গুরুচণ্ডা৯র খবরাখবর নিয়মিত ই-মেলে চান? লগিন করুন গুগল অথবা ফেসবুক আইডি দিয়ে।

পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য আইন ২০১৭ : বিশল্যকরণীর সন্ধানে

ডাঃ সিদ্ধার্থ গুপ্ত

প্রাককথন – 

প্রথমে একবালপুরের সি.এম.আর.আই হাসপাতালে দাবিমত টাকা দিতে না পারার জন্য ১৪ বছরের কিশোরীকে ভর্তি করেও চিকিৎসা না করে ফেলে রাখা। ফলত পরের দিন ভোররাত্রে কিশোরীর মৃত্যু এবং উত্তেজিত জনতার দ্বারা ওই বেসরকারি হাসপাতালে ব্যাপক ভাঙচুর এবনহ স্বাস্থ্যকর্মীদের গণধোলাই। তার মাত্র দুদিনের মধ্যেই পথ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত যুবককে টাকা বাকি থাকার জন্য সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে বাধা দেওয়ার গুরুতর (এবং প্রমাণিত) অভিযোগ শহরের সবচেয়ে মহার্ঘ্য এই সারা ভারতে শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে রাখা অ্যাপেলো হাসপাতালের বিরুদ্ধে। ফলে রোগীর মৃত্যু। ক্রমে ক্রমে জানা গেল মাত্র সাতদিনে খরচের মিটার উঠেছিল প্রায় আট লক্ষ টাকা। রোগীর পরিবার ৭৫% টাকা মিটিয়ে দেবার পরও তাঁদের বাধ্য করা হয় অর্থলগ্নি সংক্রান্ত শংসাপত্র (Fixed Deposit) জমা রাখতে। তদন্ত জোরালো হলে আস্তে আস্তে উন্মোচিত হচ্ছে নানা ভয়াবহ তথ্য। যেমন যে ‘অ্যাঞ্জিওএম্বলিজম’ প্রক্রিয়া করাই হয়নি (এবং জাল তথ্য ও চিত্র স্বাস্থ্য দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে) তার জন্য পৌনে তিন লক্ষ টাকা আদায় করা, পাঁচ মিনিটের মধ্যে চারবার অজ্ঞান করা হয়েছে বলে খরচ দেখানো, ২৪ ঘন্টায় ৩৬ বোতল স্যালাইন দেওয়া হয়েছে বলে বিল ধরানো ইত্যাদি, প্রভৃতি। 

বন্যার জলের মত অভিযোগ আসতে লাগল। ভুল চিকিৎসায় পা কেটে বাদ দেওয়া, যে সব চিকিৎসা করাই হয়নি তার অর্থ আদায় করা, বিদেশে ভ্রমণরত...... , মৃত রোগীকে বাড়ির লোকের অমতে ভেন্টিলেটরে চাপিয়ে দশ লক্ষ টাকার ফর্দ ধরানো, হৃদধমনীর মধ্যে যে ‘স্টেন্ট’ বসানো হয়েছে বলে টাকা নেওয়া হয়েছে – রোগীর মৃত্যুর পর ময়নাতদন্তে সেই বস্তুগুলির অস্তিত্ব খুঁজে না পাওয়া, এককথায় গুণতে গেলে গুণের নাই শেষ। বহু দিনের পুঞ্জীভূত অবরুদ্ধ অভিযোগ, অশ্রু, ক্ষোভ, ভুল চিকিৎসায় বা অবহেলায় স্বজন হারানর যন্ত্রণা এবং বারবার প্রতারিত হওয়ার ক্রোধ হড়পা বানের মতো নেমে এল মুদ্রিত ও বৈদ্যুতিন মাধ্যমের পাতায় পাতায়। সাংবাদিক মহলে হৈ হৈ পড়ে গেল – কে কত রোমাঞ্চকর, অশ্রুসিক্ত, ভয়াবহ ঘটনা তুলে ধরতে পারেন এই বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবসাকে কেন্দ্র করে।

বেসরকারি হাসপাতালের এই চূড়ান্ত প্রতারণা, অমানবিকতা, লুঠতরাজ ও রোগীমেধ যজ্ঞের পাশাপাশি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিরও বেহাল অবস্থা, প্রবল দায়িত্বহীনতা, রোগীদের সম্পর্কে তাচ্ছিল্য ও ভিক্ষুকের মতো তাঁদের দেখা এবং সবার জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসার প্রবল ঢক্কানিনাদের অন্তরালে মহকুমা থেকে জেলাসদর হয়ে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলির অপদার্থতার কাহিনীগুলিও কম বিবমিষা উদ্রেককারী নয়। হাসপাতালে ভ্রতি হতে না পেয়ে রাস্তায় প্রসূতির গর্ভমোচন, পাঁচ সরকারি হাসপাতালে ঘুরে শয্যা না পেয়ে পথেই রোগীর মৃত্যু, প্রসূতি বিভাগ থেকে শিশুচুরি, হঠাৎ হঠাৎ সংক্রমণে নবজাতকদের মৃত্যুর মিছিল, রোগীর আত্মীয় – বহিরাগত এবং জুনিয়ার ডা.ক্তারদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, নিঃশুল্ক পরিষেবা নিতে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর আঁকাবাঁকা লাইনে হয়তো ক্রমবর্ধমান জনরোষ আঁচ করেই সরকার নড়েচড়ে বসলেন এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলেন। ফেব্রুয়ারী মাসের গোড়ায় মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রীস্বয়ং নবান্নতে এক বিচারসভা বসালেন। টেবিলের একদিকে মুখ্যমন্ত্রী সহ মন্ত্রীপরিষদের কিছু নামীদামী সদস্য, বড় বড় সচিব পর্যায়ের আধিকারিক এবং অন্যান্য কর্তাব্যক্তিরা। টেবিলের অপরদিকে কলকাতার ‘নামকরা’ প্রায় সমস্ত হাসপাতালের মালিক, মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক এবং অন্যান্য প্রতিনিধিবর্গ।

দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মুখ্যমন্ত্রী বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে জানিয়ে দিলেন চিকিৎসা ব্যবসা নয়, সেবা এবং তাতে লাভ করা যেতেই পারে কিন্তু মানবিক মূল্যবোধ হারালে চলবে না। রোগীদের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে এবং প্যাকেজের তোয়াক্কা না করে আকাশছোঁয়া বিল করা, অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার, পরীক্ষানিরীক্ষা এবং ঔষধের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। চিকিৎসা ব্যবসাকে করতে হবে স্বচ্ছ এবং দুর্নীতিমুক্ত। টাকা না দিতে পাড়ার অজুহাতে জরুরী পরিষেবা না দেওয়া, চিকিৎসা না করে ফেলে রাখা চলবে না। অনাদায়ী অর্থের জন্য রোগীর দেহ আটকে রাখা চলবে না ইত্যাদি। বিশেষ বিশেষ হাসপাতালের নাম করে কারুর ‘কিডনি চক্র কেমন চলছে’, ‘ভেন্টিলেটরে মস্তিষ্ক মৃত (Brain Death) ব্যক্তিকে দিনের পর দিন আটকে রেখে টাকা আদায় বন্ধ হয়েছে কি না’ এসব প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে নতশির করলেন মুখ্যমন্ত্রী। এই অনুষ্ঠান সমস্ত বৈদ্যুতিন মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারিত (Live Telecast) হচ্ছিল। ফলে এতদিন ধরে বেসরকারি হাসপাতালের দ্বারা প্রতারিত হতাশ, ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ জনগণ চমৎকৃত হয়ে গেলেন যে এইবার সরকার নড়ে বসেছেন এবং বেসরকারি হাসপাতাল এবং চিকিৎসকদের তঞ্চকতা নিশ্চয় বন্ধ হবে। সাধারণভাবে চিকিৎসকদের একাংশের রোগীর প্রতি দুর্ব্যবহার এবং তার পাশাপাশি বাড়ি-গাড়ি-বিদেশভ্রমণ (অনেক ক্ষেত্রেই ওষুধ কোম্পানী পোষিত) সাধারণভাবে মানুষ অসুখে পড়লে চিকিৎসকের পা জড়িয়ে ধরলেও তাঁদের ‘গণশত্রু’ বলেই মনে করেন। নোট বাতিলের ধাক্কায় নাজেহাল নিম্নমধ্যবিত্ত যেমন নিজের আর্থিক লাঞ্ছনা সত্ত্বেও ধনী প্রতিবেশীর ‘কালাধন’ ধ্বংস হবার আশায় উল্লসিত হয়েছিলেন, তেমনই মনোভাব চিকিৎসকদের সম্পর্কে অধিকাংশ নাগরিকদের। 

অধ্যায় – ২

পশ্চিমবঙ্গ চিকিৎসাকেন্দ্র (নিবন্ধীকরণ, নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা) আইন, ২০১৭

মুখ্যমন্ত্রী আগেই আভাস দিয়েছিলেন যে বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলি নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর আইন লাগু করার। সেই পথেই এই প্রস্তাবিত বিল বিধানসভায় পেশ হল ৮ই মার্চ এবং তেমন কোন আলোচনার সুযোগ ছাড়াই ... সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে গৃহীত হল। ১৬ তারিখে রাজ্যপালের স্বাক্ষর পর এই বিল আইনে পরিণত হল, যে বিলের নাম, ‘The West Bengal Clinical Establishment (Registration, Regulation and Transparency) Bill, 2017. 

উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য

এই নতুন আইনের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য হিসেবে সরকার বলেছেন, এর আগের আইন অর্থাৎ ২০১০ সালে পাশ হওয়া আইনে স্বচ্ছতার অভাব ছিল এবং চিকিৎসায় অবহেলার বিষয়টি সঠিকভাবে পর্যালোচনা করা হয়নি। সেই জন্য এই নতুন আইনের অবতারণা যা সরকারের মতে এক দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ, রোগীবান্ধব এবং উচ্চ গুণমানের চিকিৎসা পরিষেবা দিতে বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে বাধ্য করবে কেননা সকার মনে করেন যে বেসরকারি চিকিৎসা পরিষেবা ব্যবসা হলেও আসলে তা একধরণের সেবা এবং বেসরকারি হাসপাতালরা মুনাফা করতেই পারেন কিন্তু সেবার মনোবৃত্তি নিয়েই তাদের মুনাফা করতে হবে। 

এবার মূল আইনটিতে আসা যাক। আইনটিতে বলা হয়েছে সরকার বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমে চিকিৎসা পরিষেবার ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার অভাবে গভীরভাবে চিন্তিত। যেভাবে এইসব চিকিৎসাকেন্দ্রগুলিতে রোগী ও তার আত্মীয়স্বজনকে নানা লাঞ্ছনার সম্মুখীন হতে হয় এবং প্রচুর অর্থব্যয় করতে হয় তা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। সেই জন্য সমস্ত চিকিৎসা পরিষেবা কেন্দ্র বা Clinical Establishment এর ক্ষেত্রে এই নতুন আইন লাগু করা হচ্ছে। Clinical Establishment এর ক্ষেত্রে পড়বে সমস্ত বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিংহোম, ডিসপেনসারী, পলিক্লিনিক, টীকা দানকেন্দ্র, রোগীদের ভর্তি রাখার জন্য স্যানাটোরিয়াম, ফিজিওথেরাপী সেন্টার, বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণ কেন্দ্র এবং চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বার। 

কোন ধরণের সংস্থাগুলি পরিচালিত হাসপাতালগুলি এর আওতায় আসবে

  1. সমস্ত বেসরকারি সংস্থা
  2. কর্পোরেট সংস্থা
  3. ট্রাস্ট ও সোসাইটি
  4. লাভজনক ও অলাভজঙ্ক সংস্থা
  5. সমবায় সংস্থা

কোন কোন স্বাস্থ্যকেন্দ্র এই আইনের আওতায় আসবে না

  1. সমস্ত কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারি, আধা সরকারি, পুরসভা বা পঞ্চায়েত পরিচালিত স্বাস্থ্যকেন্দ্র
  2. সামরিক বাহিনীর হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র
  3. ১৯৮৭ সালের Mental Health Act মোতাবেক মানসিক রোগের চিকিৎসা হয় এমন সব কেন্দ্র।

আইনটির উল্লেখযোগ্য ধারাসমূহ 

  1. সমস্ত ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্টকে কে এই ধারা মেনে চলতে হবে এবং সেইজন্য লাইসেন্স নিতে হবে।
  2. আইন মেনে না চললে জরিমানা, জেল এবং হাসপাতাল বন্ধ করে দেবার অধিকার সরকারের থাকবে।
  3. রাস্তায় দুর্ঘটনাগ্রস্ত, প্রাক্রিতিক বিপর্যয়ে আহত, অ্যাসিড আক্রমণের সম্মুখীন এবং ধর্ষণের শিকার কোন ব্যক্তির টাকা (Fee) দেওয়ার ক্ষমতা বিবেচনা না করেই চিকিৎসা করতে হবে।
  4. রোগীর মৃতদেহ বিল মেটানো হয়নি বলে আটকে রাখা যাবে না। (যদি হাসপাতাল ভবিষ্যতে সেই অর্থ পুনরুদ্ধার করতে পারে) ।
  5. প্রতি হাসপাতালে জনগণের অভিযোগ নথিভুক্ত করার জন্য একটি কেন্দ্র থাকতে হবে।
  6. সব ব্যবস্থাপত্র (Prescription) এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য (Medical Records) বৈদ্যুতিন প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করতে হবে। 
  7. রোগীর ছুটির সময় সমস্ত চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র দিয়ে দিতে হবে।
  8. শয্যার ভাড়া, আইসিইউ-এর খরচ, পরীক্ষানিরীক্ষা, অস্ত্রোপচার প্রভৃতির নির্দিষ্ট খরচ আগে থেকেই ঘোষণা করে দিতে হবে।
  9. “প্যাকেজ”-এর বাইরে কোন খরচ নেওয়া চলবে না (যেমন গল ব্লাডা.র, বাইপাস সার্জারি প্রভৃতি), এই ধরণের প্যাকেজের ক্ষেত্রে সমস্ত সম্ভাব্য খরচ আগে থেকে জানিয়ে দিতে হবে এবং কোন মতে তার থেকে বেশী বিল করা চলবে না। 
  10. একই পরীক্ষানিরীক্ষা বারবার করা যাবে না।
  11. প্রতিটি হাসপাতালে ন্যায্যমূল্যের ওষুধের দোকান ও ন্যায্যমূল্যের রোগ নির্ণয় কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। রোগীদের হাসপাতাল থেকেই ওষুধ কেনা বা পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য বাধ্য করা চলবে না। 
  12. যে সব হাসপাতাল সরকারের কাছ থেকে সস্তায় জমি,করছাড় বা অন্যান্য সুযোগ সুবিধা নিয়েছে তাদের বহির্বিভাগে শতকরা ২০ জন এবং অন্দরবিভাগে শতকরা ১০ জন রোগীর চিকিৎসা বিনামূল্যে করতে হবে। যারা সরকারি সাহায্য নেয়নি, তাদের ক্ষেত্রেও সামাজিক দায়িত্ব হিসাবে এই অনুরোধ রাখা হচ্ছে। 
  13. রোগীর পরিজনের সম্মতি ব্যতিরেকে ভেন্টিলেটরে চিকিৎসা চালানো চলবে না। 
  14. জরুরী ও প্রাণদায়ী চিকিৎসার ক্ষেত্রে অর্থের অভাবের জন্য রোগী ফেরানো চলবে না। যদিও হাসপাতাল পড়ে সেই চিকিৎসার খরচ উসুল করতে পারে।
  15. HIV/AIDS রোগীদের ক্ষেত্রে কোনো বিমাতৃসুলভ আচরণ করা চলবে না। 

নিয়ামক সংস্থা প্রতিষ্ঠা

এই আইনের প্রয়োগ এবং সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাজ্য সরকার একটি বাঁ নিয়ামক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন যারা সমস্ত বেসরকারি হাসপাতালের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখবে এবং রোগী ও তার পরিজনেরা যে কোনো অভিযোগ নিয়ে দ্রুত সুবিচারের জন্য সেই সংস্থার দারস্থ হতে পারবেন। 

নিয়ামক সংস্থা বা কমিশনের চেয়ারম্যান ঘোষিত হয়েছেন বিচারপতি শ্রী অসীম কুমার রায়, সহ-সভাপতি একজন বরিষ্ঠ সচিব, সভাপতির অনুপস্থিতিতে যিনি কাজ চালাবেন। কমিশনের বাকি সদস্যরা হলেন – চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষা, আইন, সমাজসেবা, অর্থনীতি প্রভৃতি থেকে ‘মনোনীত’ ১১ জন ব্যক্তিত্ব। এভাবে প্রস্তাবিত কমিশনের সদস্য হয়েছেন ডা. সুকুমার মুখার্জী, ডা. গোপালকৃষ্ণ ঢালি, ডা. অভিজিৎ চৌধুরী, ডা. মাখনলাল সাহা, ডা. মধুসূদন সাহা, ডা. মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী। এছাড়া থাকছেন – সংঘমিত্রা ঘোষ, অনুজ শর্মা, প্রবীণ ত্রিপাঠি ও মাধবী দাস।

এই কমিশনকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বেসরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রের বিরুদ্ধে যে কোনো অভিযোগ গ্রহণ ও সে বিষয়ে তদন্ত করতে এবং অভিযুক্ত স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানটিকে বা ব্যক্তিকে লাইসেন্স বাতিল, জেল এবং জরিমানা (পঞ্চাশ হাজার থেকে পঞ্চাশ লাখ পর্যন্ত) লাগু করতে। এই কমিশন এত শক্তিশালী যে তাদের রায়ের ওপর কোনো দেওয়ানি আদালতে(Civil Court) আর্জি বা মোকদ্দমা করা যাবে না।

সংশয় এবং বিরোধিতা

সরকারের এই ‘অভূতপূর্ব’ পদক্ষেপে এতদিন ধরে বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চক্রবূহ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রতারিত সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই উল্লসিত। নিয়ামক কমিশন কেবল ঘোষিত হয়েছে মাত্র। এখনো তার কার্যালয় বা পরিকাঠামো কিছুই তৈরি হয়নি। সংবাদে প্রকাশ, মাত্র এক মাসের মধ্যে কয়েক হাজার অভিযোগপত্র নবান্নে স্বাস্থ্যদপ্তরে জমা পড়েছে, যা নিয়ে সেখানকার অধস্তন কর্মচারীরা দিশাহারা।

অপরপক্ষে, চিকিৎসকদের একটি বৃহৎ অংশ, বিশেষত যেসব চিকিৎসকরা প্রাইভেট প্র্যাকটিস অথবা বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত আছেন, তাঁরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ, এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। পশ্চিমবঙ্গে চিকিৎসকদের সর্ববৃহৎ সংগঠন আইএমএ উল্লেখযোগ্য ভাবে বিভাজিত হয়ে গেছে। একদিকে সরকারপন্থী চিকিৎসকরা (যাঁদের অনেকেই অবশ্য কিল খেয়ে কিল হজম করছেন), অন্যদিকে বিদ্রোহী ডা.ক্তারকুল। রাতারাতি গজিয়ে উঠেছে Doctors for  Democracy, Doctors for Patients, West Bengal Doctors’ Forum প্রভৃতি সংস্থা, যারা ডা.ক্তারদের পেশাগত স্বার্থ রক্ষা করতে তৎপর। এঁদের অনেকেই এই বিলের ফলে চিকিৎসক রোগীর ‘মধুর’ সম্পর্কের অবনতির আশঙ্কায় পথে নেমেছেন বলে দাবী করেছেন। ডা.ক্তারদের কয়েকটি সংগঠন সংঘবদ্ধভাবে আদালতে যাওয়া স্থির করেছেন। চিকিৎসকদের পেশাগত দ্বন্দ্ব ছাড়াও এই আইনেড় বিরুদ্ধে বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্ন উঠে এসেছে। যথা – 

  1. কেন সেই বিখ্যাত প্রবাদবাক্য ‘Charity begins at home’ এক্ষেত্রে খাটছে না? সয়াকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার বিষয়ে যে ঝুড়ি ঝুড়ি অভিযোগ প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, তার বিচার কে করবে? সরকার দাবী করেন রাজ্যের তিন-চতুর্থাংশ মানুষ সরকারি পরিষেবা গ্রহণ করেন – যদিও এই দাবীর সত্যতা প্রমাণ করা মুশকিল। সরকারি হাসপাতাল্গুলি কেন এই আইনের আওতায় পড়বে না, বা নজরদারি থেকে ছাড় পাবে?
  2. যারা বিনা ব্যয়ে চিকিৎসা পান, তাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা কি উচ্চমানের বা দুর্নীতিমুক্ত হওয়ার দরকার নেই?
  3. কেন নিয়ামক কমিশনের সমস্ত সদস্যরাই মনোনীত হবেন, নির্বাচিত নন? বর্তমানে কমিশনের অন্তত তিনজন সদস্য নানা বেসরকারি হাসপাতালে ডিরেক্টরস বোর্ড আলো করে আছেন। তাঁরা ওইসব হাসপাতালের বিরুদ্ধে কিভাবে যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন – বা স্বার্থের সংঘর্ষ (Conflict of Interest) এড়াবেন?
  4. নিয়ামক কমিশনের প্রত্যেক সদস্যই স্ব স্ব পেশায় দারুণ ব্যস্ত। কমিশনের সভা বসবে মাসে একবার কি দুবার। কীভাবে তাঁরা এই বিপুল পরিমাণ অভিযোগের সুবিচার করবেন?
  5. আইনে বলা হয়েছে, অবহেলা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ কমিশনে এলে তদন্তে ফয়সালা হবার আগেই কমিশন তিন লক্ষ টাকা পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন জরিমানার নির্দেশ দিতে পারেন সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। কোনো মাসের ২৯ তারিখে যদি কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয় তবে ১ দিনের মধ্যে কোনো তদন্ত বা শুনানি ছাড়াই ওই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। পরে যদি স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দোষ প্রমাণিত হয় তাহলে ওই জরিমানার টাকা কীভাবে ফেরত পাওয়া যাবে বা আদৌ ফেরত পাওয়া যাবে কি না সে প্রসঙ্গে আইন নিশ্চুপ। শিবঠাকুরের আপন দেশেই এমন আইন সম্ভব।
  6. কমিশন কোনো হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিরুদ্ধে বা ব্যক্তি-চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলে শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা সংস্থার অর্থেই তা কাগজে বিজ্ঞাপিত করা হবে। এক্ষেত্রে প্রশ্ন, পরে যদি কোনোভাবে দেখা যায়, অভিযোগটি মিথ্যা, তাহলে ওই বিজ্ঞাপনের খরচ কীভাবে কমিশন ফেরত দেবে? ওই ব্যক্তি/ প্রতিষ্ঠানের যে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি হল তার ক্ষতিপূরণ কীভাবে সম্ভব হবে?
  7. সবচেয়ে বড় অসংগতি হচ্ছে, কেন নিয়ামক কমিশনের সিদ্ধান্ত কোনো দেওয়ানি আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না? এটা তো দেশের সাধারণ আইওন ও বিচার ব্যবস্থার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কোনো সরকারি আইনবলে ন্যায় বিচারের অধিকার থেকে কাউকে এভাবে বঞ্চিত করা যায় নাকি? সরকার বাহাদুর সম্ভবত জানেন মৌলিক অধিকার (Fundamental Right) বিরোধী এই ধারা আদালতে খারিজ হয়ে যাবে। তখন হয়তো সরকারের তরফে বলা হবে যে তাঁরা জনগণের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন, যা স্বার্থান্বেষী মামলাবাজ চিকিৎসকরা বানচাল করে দিলেন।
  8. ৩ এবং ৪ নং ধারায় বলা হয়েছে অর্থের অভাবে বা অর্থ না দিতে পারার জন্য জরুরী চিকিৎসা প্রত্যাখান করা চলবে না এবং মৃতদেহ আটকে রাখা চলবে না। তার সঙ্গে একটি উপধারা যোগ করা হয়েছে, ‘যদি বেসরকারি হাসপাতাল বা প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত হয় যে অনাদায়ী টাকা তারা রুগী বা তার পরিবারের কাছ থেকে উদ্ধার করতে পারবে’ – এ কথার মানে কী? তাহলে তো বলতে হয় প্রয়াত সঞ্জয় রায়ের ক্ষেত্রে অ্যাপেলো হাসপাতাল তার স্ত্রীর ফিক্সড ডিপোজিটের কাগজপত্র আটকে রেখে বা গয়না বন্ধক দিতে চাপাচাপি করে সঠিক কাজই করেছিল। কেননা তারা গ্যারান্টি চাইছিল যে অনাদায়ী টাকা তারা উদ্ধার করতে পারবে। এক্ষেত্রে একটা কোথা বলা প্রয়োজন যে ২০১০ সালের আইনে ছিল যে, অনাদায়ী বিল রাজ্য সরকারের কাছে পাঠালে যদি তারা তা সঠিক মনে করেন তাহলে সরকারি তহবিল থেকেই তা মিটিয়ে দেওয়া হবে। এখানে তার কোনো উল্লেখ নেই। 
  9. ভুল চিকিৎসা ও অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা : আইনে বলা হয়েছে যদি এই নিয়ামক সংস্থা মনে করেন, চিকিৎসায় অবহেলা (Medical Negligence) হয়েছে বা ভুল চিকিৎসা (Medical Malpractice) করা হয়েছে অথবা অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার হয়েছে, সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালকে তারা শাস্তি দেবেন। মজার কথা হল, আমাদের দেশে বা রাজ্যে প্রাথমিক চিকিৎসার কয়েকটি বিষয় – প্রসব, সাপে কাটা বা পেট খারাপ এই ধরণের সাধারণ কয়েকটি বিষয় ছাড়া প্রায় কোনো জটিল রোগ বা অস্ত্রোপচারের কোনো নির্দিষ্ট মান্য বিধি (Standard Protocol) নেই, যা উন্নত দেশগুলির প্রায় প্রতিটিতে আছে। ফলে কোনটা সুচিকিৎসা আর কোনটা ভুল চিকিৎসা তা প্রমাণ হবে কী করে?
  10. একই সঙ্গে সেবা আর মুনাফা! নতুন আইন বলছে চিকিৎসা হল বাণিজ্যের মোড়কে আসলে সমাজসেবা। এটা কী চূড়ান্ত স্ববিরোধিতা নয়? আমাদের দেশ সহ সারা দুনিয়ায় চিকিৎসা ব্যবসা হল সবচেয়ে দ্রুত বর্ধমান বাণিজ্য, যার বৃদ্ধির হার প্রায় ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। সেই বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য এবং পণ্য পশ্চিমবঙ্গের সীমানার মধ্যে কিভাবে ‘সেবা’য় পরিণত হল তা বোঝা কঠিন।

লেখকের মত – 

বেসরকারি হাসপাতালে যে সব রোগীরা ভিড় জমান, তাদের ৮০ শতাংশই সেখানে যেতে বাধ্য হন সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেরে, পরিকাঠামোর অভাবে, বিছানা না পেয়ে, রোগনির্ণয় পরীক্ষার লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত হয়ে, জীবনদায়ী অস্ত্রোপচারে অস্বাভাবিক দেরীর জন্য বা দুর্ব্যবহারের শিকার হয়ে। প্রিয়জনের প্রাণ বাঁচাতে তাদের জমিবাড়ি, হাল-বলদ, সোনাদানা বিক্রি করে দিতে হয়, ছেলেমেয়ের পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে হয়, পারিবারিক অনুষ্ঠান বাতিল করে দিতে হয় – যাকে বলে এক বিপর্যস্ত অবস্থা। ওই বিপর্যয়ের অভিঘাতে ভারতবর্ষের প্রায় তিনকোটি মানুষ প্রতি বছর দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে যান।

নতুন আইন এই অতলান্তিক সমস্যার অতি ক্ষুদ্র সমাধান, যদি তা সৎ উদ্দেশ্যেও করা হয়ে থাকে – ‘তোলাবাজি’র জন্য নয়। প্রকৃত সমাধান হল সরকারি পরিকাঠামোর উন্নতি এবং স্বাস্থ্য চিকিৎসাকে নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে মেনে নেওয়া। যাকে বলে সবার জন্য স্বাস্থ্য বা Universal Health Care তার ব্যবস্থা করে। ২০১০-২০১১ সালে ডা. শ্রীনাথ রেড্ডি কমিটি বা HLEG-র সুপারিশ অনুযায়ীও এই সর্বজনীন নিঃশুল্ক সরকারি স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা পরিষেবা ছাড়া, মানুষের স্বাস্থ্য বিষয়টিকে বিপর্যয়ের হাত থেকে উদ্ধার করার, ‘ভালো করার’, অন্য কোনো শর্টকাট পথ নেই। বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সাধারণ মাপের কিছু সংস্কার তো নয়ই। চাই সবার জন্য স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যের অধিকার। নান্যপন্থা বিদ্যতে। 

 



কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: Prativa Sarker

Re: পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য আইন ২০১৭ : বিশল্যকরণীর সন্ধানে

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখা। অনেক প্রশ্ন তুলে দিলো।মৃতদেহ ছেড়ে দেবার পরে বা এইরকম কেসে পরে কিভাবে টাকা তুলে নেবার অধিকার দেওয়া হল ? ফিক্সড ডিপোজিট, গয়না ? তাহলে তফাৎ কোথায়? মেষচর্মাবৃত নেকড়ে ! মাথায় বসে কারা? ফর্টিস, আরো এইরকম বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বোর্ড অব ডিরেক্টরসে যারা বসে। এক্কেবারে শিব ঠাকুরের আপন দেশ !
Avatar: অরুণাচল

Re: পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য আইন ২০১৭ : বিশল্যকরণীর সন্ধানে

কাজের চাপে ছিলাম। এতক্ষণ পরে পুরো লেখাটা পড়ে, কিছু বলবার মত সুস্থিতি লাভ করলাম। আমার কাছে নতুন স্বাস্থ্য আইনের কপি নেই। ওই খবরের কাগজ আর অন্যান্য থেকেই যে'টুকু। লেখাটায় যা আছে, মানুষের দুর্গতি তার চেয়ে বহুগুণ। যে হাসপাতাল বা নার্সিংহোমগুলির কথা মিডিয়া বা সোশ্যাল নেট ওয়ার্কিং সাইটগুলোয় আছড়ে পড়ছে তার বাইরে থাকা বিশাল কয়েকশ'গুণ বেসরকারি চিকিৎসা-বাজার রয়েছে। তা' নিতে বাধ্য হওয়া মানুষ গ্রামে আর ছোটখাটো মফসসল শহরে গিজগিজ করছে। এবং ডাক্তার, ল্যাবরেটরি, দালাল, কোয়াক, অসাধু ওষুধ ব্যবসায়ী, তথাকথিত রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ আর এমনকি বিডিওর মত ছোট সরকারি আমলা এইসবে মিলে যে প্যাঁচানো ছবি তার উদ্দেশ্য বিধেয় সবই হল কি করে অসুস্থতাজনিত দুর্দশার মুখে মানুষের শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নেওয়া যায়। ভাগবাটোয়ারার হিসেব নিয়েও যথেচ্ছভাবে লড়াই চলে। এই বিপুল নৈরাজ্যের সাথে লড়বার সদিচ্ছা আর স্বচ্ছতা নতুন আইন প্রণয়নের মধ্যে আদৌ নেই। যা আছে তা' হল হইচই বাধিয়ে ভোটের বাজার তাজা রাখা, ভুবনেশ্বরের অ্যাপেলোর দামী আসামীদের যাতে সমঝে চলে সে'জন্য এখানে তার মাসতুতো ভাইকে চাপে রাখা, খবরের কাগজ চাষির আলু-ধানের দাম না পাওয়াকে হেড লাইন থেকে সরিয়ে 'তাঁর' সচিত্র জনমুখী হুমকি ইত্যাদিকে হেডলাইন করার ব্যবস্থা করা। এবং হ্যাঁ, অন্য উদ্দেশ্যটিও আদৌ ফেলনা নয়। তা' হল, বিপুল রোজগার করতে থাকা প্রাইভেট প্র‍্যাকটিশনার, কোয়াক, গলির নার্সিং হোম, আর অ্যাবরশনের আখড়াগুলোর কাছ থেকে তোলাবাজি তথা মা-মাটি-মানুষ নামধারী মাইক্রোফিনান্সের বিপুল সাম্রাজ্য আরও নিষ্ঠুর ভাবে বিস্তৃত করা, যাতে দামাল ভাইয়েরা দুধে-ভাতে থুড়ি মদে-বাইকে থাকে,সিন্ডিকেটের মত স্থায়ী রোজগারে থাকে। সরকারি ক্ষেত্রের কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো। ডাক্তারেরা রোগীর চাপে চিঁড়েচ্যাপটা হয়েও যে ভাবে ওষুধকোম্পানি ল্যাবরেটরি ম্যানেজ করছে, দালাল মারফৎ চেম্বারের রোগী ধরছে, এমনকি একবার বেডপ্যান দিতেও একশ' দেড়শ' টাকা চাইছে সুইপারও, পুরোটা একেবারে সার্কাস। নতুন চাকরি পাওয়া কলকাতা থেকে দূর গ্রামের হেলথসেন্টারের ডাক্তার পুরো মাইনে নিয়ে সে'খানে থাকছে সপ্তাহে দু'দিন। বাকি দিন কলকাতার উপকণ্ঠে প্র‍্যাকটিশ। তাকে হেলথসেন্টার থেকে ছেড়ে দিচ্ছে ফার্মাসিস্ট? কেন? তার নিজস্ব প্র‍্যাকটিশ আর অন্যান্য সুলুক সন্ধান আছে। প্রশাসন সব জেনেও কিছু বলছে না। তার যে আবার সরকারি মোচ্ছবের টেন্ডারের চাপ। সুপার থেকে সিএমওএইচ সবাই ব্যস্ত… ভারি ব্যস্ত। আর সরকার ব্যস্ত গরিবের চেয়েও অন্ততপক্ষে কাগজে কলমে যে গরিব RSBY(রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য বীমা যোজনা) কার্ডধারী সেই হদ্দ গরিবের ইনসিওরেন্সের টাকাটা কী ভাবে সরকারি বিনাপয়সার চিকিৎসার লোভ দেখিয়ে হাতানো যায়। অথচ ঢক্কানিনাদিত সবাই এমনিতেই যা পাচ্ছে সেই বিনা পয়সার চিকিৎসা পাবার হকদার তো কেউ থাকলে সে'ই।
এই হল ব্যাপার। লোকঠকানোর ডাকাতি, চলছে চলবে।
Avatar: pi

Re: পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য আইন ২০১৭ : বিশল্যকরণীর সন্ধানে

'আর সরকার ব্যস্ত গরিবের চেয়েও অন্ততপক্ষে কাগজে কলমে যে গরিব R(রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য বীমা যোজনা) কার্ডধারী সেই হদ্দ গরিবের ইনসিওরেন্সের টাকাটা কী ভাবে সরকারি বিনাপয়সার চিকিৎসার লোভ দেখিয়ে হাতানো যায়। '

এটা একটু বিশদে বলবেন ?


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন