বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

পূব-পশ্চিমের বাংলা ভাষা

ফিরোজ আহমেদ

ক. জিম্মী সঙ্কট!

 

জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সমরেশ মজুমদার সম্প্রতি এক আলাপচারিতায় দাবি করেন ‘জিম্মা’ শব্দটা বাংলাভাষায় নেই, পশ্চিমবঙ্গে কেউ এটি ব্যবহার করেন না। ভদ্রলোককে কিছুটা উদ্ধৃত করা যাক: “...আমরা ভাষা নিয়ে ভাবছি না। এই ভাবছি না বলে আমাদের এই বাংলাভাষায় অদ্ভুত অরাজকতা; অর্থাৎ আগাছা ঢুকে গেছে। এখন আপনি দেখুন, আপনি যখন কবিতা লেখেন যে ভাষায় লেখেন, আপনি যখন গদ্য বা গল্প লেখেন সে ভাষায় লেখেন না। কেন এই পার্থক্য? কেন এই ভাষায় এতো উর্দু-আরবি-ফারসি ঢুকল? যে উর্দুর জন্য ৫২ সালে মানুষ আত্মত্যাগ করলেন, সেই উর্দু শব্দ কেন বাংলাদেশের ভাষায় ঢুকলো, এটা নিয়ে কেউ ভাবেন নি, কোনো কথা বলেন নি। আমার একটা প্রস্তাব ছিল, একটা কমিটি তৈরি করে বাংলাভাষার একটা স্ট্যান্ডার্ড চেহারা দেওয়া হোক। এটা আগের  চেয়ে ডেভেলপড এবং আগাছাগুলোকে ঝেড়ে ফেলা হোক... যেমন ধরুন, আজকের কাগজে আছে, কতজন বাঙালি বা বাংলাদেশিকে লিবিয়া জিম্মা নিয়েছে, ৪০০ বাঙালি। ‘জিম্মা’ শব্দটা কেন লিখবে?’ ‘জিম্মা’ তো বাংলা শব্দের ধারে কাছে নেই।... আত্মীকরণ দিয়ে বুঝতে চান, যেকোনো ভাষার উপর শব্দ আসবে। যেমন, ইংরেজিতে টেবিল, চেয়ার, শার্ট, প্যান্ট হিসেবে এসেছে। সেটা অভ্যেস হিসেবে এসেছে। পশ্চিমবাংলায় কোনো মানুষের ভাষায় জিম্মা শব্দ শুনবেন না। কবিতা পড়েন, গদ্যে পড়েন, গল্প পড়েন।কোথাও জিম্মা শব্দটা ছিল না। এগুলো কেন জানি মনে হচ্ছে, ১৯৭১ সালের পর থেকে এইসব শব্দ টুকটুক করে ঢোকাচ্ছে। আমার চেয়ে আপনারা ভালো বুঝবেন!”  

(যেগুলো আকাশে ভাসে সেগুলো তাৎক্ষণিক সাহিত্যঃ সাখাওয়াত টিপু ও ফরিদ কবির এর সাথেকথোপকথন)

তথ্যগত দিক দিয়ে সমরেশের দাবি যে অত্যন্ত, অত্যন্ত ভুল তাতে সন্দেহ নেই। ভুলটা শুধু এদিক দিয়ে নয় যে ‘জিম্মা’ শব্দটিকে সমরেশ এখনও অনাত্মীয়জ্ঞানে বর্জন করে চলেছেন, বরং এদিক দিয়েও যে ভাষার গতিশীলতার প্রক্রিয়া সম্পর্কে যে ভাবনাটির প্রকাশ তিনি ঘটিয়েছেন, তা নিতান্তই কিশোরসুলভ সরল, এবং বিপদজনক রকম রক্ষণশীল। ‘জিম্মা’ শব্দটির পক্ষে সমরেশ মজুমদারের তুলনায় বাংলা ভাষার অনেক বড় ওজনদার, অনেক বেশি মহত্তর সাক্ষীর দোহাই দিতে পারি, তিনি রবীন্দ্রনাথ। ‘কাব্যঃ স্পষ্ট এবং অস্পষ্ট’ নামের একটা রচনায় খোলাসা করে সব কিছু লেখার দাবি করা পাঠককে তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন সেকালের এক বাজারচলতি ঔপন্যাসিক দামোদর মুখোপাধ্যায়ের জিম্মায়ঃ “কপালকুণ্ডলার শেষ পর্যন্ত শুনিয়া তবু যদি ছেলেমানুষের মতোজিজ্ঞাসা কর ‘তার পরে?’ তবে দামোদর বাবুর নিকটে তোমাকে জিম্মা করিয়া দিয়া হাল ছাড়িয়া দিতে হয়।”

বাঙাল হাঁফ ছেড়ে বাঁচে, ভাগ্যিস রবি ঠাকুরের বরাত দেয়া গেলো, নাহলে জিম্মা-জিম্মি-জিম্মাদার এর মত কতগুলো অতি জরুরি শব্দও ‘অনাত্মীয়’ তকমায় ভেতর বাড়িতেআর ঢুকতে পেতো না, সমরেশীয় শুদ্ধি অভিযানে হয়তো বিদায় দিতে হত। পশ্চিমবঙ্গে আদৌ ব্যবহৃত না হয়ে যদি থাকেও, পূববাংলায় তো কিছু পরিস্থিতির প্রকাশে জিম্মা  ব্যবহার অনিবার্য।  কিন্তু প্রশ্নটা তো এখানে না যে জিম্মাদার রবিঠাকুর ব্যবহার করে সেটাকে আত্মীয়ের স্তরে শোধন করেছেন, তার গদ্যে সম্ভবত শব্দটা একবারই ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়েছিল। সঙ্কটটা আসলে খবরদারির, একটা নির্ধারক মানসিকতার। যে কোন কারণেই হোক, পূববাংলার দিক থেকে এই খবরদারির কিংবা শুদ্ধাশুদ্ধি বিচারের চেষ্টার কোন খবর পাওয়া যাবে না। খবরদারি না করতে যাবার পেছনে কিন্তু ঔদার্য বা স্বভাবসিদ্ধ মহত্ত্ব নেই, বরং পূর্বাঞ্চলের যে সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদতা আর পরমুখাপেক্ষিতা পশ্চিমাংশের প্রতি, তারই একটা স্বাভাবিক স্বীকৃতি আছে এই মুরুব্বিগিরি না করার চেষ্টায়। কিন্তু এটাও আশ্চর্য কম নয় যে পশ্চিমের ঐতিহ্যগত আভিজাত্য আর প্রাধান্যের পরও, এমনকি পূর্বের মননকে চুম্বকের মত শক্তিতে বালু থেকে লৌহকণাকে আলাদা করে নিজের বলয়ে নিয়ে যাবার সক্ষমতার পরও, পূববাংলার জল-কাদামাখা বুনো প্রাণশক্তিও কখনো অলক্ষ্যে এবং কখনো প্রকাশ্যে ঠিকই আপন সাম্রাজ্য বিস্তার করে গেছে। পূব আর পশ্চিমে বাংলার শব্দরীতি-পরিভাষা ব্যবহারের ঐতিহাসিক কিছু পার্থক্য নিয়ে, আঞ্চলিকতার বিষয়টি সেখানে কত গভীর ছিল, কিভাবে তা আঞ্চলিকতার ব্যপ্তি ছাড়িয়ে সাম্প্রদায়িকতার রঙেও সিক্ত হল, কিংবা এর মাঝে ‘সভ্য বাঙালি’ বনাম ‘অমার্জিত বাঙাল’ এই দুইয়ের রেষারেষির ইঙ্গিত এখনও কিভাবে বর্তমান, সেটাই আরও একবার বিবেচনা করতে বসা যেতে পারে। ‘জিম্মা’ শব্দটা ঠাকুর যদি ব্যবহার না করতেন, সমরেশ মজুমদারের দাবি অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে অদ্যাবধি তার আত্মীয়করণ না ঘটে থাকে, সেক্ষেত্রে বাঙালের কর্তব্য কী সেই মানদণ্ডে বিচার করে নিজ ভাষাকে শুদ্ধ করার যজ্ঞে নেমে পড়া — এই সব বিটকেলে ভাবনা শুধু নয়, পুরো বিষয়টার একটা সামান্য ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতও হাজির করা যেতে পারে। 

পূর্ব পশ্চিমের বাংলায় শব্দের মানে এবং প্রয়োগ কীভাবে আলাদা হতে পারে, সেটা নিয়ে মজার একটা লেখা লিখেছিলেন  পবিত্র সরকার। পূববাংলায় জন্ম এবং দত্তকসূত্রে পশ্চিমবঙ্গে বেড়ে ওঠা এই ব্যকরণবিদের মজার একটি পর্যবেক্ষণঃ  “রেস্টুরেন্টে যাওয়ার ব্যাপারে এখানকার অভিধানে একটা নতুন শব্দ শিখলাম। ‘ওখানকার খাবারে খুব “মজা” আছে!’ ‘মজা’ কী রে ভাই? না, ভালো খাবার, স্বাদের খাবারকে এরা বলে ‘মজা’র খাবার। বেশ, বেশ! বাংলা ভাষার ক্ষমতা কত বাড়ছে।” (ঢাকার খাওয়াদাওয়া, প্রথম আলো,... তারিখ)

ভারী মজার তো!  ‘মজা’ ভূক্তিটা পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত সংসদ বাংলা অভিধান থেকে দেখে নেয়া যাকঃ

মজা1(p. 676) [ majā1 ] বি. 1 আনন্দ (মজা পাওয়া); 2আমোদ, কৌতুক (মজার কথা, মজার ব্যাপার); 3 তামাশা, রঙ্গ, রগড়; 4 ঠাট্টা উপহাস। [ফা. মজহ্]। মজা করা ক্রি. বি. রগড় করা; অপরকে অপদস্হ করে কৌতুক করা। মজা টের পাওয়া ক্রি. বি. জব্দ হয়ে অসুবিধা ভোগ করা।    ̃ .দার বিণ. কৌতুকাবহ, আমোদজনক (মজাদার খেলা)। মজা দেখা ক্রি. বি. অন্যর কষ্টে বা বিপদে আনন্দ অনুভব করা। মজা দেখানো ক্রি. বি. বিপদে ফেলে জব্দ করা। মজা মারা, মজা লোটা ক্রি বি. আমোদ বা আনন্দ উপভোগ করা।

মজা2(p. 676) [ majā2 ] ক্রি. 1 জলশূন্য হওয়া, বুজে যাওয়া (পুকুরটা মজে গেছে); 2 মুগ্ধ বিভোর বা আসক্ত হওয়া (প্রেমে মজা, নেশায় মজা, মন মজেছে); 3 সুপরিণত বা উপভোগ্য হওয়া (আচারটা এখনও মজেনি); 4 অতিরিক্ত পেকে যাওয়া (আমটা মজে গেছে); 5 বিপদ্গ্রস্ত হওয়া (ফেল করে মজলাম)।   ̃ বি. উক্ত সব অর্থে।   ̃ বিণ. 1 অতিরিক্ত পক্কতার ফলে গলিত (মজা আম); 2 জলশূন্য হয়েও বুজে গেছে এমন (মজা পুকুর)। [সং √ মস্জ্ + বাং আ.] ̃ নো ক্রি. বি. 1 নিমজ্জিত করা; 2 মুগ্ধ করা; 3 পাকানো (কাঁঠাল মজানো); 4বিপদ্গ্রস্ত করা (‘মজালে রাক্ষসকুল, মজিলে আপনি’): মধু.)।

সত্যিই সুস্বাদু অর্থে মজা নেই, যদিও মজাদার শব্দটি সংসদের অন্য ভূক্তির ভেতরে আছে। কৌতুহলোদ্দীপক অর্থে আমরা যে ‘মজার’ শব্দটা (মজার কাজ, মজার ঘটনা) ব্যবহার করি, তাও গরহাজির, যদিও আমোদ বা কৌতুক হিসেবে এর অর্থটি দেয়া আছে।  বেশই তো, পবিত্র সরকারের ভাষায়, বাংলা ভাষার ক্ষমতা বাড়ছে। ভাষা নিয়ে এই দৃষ্টিটাই বরং অনেক ইতিবাচক, তার বৈচিত্র এবং চলমানতাকে সমীহ করার, ভাষা ও সংস্কৃতির শুদ্ধতাকে জিম্মি করে ছড়ি না ঘুড়িয়ে ভাষার রসটুকু সমঝে নেবার এই এক আশাপ্রদ নজির।

পবিত্র সরকারের রচনাটির নামও তাৎপর্যপূর্ণঃ ঢাকার খাওয়া দাওয়া-- সে এক এলাহী বর্ণনা রাজধানী নগরটির খাওয়া দাওয়ার; গঙ্গার এ পাড়ের বিদ্বৎসমাজের জ্ঞান-গরিমার পরিচয় খুব কমই পেয়েছি পশ্চিম বাংলার লেখকদের লেখায়। পূববাংলার পর্যটকরা কিন্তু তাদের পশ্চিমা ভাইদের পানাহারের আয়োজনের খুব একটা প্রশংসা করেন না -- বলা চলে নীরব থাকেন - বরং পশ্চিমবাংলার লোকজনের বিদ্যাভ্যাস, বই কেনা, থিয়েটার দেখা, সংস্কৃতি চর্চা, সারি বেঁধে অপেক্ষা করার অভ্যাস, গণপরিসরে অজস্র নারীর উপস্থিতি এইসব নিয়ে অনেক বেশি মুদ্ধ বিবরণ তাদের বলা এবং লেখায় পাওয়া যাবে। ঝানু দেখিয়ে একটা অঞ্চলে গেলে সেখানকার প্রধান প্রবণতাগুলো না দেখে পারেনই বা কী করে!

খ. বাঙালের দুর্গতি, বাঙালের জবাব

পূর্ব পশ্চিমের এই ভাষারীতির বিবাদ কিন্তু স্মরণাতীত কালের। কত পুরনো তার হদিস যে কে জানে জানি না, কিন্তু কত পূরনো হতে পারে,তার একটা আন্দাজ দিতে পারি। একদা মঙ্গলকাব্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল সমুদ্রযাত্রায় ঝড়ে সওদাগরের সর্বস্বান্ত হবার বর্ণনা, তারপরঃ “সমুদ্র ঝড়ে সর্বস্বান্ত সদাগরের করুণ চিত্রের পার্শ্বে মঙ্গলকাব্যের পশ্চিমবঙ্গের কবিগণ একটি হাস্যরসের চিত্রও পরিবেষণ করিতেন, তাহা বাঙ্গাল মাঝিদের খেদ” (শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্যঃ বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস)। বোঝা গেল এখনকার মত তখনও নৌচালনার মত শ্রমসাধ্য কাজে পূববঙ্গের মাঝিমাল্লারাই এগিয়ে ছিলেন, কিন্তু আরও যা বোঝা গেল, বাঙালের ভাষা হাস্যরসের নিয়মিত নিমিত্তও ছিলো। সাধারণভাবে বাঙালিজাতির আলস্যের বিপুল নিন্দার করেও হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙ্গালের তুলনামূলক কষ্টসহিষ্ণুতার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন গত শতকে বৃটিশদের সাথে প্রতিযোগিতা করে কোলকাতা শহরে নিজে শিল্পকারখানা করতে যাওয়া এবং নিজ ছাত্রবৃন্দসহ আর সবাইকে উৎসাহ যোগানো আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় তার আত্মজীবনীতে ভট্টাচার্য ভাইদের এনামেল শিল্পের অভিজ্ঞতার বর্ণনা করতে গিয়েঃ “চুল্লীতে  যে প্রচণ্ড তাপের মধ্যে কাজ করিতে হয় তাহা মধ্যবিত্ত বাঙালি ভদ্রযুবকেরা সহ্য করিতে পারে না এবং এই জন্য বহু যুবক কাজ করিতে আসিয়া কিছুদিন পরেই চলিয়া যায়। অবশেষে নোয়াখালির কর্মঠ মুসলমানএবং পূর্ববঙ্গ হইতে তথাকথিত নিম্নবর্ণের হিন্দুদের কাজে লইতে হয়।” 

পূর্ববাংলার ভাষা নিয়ে উপহাসের আরও একটা নির্দোষ উদাহরণ দেয়া যাবে, সেটা রঙ্গপ্রিয় শ্রীগৌরাঙ্গের।  “একটা পাগলামি করে, জাত দেয় সে অজাতেরে, আবার দৌড়ে গিয়ে পড়ছে ঢলে ধূলোর মাঝে”—সেই পরম পাগল চৈতন্যদেব, যার প্রভাবে মঙ্গল কাব্যের কবিদের রূঢ়তা অদৃশ্য হলো, প্রতিপক্ষ শাক্ত কবিতাও প্রেমের স্নিগ্ধতায় মজলো, কবিদের আত্মম্ভর ভনিতা উধাও হয়ে আসলো ভক্তের আত্মনিবেদন, অজাতেরেও যিনি বিনা সঙ্কোচে জড়িয়ে ধরতে পারতেন,  বাংলা সাহিত্যের সেই সর্বশক্তিমান প্রভাবক ছিলেন খুবই আমুদে মানুষ, হাস্যপরিহাসে ওস্তাদ। পূবপুরুষের বসত শ্রীহট্ট, কিন্তু সিলেটি উচ্চারণ শুনে তার মস্করাঃ

“বিশেষ চালেন প্রভু দেখি শ্রীহট্টিয়া
কদর্থেন সেইমত বচন বলিয়া।।”

আর সাধারণভাবে বাঙ্গালের মুখের ভাষা নিয়ে প্রভুর পরিহাস:

“সভার সহিত প্রভু হাস্য কথা রঙ্গে।
বঙ্গদেশী যেন মত আছিলের বঙ্গে ॥
বঙ্গদেশী বাক্য অনুকরণ করিয়া।
বাঙ্গালেরে কদর্থেন হাসিয়া হাসিয়া ॥“

মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব ঐতিহ্য পাড়ি দিয়ে ঊনিশ শতকের কোলকাতাকেন্দ্রিক জমিদারশাসিত নবজাগরণেও সেই ধারা অব্যাহতই ছিল। নদীয়া যুগের অবসানে কলিকাতা পর্বেও তাই বাঙালের দশা যে পাল্টায়নি সেটা সেই যুগের বিখ্যাত দুটি সংলাপে বোঝা যাবে; এর একটি খেদ, অপরটি পরিহাসঃ

“বাঙাল বলিয়া করিয়ো না হেলা আমি ঢাকার বাঙাল নহি গো।” 

“মাগীর বাড়িগেচি ব্রান্ডি খাইচি, তবু কলকাত্তার মত হবার পারলাম না।”

 বাঙ্গালের উচ্চারণ নিয়ে রসিকতা করা পুরনো একটি সংস্কৃত শ্লোকের কথাও মনে পড়ছে, সেখানে পূর্বদেশ কিংবা বঙ্গদেশের মানুষের কাছ থেকে আর্শীবাদ না নেয়ার উপদেশ দেয়া হয়েছে, কেননা তারা ‘শতায়ু’ বলতে গিয়ে ‘হতায়ু’ বলে ফেলে, বোধকরি বরিশাইল্যা উচ্চারণ রীতিই এই রসিকতার লক্ষ্য। ভাগ্যিস আয়ুর দেবতা শুধু মুখের কথাই শোনেন না, অন্তরের ব্যাথাও ঠিকঠাক টের পান, বাঙাল তাই মা-বাপের দোয়াতে বেঁচেবর্তে আছে এখনও।

পূব আর পশ্চিমের বাংলার এই রেষারেষির পূবদিক থেকে জবাব দেয়ার জন্য বাঙ্গালকে মনে হয় দীর্ঘ অপেক্ষাই করতে হয়েছে, পূর্ববঙ্গের সবচে বিখ্যাত পত্রিকা ঢাকা প্রকাশ ১৫ আশ্বিন, ১২৭৩; ৩০সেপ্টেম্বর ১৮৮৬ সংখ্যায় ‘পূর্বাঞ্চলীয় ভাষা’ নামের নিবন্ধটিতে পূর্বাঞ্চলের ভাষাকে পশ্চিম কতটা অবমাননার চোখে দেখে, সে সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছে, পূর্ববঙ্গের ভাষাকে তারা এত অশুদ্ধ মনে করেন: “তাহাদিগের মতের সারমর্ম এই যে, পূর্ব্বাঞ্চলের লোকে লেখাতে এমন অনেক প্রকার রীতির অনুসরণ করেন তাহা হিন্দুস্তানে নয় চব্বিশ পরগনা, হুগলী, নদীয়াও বর্দ্ধমান এই কয়েকটি জেলায় প্রচলিত হয় না। অতএব উহা তাঁহাদিগের শ্রুতিকটু হইয়া থাকে। এই নিমিত্ত তাহা অশুদ্ধ। যদি পূর্ব্বাঞ্চলীয় গ্রন্থকারগণ ঐ সকল দোষ পরিত্যাগ করিয়া লেখেন, তাহা হইলে তাহাদের পুস্তকের প্রতি কিঞ্চিৎ অনুগ্রহ প্রকাশ করা যাইতে পারে।”

কী ভয়ঙ্কর লাঞ্ছনা! কিন্তু এতেও কি শেষ আছে! “সোমপ্রকাশ সম্পাদক এই দোষের নিবারণের জন্য প্রস্তাব করিয়াছেন যদি পূর্ব্বাঞ্চলীয় কোন লোকে কখন কোন পুস্তক লিখিতে প্রবৃত্ত হন তখন যেন তাঁহারা পশ্চিমাঞ্চলীয় কোনব্যক্তি দ্বারা তাহাদিগের লেখা সংশোধন করাইয়া লন।”

সোমপ্রকাশের বক্তব্যটুকু আদতে কী ছিল, গবেষকদের তা খুঁজে দেখা অত্যাবশ্যক, শুধু ঢাকা প্রকাশের নালিশটাই এখানে জানা যাচ্ছে। তবু নিতান্তই সামান্য ছিল না তার উপহাস, তা বোঝা যায় জল অনেকদূর গড়ানো থেকে। এই কথিত রূঢ়তার প্রত্যুত্তরে ঢাকা প্রকাশ ভাষার শুদ্ধতা-অশুদ্ধতাপ্রশ্নে বিস্তারিত যুক্তি প্রদর্শন করেন, ঘোষণা করেন যে “বাঙ্গলা ভাষায় অল্পদিন হইল পুস্তক রচনা হইতে আরম্ভ হইয়াছে... কোন গ্রন্থকারই এমন শক্তি প্রদর্শন করিতে সমর্থ হন নাই, যে তাহার পুস্তক চিরকাল বা বহুদিন আদরণীয় থাকিবে এবং সেই পুস্তক ভাষার আদিসম্পত্তিরূপে বিবেচিত হইবে... যখন ভাষায় এমন পুস্তক লিখিত হইবে যে, সকল লোকেই তারা গুণে বশীভূত হইয়া তাহার নিকট মস্তক অবনত করিবে... তখন সেই সমুদয় পুস্তক দেখিয়া ব্যকরণ রচনা হইবে। তখন বলা যাইবে ভাষার রীতি এই...।”

এভাবে ঢাকাপ্রকাশ সন্দেহাতীতভাবেই দেখিয়ে দেয় যে, বাংলা ভাষার তখনও পর্যন্ত কোন ব্যকরণ কিংবাসুনির্দিষ্ট লিখনশৈলী দাঁড়ায়নি, সোমপ্রকাশসহ অনেকেই নতুন প্রণালী প্রচলিত করছে। প্রবন্ধকার আরও মত প্রকাশ করেন যে, “বিদ্যাসাগর, মুক্তারাম বিদ্যাবাগীশ প্রভৃতি কলিকাতার প্রসিদ্ধ লেখকেরা যে হইবেক করিবেক এবং অতীত কালার্থে করেন, যান, দেন ইত্যাদি ব্যবহার করিয়াছেন, তৎপ্রতিদৃষ্টি না করিয়া যদি ইহাতে স্বীকার করা যায় যে ঐ অঞ্চলের কোন লেখকই এইরূপ শব্দব্যবহার প্রণালী অবলম্বন করেন না, তথাপি এই প্রণালীর অশুদ্ধতা কোন রূপে প্রমাণিত হয় না... এদেশ হইতে আমরা যদি আদেশ প্রচার করিয়া দি যে, অমুক অমুক শব্দ ও রীতি এদেশে প্রচলিত নাই, এদেশের গ্রন্থকাররা ব্যবহার করেন না ও এদেশের লোকের নিকট শ্রুতিকটু শুনা যায় অতএব কোনস্থানের লোকেই যেন তাহা ব্যবহার না করেন, তাহা হইলে আমাদিগের কথা যতদূর সঙ্গত ও প্রামাণ্য হইবে, অন্যস্থান হইতে ঐ প্রকার কথা বলিলেও তদরূপই হইবে সন্দেহ নাই।”

এবং বাঙ্গাল হিসেবে পূববঙ্গীয়দের প্রতি এই ‘বিজাতীয় ঘৃণা’র জবাব ‘খোশ খবর’ শিরোনামায় পুরুষালী একটি উত্তরও দেয়া আছে ঢাকা প্রকাশেই, কেন পূর্ববঙ্গবাসীদের বাঙ্গাল বলা হয় সে নিয়ে পাঠানো এক প্রশ্নের জবাবে ঢাকা প্রকাশের রায়ঃ ‘পত্রপ্রেরকের লিঙ্গজ্ঞান থাকিলে বুঝিতেন; বাঙ্গাল শব্দটি পুংলিঙ্গ, আর বাঙ্গালী শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গ।’ পশ্চিমা ভাইদের নিয়ে পূবদিকে এই মস্করাটি বোধহয় বেশ জনপ্রিয় ছিল, সম্ভবত প্রায় অর্ধশতক পরঅদ্বিতীয় পরিহাসবিদ ভানুও পশ্চিমবঙ্গবাসীকে জব্দ করতে লিঙ্গভেদের এই একই অস্ত্রটি শানিয়েছিলেন বাঙ্গালের তূণ থেকে। 

 গ. অবসরভোগী বনাম মেহনতি

প্রত্যুত্তর শুরু করলেও কতটা পিছিয়ে যে সে বরাবরই ছিল তার একটা নিদর্শন পাওয়া যাবে ঢাকা প্রকাশেরই একটা ঘটনা থেকে, বাংলা ১৩০৮ সনে ঢাকা প্রকাশের মালিকানা কেনেন ত্রিপুরার মহারাজার মন্ত্রণাদাতা রাধারমণ। কারণটা ছিল অপমানবোধ, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘বেঙ্গলী’ পত্রিকার অফিসে গেলে কথা প্রসঙ্গে সুরেন্দ্রনাথ রাধারমণকে বলেন, “তুমি যাহাই বলো না কেন, যেখান হইতে এই উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগেও পড়িবার যোগ্য একখানি সংবাদপত্র প্রকাশিত হইতে পারে নাই, সেখানকার শিক্ষা দীক্ষার গৌরব করা যাইতে পারে না।।”  ‘পড়িবার যোগ্য’ কাগজ শুধু নয়, এই ঘটনার বহু বছর পরও সাধারণ শিক্ষাদীক্ষা-সাংস্কৃতিক তৎপরতায়ও যে  পূর্ববঙ্গ অনেকটাই পিছিয়ে ছিল, এ তো সত্যি। কারণ উৎপাদনের বৃহদাংশ পূর্বের চাষীরা সম্পাদন করলেও ভোগটা প্রায় সর্বাংশে ঘটতো কলিকাতা শহরে। উঁচুসাহিত্য তো অবসরজীবীদের বিলাস, শ্রমক্লান্ত পূববাংলা থেকে জমিদাররা রস অপহরণ করে কলিকাতায় যে-বাংলা সংস্কৃতির গোড়ায় তা সিঞ্চন করেছেন, তাতে  শ্রমজীবী আর অবসরজীবী এই দুই শিবিরের ওপর আঞ্চলিকতার ছাপও পড়েছিল সুষ্পষ্টই, অঞ্চলের দূরত্বের সাথে যুক্ত হয়েছিল তাই সামাজিক বর্গেরও দূরত্ব, এই দূরত্ব সহজে ঘোচার না। এরই ফল হীনমন্য বাঙালের কলিকাতায় আকর্ষণে ছুটে যেতে বাধ্য হওয়া, ‘কলকাত্তাইয়া’ হবার প্রাণপণ আকুতি, শুধু জমিদারির খাজনা ওড়ানোই নয়, শিক্ষা আর চাকরিরও সেরা সুযোগগুলো কোলকাতাকেন্দ্রিক, কিংবা সেখান থেকেই তা বন্টিত হয়, এরই ফল বাঙ্গালের মুখের ভাষার অশুদ্ধ ঘোষিত হওয়া; কিন্তু এত কিছু ছাপিয়েও চাষাড়ে সুলভ গোঁয়ার্তুমির শক্তি তার ছিল, পাশাপাশি ছিল সহজ সজীব সৃজনশীলতা, বাংলা ভাষা বহুবার তাতে সমৃদ্ধ হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই প্রসঙ্গে বুদ্ধিগ্রাহ্য একটি অবস্থান নিয়েছিলেন, কিন্তু ভাষার গতিশীলতার দিকেও তাঁর নজরটা কড়াই ছিল।

“ “কলকাতা শহরের নিকটবর্তী চার দিকের ভাষা স্বভাবতই বাংলাদেশের সকল দেশী ভাষা বলে গণ্য হয়েছে। এই এক ভাষার সর্বজনীনতা বাংলাদেশের কল্যাণের বিষয় বলেই মনে করা উচিত। এই ভাষায় ক্রমে পূর্ববঙ্গেরও হাত পড়তে আরম্ভ হয়েছে,তার একটা প্রমাণ এই যে, আমরা দক্ষিণের লোকেরা “সাথে” শব্দটা কবিতায় ছাড়া সাহিত্যে বা মুখের আলাপে ব্যবহার করি নে। আমরা বলি “সঙ্গে”। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, কানে যেমনি লাগুক, “সঙ্গে” কথাটা “সাথে”র কাছে হার মেনে আসছে। আরও একটা দৃষ্টান্ত মনে পড়ছে। মাত্র চারজন লোকঃ এমন প্রয়োগ আজকাল প্রায় শুনি। বরাবর বলে এসেছি "চারজনমাত্র লোক”, অর্থাৎ চারজনের দ্বারা মাত্রা-পাওয়া,পরিমিত-হওয়া লোক। অবশ্য “মাত্র” শব্দ গোড়ায় বসলে কথাটাতে জোর দেবার সুবিধে হয়। ভাষা সব সময়ে যুক্তি মানে না।”

কলকাতা শহরের ভাষাকে ‘সকলদেশীর’, সেই হিসেবে সর্বজনীন হিসেবে ঘোষণা করার পরও, তাকে বাংলাদেশের জন্য কল্যাণের বিষয় হিসেবে মানদণ্ডরূপে বিবেচনা করলেও বাস্তবত বোঝা যাচ্ছে, ও দেশীয় কানে তা যেমনটাই লাগুক, কোলকাতার দোর্দণ্ড প্রতাপের যুগেই পূবের রুচি তাতে ছাপ ফেলতে শুরু করেছিল। ‘সঙ্গে’ কথাটার তুলনায় ‘সাথে’ এমনই অনাড়ম্বর, সরল এবং আন্তরিক, হার না মেনে সঙ্গের হয়তো উপায় ছিল না। কিংবা মুখের ভাষার জন্য বারণ হলেও কবিতার জন্য যে তা জায়েজ ছিল, তার কারণ হতে পারে এটাও যে ‘সঙ্গে’ কথাটার ছন্দসঙ্গী মোটে কয়টা: রঙ্গে-ঢঙ্গে- বঙ্গে- জঙ্গে- ভঙ্গে ইত্যাদি। অন্যদিকে ‘সাথে’ শব্দটির ছন্দসাথী অজস্র। কাব্যভাষা আর মুখের ভাষার মাঝে প্রভেদ মানার শিক্ষিত অনুশীলন সর্বজনের থাকে না বলেই কোলকাতাবাসীদেরও হয়তো অনেকেই সহজে ‘সাথী’ হয়েছেন। কিংবা আরও একটা সম্ভাবনা হলো জনদেবতার রায়; কোলকাতা তো শুধুসংস্কৃতি আর ভোগের মধুর লোভে উড়ে যাওয়া অনুপস্থিত জমিদারদের কমলালয় ছিল না, পেটের খিদায় পাটকল- চটকলের টানে ঘুর্ণিবায়ুতে বালুকানার মত বাংলার সর্বত্র থেকে তারা জড়ো হচ্ছিল কোলকাতায়। হয়তো তাদের সূত্রেও সাথী হঠিয়ে দিচ্ছিলো সঙ্গীকে। সৈয়দ মুজতবা আলিও তার একটি প্রবন্ধে বাংলা ভাষার জমাখরচ হিসেব করতে গিয়ে পূববাংলার দাপটে পশ্চিম বাংলার কথ্যরীতির পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন।

কিন্তু বহু বছর পর পত্রিকার বানান মার্জনাকারীদের মুখে শুনেছিলাম, এদেশীয় অধিকাংশ গণমাধ্যমে তাদের বানান নির্দেশিকাতে বলে দেয়া আছে কবিতা ছাড়া অন্য সর্বত্র ‘সাথে’ কেটে ‘সঙ্গে’ করে দেয়ার জন্য! স্রেফ হীনমন্যতাই কখনো কখনো শুদ্ধতার মানদণ্ড হয়ে আছে আজো। কলকাতার ভরা মাঠে খেলায় জিতে এসেও তাই নিজের দেশেই ‘সাথে’ হীনমন্যতার শিকার ছিল সম্ভবত বহুদিন, অতিসম্প্রতি দেখছি দুটি শব্দই ব্যবহার হচ্ছে সমানতালে।

 ঘ. ‘খুনের মামলার’ প্রলম্বিত শুনানি

শুধু আঞ্চলিকতার না, উচ্চারণের পরিহাসেরও না, সাম্প্রদায়িকতার গন্ধও কিন্তু এই পূবপশ্চিমের বিভাজন নিয়ে নিত্যনিত্যই ওঠে। সমরেশ মজুমদারের মতই পশ্চিম বঙ্গের আরেক জনপ্রিয় বাঙালী সাহিত্যিক বাণী বসু, আফরোজা পারভীনের সাথে সাক্ষাতকারে পূববাংলার ভাষা-পরিস্থিতি নিয়ে তার মত জানাচ্ছেনঃ “বাংলা দেশের সাহিত্যে ভাষার চেঞ্জেস আমার পছন্দ হয় নি। যত্রতত্র আরবি ঢুকে গেছে... এটা ঠিক গ্লোবালাইজেশানের যুগে সাহিত্যে অন্য ভাষা ঢুকতে পারে। কিন্তু ওটা যে একটা অন্য ভাষা সেটা লেখায় বোঝা যাবে না। কিন্তু তোমাদের (বাংলাদেশের) সাহিত্যে বোঝা যাচ্ছে।”

পরোক্ষে একটা সাম্প্রদায়িক ইঙ্গিত আমরা কিন্তু পেয়ে যাই, অভিযোগ আরবী শব্দের বিরুদ্ধে। কিন্তু নতুন করে কোন আরবী শব্দটা পূববাংলার ভাষায় ঢুকে পড়ল? অলক্ষ্যে, যদি কাউকে বিরক্ত না করে নতুন কোন শব্দ ঢুকে পড়ে, ভাবপ্রকাশের সীমানা বাড়ায়, তাতে ক্ষতির কিছু তো নেই, প্রয়োজনীয়তাই তাকে গদিনশীন করে। তবে পরিচিত শব্দগুলোকে সরিয়ে যদি অপরিচিত আরবী শব্দ চলে আসত, সেটা হৈ চৈ ফেলে দেয়ার মতই তো বিষয় হত বটে। না, তেমন কিছু ঘটেনি, বড়জোর চিরাচরিত ফার্সীনামাজ, রোজা, খোদা হাফেজ প্রভৃতি ধর্মীয় পরিভাষার বদলে সালাত, সিয়াম, আল্লা হাফেজের উদ্দেশ্যমূলক এবং কিছুটা জোরপূর্বক প্রবর্তন ঘটেছে; আর অতিপরিচিত, বাঙালিপ্রায় হয়ে যাওয়া মুসলমানী নামগুলোর বদলে দাঁতভাঙা আরবি-ফার্সি নামের প্রচলন ঘটেছে । নামাজ আর রোজা তাও স্বমহিমা নিয়ে কিছুটা টিকে গেলেও খোদাহাফেজ প্রায় বিস্মৃতির পথে। ফার্সী ঐতিহ্যের বদলে সরাসরি আরবীর অনুসঙ্গে ধর্মচর্চার চেষ্টা দেওবন্দি এবং ওয়াহাবী এই উভয় ধারার দিক থেকে ঘটেছে, এটা আবার পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে ‘মুসলমান’ হিসেবে আত্মসচেতনার আধুনিক প্রেরণা থেকে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত হয়েছে সামরিক শাসনের যুগে।  নামকরণের এই হালপ্রবণতা আধাশতক আগেও ‘জায়গীর’ থাকা চাষাভুষো শেখের ব্যাটার ‘শরাফতে’র বাসনার প্রকাশ, বাংলায় বললে জাতে ওঠার খিদা। এই দেখো, ‘জায়গীর’ শব্দটার ব্যবহার আমাদের ছেলেবেলায়, এই আশির দশক পর্যন্ত টিকে থাকলেও আজ অন্তর্হিতপ্রায়, নীরবে, কোন আওয়াজ না করে কবে সরে গেল সে! ‘শরাফতি’র খায়েশ বরং এখনও পুরোপুরি যায়নি, শব্দটা মাঝে মধ্যেই শুনি। অথচ আজকের পূববাংলার মুসলমান নাগরিক মধ্যবিত্ত সমাজটি সৃষ্টি হয়েছিল  দরিদ্র কিংবা গ্রামীণ শিক্ষার্থীর কোন গেরস্ত বাড়িতে থাকা আর খাবার বিনিময়ে সন্তানদের পড়াবার জায়গীর পদ্ধতিটির বদৌলতে। সেই প্রথার প্রয়োজন ফুরোবার সাথে সাথে সেও সঙ্গত কারণেই শব্দের জাদুঘরে ঠাঁই নিয়েছে।

কিন্তু সমাজবাস্তবতার শর্ত উপস্থিত না থাকলে রাষ্ট্র কিংবা আর কোন কর্তৃপক্ষ কি চাইলেই আরবী-ফার্সি কিংবা জনগণের কাছে এযাবত অপরিচিত শব্দ বা বাক্যরীতি অকাতরে চাপিয়ে দিতে সক্ষম? ফোর্ট উইলিয়ামী সংস্কৃতায়িত গদ্য কিংবা পাকিস্তান যুগের উর্দু-ফার্সী অলঙ্কৃত গদ্য, উভয়ের ব্যর্থতা এবং গ্রহণযোগ্যহীনতা কি তার অসম্ভবতার সাক্ষ্যই দেয় না?

যাই হোক,পূব-পশ্চিমের বাংলায় আঞ্চলিকতার বিবাদটি চিরায়ত, কিন্তু এটি সাম্প্রদায়িক রঙ নিয়ে নেয় ’৪৭ এর পর। এর আগে পূববাংলার ভাষা উপহাসের বস্তু হয়েছে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে পশ্চিমাংশের কাছে। কিন্তু মুসলমানী বাংলা বিষয়ক রাজনীতি আরও বহু পরের ঘটনা, ঘটনাক্রমে দেশভাগের পর এই আঞ্চলিক ও সাম্প্রদায়িক উভয়প্রশ্নটিই পূর্ববাংলায় সমাপতিত হয়েছে। ’৪৭এর পর উদ্বাস্তুদের আগমনে পূর্বাংশে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি এখানে মুসলমানী সমাজে চালু শব্দগুলোর আধিপত্য নিশ্চিত করেছে, খুব সম্ভবত পশ্চিমাংশেও তার বিপরীতটি ঘটেছে। (পাকিস্তান আমলের একটি সাহিত্যসম্মেলনে কায়কোবাদ এর একটি বক্তৃতা কোন একটি সংকলনে পাঠের স্মৃতি মনে পড়ছে, সেখানে কবি কেন তার সাহিত্যে যথেষ্ট মুসলমানী ভাষা ব্যবহার করেননি, তার সাফাই দিতে গিয়ে বলছেন যে তখন মুসলমান লেখকদের প্রমাণ করতে হয়েছে তারা আদৌ যে বাংলা জানেন, সেটি প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই তাই সম্প্রদায়েরর বিশেষ ভাষারীতি তিনি ব্যবহার করেননি, এই ছিল তাঁর মূল বক্তব্য। বক্তৃতাটির সুরে এমনটা মনে হওয়া স্বাভাবিক যে কায়কোবাদ অভিযুক্ত হয়েছিলেন মুসলমানী বাংলা না লেখার জন্য)। এ যাবত অব্যহৃত আরবী ফার্সি শব্দের ব্যবহার প্রতিষ্ঠিত হলেও পাকিস্তান আমলে বাংলাভাষাকে মুসলমানীকরণের বিশেষ প্রকল্প কিন্তু সর্বাংশে ব্যর্থ হয়েছে। তারপরও, মুসলমান-সমাজে চালু ভাষারীতি পূর্ববাংলায় নিরাপদতর অভয়াশ্রম পেয়েছে। তাই হয়তো ‘জিম্মি করা’র সংবাদে সমরেশ মজুমদার আচ্ছা রকম আতঙ্কিত হয়েছেন।

বাংলায় আরবী ফার্সির প্রকোপ দেখা গেলেই সেটা সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হবেই, সেটাও মনে করার খুব কারণ নেই। বরং গত একশ দেড়শ বছরের বাংলা ঘাঁটলে যে কেউ খেয়াল করবেন চালু বাংলা থেকে সংস্কৃত তৎসম এবং আরবী-ফার্সী উভয় ধরনের শব্দেরই ব্যাপক হ্রাস ঘটেছে। কিন্তু সম্প্রদায়গতভাবে মুসলমানদের দিক থেকে আধুনিক গদ্য ও পদ্য রচনা কালের হিসেবে এত দেরিতে ঘটেছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মুসলমান সাহিত্যিকদের আগমনহেতু লিখিত বাংলায় যে অজস্র আরবী ও ফার্সি শব্দের জোয়ার আসল, তা রীতিমত সচকিতই করেছিল অনভ্যস্ত কানগুলোকে।  

জোয়ারে পলির মত ভেসে আসা এই শব্দগুলো এর আগেকার লিখিত সাহিত্যের ভাষায় না থাকুক, এদের বড় অংশই ছিল জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশের মুখের ভাষায়, আর একটা বড় অংশ ছিল মক্তবে ফার্সি পড়া বাঙালি মুসলমানের লব্জে। আজকে পূব-পশ্চিমের যে রেষারেষিটা কিছুটা সাম্প্রদায়িকতাগন্ধী আঞ্চলিক বিরোধ, সাম্প্রদায়িকতা আর আঞ্চলিকতা, উভয় দোষের মিলন ঘটল ৪৭এর পর; একদা এটা ছিল কেবল আঞ্চলিকতার রেষারেষি। সম্প্রদায়গত ভাবে মুসলমানএর আবির্ভাব যখন আধুনিক বাংলাসাহিত্যে ঘটলো, সেটা আঞ্চলিকতার দোষে মোটেই দুষ্ট ছিল না, বরং তাতে ছিল অঞ্চলনির্বিশেষে সম্প্রদায়গতভাবে মুসলমান জনগোষ্ঠীর উত্থানের খবর। তবে একটু সতর্কও থাকার দরকার আছে, ঘটনাটি সম্প্রদায়গত হলেও তা কিন্তু সর্বদা সাম্প্রদায়িক ছিল না, যদিও কোন কোন ক্ষেত্রে তা সন্দেহাতীতভাবেই সাম্প্রদায়িকও। যেমন নামে হিন্দু রঞ্জিকা হলেও, সনাতন ধর্মের ভাবধারার শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার কিংবা ঐতিহ্য রক্ষা ঘোষিত লক্ষ্য হলেও সর্বদা সেটি সাম্প্রদায়িক নয়;  মুসলিম সাহিত্য সমিতি বা বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্যপত্রিকার জন্মের কাহিনীতে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের একটা আভাস আছে, কিন্তু প্রথম পর্যায়ের কর্তারা প্রায় সকলেই যতদূর জানি, সন্দেহাতীতভাবেই ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, এবং প্রগতিশীল। 

মুসলমানদের জন্য পৃথক সাহিত্যসভার তৎকালীন প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জ্ঞানতাপস মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর স্মৃতিচারণঃ “আমরা কজন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সদস্য ছিলাম। সেখানে হিন্দু-মুসলমান বিভাজন না থাকলেও বড়লোকের ঘরে গরিব আত্মীয়ের মত মনমরা হয়ে তার সভায় যোগদান করতাম। আমাদের মনে হলো বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সঙ্গে সম্পর্ক বিলোপ না করেও আমাদের একটি নিজস্ব সাহিত্য-সমিতি থাকা উচিত।” অর্থটা খুবই সরল, একই বাঙালি জাতির অন্তর্ভূক্ত হয়েও সাহিত্যে সম্প্রদায়গতভাবে নিজেদের অনুপস্থিতি তারা ভালোই টের পাচ্ছিলেন, তাই পৃথক সভা করার তাগিদও অনুভব করলেন।

বাংলা সাহিত্যে বাঙালী মুসলমান অনুভূতির শক্তিশালীতম উত্থান শুরু হয় কাজী নজরুলের হাত ধরে, কিন্তু এটা তার পরিচয়ের খণ্ডিতাংশ। পরবর্তীকালের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বদরুদ্দীন উমরএর ভাষায় “নজরুল ইসলাম অহিফেন” প্রভূত পরিমানে ব্যবহৃত হলেও নজরুল স্বয়ং কোনক্রমেই সাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব তো ছিলেনই না, বরং তাঁর মধ্য দিয়েই প্রথমবারের মত বাংলাসাহিত্যে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ উত্তীর্ণ হয়ে বাঙালির জাতীয় সাহিত্যের চেতনাটিই নির্মিত হয়। কাকতালীয়, কাজী নজরুলের জন্ম পশ্চিম বাংলার চুরুলিয়ায়, অন্তিম শয়ান তাঁর পূববাংলার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, মুসলমানদের সাম্প্রদায়গত বঞ্চনার অনুভূতি যে বিশ্ববিদ্যালটির জন্ম দিলেও বরাবরই অনেকদূর পর্যন্ত সে ছিল অসাম্প্রদায়িক সংগ্রামের পীঠস্থান। মানবিক অনুভূতি, উচ্চতর ভ্রাতৃত্ববোধ এবং অসাম্প্রয়িকত চেতনা এর আগেকার বাংলা সাহিত্যে একদম দুর্লভ ছিল না, ছিল না তার বিপরীত অসূয়ার নিদর্শনও। কিন্তু উভয়ক্ষেত্রেই বাঙালি জীবনের অর্ধাংশের বাস্তব চিত্র ছিল একদমই অনুপস্থিত, খুবই সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে। এর সূত্রপাত কাজী নজরুলের হাত ধরে। আর সেই বিবরণ  রোমহর্ষক।

‘সওগাত ও নজরুল ইসলাম’ নামের প্রবন্ধে নাসিরুদ্দীনের বয়ান থেকে কিছুটা শোনা যাক, পূববাংলার চাঁদপুর শহর থেকে নাসিরুদ্দীন যাচ্ছেন কোলকাতায়, লক্ষ্য লোকসান দেয়া সওগাতকে কলিকাতা থেকে আরেকবার চালু করা। ব্যবসাবুদ্ধি তাঁর মন্দ ছিল না, কিন্তু ঢের বেশি ছিল নিজ সম্প্রদায়ের জন্য কিছু করার তীব্র আকুতি। সওগাত নামটাতেই মুসলমানী গন্ধ, কিন্তু ইসলামী নয় সে কিছুতেই। প্রতিপক্ষ মাওলানা আকরম খাঁর ‘মোহাম্মদী’ একই সাথে ইসলামী এবং সাম্প্রদায়িকও। এই দুই পত্রিকার রেষারেষি ছিল কিংবদন্তীতুল্য। দিন যতই গড়াতে থাকল ’৪৭ পর্যন্ত, ক্রমাগত মোহাম্মদীরই ‘আপাত’ রাজনৈতিক জয় ঘটল। কিন্তু সাহিত্যসৃষ্টিতে ওটির অবদান যৎসামান্য, এক নজরুলের তুলনাতেই তা তুচ্ছ। ’২৮ সালে নজরুল যোগ দিলেন সওগাতে, নাসিরুদ্দীন তাকে প্রস্তাব করলেন মুসলমানী বাগবিধি সাহিত্যে তুলে আনতেঃ “মুসলমানদের প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্য কমছে না। এখন মুসলমানরা তাদের সাহিত্যে নিজস্ব ভাবধারা ফুটিয়ে তুলতে চায়। তাদের নিজস্ব সমাজচিত্র ও নিত্যকথিত শব্দাবলী তারা সাহিত্যে প্রয়োগ করতে শুরু করেছে। হিন্দু দেব-দেবীর উপমা দিয়ে আপনি যেসব কবিতা-গান লিখেছেন, তাতে কাব্যরস যথেষ্ট থাকলেও বিরূপ মনোভাবের দরুণ মুসলমান সমাজের পাঠকগণের কাছে সমাদৃত হয়নি।  মুসলিম সমাজে ধর্মীয় আচারনিষ্ঠা পালনকারী লোকের সংখ্যায় বেশি। তাদের অধিকাংশই নিজেদের ঐতিহ্য ও কথিত শব্দাবলির প্রতিফলন তাদের সাহিত্যে দেখতে চায়।”

নজরুল খুবই বিরক্ত হনঃ “আবার হিন্দু মুসলমানের কথা তুললেন কেন? কোনো জাতি বা ধর্ম নিয়ে কবিতা লিখলে সেটা আর যাই হোক, সাহিত্য হবে না।”

নাসিরুদ্দীন কিন্তু পাল্টা যুক্তি দেনঃ “আপনার দেবদেবীর উপমা দিয়ে লেখা কবিতা ও গানগুলিতে তো কাব্যের সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রয়েছে। হিন্দু-মুসলমান উভয়ের সংস্কৃতি-ঐতিহ্য নিয়েই হবে বাংলা সাহিত্য। এতে হিন্দুদের ন্যায় মুসলমানদেরও চেতনাবোধের উপকরণ থাকতে হবে। মুসলমানদের সমাজচিত্র ও মুখের ভাষা বাদ দিলে বাংলার গণসাহিত্য গড়ে উঠবে না কোনোদিন।”

এরপর “গণসাহিত্যের কথা বলার পর নজরুল আমার সাথে একমত হলেন।” কিন্তু সাথে সাথেই জানিয়ে দিলেন, “দেশের মঙ্গলের জন্য সাহিত্য-সংস্কৃতির মাধ্যমে মুসলমানদের জাগাবার প্রয়োজন একটা আমি স্বীকার করি; কিন্তু ধর্মের নামে, সমাজের নামে আর দেশের নামে যারা ভণ্ডামি করে বেড়াচ্ছে, যারা মানবতার শত্রু—তাদের বিরুদ্ধে আমার কলম ক্ষান্ত হবে না।” 

এই যে সাহিত্যে বাদ পড়ামুসলমান সম্প্রদায়ের সমাজচিত্র তুলে আনতে হবে, কিন্তু সেটা হতে হবে মিলনাকাঙ্খী, সাম্প্রদায়িক হলে তার চলবে না, এই নবচিন্তা থেকে বাংলা সাহিত্যে একদমই নতুন একটা যুগের সূত্রপাত। নজরুলের আগেকার মহান বাংলা সাধকেরা  – রবীন্দ্রনাথ, শিবনাথ শাস্ত্রী কিংবা প্রমথ চৌধুরী — সকলেই  বাংলাকে সংস্কৃতের দায় থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছেন, তেমনি কিন্তু বাংলা ভাষার সাবলীলতা অক্ষুন্ন রাখার স্বার্থেই আরবী কিংবা ফার্সি যে সব শব্দের বাংলাকরণ ঘটে গিয়েছিল, সেগুলোকে অকাতরে গ্রহণের  তাগিদ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে পাঠ করা যেতে পারে প্রমথ চৌধুরীর ‘বঙ্গ সাহিত্যে খুনের মামলা’ প্রবন্ধটি। কিন্তু এই গ্রহণের পরও যে শব্দগুলো শুধু মুসলমানসমাজেই বিশিষ্ট, সাহিত্যে সেগুলোর প্রয়োগ কিংবা বহিঃপ্রকাশ সঙ্গতকারণেই ঘটেনি, যেমন ঘটেনি তারসমাজচিত্রেরও প্রকাশ। কারণ একদিকে মুসলমান জনগোষ্ঠীর অক্ষরজ্ঞানহীনতা, সামান্য যে কয়েকজন জানতেন, তারাও মাতৃভাষার চর্চা একদমই করতেন না।

এই নবযুগের সূত্রপাত হল পশ্চিমবঙ্গজাত নজরুলের হাত ধরে। কিন্তু ঘটনাক্রমে দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গের আঞ্চলিক রীতি আর মুসলমানী ঐতিহ্যের প্রয়োগের ধারাবাহিকতা, দুটোই ঘনীভূত হলো পূববঙ্গে। যদি ধরে নিই নজরুল যে শব্দগুলো বিপুল হারে ব্যবহার করেছেন তাঁর কাব্যে, সেগুলো সেকালের শিক্ষিতএবং আটপৌরে, মুসলমানের উভয় জীবনে অঢেল ব্যবহৃত হত, তাহলে আর কিছু না হোক, এটা প্রমাণিত হবে যে,  আধুনিক সাহিত্যে উত্তরণের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মুসলমানদের রচিত সাহিত্য কিংবা পূববাংলার সাহিত্য উভয়টি থেকেই  অজস্র আরবী ফার্সী শব্দ বিলীন হয়েছে — গিয়ে খুব অনিষ্ট হয়েছে সেটা বলার উপায়ও নেই -- ক্রমশ বাংলা ভাষার অন্তরের সুরের সাথে বহিরাগত কিংবা এমনকি ঐতিহগত কোন শব্দটি যায়, কোনটি যায় না তার একটি ধারণা দাঁড়িয়েছে । কথাটি সমভাবে তৎসম শব্দভাণ্ডারের জন্যও প্রযোজ্য। আরবি ও ফার্সিকরণ কিংবা মুসলমানিকরণের অভিযোগটি তাই খুব সামান্যই সত্যি। বরং অঞ্চল ও সম্প্রদায় ভেদে যে বৈচিত্র্য, তাকে উদ্‌যাপনেই সত্যিকারের বাংলাপ্রেমীর মহত্ব প্রকাশিত হবে।

ঙ. মুসলমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন!

’৪৭ এর পরেকার অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিস্তারকে ব্যাখ্যা করতে ‘মুসলমানদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ এই উমরীয় প্রবচনটা কতদূর সঠিক তা বোঝা যাবে পাকিস্তানপূর্ব সময়ের আরও কিছু ঘটনায়। যুগটা আদতে এমন ছিল যে এর মাত্র কিছু দিন আগে মোজাফফর আহমেদ বহু কষ্টে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হককে রাজি করান পত্রিকার নাম অসাম্প্রদায়িক রাখতে, ফজলুল হকের যুক্তি ছিল “হিন্দুরা তোমাদের কাগজ কিনবেন না। পক্ষান্তরে মুসলমানরাও বুঝতে পারবেন না যে কাগজখানা মুসলমানদের। দু’দিক থেকেই তোমরা মার খাবে।” মোজাফফর আহমেদরা ‘মুসলমানী’ নামে কিছুতেই রাজি হলেন না, তারা যুক্তি দিলেন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিকাশের ফলে যে চেতনা তৈরি হয়েছে তাতে লেখার মান দেখে হিন্দু এবং মুসলমান দুসম্প্রদায়ই কাগজ কিনবে। শেষপর্যন্ত কাগজের নাম ঠিক হলো নবযুগ। ‘ইংরেজি বাংলা ও উর্দু ভাষায় অনর্গল বক্তৃতা তিনি দিতে পারতেন’ বটে, কিন্তু ফজলুল হকের একমাত্র বাংলা চর্চা ছিল ‘মাসে একখানা কিংবা দুখানা চিঠি তাঁর মা’কে বাংলায় লিখতেন’। সঙ্গতকারণেই “তাঁর মনে সন্দেহ হল যে আমরা মুসলমানের ছেলেরা হয়তো ভালো বাংলা লিখতে পারব না... তাই তিনি আমাদের নিকট প্রস্তাব করলেন প্রথমে কয়েক দিন শ্রীপাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়েই সম্পাদকীয় প্রবন্ধগুলি লেখানো হোক।” পণ্ডিত হলেও ভাড়াটে এবং নীতিহীন লেখকের দুর্নাম অর্জন করা পাঁচকড়ি বাবুর সাথে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানান মোজাফফর, ইনি নাকি “টাকা পেলে যিনি যেমন লেখা চাইতেন তেমন লেখাই তিনি লিখতেন, ভোরের কাগজের জন্য রাত্রে যা লিখতেন, সকাল বেলা সান্ধ্য দৈনিকের জন্য তাঁর রাত্রের লেখার বিরুদ্ধেই আবার তিনি অবলীলাক্রমে লিখে যেতেন।”

ফজলুক হকরা যেমন বাংলায় লিখতে অনভ্যস্ত ছিলেন, তেমনি মাদ্রাসা-শিক্ষিত মুসলমান শিক্ষিতরা বাংলা থেকে কতটুকু দূরে যেতে বাধ্য হতেন, তারও একটা উদাহরণ মোজাফফর আহমেদের নজরুলস্মৃতি থেকে দেয়া যেতে পারে, একই সাথে ঘটনাটিতে বাংলাভাষী হিসেবে মোজাফফর আহমেদদের ক্রমজাগরিত আত্মসচেতনতাও লক্ষ্যণীয়। পরবর্তীতে পুলিশের চর প্রমাণিত একজন সম্পর্কে তাঁর বিবরণঃ “মসউদ আহমদকে অন্য কারণে আমি পসন্দ করতাম না। বাঙালি হয়েও বাঙালি মুসলমানদের সঙ্গেও সে উর্দুতে কথা বলতো। এটাই ছিল কারণ যার জন্য তার সঙ্গে আমি কখনও ঘনিষ্ঠ হইনি। ... শুনে আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম যে মসউদ আহ্‌মদ বাংলায় কথা বলছে, যদিও ভালো বাংলা বলার চেষ্টা করে সে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিল। সে ‘সমস্যা’কে উচ্চারণ করছে ‘সমিস্যা’। তখন বুঝেছিলেম যে শিশু বয়স হতেই মস্‌উদ আহ্‌মেদ মাদ্রাসায় পড়েছে, বাংলা লেখা-পড়া কখনও করেনি। তার মাতৃভাষা ছিল চাটগাঁর বিশিষ্ট বুলি। সে বুলিতে সে বাইরের লোকের সঙ্গে  কথা কখনো বলত না।”

বাঙালী মুসলমান যেমন নিজভূমে পরবাসী মন নিয়ে বাস করেছেন, তেমনি ভাবে জয়া চ্যাটার্জির ভাষ্য অনুযায়ী “হিন্দু বাংলাকে সমরূপে দেখানোর চেষ্টায় বাংলার সত্যিকার বৈচিত্রপূর্ণ সহঅবস্থানকারী অথচ প্রতিদ্বন্দ্বী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ঢেকে রাখারও চেষ্টা করা হয়”... ১৯৩২ সালে ‘হিন্দু নেতৃবৃন্দের ঘোষণাপত্র’ নামে অন্য এক স্মারকলিপিতে ঘোষণা করা হয়: “শিল্প, সাহিত্য ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সমগ্র ভারতে হিন্দু বাঙালিদের সাফল্য সবার চেয়ে বেশি; অথচ বাংলায় মুসলমান সম্প্রদায় এমন কোন ব্যক্তিকে সৃষ্টি করতে পারেনি যে ঐসব ক্ষেত্রে সর্বভারতীয় প্রসিদ্ধি অর্জন করেছে।” আঞ্চলিকতা ছাপিয়ে এবার সাম্প্রদায়িকতাই প্রধান ঘটনায় পরিণত হল রাজনীতি এবং সংস্কৃতিতে; কাজী নজরুল কিংবা মোজাফফর আহমেদের মত ব্যক্তিত্বরা শত চেষ্টা করেও তিরিশের দশকের পর থেকে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকা মুসলিম সাম্প্রদায়িক চেতনার উত্থানকে রোধ করতে পারেননি, যেমনটি পারা যায়নি হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাকেও রোধ করতে। ফলে মুসলমানদের দিক থেকে তারা অল্প ক’জন ছিলেন বলা যায় ব্যতিক্রম, মধ্যবিত্ত অধিকাংশ মুসলমান বাঙালি সংস্কৃতির অনেকটাকেই নিজের সংস্কৃতি বলে স্বীকারই করতে চাইতেন না।

’৪০ একদম শুরুতে স্বপ্নের পাকিস্তানকে ‘ফাকিস্তান’ হিসেবে অভিহিত করায় নজরুল তাই বিশেষভাবে বিরাগভাজন হযেছিলেন নিজ সম্প্রদায়ের কাছে, সর্বত্র তখন পাকিস্তান আন্দোলন তুঙ্গে উঠছে। তাই  দ্বিতীয় পর্যায়ের নবযুগ পত্রিকায় তার ‘বাংলা বাঙালির হোক’ আহ্বানটি উভয় সম্প্রদায়েরই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর অচিরাৎ মুসলমান মধ্যবিত্তের নিজ সংস্কৃতির প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেল, বদরুদ্দীন উমর ‘মুসলমানদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ প্রবন্ধে তার বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, ‘মুসলমানদের যে দৃষ্টি দেশের প্রতি এতকাল ছিল মমতাহীন, সেই দৃষ্টিই আচ্ছন্ন হলো স্বদেশের প্রতি প্রেম ও মমতায়। ১৯৪৭ সাল থেকে ভাষা ও সংস্কৃতির সংগ্রাম তাই অনেকাংশে তাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনেরই সংগ্রাম। যে মধ্যবিত্ত মুসলমান নিম্ন অবস্থা থেকে উন্নতি লাভ করে দেশের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে উদ্বিগ্ন হত এরপর থেকে তার সে উদ্বেগের অবসান হতে শুরু করল। বাঙালী পরিচয়ে সে আর লজ্জিত হল না। যে চিত্ত ছিল পরবাসী, সে চিত্ত সচেষ্ট হলো স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে।” সেই দলে দলে নিজ মনোভূমে স্বদেশকে খুঁজে পাবার, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিকে ভালবাসার, রীতিমতো সংগ্রাম করে পহেলা বৈশাখ আর রবীন্দ্রনাথকে প্রতিষ্ঠিত করার অসাম্প্রদায়িকতার যুগ হবার যুগের আগে তাই নজরুল-মোজাফফররা ছিলেন অল্প কিছু ব্যতিক্রম। 

 পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তাই একটা বড় উদ্‌যোগ হয়েছিল নজরুলের খন্ডিত রূপ উপস্থাপন করে তাকে কেবল মুসলমানিত্বের প্রতিভূ হিসেবে হাজির করার, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ভাষায় “রবীন্দ্রচর্চার বিকল্প হিসেবে মুসলিমান নজরুল ইসলামকে বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত করার... এই নজরুল চর্চাও ছিল আসলে নজরুল বিরোধিতাই। ” কিন্তু নজরুল পাকিস্তানের জন্য অস্বস্তিকর যে ছিলেন, সেটাও ঢেকে রাখা যায়নি, ওই একই প্রবন্ধে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী উল্লেখ করেছেন গোলাম মোস্তফার কথা, যিনি “নওবাহারে ধারাবাহিক প্রবন্ধ লিখে প্রমাণ করছিলেন যে, নজরুল কাব্যের বহুলাংশ ইসলামের তো বটেই, তামুদ্দুনিক পাকিস্তানেরও বিরোধী। তাই নজরুল কাব্যের অবাঞ্ছিত অংশ বর্জনা করবার আহ্বান তিনি জানিয়েছেন ঠিক সেই কারণেই যে-কারণে প্রায় একই সময়ে সৈয়দ আলী আহসান বলেছিলেন প্রয়োজনবোধে রবীন্দ্রনাথকে বর্জনের কথা।” 

 আজকে রবীন্দ্রকেন্দ্রিক গোঁড়া বাঙালিপনা যতই কৌতুককর ঠেকুক, পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রনাথকে পূববাংলার বাঙালি মনন থেকে মুছে দেবার রাষ্ট্রীয় উদ্‌যোগের বিরুদ্ধে রীতিমত লড়াই করতে হয়েছে, লড়তে হয়েছে পহেলা বৈশাখের বাঙালি প্রতীকটিকে রক্ষার করার জন্য। জীবনানন্দ দাশের একটি প্রবন্ধে দেখতে পাই বিভাগোত্তর বাংলা ভাষার ভবিষ্যত নিয়ে তাঁর আকূল উদ্বেগ, পশ্চিমবাংলা একটা জনভারক্লিষ্ট ক্ষুদ্র প্রদেশমাত্র, আর পূববাংলা চলে গেছে উর্দূর করায়ত্তে। পূববাংলার মানুষের ‘বাঙালি’ আর ‘মুসলমান’ এই দুই পরিচয়ের দ্বন্দ্বে জীবনানন্দ দাশ মোটামুটি নিশ্চিতই ছিলেন বাংলার পরাজয়ই ঘটবে, যদিও কিছু আশাবাদও তাঁর ছিল। তাঁকে দোষ দেয়া যাবে না, পূববাংলার উচ্চকোটির মানুষেদের বড় একটা অংশও কার্যত সেই রকমই ভাবতেন, কিংবা অন্তত সংশয়ে ছিলেন নিজেদের পরিচয় নিয়ে। সেই রকম একটা রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রঘন পরিবেশ আর প্রদেশিক শরিফ আদমীদের জানপ্রাণ চেষ্টার পরও ভাষার প্রশ্নটিই পূববাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রাণশক্তিতে পরিণত হয়েছিল। ভাষা যখন জাতীয় চেতনার বাহন, বাংলা ভাষারও উৎকর্ষ তাই ষাটের দশকে জাতিয়তাবাদী সংগ্রামের ভেতর দিয়েই ঘটেছে। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে অজস্র লেখক তার প্রেরণায় সাহিত্য রচনা করেছেন,এই বাংলা চিরকালের বাংলা ভাষারই ধারাবাহিকতা, শুধু হয়তো সংখ্যাধিক্য আর শিক্ষার প্রসারের সুবাদে মুসলমানী সমাজের চিত্র আর লব্জও তাতে সমমাত্রায় উঠে আসতে এবং প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করেছে। 

চ. নিরুদ্বেগ উদ্বেগ

ভাষার মাসে ভাষার প্রতি ভালোবাসা এবং উদ্বেগ প্রকাশ পূর্ববঙ্গের দস্তুর। সেই ঐতিহ্য রক্ষা করেই গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ‘ভাষাদূষণ নদীদূষণের মতোই বিধ্বংসী’ শীর্ষক একটি রচনা প্রকাশ করেন । কিন্তু ঝামেলা একটা বাধে, উদ্বেগ তাৎক্ষণিক আইনী উৎকণ্ঠায়ও রূপান্তরিত হয়। ওইদিনই, বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ অন্তর্বর্তীকালীন দূষণ, বিকৃত উচ্চারণ এবং ‌’অবক্ষয় রোধে’ আদেশের পাশাপাশি রুলও জারি করেন।

বাংলাদেশের মহামান্য আদালত বাংলাদেশস্থ লোকজনের বাচনভঙ্গীকেও আদালতের হুকুমাধীন অঞ্চল গণ্য করে বাংলাভাষার আরেকজন খ্যাতনামা অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে প্রধান করে একটি পরিষদ গঠন করেন এই বিষয়ে ভূমিকা গ্রহণের জন্য। ঢাকা প্রকাশের পূর্বোক্ত নিবন্ধের ভাষায়, “সোমপ্রকাশ সম্পাদক ... বলিয়াছেন বাঙ্গালীরা যে মকদ্দমা প্রিয় বলিয়া খ্যাত, তাহা কেবল পূর্ব্বাঞ্চলীয় দিগের নিমিত্ত”, তারই আর একটি নিদর্শন এই মোকদ্দমাটি, জানি না পূববঙ্গের মাঝেও আবার যে দক্ষিণবঙ্গীয়দের এই বিষয়ে সুনাম সুবিদিত, তাদের কেউ ফরিয়াদী কি বিচারক হিসেবে ছিলেন কি না। খুব সম্ভবত ‘কাইজ্জা’ সংস্কৃতিজনিত অজস্র মোকদ্দমার নিচে এই বিবাদটিও পরের ফাল্গুন পর্যন্ত চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহে যে কথাবার্তাগুলো উঠে এসেছে, সেগুলো কিছুটা নড়েচড়ে উঠবারই মতো। আদালত কর্তৃক প্রদত্ত দায়িত্ব উপলক্ষেএকটি জাতীয় দৈনিক অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে, সেখান থেকে দুটো দারুণ উদ্ধৃতি দীক্ষিত পাঠকের অপ্রাসঙ্গিক লাগবে নাঃ

“মুসলমান আত্মীয়তাবাচক শব্দ এখনও হিন্দু বাঙালির কাছে অপরিচিত। উত্তর আমেরিকায় বিভিন্ন সম্মেলনে পশ্চিমবঙ্গের প্রবাসীদের বলতে শুনেছি, আপনাদের (বাংলাদেশের) বইয়ে যে সব ধর্মীয় বা আত্মীয়তাবাচক শব্দ লেখা থাকে, তা আমরা বুঝতে পারি না। বইয়ের শেষে যদি শব্দের অর্থ লিখে দেন, আমাদের জন্য সুবিধা হয়। আমার জবাব দেওয়ার আগেই সমরেশ মজুমদার প্রবলভাবে আপত্তি করলেন এবং বললেন, ‘কেন, আমরা যখন হিন্দু আত্মীয়তাবাচক বা ধর্মীয় শব্দ ব্যবহার করি, তখন কি তার শব্দার্থ লিখে দিই?’ ”

“আমি যখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বা সমরেশ মজুমদারের উপন্যাস পড়ি, তখন তেমন পার্থক্য লক্ষ্য করি না। কিন্তু হয়তো অন্য কোনো লেখকের লেখায় এই পার্থক্যটা ধরা পড়ে। কলকাতার সংবাদপত্রে কিন্তু আমাদের এখানকার সংবাদপত্রের চেয়ে বেশি আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করে। তার পরও বলব, সাহিত্যে একটা পার্থক্য আছে। পশ্চিমবঙ্গের যে জীবনযাত্রা, যে রাজনীতি, যে অর্থনীতি তা আমাদের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি, রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে সমাজের যে ছবিটি সাহিত্যে পাওয়া যাচ্ছে, তা অভিন্ন নয়।”

পর্যবেক্ষণ দুটোই মুগ্ধ হবার মত। কিন্তু সাক্ষাতকারটির শিরোনাম “আমাদের একটি ভাষা পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন”, সেই ভাষা পরিকল্পনার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে ‘ভাষার অরাজকতা’ দূর করতে বাংলাসাহিত্যের এই অন্যতম জীবিত কিংবদন্তীর পরিকল্পনাটিতে আবারও দেখি সেই রক্ষণশীলতারই প্রকাশঃ

“অরাজকতা নানা ধরনের। শব্দব্যবহারে অরাজকতা একটি। একটি ছোট উদাহরণ দিই। ‘অন্যতম’ শব্দের অর্থ ‘অনেকের মধ্যে একজন’। কিন্তু পত্রপত্রিকায় লেখা হয় ‘অন্যতম একটি কারণ’। ভুল বানান, ভুল বাক্যব্যবহার এবং ইংরেজি শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহার চলছে। এফএম রেডিওতে হিন্দি, ইংরেজি ও বাংলার মিশেলে এক ধরনের জগাখিচুড়ি ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। তারা যেমন তরুণদের লক্ষ্য করে এসব ভাষা ব্যবহার করছে, তেমনি তরুণেরাও মনে করছে, এটাই তাদের শিখতে হবে। মোবাইল ফোনে যে ইংরেজি ব্যবহার করা হয়, সেটি কিন্তু লিখিত ইংরেজি ভাষা নয়। মৌখিক ভাষা, আড্ডার ভাষা এসবের মাধ্যমে বন্ধুদের সঙ্গে মতবিনিময় করা যায়। কিন্তু আমরা এটাকেই যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছি। বানানের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনা প্রয়োজন। প্রথম আলো যেমন ভাষারীতি চালু করেছে, অন্যান্য পত্রিকাও তা করতে পারে। কিন্তু বানান ইত্যাদির ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন রীতি অনুসরণ বাঞ্ছনীয় নয়।”

আতঙ্কিত হবারই কথা, কারণ সাক্ষাতকারটি দেওয়া হয়েছে আদালত কর্তৃক ভাষা দূষণ প্রতিরোধের দায়িত্ব পাবার পর; আশঙ্কামুক্ত হই, কেননা আদালাতের রায়ের চেয়ে আরও বড় রায় আছে, সেখানে ভাষার প্রশ্নে জনতার স্বরই সবচে বড় আদালত। ১৯১৩ সালে রবি ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার পাওয়াটাকে যদি একটা চূড়াবিন্দু ধরি, তারও বছর কয়েক পর, আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে রবি ঠাকুরের বয়স যখন প্রায় ষাট, বাংলা ভাষার চলিত রীতি প্রবর্তনের অন্যতম কাণ্ডারি প্রমথ চৌধুরী নতুন জন্ম নে‌য়া ‘সাহিত্যিক’ শব্দটার যথার্থতা নিয়ে আপত্তি জানানঃ ‘নব্য-সাহিত্যিকদের বিশ্বাস যে, বিশেষ্যর উপর অত্যাচার করিলেই তা বিশেষণ হয়ে ওঠে।’ প্রমথ চৌধুরীর মতে বাংলা ও সংস্কৃত কোন ভাষাতেই ‘সাহিত্যিক’ শব্দটা বৈধ নয়। এরও বেশ কিছুকাল পর অবশ্য (সম্ভবতপূর্ববঙ্গসুলভ) প্রমাদজাত ‘সাহিত্যিক’ শব্দখানা রবি ঠাকুরেরও অভিধানে ঠাঁই পায়; সাহিত্যিক শব্দটার অভাব পূরণ করে এমন শব্দ আজ কি আর বাংলা ভাষায় আছে! প্রমথ চৌধুরী ওই একই লেখার আরেকটা মজার মন্তব্য “ ‘ভাষাভাষী’ সমাসটা এতই অপূর্ব যে হাসাহাসি করাছাড়া আর কিছু করা চলে না।” ভাষাভাষী শব্দটা আজ আমরা কত সহজে ব্যবহার করি, রবীন্দ্রনাথ করেননি, যদিও তিনি ‘আইরিশভাষী’ কথাটা ব্যবহার করেছেন। 

ভাষা তার নিজের সুবিধার্থেই অর্থের সীমা সম্প্রসারণ করে, প্রয়োজনের চাপে নতুন শব্দও নির্মাণ করে, প্রয়োজনের তাপে অশুদ্ধ শব্দকে শুদ্ধিকরণ করে নেয়। ব্যকরণের আদালতের রায় যাই হোক না কেন ‘সাহিত্যিক’ আর ‘ভাষাভাষী’ উভয়টির প্রয়োগ নিয়ে যেমন আজ আর কেউ প্রশ্ন করবেন না, তেমনি আদালতের নিয়োগপ্রাপ্ত সম্মানিত তদাকরকারীদের রায় যাই হোক না কেন, অন্যতম শব্দটির অর্থের যে সম্প্রসারণ ঘটে গেছে, তাকে আর পুরনো সীমায় বেধে রাখা যাবে না। কী ক্ষতি ‘অন্যতম ব্যক্তি’ বলতে ব্যক্তির বেলায় যেমনটা আমরা বুঝি, ‘অন্যতম গ্রন্থ’ বলে ব্যক্তির কীর্তিকে তেমনি আমরা বোঝাতে পারি? ভাষা এইভাবেই নিয়ত তার অর্থ সম্প্রসারণ করে চলে। 

বরং বাংলা ভাষার সত্যিকারের বিপদ যদি কোনদিক দিয়ে থাকে, সেটা সমাজের উচ্চক্ষেত্রগুলোতে তার চর্চা না করার ফল। শৌখিন রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চা দিয়ে তাকে সামান্যই রক্ষা করা যাবে। আমরা কি খেয়াল করছি রবীন্দ্র-নজরুলের ব্যবহার করা শব্দগুলোও তরুণতর প্রজন্মের কাছে অস্পষ্ট ঠেকছে, ক্রমে তারা ধূলিমলিন হয়ে পড়বে? জায়গীর বাদ যাক, কেন না প্রথাটাই নেই, কিন্তু বাংলাভাষা এখন শুধুমাত্র আটপৌরে জীবনেই ব্যবহৃত হচ্ছে, সমাজের-রাষ্ট্রের উচ্চস্থানগুলো থেকে সে কোন রসদ সরবরাহ পাচ্ছে না। উচ্চশ্রেণির সন্তানেরা যদি শিক্ষার প্রধান অংশ ইংরেজিতে সম্পন্ন করেন, আমলাতন্ত্র-সামরিকতন্ত্র-বনিকতন্ত্র সর্বত্র যদি ইংরেজিই দাপুটে ভাষা হয়ে থাকে, মায় আদালতে পর্যন্ত যদি প্রায় সমুদাংশ সওয়াল-জওয়াব মাতৃভাষায় না হয়; তো বাংলার ওপর ইংরেজির প্রভাব শুধু হুকুম বলে নড়ানো যাবে না, তার আগেই অজস্র হাকিম সরে যাবেন। কিন্তু যদি কোন হাকিমের হুকুমে যদি এই আদেশ কার্যকর করা যায় যে, বঙ্গদেশে আজ থেকে সরকারি-বেসরকারী কোন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে উপযুক্ত কারণ না দর্শিয়ে বাংলা ছাড়া আর কোন ভাষায় পরীক্ষা নেয়া যাবে না, বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কোনো কর্মক্ষেত্রে-আদালতে সাধারণ মানুষের অবোধ্য কোন ভাষায় আলাপ করা যাবে না, সকল পাঠ্যগ্রন্থ অবিলম্বে বাংলায় প্রণয়ন করা হবে -- হুকুম করে ভাষাদূষণ বন্ধ করতে হবে না, আপনাতেই সেখানে প্রাণের স্রোত বইতে থাকবে। 

কর্তাদের উতলা উদ্বেগ যে কল্‌ব থেকে এসেছে, তার প্রমাণ তো আমরা তাদের নিরুদ্বেগ ভেসে যাওয়ার মাঝে পাই না।


ঈদ সংখ্যা ২০১৩, আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত।

ভানুর কৌতুকটির উল্লেখ পেয়েছিলাম ইতিহাসবিদ আহমেদ কামালের আড্ডায়; ‘সঙ্গে’ আর ‘সাথে’ বিষয়ক রবীন্দ্রনাথের উল্লেখটির জন্য বাংলার অধ্যাপক মোহাম্মদ আজমের কাছে কৃতজ্ঞ আছি।

 



116 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ অপর বাংলা 
শেয়ার করুন


Avatar: b

Re: পূব-পশ্চিমের বাংলা ভাষা

খুব ভালো লাগলো। ধারে ও ভারে দুদিকেই। আরো বার দুয়েক পড়তে হবে।
Avatar: Biplob Rahman

Re: পূব-পশ্চিমের বাংলা ভাষা

ভাষার গুরু গিরি ও সংকট নিয়ে অনেকদিন এমন গুরুতর লেখা পড়িনি। ধন্যবাদ ফিরোজ, অনেক কিছু হাতেনাতে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য। চলুক।
Avatar: কল্লোল

Re: পূব-পশ্চিমের বাংলা ভাষা

আমরা তো জানতাম যে ভাষা অন্য ভাষা থেকে যতো বেশী গ্রহন করে, সে ভাষা ততো বেশী সম্বৃদ্ধ হয়। এই সব স.ম.র মতো অশিক্ষিত লোক কি বললো, তাতে কী আসে যায়। উনি চরটে জম্মো নিলেও সৈয়দ মুজতবা আলির মোজার সুতো হবার যোগ্যতা অর্জন করতে পারবেন না। কিন্তু আলি সায়েবের ভাষা, সে তো অনন্য এক অভিজ্ঞতা। কারন তার পরতে পরতে উর্দু, ফারসি, ফরাসী, জর্ম্মন।

বাঙ্গালদের উচ্চারণ নিয়ে চিরকালই নানান পরিহাস। সে পরিহাস মেদিনীপুরী, বাঁকুড়ার ভাষা নিয়েও আছে।
কিন্তু সেই অর্থে ভাষার বাঙ্গাল বা এদেশী বলে কিছু হয় কি? গোপীবল্লভপুরে মানুষ ওড়িয়া মেশানো বাঙ্গলা বলে, সেটাও বাঙ্গলা ভাষা, চট্টগ্রামে মানুষ যে ভাষায় কথা বলে তাতে আরাকানী ও বর্মী ভাষার গন্ধ বেশ প্রবল। সেটাও বাঙ্গলা ভাষা। মাঝের অঞ্চলগুলোতেও কত কত বৈচিত্র। তারপর ফার্সী, উর্দু ,পর্তুগিজ, ইংরাজি এতো সব ভাষা থেকেও দুহাত পেতে নিয়েছে যে ভাষা, সে সব মুছে "স্ট্যান্ডার্ড" বাঙ্গলা ভাষা দাবী করেন যিনি, তাকে মুর্খামীতে নোবেল দিলেও কম হয়।

Avatar: ফিরোজ আহমেদ

Re: পূব-পশ্চিমের বাংলা ভাষা

ধন্যবাদ, যারা পড়েছেন ও মন্তব্য করেছেন, সবাইকে।

জনাব কল্লোলের মন্তব্যটা বিশেষ করে ভাবার মতো। পূব ও পশ্চিম বাঙলার মাঝেও সত্যিই তো অনেকগুলো রীতি আছে। আমার এক চাঁটগার বন্ধু দাবি করেন তারা এমন সব ধ্বনি শুনতে পান, বাঙালীর কানে তা পরশিবে না। সিলেটি বহু ধ্বনিও বুঝি না। কিন্তু মোটা দাগে এই বিভাজনটা সৃষ্টি হয়েছে ঐতিহাসিকভাবেই, সেটাও অস্বীকার করার খুব উপায় নেই।
মানবাঙলার বিষয়েও কথা সেটাই। নানান সাহিত্যিক কারণেই এর জন্ম। ফলে সেই কয়েক শত বছর ধরে কবিরা যেমন আঞ্চলিক বাঙলায় তাদের কবিতা লিখেছেন, তেমনি বৃহত্তর বঙ্গভাষীর কাছে তার সংবেদন পৌঁছবার উচ্চাভিলাষে মানবাঙলা বলে তিনি যা মনে করেন, সেটাতে লিখেছেন। নানান আবর্তে নদীয়াই তার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ালো। এই মানভাষায় সাহিত্য রচনার সুবিধা অজস্র শুধু না, এ্টা কোন স্থির মানও না। সেই মানবাঙলার কাঠামোটা একটা সচল বিকাশের পরিণতিতে কোলকাতার উপনিবেশের অভিজ্ঞতা পাড়ি দিয়ে আজকের আরও নিত্য নতুন পরিবর্তনের ঝোঁকে এগিয়ে চলেছে। একে উড়িয়ে দেয়া যাবে না হয়তো।
কিন্তু তাই বলে উড়িয়ে বা গুড়িয়ে কিংবা পাত্তা না দেয়ার বিদ্রোহী চেষ্টাগুলোর গুরুত্বও খুব কম না। এই বৈচিত্রেই ভাষার পরিসর বৈচিত্রপূর্ণ হয়। আরবী ভাষার বিকাশের ইতিহাস নিয়ে একটা আলোচনায় দেখেছিলাম আঞ্চলিক ভাষাগুলোর অনুসন্ধান কিভাবে পরিভাষা নির্মাণে আর শব্দভাণ্ডার বিস্তারে কাজ করেছিল সেই উমাইয়া-আব্বাসী আমলে। আঞ্চলিক ভাষার এই শক্তিমত্তা জীবনানন্দ দাশও খেয়াল করেছিলেন, বরিশালের ভাষা নিয়ে তার ভাবনা খেয়াল করা যাবে বাঙলা ভাষার ভবিষ্যত নিয়ে তাঁর একটা প্রবন্ধে।
Avatar: swarnendu

Re: পূব-পশ্চিমের বাংলা ভাষা

লেখাটাও ভাল...এবং কল্লোলবাবুর মন্তব্য ও ...... তবে হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথ ব্যবহার করেছেন এইটা যুক্তি হিসেবে কোন যুক্তি নয়... রবীন্দ্রনাথের বিষয়ে বেশিরভাগ বাঙ্গালি যুক্তির বাইরে অবশ্য... কিন্তু সে দিকে না গিয়েও... অন্তত বিদেশি শব্দ ব্যবহার এ রবীন্দ্রনাথ কে সালিশ মানার কোন কারণ নেই... সৈয়দ মুজতবা আলি থাকতে ... কে কটা বিদেশি শব্দ ব্যবহার করেছেন তার থেকে বেশি জরুরী হল করে কি জিনিস দাঁড়িয়েছে... আলি সাহেবের ভাষা বাংলা ই... এবং বিদেশি শব্দের গন্ধ ম ম করেও তা বাংলা ই...
ভাষার বৈচিত্র্য ভাষার সম্পদ, তার শক্তি... একজন সাহিত্যিককে এর উলটো কথা বলতে দেখলে দুঃখ হয়। আর তাছাড়া উর্দু-আরবি-ফারসি শব্দ বাদ দিতে গেলে ইংরাজি শব্দ আগে বাদ দেওয়া উচিৎ। প্রসঙ্গত ফরাসিরা মানতে না চাইলেও সাধারণভাবে ইংরাজি ফরাসির চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হওয়ার একটা কারণ এইটাও যে ইংরাজি বাকি সব ভাষা থেকে কোন ছুঁতমার্গ ছাড়াই শব্দ ও বাক্যবন্ধ গ্রহণ করেছে। লেখাটার জন্য আবারো ফিরোজ বাবুকে অভিনন্দন।

Avatar: দেব চৌধুরী

Re: পূব-পশ্চিমের বাংলা ভাষা

জিম্মা আমার মায়ের মুখেও অনেক শুনেছি মনে পড়ছে। মা-বাবা ফরিদপুর থেকে কোলকাতায় এসেছিলেন ১৯৪৫-এর আগে, বাবার চাকরীর সূত্রে। আমার মনে হয় এই শব্দগুলো আমার 'চৌধুরী' পদবীর মত একই সূত্র ধরে এসেছে, উর্দু নয়, বরং আরবী ও পার্সি থেকে, যেদুটো ভাষা চাকরি পেতে জানা দরকার হত। সমরেশ মজুমদার-এর দাবি মানলে ত আমার পদবীটাও বাদ দিতে হয়। আরেকটা পদবী 'কারকুন'। অলিয়ঁসের ক্যান্টিনে বসে অভিজিত-দা নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, "আমার নাম অভিজিত কারকুন। 'কারকুন' বাঙালি।" পরে রমেশ মজুমদারের ইতিহাসে পড়েছি 'কারকুন' মানে রেভিন্যু ক্লার্ক। সম্ভবত ওনার কোন পূর্বপুরুষ কোন নবাবের অধীনে চাকরি করতেন।
Avatar: কল্লোল

Re: পূব-পশ্চিমের বাংলা ভাষা

সম'র যুক্তি ও দেববাবুর পদবী ওড়ানোর শ্লেষ পড়ে মনে পড়লো - পদবী ওড়াতে গেলে অনেক পদবীই উড়বে, তার মধ্যে একটা কিন্তু "মজুমদার"। ;-)) ওটি তালুকদার, তহসীলদার, চৌধুরীর মতোই বাংলায় পাঠানরাজের দেওয়া পদবী।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন