বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

রবিশংকর বল ও স্বপন সেন ... এক মিনিট নীরবতা

অমর মিত্র

গত ১২ই ডিসেম্বর আমার তরুণ লেখক বন্ধু রবি চলে গেছে। আমি রবির লেখা পড়তে ভালবাসতাম। আলাদা লেখা। গভীর অনুভূতিময় লেখা। গল্প উপন্যাস কত রকমে লেখা হয়। ওর লেখার ভিতরে পাঠ অভিজ্ঞতার বড় ভূমিকা। সঙ্গে নিজের পরিবার,মা-বাবা,এই শহর,ছেলেবেলা ... এইসব। ওর অনুভূতিপ্রবণ গদ্য আমাকে আবিষ্ট করত। রবি নিচু গলায় কথা বলত। ওর লেখা নিম্নস্বরের। কখনো উচ্চকণ্ঠে কথা বলেনি রবির গল্পের চরিত্ররা। ব্যর্থ মানুষ তারা। কিন্তু স্বপ্নজীবী। রবির লেখায় ১৯৪৭-এর দেশভাগ ঘুরে ঘুরে আসত। কীভাবে আসত? অনেক গভীর থেকে ফিরে আসত মায়ের বেদনা,বাবার কষ্ট,খিন্ন জীবনের কথা। রবির একটি উপন্যাসে দণ্ডকারণ্য পেয়েছিলাম। দণ্ডকারণ্যের কলোনিবাসী জেঠামশায়ের কাছে গেছে মণিময়। দূর বরিশাল থেকে উচ্ছিন্ন হয়ে সেখানে তাঁদের শেষ আশ্রয়। নিরুপায় মানুষ। এ জীবন ফড়িঙের নয়,দোয়েলের নয়। এ জীবন কিছু ভাঙাচোরা মুখের সঙ্গে আত্ম-বন্ধনের। বার বার রবি এই লেখাই যেন লিখেছে। কী অসামান্য এই দেখা,এই ছোঁয়া।

রবির আগে আমার আর এক বন্ধু লেখক স্বপন সেন চলে গেছে। গত ২০১৭-র ফেব্রুয়ারিতে নিঃশব্দে। তার কথাও বলি। স্বপন আর রবি দুই বন্ধু। ওদের সঙ্গে আমার আলাপ এক সময়েই।

গত অক্টোবরের কথা বলি। স্বপন চলে গেছে যখন আট মাস আগে। আমরা কেউ জানতাম না। নিঃশব্দে। তার স্ত্রী কাউকে জানায়নি। চেতলা থেকে কেওড়াতলা শ্মশান বেশি দূর নয়। আদি গঙ্গা পেরিয়ে এলেই হয়। সেতু আছে। স্বপনকে দাহ করে তাঁরা বসতিতে ফিরে গিয়েছিলেন। স্বপনের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। লিখত না কিংবা ওর লেখা ছাপা হতো না। এইরকম হয়। কতজন অনেক স্বপ্ন নিয়ে লিখতে আসেন। তারপর সেভাবে কিছু করে উঠতে পারেন না। লেখার জন্য ত্যাগ করেও শেষ অবধি প্রাপ্তি কিছুই না। হয়তো তার লেখা সেভাবে গ্রহণ করেনি পাঠক। তবুও স্বপন লিখত। ছোট পত্রিকায় তাঁর লেখা ছাপা হত। বয়স হয়ে যেতে কর্মস্থল থেকে বিদায়। পেনশন ছিল না। বেশি বয়সে চাকরিতে ঢুকেছিল। সামান্য চাকরি। বেতন বেশি নয়। ফলে অবসরের পর হাতে তেমন কিছুই আসেনি যা দিয়ে বাকি জীবন ভালোভাবে চলে যেতে পারে। আর এক জায়গায় ঢুকল হাজার দশেক টাকা বেতনে। খুব খাটনি স্বপনের। এই অবধি আমার জানা ছিল। না,আরো বেশি জানা ছিল। কী? স্বপন আরম্ভ করেছিল সাড়া জাগিয়ে। সেই ৩৫-৩৭ বছর আগে নিজের পয়সায় একটি গল্পের বই,পুস্তিকা প্রকাশ করেছিল - ঝুপড়ির বাসিন্দা। তার ভিতরে অসামান্য দুটি গল্প ছিল,'ঝুপড়ির বাসিন্দা','গলিত শবদেহ'। এর পরে স্বপন লিখেছিল 'বুলগানিনের ব্যবসা :একটি পক্ষপাতমূলক অনুসন্ধান'। আলাদা গল্প। সমাজকে তীব্র কষাঘাত। স্বপন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন জানত। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু জানত। বলত,লেখকের প্রকৃত জীবন অমন। মনে হত ওর ভয় হয় না? স্বপন আমার চেয়ে কয়েক বছরের ছোট। স্বপনের বন্ধুরা কেউ কবিতা লিখত,কেউ গল্প। এক বন্ধু খ্যাতিমান হয়েছে লিখে। এক বন্ধু কবি এবং অধ্যাপক। আর এক বন্ধু উকিল। এক বন্ধু বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ করে সফল। দেশবিদেশ ঘুরে বেড়ায়। স্বপন একটি ফ্যাক্টরিতে চাকরি করত প্রথম জীবনে। সেই ফ্যাক্টরি বন্ধ হল,কিন্তু কোম্পানি বলল স্বপনের চাকরি আছে। সে সুপারভাইজার হয়ে অন্য ফ্যাক্টরিতে যাক। ভাল মাইনে। স্বপন এল বন্ধুদের কাছে। তারা হাঁটতে হাঁটতে লেকের ধারে বসল। স্বপন বলল, 'তোরা যা বলবি,আমি তাই করব,আমাকে মালিক বেশি মাইনেতে অন্য কোম্পানিতে নিচ্ছে,আমার কি উচিত হবে এই অফার নেওয়া? কতজনের কাজ গেল। আমি মালিকের দালাল হয়ে যাব?'

বন্ধুরা স্বপনের চেয়ে ছোট বয়সে। তারা সকলে ভাবে বিপ্লব হবে। মানুষের সুদিন আসবে। স্বপন তুই রিফিউজ কর। স্বপনের বাড়িতে হাঁড়ি চড়ে না নিত্য। অভাব লেগে আছে। তা হোক,স্বপন লেখক। লেখক কেন মালিক পক্ষের লোক হবে? স্বপন বলল, 'তাহলে প্রত্যাখ্যান করছি'। তাই-ই করল। বন্ধুরা এরপর চাকরি পেতে থাকে। তারা কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। স্বপনের বয়স বেড়ে যেতে থাকে। শেষে বেশি বয়সে ছোট চাকরিতে ঢুকল। প্রুফ দ্যাখে। চাকরি পাকা নয়। যাই হোক,স্বপনের অদম্যতার শেষ নেই। এক জায়গা থেকে বই বের করল গল্পের। যে ছিল প্রকাশক তাকে অনেক গ্রাহক জোগাড় করে দিয়েছিল স্বপন। গ্রাহক বেশিরভাগ স্বপনের পরিচিত বন্ধুরা। প্রকাশক আগাম টাকা পেয়েও সেই বই বের করল দু-তিন বছর বাদে। আর গ্রাহকদের বই দিল না। স্বপন বলবে কী? সে ছিল শান্ত প্রকৃতির,নম্র স্বভাবের মানুষ। বইটি মানের দিক থেকে ছিল ভাল। স্বপনের প্রথম বয়সের সব গল্প ছিল তার ভিতরে। আর একটি বই বেরিয়েছিল স্বপনের। 'মুখোস যোদ্ধা'-উপন্যাস। যে পত্রিকা ছেপেছিল উপন্যাসটি সেই পত্রিকাই বই করে। বিদগ্ধ পাঠক 'মুখোস যোদ্ধা'র সুনাম করেছিল। কিন্তু স্বপন সেই উপন্যাসের জন্য একটি পয়সাও পায়নি। এরপর 'নির্বাচিত ২৫' প্রকাশ করে এক প্রকাশক। এখানেই শেষ। স্বপন কবে বিয়ে করেছিল আমি জানি না। আমার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না সেই সময়টায়। মাঝে মধ্যে তার সঙ্গে দেখা হতো তার অফিসে। ঘাড় নিচু করে প্রুফ দেখে যাচ্ছে। ডাকলে উঠে এসে কথা বলত। ওর গল্পের বই নিয়ে আমার পত্রিকায় একটি রিভিউ লেখালাম ওর অধ্যাপক বন্ধুকে দিয়ে। স্বপন খুব খুশি। এমনি দিন যায়। এক সন্ধ্যায় আমার উত্তর কলকাতার বাড়ির সামনে আচমকা দেখি স্বপনকে। কোথায় এসেছিলে স্বপন? আমার বাড়ি আসবে না? 'না দাদা,এ পাড়ায় একজন কবিরাজ থাকেন। তাঁর কাছে ওষুধ নিতে আসতে হয়। ফিরব চেতলায়। রাত হয়ে গেছে।' কার জন্য ওষুধ? স্বপন বলল,তার ছেলের জন্য। ছেলেটি অসুস্থ। তার সাধ্যমতো চিকিৎসা করিয়েছে। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। একজন এই কবিরাজের সন্ধান দিয়েছে,দেখা যাক। এর কিছুদিন বাদে আমার এক লেখক বন্ধু ফোনে বললেন,স্বপন খুব অসুস্থ। পিজি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। কিছু টাকা দিতে পারলে ভাল হত। আমরা টাকা তুললাম স্বপনের জন্য। কেউ দিল,কেউ দিল না। হাসপাতালে গিয়ে ওর স্ত্রীর হাতে দিয়ে এলাম। স্বপন ফিরল হাসপাতাল থেকে। তারপর অবসর। আর এক জায়গায় ঢোকা। পুত্র আর স্ত্রী নিয়ে সংসার প্রতিপালন করতে হবে তো লেখককে। এই অবধি জানা ছিল। স্বপন আছে জানতাম। পুজোর পর এক বন্ধু ফোন করল,তুমি কি জানো,স্বপন আর নেই। গত ফেব্রুয়ারিতে মারা গেছে। নিঃশব্দে চলে গেছে। তার স্ত্রী কাউকে জানায়নি। এমনকী রবিকেও না। রবিকে আমি ফোন করলাম খবর নিতে,তুমি কি জানো রবি,স্বপন বেঁচে নেই? সে জানত না। একটু বাদে ফোন করে আমাকে বলল,সত্য। স্বপনের খবর তার জানা ছিল না। বাড়িতে ফোন করে জানল এখন। কোনো বন্ধুই জানে না। বিকাশ,সর্বজিত,ভাস্কর,অদীপ কেউই না। কাউকে জানায়নি ওর স্ত্রী। অসুস্থ সন্তান নিয়ে সে বেঁচে আছে। সেই জানার দু'মাসের মাথায় ডিসেম্বরে রবি চলে গেল। লেখক রবিশংকর বল। স্বপন সেনের সঙ্গে নিশ্চয় তার দেখা হয়েছে। অনুজপ্রতিম দুই বন্ধু চলে গেছে। বাইরে বসন্ত আসছে। নতুন পাতা ফুটছে শালবনে। চারদিকে নতুন জীবনের গন্ধ। আমি লিখছি এই শোক গাথা। হায়!

রবিকে চিনতাম প্রায় বছর চল্লিশ ধরে। আমাদের কবিপত্রর আড্ডায় রবি এসেছিল হাফ প্যান্ট পরা এক সদ্য যুবক। তারপর থেকে রবির সঙ্গে যোগাযোগ ছিলই। শেষ দেখা অক্টোবরের শেষে তানভীর মোকাম্মেলের ছবি সীমান্তরেখার প্রদর্শনে। গোর্কি সদনে। আমরা পাশাপাশি বসেছিলাম। দেখলাম রবি খুব রোগা হয়ে গেছে। জীর্ণ। চোখমুখে মলিনতা। বলল,ও পুজোয় মুসৌরীর দিকে গিয়েছিল। কী অসামান্য প্রকৃতি! তার শরীর ভালো হয়ে যাচ্ছে। গল্প উপন্যাস নিয়ে কথা হলো। আমি কথা সোপান পত্রিকায় অনুবাদ সংখ্যার পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে ও আমাকে বলল, ব্রাজিলের লেখক ক্ল্যারিস নিস্পেক্টার-এর একটি গল্প আমাকে অনুবাদ করে দেবে। গল্পটি অনুবাদ করে পাঠাল দিন পনেরোর মধ্যে। হাতের লেখা এল। স্ক্যান করে মেল। এরপর ফোনে কথা হতে থাকে। ওকে আমি ন'মিনিটের একটি ছবি পাঠালাম মেল করে। দেখে আমাকে ফোন করল। অনেক কথা বলল। তারপর একটি লেখার কথা বলল। লিখবে। লেখাটা হয়নি। এই পর্ব নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ অবধি চলল। তারপর আর যোগাযোগ নেই। যোগাযোগ হলো হাসপাতালে। ঘুমিয়ে আছে হাসপাতালের বেডে। শীতের ভোরে সেই শেষ দেখা। ব্যারাকপুরের সীমান্ত গুহঠাকুরতা খবর দিয়েছিল ভোর পাঁচটায়। যখন আমি রবির সঙ্গে দেখা করতে গেলাম, তখন শীতের শহরের ঘুম প্রায় ভাঙেইনি। রবিও ঘুমিয়ে। অনন্ত নিদ্রা। এই নিদ্রায় স্বপ্নজীবীর স্বপ্ন নেই।

আমি রবির দুটি গল্পের কথা বলি, 'মধ্যরাত্রির জীবনী' এবং 'অশ্রু ও ঘামের গন্ধ'। আসলে পার্টিশন জীবনকে কত ধূসরতার ভিতরে প্রবেশ করিয়েছিল,উদ্বাস্তু জীবন কত মর্মবেদনার হতে পারে রবি তা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আঁচড়ে আঁকত। ওর গল্প ওর উপন্যাসে কলকাতা শহরের বড় ভূমিকা। মধ্যরাত্রির যে সন্তান,তারই জীবনী যেন লিখে গেছেন রবিশংকর বল। মধ্যরাত্রির জীবনী গল্পে আচমকা চাকরি ছেড়ে মায়ের কাছে, সেই পুরনো ধ্বস্তপ্রায় ভাড়া বাড়িতে। কেন এল ফিরে? সে শহরকে ছেড়ে থাকতে পারছিল না। আর স্বাধীনতা চাইছিল বিতান। গল্প থেকে একটু অংশ বলি -

"নীহারিকা চেয়ে থাকলেন বিতানের দিকে। তিন হাজার বছরের কত আঁকিবুকি মুখে নিয়ে বসে আছে তার ছেলে। বিতানের দিকে তাকালেই তাঁর মনে পড়ে নিজের বাবার কথা। সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কয়েক বছর পরেই... ভারত-পাকিস্তান হয়ে যাওয়া... দূরে কাছে যখন কেবল গ্রামপতনের শব্দ... মূল্যবোধ আর নৈতিকতা যখন বুকটাকে দুফালি করে ভেঙেচুরে যাচ্ছে... তার বাবা তখন সুবচনীর খোঁড়া হাঁসের মতো মানস সরোবরের স্বপ্নে ডানা ঝাপটাচ্ছেন। রোগা,ছ-ফুট লম্বা,গৌরবর্ণ তার বাবা শহরের রাস্তায় রাস্তায় হাঁটতেন। কথা বলতেন খুব কম। ধীরে। একদিন বলেছিলেন,রাজনীতি কখনো মানুষের হৃদয়ের জিনিস নয়...

তবু রাজনীতি ছাড়া মানুষ আর কী নিয়ে লড়বে? কেউ প্রশ্ন করেছিল তখন। বাবা এর কোনো উত্তর দিতে পারেননি। সময়ের নানা বিভ্রান্তি এভাবেই আলাদা করে দিচ্ছিল সকলের থেকে,হয়তো নিজের হৃদয়ের থেকেও। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে থেকে তিনি লিখছিলেন আত্মজীবনী,যা অসমাপ্ত,এখন নীহারিকার ট্রাঙ্কে, ন্যাপথলিনের গন্ধের ভিতরে। তার বাবা বলতেন,ও জীবনী আমার নয়... আমার নয়...

তাহলে কার?

মধ্যরাত্রির। বাবা কি শেষকালে পাগল হয়ে যাচ্ছিলেন? নীহারিকা জানেন না। বিতানও কি তবে মধ্যরাত্রির সন্তান?

এই বাড়িটায় আর থাকতে ইচ্ছে করে না। বিতান শুনল,নীহারিকার গলার ভিতরে প্রাচীন বালি ঝরছে।

কেন?

কতদিন কোথাও যাইনি।

বেড়াতে যাবে?

না। মানুষ তো নতুন-নতুন বাড়ি বদলায়...

ভালো বাড়ির লোভ হয় বুঝি?

হৃদয়পুরের দিকে একটা জমির সন্ধান পেয়েছি...

বিতান চুপ করে থাকল। মার জিজ্ঞাসার ধরন কি এইরকম? এত স্বপ্নাভাসের মধ্য দিয়ে? চাকরিটা সে এমন আকস্মিকভাবে ছেড়ে দিল কেন... মা তবু সহজে জিজ্ঞেস করতে পারে না তাকে। সহজ জিজ্ঞাসার রক্তপাতে তারা কেউ... এই মা আর ছেলে,বিতান আর নীহারিকা দীর্ণ হয়নি কখনো,তবু স্বপ্নে তো আমরা এখনও কথা বলি, বিতান ভাবল।

আকাশ দেখছিল বিতান। তার ছেলেবেলার সেই আকাশ আর নেই। ভাড়াবাড়ির একতলার ছাদে দাঁড়িয়ে রাতের আকাশ দেখতে-দেখতে ভাবছিল বিতান,আকাশ,সমুদ্র সবকিছুই বদলায়। মাতৃত্বের সংজ্ঞা বদলায়। গন্ধের শরীর একসময় শুধু গন্ধের স্মৃতি হয়ে যায়। নীহারিকার কথা ভেবে বিতানের গলার কাছে সূক্ষ্ম ব্যথার কুণ্ডলী পাকিয়ে ওঠে। কী অসহায় তুমি নীহারিকা,যেন কুন্তীর মতো তুমি আজ আমার সামনে এসে দাঁড়ালে... ভ্রূণের সন্তানের পরিচয় এভাবেই বদলে যায়।"

এই এক লেখাই যেন লিখেছে রবি তার এইটুকু জীবনজুড়ে। 'ঘুম আর অশ্রুর গন্ধ' গল্পে বস্তির ঘরগুলি পরপর তালা বন্ধ পড়ে আছে। একজন এসেছে বহুদিন বাদে। তালা খুলে একটি ঘরে প্রবেশ করেছে। গল্পটি এক জানালার। ঘর ভর্তি ধুলো,ময়লা,চৌকিতে বইয়ের স্তূপ,কাগজের টুকরো। সে একদিন এই ঘরে থাকত। এখন থাকে না। ফিরেছে। জানালাটি খুলে দেয়। দেখল একটি অপরাজিতা ফুলের গাছ লতিয়ে উঠেছে জানালার মরচে ধরা শিক পর্যন্ত। সে জানালা খুলে ঘর বন্ধ করে বেরিয়ে আসে। ফুলটিকে দেখার জন্য চোখদুটিকে যেন ঘরে রেখে অন্ধ হয়ে শহরে। ফুল থেকে ঘুম আর অশ্রুর গন্ধ পেয়েছিল নাকি সে?

"সে তাই জানলাটা খোলা রেখেই ঘরে তালা লাগাল; পিছন ফিরে কেন অপরাজিতার লতার দিকে তাকায়নি তা সে-ই জানে। বা হয়তো সে জানত,এ জন্মের চোখদুটি সে ওই ঘরের ভিতরে রেখে এসেছে,যারা দিনের পর দিন অপরাজিতা লতার বেড়ে ওঠা দেখবে,আর সে-ই অন্ধ হয়ে এই শহরের রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে যাবে। অসুবিধে তো নেই,সব রাস্তাই তার চেনা;শুধু সে জানে না,কবে,কখন জানলার পাশে জন্ম নিয়েছিল অপরাজিতার লতা। সে দিন রাতেই অপরাজিতার লতা ভাবছিল,লোকটা কে? এভাবে জানলাটা হাট করে খুলে দিয়ে গেল... নাকি ভুলে গিয়েছে? কষ্ট হয়,ঘরটার ভিতরে তাকাতে বড় কষ্ট হয়... সারাক্ষণ শুধু ঘুম আর অশ্রু গন্ধ ভেসে আসে।"

ইসলামি সংস্কৃতিতে রবির প্রধান আকর্ষণ ছিল। দোজখনামার পর ক্রমশ আরো আত্মস্থ করছিল সে। দোজখনামা এবং আয়নাজীবন দুই উপন্যাসে ছিল অভিজ্ঞতা,অবশ্যই পাঠের। দোজখনামা উপন্যাসটি দেশভাগের। দোজখনামা সাদাত হোসেন মান্টোর জীবন। মহাকবি গালিবের জীবন। ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহে পরাজয়ের পর এদেশের মানুষের পাকাপাকিভাবে পরাধীনতায় প্রবেশ। দোজখনামা এক বেহেস্তের দোজখ হয়ে যাওয়ার কাহিনি। দোজখ থেকে বেহেস্তের কল্পনা। এই উপন্যাসটির বহু মাত্রা আছে। আর বহুমাত্রার জন্য এই উপন্যাস কখনোই মনের ভিতরে গিয়ে শেষ হয়ে যায় না। দোজখনমা আমি পড়েছি বছর কয় আগে,গ্রন্থাকারে প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে। কোনো-কোনো পাঠ হয়ে ওঠে ধারাস্নান। সেই ধারাস্নানের অভিজ্ঞতা এখনও মিলিয়ে যায়নি। দোজখনামা নিয়ে ধারাস্নানের সেই অভিজ্ঞতার কথাই আবার বলতে বসেছি।

আসলে উপন্যাস কতরকমে লেখা হতে পারে সেই কথাটি মনে করতে চেষ্টা করি। কেউ কেউ উপন্যাসের রসদ জোগাড়ে স্থান থেকে স্থানান্তরে যাত্রা করেন। সবকিছু আগেই ঠিক করে নেন। জলঙ্গীর বন্যা নিয়ে লিখবেন কি বীরভূমের কোনো এক জনগোষ্ঠী নিয়ে লিখবেন। তথ্যই সেই লেখার মূল আধার। তথ্য জানায় ভুল থেকে গেলে,সেই ভুলই উপন্যাসে চলে আসে। আর কেউ কেউ লেখেন জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা নিয়ে। আর যাপিত জীবনে থাকে কতরকম অভিজ্ঞতা। পাঠ অভিজ্ঞতা তার ভিতরে প্রধান। প্রধান হয়ে আসে কল্পনা। রবিশংকর বলের দোজখনামা দ্বিতীয় গোত্রের উপন্যাস। তিনি কী আশ্চর্য এক কল্পনার দুয়ার খুলেছেন ক্রমান্বয়ে,এই উপন্যাসের পরিচ্ছেদে পরিচ্ছেদে। এই উপন্যাসের দুই প্রধান চরিত্র,মহাকবি গালিব এবং মহালেখক মান্টো ভারত ও পাকিস্তানের মাটির নীচে,কবরে শুয়ে আছেন। তারা যেন মাতৃগর্ভের অন্ধকারে শুয়ে পরস্পরে আলাপ করেন। দিল্লি আর লাহোরে শুয়ে গালিবের সঙ্গে কথা হয় মান্টোর। সেই কথোপকথনের ভিতর দিয়েই উপন্যাসের বিস্তার। এই আশ্চর্য কিসসা লেখা হয়। কিসসা তো এই দুনিয়ায়। এই জল মাটি আর পৃথিবীর,উপরওয়ালার। গালিব বলছেন তাঁর বান্দা কাল্লুর কথা। তখন ১৮৫৭-র বিদ্রোহ শেষ। তারপর আরও ১২ বছর বেঁচেছিলেন তিনি। কিন্তু চুপ করে থাকতেন জীবন সায়াহ্নে এসে। ভাঙাচোরা দিবানখানায় শুধু শুয়ে থাকতেন,কাল্লু এসে একটু পরোটা, কাবাব বা ভুনা গোস্ত আর দারু দিয়ে যেত। কাল্লু খুব ভালো কিসসা বলত। জামা মসজিদের চাতালে বসা দস্তানগোর পাশে বসে কিসসা শুনত। সেই কিসসা সে বলে বেড়াত। দস্তানগোরদের কাজই ছিল মানুষকে কিসসা শুনিয়ে রোজগার করা। এই উপন্যাসে রবিশংকর বল হলেন দস্তানগো। এই উপন্যাস একটি দস্তান। কিসসা। সেই কিসসা কে লিখছেন এখানে? মান্টো বলছেন তিনি লিখছেন না তাঁর ভূত? মান্টো তাঁর সমস্ত জীবন একটি মানুষের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন,মির্জা মহম্মদ আসাদুল্লা খান গালিব। মান্টোর মনে হয়েছে মির্জা আর তিনি যেন মুখোমুখি দুটি আয়না। দুই আয়নার ভিতরেই শূন্যতা। দুই শূন্যতা একে অপরের দিকে তাকিয়ে বসে আছে।

কিসসায় এক কাহিনির সঙ্গে আর এক কাহিনি জুড়ে যায়। তার কোনো শেষ নেই। এই উপন্যাস আরম্ভ হয় লখনউ-এর ওয়াজিরগঞ্জে এক কিসসা লেখক ফরিদ মিঞার মুখে মুখে। লেখক লখনউ গিয়ে ফরিদ মিঞার সঙ্গে দেখা করেন নানা সূত্রে তাঁর কথা জানতে পেরে। তিনি লখনউ গিয়েছিলেন তবায়েফদের নিয়ে একটি লেখার খোঁজে। লিখেই তাঁর দিন চলে,তিনি তো যাবেনই লেখার খোঁজে। ফরিদ মিঞা হলেন এক কিসসা লিখিয়ে। লিখতেন,কিন্তু ছেড়ে দিয়েছেন লেখা কেন না কিসসা লিখিয়েকে বড়ো একা হয়ে যেতে হয়। তার জীবন কারবালা হয়ে যায়। ছায়া ছায়া মানুষের সঙ্গে কাটাতে হয় জীবন। সেই ফরিদ মিঞা এই দস্তানের কথক বা দস্তানগোর হাতে তুলে দেয় নীল মখমলে মোড়া একটি পাণ্ডুলিপির পুঁটুলি,উর্দুতে লেখা একটি উপন্যাস,লিখে গেছেন সাদাত হোসেন মান্টো। মান্টোর লেখা এই অলীক উপন্যাস মির্জা গালিবকে নিয়ে। কথক উর্দু জানেন না,কিন্তু ফরিদ মিঞা তাকে দিয়েছে পাণ্ডুলিপি অনুবাদ করে প্রকাশের জন্য। তিনি কলকাতায় ফিরে উর্দু শিখতে যান। তবসুমের কাছে। তবসুমের কাছেই জানে উপন্যাসে একটি ভূমিকা আছে মান্টোর,১৮ই জানুয়ারি ১৯৫৫ সেই ভূমিকা লিখনের তারিখ,যে তারিখে ইন্তেকাল হয়েছিল মান্টোর। তখন তিনি লেখার অবস্থায় ছিলেন না। রোগজর্জর হয়েই পাকিস্তানে মারা গিয়েছিলেন মান্টো। সেই উপন্যাসই বুঝি এই দোজখনামা। দোজখের কিসসা। রবিশংকর বল এই আশ্চর্য উপন্যাস লিখেছেন এক বিচিত্র আঙ্গিকে। আসলে যে কোনো আখ্যানের মূল শক্তি তার লিখন ভঙ্গি,লিখন প্রক্রিয়া,আঙ্গিক। রবি লিখবেন গালিবের জীবন বা মান্টোর জীবন। তিনি তার কথন ভঙ্গিতেই আমাকে নিয়ে গেছেন ফরিদ মিঞা বা তার চারপাশে ঘোরা ছায়া ছায়া মানুষের ভিতর। মান্টো আরম্ভ করেন আলাপ। গালিবের পূর্ব-পুরুষকে স্মরণ করেন। একটি ধুলোর ঝড়। অশ্বারোহীরা নদী পেরিয়ে আসছে সমরখন্দ থেকে। সূর্যের আলোয় ঝলসাচ্ছে তাদের ঘুরন্ত তরবারি। হত্যা আর রক্তের কারবালা পেরিয়ে তারা আসছে ভারতবর্ষের দিকে। নিজে কোনোদিন তরবারি স্পর্শ করেননি মির্জা গালিব,কিন্তু তাঁর পূর্বপুরুষ ছিল তুর্কি সৈনিক। বিভক্ত হয়ে যাওয়া দেশের পশ্চিম পাকিস্তানের শহর লাহোরের মাটির নীচে শুয়ে মান্টো এইভাবে শুরু করেন গালিবের কথা। মান্টো পাকিস্তানে যাওয়ার আগে বোম্বে টকিজের গালিবকে নিয়ে তৈরি একটি সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। সেই সিনেমা রিলিজ যখন করে,মান্টো ওপারে। গালিব এবং মান্টো দুই মহাপ্রতিভাধরের জীবন এই উপন্যাস। মান্টোর সঙ্গে আলাপে গালিব নিজের জীবনের কথা স্বপ্নের কথা,ধুলো হয়ে যেতে থাকা জীবনের কথা শোনান। মান্টোও তাই। এই দুই প্রতিভাধরের জীবনের সঙ্গে যেন এই উপমহাদেশের ইতিহাস জড়িয়ে গেছে। ১৮৫৭-র সিপাহী বিদ্রোহ,মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের শব্দ,আর ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা,দাঙ্গা রক্তপাতে কারবালা হয়ে যাওয়া এই উপমহাদেশ,দুই সময়ের সাক্ষী দুই নিয়তিতাড়িত মানুষ। এই উপন্যাস ইতিহাসের দুই সন্ধিক্ষণের ভিতর যেন সেতু নির্মাণ করেছে। অতীত থেকে ভবিষ্যতকে দেখা। বর্তমান থেকে অতীতে ফিরে তাকানো। মান্টোর জীবনকথা রচনা করতে তার গল্পের আশ্রয়েও গেছেন লেখক,আর সেই যাওয়া হয়েছে তাঁর রচনার গুণে এতই নিবিড় যে মনে হয় মান্টোর জীবনে এই পরাবাস্তবতা জড়িয়ে গিয়েছিল। গিয়েছিল তো নিশ্চিত,এই দস্তানে তো ধরা আছে মান্টো আর গালিবের আত্মার ক্রন্দন। সে ক্রন্দনধ্বনিই এই আখ্যানের মূল সুর। ক্রন্দন মানবাত্মার পচনে, মানুষের ক্রমাগত নিষ্ঠুরতায়। মান্টো আর গালিব,দুই কালের দুই প্রতিভাধর সেই নিষ্ঠুরতার সাক্ষী। লেখক আমাদের ইতিহাসকে চিনিয়ে দিয়েছেন এই দস্তানগো তীব্র দস্তানের পুটুলি খুলে। কিসসার পর কিসসা শুনিয়ে গিয়েছেন আমাদের। সেই কিসসায় এই উপমহাদেশের পরাধীনতা,এই উপমহাদেশের রক্তপ্লাবিত স্বাধীনতা। তারই ভিতরে অতিবাহিত হয়েছিল গালিব ও মান্টোর জীবন। সেই জীবনের কথা রচনা করতে গিয়ে লেখক যেমন ইতিহাসের সত্যকে খুঁজতে গিয়ে প্রবেশ করেছেন,মান্টোর জীবনের যতটা জানা যায় তারও বেশি কিছুতে। বেশিটুকু এসেছে মান্টোর কোনো কোনো গল্প থেকে। সাহিত্যের সত্য থেকে তিনি হেঁটেছেন জীবনের সত্যে। কী অপূর্ব এই যাওয়া। রবিশংকর বল তাঁর এই উপন্যাস শুরুই করেন হারিয়ে যাওয়া,মুছে যাওয়া সময়ের দুয়ারে দাঁড়িয়ে। সময় থেকে সময়ান্তরে গেছেন,ফিরে এসেছেন। সে যেমন মান্টো আর গালিবে... একশো বছরের ভিতরে যাওয়া আসা,তারও পিছনে যাওয়া আবার ফিরে আসা। ক্ষয়ে যাওয়া মোগল যুগের পদশব্দ শোনা যায় এই উপন্যাসে। অভিনব হল এই দস্তানের পুঁটুলির এক একটি গিঁট খুলে ফেলা। দস্তান উন্মোচনের পর দস্তানগো তাঁর ঝোলা থেকে একের পর এক কাঠের পুতুল বের করে মসজিদের চত্বরে সাজিয়ে দিতে থাকে। লেখক বলেছেন, সবই যেন তার এই উপন্যাসের চরিত্র। সবকটি পুতুল ঝলমলে। ইতিহাসের ধুলোবালিতে তারা মলিন হয়ে যায়নি। মনে হয়েছে সেই ধুলো উড়িয়ে দিয়েছেন এই দস্তানের দস্তানগো। প্রথাগতভাবে উপন্যাস লেখেন না রবিশংকর। সাহিত্যের পাঠক হিসেবে তীর প্রথাভাঙার ভিতরে আমি যুক্তিগ্রাহ্যতা দেখতে পাই। তার উপন্যাস বাস্তবতার দাসত্ব করে না। তা পেরিয়ে তিনি পরাবাস্তবতা বলি আর কল্পনার জগৎ বলি সেখানে পৌঁছে যান। সেখানেই তিনি স্বচ্ছন্দ। এই উপন্যাসে কত অলীকদৃশ্য নির্মাণ করেছেন তিনি। ফরিদ মিঞার হাভেলি থেকে তা আরম্ভ হয়। তবসুমের ঘরে উর্দু শিক্ষা থেকে তা ঘনীভূত হয়। তারপর সমস্ত দোজখনামা জুড়ে সেই অলীক দৃশ্যাবলিতে মুগ্ধ হই। উপন্যাসের অন্তিমে এসে লেখক মিঞা তানসেনের জীবনের এক ঘটনার কথা বলেন তবসুমকে। লেখক বলছেন,মির্জা ও মান্টোর জীবন যেন মিঞা তানসেনের গাওয়া দীপক রাগ। অগ্নিদগ্ধ ইতিহাসের এই দুই প্রগাঢ় পিতামহ। মিঞা তানসেনের দগ্ধ শরীর মেঘ রাগে স্নিগ্ধ করেছিল তার পুত্রী সরস্বতী ও তার স্বামী হরিদাসের শিষ্যা রূপবতী। কিন্তু তারা তখন কোথায় যে গালিব ও মান্টোর অগ্নিদগ্ধ দেহকে শীতল করবেন? এই দোজখের জন্য মেঘরাগ কে বাজাবেন?

দোজখনামার পর রবি লিখেছেন আয়নাজীবন। পারস্যের সুফী কবি মওলানা জালালুদ্দিন রুমিকে নিয়ে এই উপন্যাস। কিন্তু রবি তো জীবন কাহিনি লিখতে যাননি। তিনি ধরতে চেয়েছেন সুফী দর্শন। আয়নাজীবন আমাদের ভাষার এক গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস। তা নিয়ে অন্য লেখা হবে। অন্য লেখা হবে বরিশাল জেলায় তার পিতৃভূমি দেখতে গিয়ে মায়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে না দেখে ফিরে আসা সেই 'জন্মযান' উপন্যাসটি নিয়েও। রবি বলতেন, তাঁর ভিতর থেকে অনেক কন্ঠ কথা বলে। সেই কথাই তার গল্প। রবি বলছেন, "আর্জেন্তিনার কবি পিজারনিক -মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে এই মহিলা আত্মহত্যা করেন ১৯৭২-এ একটি কবিতায় লিখেছিলেন,'I can not speak with my voice, so I speak with my voices' তো এই কণ্ঠস্বরগুলি কার - কাদের - আমার ভিতরে কারা কারা কথা বলে? তাদের গল্পই কি আমি লিখতে চাইনি? তবু বলা যাক, 'কেন গল্প লিখতে শুরু করলাম' এ-প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে স্পষ্ট নয়। কেন? যদি জানতাম,তাহলে কি আর গল্প লিখতাম? হোর্হে লুইস বোর্হেস শেষ সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,'My only destiny is literary.' একটুও বাড়িয়ে না বললে,এটাই সবচেয়ে স্পষ্ট উত্তর। লেখা একটি প্রবৃত্তিগত প্রক্রিয়া,যার মানচিত্র অস্পষ্ট।"

রবিশংকর বল একটি তরুণ নক্ষত্র। মৃত্যু হল তার। কিন্তু অনেক আলোকবর্ষ দূর থেকে আসা সেই নক্ষত্রের রোদ আমাদের ভাষা বহুদিন পাবে। আমি ভাবতে পারছি না রবি চলে গেছে। সেই ঘুমন্ত লেখক অগ্নির ভিতরে প্রবেশ করে ভস্ম হয়েছে। আমাদের শহরের আকাশে সূর্য পোড়া ছাই ভেসে আছে। আমি রবিকে ভালবাসতাম ওর স্বপ্নোত্থিত যাপনের জন্য। আমাদের ভালোবাসা মুছে যাবে না। যাও রবি। ফিরে এসো আবার যে লেখা সঙ্গে নিয়ে গেছ তা ফিরিয়ে দিয়ে যেতে। আবার দেখা হবে প্রিয় লেখক।



115 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ আলোচনা  বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: রুখসানা কাজল

Re: রবিশংকর বল ও স্বপন সেন ... এক মিনিট নীরবতা

অসাধারণ স্মৃতি কথা।
"অশ্রু ও ঘামের গন্ধ" আমাকে বিবশ করে দিয়েছিল কদিনের জন্যে। অন্য লেখাগুলি তো
আছেই। শুভেচ্ছা লেখকের জন্যে।
Avatar: de

Re: রবিশংকর বল ও স্বপন সেন ... এক মিনিট নীরবতা

খুবই সুন্দর স্মৃতিচারণা - নীরবতার অংশীদার হলাম -
Avatar: শিবাংশু

Re: রবিশংকর বল ও স্বপন সেন ... এক মিনিট নীরবতা

স্মৃতি আর মানুষ, দুইয়ের টানাপড়েনের সুতোয় গড়ে ওঠা মায়াবী ধারাভাষ্য।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন