বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

অন্য মেটিয়াবুরুজ - ২

সেখ সাহেবুল হক

আগের পর্বের পর

শাহজাদা থান্ডারের স্কুটি অপেক্ষা করছিলো সন্তোষপুর স্টেশনে। নামতেই শাহজাদাভাই সিগারেট বাড়িয়ে বললো - “তারপর খবর বলো সেলেবভাই, সব ঠিকঠাক?”। আমি পাল্টা বললাম গালাগালি দিচ্ছো কেন? শুধু ভাইটাই ঠিক আছে।

সোশাল মিডিয়ার সময়রেখা পেরিয়ে দ্বিতীয়বার দেখা। আজকের আড্ডার মজলিশ সেরে মেটিয়াবুরুজ ঘুরিয়ে দেখাবে বলেছে শাহজাদাভাই। শাহজাদা থান্ডার পড়াশোনা শেষ করে পৈতৃক ব্যবসা সামলাচ্ছে। শান্ত, ধীরস্বভাবের। ফটো তুলতে ভালোবাসে, জামাকাপড়ের ব্যবসাটাকে দারুণ জায়গায় নিয়ে যেতে চায়। ঠিকভাবে আলাপ হওয়ার আগে আমি বিশ্বাসই করতে পারতাম না মেটিয়াবুরুজে বসে শাহজাদা থান্ডার ফেসবুকে বেশ সুন্দর বাংলা লেখে। স্কুটিতে গল্প করতে করতে একসময় পুরকাইতদার বাড়ি পৌঁছেতেই স্থানীয় জনপ্রিয় লস্যির গ্লাস দিয়ে বরণ করে নেওয়া হলো। কিছু পরে জানতে পারা গেলো পুরকাইতদার ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় মাজার সংলগ্ন খারেজী মাদ্রাসার মাঠে বড় হাঁড়িতে(ডেগ) রান্নাবান্না হচ্ছে। দুপুরের জমিয়ে বিরিয়ানি-বোরহানি-বিফ চাঁপ-স্যালাড…।

সবাই প্রায় চলে এসেছেন দেখে পুরকাইতদার স্কুলের দোতালায় আড্ডা জমে উঠলো। দেশ, সমাজ, নোটবাতিল, গোরক্ষার পাশাপাশি ফেসবুকের বিভিন্ন মানুষ আলোচনায় উঠে আসতে লাগলেন। পুরকাইতদা শুধু ভোজনরসিক নন, কিংবা চরম অতিথিবৎসল বললেই তাঁর মূল্যায়ন সম্পূর্ণ হয় না। ক্রমশ ‘সামসুদ্দিন পুরকাইত’ সাহেবের কর্মকাণ্ডের আঁচ পাওয়া গেলো। বেশ কিছু বছর আগে বাচ্চাদের স্কুল গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন পুরকাইতদা। কিন্তু পর্যাপ্ত পয়সার অভাবে তা বাস্তবায়িত হতে পারছিলো না। এমন সময় দেবী লক্ষ্মীর মতো নিজের বিয়ের গহনা বন্ধক দিয়ে স্বামীর হাতে পয়সা তুলে দিয়েছিলেন পুরকাইতভাবী। সেই সুমহান সিদ্ধান্তের ফসল এই স্কুল। স্কুলঘরের দোতালায় বসে কথাগুলো বলতে বলতে পুরকাইতদার চোখে কিছু করতে পারার পরম তৃপ্তির জলকণা চিকচিক করে উঠছিলো। আচমকা ফ্যাকাসে হাসি সহযোগে বলে উঠলেন - “এই যে স্কুল, আপনাদের ভাবী ছাড়া সম্ভব হতো না। নিজের মুখে বলতে লজ্জা হয়। কিন্তু ও না থাকলে…”।

১৯৯৪ সালে পথচলা শুরু। দীর্ঘ বাধাবিপত্তি পেরিয়ে প্রায় ৩৫০ জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে দারুণভাবে চলছে। শিক্ষাবিস্তারের পাশাপাশি বেকার যুবকযুবতীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিয়েছে স্কুলটি।

সমাজসেবা এবং সাহিত্যচর্চাকে পুরকাইতদার মতো মানুষেরা উচ্চপর্যায়ে নিয়ে গেছেন। অনুভব, শব্দনগর, একত্র, বাঁশের কেল্লা প্রভৃতি পত্রিকার মাধ্যমে সাহিত্যচর্চার পরিবেশ বহুবছর থেকে চলে এসেছে। এলাকায় সরকা্রি অনুদানে নির্মিত পাঠাগার মোসলেম লাইব্রেরির উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। স্থানীয় কাজী ফয়জল নাসেরদের মতো সাহিত্যপ্রেমী মানুষদের নিয়ে সাহিত্যসভা বসে পুরকাইতদার স্কুলে। এঁনাদের বদান্যতায় আদ্যোপান্ত অবাঙালি এলাকা, এবং শুধুমাত্র গুটখার ছোপমাখা হিন্দির আগ্রাসন বলে চালাতে চাওয়া মতবাদের মুখে ছাই দিয়ে বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের চর্চা হয়ে চলেছে।

অতীতে আনন্দবাজারের পাতায় উল্লেখিত হয়েছে সেই কর্মকাণ্ড - “সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কলমকে হাতিয়ার করেছেন বাংলাভাষী সামসুদ্দিন পুরকাইত, মেটিয়াবুরুজ বড়তলায় সামসুদ্দিন ‘অনুভব’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন। এলাকারই প্রজাতি, আয়না, সাঁধের প্রদীপ, কাণ্ডারি বা আহ্বানের মতো অন্য লিটিল ম্যাগাজিনগুলিকে নিয়ে গার্ডেনরিচ-মেটিয়াবুরুজ সাহিত্য সংসদ গড়ে তুলেছেন। চাইছেন সমবেতভাবে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী মঞ্চ গড়ে তুলতে।

শিশুভারতী নামে একটি স্কুল চালান বছর পঁয়তাল্লিশের সামসুদ্দিন। নার্সারি থেকে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ুয়ার সংখ্যা প্রায় ১৭০। তাদের মধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। স্কুলে রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি শেখানো হয়, নিয়মিতভাবে হয় রবীন্দ্র নৃত্যনাট্য...।

বামিয়ানে বৌদ্ধমূর্তি উড়িয়ে দেওয়ার পরে মেটিয়াবুরুজে প্রতিবাদ সভা করেছিলেন সামসুদ্দিনরা।

চতুর্দিকের পরিস্থিতি দেখে সামসুদ্দিন বলেন - “ভালো লাগে না জানেন। জীবনে এত কাজ থাকতে লোকে কেন ধর্ম নিয়ে উন্মাদ হয়ে যায়?”।

এই উদারমনা মানসিকতার আবহে সামসুদ্দিন পুরকাইত একজন উদাহরণ মাত্র। তিনি সুস্থ চিন্তাভাবনার প্রতিনিধি। অবাঙালী সংস্কৃতির সমান্তরালে বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতি নিঃশব্দে লালিত হচ্ছে এখানকার মানুষের মধ্যে। অথচ কী নিদারুণ বিদ্বেষ, অপপ্রচারের কালো পর্দায় ঢেকে রাখা হয়েছে চারপাশ। বন্দর এলাকায় নানান অপরাধ, মাফিয়াবাজিতে অর্থনৈতিক কারণ, এলাকাদখল ইত্যাদি থাকতে পারে। কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সেখানে ধর্মের ছাপ লাগানোর প্রচেষ্টা হয়। পেইড মিডিয়া এবং প্রোপাগান্ডার গুজবে মেটিয়াবুরুজ মানুষের চোখে প্রায় নিষিদ্ধভূমি, এক শঙ্কাপূর্ণ বিচ্ছিন্ন কলকাতা। কেউ বলেন দাঙ্গাবাজির পীঠস্থান, কারো কাছে ক্ষুদ্র পাকিস্তানি সংস্করণ। এগুলো নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ। আমরা ঠিক যতোটা দেখতে চাই, ততটাই দৃষ্টিগোচর হয়। কেউ রাজনৈতিক স্বার্থ দেখেন, কেউ পিছিয়ে থাকা অংশের অশিক্ষা, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকে দোষারোপ করে নিজেদের ‘উন্নত’ প্রমাণ করতে চান, কারো কাছে ধর্মীয় রাজনীতির তাস মেটিয়াবুরুজ। কারো কাছে মেটিয়াবুরুজ ব্যবসার জায়গা, সন্ধেবেলা পেঁয়াজকুচি সহযোগে ঝালঝাল কাবাব, দিলদরিয়া মানুষজনের আড্ডা, সোশাল মিডিয়ায় অনুপম ভট্টাচার্যের আহ্বানে বিভিন্ন সময় রক্ত বা এস.ডিপি দানে এগিয়ে আসা যুবসম্প্রদায়।

মেটিয়াবুরুজকে আরো উদার এবং শিক্ষিত হতে হবে বলে অনেকে দাবি করেন। তাঁদের বক্তব্য যথাযথ এবং সময়োপযোগী। কিন্তু মেটিয়াবুরুজকে চিনতে হলেও একটা উদারতা লাগে, বিভেদকামী চিন্তাভাবনার চশমা খুলে ফেলতে হয়। মাছেভাতে বাঙালীকে বুঝতে হবে সুস্বাদু ইলিশেও কাঁটা থাকে। সন্তর্পণে বেছে খেতে হয়। তেমনি ভালোমন্দ নিয়ে একটি এলাকা। নানান কিংবদন্তী, ইতিহাস ঠাসা এই গার্ডেনরিচ-মেটিয়াবুরুজ নবাব ওয়াজেদ আলী শাহর বিচরণভূমি। বিরিয়ানি, ফিরনি, হালিম, কাবাবের বিবর্তন লুকিয়ে আছে। কুরবানির মাংসকে বহুদিন পর্যন্ত খাদ্যযোগ্য করে রাখার ঘরোয়া কায়দা খুঁজে পাওয়া যাবে ভোজনরসিক পরিবারে।

এতকিছুর মধ্যে জেগে থাকেন শিক্ষানুরাগী, জনদরদী সামসুদ্দিন। নাতনিকে পাশে বসিয়ে তিনি হয়তো পরিকল্পনা করছেন পুরুলিয়ায় মানবদরদী সংগঠনকে এই শীতে কতগুলি কম্বল পাঠাতে পারবেন, অথবা ভাবছেন ঝাড়গ্রামে বইপত্র দিয়ে আসা শবর বাচ্চাগুলো কেমন আছে…”।

আড্ডা দারুণভাবে জমে উঠেছিলো। ডাক পড়লো মধ্যাহ্নভোজনের। সবাই আস্তে আস্তে খাবারের টেবিলে সমবেত হলাম। ডেগের ঢাকনা খুলতেই বিরিয়ানির সুগন্ধে ভরে গেলো চারপাশ। সাদা জগে রাখা বোরহানি, রংবেরং স্যালাডে উঁকি দিচ্ছে লংকাকুচি। বিফ চাঁপের তেলতেলে মাংসের টুকরো ভাসছে স্টিলের গামলায়। থার্মোকলের প্লেট যেন সাজানো বাউন্ডারি। খেলা শুরু হবে। বাঁ হাতে ফোন সামলে মুহূর্তগুলোকে ধরে রাখছি। নাসেরদা সহজাত সেন্স অফ হিউমারের সৌজন্যে বলে উঠলেন - “একটা সমীক্ষায় জানা গেছে। খাওয়াদাওয়ার সময় ফোন ঘাঁটা মানুষদের ৬৩% দ্রুত মোটা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে…”।

খাওয়াদাওয়া, আড্ডা, ভালোবাসার আদানপ্রদান। এ যেন জীবনের অপার উৎযাপন। উপাসনাও বটে। মনে হচ্ছিলো একি সেই মেটিয়াবুরুজ? যেখানে নাকি অমুসলিমরা অত্যাচারিত হন বলে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা চলে। ঠিক তখনি দেবারতিদি, অনুপমদার অজান্তেই তাঁদের দিকে তাকিয়ে একবার হেসে নিলাম। এই হাসি বিজয়ের হাসি। অগুনতি অপপ্রচার, ভুয়ো ছবির ভিড়ে এই মানুষগুলোর বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছে মেটিয়াবুরুজ। কোমল আতিথেয়তা, আর নিখাদ আন্তরিকতায় মিশেল, সর্বোপরি ভালোবাসায় মোড়া অভিজ্ঞতা উপলব্ধি করেছি মেটিয়াবুরুজে, তার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিলো না। সন্ধেয় বাইকে করে মেটিয়াবুরুজে ঘোরা গেলে মন্দ হয় না। মাফিয়াবাজির গল্প, মেটিয়াবুরুজের জনপ্রিয় জামাকাপড়ের হাট, নানান খাওয়াদাওয়ার দোকান, আলোআঁধারি অপরাধপ্রবণ গলি, নানা ধরণের মানুষজনকে নিরীক্ষণের লোভ জাঁকিয়ে বসেছে। এসব ভাবছি আর আশপাশ থেকে আলু, মাংসের টুকরো, স্যালাড না চাইতেই পাশে এসে পড়ছে। গ্লাস ভরে যাচ্ছে বোরহানিতে। অল্প চুমুক লাগালাম। মন পড়ে আছে সান্ধ্যভ্রমণে, যত রাত হয় হোক। প্রয়োজনে শেষ ট্রেনে ফিরবো। মেটিয়াবুরুজ নিয়ে অজানা কৌতূহল ছড়িয়ে যাচ্ছে শিরা উপশিরায়…
(ক্রমশ)



61 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক 
শেয়ার করুন


Avatar: Prativa Sarker

Re: অন্য মেটিয়াবুরুজ - ২

দারুণ লেখা ! যেমন ঝরঝরে, তেমনি কন্টেন্ট। এরপরের বার আমিও যাব সঙ্গে।
Avatar: Spandan Samanta

Re: অন্য মেটিয়াবুরুজ - ২

বেশ সুন্দর লেখা, পার্ট ৩ এর অপেক্ষায় রইলুম ..
Avatar: Md Azharuddin

Re: অন্য মেটিয়াবুরুজ - ২

এককথায় দারুণ।

আমি প্রতিটা পর্ব পড়ছি দারুণ মনোযোগ দিয়ে। দিতে বাধ্য হচ্ছি।গল্প বলার স্টাইল বুঁদ করে রাখছে আমায়।

পরের পর্ব তাড়াতাড়ি চাই।


Avatar: Sk md makim

Re: অন্য মেটিয়াবুরুজ - ২

অসাধারণ লেখা। জবাব নেই।
Avatar: আয়েশা সুলাতানা

Re: অন্য মেটিয়াবুরুজ - ২

দারুন দারুন।
লেখার সাথে সামসুদ্দিন দাদার কথা জানতে পেরে ভালো লাগছে।
পরের অংশের জন্য অপেক্ষায় আছি।
Avatar: Sk ImtiazUddin

Re: অন্য মেটিয়াবুরুজ - ২

মেটিআব্রুজ এ 14 বছর ধরে যাচ্ছি , ওকালতি কারণেই যাওয়া , কখনও কোর্টের কমিশনার হয়েও গেছি । এখন কার মেটিআব্রুজ অনেক উন্নত , মেয়েদের মধ্যে লেখাপড়ার হার অনেক বেড়েছে , কিছু ছেলেপুলে বিগড়ে যাওয়ার কারণ একটাই ,সেটা হলো অল্প বয়সে হাতে কাঁচা টাকা আসা , আসলে কেউ বসে থাকেনা ওখানে বেকার হয়ে , কিছুনা কিছু কাপড়ের যোগানের কাজের বন্দোবস্ত হয়েই যায় ।
এরকমও ব্যাবসায়ী দেখেছি যারা এখানে থেকে সব ব্যাবসা দুবাই যে তুলে নিয়ে যাওয়ার দম রাখে । মেটিআব্রুজ এর একটা প্রাণ আছে ,আতিথেয়তা আছে আর আছে আল জাফরান বলে বিরিয়ানির রেস্টুরেন্ট , সেটা আমার এক ক্লায়েন্ট বাবলু দার ।
সাহেবুল এর চোখে আরোও নতুন মেটিআব্রুজ চেনার অপেক্ষায় রইলাম ।
Avatar: shahzada thander

Re: অন্য মেটিয়াবুরুজ - ২

অনেক ভালবাসা নিও সাহেবুল ভাই।।❤
Avatar:  রুখসানা কাজল

Re: অন্য মেটিয়াবুরুজ - ২

বাংলাদেশের চেনাজানা একজন, তার পূর্বপুরুষের কবর আছে মেটিয়াবুরুজে। পড়ছি, জানছি। শুভেচ্ছা লেখকের জন্যে।
Avatar: রুকু

Re: অন্য মেটিয়াবুরুজ - ২

দারুণ :)
Avatar: Sumita Sarkar

Re: অন্য মেটিয়াবুরুজ - ২

আমি খিদিরপুরে শরৎ চন্দ্র পাল উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে বাংলা পড়াই। আমি মেটিয়াবুরুজের ওই স্কুলটির সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাই। কীভাবে করব?
Avatar: Sumita Sarkar

Re: অন্য মেটিয়াবুরুজ - ২

সামসুদ্দিন পুরকাইতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাই।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন