রথের কোলাজ

শক্তি করভৌমিক দত্তরায়, সৃজিতা সান্যাল শূর, সেখ সাহেবুল হক, নাভিদ আঞ্জুম, সোমা মুখোপাধ্যায়

আজকে, রথের যাত্রা
শক্তি করভৌমিক দত্তরায়

বসে আছি। দেখছি সবুজ গাছগাছালি। উঁচুনীচু অনেকটা যেন জলপাই রঙ ঘাস। মাঝখানটা দিয়ে ছুটেছে পিচরাস্তার কালো রঙ। অনেক আকাশলীনা সৌধ। নীচে মাঠে ছেলেরা ক্রিকেট আরো কি কি খেলছে রোজের মতো। একটু দূরে পার্কে শিশুরা খেলছে। আরো দূরে চলছে বাস, দু চাকা চার চাকার কতো গাড়ী।

কোনো শিশুর দল কাঁসর বাজিয়ে ছোট্ট সাজানো রথ টানছে না। ভেতরে জুবুথুবু বসে নেই সুভদ্রা ভগিনী আর বলরাম দাদাকে নিয়ে জগতেরপ্রভু বড়বড় চোখ দেবতা। শঙ্খধ্বনি হচ্ছে না। উলুধ্বনি বা জোকার?না না। কোথাও না।

মনের মধ্যে রথের চাকা গড়িয়ে চলছে। পুরীর রথ - সেতো মনে আছেই। আর সেই ছোট বেলায় মা আর পিসিমণির সঙ্গে ভাইবোন মিলে দেখতাম যে রথ।? কাঁসর ঘন্টা, লোকের ভীড়। হরিরলুঠ। উড়ছে নকুলদানা। ঝিরঝির বৃষ্টিতে ভিজছে লুঠের বাতাসা। অনেকে ছুড়ে দিচ্ছে কলা। দু একটা নারকেলও ছুঁড়ে দেয় কোন বেপরোয়া ভক্ত। রথের দিকেই লক্ষ্য তবে লুফে নেয় জনতা। সবচেয়ে বেশি ছোড়ে লুকলুকি,--একধরনের লালচে কালো গোল ছোট ছোট টক মিষ্টি ফল। ভেতরটা রক্তিম। দুই হাতের চেটোয় রেখে একটু ঘষলে নরম হয়। জানিনা আর কোনো ভালো নাম এর আছে কিনা। আরেকটি ফল জড়িয়ে আছে শৈশব আর শৈশবের দেখা রথের সঙ্গে। সেই ফলের নাম বুবি, আমরা ওই নামই বলতাম। ঘিয়ে রঙএর খোসা, ভেতরে তুলতুলে তিনটি স্বচ্ছ টক কোয়া। গোলাপী আভা, হালকা নীলাভ রেখা। কি সুন্দর। বড় হয়ে বুঝলাম এই ফলই হয়তো লটকন। জীবনানন্দের লটকন রঙের রোদ। রঙ, স্পর্শ, স্বাদে মাখা কোমল সজল রোদ। ওই ফল খেলে নাকি জ্বর হয়, হোক্। রথের ধর্মীয় অনুষঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু রথের মেলা সত্যই কার্নিভাল। তার পাঁপড়ভাজা, জিলিপি, ফুলের চারা, সব নিয়ে একবেলার উৎসব; দু'চারদিন বাদে ওই চারাতেই বনোমহোত্সব। মায়ের সমান্য সঞ্চয় থেকে আমাদের জন্য কেনা হয় সোনালী কাজ করা প্লাস্টিকের খেলনা হাঁড়ি, মাটির উনুন, তালপাতার সেপাই, বেলুন বাঁশি, সাপ বেলুন। বাড়ী ফেরার আগেই ঢাউস বেলুন ফেটে যায়। যার যায় সে কাঁদে। অন্যে হাসে। ঠাকুমা বলেন মেলার পয়সা ধূলায়। সবই তো শেষ অবধি ধূলায়। কি আর করা। 

একবার আগরতলায় মাকে দেখতে কামার পুকুরের পাড় দিয়ে শর্টকাট করছি। মণিপুরীরা অপেক্ষায় আছেন - রথ আসবে, অভ্যর্থনা করবেন। ধবধবে শাদা তাঁদের উত্তরীয়। মেয়েদের ডুরে রঙিন ফানেক আর কারুকাজ করা শুভ্র চাদর --ওড়না। স্ট্রেট লম্বা অঢেল চুলে চাঁপার মালা। হাতে ঝকঝকে সাজি। তাতে নীল সাদা ফুল আর পচাপাতা নামে সুগন্ধি পাতা দিয়ে গাঁথা মালা। চাঁপা, গোলাপ আর জুঁই ফুলের অর্ঘ্য। চলায় নৃত্যের ছন্দ। বন্দনা তাঁদের "সঙ্গীতে আর ভঙ্গিতে বিরাজে"।

মার কাছে গিয়ে দেখি অনু মিয়া গেটে দাঁড়িয়ে হাসি মুখে। গাছের কলার ছড়ি আর লিচু গুলো ভালো দামে বিক্রি করে মেলা থেকে বিবির জন্য মেয়ের জন্য বাহারি কাঁচের চুড়ি আর ফিতে কিনেছে। পছন্দ হবে তো? --হবেনা আবার! গোলাপী আর সবুজে মনোমোহন। 

রথযাত্রা লোকারণ্য। কতো ধুমধাম। সব আছে মনের মধ্যিখানে। ভোলা কি যায়? দেবতা কি ভুলতে দেন? দেন না। প্রার্থনা বেজেই চলে অনুভবের তারে ---

 

"তুঁহু জগন্নাথ জগতে কহাওসি/ দয়া জনু ন ছোড়বি মোয় "।


 

রথের মেলার গল্প
সৃজিতা সান্যাল শূর

আমি জানি আমাদের সমস্যাটা জিনঘটিত।  কোনোভাবেই এড়াতে পারি না। নেশার মত টানে। কি? আরে মেলা,  মেলা। আমার দিদা, বড়মাসী, মা, আমি, আর এখন আমার মেয়েও। আমরা মেলা দেখলে স্থির থাকতে পারি না। সত্যনারায়ণের সিন্নির মতই, মেলার নাম কানে শুনলেই যেতে হয়। আমরাও মেলা শুনলেই যাই।

মেলা বললেই তো প্রথমে রথের মেলা। বারুইপুরে রাসমাঠে চৌধুরীবাড়ির রথ। সঙ্গে মেলা। তখন বড়মাসিরা থাকত মেলার কাছাকাছি একটা পাড়ায়। আমার তখন চার কি পাঁচ হবে। তো সকাল থেকে আমাদের সবার রথ উপলক্ষ্যে মাসির বাড়ি নেমন্তন্ন। বললাম না, মাসিও মেলাপ্রেমী। সকালে যাব। রথের রশিতে টান দেব। দুপুরে মাসির বাড়ি খাওয়াদাওয়া করে আবার বিকেলে মেলায় যাব।মানে ভরপুর প্রোগ্রাম যাকে বলে।এবার আমার বাবা আবির্ভূত হলেন, মূর্তিমান কালাপাহাড় রূপে। "ঐ ভীড়, গন্ধ, নিয়ম নেই,  শৃঙ্খলা নেই, আমি আমার মেয়েকে অই মারাত্মক মেলায় যেতে দেব না। এই ছোটোবেলায় গিয়ে সকালে রথের রশি টানবে আমার মেয়ে? মামাবাড়ির আবদার?!" তারপর আর কি! "ছোটোরাণী আছাড় খাইয়া পড়িলেন "। কান্নাকাটি,  রাগারাগি। অবশেষে রথের দিন দেখলাম সকালে রিকশায় চড়া হল।

এমনি দিনের ডবল ভাড়া। কারণ মেলা অভিমুখী রিকশা কখন পৌঁছবে আর কখন ফিরবে তার ঠিক নেই। তো আমরাও চললাম|আরো রিকশা যাচ্ছে, ভ্যান যাচ্ছে। হাজার রকমের গাছ যাচ্ছে। মাথায় কাঁঠাল নিয়ে একদল লোক। রিকশা এগোয় আর না। অমন জ্যাম দেখতে মোটেও ছোটোবেলায় অভ্যস্ত ছিলাম না। মেলার কাছাকাছি যত যাই দেখি ভীড় বাড়ছে। আর সবার পা কাদা ভর্তি। আস্তে আস্তে আমার বুক শুকিয়ে আসছিল আর বাবার চোয়াল শক্ত হচ্ছিল। এমন সময় নামল তেড়ে বৃষ্টি । রিকশার হুড তুলে প্লাস্টিক নামানো হল। বাইরে বৃষ্টি, ভেতরে ঘাম। বাঁধ ভেঙে গেল। চিতকার করে কান্না শুরু করলাম, পায়ে পড়ি বাবা, আমি রথ দেখবো না। বাবাও শুরু, আজ তুই রথের রশি টেনে বাড়ি যাবি, আমিও এর শেষ দেখে ছাড়ব। সে এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা যারে কয়। যদিও এরপর মেলায় গেছিলাম কিনা আমার মনে পড়ছে না। বাবা,  মা কে জিজ্ঞাসা করতে তারা দেখলাম তিরিশ বছর আগে সেদিন রথে যাওয়া ভুল ডিসিশন ছিল কিনা তাই নিয়ে ঝগড়ায় মেতে গেল।

রথের মেলায় আসত দারুণ দারুণ সব জিনিসপত্তর। চাকি-বেলুন, পিঁড়ি, টবের মাটি খোঁচানোর নিড়ানি। এরকমই এক রথের মেলা থেকে কেনা হয়েছিল একটা টেবিল। সেই সপ্তাহে বাড়িতে আসবে নতুন গ্যাস , তার জন্য চাই টেবিল।  বাবার সস্তা টেবিল চাই, বাজেটে ঘাটতি আছে। রথের মেলা থেকে এল সস্তা টেবিল। তাতে গ্যাস থাকল, বেশ কয়েক বছর পরে সেটা খাবার টেবিল হয়ে গেল। এখন সেটা আমাদের কাজের দিদির মেয়ের পড়ার টেবিল। তবে মেলায় আমি যেতাম জিলিপি খেতে। অমন ধূলোমাখা গুড়ের জিলিপি রথ ছাড়া কোত্তাও পাওয়া যায় না। আর কটকটি, আর পাঁপড়ভাজা। মানে কুখাদ্য পেটে না গেলে আর মেলা কি। শুধু আজকাল একই দোকানগুলো দেখে শিউরে উঠি, কি করে বাচ্চাগুলো খাচ্ছে কে জানে?!!!!

আমার বড়মামা এরকমই এক রথের মেলা থেকে এনেছিল মিঠুকে। নর্দমার ধারে পড়ে ছিল। মামা তুলে তাকে বাড়ি নিয়ে আসে। এখন ওকে ছাড়া মামাবাড়ি ভাবা যায় না। এত্ত এত্ত কথা বলে বারান্দায় বসে বসে। চকচকে লাল ঠোঁট আর পালিশ করা সবুজ গায়ের রং। মামার পেয়ারের টিয়েপাখি।

গতবছর মেয়েকে নিয়ে গেলাম রথের মেলায়। এই মেলা একটু ছোটো। রথ মেলায় ঢোকার মুখেই। বেদম ভীড়। রথের রশি বেশ গুছিয়ে রাখা। মানে দিনের যেকোনো সময়েই গিয়ে টেনে নেওয়া যায়। একদিকে প্লাস্টিকের ফুলের দোকান, পাশে কায়দার টেরাকোটার স্টল। আমার ইচ্ছে হল না ঐ দোকানগুলোতে যেতে। আমি গেলাম একটু গেঁয়ো ,পুরোনো গন্ধের ঝুপড়িতে। কিনলাম পুজোর বারোকোশ ,পাথরের বাটি। কিনলাম কাঠের চিরুণী। জানি কোনো কাজে লাগবে না, তবুও কিনলাম। বাঁশি কিনে , জিলিপি খেয়ে , বেলুন কিনে মেয়ের আল্হাদী মুখ দেখে বুঝে গেলাম, মেলার নেশা ওরও আছে। আজ দেখলাম, দাদু দিদাদের কাছ থেকে পাওয়া মেলার পার্ব্বণীতে তার ব্যাগ ভরা। কালই ভাবছি মেলা অভিযান সেরে ফেলব। এই মওকায় বাজে পচা গুড়ের জিলিপি গোটা কয়েক জুটে গেলে মন্দ কি !!


 

শুভ রথযাত্রা
নাভিদ আঞ্জুম

কদিন আগে ফেসবুকে এক পরিচিত-এর বাবার মৃত্যুর সংবাদ শুনে নির্বিকার ভাবে যন্ত্রের মত লিখলাম 'RIP',সেরকম কোনো অনুভুতি ছাড়াই।এই খুশির দিনে সেটা নিয়ে কিছু লিখবোনা।আজ ঈদ ছিল।কাল ছিল রথযাত্রা।আহা কি আনন্দ।ছোটো থেকেই রথের মেলায় যাওয়া আমার মাস্ট। রথের মেলাতেই আমার প্রথম সার্কাস দেখা। নাগরদোলা চড়াও।লালগোলায় প্রতিবার রথের মেলা বসে অনেকদিন থাকে।এবারো যাবো।আমার সাড়ে চার বছরের ছেলের এবার তৃতীয়বার রথের মেলা দেখা হবে।ও বেচারি হিন্দু-মুসলিম না বুঝলেও,লালগোলাবাসিরা জানে লালগোলার রথের মেলার মোট টার্ন আউটের অন্ত 50%মুসলিম।সকালে ঈদের ময়দানের বাইরে পাঁপড়, চপ,ঘুগনি বা খেলনার যে দোকানগুলো ছিলো তার অনেকগুলিই হিন্দুদের। এতে আমার তিন বছরের ভাইপোর কিছু এসে যায়নি। সে পাঁপড় পুরোটাই খেয়েছে।আর হ্যাঁ,অনেক অনেক হিন্দু ভাইবোনেরা 'ঈদ মুবারক' লিখেছে। আমি অবশ্য 'শুভ রথযাত্রা' লিখিনি।অনেক মুসলিমই লেখেনি। আমিতো কোনদিনই না।তাহলে এবার কি হোলো??? আজ্ঞে অনেকে জায়গায় দেখছি,অনেকে বিজ্ঞের মত সিদ্ধান্ত টানছেন "মুসলমানরা খালি নিজের পরব বোঝে। হিন্দুদের গুলো নিয়ে তাদের কোনো অনুভূতি নেই।" যদিও সরস্বতী পুজোয় অংশগ্রহণ, দূর্গাপূজোয় মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরা, দীপাবলির রোশনাইতে সামিল হওয়া, বিজয়া দশমীর পরের দিন হিন্দু বন্ধুর বাড়িতে যাওয়া, বিশ্বকর্মায় ঘুড়ি ওড়ানো ও চিড়ের পোলাও খাওয়া এগুলো প্রচুর মুসলিমের কাছে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।এরকমটা দু দশক আগেও ছিলো। তখন ফেবু ছিলোনা, সাধারণদের কাছে মোবাইলও ছিলোনা। স্ট্যাটাস বা ইনবক্সের দেখনদারি ছিলোনা।তবে হৃদ্যতা ছিলো ষোলোআনা।আর জানা ছিলোনা মানুষের মত দেখতে গোরু-ছাগলও হয়। 'শুভ রথযাত্রা' লিখে স্ট্যাটাস দেওয়ার কোনো তাগিদই অনুভব করছিনা, তবে রথের মেলা যাবো, প্রতিবারই।আর হ্যাঁ, কেউ 'শুভ বিজয়া' বা 'ঈদ মোবারক' লিখলে আমার কোনো সমস্যা হয় না।কিন্তু  'ঈদ মোবারক', 'শুভ বিজয়া' বা 'মেরি ক্রিসমাস' এগুলোর কোনোটাই লিখে স্ট্যাটাস দেয়ার কোনো আগ্রহ আমার নেই।কিন্তু আমার কোনো 'হিন্দু বন্ধু' (হায়রে,বন্ধু শব্দের আগেও হিন্দু মুসলিম বসে গেল😢) হয়তো 'ঈদ মোবারক' লিখে আমার কাছেও 'শুভ রথযাত্রা' লেখা আশা করছো। এতেও কোনো সমস্যা নেই। এবার আমি তার মনোমত না লেখায় 'সংকীর্ণ' তকমা পেলাম,এটাতেই আমার আপত্তি।আর আমি আপনিতো ভালোমতোই জানি,ফেসবুকের শুভেচ্ছাবার্তাগুলির (বা RIP লেখা শোকবার্তাগুলির) বেশিরভাগই যান্ত্রিক ফর্মালিটি।কেউ দেখাই,কেউ হয়তো দেখাই না।শেষে এটাই বলবো, ধর্মাচরণ যার যার, মেলা-উৎসব সবার।

---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

শ্রীজগন্নাথ ও ছোটবেলার ভিড়

সেখ সাহেবুল হক
-----------------------------------------------------------
মামাবাড়িতে নাতি হিসেবে কদর তো ছিলোই। ভাগনা হিসেবে ছিলো আলাদা ব্যাপারস্যাপার। সেযুগে রোগী দেখে ফেরা মামার ব্যাগ হাতড়ে মিলতো আঙুর, কখনও মুগবেড়িয়ার স্কুলমোড়ের জনপ্রিয় রসমালাই, বা কালো পলিথিনে জামরুল…!
মামা তাঁর বন্ধুদের আমায় নিয়ে মজা করে একটা কথাই বলতেন, “ভাগনা জগন্নাথ, ঠিকভাবে সেবা না করলে অমঙ্গল হবে”। ব্যাস এভাবেই প্রথম জগন্নাথ শব্দটির সাথে পরিচয়।

এভাবে জগন্নাথ দেবের জলজ্যান্ত অবতার হয়েও আমি ছয় বছর বয়স পর্যন্ত রথ দেখিনি। মেদিনীপুরে মামাবাড়িতে বিভিন্ন গাড়িতে, বাড়িতে, এমনকি মন্দিরে জগন্নাথদেবকে দেখতাম। অথচ জানতামই না উনিই শ্রীজগন্নাথ।

হাওড়ার একেবারে পাড়াগাঁ ছেড়ে ৯৮ সালে কাকদ্বীপে এলাম। তারপরই প্রথম রথ দেখা, পাঁপড়ভাজা, রথের ভিড়ে হাঁটা। প্রথম উল্টোরথ দেখার আগে পর্যন্ত আমার মনেহতো উল্টোরথে রথ বুঝি উল্টে চলে। ভুল ভেঙে দিলো সময়।

এরপরের রথগুলো সত্যিই অন্যরকম ভালো কাটতো। দিনকয়েক আগেই রথ বের করে রাখা হতো দুর্গামন্দিরের মাঠে, তারপর নির্দিষ্ট দিনে রথ সাজানো হতো ফুল, নানা প্লাস্টিকের সামগ্রী দিয়ে। রথের গায়ে আঁকা জগন্নাথ-শুভদ্রা-বলরামের ছবি। রথের চূড়ায় ছোট্টছোট্ট পতাকা লাগানো।

বিকেল হলেই মেলা জমতে থাকে। মাথার ভিড়, রাস্তার দুপারে নানা দোকানের পসরা, জগন্নাথ প্রস্তুতি নিচ্ছেন মাসিরবাড়ি ‘বামুন পাড়া’ যাওয়ার জন্য।

নিশি কাকুর চায়ের দোকানের সামনে জিলিপির অস্থায়ী দোকান বসেছে। আরো অনেক জিলিপি দোকানের ভিড়ে এটাই জনপ্রিয়। গরম গরম জিলিপ ভাজা হচ্ছে, ভিড় জমছে।
পাঁপড় ভাজা হচ্ছে জিলিপির পাশেই। জিলিপি কিনতে গেলে পাঁপড় খেতে হবেই। ফুচকার দোকানে মেয়েদের ভিড়, সে ভিড় ভেদ করে ফুচকা খাওয়া। এক টাকায় চারটে ফুচকা, কি অপরূপ তার স্বাদ! ফাউ চাইতেও ইচ্ছে করতো না।
একটু পেরিয়ে আদিত্যকাকুর চপ দোকান, সেখানে আজ ঢুকতে পারা যাচ্ছে না। চপ, ঘুগনী, বোমের জয়জয়কার।
মশলামুড়ির দোকানে একটাকায় মুড়ি মিলতো তখন। নারকেলের সরু টুকরো মুড়ির উপর ঠোঙা উপুড় করে একগাল মুড়ি মুখে নিয়ে আলতো কামড়ে নারকেল কেটে নেওয়া। ধনেপাতার গন্ধে, দাঁত কামড়ে বসে কাঁচা লংকার টুকরো। ঝালে ‘উহহহ’ করে ওঠা ছোটবেলায় তখনো ভেজাল ঢোকেনি।

পকেটে দুই ভাইয়ের মেলার হাতখরচ কুড়িটাকা। এর মধ্যে এতোকিছু করা সত্যিই খুব চাপের। প্লাস্টিকের বন্দুক পনেরো টাকা, জলে চলতে পারা টিনের নৌকা পাঁচটাকা, পেছোনে টানলে সামনে যাওয়া গাড়ি কুড়িটাকা, গান হওয়া মোবাইল পঁয়ত্রিশ টাকা। উসমানকাকুর খেলনা দোকানের সামনে দিয়ে গেলে রোমাঞ্চ লাগে। কিছু জমানো টাকায় কিনে ফেলা খেলনা মোবাইল। বোতাম টিপলেই গান হচ্ছে - “বুমরো বুমরো শাম রঙ বুমরো”। কখনো আবার - “চলে ছইয়াঁ ছইয়াঁ…”। আবার অন্য বোতাম টিপলে মেয়ে গলা বল উঠছে - টুট.টুট.টুট...হ্যালো। গাড়িটা কেনা হয়নি। উলটোরথে কিনে ফেলার প্ল্যান করলাম দুইভাই। হাতে নিয়ে কয়েকবার টেস্ট ড্রাইভ সেরে রেখেছি। রিমোট দেওয়া গাড়িটা বাজেটের বাইরে চলে যাচ্ছে তাই ওটা বাতিল।
মানুষের কেনাকাটা দেখতাম। কেউ কাঁঠাল কিনছেন দামাদামি করে, কেউ লেবুচারা নিচ্ছেন। কোন বৌ কিনে নিচ্ছেন সস্তায় ঝুড়ি। বাচ্চা ছেলের খেলনার জন্য অনুনয়, লুটিয়ে কাঁদা, কিনে দিতে না পারা বাবা-মায়ের বিব্রত মুখ...।

প্রায় সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। রথের উপর চেপে বসেছেন ঠাকুর মশাইরা। গায়ে নামাবলীর পোষাক। ঢাকের বাদ্যি বাজছে। রথের উপর থেকেই গান হচ্ছে - “জানি তোমার প্রেমের যোগ্য আমি তো নই…”। মাঝেমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘোষণা। বাতাসা হরিলুট শুরু হলো। মানতের বাতাসা ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে দুর্গামন্দিরের মাঠে, কখনো পিচ রাস্তায়। জনতার ভিড় হাত বাড়িয়ে বাতাসা লুফে নিতে চাইছে। মাটিতে পড়ে যাওয়া বাতাসাও ভক্তিভরে তুলে নিচ্ছেন মানুষেরা। এরই মধ্যে চাঁপাদির সাথে দেখা। মাকে নিয়ে দুই বোনে বেরিয়েছে ওরা। ভীড়ে বাতাসা কুড়োতে পারছে না। আমি বাতাস কুড়িয়ে ওদের হাতে দিচ্ছি...। হরিলুটের মাঝে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের রথে তুলে আবার নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বোধহয় এটা অনেকের মানত থাকে। রথে চড়ানোটা মঙ্গলকর বলেই...।

রথ এবার এগোবে। মাইকে ঘোষণা হলো। ভিড় রথের সামনে জমায়েত হলো। নির্দেশমতো রথ এগোবে, সবুজ পতাকা দেখালে রথ এগোবে, নীল পতাকা হলে রথে টান দেওয়া বন্ধ হবে। এছাড়া মাইকে নির্দেশ থাকবেই পর্যায়ক্রমে থেমে যাওয়ার, এগিয়ে যাওয়ার। যাওয়ার পথে বাড়ির ইলেক্ট্রিকের তারগুলোকে লম্বা বাঁশ দিয়ে উপরে তুলে ধরা হবে, যাতে চূড়া ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

রথে টান পড়লো। গড়গড়িয়ে রথ এগোচ্ছে ঢাকের বাদ্যি চড়া হচ্ছে। রথ আস্তে আস্তে এগিয়ে চলছে, শ্রীজগন্নাথ দেব মাসিরবাড়ি চলছেন। আমারো মনে পড়েছে মামাবাড়ি। ভিড়ে রোমাঞ্চ জাগে। আমি মানুষের উন্মাদনা দেখছি, ভক্তি দেখছি, মুগ্ধ হচ্ছি।
অনেক ছোটখাটো রথ নিয়ে বাচ্চারা রের হয়েছে। তাদের উন্মাদনাও দেখার মতো।

আস্তে আস্তে রথ চোখের সামনে দিয়ে চলে গেলো। মনখারাপ হলো আমার। এতো মানুষের হাট ভাঙতে দেখলে মনখারাপ হওয়া স্বাভাবিক। অপেক্ষা উল্টোরথ পর্যন্ত, গাড়িটা শেষপর্যন্ত কেনা হবে কিনা সেই সংশয়ের রোমাঞ্চকর গল্প। ঠিক যেন আনন্দমেলার ক্রমশ লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস।

এমনই ছিলো সেসব রথের দিন। পকেটে পয়সার টান ছিলো, কিন্তু খুশিরা বিস্কফার্ম বিস্কুটের বিজ্ঞাপনী লাইন ছিলো না। সব স্বাদের ভাগ দেওয়ানেওয়া চলতো। একটাকার ঝালমুড়ি, পাঁচটাকার ফুচকা, দু চারপিস জিলিপিতেই শান্তি ছিলো।
তখনকার ভক্তিবোধে বিদ্বেষ ছিলো না। ক্রমে বাবার কাছেই শেখা - “রথযাত্রা লোকারণ্য মহা ধুমধাম, ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম।”। রথের মেলায় গণদেবতার সমাগম দেখেই বড় হওয়া।
হরেকৃষ্ণ মামার বাবা রথের দায়িত্বে আজও বড় ভূমিকা নেন। তিনি আমাদের দাদুর মতোই একান্ত কাছের।
বড় হওয়ার পরে রথের মেলায় সেই অনুভূতিটা পাই না ঠিকই। কিন্তু খেটে খাওয়া মানুষের উন্মাদনা বা ভক্তি কিছুই কমেনি।

ইদানীং ঈদ-রথযাত্রা নিয়ে রাজনীতি টানার নোংরামি দেখি। কিন্তু আজও পথই দেবতা, মানুষকে দেখি গণদেবতার বেশে। রথের পাঁপড়, ঈদের সিমুইয়ের মধ্যে যে অভিন্ন আন্তরিকতা, আত্মার টান। সেসব রাজনৈতিক চক্রান্তকে ছাপিয়ে যায়। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনায় নিজেকে ব্যর্থমনোরথ মনে হয়েও রথটা আজও তেমনই আছে।

#হককথা

----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

রথের মেলা
সোমা মুখোপাধ্যায়

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলাতে রথের মেলাতে পসরা সাজান লোকশিল্পীরা। এমন তিনটি মেলা দেখলাম দক্ষিণ ২৪ পরগনার বজবজ আর নুঙ্গি অঞ্চলে। স্থানীয় এই মেলায় আসেন আশপাশের শিল্পীরা।এবার ঈদ আর রথ পরপর থাকাতে দোকানিরাও খুব খুশি। ঈদের বাজার করতে আসা মানুষ জন ঘুরে যাচ্ছিলেন রথের মেলাও। কিনছিলেন সংসারের টুকিটাকি আর ঘর সাজানোর সরঞ্জাম। এর মধ্যে শিশুদের খেলনাও ছিল নানারকম। হুগলী নদির ধার ঘেঁষা পুজালি থেকে মাটির খেলনা খুব ভাল বিক্রি হয় বজবজের চরিয়ালের মেলাতে। এক পাড়ে পুজালির কুমোর পাড়া আর অন্য পাড়ে বিশাল থার্মাল পাওয়ার । একদিকে লোক প্রযুক্তি আর অন্য দিকে আধুনিক প্রযুক্তি নদীর মতই প্রবহমান। পুজালিতে এখন খেলার পুতুল হয় না। ফুলের টব ,হাঁড়ি, সরা, প্রদীপ তৈরি হয়। রথের মেলাতে শুধু খেলনাপাতি। মেলাতে আসা মোহন পাল আর তাঁর পরিবার জানালেন এইসব। সন্ধান পেলাম আশ্চর্য এক জিনিসের। শোলার মস্ত মস্ত দাঁড়ে বসা কাকাতুয়া। বাখরাহাটের কাছাকাছি অঞ্চল থেকে এসেছেন জয়দেব দাস তার দুই ছেলেকে নিয়ে।আদি বাড়ি হুগলীর সুন্দুরুস। রাসের সময় ছাড়া এই পাখি বিকোয় এই মেলাতেই। লোকে কেনে সাজানোর জন্য।

চরিয়াল থেকে অটো তে ২০ মিনিট গেলে বাওয়ালি রথ তলা । এখানে আমতলা বিদ্যানগর থেকে ভারতী পাল তার ২ ছেলে নিয়ে এসেছেন। রঙচঙে হুঁকো ধরা ঘাড় নাড়া বুড়ো আর  রাধা কৃষ্ণ নিয়ে এসেছেন। এছাড়া রয়েছে অন্য পুতুল তবে তা তাদের তৈরি নয়। আমি সরকারি দপ্তর  থেকে এসেছি শুনে উৎসাহিত হয়ে বললেন সাহায্য পেলে সব পুতুল বানাবেন।

নুঙ্গি স্টেশনের কাছের মেলাতে উস্তি -আলমপুর থেকে আনেকে এসেছেন টমটম গাড়ি, বেহালা নিয়ে।এর মধ্যে আনিসুর শেখ আর তাঁর স্ত্রী তৈরি করেছেন তালপাতার পাখা আর তালপাতার পুতুল।এই পুতুল আজ হারিয়ে গেছে।

রথের মেলা বহু জায়গাতেই হয়। সব অঞ্চলেই সেই অঞ্চলের লোকশিল্প পাওয়া  যায়। এদের উৎসাহ দিলে এগুলো বেঁচে থাকবে।

        




Avatar: প্রতিভা

Re: রথের কোলাজ

এই কোলাজটা দুর্দান্ত হয়েছে।
Avatar: de

Re: রথের কোলাজ

বাঃ! এটা তো আগে দেখিইনি - খুব সুন্দর!
Avatar: AS

Re: রথের কোলাজ

খুব সুন্দর কোলাজ টা
Avatar: dd

Re: রথের কোলাজ

এটা কি জুলাই মাসেই বার হয়েছিলো?
কি করে মিস করেছি?

ভালো লাগলো পড়ে।
Avatar: শঙ্খ

Re: রথের কোলাজ

বাঃ
Avatar: পাই

Re: রথের কোলাজ

হুম,রথ আর ঈদের পরেই বেরিয়েছিল।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন