টাকা বাতিল এবং গ্রামের কারু-অর্থনীতি

বিশ্বেন্দু নন্দ

শূদ্র সভ্যতার সম্পদ লুঠ ইতিকথা

বঙ্গীয় পারম্পরিক কারু ও বস্ত্র শিল্পী সংঘ

ঈপ্সিতা বলেছেন টাকা বাতিল নীতিতে গ্রামীণ পরম্পরার উৎপাদকেদের অবস্থা কী দাঁড়িয়েছে তা বোঝার চেষ্টা করা।  এই অর্থনীতির মূল চরিত্রগুলি একটু জেনে নেওয়া দরকার। এই অর্থনীতির চরিত্র এবং কীভাবে, কেন এই চেষ্টা করছে বড় পুঁজি তাও হয়ত বোঝা দরকার। বোঝা দরকার টাকা বাতিল গ্রামীণ অর্থনীতি দখলের একটা ধারাবাহিক রণনীতির অঙ্গ। শেষে টাকা বাতিলের সম্ভাব্য দূর সময়ের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে তা নিয়েও আলোচনা করা যেতে পারে। 

প্রাথমিকভাবে যেহেতু অধিকাংশ গ্রামের ছোট উদ্যমীর কাঁচামাল কিনে নিতে হয় না, তাই তার অর্থনীতি বেশ ভাল অবস্থায় রয়েছে এমন কথা বলার অবস্থায় নেই আমরা। কেন? তারা আজও নগদ অর্থনীতির অংশ, যাকে প্লাস্টিক টাকার প্রচারকেরা ব্ল্যাক মানি দেগে দিচ্ছেন – এ নিয়ে বিগত কয়েক দিন ধরে নানান বিতর্ক হয়েছে – সে বিষয়ের বিতর্কে ঢুকছি না। কিন্তু  গ্রামে নগদ অর্থের ঘাটতি হলে কী করে সেই অর্থনীতির অংশগুলি সুস্থির থাকে তা বোঝা দায়। দ্বিতীয়ত তাদের হাত থেকে যখন নগদ কেড়ে নেওয়া হয়, বা তারা যে টাকা ধরে রয়েছেন, সেগুলিকে বেআইনি ঘোষণা করে দেওয়া হয়, তাহলে তাদের সামগ্রিক অর্থনীতির দুরবস্থার সঙ্গে ব্যক্তিজীবনেও নেমে আসে অচলাবস্থা। দুয়ে মিলে যে বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতি যে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে তা বলাই বাহুল্য।

আমরা তিনটে ছোট উৎপাদন ব্যবস্থা, তার ব্যবস্থাপক আর ক্রেতার অবস্থা নিয়ে আলোচনা করব – যাদের কাঁচামাল তার নিজের এলাকায় উৎপাদন হয় না – তাঁতি, শঙ্খশিল্পী আর ডোকরা কামার। তাদের অবস্থা কী দেখে নেওয়া যাক। তার পরে আমাদের তত্ত্ব আর সিদ্ধান্ত।

তাঁতি

চরকা কাটনিদের লুপ্ত হওয়া আর স্থানীয়ভাবে তুলো চাষ জোর করে বন্ধ করে দেওয়ায় (যার বিরুদ্ধে সারা বাঙলার তাঁতিরা ১৭৯০-১৮১০ পর্যন্ত লড়েছিলেন) তুলো চাষ মূলত বড় পুঁজির মৃগয়া ক্ষেত্র হয়ে পড়ে – বছর দশেক ধরে ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ সহায়তায় আর কর্পোরেটদের সক্রিয় চাপে দেশিয় তুলো চাষ প্রায় বন্ধ – চাষ হচ্ছে বিটিতুলোর। তবে চাষিরা বুঝেছেন তার কুফল – ফিরছেন দেশি তুলো চাষে – এ বছর বিটি তুলো বীজ কেনার প্রবণতা কমেছে – সে অন্য বিষয় – রঙও তাঁতির নিজস্ব নয়, তা তাকে সরবরাহ করে বড় কারখানা। শুধু তাঁতটুকুই তার – আবার অনেকের তাও নয়। কৃষকদের মত চাষের কোন ইনপুটই তাঁতির হাতে নেই। আজ সম্পূর্ণভাবে তাকে নির্ভর করতে হয় বাজারের ওপর। একটা ২৫০/৩০০ টাকার শাড়িতে সুতো লাগে লাছির ওজন অনুযায়ী যাকে কাউন্ট বলে, যত বেশি কাউন্ট তত বেশি পাতলা সুতো, মসলিন হলে ন্যুনতম ৫০০ কাউন্ট হতেই হয় – আর সাধারণভাবে বাঙলার ভদ্রমহিলারা যে কাপড় পরেন, তার কাউন্ট খুব বেশি হলে ১৫০ মত, রঙ, মাড়, পালিশ, লাটাই বা অন্যান্য সুতোর কাজ করতে আরও ১০০-১৫০ টাকা – সে হাতে পায় খুব বেশি হলে ৫০ টাকা দুদিনের বোনায়। ফলে তার হাতে এমনিতেই টাকা নেই। তার যারা ক্রেতা, গ্রামের মা-বোনেরা, তাদের হাত থেকেও নানান ভাবে টাকা/সম্পদ (মুর্গি আর হাঁসের নির্বিচার কালিং মনে রাখুন) ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এবারে আচমকা নোট বাতিলের সিদ্ধান্তে সেই সম্পদ লুঠের কাজ চরমে গিয়ে পৌঁছল। আজ ২ ডিসেম্বর ১৫ পৌষ, যখন এই প্রবন্ধটা লিখছি, তখন লাখি, হাজারি চাকরিজীবি ভদ্রশ্রেণী, যারা নো কিউএর বিজ্ঞাপনে প্লাস্টিক টাকা বানিয়েছিলেন, কলকাতা শহরে হাপিত্যেশ করে রাস্তায় রাস্তায় উদ্ভ্রান্তের মত দৌড়চ্ছেন এক ব্যাঙ্ক থেকে অন্য ব্যাঙ্কে, এক এটিএম থেকে অন্য এটিএম – তাও টাকা নেই জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাহলে গ্রামের সাধারণ খেটে খাওয়া বা ছোট ব্যবসায়ীর হাতে টাকা থাকবে, গ্রামের অর্থনীতি সচল থাকবে, এই ধারণা বাতুলতা বই আর কিছু নয়। আর তাঁতিদের অধিকাংশ ইনপুটই কিনতে হয়, হয়ত খুব বেশি হলে একটা ধার পায় সে। 

তাহলে যদি তার মূল গ্রামীণ ক্রেতার হাত থেকে টাকা খরচ করার সুযোগ কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে তাঁতের বাজারের তাঁতির আর জায়গা কোথায়? ফুলিয়ায় তিনটে তাঁতি সমবায় আছে, মোট ২ লক্ষের বেশি তাঁতি সংখ্যার ভগ্নাংশ, ব্যাঙ্ক তাদের সপ্তাহে ৫০ হাজার টাকার বেশি টাকা তুলতে দিচ্ছে না – গত শনিবার শান্তিপুর আর ফুলিয়ার প্রত্যেককটা তাঁতি সমবায় বৈঠক করেছে – জেলার লিড ব্যাঙ্কের সঙ্গে কথা বলেছে। কোন সুরাহা হয় নি। তাদের এক একটা দিনেই অন্তত কয়েক লাখ টাকা বিল চোকাতে হয়। তাঁতিরা বকেয়া অর্থই পাচ্ছে না। তাঁতগুলিতে জরা ধরেছে। 

কলের তাঁতের চাপে গত চার পাঁচ বছর ফুলিয়ার তাঁতি কমেছে ৫০ হাজার প্রায়। ফুলিয়ায় বহু সংখ্যক তাঁতি কুচবিহার, দিনাজপুরের তাঁতি। তাদের কাজ নেই – রোজগার নেই। ফিরে যাচ্ছেন বাড়িতে দলে দলে। উত্তরবঙ্গের বাসে টিকিট, ট্রেনের অসংরক্ষিত কামরায় ঠাঁই পাওয়া ভার। এই কুড়ি-বাইশ দিনের হিসেব নেওয়া হয় নি – কিন্তু সেটাও হাজার বিশেকের কম হবে না। তাঁতি রোজগার বন্ধ মানে তার সঙ্গে জুড়ে থাকা অন্তত দশজন দক্ষ প্রযুক্তিবিদের রোজগার হারানো। গ্রামের বাজার পড়ে যাওয়া। বকলমে গ্রামের অন্তত পরিধেয়র বাজার, যতুটুকু টিকেছিল তাঁতিদের নাছোড়বান্দা মনোভাবে, রাষ্ট্রের উদ্যোগে তাদের হাত থেকে সেটাও কেড়ে নিয়ে বড় মিলের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা পাক্কা। 

২৪ পরগণা থেকে কোচবিহার, প্রায় সব জেলায় স্বাতন্ত্র্যে ভরপুর বাংলাকে গর্বিত করা তাঁতি (সুতি, রেশম, এণ্ডি ইত্যাদি) পাড়া রয়েছে। তাদের প্রত্যেকের অবস্থা মুখে রক্ত ওঠার মত। সাধারণ দৈনন্দিনের খরচ চালাতে বাড়ির লক্ষ্মী ভাঁড়ার ভাঙতে হচ্ছে – ব্যবসার পুঁজি তো দূরস্থান। বাঙলার গর্ব তাঁতির বেঁচে থাকাই অসম্ভব হয়ে পড়ছে। সে যায় কোথায়!

ফুলিয়ার ক্ষতির একটা ছোট হিসেব দেখা যাক। হবিবপুর-ফুলিয়া অঞ্চলে দেড় লক্ষ তাঁত রয়েছে। প্রত্যেক তাঁতে যদি দুদিনে একটা শাড়ি তৈরি হয় তাহলে এই পঁচিশ দিনে ধরে নেওয়া যাক ১২টা শাড়ি তৈরি হত। তার মূল্যটা হিসেব ধরা যাক প্রতি সাড়ি ৫০০ টাকা ধরে। তাহলে এই ধ্বংসের সময়ের অঙ্কটা দাঁড়াল ৫০০ টাকা দামের দেড় লক্ষ তাঁতে আর ১২টা করে শাড়ি – অর্থাৎ ৯০ কোটি টাকা। যদি তাঁতিরা এর অর্ধেকটা কাজ না করে হলে সেই অঙ্কটা দাঁড়াবে ৪৫ কোটি টাকা – এর এক তৃতীয়াংশ তার রোজগার – অর্থাৎ ১৫ কোটি টাকা মজুরি হিসেবে লুঠ করল কেন্দ্রীয় সরকার। একে সারা বাংলার সাড়ে সাত লক্ষ তাঁতির অঙ্কের সঙ্গে জুড়ুন – মানে এর সঙ্গে ৬ গুণ করি – ৯০ কোটি টাকা। 

এই লুট হওয়া রোজগার তাকে কে ফিরিয়ে দেবে দেবে? 

শঙ্খ উদ্যোগী 

আরেক ধরণের গ্রামীণ উদ্যোগী যাদের কাঁচামাল এসে বাংলার বাইরে থেকে। শাঁখ আসে সাধারণত ভারত মহাসাগর এলাকা – তামিলনাড়ু, শ্রীলঙ্কার আশেপাশের সমুদ্র থেকে। অথচ সারা বিশ্বে বরাবরই বাঙলার শাঁখারি আর শঙ্খ বণিকেরা বিখ্যাত ছিলেন – আজও তামিলনাড়ুর শাঁখারিপাড়ায় বাঙালি কারিগরের চাহিদা অসম্ভব। বাংলার ঢাকার আর বিষ্ণুপুরের শাঁখারিপাড়া প্রবাদপ্রতীম। প্রত্যেক জেলা শহরেই রয়েছে শাঁখারিপাড়া। ব্রিটিশপূর্ব বাঙলার যে কটি পণ্য বিশ্বের বাজারে প্রায় একচেটিয়া ব্যবসা করত, সেগুলির মধ্যে শাঁখের পণ্য অন্যতম পণ্য। শাঁখ কাটার যে করাত(যা যেতেও কাটে আসতেও কাটে)) ব্যবহার করেন শাঁখারিরা সেটি বাঙলার প্রযুক্তি বিকাশের কাজে অন্যতম উদাহরণ – একদা এই করাতটি তৈরি করতেন আউশগ্রামের কামারেরা – তাঁরাই এই শাঁখ কাটার প্রযুক্তি উপহার দিয়েছিলেন বিশ্বের শাঁখারিদের, যতদিননা, ড্রিল মেশিন এসে শাঁখের সূক্ষ্ম কাজের বাজারটা বরবাদ করে দেয় নি। যদিও আজ ছোট তুরপুণ দিয়েই শাঁখারির হাতেই সব থেকে সূক্ষ্ম শাঁখের কাজ হয়। 

বিগত তিরিশ দশকে তেল ব্যবহারের প্রবণতা যত বেড়েছে সমুদ্র যত নোংরা হয়েছে, সমুদ্রে নানান ধরণের চরম ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ ফেলার কাজ বেড়েছে – শাঁখ তোলার সংখ্যা কমেছে। কাঁচামালের দাম বেড়েছে। কারিগরদের কাজ কমেছে। তার প্রভাব পড়েছে শাঁখের বাজারে। সেই অবস্থা এখন চরম অবস্থায় পৌঁছেছে টাকা বাতিলের প্রক্রিয়ায়। একদিকে সমুদ্র থেকে শাঁখ উঠছে কম – তার পরে শাঁখারিদের হাতে যতটুকু নগদ ছিল, তাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে জোর করে তাদের ডিজিট্যাল অর্থনীতিতে আত্তীকৃত করতে। এই ব্যবসার সঙ্গে জুড়ে থাকা কোন মানুষের হাতে টাকা নেই – শাঁখ তোলা কর্মী থেকে শাঁখ কাটা শাঁখারি আর সব শেষে ক্রেতা, যে আসলে বাজারটাকে চাগিয়ে রাখে – সক্কলের হাত শূন্য করে ব্যাঙ্কে টাকা ভরা হচ্ছে। আর প্রত্যেকে বড় পুঁজির টাকার আড়তদারের কাছে ভিখিরির মত দাঁড়াতে হচ্ছে দেশের পরম্পরার উৎপাদকেদের – যাদের কাজে বাঙলাকে এক সময় এক ডাকে চিনত বিশ্ব। এ এক অদ্ভুত ভানুমোদির খেল।    

বিষ্ণুপরের, ডোমকলের, বর্ধমানের, কলকাতার বাগবাজার বা শ্রীমানী বাজারের বা বাঙলার প্রত্যেকটা শহরের শাঁখারিদের হাতে কাজ নেই। এদের একটা অংশ পরিযায়ী কারিগর। তাদের পরভূমে টাকা ছাড়া বেঁচে থাকাটাই সমস্যা হয়ে পড়েছে। যে দোকান বা মহাজনের গদি বা মোকামে এরা কাজ করেন, তাদের নগদের ভাঁড়ারে টান। ফলে দিনগুজরানের জন্য টাকা পাবেন কোথায়। 

বিষ্ণুপুরের প্রখ্যাত শাঁখারি, এখন পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরের বাসিন্দা, নিতাই চন্দ সংগঠনের সক্রিয় কর্মী। তিনি জানালেন তার আগে মাসে তিনটে বস্তা যেত শ্রীমানী মার্কেটের বাজার থেকে। কিন্তু গত এক মাসে টাকা বাতিলের পর পাইকারদের মোকামে হাতে যতটুকু শাঁখের জমা ছিল সব শেষ হয়ে গিয়েছে। চলতি হস্তশিল্প মেলার জন্য কিছু তুলে রেখে দিতে পেরেছিলেন বলে রক্ষে। সারা বছরের রোজগার তারা পান এই মেলা থেকেই। না হলে যে কী হত বলা যায় না। নিতাই তুলনায় স্বচ্ছল, বেশি করে তুলতে পারেন, কলকাতা থেকে। তাঁর বাবা, শ্বশুর দুজনেই রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার প্রাপ্ত শাঁখারি। তিনিও অসাধারণ কারিগর। মরশুমের শুরুর মেলাটা নিতাই হয়ত চালিয়ে নিলেন। কিন্তু তার পরেরগুলো? সক্কলে নিতাই চন্দ নন যারা ছোট খুচরো উৎপাদক, তাদের অবস্থা? খুব খারাপ বললে কম বলা হয়।

আদতে বাংলার চাষের মত অবস্থা হয়েছে এদের। তামিলনাড়ুতে ডুবুরিদের কাঁচা টাকা দিয়ে কাজ করাতে হয় শাঁখ তোলার জন্য। তা দিতে পারছেন না বড় আড়তদারেরা। কাঁচামালের জমায় টান ধরছে। নিতাই চন্দের মত ছোট ব্যবসায়ী, যারা তার এলাকায় বড়, তারাও খুব বেশি কাঁচামাল পাচ্ছেন না। সব থেকে খারাপ বিক্রিবাটা। বেহালা বাজারে যে ক’টা শাঁখের দোকান রয়েছে, সেগুলির অবস্থা গত ২৫ দিনে শোচনীয়। হাতের শাঁখা, পলাটা হয়ত কিনতে আসছে। বিয়ের একটা বড় মরশুম গেল। তাই বাঁচোয়া – বিক্রিবাটা হয়েছে – পরম্পরার বাঙালির বিয়ের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য শাঁখা – কিন্তু শুধু শাঁখা, পলা বেচে দোকান চলে না – সপ্তাহে দুএকটা শাঁখ বিক্রি না হলে দোকানির পুঁজিতে টান পড়ে। বিয়ের মরশুমে তাও মানসিক শান্তি ছিল, লাভ না হোক দোকানটা চলছে। সেটাও চলে গিয়েছে। তার পর? হাঁ করে বসে থাকা। তারপর টাকার জন্য ব্যাঙ্কে হত্যে দেওয়া তো রয়েইছে।

উৎপাদক, বিক্রেতা আর ক্রেতা কারোর হাতে টাকা নেই। উৎপাদন-বিতরণ চক্রটাই দাঁড়িয়ে গিয়েছে শঙ্খ পণ্য উৎপাদনে।

ডোকরা কামার

উপনিবেশপূর্ব বৃহত্তর বাংলা বা বাংলা সুবার আর্থনীতিতে ডোকরা কামারদের অসাধারণ অবদান ছিল। ভারত যে লোহা আর ইস্পাত আর ক্রুসিবল স্টিলের পিণ্ড সারা বিশ্বে রপ্তানি করত, তার উৎপাদন অঞ্চল বাঙলার বীরভূম বাঁকুড়া থেকে শুরু করে ওড়িশা, বিহার, মধ্যপ্রদেশ হয়ে ব্যপ্ত ছিল দক্ষিণের রাজ্যগুলো। দামাস্কাস তরোয়ালের পিণ্ড যেত ভারত থেকে। সাঁওতাল, মুণ্ডা, গোন্দ, বা অন্যান্য পরম্পরার সমাজ মাহির ছিল জং ছাড়া ধাতু পণ্য আর বাট তৈরিতে – তাদের তৈরি লোহায় হয়েছে কোণার্কের ৮০ ফুট বিম, ধরের লোহার স্তম্ভ বা ঢাকার কারিগর জনার্দন কর্মকারের মুর্শিদাবাদের বাচ্চেওয়ালি তোপ। এই প্রযুক্তি, সমাজ নিয়ে আমরা পরমের দুটি পত্রিকায় বিশদে আলোচনা করেছি। 

ধরমপাল, মীরা মুখোপাধ্যায় এই মানুষদের প্রযুক্তি, আচার, সমাজ নিয়ে বিশদে কাজ করেছেন। মীরাদিকে এই মানুষেরা আমাদের পরম্পরার ঢালাইয়ের কাজ শিখিয়েছিলেন। তাঁর সূত্রে বস্তারের সোনাধর বিশ্বকর্মা বা লোহা বা কাঁসার পণ্য উৎপাদকের বিষয়ে সচেতন হয়েছে শহুরে সমাজ। এঁদের তৈরি পণ্যে কেন জং লাগে না, সেই জ্ঞান লুঠ করতে কাজ করেছেন ঔপনিবেশিক কর্পোরেট প্রযুক্তিবিদেরা। এঁরা পরাধীন বা স্বাধীন ভারতে এই পুরোনো সমাজের রক্ষা করা ধাতুচুরগুলির খনি, পণ্য তৈরির প্রযুক্তি উদ্ধার করতে গবেষণা করেছিলেন। তাদের মধ্যে প্রমথনাথ বসু অন্যতম। এ ছাড়াও টাটা কোম্পানির বহু ভূতত্ত্ববিদ, ধাতুবিদ এই জঙ্গল এলাকার মানুষদের প্রযুক্তি, ব্যবস্থা জানতে কাজ করেছিলেন। 

তো আজও ডোকরা কামারদের কোন ধাতু পণ্যতেই জং পড়ে না সেটা আমরা সক্কলে জানি। এই জ্ঞান লুঠ, চুরি ধ্বংস করতে আধুনিক ইন্ডিয়া আজও খুব চেষ্টা করে চলেছে। কিন্তু আজও তাদের সেই প্রযুক্তির অক্ষ হৃদয় ভেদ করতে পারে নি। শুধু এক একজন ‘প্রশিক্ষিত’ ধাতুবিদ নিজেদের মত করে পরম্পরার প্রযুক্তি কেন জংছাড়া আর পশ্চিমি প্রযুক্তি কেন নয়, সে বিষয়ে তত্ত্ব খাড়া করে চলেছেন – নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে কর্পোরেটরা তত্ত্ব ছড়াতে অতীব দক্ষ। হাতে মারতে না পেরে ফলে তাদের ভাতে মারা চেষ্টা চলছে। যেভাবে মসলিনের প্রযুক্তি ধ্বংস করা হয়েছে সমূলে, সেই কায়দায় চেষ্টা চলছে জং ছাড়া লোহা পণ্য তৈরির প্রযুক্তি ধ্বংসের। এখোনো লোহা প্রযুক্তি বোঝাই গেল না, ধ্বংসও করা গেল না। ফলে উৎপাদন ব্যবস্থা ধ্বংস করতে না পেরে বাজার দখল করে, জীবনধারণের চরিত্র বদল করে, সেটা ধ্বংস করার উদ্যম নিয়েছে কর্পোরেট ভারত। ‘সহৃদয়’ প্রশাসকেরা যাযাবর এই সমাজের মানুষদের দুঃখ দেখতে না পেরে বাংলার দুটি এলাকায় বসিয়ে দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলেছেন – ফলে হাজার হাজার বছরের যাযাবর চরিত্র থেকে গৃহী হতে গিয়ে মোটামুটি তাদের যাযাবরীয় সংস্কৃতি ধ্বংস। যাদের সঞ্চয়ের কোন প্রবণতাই ছিল না, তাদের গৃহী হয়ে সঞ্চয় করতে হচ্ছে। সেই পরিবর্তন তাদের উৎপাদনের ওপর নিদারুণ প্রভাব ফেলেছে।

এইভাবে রাষ্ট্র, বড় পুঁজির হয়ে নানান ভাবে গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থা ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছে। চরম দক্ষ ডোকরা কামার প্রযুক্তিবিদেরা তাদের অন্যতম লক্ষ্য। এই মানুষেরা আগে মাটি থেকে লোহাচুর বেছে পণ্য তৈরি করতেন, জঙ্গলের তেল আর মধু উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করতেন, না হলে গ্রামে গ্রামে গিয়ে গৃহীর বাতিল তৈজস ইত্যাদি থেকে নতুন জিনিস বানাতেন। আজ তারা তাদের কাঁচামালের এবং তারা গৃহী হয়ে উতপন্ন দ্রব্যের জন্য সরাসরি স্থানীয় ধাতু মহাজনের কাছে বাঁধা। 

টাকা বাতিলের চক্করে পুরো উৎপাদন ব্যবস্থাটাই দাঁড়িয়ে পড়েছে। ধাতু কেনা তো রয়েইছে, আর রয়েছে চুল্লি চালানোর জন্য কয়লা। সেটা নগদে করতে হয় – একবার ধার হল, দুবার হল, তার পর? অন্যান্য গ্রামীণ উৎপাদনের তুলনায় তারা স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে পড়ায়, তাদের পণ্যের চরিত্র গেছে পালটে। তারা তৈজস গলিয়ে গৃহীদের নানান জিনিস তৈরির কাজ স্থায়ী বসত হয়ে যাবার পর আর করতে পারেন না। অন্যান্য গ্রামীণ উৎপাদক যখন তার নিজের কাঁচামাল, নিজের হাটের, গঞ্জের বাজার ধরে বেঁচে থাকেন, ডোকরা কামারেরা বেঁচে থাকেন শহরের বাজারের দাক্ষিণ্যের ওপর। বাড়ি ঘরদোর ব্যবস্থা রাখতে আগামী দিনের জন্য সঞ্চয় করতে হয় – যা তার যাযাবর চরিত্রে ছিল না, সে সারা দিনের রোজগারেই বেঁচে থাকতে পারত। সরকারি নিদান অনুযায়ী বাবুদের বাড়ির বেশ দামি পণ্য তৈরি করেন তারা এখন – অনেকগুলি দেখনদারি।  সেগুলি মূলত উচ্চভদ্রলোকিয় বাজারের বিক্রির জন্য। 

তাই টাকা বাতিলের নীতিতে তাদের উৎপাদনের অসুবিধেগুলো ছেড়েই দিন, মধ্যবিত্ত এই কুড়ি দিন টাকার পিছনে দৌড়োচ্ছে, তার আর ডোকরা কামারের কাজ দেখার/কেনার ফুরসত কোথায়? ফলে হস্ত শিল্পের বাজারে যে কারিগরটি লাখ খানেক টাকা নিয়ে যেত বাড়িতে মেলার ২০ দিন বাদেও তার হাজার পাঁচেক টাকা বিক্রি হয়েছে কিনা সন্দেহ। আর যারা বাঁকুড়া, পুরুলিয়া আর বর্ধমানের বাজারে বসে রয়েছেন, তাদের অবস্থা? এক জন দুজন ব্যতিক্রম বাদ দিলে ডোকরা কামারের বাজার খুব খারাপ। সে বাজার ওঠা সম্প্রতি ভবিষ্যতে খুব কঠিন।


তত্ত্ব

বাঙলা তথা ভারতের পরম্পরার গ্রাম উৎপাদক-বিতরকেরা মূলত শূদ্র-বৈশ্য সম্প্রদায়ের। সমগ্র ভারতের শূদ্র-বৈশ্যরা কয়েক হাজার বছর ধরে ভারতের উৎপাদন-বিতরণ ব্যবস্থা ধরে রেখেছিল, যতক্ষণ না, মীর জাফরের আমলের দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার সময় থেকে বাঙালি ভদ্রশ্রেণীকে কাজে লাগিয়ে এই সামগ্রিক উৎপাদন-বিতরণ ব্যবস্থা উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ধ্বংস করার চেষ্টা করে নি। ১৮০০ সালের বিশিল্পায়ন না হওয়া পর্যন্ত বাঙলা ছিল উদ্বৃত্ত অর্থনীতি, তার সামগ্রিক শ্রেয় যায় এই ছোটলোকেদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, প্রযুক্তি, দক্ষতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা আর বাজারের আধিপত্যের  জন্য। অন্তত উইলিয়াম এডামের শিক্ষা সমীক্ষায় পাচ্ছি, বাংলা-বিহারের বিদ্যা চর্চার জগতে ব্রাহ্মণ আর কায়স্থ নয়, ১লক্ষ ৫হাজার গ্রামে যে ১ লক্ষ পাঠশালা ছিল, সেগুলিতে শূদ্র-বৈশ্য বটুরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ (উইলিয়াম এডামের দেওয়া বটু আর শিক্ষকের বিন্যাসটা শেষে দিলাম। ইচ্ছে হলে দেখে নিতে পারেন, না হলে এড়িয়ে যাবেন)। বৈশ্য-শূদ্রদের উদ্যমের জন্যই লুঠেরা শিল্প বিপ্লব পূর্ব সময়ে ভারত-পারস্য-চিন উৎপাদক অঞ্চলে বাঙলা ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।  

ভারতের ঔপনিবেশিক শহুরে অর্থনীতি কর্পোরেটিয়, পশ্চিমি অর্থনৈতিক, তাত্ত্বিক, তাথ্যিক পক্ষপাতিত্ত্বের নানান ঢক্কা নিনাদ-নিদান সত্ত্বেও, যে সরাসরি গ্রাম বাঙলার অর্থনীতির ওপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল, এ তথ্য আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। যারা এ বিষয়ে চর্চা করেন না, তাদের কাছেও এই বাস্তব অবস্থাটি হয়ত প্রকট। বিপুল চলমান গ্রামীণ অর্থনীতির নিরাপত্তার মোড়কে দাঁড়িয়ে থাকে কর্পোরেট অর্থনীতি। অজ্ঞ, মুর্খ, অশিক্ষিত, গাঁইয়া দাগিয়ে দেওয়া গ্রামীণ অর্থনীতি তার থেকেও কলেবরে বড়, এই ভাবনাটা তার অস্তিত্বের সামনে প্রশ্ন চিহ্ন এঁকে দেয়, অহংএ প্রবল ধাক্কা দেয়। তাই বড় পুঁজির উৎপাদন ব্যবস্থা গাঁয়ের মায়ের আঁচলে বাঁধা একটাকাও দখল করতে চায়। গ্রামে স্বাভাবিক বাজার বিকাশে বহু সময় লাগলে, হোস্টাইল টেকওভারের ধারাবাহিক রণনীতি হয়ে ওঠে তার বাজার জয়ের হাতিয়ার। 

তাহলে প্রশ্নটা হল গ্রামের বাজারটা কত বড়। অন্তত আমাদের সংগঠনের করা সমীক্ষা সূত্রে বলতে পারি ৯ কোটি মানুষের বাংলায় যদি ৬০ লক্ষ পরম্পরার শূদ্র-বৈশ্য উদ্যমী, তাঁতি আর অভিকর শিল্পী থাকেন এবং প্রত্যেককে যদি দৈনিক ৫৫ টাকা করে বছরে অন্তত ২০ হাজার টাকা রোজগার করতে হয়, তাহলে তাকে বছরে অন্তত ১ লক্ষ টাকার ব্যবসা করতে হবে (অনেকে হয়ত এর বেশিই করেন)। এই অঙ্কে বাজারটার ন্যুনতম পরিমাণটা গিয়ে দাঁড়াচ্ছে খুব কম করে ৬০ হাজার কোটি টাকা। বাংলা বাজারে শুধু ৫% পরম্পরার উদ্যমীদের তৈরি ব্যবস্থা। এদের সম্বল পুঁজি নয়, সামাজিক পরম্পরার জ্ঞান, অর্জিত সামাজিক দক্ষতা, নিজস্ব বাজারের প্রজ্ঞা আর গ্রামের শ্রম সম্পদ। তার বাইরে চাষ, অপরম্পরার আরও বিপুল অর্থনীতির পদচিহ্ন রয়েছে। এই বাজারকে সাম্রাজ্যবাদী বড় পুঁজি ছেড়ে দেবেই বা কেন? বামফ্রন্টকে দিয়ে তারা যেমন কলকাতার হাঁটার পথের বাজারটা, মধ্যবিত্তকে ম্যালেরিয়ার ঝুটা ভয় দেখিয়ে খাটাল উচ্ছেদ করে বহুজাতিকের রাসায়নিক দুধের বাজারটা দখল এবং ধ্বংস করতে চেয়েছিল, ঠিক তেমনিই করে গ্রামীণ উৎপাদকেদের বাজারটা দখল করার চেষ্টা চালাচ্ছে নানান পরিকল্পনায়। তারই শেষতম ভারত সরকারের টাকা বাতিলের পরিকল্পনা। টাকা বাতিলের ভারত সরকারের নীতিতে বাংলার গ্রামের ছোট পরম্পরার উদ্যমী, ব্যবসায়ী আর কৃষিতে অবশ্যম্ভাবী প্রভাব পড়েছে এ অভিজ্ঞতা মধ্যবিত্ত ভদ্রমানুষেরা নিজেদের আশেপাশের ঘটনায় চাক্ষুষ দেখছেন। 

শিল্প বিপ্লবীয় লুঠেরা, খুনি, অত্যাচারী, অমানবিক বড় পুঁজির তৈরি করে দেওয়া জ্ঞানচর্চা ভিত্তি করে আমাদের বিশ্বাস জন্মেছে যে বাজার একটা তার চরিত্রও একটা। অথচ বাংলায় গ্রামীণ বাজার বললে এককেন্দ্রিক বাজার ব্যবস্থা বোঝায় না। প্রত্যেকটি বাজার তার নিজস্বতায়, তার ব্যবস্থা বৈচিত্রে, উৎপাদন-বিতরণ বৈচিত্রে একে অপরের থেকে আলাদা। বৈচিত্র্য তার মূল শক্তি, বিকেন্দ্রীভবন তার ভিত্তিভূমি। কেন্দ্রীভূত বড় পুঁজি বৈচিত্র্যে, বিকেন্দ্রীভবনে বিশ্বাস করে না। দুটোই তার অস্তিত্বের চরমতম শত্রু। সে চায় তার তৈরি করা এককেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সারা বিশ্বকে টেনে নিয়ে আসা। সে ছোট অর্থনীতির অসাধারণ জীবনীময় বৈচিত্র্য আর বিকেন্দ্রিকতা অস্বীকার করে তাদের জ্ঞানচর্চায়।

গত আড়াইশ বছরের ঔপনিবেশিক অত্যাচার, লুঠ, গণহত্যা, প্রযুক্তি, জ্ঞান, বাজারকে ধ্বংস করেও সে এই গ্রামের অর্থনীতিতে আধিপত্য বাড়ানোর কাজটি করে উঠতে পারে নি। যদিও তার জন্য সে কখনো গণহত্যার পরিবেশ তৈরি করেছে (ছিয়াত্তর/পঞ্চাশ), কখনো সরাসরি গ্রামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে (ফকির-সন্ন্যাসী স্বাধীনতা সংগ্রাম, ঘড়ুই স্বাধীনতা সংগ্রাম, খয়রা মাঝি স্বাধীনতা সংগ্রাম, চাকমা স্বাধীনতা সংগ্রাম, নীল ও আফিম চাষী স্বাধীনতা সংগ্রাম, মালঙ্গী স্বাধীনতা সংগ্রাম, পাহাড়িয়া স্বাধীনতা সংগ্রাম, সুবান্দিয়া স্বাধীনতা সংগ্রাম, নায়েক স্বাধীনতা সংগ্রাম, গারো স্বাধীনতা সংগ্রাম, ওয়াহাবী স্বাধীনতা সংগ্রাম, ফরাজী স্বাধীনতা সংগ্রাম, সাঁওতাল-মুণ্ডা স্বাধীনতা সংগ্রাম, সিপাহি স্বাধীনতা সংগ্রাম ইত্যাদির বিরুদ্ধে ভদ্রলোকেদের সামনে রেখে নিয়ে যুদ্ধ), কখনো পরোক্ষ-প্রত্যক্ষ উচ্ছেদ করেছে (স্বাধীনতার পরে নেহরুর আমল থেকে মোদির আমল পর্যন্ত, হকার, খাটাল, রাজারহাট, সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম...), কখনো কর্পোরেটদের লুঠের ক্ষেত্র তৈরির জন্য বড় পুঁজির বাহক ব্যাঙ্ক গ্রামে ঢুকতে না পারলে তাকে রাষ্ট্রীয়করণ করে গরীব মানুষের ওপর কর চাপিয়ে গ্রামে ঢোকানোর ব্যবস্থা করেছে, এবং সম্প্রতি কৌশল খাটিয়ে মানুষের গচ্ছিত সঞ্চয়কে কালো টাকা হিসেবে দেগে, রাষ্ট্রের কবলে নিয়ে এসে তা দিয়ে কর্পোরেট পরিকল্পনা সফল করেছে। 

শেষতম ধ্বংসাত্মক ক্রিয়াটির আগে সে যে গ্রামের অর্থনীতি বানচাল করতে খুব একটা সফল হয়েছে তা বলা যাবে না, নইলে সে মাথা খাটিয়ে সেনা শাসিত রাষ্ট্রের নীতি অবলম্বন করে, সর্বব্যপ্ত টাকা বাতিলের নীতি প্রয়োগ করে গ্রামীণ অর্থনীতিকে বড় পুঁজির অর্থিনীতিতে জোড়ার আপ্রাণ চেষ্টা করত না। এই রণনীতি নানান ধরণের হতে পারে – তার জনমুখী মুখোশও থাকে বহু সময়। যেমন পরম্পরার গ্রাম উৎপাদন কেটেছেঁটে শহুরে বাজারে বিক্রি করতে দিল্লিতে একটি আস্ত মন্ত্রক বরাদ্দ হয়েছে স্বাধীনতার পর থেকে। সেই সরকারি প্রকল্পে গ্রাম বাজার বিমুখ অ-পণ্য তৈরি হচ্ছে। গ্রামকে মেনস্ট্রিমের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় যোগ্য করে তুলতে বহু প্রকল্পে প্রচুর অর্থ খরচ হচ্ছে। কাজের কাজ খুব একটা কিছু হচ্ছে কীনা বোঝা যাচ্ছে না। গ্রামীণদের অংশগ্রহণও খুব কম। স্বাধীনতার পর ভারতে শুরু হয়েছিল টেকনলজি ট্রান্সফার প্রকল্প। ইওরোপ-আমেরিকা-জাপান প্রযুক্তির ঋণ নিয়ে দাঁড়াল রাজনেতা, আমলা, ব্যবসায়ী, স্বেচ্ছাব্রতীদের সামনে। উদ্দেশ্য তিনটে পাখি মারা - এক, পশ্চিমি প্রযুক্তি সর্বশক্তিমান, আধুনিক এবং সর্বরোগহর, এই দর্শন গাঁয়ে পৌঁছে দেওয়া গেল। দুই, যতটুকু দেশিয় প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা টিকে ছিল, তাকে প্রাচীণ, গ্রামীণ, পারম্পরিক, প্রিমিটিভ দেগে, উচ্ছেদ করে সসম্মানে জাদুঘরে সাজানোর প্রকল্প জুটল। শিক্ষিত শহুরেদের জন্য গ্রাম সংস্কৃতি, প্রযুক্তি, অর্থনীতি মারার জন্য লোকসংস্কৃতি গবেষণার, জাদুঘর ব্যবস্থাপনার, নানান এনজিও কর্মের, নানান বিদ্যালয়ে শহুরে শিল্পবিপ্লবীয় তত্ত্বে গ্রাম ব্যবস্থা বিশ্লেষণের সমাজতত্ত্ব, অর্থনীতির, নৃতাত্ত্বিক ইত্যাদি চাকরি, গবেষণা, মাঠ কর্মীর পদ তৈরি হল। তিন, পশ্চিমি যন্ত্রপাতির বাজার শহর ছাড়িয়ে গ্রামে তৈরি হল। শাঁখের করাত। প্রাচীণ যন্ত্রটি প্রায় কাজ হারিয়েছে। এসেছে বিদ্যুতে চলা কাটাই যন্ত্র। বহু ছোট শাঁখারি উচ্ছেদ হচ্ছেন। ড্রিল মেশিনে সূক্ষ্ম কাজ অসম্ভব। নষ্ট হচ্ছে বাজার। বিদেশি বাতিল যন্ত্রে দেশি প্রযুক্তির সর্বনাশ। 

আমরা যে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, যে নামেই এই লেখাটা তৈরি করা হচ্ছে, সেটি মূলত বাঙলার পরম্পরার বৈশ্য-শূদ্র উদ্যমীদের তৈরি – যাদের ঔপনিবেশিক ভদ্রলোক বাঙালি ভালবেসে মৃতপ্রায় লুপ্রপ্রায় হস্তশিল্পী ডেকে থাকে। এই উৎপাদন এবং বিতরণ ব্যবস্থার মূল চরিত্র হল সেটির কোন কেন্দ্র নেই, হাজারো উৎপাদক হাজারো বিক্রেতা। বিপুল পরিমান আর্থব্যবস্থা, কিন্তু সেই ব্যবস্থা জাত লাভ কিছু মানুষের হাতে জড়ো হওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ থাকে না। এই ব্যবস্থার প্রযুক্তি উৎপাদক এবং বিতরকেদের নিজস্ব, তার জন্য অন্তত এদের অজানা অচেনা কাউকে যন্ত্রের দামের বাড়তি (যার একটা পেটেন্টের জন্য ব্যয় হয়) গাঁটের কড়ি গুণতে হয় না। যন্ত্র খারাপ বা পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে, হয় নিজেরা বা এলাকার প্রযুক্তিবিদেরা সারিয়ে নিতে পারেন। যন্ত্র চালাতে তার যে শক্তি প্রয়োজন হয়, সেটি হয় সে নিজের বা সামাজিকভাবে তার এলাকাতেই পাওয়া যায়। যন্ত্র আর শক্তি দিয়ে এই উৎপাদন ব্যবস্থাকে কর্পোরেট অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। কাঁচামালেও নয়। কাঁচামাল মূলত মেলে তার নিজস্ব এলাকায়, কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে। বাজার মূলত তার নিজস্ব। জানা। বাজার তাকে নিয়ন্ত্রণ করে না, সে বাজারের অংশিদার। যদি কিছু উদ্বৃত্ত তৈরি হয়, তা সে বিক্রি করে বিদেশি (তার এলাকার বাইরের) বাজারের জন্য। রয়েছে গ্রামে থাকার সামাজিক নিরাপত্তা বোধ। পূর্বজদের থেকে পাওয়া যে জ্ঞান, সেই জ্ঞান তার পরবর্তী প্রজন্মকে কিনতে হয় না। স্থানীয় জ্ঞান, বংশপরম্পরার বয়ে যায় তার মত করে। সে জ্ঞান বিক্রি করে না, বইয়ে দেয় – হয় তার পরিবার না হয় তার সমাজে। পরিবারে থাকলেও সেটি তার সমাজেই থাকে। আর যেহেতু বিনিয়োগ উৎপাদন-বিতরণ ব্যবস্থার অন্যতম খুঁটি নয়, বড় পুঁজির হয়ে বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রক, ব্যাঙ্ক তাকে নিয়ন্ত্রণ করে না। উল্টো দিকে এমএসএমই উৎপাদকেরা মূলত বড় পুঁজির অনুসারী শিল্প। তার ছোটখাট যারা নিজের কোমরের জোরে বাজার করেন, তাদের উৎপাদনের জন্য নির্ভর করতে হয় বড় পুঁজির সরবরাহ করা শক্তি, কাঁচামাল, প্রযুক্তি আর ‘শিক্ষিত’ শ্রমশক্তির ওপর, বাজার মূলত বড় পুঁজির নিয়ন্ত্রণে, ছোটখাট ব্যতিক্রম বাদ দিলে। পুঁজি প্রযুক্তি/কাঁচামাল/পণ্যের প্রকৃতি পাল্টালে উদ্যমীর মাথায় হাত। তাকে আবার ব্যাঙ্কে গিয়ে নিজের উৎপাদন ব্যবস্থা বা সম্পদ বাঁধা দিয়ে টাকা ধার করে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত শ্রমশক্তি কিনতে হয়, না হলে তার উৎপাদন বন্ধ করে দিয়ে চুপচাপ বসে যেতে হয়। এমএসএমইর নিয়ন্ত্রক বড় পুঁজিই। তার উৎপাদন-বিতরণের অন্যতম যোগ্যতা সে ব্যাঙ্কেবল কি না, অর্থাৎ বড় পুঁজির ব্যবস্থাপকেরা তাকে ঋণ দেওয়ার উপযুক্ত ভাবছে কি না। সেই দায় পরম্পরার অর্থনীতির নেই। 

অথচ শিল্পবিপ্লবপরবর্তী সময়ে যে সব শিল্পপরিচালন ব্যবস্থার আগ্রাসী দখলদারি নীতিমালা ধীরে ধীরে তৈরি হয় সারা বিশ্ব জুড়ে, সেগুলি এশিয় উৎপাদন ব্যবস্থায় ছিল না। একজন উৎপাদক অন্য উৎপাদক/দের উৎপাদন তার/তাদের অনিচ্ছেয় কিনে নিতে পারবে (হোস্টাইল টেকওভার), এই গায়ের জোয়ারি, সাম্রাজ্যপ্রভুসুলভ ব্যবস্থাপনার অস্তিত্ব ছিলই না এশিয়-ভারতীয়-বাংলার উৎপাদন জগতে। অথচ বাংলা জুড়ে ছিল উৎপাদকেদের ছিল বিপুল আড়ৎ, যেখানে উৎপাদকেরা প্রায় সমবায় প্রথায় নিজের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় রেখে উৎপাদন করতে পারতেন। 

স্বাভাবিকভাবেই শূদ্র-বৈশ্যদের তৈরি উৎপাদন-বিতরণ ব্যবস্থা কর্পোরেট উৎপাদন ব্যবস্থার তত্ত্বের বিপরীতে দাঁড়িয়ে। এদের কোন কেন্দ্র নেই। সেই আর্থব্যবস্থা স্থানীয় অর্থনীতিকে জোরদার করে, স্থানীয় শ্রম বাজারকে চাঙ্গা করে। প্রত্যেক বাজার অন্য বাজারের চরিত্র থেকে আলাদা। প্রত্যেক বাজারের উৎপাদন, বিনিময় চরিত্র, লেনদেনের চরিত্র আলাদা। চাইলেই বড় পুঁজি ইকনমিক হিটম্যান সেজে দূর বাজারের চরিত্রের ছোট অদলবদল ঘটিয়ে গোটা গ্রাম বাজার মেরে ফেলতে পারে না।  একটা বাজারে জেনেশুনে কোন দুষ্কর্ম ঘটিয়ে দিলে অন্য বাজারে তার খুব বেশি প্রভাব পড়ে না। আর যদি কিছু প্রভাবও পড়ে তা সে তার বিকেন্দ্রীকৃত, উৎপাদন-বিতরণের চরিত্রের জন্য সমস্ত অত্যাচার সহ্য করে নিয়ে গা ঝেড়ে উঠে দাঁড়াতে পারে নতুন করে। বড় পুঁজি সেটা জানে। সেই ১৭৫৭র পর থেকে সে তার প্রধান শত্রু গ্রামীণ ছোট উদ্যোগকে আঘাত করে তার বাজার এবং উৎপাদন-বিতরণ ব্যবস্থাকে ধ্বংস, না হলে আত্তীকরণ করে নেওয়ার চেষ্টা করেছে, নিজের অস্তিত্ব রক্ষার, বাজার বাড়াবার জন্য।

নোট বাতিল গ্রাম উৎপাদন বিরোধী যুদ্ধের শেষতম কর্পোরেটিয় উদ্যম। গ্রামের উৎপাদন ব্যবস্থার যতটুকু স্বাতন্ত্র্য রয়েছে তাকে কেড়ে, তাকে অস্থির লুঠেরা অর্থনীতির অংশ করে এবং জুয়াড়ি পুঁজিবাদের অংশ করে নেওয়ার চেষ্টা, যাতে যে কোন সময়ে মুহূর্তের ইঙ্গিতে তাকে ধ্বংস করে দেওয়া যায়। সোজা গ্রামীণ শিরদাঁড়াকে বেঁকিয়ে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে দেওয়া যায় গলবন্ধপরা বড় পুঁজির ব্যবস্থাপকেদের সামনে, গ্রামের শেষ উদ্বৃত্তটুকু চেঁছে পুঁছে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দেওয়া যায় অনিশ্চিত ভবিষ্যতে। 


তো শুরুতে এই তিনটে উৎপাদন ব্যবস্থা আমরা দেখলাম, তার পরে তার তত্ত্বটাও দেখার চেষ্টা করলাম। পড়ে যাওয়া বাজার আরও গাড্ডার দিকে চলে যাচ্ছে বুঝলাম। 

তবুও...

এখানেই আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এল। সত্যি কি এই বাজারটা ধ্বংস হয়ে যাবে? কর্পোরেটরা জিতে যাবে?

আমরা যারা এই কারিগরদের হাতে তৈরি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, মনে করি অতীতের মতই দখলদারির ব্যাপারটা খুব সহজ হবে না, এ লড়াই দীর্ঘদিন ধরে চলছে – এবং যে লড়াই মোদি নতুন করে শুরু করলেন লড়াই দীর্ঘস্থায়ী হবে। প্রত্যেকবার লড়াইয়ে বড় পুঁজি, গেঁয়ো পাঁকাল মাছের অর্থনীতিটি ধরতে বহু কাঠ খড় পোড়ায়। তার ব্যবস্থায় ধাক্কা লাগে, প্রচুর ক্ষয় ক্ষতি হয় – ব্যবস্থাপক মধ্যবিত্তের ওপরে ঝড়ঝাপটা আসে। কিন্তু চূড়ান্ত দখলদারির চরিত্র থেকে এই পরিকল্পিত ঝুঁকিটা বারবার নিয়েই থাকে – মারি তো গণ্ডার লুটি তো ভাণ্ডার – মার দিয়া কেল্লা তার মানসিকতায়। বড় পুঁজি ফাটকা চরিত্রে ঢুকে পড়ার আগে থেকেই ভদ্রলোকেদের সঙ্গী করে গ্রাম দখল আর লুঠের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিছুটা হয়ত সফল হচ্ছে, কিন্তু সে সাফল্য সীমাবদ্ধ এবং খুব ধীরগতি। গ্রামীণ অর্থনীতিটা এতই আস্তে, এতই আস্তে পাল্টাচ্ছে, সেই পরিবর্তনের প্রভাব সে বোধহয় আর সে চোখে দেখতে পাচ্ছে না, তার অর্থনীতিতে বুঝতে পারছে না – অসম্ভব অধীর হয়ে পড়ছে – এই পরিবর্তনটা সে আরও দ্রুত দেখতে চায় – ট্যানজেবল রেজাল্ট কোয়ান্টিফাই করা দরকার তার – ফলে আজই তার চাই ক্যাশলেস অর্থনীতি যাতে কর্পোরেট চিনা, আমেরিকা, ইওরোপিয় বড় পুঁজি প্রত্যেকটি কার্ড ঘষা থেকে কমিশন পায়। 

তাতে আনেকগুলো কাজ একসঙ্গে সমাধা হয় – ১) স্থানীয় বাজার আর বিশ্ব বাজারের ধাক্কা থেকে আলাদা থাকে না। ফলে মায়ের আঁচলের একটাকা দখলের মতই সেই ছোট ছোট বাজারগুলোর ওপর দখলদারি বজায় রাখতে পারে। ২) স্থানীয় কাঁচামালের এবং বিক্রির বাজার একদা মীর জাফরের সময় ব্রিটিশ বড় পুঁজি গায়ের জোরে দখল নিয়েছিল, ঠিক তেমনি করেই, গাঁয়ের এজমালি এলাকার সম্পদ, জঙ্গল জাতি রাষ্ট্রের ভূমিসংস্কারের ধাক্কার পরে যতটুকু বেঁচে রয়েছে, তাও দখল হবে যদি বাজারটাকে উথালপাথাল করে দেওয়া যায়। ছোট উৎপাদকের কাঁচামাল কেনা আর উৎপাদন বিক্রি কাজ বড় পুঁজিকে ছাড়া আর চলবে না। ৩) তার ঘাম ঝরানো সম্পত্তি যদি ব্যাঙ্কের হাতে চলে যায় প্লাস্টিক টাকার ব্যবহার জোর করে করানোর মাধ্যমে, তাহলে আর কোন ঝামেলা নেই, মুহূর্তেই ব্যাঙ্ক ফেল করতে পারে, ফাটকার শেয়ার বাজার ধ্বসে যেতে পারে, ব্যাঙ্কের একাউন্ট হ্যাক হয়ে সেই টাকা ফাঁকা হতেই পারে। বড় পুঁজির ইচ্ছে, তার কারিকুরিতে গ্রামের একটাও স্বেদবিন্দুর কামাই গ্রামে থাকবে না, চলে যাবে দিল্লির দালাল হয়ে বেজিং বা নিউ ইয়র্ক। 

এই পরিকল্পনা কি সত্যিই ফলবে? এটাই এখন আমরা যারা এই ধরণের ব্যতিক্রমী মানুষের সংগঠনের সঙ্গে জুড়ে রয়েছি, তাদের প্রশ্ন। 

খুব ছোট ভাবে বলি, আমাদের ধারণা খুব সহজ হবে না। এগুলি গ্রামীণদের উৎপাদন-বিতরণ ব্যবস্থার চরিত্রের জন্যই এত তাড়াতাড়ি ঘটবে না। গ্রামীণ চরিত্রটাই কর্পোরেট পুঁজির তৈরি করে দেওয়া জীবনযাত্রার ছকের উল্টো। তাছাড়া এরা রক্তবীজের বংশধর। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ শক্তি নেই। বড় পুঁজি নেতা চায়, যাকে দিয়ে তারা তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। একটা বড় এনজিও গ্রাম উৎপাদকেদের সঙ্গে বাংলায় কাজ করছে ইওরোপিয়দের বিপুল আর্থিক সাহায্য নিয়ে। তারাও পরিবর্তন যাত্রায় খুব বেশি দাঁত ফোটাতে পারছে না। সেবাটেবা দিয়েই তার কাজ সমাপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এনজিওরা তাদের হাতে গোণা নির্দিষ্ট সংখ্যক বেনিফিসিয়ারির বাইরে বেরোয় না। গ্রাম নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনায় কাঠি হচ্ছে। কর্পোরেট ঘোমটা পরা এনজিওদের দিয়ে আর হবে না, তার একটা ইঙ্গিত রয়েছে বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টে। সেই কাজ সোজাসুজি কর্পোরেট নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। তার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ভারত সরকার গ্রামীণ উৎপাদক চাষীদের খুব ঘটা করে ব্যাঙ্ক একাউন্ট, কার্ড করে দিয়েছে। কিন্তু গ্রামীণেরা আরও চালাক। তারা হয়ত বছরে একবারও ব্যাঙ্কে যায় না। ডেবিট কার্ড আছে। সেটা সব থেকে ভাল ইংরেজি জানা উৎপাদকেরও আলমারিতে তোলা থাকে তালাচাবি মেরে। 

ধার দেওয়ার জন্য বন্ধন ঋণ সংগঠন তৈরি করে দিয়েছিল। তারা ঘাড় ধরে টাকা আদায় করত – সুদ? জিগায়েন না কত্তা। বন্ধন নামেই গ্রামে এখোনো আতঙ্ক ছড়ায় – হপ্তান্তে বন্ধনের নাম শুনলেই বৌ-ঝিদের রক্ত হিম হয়ে যায়। গ্রামে বড় পুঁজি তাদের কাজ দেখে খুশ হয়ে ব্যাঙ্ক বানিয়ে দিয়েছে, যাতে তারা আরও বড় ভাবে গ্রামের টাকাটা লেপেপুঁছে আনতে পারে। রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাঙ্ক ইন্দিরা-সিপিআই জামানার পরে গ্রামে ঢুকেও গ্রামীণ মধ্যবিত্তকে সেবা দেওয়া ছাড়া বড় পুঁজির খুব বেশি সেবা করতে পারে নি। ছোট ঋণ সংগঠনের শিশুমৃত্যুর হার খুব বেশি। বড় বড় কর্পোরেট চাকরি ছাড়িয়ে, বড় পুঁজি তাদের সেবা করা সেরা মাথাদের নিয়োগ করেছিল গ্রামের সম্পদ দখলে ছোট ঋণ সংগঠনে। বহু ছোট ধার দেওয়া সংগঠন থেকে সারভাইভ্যাল অব দ্য ফিটেস্ট থেকে বেছে নিয়েছে বন্ধনকে। খুব বেশি কেউ পারে নি – পারল একমাত্র বন্ধন। তারাই কর্পোরেটদের একমাত্র বাজি।

দিল্লিতে তৈরি হয়েছে ক্রাফটস রিভাইভ্যাল কাউন্সিল। তাদের উদ্যমে গ্রামে ছোট উৎপাদকের সংখ্যা কমিয়ে আনার প্রকল্প শুরু হয়েছে অল ইন্ডিয়া আর্টিজান এন্ড ক্রাফ্টওয়র্কার্স ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন তৈরি করে। পেছনে ফ্যাব ইন্ডিয়ার প্রাক্তন প্রধান উইলিয়ম বিসল, ফ্যাশন ডিজাইন কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার ডিরেক্টর জেনারেল রতি বিনয় ঝা, দস্তকরের প্রধান লয়লা তয়বজী প্রমুখ। সংঘ জুড়ে আছেন বিদেশে পড়াশোনা, কর্পোরেটে চাকরি করে আসা যুবা, কর্পোরেটিয় কেষ্টুবিষ্টু আর ভারতের ব্যবসায়ী দালালেরা। বিপুল সাহায্য আসছে ফোর্ড ফাউন্ডেশন, ইওরোপিয়ান ইউনিয়ন, ইবে ফাউন্ডেশন, ফ্যাবইন্ডিয়া, দোরাবজী টাটা ট্রাস্ট, দুর্নীতিতে ডুবে থাকা রয়েল ব্যাঙ্ক অব স্কটল্যান্ডএর মত কর্পোরেট দাতাদের থেকে। শুরু হয়েছে ক্রাফ্টমার্ক প্রকল্প। এরা শংসাপত্র দেবে দেশের কোনটা পরম্পরার উৎপাদন আর কোনটা নয়, মুদ্রারাক্ষসের বিনিময়ে। কর্পোরেট স্বেচ্ছাব্রতীরা বড় পুঁজির স্বার্থ দেখে। টাকার বিনিময়ে সংঘের স্বাক্ষরে গ্রামশিল্পীদের ভবিষ্যত তৈরি হচ্ছে। এটি সরকারি প্রকল্প নয়। সামাজিক দায়বদ্ধতাও নেই। অর্থবলে আর ক্ষমতার অলিন্দে ঘোরাফেরা করা এই সংঘটি প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে সরকারগুলোকে।  

শুধু টাকা বাতিল নয়, ভেতরে ভেতরে ক্রাফটমার্ক প্রকল্পের মত নিরব উচ্ছেদের কর্মসূচী নিয়ে কর্পোরেট ইন্ডিয়া চেষ্টা চলছে এই অর্থনীতির পাঁজর ভেঙ্গে দেওয়ার। তবুও এই রক্তবীজের বংশধরেরা বড় পুঁজির বিরুদ্ধে দাঁত কামড়ে লড়াই দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের মত করে। আমরা যেন মনে রাখি সারা বিশ্বে অসম লড়াইতে কিন্তু কর্পোরেট লুঠ, অত্যাচার, খুন শেষ পর্যন্ত জেতেনি – ভিয়েতনামে, আফগানিস্তানে, ইরাকে বা সিঙ্গুর নন্দীগ্রামে, নিকারাগুয়ায়, কিউবায় তাদের মাথা নামিয়ে আবার বোর্ডরুমে ফেরত যেতে হয়েছে, নতুন করে অস্ত্র শানাতে। সংবাদমাধ্যমে কাজ করা অনুগত মধ্যবিত্ত চেষ্টা করে বোঝাতে যে, কর্পোরেটরা অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে, তাদের রোখার ক্ষমতা কারোর নেই। মধ্যবিত্ত জগতে এমন একটা বাস্তব, তাত্ত্বিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাস্তব অন্য কথা বলে – ভারতে এশিয় উন্নয়ন ব্যাঙ্কের ৪৬০টা প্রকল্পের মধ্যে ৪০০ বেশি প্রকল্প, বা চিনের নতুন রেশমপথ প্রকল্পের বিশাল দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা তৈরির বিনিয়োগ বিশ্বের প্রায় সব দেশে দাঁড়িয়ে পড়েছে গ্রামীণদের বিরোধিতায়।

টাকা বাতিল ঘটনায় হয়ত গ্রামীণ উৎপাদন-বিতরণ ব্যবস্থার দুটো পা ভেঙ্গেছে, কিন্তু তাকে মেরে ফেলতে পারে নি। তারা আবার সেরে উঠে দাঁড়াবে, লড়াই দেবে। বড় পুঁজির বিজয় এত তাড়াতাড়ি হবে না – হয়ত হবেই না শেষ পর্যন্ত। কোথাও একটা গ্রামীণ পরম্পরার বিশ্বাস কাজ করে। হাজারটা গাছ উপড়ে ফেললে একটা জঙ্গল উজাড় হয়ে যায়, কিন্তু লক্ষ-হাজারটা ঘাস উপড়োলেও তৃণভূমি শুকিয়ে যায় না। এটাই  ইতিহাসের শিক্ষা। শেকড়ের প্রত্যয়। তাকে মেরে ফেলা কঠিন। 



উইলিয়াম এডামের শিক্ষা সমীক্ষা। 

সমীক্ষা জমা করেন তিন দফায়। ১৮৩৫-৩৮ পর্যন্ত সময়ে।

সেখানে তিনি জেলাওয়ারি পাঠশালার কিছু তথ্য উল্লেখ করেছেন। সেগুলি তুলে দেওয়া গেল।

এটি ভারতের একমাত্র শিক্ষা সমীক্ষা, যেটি মেকলের প্রস্তাবের বাইরে বেরিয়ে স্থানীয় ভাষায় পড়াশোনার নিদান দিয়েছিল। তার পরে একটাও শিক্ষা সমীক্ষা সেই পথে হাঁটে নি।

 

বর্ধমান

কতগুলি বিদ্যালয়

বাংলা ৬৩৯টি, ১৯০টি সংস্কৃত, ৯৩টি পার্সি, ৩টি ফর্মাল আরবি, লার্নেড আরবি ৮টি, ইংরেজি ৩, মেয়েদের ৪, শিশুদের ১। মোট ৯৩১টি। 

শিক্ষকদের জাতি 

কায়স্থ ৩৬৯, ব্রাহ্মণ ১০৭, সদগোপ ৫০, আগুরি ৩০, বৈষ্ণব ১৩, তেলি ১০, ভট্ট ৯, গন্ধবণিক ৬, কৈবর্ত ৫, চণ্ডাল ৪, কুমার ৩, নাপিত ৩, সুবর্ণবণিক ২, গোয়ালা ২, বাগদি ২, নাগা ১, তাঁতি ১, দৈবজ্ঞ ১, বৈদ্য ১, যুগি ১, বারাই ১, কামার ১, মারায়া ১, ধোবা ১, রাজপুত ১, কালু ১, শুঁড়ি ১

শিক্ষকেরা গড়ে ৩টাকা ৪পয়সা ৯ পাই পাচ্ছেন মাসে (এই টাকার ক্রয় ক্ষমতা কত দেখা যাক। এই সময়ের একটু আগে মূল্যবৃদ্ধির গড়, কলকাতায় ১৮২০ সালে বিদ্যাসাগর মশাইএর পিতা ঠাকুরদাস মাসে ২ টাকা রোজগার করে বাড়িতে মায়ের কাছে টাকা পাঠাবার মত স্বচ্ছল ভাবছেন)।

ছাত্রদের জাত তালিকা

ব্রাহ্মণ ৩৪২৯, কায়স্থ ১৮৪৬, সদগোপ ১২৫৪, আগুরি ৭৮৭, গন্ধবণিক ৬০৬, তেলি ৩৭১, গোয়ালা ৩১১, ময়রা ২৮১, কামার ২৬২, সুবর্ণবণিক ২৬১, তাঁতি ২৪৯, তামলি ২৪২, কৈবর্ত ২২৩, কলু ২০৭, তিলি ২০০, নাপিত ১৯২, বৈষ্ণব ১৮৯, শুঁড়ি ১৮৮, ক্ষত্রিয় ১৬১, বাগদি ১৩৮, যুগি ১৩১, বৈদ্য ১২৫, সুতার ১০৮, কুমার ৯৫, স্বর্ণকার ৮১, ডোম ৬১, চণ্ডাল ৬১, ছত্রি ৩৫, কাংস্যবণিক ৩৪, দৈবজ্ঞ ৩৩, বারাই ৩২, জালিয়া ২৮, স্বর্ণবণিক ২৭, মালি ২৬, ধোবা ২৪, রাজপুত ২১, বাইতি ১৬, মুচি ১৬, ভট্ট ১১, হাড়ি ১১, অগ্রদানি ৮, কুর্মি ৮, তিয়র ৪, কুঁয়ার ৩, লাহারি ৩, গারার ২, কাহার ২, মাল ২, কাণ্ডা ১, মাটিয়া ১, পাশি ১।

  ১৩টি মিশনারি বিদ্যালয় ৬১৬টি দেশিয় বিদ্যালয়
কালু ৩৩ ১৭৪
শুঁড়ি ২০ ১৬৮
বাগদি ২১ ১১৭
ডোম ৫৮
চণ্ডাল ৬০
জেলিয়া -- ২৮
ধোবা ১৯
মুচি -- ১৬
হাড়ি -- ১১
তিওড়
লাহারি --
গারার --
কুলহার --
মাল --
মাটিয়া --
পাসি --

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

দক্ষিণ বিহার

হিন্দি ২৩৬, সংস্কৃত ১৭, পার্সি ২৭৯, আরবি ১২, ইংরেজি ১।

শিক্ষক কায়স্থ ২৭৮, মগধা ২, গন্ধবণিক ১, তেলি ১, কইরি ১, সোনার ১।

গড় মাসিক রোজগার ১টাকা ১০ আনা।

ছাত্রদের জাতি গন্ধবণিক ৫৪০, মগধা ৪৬৮, তেলি ২৭১, ব্রাহ্মণ ২৫৬, কায়স্থ ২২০, কোইরি ২০০, রাজপুত ১৫০, কাহার ১০২, হালুয়াইকর ৬৬, শুঁড়ি ৫৬, কুর্মি ৫৫, স্বর্ণকার ৫১, মাহুরি ৪২, নাপিত ৩৯, গোয়ালা ৩৮, বারহাই ৩৫, সুবর্ণবণিক ৩১, দোসাদ ২৩, পাশি ২২, আগুরি ২১, লুনিয়ার ২১, কাংস্যবণিক ২০, ক্ষত্রিয় ১৮, কালাওয়ার ১৮, মালি ১৬, তামলি ১৬, ভট্ট ১৫, বাণাওয়ার ১৪, সন্ন্যাসী ১৪, লোহার ১৩, লাহারি ১৩, কুমার ১০, কাণ্ডু ৯, যুগি ৮, বেলদার ৮, বুন্দেলা ৪, পাটোয়ার ৪, বৈষ্ণব ২, খটকি ২, ছত্রি ১, তাঁতি ১, বারাই ১, বাইতি ১, ধোবা ১, মুশাহর ১, চুরিহারা ১, কায়ালি ১, মাহালা ১।

 

ত্রিহুত

হিন্দি ৮০, সংস্কৃত ৫৬, পার্সি ২৩৪, আর্বি ৪।

শিক্ষক কায়স্থ ৭৭, গন্ধবণিক ২, ব্রাহ্মণ ১

ছাত্রদের জাতি শুঁড়ি ৭২, রাজপুত ৬২, কায়স্থ ৫১, কালাল ৪০, গন্ধবণিক ৩২, তেলি ২৯, ময়রা ২৮, ব্রাহ্মণ ২৫, স্বর্ণকার ২৫, মাগধা ১৮, কাণ্ডু ১৮, আগুরি ১৭, লুনিয়ার ৯, গোয়ালা ৮, ক্ষত্রিয় ৭, মহলা ৬, কাইরি ৫, ধানুক ৫, পাশি ৫, তামলি ৪, নাপিত ৪, কামার ৪, কাঁসারি ৪, কৈবর্ত ২, ছাইপিকর ২, পরশুয়া ২, কাহার ২, লাহারি ২, ছুতার ২, খটকি ১।

শিক্ষকদের মাসিক রোজগার ১টাকা আট পয়সা সাত আনা

 

মুর্শিদাবাদ

৬২টা বাংলা, ৫টা হিন্দি, ২৪টা সংস্কৃত, ২৪টা পার্সি, ২টি আর্বি, ২টি ইংরেজি, ১টি মেয়েদের।

শিক্ষক 

কায়স্থ ৩৯, ব্রাহ্মণ ১৪, আগুরি ৩, শুঁড়ি ৩ কৈবর্ত ৩, বৈদ্য ১, সুবর্ণবণিক ১, ক্ষেত্রিয় ১, ছেত্রী ১, 

সদগোপ ১, চন্ডাল ১।

একটি বাংলা বিদ্যালয়ে ১ জন মুসলমান পড়াতেন। 

শিক্ষকদের গড় রোজগার ছিল ৪টাকা ১২ পয়সা ৯ পাই। 

শিক্ষার্থী 

ব্রাহ্মণ ১৮১, কায়স্থ ১২৯, কৈবর্ত ৯৬, সুবর্ণবণিক ৬২, গন্ধর্ববণিক ৫৯, তাঁতি ৫৬, শুঁড়ি ৩৯, তেলি ৩৬, ময়রা ২৯, ক্ষত্রিয় ২৬, কুর্মি ২৪, বৈষ্ণব ২৪, তামলি ২২, গোয়ালা ১৯, মালা ১৯, নাপিত ১৫, বৈদ্য ১৪, ছুতোর ১৩, ওসয়াল ১২, স্বর্ণকার ১১, যুগি ১০, ছত্রি ৯, কামার ৯, কুমোর ৮, রাজপুত ৭, কংস্যবণিক ৭, তিলি ৬, আগুরি ৫, লুনিয়ার ৫, হালুইকর ৪, বারাই ৪, মালি ৪, দৈবজ্ঞ ৪, চণ্ডাল ৪, গৌরবণিক ৩, কাণ্ডু ৩, কালোয়ার ৩, কয়ালি ৩, সদগোপ ২, কাহার ২, জালিয়া ২, লাহারি ২, বাগদি ২, বৈশ্য ১, কালু ১, পাশি ১, গারেই ১, ধোবা ১, কাইরি ১, মুচি ১।

 

বীরভূম

৪০৭টি বাংলা, ৫টি হিন্দি, ৫৬টি সংস্কৃত, ৭১টি পার্সি, ২টি আরবি, ২টি ইংরেজি এবং ১টি মেয়েদের বিদ্যালয় ছিল।

গুরুদের জাতি

কায়স্থ ২৫৬, ব্রাহ্মণ ৮৬, সদগোপ ১২, বৈষ্ণব ৮, গন্ধবণিক ৫, সুবর্ণবণিক ৫, ভট্ট ৪, কৈবর্ত ৪, ময়্রা ৪, গোয়ালা ৩, বৈদ্য ২, আগুরি ২, যুগি ২, তাঁতি ২, কালু ২, শুঁড়ি ২, স্বর্ণকার ১, রাজপুত ১, নাপিত ১, বারাই ১, ছাত্রি ১, ধোবা ১, মালা ১, চণ্ডাল ১।

ছাত্রদের জাতি

ব্রাহ্মণ ১৮৫৩, গোয়ালা ৫৬০, গন্ধবণিক ৫২৯, কায়স্থ ৪৮৭, সদগোপ ২৯০, কালু ২৫৮, ময়রা ২৪৮, তাঁতি ১৯৬, সুবর্ণবণিক ১৮৪, শুঁড়ি ১৬৪, বৈষ্ণব ১৬১, তামলি ১৭, কামার ১০৯, কৈবর্ত ৮৯, নাপিত ৭৯, বৈদ্য ৭১, রাজপুত ৬৮, বারাই ৬২, স্বর্ণকার ৫৩, ক্ষত্রিয় ৫২, ছুতার ৫০, কুমার ৪৩, তেলি ৩৮, তিলি ৩৫, আগুরি ২৮, ধোবা ২৮, ছত্রি ২৪, পুঁড়া ২৩, ডোম ২৩, দৈবজ্ঞ ১৭, কেওট ১৫, বাগদি ১৪, বাইতি ১৩, হাড়ি ১৩, মাল ১২, বৈশ্য ১১, স্বর্ণবণিক ৯, কাংস্যবণিক ৯, ভট্ট ৯, যুগি ৯, নেট ৮, সারাক ৭, কুর্মি ৭, লাহারি ৫, মালি ৪, বাহিলা ৪, মুচি ৩, ভূমিয়া ২, ঢাঁক ২, কোর্ণা ২, গাঁরার ২, মাটিয়া ২, অগ্রদাণি ১, সন্যাসী ১, হালুওয়াইকর ১, বাউরি ১, দুলিয়া ১, জেলিয়া ১, ব্যাধ ১, চণ্ডাল। 

শিক্ষকেরা মোটামুটি ৩টাকা ৩পয়সা ৬ আনা মাইনে পেতেন। 

 

শিক্ষকদের তুলনা

জেলা মোট শিক্ষক কায়স্থ অন্য
মুর্শিদাবাদ ৬৭ ৩৯ ২৮
বীরভূম ৪১২ ২৫৬ ১৫৬
বর্ধমান ২৮৫ ২৭৮
দক্ষিণ বিহার ৬৩৯ ৩৬৯ ২৭০
ত্রিহুত ৮০ ৭৭

  

 

 

 

 

 

মাসিক রোজগার

মুর্শিদাবাদ ৪-১২-৯
বীরভূম ৩-৩-৯
বর্ধমান ৩-৪-৩
দক্ষিণ বিহার ২-০-১০
ত্রিহুত ১-৮-৭

  কত বিদ্যালয় কী ধরণের হিসেব রাখার শিক্ষা দিত

জেলা ব্যবসায়িক হিসেব কৃষি হিসেব দুটো
মুর্শিদাবাদ  ১৪ ৪৬
বীরভূম  ৩৬ ৪৭ ৩২৮
বর্ধমান  ৬০৯
দক্ষিণ বিহার  ৩৬  ২০  ২২৯
ত্রিহুত  ৪  ৮  ৬৮

 

 

 

 

 

 

কত বিদ্যালয়ে লিখে, পড়াশোনার চল ছিল আর ছিল না

  ছিল  ছিল না
মুর্শিদাবাদ ৩৯ ২৮
বীরভূম ১৩ ৩৯৮
বর্ধমান  ৪২৬ ১৯০
দক্ষিণ বিহার  ২৮৩
ত্রিহুত ১১ ৬৯

 

 

 

সূত্রঃ https://archive.org/details/AdamsReportsOnVernacularEducationInBengalAndBeharcalcutta1868

 




Avatar: পাঠক

Re: টাকা বাতিল এবং গ্রামের কারু-অর্থনীতি

এ আমাদের প্রায় অচেনা অজানা জগত। অনেক ধন্যবাদ এই মানুষজনের কথা তুলে ধরার জন্য।
Avatar: রৌহিন

Re: টাকা বাতিল এবং গ্রামের কারু-অর্থনীতি

অত্যন্ত জরুরী দলিল


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন