এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা

মিঠুন ভৌমিক

আশির দশকে যাদের টিভি দেখে বোঝার, টিভি দেখার একটু একটু নেশা হওয়ার বয়স হয়েছে তাদের কাছে “ইয়ে যো হ্যায় জিন্দেগী”, “নুক্কর”, “মনোরঞ্জন”, “ওয়াগলে কি দুনিয়া” এসব পরিচিত নাম। তার আগেই "জানে ভি দো ইয়ারো" হয়ে গেছে যদিও, আমি দেখিনি। “জানে ভি দো ইয়ারো” দেখার জন্য আমাকে আরো কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। সাধারণভাবে ডিডি ওয়ানের সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে টিভি দেখতে পাওয়ার মধ্যে যে লটারি জেতার আনন্দ ছিল, তা এখন ভেবে উঠতে আমাদেরই কষ্ট হয়। ঈষৎ থেমে থেমে, আকাশবাণী বিবিধ ভারতীর ঘোষণার মত সেইসব স্মৃতি জায়গায় জায়গায় আবছা, কুয়াশাচ্ছন্ন। মুশকিল হল, কুন্দন শাহের কাজ নিয়ে আলোচনায় এই স্মৃতিভার মাঝে মাঝেই আমাদের বিহ্বল করবে। যা ক্ষতিকর, কারণ ভদ্রলোককে নিয়ে বলার অন্য অনেক কিছু আছে।

১৯৮৩ সালে কুন্দন শাহের আত্মপ্রকাশ, জানে ভি দো ইয়ারো ছবির মাধ্যমে। সেই ছবি তৈরির গল্প খুবই আশ্চর্য, প্রায় একইরকম আশ্চর্যের কুন্দন শাহের পরিচালক হওয়ার গল্পও। অনেক পরে, একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে কুন্দন শাহ বলেছিলেন, মূলত তেমন কিছু করার ছিলনা বলে পুনে ফিল্ম ইন্সটিটিউটে আবেদন করেছিলেন। তার আগে লেখক হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টার পরে একটি পাবলিশিং হাউসে কেরানির চাকরি করেছেন বছর পাঁচ। পুনেতে শাহ এবং তাঁর আরো দুজন বন্ধু ডায়লগ লেখার পরীক্ষায় ফেল করেন। ইন্সটিটিউটের "প্রাচীন অরণ্য প্রবাদ" হল, ডায়লগ লেখার পরীক্ষাই ঠিক করে দেয়, কে পরবর্তীকালে আসলে ডিরেক্টর হয়ে উঠবে। যাই হোক, ঐ ব্যর্থতা শাহকে ভাবায়, তাঁকে মনে করায় যে তিনি বইতে লেকচারে যা পড়ছেন সেই একই জিনিস তৈরি করতে চাননি। ফলে শুরু হয় নতুন ধরনের কমেডির খোঁজে, তাঁর যাত্রা, যা "জানে ভি দো ইয়ারো" তে আমাদের সামনে আসে। প্রসঙ্গতঃ, “জানে ভি দো ইয়ারোর” স্ক্রিপ্ট প্রথমে আলাদা ছিল। সেই অর্ধসমাপ্ত স্প্রিপ্ট মাঝপথেই বাতিল হয়, যখন একদিন রাতে ইন্সটিটিউটের দুই পুরোনো বন্ধুর সাথে রি-ইউনিয়নে শাহ ও বাকিরা তাঁদের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা শোনেন। ডিরেকশন ও ফিল্ম এডিটিং এর ডিপ্লোমা নিয়ে সেই দুই তরুণ তখন দক্ষিণে কাজের খোঁজে হন্যে হয়ে ফিরছেন। শেষে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিল্ম বানানোর একটাই কাজ পান, যেখানে কাজ ছিল, প্রধানত রিফ্লেক্টর ধরা। শাহ এই গল্প শোনামাত্র আগের স্ক্রিপ্ট সরিয়ে রেখে নতুন গল্প লিখতে শুরু করেন, সুধীর ও বিনোদের গল্প।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি রিভিউতে "জানে ভি দো ইয়ারো" সম্পর্কে বলা হয়েছে, ছবিটি দেখতে দেখতে মনে হবে এই ছবি যেন কারুর বাড়িতে তৈরি। শাহ এই বর্ণনার সাথে প্রচন্ড একমত। ছবিটিতে ব্রিজ ভাঙার যে দৃশ্য আছে সেটি আসলে ছবি তৈরি হওয়ার আগেই তুলে রাখা, যখন একের পর এক ঋণের আবেদন নাকচ হচ্ছে, সেই সময়ের। একদিন যদি সত্যিই ছবিটা হয়, তাহলে ততদিন তো ব্রিজ পড়ে থাকবেনা, সেই কথা ভেবে। কুন্দন শাহের ছবি বানানোর দর্শন, তাঁর জীবন ও কেরিয়ার আমাদের কাছে জাদুবাস্তব, কারণ সময় - যা আমাদের জন্য অতি দ্রুত পরিবর্তনশীল, তা তাঁকে কোনদিনই তাড়াহুড়ো করিয়ে নিতে পারেনি। প্রায় তিন দশকে দশটি ছবি আর কয়েকটি টিভি সিরিয়াল, এছাড়া কুন্দন শাহের কাজ বলতে ধুলোয় ঢাকা অজস্র না হওয়া ছবির চিত্রনাট্য, যেগুলোর কথা পরবর্তীকালে আশুতোষ গোয়ারিকার আর সুধীর মিশ্র বলেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, "জানে ভি দো ইয়ারো"র হওয়ার পরে অনেকদিন শাহের কোন কাজ ছিলনা, ছবি মুক্তি পাওয়ার পরের বছর ইন্দিরা গান্ধী পুরষ্কার পাওয়া সত্ত্বেও। এমনকী পরে, "জানে ভি দো ইয়ারো"র দ্বিতীয় পর্বের চিত্রনাট্য বহু প্রযোজক প্রত্যাখ্যান করেন এবং সেই নৈরাশ্য থেকে মুক্তি পেতেই মূলত টিভি সিরিয়াল পরিচালনার কাজ শুরু হয়।

কিন্তু কী ছিলো মধ্যবিত্তের গল্প বলতে চাওয়া ডার্ক হিউমার সম্বলিত সেইসব গল্পে? নিজের কথা বলতে চাওয়ার কোন্ সে উপায় ক্রমাগত ধাক্কা খেতে খেতে একজন পরিচালক খুঁজে পেলেন, যা তাঁকে দিয়ে করিয়ে নিল "ওয়াগলে কি দুনিয়া", যেখানে হাসি আছে স্রেফ কান্নাকে অপমান করতে না চাওয়ার অঙ্গীকারে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের সেই সময়ে দাঁড়িয়ে আরেকটু ইতিউতি চাইতে হবে। ভারতীয় সিনেমার সেই সুবর্ণযুগে, যখন আমরা যথার্থভাবেই আধুনিক সিনেমার সমসাময়িক, এটা সেই সময়। এ সেই সময় যখন ভারতীয় ছবিতে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার লোকের অভাব নেই, যখন বাণিজ্যিক সাফল্যের বাইরেও একটি অঞ্চল অনেকদিন ধরে তৈরি হয়েছে। প্রায় দু’দশক ধরে তৈরি করা সেই জমিতে তখন একে একে সৈয়দ ও আজিজ মির্জা, কুন্দন শাহের মত পরিচালকেরা কাজ করতে আসছেন। জানে ভি দো ইয়ারোর পরের বছরই তৈরি হচ্ছে "মোহন যোশী জাহির হো!" মত ছবি, যা সেই কতবছর আগেই ভারতীয় বিচারব্যবস্থার অসারতা ও মধ্য/ নিম্নবিত্তের অসহায়তা মাপা কমেডির মোড়কে দেখিয়ে দিয়েছে।

টিভি সিরিয়াল পরিচালক হিসেবে কুন্দন শাহের একটি কাজ ব্যান হয়, যার বিষয়বস্তু ছিলো দুর্নীতি। সরকারপক্ষ থেকে বলা হয়, ছবিটি "সাবভার্সিভ"। স্থানীয় পুলিশের লোক কুন্দন শাহকে বলেছিলেন, " আমাদের দপ্তর, দুর্নীতির লিস্টে সতেরো নম্বরে আছে, আপনি জানেন? আগের ষোলোটা দপ্তর নিয়ে আপনাদের অসুবিধে নেই, আর আমাদের একজন অফিসার দু’হাজার টাকা চাইলেই দোষ?" ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি সরকারি দপ্তরগুলোতে কীভাবে ছাপ ফেলছে তাই ছিল সেই ছবির বিষয়বস্তু এবং সেখানে কমেডির কোন জায়গা রাখা হয়নি। এরপর আরো বেশি করে শাহ কমেডি মাধ্যমেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন।

"ইয়ে যো হ্যায় জিন্দেগী"তে রঞ্জিত আর রেনুর সংসার, লক্ষ্মণের কার্টুন থেকে তৈরি ওয়াগলে কী দুনিয়ার ওয়াগলে দম্পতির সংসারের থেকে আলাদা ছিল। গোর্কির "দ্য লোয়ার ডেপথস" অনুপ্রাণিত "নুক্কর" তো আরোই অনেক আলাদা। কিন্তু এই কাজগুলোর সবকটাতেই সেই সময়ের দুটি চরিত্র স্পষ্ট। এক, এই সেই সময় যখন শিক্ষিত চাকরি করা স্বচ্ছল মধ্যবিত্তের সাথে নিম্নবিত্তের মানসিক দূরত্ব অনেক কম ছিল। দুই, ভারতীয় সমাজে তখনও ব্যক্তির থেকে সমষ্টির ভালোমন্দ বেশি গুরুত্ব পেত। এই দুটি ঘটনাই এখন অতীত, এবং ব্যক্তি বা সমষ্টির মধ্যে কার গুরুত্ব বেশি, সেই বিষয়ে আমার কোন মন্তব্য নেই, কুন্দন শাহের ছবিতে কালের নিয়ম মেনেই সেই চিহ্নগুলো ফুটেছে শুধু এট্কুই বক্তব্য। কুন্দন শাহের বংশে সিনেমার কোন ইতিহাস নেই। পরিচালক হিসেবেও তিনি নিজেকে বর্ননা করেছেন বৃত্তের বাইরের একজন হিসেবে, যাঁকে মেইনস্ট্রিমে ফেলা যায়নি, এবং তথাকথিত প্যারালাল সিনেমার কুশীলবদের তালিকাতেও রাখা হয়নি। এমনও নয়, তিনি একমাত্র পরিচালক যিনি মধ্যবিত্তের সুখদুঃখ নিয়ে কাজ করেছেন। কুন্দন শাহকে শুধু আলাদা করেছে তাঁর গল্পের চরিত্রেরা, কারণ তারাও আসলে অনেকেই পরিচালকের মতই সাফল্য-ব্যর্থতার বৃত্তের বাইরের মানুষ, তাদেরও কোন হিসেবে এঁটে ফেলা যায়না। দেগে দেওয়া যায়না "ব্যর্থ" হিসেবে। বরং তারা অবলীলায় ব্যর্থতার লাশ বয়ে হাসি ঠাট্টায় মেতে উঠে পরবর্তী ব্যর্থ প্রোজেক্টের অনুসন্ধানে যাত্রা করে।

অতীত যত পুরোনো হতে থাকে, ততই তা আমাদের কাছে মধুরতর হয়। দূরত্বের একটা আফসোস আছে, তার প্রতি আকাঙ্খা একটু বেশিই যেন টের পাই আমরা। তাই লোডশেডিং চিত্রিত নুক্করের যুগ নস্টালজিয়া আনে। আমার মনে পড়ে রাত নটার আশেপাশের সময়টার কথা, যখন যৌথ পরিবারে রাতের খাওয়ার প্রথম ব্যাচ শুরু হবে, আর আমার বইপত্তর নিয়ে প্রহসনের অবসান। কানখাড়া করে শুনতে হবেনা অনুষ্ঠান, সরাসরি টিভির সামনে বসার ছাড়পত্র থাকবে পরের দু’ঘন্টা। আমার বাবা, যাঁর আমার খাপছাড়া হয়ে ওঠার পেছনে অনেক অবদান আছে, তাঁর পরোক্ষ প্রশ্রয়ে খুলে যাবে একটি জানলা। তখন জানতেই পারব না, ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের মধ্যে বসে থাকছি, পড়া কামাই করার আনন্দ যে বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে অকিঞ্চিৎকর বহু তুচ্ছ চরিত্রের সামনে বসে, তার পেছনে কিছু কার্যকারণ সম্পর্ক আছে, আমার আর্থ-সামাজিক পরিচয় আছে এবং মিছিলে না গিয়েও আমার রাজনৈতিক বক্তব্য তৈরি হচ্ছে, কারণ ভারতের রাজনীতির দাগ অন্তরে বয়ে নিয়ে হাজির হচ্ছে সেইসব দৃশ্য। কোন অর্থেই সেই মানুষগুলো গল্প ছিলনা, কোন অর্থেই তা ছিলনা শুধু বিনোদনের জন্য বানানো কিছু দৃশ্য বা সময় কাটানোর অছিলা।

কুন্দন শাহের ওবিচুয়ারিতে নাসিরউদ্দিন শাহ লিখেছেন, “কুন্দনকে ভারতীয় সিনেমা মিস করবেনা কারণ যে ধরনের ছবি কুন্দন করতে চেয়েছিলেন, বর্তমান ইন্ডাস্ট্রিতে তার কোন জায়গা নেই।” হক কথা। এই গতিময়তার যুগে তাঁকে আমাদের মিস করার কারণ নেই। আমাদের সামনে এখন কোন নুক্কড় নেই, তারা ওভারব্রিজের নিচে অদৃশ্য, হয়তবা ব্রিজ ভেঙে পড়লেও আমরা তাদের আর দেখতে পাব না। আমাদের সামনে কোন ওয়াগলে নেই, তাঁদের আমরা প্রান্তে ঠেলতে ঠেলতে চোখের আড়ালে পাঠিয়েছি। আমাদের কোন কোন সুধীর বা বিনোদ নেই, যদিও ক্যামেরা অজস্র হয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমাদের জন্য কোনো মোহন যোশী কুৎসিত এই বাড়িটার খুঁটি ধরে ঝাঁকিয়ে সব ভেঙেচুরে তছনছ করে দিচ্ছেনা।




Avatar: i

Re: এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা

লেখা হিসেবে ভালো তো বটেই। দৃষ্টিকোণ সবই অত্যন্ত আন্তরিক। তবে বিস্তারিত একটি লেখার দরকার ছিল মনে হয়।
Avatar: S

Re: এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা

দারুন হয়েছে লেখাটা। মিস করেছি, মিস করছি, মিস করবো।
Avatar: Tim

Re: এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা

পাই, লেখার শুরুর দিকটা ঘেঁটে গেছে। একটু দেখো।
Avatar: Tim

Re: এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা

বেশ খানিকটা আপলোড হয়নি ঃ-)


Avatar: গুরুচণ্ডা৯

Re: এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা

ঠিক করা আছে।
Avatar: dc

Re: এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা

একটা সময়ে জানে ভি দো ইয়ারো আর মার্ক্স ব্রাদার্স বারবার করে দেখতাম। কিছুদিন পরপরই একটু জানে ভি দো ইয়ারো আর একটু ডাক সুপ বা একটু হর্স ফেদার্স দেখে নিতাম। অথচ প্রথমদিকে যখন জানে ভি দো ইয়ারোর নাম প্রথম শুনেছিলাম তখন অনেকদিন সিনেমাটা দেখিনি, কারন নাসিরুদ্দিন শাহ ছিল, তাই ধরেই নিয়েছিলাম আঁতেল মার্কা সিনেমা হবে। তারপর বোধায় টিভিতে একদিন থোড়া খাও আউর থোড়া ফেকো সিনটা দেখেছিলাম, তারপরেই পাড়ার দোকান থেকে ক্যাসেট নিয়ে এসে সিনেমাটা দেখে ফেলি। হিন্দি সিনেমার মধ্যে এটা আর দিল চাহতা হ্যায়, এই দুটো সিনেমা বোধায় সবচেয়ে বেশীবার দেখেছি (শোলে ছাড়া, অবশ্যই, আর অমিতাভের ডনও অনেকবার দেখেছি অবশ্য)। আর নাসিরুদ্দিন শাহরও যে দুতিনটে সিনেমা দেখেছি তার মধ্যে এটা একটা (আরেকটা বোধায় আ ওয়েডনেসডে)।
Avatar: কল্লোল লাহিড়ী

Re: এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা

লেখাটি ফিরিয়ে দেয় এমন এক ছবির ঘরানায় যেখানে আমরা অনেক দিন আর বিচরণ করিনা। সত্যিই তো ক্যামেরা হয়েছে অনেক। ঝট করলে এখন দৃশ্য জগৎ হাতের মুঠোয়। সম্পাদনা বলতে নিজেরই ল্যাপটপ। কিন্তু ভাবনা চিন্তা গুলো আর দানা পানি পাচ্ছে না। কাজেই সম সময় সেই ভাবে প্রকাশ পাচ্ছে কই আমাদের ছবিতে? একদল আছেন যাঁরা ফেস্টিভাল গুলোর জন্য ছবি বানাচ্ছেন। পুরষ্কারের হাতছানি আছে সেখানে। ছবির চিত্রভাষাই সেটা মনে করায়। আর একদল জনপ্রিয় পরিসরে। তার মধ্যেও একটা দুটো উজ্জ্বল তারা খসার মতো ছিটকে আসে সাদা পর্দার গায়ে। কুন্দন শাহকে অবশ্য এই দুই পরিসরের কোনটাতেই আটকে রাখা যাবে না। তিনি এই তথাকথিত দুই উজ্জ্বল বৃত্তের বাইরে। তিনি প্রান্তিক। যে ধরনের বিষয় তাঁর চিত্রভাষার ভিত্তিভূমি রচনা করে সেই ধরনের বিষয় এখন আর কেই বা ঘেঁটে দেখে? দেখার সাহস পায়? রিস্ক নেয়? আপোষের আঙুল গুলোকে আজ কজনই বা আমরা পুড়িয়ে নিতে চাই? মারাত্মক এক আপোষহীন লড়াইয়ের আখ্যান হাসির প্রতিটা দৃশ্যে মুড়ে সেই সময়ের সমাজ বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তুলতে চায় জানে ভি দো ইয়ারো। ঠিক তেমনি নুক্কড় এমন একটা জন সমাজকে প্রতিস্থাপিত করার জন্য প্রতিরূপায়িত করে যেখানে সঙ্গবদ্ধতা আর বেঁচে থাকাটাই প্রাধান্য পায় প্রতিদিনের ছোট খাটো নানান রঙ বেরঙের ঝামেলার মধ্যেও। মনে রাখতে হবে সেই সময়ে দূরদর্শন সবে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোতে শুরু করেছে। আর আমাদের কাছে 'নেশন' নামক বস্তুটি কী হবে সেটাও কাঁটাছেঁড়া চলছে পুরোদমে। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে নুক্কড় যাদের কথা বলে আজকের টেলিভিশন তাদের ভুলেও মনে করতে চায় না। কেন? তার অনেক কারণ জড়িয়ে আছে মার্কেটে। পণ্যের বিকিকিনিতে। হাজারটি টিভি চ্যানেলের নিজস্ব স্ট্র্যাট্রেজিতে। সবচেয়ে বড় কথা কুন্দন শাহকে স্বীকার করা বা না করা এই সময়ের ইন্ডাস্ট্রির, ইতিহাসের, দৈনন্দিন জীবন যাপনের বড় কথা নয়। বড় কথাটি হল আমরা তাঁকে অস্বীকার করতে পারবো না। ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করবো। ভুলিয়ে দেওয়ার নানা রকমের হাতছানি দেবো। কিন্তু তাঁর এতোদিনের অদ্ভুত নীরবতা আমাদের প্রশ্ন করবে। আগেও করেছিল। এখনও করবে। ইতিহাসে করবে। ইন্ডাস্ট্রিতে করবে। তাঁর যারা বন্ধুরা বেঁচে আছেন তাদের করবে। যে প্রতিষ্ঠানে তিনি ফিল্মের জন্য নাড়া বেঁধেছিলেন সেখানেও করবে। আমরা যারা লিখবো। পড়াবো। স্ট্যাটাস দেবো তাদেরও করবে। আর এখানেই তাঁর জিৎ। অবহেলিত, উপেক্ষিত, এবং আরও নানান কিছুর পরেও এক আপোষজীনতার জিদ। শ্রদ্ধা।
Avatar: de

Re: এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা

লেখাটা খুব ভালো লাগলো -

তাই ইউটিউবে খুঁজে দেখবো কুন্দন শাহের কাজ -

আমার এসবের কোনটাই দেখা নেই -
Avatar: দ

Re: এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা

কি ভীষণ একাত্ম বোধ করলাম লেখাটার সাথে। ওয়াগলে কি দুনিয়া, নুক্কড়, জানে ভি দো ইয়ারো আমাদের মত কতজনের যে বেড়ে ওঠা বয়সটার সাথে কত হেরে যাওয়া মুহূর্তের সাথে জড়িয়ে আছে --- মুহূর্তগুলোকে হুশ যাঃ করে উড়িয়ে দেবার সাথে জড়িয়ে আছে ---
Avatar: Arpan

Re: এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা

আহ, কত পুরনো সব স্মৃতি। তার সাথে টিমের লেখা।

কভি হাঁ কভি না -র উল্লেখ আশা করেছিলাম।
Avatar: শিবাংশু

Re: এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা

বাহ...
আমি একটু আগের লোক। কুন্দন শাহ সম্বন্ধে যখন প্রথম সচেতন হই, তখন 'নিজে' সংসার করা শুরু করেছি। একটা প্রত্যন্ত ছোট্টো শহরে। একটি শিশুকন্যাও এসে গেছে। যাকে বলে 'আটে-দাল কে ভাও', সেটা জেনে ফেলেছি মোটামুটি। সত্যি কথা বলতে কী, আমি 'জানে ভি দো ইয়ারোঁ' পরে দেখেছি। কুন্দন শাহের সিরিয়লগুলো'ই আগে দেখা। তাদের কন্টেন্ট ছিলো একান্ত পরিচিত। আমরাও মফস্সল শহরের বাংলা মিডিয়ম, মধ্য-নিম্ন-মজুর-মাস্টার সমাজের লোক। সেই সময় অপ্রতিদ্বন্দ্বী দূরদর্শন, নতুন খেলনা দেখার ঝোঁক, চকচকে প্রসাধিত ফিল্মি ইল্যুশন থেকে একটু হটকে এবং আই পি টি এ মুম্বাইয়ের উস্তাদদের হাতে গড়ে ওঠা হিন্দি সিরিয়লের একটা অন্য ভিজ্যুয়ালের জগৎ। অবলীলায় দর্শকের আনুগত্য একেবারে বেঁধে ফেলেছিলো। একনায়কতন্ত্রী ব্যবস্থা থেকে আমলাতন্ত্রী ব্যবস্থা, ইন্দিরার মৃত্যুর পর রাজীব। পরিবর্তিত আর্থ-রাজনৈতিক ডায়নামিক্সগুলির চাপে মধ্যবিত্তের দুনিয়া দ্রুত বদলে যাচ্ছিলো। নুক্কড় বা ওয়াগলে, সার্কাস বা ইয়েহ জো হ্যাঁয়... সে সময়ের দর্শকরা অনায়াসে নিজেদের চিহ্নিত করতে পারতো।'বিশেষ' না হওয়াটাই বিশেষত্ব ছিলো কুন্দনের। জানে ভি দো... দেখেছি তিন-চার- বছর পর। তাও স্ক্রিনে নয়, টিভিতে। কিন্তু এই ছবিটির যে চমকটা সেসময় অন্য কারো কাছে পাইনি, সেটা অপ্রত্যাশিত ব্ল্যাক হিউমারের তীক্ষ্ণতা। তার পরেও খুব বেশি এদেশি ছবিতে দেখিনি। প্রথম ভিসিআর নেবার পর জানে ভি দো... আর পথের পাঁচালির ক্যাসেট একসঙ্গে। না, কোনও তুলনামূলক কিছু নেই। জাস্ট বারবার দেখার ইচ্ছে।

আমারও মনে হয় ওঁকে এই মূহুর্তে কেউ মিস করবে না। যাঁরা স্মরণ করছেন, স্মৃতি থেকেই করছেন। তাঁর থেকে নতুন কোনও প্রত্যাশা তাঁদের ছিলোনা। অধিকাংশ ছবিকরদের সঙ্গেই এরকম হয়ে থাকে। ব্যক্তিগত আমি তাঁর ছবির সঙ্গে 'বেড়ে' উঠিনি। আগেই 'বড়ো' হয়ে গিয়েছিলুম। নস্টালজিয়া নয়, এই মানুষটির কাজে আকৃষ্ট হয়েছিলুম। নির্বিশেষ মধ্যবিত্তের যা যা বিশেষত্ব, নীতি-দুর্নীতির দোলাচল, কমন সেন্স আর নিরুপায় আপোসের বন্ধন, সব মিলিয়ে তিনি আমাদের মনে আছেন। থাকবেনও....

Avatar: MR

Re: এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা

"জানে ভি দো ইয়ারো" এক হলিউড মুভির ছায়ায় নির্মিত "Weekend at Bernie's"। খুঁজে দেখ্লে সব ভালো হিন্দি কমেডি ই হলিউডের রিমেক অথবা ইন্স্পায়ার্ড হয়েচে।
Avatar: dc

Re: এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা

Weekend at Bernie's ১৯৮৯ এ রিলিজ হয়েছিল, জানে ভি দো ইয়ারো ১৯৮৩ তে। তবে উইকেন্ড বা মাই কাজিন ভিনির মতো লো প্রোফাইল মজাদার সিনেমা অনেকদিন দেখিনা।
Avatar: pinaki

Re: এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা

খুবই সুন্দর লাগলো লেখাটা। আবার দেখতে ইচ্ছে হল ঐ সিরিয়ালগুলো। ওগুলো কোথাও পাওয়া সম্ভব?
Avatar: de

Re: এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা

এইসব সময়ে আমার বাড়িতে টিভি ছিলো না - সেভাবে দেখলে দেখা যাচ্চে আমিই সবচে' ব্যাকডেটেড লোক গুরুর! ১৯৯৪ এ বাড়িতে টিভি এয়েচে -
Avatar: b

Re: এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা

কিন্তু তখন তো বাড়িতে টিভি না থাকলে অসুবিধা ছেলো না। টিভি/টেলিফোন/ফ্রিজ ব্যাভার করতে না দিলে প্রতিবেশী হয়েচে কি কত্তি?

১৯৯৪-এ টিভি, ১৯৯৬-এ কেবল।

Avatar: sm

Re: এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা

আমাদের টিভি আসে ৮৩ সালে এশিয়াডের আগে।ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট ।কিন্তু কি বিশাল ব্যাপার!হামলোগ,বুনিয়াদ,নুক্কড় ,রজনী,রামায়ণ ,মহাভারত- সব দেখেছি।মানে চেটে পুটে!
কিন্তু ওই সময়ের আবহ,পরিবারের সকলে মিলে দেখা,পরের এপিসোডের জন্য অধীর অপেক্ষা -এগুলো তো আর ফিরে পাবোনা।
এখন এগুলো ইউ টিউব এ দেখলে হয়তো পানসে লাগবে। আগের দেখা স্মৃতির আমেজ টুকু নষ্ট হয়ে যাবে।
এই ভয়ের জন্য ইউটিউবে সার্চ করিনা।
Avatar: দ

Re: এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা

পিনাকী
যে যুগে ফ্লিপকার্ট পরের দিনই ডেলিভার করে দিত হাঁচোড় পাঁচোড় করে, তখন আমি নুক্কর আর ইয়ে যো হ্যায় জিন্দেগি পুরো স্রট কিনেছিলাম। এখনও পাওয়া যায় নিশ্চয়
Avatar: দ

Re: এক বহিরাগত সিনেমাওয়ালা

সেট


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন