উৎসবের খাদ্যসম্প্রীতি ও পাড়ার খানাপিনা

সেখ সাহেবুল হক

ঈদের চাঁদ দেখা গেলেই বাঙালী মুসলমান প্রথমে ঈদের চাঁদকে চুমু খায় ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে। খুশির মাত্রাটা ঠিক এমনই থাকে যে আকৃতিগত ভাবে তো নয়ই পরিস্থিতির বিচারেও চাঁদ তখন ঝলসানো রুটি নেই। চাঁদরাত উপলক্ষে কিছু জায়গায় খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। গোটা পাড়ায় হাঁড়ি বন্ধ। নিজেদের মধ্যেই চাঁদা তুলে বিরিয়ানি, পোলাও খাওয়ার ঘটনাও প্রত্যক্ষ করি। এটা দিয়েই একসাথে ঈদের আগাম সেলিব্রেশন শুরু।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই মসজিদে ঈদের নামাজের জন্য তৈরী হওয়া। ঈদের নামাজের জামাত সাধারণত সাড়ে আটটা থেকে সাড়ে নটার মধ্যেই হয়ে থাকে। বিভিন্ন এলাকার মসজিদ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সময় নির্ধারণ হয়।

ঈদের মধ্যে ঈদুল ফিতর মিষ্টিমুখ করে কিছু খেয়ে পড়ার নিয়ম। উল্টোদিকে ঈদুর আজহার(কুরবানির ঈদ) নামাজ খালিপেটেই পড়ার রীতি। এই কারনে ঈদুল ফিতরে বাড়ির পুরুষদের পাশাপাশি মহিলাদের মধ্যে তৎপরতা বেড়ে যায়। বাড়ির মা-বোনেরা সকাল সকাল চান করে ‘পাক সাফ’ হয়ে লাচ্ছা-সিমুই তৈরীতে লেগে যান।

নারকেল কুরে রাখা হয়। এই নারকেল মূলত সিমুই তৈরীতে লাগে। মায়ের হাতের জাদুতে সিমুই হয়ে ওঠে লোভনীয়। ঘি দিয়ে সিমুই ভেজে নারকেল, দুধ, কিসমিস, এলাচ, কাজুবাদামের উপস্থিতিতে ভালোবাসার রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সিমুই আলাদা রূপ পায়। সিমুইয়ের মধ্যেকার ঘিয়ের গন্ধ জানলা ভেদ করে ছড়িয়ে যায় দূরপ্রান্তে। বোধহয় এই সুবাস জান্নাতে গিয়ে জমা হয়।

এর পরেই নাম আসে লাচ্ছার। দুধ গরম করে অল্প চিনি মিশিয়ে লাচ্ছার গোলাকার চাকতিগুলো ফেলে দিতে হয়। আস্তে আস্তে নরম হয়ে আসে লাচ্ছা। নরম হয়ে গেলেই খাওয়া শুরু করতে হয়।

যাইহোক নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে রীতি মেনে অল্প করে খেয়ে নেওয়া। নামাজ পড়ে, কোলাকুলি করে, গুরুজনদের সালাম জানিয়ে বাড়ি ফিরে আবার লাচ্ছা-সিমুই খাওয়া হয়। মুসলিম বাড়িতে সাধারণত এমনই খাদ্যরীতি। 

পাড়ার মধ্যেই একে অন্যেকে বাড়ি ধরে নিয়ে জোর করে খাওয়ানোটাও গ্রাম্য দাদাগিরি। আরিফের বাড়ি খেয়ে আসছে ডালিম, অথবা উজ্জ্বলকাকা খেয়ে আসছে মানিককাকার বাড়িতে।

খুব হতদরিদ্র পরিবার বাদ দিলে, সাধ্যমত দুপুরে বিরিয়ানি, পোলাও বা ব্যবস্থা হয়। বিরিয়ানি হলে বিফ বিরিয়ানির চান্স নব্বই পার্সেন্ট। কেউ কেউ গোমাংস ভালোবাসেন না, কখনও ডাক্তারের বারণ, কিছু ক্ষেত্রে অমুসলিম মেহেমান থাকলে ‘বিফ বিরিয়ানি’ চিকেনে বদলে যায়। আসলে গরুর গোস্ত খাওয়া বাঙালী সাধারণ মুসলিম খাসির মাংসে মন ভরাতে পারে না। দামে পোষালেও টেস্টে পোষাবে না! অগত্যা চিকেন।

গোস্তের সলিড টুকরো দিয়ে সরু চালের ধোপদোরস্ত ‘বিফ বিরিয়ানি’, কেউ কেউ হাড়ের গায়ে লেগে থাকা মাংস খোঁজেন। সে মাংসের আলাদা কদর।

পোলাওয়ের মিঠে সুবাসের সাথে গোস্তের কম্বিনেশনটাও প্রশংসার দাবি রাখে। এছাড়া বাঙালী মুসলমানের চিরন্তনী ‘গোসভাত’। সাদা ভাতের সাথে গরুর মাংসের ঝোল, গরম মশলার গন্ধ প্রান ভরে টেনে নেওয়াটাও শিল্প। চর্বিদার ঝোলকে ভাতে মেখে খাওয়ার সময় কাঁচা পেঁয়াজ বা কাঁচালংকা কামড়ে খেলে অন্যরকম স্বাদ পাওয়া যায়। স্যালাড হলে তো কথাই নেই। গোস্তকে প্রধান মেনু ধরে নিয়ে সাথে শাকসবজি, ডাল, ভাজাভুজি, চাটনিও কালভদ্রে থাকে। ঈদে চাটনি খুব কম বাড়িতেই হয়। ইসলামে মদের ব্যাপারে কড়া নিষেধ থাকায় পানীয় হিসেবে মূলত কোল্ড ড্রিংকের নাম উঠে আসে। 

গরুর গোস্তের পছন্দের নানা প্রকারভেদ আছে। কেউ কেউ কলিজা খেতে ভালোবাসেন, কেউ মগজভাজা, কারো জিভ খেতে ভালোলাগে। কেউ গরুর পা দিয়ে তৈরী ‘নেহারি’ দিয়ে পরোটা হুড়মুড়িয়ে খান। হাড় থেকে সুড়ুৎ করে টেনে নেওয়া শাঁসালো অংশ...।

ঈদের খাওয়াদাওয়া মধ্যে যেন রমজানের ছায়া রয়ে যায়। তবুও বাঙালী রমজান ফলসর্বস্ব এবং প্রায় তেলেভাজায় সীমাবদ্ধ। কিন্তু ঈদে হালিম, ভুনা, চাঁপ, টিকিয়া, কাবাবের ভিড়ে নানান পদের ব্যবস্থা। ঘরেই বানিয়ে ফেলা বিফরোল, মাংসের কুচি দিয়ে ছোলার ডালের স্বাদ জিভে লেগে থাকা...।

বাড়িতে খাওয়াদাওয়ার পাশাপাশি সন্ধ্যেয় রাস্তায় বেরিয়ে স্ট্রীট ফুডের স্বাদ নেওয়ার মজাই আলাদা। কলকাতার মুসলিম প্রধান এলাকায় বিফকেন্দ্রিক নানা স্ট্রীট ফুডের কথা বিস্তারিত লেখার প্রয়োজন নেই। অনেকেই জানেন এবং ফেসবুকে কিছু অমুসলিমরাই এই ব্যাপারে দারুন লিখেছেন। আমি ঘরোয়া হেঁসেলের কথাই মূলত তুলে ধরলাম। 

ঈদে প্রতিবারই আদি বাড়িতে এলে পাড়ায় ভোজের ব্যাপার থাকে। মাঝেমধ্যে বিরিয়ানি হলেও, প্রায়ই সাদা ভাতের সাথে গোস্তের ঝোল। পিতলের বড়বড় হাঁড়িতে(দেগ বলা হয় হাওড়ায়) আলুগোস্ত রাঁধা হয়। সাদামাটা অথচ কি অপূর্ব তার স্বাদ, দেগের আলুর গন্ধেই জিভে জল আসে। বড় বড় আলুর টুকরো দিয়েই ভাত মেখে খাওয়ার মজাই অন্যরকম। হান্নানকাকু, জালালকাকুরা বিকেল থেকেই কাজে লেগে পড়েন। সাধারন মশলা, আদা-রসুন-গরম মশলার জাদুতে গোটা এলাকা মাতিয়ে দেন। ভিড়ের মধ্যে দেলু চাচারা বলে ওঠেন - “হান্নান গোসটা হেব্বি রাদে তো। অকে এবার থিকে খানাঘরে(ভোজবাড়ি) রাদতে দিতে হবে”। 

ত্রিপল পেতে খামারের(ধান উঠতো বলে) অল্প ফাঁকা জায়গায় দু-তিন পঙক্তিতে সবাই একসাথে বসে খাওয়ার মধ্যেই সাধারণ মেঠো খুশি। মেয়েদের খাওয়া হলেই ছেলেরা বসে। অল্প আলোর মধ্যেই সব বয়সের মানুষদের সাথে ‘আলু-গোস’ খেয়ে ওঠা। কেউ এরই ফাঁকে বলে উঠলো - “জয়নাল চাচাকে নরম দেখে আরো দুটো গোস দে রে”। আমাদের জয়নাল দাদু বয়সের ছাপ স্পষ্ট করে উত্তর দিলেন - “দিওনি বাপ, আমার কি সে বয়স আছে!”। এরই মধ্যে আসরাকাকা, মোমরা গাঁতিয়ে সেঁটে দিচ্ছে। দু তিনটে জলের মগ ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিকওদিক। কেউ নুন চেয়ে বসেছেন, সেই নুন আনতে গিয়ে খাওয়া অর্ধেক কাবার...।

সত্যি বলতে সারামাস রোজা রেখে ঈদে একসাথে অনেক খাওয়া যায় না। এ ব্যাপারে প্রায় প্রত্যেক রোজাদারই একমত হবেন। তাছাড়া ঈদে খাওয়ার চেয়ে খাইয়েই বেশি সুখ। একসাথে দেখা হওয়া আত্মীয়পরিজনদের পছন্দের খাবারটা খাওয়ানো মধ্যেই অফুরান আনন্দ। লাচ্ছা-সিমুইয়ের ছুতোয় কত খারাপ সম্পর্কও ভালো হয়ে যায়, হিন্দু-মুসলিমের যোগসূত্র সামান্য হলেও রচিত হয়। যে মুসলিম বন্ধুটি প্রিয় বিফের বদলে চিকেন এনে অমুসলিম ভাইটির পাতে ‘চিকেন বিরিয়ানি’ সাজিয়ে দিতে চান। তাঁর নিয়েত মুসলমানি ছুঁয়ে, আত্মীয়তার সপ্তম আসমান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। 

অনেকই হয়তো জানেন না, অমুসলিমদের অস্বস্তি এড়ানোর জন্য খুবই সতর্কতার সাথে রান্না হয়। এই সততা ও শ্রদ্ধা খুব সাধারণ মুসলমান বাড়িতেই দেখি।

বিরিয়ানিকে বাঙালী গত কয়েকবছরে আলাদাভাবে আপন করেছে। বিশেষত অমুসলিমদের মধ্যে এই প্রবণতা ছোটবেলা দেখিনি।  আর্সেলান, আমিনিয়াদের দৌলতে রোজকার বিরিয়ানিকে ঈদের খাবার ধরাটা যথার্থ হবে না।

মুসলিম বাড়ির লাচ্ছা-সিমুয়ের যে আবেদন, তা একমাত্র খাদ্যরসিকরাই জানেন। এটিকেই অফিশিয়াল ঈদের খাবার বলা চলে। শিমুই খেতে খেতে তাড়াহুড়োয় এলাচ দাঁতে কেটে ফেলার অভিজ্ঞতা অন্যরকম। হলদিরামের প্যাকেটজাত লাচ্ছায় হয়তো স্বাদ আছে, কিন্তু আন্তরিকতার অভাব। ঈদের দাওয়াতে গিয়ে মুসলিম পরিবারের বউয়ের শাড়ির ঘোমটা সামলে - “দাদা, আরেকটু সিমুই দিই। আপনার বাড়ির জন্য টিফিন ক্যারিয়ারে দিচ্ছি…”। এসব শুনবার পর কোথাও একটা পারস্পরিক সম্মানের আবহ জন্মে যায়। 

ঈদের নামাজের পর কিছু বাগদিপাড়ার বাচ্চারা মসজিদের বাইরে ওয়েট করে। মসজিদে মিষ্টিমুখ করার জন্য কিছু বাড়ি বাড়ি থেকে পায়েস, সিমুই আসে। সেগুলো বিলিয়ে দেওয়া হয় ওই গরিব বাচ্চাকাচ্চাদের মধ্যে। মুসলমানের পরবে এভাবেই তাদের অংশগ্রহণ।

অমুসলিম বন্ধুদের দাওয়াতের পাশাপাশি। ভক্তির মা, রাধামাসির মতো বয়স্ক বিধবা মহিলারা আমাদের পাড়ায় এসে ঈদে শাড়ি নেওয়ার পাশাপাশি, লাচ্ছা-সিমুই নিতে আসেন প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভরে। তাঁদের অভাবের সংসারে এগুলোই অনেক। সাথে কিছু নগদ টাকাও দেওয়া হয়। আমাদের বাড়িতে বিভিন্ন কাজ করা অশোককাকু, শশাঙ্ককাকুরাও আসেন। ঈদের পরবে এটাও অন্যরকম পাশে থাকা।

ঈদ কোলাকুলি, নিজধর্ম পালনের পাশাপাশি সম্প্রীতি ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা। খুশির উৎসব আসলে সবাইকে সাথে নিয়ে আনন্দ করা। এতোবছর দুটো ধর্ম এতো কাছাকাছি থেকেও একে অন্যের ধর্মীয় রীতি সম্পর্কে খুব বেশি ওয়াকিবহাল নয়, তারই মাঝে ঈদে দেদার খাওয়াদাওয়া আসলে খাদ্যসম্প্রীতি রেখে যায়।

 

#হককথা

 

 

 

 

 

 




Avatar: দ

Re: উৎসবের খাদ্যসম্প্রীতি ও পাড়ার খানাপিনা

উল্লুস। পড়তে গিয়েই জিভে জল এসে টেসে একশা!

পশ্চিমবঙ্গে থাকতে কোনওদিন ঈদের নেমন্তন্ন পাই নি অবশ্য। বাইরে আসার পর থেকে নিয়মিতই পই।
Avatar: শঙ্খ

Re: উৎসবের খাদ্যসম্প্রীতি ও পাড়ার খানাপিনা

জিভে জল এলো। এবারে রমজান উপকলক্ষ্যে দু জায়গার হালিম, কাবাব, বিরিয়ানি আর লাচ্ছা খাওয়া হল। নেহারি মিস করে গেলুম।

নিউ জার্সিতে থাকার সময় নিয়মিত জ্যাকসন হাইটে গিয়ে গোস্ত বিরিয়ানি আর গরুর ভুনা খেতুম। খুব একটা ঝাল হতনা, কাঁচালঙ্কা চেয়ে নিতুম। একটা দোকানে মুখচেনা হয়ে গেছিল, এক্সট্রা বিরিয়ানি, বেছে বেছে বড় মাংসের টুকরো, শেষপাতে মিষ্টি দিত। মিস ইউ রাসেলভাই।
Avatar: রত্না রশীদ ব্যানার্জী

Re: উৎসবের খাদ্যসম্প্রীতি ও পাড়ার খানাপিনা

সঠিক তথ্য সমৃদ্ধ মনোগ্রাহী লেখা।ধন্যবাদ।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন