বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ধর্ষণ ও নারীর দায়

শৌভ চট্টোপাধ্যায়

এ-দেশে যৌন-অপরাধের, বিশেষত ধর্ষণের সংখ্যা দিন-দিন বেড়েই চলেছে। অথবা, এমনও হতে পারে যে, অপরাধের সংখ্যা একই আছে, কিন্তু ঘটনাগুলো ক্রমশ আরো বেশি করে প্রকাশ্যে আসছে, জায়গা করে নিচ্ছে সংবাদমাধ্যমে, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং-এর জগতে, এমনকী আমাদের দৈনন্দিন আলাপ-আলোচনার পরিসরেও। আর এইসব আলোচনার সূত্র ধরে, জন্ম নিচ্ছে নানান বিতর্ক, পরস্পরবিরোধী নানান দৃষ্টিভঙ্গী। কেউ সোচ্চার হচ্ছেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে, কেউ আঙুল তুলছেন শিক্ষাব্যবস্থার দিকে, কেউ বা মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে চিন্তিত। এর বিপরীতে, অনেকেই আবার ধর্ষণের জন্য সরাসরি দায়ী করছেন মেয়েদের, প্রশ্ন তুলছেন তাদের পোষাক-আশাক, আচার-আচরণ নিয়ে। এমন অভিযোগ যাঁরা করছেন, তাঁরা যে সকলেই মৌলবাদী, কিংবা কট্টর প্রাচীনপন্থী, এমন নয়। এমনকী, এঁদের মধ্যে অনেক মহিলাও আছেন, যাঁরা স্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ও শ্রদ্ধাভাজন। ফলে, এই অভিযোগগুলোকে চট করে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। বরং খতিয়ে দেখা দরকার, সত্যিই এর ভেতরে কোনো সারবত্তা আছে কি না। সন্দেহ নেই, ধর্ষণের মতো একটি জটিল সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে সংগঠিত জনমত গড়ে তোলা আশু প্রয়োজন। আর তার জন্যে, রোগের কারণটিকে সর্বাগ্রে চিহ্নিত করা দরকার। রোগনির্ণয়ে ভ্রান্তি থাকলে, উপশম তো দূরের কথা, ভুল ওষুধের ক্রিয়ায় রোগীর প্রাণসংশয় অবধি হতে পারে।

ধর্ষণ ও ক্ষমতা
যেকোন যৌনসঙ্গম ধর্ষণ নয়। যৌনতাড়নার যেকোন বহিঃপ্রকাশও ধর্ষণ নয়। ধর্ষণ তখনই বলা হয়, যখন যৌনসঙ্গমে একপক্ষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা তথা সম্মতি-অসম্মতিকে জোর খাটিয়ে নাকচ করে ফেলা হয়, এবং অপরপক্ষের ইচ্ছা-অনিচ্ছাই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়। এই ‘জোর খাটিয়ে’ কথাটা গুরুত্বপূর্ণ। জোর খাটানো তখনই সম্ভব, যখন ক্ষমতার নিরিখে, একপক্ষ অন্যপক্ষের থেকে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় অবস্থিত হয়। একে আমরা Power Distance বলতে পারি।

একটু অন্যভাবে বললে, যখন দুজন ব্যক্তির মধ্যে একজন নিজেকে অধিক ক্ষমতাশালী বলে মনে করে, এবং তার সুবাদে, অপরপক্ষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে খর্ব করে নিজের যৌনলালসা চরিতার্থ করতে উদ্যোগী হয়, তখন তাকে ধর্ষণ বলে। এই ঘটনা দুজন অপরিচিত ব্যক্তির মধ্যে যেমন ঘটতে পারে, তেমনি ঘটতে পারে স্বামী-স্ত্রী বা একই পরিবারের দুই সদস্যের মধ্যেও।

এবার ভাবা যাক, একপক্ষের হাতে এই ক্ষমতা আসে কী করে? বা, এই ক্ষমতার চেহারা-চরিত্র কীরকম?

ধরুন, আমি কোন এক গ্রামের উচ্চবর্ণের জমিদার। আমার জমিতে মুনিষ খাটে হরি। আমি হরির স্ত্রীকে জোর করে বলাৎকার করলাম। এখানে আমার ক্ষমতার উৎস আমার বর্ণ এবং আমার অর্থ-প্রতিপত্তি, আর এই দুইয়ের দ্বারা নির্ণীত আমার সামাজিক অবস্থান। আমি যে-সমাজে বসবাস করি, সেই সমাজ যদি আমাকে নিঃসংশয়ে হরি বা তার স্ত্রী-র থেকে অধিক ক্ষমতাবান বলে মেনে নেয় (আমার বর্ণ ও অর্থ-প্রতিপত্তির কারণে), তাহলে আমি ভেবে নিতেই পারি যে, সমাজ-নির্ধারিত ন্যায়-নীতির বিচার আমার পক্ষেই যাবে। অর্থাৎ, সমাজ পরোক্ষে আমার বলাৎকারকেই মান্যতা দেবে। মনে রাখা ভালো, ভারতের একটি বড় অংশ আজও, মানসিকভাবে, ও মূল্যবোধের দিক থেকেও, সামন্ততান্ত্রিক বা আধা-সামন্ততান্ত্রিক যুগে পড়ে রয়েছে। সেখানে এ-ধরণের অপরাধের সংখ্যা বড় কম নয়।

আবার আমি, পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ ও সম্মাননীয় ব্যক্তি হিসেবে, কম বয়সের কোনো আত্মীয়াকে ভয় দেখিয়ে, তার ওপর দিনের পর দিন যৌন উৎপীড়ন করতে পারি। এখানে, আমি ভেবে নিচ্ছি যে, আমার পারিবারিক কাঠামো এবং সেই কাঠামোয় আমার উচ্চতর অবস্থানের সুবাদে অর্জিত ক্ষমতা, আমার ধর্ষকামকে মান্যতা দিচ্ছে।

আরেকধরণের ক্ষমতার উৎস হতে পারে সমাজে আমার নৈতিক অবস্থান। ব্যাপারটা আপাতদৃষ্টিতে উদ্ভট মনে হলেও, কার্যক্ষেত্রে ততটা নয়। সমাজ যদি একজন দেহোপজীবিনী-কে নৈতিকভাবে আমার চেয়ে হীন বলে গণ্য করে, তাহলে সমাজের ন্যায়-নীতির ওপর আমার দাবি, ওই দেহোপজীবিনীর চেয়ে বেশি ও অধিক ন্যায্য বলে সাব্যস্ত হয় (বা, আমার সেই রকমই মনে হতে পারে)। আমি যদি সেই মেয়েটিকে, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে, আমার সঙ্গে যৌনসংসর্গে লিপ্ত হতে বাধ্য করি, তাহলে তা ধর্ষণই। যদিও, আমার মনে হতে পারে, যেহেতু ওই দেহোপজীবিনী আমার তুলনায় অপেক্ষাকৃত “কম-মানুষ”, ফলে তাকে ইচ্ছামতো ভোগ করা যেতেই পারে, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েও।

ক্ষমতা ও পণ্য
এই শেষোক্ত ঘটনাটিরই আরেকটি রূপ হল, সামগ্রিকভাবে মেয়েদের অবজেক্টিফিকেশন। যেখানে, পুরুষদৃষ্টির (male gaze) সম্মুখে, মেয়েমাত্রেই একটি যৌন-বস্তু (sexual object) হিসেবে প্রতিভাত হয়। বস্তুর কোনো নিজস্ব চেতনা নেই, ইচ্ছা-অনিচ্ছা নেই। অতএব, মেয়েদের অবজেক্টিফিকেশনের অনিবার্য ফল হল, তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে অনায়াসে অস্বীকার করার, বা উল্লঙ্ঘন করার, সহজাত ক্ষমতা। এ-ও একধরণের de-humanisation। পণ্য-শাসিত এবং মিডিয়া-লালিত সমাজ, প্রতিনিয়ত, নানাভাবে, এই অবজেক্টিফিকেশন ও ডি-হিউম্যানাইজেশনের কাজটি চালিয়ে যাচ্ছে, আমাদের অগোচরে।

প্রতিদিন অজস্র বিজ্ঞাপনে এ-কথাই নানাভাবে বোঝান হচ্ছে যে, পুরুষের করায়ত্ত হয়ে তার যৌনকামনা মেটানোর জন্যে নারী সর্বদাই প্রস্তুত, দরকার কেবল সঠিক ডিওডোরান্ট, সঠিক মাউথ-ফ্রেশনার, অমুক দাড়ি কামানোর সাবান কিংবা তমুক জাঙিয়ার। অর্থাৎ নারী এবং যৌনতা, দুই-ই পণ্য, এবং বিক্রয়ের জন্য হাজির। অন্য নানা পণ্যের সঙ্গে এগুলোকেও কেনা যায়। ক্রেতব্য সাবানের যেমন কোনো ব্যক্তিগত ইচ্ছা থাকে না, তেমনি ক্রেতব্য নারীর নিজস্ব ইচ্ছার প্রশ্নটাও অবান্তর। থাকলেও, তা চুক্তিভঙ্গের সামিল, এবং ক্রেতাসুরক্ষা দপ্তরে নালিশ ঠোকা যায়।

একজন পুরুষ, যে সারাদিন টেলিভিশনে, খবরের কাগজে, বিজ্ঞাপনে, মেয়েদের সহজলভ্যতার ধারণাকে এইভাবে মান্যতা ও প্রতিষ্ঠা পেতে দেখছে, সে যখন পানশালায়, বা নৈশক্লাবে, সদ্যপরিচিত একটি মেয়েকে তার শয্যাসঙ্গিনী হিসেবে পেতে চাইবে, তখন মেয়েটির যাবতীয় আপত্তি ও বিরোধিতা যে তার কাছে নিতান্ত আশ্চর্যজনক বলেই মনে হবে, তাতে সন্দেহ কী? সে তো সঠিক জামাকাপড় পরে, সঠিক ডিওডোরান্ট মেখে, সঠিক ব্লেডে দাড়ি কামিয়ে প্রস্তুত। মেয়েটিকে নানাবিধ ইশারাও করেছে, তবু কেন সে তার কন্ঠলগ্ন হচ্ছে না? ছেলেটির কাছে এটা একধরণের চুক্তির খেলাপ, অতএব উপায় একটাই—বলপ্রয়োগ।

অবিশ্যি, মিডিয়া বা বিজ্ঞাপনের দিকে আঙুল তোলার আগে, অন্য দুটি আঙুল নিজেদের দিকেও তাক করা প্রয়োজন। বিজ্ঞাপনের প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য, মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ, যাতে করে তিরিশ সেকেন্ড সে টেলিভিশনের পর্দা থেকে চোখ সরাতে না পারে। টিভি সিরিয়াল বা জন-মনোরঞ্জক বাণিজ্যিক সিনেমার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই—দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখা, যে কোনো উপায়ে। ফলে, সিনেমায়, সিরিয়ালে বা বিজ্ঞাপনে মেয়েদের অবমাননাকর চিত্রায়ণ, অথবা লাগাতার যৌনসুড়সুড়ি, হয়তো বা মানুষের চাহিদার কথা মাথায় রেখেই। হয়তো তা এই সত্যের দিকেই ইঙ্গিত করে যে, আমাদের সমাজে, এখনও, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মেয়েদের যৌনপুতুল-হিসেবে দেখতেই অভ্যস্ত; পুরুষের ক্ষমতা ও দাবির সামনে মেয়েদের শর্তহীন নতিস্বীকারই তাদের আজন্মলালিত সংস্কার, তাদের গোপন স্বপ্ন ও ফ্যান্টাসি।

অর্থাৎ, নারীর এই পণ্যায়ন, তথা অবজেক্টিফিকেশনের মূল, আমাদের সাংস্কৃতিক-সামাজিক গঠনের মধ্যে, বহুকাল ধরেই প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে। পণ্যনির্ভর, বাজারী সভ্যতা তাকে ব্যবহার করছে কেবল, তাকে গোপনে মান্যতা দিচ্ছে, নিজের স্বার্থপূরণের তাগিদে। আর সেটা করতে গিয়ে, বৈধতা দিয়ে ফেলছে ধর্ষকের মানসিকতাকেও। তৈরি হচ্ছে ধর্ষণের সংস্কৃতি।

এ-সমস্যা শুধু ভারতবর্ষের নয়, বরং গোটা পৃথিবীর। পশ্চিমী দুনিয়ায় পণ্যের আগ্রাসন আরো ব্যাপক, এবং নারী ও যৌনতাকে পণ্য-হিসেবে বিজ্ঞাপিত করার চেষ্টায় কোনো খামতি নেই সেখানেও। কিন্তু ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে, জটিলতা বোধহয় আরেকটু বেশি। আগেই বলেছি, এ-দেশের একটা বড় অংশ এখনও মানসিকভাবে সামন্ততান্ত্রিক বা আধা-সামন্ততান্ত্রিক। সেখানকার আর্থসামাজিক পরিকাঠামোয়, মেয়েদের স্থান অন্তেবাসীর। কন্যাভ্রূণ-হত্যা আজও নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। যার ফলে, নারীপুরুষের সংখ্যাগত অনুপাত সেখানে ভয়াবহ—পয়সা দিয়ে মেয়ে কেনাবেচা হয় বিয়ের জন্য। এইরকম পরিস্থিতিতে, যখন মেয়েদের পণ্য হিসেবে দেখানো হয়, তখন তার ফল আরো বিষময় হয়ে ওঠে।

পণ্য ও পোষাক
পোষাকের উৎপত্তির অন্যতম কারণ লজ্জানিবারণ। লক্ষ করা যাক, লজ্জা আর যৌনতার সম্বন্ধটা কিন্তু খুবই প্রত্যক্ষ ও প্রকট। যৌন-অঙ্গগুলির বিষয়ে আমাদের একটা অব্যাখ্যাত লজ্জাবোধ রয়েছে। আর, সেই অঙ্গগুলিকে আবৃত করার উদ্দেশ্যেই পোষাকের ব্যবহার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, পোষাকের ব্যবহার ক্রমশ এক অলঙ্ঘ্যনীয় সামাজিক অনুশাসনের চেহারা নিয়েছে। রাস্তা দিয়ে বিনা-পোষাকে কেউ হেঁটে গেলে, স্থান-কাল-পরিস্থিতি অনুযায়ী, পুলিশের অধিকার আছে তাকে গ্রেফতার করার। শুধু তাই নয়, পোষাকের সঙ্গে কালক্রমে জড়িয়ে গেছে রুচি, সামর্থ্য, প্রতিপত্তি, বা নৈতিকতার প্রশ্নও। অর্থাৎ, একজন মানুষের পোষাক-পরিচ্ছদ দেখে, তার সামাজিক অবস্থান, এমনকী নৈতিক অবস্থানও, আমরা অনুমান করে নিই। যেভাবে, বাক্স বা মোড়কের চাকচিক্য দেখে, পণ্যের গুণগত মান আঁচ করে নেবার প্রবণতা আমাদের মজ্জাগত হয়ে উঠেছে।

প্রশ্নটা এবার, এইখান থেকেই, ঘুরে যেতে পারে মেয়েদের পোষাকের সঙ্গে পুরুষ-দৃষ্টির যোগসাজশের দিকে।

যাকে আমরা হাই-ফ্যাশন, বা Haute-Couture বলে মনে করি, তা কি আসলে পুরুষতন্ত্র-লালিত একটি ধারণামাত্রই নয়? কী ধরণের পোষাক পরলে মেয়েদের সুন্দর ও শালীন দেখাবে, তা কি মেয়েরা নিজেরা নির্বাচন করে, না কি তা নির্ধারিত হয় male gaze-এর প্রশ্রয়ে ও আনুকূল্যে? একদা ইয়োরোপে, মেয়েদের কোমর অত্যধিক সরু দেখানোর জন্য, মারাত্মক আঁট করসেটের ব্যবহার চালু হয়েছিল। ব্যবহারিক অস্বস্তি বা অসুবিধার কথা যদি বাদও দিই, দীর্ঘদিন এই করসেট ব্যবহার করলে, অনেকক্ষেত্রেই, মেয়েদের গুরুতর শারীরিক সমস্যা দেখা দিত। এমন অস্বস্তিকর পোষাক কি মহিলারা স্বেচ্ছায় নির্বাচন করতেন, না কি পুরুষের চোখে নিজেদের আকর্ষণীয় করে তোলবার তাগিদে, অথবা পুরুষের ‘শালীনতা’-র ধারণাকে বলবৎ করার খাতিরে (নীতিনিষ্ঠ পুরুষের আকর্ষণ শালীন নারীর প্রতি!) বাধ্য হতেন এইসব জবড়জং পোষাককেই ফ্যাশন বলে মেনে নিতে, যাকে তাত্ত্বিকরা self-objectification বলেন? ভিক্টোরীয় যুগের শেষদিকে, একাধিক পোষাক-সংস্কার আন্দোলন, আমেরিকায় অ্যামেলিয়া ব্লুমারের নেতৃত্বে ‘লিলি’-পত্রিকার বিদ্রোহঘোষণা, দ্বিতীয় সম্ভাবনাটির দিকেই অঙ্গুলিনির্দেশ করে।

মিডিয়ায় ও বিজ্ঞাপনে, একদিকে যেমন মেয়েদের ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখানো হয়ে থাকে, তেমনি সেই ভোগ্যপণ্যের বাহ্যিক গুণমান তথা উৎকর্ষ-অপকর্ষের মাপকাঠিটিও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। ঠিক কোন ধরণের মেয়ে ভোগের উপযুক্ত, তার একটা স্পষ্ট রূপরেখা আমাদের মগজে গেঁথে দেয় এই বিজ্ঞাপনগুলি। জানিয়ে দেয় যে, ভোগ্য নারীটিকে হতে হবে তন্বী ও ফর্সা, তার স্তন হতে হবে উঁচু ও দৃঢ়, তার পাছা হবে অল্প-ভারী, তার ত্বক নির্লোম, আর তার পোষাক হবে এমন, যা তার এই ভোগযোগ্যতাকে আরো বেশি করে বিজ্ঞাপিত করে। অর্থাৎ, মিডিয়া শুধু নারীকে অবজেক্টিফাই করেই ক্ষান্ত নয়, বরং মেয়েরা কীভাবে নিজেরাই নিজেদেরকে যৌন-অবজেক্ট হিসেবে তুলে ধরতে পারে, তার মেড-ইজি সরবরাহ করাও তার অন্যতম উদ্দেশ্য। এর ফলে, শুধু যে পুরুষদের মনে নারী-সৌন্দর্যের একটি অবাস্তব প্রতিমূর্তি বা ‘মডেল’ তৈরি হয় তা-ই নয়, মেয়েদের মধ্যেও নিজের শরীর-সম্পর্কে, শারীরিক গড়ন-সম্পর্কে হীনম্মন্যতা জন্মায়, যাকে ‘বডি-শেমিং’ বলা হয়। জোর করে নিজের শরীরকে তন্বী করতে গিয়ে তারা জটিল অসুখ বাধিয়ে বসে, অথবা, নিজের রুচির বিরুদ্ধে গিয়েও, পোষাক-আশাকে ‘সাহসী’, ‘আধুনিক’ ও ‘দামী’ হয়ে ওঠার দুর্দম আকাঙ্ক্ষা জন্মায়। এদিক দিয়ে দেখলে, মিডিয়া-নির্মিত নারীত্ব ও সৌন্দর্যের ধারণাগুলিকে বলবৎ করার পেছনে মেয়েদের ভূমিকা যে একেবারেই নেই, এমন কথা বলা যায় না। নিজের অজান্তেই তারা, পুরুষের চোখে, আকর্ষক ভোগ্যপণ্য হয়ে ওঠার অবান্তর প্রতিযোগিতায় শামিল হয়ে পড়ে। এর মধ্যে দিয়ে, বর্তমান সমাজের ভিতরকার একটি স্ববিরোধও কি ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে না? একদিকে, সামাজিক অনুশাসন বলছে পোষাকের দ্বারা লজ্জানিবারণ করতে, আর অন্যদিকে, পণ্যসমাজের নয়া-অনুশাসন বলছে পোষাকের মাধ্যমে শরীরকে অধিকতর প্রদর্শনযোগ্য করে তুলতে। এই দুই বিপ্রতীপ প্রবণতার সামঞ্জস্যবিধান কীভাবে সম্ভব? এই দুই বিপরীত টানকে সামাল দিতেই কি মাঝখানে ঢুকে পড়ে ন্যায়, নীতি, সুরুচির মতো আপেক্ষিক ও গোলমেলে প্রশ্নগুলো? এভাবেই কি শুরু হয় এক অদ্ভুত খেলা, যেখানে সংক্ষিপ্ত পোষাকের শরীর-প্রদর্শনকেই রূপ-মুগ্ধতা বলে ভুল করতে থাকি; আর অন্যদিকে, অনুরূপ পোষাকে সজ্জিত কোনো মেয়েকে দেখামাত্রই, তাকে সহজলভ্য ও নীতিবিচ্যুত বলেও ধরে নিই?

প্রসঙ্গত মনে করিয়ে দিই, একসময়ে, বলিউডের ছবিতে নায়িকার পরণে থাকত শাড়ি, অথবা অনুরূপ কোনো “শালীন”, “ভারতীয়” পোষাক, আর ভ্যাম্পটি হত স্বল্পবসনা, কিংবা “পশ্চিমী” কেতায় সজ্জিত। যেন, এর অন্তর্লীন (subliminal) বক্তব্যটি এই যে, আদর্শ-নারীর দায়িত্ব নিজের যৌন-সৌন্দর্যকে পোষাকের আবরণে সম্পূর্ণ ঢেকে রাখা; যেসব নারী সহজলভ্যা, খোলামেলা পোষাকের ছলা-কলায় পুরুষকে আকর্ষণ করা কেবল তাদেরই সাজে।

পোষাক ও ধর্ষণ
যেহেতু পোষাক-সংক্রান্ত বিভিন্ন পূর্ব-নির্ধারিত ধারণা বা ‘স্টিরিওটাইপের’ সঙ্গে অবজেক্টিফিকেশনের যোগটা অস্বীকার করা যায় না, এবং যেহেতু অবজেক্টিফিকেশনের সঙ্গে ধর্ষক-মানসিকতা তৈরিরও একটা যোগসূত্র রয়েছে, ফলে মেয়েদের পোষাকের সঙ্গে ধর্ষণের সম্বন্ধস্থাপন করাটা দুরূহ নয়। কিন্তু যা-কিছু সহজ, তা যে সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ত হবেই, এমন কোনো বাধ্যবাধ্যকতা নেই। পোষাকের ক্ষেত্রে, যে-সামাজিক স্ববিরোধের কথা আগের অংশে উত্থাপন করেছিলাম, লক্ষ করলে দেখা যাবে, মেয়েদের অবজেক্টিফিকেশনের ক্ষেত্রেও, অনেকটা একই ধরণের স্ববিরোধ সমাজের ভেতরে-ভেতরে ক্রিয়াশীল। যে-মানুষ মেয়েদের পণ্য হিসেবে জেনে এসেছে বরাবর, নিছক যৌনপুতুল হিসেবে ভাবতে শিখেছে তাদের, সে-ও জানে, পণ্যায়িত নারীত্বের ধারণাটি সবার ক্ষেত্রে নির্বিচারে প্রয়োগ করা চলে না। নিজের মায়ের বা বোনের ক্ষেত্রে, এই ধারণাটিকে কিছুটা পালটে নিতে হয়। পালটে নেওয়া মানে কিন্তু উলটে দেওয়া নয়। এমন নয় যে, মাতৃস্থানীয় কোনো মহিলাকে, পুরুষমাত্রেই, নিজের সমকক্ষ ও সমান জ্ঞান করে। অবমাননা সেখানেও থাকে, কিন্তু তা চরিত্রগতভাবে অযৌন। এইসব নারী, পুরুষের অধীন হলেও, ঠিক সেই অর্থে সহজলভ্য নয়। নিজের সংসার আর স্বামী-সন্তানের বাইরে তাদের অন্য কোনো জগৎ নেই, যৌনতাবোধ নেই, কামনা-বাসনা নেই। খ্রীষ্টধর্মে, এই অযৌন-নারীত্বের চূড়ান্ত প্রতীক হলেন মাতা মেরী, যাঁর সন্তানধারণও যৌনতার কলুষ-স্পর্শ থেকে মুক্ত। ঠিক ইয়ুং-কথিত অর্থে না-হলেও, এটাও একধরণের “মাদার আর্কেটাইপ” বই কী!

এর বিপরীতে রয়েছে সেইসব নারী, যাদের সহজলভ্যতা, যাদের অপরিমিত কিন্তু গোপন যৌন-আকাঙ্ক্ষা পুরুষকে অহরহ প্রলুব্ধ করে, তাদের কামনাকে উস্কে দেয়। পুরুষের স্বপ্নে ও কল্পনায়, এরাই চিরন্তন বেশ্যা, চিরকালীন যৌনদাসী। খ্রীষ্টীয় ধর্মতত্ত্বের উপমায়, একে “দ্য গ্রেট হোর আর্কেটাইপ” বা “হোর অফ ব্যাবিলন আর্কেটাইপ” বলা যেতে পারে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অন্তর্গত ভারসাম্যটিকে বজায় রাখার জন্যেই এই দুই আর্কেটাইপের অবতারণা বলে মনে হয় আমার। যাতে, একদিকে, সংসারের কাঠামোটি অক্ষুণ্ণ থাকে, আর অন্যদিকে, পুরুষের যৌনকামনার নিবৃত্তির পথটিও যথাসম্ভব নিষ্কন্টক ও অবাধ হয়। লক্ষ করলে দেখা যাবে, সিরিয়ালে, সিনেমায়, বিজ্ঞাপনে, এই দুই আর্কেটাইপকে প্রতিনিয়তই উসকে তোলা হচ্ছে, নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে তাদের, আর দেগে দেওয়া হচ্ছে মানুষের মনে।

পুরুষের চোখে নারীর অবস্থানকে যদি একটি বর্ণালীর সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে সেই বর্ণালীর দুইপ্রান্তে রয়েছে দুই আর্কেটাইপ—মাতৃপ্রতিমা বনাম বেশ্যাপ্রতিমা। আর, মাঝখানে রয়েছে এই দুই আর্কেটাইপের সংমিশ্রণে জাত অন্য সম্ভাবনাগুলি। একটি মেয়েকে দেখে, বা তার সঙ্গে পরিচিত হয়ে, একজন পুরুষ তাকে এই মানদণ্ডটির সাপেক্ষে ততক্ষণাৎ মেপে দেখতে চায়, ও বুঝতে চায়, মানদণ্ডের ঠিক কোনখানে তার অবস্থান—সে কি ‘মা’ না কি ‘বেশ্যা’।

যেকোনো একতরফা বিচারের মতোই, নারীত্বের এই অবচেতন বর্গবিভাজনও ভ্রান্ত এবং একদেশদর্শী। অথচ, বিচারক পুরুষের কাছে এর সত্যতা সন্দেহাতীত। মেয়েটির পোষাক, সাজসজ্জা, আচার-ব্যবহার, অঙ্গভঙ্গী, কথাবার্তা, ধূমপান বা মদ্যপানের অভ্যাস—এই সবকিছুই তার কাছে অকাট্য সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। আর এর ভিত্তিতেই, সে বুঝে নেয় মেয়েটির স্বভাব-চরিত্র, তার সহজলভ্যতা, এমনকী তার অকথিত সম্মতিটুকুও। উপ্ত হয় সম্ভাব্য ধর্ষণের বীজ।

লক্ষ করুন, পোষাক এখানে একটা দুর্বল অজুহাত-মাত্র, একটি কাল্পনিক মানদণ্ডে মেয়েটিকে আঁটিয়ে নেওয়ার অন্যতম ফিকির। মেয়েটির পোষাক “শালীন” হলেই যে পুরুষের মানদণ্ডে তার স্থান অত্যুচ্চ হবে, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং, তখন কথা উঠবে তার মদ্যপান নিয়ে, তার রাত করে বাড়ি ফেরার কারণ কিংবা তার পুরুষসঙ্গীর উপস্থিতি নিয়েও। এবং এইভাবে মেয়েটির স্বাধীনতা—পোষাকের, চলাফেরার, জীবনযাপনের—খর্ব হতে হতে, হাতে পড়ে থাকবে পেনসিল, তবু ধর্ষণ কমবে না।

পুরুষের দায়, নারীর দায়
নারীশরীর দেখে কামনা জাগা অস্বাভাবিক নয়। বরং তা স্বাভাবিক জৈব প্রবৃত্তিই। কিন্তু, যেনতেনপ্রকারেণ সেই কামনা চরিতার্থ করতে যাওয়াটা অস্বাভাবিক। একটি মেয়েকে দেখে কামনা জাগা, আর মেয়েটির হাবভাব কিংবা পোষাকের রকম দেখে—তাকে সহজলভ্য ভেবে—তার ওপর জোর খাটাতে যাওয়া, এ-দুটো সম্পূর্ণ আলাদা প্রবণতা। ধর্ষণের পেছনে এই দ্বিতীয় মানসিকতার অবদান রয়েছে। রয়েছে নিজেকে নৈতিক উচ্চাসনে বসিয়ে, অপরপক্ষের “স্খলনের” শাস্তিবিধানের মানসিকতা। ধর্ষক ভেবে নেয়, সে-ই আসলে ঠিক, নারীটিই বরং লঙ্ঘন করেছে সমাজ-নির্দিষ্ট নিষেধের সীমাটি—“মা” থেকে “বেশ্যা” হয়ে উঠেছে সে। ফলে, সমাজের ভারসাম্যরক্ষার খাতিরে, মেয়েটিকে উপযুক্ত সবক শেখানোর দায়িত্ব পুরুষের ওপরেই বর্তায়। পুরুষ-প্রাধান্যের সামনে মেয়েদের সহজলভ্যতার এই ধারণাটিকে জোরদার করে, বিশ্বাসযোগ্য ক’রে তোলে অবজেক্টিফিকেশন। মোড়ক দেখে বস্তুর ব্যবহার্যতা নির্ধারণে বাধ্য করে আমাদের। এমতাবস্থায়, ধর্ষিতার পোষাককে ধর্ষণের কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া, আসলে ধর্ষকের মানসিকতাকে মান্যতা দেওয়া, বা অপরাধের পাত্রান্তরের (transference of guilt) অক্ষম প্রয়াস ছাড়া আর কিছু নয়।

বরং, আমরা যদি সত্যিই মেয়েদের ভোগ্যপণ্য হিসেবে ভাবা থেকে বিরত হতে চাই, তাহলে কি একথাই বারবার বলা উচিত নয় যে, পোষাক-আশাক যাই হোক, শেষ অবধি মেয়েটি একটি স্বতন্ত্র মানুষ? আর, তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার দাম দিতে আমরা বাধ্য? এমনকী, সে-মেয়েটি রূপোপজীবিনী হলেও এ-কথা খাটে?

বস্তুত, মেয়েদের শরীরকে পণ্য করে তোলার বিরোধিতা করতে হলে, তাকে নতুন করে বা নতুনভাবে ঢেকে নিতে বলার দরকার নেই। বরং, যেকোন অবস্থায়, যেকোন পোশাকে বা বিভঙ্গে, তাকে সহজলভ্য ভেবে নেওয়ার নিগূঢ় তাগিদটিকেই পরিহার করা প্রয়োজন। প্রশ্নায়িত করা দরকার মিডিয়া-নির্ধারিত সৌন্দর্যের এবং নারীত্বের ধারণাগুলিকে, প্রচলিত সমস্ত আর্কেটাইপ ও স্টিরিওটাইপকে। এবং সেটাই পণ্যসমাজের আসল বিরোধিতা—মোড়ক দেখে, বাইরের বাহার দেখে, তার মূল্য বা ব্যবহার্যতা বিষয়ে কোনো একপাক্ষিক সিদ্ধান্তে আসার বিরোধিতা। এই বিরোধিতার দায় শুধু পুরুষের একার নয়, বরং নারীর ওপরেও অর্শায়।



কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: দ

Re: ধর্ষণ ও নারীর দায়

এটা তুলে রাখি। শৌভ'র লেখা অখন্ড মনোযোগ দাবী করে। সময় নিয়ে পড়ব।
Avatar: Anonym

Re: ধর্ষণ ও নারীর দায়

ছ মাস থেকে ছ বছর, শিশুধর্ষন ও হত্যার ক্রমবৃদ্ধি কি শৌভ এই প্রবন্ধে আঁটাতে পারল? মনে হচ্ছে আর কয়েকটা অ্যাক্সিস/ডিগ্রি অব ফ্রিডম ঢুকবে।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন