বানভাসিরা

রুখসানা কাজল

রায়হান বোঝে বিপদ আসন্ন। কয়েকজন দাড়িওয়ালা ওকে ঘিরে ফেলেছে। তারা অতি ক্ষুব্ধ, বিরক্ত, মুসলমানরা কি বানভাসি না? তাদের ঘরবাড়ি কি পানির তলায় তলিয়ে যায়নি? যারা আসে তারা কেবলই সংখ্যালঘু খোঁজে। ওদের নাম নেয়, সাহায্য দিয়ে চলে যায়। আমরা তো কিছু পাই না স্যার।

রায়হানদের চারজনের টিমের তিনজন চলে গেছে যমুনার চরে। সেখানে অন্যের জমিতে ঘর তুলে থাকত চল্লিশটি ঘাটমাঝি সম্প্রদায়ের পরিবার। বন্যায় যমুনার জল ফুঁসে ওঠে এদের সর্বস্ব ডুবিয়ে দিয়েছে। প্রথমে রাস্তার দু পাশে, পরে স্থানীয় মাতব্বরদের সাহায্যে এই ইশকুল ঘরে ঠাই নিয়েছিল ওরা সবাই। ওদের সাথেই কয়েকঘর মুসলিম পরিবারও আশ্রয় নিয়েছিল। তারাও ঘাটমাঝিদের মত সারাবছরের অভাবচোষা। নদী পারাপার, চুন তৈরি, গরুর ঘাস কেটে আনা, মাটিকাটার কাজ করে খায়। গরু ছাগল হাঁস মুর্গি আর মানুষে ইশকুল ঘর থই থই করেছে এই ক'দিন।

ঢাকা থেকে ওরা এসেছে সামান্য টাকা আর অল্প কিছু কাপড়চোপড় সাথে নিয়ে । এসে দেখে ইশকুল ঘর প্রায় ফাঁকা। অনেক মুসলিম পরিবারই চলে গেছে জেলা শহরে আত্মীয়দের কাছে। কেউ কেউ পানি সরে যেতে ঘরে ফিরে গেছে কাল বিকেলে । যারা ইশকুল ঘরে ছিল তারা ঘুরে ঘুরে দেখালো কয়েক জায়গায় পুড়ে যাওয়া মাটি। এখানেই ইট দিয়ে অস্থায়ী চুলোয় রান্না করে নিয়েছে হিন্দু মুসলিম বানভাসি মানুষরা। ভাগ করে থেকেছে মেয়েরা মেয়েরা। ছেলেরা ছেলেদের সাথে।

যারা ছিল তাদের সাথে কথা বলে নাম লিখে নেওয়া হলো। তখুনি কিছু দেওয়া হলো না। কারণ ওদের তিনজন আবার যমুনার চরে ভেসে যাওয়া এদের ঘরবাড়ি দেখতে হেঁটে, নৌকা করে, কলার ভেলায় চড়ে, বাঁশের পুল পেরিয়ে ছুটল যমুনার চরে।

রায়হান গেলো না। কেনো গেলো না তার উত্তর খুঁজতে ইশকুল চত্বরে হাঁটছিল আর থেকে যাওয়া বানভাসিদের সাথে গল্প করছিল।সুমিত্রা, নয়না, সুমি, সুইটিরাণি দাস ওদের ইশকুলের গল্প শেষ করে অন্য বান্ধবীদের ডেকে আনতে যাওয়ার সাথে সাথে দাড়িওয়ালাদের অবির্ভাব ঘটল। তীব্র অসন্তোষে গনগন করছে ওদের মুখ, আমাদেরও তো ঘর ভেসেছে ---

রায়হান গা বাঁচায়, আরে ভাইসাব আমরা তো সামান্য সাংবাদিক। এই যে ছবি টবি তুলে নিলাম এগুলো পত্রিকায় দিয়ে নিউজ করলে আপনাদের জন্যে ত্রাণ চলে আসবে। সুন্দর চেহারার এক দাড়িওয়ালা চোখ ঘোঁচ করে জানতে চায়, কিন্তু লিস্টি যে করলেন আপনারা আমাদের নাম তো লিখলেন না? রায়হান মাখনের মত হাসে, ভাইরে আপনারা ত এখানে ছিলেন না তাই লেখা হয়নি। এবার হবে দেখবেন। কায়দা করে দাড়ি রাখা বেঁটে মত একজন সামনে এসে মারমুখী দাঁড়ায়, এখন ত এসেছি, নিন আমাদের নাম লিখেন লিস্টিতে।

কাঁপুনি লুকিয়ে সিগারেটের প্যাকেট খোলে রায়হান, ওরা এলেই আপনাদের নাম লেখা হবে। একটু অপেক্ষা করেন ভাইজান। বেঁটে বিপজ্জনক চোখে অন্যদের শুনিয়ে ঠাট্টা করে, ডুবে যাওয়া মানুষ নিয়েও আপনারা মজাক করেন ভাইজান। আমাদের চেহারা কি হাঙ্গর কুমির কামটের মত হয়ে গেছে যে খালি ছবি তুলতে এসেছেন?

মাথার উপর মশারা পাক খাচ্ছে। রায়হান ভাবে কেনো গেলাম না ওদের সাথে কিম্বা কেন এলাম এত স্বল্প ত্রাণ সাথে করে! বন্যার্তদের চেহারা, অবস্থা কি তার চেনাজানা নয়? বন্যার এই পানিপ্লাবিত অঞ্চল ছেড়ে সব গিয়ে জমা হবে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার নীচু অঞ্চলে। সে ত অই জল জেলো নীচু অঞ্চলেরই মানুষ। কলার ভেলা, তালের ডোঙা, বড় হাঁড়িপাতিল, কলস উল্টে পানিভেঙ্গে ছুটে আসা দূর্গত মানুষ কি সে চেনে না? এবার যদি ওরা ক্ষেপে মার দেয়? বেঁটের ভাব তেমন ভাল লাগছে না। মতলববাজ মতলববাজ ভাবভঙ্গিতে ক্রমশ জটলা বড় করছে। ও বোঝে কেউ না কেউ বন্যা দুর্গতদের মাঝে হিন্দু মুসলিমের বিভেদ সৃষ্টি করে গেছে। নইলে উপদ্রুত দুর্গতদের আবার ধর্মবিচার কি!

আচ্ছালামু আলাইকুম স্যার – এক ঝাঁক পরি ঘিরে ধরেছে রায়হানকে। সুমি, সুইটি, সুমিত্রার বান্ধবীরা এসে গেছে। শাহনাজ, নাদিয়া ছোট্ট মিলিয়া, গীতা, প্রিয়াঙ্কা, শামিমা কলকল করে ওঠে। গেল কালকেই ওরা ইশকুল ঘর ছেড়ে চলে গেছে নিজেদের বাড়িতে। ভ্যাদভেদে কাদার উপর পলিথিন বিছিয়ে তাতে কাঁথা কাপড়ের বিছানা করে রাতে ঘুমিয়েছে ওরা। ঘুম কি আসে! কী ঠান্ডা! আর পচা পানির গন্ধ! আমার তো গলা ভেঙ্গে গেছে। কান ব্যথা করছে! ঘড়ঘড়ে গলায় শাহনাজ জানায়, বুঝলি সুমি আমরা কিন্তুক রাত্তিরে ইশকুলেই থাকবো। জায়গা রাখিস।

সত্যিইইই----বরইতলায় হুল্লোড় ওঠে। সুমি শাহনাজদের কে যে কাকে জড়িয়ে ধরে খুশির বন্যায় ভেসে যাচ্ছে রায়হান বুঝতে পারে না। এসময় বুড়ি মোক্ষদা দাসী ইশকুল বারান্দার রেলিং ধরে চেঁচিয়ে ওঠে, হবিব, অ হবিব সুজ্জ তো ডুবতি নাগছে মাগরিবের আজান দিবা না মিয়া? আর ওডা কিডা? সুজামাঝির ছইলে আরমান না? ও আরমান ভিজে ঘরে পোয়াতি বউটার ঠান্ডা নাগলি কিন্তুক বাচ্চার ক্ষতি হয়ে যাবে নে। বউমারে নিয়ে রাত্তিরে চলে আসিস বাপ। একটু না হয় কষ্ট করেই সবাই থাকবানি নিদানের এই কদিন।

বেঁটে নুয়ে পড়ে নম্রতায়। আরমান এগিয়ে যায়, হ মাসি তাই তো বলতি আসতিছিলাম। কারা যেনো বল্ল ত্রাণ খালি হিন্দুদের জন্যে দেওয়া হবে --- মোক্ষদা দাসি হাত ঝেড়ে মশা তাড়ায়, ধুর ধুর দুগগতদের আবার জাত কিয়ের বাপ! অই হারামজাদাগো মুকি পোকা পড়ুক, তুই যা বউমারে নিয়ে আসেক--

ভাটপিয়ারী জঃ রাঃ সাঃ বহুমুখী বিদ্যালয়ের মাঠে বসে উপদ্রুত ছাত্রছাত্রী আর শিশুদের নিয়ে আজানের শব্দের সাথে ভেসে আসা উলুধ্বনি শোনে রায়হান ।




Avatar: aranya

Re: বানভাসিরা

'আজানের শব্দের সাথে ভেসে আসা উলুধ্বনি'

- স্বপ্নের মত শোনায়। স্বপ্ন সত্যিও হয় কখনো কখনো, এই পোড়া দুনিয়াতেও
Avatar: জারিফা

Re: বানভাসিরা

মুগ্ধতা। অসামান্য লেখনী। 'দুগগতদের আবার জাত কিয়ের বাপ!' ...সত্যি যদি দুর্গতের বাইরেও সবাই সবার সম্পর্কে ঠিক এমনটা ভাবত, সবসময়ই।
Avatar: প্রতিভা

Re: বানভাসিরা

ভালো লাগল। তবে বড় সংক্ষিপ্ত। আর একটু লিখলে হতো না ?
Avatar: দ

Re: বানভাসিরা

সুন্দর লেখা। বড্ড ছোট, আমিও বলি আর একটু হলে ভাল হত।

"মাথার উপরে মশারা পাঁক খাচ্ছে" এখানে চন্দ্রবিন্দু হবে না। পাঁক মানে কাদা। এখানে পাক খাচ্ছে হবে।
Avatar: দীপা ভট্টাচার্য

Re: বানভাসিরা

কাজল আমার বইমেলার বন্ধু ।। ওর লেখা আমাকে মুগ্ধ করেছে । আর ও একটু পেলে আর ও একটু নিতাম ।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন