গুরুচণ্ডা৯র খবরাখবর নিয়মিত ই-মেলে চান? লগিন করুন গুগল অথবা ফেসবুক আইডি দিয়ে।

সুর তো ফকির

সুশোভন প্রামাণিক

বাবা আলাউদ্দিন খাঁ শান্তিনিকেতন যাচ্ছেন। নাতি আশিস খাঁকে নিয়ে উনি বোলপুরের বাসে। সাধারণ চেহারার এক বৃদ্ধ, পরনে সাধারণ পোশাক, পিঠে কাপড়ের খোলে জড়ানো বাজনা। ভারতবর্ষের প্রতীক হয়ে আর যে সাধারণ চেহারার ও বেশভূষার সহযাত্রীরা তার সঙ্গে যাচ্ছেন, তাদের পক্ষে অনুধাবন করা কঠিন পিঠে কাপড়ের খোলে জড়ানো বাজনায় কী শক্তিশালী সুর লুকিয়ে আছে। বাসে অনেকের সঙ্গেই নিজের থেকে আলাপ করে নিলেন আলাউদ্দিন। মাইহারে রাজার শ্রদ্ধা-ভক্তি-আদর-যত্ন-আনুকূল্য কোনটাই তাঁর মূল স্বভাবে খুব একটা পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি তা তাঁর কথায় এবং ব্যবহারে ভীষণ ভাবে স্পষ্ট। কথায় পূর্ববঙ্গের ছাপ তাই এখনও খুব বেশি। নাতি বসে আছে জানলার ধারে। বাসের বিভিন্ন সহযাত্রী, জানলার বাইরে বীরভূমের প্রকৃতি আর লাল মাটির লাল ধুলো, পাঁচ বছরের আশিসের ঔৎসুক্য বাড়িয়েছে অনেকখানি। পরের পর প্রশ্ন, অনর্গল। বাবা উত্তর দিচ্ছেন...

বাবা আলাউদ্দিন খাঁ কতবড় সঙ্গীতজ্ঞ তা তো গোটা পৃথিবী জানে। বাসের জানলা দিয়ে দেখা শান্তিনিকেতনের প্রকৃতি যা আশিসের চোখে এক নতুন পৃথিবী, তার বিবরণ যে ভাষায় বৃদ্ধ আলাউদ্দিন পাঁচ বছরের নাতিকে দিচ্ছেন তাঁকে ইংরেজি ভাষায় বলে পিকটোরিয়াল ডেসক্রিপশান। আলোকচিত্রশিল্পী যেভাবে প্রকৃতিকে দেখেন প্রায় সেভাবেই আলাউদ্দিন নাতিকে প্রকৃতি চেনাচ্ছেন। যাকে তাত্ত্বিকরা ‘মিসটিসিজম’ বলেন, যা উইলিয়াম ব্লেকের ভাষায় ‘টু ডিসকভার দ্যা হোল ওয়ার্লড ইন অ্যা গ্রেন অফ স্যানড’। প্রায় সেভাবেই চেনা প্রকৃতিকে শিশুসুলভ বিস্ময় নিয়ে আবিষ্কার করছেন আলাউদ্দিন। তার স্বাদ পাচ্ছে নাতি। বাস থামলো। বোলপুর এসে গেছে।

ছোটনাগপুর মালভূমির খানিকটা অংশ প্রকৃতির অত্যাচারে ক্রমশ সমতল হতে হতে একটা লাল ধুলোর চাদরে নিজের লজ্জাটুকু ঢেকে নিয়ে একটা তরঙ্গায়িত সমভূমির রূপ নিয়েছে। তারই খানিকটা অংশ শান্তিনিকেতন। আশিস মাইহারের বাইরে প্রথমবার এলো। যে শিশু ব্লেকের কবিতায় ‘ল্যাম্ব’ এবং ‘টাইগার’-কে দেখে বিস্ময় লোকাতে না পেরে ঈশ্বরকে প্রশ্ন করেছিলো ‘সবচেয়ে নিরীহ প্রাণী এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রাণী এদেরকে তুমিই সৃষ্টি করেছো! তুমিই একই মানুষ!’ একইরকম বিস্ময় আশিসেরও। মাইহার আর শান্তিনিকেতন দেখে।

বোলপুর থেকে বিশ্বভারতীর পথ অনেক।

ততদিনে শরৎ এসেছে। সবুজ আগাছাকে ঢেকে দিয়েছে কাশের চাদর। আশিস কখনো কাশ দেখেনি;

আশিসঃ মাইহারে গাছ সবুজ, তুমই বাগানে যে গাছ লাগাও সেগুলো সবুজ, এখানে এমন সাদা কেন!
আলাউদ্দিনঃ ওডা গাছ নয়, ফুল। মা দুজ্ঞা আইসবে, তাই সাদা ফুল আর মেঘ পাঠিয়েছে।
আশিসঃ আকাশে হাতি! কেন ?
আলাউদ্দিনঃ এবারে দুগগা মা হাতির পিঠে আসছেন!
আশিসঃ মা দুগগা কে!
আলাউদ্দিনঃ মা সরস্বতীর মা!
আশিস শুনেছে মাইহারে রাস্তা ঘাটে লোকে হিন্দি বলে। মাইহারে থাকার জন্য ওদের ভাষাতে কোথাও কোথাও হিন্দি প্রভাব চলে এসেছিল। বোলপুর থেকে বিশ্বভারতীর রাস্তায় লোক বড় কম নয়।
আশিসঃ এঁরা আমাদের মতোই কথা বলে, কিন্তু মাইহারে তো বলেনা। এঁরা কারা!
আলাউদ্দিনঃ এঁরা বাঙালি।
আশিসঃ যেখানে যাচ্ছি সেখানে কে আছে ?
আলাউদ্দিনঃ গুরুজি আছেন।
আশিসঃ তোমাকে যে লোকে গুরুজি বলে!
আলাউদ্দিনঃ আহাম্মক! মূর্খ! ভুল বলে, গুরুজি তো একজনাই আছেন। চলো দেখতে পাবে
আশিসঃ আমি খেলবো কার সাথে!
ততক্ষণে ওঁরা বিশ্বভারতী পৌঁছেছেন। বিশ্বভারতীর মূল ফটক থেকে পুরো রাস্তা আলপনা দেওয়া। আশিস এমন ছবি আঁকা রাস্তা কখনো দেখেনি।
আশিসঃ এগুলো কী দাদু! রাস্তায় ছবি আঁকা কেন ?
আলাউদ্দিনঃ আলপনা, তুমি আগেও বাড়িতে দেখেছ!
বিশ্বভারতীর ভিতরে প্রবেশের পর থেকে আশিসের ধারণা হয়েছে এটাও একটা রাজার বাড়ি।
আশিসঃ এটা কি রাজবাড়ি ? রাজার নাম কী!
আলাউদ্দিনঃ রাজাই বটে! বাড়ি ছাইড়া এহানে থাকে!
ততক্ষণে রামকিঙ্কর বেইজের বেশ কিছু ভাস্কর্যের আলাউদ্দিনের সঙ্গে সঙ্গে আশিসেরেও চোখে পড়েছে। আশিস হঠাৎ ভয় পায়
আশিসঃ ওঁরা কারা দাদু ?
আলাউদ্দিনঃ কোথায় ?
আশিসঃ ঐ যে কারা সব দাঁড়িয়ে আছে! একটা লোক-একটা মেয়ে-একটা ছোট ছেলে-একটা কুকুর!
আলাউদ্দিনঃ সাঁওতাল- সাঁওতালি।
তখন রবির শেষ রাগিণীর বিন বেজে গেছে, মানে, শৃঙ্খলাপরায়ণ ছাত্রের মতোই সূর্য পৃথিবীর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তাঁর আজকের মতো এদিককার পাঠ গেছে চুকে। এখন ভোর হচ্ছে অন্য কোথাও, শুরু হচ্ছে কারোর নতুন দিন।
ঈশ্বর নামে কেউ যদি থেকে থাকেন তিনি গাছপালা-মানুষ-পাথর-নদী-পশু এমন নিয়মের বাঁধনে কষে বেঁধেছেন যে এক পা বেচাল হওয়ার যো নেই। বাধতে পারেনি বোধহয় মানুষের মন আর মনের মধ্যে জমা ইতিহাস...স্মৃতির হলুদ রং...

আলাউদ্দিন হাঁটছেন প্রত্যেকটা বাড়ী, ভেতরের ঘণ্টা, বিদেশ থেকে পড়তে আসা যুবক যুবতী বিকেলের আলো মেখে থাকা আদুরে আমগাছ। হলুদ শাড়ীতে সাইকেল চালিয়ে যাওয়া কিশোরী। প্রত্যেকেই জানিয়ে দিচ্ছে কিছু একটা নেই। কী যে নেই সেটা ওপর থেকে বোঝা খুব কঠিন। আলাউদ্দিন একটা করে পা ফেলছেন আর স্মৃতিকাতর হচ্ছেন। হুজুগে বাঙালির মতো পুরোনো স্মৃতি ভিড় ঠেলাঠেলি করে কৌতূহল মেটাতে চাইছে। আলাউদ্দিন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন তিনি আর নন্দলাল উদয়নে প্রবেশ করছেন। তখন বেশ রাত। গুরুদেবের আমন্ত্রণে এসেছেন শান্তিনিকেতনে। এবার দেখা হবে।

যে ঘরে রবীন্দ্রনাথ রয়েছেন তাঁর বারান্দা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আলাউদ্দিন শুনতে পাচ্ছেন একটি মহিলা কণ্ঠ;

‘ভুবন আমার ভরিল সুরে, ভেদ ঘুচে যায় নিকটে দূরে,
সেই রাগিনী লেগেছে আমার সকল কাজে
হাতে পাওয়ার চোখে চাওয়ার সকল বাঁধন
গেলো কেটে আজ, সফল হল সকল কাঁদন
সুরের রসে হারিয়ে যাওয়া সেই তো দেখা সেই তো পাওয়া’---

আলাউদ্দিন ঘরে প্রবেশ করলেন, সঙ্গে নন্দলাল, গান থেমে গেলো, গুরুদেব বললেন,

রবীন্দ্রনাথঃ আমাদের মাঝে ওস্তাদ কে পাওয়াও, পরম পাওয়া। বসুন খাঁ সাহেব। সাহানা মালার সদ্বব্যবহার করো।

সাহানা একটি চন্দনের ফোঁটা খাঁ সাহেবকে পরিয়ে দেন এবং গলায় মালা পরিয়ে প্রণাম করেন। আলাউদ্দিন প্রত্যুত্তরে নিজেও প্রণাম জানান।

আলাউদ্দিনঃ দেখো দিকি আবার মালা ক্যানো!

রবীন্দ্রনাথঃ নন্দলাল খাঁ সাহেব বলছেন; ‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে’, ভেবে দেখতে হবে কে কার অলঙ্কার!

মালা খাঁ সাহেবের না খাঁ সাহেবের মালা।

খাঁ সাহেব স্মিত হেসে আসন গ্রহণ করেন।

রবীন্দ্রনাথঃ সাহানা

‘সুরের রসে হারিয়ে যাওয়া সেই তো দেখা সেই তো পাওয়া---
বিরহ মিলন মিলে গেলো আজ সমান সাজে’।।

রবীন্দ্রনাথঃ নির্মল থামলে কেন ? ভয় পেয়ো না, খাঁ সাহেবও একদিন শিখেছেন তুমিও তো শিখছো। তফাৎ হল খাঁ সাহেব ওস্তাদ আহমদ আলীকে গুরু পেয়েছিলেন তুমি স্বয়ং খাঁ সাহেবকেই পাচ্ছ। আসলে ‘অরূপরতন’ নাটক মঞ্চস্থ হবে। তারই প্রস্তুতি চলছে। খাঁ সাহেব সঙ্গীত ভবনে যারা তারের যন্ত্র বাজায় তাদের তার যতটা যত্নে টেনে বাঁধা, সুর ততটা নয়। আপনি যে ক'দিন আছেন, একটু সুর বেঁধে দিন।

আলাউদ্দিনঃ গুরুদেব আমি তো বেসুরা আতাই, জীবনে তো একটা সুর লাগাইতে পারলাম না। আমি হলেম গিয়ে ম্লেচ্ছ, ডাকাতের বংশ।

রবীন্দ্রনাথঃ ডাকাতের বংশ বলেই তো খাঁ সাহেব যখন যাকে গুরু পেয়েছেন প্রকাশ্য দিবালোকে তাঁর সুরের নির্যাসটুকু এমন করে নিজের করে নিয়েছেন যে, সে বেচারা নিজের ধন আর নিজের কাছে রাখতে পারলো না। এমন ডাকাত তো আমার সঙ্গীত ভবনে আরও কয়েকটা চাই।

আলাউদ্দিন হাসেন

রবীন্দ্রনাথঃ খাঁ সাহেব বোধ হয় ক্লান্ত। হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবু সাহানা প্রতিমা রানী নির্মল নন্দর মতো আমারও লোভ হচ্ছে ওঁর বাজনা শোনার।

আলাউদ্দিন নিজের কাছে থাকা বেহালাটা বের করলেন। বাজনা শুরু হল; ঘর ছাড়িয়ে বাইরে বেরোল যত দূর দূর পৌঁছাল ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষক যাঁরা শুনেছিলেন আলাউদ্দিন আসছেন হাতে নাতে প্রমাণ পেলেন... যখন যন্ত্র থামল আলাউদ্দিন তাঁর প্রিয় পদ গেয়ে উঠলেন;

আলাউদ্দিনঃ কাজ কি ভূষণে, কাজ কি ভূষণে
মন যে আমার, শ্যামের তরে পরা্ন তা জানে।।
নয়ন ভূষণ শ্যাম দরশন শ্রবণ ভূষণ গুণে
এবার গুরুদেব ধরলেন একই সুরে,
রবীন্দ্রনাথঃ ভালোবেসে, সখী, নিভৃতে যতনে
আমার নামটি লিখো-- তোমার
মনের মন্দিরে।
আমার পরানে যে গান বাজিছে
তাহার তালটি শিখো-- তোমার চরণমঞ্জীরে॥

এই সময়ে কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে কেউ বেসুরো শাঁখ বাজায়। আর সেই বিশেষ স্মৃতির রাত থেকে আলাউদ্দিন ফিরে আসেন পড়ন্ত বিকেলে যেখানে তাঁকে এবং আশিসকে অভ্যর্থনা জানাতে উপস্থিত নন্দলাল বসু, শৈলজারঞ্জন মজুমদার, শান্তিদেব ঘোষ, উপাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সদ্য কৈশোর পেরোন কিছু তরুণী। তাঁদেরই একজন শাঁখে ফুঁ দিয়েছিলো। একই রকমভাবে আগের মতই ফুল চন্দন এবং ছাতিম পাতা দিয়ে দাদু-নাতিকে বরণ করা হয়।

সন্ধ্যে ঘনায় চারিদিকে

আলাউদ্দিন আছেন সঙ্গীত ভবনের নতুন হস্টেলে। পুরো বাড়িটা তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। নন্দলাল এলেন; এখনও গুরুজির সঙ্গে দেখা হয়নি। প্রকৃতি যে দৃশ্য আর সঙ্গীতের ঠাস বুনোটে বাঁধা তার কারিগর যদি ঈশ্বর হন, তাঁরই দুই অবতার একজন চিত্রকর একজন সঙ্গীতজ্ঞ যখন আড্ডায় বসলেন চলচ্চিত্রের মতোই এক দৃশ্য কাব্য তৈরি হল। সুর শুনে যে দৃশ্য কল্পনায় ভেসে ওঠে আর চিত্রশিল্প দেখে যে সুর আমরা মনে মনে কল্পনা করি এ দুয়ের এক মেলবন্ধন হল।

নন্দলালঃ উস্তাদজি, আসতে কষ্ট হয়নি তো!

আলাউদ্দিনঃ কষ্ট কিডা! দিব্বি এলুম! আশিসের সঙ্গে বকবক করলুম। অজয় আর তোমাদের শান্তিনিকেতন দেখলুম, দু'চোখ ভরে।

ইতিমধ্যে খেলে তৃপ্তি হয় তবে খুব একটা পেট ভরেনা এমন কিছু খাবারের যোগান হতে লাগলো। যতই রসনা তৃপ্তি হল ততই মজলিশ জমলো আড্ডার বিষয় গভীর থেকে গভীরতর হল।

আলাউদ্দিনঃ ছবি দেখেছি অনেক, বুঝেছি কম। ডাকাতের বংশ তো। বেসুরো গেয়েই জীবন কেটে গেলো। ঢোকার মুখে কিছু ভাস্কর্য দেখলুম!

নন্দলালঃ কিঙ্করের কাজ!

আলাউদ্দিনঃ মা দু হাত ভরে দিয়েছেন! আমি রোজ বাজনা শোনাই আমায় দেয়না! তুমি তো বাগবাজারের পোলা! প্রথম যখন কলকাতায় এলুম! আট বছর বয়স সঙ্গে বারো টাকা। আমি ত্রিপুরার গেয়ো ভূত। চাপা কল তো কখনো দেখিনি! তাতে যে জল পড়ে, সে জল যে খাওয়া যায় তাও ভাবিনি। নিমতলা ঘাটে থাকতুম আর গঙ্গার জল খেতুম।

নন্দলালঃ সে তো অনেকেই খায়! তখন তাঁর নাম পাল্টে যায়। চরণামৃত।

আলাউদ্দিনঃ গিরিশ বাবুর থিয়েটারে বাজনাও বাজিয়েচি, বুঝলে। বাগবাজার বলতেই পুরো ছোটবেলাটা মনে পড়ে গেলো! নন্দলালঃ আপনি নিজেকে বেসুরো বলে বিনয় করছেন বটে! আমি বিনয় না করেই বলছি, আমি ছবি এঁকে বিশেষ নতুন কিছু করিনি , তবে আমার কাজ ভীষণভাবে ভারতীয়। এইটুকুই শান্তি।

ততক্ষণে সন্ধ্যে আর একটু গড়িয়েছে। আলাউদ্দিন তাঁর যন্ত্রটি বেশ কয়েকবার নাড়াচাড়া করেছেন, পাঁচ বছরের আশিস দুই প্রতিভাধরের আড্ডা কিছুটা শুনেছে কিছুটা বিরক্ত হয়েছে। প্লেট খালি হতে আলাউদ্দিন বললেন;

আলাউদ্দিনঃ রুটি পাওয়া যাবে তো ? আমি বাবা দিনে বাঙালি রাত্রে পশ্চিমা!

(নন্দলাল মুচকি হাসেন )

নন্দলালঃ চিন্তা করবেন না। ব্যবস্থা হয়ে যাবে। বিনোদ একটা নতুন কাজ করছে আমায় একবার যেতে হবে। আপনি বিশ্রাম করুন। আমি ফিরে আসছি। আমরা উদয়নে যাব...

(নন্দলাল বেরিয়ে যান)

আলাউদ্দিন গতবার যখন এসেছিলেন উদয়নে প্রথম রাতটা আবার মনে পড়ে গেলো...

রবীন্দ্রনাথ গাইছেন;

রবীন্দ্রনাথঃ ধরিয়া রাখিয়ো সোহাগে আদরে
আমার মুখর পাখি-- তোমার
প্রাসাদপ্রাঙ্গণে॥
মনে ক'রে সখী, বাঁধিয়া রাখিয়ো
আমার হাতের রাখী-- তোমার
কনককঙ্কণে॥
আমার লতার একটি মুকুল
ভুলিয়া তুলিয়া রেখো-- তোমার
অলকবন্ধনে।
আমার স্মরণ শুভ-সিন্দুরে
একটি বিন্দু এঁকো-- তোমার
ললাটচন্দনে।
আমার মনের মোহের মাধুরী
মাখিয়া রাখিয়া দিয়ো-- তোমার
অঙ্গসৌরভে।
আমার আকুল জীবনমরণ
টুটিয়া লুটিয়া নিয়ো-- তোমার
অতুল গৌরবে॥

‘অরূপরতন’ ছাড়াও আরও একটি নাটক আমরা মঞ্চস্থ করবো ঠিক করেছি। ‘শারদোৎসব’। এ সময়ে আপনাকে পেয়ে ভালোই হল। সাহানা শারোদৎসবের কোনও একটা গান একটু ধরো দেখি....

সাহানা গান ধরে;

সাহানঃ মেঘের কোলে রোদ হেসেছে বাদল গেছে টুটি
আজ আমাদের ছুটি ও ভাই আজ আমাদের ছুটি
আহা হা হা হা
কি করি আজ ভেবে না পাই পথ হারিয়ে কোন বনে যাই
কোন পথেতে ছুটে বেড়াই সকল ছেলে জুটি আহা হা হা হা
(সাহানা থামে)

আলাউদ্দিনঃ গুরুদেবের গান শুইনলে স্পষ্ট দেইখতে পাই দস্যি ছেলেমেইয়ের মতো মেঘ আর রোদ লুকোচুরি খেইলসে। মা সাহানা যে গানখান তুমি গাইলে, ভূপমাণ্ড রাগ জান তো! সন্ধ্যে একটু গড়ালে এ রাগ গাওয়া হয়। এই প্রইথম ঠিক সময়ে ঠিক রাগ শুইনলাম।

(গুরুদেব হাসেন)

আলাউদ্দিনঃ গুরুদেব আপনার কিছু গানে আমি, লালনগীতির সহজিয়া ভাব খুঁজে পাই।

রবীন্দ্রনাথঃ লালন সাঁই এর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় জ্যোতিদাদার স্কেচের খাতা থেকে। তাঁর গানের সঙ্গে পরিচয় জ্যোতিদাদার ডায়ারিতে বেশ কিছু লালনগীতি চোখে পড়ে। তখন আমার বয়স কম। তাঁকে স্বচক্ষে দেখি কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়ায়। আমি পনেরো কি ষোলো। উনি বোধহয় শততম বছরে পা দিয়েছেন। কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ার লালনের আখড়া থেকে শিলাইদহের কুঠিবাড়ীর দূরত্ব খুব কম। পুবদিকে আধক্রোশের মেঠো পথ মাঝে গড়াই নদী।

আলাউদ্দিনঃ আমার বড় দাদা আফতাবউদ্দিনের কাছে আমি লালন সাঁইয়ের গান শুনি। তখন তো বয়স কম কথার থেকে সুরটাই টানত বেশী। একলিম রাজার একটা গান মনে পড়ছে, গাই!

আলাউদ্দিনঃ মন আমার মদিনা রে
কাশী বারাণসী
মনের মাঝে মনের মানুষ
সদাই পরবাসী
মনেতে মথুরা আছে
মক্কা কাবার ঘর
তারই মাঝে বিরাজিছে
মানুষ সুন্দর।
মনের মাঝে মরুভূমি
তরু সরবোর
খুঁজিলে পাইতে পার
জোবেদা নহর।
ভাবিয়া একলিম রাজায় বলে
মক্কা যাওয়া মিছে
মনের মাঝে খোঁজ তারে
সে তোমায় খুঁজিছে।

রাত হয়েছে সেদিনের মতো নাটকের মহড়া শেষ। সবাই যে যার ঘরে ফিরে যাবেন। তার আগেই গুরুদেব বললেন;

রবীন্দ্রনাথঃ নন্দলাল আলাউদ্দিনের মাথাটা রেখে দিও।

(এই সময়ে নন্দলালের গোলা শোনা যায়)

নন্দলালঃ চলুন খাঁ সাহেব উদয়নে যাই।

(আলাউদ্দিন দেখেন নন্দলাল ফিরে এসেছে।)

সারাদিনের ক্লান্তিতে আশিস ঘুমিয়ে পড়েছে। বাইরের জ্যোৎস্নায় মাঝে মধ্যে ভুল হয়ে যাচ্ছে দিন না রাত। যে পাখি রাতে ঘুমায় দিনে জাগে, তারাও ভুলবশত ডেকে উঠছে। আর যারা দিনে ঘোমায় রাতে জাগে তারা ভীষণই অধৈর্য হয়ে উঠেছে। আলাউদ্দিন ও নন্দলাল সঙ্গীত ভবনের হস্টেল থেকে বেরোলেন। উদয়নে অপেক্ষায় আছেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আর শান্তিদেব ঘোষ... তখন অন্ধকারের ভেতর থেকে শিউলির গন্ধের মতো স্তবকে স্তবকে উঠে-আসছে নিঃশব্দ। সুরে ভিজে যাচ্ছে ঘাস, ভিজে যাচ্ছে অবোধ পশুপাখি, গ্রহণে গ্রহণে ভরে যাচ্ছে অঞ্জলি, করপুট উঠে যাচ্ছে আকাশের দিকে। ঝলকে ঝলকে এগিয়ে আসছে স্বস্তির হাওয়া , অশ্বত্থ পাতায় লেগে থাকা লাজুক কুয়াশাও বোধহয় শুনতে পাচ্ছে আলখাল্লায় ঢাকা দীর্ঘকায় মানুষটির নিঃশব্দ পদধ্বনি। শান্তিনিকেতন আছে, সঙ্গীতভবন আছে, কলাভবন আছে, বিদ্যাভবন আছে, উদয়ন আছে শুধু তিনি যে নেই, এ ঘোরটা আলাউদ্দিনের কিছুতেই কাটছে না। এ সময়ে অশ্বথ গাছে ঘুমিয়ে থাকা কোনও পাখির ঘুম ভাঙে, কারণ তখন চাঁদের তেজ আরও বেড়েছে। সে বেচারাও গুলিয়ে ফেলেছে সময়, বছর..দিন.....

কেউ এস্রাজ বাজাচ্ছে। তার সুর কানে আসছে.....

বাবার জন্মদিন গেল এই রবিবার।

(নাতি আশিস খানের কথা, ওঁর পুত্র উস্তাদ আলি আকবরের স্মৃতিকথা ও নানাবিধ গ্রন্থের সাহায্যে কিছুটা সত্যি কিছুটা হয়তো কল্পনা এই লেখা।বাবার মুখের কথা এবং যে মানুষদের কথা এখানে উল্লিখিত তাঁদের সব কথাই কমবেশি স্মৃতিচারণা এবং অন্যান্য লেখা থেকে সংগৃহীত এবং উল্লিখিত।)



কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: de

Re: সুর তো ফকির

খুব ভালো লাগলো - কথোপকথনগুলো আরেকটু এডিট করলে আরো ভালো হবে!
Avatar: b

Re: সুর তো ফকির

কিন্তু দুটো কথা বাদ গেছে।
১। আলি আকবর রবীন্দ্রনাথের গান শুনে বলেছিলেনঃ আপনি এরকম বিশ্রী নাকি সুরে গান কেন?
২। রসগোল্লা খেয়ে রবীন্দ্রনাথের দাড়িতে হাত মুছেছিলেন।

এই দুটো ঘটনা থেকে থেকেই আলাউদ্দিনের মনে পড়ত আর ছেলেকে বেধড়্ক ঠ্যাঙ্গাতেন' গুরুদেবরে কি কইছস, অনার লগে কি করছস' এই সব বলতে বলতে।


Avatar: R

Re: সুর তো ফকির

ছোট্ট তথ্য প্রমাদ। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে লালনের দেখা হয়েছিল বলে মনে হয় না। যদিও তিনি যে কুষ্টিয়াতে লালনের আখড়ায় গিয়েছিলেন ও গান শুনেছিলেন, সে বিষয়ে বিশদ প্রমানাদি রয়েছে। এ বিষয়ে সুধীর চক্রবর্তী মশাইয়ের একটি প্রামাণ্য লেখাও পড়েছি বলে মনে পড়ে।

ভূপমান্ড রাগের নাম অগে শুনিনি। আমার ধারণা ছিল মেঘের কোলে রোদ হেসেছে ভূপালিতে। তার সাথে রবীন্দ্রনাথ কোথাও কোথাও শুদ্ধ মধ্যম, কোমল ও শুদ্ধ নিখাদ ব্যবহার করেছেন। উপরোক্ত রাগটির চলন বা কোনো নিদর্শন দিলে ক্‌তজ্ঞ থাকবো।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন