গুরুচণ্ডা৯র খবরাখবর নিয়মিত ই-মেলে চান? লগিন করুন গুগল অথবা ফেসবুক আইডি দিয়ে।

সামগ্রী ও পরিষেবা কর (জিএসটি): কী এবং কেন - দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব

অমিতায়ু সেনগুপ্ত

( প্রথম পর্বের পর)
ফলাফলটি হলো একটি ত্রি-স্তরীয় জিএসটি ব্যবস্থা। সমগ্র ব্যব্স্থাটি এখন একটি আন্তঃ-রাজ্য জটিল হিসাব (CGST এবং SGST) এবং আন্তঃ-রাষ্ট্রিয় (IGST, রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে ভাগ করা) 'সরবরাহ'-এর উপরে নির্ভর করছে। এটি হলো জটিলতার প্রথম স্তর। পাঠকরা মনে রাখবেন এই জিএসটি প্রণয়নের মুল মন্ত্র ছিলো "এক দেশ, এক বাজার। এক বাজার, এক কর।" তাই যেই মুহুর্তে কোনও লেনদেনকে আন্তঃ বা অন্তঃ হিসাবে শ্রেণীভুক্ত করা হবে; এক বাজারের ধারণাটাই বাতিল করা হবে। জিএসটি ভারতকে একটি অভিন্ন বাজার হিসাবে কখনই বিবেচনা করে না; এটি ভারতকে অনেকগুলি ছোটো বাজারের সমষ্টি (ভারতীয় রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল) হিসাবে দেখে এবং বিভিন্ন খণ্ডিত বাজারগুলির মধ্যে করের দাবির নিষ্পত্তির চেষ্টা করে। ব্যক্তিগতভাবে, দেখে আমোদিতই হই যে প্রচার মাধ্যম জিএসটিকে কেবলমাত্র "এক দেশ, এক কর" হিসাবেই প্রচার করছে। তারা এক বাজারের ধারণাটাকেই সম্পূর্ণ ভাবে উপেক্ষা করছে, যা আসলে জিএসটি যে ভারতকে এক বাজার হিসাবে বিবেচনা করে না, তারই স্বীকারোক্তি!

প্রেক্ষিত দেখলে, ইয়োরোপে ইউরোজোন তৈরি করার থেকেও ভারতীয় জিএসটি সম্ভবত বেশি জটিল প্রক্রিয়া। যেখানে ইউরোপ প্রকৃতপক্ষে একাধিক সার্বভৌম দেশকে এক অর্থনৈতিক বাজার বা সত্তার মধ্যে একত্রিত করার চেষ্টা করেছে, সেখানে জিএসটি একটি সার্বভৌম দেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিভাগে (বা বাজারে) ভেঙ্গে দিয়েছে। দ্বিতীয় সমস্যাটি হলোঃ আমাদের কেন একটি ত্রি-স্তরীয় ব্যবস্থার প্রয়োজন? এমনকি আমরা যদি একাধিক বাজারও বিবেচনা করি, আমরা একটি একক IGST প্রয়োগ করে তা কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বিভক্ত করতে পারতাম। অন্য সমস্ত দেশেই সাধারণত এক অভিন্ন জিএসটি আছে। কানাডাতে একটি দ্বৈত কর নীতি আছে, যেখানে কেন্দ্রের জিএসটির উপরে কিছু প্রদেশ প্রাদেশিক বিক্রয় কর প্রয়োগ করে বটে, কিন্তু জিএসটি একক কর হিসাবেই প্রয়োগিত হয়। আমেরিকা আর্থিক যুক্তরাষ্ট্রীয়গত সমস্যাগুলি এড়ানোর জন্য জিএসটি নীতি নিয়ে মাথাই ঘামায়নি (এবং এখনও ব্যবসা করা সহজীকরণের ক্ষেত্রে ভারতের তুলনায় উচ্চতর অবস্থানেই রয়েছে)।

জিএসটির এই ত্রি-স্তরীয় কাঠামোটি ভারতের যুক্তরাষ্ট্রিয় আর্থিক কাঠামোগত বিতর্কের একটা আপস মাত্র। জিএসটি কাঠামোর গঠন এমন যে, যখন কেউ CGST এবং SGST দেন, তখন তিনি সরাসরি কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে কর দেন। আইজিএসটির ক্ষেত্রে, প্রথমে সেটি জিএসটিএন-কে দেওয়া হয়, যা জিএসটিএন পরে কেন্দ্রে এবং রাজ্যগুলিতে বরাদ্দ করবে। একবার জিএসটির রাজনীতিগত অনুচ্ছেদটি ফিরে দেখুন। আন্তঃরাজ্য লেনদেনের ক্ষেত্রে রাজ্যগুলি IGSTএর মাধ্যমে একটি কেন্দ্রীভূত সমাধান প্রক্রিয়ায় সম্মত হয়। কিন্তু যখন রাজ্যগুলির নিজেদের আভ্যন্তরীণ লেনদেনের প্রশ্ন আসে, তখন রাজ্যগুলি তাৎক্ষণিক তাদের নিজস্ব রাজস্বের অংশ দাবি করে এবং কেন্দ্রীয় GSTN এর মধ্যস্থতা গ্রহণ করতে সম্মত হয় না। এইভাবে রাজ্যগুলি এবং কেন্দ্রের একটি রাজনৈতিক আপস হয়। যখন রাজ্যগুলির আভন্তরীণ লেনদেন হবে, রাজ্যগুলি তাদের রাজস্ব সরাসরি SGSTর মাধ্যমে আগেই দাবি করতে পারবে এবং কেন্দ্র তার CGST সংগ্রহ করতে পারবে। কিন্তু, আন্তঃরাজ্য লেনদেনের ক্ষেত্রে রাজ্যগুলি GSTN এর মাধ্যমে তাদের কর সংক্রান্ত বিবাদ মেটাবে এবং সম্পদের বৈধ বরাদ্দ নিশ্চিত করবে। জিএসটির তিন নম্বর বিকৃতিটি হলো বিভিন্ন কর স্ল্যাবগুলির ফলাফল। 'নিরপেক্ষ রাজস্ব হার' এবং 'রাজ্যের ক্ষতিপূরণের' আকারে 'রাজনৈতিক শুদ্ধি'র ফলে করের বিভিন্ন হার প্রবর্তিত হয়েছে এবং জিএসটির আকারে অতিরিক্ত সেস বাস্তবায়িত হয়েছে। একাধিক হারের ফলে আর্বিট্রাজের সম্ভাবনা ফিরে এসেছে. উদাহরণ স্বরূপঃ সুপ্রিম কোর্টের ভারুচ কোকোনাট ট্রেডিং কোম্পানি বনাম আমেদাবাদ মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের মামলাটির (১৯৯০) বিতর্ক ছিল যে (কর আরোপ করার ক্ষেত্রে) নারকেল একটি ফল নাকি তন্তু? যেখানে জিএসটি প্রণয়নের উদ্দেশ্যই ছিল সেস ইত্যাদি ছাড়াই একটি অভিন্ন কর আরোপ করা, এই আপস ভারতে জিএসটির মতন একটি জটিল প্রক্রিয়া চালু করার উদ্দেশ্যটিকেই ব্যর্থ করে।

চতুর্থ স্তরের সমস্যাটি হলো 'সরবরাহের স্থান' বিষয়ক জটিলতা যার উপরে আভ্যন্তরীণ ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নির্ভর করছে। মনে করুন আপনি একটি বিমান ভ্রমণ করবেন এবং আপনার কোম্পানী প্লেনের টিকিটটি কিনেছে (যা নিয়ম মাফিক জিএসটি নথিভুক্ত) যেক্ষেত্রে সরবরাহের স্থান আপনার অফিসের ঠিকানা। কিন্তু, আপনি যদি নিজে টিকিটটি কিনতেন (কোনও ব্যক্তি জিএসটির অধীনে নথীভুক্ত করবেন, এমন সাধারনতঃ প্রত্যাশিত নয়) স্বল্প ঠিকানা বিশদ সহ, সরবরাহের স্থান হবে আপনার ট্রাভেল এজেন্টের ঠিকানা। আন্তঃরাজ্য এমন লেনদেনের ক্ষেত্রে (মনে করুন টিকিটটি অনলাইনে কেনা হয়েছে যেখানে আপনার এজেন্টটি একটি তৃতীয় রাজ্যে অবস্থান করছেন), এটি একটি বিশাল জটিলতার সৃষ্টি করবে। জিএসটির নিয়মে সরবরাহের জায়গা বিষয়ক বিধানটিতে এইসব আন্তঃরাজ্য কর দাবীগুলির সমাধান করার কথা (জিএসটি'র রাজনীতিগত অনুচ্ছেদের দিকে নজর দিন), কিন্তু সমাধানটি বোধয় আসল সমস্যার থেকেও বেশি বিভ্রান্তিকর হবে।

এই রাজনৈতিক আপোষের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে ব্যবসা। কল্পনা করুন যে আপনি একজন ছোট ব্যবসায়ী যিনি অন্য কোনও রাজ্যের বিক্রেতা / ব্যাপারী / গ্রাহকদের সাথে কিছু লেনদেন করেন। আপনাকে এখন তিনটি বিভিন্ন করের হিসাব (অ্যাকাউন্ট) রাখতে হবেঃ SGST, CGST এবং IGST। আপনার চ্যালেঞ্জ এখন দুইগুণ। প্রথমতঃ আপনাকে এখন প্রতিটি লেনদেনকে রাজ্যের অন্তর্বর্তী ও আন্তঃরাজ্য হিসাবে নির্ধারণ করতে হবে এবং করের দাবীওয়ালা রাজ্যগুলিকে শনাক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়তঃ, তিনটি অ্যাকাউন্ট বজায় রাখার সমস্যাটি হল যে আপনি এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে কোনও হিসাব ট্রান্সফার করতে পারবেন না।

কোনও সরবরাহ আন্তঃরাষ্ট্র এবং রাজ্যের আভ্যন্তরীণ কিনা, তা তাৎক্ষণিকভাবে নির্ধারণ করা জিএসটি ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে উঠেছে। জিএসটি সঠিকভাবে প্রয়োগ করার জন্য সব 'সরবরাহকারী'কে দেশের প্রতিটি রাজ্যে নথিভুক্ত করা প্রয়োজনীয়। প্রতিটি রেজিস্ট্রেশনের জন্য নিয়মিত কর জমা (ফাইলিঙ্গ) দিতে হবে এবং জিএসটির (ডিজিটাল প্রযুক্তি গ্রহণ সত্ত্বেও) অধীনে প্রয়োজনীয় ফাইলিংয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। মূল জিএসটি আইন মাসিক ফাইলিঙ্গের নির্দেশ দেয়। আপনি যদি সারা ভারত জুড়ে আপনার ব্যবসা চান, তাহলে আপনার ৩৬ টি অধিক্ষেত্রর (২৯ টি রাজ্যে এবং ৭ টি কেন্দ্রিয় অঞ্চল) জন্য CGST, SGST এবং IGSTর ৩ টি অ্যাকাউন্ট ফাইল করতে হবে, যার ফলে প্রতি মাসে ১০৮ টি ফাইলিং এবং প্রতি বছর ১২৯৬ টি ফাইলিং করতে হবে। একটি সাম্প্রতিক সংশোধনী ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে ফাইলিঙ্গ প্রতি ত্রি-মাসিকে হ্রাস করা হয়েছে; যার মানে ছোট ব্যবসার জন্য শুধুমাত্র প্রতি বছর ৪৩২ ফাইলিং করতে হবে। এইবারে কেউ ব্যাখ্যা করে দিন যে জিএসটি কীভাবে ভারতে ব্যবসা করা সহজতর করে তুলবে?

এবারে তাহলে জিএসটির অন্যান্য জটিল উপাদানের উপর একটু চোখ রাখা যাক; যেমন ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট। মনে রাখবেন, জিএসটি মুলতঃ মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের সাথে সংযুক্ত আরেকটি ধারণা মাত্র। সহজভাবে বললে, যে কোনও উৎপাদকারীকে উৎপাদনের যেকোনও পর্যায়ে (পণ্য বা পরিষেবার ক্ষেত্রে উৎপন্নের জন্য) শুধুমাত্র তার মান বৃদ্ধির অংশটুকুর জন্যই কর প্রদান করতে হয়। ধরুন আপনি ১০০ টাকা মূল্যের একটি 'সরবরাহ' উৎপাদন করলেন এবং তার জন্য ১০% কর প্রয়োগ হলো। আপনি সাধারণত পণ্যটির জন্য ১১০ টাকা মূল্য ধার্য করবেন, কারণ আপনি আপনার গ্রাহকের কাছ থেকে ঐ করটি আদায় করবেন (এটিও পরোক্ষ করের সমস্যাগুলির মধ্যে একটি, কিন্তু তা অন্য আলোচনা)। এখন ধরুন আপনি ৭০ টাকা মূল্যের উপাদান কিনেছেন, যার জন্য আপনি ইতিমধ্যেই ৭ টাকা কর পরিশোধ করেছেন (সরলীকরণের জন্য ১০% কর ধরা হচ্ছে)। এইবার আপনি 'ট্যাক্স ক্রেডিট' দাবি করতে পারেন এমনভাবে যেন আপনি আপনার চূড়ান্ত পণ্যের জন্য শুধুমাত্র ৩ টাকা কর প্রদান করেছেন এবং আপনার চূড়ান্ত পণ্যটির মূল্য হওয়া উচিত ১০৩। ভ্যাটের পরিপ্রেক্ষিতে, আপনি ৩০ টাকার মূল্য সংযোজন করেছেন এবং করের হিসাবে শুধুমাত্র ৩ টাকা (আপনার দ্বারা মূল্য সংযোজনের ১০%) ধার্য করেছেন।

ভ্যাটের ক্ষেত্রে সমস্যা ছিল যে এই বিধান শুধুমাত্র পণ্য উপাদানের জন্য প্রয়োগ করা হয়েছিলো, কিন্তু উপাদাণের পরিষেবা অংশটির জন্য "ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট" প্রয়োগিত ছিলো না। জিএসটি উৎপাদনের সমস্ত উপাদান (পণ্য এবং পরিষেবা) হিসাব করার অনুমোদন দেয় যাতে শুধুমাত্র প্রকৃত মূল্য সংযোজনের উপরেই কর ধার্য্য করা হয়। জিএসটি-র পক্ষে ব্যবসাগুলির দ্বারা প্রদর্শিত উৎসাহের এটিও অন্যতম বড় কারণ ছিল (সমস্ত রাজ্যের অভিন্ন করের হার করা ছাড়া)। উৎপাদনের সমস্ত পর্যায়ে ভ্যাট নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া; এবং ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিটের এই শৃঙ্খল যেকোনও জায়গায় ব্যাহত হলে ভ্যাটের ফলে মুদ্রাস্ফীতি ঘটবে। জিএসটির ক্ষেত্রে উৎপাদনের পণ্য ও পরিষেবা উভয় উপাদানকে একই কর কাঠামোয় এনে এই শৃঙ্খলটিকে সম্পুর্ণ করার কথা ছিলো যাতে এই উভয় উপাদানের উপরেই ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট প্রয়োগ হয়। এটি তাত্ত্বিকভাবে জিএসটির পক্ষে দৃঢ় যুক্তি ছিল যে এর ফলে জিএসটি দ্রব্যমূল্য কমাবে এবং এর ফলে ভারত মুদ্রাস্ফীতির প্রবণতা মোকাবেলা করতে সাহায্য করবে।

তাত্ত্বিকভাবে এই ধারণাটি কোন অর্থনীতিবিদের কাছে চমৎকার মনে হলেও বাস্তবে জিএসটি এই তাত্ত্বিক গঠনের থেকে অনেকটাই আলাদা। জিএসটি কেবলমাত্র তখনই কাজ করতে পারে যদি উৎপাদনের সমস্ত উপাদানকে জিএসটির অধীনে আনা হয়; যার মানে হলো যে দেশের সমস্ত উৎপাদন সংস্থাগুলির অর্থনৈতিক কার্যকলাপকে জিএসটির সাথে এমন ভাবে জড়িত থাকবে যাতে উৎপাদনের সমগ্র শৃঙ্খলটি ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিটের আওতায় পরে। আমি নিম্নলিখিত অনুচ্ছেদগুলিতে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি যে কেন জিএসটি-র বর্তমান গঠনে তা একেবারেই সম্ভব নয়।

প্রথমতঃ সমস্ত পণ্যকে জিএসটির অধীনে আনা হয়নি। কোনও অজানা কারণে, জ্বালানি/তেলকে জিএসটির অধীনে আনা হয়নি এবং এর ফলে কোনও শিল্প জ্বালানী খাতে খরচবাবদ ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট দাবি করতে পারবে না। এই সমস্যা পরিবহনশিল্প দ্বারা বিশেষভাবে উত্থাপিত করা হয়েছিল এবং প্রস্তাবিত সমাধান হিসাবে অধিকাংশ পরিবহন সেবার করকে সর্বনিম্ন করের ব্র্যাকেটে এনে ৫% করা হয়েছে। জিএসটি-র অধীনে কেন জ্বালানীকে অন্তর্ভুক্ত করা হলোনা সেই নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে (এবং এইগুলির মধ্যে অনেকগুলি ব্যাখ্যাই রাজনৈতিক), তবে একজন অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিভঙ্গী দেখলে ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিটের শৃঙ্খলটি যদি কোনও একটি উপাদানের জন্য ভেঙ্গে যায় তবে ভ্যাটের তুলনায় ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিটে চূড়ান্ত দাম হ্রাসের যে অর্থনৈতিক যুক্তিটি দেওয়া হয়েছে সেটিও আর থাকেনা।

দ্বিতীয় চ্যুতিটিতে আবার দুটি ভাগ আছে। প্রথম ভাগটি সম্মতি সংশ্লিষ্ট (কম্প্লায়েন্স) সমস্যা সম্পর্কিত। যেকোন কর প্রণিধানের মতন জিএসটির ক্ষেত্রেও বলা হয়েছে যে ছোটো ব্যবসাগুলির (একটি নির্দিষ্ট পরিমানের নীচে মোট লেনদেন) কর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। অথচ, সম্পূর্ণ জিএসটি পদ্ধতিটিকে কার্যকরভাবে চালানোর জন্য কোনও করযোগ্য সংস্থাকে কোনও কর-অপ্রদানকারী সংস্থার সাথে করা সমস্ত লেনদেনের জন্যও ট্যাক্স ক্রেডিট দাবি করার অধিকার থাকতে হবে, যার অর্থ হল যে সমস্ত কর-অপ্রদানকারী সংস্থাকেও জিএসটি-র অধীনে নিবন্ধিত হতে হবে। (মনে রাখবেন যে উৎপাদনের সমগ্র শৃঙ্খলের জন্য যদি হিসাব করা না হয়, তবে পুরো ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট মডেলটি ভেঙ্গে যাবে, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতির প্রবণতা দেখা দেবে)। সুতরাং, জিএসটিকে প্রকৃতপক্ষে কার্যকর করতে গেলে এমনকি সেইসব ব্যবসা যারা কর দিতে বাধ্য না তাদেরকেও নিবন্ধিকরণ করতে হবে এবং ফাইলিং (প্রতি বছরে ৪৩২ টি!) করতে হবে, যদিওবা তাদের জিএসটি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। দ্বিতীয় ভাগটি উপরের প্রথমটির থেকেই আসে; এবং এটি ভারতের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ প্রসঙ্গের প্রতিফলন। ভারতীয় অর্থনীতির একটি বৃহৎ অংশ হলো অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্র এবং অসংগঠিত শিল্প। এই দুটি পদ প্রায়ই অদলবদল করে ব্যবহৃত হয় (প্রায়শই অজ্ঞতার কারণে), কিন্তু তার জন্য সামাজিক-অর্থনৈতিক কারণও রয়েছে। অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্র বলতে সেইসব ক্ষেত্রকে বোঝায় যারা করের হিসাবের আওয়াত পরেনা, কিন্তু কর কর্তৃপক্ষ তাদেরকে জিএসটি আধিকারিকের আওতায় আনতে চাইবে (অন্য কিছুর জন্য না হলেও শুধুমাত্র কর আদায় বাড়ানোর জন্য)। অন্যদিকে অসংগঠিত শিল্প একটি ধারণা যা শ্রম আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত হয়েছে, যেমন মৌলিক কোম্পানি আইনগুলি এবং শ্রম আইনগুলি এইসব শিল্পের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয় না।

যদিও উভয়কেই অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রায়শই অভিশাপ হিসাবে ধরা হয়, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে বুঝতে পারবেন যে এই দুটিই কেবলমাত্র ভারতের ক্ষুদ্র উৎপাদন পর্যায়েরই প্রতিফলন। যদিও এই বিষয়টি নিয়ে একটি পৃথক অলোচনার দরকার, তবু এটুকু বলাই যায় যে (ক) এটা আমাদের এক যৌথ ব্যর্থতা যার ফলে এক বিপুলসংখ্যক ভারতীয় সংস্থা এই অসংগঠিত/অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রের বিপদজনক চক্রের মধ্যে আটকে রয়েছে এবং (খ) মাঝারি ও ছোট ব্যবসা নিয়ে অনেক হইচই হওয়া সত্ত্বেও, আমরা এইসব ভারতীয়দের জন্য খুব অল্পই করতে পেরেছি।

জিএসটি'র প্রসঙ্গে, অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রের (প্রথাগত ভাবে সংজ্ঞায়িত, যেখানে জিএসটি কেবলমাত্র একটি কর সমস্যা) এই বিশাল অংশকে এই জটিল কর ফাইলিঙ্গের জন্য নিবন্ধন করানো এবং সম্মতিকরণগত বিধিগুলোকে মেনে চলানোর জন্য তৈরী করা এক বিশাল কাজ। এই ধরনের সংস্থার কাজকর্মের আয়তন এবং ফলে তার লাভজনকতা অত্যন্ত কম (প্রায়ই অস্তিত্ব হারানোর পর্যায়ে) এবং এই সমস্ত সংস্থাগুলি জিএসটির অধীনে কর প্রদান করতেও দায়ী নয়। অর্থনীতির বৃহত্তর মঙ্গলের জন্য কেবলমাত্র ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট শৃঙ্খল সম্পূর্ণ করার জন্য তাদের নিবন্ধন করার প্রত্যাশা কেবল তাদের উপর অকারণ বোঝা বাড়াবে। উল্টোদিকে, তারা নিবন্ধিত না হলে শুধুমাত্র ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিটের সমগ্র শৃঙ্খলটি ভেঙ্গে যাবে, এবং জিএসটির জন্য মুদ্রাস্ফীতির প্রবণতা দেখা দেবে।

জিএসটি-র দিকে পদক্ষেপ ভারতকে কিভাবে প্রভাবিত করবে তা নির্ধারণ করার জন্য বিশ্বে খুব কম উদাহরণ রয়েছে। সম্ভবত মালয়েশিয়াই একমাত্র উদাহরণ; এবং মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা খুব ভাল ছিলো না (প্রথম কয়েক বছরের জন্য দেশ মুদ্রাস্ফীতির সম্মুখীন হয়েছিল)। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ভারত কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে তা বোঝার জন্য মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা বিস্তারিত বিবরণে অধ্যয়ন করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এই ধরনের কোনও কেস স্টাডি উন্নয়নশীল অর্থনীতির ক্ষেত্রে কখনো নিখুঁত হয় না, কারণ প্রতিটি দেশেই একে অপরের থেকে আলাদা গতিশীলতা রয়েছে।

যখন বিশ্ব অর্থনীতিতে ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সঙ্কটের পরে পুনরুদ্ধারের সবুজ অঙ্কুর দেখা দিচ্ছে, তখন ভারত মনে হয় একটি ভিন্ন পথে এগিয়ে যেতে চলেছে, প্রথমে নোটবন্দি এবং এখন জিএসটির মাধ্যমে। এটা লক্ষণীয় যে ভারতের অথনৈতিক অবস্থান উন্নত করার উদ্দেশ্যে যে নীতিটি অনুমিত হয়েছিল তা দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিবাদের কারণে যখন অর্থনৈতিক যুক্তিকে উপেক্ষা করা হয়, তখন বোধহয়এমনটাই ঘটে।


মূল লেখা থেকে অনুবাদ করেছেনঃ সাগর দাস



কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন