গুরুচণ্ডা৯র খবরাখবর নিয়মিত ই-মেলে চান? লগিন করুন গুগল অথবা ফেসবুক আইডি দিয়ে।

জাদুর নাম ডিমনেটাইজেশন -প্রথম পর্ব

শেখর মুখোপাধ্যায়

ছিল কালো, হয়ে গেল সাদা!

 

সাম্প্রতিক ডিমনেটাইজেশন বিষয়ে কিছু ভাবতে গেলে আগে দুটি মনুষ্যোচিত প্রবৃত্তি মনে রাখা জরুরি। এক, মানুষ স্বভাবত স্বার্থপর অর্থাৎ, নিজের স্বার্থসিদ্ধির বিষয়টি তার কাছে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। দুই, মানুষ স্বভাবত সৎ এবং নিয়মপরায়ণ অর্থাৎ, একজন ল-অ্যাবাইডিং সিটিজেন। জনাকয় ব্যতিক্রম মানুষের পূর্বোক্ত স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগুলিকেই প্রমাণ করে। প্রথম প্রবৃত্তিটির ব্যতিক্রম যাদের মধ্যে দেখা যায় তাঁদের আমরা মহাত্মা বলি। দ্বিতীয়টির ব্যতিক্রম যাদের মধ্যে দেখি তাদের আমরা দুরাত্মা মনে করি। দুরাত্মাদের অনাচার যত বাড়ে, মহাত্মাদের মাহাত্ম্য আমরা তত অনুভব করি। ভোগ তথা উৎপাদনের সীমিত উপাদানের পরিপ্রেক্ষিতে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার মধ্যে সেগুলি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা দারিদ্র্য ও বৈষম্য বাড়িয়ে তোলে যদি না সে-ক্ষেত্রে সচেতন এবং সদর্থক প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপ ঘটে। সমস্যা হয় সদর্থক ব্যঞ্জনাটিকে ঘিরে। কোনটা সদর্থক বলব আর কোনটাকে বলব না সে-বিষয়ে বিতর্কের শেষ নেই। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, ব্যবহারিক কয়েকটি ক্ষেত্রে সমষ্টির মোটামুটি নীতিগত মতৈক্য দেখা যায়। এই নীতিগুলির পক্ষে যাঁরা, তাঁদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সক্রিয় জনাকয় যাঁরা উপরন্তু নিজেদের জীবন ও জীবিকার তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেন সমষ্টির জীবন ও জীবিকাকে, তাঁদের আমরা বলি মহাত্মা। অন্যদিকে, যারা এই নীতিগুলি অমান্য করে বিভিন্ন সুযোগ যথা, আর্থিক সংগতি, আইনের ফাঁক, উপরমহলে পরিচিতি ইত্যাদি, ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি ঘটান যা প্রকারান্তরে সমষ্টির ক্ষতিসাধন করে, তাঁদের আমরা বলি দুরাত্মা। উদাহরণস্বরূপ, যিনি নিজের অর্জিত ধন অন্যের মধ্যে বিলিয়ে দেন তিনি পরিচিতি পেতে পারেন মহাত্মার। অন্যদিকে, যিনি অপরের ধন কৌশলে হাতিয়ে নেন তিনি পরিচিতি পেতে পারেন দুরাত্মার। সুতরাং, মানুষ সবার আগে কেবল মানুষ, তারপর কর্ম-পরিচিতিভেদে সে মহাত্মা বা দুরাত্মা। টাকাও তেমনি সবার আগে কেবল টাকা, বিনিময়ের স্বীকৃত মাধ্যম। মহাত্মা যেমন কখনও দুরাত্মা হয় না (হলে, তার মাহাত্ম্যের ইতিহাস বিনির্মিত হয়) এবং দুরাত্মা কখনও মহাত্মা হয় না (গল্পে ও বাস্তবে বাল্মীকির মতো জনাকয় বাদে), কালো টাকাও তেমনই কখনও সাদা হয় না। চাইলে, তাকে ধরা যায়। আর, না চাইলে, সে পাঁকাল মাছের মতো পাঁকে পাঁকে পালিয়ে বেড়ায়।

 

জনতার অগ্নিপরীক্ষা

 

যে সমাজে নৈতিক কাঠামোর সামান্যতমও অস্তিত্ব আছে, সেখানে সর্বসমক্ষে বুক বাজিয়ে চুরিবিদ্যাকে মহাবিদ্যা আখ্যা দিতে কেউ এগিয়ে আসবেন না। কর ফাঁকিও চুরি। নীতি ও আইন কোনওদিকেই এর সমর্থন নেই। করযোগ্য আয়ের উপরে কর না দিলে সেই আয় আয়কর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে হয়। জাতীয় আয়ের হিসাবে এই আয় অন্তর্ভুক্ত হতে পায় না। এই আয় কালো আয়। লক্ষণীয়, আয়টি কালো, তাই সেই আয়ের প্রতিভূ টাকাটিকেও আমরা কালো বলি। আসলে কালো আয়ের উৎস কারবারটি কালো। কালো বলতে আমরা এক্ষেত্রে বুঝি অনৈতিক। নীতির প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতির উচ্ছেদ মূলত শাসনতান্ত্রিক অর্থাৎ, প্রশাসনিক বিষয়। অনৈতিক কোনওকিছুর মোকাবিলা করতে হয় সরাসরি অর্থাৎ, অনৈতিক কারবার ও কারবারিকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হয়। দেশের মানুষ বোঝে কারা কালো কারবারি, অথচ প্রশাসন বুঝতে পারে না। দেশের মানুষ বুঝতে পারে কারা চিট ফান্ডের উপদেষ্টা, পৃষ্ঠপোষক, রক্ষাকর্তা তথা বখরাদার, অথচ, প্রশাসন বুঝতে পারে না। অর্থনীতি পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মানিটারি পলিসি অর্থাৎ আর্থিক-নীতি দেশের আর্থিক কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাত থেকে এই বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে তার ঘোড়া প্রশাসন দাবাতে পারে না। কোনও এক্তিয়ারই নেই। প্রশাসনের হাতে অজস্র অস্ত্রের পাশাপাশি অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে অস্ত্র আছে ফিসক্যাল অর্থাৎ বাজেটভিত্তিক নীতি যা সরকারের আয় ও ব্যয়ের ক্ষেত্রগত বৈভিন্ন্যকে স্বীকৃতি ও মান্যতা দেয়। লক্ষ্য স্থির করে টারগেট পপুলেশন বা টারগেট সেকটর চিহ্নিত করে, দারিদ্র্য দূরীকরণ থেকে কালো কারবার দমনের ক্ষেত্রে সাধারণ প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি এই নীতি বিশেষ কার্যকর হতে পারে। অন্যদিকে, আর্থিক নীতি মানুষ ও তার কারবারের বৈষম্য, বৈচিত্র্য ও চরিত্র চিনে কাজ করে না, কালো-সাদা নির্বিশেষে সবকিছুকেই আঘাত করে (যদিও, পরে আলোচ্য যে, সবসময় সমানভাবে নয়)। বিভিন্ন আর্থিক-নীতির মধ্যে ডিমনেটাইজেশন নীতিটি সর্বাপেক্ষা স্থূল। এই নীতি গ্রহণ করার অর্থ দেশের সমস্ত মানুষকেই কালোবাজারি ধরে নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি নাগরিককে সমান কষ্টের মধ্যে দিয়ে গিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে, সে কালোবাজারি নয়। সীতার অগ্নিপরীক্ষার মতো।

 

রাম-ফ্যাসিস্ট

 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্যাসিবাদী শাসকেরা ডিমনেটাইজেশন পলিসির যথেচ্ছ ব্যবহার করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও স্পেনে ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে যাওয়ায় সেখানে ডিমনেটাইজেশন আরও বহুকাল চলেছে। গত শতকের আশির দশকে মায়ানমারে মিলিটারি শাসকগোষ্ঠী ডিমনেটাইজেশন করেছে। ২০১০ সালে উত্তর কোরিয়া ডিমনেটাইজেশন প্রয়োগ করেছে। এর ফল ভাল কিছু হয়নি, বরং সেইসব দেশের অর্থনীতি আরও ভেঙে পড়েছে। এসব ইতিহাস ছেড়ে দিলেও যা থেকে যায় তা হল শাসকের দৃষ্টিভঙ্গি। ডিমনেটাইজেশন যে শাসক প্রয়োগ করে সে দেশের জনগণের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাশীল নয়, তাদের স্বাধীন চিন্তায় তার আস্থা নেই। সে মনে করে কলমের এক খোঁচায় সে সবার আর্থিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, জোর করে সবাইকে ডিজিট্যাল মানি ব্যবহার করিয়ে ফিনান্সিয়াল কর্পোরেটের তরফদারি করতে পারে। বর্তমান ডিমনেটাইজেশন উদ্যোগ প্রশ্নাতীতভাবে শাসকের তরফে ফ্যাসিবাদী আচরণ। কাগুজে টাকা লিগ্যাল টেন্ডার হিসাবে বিনিময়ের আর্থিক কর্তৃপক্ষ-স্বীকৃত মাধ্যম। প্রমিসরি নোট অর্থাৎ প্রতিশ্রুতিপত্র হিসাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের স্বাক্ষর সম্বলিত টাকা মানুষ বিশ্বাসভরে গ্রহণ করেন। ডিমনেটাইজেশনের ফলে দেশের আর্থিক ব্যবস্থার সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতিভঙ্গ হয় ও ফলত অর্থ ও আর্থিক কর্তৃপক্ষের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। ডিমনেটাইজেশন স্পষ্ট দেখায় যে, সরকার ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস তলানিতে এসে নেমেছে, এবং গায়ের জোরে শাসন করার প্রবণতা বেড়েছে। এতে শাসককে স্বেচ্ছাচারী ও একনায়কতন্ত্রে বিশ্বাসী দেখায় এবং শাসিতকে লাঞ্ছিত অপমানিত। বিগত ইউপিএ জমানার সঙ্গে এই এনডিএ জমানার বাজেটারি পলিসির কোনও প্রভেদ নেই। দুটিরই বাজেটারি নীতি নরমধাতের, আয়করের হারের ক্ষেত্রে যেমন, তেমনই সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে। উচ্চবিত্তকে এরা চটাবে না। নরমধাতের বাজেটারি নীতির সঙ্গে কড়াধাতের আর্থিক-নীতি শাসকের শ্রেণিচরিত্রের পাশাপাশি তার ফ্যাসিবাদী চরিত্রও ঘোষণা করে।  ফ্যাসিবাদী শাসকের এতে কিছু যায়-আসে না। গায়ের জোর অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় শাসনকাঠামো তার হাতে তো আছেই, উপরন্তু সে কৌশলে ব্যবহার করে নীতিকেন্দ্রিক কিছু অস্ত্র।

 

ওয়েলথ, অ্যাসেট, ইনকাম, মানি, এবং আই প্রমিস টু পে দ্য বেয়ারার অমুক সাম অফ রুপিজ

 

এই ডিমনেটাইজেশনের ঘোষিত লক্ষ্যটা কী? না, কালো ও জাল টাকা নির্মূল করা। ১৯৪৬ ও ১৯৭৮ সালেও টাকার ডিমনেটাইজেশন ঘটেছিল। তার ফলে কালো টাকা ও জাল টাকা নির্মূল হয়নি। বরং, সময়ের সঙ্গে বেড়েছে।  ন্যাশনাল ইনস্টিউট অফ পাবলিক ফিনান্স অ্যান্ড পলিসির হিসাবমতো, ১৯৭৫-৭৬ আর্থিক বর্ষে কালো টাকার পরিমাণ ছিল জাতীয় আয় (জিডিপি) এর ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ। ১৯৮০-৮১ তে তা বেড়ে হয় ১৮ থেকে ২১ শতাংশ।  বর্তমানে কালো টাকা জাতীয় আয়ের ২৩ থেকে ২৪ শতাংশ।  সুতরাং, তত্ত্বের পাশাপাশি সময়ের ধারায় বাস্তবেও এটা প্রমাণিত যে, ডিমনেটাইজেশন নীতি কালো ও জাল টাকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আদর্শ অস্ত্র নয়। তাত্ত্বিক দিকটা এবার একটু বিশদে দেখা যেতে পারে। আগেই বলেছি যে, কালো টাকা আসল অপরাধী নয়। আসল অপরাধী হল কালো কারবার। অনেকসময়ই ওয়েলথ, অ্যাসেট ও মানি, এমনকী আয়ও সমার্থক ব্যবহার হয়ে থাকে। অর্থনীতিতে এগুলির প্রভেদ গুরুত্বপূর্ণ। ওয়েলথ, অ্যাসেট ও মানি এই তিনটিই স্টক কনসেপ্ট অর্থাৎ, একটি সময়-বিন্দুতে এদের পরিমাপ করা দস্তুর। যেমন, ১লা জানুয়ারি ২০১৬ তে বা, ৩১শে ডিসেম্বর ২০১৬ তে এক ব্যক্তির বা একটি দেশের ওয়েলথ, অ্যাসেট ও মানির পরিমাণ কত তা নির্ণয় করা চলে। ব্যক্তির ক্ষেত্রে এতে বোঝায় যে, ওই ওয়েলথ, অ্যাসেট ও মানি ওই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে বিগত সময়ে ধারাবাহিক জমা ও খরচের ফলে। অন্যদিকে, আয় বা ইনকাম একটি ফ্লো কনসেপ্ট। তার পরিমাপ এক সময়-বিন্দু থেকে আর এক সময়-বিন্দু অবধি অর্থাৎ, একটি সময়-পরিধির মধ্যে নির্ণয় করা দস্তুর। যেমন, কেউ যদি বলেন, তাঁর আয় ডিসেম্বর মাসে ১০০০ টাকা তাহলে বুঝতে হবে ১লা ডিসেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর অবধি তিনি ওই আয় উপার্জন করেছেন। অনেকেই দৈনিক উপার্জন করেন। তেমন কেউ হয়তো বলবেন, আজ তাঁর আয় ১০০ টাকা। সেক্ষেত্রেও, ওই আয় উপার্জিত হয়েছে দিনের শুরু ও শেষ অবধি ওয়ার্কিং আওয়ার্সের মধ্যে। কেউই কখনও বলতে পারবেন না, এই মুহূর্তে আমার আয় অমুক। কারণ, উৎপাদনের উপাদান কাজে লাগানো ও উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে মোট আয়ের বন্টণ এক মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে না। এক মাছবিক্রেতা পাঁচশো টাকায় একটি মাছ বেচে বলতে পারেন, এই মুহূর্তে আমার আয় পাঁচশো টাকা। কিন্তু, সেটা ভুল হবে। কারণ, ওই মাছটি বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে তিনি সংগ্রহ করেছেন বাজারে এসে বসার আগে এবং তখন থেকেই আয়ের উদ্যোগ ও সম্ভাবনা শুরু হয়েছে। সেই প্রক্রিয়া অর্থাৎ উপার্জন সম্পন্ন হল মাছ বেচার শেষে। অথচ, ওয়েলথ অর্থে ওই মাছটি তাঁর ও দেশের সম্পদ হিসাবে প্রতি মুহূর্তেই বর্তমান ছিল, এমনকী যদি তা অবিক্রীত থাকত তবুও। কিন্তু, অবিক্রীত থাকলে পুকুর, নদী বা আড়তদারের কাছ থেকে বাজারে ক্রেতার হাতে মাছটি তুলে দেওয়ার মূল্য সংযোজনটি ঘটে উঠত না। এক কথায়, মাছবিক্রেতার আয় হত শূন্য। অবশ্য, সেদিন তিনি যদি ওই মাছটি খেয়ে ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করতেন তবে তা আবার তাঁর আয় হিসাবে গণ্য হত।

 

আলোচনায় মাত্রা ও জটিলতা আরও যুক্ত হয় ব্যষ্টি ও সমষ্টিগত দৃষ্টিভঙ্গির ফারাকে। দেশের যাবতীয় উৎপাদনের উপাদান এবং উৎপাদিত দ্রব্য ও সেবাসমূহ ওয়েলথ অর্থে দেশের সম্পদ। সরকারি মালিকানায় রক্ষিত সম্পদগুলি আলোচনার বাইরে রাখলে, ব্যক্তিগত মালিকানার অধিকারের সুবাদে বাকি সম্পদগুলির মালিক বিভিন্ন মানুষ হতে পারেন। যেমন, একজন মানুষ কয়েক বিঘা জমির মালিক হতে পারেন। ওই জমিটি যুগপৎ ওয়েলথ ও অ্যাসেট অর্থে তাঁর সম্পদ কারণ, তিনি জমিতে ফসলের চাষ করে উপার্জন করতে পারেন আবার প্রয়োজনে জমিটি এককালীন বেচেও দিতে পারেন। জমি বেচে দেওয়ার পর তিনি আর জমি নামক সম্পদের মালিক নন। যদিও সেই জমি তখনও দেশের সম্পদের অঙ্গ। অথচ, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সেই সম্পদ দেশ কিন্তু অন্য কাউকে, অন্য কোনও দেশকে বেচতে পারবে না। অর্থাৎ, দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ওই জমি অ্যাসেট নয়। জমির মালিক জমিটি বেচে থাকতে পারেন পুরনো কোনও ধার শোধের উদ্দেশ্যে তাঁর পাওনাদারকে। সেক্ষেত্রে, তিনি নতুন কোনও অ্যাসেটের মালিক হলেন না। ওয়েলথের তো নয়ই। যদি তিনি টাকার বিনিময়ে জমিটি বেচে থাকেন তাহলেও তিনি মালিক মূলত অ্যাসেটের। অ্যাসেট হিসাবে টাকাগুলির ওয়েলথে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সম্ভাবনা মাত্র। ধরুন, দশ লাখে একটি বাড়ি বিক্রি আছে শুনে জমিবেচা দশ লাখ টাকা নিয়ে ভদ্রলোক গেলেন বাড়িটি কিনতে। গিয়ে দেখেন দ্বিতীয় এক খরিদ্দার সেখানে উপস্থিত যিনি দশ লাখের উপরে আরও কিছু টাকা দিয়ে বাড়িটি কিনতে প্রস্তুত। এক্ষেত্রে, দ্বিতীয় ব্যক্তিই বাড়িটির মালিক হবেন। আমাদের প্রাক্তন জমি-মালিক গেঁজের দশ লাখ টাকা নিয়ে ফিরবেন শূন্য হাতে। জমি বা বাড়ি বেচে টাকা পাওয়া যায়, কিন্তু টাকা বেচলেই যে জমি বা বাড়ি পাওয়া যাবে তার নিশ্চয়তা নেই। তাহলে, ‘আই প্রমিস টু পে দ্য বেয়ারার অমুক সাম অফ রুপিজ’ বলে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর টাকায় সই করে? স্পষ্টত, কোনও ওয়েলথ প্রদানের প্রতিশ্রুতি তিনি দেননি। আর্থিক-কর্তৃপক্ষ হিসাবে তিনি শুধু দিয়েছেন বাজারে বাজারদরে বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে ওই কাগজের টুকরোগুলি গৃহীত হওয়ার সরকারি স্বীকৃতি। ওইতে রুটির টুকরো কিনতে পারলে কেন। নইলে, বসে থাক পেটে কিল মেরে। বেশ, তাই বসে থাকলুম। ওই টাকা দিয়ে জমি, বাড়ি ইত্যাদি কিনলুম না, কোনও ব্যবসায় লাগালুম না বা, খাদ্য, পানীয় ইত্যাদি কিছুই ভোগ করলুম না। ব্যাংক ব্যবস্থাকে বিশ্বাস করি না কিংবা, ব্যাংকে টাকা রেখে সুদ কামাতে চাই না (আমার মর্জি, এনি কোশ্চেন?)। টাকাগুলো স্বেচ্ছায় বুদ্ধুরাম আমি রেখে দিলুম বাড়িতে তোষকের তলায়। বলা বাহুল্য, তোষকের তলায় টাকার গাছ গজায় না। কিন্তু, ইতিমধ্যে সেগুলি যদি ছিঁড়ে বা ফেটে যায় বা, বাজারে জিনিসের দামবৃদ্ধি ঘটে তাহলে ওই অ্যাসেটের মূল্য তথা ওয়েলথপ্রাপ্তির সম্ভাবনা কমবে। আর, কোনও কারণে, যথা ডিমনেটাইজেশন, টাকা যদি অচল হয়ে পড়ে তবে অ্যাসেটের মূল্য হবে শূন্য এবং ওয়েলথপ্রাপ্তির সম্ভাবনাও তদ্রূপ। এটা কি ঠিক হল? আমার জমির মালিক আমি, তাতে চাষ করব না পতিত ফেলে রাখব না বেচে দেব সেটা ঠিক করব আমি। আমি কি তোমাকে সই করা কাগজের রঙিন টুকরোগুলো টাকা বলে বাজারে চালানোর মাতব্বরি করতে বলেছিলাম? সেই মাতব্বরিও বিশ্বাসভরে মেনে নিয়েছিলাম, আচ্ছা সবাই মানছে আমিও মানি। তারপর সেগুলো নিজের কাছেই রাখলাম। আমার মর্জি। টাকায় সই তোমার থাকতে পারে, কিন্তু টাকাগুলোর মালিক আমি। তুমি সেদিন এক কথা বলে আজ অন্য কথা বল কোন যুক্তিতে, হ্যা? আমি কি আয় কর দিইনি? না কি, আমি কাউকে বন্দুক-বারুদ বেচেছি? না কি, আমার এই টাকাগুলো জাল? আর যদি টাকাটা ব্যাংকেই রেখে থাকি তাহলে কোন অধিকারে তুমি আমাকে ছোটাও এই এটিএম থেকে সেই এটিএম? ব্যাংকের কাউন্টার থেকে নিজের টাকা আমি সপ্তাহে চব্বিশ হাজারের বেশি তুলতে পারব না? প্লাস্টিক কার্ডফার্ডে কেনা-বেচা, ডিজিট্যাল মানি, অনলাইন ব্যাংকিং তুমি আমাকে জোর করে করাবে? পেয়েছটা কী? এরপর তো বলবে দিনে দু’বারের বেশি বাহ্যে যাওয়া বারণ। ফতোয়া দেবে বাথরুমের বাইরে সিসিটিভি কিংবা বায়োমেট্রিক সিস্টেম বসাতে। রাজধানীতে বসেই দেখে নেবে ক’বার গেলুম। পেট খারাপ হলে ডাক্তারের সার্টিফিকেট জুটিয়ে তবে গিয়ে কমোডে বসতে পাব। তাতে কাপড়েচোপড়ে হলে দেশের কথা ভেবে সেও মেনে নিতে হবে! বলা যায় না।

 

যারা বুক বাজিয়ে বুকে হাঁটে

 

ফেরা যাক ওয়েলথ, অ্যাসেট, মানির প্রসঙ্গে। তাহলে দাঁড়াল, ওয়েলথ হল সেই জিনিস যার এক্সচেঞ্জ ভ্যালু থাকতে পারে, না-ও থাকতে পারে, কিন্তু ইউজ ভ্যালু থাকতেই হবে। অ্যাসেট হল যার ইউজ ভ্যালু থাকতে পারে, নাও থাকতে পারে, কিন্তু এক্সচেঞ্জ ভ্যালু থাকতেই হবে। মানি হল সেই অ্যাসেট যার শুধুমাত্র এক্সচেঞ্জ ভ্যালু আছে। টাকা বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে গৃহীত হওয়ার আইনি প্রতিশ্রুতিপত্র এবং এই কারণে তরলতম অ্যাসেট, এবং এই কারণে প্রবল গতিশীল, এবং এই কারণেই ধরা শক্ত কখন সে সাদা আর কখন কালো। আগেই বলেছি, কালো টাকা কালো কারবারের প্রতীক, তাই কালো টাকা আসলে কখনও সাদা হয় না কারণ, কালো কারবার কখনও সাদা হয় না। একই কথা অন্যভাবেও বলা যায়, হঠাৎ শুনে কানে চমকপ্রদ লাগতে পারে যে, টাকা কখনও কালো হয় না। কারবার কালো হতে পারে। একটু ভাবলেই বোঝা যাবে যে, দুটি বক্তব্যের একই মর্মার্থ। বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে টাকা গতিশীল, মুহূর্তের ফারাকে কালো কারবারির হাত থেকে পৌঁছে যায় সাতে-পাঁচে না-থাকা সবজি বিক্রেতা, সেখান থেকে তেমনই এক মুদির হাতে। তাই কালো টাকা ধরতে গেলে ধরতে হবে কালো কারবারকে। সেই কারবার বন্ধে বর্তমান সরকারের প্রশাসনিক অনীহা দীর্ঘ ধারাবাহিক প্রশাসনিক ব্যর্থতার ইতিবৃত্তে সাম্প্রতিকতম সংযোজন। এই কিস্তি রচনা করে দেশ ও দশের তরফে সীমাহীন সহনশীলতা দাবি করার মতো পুণ্য এই সরকার গত আড়াই বছরে অর্জন করেননি। কালো টাকা উদ্ধার করে আগামীতে পারেন কি না দেখার জন্য আরও আড়াই বছর পড়ে আছে। কিন্তু, সেই আড়াই বছরে শহুরে ও গ্রামীণ অর্থনীতির বৈষম্য, এবং সাধারণভাবে সমাজে আর্থিক বৈষম্য কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা এখনই লিখিত হয়ে চলেছে, পুরনো দু’টাকার চালে আর নতুন দু’হাজার টাকার নোটে।

 

কালো টাকা নির্মূল! কালো কারবারিরা উদাহরণের জমিবিক্রেতার মতো ‘বুদ্ধু’ নন। তাঁরা বুদ্ধিমান ব্যবসাদার। অর্জিত অর্থ বাড়িতে বিছানার তোষকের নীচে রাখেন না। তাঁরা কারবারি মানুষ। মুনাফা কামান। টাকাকে অলস বসিয়ে রেখে সেটা সম্ভব নয়। তাঁদের টাকা বাজারে খাটে। দ্রুত বিবিধ সম্পদে পরিণত হয়। সরকার ‘জানতি’ পারে না! অথচ, কারবার যখন সেখানে লেনদেনযোগ্য পণ্য কিছু কোথাও না কোথাও থাকবেই (যদি না চিটিং চিট ফান্ড হয়)। এফএমসিজি পণ্যও আজ উৎপাদিত হয়ে আজই বিক্রি হয়ে, আজই ভুক্ত বা বিনিয়োজিত হয়ে যায় না। উৎপাদন ও ভোগ বা বিনিয়োগের মাঝে কিছু ল্যাগ বা অন্তর থাকে। পটেটো চিপসের প্যাকেট হাতে নিয়ে দেখবেন কবে সেটি প্যাকেটবন্দি হয়েছে, আজ কত তারিখ, এবং কতদিন পর্যন্ত এই প্যাকেট না খুলে রেখে দেওয়া যায়। দুধের প্যাকেট দেখবেন। উৎপাদন ও ভোগের মধ্যে অন্তত দু’দিন থেকে ছ’মাসের অন্তর থাকে। ক্যাপিটাল বা কনজিউমার ডিউরেবলসের ক্ষেত্রে এই ল্যাগ আরও বেশি। তাহলে, ছ’মাস বা এক বছর আগেই কালো কারবারে উৎপাদিত ও বিপণনযোগ্য দ্রব্যগুলি এখন কোথায়? কোটি কোটি টাকা শুনছি পুকুরে বা ধানখেতে পাওয়া যাচ্ছে। কোটি কোটি টাকার গোলাগুলি, বন্দুক, সিমেন্ট, স্টিল, জমি, বাড়ি, সব কোথায় গেল? এক লাখের বাণ্ডিল তো এক লাখি বন্দুকের চেয়ে ছোট হয়। কোটি টাকার বাড়ি হয় এক কোটির বাণ্ডিলের চেয়ে বহুগুণ বড়। টাকার আদানপ্রদান হয় নিঃশব্দে। বন্দুক, বারুদ বা বাড়ি নিঃশব্দে নির্মিত হয় না, চাইলেই সকলের নজর এড়িয়ে পকেটে বা বস্তাবন্দি করে পাচার করা যায় না। যারা কালো উৎপাদনের শব্দ শুনতে পায় না, তারা আজ বুক বাজিয়ে নেমেছে কালো টাকার নিঃশব্দ গতি রোধ করতে। এবং, সেই দাবি বিশ্বাস করতে হবে!

 

হাওয়ালা এক হাওয়াওয়ালার নাম নয়

 

হাওয়ালা! হুন্ডি! হ্যাঁ, কালো কারবারের বড় সহযোগী। ডিমনেটাইজেশন তাকে জব্দ করবে? ফারসি শব্দ হুন্ডির অর্থ নগদ প্রদানের প্রতিশ্রুতিপত্র। ওদিকে, আরবি হাওয়ালা শব্দের একটা অর্থ আস্থা।  হাওয়ালা প্র্তিষ্ঠান অতি প্রাচীন। আধুনিক ব্যাংক ব্যবসার পূর্বসূরি। আজ বেআইনি বটে, বরাবর তা ছিল না। অতীতে রাজা, বাদশা, সম্রাট প্রভৃতিদের নিয়মিত কর তো দিয়েইছে, প্রয়োজনে তাদের ধার-দেনা দিয়ে সংকটকালে সাহায্যও করেছে। বিখ্যাত ও বহুচর্চিত এককালের রেশম পথগুলিতে পণ্য আদানপ্রদানের ক্ষেত্রে হাওয়ালা ব্যবস্থা বড় প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা পালন করেছে।  বিপুল ও বিস্তৃত এদের নেটওয়ার্ক। এক্ষেত্রে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি বিশদে আলোচনা করেছেন স্কট লেভি।  হাওয়ালা বা হুন্ডিগুলি দূর ও বহির্বাণিজ্যের ক্ষেত্রে লেনদেনের মাধ্যম হিসাবে নিয়মিত ব্যবহৃত হয়েছে।  হাওয়ালা বাণিজ্য চিনের ট্যাং রাজবংশ দেখেছে, দেখেছে কনিষ্ককে, চেঙ্গিজ খান, তৈমুর লং, সম্রাট অশোক, হর্ষবর্ধন, বাবর, আকবর, ঔরঙ্গজেব, ফারুখশিয়র, বাহাদুর শাহ জাফর, মাউন্টব্যাটেন, নেহরু, মোরারজি দেশাই, সবাইকে দেখেছে। এরা কেউ আজ নেই। হাওয়ালা আছে। একসময়ের সমরখন্দের বিখ্যাত ও বর্ধিষ্ণু শোগদীয় ব্যবসায়ীগোষ্ঠীকে হাওয়ালা দেখেছে। শোগদীয়দের খোঁজ আজ আর পাওয়া যায় না।  হাওয়ালা আজও টিকে আছে। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে আড়ালে-আবডালে প্রতিযোগিতা করেই টিকে আছে। নানান কারণে ব্যাংক ব্যবস্থার তুলনায় হাওয়ালায় টাকা স্থানান্তর দ্রুততর, কম ব্যয়বহুল এবং সুবিধেজনক। ব্যাংক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করতে গেলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট লাগবে। অনেকেরই তা থাকে না। ব্যাংক ব্যবস্থার বিবিধ নিয়মকানুন ও বহুস্তরী প্রশাসনিক পদ্ধতির দরুন কাজে তুলনায় দেরি হয়। বহির্বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই বিলম্বের কালে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বদলে যেতে পারে এবং ফলত কোনও এক পক্ষের আর্থিক লোকসান হওয়ার সম্ভাবনা। ভারতে আজও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার যা পরিচিত ম্যানেজ্‌ড ফ্লোট রেজিমি নামে তা পুরোপুরি বাজারনির্ভর নয়। শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্বারা স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলিই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেফারেন্স রেট মেনে বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচা করতে পারে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বাজার সতত অস্থির। ব্যাংকের তুলনায় হাওয়ালা বাজার দ্রুত ক্রিয়াশীল হতে পারে বলে তার পক্ষে বৈদেশিক মুদ্রার ক্রেতা বা বিক্রেতাকে অধিক লাভজনক হারে লেনদেনের ব্যবস্থা করে দেওয়া সম্ভব। ব্যাংক ব্যবস্থা তুলনায় যান্ত্রিক, লেনদেন ও ব্যক্তির বহুবিধ প্রমাণ ও পরিচয়পত্র দাবি করে। অন্যদিকে, হাওয়ালা, নামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাঁড়িয়ে থাকে পারস্পরিক বিশ্বাসের উপর। ফলত, হাওয়ালা তুলনায় দ্রুত কর্মসম্পাদন করতে পারে। এই পর্যন্ত দেখলে, বাজার অর্থনীতির আবহে হাওয়ালাকে এক দুষ্ট কারবার বলে মনে করা সম্ভব নয়। বরং, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যাংকিং পদ্ধতি যাদের জটিল মনে হয় সেইসব মানুষদের পক্ষে সুবিধেজনক এক ব্যাংকিং ব্যবস্থা। হাওয়ালা কারবারের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ দুটি। এক, তাদের লেনদেন সরকারি নথিভুক্ত না হওয়ার ফলে, কর ফাঁকি দেয় ও দিতে সাহায্য করে অর্থাৎ, কালো টাকা বাড়িয়ে তোলে। দুই, বিভিন্ন অসাধু ও সাধারণের জন্য ক্ষতিকর কারবার যথা, বেআইনি অস্ত্রব্যবসা, মাদকের ব্যবসা ইত্যাদির আর্থিক লেনদেনে সহায়তা করে এবং এইসব কারবার থেকে অর্জিত কালো টাকা ঘুরপথে নানান বাহানায় দেশের অর্থনীতিতে প্রবেশ করিয়ে তাকে ধলো টাকার মান্যতা পেতে সাহায্য করে, যাকে বলে টাকা ধোলাই বা মানি লন্ডারিং। এই কারণেই ভারত ও অন্যান্য অনেক দেশে হাওয়ালা কারবার সরকারিভাবে বেআইনি ঘোষিত (যদিও, ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে অবিভক্ত ভারতে হুন্ডি কারবারকে বেআইনি ঘোষণা করার পিছনে উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ ব্যাংকগুলিকে এদেশে প্রাধান্য পেতে সাহায্য করা)।  প্রসঙ্গত, আজকের অনেক ভারতীয় আধুনিক কর্পোরেটেরই শিকড় খুঁজলে সন্ধান পাওয়া যাবে অতীতের কোনও হাওয়ালা কারবারের। উদাহরণ, হিন্দুজাদের অতীত খুঁড়ে দেখার চেষ্টা করতে পারেন।  আজকেও হাওয়ালার সঙ্গে কর্পোরেট যে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন তাও জোর দিয়ে কেউ বলতে পারবেন না। শেয়ার বাজারের ওঠা-নামা যারা পিছন থেকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের সাদা বলা যায় না।

 

আবার প্রশ্ন করা যাক, এই ডিমনেটাইজেশন হাওয়ালা কারবার, তার কালো টাকা, সেই কালো টাকার ধোলাই বন্ধ করতে পারবে? কী করে পারবে? এক, টাকা গতিশীল, ক্রমাগত হাত বদলায়। ঠিক কার হাতে সে ধরা পড়বে? দুই, হাওয়ালার কালো টাকা অতি দ্রুত ভিন্ন অ্যাসেটে পরিণত হয় যথা, বৈদেশিক মুদ্রা, বৈদেশিক মুদ্রানির্ভর ঋণপত্র, বহির্বাণিজ্যনির্ভর বিবিধ বিনিয়োগপত্র, উৎপাদিত বৈধ পণ্যাদির মালিকানা, গয়না, জমি, বাড়ি ইত্যাদিতে। কালো টাকা বৈদেশিক মুদ্রা বা বৈদেশিক মুদ্রানির্ভর ঋণ বা বিনিয়োগপত্রে পরিণত হয়ে গিয়ে থাকলে এদেশি টাকাকে ডিমনেটাইজ করে ফল হবে শূন্য। তিন, হাওয়ালার কর্মপদ্ধতি সরল হলেও হিসাবপত্র রাখার পদ্ধতি এতটাই বিধিবহির্ভুত ও জটিল যে, সরল বিধিমতে তার হদিশ করা অত্যন্ত কঠিন। অসংখ্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, সেগুলির মধ্যে গোলকধাঁধাসদৃশ অজস্র লেনদেন, বড় টাকা বহু ছোট অংকে জমা করা ও তোলা, প্রতিটি হাওয়ালা কারবারকে ঢেকে রাখা অসংখ্য বৈধ কারবারের মোড়ক যথা, আমদানি-রফতানির ব্যবসা, ভ্রমণসংস্থা, হোটেল ও রেস্তোরাঁ, এমনকী সমাজসেবামূলক এনজিও ইত্যাদির মাধ্যমে হাওয়ালা কারবার তার প্রকৃতি গোপন করে। ডিমনেটাইজেশনে এদের তেমনকিছু যায়-আসে না। ডিমনেটাইজেশনের ফলে হাওয়ালা আপাতত খানিকটা স্তব্ধ। কিন্তু, তাদের ও তাদের মাধ্যমে অর্জিত কালো সম্পদ বিনষ্ট হয়নি। হবেও না। ক’টা দিন যাক, হাওয়ালা আবার চাঙ্গা হয়ে উঠবে।

 

তাহলে উপায়টা কী? গিভ আস অ্যান অল্টারনেটিভ, প্যাল!

 

তাহলে কি হাওয়ালাকে জব্দ করা যায় না? যায় বই কী। একেবারে নির্মূল করা না গেলেও, অনেকটা কমিয়ে দেওয়া যায়। সেটা ডিমনেটাইজেশনের কর্ম নয়। হাওয়ালা কারবার ধরতে হবে সরাসরি। একটা রাস্তা আগেই বলা হয়েছে, বেআইনি পণ্য উৎপাদন ও পণ্যাকারে লেনদেনের সময় তাকে ধরা তুলনায় সহজ। সেই কাজ দেশের বর্তমান আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই সম্ভব। কিন্তু, পুলিশ যদি পুলিশের কাজ না করে, কাস্টমস তার কাজ, আয়কর দফতর তার, আর্থিক অপরাধ দমনের রাজ্য ও কেন্দ্র স্তরের সংস্থাগুলি তাদের কাজ না করে, উলটে যদি কালো কারবারিদের আয়ের বখরা নিয়ে তাদের সহযোগীর ভূমিকা নেয়, তাহলে এমনই চলবে। বেশিদূর যেতে হবে না। কাছাকাছি বালি বা পাথরখাদানগুলি দেখে আসুন। সরকারি খাদানগুলিতে টাকা জমা করে কতটা বালি বা পাথর তোলার অনুমতি নিয়েছে সংস্থাগুলি? বাস্তবে কত বেশি বালি ও পাথর তারা তুলছে? সেই বাড়তি টাকা কত অংশে ভাগ হয়ে কোথায় যাচ্ছে? আর, অবৈধ খাদান তো আছেই। সবাই দেখতে পাচ্ছে। তবু কারবার চলছে। এটা কালো কারবার নয়? এই কারবারের টাকা কালো নয়? একে ডিমনেটাইজেশন কী করবে? এই টাকা কি কারও ঘরে জমা করা আছে? করা থাকলে চলে? বিজনেস রোল করে? কারও ঘরে যদি কিছু জমাও থাকে তবে অন্যত্র অন্যভাবে বিনিয়োজিত কালো টাকার তুলনায় সেটা নস্যি। নস্যি। ডিমনেটাইজেশনে এক-আধটা বাপ ধরা পড়তে পারে, বাপের বাপ কোনওদিনই ধরা পড়বে না। সুতরাং, ধরতে গেলে কারবারিকে কারবারেই ধরতে হবে। উপর্যুক্ত আইনি ও প্রত্যক্ষ প্রশাসনিক উপায় তার একটা।

 

দ্বিতীয় উপায় হল, ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা এবং সততার উপরে নির্ভর করা (এই দেখুন, সততার প্রশ্ন আবার সেই চলেই এল। না এনে তো উপায়ও নেই। কালো মানে অসৎ। তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সততাই তো হাতিয়ার। মোদি কিন্তু নামভূমিকায় অভিনয় করতে নাটকটি জম্পেশ নামিয়েছেন! অবশ্য, ভারতীয় মঞ্চে তিনিই একমাত্র স্টার অভিনেতা নন। আশপাশে আরও জনাকয় চোখে পড়ে)। দক্ষ অভিজ্ঞ ব্যাংককর্মীরা জানেন, হাওয়ালা কারবারের কতকগুলি বৈশিষ্ট্য আছে যা চোখে না পড়ে উপায় নেই। যেমন, কয়েকটি অ্যাকাউন্টে ধারাবাহিকভাবে মোটা টাকা জমা থাকে, সেগুলিতে নিয়মিত টাকা জমা পড়ে, অ্যাকাউন্ট থেকে নিয়মিত টাকা অন্য অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়, কিন্তু প্রতিটি জমা ও পেমেন্ট রিপোর্টযোগ্য সীমার নীচে, ধরুন পঞ্চাশ হাজারের নীচে। ব্যাংকের একই শাখায় এমন একাধিক অ্যাকাউন্টের মালিক একজন। কিছু অ্যাকাউন্ট তাঁর নিজের নামে, কিছু তাঁর সংস্থার নামে, কিছু আবার অন্যের নামে। তিনি নিয়মিত একসঙ্গে অনেক টাকা জমা করেন। কিন্তু, মোট টাকাকে ছোট ছোট ভাগে ভেঙে একাধিক অ্যাকাউন্টে। বর্তমান ব্যাংকে তাঁর অ্যাকাউন্টগুলির সঙ্গে অন্যান্য ব্যাংকের বিভিন্ন শাখার বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের নিয়মিত লেনদেন থেকে দুটি জিনিস বোঝা যায়, এক, অন্য বিভিন্ন ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় তাঁর এমনই একাধিক অ্যাকাউন্ট আছে। দুই, নিজের অ্যাকাউন্টগুলির মধ্যে ছাড়া তাঁর নিয়মিত লেনদেন হয় নির্দিষ্ট কয়েকটি অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যেগুলির মালিক তিনি নন। অর্থাৎ, ওই অ্যাকাউন্টগুলির মালিক তাঁর কারবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তিন নম্বরে দেখা যায়, ওই অ্যাকাউন্টগুলির বেশ কয়েকটি বিদেশস্থিত ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট। অর্থাৎ, ইনি নিয়মিত তাদের টাকা পাঠান। তাঁরাও নিয়মিত এঁকে টাকা পাঠান। খোঁজ নিলে জানা যায়, হয় ইনি কোনও ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট সংস্থার মালিক, নয়তো ট্রাভেল এজেন্সির, নয়তো হোটেল-রেস্তোরাঁর, নয়তো এনজিও’র কর্ণধার, নয়তো এথনিক ও ডিজাইনার পোশাকের, নয়তো ইমপ্রেসারিও, স্টার অভিনেতা ও গানের দল নিয়ে বিদেশে আসর জমাতে যান, ওদেশের স্টারদের এদেশে আনেন, সিনেমায় বিনিয়োগ করেন বা বিনিয়োগের মাধ্যম (দালাল) হিসাবে কাজ করেন, ইত্যাদি। 

 

ব্যাংককর্মী, অন্যান্য অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এবং দেশের আর্থিক অপরাধ দমনের শাখাগুলি একযোগে কাজ করলে এইসব হাওয়ালা কারবার ধরা পড়বে এবং এদের তেজ ক্রমশ কমবে। কিন্তু, যদি এমন হয় যে, ব্যাংকের শাখার উচ্চপদস্থ কর্মচারী ব্যাংকের অন্যান্য গ্রাহক বা আমানতকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে তার ভিত্তিতে কালো কারবারিদের বেনামে নতুন নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে দিচ্ছেন বা, রেজিস্ট্রার অফ কোম্পানিজ’এর কোনও কর্তা আবেদন ও তৎসংলগ্ন নথি খতিয়ে না দেখে নতুন নতুন সংস্থার পত্তন হতে দিচ্ছেন তাহলে কোনও আশা নেই। এক্ষেত্রে ডিমনেটাইজেশন সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক, শিবমন্দিরের ঘণ্টার মতো। ওটা বাজালে ভক্তের মনে আশার সঞ্চার হতে পারে, কিন্তু ঈশ্বর আছেন কি না তার প্রমাণ হয় না। কালো টাকা নির্মূল করতে প্রশাসনিক সদিচ্ছা প্রয়োজন, মানিটারি পলিসির গিমিক নয়। এদেশের দুর্বল, দরিদ্র, খানিকটা বিভ্রান্ত মানুষ যে মূলত সৎ তা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। ডিমনেটাইজেশনকে তাঁরা একটি সৎ উদ্যোগ মেনে নিয়েছেন। তাঁদের সততা আরও প্রমাণিত এই জন্য যে, ভারতে জাতীয় আয়ের এখনও বড়জোর এক-চতুর্থাংশই কালো (বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী), পুরোটা নয়।

 
( পরের পর্বে সমাপ্য )

 



কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী

Re: জাদুর নাম ডিমনেটাইজেশন -প্রথম পর্ব

ভাল লিখেছেন।
লেখক কে ধন্যবাদ।
আগামী পর্বের জন্য অপেক্ষায় রইলাম।
Avatar: sm

Re: জাদুর নাম ডিমনেটাইজেশন -প্রথম পর্ব

দুরন্ত হচ্ছে।অসাধারণ।চালিয়ে যান।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন