণের ভূমিজ মনীষার উদ্ভব বিভিন্ন সময়ে ঘটেছে সমাজচিন্তনের প্রকাশরূপে : থিরু ভাল্লুভার, মীরাবাই, তুকারাম, কবিরদাস, লালন প্রমুখ ।

১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠা, ১৮৩৫ থেকে শিক্ষার বাহনরূপে ইংরেজি, এবং ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা, বাঙালির জীবনে একটা স্ট্যাণ্ডার্ড সংস্কৃতির সুযোগ তৈরি করে দিতে পেরেছিল, যা তার লৌকিক সংস্কৃতি থেকে মধ্য ও উচ্চবর্গকে ক্রমশ বিছিন্ন-বিযুক্ত করে দিলে । ইয়ং বেঙ্গল এবং অন্যান্য সম্প্রদায় আবির্ভূত হলেন, বাঙালির সংখ্যাগরিষ্ঠ, প্রধানত নিম্নবর্গের, সংস্কৃতির বিপরীতে । ইংরেজদের সংস্কৃতিকে মান্যতা দেয়া এবং গ্রহণ করে নেয়াটা শিক্ষিত ও সবর্ণ বাঙালির বৈধতা পেল বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত ‘অনুকরণ’ নামের প্রবন্ধে । ১৯১০ সালে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, “পশ্চিম আজ খুলিয়াছে দ্বার/সেথা হতে সবে আনে উপহার/দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে — এই ভারতের মহামানবের/সাগরতীরে” । এই বিরাট মিলনযজ্ঞের উচ্চবর্গের হোতারা খেয়াল করলেন না যে, কলকাতা সাংস্কৃতিক ক্ষমতাকেন্দ্রের বাইরে অজস্র ছোট ছোট লৌকিক সংস্কৃতির গ্রামীণ ও নিম্নবর্গ মানবনদী ইতোমধ্যে শুকিয়ে যাচ্ছে । তাদের সজীবতা ও উৎকর্ষের প্রয়োজনীয়তার কথা মনে পড়েনি কারোর । ক্রমাগত অবহেলিত থাকার পর তা কালক্রমে তামাদি হয়ে গেল । বঙ্গীয় রেনেসাঁসের উচ্চবর্গীয় সংস্কৃতির পাশাপাশি, সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির আদি সংস্কৃতিটি নিকৃষ্টতার তকমায় ভূষিত হল । ইউরোপের অনুকারকরাই ছিলেন বঙ্গসংস্কৃতির নিয়ন্তা । অনেকে নিজের নামপদবিরও ইংরেজিকরণ করে ফেলেছিলেন । ইসলামের একেশ্বরবাদের চাপ ছিল না অভিজাত হিন্দু সমাজে, যদিও ইসলাম ধর্ম গ্রহণের চাপ ছিল অবহেলিত নিম্নবর্গের ওপর । কিন্তু ইউরোপীয়দের প্রভাবে ব্রাহ্মসমাজের প্রয়োজন অনুভূত হল, আইনের ঘোষণার মাধ্যমে জানিয়ে দিতে হল যে ব্রাহ্মরা হিন্দু নয় । পরিস্হিতি এমন দাঁড়াল যে ইউরোপীয়দের নকল করা কাজগুলোকে বলা হতে লাগল ‘ভালো’, এবং বাঙালির সনাতন কাজগুলোকে বলা হতে লাগল ‘খারাপ’ । এরকম পরিমণ্ডল সত্ত্বেও, ইংরেজি কবিতার কোলাবোরেটর হিসাবে নতুন উরনের যে বাংলা কবিতার উন্মেষ ঘটছিল, নেটিভ লোকসত্তার কারণে সেই দলে ভিড়তে পারেননি কাজী নজরুল ইসলাম । বহিরাগত রাজা কন্ঠস্বরের ফর্মের পরিবর্তে নিজের চারপাশের সাধারণ জনগণের কন্ঠস্বরের ফর্ম তাঁর শ্রেয় মনে হয়েছিল ।

ইউরোপের সংস্কৃতিতে অমন জলবিভাজক দেখা দেয়নি, যার দরুন একেবারে গেঁয়ো কিশোর জাঁ আর্তুর র‌্যাঁবোর মতন মনীষার আবির্ভাব ও স্বীকৃতি ঘটেছিল । খ্রিস্টধর্মের তৃণমূল স্তর থেকে উদ্ভব ও আগমন ঘটেছে, মৌলবাদিতা বর্জিত, উল্লেখযোগ্য কবি ও চিত্রকরের, যখন কিনা নিজেরই ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মধ্যে গৌরব অনুসন্ধান করেছে বাঙালি, অথবা আহ্লাদিত হয়েছে মৌলবাদে আত্মসমর্পণ করে । মুৎসুদ্দি, বেনিয়ান, গ্রাম-ছাড়া ভূস্বামী, উচ্চবর্গের দোআঁশলা মূল্যবোধ দিয়ে গড়ে উঠেছিল বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির মানদণ্ড, অনুশাসন, ক্যানন — যা বিকাশ ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল হিন্দু কলেজ আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহেবি প্রশ্রয়ে । কাজী নজরুল ইসলাম এসেছিলেন এই পরিমণ্ডলের বাইরে তৃণমূল সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির লৌকিক জগৎ থেকে, এবং সেহেতু উচ্চবর্গের মানদণ্ডে থেকে গেলেন বিতর্কিত ও প্রান্তিক । ইয়ং বেঙ্গলের ঔরসপ্রসূত কাব্যভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর খাঁটি ভূমিজ বাঙালিত্ব স্বাভাবিকভাবে সন্দেহজনক ছিল । সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ততোদিনে সায়েবি অনুপ্রবেশ পুরোদমে ঘটেছে । বিলিতি পুঁজিবাদের প্রথম শিকার ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠের সংস্কৃতি । ইতিহাসের সনাতন ধারাগুলোকে প্রবাহিত রাখতে চেয়েছিলেন নজরুল, তাই তিনি পদে-পদে আক্রান্ত হয়েছেন, নতুন আমদানি-করা আর্টের পৃষ্ঠপোষকদের দ্বারা, ব্রাহ্মসমাজের প্রতিনিধিদের দ্বারা, নব্যহিন্দু কর্তাদের দ্বারা, শহুরে সাহিত্যিকদের দ্বারা । নজরুলের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ তৃণমূল সাংস্কৃতিক চরিত্রস্বভাবকে পরিত্যাগ করে মেট্রপলিটান সংস্কৃতিতে প্রবেশ করা সম্ভব ছিল না । একই কারণে মেট্রপলিটান সংস্কৃতিতে পালিত আলোচকরা নজরুলের কাজগুলো সম্পর্কে বিব্রত বোধ করেন । দ্বন্দ্বজটিল নজরুলকে বর্গীয়করণ করা তাঁদের পক্ষে দুষ্কর হয়ে গিয়েছিল, এবং এখনও বিদ্যায়তনিক আলোচনাচক্রে তাঁকে ইউরোপীয় ক্যানন প্রয়োগ করে যাচাই করার প্রয়াস হয় । তাঁরা ভুলে যান যে তাঁদের নিজেদের প্রতিস্বটি ইউরোপীয় অধিবিদ্যাগত মননবিশ্ব দ্বারা নির্মিত, সে তাঁরা যতোই ধুতি-পাঞ্জাবি পরে কাঁধে চাদর ফেলে বাঙালি সাজার ভড়ং করুন ।

ইউরোপীয় রেনেসাঁসের তিনশো বছর পর সেখানে আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল মেট্রপলিসের বা বিশ্বনগরীর যুগ, যেখানে মিশ খেলো পেশাদারদের পেশার সঙ্গে দ্রষ্টাদের দৃষ্টি, তার সঙ্গে রাজনীতিকের রাজনীতি, এবং উদ্ভব হল জগৎসংসার বিষয়ে সুশৃঙ্খল বৌদ্ধিক নিরিখ, যা যুক্তিপ্রতর্কের ধাপ দিয়ে গড়া । সত্যের পরম ও সর্বজনীন মানদণ্ডের সমারোহ প্রতিফলিত হল রাষ্ট্রের বিধানে, বর্গীকরণ প্রক্রিয়ায়, তথ্য সঞ্চয়ে, পৃথগীকরণে, সংজ্ঞা তৈরিতে, সংস্হাপন প্রণালীতে । সত্য ও ক্ষমতার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য হয়ে দেখা দিল মেট্রপলিসে । সেখানে মতবিরোধ মানেই যেন অসত্য । এই ব্যাপারটা হাংরি আন্দোলনের সময়ে ঘটতে দেখেছি । মতবিরোধিতা মানেই হাংরি আন্দোলনকে অনেকে অসত্য সাব্যস্ত করতে চেয়েছিল । মতবিরোধিতা যেহেতু ক্ষমতার বিরোধিতা, তাই মেট্রপলিসে তা হেয়, কেননা ক্ষমতার ধারকদের মতে তা বিশৃঙ্খলর জন্ম দেয়, অনিশ্চয়তার প্রসার ঘটায় । যা অনিশ্চিত তা বর্গীকরণের অযোগ্য, তা অন্যরকম । যারা অন্যরকম তারা পশ্চাদপদ । মেট্রপলিসের কাজ হল এদের তুলে এনে সর্বজনীন ও বিশ্বজনীন করে তোলা । তা না করা গেলে তাদের সমাজের বাইরে রেখে দিতে হবে। যারা অন্যরকম এবং খাপ খায় না, তাদের মাড়িয়ে এগিয়ে যাবে মেট্রপলিস । এগোবার পথে সনাতন আদর্শ ও সংস্কারকে সরিয়ে তার জায়গায় প্রতিষ্ঠা করবে মেট্রপলিসের নতুন আদর্শ ও সংস্কার । ইংরেজরা চারটি মেট্রপলিস প্রতিষ্ঠা করেছিল ভারতীয় উপনিবেশে, যার অন্যতম হল কলকাতা । এই মেট্রপলিসের মূল্যবোধের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারলেন না কাজী নজরুল ইসলাম । মেট্রপলিটান নিরিখে তিনি চিহ্ণিত হলেন ‘বহিরাগত’ ও ‘অন্যরকম’ হিসাবে ।

ইংরেজদের মেট্রপলিটান প্রভাবে, ‘কবি’র সংজ্ঞাটি, একটি সাংস্কৃতিক ফাটলের সৃষ্টি করেছিল । তাদের আগমনের আগেকার কবিদের এবং আগেকার কবিত্ব বহনকারী কবিদের একঘরে করে ফেলা হয়েছিল । কবি-র নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী আড়াআড়ি-খাড়াখাড়ি বিভাজিত হয়ে যান বাঙালি কবিরা, এবং এই নতুন সংজ্ঞাটিও ইউরোপীয় ঢঙে ‘ভালো’ কবি, ‘খারাপ’ কবি, বড়ো মাপের কবি, ছোট মাপের কবি ইত্যাদি বিভাজনে সাহায্য করেছে । বাংলা পাঠকৃতি ইউরোপীয় মানদণ্ডে যতো নিখুঁত তা ততো ‘ভালো’, তার রচয়িতা ততো ‘বড়ো মাপের’। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘মুচিরাম গুড়’ থেকে আরম্ভ করে রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ পর্যন্ত দেখা যায় কলকাতা মেট্রপলিসে এক নতুন ধরনের বাঙালির উদ্ভব হয়েছে, যাদের সঙ্গে তৃণমূল বাঙালির বিশেষ মিল নেই । কাজী নজরুল ইসলাম পড়ে যান সেই বিভাজনের জাঁতায় । সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকায়তের সঙ্গে মুষ্টিমেয় মেট্রপলিটানের ‘দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে’ অসম্ভব ছিল । অথচ নজরুল পদক্ষেপ করলেন সেই অসম্ভব সংঘর্ষময় এলাকাটিতে । একদিকে বহুত্বময় যৌগিক সংস্কৃতির দ্বারা রূপায়িত তৃণমূল চেতনা, আরেকদিকে সংস্কৃতির আদল-আদরা পালটাবার মসনদি চেতনা । মেট্রপলিটান বাবুরা যখন ইংরেজের শাসন থেকে মুক্তির যুক্তিতর্কে ব্যস্ত, সে সময়ে নজরুল তাঁর কাজগুলোকেই চালিত করেছেন মসনদের বিরুদ্ধে । ইংরেজদের শাসনের ও শোষণের বিরোধিতায় বঙ্গসমাজে একদিকে ছিল তৃণমূল জাতীয়তাবাদ এবং অপরদিকে রক্ষণশীল ইংরেজি-শিক্ষিত ভদ্রলোকের জাতীয়তাবাদ । নজরুলের কৌমসত্তা তাঁকে প্রথমটির বাইরে যেতে দেয়নি। মেট্রপলিসের বাবুকবিদের কোনও হেনস্হা হয় না, কিন্তু কবিতা লেখার দায়ে নজরুলের এক বছর জেল হয় । নজরুলকে দৃষ্টান্তস্বরূপ বিধ্বস্ত করা দরকার ছিল, ইংরেজদের আনা সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক মানদণ্ডকে বঙ্গজীবনে গভীরভাবে চারিয়ে দেবার জন্য ।

লোগোসেন্ট্রিক ইংরেজদের কাছে শব্দের নিহিতর্থের খেলার তুলনায় তার ধ্বনির খেলাটি ছিল নিকৃষ্ট, অথচ ক্রিয়াভিত্তিক বাংলা শব্দ তার ধ্বনিকে প্রাথমিক ব্যাখ্যায় প্রয়োগ করে । বাবুকবিরা ধাক্কা খেলেই আশ্রয় নিয়েছেন কবিতায় । কাজী নজরুলল ইসলাম আশ্রয় নিয়েছেন জীবনে । বাবুকবিরা কবিতায় দেখিয়েছেন পারক্য, অস্তিত্বের ফাটল, ব্যক্তিপ্রতিস্বের কাতরতা, আত্মার ক্ষত । এই বোধগুলো কৌমনিরপেক্ষ । নজরুল যৌথতার ভূমিজ বোধ ( অনেকে একে বলেন গ্রাম্য, অর্থাৎ খারাপ ! ) দ্বারা সেগুলোর আস্তরণ গড়েছেন তাঁর পদ্যে, তাঁর গানে । সংঘর্ষের দামামা বাজিয়ে তিনি আড়াল করেছেন তাঁর অন্তরজগতের সন্ত্রাস । তাঁর রচনায় পাওয়া যাবে মরুভূমির বাবকল্পের স্বাধীনতা । র‌্যাঁবোর মতন লৌকিক সক্রিয় আনন্দ । শরীরের নিজস্ব যাপনবোধ । রাজনৈতিক কবিতা ও গানকে যে-সময়ে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যাচ্ছিলেন নজরুল, বাঙালির রাজনীতিতে সে-সময়ে যে-ঘটনাগুলো ঘটছিল তা ছিল নজরুলের কীর্তির পক্ষে ক্ষতিকর, কেননা সেসব ঘটনা বাঙালির জীবনবোধকে পরবর্তীকালে পালটে দিয়েছিল, এবং সমগ্র সমাজকে ফেলে দিয়েছিল আতান্তরে । ১৯২৪ সালে চিত্তরঞ্জন দাশ ও গান্ধির মতান্তর । ১৯২৫ সালে চিত্তরঞ্জনের মৃত্যু । ১৯৩২ সালে কম্যুনাল অ্যাওয়ার্ড । ১৯৩৭ সালে কংগ্রেস কর্তৃক ফজলুল হকের দলকে প্রত্যাখ্যান । ১৯৩৯ সালে সুভাষচন্দ্র বসুর কাছে গান্ধির পরাজয় এবং সুভাষের কংগ্রেস ত্যাগ । সে বছরই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং লক্ষ্মীকান্ত মৈত্রের বাংলা ভাগের আন্দোলন । তারপর তো উন্মাদ হয়ে গেলেন নজরুল, নির্বাক হয়ে গেলেন, জগতসংসারের প্রতি সাড়াহীন।

দেশভাগের অব্যবহিত পরের সময়প্রবাহ, পশ্চিমবঙ্গে, নজরুলের প্রতিষ্ঠার অনুকূল ছিল না । প্রথমত, শরৎ বসুকে সরিয়ে মসনদ দখল করেন প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ এবং ব্রাহ্ম বিধানচন্দ্র রায় । দ্বিতীয়ত, পূর্ববঙ্গ থেকে হু হু করে পশ্চিমবঙ্গগামী উদ্বাস্তুদের দুঃখদুর্দশা এক বিমূর্ত মুসলমান-ঘৃণার জন্ম দিয়েছিল সর্বস্তরের বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে, এবং পরবর্তীকালে সাংস্কৃতিক মানদণ্ডটি এঁদেরই অভিজাত গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায় । মার্কসবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব ক্রমশ দখল করে নেন উদ্বাস্তু নেতারা । স্বভাবতই রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, শিক্ষপর্যদ, অ্যাকাডেমি প্রভৃতির চুড়োয় বসিয়ে দেয়া হয় একদা-উদ্বাস্তু উচ্চবর্গীয় কর্তাব্যক্তিদের । উল্লেখ্য যে পূর্ববঙ্গে থাকার সময়ে এই উচ্চবর্গীয় হিন্দু কম্যুনিস্ট নেতারা দেশভাগ সমর্থন করেছিলেন আর দেশভাগ হতেই সবচেয়ে আগে তাঁরাই পালিয়ে আসেন, নিম্নবর্গের মানুষদের অবহেলা করে । কলকাতায় নতুন একটি রাজনৈতিক স্লোগান আসর জমিয়ে বসে । তা হল : গরিব হওয়া ভালো, উদ্বাস্তু হওয়া ভালো, সর্বহারা হওয়া ভালো, শোষিত হওয়া ভালো । এর দরুন একটা সময়ে নজরুলের চেয়ে বড়ো করে তুলে ধরা হয় সুকান্ত ভট্টাচার্য, হেমাঙ্গ বিশ্বাস প্রমুখকে । নজরুল থেকে যান কেবল প্রতীকি উপস্হিতি নিয়ে । নজরুলের প্রতি এই কৌম-উপেক্ষা, নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশকে বাধ্য করে থাকবে উন্মাদ, নির্বাক, বৃদ্ধ কবিকে সে দেশে নিয়ে গিয়ে সন্মান ও প্রতিষ্ঠা দিতে । দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশে কাজী নজরুল ইসলাম রূপান্তরিত হন সেখানকার এসট্যাবলিশমেন্টের, এমনকী আবছাভাবে ধার্মিক প্রাতিষ্ঠানিকতার, সাংস্কৃতিক প্রতিভূরূপে । মসনদ-বিরোধী কথকের এ এক ভয়াবহ প্রতীকবদল । বাংলাদেশের এসট্যাবলিশমেন্টের সৌভাগ্য যে নজরুল কোনো কিছুর প্রতি সাড়া দেবার অবস্হায় ছিলেন না

উভয় বাংলায়, দেশভাগের পর, মূল্যবোধের বীভৎস ধ্বংসের পরিপ্রেক্ষিতে, নজরুলের ভূমিজ ইতিবাচক কবিতার অ্যাড্রেনালিন প্রায় অসহ্য হয়ে ওঠে ব্যক্তিপ্রজ্ঞাবাদী মধ্যবিত্ত পাঠকের অবচেতনায় । বস্তুত স্বদেশী আন্দোলনের যাবতীয় দ্যোতকগুলোকে নিজেদের স্মৃতিতে স্হান দিতে ভয় পেতে লাগলেন নাগরিকরা । স্বাধীনতার পর, দুই বাংলাতেই, কবিতা আবৃত্তির জগতে পেশাদার আবৃত্তিকারদের মধ্যে গলা-কাঁপানো নম্র ব্রা্‌হ্ম ঢঙটি জাঁকিয়ে বসে, যার দরুন নজরুলের উদাত্ত ওজস্বী বজ্রনির্ঘোষ কবিত্ব প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় কন্ঠস্বরের রেওয়াজ অবলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল । কিংবা চলে যায় ছেঁদো পার্টিবাজদের এক্তিয়ারে । নজরুল সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন স্কুলের বালক-বালিকাদের মঞ্চে । অথচ ভারতবর্ষে প্রতিবেশী পাকিস্তান বা চীনের সঙ্গে সামরিক সংঘর্ষ বাধলে বা শহরে দাঙ্গা লাগলে, এসট্যাবলিশমেন্ট ঝেড়ে-পুঁছে বের করে নজরুলের পদ্য ও গান । কন্ঠস্বরের শব্দাঙ্ক বাঙালির ক্ষুদ্র রাজনীতির ফলে এতই নোংরা হয়ে গেছে যে, মঞ্চে দাঁড়িয়ে নজরুলের কবিতা আবৃত্তির শব্দাঙ্ককে সেই কলুষ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে, তা আর আদপে নজরুলি থাকে না । দুই বাংলার বর্তমান ন্যায়নৈতিক পরিমণ্ডলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে, নজরুলের স্বয়ম্ভূ তৃণমূল কাব্যভাবনার নিজস্ব মানদণ্ডটি, সাংস্কৃতিক নান্দনিক রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বেশ অস্বস্তিকর ।

তিন
তাঁর কবিতা ও গানের রচয়িতা-অহংটি আদপে কে এবং কী, এই দার্শনিক সংকটটি নজরুলের সময়কাল থেকে হয়ে উঠেছে জটিলতর । মোহিতলাল মজুমদার, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসু প্রমুখ বিদ্বজ্জনেরা কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যপ্রতিষ্ঠার মূল্যায়ন সম্পর্কে দোনামনা করেছেন, একটা কিন্তু-কিন্তু ভাব দেখিয়েছেন । মূল কারণটি হল, বাংলা ভাষাসাহিত্য তখন ইউরোপীয় আধুনিকতায় আক্রান্ত হয়েছে । পরিশীলিত শিল্পবোধের ধুয়ো তুলে, যা ছিল পপধানত হেলেনিক ( হেগেল ভাবতেন যে শিল্প বলতে যা বোঝায় তা কেবল প্রাচীন গ্রিসেই জন্মেছে), বাদ দেয়া হয়েছে আদি ভূমিজ বাঙালির ডিসকোর্স, যে বাঙালিদের ইংরেজরা নেটিভ হিসাবে চি্‌হ্ণিত করেছিল। সে-সময়ে ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাজানো আরম্ভ করেছিল আধুনিকতার কাড়া-নাকাড়া, যেন ইউরোপীয় আধুনিকতাই সত্য, বাদবাকি সব মিথ্যা । অমন একটা ধারনার রমরমায় নজরুলকে যে কোথায় খাপ খাওয়ানো হবে, তা একটি জ্ঞানতাত্বিক সমস্যা হয়ে উঠেছিল বাঙালি সাহিত্য আলোচকদের কাছে, কেননা তাঁকে প্রাগাধুনিক বা আধুনিক কোনো বর্গীকরণেই ফেলা যাচ্ছিল না । কল্লোলের নীল নকশা নজরুল অগ্রাহ্য করেছিলেন, আবার সেই সময়ের প্রথাবাহিত কবিতা ও গানের ঐতিহ্যকেও করেছিলেন অস্বীকার । তিনি জানতেন যে তিনি একজন দ্রোহী, কিন্তু সেই দ্রোহটিকে সাহিত্য-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে চালিত করেননি, যেমনটা ইউরোপে সাহিত্য ও ছবি আঁকার নানা আন্দোলনে ঘটতে দেখা গেছে । দ্রোহ ব্যাপারটাই তাঁর চেতনায় একটা ‘ঘোর’ তৈরি করেছিল, আর সেই আত্মসত্তাটিতে মগ্ন থাকার উৎসারণ ঘটেছে বিদ্রোহী, অগ্নিবীণা, ধূমকেতু, লাল সালাম, সর্বহারা ইত্যাদি দ্যোতকে । দ্যোতকগুলো আধুনিক হওয়া সত্বেও তাঁর চিত্তবৃত্তিতে যেহেতু লোকরঞ্জনের ক্ষমতা ও দক্ষতা ছিল, সেগুলো পড়ে গেছে উচ্চবর্গের সংস্কৃতি ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির টানাপোড়েনের ফাঁদে ।

বঙ্গসংস্কৃতিতে পপুলার কালচারের প্রতিষ্ঠা ও প্রসার আরম্ভ হয় বিশ শতকের ছয়ের দশক থেকে । কবিতার গ্রামোফোন রেকর্ড, কবিতার অডিও ক্যাসেট, মঞ্চসফল কাব্যপাঠ, পেশাদার আবৃত্তিকার, কবিতাপাঠের সঙ্গে সঙ্গীতযন্ত্র ইত্যাদি লোকরঞ্জনী প্রক্রিয়ার সুদূরপপসারী সূত্রপাত ঘটে । পপুলার কালচার বলতে আমি বোঝাতে চাইছি এমন সাংস্কৃতিক পরিস্হিতি ও পরিবেশ যখন খবরের কাগজের মালিক, রেডিও ও টেলিভিশন নিয়ন্ত্রণকারী কর্তা, টিভি টাইকুন ও প্রযোজক, গ্রন্হ প্রকাশক, চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিচালক, রেকর্ড ও ক্যাসেট কোম্পানি, আর্টগ্যালারি, বাণিজ্যিক পত্রিকার স্বত্বাধিকারী, স্টুডিও মালিক, সঙ্গীতযন্ত্র প্রযুক্তিবিদ, গণমাধ্যম ব্যবস্হাপক, মিছিলে ভিড় সাপলাইকারী প্রমুখ লোকজন সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিলেন । এই পপেক্ষিতে বোঝা যায় কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সময়ের অনেক আগে আবির্ভূত হয়েছিলেন । পপুলার কালচারের পৃষ্ঠপটে, কবিতায় ছন্দের বদলে ধ্বনিক্রীড়ার প্রবর্তন একটি অত্যাধুনিক নিরীক্ষা । এ এক অভূতপূর্ব নিরীক্ষা যা একাধারে সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক মানদণ্ডটির সর্বসন্মতিক্রমের বিরোধিতা করে, আবার সেই সঙ্গে তার মধ্যে রয়েছে লোকরঞ্জনের প্রাণশক্তি । জ্ঞান, রাজনীতি, নান্দনিকতা ও নৈতিকতার বহুত্বকে এইভাবে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম ।

খ্রিস্টধর্মের বাহকরূপে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ যখন এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকায় পৌঁছেছিল, তখন অষ্টাদশ শতকে পাওয়া তাদের নতুন দার্শনিক উদ্দীপনাকে তারা চারিয়ে দিতে চেয়েছিল তথাকথিত আবিষ্কৃত ভূখণ্ডের জনসাধারণের জীবনে । ইউরোপ তার কৌশল ও সামরিক ক্ষমতার গরিমায় নিজেকে মনে করেছিল, আজও করে, আলোকপ্রাপ্ত প্রগতির দূত । বাদবাকি পৃথিবীকে নিজের মতন করে গড়ে তুলতে চেয়েছিল । নিজের সমান নয়, বলাবাহুল্য । কিন্তু তাদের সবাইকে পিটিয়ে একইরকম করতে চেয়েছিল । চেয়েছিল সর্বজনীন করে তুলতে । ইতিহাসকে, সময়কে, তারা মনে করেছিল একমুখী আর একরৈখিক । আধুনিকতাকে ভিত্তিকরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বঙ্গসমাজে যে প্রাতিষ্ঠানিক বোধের প্রবর্তন ঘটায়, তার প্রক্রিয়া ও প্রভাবে আমজনতার সাহিত্য সঙ্গীত সংস্কৃতির বাইরে গড়ে উঠেছিল খ্রিস্টধর্ম-প্রভাবিত রাজধানির বন্দনাকারী মুষ্টিমেয় উচ্চ ও মধ্যবিত্ত বাঙালির একটি কেন্দ্রাতিগ আধিপত্যবাদী একমুখী একরৈখিক দোভাষীর খাস সাহিত্য সঙ্গীত সংস্কৃতি । বঙ্গসমাজের অজস্র রূপকে তা ঢালাই করতে চেয়েছিল এবং তাতে সফলও হয়েছিল, একরূপতায় বা সমরূপতায় । অনেক স্বরকে পালটাতে চেয়েছিল একক স্বরে এবং তাতে সফল হয়েছিল । নজরুল গ্রাম ও পাড়ার নানাধর্মী নেটিভ নান্দনিকতাকে বদলে ফেলতে চেয়েছিলেন শাসকর কেন্দ্রাভিগ নান্দনিকতার বিরুদ্ধবাদী স্ফূরণে, ইতিহাসের সর্বজনীনতার বিরুদ্ধে, ভাষার উচ্চবর্ণ গোঁড়ামির বিরুদ্ধে, মানবেতিহাসকে একটিমাত্র আখ্যানের অন্তর্গত মনে করার বিরুদ্ধে, বিশুদ্ধ সাংস্কৃতিক সত্তার ধারনার বিরুদ্ধে । এই কারণেই, মোহিতলাল মজুমদার যখন তাঁকেশেলি, কিটস, টেনিসন, ওয়র্ডসওয়র্থের কবিতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চাইলেন, তখন নজরুল ওই ব্রিটিশ কবিদের কাজকে অসহ্য মনে করে প্রত্যাখ্যান করেন । ইউরোপের সরবরাহ করা আলোকপ্রাপ্তির দর্শনটিকে সর্বজনীন নৈতিক ও বৌদ্ধিক প্রগতির প্রতিভূ বলে মেনে নিতে পারেননি কাজী নজরুল ইসলাম । তাই বলে নজরুল দেহাতি নন বা স্কিৎসোফ্রেনিকও নন ।

ত্রয়োদশ শতকে বর্তমান ইরাকের রাজধানী বাগদাদ শহর থেকে এসেছিলেন নজরুলের পূর্বপুরুষ মহম্মদ ইসলাম। ঘরসংসার মা-বাপ ফেছনে ফেলে অজানার উদ্দেশ্যে এই বেরিয়ে পড়ার আরবিক ইন্দ্রিয়চেনতা ও নারীসৌন্দর্যে স্তম্ভিত হওয়ার ( যে জন্য আবায়া পরার প্রথা ) সংবেদন নজরুলকে কৈশোর থেকে আটপৌরে বাঙালিদের থেকে আলাদা করেছিল । ওল্ড টেস্টামেন্টের চরিত্রদের সঙ্গে তাঁর রক্তসম্পর্ক ছিল । গৌরবর্ণ মজবুত চওড়া হাড়ের নজরুল, ময়লা চেহারার পাঁচফিটের রোগাটে বাঙালিদের মধ্যে নিজেকে খাপ খাওয়াতে চেয়েছেন কবিজনোচিত নম্রতার খোলোশ দিয়ে । তাঁর ্রবিক ইন্দ্রিয়চেনা তাঁকে যোদ্ধা হতে প্ররোচিত করেছে এবং সেকারণে তিনি গর্ববোধ করেছেন হাবিলদার পদের আখ্যায় । যা তদানীন্তন সাহিত্যজগতে ছিল অকল্পনীয় । আমরা ফরাসি কবি গীয়ম অ্যাপোলোনিয়ারের কথা জানি, যিনি সাহিত্যিক মহলে সামরিক পোশাকে ঘুরে বেড়াতেন । ঘরকুনো কলকাতাবাসী কবিমহলে নজরুলের প্রাগুক্ত বাড়িহীনতাকে বোহেমিয়ান বলে ভুল করা হয়েছে । কাজী নজরুল ইসলামের পরিবার নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত বাঙালি ছিলেন না, সেকারণে তাঁর বোধে হীনম্মন্যতা কাজ করেনি কখনও ।

বাঙালিবাড়ির আদ্দামড়া খোকারা মায়ের আঁচল ছেড়ে অন্যত্র যেতে চান না । কিন্তু আমরা আজও দেখি বাড়িঘর ছেড়ে ইরাক-ইরান-লিবিয়ার যুবকেরা মতাদর্শের লড়াই লড়তে চলে যাচ্ছে আলজেরিয়া সুদান সিরিয়া ইরাক আফগানিস্তান লেবানন চেচনিয়া বসনিয়ায় । এ এক আত্মআবিষ্কারের কৌম-প্রক্রিয়া যা বস্তুজগতের লাভ-লোকসান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না । অথচ একদা-ধর্মান্তরিত পরিবারের বাঙালি যুবকেরা নিজের দেশের মানুষের মাথায় বোমা ফাটাতে ব্যস্ত । নিজের তৃণমূল বোধের জন্য নজরুল আর্থিক দৈন্যে বিপর্যস্ত হয়েছেন বারংবার, গুছিয়ে বসার ব্যাপারটা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি । তাঁর কবিত্ব-প্রতিস্বের দুর্বার প্রাণস্রোত, একই সময়ে বিভিন্ন আঙ্গিকের কবিতা ও গান লেখার অনর্গল ক্ষমতা, সামনের সমস্তকিছু জয় করে যেদিকে ইচ্ছে চলে যাবার আকাঙ্খা, তাঁর অশ্বারোহী পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পাওয়া । এই কারণেই তাঁর সমকালীন বাঙালি কবিরা ব্রিটিশ রোমান্টিসিজমের ভাষা-জটিলতায় আচ্ছন্ন হলেও, নজরুল এড়িয়ে গেছেন সেই জগৎটিকে । পয়গম্বর হজরত মহম্মদের বিরোদ্ধে বিদ্রোহকারী খালেদ সম্পর্কে ১৯২৬ সালে একটি কবিতা লেখেন নজরুল । পরবর্তীকালে হজরত মহম্মদের সেনাপতি হয়ে খালেদ রোমক শাসকদের কবজা থেকে উদ্ধার করেছিলেন পবিত্র মক্কা নগরীকে । আরবিক ইন্দ্রিয়চেতনা সঞ্জাত প্রতিস্বকে নজরুলও, খালেদের মতন, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূমিপুত্রের সাংস্কৃতিক পুনরুদ্ধারের কাজে লাগাতে চেয়েছেন । তাকে মুক্ত করতে চেয়েছেন ইউরোপীয় মননবিশ্বের কোড লোগো প্রতীক চি্হ্ণ দ্যোতক রূপক ইত্যাদির জেলখানা থেকে । তাঁর সারা কাব্যদুনিয়ায় পাওয়া যাবে বিলম্বিত ও দ্রুতলয়ের অশ্বখুরধ্বনি, যা বাবু-মিয়াঁ বাঙালিকে বিব্রত করে । অমন অন্ত্যজ ভাবদুনিয়ায় ঢুকতে অপ্রস্তুত বোধ করেন অভিজাত বাঙালি । তাঁর প্রতিবাদের মুহুর্মুহু আধিপত্যবাদবিরোধী আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হয় তাঁর কাব্যভাষার সন্ত্রাসে । মোলায়েম প্যানপেনে ন্যাকান্যাকা অভিব্যক্তির হিনম্মন্যতা থেকে তিনি ছিনিয়ে বের করতে চেয়েছেন কবিতাকে, কবিত্বকে । আরবি রূপকল্প ও শব্দাবলীর অন্তর্ঘাতই কেবল নয়, তলে-তলে কাজ করেছে বিকল্প মূল্যবোধ সৃষ্টির অভিঘাত, যে-অভিঘাতের সূত্র ছিল মারফতি ও মুরশিদা, নৌরচকা ও গজল, নিকউবানা ও ভাটিয়ালি, লাউনি ও ঝুমুর, সারি ও রামপ্রসাদী, তোড়ী ও কীর্তন । সাহিত্য সংস্কৃতির ইউরোপীয় মানদণ্ডটি তিনি ভেঙে ফেলতে চেয়েছেন ঔপনিবেশিক কালখণ্ডেই, যখন কিনা এই স্ট্র্যাটেজি বিভিন্ন দেশে উৎসারিত হতে দেখা গেল উত্তরঔপনিবেশিক আমলের সাহিত্য সংস্কৃতিতে ।

নজরুল তাঁর গানের স্বরলিপির কপিরাইটের ধার ধারেননি । তিনি চেয়েছেন মীরাবাই, রহিম, লালন, রামপ্রসাদের মতন তৃণমূলে নিজেকে চারিয়ে দিতে, যাতে যে গাইবে তারই যেন হয়ে ওঠে তাঁর গান । যাতে তাঁর গানকে কেন্দ্র করে কোনও আধিপত্যবাদী শাসন-কাঠামো না জন্মায়, যাতে না তা অভিজাত নিয়ন্ত্রকদের স্বার্থান্ধ বিধিবিন্যাসের কবজায় স্হবিরতা লাভ করে, যাতে না তা স্হিতাবস্হার আরোপিত অভ্যাস গড়ে তোলে, যাতে না তা মুষ্টিমেয়র সুবিধাভোগের চক্রব্যূহ বানিয়ে, যা গাইতে চায় তাকে ঘিরে ধরে বোবা করে দেয় । বাজার না হলে আধুনিকতার পপকল্প সম্পূর্ণ হয় না, অথচ প্রভূত জনপ্রিয়তা সত্বেও বাজারকে উপেক্ষা করেছেন নজরুল । তাঁর সহজাত প্রবৃত্তি তাঁকে আপনা থেকেই সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের মডেলটির বিরোধী করেছিল ।

আধুনিকতাবাদের সঙ্গে নজরুলের সংঘাত কেবল আরব ইন্দ্রিয়চেতনার জন্য নয় । ঔপনিবেশিকতাকে সহ্য করা সম্ভব হয়নি বলে সাধারণ মুসলমান সমাজ, অভিজাত ও মধ্যবিত্ত তো বটেই, হিন্দু নিম্নবর্ণ থেকে ধর্মান্তরিত মানুষও, আধুনিকতাকে সরাসরি গ্রহণ করতে চাননি । নজরুল কর্তৃক আধুনিকতাবাদ প্রত্যাখ্যানের উৎসসূত্র হল বহু জনমানস-সম্ভূত সাংস্কৃতিক ভূমিপুত্র হিসাবে অন্ত্যজ ও প্রান্তিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব । তাঁর আগে ও পরে যাঁরা এসেছেন, তাঁরা বঙ্গসমাজের একটি ক্ষুদ্র বর্গ-বিশেষের কন্ঠস্বর নিয়ে এসেছিলেন । তা হয় এলিটের নয় পাতিবুর্জোয়ার বা নিচুতলার । তা পূর্ববঙ্গের বা পশ্চিমবঙ্গের । তা ব্রাহ্ম বা হিন্দু বা মুসলমানের । এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যের নিদারুণ চাপ যে কোনও সুস্হ মানুষকে উন্মাদ করে দিতে পারে ।অধচ নজরুলের জনপ্রিয়তার ভিত্তি ছিল এই ভয়ঙ্কর ভারসাম্য, যাকে তিনি ব্যক্তিগত স্তরে সামলাবার চেষ্টা করেছেন অযথা অট্টহাস্যের দ্বারা, দিলখোলা কথাবার্তার দ্বারা, জীবনযাপনের নোঙরহীনতার দ্বারা, গানের সর্বভূক ব্যাপকতার দ্বারা । নজরুলের কীর্তিকে বিচার করতে হলে আলোচককে কেবল প্রান্তিকের প্রতিনিধিত্ব করলেই চলবে না, তাঁকে হতে হবে বহুত্ববাদী যৌগিক সংস্কৃতির ভূমিপুত্র । প্রান্তিক ও অন্ত্যজ বাঙালির জ্ঞানতাত্বিক অবয়বটির উপলব্ধি থাকা তাঁর প্রয়োজন । দেশভাগের পর দুই বাংলার গ্রামীন কমিউনগুলোর কাঠামো ভেঙে পড়ায় সেই ব্যাপারটি প্রায় অসম্ভব হয়ে গেছে । জনৈক মুসলমান যুবক শ্যামাসঙ্গীত গাইছেন ও সুর দিয়ে তাকে রামপ্রসাদের গানের চেয়ে জনপ্রিয় করে তুলছেন, আজকের ঐক্যবুকনির যুগে, পদ্মা-গঙ্গা ড্রামাবাজির দিনকালে, সংহতি-বক্তিমে ঝাড়ার দিনে, স্রেফ ভয়াবহ । বাংলাদেশে তো আরও বিপজ্জনক । বাজারের খোরাকের ব্যাপার না হলে, তা যদি কবির নির্মল ব্যক্তিপ্রতিস্বের উৎসার হয়, তাহলে বর্তমান কালখণ্ডে সমাজ তা অনুমোদন করবে বলে মনে হয় না । নজরুল যে তাঁর সমসাময়িক কবি ও সঙ্গীতকারদের ঈর্ষার পাত্র হয়ে উঠেছিলেন তা ওই প্রাণস্পন্দিত ভারসাম্য সৃষ্টির ক্ষমতার দরুণ । তাঁর নির্মাণপ্রকল্পের তাৎক্ষণিক অভাবনীয় সফলতার মধ্যেই ছিল ভবিষ্যতে উপেক্ষিত হবার বীজ । রবীন্দ্রনাথের কর্মকাণ্ড দেখেও তিনি শিখতে পারেননি ।

সমগ্রের পৃষ্ঠপোষক নজরুল বাদ দিতে চাননি কোনও কিছু, এবং সেকারণেই সমর্থন করেননি কবি ইকবালের রাজনীতিকে । একথা নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী লিখেছিলেন, “সভাকবি হতে হলে এসট্যাবলিশমেন্টের কাছে মাথা নোয়াতে হয়, নজরুল কখনও নোয়াননি” । নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী নিজে পরবর্তীকালে বেমালুম এসট্যাবলিশমেন্টে সেঁদিয়ে গেলেও, নজরুল কিন্তু রফা করেননি । ভারতীয় এসট্যাবলিশমেন্টের কাছে তাই ইকবাল ও গালিবের তুলনায় উপেক্ষিত ছিলেন, এবং থেকে গেছেন । ভারতবর্ষে, বহুকাল পর্যন্ত, শিক্ষা দপতরটির নিয়ন্ত্রণ ছিল মৌলানা আবুল কালাম আজাদের হাতে । কেবল জিন্নার পাকিস্তানে নয়, ভারতবর্ষেও মুসলমান বাঙালির সাহিত্যসঙ্গীতকে মুসলমান উর্দুভাষীর কীর্তির চেয়ে নিকৃষ্ট মনে করেছে এসট্যাবলিশমেন্ট । বাঙালি মুসলমান ছিল নিম্নবর্গের, অর্থাৎ মেট্রপলিটান ক্ষমতাজোটের বাইরের লোক । প্রাগাধুনিক আমলে, মোগল এসট্যাবলিশমেন্টে, এবং তার ভাঙনের সময়েও, অভিজাত মুসলমান সমাজের ভাষা ছিল ফারসি-আরবি-উর্দু। ওই ভাষাভাষি সাহিত্যিক কোড অমান্য করা ছিল গর্হিত, কেননা আধিপত্যের আহ্লাদের মুসলমানি উৎসসূত্র ছিল সেই ডিসকোর্স । স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানের উর্দুভাষীরা বাঙালি মুসলমানদের সম্পর্কে চোখা-চোখা গালমন্দ উপহার দিয়েছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত তাদেরই নব্বুই হাজার সেনা ল্যাজগুটিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে বাঁচে । নজরুল তা অমান্য করেছিলেন, এবং সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র সেকারণেই মৃত নজরুলের দাবিদার হয়ে ওঠে । প্যান ইসলামিক সমাজে বাঙালি মুসলমান অবশ্য এখনও প্রায় প্রান্তিক । আর নজরুল যে সেই মঞ্চে রবাহুত, তা না বললেও চলে । ব্যাপারটা বিস্ময়কর এইজন্যে যে, মসনদের পপাগাধুনিকতা এবং আধুনিকতাকে একযোগে প্রতিরোধ করে একেবারে নিজস্ব আধার ও আধেয় গড়েছিলেন তিনি । মনে রাখা দরকার যে বঙ্কিম যেমন ইংরেজিতে ‘রাজমোহনস ওয়াইফ’ এবং মাইকেল যেমন ইংরেজিতে ‘ক্যাপটিভ লেডি’ লিখে যাত্রা শুরু করেছিলেন, সেরকম নজরুল শুরু করেছিলেন আরবি-ফারসি-উর্দু নগমা-শায়রি দিয়ে । আধুনিকতার দ্যোতকগুলোর চাপে তাঁর সময়কার বাংলা কবিতা যদিও ইউরোপীয় আদলটি গ্রহণ করেছিল, তিনি কিন্তু প্রাচীন ও নবীনের মাঝে নেটিভ যোগসূত্রটির একচ্ছত্র মালিকানা বজায় রাখলেন । কিন্তু খ্রিস্টধর্মের তল্পিবাহকরূপে আধুনিকতাবাদ আসার আগেও বাংলা কাব্য ছিল প্রধানত অ্যাপোলনীয় । প্রথমে মাইকেল মধুসূদন এবং পরে নজরুল ইসলাম প্রবর্তন করেছিলেন ডায়োনিসীয় মেজাজের । ডায়োনিসীয় মেজাজটা বাঙালি পাঠকের কাছে বেশ অস্বস্তিকর । নজরুলের কবিতায় ভাষার নৃত্যভঙ্গিমা বাঙালি বাবু ও মিয়াঁ সমাজের মানসিক শান্তিতে ব্যাঘাত ঘটায় । বস্তুত মনস্তাত্বিকদের উচিত বিশ্লেষণ করে দেখা যে, ‘দে গোরুর গা ধুইয়ে’ সংলাপটি কোনও ব্যক্তিগত ইশারা বহন করছে কি না । বাক্যটিকে অর্থহীন কথার কথা মনে করা ভুল ।

প্রাগাধুনিক সমাজটি যখন আধুনিকতার ভান করেছে, তার ঘুর্ণিতে পড়তে হয়েছে নজরুলকে । একাধিকবার মায়ের সঙ্গে মনোমালিন্যের দরুন আচমকা সম্পর্ক ছিন্ন করে মেনে নিলেন রহস্যময় চিরবিচ্ছেদ । সিয়ারশোল স্কুল থেকে উৎখাত হলেন, কেননা প্রাগাধুনিক প্রকৃতিবাদী প্রধানশিক্ষক গিয়ে তাঁর জায়গায় এলেন আধুনিক সংস্কৃতিবাদী প্রধানশিক্ষক । রেলের খ্রিস্টান গার্ডের খোঁড়া সৎ-মেয়েটিকে তার আশ্রয়স্হলে পৌঁছে দেবার বদান্যতা দেখাতে গিয়ে কৈশোরেই কুড়োলেন ইলোপ করার বদনাম । প্রণয়িনীর চুলের কাঁটা পকেটে নিয়ে যোগ দিলেন সৈন্যবাইনীতে । ফিরে এসে, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের বাদুড়বাগানের মেসে দিনকতক থাকার পরের উৎখাত হলেন হিন্দু আবাসিকদের হল্লায় । ডেরা বাঁধলেন কাগজের অফিসে । রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে নিচে থেকেই ‘গুরুজি গুরুজি’ বলে হাঁক পাড়লেন । মোহিতলাল মজুমদারের বিরুদ্ধে চাপালেন চাপান উতোর । তাঁর ক্রুদ্ধ রচনার দরুন ‘নবযুগ’ পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত হল । দেওঘরে যাঁর বাসায় আশ্রয় পেলেন, সেখানে স্বামী-স্ত্রী নয় এমন যুবক-যুবতীকে রাতভর থাকতে দিয়ে উৎখাত হলেন । দৌলতপুর গিয়ে অতিদ্রুত সৈয়দ আসাব খানের প্রেমে পড়লেন এবং কাবিনামার শর্ত মনঃপূত না হওয়ায় বিয়ের আসর থেকে উঠে চলে গেলেন । ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা প্রকাশ করা আরম্ভ করলেন, এবং তাঁর ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি বাজেয়াপ্ত হল । ‘ধূমকেতু’ প্রকাশের দায়ে কুমিল্লা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে এনে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হল । মেদিনীপুরে তাঁর গান ও কবিতা আবৃত্তিতে মুগ্ধ একটি হিন্দু যুবতী নিজের গলার সোনার হার খুলে নজরুলকে পরাবার পর পারিবারিক ও সামাজিক ধিক্কার সহ্য করতে না পেরে মেয়েটি আত্মহত্যা করে নিল । ঢাকার রানু সোমের সঙ্গে তাঁর নৈকট্য আঁচ করে তাঁকে প্রহার করেন সমাজের কর্তাবাবারা । তেইশ বছরের নজরুল আহলে-কেতাব মতে বিয়ে করলেন ষোলো বছরের প্রমীলা সেনগুপ্তকে । নলিনাক্ষ সান্যালের বিয়েতে মুসলমান বরযাত্রী হওয়ার দরুন বিতাড়িত হলেন বিয়েবাড়ি থেকে । হিন্দু মেয়ে বিয়ে করায় কলকাতার কোথাও বাড়ি ভাড়া না পেয়ে শেষে থাকতে বাধ্য হলেন হুগলির মুসলমান গেটো মোগলপুরায় । তারপর সেখানেও টিকতে না পেরে বাসা নিলেন কৃষ্ণনগরে, এবং এমন দারিদ্রে আক্রান্ত হলেন যে বন্ধুবান্ধবদের ‘নজরুল সাহায্য রজনী’ অনুষ্ঠান করে চটজলদি টাকা তুলতে হল । উত্তরোত্তর হিন্দু দেবী দেবতার প্রসঙ্গ তাঁর গান ও কাব্যে বৃদ্ধি পাওয়ায়, বিরাগভাজন হলেন মুসলমান সমাজের রক্ষণশীল বর্গের । ‘মোহম্মদি’ পত্রিকা তাঁকে ‘কাফের’ আখ্যায় ভূষিত করল । গণিতে স্নাতকোত্তর যুবতী ফজিলতুন্নেসার প্রতি আকৃষ্ট ও প্রত্যাখ্যাত হয়ে টের পেলেন যে কবিতা ও গানের জনপ্রিয়তার বাইরে একটি আত্মাভিমানের জগৎ আছে যেখানে তাঁর স্বীকৃতি সম্ভব নয় । অকস্মাৎ একদিন, তাও বেতারকেন্দ্রের অনুষ্ঠানে, তাঁর উচ্চারণ ক্ষমতা তিরোহিত হল, এবং বাকহীন হয়ে গেলেন বাকি সারাটা জীবন । তাঁর মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেল । তাঁর শাশুড়ি একদিন কাউকে না জানিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন । ‘নজরুল সাহায্য কমিটি’ দুশো টাকা মাসোহারার ব্যবস্হা করেছিল, কিন্তু জনৈক ঈর্ষান্বিত কবি কলকাঠি নাড়িয়ে তা বন্ধ করে দিলেন । তাঁর স্ত্রী আক্রান্ত হলেন পক্ষাঘাতে । জীবনের শেষ কয়েকদিন মৌন সম্রাটের মতন ঢাকায় কাটালেন নজরুল । নজরুলের পপতিষ্ঠার জন্য তা ভালোই হল । পশ্চিমবঙ্গে তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে গড়ে-ওঠা সংস্হার সংগঠকরা যে-যার আখের গুছিয়ে কেটে পড়লেন , এবং সংস্হাটি লাটে উঠে গেল । তাঁর রচনাসমগ্রের ফাইল লোপাট হয়ে গেল সরকারি দপতর থেকে । একুশ শতকের পোস্টমডার্ন দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, প্রাগুক্ত ঘটনাবলীকে একটি ভয়াবহ ত্রাসিত রূপকথা মনে হয়, অধিবাস্তব মনে হয় । কিন্তু প্রাগাধুনিকতা ও আধুনিকতার বঙ্গীয় সাঁড়াশিতে আটক নজরুল ভুগেছেন ওই অনৈক্য, ওই অনিশ্চয়তা, ওই হাহাকার, ওই আক্রমণ, ওই অনপনেয় জীবন ।

চার
রবীন্দ্রনাথ ১৩০৫ বঙ্গাব্দে তাঁর ‘গ্রামসাহিত্য’ নিবন্ধে এই কটা কথা লিখেছিলেন : “গাছের শিকড়টা যেমন মাটির সঙ্গে জড়িত এবং তার অগ্রভাগ আকাশের দিকে ছড়াইয়া পড়িয়াছে, তেমনি সর্বত্রই সাহিত্যের নিম্ন অংশ স্বদেশের মাটির মধ্যেই অনেক পরিমাণে জড়িত ্‌ইয়া থাকে ; তাহা বিশেষরূপে সংকীর্ণরূপে দেশীয়, স্হানীয় । তাহা কেবল দেশের জনসাধারণেরই উপভোগ্য ও আয়ত্তগম্য, সেখানে বাহিরের লোক প্রবেশের অধিকার পায় না । সাহিত্যের যে অংশ সার্বভৌমিক তাহা এই প্রাদেশিক নিম্নস্তরের থাকাটার উপরে দাঁড়াইয়া আছে । এইরূপ নিম্নসাহিত্য এবং উচ্চসাহিত্যের মধ্যে বরাবর ভিতরকার একটি যোগ আছে । যে অংশ আকাশের দিকে আছে তাহার ফুলফল ডালপালার সঙ্গে মাটির নিচেকার শিকড়গুলোর তুলনা হয় না — তবু তত্ববিদদের কাছে তাহাদের সাদৃশ্য ও সম্বন্ধ কিছুতেই ঘুচিবার নহে ।” প্রাগুক্ত নিবন্ধে রবীন্দ্রনাথ আরও লিখেছিলেন, “নিচের সহিত উপরের এই যে যোগ, পপাচীন বঙ্গসাহিত্য আলোচনা করিলে ইহা স্পষ্ট দেখিতে পাওয়া যায় । ‘অন্নদামঙ্গল’ ও ‘কবিকঙ্কণ’-এর কবি যদিচ তাঁহারা উভয়ে রাজসভা-ধনীসভার কবি, যদিচ তাঁহারা উভয়ে পণ্ডিত, সংস্কৃত কাব্যসাহিত্যে বিশারদ, তথাপি দেশীয় প্রচলিত সাহিত্যকে বেশিদূর ছাড়াইয়া যাইতে পারেন নাই ।”

নিম্নসাহিত্য ও উচ্চসাহিত্যের খুঁটি দুটিতে বাঁধা বঙ্গসংস্কৃতির অশ্বটিকে মুক্ত করে দিলেন নজরুল, ছুটিয়ে দিলেন তাকে দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝেকার বঙ্গীয় মননের টালমাটাল কালখণ্ডে, এবং আঘাত হানলেন যুগ্ম-বৈপরীত্যগুলোর ভিত্তিবাদী ও খণ্ডবাদী বনেদে । একেবারে ভণ্ডুল করে দিতে চাইলেন তাদের : আর্য ও অনার্য, উচ্চ ও নিম্ন, হিন্দু ও মুসলমান, ভূমিপুত্র ও বহিরাগত, মাতৃতন্ত্র ও পিতৃতন্ত্র, সাকার ও নিরাকার, কেন্দ্রীয় ও প্রান্তিক, জ্ঞান ও কর্ম, মন ও দেহ, দেবতা ও রাক্ষস, শহর ও গ্রাম, বেদ ও নির্বেদ, ফরসা ও কালো, ঈশ্বর ও অনীশ্বর, মস্তিষ্ক ও হৃদয়, শ্রীকৃষ্ণ ও ইন্দ্র, শুভ ও অশুভ, উর্বশী ও অর্জুন, মূর্ত ও বিমূর্ত, ভদ্রলোক ও ছোটলোক ইত্যাদি । এ-প্রসঙ্গে আনন্দবেদনার অভিজ্ঞান ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সেই নিগূঢ় ও ওজস্বী বৈপরীত্যগুলোকে স্মরণ করা যায়, যা একদা ঔপনিবেশিক পাশ্চাত্য মানদণ্ড প্রয়োগ করে বিচ্যুতি ঠাওরেছেন এলিট আলোচকের দল, যাঁদের সঙ্গে সুফি গায়ক-কবি বুল্লে শাহের রচনার ( বুল্লা কি জানা ম্যায় কৌন ) পরিচয় নেই :
আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘুর্ণি
আমি পথ সন্মুখে যাহা পাই তাহা চূর্ণি
আমি চিরদুরন্ত দুর্মদ
.
আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়
আমি শ্মশান,
আমি আবাসন, নিশাবসান ।

এরই বিপরীতে, একই পাঠকৃতিতে তিনি লিখেছিলেন :
আমি বন্ধনহারা । কুমারীর বেণী
তন্বী নয়নে বহ্ণি,
আমি ষোড়শীর হৃদি সরসিজ প্রেম
উদ্দাম, আমি ধন্যি ।

চিন্তা ও অসামঞ্জস্যকে যেভাবে তাঁর পদ্যে ও গানে বার বার এনেছেন নজরুল, আমাদের কাছে স্পষ্ট হয় যে, ঠাণ্ডামাথায় পুনঃচিন্তিত স্মৃতি কালক্রমে তার আদল পালটায়, চরিত্রহীন হয়ে যায় । তাঁর অধিকাংশ পাঠকৃতি সেহেতু দ্রুত, স্বতঃস্ফূর্ত ভৌতবৃত্তীয়, সংবাহক । ইউরোপীয় অধিবিদ্যাগত মননবিশ্বে প্রতিপালিত বাঙালি ভাবুকদের একদেশদর্শিতা থেকে মুক্ত । নয়তো তাঁরা কীভাবেই বা এই ঘটনাগুলো মিলিয়েছেন : জেমস স্টুয়ার্ট মিল-এর উদারনীতি এবং তাঁর ভারতবর্ষের ইতিহাস, ম্যাকলের হুইগিশ উদারনীতি নিজেরদেশে বসে এবং উপনিবেশে রেসিজম, ইউরোপীয়দের নিজেদের জন্য ‘মুক্তি-ভাতৃত্ব-স্বাধীনতা’-র স্লোগান আবার একই সঙ্গে কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস রাখা, একদিকে আলোকপ্রাপ্তি তত্বের রমরমা আর তার বিপরীতে নারীকে ভোটাধিকার না দেবার প্রয়াস । একইভাবে প্রশ্ন ওঠে যে, হিন্দু ও ব্রাহ্ম সাহিত্যিকদের রচনাতে ইসলামের মিথ ব্যবহৃত হয়নি কেন ! হয় না কেন ? তাহলে তাঁদের চেতনাকে তো আত্মসর্বস্ব এবং খণ্ডিত আখ্যা দেওয়াই উপযুক্ত । আসলে ‘মসনদের মূল্যবোধ তার নিজস্ব মালিন্য গড়ে তোলে’। যেমন পরবর্তীকালে তসলিমা নসরিনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার ও তাদের বিতাড়ন বিষয়ক বই ‘লজ্জা’-কে কেন্দ্র করে।

প্রাগুক্ত মালিকানার দরুন অনেক আলোচক নজরুলে আলোচনা এড়িয়ে যান । তাঁদের ভয় হয়, নজরুলের আলোচনা করলে বুদ্ধিজীবী মহলে তাঁরা নিজেরাই বেকায়দায় পড়বেন, তাঁদের হয়তো সাহিত্যসমাজে জবাবদিহি করতে হবে, অধ্যাপকদের কাছে কারণ দর্শাতে হবে । আসলে নজরুলের সংবরণহীনতা, সংহতিহীনতা, সংশ্লেষহীনতার সামনে পড়ে ভ্যাবাচাকা খেয়ে যান তাঁরা, কেননা তাঁদের হাতে গুঁজে দেওয়া মাপকাঠিতি জগা কৈবর্ত, বিশা ভূঞিমাল এমনকি শিবনাথ শাস্ত্রীও নয় । তা দিশি কেরি সাহেবদের মারফত পাওয়া স্যামুয়েল জনসন প্রমুখের মাপকাঠি । তিরিশের দশকের পাঁচজন কবি, যাঁরা বাংলা কবিতায় আধুনিক আদরা-আদল-কাঠামোর অনুপ্রবেশ ঘটান, তাঁরা সবাই ছিলেন ইংরেজি ভাষার অধ্যাপক । অর্থাৎ সাদা-কলার সংস্কৃতির তাঁরা ছিলেন অন্তরঙ্গজন । বাঙালি চাষা ক্ষেতমজুর ঢুলি মোয়াজ্জিন সেপাই কাজি বাবুর্চি খানসামা এমাম ইত্যাদি প্রান্তিক মানুষের কালচেতনা ও অভিব্যক্তি-বিন্যাস যে কলেজ অধ্যাপকদের থেকে আলাদা হবে না, তা নজরুলের আলোচকরা ঠাহর করতে পারেননি, পারেন না । ওপরতলার বিদ্যায়তনিক ঠাটটিকে যেহেতু নিচুতলার হেলাফেলার বিশ্ববীক্ষা দিয়ে চুরমার করেছিলেন তিনি, সেহেতু ওপরতলার তথাকথিত শিক্ষিত সংস্কৃতিবান রুচিসম্পন্ন এলিটের আঁতে ঘা লেগেছিল, আজও লাগে । নজরুলের পাঠকৃতিতে আওয়াজ অর্থকে ছাপিয়ে যায় । অর্থ অনেক সময়ে বোধাতীত হতে পারে, কিন্তু আওয়াজের ঘোরের মধ্যে বোধকে পড়তেই হয় । নিহিতার্থ বা মানের মালিকানা থাকে ওপরতলার কবজায় । আওয়াজ নিচুতলায় । রস ওপর থেকেই টানা যায় । সেখানেই নান্দনিকতার কারখানা । ফলে যত দিন যাচ্ছে আর যাবে, দেয়ালে টাঙনো তাঁর ছবির সংখ্যাবৃদ্ধি হলেও, তাঁর বহু পাঠকৃতি বিদ্যায়তনিক ও বৌদ্ধিক মহলে হয়ে উঠবে এগজটিক ।

লক্ষণীয় যে, কাজী নজরুল ইসলামের সমকক্ষ জনপ্রিয় কবি, উভয় বাংলাতেই, আবিভূত হননি । আবৃত্তিকার-কবিদের পারফরমেন্স আরম্ভ হয়েছে তাঁর বহু পরে । পারিবারিক সংস্কৃতিতে ইউরোপীয় দ্যোতকগুলি অনুপ্রবেশ করতে পারেনি বলে, পশ্চিমবঙ্গে তিন, চার ও পাঁচের দশকে মুসলমান সমাজ থেকে বাঙালি কবি নেই । তারপর যাঁরা এলেন, কবিরুল ইসলাম, সামসুল হক, শামসের আনোয়ার প্রমুখ, মসনদের পপাতিষ্ঠানিক জ্যোতির্মণ্ডলের বাইরের অন্ধকারে, রয়ে গেলেন আগন্তুক ও প্রান্তিক । উপেক্ষিত ও অবহেলিত শামসের আনোয়ার বেছে নিলেন আত্মনিধনের পথ । সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তর হিন্দু সমাজটি এমন এক বিমূর্ত মূল্যবোধের চাপ সৃষ্টি করে যে, সেই প্রক্রিয়ায় মুসলমান কবি রয়ে যান প্রান্তে, সাহিত্যশাসকদের ক্ষমতাকেন্দ্রটির ছত্রছায়ার বাইরে । কবি নজরুল ইসলামের, পশ্চিমবঙ্গে তো বটেই, ক্রমাবলুপ্তির ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে ওই প্রক্রিয়ায় ।

মক্তব, মদ্রাসা, দার-উল-উলুমে শিক্ষাপ্রাপ্ত যুবকের পক্ষে আর বোধহয় পশ্চিমবঙ্গে কবি হওয়া এবং স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব নয় । বাংলাদেশে কি সম্ভব ? আমার মনে হয় সম্ভব নয় । বস্তুত পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে অবস্হা এমন দাঁড়িয়েছে যে, নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতায় ‘লানত গলায় গোলাম ওরা সালাম করে জুলুমবাজে/ধর্মধ্বজা উড়ায় দাড়ি গলিজ মুখে কোরান ভাঁজে’ পড়েন পঠক তখন তিনি মানে বইয়ের খোঁজ করেন । একই ব্যাপার ঘটে যখন ‘চিরনির্ভর’ কবিতায় শোনা যায় ‘ইস্রাফিলের বজ্রবিষাণ বেজে ছিল বারবার’, কিংবা ‘চোর ডাকাত’ কবিতায় ‘জগৎ হয়েছে জিন্দানখানা প্রহরী যত ডাকাত’ । এমন অজস্র আছে । পেশাদার আবৃত্তিকাররা নজরুলের গুটিকয় অতিজনপ্রিয় কবিতাই মঞ্চে-মঞ্চে পড়ে বেড়ান । পশ্চিমবঙ্গের ভাষাজগৎটিতে দেশভাগের পর যে বৌদ্ধিক ও সেম্যানটিক পরিবর্তন ঘটেছে, ঘটে চলেছে, নজরুলের বহু প্রতীক রূপকল্প শব্দবন্ধ অভিধা সেই প্রেক্ষিতে হয়ে উঠেছে অপরিচিত । পক্ষান্তরে তাঁর গান, বিশেষ করে শ্যামাসঙ্গীত, টিকে আছে তৃণমূল স্তরে । নজরুলের অভিব্যক্তি বুঝতে না পারলেও, বাঙালি যুবক-যুবতীরা, নর্তক-নর্তকীরা বলিউডের সালমান খান বা শাহরুখ খানের উর্দু সংলাপ দিব্বি বোঝেন ও নিজেদের বাক্যালাপে ব্যবহার করেন।

নজরুলের বিদ্যায়তনিক ও সমাজতাত্বিক গ্রহণ বর্জন ব্যাখ্যা করা যায় সম্ভবত পোস্টস্টাকচারাল অর্থাৎ উত্তরকাঠামোবাদী বা উত্তরগঠনবাদী ভাষাতত্বের দ্বারা । ধারণাটি জানায় যে, মানবসত্তাকে কোনও সর্বজনীন নিয়ম-পদ্ধতি প্রয়োগ করে টের পাওয়া যায় না, যা আধুনিকতাবাদ করতে চেয়েছিল নানারকম গ্র্যাণ্ডন্যারেটিভ (মহাআখ্যান, মহাসন্দর্ভ, মহাগল্প ) দ্বারা । বলা হল যে, গল্পটি অনুযায়ী, ইউরোপ একটি তুলাদণ্ড তৈরি করেছে এবং এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার সাহিত্য-সংস্কৃতি জীবনধারাকে তাইতে ওজন করে ফতোয়া দিতে চেয়েছে । ওজন করার পর তাদের মাপে যে বা যা বা যেগুলোকে মনে হয়েছে ইউরোপের, সেই বুড়ি ছুঁয়ে-ছুঁয়ে একটা একমুখী একরেখ ইতিহাসের নৈতিকতা ও বৈধতা তারা অনুমোদন করেছে । এমনিতেই, একটিমাত্র সংস্কৃতি নামে কিছুই ছিল না উপনিবেশগুলোয় । তার ওপর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দাপটে তা হয়ে গেছে যৌগিক, দোআঁশলা, মিশ্রিত, বহুমুখী, বহুরেখ, বহুস্বর ।

সাম্রাজ্যবাদী শাসনকেন্দ্রটি, আধুনিকতাবাদের মাধ্যমে তৈরি করেছিল একটি জেলখানা, যা আজও বজায় আছে উপনিবেশগুলোয়, এবং ভয়ংকর রাজনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি করে চলেছে প্রাক্তন উপনিবেশগুলোয় । এমন জেলখানা, যেখানে, সমস্ত আত্মপরিচয়কে খোপে-খোপে আবদ্ধ করা হয়েছে । কাজী নজরুল ইসলামকে তেমন কোনো খোপে ফেলতে না পারায় দেখা দিয়েছে সমস্যা, কেননা একদিকে আরব ইন্দ্রিয়চেতনার সাহায্যে ও ইসলামের গরিমা আশ্রয় করে তিনি আধুনিকতাবাদকে প্রতিরোধ করেছেন, আরেকদিকে রাঢ় বাংলার সহজ চিত্তবৃত্তি প্রয়োগ করে বহু প্রচলিত ও পপতিষ্ঠিত সীমাগুলোকে অভাবিত তাড়নায় লঙ্ঘন করে গেলেন । অথচ দ্রোহীর অহংটিকে সংজ্ঞায়িত করলেন না । দ্রোহী নজরুল তাঁর প্রান্তিক স্হিতি বজায় রেখেছেন সাম্রাজ্যবাদী শাসনকেন্দ্রটির বিরুদ্ধে আঘাত ঘটিয়ে । আর সাবঅলটার্ন উপসংস্কৃতির সঙ্গে প্রগাঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন ‘শ্মশানকালীর নাম শুনেরে, শ্যামা মায়ের ভেলায় চড়ে, আল্লা রসুল জপের গুণে, বক্ষে ধরেন শিব যে চরণ’ ইত্যাদি অজস্র লোকায়ত গানের মাধ্যমে ।

নজরুলের পাঠকৃতি অনুধাবনকালে উত্তরকাঠামোবাদের এই বক্তব্যটিও প্রযোয্য যে, শব্দাবলী বা অভিধাসমূহের নিহিতার্থের উৎস হল আধিপত্যবাদী ক্ষমতার পারস্পরিক সম্পর্কের লাগাতার টানাপোড়েন । এই টানাপোড়েনে শব্দ তামাদি হয়ে যায়, কিংবা তার নিহিতার্থ পালটে যায় । যে-বিবাহ বাসর থেকে বরের পোশাক ফেলে দিয়ে চলে গিয়েছিলেন তিনি, সেই বিয়ের কনেকে নিয়ে লেখা ‘হিংসাতুর’ শিরোনামটি ওই প্রগাঢ় প্রেমের কবিতাটি এ-প্রসঙ্গে উল্লেখ্য । নজরুলের আলোচনা ডায়াক্রনিক নিরিখের পরিবর্তে সিংক্রনিক নিরিখ অনুসারী হলে তাঁকে এবং তাঁর রচনাকে বুঝতে সুবিধে হবে । সিংক্রনিক নিরিখটি পাঠকৃতিটিকে সংস্কৃতি-বিশেষটির জটিলতার প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করে । নজরুলের পাঠকৃতিগুলো অনেকানেক সাংস্কৃতিক, নৈতিক, ধার্মিক, নান্দনিক, রাজনৈতিক, সাহিত্যিক উপাদানে নির্মিত । তাতে পাওয়া যায় জ্ঞানতাত্বিক ও ভাবাত্মক রেশারেশির অনর্গল দোটানা, মেলবন্ধন, বহুধ্বনিময়তা ।

ভাষার বাইরের নার তার ভেতরের প্রসঙ্গ সম্পূর্ণ আলাদা-আলাদা করা যায় না । শব্দ ও বাক্যের মানে বাইরের বস্তুজগতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক থেকেই কেবল গড়ে ওঠে না, পাশাপাশি অন্যান্য শব্দ ও অভিব্যক্তির কারণেও শব্দের নিহিতার্থ তৈরি হয় । চিন্তা ও কর্মে প্রোথিত থাকে ভাষা । নজরুলেরও তা-ই ছিল । ছিল তাঁর স্বজন ও পরিচিতের । শব্দার্থ উদ্ভূত হয় সামাজিক প্রসঙ্গভূমিতে । শব্দ ও চিন্তা, শব্দ ও কাজ, শব্দ ও বস্তু, এদের মধ্যে নিহিতার্থের অপরিবর্তনীয় সম্পর্ক যে থাকে না, তা অভিধান খুললেই টের পাওয়া যায় । শব্দ ও অভিব্যক্তি মাত্রেরই থাকে অপার মানে-সম্ভাবনা । অধিপতিরা এই সম্ভাবনাকে খাটান । যে আলোচকরা কাজী নজরুল ইসলামকে নাকচ করে দিতেন, এখনও নাকচ করে দিতে চান, তাঁরাও খাটান এই সম্ভাবনা ।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতারা খ্রিস্টধর্মের প্রভাবে আধুনিকতাবাদী ঐতিহাসিকতার নকশা প্রয়োগ করে যে গল্পটি লেখার চেষ্টা করেন, তাতে বিভিন্ন কালখণ্ডের একই পথ-বরাবর, তাঁদের নিজেদের পোঁতা মাইল-পাথরের বুড়ি ছুঁয়ে, এগিয়ে যান । সে-পথ, যাদের এডওয়ার্ড সাঈদ বলেছেন ‘ওরিয়েন্টালিস্ট’, এবং রণজিৎ গুহ বলেছেন ‘উচ্চবর্গ’, তাঁদের চেনাজানা । আশপাশ থেকে যে আরও নানা পথ নানা দিকে চলে যাচ্ছে, যায়, তা তাঁরা খেয়াল রাখেন না, কেননা সেসব পথ, প্রথমত তাঁদের পরিচিত নয়, দ্বিতীয়ত তাঁদের নিরিখ-নকশায় খাপ খায় না, এবং তৃতীয়ত তাঁদের স্বীকৃতি পায় না । সাহিত্যের ইতিহাস চর্যাপদ থেকে বিভিন্ন দিকে এগিয়ে গেছে অজস্র সাংস্কৃতিক কাজের মাধ্যমে । ইতিহাস তো অতীত । রেখা টানতে হলে অগুনতি জাতি, গোষ্ঠী, বর্গ, শ্রেণি, ধর্ম, সম্প্রদায়, অঞ্চল, মতাদর্শ সবকিছুর জন্যে বিভিন্ন দিকে টানতে হয় । পেঁপের বীজ থেকে অজস্র পেঁপের বীজ আর তার প্রতিটি থেকে আরও অজস্রের মতন হবে রেখাগুলো । একটিমাত্র তত্ববিশ্বের ধারণাটি ভুল ও তা মানবজাতির পক্ষে ক্ষতিকর । বাঙালি বলতে কেবল কলকাতা-ঢাকার শহরাঞ্চলের অতিশক্ষিত বর্গটিকে বোঝায় না । বলাবাহুল্য যে প্রথমে হিন্দু পরে খ্রিস্টধর্মী মাইকেল, ব্রাহ্ম জমিদার সন্তান রবীন্দ্রনাথ এবং নিম্নবর্গীয় যোদ্ধা মুসলমান ও পরে সর্বসম্প্রদায়ি নজরুল ইসলাম একই পথের মাইল-পাথর নন।


[রচনাকাল : ১৯৯৬, পরবর্তীকালে, কবিতীর্থ প্রকাশিত ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ গ্রন্হে পরিমার্জিত]
রচনাটি লেখার জন্য নজরুলের জীবনী ও গানের বই দিয়ে সাহায্য করেছিলেন কলিম খান ও জাহিরুল হাসান।
প্রথম প্রকাশিত ঢাকার ‘মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা’য় ২০০০ সালে।



কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: Tanwi halder

Re: উনিশতম অশ্বারোহী

Asadharan..anek kichu janlam
Avatar: Tanwi halder

Re: উনিশতম অশ্বারোহী

Asadharan..anek kichu janlam
Avatar: paps

Re: উনিশতম অশ্বারোহী

তুললাম
Avatar: Kakali Sinha Roy.

Re: উনিশতম অশ্বারোহী

নতুন আঙ্গিকের তথ্য সম্বলিত লেখা। নজরুল ইসলাম কে নিয়ে এমন লেখা আগে পড়িনি। জানলাম অনেক। ধন্যবাদ লেখক কে।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন