বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা - শেষ পর্ব

মিঠুন ভৌমিক

আগের পর্বের পর

প্রথম পর্বে কুন্দন শাহের সিনেমা বানানোর শুরুর কথা বেশি করে বলতে চেয়েছিলাম। কীভাবে "জানে ভি দো ইয়ারোঁ" তৈরি হচ্ছিলো, কীভাবে পরীক্ষামূলক কেরিয়ারের মধ্যে দিয়ে একজন মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে নানা ঘাটের জল খেয়ে ছবি বানানোর কথা ভাবছেন সেই জায়গাটা, আমার মনে হয়েছে, কুন্দন শাহকে বোঝার জন্য খুব দরকার। শাহ মারা যাবার পর বিভিন্ন কাগজের রিপোর্টিং এ উল্লেখযোগ্যভাবে ফিরে এসেছে দুটি বিষয়। এক, বিস্তীর্ণ সময় জুড়ে কাজ না থাকা। দুই, প্রথম দিকের কাজ অর্থাৎ "জানে ভি দো ইয়ারোঁ" থেকে "ওয়াগলে কী দুনিয়া" পর্যন্ত কাজের সাথে পরবর্তী কাজগুলির মানের পার্থক্য।

এই পার্থক্য বোঝার জন্য খুব দরকারি ছিলো এই ছবিগুলির বানানোর পুঙ্খানুপুঙ্খ ইতিহাস, যা কোথাও আছে কিনা আমি জানিনা। সম্ভবতঃ স্মৃতি থেকে সতীশ কৌশিকের মত কেউ কেউ লিখবেন কোনদিন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে শাহ যা বলেছেন তা থেকে খানিকটা আন্দাজ পাওয়া যায়। ধরা যাক "ক্যায়া কেহনা" ছবির কথা। ব্যবসায়িক সাফল্য পাওয়া এই ছবিটি কোনমতেই কুন্দনের সবথেকে ভালো কাজগুলির মধ্যে পড়বেনা। এই ছবি বানানোর কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন গল্পের জায়গায় জায়গায় তাঁকে যুক্তির অভাবে থমকাতে হচ্ছিলো। এবং তিনি প্রযোজক ও লেখককে জানিয়েছিলেন একটা গল্প তাঁর নিজের হয়ে না ওঠা পর্যন্ত তিনি ছবি করতে পারেন না। সম্ভবত এই কারণেই পরবর্তীকালের ছবিগুলি এত তাৎপর্য্যহীন হয়েছে। সে কথায় পরে আসছি।

কিন্তু এসবের আগেও বলতে হয় "কভি হাঁ কভি না"র কথা। ১৯৯২ সালেই, "বাজিগর", "ডর" রিলিজ হওয়ার আগেই নির্মিত এই ছবি তৈরির গল্প নিজেই এক ট্র্যাজিকমেডি। জনপ্রিয় সিরিয়াল হিসেবে "ফৌজি" সার্কাস" ইত্যাদির পরে শাহরুখ একটু একটু নাম করেছেন। মুম্বই এসে একে একে ছবিতে কাজ পাচ্ছেন, সইটই চলছে। কুন্দনের সাথে "ওয়াগলে কী দুনিয়া" ও "উমীদ" বলে দুটি টেলিভিশনের কাজের সুবাদে শাহরুখের পরিচয় ছিলো। কভি হাঁ কভি না'র গল্প ভালো লাগায় কথাবার্তাও চূড়ান্ত হলো। ফি ছিলো পঁচিশ হাজার টাকা। এরপর ছবি তৈরি হয়ে বসে রইলো, ডিস্ট্রিবিউটররা কিনতে রাজি হলেন না (এ একেবারেই সুধীর ও বিনোদের মত দশা)। বাজিগর, ডর ততদিনে বেরিয়ে ব্লকবাস্টার, তাও এই অবস্থা। এসে গেল ১৯৯৪ সাল। ছবিটি কোনদিন দিনের আলো দেখবেনা বুঝে শাহরুখ নিজেই মুম্বই এলাকায় ডিস্ট্রিবিউটিং রাইটস কিনলেন। কুন্দন পরে বলেছেন, ঐ লো বাজেট ছবি যতদিনে খ্যাতি পায় বা কাল্ট হয়, ততদিনে একযুগ কেটে গেছে। ঠিক যেভাবে জানে ভি দো ইয়ারোঁ যেসব কলেজের ছেলেমেয়েদের সময় বানানো হয়েছিলো, সমাদর পেয়েছিলো তার পরের প্রজন্মের কাছে, সেইরকম।

জানে ভি দো ইয়ারো'র কথা যখন ফিরে এলোই, সে বিষয় আরো একটা গল্প বললে আশাকরি পাঠক অখুশি হবেন না। ঐ একই ছবি অনুপম খেরেরও প্রথম কাজ ছিলো। ভূমিকা ছিলো একজন কনট্র্যাক্ট কিলারের। কুন্দন শাহ ও সতীশ কৌশিক এক যৌথ সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ঐ রোলটা নিয়ে নাকি কাড়াকাড়ি পড়ে গিয়েছিলো। নাসিরুদ্দীন শাহ, ওম পুরি, পঙ্কজ কাপুর তিনজনেই ঐ চরিত্রে অভিনয় করতে চাইছিলেন। ভাগ্যের এমন পরিহাস, খানিকটা শ্যুট করার পর সাবপ্লটের ঐ অংশটি প্রক্ষিপ্ত মনে হওয়ায় বাতিল হয়। একইভাবে বাতিল হয় টাইটেল সং, যার বদলে "হাম হোঙ্গে কামিয়াব" আসে।

ক্যায়া কেহনা মুক্তি পাওয়ার আগের এক সাক্ষাৎকারে কুন্দন বলেন তাঁর অন্তত একশোটি ছবির আইডিয়া আছে। সুযোগ কম, তবু তিনি আশা রাখেন অনেক ছবি করতে পারবেন। বাস্তবে দেখা যায় ২০০০ সালের পরে বানানো ছবিগুলি একেবারেই দাগ কাটার মত নয়। কেন এমন হলো? এমনকি ক্যয়া কেহনাও অতি সাধারণ মানের এবং মোটা দাগের সোশ্যাল ড্রামা হয়ে ওঠার কারণ কী, যাতে কেরিয়ারের প্রথম পর্বে বানানো ছবিগুলোর ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়না? কেন সমসাময়িক মেইনস্ট্রীম হিন্দি ছবির থেকে মৌলিকতায়, ট্রীটমেন্টে, আপোষহীনতায় যে পার্থক্য আমরা দেখেছি কেরিয়ারের প্রথম পর্বে, তা পরের দিকে অনুপস্থিত? খেয়াল করলে দেখা যাবে "জানে ভি দো ইয়ারোঁ" যখন বানানো হচ্ছে তখন মূলধারার ছবিতে দুর্নীতি এবং প্রতিবাদের গল্প নিয়ে ছবি হতেও শুরু করে দিয়েছে, কিন্তু সেই ছবিগুলির (১৯৮৪ সালেই মুক্তি পাওয়া বচ্চন অভিনীত ইনকিলাব, রাজেশ খান্না অভিনীত আজ কা এম এল এ ইত্যাদি) ট্রীটমেন্ট একেবারেই ভিন্ন, সেখানে লার্জার দ্যান লাইফ হিরো থাকছে। এমনকি ১৯৯০ সালেও তৈরি হচ্ছে আজ কা অর্জুনের মত ছবি যেখানে ট্রীটমেন্ট গতানুগতিকতায় আচ্ছন্ন, মেলোড্রামায় ভরপুর, নতুনত্বের নামগন্ধ নেই। স্রেফ হাততালি কুড়োনোর মত ডায়লগ আর স্টারডমের ভর করে বলিউডি ফর্মূলা ছবি। মোদ্দা কথা, কুন্দনের ছবির সাথে একই থীমের মূলধারার ছবিগুলির পার্থক্য খুব স্পষ্ট।

এই পার্থক্য ক্রমশ কমে আসে, কভি হাঁ কভি না থেকেই। যদিও ট্রীটমেন্টে খানিক বৈশিষ্ট্য থাকে, রিয়েলিজম কিছু কিছু উপস্থিত থাকে। কিন্তু এর পরের ছবিতে সেই পার্থক্য অদৃশ্য হয়।

এর কারণ বিশ্লেষণে নাসিরুদ্দীন শাহ বলেছেন কুন্দন তাঁর প্রথম ছবিতেই সততার সাথে সমস্ত কাজটা করে ফেলেছেন, পরিচালক হিসেবে তাঁর আর তাই পরে আর কিছু বলার ছিলোনা। হতে পারে, যদিও টিভির জন্য বানানো কাজগুলো সেকথা তেমন সমর্থন করেনা। বরং দীর্ঘদিনের কাজ না থাকা কারণ হতে পারে। প্রথম ছবি অত ভালো কাজ হয়েও সেভাবে স্বীকৃতি না পাওয়া কারণ হতে পারে। আরো একটা মজার ব্যাপার হলো, মিউজিকালের আঙ্গিকে যথেষ্ট বিনোদন রেখেও কভি হাঁ কভি না সেই বছরের ব্যবসা করা ছবিগুলোর তালিকায় প্রথম দশেই নেই। সেই বছরই, অর্থাৎ ১৯৯৪ সালে হাম আপকে হ্যায় কৌন, এবং পরের বছর দিলওয়ালে দুলহানিয়া রিলিজ করেছিলো। আমার ধারণা বলিউডে পরের কিছু বছর কী ধরণের ছবি বানানো হবে তা এই সময় থেকেই ঠিক হয়ে যায়। জীবনের একেবারে শেষের দিকে কুন্দন এই ঘটনাকে বলেছেন দুর্ভাগ্যজনক, কারণ ব্যবসাভিত্তিক মূল্যায়নের জন্য অভিনেতাদের নিজস্ব কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা কমতে থাকে, সেই জায়গায় দর্শক টেনে আনার মশলা পরিবেশনের ছক বজায় রাখার দায়বদ্ধতা তৈরি হতে থাকে, এবং সেখানে তাঁরা বন্দী হয়ে যান।

এই প্রসঙ্গ এই কথা বলে শেষ করবো, যে পরের দিকের ছবিগুলো তুলনায় তেমন ভালো না হলেও প্রস্তুতিতে খামতি ছিলো না। ক্যয়া কেহনা বানানোর সময় কুন্দন চিত্রনাট্যের অনেক জায়গার সাথে একমত হতে পারছিলেন না বলে কাজ থেমে যায়। তখন রঞ্জিৎ কাপুরের (লেখক) সুপারিশে কুন্দন "লেটার টু এ চাইল্ড নেভার বর্ন" পড়েন (ইংরেজি অনুবাদ, মূল বই Lettera a un bambino mai nato, 1975 by Oriana Fallaci) ও সমস্যা কাটিয়ে ওঠেন। কিন্তু এসব সত্ত্বেও কেন তাঁর পরের দিকের কাজগুলো আমাদের ফিরে দেখার মত হয়নি সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

এই লেখার একেবারে শেষে এসে, আমাদের কাছে তাই পড়ে থাকছে কুন্দন শাহের কাজের মাত্র দশ এগারো বছর, যা তিনি প্রথম দিকে করেছিলেন। পড়ে থাকছে "জানে ভি দো ইয়ারোঁ"র রূপকথাসম কালজয়ী হয়ে ওঠার কথা, যে ছবির নষ্ট হয়ে যাওয়া ফুটেজের গল্প শুনে শুনেই পরে বিভিন্ন ছবির সিকোয়েন্স তৈরি করেছেন অন্য পরিচালকেরা, যে ছবিতে কুন্দন শাহকে আমরা পাই প্রচন্ড সিরিয়াস, আপোষহীন একবগ্গা পরিচালক হিসেবে। পড়ে থাকছে শহুরে মধ্যবিত্তকে খুব ভালো করে চেনা তাঁর টিভি সিরিয়াল, অসংখ্য "কমন ম্যান" ও তাদের গল্পেরা। পড়ে থাকছে আন্ডারডগ হিসেবে ছকভাঙা কাজ, একঝাঁক নতুন শিল্পীর প্রায় না খেতে পাওয়া অবস্থাতেও ভালো কাজের জেদ। থেকে যাবে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসের যে অংশগুলো বড়ো বড়ো ব্যানারের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে আবছা সেই চিহ্নগুলি। আর পড়ে থাকছে অজস্র ব্যক্তিগত মুহূর্ত, যার আলাদা করে তেমন দাম নেই, কিন্তু সমষ্টিগতভাবে সেগুলি অমূল্য। সিনেমাকে রাজনীতি দিয়ে দাগিয়ে না দিয়ে যদি মানুষের ভালোমন্দ দিয়ে দাগানো যেত তাহলে দেখা যেত এই ছবিগুলো নিম্ন-মধ্যবিত্তের পারিবারিক অ্যালবাম। ১৯৯১ সালের মুক্ত অর্থনীতির ফলে যে ছবিটা পাল্টাতে থাকে। এখন জানা যাচ্ছে সেই সময় থেকেই ভারতে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়তে থেকেছে। এর ফলে কি দুটি গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকা শ্রেণী বিযুক্ত হয়ে গেল পরস্পরের থেকে? এর ফলে কি বিযুক্ত হলো সিনেমার সেই ধারা, যা শ্রেণী পরিচয়ের দূরত্ব সত্ত্বেও কোথাও সম্মানজনক সহাবস্থানের, পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরির অবকাশ দিতে পারছিলো? কুন্দন শাহের মত কাজ করতে চাওয়া মানুষেরা কি এর ফলে অপ্রাসঙ্গিক হলেন? নব্বইয়ের মাঝামাঝি থেকে যে উদ্ভট বিনোদনের প্যাকেজ বানানো হতে শুরু করলো তা কি এই পরিবর্তনের ফল? আমার ধারণা ভবিষ্যতে এর উত্তর মিলবে।

ততদিন অবধি কুন্দন শাহের কাজের অসম্পূর্ণ মূল্যায়ন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা ছাড়া গতি নেই। প্রথম পর্বে যেমন লিখেছিলাম, হেরে যাওয়াদের হারতে না চাওয়া, তরপর একদিন দুম করে হিসেব উলটে দিয়ে টিঁকে যাওয়ার প্রতিনিধি কুন্দন শাহ ও তাঁর কাজ। কে বলতে পারে, বেঁচে থাকলে আবার একদিন হিসেব উলটে দিতেন না?



18 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা  আলোচনা 
শেয়ার করুন


Avatar: aranya

Re: এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা - শেষ পর্ব

দারুণ


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন