গুরুচণ্ডা৯র খবরাখবর নিয়মিত ই-মেলে চান? লগিন করুন গুগল অথবা ফেসবুক আইডি দিয়ে।

কুমারীবালাদের বিশ্বকাপ

মধুবন্তী দাশগুপ্ত

সল্টলেকের ১২ নম্বর ট্যাঙ্ক বস্তির নোংরা, প্যাচপ্যাচে রাস্তায় আমার সঙ্গে হাঁটছিলেন কুমারীবালা মন্ডল। বয়স আশি পেরিয়েছে। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভাঙাচোরা ঝুপড়ির কঙ্কালের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কুমারীবালা বলছিলেন তাঁর যৌবনের গল্প। বলছিলেন, প্রায় সাড়ে চার দশক আগে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে এই বাংলায় চলতে আসতে হয়েছিল তাঁকে। উল্টোডাঙা থেকে হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে প়ড়েছিলেন সল্টলেকে। ওই এলাকা তখন কার্যত জঙ্গল, সন্ধ্যা হলে শিয়াল ডাকে। কুমারীবালা বলছিলেন, ‘‘এই যেখানে তুমি দাঁড়িয়ে আছ, সূর্য ডুবলে সেখানে দৃষ্টি চলত না, ঘন অন্ধকার। আমরা সবাই মিলে সেই জঙ্গল কেটে সাফ করে বসতি বানালাম। দরমার বেড়া দিয়ে ঘিরলাম, প্লাস্টিক দিয়ে ঘর ছাইলাম। তারপর আস্তে আস্তে রাস্তা হল, দোকান হল। আরও অনেক বছর পর আশেপাশের এলাকায় বড়লোকরা আসতে শুরু করল। সল্টলেক বদলে গেল।’’ ছেলে-মেয়ে-বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ভরভরন্ত সংসার কুমারীবালার। কেউ রিকশ চালান, কেউ লেবার খাটেন, কেউ আবার হকার বা পরিচারিকা। মাথার উপর আছেন ১০২ বছরের বুড়ি মা।

কুমারীবালা ইদানিং ঘুমোতে পারছেন না আতঙ্কে। প্রশাসনের লোকজন এসে বলে গিয়েছেন, যুব বিশ্বকাপের জন্য বস্তি খালি করে দিতে হবে। ইতিমধ্যেই সামনের দিকে খান পঞ্চাশ ঝুপড়ি ভাঙা পড়েছে। বাকিদের কী হবে, কেউ জানে না। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বস্তিতে স্কুল চালাত। সেখানে পড়ত প্রায় দু’শো ছেলেমেয়ে। উচ্ছেদ-আতঙ্কে আপাতত স্কুল বন্ধ। বাইশ বছরের যুবতী রমা কোলে বলছিলেন, জল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। টিউবওয়েল ভাঙা পড়েছে। এখন সম্বল বলতে একটি কুয়োর জল— দুর্গন্ধযুক্ত, কালো, নোংরা।

১২ নম্বর বস্তির দু’হাজার বাসিন্দা এখনও আতঙ্কে, কেবি কেসি ব্লকের বস্তিতে সে সবের বালাই নেই। গত রবিবার সেখানে উচ্ছেদ হয়ে গিয়েছে। খান সত্তর ঝুপড়ি মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে মাটিতে। তৈরি হচ্ছে ঝাঁ চকচকে রাস্তা। ইউটিউবে মেসির ড্রিবল দেখতে দেখতে সেখানে পৌঁছে দেখা হল রাধিকা মন্ডলের সঙ্গে। চারদিকে ভাঙা ঝুপড়ির কঙ্কাল, থালা-বাসন, চিরুনি, ভাঙা স্টোভ। পুরসভার কর্মীরা এলাকা সাফ করছেন। রাধিকা বলছিলেন, ‘‘রবিবার দুপুরে ওরা যখন এল, তখন অনেকে রান্না করছিল। হাঁড়ি ভেঙে দিল। আলনায় লাথি মারল, টিনের বাক্স ভাঙল। জামাকাড় সব লণ্ডভণ্ড। আটকাতে পারলাম না।’’ তাঁর কথায়, ‘‘আমার জন্ম এই বস্তিতেই। এখানকার একজনের সঙ্গেই বিয়ে হয়েছে। আধার কার্ড, ভোটার কার্ড সব এই ঠিকানার। কী করব, কোথায় যাব, জানি না। বৃষ্টিতে মাথা গোঁজার জায়গাটুকু রাখেনি। যাদবপুরের কয়েকটা ছেলেমেয়ে ত্রিপল দিয়ে গেছে। তাই দিয়ে মাথা ঢাকছি।’’

রাধিকার প্রতিবেশী আল্পনা দাস জানালেন, রান্না করতে দেওয়া হচ্ছে না। হ্যাঁ, ঠিক শুনছেন, রান্না করতে দেওয়া হচ্ছে না কেবি কেসি ব্লকের ঝুপড়ির ধ্বংসাবশেষের আশেপাশের রাস্তায় থেকে যাওয়া মানুষদের। আল্পনার কথায়, ‘‘ওরা বলে গেছে, রান্না করা যাবে না রাস্তায়। কোথায় খাব বলুন তো! হোটেলে সব্জি ভাত খেতে কুড়ি টাকা। তিনটে লোকের সংসারে দু’বেলা মিলিয়ে ১২০ টাকা খরচ করা সম্ভব! তাছাড়া খোলা আকাশের নীচে থাকতে হচ্ছে, চাল তো ভিজে যাচ্ছে।’’ কী করছেন তাহলে? আল্পনা সাড়ে আট বছরের ছেলে গৌতম হেসে ফেলে, ‘‘গাছের পিছনে বা খালের ধারে ফাঁকা জায়গা দেখে রাঁধছে। তাড়া দিলে আবার সরে যাচ্ছে। হয়ে গেলে আমরা দৌড়ে খেয়ে আসছি।’’

সাবিনা বিবির কথায়, ‘‘ছেলেগুলোকে ফলস কেস দিয়ে দিচ্ছে। বলছে মেরে তাড়াবে। একটা ছেলে প্রতিবাদ করল, তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে মার্ডার কেস দিয়েছে।’’ সাবিনার প্রতিবেশী আরতি দাস পরিচারিকার কাজ করেন। তাঁর কথায়, ‘‘উঠে যাব কোথায়! একটা জায়গা বলে দেবে তো! কোনও পুর্নবাসনের কথা বলেনি। শুধু বলেছে, উঠে যেতে হবে, কারণ বিশ্বকাপে দামী দামী লোক আসবে।’’

বিকেলের দিকে আবার দেখা হল ১২ নম্বর বস্তির বাসিন্দাদের সঙ্গে। কেউ আধার কার্ড দেখাচ্ছেন, কারও হাতে ভোটার কার্ড। আমার সমবয়সী রবি মন্ডল বলল, ‘‘আমরা না কি অবৈধ ভাবে জবরদখল করে আছি। বেশ কথা, মেনে নিলাম। তাহলে এতদিন কেন কেউ কিছু বলল না? কেন আমাদের ৭০ শতাংশ বস্তিবাসীকে ভোটার কার্ড দেওয়া হল! প্রতি বছর ভোটের সময় আমাদের দিয়ে কেন সব রকম কাজ করায় নেতারা! এই যে চারদিকে এত বড়লোক আছে, কেউ ভোটে খাটে! যা কাজ সব আমরা করি! আর এখন বাইরের দেশ থেকে লোকজন আসবে বলে আমরা সব ফালতু হয়ে গেলাম।’’

শেষ বিকেলের মরা আলোয় চিকচিক করে ওঠে রিকশচালক হরেন দাসের চোখ। খালপাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘‘অঙ্কটা খুব সহজ, দাদাভাই। বাইরের দেশের লোকজনের সামনে দেখাবে সল্টলেকে কোনও গরীব নেই, নোংরা নেই। সব ঝকঝকে চকচকে। তাই আমদের চলে যেতে বলেছে। কালো প্লাস্টিক না কী রাখা যাবে না। কালো প্লাস্টিক মানেই নোংরা, জঞ্জাল।’’ হরেনের ছেলে আকাশ লেবার খাটেন। তাঁর প্রশ্ন, ‘‘আপনাদের যাদবপুর, টালিগঞ্জ, নেতাজিনগর, বাঘাযতীন কী করে তৈরি হয়েছিল? সেগুলো জবরদখল নয়? তাহলে ওই এলাকাগুলো ফাঁকা করা হোক। একতা হাইটস ভাঙা পড়ুক। আমরা গরীব, আপনাদের সরকারের আমাদের কাজ দিতে পারে না, তাই আমরা ঝুপড়িতে থাকি। সেটা অন্যায়?’’

অমল দাস হকার সংগঠন করেন। বললেন, সল্টলেকের ১০, ১২, ১৪, ১৬ নম্বর ট্যাঙ্ক, বিভিন্ন ব্লক, দত্তাবাদ, সিটি সেন্টার সংলগ্ন এলাকা মিলিয়ে মোট আড়াই হাজার হকার উচ্ছেদ হয়েছেন। পুর্নবাসনের কোনও প্রতিশ্রুতি মেলেনি। হকার রাঘব কোলের ছেলে রাহুল পাড়ায় ফুটবল খেলে। বাপ-ছেলে দু’জনেই কট্টর ইস্টবেঙ্গল সমর্থক। যুব বিশ্বকাপের ফাইনালটা টিকিট কেটে একসঙ্গে দেখার পরিকল্পনা করেছিলেন দু’জনে। রাঘব বললেন, ‘‘যখন প্রথম শুনেছিলাম যুবভারতীতে বিশ্বকাপ হচ্ছে, খুব আনন্দ হয়েছিল। চিরকাল তো টিভিতে দেখেছি এ সব। এই প্রথম মাঠে বসে দেখব, স্বপ্ন সত্যি হবে।’’ রাহুল বলল, ‘‘বাবা পরোটার দোকান চালাত। বুলডোজার দিয়ে ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। মায়ের অসুখ। ওষুধ কিনতে পারছি না। ওই বিশ্বকাপে পেচ্ছাব করি।’’


………………

আপনি বিশ্বাস করুন বা না-ই করুক, ফুটবল আমার রক্তে। সেই ছোট্টবেলা থেকে ইস্টবেঙ্গলের ম্যাচ হলে টেনশনে খেতে পারি না ভাল করে। বড় ম্যাচের সাতদিন আগে থেকে বুকের ভিতরে অনিবার্য লাবডুব। একবার মোহনবাগানের জালে বল জড়ালে মনে হয়, সব কিছু ছেড়ে আসতে পারি এর জন্য, সব কিছু, সব সব। এ বার ভেবেছিলাম সিজন টিকিট কাটব। প্রিয় মানুষদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিটি ম্যাচে মাঠে যাব। চিৎকার করব নীল জার্সির জন্য। জানি, খুব বেশী দূর হয়তো যেতে পারবে না, কিন্তু যদি পারে, যদি অঘটন হয়… তাছাড়া প্রাণভরে দেখব মাঠ আলো করা ভবিষ্যতের মেসি-রোনাল্ডোকে।

আমার ঘেন্না হচ্ছে নিজেকে। থুতু দিতে ইচ্ছে করছে নিজের শরীরময়। উচ্ছেদের ক্ষত ছুঁয়ে আমি রাঙিয়ে নিতে চেয়েছিলাম আমার বিকেল-সন্ধেগুলোকে। আমি যাব না। হ্যাঁ, আমি জানি, আমার না যাওয়ায় কিচ্ছুটি যাবে-আসবে না, থামানো যাবে না এই সর্বগ্রাসী উন্নয়ন। তাও যাব না। যাব না, কারণ আমি বাঙালের বাচ্চা, উচ্ছেদের গল্প শুনে বড় হয়েছি। হরেনবাবুর মুখটা ঠিক যেন ছবিতে দেখা ঠাকুরদার মতো।

আপনি যাবেন, কারণ আপনি জানেন, ওরা নোংরা, জবরদখলকারী। আপনি যখন মাঠে বসে খেলা দেখবেন, ঠিক তখনই হয়তো বৃষ্টি নামবে! আলোয় আলোয় ভরে ওঠা স্বর্গীয় যুবভারতীতে সেই বৃষ্টি কেমন অলৌকিক মনে হবে, ভাবুন! মিস করবেন না, মিস করতে নেই। এই সুযোগ দু’বার আসে না।

হ্যাঁ, বৃষ্টি হবে। রাধিকা মন্ডল গুটিসুটি মেরে ঢুকে পড়বেন প্লাস্টিকের ভিতরে।



কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন