অসন্তোষের কারণ

কৌশিক দত্ত

চিৎ হয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে কোনো এক সময় যে পাশ ফিরি, সে তো অসন্তোষের ফলেই, পিঠ ব্যথা হয়ে যায় বলেই। নইলে কে আর নড়াচড়া করত পরিশ্রম করে? এই যে আমরা সবাই মিলে বেশ ভাবিত হয়েছি চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে (না, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে এখনো তেমন ভাবনা গণস্তরে চোখে পড়ছে না, শুধু চিকিৎসা পরিসেবা নিয়েই ব্যস্ততা), সেও তো অসন্তোষের খোঁচা খেয়েই। চিকিৎসা বিজ্ঞান রে রে করে উন্নয়নের পথে ধেয়ে চলেছে নোবেল প্রাইজ-টাইজের ঘুঙুর বাজিয়ে, ওদিকে রোগীদের একটু বাজিয়ে দেখলে কেবলই রাগত রাগের তার সপ্তকের কড়ি মা ছাড়া অন্য কোনো সুর বেরোচ্ছে না। অগত্যা খুঁজে দেখার পালা, সুর কোথায় কাটল? অগত্যা আত্মবিশ্লেষণ। গরজ বড় বালাই। পরিসংখ্যান সহ মূল্যবান নিবন্ধ অনেকে লিখবেন। আমার কাজ হল এলোমেলো কথা বলা; মনে যা আসছে, তা অপরিমার্জিত রূপে বলে ফেলা।

চিকিৎসকেরা অনেকে বলছেন, এ হল হিন্দী সিনেমার মাস্টার দীননাথ সিন্ড্রোম। সৎ স্কুল মাস্টারের সততার একমাত্র পরিচয় তার দারিদ্র্য, সন্তানদের ভরণপোষণে অক্ষমতা, আত্মরক্ষা করতে না পারা। তাঁর হেরে যাবার ভিত্তির উপরেই দাঁড়িয়ে থাকে তাঁর রাগী যুবক পুত্রের ভায়োলেন্স নির্ভর সমাজবদলের গল্প। তাঁর জীবনের সমগ্র যাপন একই রেখে তার গা থেকে দীনতার রোঁয়া ওঠা পুরনো কম্বলটুকু সরিয়ে নিলে আমাদের সামাজিক মনের বিচারালয়ে তাঁর নিষ্ঠার আর কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না। একাহারী ভিষগ আর বল্কলপরিহিত বুনো রামনাথের ফ্যান্টাসিতে অভ্যস্ত মন সচ্ছল শিক্ষাবিদ বা চিকিৎসককে সন্দেহ করবেই। যুক্তিটা উড়িয়ে দেবার মতো নয়, বিশেষত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সিংহভাগ যেহেতু আর্থিক, চিকিৎসা সংক্রান্ত বেশিরভাগ আলোচনাতেই “ওঁ শান্তি”-র মতো এসে পড়ে “মোটা অঙ্কের ভিজিট”-এর প্রসঙ্গ। অস্বীকার করার উপায় নেই, বাবা-মায়েরা প্রাণপণ অত্যাচারে ছেলেমেয়েদের ডাক্তার বানাতে চান মূলত স্বচ্ছলতার লোভেই !
 
অযৌক্তিক না হলেও এই তর্ক অসম্পূর্ণ। সকলেরই যে পয়সা বা সাফল্য দেখে চোখ টাটাচ্ছে, এমন ধরে নেওয়ার পিছনে একরকম অহংকার আছে। আর আছে আত্মাবলোকনে অনিচ্ছা। বুনো রামনাথের পাশাপাশি রাজানুগ্রহপ্রাপ্ত সচ্ছল পণ্ডিতবর্গেরও সামাজিক সম্মান চিরকাল অত্যুচ্চ থেকেছে। সবচেয়ে বড় বিলিতি গাড়ি থেকে নামা কোট পরা ডাক্তারের ওপরেই সর্বাধিক ভরসা করেন বেশিরভাগ মানুষ, যাঁরা বাজারের নিয়ম মেনে রোগী সত্তা হারিয়ে ক্রমশ উপভোক্তা বা ক্রেতা হয়ে উঠেছেন। এই বাজার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে চাপা ক্ষোভ থাকবেই, কিন্তু যে মানুষ মনেপ্রাণে কাস্টমার, কোম্পানির ছাপ দেখে জামা কেনেন, তাঁর ক্ষোভের একমাত্র কারণ জিনিসের (এক্ষেত্রে ডাক্তারের) দাম হতে পারে না। নিশ্চয় কোথাও গুণমান বিষয়ে অতৃপ্তি বা নিদেনপক্ষে ঠকে যাবার ভয় কাজ করছে।  সেই অতৃপ্তি আর ভয়ের কারণ বোঝা জরুরি। পাশাপাশি এটাও বলা দরকার যে আমাদের রাজ্যের বৃহৎ সংখ্যক চিকিৎসক কেন্দ্রীয় সরকারী করণিকদের তুলনায় কম বেতন পান। 

দোষারোপের পরিচিত খেলাটার ফাঁদে পড়ে যাবার আগে একবার দেখে নেওয়া যাক, চরিত্রগত ভাবে চিকিৎসা পেশা কোথায় আলাদা আর কোথায় সমস্যাজনক?  অসুস্থতা, স্বাস্থ্য ও রোগ সংক্রান্ত রহস্য, এবং মৃত্যুভয় সাধারণ মানুষকে এক চূড়ান্ত অসহায় অবস্থায় দাঁড় করায়। একইসঙ্গে চিকিৎসককে (হয়ত তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধেই) তুলে দেয় ক্ষমতার অত্যুচ্চ শিখরে, যেখান থেকে নেমে আসা খুব মুশকিল। সেই শৃঙ্গের নির্বাসনে প্রত্যাশার পাহাড়ের ওপর প্রতি মুহূর্তে পতনের ভয় নিয়ে চিকিৎসক খুঁজতে থাকেন হারিয়ে যাওয়া মইটা, কিন্তু মুখ ফুটে সেকথা বলতে পারেন না কাউকে, কারণ আত্মপ্রত্যয় বা প্রত্যয়ের ভান অস্তিত্বের সঙ্গে কবচ-কুণ্ডলের মতো সেঁটে রাখা ছাড়া তাঁর অন্য উপায় নেই। অত উঁচু থেকে নীচের মানুষগুলোকে যেমন অনেকে লিলিপুটের মতো দেখেন, তেমনি নীচ থেকে টঙে চড়া লোকগুলোর মুখের রেখা দেখা যায় না, শুধু স্যুট-বুট দেখা যায় আর তাদের দেখতে লাগে সন্দেহজনক “অপর”-এর মতো। 

সংক্ষেপে বলতে গেলে, মানুষের জীবন ও তার যাপনের উপর চিকিৎসক যে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে সক্ষম, তা একই সঙ্গে শ্রদ্ধা ও সন্দেহ উদ্রেক করে। আমরা শ্রদ্ধাটাকে গুরুত্ব দিতে অভ্যস্ত এবং ধরে নিই যে এই শ্রদ্ধা আসলে ভালবাসার অন্য রূপ। বাস্তব সর্বদা তেমন নয়। ভালবাসা জন্ম নেবার সুযোগ পায় না উপযুক্ত আঁতুড়্রঘরের অভাবে। চিকিৎসকের প্রতি সম্ভ্রমের উৎস হল ভীতি... রোগের প্রতি, মৃত্যুর প্রতি, এবং চিকিৎসা নামক রহস্যময় (ক্ষেত্রবিশেষে আতঙ্কজনক) তলোয়ারটি মুষ্টিবদ্ধ দক্ষিণহস্তে ধারণ করে আস্ফালন করছেন যিনি, তাঁর প্রতিও। গ্রহীতার এই ভয় ও সভ্রম, এবং নিজের নলেজ প্রিভিলেজ কাজে লাগিয়ে চিকিৎসক অনেক কিছু পারেন, বলা ভালো “পারতেন” গত কয়েক হাজার বছর ধরে। এই অসাম্যের ভিত্তিতেই উপার্জিত হয়েছে সম্পদ ও মর্যাদা, অর্জিত হয়েছে অবাস্তব প্রত্যাশা, পাশাপাশি এসেছে নিখুঁত চরিত্র এবং আকাশ-সমান প্রসারিত হৃদয় বহন করার দায়, যা অধিকাংশ পেশার ক্ষেত্রে থাকে না। 

এভাবে চলছিল, মূলত বিঃশ্বাসে ভর করে। কে না জানে, চিকিৎসকের নিদানকে বেদবাক্যজ্ঞানে মেনে চলার অভ্যাসের দরুন বহু অপচিকিৎসা প্রশ্রয় পেয়েছে। গ্যালেন সাহেবের হাতে জনপ্রিয় হওয়া “ব্লাড লেটিং”-এর মতো অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সহস্রাব্দকাল ইউরোপ শাসন করেছে, অথচ তার দ্বারা কোনো রোগীর উপকার হয়েছে (মৃত্যু ত্বরান্বিত হয়ে যন্ত্রণা লাঘব ছাড়া) বলে মনে করার সঙ্গত কারণ নেই। অবশ্যই গরিষ্ঠ সংখ্যক চিকিৎসক/ বৈদ্য অন্তত মানসিকভাবে মানুষের বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে চাইতেন বলে ভাবা যায়। সেই চেষ্টা থেকেই এসেছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি। পাশাপাশি ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে এসেছে ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা,কায়েম হয়েছে সমাজ ও মানবমনের উপর বাজারের নিয়ত্রণ। পুরনো সামন্ততান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা যেভাবে চলত, তাতে বিশ্বাসের বড় ভূমিকা ছিল। এর ফলে চিকিৎসক পরিষেবা প্রদানকারীর বদলে দেবতাসুলভ উচ্চাসনে অতিরিক্ত সম্মান নিয়ে অধিষ্ঠিত থাকতে পেরেছেন এবং তাঁর স্বেচ্ছাচারী হবার সম্ভাবনাও থেকেছে, যা খারাপ। পাশাপাশি বিশ্বাসের বাতাবরণের কিছু সদর্থক ভূমিকাও ছিল। কিন্তু আস্থা বা বিশ্বাস  মানুষকে উপভোক্তা হিসেবে স্থবির করে। ক্রেতার একনিষ্ঠতা প্রতিযোগিতাকে অনেকাংশে মঞ্চচ্যুত করে, যা বাজার অর্থনীতির চরিত্রবিরোধী। বাজারের প্রয়োজন তাই উপভোক্তার বিশ্বাসগুলো ভেঙে দেওয়া; তার চাহিদা বাড়ানোই শুধু নয়, তাকে একাকী, অসহায়, অব্যবস্থিতচিত্ত এবং আগ্রাসী করে তোলা। একই সঙ্গে শিল্পী থেকে শিক্ষক, স্তন্যদাত্রী থেকে চিকিৎসক, সবাইকে বিক্রেতায় পরিণত করাও আবশ্যক। সুনিপুণভাবে এই সবের আয়োজন চলছে বিগত শতক (বিশেষত শেষ কয়েক দশক) ধরে। আইনসভা থেকে সংবাদ পরিবেশক, সবাই মিলে যে কনসার্ট গাইছেন, তার মূল উদ্দেশ্য সমাজব্যবস্থায় তথা মানুষের মনে এই নতুন (অ)মানবিক সম্পর্কের বীজ গভীরভাবে বুনে দেওয়া।

বিষবৃক্ষের চারাটিতে সবে নতুন পাতা আসতে শুরু করেছে। আজ যারা নতুন ডাক্তারি পাশ করে হঠাৎ এই অবিশ্বাসের বাতাবরণে নিজেদের আবিষ্কার করছে, তারা বিস্মিত হয়ে ভাবছে, “আমরা কী দোষ করলাম?” এই দীর্ঘ সময়কাল ধরে তারা তো ছিল না, কিন্তু ইতিহাস ছিল, বীজ বপন ছিল, তাকে খেয়াল না করার ভান করে জলসিঞ্চন ছিল। 

বাজারের বপু বিস্তারের জন্য ক্রেতার সংখ্যা বাড়াতে হয়। তার জন্য লগ্নি ও বিক্রয়ের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া এবং বিজ্ঞাপনের দ্যুতিতে “উন্নত” জীবন, বিলাস বা পরিষেবার প্রতি ক্রেতাকে মোহগ্রস্ত করার পাশাপাশি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের হাড়-পাঁজর আলগা করে ফেলতে হয়। স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও দরিদ্র আর মধ্যবিত্তের মাথা থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে নিতে হয় রাষ্ট্রের ছাতা, এমনভাবে যাতে তাঁরা সুস্থতা ক্রয় করতে বাধ্য হন। একইসঙ্গে সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জীবনশৈলীভিত্তিক  সাধারণ প্রণালি এবং রোগ প্রতিষেধমূলক পদক্ষেপগুলি থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়া হয় ক্রয়যোগ্য “অত্যাধুনিক” চিকিৎসার দিকে। এভাবে এক বিশাল সংখ্যক অপারগ মানুষ স্বাস্থ্য বা চিকিৎসা নামক পণ্যটির ক্রেতা হতে গিয়ে নিজের সর্বস্ব বিক্রয় করতে বাধ্য হবার পর্যায়ে পৌঁছান। সংবাদ ও বিনোদনের বিভিন্ন গণমাধ্যম, রাজনৈতিক  এবং দেশ ও রাজ্যগুলির বিভিন্ন সরকার, সবাই মিলে এই প্রক্রিয়ায় ছন্দোবদ্ধ অংশগ্রহণ করেছে। ইতস্তত ব্যাতিক্রম অবশ্য থেকেছে, সমসত্ত্ব কিছু তো হয় না।

রোগী ক্রেতা এবং চিকিৎসক বিক্রেতায় পরিণত হলে দ্বিতীয় গোষ্ঠীর মধ্যে বণিক চরিত্রের জন্ম হবেই। তাও ব্যক্তি চিকিৎসকের ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার একটা সীমা আছে, কারণ রোগী এবং তাঁর পরিবার “পরিচিত” হয়ে ওঠেন, ক্রমশ এতটাই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতে পারেন, যখন তাঁদের আর্থসামাজিক বাস্তবতার কথা ভুলে গিয়ে শুধুমাত্র বিজ্ঞানের বই আর বাজারের শর্তগুলির কথা মাথায় রাখা সম্ভব হয় না। তাই নানা সময়ে বিভিন্ন আইনের দ্বারা এটা নিশ্চিত করা হয়েছে বা হচ্ছে,যাতে ছোটো পরিসরে একাকী চিকিৎসক নিজের পেশায় টিকে থাকতে না পারেন, যাতে তাঁকে বৃহৎ পুঁজির কাছে অবশ্যই আত্মসমর্পণ করতে হয়। এসব ব্যবস্থা যখন হয়েছে, তখন ডাক্তারকে টাইট দেওয়া হচ্ছে ভেবে অনেক সাধারণ মানুষ আনন্দিত হয়েছেন/ হচ্ছেন, কিন্তু বুঝতে পারেননি তাঁদের পাড়ার অমুক ডাক্তারকেও “ম্যাক্সিমাইজেশন অব প্রফিট”-এর কারখানায় শ্রমিক বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। পরিচিত সেই ডাক্তারটি মানুষ হিসেবে যেমনই হন, তাঁর হাতদুটো ধরে নিজের কষ্টের কথা বলে কিছু সুরাহা হত। এখন দুনিয়াব্যাপী এই চিকিৎসাযন্ত্রের কোথায় হাত আর কোথায় বা হৃদয়?

পরিস্থিতি এই নতুন ব্যবস্থার দিকে বাহ্যিকভাবে ঠেলে দিলেও মানসিক ও আত্মিক স্তরে নিজেদের চিকিৎসক সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখতে না পারার দায় চিকিৎসকদেরও নিতে হবে। প্রয়োজন, চাহিদা, লোভের ক্ষীণ সীমান্তরেখা রক্ষা করার দায়িত্ব মানুষের নিজেরই। দায় আমাদের প্রশিক্ষণেরও। শরীরকে জানতে যে পরিমাণ পড়াশুনা এবং কাজ করতে হয়েছে, তার কণামাত্র চেষ্টা ছিল না মানুষকে চেনার বা চেনানোর। চিকিৎসা আসলে কিছুটা বিজ্ঞান আর অনেকটা শিল্প, অথচ আমরা বুঝতে শিখিনি শারীরবিজ্ঞানের বাইরে মানবমনের জটিলতা বা তার সৌন্দর্য। ঠিকমত বোঝাতেও শিখিনি, আমরা কী ভাবছি বা করছি। ফলে চিকিৎসক-রোগী সম্পর্কের অ্যাকিলিস হিল হয়ে দাঁড়ায় কমিউনিকেশন, বলা ভালো, তার অভাব। আরেকটু বেশি করে পরস্পরকে চিনলে, কথা বললে, খোলামেলা হলে, বেশ কিছু সমস্যা মিটতে পারত। অবশ্যই সব সমস্যা মিটত না তাতে। বোঝাতে গিয়ে দেখেছি, সকলে বুঝতে রাজি হন না।

যে বিজ্ঞান নিয়ে এত মাতামাতি, তার সম্বন্ধে দু-একটা কথা। প্রথমত, চিকিৎসাবিজ্ঞান  ভয়ানক রিডাকশনিস্ট। মানুষের সমগ্র সত্তাকে শরীরে, শরীর থেকে একটি অঙ্গে (যেমন হার্ট), অঙ্গ থেকে অঙ্গটির একটি নির্দিষ্ট অংশে (যেমন হার্টের ভালব) সংকুচিত করে আনাই আমাদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। এভাবেই আমরা এগোতে শিখি এবং তা অনেকাংশে কার্যকর। কিন্তু এই ক্ষুদ্রায়িত পরিসরে সমগ্র মানুষটির জায়গা হয় না, আশ্রয় খুঁজে পায় না তার পরিচয়, তার সর্বাঙ্গীণ (অ)সুখ। ফলে রোগ সারলেও রোগী আর তার পরিবারের মনে অতৃপ্তি থেকে যেতে পারে। রোগ না সারলে সেই অতৃপ্তি প্রকাশিত হতে পারে বিকৃত আকারে।

দ্বিতীয়ত, এভিডেন্স বেসড মেডিসিন একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল বিষয়। গুরুত্বপূর্ণ এইজন্য যে তা চিকিৎসা বিজ্ঞানকে একটি নির্দিষ্টি রূপরেখা দেয়, নইলে যে যার ইচ্ছামত যে কোনো ওষুধে যে কোনো অসুখের চিকিৎসা করতে পারত, হয়ত ব্লাড লেটিং এর মাসতুতো ভাইয়ের শরণাপন্ন হত। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাই প্রমাণ বা এভিডেন্সের কোনো বিকল্প নেই। আবার এর হাতে সম্পূর্ণ ক্ষমতা তুলে দেওয়ার ফলে চিকিৎসা পদ্ধতি শুধু যে যান্ত্রিক হচ্ছে তাই নয়, এভিডেন্স নথিবদ্ধ করতে এবং প্রচার করতে সক্ষম কিছু প্রভূত ক্ষমতাধর আকাদেমি, জার্নাল, ল্যাবরেটরি বা বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। ভুলে গেলে চলবে না, এরা এভিডেন্স নির্মাণ বা সৃজন করতেও সক্ষম এবং এদের নৈতিকতায় অন্ধের মতো আস্থা রাখার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কারণ নেই। 

তৃতীয়ত, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির কুফল আমরা নিয়মিত ভোগ করি। অস্বীকার করার প্রশ্নই নেই, যে চিকিৎসার তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে অতি দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। আমরা এখন অনেক বেশি গভীরে গিয়ে রোগের কারণ নির্ধারণ করতে পারি। আগে যাকে একটা রোগ ভাবা হত, তার মধ্যে এখন পাঁচরকম শ্রেণীবিভাগ করা সম্ভব, যাদের চিকিৎসার মধ্যে কিছু সূক্ষ্ম তফাৎ আছে। স্ট্রোক চিকিৎসা, হৃদরোগের চিকিৎসা বা জটিল হয়ে যাওয়া নানান রোগের “ক্রিটিকাল কেয়ার”-এর ক্ষেত্রে এখন বিভিন্ন নতুন ওষুধ, উন্নত যন্ত্রপাতি, অজস্র খুঁটিনাটি মাপজোখের ভিত্তিতে চিকিৎসার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিবর্তন, ইত্যাদি এখন স্বাগত বাস্তব। এসবের দ্বারা মৃত্যুর হার সত্যিই কিছু কমেছে এবং সুস্থ হবার সম্ভাবনা খানিক বেড়েছে। কিন্তু তার চেয়েও অনেক বেশি বেড়েছে দুটো জিনিস... চিকিৎসার খরচ (নানা নতুন পদ্ধতি এবং ওষুধ প্রয়োগ করার খরচ বিপুল) এবং আধুনিক চিকিৎসা থেকে মানুষের প্রত্যাশা। একদিকে “এভিডেন্স বেস”, বিভিন্ন গাইডলাইন এবং আইনের দ্বারা নিশ্চিত করা হচ্ছে যে আধুনিক বলে গৃহীত (মহার্ঘ্য) চিকিৎসাটি প্রয়োগ না করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ, পাশাপাশি প্রচারের ফলে মানুষ ভাবতে শুরু করেছে একবার বড় হাসপাতালে গিয়ে পৌঁছতে পারলে সব মানুষের সব রোগ সারিয়ে ফেলা সম্ভব, তাও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। অতঃপর ভাবুন, সেই লাখ টাকার চিকিৎসাটি করার পর যদি আশানুরূপ ফল না হয়, তাহলে? মানুষের তৃপ্তি নির্ধারিত হয় প্রত্যাশা আর ফলাফলের সামঞ্জস্য বা অসামঞ্জস্যের দ্বারা। যে পাশ করার জন্য কাতর ছিল, সে ফার্স্ট ডিভিশন পেলে মিষ্টি খাওয়াবে, আর যে ফার্স্ট হবে বলে জেদ ধরেছিল, সে থার্ড হয়ে আত্মহত্যা করে ফেলতে পারে। জ্বর রোগে দুর্গার মৃত্যুতে সর্বজয়ার মনে যতটুকু বেদনা বা ক্ষোভ সঞ্চারিত হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি ক্ষোভ-ক্রোধ সঞ্চারিত হতে পারে আজকের দিনে কোনো মেয়ের মনে, তাঁর আশি বছর বয়স্ক মা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ফলে হাসপাতালের আইটিইউ-তে প্রাণত্যাগ করলে। কারণ প্রত্যাশার তারতম্য। প্রত্যাশা আমরাই জাগিয়েছি, হয়ত সম্মান বা বাণিজ্যের লোভে। তাই ক্রোধ, অভিযোগ। ভগবান ভদ্রলোক নীৎসের হাতে খুন হয়ে বেঁচে গেছেন, কর্পোরেট হাসপাতালের মালিকে নাম কেউ জানে না, অতএব পড়ে থাকে ডাক্তার। যমের সাথে লড়তে গিয়ে বেচারা খেয়ালই করে না, কখন যমরাজ তার হাতে গদাটা ধরিয়ে দিয়ে রোগীকে উঠিয়ে নিয়ে পালিয়েছে। ক্যামেরার ফ্রেমে এখন সে একা মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে, হাতে রক্ত। দর্শকমণ্ডলি সহজেই বুঝে নেন, মৃত্যুর জন্য দায়ী কে?      

নিদারুণ অবিশ্বাসের পরিবেশে  ভালো কাজ হয় না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় জানি, জটিল রোগীর সঠিক রোগ নির্ণয় এবং দ্রুত চিকিৎসার ক্ষেত্রে ষষ্ঠেন্দ্রিয়ের ভূমিকা বিরাট। রোগী দেখার সময় পূর্ণ মনোযোগ রোগীর দিকে দিতে পারলে তবেই মনের সবটা, ষষ্ঠেন্দ্রিয় সমেত, কাজ করে। যদি অর্ধেকটা মন পড়ে থাকে নিজের পিঠ বাঁচানোর দিকে, রোগী দেখার সময় যদি ভাবতে হয় “এই রোগী নিয়ে কী ধরণের কেস খেতে পারি” বা “এর বাড়ির লোক ঝামেলা করতে পারে কিনা”, তাহলে মনের সেই আশ্চর্য রত্নভাণ্ডারে তালা পড়ে যায়, বদলে সামনে আসে কৈকেয়ীর গোঁসাঘর আর মন্থরার ফিসফাস। রোগীকে ভালোবেসে দেখা, তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে “কিচ্ছু হবে না, আমি তো আছি” বলা, বা হাল ছেড়ে দেবার আগে নিজের জ্ঞানবুদ্ধি অনুসারে নিয়মের বেড়া ডিঙিয়ে শেষ চেষ্টা করার বদলে এখন অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি শব্দ খাতায় লিখে রাখা, আত্মীয়দের কটার সময় কী জানানো হয়েছে তা নথিবদ্ধ করে সই করিয়ে নেওয়া, বইতে যেটুকু লেখা আছে তার বাইরে যাবার চেষ্টা না করা, দায়িত্ব নিজের কাঁধে না রেখে অন্যান্য স্পেশালিস্টদের রেফার করে দেওয়া, ইত্যাদি। যেন রোগীকে নয়, নিজেকে বাঁচানোর জন্য চিকিৎসা করছি। এভাবে আর যাই হোক, সুচিকিৎসা হয় না। যাঁদের প্রতি সমানুভূতি লাভ করার কথা, তাঁদেরকেই সম্ভাব্য আক্রমণকারী বা আদালতের প্রতিপক্ষ হিসেবে ভাবতে হবে বলে যদি জানতাম, তাহলে আমরা অনেকেই হয়ত অন্য পেশা বেছে নিতাম, যেখানে এর চেয়ে কম পরিশ্রমে এর চেয়ে বেশি উপার্জন করতে পারতাম। চিকিৎসা পেশার একটা নেশা আছে, যেটা চলে গেলে আমাদের অনেকের জন্যেই কাজটি অর্থহীন হয়ে যায়।

বরং প্রয়োজন ছিল এমন এক পরিসর, যেখানে কিছু না জানার কথা বা বুঝতে না পারার কথা খোলাখুলি বলতে পারব, আরো পাঁচজনেকে ডেকে জিজ্ঞেস করার মধ্যে যেখানে অসম্মান থাকবে না। যেখানে নিজের ভুল বুঝতে পারলে চাপা দেবার প্রয়োজন থাকবে না, বরং তা স্বীকার করে শোধরানোর চেষ্টা করা যাবে চটপট, যেখানে ভুল বা ব্যর্থতা মানেই অপরাধী সাব্যস্ত হওয়া (blameworthiness) নয়। যেখানে আন্তরিকতা, সততা, নিষ্ঠা মূল্যবান। যেখানে নিজের কান্না, নিজের দুর্বলতা, নিজের হেরে যাওয়া নিয়ে পাশাপাশি বসতে পারেন সন্তানহারা পিতা আর সেই সন্তানকে বাঁচাতে না পারা চিকিৎসক... পরস্পরকে দিতে পারেন মন উজাড় করে ভেঙে পড়ার জায়গা এবং জোগাতে পারেন আরেকবার উঠে দাঁড়ানোর শক্তি।         

গাফিলতি কি তবে সত্যি থাকে না? অবশ্যই থাকে। লোভ কি নেই? আছে বলেই তো সমস্যা। চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন কি নেই? অবশ্যই আছে। চিকিৎসা হওয়া উচিত মানবিক। তার উপর নিয়ন্ত্রণ হওয়া উচিত বিজ্ঞানসম্মত, যুক্তির ভিত্তিতে পরিবর্তনযোগ্য (কারণ বিজ্ঞান পরিবর্তনের উপরেই ভর করে বেঁচে থাকে), বাস্তবসম্মত এবং মানবিক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল রোগী-চিকিৎসক সম্পর্ক। সেটাকে বিষিয়ে দেবার চেষ্টা চলছে বহুদিন ধরেই। এই অপচেষ্টা আটকানোর জন্য সাধরণ মানুষ, বিচার ব্যবস্থা, সৎ সাংবাদিক, সমাজকর্মী এবং সরকার, সকলকেই সচেতন হতে হবে। চিকিৎসকদের বিশেষ মনোযোগী হতে হবে আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধিতে। নীচে নেমে আসতে শিখতে হবে, কথা বলতে শিখতে হবে। হাত বাড়াতে শিখতে হবে। অসহিষ্ণুতা একটি যুগলক্ষণ, যা সর্বব্যাপী আজকের পৃথিবীতে। রোগী-চিকিৎসক উভয় পক্ষকেই সেকথা বুঝতে হবে এবং তার প্রতিকারে সচেষ্ট হতে হবে। শেষ অব্দি মানুষই তো পারে।




মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 5 -- 24
Avatar: সনৎ মিশ্র

Re: অসন্তোষের কারণ

দারুন লেখা
Avatar: জ

Re: অসন্তোষের কারণ

কৌশিক,
খুব ভাল লিখেছেন।

পার্থপ্রতিম মৈত্র,
মার্জনা করবেন, আমি চিকিৎসক মাত্র, অন্যের মানসিকতার সাবজেক্টিভ দৃষ্টিকোণ আনা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সেটুকু মেনে নিয়েই বলছি। আমি ক্ষেত্রবিশেষে রোগী বা রোগীর বাড়ির রোগ, সেই সত্তাটা হয়তো আবান্তরই হবে। কিন্তু আসল কথাটা হল, আপনার এই যে প্রশ্ন, "... সব ডাক্তার কি সম্মাননীয়? জাল ডাক্তার, অর্থগৃধ্নু ডাক্তার, ব্যবসায়ী ডাক্তার, অপচিকিৎসক এদের কারও বুঝি অস্তিত্ব নেই?" এ নিয়ে দুটো কথা বললে সেটার যুক্তিটা একটু দেখবেন, কেবল 'কে বলছে?' সেটুকুই দেখবেন না; যদিও সেটুকু একেবারে দেখবেন না, এমন আবদার নেই।

জাল ডাক্তার নিয়ে দায় কার? ডাক্তারের, নাকি সরকারের? নাকি সমাজের, রাজনীতির? একজন পাশ করা ডাক্তার 'জাল ডাক্তার'এর জন্য সবথেকে বেশি ভোগে। কিন্তু সে তো ডাক্তারদের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পর্কিতই নয়! সে ডাক্তারদের সঙ্গে পড়ে না, সামাজিকভাবে মেশে না (যদিও ঠকিয়ে কিছু জায়গায় গা-ঘেষাঘেষি করে ফটো তোলে)। তার কাজের দায়িত্ব ডাক্তারের ওপর চাপানো যায় কি? বুঝলাম না। মানে, আপনার নাম করে, আপনার আইডেন্টিটি কার্ড চুরি করে, যদি কেউ আপনার প্রাপ্য কিছু নিয়ে পালায়, আপনি তো তার শিকারই হলেন, তার কর্মের দায়িত্ব আপনার ওপর কেউ ভুল করে চাপাতে পারে, কিন্তু সেটা তো ঠিক নয়, সত্য নয়। তেমনই জাল ডাক্তার নিয়ে দায় ডাক্তারের নয়।

"অর্থগৃধ্নু ডাক্তার, ব্যবসায়ী ডাক্তার" --এগুলো একদম সত্যি কথা। এরা না থাকলে ডাক্তাররা মার খেত না। কৌশিক দত্ত লিখেছেন বটে, "বাজারের প্রয়োজন ... চিকিৎসক, সবাইকে বিক্রেতায় পরিণত করাও আবশ্যক।" লিখেছেন, "রোগী ক্রেতা এবং চিকিৎসক বিক্রেতায় পরিণত হলে দ্বিতীয় গোষ্ঠীর মধ্যে বণিক চরিত্রের জন্ম হবেই।" কিন্তু এ নিয়ে রোগীর ধারণা, আমি যেটুকু বুঝি, অন্যরকম। তার ধারণায় ডাক্তার লোভী, চতুর, সুযোগসন্ধানী, ধান্দাবাজ। এবং তার ধারণা পুরো ভুল নয়। অকারণ ইনভেস্টিগেশন, কমিশন কাটমানি, ভর্তি করে রাখা-- এগুলো কর্পোরেট হাসপাতালের একার কাণ্ড, এ বললে অনৃতভাষণের দায়ে পড়তে হবে। এমনকি হাউজস্টাফ পিজিটি ইত্যাদি জুনিয়র ডাক্তার অনেকে এখন এইভাবে ভাবছে। 'এখন' বললাম? আমাদের সময় ছিল না? ভুল বললাম, তখনও ছিল, কিন্তু নেহাত লুকিয়েচুরিয়ে, এখনা আছে বুক ফুলিয়ে। কৌশিক এ নিয়ে বেশি লেখেন নি, বোধ করি এজন্য নয় যে ব্যাপারগুলো জানেন না, বা অস্বীকার করেন, বা চেপে যেতে চান। কিন্তু এদের তৈরি হবার পেছনে বাজার, বাজারবোধ, বাজারি বাস্তবতা-- যা হবু ডাক্তারের মা-বাবাকেও প্রণোদিত করে ছেলে বা মেয়েকে ডাক্তার বানাতে, সেটাকে পাখির চোখ করেছেন। সব লেখার অভিমুখ এক থাকে না। কথাটা লেখা হয় নি, কিন্তু যেভাবে লেখাটা এগিয়েছে তাতে এদের আগমন হবে, সেটা মনেই হয়।

"অপচিকিৎসক' নিয়ে, পার্থপ্রতিম মৈত্র, একটু সমস্যা আছে। অপচিকিৎসা কে করছে, কেন করছে, কতটা করছে, কোনটা অপ, এই সব না বোঝালে কার কাজটা আপনি কীভাবে দেখবেন সেটা বলা মুশকিল। ধরুন আমি কোনো রোগীকে বইয়ে পড়া চিকিৎসা অনুযায়ী চিকিৎসা দিলাম না। ধরা যাক, তার ওষুধ দেবার আগে যে ইনভেস্টিগেশন করা দরকার বলে বইতে লেখা আছে, সেই ইনভেস্টিগেশন না করিয়েই ওষুধ দিলাম। "অপচিকিৎসা''? নাও হতে পারে। বইটা যে আর্থসামাজিক অবস্থানের মানুষের জন্য লেখা (অথচ এভিডেন্স বেসড মেডিসিন-এর যুগে কোনো ইউভার্সাল (ও)ম্যান-এর জন্য উপযুক্ত বলে ধরা হচ্ছে), সেই মানুষ তো কল্পিত, আমার রক্তমাংসের রোগী যে অন্যরকম-- তার রোজগার অন্যরকম, চিকিৎসকের থেকে তার এক্সপেক্টেশন অন্যরকম, তার সামাজিকভাবে নির্মিত
ধ্যানধারণা অন্যরকম।
তবে, নেহাতই অপচিকিৎসক অপচিকিৎসকও অনেক আছেন, তাঁদের "অর্থগৃধ্নু ডাক্তার, ব্যবসায়ী ডাক্তার" দের দলে ফেলাই সঙ্গত। তবু স্ট্যাম্প মারার আগে, একটু ভেবে নেওয়া দরকার, যাকে অপচিকিৎসক বলছেন তিনিই হয়তো সুচিকিৎসক, বইয়ের মাপে নন যদিও।
"সবটাই রুগীদের মনের ভ্রম? বললেই বলবেন আমি ঈর্ষাপরায়ণ" মোটেই না। মনের ভ্রম নয়, সেটা কৌশিকের কথায় যদি স্পষ্ট নাও হয়ে থাকে, আমার কথায় স্পষ্ট। আর কৌশিক বলবেন আপনি "ঈর্ষাপরায়ণ"? না। আপনি দেখুন কী লিখেছেন কৌশিক, "সকলেরই যে পয়সা বা সাফল্য দেখে চোখ টাটাচ্ছে, এমন ধরে নেওয়ার পিছনে একরকম অহংকার আছে। আর আছে আত্মাবলোকনে অনিচ্ছা।"

যাক গে, "আপনার লেখা থেকে প্রত্যেকটি লাইন তুলে প্রমাণ করা যেতো যে এ সবই আংশিক সত্য।" সহমত। আপনার লেখা থেকেও হয়তো কেউ কিছু প্রমাণ করতে পারে। সেটা খুব খারাপ কিছু নয়, তবে একসাথে কিছু উত্তর খোঁজা জরুরি।

অভিনন্দন, কৌশিক দত্ত।
ধন্যবাদ, পার্থপ্রতিম মৈত্র।

Avatar: গৌতম মিস্ত্রী

Re: অসন্তোষের কারণ

কঠোর সত্য কথাগুলি একজন চিকিৎসক যতটা বুঝবে আর সত্য বলে মানবে সাধারণ মানুষ সংকট কালে দ্বিধাগ্রস্ত হতেই পারে। তখন বুদ্ধি গুলিয়ে যায় যে। একমাত্র রাষ্ট্রই পারে এর সমাধানের পথ দেখাতে। তেমন রাষ্ট্রনেতা বা রাষ্ট্রনীতি দেখি না।
Avatar: sm

Re: অসন্তোষের কারণ

চিকিৎসা একটা পেশা। এটাই বাস্তব। এর বেশি কিছু না।
অন্য প্রফেশনের কথা ধরি। ধরা যাক ,ওকালতি। এখানেও মানুষ ঘটি বাটি বেচে উকিলের দ্বারস্থ হয়। মামলার ফয়সালা হয়ে ওঠেনা।বছরের পর বছর কোর্টের দরজায় ঘোরে। উকিলের ফি গোনে। পরিবর্তে 'সানি' র মতো বলতে ইচ্ছে করে -মেলে শুধু তারিখ!কপিল সিব্বল,জেঠলি,ভূষণ,জেঠমালানি -এদের ফি লক্ষ লক্ষ্ টাকা ।ডাক্তার দের ফি সে তুলনায় নস্যি। কি এদের বিরুদ্ধে তো লোকে শির ফুলিয়ে চেঁচা মেচি করে না?বরঞ্চ বাজারে রটে কি বিরাট উকিল -তাই তো এতো ফি!অথচ দেখুন দুই প্রতিপক্ষ -লক্ষ টাকা ফি নেওয়া, উকিলের একজন তো হারবেই।
সে জায়গায় ডাক্তারের প্রতিপক্ষ তো ওপরওয়ালা।
ওই অসম লড়াই এ ডাক্তার তো মাঝে মাঝে জেতে তো নাকি!
এখন শহরে একটা দো তলা বাড়ির প্ল্যান করতে ,নামী আর্কিটেক্ট বা ইঞ্জিনিয়ার এর ফি, দেড় থেকে দু লক্ষ টাকা!
কাউকে চেঁচাতে শুনেছেন?
ডাক্তার তিনশো টাকা ফি নিয়ে একটা প্রেসক্রিপশন লিখলে তার ওষুধের দাম পড়ে প্রায় হাজার টাকা। এর পর থাকে ইনভেস্টিগেশন।
সুতরাং ডাক্তার অর্থগৃধ্নু ,লোভী বলাটা ঠিক নয়।
আর রুগীর ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু বা ক্ষতি হলে কম্পেনসেশনেও দাঁড়ি টানা উচিত।
একটি সাম্প্রতিক কেসে ক্ষতি পূরণের দাবি কয়েক কোটি টাকা!ঠিক কি জন্য?
তিনি রোজকার বেশি করতেন বলে?
যদি কোনো কয়েক হাজার টাকা বেতনের কোনো যুবক মারা যেতো-তাহলে কি কম্পেন্সেশন কমে হতো মাত্র এক দুলাখ টাকা?দুজনেই কিন্তু ডাক্তার কে সমান ফি দিয়েছিলেন।দুজনের ক্ষেত্রেই গাফিলতির মাত্রা সমান।
একটি শিশু যদি ভুল চিকিৎসায় মারা যায় তার ক্ষেত্রেই বা কি কম্পেন্সেশন হবে?কারণ সে তো রোজকার করতেই শেখেনি।ভবিষ্যতে কি রোজকার করতো তার মাপ টাও বিচারক জানবেন; কেমনে?
তিন ,একজন রোগীর মাথা ব্যাথা হয়েছে। একজন সিটি স্ক্যানের নিদান দিলেন আর একজন ক্লিনিক্যাল এক্যুমেন এর ওপর ভরসা করে প্যারাসিটামল দিয়ে ছেড়ে দিলেন। দেখা গেলো পেশেন্ট এর ব্রেন টিউমার ছিল। দ্বিতীয় ডাক্তার বাবু টি ওপরওয়ালার কাছে খেলায় হেরে গেলেন।জাজ নাক কুঁচকে জিগালেন, আমেরিক্যান গাইডলাইন তো বলছে সিটিস্ক্যান করানো উচিত। আপনি করান নি কেন?কি জবাব দেবেন পেশেন্ট দরদী অভিজ্ঞ ডাক্তার বাবুটি?
Avatar: ম্যাক্সিমিন

Re: অসন্তোষের কারণ

আমার তো খুবই ভালো লাগল। তিনবার পড়লাম।
Avatar: pi

Re: অসন্তোষের কারণ

ডাঃ আশিক ইকবাল একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। রইল।

'দুধের শিশু, মাত্র চার মাস বয়স।
খালি কাঁদছে, আর মাঝে মাঝে চুপ করে চারপাশের মুখ গুলোকে দেখছে।

ভাবছে এরা কারা???

আসলে ঠিক তা নয়, ও তার মা কে খুঁজছে।

আমাদের ওয়াডের ঘটনা।

গত হপ্তায় একটা বাচ্চার অপারেশন করা হয়েছিল। তার ডান পায়ে একটা টিউমার সাসপেক্ট করা হয়। সেজন্য প্রাথমিক ভাবে ওর পা থেকে অপারেশন করে বায়োপ্সি করা হয় যাতে টিউমার টা কি সেটা জানা যায়। রুটিন ব্যাপার।

কিন্তু আমাদের প্রাথমিক ভাবে টিউমার টা খারাপ বলেই মনে হয়। সেজন্য আমাদের তরফ থেকে শিশুটির বাড়ির লোক ও বাবা মা কে সব কিছু বলা হয়। এমনকি শিশুটির প্রাণ বাঁচাতে তার পা কাটতে হতে পারে, তাও বলা হয়। এবং এও বলা হয় যে আমাদের ধারণা ভুলও হতে পারে।

শিশুটির বয়স চার মাস, কন্যাসন্তান।

বাকিটা অনুমান করতে পারেন কি??

বাবা মা ওই টুকু বাচ্চা টা কে রাস্তার ধারে ফেলে বাড়ী চলে যায়। ভোর রাতে শিশুটিকে রাস্তার কুকুররা ছিঁড়ে খাচ্ছিল। কিছু ভালো মানুষের চেষ্টায় বাচ্চাটিকে আবার হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।

তারপর পুলিশের চেষ্টায় পরদিন তার বাবা মা কে ডেকে আনা হয়।

আপাতত সে আমাদের ওয়াডেই আছে। তার মা তারপাশে বসে আছে। কিন্তু তার মা এখনো অবধি তাকে কোলে নিচ্ছে না, কিছু খাওয়াচ্ছে না। বাচ্চা টিকে খাওয়াচ্ছে আমাদের শিশুবিভাগ। মায়ের যেন কোন ভ্রুক্ষেপ নেই সে মরলো না বাঁচলো।

শিশু টিও যেন কেমন চুপ হয়ে গেছে। কান্নাকাটি বন্ধ করে দিয়েছে। খালি তাকিয়ে দেখছে।

খারাপ লাগছে?? রাগ হচ্ছে??

দোষ টা কার??

ওই টুকু দুধের শিশুটার যে এখনো ডায়াগনোসিস না হাওয়া রোগে ভুগছে?? নাকি তার বাবা মা যাদের কাছে অসুস্থ কন্যাসন্তান থাকার থেকে না থাকা ভালো?? নাকি ডাক্তারদের যারা তাদের সন্দেহ বাড়ীর লোককে জানিয়ে দিয়েছে??

কিছু ভাবছেন?? কার দোষ??

এতো ভাবার কিছু নাই।

কিছু মানবাধিকারবাদী আর প্রশাসন দোষ আর দায়িত্ব টা ডাক্তারদের উপরেই দিয়েছেন। বলেছেন আপনারা বাবা মা কে বোঝাতে পারেননি।

আর দোষী হিসেবে আমরা বাচ্চা ও মা কে সামলাচ্ছি। পাছে মা আবার তার বাচ্চা কে ফেলে না পালায়।

কাল কিছু সংবেদনশীল মানবাধিকারবাদী আমাদের অন্য একটি বিষয়ে ফেবুতে সংবেদনশীল হতে জ্ঞান দিচ্ছিলেন।

তাদের কাছে আমার একটি মাত্র প্রশ্ন একরাত ওই বাচ্চা ও তার মা কে পাহারা দিতে পারবেন যাতে তার মা বাচ্চা টাকে ফেলে যেতে না পারে??'
Avatar: আশিক ইকবাল

Re: অসন্তোষের কারণ

মনের কথা।
Avatar: পার্থপ্রতিম মৈত্র

Re: অসন্তোষের কারণ

মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত বাড়ির রুগী এবং পরিজন, ডাক্তারদের ঈশ্বর মনে ক'রে প্রাণ তাঁদের হাতে সঁপে নিশ্চিন্ত হতে চান। ফলে ঈশ্বরেরও সামান্য দায়িত্ব থাকে সমর্পিতজনকে আশ্বস্ত করা। তার কাছে বিশ্বস্ত, আস্থভাজন হয়ে ওঠা। আস্থার সূত্র টা কোথাও ছিঁড়েছে। সেটাকে জোড়া দেওয়ার চেষ্টা করা দরকার ছিল । দুপক্ষ থেকেই আশু কাজ হওয়া উচিৎ ছিল সেই ছিঁড়ে যাওয়া গ্রন্থিটাকে নতুন করে বাঁধা। তার বদলে এই যে ব্লেম গেম শুরু হয়েছে তাতে গোটা বিষয়টা হাসির হয়ে যাচ্ছে।

অন্যদের কথা থাক আমি আমার কথাটুকুই বলি। জালি ডাক্তার যে বিশুদ্ধ ডাক্তাররা পয়দা করেন না, সেটা সবাই জানে। আমি শুধু বলতে চেয়েছিলাম রুগী হিসাবে আমার অসহায়তার কথা। কোনও বিশুদ্দ্ধ ডাক্তারের কাছে গিয়েও তো বলতে পারবো না আপনার সার্টিফিকেট দেখি। যদি পাশ করা হন, তবে দেখাবো নৈলে নয়। কোনও মেকানিজম নেই এই ভেরিফিকেশনের। কিন্তু প্রসঙ্গটি তোলা যাবেনা, কেননা এক্ষেত্রে কারও রেসপনসিবিলিটি নেই। একজন যুক্তি দিয়েছেন জেঠমালানী বা সিব্বল বা শান্তিভূষণের মত উকিলেরা লক্ষ লক্ষ টাকা অ্যাপিয়ারেন্স ফি নেন কিন্তু তাঁদের কেউ কিছু বলেনা। সমস্যা হলো যাঁরা এঁদের দিয়ে কেস করায় তারা উচ্চকোটির জীব। তাদের ডাক্তারও সমতুল্যই হওয়া উচিৎ। আমারা যারা কোর্ট চত্বরে পা রাখতে বাধ্য হই, তাদের অ্যাডভোকেটদের অ্যাপিয়ারেন্স ফি খুব বেশী হলেও দু থেকে আড়াই হাজার টাকার মধ্যে। কিন্তু একজন সার্জন দিনে সাতটা অপারেশন করলেও মোট আমদানী কত হয়? আমার লিভার ট্রানসপ্লান্টেশনের জন্য খরচ হতো তিরিশ লক্ষ টাকা। তার মধ্যে সার্জন ফিজ কত থাকতো? অপচিকিৎসক নিয়ে কথা বলায় এখানে কেউ কেউ ক্ষুন্ন হয়েছেন।এটা সত্যি কথা, চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করলে অনেক ডাক্তারই (অবশ্যই সবাই নন) প্রচণ্ড রুষ্ট হন। "গুগল ডাক্তারের পেশেন্ট বুঝি" বলে ব্যঙ্গ করেন। আমি কিন্তু আজ পর্যন্ত একজনও রুগীর সন্ধান পাইনি যিনি নেট দেখে নিজে নিজের চিকিৎসা করছেন। হ্যাঁ, আগে ডাক্তাররা রুগীর জ্ঞানের অপ্রতুলতাকে কৃপাদৃষ্টিতে দেখতেন, এখন নেটযুগে রুগী চেষ্টা করে নিজের অসুখটি সম্পর্কে আরও একটু জানতে, বুঝতে। খুব কি অন্যায় করে? হ্যাঁ অপচিকিৎসা নিয়ে রুগীর বলার কোনও লেজিটিমেসি নেই, মানছি। কিন্তু একজন ডাক্তার অন্য ডাক্তারের অপচিকিৎসা নিয়ে যা বলেন, সেটা কি লেজিটিমেট? বলেন তো রুগীর সামনেই, রুগী প্রভাবিত না হয়ে পারে? তার তো বিশ্বাসই সম্বল। নাকি অপচিকিৎসা হয়েছে জেনেও ডাক্তারের উচিৎ হয় ব্রাদারহুডের দায়ে চুপ করে থাকা?

আমি কিন্তু ডাক্তারদের বিরুদ্ধে কোন কথা বলতে চাইনি, কৌশিক দত্ত। আপনার লেখা পরে আলোকিতই হই এবং এটা ব্যজস্তুতি নয়। ওটা আমার আসেনা। আমার পেশার দায়িত্বেই স্বাস্থ্যদপ্তরের এবং বহুবিধ ডাক্তারদের কাছে চিকিৎসাব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে বহু কথা শুনতে হয় না চাইতেই। সব ডাক্তারকে পতিত ভাবার দুর্বুদ্ধি যেন কখনও না হয়। বহুজনের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাগুলো বাড়িয়ে তোলার জন্য বহু ডাক্তারের কাছে আমি ঋণী। সমস্যা হয় তখনি নিজেদের পচে যাওয়া, গলে যাওয়া ভাই বেরাদরদের বাঁচাতে সুস্থ ডাক্তাররাও সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। ডক্টরস ফ্র্যাটারনিটির নামে। যেমন উকিলদের ফ্র্যাটারনিটি আছে, যেমন সাংবাদিকদের ফ্র্যাটারনিটি আছে, রুগীদের কোনও ফ্র্যাটারনিটি নেই।

যিনি প্রশ্ন করেছেন একরাত মা ও শিশুকে পাহারা দেবার কাজটা কোনও মানবাধিকার কর্মী করবেন কিনা, তাঁকে জানাই, করবেন। রাতের পর রাত বহু কর্মী এই পাহারা দেবার কাজটি করেই থাকেন। বিভিন্ন হাসপাতালে। সকলের অজান্তে।

এখানে যাঁরা লিখেছেন মানবিক মন দিয়েই লিখেছেন। কৃতজ্ঞ রইলাম। ভাল থাকবেন সবাই।

Avatar: sm

Re: অসন্তোষের কারণ

পার্থবাবু ,লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট বিরাট রকম কুশলী বিদ্যা । পৃথিবীতে কতিপয় লোক সেটি আয়ত্ব করেছেন।
মানে খুব ই হ্যান্ডফুল । এর সঙ্গে উকিলদের তুলনা করা অনুচিত।
আপনি আমি হরবখত লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করাই না। যেসব ডাক্তার দের দেখাই তারা ২৫০ -৩০০ টাকাই ফি নেন।
একজন উকিলের কাছে সামান্য কাজ করাতেও কয়েক হাজার খসবে।
দুই ,ভুয়ো ডাক্তার সন্দেহ হলে এম সি আই সাইট ভেরিফাই করুন। নয়তো সিধা স্টেট্ কাউন্সিলের অফিসে যোগাযোগ করুন।
উকিল ,ইঞ্জিনিয়ার ও অন্যান্য প্রফেশনাল দের জন্যেও রেজিস্ট্রেশন প্রদর্শন আবশ্যিক হওয়া উচিত।
তিন,যে ব্যাপারটি মোস্ট গুরুত্ব পূর্ণ -সেটা হলো কম্পেন্সেশন।এটাতে আপনার ও অন্যান্য দের মত শুনতে চাইছি । ঠিক কত কম্পেন্সেশন হওয়া উচিত বা কিভাবে নির্ধারিত করা উচিত বলে মনে হয়?

Avatar: জ

Re: অসন্তোষের কারণ


pi on 16 July 2017 09:42:59 IST 57.29.217.240 (*) # আপনি বলেছেন--
ডাঃ আশিক ইকবাল একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। রইল।

পাই, আশিক ডাক্তার, তাঁর কথা শোনার আগে অনেকেই বুঝে নিতে চাইবেন তাঁর গোত্রপরিচয়।

সমস্যার মূল এখানেই যে কার কথা শুনব সেটা আগে বিবেচ্য হয়ে যাচ্ছে, জাতের বিচার হচ্ছে। অনায়াসে বলা যাচ্ছে, "কিন্তু এই যুক্তিবিন্যাসের সবটাই তো চিকিৎসকের দৃষ্টিকোণ। অবশ্য তাই তো হবার কথা। দিনান্তে আপনি তো একজন প্রথিতযশা চিকিৎসকই বটে।" দিনান্তে মানে বোধহয় at the end of the day. যেহেতু একথাটি বলা হয়, পার্থপ্রতিম একা বলেন, তা নয়, অনেকিএ বলেন ও এভাবেই ভাবতে অভ্যস্ত করে তোলেন, কোনোরকম একপেশেমি দেখতে পান না, তাই সেখানেই আলোচনার গোড়াটি সমূলে উৎপাটিত করা হয়। আমরা তারা, আমি ও অপর, এই ধারায় যুক্তিবিন্যাস সাজানো হতে থাকে, অপরের "...প্রত্যেকটি লাইন তুলে প্রমাণ করা" হতে থাকে, "...যে এ সবই আংশিক সত্য।"

শেষে এই সত্যে উপনীত হবার জন্যই ডাক্তারদের কয়েকজনকে (অব্যাজ) স্তুতি করা হয়-- "...নিজেদের পচে যাওয়া, গলে যাওয়া ভাই বেরাদরদের বাঁচাতে সুস্থ ডাক্তাররাও সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। ডক্টরস ফ্র্যাটারনিটির নামে।"

পার্থপ্রতিম মৈত্র,
কে ঢাল? কোথায় দেখলেন এই ঢালীদের? এই লেখাগুলোয় কোথায় আছে ঢালের কথা? কে না জানে যে অকারণে ইনভেস্টিগেশন করা হয়? কমিশন খাওয়া হয়? ওষুধ লেখা হয়?
আজ থেকে ৩৩ বছর আগে পশ্চিমবঙ্গে Drug Action Forum তৈরি হয়, ডাক্তাররাই তৈরি করেছিলেন। যুক্তিসঙ্গত প্রেসক্রিপশনের জন্য সেটা ডাক্তারদের মধ্যে চেষ্টা করে, করছে। বিরাট সফল যে, তা নয়। কিন্তু ডাক্তারদের দুর্নীতি নিয়ে কথা বলা হয় নি, তা নয়। আজও বলা হয়। আর কোন পেশায় কে কতটা বলেন, সেদিকে না তাকিয়েই বলা হয়। সারা ভারত জুড়ে র‍্যাশনাল থেরাপির জন্য প্রচার চালাচ্ছেন ডাক্তাররাই।
এটা আপনার নজর এড়িয়ে যেতেই পারে। আপনাকে দোষ দেব না। কিন্তু " সুস্থ ডাক্তাররাও সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন" এটা কোনরকম কোয়ালিফাই না করে, জেনারেলাইজ করে, সর্বত্র খাটে যেন এমন করে, বলাটা নিজের জানার ওপর একটু বেশি আস্থা স্থাপন করা।


Avatar: জ

Re: অসন্তোষের কারণ

Comment from sm on 14 July 2017 17:25:59 IST 52.110.141.201 (*) # লিখেছেন--
"সুতরাং ডাক্তার অর্থগৃধ্নু ,লোভী বলাটা ঠিক নয়।
...একজন রোগীর মাথা ব্যাথা হয়েছে। একজন সিটি স্ক্যানের নিদান দিলেন আর একজন ক্লিনিক্যাল এক্যুমেন এর ওপর ভরসা করে প্যারাসিটামল দিয়ে ছেড়ে দিলেন। দেখা গেলো পেশেন্ট এর ব্রেন টিউমার ছিল। দ্বিতীয় ডাক্তার বাবু টি ওপরওয়ালার কাছে খেলায় হেরে গেলেন।জাজ নাক কুঁচকে জিগালেন, আমেরিক্যান গাইডলাইন তো বলছে সিটিস্ক্যান করানো উচিত। আপনি করান নি কেন?কি জবাব দেবেন পেশেন্ট দরদী অভিজ্ঞ ডাক্তার বাবুটি?"

এটা খুব মূল্যবান প্রশ্ন। আমি যদি গাইডলাইন মেনে চিকিৎসা করতে যাই, তা হলে কোন দেশের গাইডলাইন মানব?
ডাক্তারি পাস করতে গেলে তো আমেরিকা ব্রিটেনের বই পড়তে হয়। আমেরিকা দূরের ব্যাপার, আমি ব্রিটেনের কথায় আসি (একটু কম দূরের, কিন্তু তবু বহুদূর)। আমাকে দিনে অন্তত ৫০ জন রোগী দেখতে হয়। অর্থগৃধ্নু ,লোভী বলে নয়, কেন না এর প্রায় অর্ধেক রোগী আমি দেখি একটি দাতব্যপ্রায় চিকিৎসালয়ে, যেখানে রোগী দেখার জন্য আমি কোনো টাকা পাই না। তবে মাস গেলে আমার গাড়িভাড়া বাবদ যা দেওয়া হয় তাতে গাড়ি করে বাড়ি থেকে সেখানে যেতে আসতে পেট্রোলের খরচটুকু ওঠে।

আমার বন্ধু, ইউকে-তে থাকে। দিনে আটটার বেশি রোগী দেখে না। একজন রোগীকে অনেক সময় দেয়। আমার মোটামুটি দশগুণ রোজগার করে, অবশ্য এটাতে একটু ভুল আছে, কেন না টাকা আর পাউণ্ডের কনভার্সান রেট থেকেই বললাম। কী করে আমি তার মতো পরিষেবা দেব?
কিন্তু কেস হলে, জজসাহেব এক্সপার্ট ডাকবেন, এক্সপার্ট ওদের বই খুলে বলবেন আমার কী কী করণীয় ছিল, করিনি। আমারই অপরাধ।
ভেবে দেখুন, আমারই অপরাধ যদি হয়, সরকারের উপযুক্ত সংখ্যায় ও গুণমানের চিকিৎসক সরবারাহ না করার দায় ঢাকা পড়ে কিনা? অন্য কথায়, যাঁরা ডাক্তরদের এই অবস্থাটা দেখছেনই না, তাঁরা, " "...নিজেদের পচে যাওয়া, গলে যাওয়া পলিটিশিয়ান ও সিস্টেম বাঁচাতে সুস্থচিন্তার মানুষজন হয়েও, সিস্টেমের বহু দোষত্রুটির সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। রোগীরক্ষার নামে।" বললে, ভুল করব কি?
Avatar: জ

Re: অসন্তোষের কারণ

এবার আমি, ডাকাত বা ডাক্তার, আলাদীনের দৈত্য। যাহা হুকুমিবে গাইডলাইন তাহাই করিয়া দিব, কখন পড়িব, কেমনে রোগীরে সময় দিব এসব প্রশ্নের উত্তর হইবারে একখান কথা রেডি আছেঃ কেন, ডাক্তারি পড়তে ঢোকার সময়েই বুঝে নেওয়া উচিত ছিল পেশার ডিম্যান্ড। অতএব ইনফ্রাস্ট্রাকচার ভারতীয়, রোগীর রোজগার এক্সপেক্টেশন ভারতীয়, সেই মাপেই থাকিবেক। ডাক্তার আমেরিকা ব্রিটেনের বই পড়িবেক, সেই মোতাবেক চিকিৎসা করিবেক।

হুজুর, আলাদীনের দৈত্যর কি প্রশ্ন করিবার অধিকার আছে? থাকিলে সে বলিতঃ
না হয় আমি ব্রিটেনের মাপে চিকিৎসা করে দিলুম। কিন্তু তাহলে তো সবার আগে আমার বদনাম হয়ে যাবে, আমি অর্থগৃধ্নু ,লোভী, নিশ্চয় কমিশন খাই! ব্রিটেনে কী পরিমাণ ইনভেস্টিগেশন করায় একবার দেখুন গিয়ে। আমেরিকায় আরও বেশি। আমার রোগীরা তো ওষুধের দোকানদার, কোয়াক/গ্রামীণ অপাশকরা ডাক্তার, পাড়ার দাদা থেকে দিদিমা, এদের পরামর্শ মতো চিকিৎসা করে আসেন, ওষুধ খান, ভালও হন; না হলে আমার কাছে আসেন (গুগল করা মানুষ এখনও কম, আর তাঁরা ওষুধের দোকানদার বা নিজে নিজে ওষুধ খান সেটা আমার খুব ভালই দেখা আছে)। লোকে আমার কাছে আসবে কেন? এলেও থাকবে কেন? অবশ্য আমার মতো ডাক্তারদের খুব ভাল একটা পথ আছে। বিলেত চলে যাওয়া, পারলে আমেরিকা। সেখান থেকে যদি কোনোদিন আসিও এই দেশে, বড়লোকের চিকিৎসক হতেই হবে। তারা মাথাধরাতে সিটি স্ক্যানই করবে। বড় অংকের ফি দেবে।
দয়া করে আমাকে সাধারণ মানুষের চিকিৎসক হতে বলবেন না।
অন্তত, যতদিন এদেশে দেশোপযোগী চিকিৎসা গাইডলাইন লীগ্যালি ইম্পলিমেন্টেবল হচ্ছে। চল্লুম সাগরপারে, তদ্দিন।
Avatar: জ

Re: অসন্তোষের কারণ

om Arin Basu on 13 July 2017 17:55:32 IST 213.100.212.170 (*) # লিখেছেন--

"আবার এর [এভিডেন্স বেসড মেডিসিনের] হাতে সম্পূর্ণ ক্ষমতা তুলে দেওয়ার ফলে চিকিৎসা পদ্ধতি শুধু যে যান্ত্রিক হচ্ছে তাই নয়, এভিডেন্স নথিবদ্ধ করতে এবং প্রচার করতে সক্ষম কিছু প্রভূত ক্ষমতাধর আকাদেমি, জার্নাল, ল্যাবরেটরি বা বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। ভুলে গেলে চলবে না, এরা এভিডেন্স নির্মাণ বা সৃজন করতেও সক্ষম এবং এদের নৈতিকতায় অন্ধের মতো আস্থা রাখার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কারণ নেই"

বুঝলাম না ।
এভিডেন্স বেসড মেডিসিনের গোড়ার কথাতেই যান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে স্পস্ট বক্তব্য রাখা আছে।
আপনার কেন অন্য রকম মনে হচ্ছে লিখবেন?"

"এভিডেন্স বেসড মেডিসিনের গোড়ার কথাতেই যান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে স্পস্ট বক্তব্য রাখা আছে" এক কথা। আর এভিডেন্স বেসড মেডিসিনের পদ্ধতিতন্ত্র কী পথে আপনাকে চালিত করে সেটা আরেক কথা।
ধরা যাক আপনি উজ্জ্বলা সিনেমার পাশের রাস্তার একটি পলিক্লিনিকে বসছেন। ধরা যাক মাথাব্যথা/ঘোরা নিয়ে এক রোগী এলেন। এক বাড়িতে কাজ করেন, রান্না করার কাজ। বহুদিনের মাথাব্যথা/ঘোরা। এভিডেন্স বেসড মেডিসিন বলবে, কক্রেন কোলাবরেশনের কাজ দেখ। কেন মাথাব্যাথা/ঘোরা। ক্লিনিক্যালি বলতে পারলে, ভাল, নইলে পরীক্ষা। কী কী পরীক্ষা, সেটা কিন্তু রান্নার কাজ করেন না গোয়েঙ্কাবাড়ির মেয়ে তাতে কিছু এসে যায় না, অন্তত এভিডেন্স বেসড মেডিসিনের বা কক্রেন সিস্টেম্যাটিক রিভিউ-এর।
"গোড়ার কথাতেই যান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে স্পস্ট বক্তব্য রাখা আছে"-- সো হোয়াট? আপনাকে ছেড়ে দেবে কনজিউমার কোর্ট বা ভারতীয় বিচারব্যবস্থা, যদি টিউমার থেকেই থাকে, আর আপনি সিনাজারিন বা প্যারাসিটামল দিয়ে তাকে ভাল রাখার চেষ্টা করেন?

আমার কথা বলি। চামড়ায় একটি লালচে চাকা দাগ, দু'বছর ধরে আছে। ক্লিনিক্যালি বাউয়েনস হতে পারে। রোগী বায়োপ্সির করতে হবে শুনে বললেন, ডাক্তারবাবু, গরীব মানুষ, আপনি যা পারেন করুন। আমি কেটে বাদ দেবার কথা বললাম। রোগীর জবাব ভদ্রলোকের মতো -- এক কথা। তবে আমি লিখে রেখেছিলাম।
দুবছর পরে সেই রোগী। ভেলোরে গেছিলেন কন্যার কোনো রোগ দেখাতে, নিজেকেও দেখিয়েছেন। বায়োপ্সি করেছেন, কেটে বাদ দিয়েছেন। সিএমসি ভেলোর অনেক কম পয়সাতেই চিকিৎসা করে, কিন্তু যাতায়াত মিলিয়ে খরচ কলকাতার চাইতে অনেক বেশিই পড়েছে। কিন্তু সেটা আসল কথা নয়। তিনি আরেকজন চর্মরোগবিশেষজ্ঞকে দেখিয়েছিলেন, যিনি বাউয়েনস লিখেও, রোগীরই অনুরোধে, ইউরিয়া ১০ লাগাকতে বলেছেন। রোগী তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করবেন, কেননা ভেলোরের ডাক্তার বলেছেন, হাউ রিডিকিউলাস!

আর এভিডেন্স নির্মাণ হয় না নাকি? দেখুন, যেখানে এভিডেন্স নির্মাণ করলে বিপুল পয়সা লাভের সম্ভাবনা আছে, সেখানে নির্মাণ হবে। দুরকম নির্মাণ। এক নির্মাণ সোজাসাপটা মিথ্যে তৈরি। যেমন আমেরিকার সুগার লবি স্যাচুরেটেড ফ্যাটকে হৃদধমনীর রোগের কারণ ব'লে চিনি-র বিরুদ্ধে এভিডেন্স চেপে দিয়েছিল। পয়সা দিয়ে গবেষণাকে অন্যপথে চালিত করেছিল। NJEM এ লেখাটা বেশ প্রচার পেয়েছিল, আপনার মতো এপিডেমিওলজিস্ট নিশ্চয়ই পড়েছেন।
অন্য নির্মাণ হল টাকা ঢালা ও না-ঢালা। বায়োলজিক্স-এর জন্য টাকা আছে। জেনেটিক্স-এর জন্য আছে। অন্য সহজ কমদামী ক্যান্ডিডেট-ওষুধের জন্য গবেষণা বরাদ্দ নেই। বিগ ফার্মা-র নেই, সরকারেরও নেই। দুর্জনে বলে সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করে বিজনেস ইন্টারেস্ট। এই হল উন্নত বিশ্বের চিত্র, যদিও উলটো পিঠ একেবারে নেই তা বলছি না।
Avatar: SS

Re: অসন্তোষের কারণ

জ,
আমেরিকাতে রিসার্চের জন্যে টাকা আসে ট্যাক্স থেকে। মানে ট্যাক্স পেয়ার ডলার। সিভি ডিজিজে মিলিয়ন মৃত্যু হয় আর ইয়েলো ফিভারের কোনো কেস নেই। এবার টাকার অ্যামাউন্টটা তো ফাইনাইট। যেসব রোগ এখানে হয় না, মানে ট্রপিকাল ডিজিজ, তাতে টাকা বরাদ্দ করতে হলে হার্ট ডিজিজ বা ক্যানসারের জন্যে টাকা কম পড়বে। তখন ফান্ডিং এজেন্সির হর্তাকর্তা দের কংগ্রেসে ডেকে এনে তুলোধনা করা হবে। এমনকি কোনো ল পাশ হয়ে যেতে পারে। দেশবাসীর ইন্টারেস্টই এখানে ড্রাইভার।
আর একেবারেই যে হয়না তা নয়। ম্যালেরিয়া রিসার্চে অনেক গ্র্যান্ট্স দেওয়া হয়। পেপফার (PEPFAR) বলে একটা প্রোগ্রাম আছে, যার জন্যে আফ্রিকাতে এইড্স মোটামুটি একটা ক্রনিক ডিজিজের লেভেলে নেমে এসেছে। প্রেসিডেন্ট বুশের একমাত্র কাজ যাকে দু হাত তুলে সমর্থন করা যায়।
Avatar: জ

Re: অসন্তোষের কারণ

SS on 19 July 2017 20:28:34 IST 160.148.14.151 (*) # ঠিক বলেছেন। কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজএর ওষুধ নিয়ে আমেরিকা সরকার টাকা খরচ করবে সেটা ঠিক, ইয়েলো ফিভারের জন্য করবে না, সেটাও ঠিক। ন্যায্য।

আমেরিকার ফার্মা কোম্পানি ভারতের চাইতে অনেক বেশি খরচ করে। ভারতে নানা ফার্মা কোম্পানি যে খরচ করে তার পরিমাণ বেশি নয়। সেই ব্যাপারটা এদেশে নতুন ওষুধ কম, খুব কম, আবিষ্কৃত হবার একটা কারণ। ভারত অবশ্য ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্র্যায়ালের জন্য ভাল জায়গা। বাধানিষেধ কম।

কিন্তু কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজএর ওষুধ নিয়ে আমেরিকার সরকার বা বিগ ফার্মা টাকা খরচ করবে, সেটা ন্এযায্খায, এটুকু ভেবেই মনে হয় ভাবনা থামিয়ে রাখা যায় না। কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজ, ডায়াবেটিস, মেটাবলিক সিন্ড্রোম, ওবেসিটি-- এগুলো ওষুধে সারার জিনিস নয়, ওষুধে আটকানোর জিনিসও কতোটা সন্দেহ আছে। এগুলো লাইফস্টাইল ডিজিজ বলেন পণ্ডিতেরা, এমন শুনেছি। তা লাইফস্টাইল বদলাতে গেলে আমেরিকান বিভিন্ন ফুড লবি, গাড়ি-গাড়িগ্যাস লবি, এদের অসুবিধা হতে বাধ্য বলেই মনে হয়। এক্ষেত্রে এভিডেন্স নির্মাণ আটকানো যায় নি, কিন্তু ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে হোক বা অন্য কোনোভাবে হোক, খাদ্য খাদ্যাভ্যাস মোটরাইজড ভেহিকল ব্যবহার -- এগুলো শেষমেশ কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজএর ওষুধ কোম্পানির পেট ভরাবে, সেটা ভাবার মতো গল্প হতে পারে।
Avatar: জ

Re: অসন্তোষের কারণ

"ন্এযায্খায"-র জায়গায় 'ন্যায্য' পড়ুন।
Avatar: SS

Re: অসন্তোষের কারণ

হ্যাঁ, মেটাবলিক সিন্ড্রোম লাইফস্টাইল ডিজিজ। কিন্তু লাইফ্স্টাইলে চেঞ্জ সব সময় প্রার্থিত আউট্কাম দেয় না। যেরকম টাইপ টু ডায়বেটিসের ট্রিটমেন্টের সময়েই ডায়েট আর এক্সারসাইজের কথা বলা হয়, অ্যাকটিভলি রোগীকে এনগেজ করা হয়। এমনকি অনেক ইন্শিওরেন্স কোম্পানি থেকে জিম মেম্বার্শিপ রিইম্বার্স করা হয়। কিন্তু শুধু ডায়েট আর এক্সার্সাইজের উপর ডিপেন্ড করে থাকলে ব্লাড শুগার অপটিমাম লেভেলে না নামতেও পারে। তাই মেটফর্মিন ডেভেলপমেন্টের জন্যে বিলিয়্ন ডলার খরচ হয়।
আর সিভি ডিজিজ বা ডায়াবেটিসের জন্যে শুগার বা মোটরাইজড ভেহিকল লবি হয়ত ইন্ডায়রেক্টলি দায়ী। কিন্ন্তু আধুনিক জীবনে কি আপনি এদের ছাড়া বাঁচতে পারেবেন? সেরকম ভাবলে তো ওয়াশিং মেশিন, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার - মানে যা কিছু শারিরীক পরিশ্রম কমিয়ে দেয় সব কিছুকেই দায়ী করতে হয়। ঘরে বসে অনলাইন শপিং করছি, এমনকি গান শোনার ইচ্ছে হলে বিছানায় শুয়ে অ্যালেক্সাকে অর্ডার করছি, উঠে রেডিওটাও চালাতে হচ্ছে না। এবার তো লাইফস্টাইল ডিজিজের জন্যে আমাজন আর ফেসবুককে দায়ী করতে হয়।
আমি যেটুকু বুঝি, ব্যাক্তিগত লেভেলে মানুষকে রেস্পন্সিবল হতে হবে ঠিকঠাক লাইফস্টাইল মেন্টেন করার জন্যে। কিন্তু সরকারি দায়ীত্ব অন্য লেভেলের। সেখানে ধরেই নেওয়া হয় যে পাবলিক হেলথ ক্রাইসিস হবে আর সেটাকে সামাল দিতে হবে। তার জন্যে বিলিয়ন ডলার ইন্ভেস্ট করতে হলে হবে। তার সাথে সাথে লাইফস্টাইল ভাল করার জন্যে প্রচার চালাতে হবে বা ইন্সেন্টিভ দিতে হবে। দুটোর কোনোটাই কম হলে চলবে না।
আর ডায়বেটিস তো ছেড়েই দিন। ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডে ভবিষ্যতে মহামারী আসতে চলেছে নিউরোডিজেনেরেটিভ ডিজিজে। এর পরোক্ষ কারণ হচ্ছে হিউম্যান লন্জিভিটি। তাহলে কি করা হবে? মানুষকে তাড়াতাড়ি মরতে বলতে হবে নাকি অ্যালজাইমার্স আর পার্কিন্সন্স রিসার্চে টাকা খরচ করতে হবে?

আর ভারতে ড্রাগ ডেভেলপমেন্ট নিয়ে একমত। এখন ড্রাগ ডেভেলপমেন্টের জন্যে যা খরচ, ভারতে বসে সেটা করা অসম্ভব। একটা নতুন ড্রাগ বাজারে আনার খরচ আজকের দিনে প্রায় দুই থেকে তিন বিলিয়্ন ডলার। বিগ ফার্মা ছাড়া অত বড় ইন্ভেস্টমেন্ট কারোর পক্ষেই করা সম্ভব নয়।
Avatar: জ

Re: অসন্তোষের কারণ

SS,
কাল দারুণ, বা নিদারুণ, লিখেছেন, "ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডে ভবিষ্যতে মহামারী আসতে চলেছে নিউরোডিজেনেরেটিভ ডিজিজে। এর পরোক্ষ কারণ হচ্ছে হিউম্যান লন্জিভিটি। তাহলে কি করা হবে? মানুষকে তাড়াতাড়ি মরতে বলতে হবে নাকি অ্যালজাইমার্স আর পার্কিন্সন্স রিসার্চে টাকা খরচ করতে হবে?" শুধু নিউরোডিজেনেরেটিভ ডিজিজ নয়, ক্যানসার বাড়ার (একটা) কারণও দীর্ঘায়ু লাভ। এ নিয়ে কিছু বলতে চাই না। খালি বলব, এটা পারস্পেক্টিভ হিসেবে মাথায় রাখা দরকার। নইলে "কেবল ডাক্তারের দোষ" থেকে হয়তো "কেবল সরকারের দোষ"-এ পৌঁছনো যাবে, কিন্তু তাতে আসল ইস্যু ঘেঁটে ঘ হতেই পারে।

কিন্তু আপনার কথা, "ব্যাক্তিগত লেভেলে মানুষকে রেস্পন্সিবল হতে হবে ঠিকঠাক লাইফস্টাইল মেন্টেন করার জন্যে। কিন্তু সরকারি দায়িত্ব অন্য লেভেলের।" এর সঙ্গে কি একটু যোগ করতে পারি? সরকার যদি ঠিক করে দেয় ইস্কুল কলেজে ইতিহাস কী পড়ব, বা ইভোলিউশন থিয়োরির পাশাপাশি এট্টু বিব্লিক্যাল জেনেসিস পড়ব কিনা, তাইলে সরকার কি লাইফ স্টাইল নিয়েও কিছু ফাণ্ডা মাথায় ঢোকনোর চেষ্টা করতে পারে? ধরুন মোটা বা মেটাবলিক সিন্ড্রোম হবার সঙ্গে খাবারের সম্পর্ক। ম্যাকডোনাল্ড ইত্যাদির খাবারে চিনি ও ট্র্যান্স ফ্যাটের ব্যপার ও তার লার্জ স্কেল ব্যবহারের ফলে পাবলিকের স্বাস্থ্যের যা হচ্ছে। এ নিয়ে রিসার্চ স্পনসর ও এনকারেজ করা, এটা স্কুল কলেজে ঢোকানো।

একটা ছোটো কথা। আপনি বলেছেন, "কিন্তু লাইফ্স্টাইলে চেঞ্জ সব সময় প্রার্থিত আউট্কাম দেয় না। যেরকম টাইপ টু ডায়বেটিসের ট্রিটমেন্টের সময়েই ডায়েট আর এক্সারসাইজের কথা বলা হয়" ইত্যাদি। আমি সহমত। কিন্তু আমি ডায়বেটিসের ট্রিটমেন্টের কথা বলছিলাম না, ডায়বেটিসে ও নানা লাইফস্টাইল ডিজিজ আটকানোর কথা, হতে না দেবার কথা, বলছিলাম। ট্রিটমেন্টে প্রার্থিত আউট্কাম দেয় না, কেন না তদ্দিনে প্যাথোলজি এগিয়ে গেছে। রোগ হবার আগেই লাইফস্টাইল স্বাস্থ্যসম্মত করা দরকার। সেটা যে খানিকটা করা যেতে পারে সেটা নানা দেশে তামাকের ব্যবহার কমানো থেকে বোঝা গেছে। ঐ স্কুল, প্রাথমিক স্কুল থেকে চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।
Avatar: জ

Re: অসন্তোষের কারণ

আরেকটু, SS,
আপনি যে লিখেছেন, "আমেরিকাতে রিসার্চের জন্যে টাকা আসে ট্যাক্স থেকে। মানে ট্যাক্স পেয়ার ডলার।"

এটা কি টায়টায় সত্যি কথা?

ধরুন এই লেখাটাঃ
http://www.sciencemag.org/news/2017/03/data-check-us-government-share-
basic-research-funding-falls-below-50

এখানে লিখছে--
The U.S. pharmaceutical industry is the major driver behind the recent jump in corporate basic research, according to NSF’s annual Business Research and Development and Innovation Survey (BRDIS), which tracks the research activities of 46,000 companies. Drug company investment in basic research soared from $3 billion in 2008 to $8.1 billion in 2014, according to the most recent NSF data by business sector. Spending on basic research by all U.S. businesses nearly doubled over that same period, from $13.9 billion to $24.5 billion.

কেমন মনে হচ্ছে না, কর্পোরেট, U.S. pharmaceutical industry, কিছু টাকা ঢালে, যেটাকে এককথায় ট্যাক্স পেয়ার ডলার বলা মুশকিল।
Avatar: SS

Re: অসন্তোষের কারণ

জ,
সরকার তো কোর্স আর কারিকুলাম ঠিক করেই। কিন্তু আমেরিকাতে স্কুল মানে K-12 এডুকেশনে সেন্ট্রাল মানে ফেডেরাল রোল খুবই সীমিত। স্কুল লেভেল এডুকেশনে লোকাল স্কুল বোর্ড বা স্টেটই শেষ কথা বলা যায়। ফেডেরাল ডিপার্টমেন্ট অফ এডুকেশন কিছু ব্রড পলিসি অ্যাজেন্ডা ঠিক করে, যেমন রেশিয়াল ডিসক্রিমিনেশন করা যাবে না বা ফেডেরাল গাইড্লাইন ঠিকঠাক মানা হচ্ছে কিনা। তবে তার মধ্যেও কিছু কাজ হয়। যেমন মিশেল ওবামার উদ্যোগে স্কুল লাঞ্চ মেনুতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। ডিপার্টমেন্ট অফ এগ্রিকালচার যেহেতু সাবসিডাইজড লাঞ্চ প্রোভাইড করে, তাই তারা রুল সেট করতে পারে। আমি লিংক দিলাম, ইচ্ছে হলে পড়তে পারেন। বোরিং একটা ডকুমেন্ট, কিন্তু এতে স্কুল লাঞ্চে কতটা ফ্রুট আর ভেজিটেবল থাকতে হবে সব পরিষ্কার করে লেখা আছে।
https://www.gpo.gov/fdsys/pkg/FR-2012-01-26/pdf/2012-1010.pdf
এছাড়া মিশেল ওবামা লেটস মুভ বলে একটা কম্প্রিহেন্সিভ প্রোগ্রাম চালু করেছিলেন। এই হল লিংক-
https://letsmove.obamawhitehouse.archives.gov/about
অবশ্য ট্রাম্পের জমানায় সেটা আর্কাইভ হয়ে যেতে পারে।
সব স্কুল থেকে ভেন্ডিং মেশিন আর শুগারি ড্রিংক তুলে দেওয়া হয়েছে। অনেক বড় বড় সিটি যেমন নিউ ইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া সোডা ট্যাক্স চালু করেছে। তবে আমেরিকার মত বিশাল দেশে সব রিজিয়নে একই রকম আইন একসাথে চালু করা যায় না, কারণ এখানকার রিপাবলিক স্ট্রাকচার। প্রত্যেক স্টেটে আলাদা আইন এবং জুরিসডিকশন।

বেসিক রিসার্চে বেসরকারি ফান্ডিং আগের থেকে বেড়েছে সেটা ঠিক। এর কারণ হল ২০০৮-২০০৯ এর রিসেশান। ঐ সময় এবং তার পর আরো কিছু বছর সরকারি অনুদান ছিল হিস্টোরিকালি লো। তাই ইন্ডাস্ট্রি বাধ্য হয়ে নিজেরা ফান্ডিং বাড়ায়। তবে সেটা কতটা বেসিক রিসার্চ সেটা তর্ক সাপেক্ষ। ইন্ডাস্ট্রি রিসার্চ সাধারণত নিজেদের প্রোডাক্টকে টার্গেট কর হয়ে থাকে। আর ইন্ডাস্ট্রি যেহেতু সেটা পাবলিশ নাও করতে পারে, তাই কি হচ্ছে সেটা সঠিক ভাবে জানা মুশকিল। আর কার্পোরেট বা ফার্মা ইন্ডাস্ট্রি প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট স্টেজে তো টাকা ঢালবেই। মোটামুটি এখানে যে মডেল ফলো করা হয় তা হল বেসিক রিসার্চ সাধারণত ইউনিভার্সিটিতে হয়ে থাকে, NIH বা NSF এর গ্র্যান্ট থেকে। এবার কোনো একটা প্রমিসিং ড্রাগ ক্যান্ডিডেট পাওয়া গেল। এরপর ক্লিনিকাল ট্রায়াল করতে হবে। এখন ইউনিভার্সিটির মাল্টিফেজ ট্রায়াল চালানোর মত ইনফাস্ট্রাকচার থাকে না। তারা তখন ইন্ডাস্ট্রির সাথে টেক ট্রান্সফার এগ্রিমেন্ট সাইন করে এবং একটা রয়ালটি পায়। এরপর ডেভেলপমেন্টের কাজ পুরো ইন্ডাস্ট্রি করে। তবে তাতে ইউনিভার্সিটির ক্লিনিশিয়ান ইন্ভেস্টিগেটর হয়ে থাকতে পারেন। আপনি গত কুড়ি বছরের ব্লক বাস্টার ড্রাগের খোঁজ নিলে দেখতে পাবেন শুরু কিন্তু কোনো একটা ইউনিভার্সিটিতে, ট্যাক্স পেয়ার ডলার ইউজ করে। এটা লিখতে গিয়ে সেই সিলভার বুলেট গ্লিভেকের নাম মনে পড়ল। গ্লিভেক অ্যাপ্রুভ হবার পর প্রতিটা কোম্পানি অন্কোলজি ডিভিশনে একটা করে টাইরোসিন কাইনেজ ইনহিবিটর রিসার্চ ইউনিট খুলেছিল। কিন্তু এর আগে অনেকদিন ধরে ফিলাডেলফিয়া ক্রোমোজোম নিয়ে সরকারি টাকায় রিসার্চ চলেছে, যার পরিণতি গ্লিভেক।

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 5 -- 24


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন