মায়ের কর্তব্য ভিন্ন কিছু নাই

যশোধরা রায়চৌধুরী

সে একজন মা। একজন কারুর স্ত্রী, একজন কারুর মেয়ে, একজন কারুর বোন। এবং মা। এইসব পরিচয় তৈরি হয় সমাজে। তারপর সারাজীবন সেই ছাপ্পা গুলো নিয়ে চলতেই হয়। সেটাই দস্তুর।

হ্যাঁ মাতৃত্বের আনন্দ আছেই । আনন্দটুকুকে এতটুকুও খাটো করছিনা। অনন্ত সুখের পিন্ড আছে সন্তানে। কিন্তু তারপরেও থাকে অনেক প্রশ্ন, অনেক কথা। 

প্রথম যেদিন সে মাতৃত্বের রণডংকা বাজতে শুনেছিল, সেদিন ছিল তুমুল দুর্যোগের দিন। বিবাহিত জীবনের মোটে আট কি ন মাসের মাথায় সেই দিন। 

তার আগে সে তার বরকে, যৌন সঙ্গমের সময়েও , নানা বিধিনিষেধের মধ্যে রেখে, নিজের গর্ভাধান আটকানোর চেষ্টা করেছে। তার বরও কিছু কম শিক্ষিত পরিশীলিত নয়। সে নিজেও চাইত না বিয়ের পরের রাত্তিরেই বউকে প্রেগনেন্ট করার মত “নীচকর্ম” করতে। যেটা তার অনেক বন্ধু করেছে, এবং আড়ালে খিঁকখিঁক হেসেছে তারা , এরা সব ফার্স্ট নাইট কেস। 

শিক্ষিত স্বামী হবার নাতে, স্ত্রীর সঙ্গে বসে ক্যালেন্ডার দেখে সংসর্গ ঠিক করেছে। দু হাজারের দম্পতি তারা। 

বহু স্ত্রীর এই সৌভাগ্য হয়না সে জানে। সে দিক থেকে তার কোন আপশোস অভিযোগ নেই স্বামীর প্রতি।

সেটা অন্য গল্প, যে তথাপি অ্যাক্সিডেন্ট ঘটিয়া থাকে, এবং ঘটিলে তাহা “ঈশ্বরের দান” হিসাবে মানিয়া লইতে হয়।

অ্যাক্সিডেন্ট ঘটল এবং পিরিওড মিস হল। সে দেখল, মুহূর্তে পৃথিবীর রঙ পালটে পাটকিলে, ধোঁয়াটে এবং অসম্ভব ক্লান্তিকর হয়ে গেল তার কাছে। গুরুভার হয়ে উঠল জীবন। 

কিন্তু সে তো তার নিজের কাছে। অফিসে একটা নতুন অ্যাসাইনমেন্ট। সেটাতে দক্ষতা দেখাতে পারবে না , ভেবে বসের কাছে কুঁকড়ে যাওয়া। শরীরের নানা আশ্চর্য নতুনত্বের ঝড় , তাকে বহন করার জন্য দক্ষতা অর্জন। সব ছিল কার্যক্রমে। প্রথম তিনমাসের অসম্ভব গা গুলনো এবং আর যা যা হয়ে থাকে।  সকালে ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘর থেকে আসা এমনকি সাদা পটল আলুর ছেঁচকির সেই সম্বর দেবার গন্ধেও অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসতে থাকছিল তার। 

এইসব পেরিয়ে সে দেখল, পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যার পুরাতন, আদিম, প্রাচীনতম খেলা শুরু। শ্বশুর এবং শাশুড়ি আনন্দে আটখানা। অন্য সবকিছু গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা থাকলেও, সন্তানসম্ভাবনা একধরণের প্রোমোশন।

ভয়ানক পরিশীলিত এবং বাঙালি ভদ্রলোকের এপিটোম তার শ্বশুরমশাই হঠাৎ বসবার ঘরে সবার সামনে আবেগ থরথর কন্ঠে প্রায় আবৃত্তির ঢঙে বলে ফেললেন, প্রথমে সে তুমি ছিলে কন্যা। তারপর স্ত্রী হলে। এখন হবে মা। নারীত্বের সম্পূর্ণতাই তো মাতৃত্বে। তোমার পদোন্নতি হল। জীবনের সর্বোচ্চ ধাপে উঠে গেলে তুমি।

তার শাশুড়ি কেমন ভয়ানক গুরুত্ব দিতে শুরু করলেন তাঁকে। প্রায় যা পুলিশি খবরদারির মত দেখায়! 

একমাত্র আনন্দ জন্মেছিল তিনমাসের মাথায় প্রথম সোনোগ্রাফির দিনে, অপরিচিত এক নতুন ধুকপুকুনির শব্দ ডাক্তার যখন শোনালেন, আর সোনোগ্রাফির স্ক্রিন তার দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বললেন কী ভীষণ দৌড়চ্ছে আপনার বাচ্চা জলের ভেতর। মাছের মত ঘাই মারছিল একটি ছায়া। সেই ছায়াকেই ভালবাসল সে। মুখহীন এক শিশু। 

সন্তানটির আসার আগে, সকলের ফুর্তি আর পুলক তাকে খুবই বিচলিত করলেও, সে মেনে নিল মাসে একবার করে ডাক্তার দেখিয়ে আসা। 

তারপর, মেনে নিল সবার তার ওপরে নানা খবরদারি। এটা করবে না ওটা ধরবে না। এভাবে শোবে না, ওখানে বসবে না। কিচ্ছু বাইরের খাবে না। 

ফুচকা চুরমুর চিকেন রোল আদি দীর্ঘ কয়েক মাসের জন্য বন্ধ হল।

তারপর সেই মহা মুহূর্ত। সে ঢুকে গেল ভীত চকিত এক স্ফীতোদর শরীর নিয়ে, নার্সিং হোমের গর্তে। সেই রাতেই তার যৌনকেশ ব্লেড দিয়ে শেভ করতে করতে বয়স্কা নার্স বললেন অমোঘ বাণীঃ মেয়েদের এই এক জ্বালা। যতই পড়ো আর যতই বড় চাকরি কর, এর থেকে নিস্তার নেই। 

সাতদিনের নার্সিং হোম বসবাসে সে দেখে শুনে বুঝে ফেলল সন্তানজন্ম নিয়ে আয়াদের উল্লাস, নতুন শাড়ি পাওয়ার আশ্বাস। চোখে মুখে অশ্লীল ভঙ্গি করে কত না রসিকতা, সন্তানজন্মের গূঢ় তত্ত্ব নিয়ে। দাদার এবার একতলায় ঢোকা বন্ধ, দোতলায় নতুন ভাড়াটে এসেছে। হি হি।

স্বামী তো অদ্ভুত আচরণ করছে, সে দেখল।  অপারেশনের দিন দেখতে এল,  তারপর কেমন বিচ্ছিন্ন হয়ে, অন্যমনস্ক হয়ে, কেমন যেন উদাসীন, বাড়ি চলে গেল, একটু মিষ্টি কথাও না বলে। গলা আটকে এল কান্নায়, মেয়েটির। বাচ্চাটা আমাদের দুজনের তো। তাহলে কেন আমাকেই শুধু থাকতে হবে ঠান্ডা সাদা এই নার্সিং হোমটায়। আর তুমি ভিতু আত্মীয়ের মত, অসুস্থা গিন্নিকে দেখে কাষ্ঠ হাসি হেসে চলে যাবে, তারপর পরদিন বলবে, সারা সন্ধে ছেলে বন্ধুরা তোমাকে ঘিরে রেখেছিল মালের আড্ডায়, কেননা, বাচ্চা হলেই গিন্নির প্রেম চলে যাবে, সব অ্যাটেনশন কেন্দ্রীভূত হবে বাচ্চার দিকে, তাই একলা হয়ে যাবে স্বামী, এই ভয়ে সে পারছিল না একা একা সন্ধেটা কাটাতে।

অপারেশনের দিনের সেই ধক করে নাকে আসা ক্লোরোফর্মের গন্ধ আর তার আগের মুহূর্ত অব্দি ডাক্তারদের হাসাহাসি, অ্যানেস্থেটিস্টের নানা টুকরো কথা, এ বাবা, পেশেন্ট অ্যাতো ফ্যাকাশে কেন, ব্লাড কাউন্ট দেখি তো!  আর গোটা ব্যাপারটার প্রবল শীত-করা প্রাইভেসিহীন নিশ্ছিদ্র নৈর্ব্যক্তিক একটা পরিবেশে দম আটকে এসেছিল তার। উলঙ্গ সে এক বিটকেল পিঠখোলা হাস্পাতাল সবুজ মোটা কাপড়ের জামার তলায়। এই বোধ এসেছিল। তলপেট উন্মুক্ত করে তাকে কেটেকুটে বাচ্চাকে বার করবে পুরুষ ডাক্তার, অন্তত আজকের জন্য স্বামীর চেয়ে সে বেশি প্রিভিলেজড, ভাবতে গিয়ে অসংখ্য গোল গোল জোরালো আলোর বৃত্ত দেখতে দেখতে সে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল।

জ্ঞান ফিরেছিল চাপ চাপ অনির্দেশ্য ব্যথায়। অবশ হয়ে আছে সারাটা তলপেট অঞ্চল। কিছু জানে না। অথচ প্রচন্ড ব্যথা। চোখ খুলতে একটা ন্যাকড়ার পুটলি এনে তাকে দেখানো হয়েছিল। এই তো বাচ্চা, ছেলে হয়েছে, ছেলে। 

বর এসে হাত ধরেছিল বিবর্ণ মুখে। 

আবার কেবিনে ঢুকে ঘুম, ঘুম, ওষুধের ভেতর।

পরদিন থেকে ক্ষতচিহ্ন, ব্লিডিং, শিশুকে দুধ খাওয়ানোর নতুনত্ব, নার্সের বকুনি, আয়ার ধমক।

সবকিছুর মধ্যে ছোট একটা নতুন মাংসদলার ধুকপুক, ভয় আর আনন্দের জোট বাঁধা অদ্ভুত এক ফিলিং।

এই ডেটাবেসের প্রান্তে ছিল আবার বাড়ি ফিরে আসা। বালতি বা কোণ ভারি জিনিশ না তুলতে পারা ইত্যাদি ইত্যাদি, প্রায় দু মাস। 

একটু ইনফেকশন, ব্লিডিং বন্ধ না হওয়ায় অনেকটা ওষুধ পালটানো, ভয় ডর। ক্যাথিটার লাগিয়ে রাখার পর যন্ত্রণা আর চুলকুনি তার যোনিদ্বারে। এই অস্বস্তিগুলি তো কিছুই নয়। তারপর যা আরম্ভ হল তা জীবনের নতুন দিক।

নার্সিং হোমেই শাশুড়ি গিয়ে নাতির মুখদর্শন করে, বউমাকে দেখে ফিকফিক করে হেসে বললেন, এবার দেখব কেমন অফিস গিয়ে ছটা সাড়ে ছটা অব্দি অফিস কর, চারটে বাজলেই বাড়ি ফিরে আসতে শুরু করবে ত! বাচ্চার টান, বাবা, হুঁ হুঁ!

কন্টিনুয়াস সারভেইলেন্সে বন্দিদশায় থাকা শুরু হল। শিশুটির জন্য আয়া আছে। তবু সে বই পড়ে শিখে নিয়ে তাকে স্নান করাতে চেষ্টা করত, জামা পরাত, হাগু পরিষ্কার করে দিত। হিসির কাঁথা পাল্টাত। কিন্তু যারা কিছুই করত না , সেই সব বাড়ির লোকেরা তার আশেপাশে ঘুরত। মা ছিল না বলে মায়ের বাড়িতে গিয়ে থাকা হয়নি তার। শ্বশুরবাড়ির লোকের পুলিসগিরি তার সহ্য হত না। সে যে বাচ্চা বিষয়ে কিছুই জানেনা, এটা নতুন মা-কে চোখে আঙুল দিয়ে বলার মধ্যে এক অদ্ভুত সুখ আছে সকলের, সে বুঝতে পারে। 

বাচ্চা কাঁদলে অভিযোগের আঙুল উঠত, কাঁদছে কেন? খাওয়াচ্ছ না ঠিক করে?

খাওয়াতে গেলে বলা হত, মাথাটার তলায় হাত দাও ঠিক করে। পশ্চার ঠিক হয়নি।

শুইয়ে রাখলে শাশুড়ি এসে নাতির মুখচন্দ্রমা নিরীক্ষণ করতে করতেই ইম্যাজিনারি পিঁপড়ে খুঁজে পেতেন, অথবা ঠিক করে কাঁথা দিয়ে ঢাকা হয়নি ওকে, বলে তাকে এক প্রস্থ জ্ঞান দিয়ে যেতেন।

শিশু ছ মাস  হতে হতে অলটারনেটিভ খাবার দেওয়া শুরু। সেই সময়ে বোতল ঠিক ঠাক পনেরো মিনিট ধরে  না ফোটানোর অপকারিতা আর বুকের দুধ অনেকক্ষণ ধরে খাওয়ানোর উপকারিতা নিয়ে লেকচার শোনানো হত তাকে। কে না এসে জ্ঞান দিয়ে যেত। কে না এসে বক্তব্য রাখত। যেখানে পৃথিবীতে যত মহিলা আছে যারা কখনো না কখনো বাচ্চা রেখেছে বা পেটে ধরেছে, তাদের বক্তব্য রাখার অধিকার জন্মে যায় কীভাবে যেন। আর নতুন মায়ের কাজ সবার কাছ থেকে তাদের নিজস্ব টিপস শুনে যাওয়া। জমা করা। ডেটাবেসে। শুধু শ্বশুর শাশুড়ি নয়, বাবা, কাকা, পিশি, পিশে, মাসি শাশুড়ি , কে নয় এই জ্ঞানদাতাদের দলে। এমনকি আয়া, বাড়ির ঘরমোছার লোক। এমনকি রাস্তার অপরিচিত মহিলা। ডাক্তারখানার হেল্পার। 

ঠিক করে ধরুন। ধরা ঠিক না আপনার। 

বাব্বা, ছেলেটাকে সামনে দিয়ে জামা পরিয়েছে দ্যাখো, হি হি , পেছনটা পুরো বেরিয়ে আছে...

কেন দাঁত উঠল না এখনো? আমার নাতনির তো ক—বে...

কেন শিশু কথা বলতে শিখল না আজো? আমার ছেলে তো কত আগে...

একবছর হয়ে গেছে বাচ্চাটার? এ মা, হাঁটতে পারে না? আমাদের টা তো এরই মধ্যে...

বাড়ির নানা পলিটিক্স তার এতদিনে গা সওয়া হয়ে গিয়েছে, বাচ্চার দৌলতে। 

তার নিজের বাড়ি ছিল না কোন, বাপের বাড়ির লোক মানে তার মামিমা কাকিমারা এসে মুখ দেখে গেল শিশুর, ব্যাস তাদের কর্তব্য শেষ। 

শ্বশুরবাড়ি তার সর্বেসর্বা হল। এর আগে, বিবাহের অব্যবহিত পরে, নিজে যখন তার বরের সঙ্গে দরজা বন্ধ করে থাকত, প্রাইভেসির দৌলতে, তখন মনে হত এঁরা যথেষ্টই লিবারাল এবং শিক্ষিত। কিন্তু সে ইতিপূর্বে যা যা দেখেনি, এখন শিশু সন্তানের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো নাটকের মত অভিনীত হতে শুরু করল।

তার জগত হয়ে গেল সচ্ছিদ্র, অন্যদের কথাবার্তা কাজ কর্ম এসে পৌঁছতে শুরু করল শিশুর হাত ধরে। 

তখনই শুরু তার সহস্র হাতের পাশাপাশি সহস্র কানের জন্মের। সে শুনতে পায়, পাশের ঘরে আলোচনা চলছে তার শিশুর বাড়বৃদ্ধি নিয়ে, এবং তার উপরে তার মায়ের ভূমিকা নিয়ে। 

সে দেখতে পায় , শিশুকে ঘিরেই বর্ণনা হয়, বিশেষত পুরুষ শিশু , প্রথম বংশরক্ষক। ছেলে কই, ছেলের মায়ের সঙ্গে বেরোচ্ছে। এরকম কথা শুনতে শুনতে সে স্তম্ভিত হয়ে টের পায়, তার নিজের একটি নাম ছিল , বেশ বড় নাম, বরবর্ণিনী রায় চট্টোপাধ্যায় গোছের ( চট্টোপাধ্যায়টি তার স্বামীর অবদান অবশ্যই) ... সেটি বেবাক বেমালুম হাপিশ হয়ে যাচ্ছে। ক্রমশ তার বিবরণ হয়ে যাচ্ছে “ছেলের মা” বা ‘পুটুশের মা’ বা ‘বিংগোর মা’।

আদি অকৃত্রিম সামাজিক প্রক্রিয়ায় কাজের লোকেদের জগতে যেভাবে পুঁটির মা বা ক্ষেন্তির মা জন্ম নেয় সেভাবেই হচ্ছে। বাড়িতে আসা লোক বলছে, বাড়ির কাজের লোক বলছে, এমনকি তার বাড়ির লোক, মানে শ্বশুর শাশুড়িও বলছেন, এমনকি তার বর ও বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার সময় বলছে!

ইতিমধ্যে সে তার নিজের চাকরির জন্য বদলি হল অন্য প্রদেশে, ছোট এক শহরে। নিজের ব্যক্তিজীবনে সে একজন সরকারি চাকুরে। উইথ অল ইন্ডিয়া ট্রান্সফার লায়াবিলিটি । কথাটা লোকেরা ধীরে ধীরে হৃদয়ংগম করতে পারছে এখন, বিয়ের পর পর জোর গলায় ত আর বলা যায় না, কালই আমি দিল্লি বম্বে পোস্টিং নেব! সে সত্যের অভিঘাত ওদের সহ্য হত না বলেই বলা যায়না। কিন্তু স্লো লি ওদের মাথায় ঢুকল সেটাও। তখন প্রতিভাত হল, ম্যাটারটি বৌমার ইচ্ছাধীন, সে চাইলেই কেঁদে ককিয়ে তার হেডকোয়ার্টারস কে বলে বদলি ঠেকাতে পারে। কিন্তু করছেনা, তার মানে, “আমাদের সঙ্গে থাকতে চাইছে না”।

অ্যাজ ইফ তার ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন দাম দিত তার হেডুরা। উলটে তারা ওকে পাঁচ বছর কলকাতায় থাকার পর বাইরে ঠেলবেই, এটা নিশ্চিত। তবে সেটা হলেই সে এ যাত্রা  এই কনটিনুয়াস সার্ভেলেন্স থেকে বেঁচে যাবে, এটা ভাবতেই নিজেকে বেশ অসভ্য আর সস্তা লাগছিল তার। মীন লাগছিল। মীনগণ হীন হয়ে রহে সরোবরে টাইপের। 

তখনই কানে আসে বরের এক পিশি আর তার শাশুড়ির কথোপকথন :

শোন বৌদি, বৌমার তো বদলির চাকরি, তা সে যেখানে খুশি যায় যাক। বাচ্চাটাকে কিন্তু তুমি ছেড়ো না। বৌ ত পরের ঘরের মেয়ে, ছেলেটা তো তোমাদের। যাকে বলে বংশের বাতি। ওকে এখানেই কোন ইশকুলে ভর্তি করে রেখে যেতে বল। আমাদের ছেলে আমরা ছাড়ব কেন? মা যাক না গিয়ে যেখানে প্রাণ চায়?

আসলে সন্তান একটি প্রপার্টি। যেরকম স্ত্রী ও একটা প্রপার্টি, তবে কিনা আজকালকার দিন, দু পাত ইংরিজি পড়ে চাকরি করে সব বউগুলো নিজেদের ভেবে ফেলেছে মহা মাতব্বর, সে আর কী করা যাবে। 

সন্তানটি তো বাবার পদবি ধারণ করে, মায়ের নয়! কাজেই তার ওপর একটা দখল থাকেই শ্বশুরবাড়ির।

এ ছাড়াও কথা আছে। বউ যেখানে যাবে, সেখানে বাচ্চাকে দেখবে কে? বউ তো সারাদিন অফিসে থাকবে। “আমাদের বাড়ির বাচ্চা”-র দেখভাল করবে মাইনে করা কাজের লোক? তা তো হতে পারে না। এমনিই তো চাকরি করা বৌয়ের হাতের অবহেলা আর উদাসীনতায় ছেলেটা রোগা হয়ে গেল। 

সুতরাং সে যখন বদলি হয়ে ভুবনেশ্বর গেল, তার ছেলের দেখভাল করার কথা তুলে শাশুড়ি এবং শ্বশুর অলটারনেটিভলি যেতে লাগলেন সেখানে। একেবারে থাকতে লাগলেন। নজরবন্দী দশা ঘুচল না। ছেলেও বড়লোকের অওলাতের মত আহ্লাদে, আতুপুতু হল। একেবারেই সে যেভাবে তাকে মানুষ করবে ভেবেছিল সেভাবে “নিজের কাজ নিজে কর “ টাইপ সেলফ রিলায়েন্ট করে মানুষ করা গেল না।

ছেলে ক্রিকেট খেলতে শিখল, ছবি আঁকতে শিখল কিন্তু গান গাইতে শিখল না। তাকে নানারকম খেলনা কিনে দেবে ভেবেও দেখল, পুরুষোচিত র‍্যাট ট্যাট ট্যাট বন্দুক আর আর্মির ছাপ ছোপ মারা হেলিকপ্টার দেওয়া হচ্ছে তাকে, উপহারে। দেখল, বাড়ির কোন জিনিশ ভাঙ্গলে চুরলে তাকে বাহবা দিয়ে বলা হচ্ছে, মারো, মারো, তোমারই তো সব। এগুলো কিন্তু সব তোমার , বাবু, এই ফ্রিজ, এই টিভি। গেলে তোমার যাবে। 

তাকে শেখান হচ্ছে অধিকার, আবার সেই প্রপার্টি রিলেশন্স। 

শ্বশুর শাশুড়িরা একজন গিয়ে তিন চারমাস গিয়ে থেকে আসতেন, তারপর যেতেন অন্যজন। বিষয়টাকে বাধা দিতে সে চায়না, হাজার হোক তাঁদের নিজেদের সংসার ফেলে রেখে তো তাঁরাও অনেকটা আত্মত্যাগ করছেন, তার পেটে থেকে পড়া সন্তানকে দেখার জন্যই। তা ছাড়া শুষ্ক, দায়সারা আয়া বা বাচ্চাধরার লোকের তুলনায়, একজন দাদু বা ঠাম্মার সঙ্গ পাওয়া , এটাও ত কত না জরুরি শিশুর জীবনে, সেটা তো সে স্বীকারই করে। তার নিজের মা-ও তো নেই। 

মধ্যে মধ্যে তার বর আসত ছুটিতে। সে কটা দিন হীরকদ্যুতিময় ব দ্বীপের মত হাসি খেলা গানে কাটত, তারপর আবার  ডার্ক এজ। সে কটা দিন ঠারে ঠোরে বয়স্কদের দাপট ও “আত্মত্যাগের মহিমা”র গল্প শুনতে হত। তাঁরা উঠতে বসতে  শহর হিসেবে কলকাতার তুলনায় ভুবনেশ্বরের নিকৃষ্টতা জাহির করতেন, কেননা শহরটাকে বৌমার পোস্টিং এর ফলে ‘নিতে হচ্ছে’। বেড়াতে এলে অন্যরকম হত। 

ততদিনে শিশু থপ থপ করে হাঁটছে, চলছে, ছড়া বলছে, ভাত খেতে খেতে কার্টুন নেটওয়ার্ক দেখছে, ঠাকুমার সঙ্গেই ছড়ার বই বা ছবির বই শেষ করছে আর দাদু থাকাকালীন বাংলা অক্ষর পরিচয়ও হচ্ছে তার... খবরের কাগজ দেখে দেখে। 

আসলের থেকে সুদ মিষ্টি, একথাও ওঁরা বলে থাকেন, অন্তত শ্বশুরমশাই। শাশুড়ি সদাই পাঁচের মত মুখ করে থাকেন, কারণ একটি আদিবাসী রমণীকে সে তার ভুবনেশ্বর হাউজহোল্ডের রান্নার দায়িত্বে রেখেছিল, আর সে কিছুই রাঁধতে পারেনা শাশুড়ির মনমত। সে এক শ্বাসরোধী পরিস্থিতি। রান্নার লোক আর শাশুড়ি সারাদিন ঝগড়া করে মুখ ভার করে বসে থাকত, আর তাকে সন্ধ্যাবেলা এসে সেই ঝগড়া মেটাতে হত, অথবা আসামাত্র আদিবাসী মেয়েটি এসে ফিরিস্তি দিতে থাকত, বাড়িতে কী কী নেই। 

বাজারে যাওয়া বা কাউকে বাজারে পাঠানোর দায়িত্বটা ছিল তার, কারণ, ওই যে, আগেই বলা হয়েছে, ভুবনেশ্বরে আসার জন্য দায়ীটা কে, শুনি?

রোজ, রোজ সেই আলু নেহি হ্যায়, মুড়ি নেহি হ্যায়, দুধ খতম হো গিয়া হ্যায় শুনতে শুনতে বাড়ি ফিরেই সে আবার বাজারে যেত। ইতিমিধ্যে তার বাড়িতে বাচ্চার মা-র ভূমিকায় একটা ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। কারণ ইতিহাস বইয়ের পাতায় মুহুর্মূহু লিখিত হয়েই চলেছে, যে সে একজন নন রেসিডেন্ট মা। সে বাচ্চাকে খাওয়ায় না ঘুম পাড়ায় না, হাগায় না ছোঁচায় না।

এক শীতের রাত্তিরে, ছেলেকে ছুঁচিয়ে দিতে বাথরুম যায় সে, পটিতে বসা ছেলের সঙ্গে ছড়া বলতে বলতে তাকে মহৎ কর্ম করতে সাহায্য করে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে ,  সে, ওভারহিয়ার করে ( হিন্দি বা বাংলা সিনেমায় যা সচরাচর ঘটে থাকে , এবং নায়িকাদের এই ওভারহিয়ারের ফলে অনেক কাপ ডিশ সরবতের গেলাস ভেঙে থাকে), তার শাশুড়ি ছুটে গিয়ে কাজের মহিলাকে জিগ্যেস করছেন, ভাবী কোথায় রে? বাচ্চাকে বাথরুম থেকে পরিষ্কার করে নিয়ে গেছে?

হাঁ। 

কী দিয়ে পরিষ্কার করল? ঠান্ডা জল দিয়ে? 

(বাচ্চার হাগানো ছোঁচানোর জন্য গরম জল রাখা থাকত গিজারে, এবং একটি বালতিতে)

নেহি, গরম পানি সে। 

তুই নিজে দেখেছিস, গরম জল দিয়েই করেছে তো?

 

এগুলো কোন বিচ্ছিন্ন কথোপকথন না, এগুলো সন্তান জন্মানোর পরবর্তী তার গোটা জীবনের এক একটি স্নিক পিক মাত্র। আসলে কনটিনুয়াস সারভেইলেন্স ব্যাপারটির সঙ্গে যারা পরিচিত না তারা এর মর্ম বুঝবেন না। 

ব্যাপারটি হল, এটা একটা ডিকটমির জগত। হয় তুমি ভাল মা নয় তুমি ভাল চাকুরে। এখনো প্রাক্তন নামে ছবি হয় বাংলায়। যাতে ভাল বউ বনাম ভাল চাকুরে নিয়ে আলোচনা চলে। সেই একই ডিকটমিবশে, ভাল মা হতে হলে ভাল চাকুরে হওয়া যাবে না। আর একটা ওভার হিয়ার অথবা, থালা গেলাস ফেলে দেওয়ার মত শুনতে পাওয়া ডায়ালগ তার শাশুড়ির, বউ যদি কেরাণি হত তাহলেই ভাল হত , অফিসার হয়েই হয়েছে মুশকিল, একটা দিনও সাড়ে ছটা সাড়ে সাতটার আগে ফিরতে পারে না। 

সে যেহেতু অফিসার, এবং অফিসে দরকার হলে শনিবার যেতে হয়, দরকারে অদরকারে দিল্লি ছুটতে হয়, ট্যুরে যেতে হয়,  দু বছরের বাচ্চাকে রেখে চার মাসের জন্য আমেরিকায় একটা অফিশিয়াল ট্রেনিং এও গেছে সে ( সত্যি কী করে পারে এরা, অ্যাঁ!!! এত কেরিয়ারিস্ট! ) ... সে তো খারাপ মা হবেই। তাকে হতেই হবে এমন মা যে বাচ্চাকে খাওয়াতে পারে না, যে বাচ্চাকে ঠান্ডা জলে ছোঁচায়, ছেঁড়া জামা পরায়, একটাও কাজ পরিষ্কার করে করতে পারেনা। স্নানের টাবে বাচ্চা ফেলে চলে যায়, বাচ্চা ডুবে মরে যায়, এমন সব ভয়ঙ্কর হরার স্টোরি তো আছেই পৃথিবীতে... তাদের ডোমেনে এখন ওরকম সব গল্পরা ঘোরাঘুরি করে রাতবিরেতের রক্ত পিশাচের মত।

সেই শুধু বুঝতে পারে না, বাচ্চার কোন ক্ষতি হচ্ছে, সে তো বেশ ছড়া বলছে, খেলছে  , বেড়ে টেড়ে উঠছে... কিন্তু শ্বশুর শাশুড়ি তো হাহুতাশ করেই চলছেন ভেতরে ভেতরে, যে বাচ্চাটা ঠিকঠাক মানুষ হল না। মাকে পেলনা। 

এতটাই এসব করছেন যে ছেলে যখন ষোল বছরের, সে একদিন সত্যজিত রায়ের মহানগর দেখে চমকে উঠবে, ওই সিনটায়, যেখানে  মা চাকরি করতে যাচ্ছে , বাচ্চার জ্বরের দিনেও। মাধবী ফিরে এসে দেখছে সারাবাড়ি থমথমে, আর  বাচ্চা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে, আর অনুতপ্ত মাধবীকে তার শাশুড়ি বলছে, ছেলে তো সারাদিন বলে গেল,   মা খারাপ, মা পাজি, মা খালি অফিসে যায়। প্রত্যুত্তরে মাধবী ছেলের হাতে গুঁজে দিচ্ছে উপহার, যা আসলে, মেনস্ট্রিমের মতে, চাকুরে মায়ের দেওয়া ঘুষ। নিজের না-থাকার বিকল্পে দেওয়া পারিতোষিক। 

তার ছেলে , এখন বড়, তার চোখ দপ করে জ্বলে উঠল ছবির ওই অংশটা দেখে, মায়ের দিকে তাকাল এমন চোখে, যে মা বুঝল, ওই ডায়ালগটা কত্তো চেনা চেনা লেগেছে তার। মা ছেলে দুজনেই তারপর হো হো করে হেসে ফেলল। 

ইন্দ্রা নুয়ি নাকি রাত্তির অব্দি অফিস করে দেরিতে একবার বাড়ি ফিরে দেখেছিল বাড়িতে দুধ নেই, তার নিজের মা বলেছিল, বাড়িতে দুধ নেই, আনতে হবে। ইন্দ্রা বলেছিল আমার বর ত অনেক আগেই এসে গেছে মা, ওকে কেন বলনি? মা বলেছিল বেচারি খেটেখুটে এসেছে, ক্লান্ত। 

মেয়েদের চাকরি করা মানে খেটেখুটে ক্লান্ত হয়ে এসেও তোমাকে চূড়ান্ত পারফর্মেন্স –এ বাজার হাট সব করে দেখাতে হবে, তুমি দুধ ময়দা চাল ডাল সবকিছুর কেমন খেয়াল রেখেছ। আর এসব অবলীলাক্রমে করার পরও, আসল হল একটা অপরাধী অপরাধী মুখ করে থাকা। একটা শহিদ শহিদ স্টাইল করে থাকা।  যদি তোমার মুখে এতটুকুও অপরাধবোধ না ফোটে ( যেমন আমাদের গল্পের এই সে-র মুখে কোনদিনই ফুটত না) তাহলে ধরে নেওয়া হবে তুমি খারাপ গৃহিণী ও খারাপ মা। 

 

ছেলে বড় হতে থাকে এরপর। পর পর যা যা মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবারে ঘটার সবই ঘটতে থাকে , যথা এরপর স্কুলিং নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হল। তালিকা তৈরি হল। লাইন লাগানোর জন্য অনুপ্রাণিত হল স্বামীটি।

স্কুলে যেতে গিয়ে শিশু কাঁদল না। সেটাও বিস্ময়ের। কেন কাঁদল না? শিশু স্কুলে কিছু শিখছিল কিনা, তা নিয়েও সংশয় ছিল। প্রশ্ন ধরা হত ওকে, বাইসাইকেলে কটা আই বলতো? গাজর দেখিয়ে জেঠিমা জিগ্যেস করত, এটা কি কালার শিশু? রেড বলেছিল বলে আ আ ছি ছি শুরু হল, সেকি,  ওকে অরেঞ্জ কালারটা চেনাও নি?

সবকিছুর শেষেও, ভাল মা হয়ে উঠতে পারল কি, সে? খুব সন্দেহ আছে তাতে। 

শিশুর ক্লাস টু। একদিন অফিস থেকে ফিরে এসে সে দেখল শাশুড়ির মুখ হাঁড়ি। শিশুর ক্লাস টিচার ওর খাতায় লাল কালি দিয়ে লিখে দিয়েছেন, হোম ওয়ার্ক নট ডান। 

শাশুড়ি ঝাঁঝিয়ে উঠে সেকে জবাবদিহি চাইলেনঃ  হোমওয়ার্কটা  করল কিনা এটাও দেখতে পারো না?

ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ, মিশেল ফুকো নাকি লিখেছিল। একজন মা শুধু বায়োলজিকালি মা হয়ে ওঠেনা। পেট থেকে পড়লেই বাচ্চা পয়দা করা যায়না। মা হওয়া শিখে উঠতে হয়। কঠোর তপস্যা চাই। 

আজকের দিনের মায়েদের কত না চাপ। তাকে সর্বংসহা ও সর্বকর্মা হতে হবে। কে যেন গোটা একটা বইই লিখে দিয়েছে, আমার মা সব জানে। তাই তাকে সেই বইটা কিনে পড়ে ফেলতে হবে ও শিশুর সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

টিভির বিজ্ঞাপনে যেরকম দেখায়, মা কখনো বকবে না অধৈর্য হবে না বিরক্ত হবে না। নিজের সুখের কথা ভাববে না। সারাদিন ছেলের মুখে জলের গেলাস খাবারের থালা এবং কুলকুচি হয়ে গেলে গামছা তুলে দেবে। জামা বার করে রাখবে, পরিয়ে দেবে। জুতো পরিয়ে দেবে। স্কুলে র থেকে এলে গ্লুকন ডি গুলে দেবে। পরীক্ষায় ভাল করলে কিটক্যাট কিনে দেবে। 

মা কখনো নিজের কাজ করবে না, বাড়িতে যতক্ষণ থাকবে ছেলের সঙ্গে খেলবে কথা বলবে, ছেলের পড়া দেখবে। অফিসে গেলে তো আরো বেশি অপরাধী হয়ে মাকে ফিরে আসতে হবে, আরো দ্বিগুণ উৎসাহে ছেলের সেবাযত্ন করতে হবে, সে সময়টা সে ছিল না সেই সময়টার অভাব পুষিয়ে দিতে হবে। 

মাতৃত্ব কত আনকন্ডিশনাল তা নিয়ে অনেক ভাল ভাল কথা পড়া যাবে, বলা হবে অনেক সুন্দর কবিতা গান আর বাণী, মা হল সবার ওপরে।

এইভাবে , কন্ডিশনড হতে হতে, সে দেখেছে, সে এক রোবট মা এখন।

সারাদিন অফিস করে বাড়িতে ঢুকেই চুড়িদার কামিজের ওপর থেকে চুন্নিটা নামিয়ে রেখে সে রান্নাঘরে ঢুকে  ছেলের দাবি অনুসারে কোনদিন চাউমিন কোণদিন পাস্তা কোনদিন ভাত নেড়ে বিরিয়ানি করে দেবে। অনায়াসে তারপর  ছেলের হোমওয়ারক দেখবে, অনায়াসে তার প্রয়োজন হলে বেরিয়ে কিনে এনে দেবে সেলোফেন পেপার অথবা ফেভিকল, কলম পেন্সিল বা রুলটানা খাতা। যখন যেটা দরকার।

রাত এগারোটায় ঘুমে ঢুলে পড়তে পড়তেও, ছেলের দাঁত মাজা জামা পালটানো সুপারভাইজ করবে, বিছানা পাতবে। 

স্বামী করে না এসব? না তা নয়। স্বামী অনেক কিছুই করেছে, করে হালকা করেছে গুরুভার সন্তানপালনের দায়। সে জুতো পরিয়ে দিয়ে চুল আঁচড়ে দিয়ে শার্ট পরিয়ে দিয়ে নিয়ে গেছে শিশুকে টিউশনে। কিন্তু জুতোটা কিনে এনেছে মা, চিরুনি হারিয়ে গেলে কথা শুনতে হয়েছে মাকে, শার্টের বোতাম না থাকলে মার সামনে ছুঁড়ে ফেলে বলা হয়েছে, দেখে রাখতে পারো না, আদ্ধেক শার্টের বোতাম নেই?

আসলে, একটাই তফাত থেকেছে। স্বামী যা যা করেছে, সেগুলো স্বামী স্বেচ্ছায় করেছে। ওর করার কথা ছিল না বাধ্যতা ছিল না তাও করেছে। 

 বাই ডিফল্ট ওগুলো সব মায়ের করার কথা ছিল। স্বামী করে, তাকে ধন্য করেছে, হেল্প করেছে। স্বামীর কাজ করাটা স্বামীর ক্রেডিট। আর স্ত্রীর না করাটা, স্ত্রীর গাফিলতি। ত্রুটি। তাকে চিরজীবন অপরাধী হয়ে থাকতে হয় এই তথ্যের জন্য, যে, সে যখন অফিসে থাকত তখন তার সন্তানকে শাশুড়ি দেখত, আয়া দেখত, অনেক সময় আগে ফিরে এসে স্বামীও দেখত। 

অন্যেরা যে যা অবদান রেখেছে শিশুর জীবনে, কোনটাই বাই ডিফল্ট ছিল না। সেগুলো অবদান ছিল। আর সে যা করেছে? একজন মায়ের তো তা করারই কথা। সেজন্যে আলাদা করে কোন থ্যাঙ্কস প্রাপ্য আছে নাকি আবার? ওটাকে কোন কাজ বলতেই নারাজ তো, সমাজ। ওগুলো তো তার কর্তব্য। 

পেট থেকে পড়েছে কার, বাচ্চাটা, শুনি? 

করবে না মানে?

শিশু একদিন বড় হয়ে যাবে, শিগগিরি একদিন সে নিজের জীবন খুঁজে নেবে। তারপর অচিরেই নিজের জীবন সঙ্গিনীও। 

তখন , সেই জীবন সঙ্গিনীও , সে কি চাইবে, করুক সব কাজ বাই ডিফল্ট? 

 

এরপর বিদ্বজ্জনরা প্রশ্ন তুলবেন, আমাদের গল্পের মেয়েটি এত ন্যাকা কেন? তার এত এত অসুবিধের কথা সে এতদিন মুখ ফুটে বলেনি কেন? সে কেন শ্বশুরবাড়ির সংস্রব ত্যাগ করেনি। ভুবনেশ্বর থেকে টিকিট কেটে শ্বশুর শাশুড়িকে পত্রপাঠ বিদেয় করে দেয়নি এবং পরবর্তী জীবনে কেবলমাত্র আয়া বা কাজের লোকের হাতেই ছেলেকে মানুষ করেনি?

সে কেন নিজের এই বিশ্রি অসম সম্পর্কটা ভেঙে ফেলেনি? 

সে যেহেতু বিবাহিত জীবনে আছে, প্রশ্ন উঠবে,  সে কেন আপোশ করেছে এত ? সে তো চাকরি করত, ইন ফ্যাক্ট নিজের বরের চেয়ে বেশি মাইনের চাকরিও ( যেটা নাকি আবার খুলে দেবে আরো এক বিশাল আলোচনার দরজা, এ নিয়ে বেশি মুখ না খোলাই ভাল)... তাহলে সে ছেড়ে চলে যায়নি কেন?

এত প্রেম, বাব্বা! বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। নিশ্চই অন্য ধান্ধা ছিল , অন্য কোন হিসাব কিতাব, অন্য কোন হিডেন অ্যাজেন্ডা!

হ্যাঁ তার বরও তো বলেছে তাকে, আসলে তুমি অপরচুনিস্ট একটা, মারাত্মক চালু মাল, ম্যানেজ মাস্টার। নিজের ছেলেকে আমার বাবা মাকে দিয়ে বড় করিয়ে নিলে কনভিনিয়েন্টলি, পয়সা দিলেও এরকম আয়া তো পেতে না, এত নির্ভরশীল, শুভাকাঙ্ক্ষী। এখন তো লিখবেই, আমার বাবা মা কত খারাপ।  তোমার হাতে কলম আছে তো!

সে আসলে অপরচুনিস্ট। সে চায়নি তার নিজের এই সব টুকরো টাকরা অপমান  (যা সে বিশ্বাস করে এই সমাজ পরিবর্তন না হলে কোনদিন পরিবর্তিত হবে না এবং এই সমাজে থাকা অধিকাংশ মেয়েকে এসবের মধ্যে দিয়েই যেতে হয় ) গায়ে মাখতে। তবুও ডেটাবেস হিসেবে এগুলো তার মাথার মধ্যে রেজিস্টারড হয়েছে, থেকে গেছে, সে ভুলতে পারেনি, বা ৯০ শতাংশ ভুলে গেলেও ১০ শতাংশই তার মনে “থেকে গেছে”। 

সে আসলে অপরচুনিস্ট, সে চেয়েছে তার ছেলে মানুষ হোক একটা আপাত স্বাভাবিক পরিসরে, পরিবারে, দাদু ঠাকুমার সঙ্গে। 

তার মা ছিল না, বাবা অন্য বিয়ে করেছিল,  প্রথম জীবনে ঠাকুমার আদরে আর পরে ঠাকুমা মারা গেলে, কাকিমাদের হাত তোলা ও লাথি ঝ্যাঁটা খেয়ে সে নিজে মানুষ হয়েছিল। হয়ত সেজন্যেই, ব্রোকেন ফ্যামিলিতে বড় হওয়ার চাপ সে তার সন্তানকে দিতে চায়নি। সে জানে একা থাকার মহিমা, সে জানে কষ্ট কাকে বলে, সে জানে নিজের চাকরি তার নিজের অর্জন, মামা কাকাদের গালে পিঠে হাত বুলিয়ে দেওয়া পুরস্কার নয়, তাই নিজের চাকরি নিয়ে সে অন্যদের কাছে ফাটাতে চায়নি, ফুটানি মারতে চায়নি। নিজের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সযত্নে আলাদাও রেখেছে আবার স্বামীর থেকে। 

এগুলো তার আপোশ বইকি। যারা নিজেদের র‍্যাডিকাল বলে তাদের জীবনের যে প্রতিমুহূর্তে পেরেক ফোটা চাপ, সমাজ যা প্রতিনিয়ত দিতে থাকে, তার থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে সে চেয়েছে কারণ তার শৈশব আদৌ খুব একটা সুন্দর ছিল না। অন্তত যৌবন সুন্দর হোক সে চেয়েছিল। 

আর এই আপোশের ফলে সে পেয়েওছে অনেকটা। সে পেয়েছে মন দিয়ে চাকরি করা এবং নিজের লেখালেখি করার পরিসর। আফটার অল সারাজীবন শুধু বিবিধ পুরুষের সঙ্গে এবং সেই পুরুষতন্ত্রের এজেন্ট নারী ( তার কাকিমারা, তার শাশুড়ি প্রমুখ) দের সঙ্গে লড়াই করে সময় নষ্ট না করে তাদের উপেক্ষা ও করুণা করতেই সে বেশি পছন্দ করেছে। 

এই আপোশের পথ অনেকের নয়। অনেকেই ঝগড়া করে, প্রতিবাদ করে, বেরিয়ে যায় সংসার থেকে। হয়ত সে পারেনি এসব। কিন্তু পারেনি বলেই তার এই এই শোনাগুলো, ডেটাবেসের এই এই চড় থাপ্পড়গুলো, মিথ্যে হয়ে যায়না। সে কিন্তু টাকা দিয়ে অনেক কিছু কিনতে পারে। কিন্তু বহুকিছু কিনতে পারাটাই তো তার সবচেয়ে বড় ডিসকোয়ালিফিকেশন, কারণ তার শাশুড়ি তো সারাজীবন চাকরি করেন নি, আর এখনো ছেলেরা না খেলে খেতে বসেন না। রাত বারোটা একটা বাজলেও তবু না। এই সব না খাওয়া আর জেগে থাকা দিয়ে তো তিনি মাতৃত্বের পরীক্ষায় বৌমার থেকে বেশি নম্বর পেয়েছেন বলেই জানেন। তাই তো তাঁর কনফিডেন্স এর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া যায়না। মহিলাকে করুণা করতেও তাই আজকাল তার করুণা হয়। 

 বুদ্ধিজীবী ও র‍্যাডিকালরা এখনো বলে সে নাকি থ্রি এস, মানে সসসস্বামী সসসন্তান সসসসসংসার নিয়ে দিব্যি আছে। 

চাকুরে মেয়েরা, অন্তত তার মহিলা কলিগেরা, অন্তত এটা বলে না, এটুকুই যা এক রিলিফ!

 




Avatar: রত্না রশীদ

Re: মায়ের কর্তব্য ভিন্ন কিছু নাই

চমৎকার।একেবারে মেয়েদের জীবন্ত ডায়েরি। হ্যাটস্ অফ।
Avatar: রত্না রশীদ

Re: মায়ের কর্তব্য ভিন্ন কিছু নাই

চমৎকার।একেবারে মেয়েদের জীবন্ত ডায়েরি। হ্যাটস্ অফ।
Avatar: R

Re: মায়ের কর্তব্য ভিন্ন কিছু নাই

অসাধারণ!! ভীষণ সত্যি!!
Avatar: S

Re: মায়ের কর্তব্য ভিন্ন কিছু নাই

হঠাত এই একই টপিকের উপরে অনেকগুলো টই একসাথে।
Avatar: S

Re: মায়ের কর্তব্য ভিন্ন কিছু নাই

তুল্লাম।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন