বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

কাব্যি

গাজন - সোমনাথ রায়
 



ফেটে ওঠা মাটি এই চৈত্রের বুকে- রক্ত চেয়েছে , মাগো! এরকমই সন্তাপ আঁধি ফিরে ফিরে আসে নিযুত বছরে তার তারাচিহ্ন ছাপে ধরে রাখি, আঙুলে ছুঁচের ডগা জিহ্বাগ্রে বর্শা আর বিভিন্ন অস্তরে ছিঁড়ে ফেলি চামড়ার গ্লানি প্রগাঢ় উপোস অন্তে সোঁদাসোঁদা গেটের গভীর চোখে বরষা আঁধারঘন কালো মেঘ মেশে ধানক্ষেতে, গাভীটিও ঘরে ফেরে ফেনিল এই উৎসব শেষে -মহামারী রোগ মৃত্যু আদি ক্রমশঃ চৈত্রে এসে পড়ে; অনেক বসন্তের এই পথ, অনেক কূজন আর অনিবার্য যা যা দংশন বুক থেকে মাংসের মত খুবলেখুবলে খায় চোখ, স্তন্য, প্রত্যঙ্গসকল- উপবাস শেষে তাই কাঠের মাচায় উঠে আসি , বৎসরান্তে জানি কণ্টকে ঝাঁপ দিতে হবে। তারপরই প্রখর নূতন-

 


 

 

লিটলমেঘ মেলা- শু ভ্রনীল সাগর




অষ্টবসুর আট আহ্ণিকে মৈথিলি শব। রোদ রাইসর্ষের মাসতুতো দিদির দ্বিতীয় পক্ষ ননদের মেয়ের মামী হ’লেও, সম্পর্কে আমার বউদি লাগে। খেজুর রসে ধোয়া চোখ জারুল ছায়া। দূর থেকে যতদূর বোঝা যায়, গাছের গুঁড়িরা অবসর ঘাস নয় - ফুলকাটা উলেন মন। পাখি-পাতা যাইহোক এইসব বালিহাঁস ওম। খানিকটা হাঁটা হ’লে এবার থেমে যাই। আমাদের শুরু হোক শুরু থেকে। কলাপাতা ছিড়ে গেলে চিঠি হয় জানি। তুমি তো পড়নি মেঘদূত, তাই আক্ষেপ আদিনাথ চূড়াময় অচেতন অহম। এই মেলা শটিবনে, চোখ রেখো জোনাকীর জলজ মিলন...

                       আমারও ফর্মা দুই ষাট পাওয়ারের হলুদ জীবন....

 

 

 


 


গণেশ পাইনের রানি - শিবাংশু দে



সে এক অসম্ভব তিলোত্তমা
এই রৌদ্রের পৃথিবীর কেউ নয়
ঘাম মৃত্যু অপমানসিক্ত লালা
তা'কে ছুঁতে কখনও পারেনি

যখন বায়োস্কোপে দোলে
তার বিদায়বেলার মালাখানি
জানালার পাশে উদ্ভাসিত
কাননবালার কল্কা চোখ

নির্ঝরস্বপ্নলীন বিনীত নয়ন
প্রবাদের পাখি যেন
উত্তরের কানাগলি ফেলে উড়ে
গেছে সাতাশ তারায়

ঘাসপাতা লতাখড় রাজার করোটি
সযত্নে নামিয়ে দেয় মুখখানি
বিষণ্ণ ভেলভেট আর জরির বালিশ

অর্ঘশিমুলের প্রেমে ছাই ওড়ে

সে এই অপরাহ্নে পরিজনচ্যুত
পূজারির কেউ নয়

রং তেল তুলি ও টেম্পেরায়
সারাদিন কোমল ঋষভ

আমার জন্য তার অসম্ভব
খেলা....
 



না-হওয়া কথারা- সোনালি সেনগুপ্ত 



পাতার মাঝখানে চুঁইয়ে পড়ছে জল
উঠে রয়েছে একটা একলা সবুজ শিরা

ওই সরু পিছল পথে হাঁটতে গিয়ে
আমার চোখে ধাঁধা, পায়ে পতনের টান
ছাড়ান আছে কি তাও? চৌকাঠে আলতার বারকোশ
এতটা ট্রাপিজ পথ বেয়ে
পায়ের ছাপ ফেলতে ফেলতে সেই ঘরেই ঢুকতে হবে
তবে আর এই টালমাটাল বর্ষাদিনের
অনুবাদ করে লাভ?

কফির দোকানে বসে থাকলে চোখ জ্বালা করে
ঝকঝকে এপ্রনের নিচে
আমি দুধ-গন্ধ পাই, পোড়া লাগা, উথলানো দুধ
সেদিন সমৃদ্ধি ছিল, আজ দুর্নামে অপচয় বলে
মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে চেনা মেঘেরা,

টানেলের দুপাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়া বালুচরীর শ্যামশ্রী
আমাকে বিভ্রান্ত করে। শাড়ির কুঁচির দিক ঠিক করতে গিয়ে
আমি হারিয়ে যাই বিভুল অরণ্যে, মাদলের কথকতায়
কথাদের ধরে এনে কাগজে আটকাই, আর শরীর থেকে শষ্প মুখ তোলে
নর্মদার উত্সমুখ , খুঁজলেই পেয়ে যাব, সে কোন দিকে?
বোকার মত দাঁড়িয়ে থাকি, ঠাহর হয়না
কোন দিক থেকে ভেসে আসছে ঢেউ এর শঙ্খ

ঘরময় ভেজা কাদা-পায়ের দাগ ছড়িয়ে
উপর্ঝুরন্ত ছোটাছুটি করে আমার মেয়ে দুটো।
মধ্যশিরায় দাঁড়িয়ে
আমি চোখ দিয়ে সুগন্ধ আদর ঘষি ওদের সারা গায়ে
মা-রে, হেঁটে এ রাস্তা পেরোতে
এখনো কতদিন বাকি! হারিয়ে যাসনে যেন, সোনা।
   


দৃষ্টিকোণ -   শান্তনু রায়

 

আশ্চর্য হ­য়ে আ­ছে নক্ষত্ররা
কাঁচা ­লোহার গ­ন্ধ আমা­দের বুকে ভ­রে আ­চে
আবার অ­নেকদূর
রাত্রির সমস্ত ­ছেঁড়া ­মেঘ আমা­দের স­ঙ্গে
তা­দের অস্থানিক ­বোঝাপড়ায়
গোটা আকাশটাই হ­য়ে উ­ঠেচে নকশিকাঁথার মাঠ
তুমি আমা­কে একটা ভাল্লুক ­দেখালে
আমি ­যেটাকে এতক্ষণ মানু­ষর মুখ ভাবছিলাম
আমরা ঘু­মাই না
সারারাত জানলার ধা­রে ব­সে ­মেঘছবি ­খেলি

কাল­কের সকালটা আমি ­তোমার ­চোখ দিয়ে ­দেখব

 


 

মামুলি কথা-   মলয় ভট্টাচার্য
 



শুকনো হাওয়ার মরশুম
এখন সবাই চেপে হাসছে,মেপে কাঁদছে
চমকে উঠে
থিতিয়ে যাচ্ছে কথার খসখস

শুকনো ধুলোর মরশুম
কোমর থেকে চারিয়ে যাওয়া শিকড়বাকড়
এখন বেশ পোক্ত লাগছে
চেপে হাসছে,ঠিক ততটা মেপে কাঁদছে এখন সবাই

থাকতে থাকতে কখন হয়তো
উল্টে গেছে রঙের শিশি ----
পোকামাকড় মুখ ডোবাচ্ছে গরম রক্ত ভেবে
 

 


 
          মুকুর - শ্ব




কবিকে জিজ্ঞেস করো
ও মেয়েটি কে ?
ঐযে বারে বারে লেখার অলিন্দ জুড়ে
লং স্কার্ট , পায়ে তে ঘুঙুর

ওই যে পুরুষ
প্রতিটি লেখায় যার পশমের
ঘ্রাণ থাকে

পুরনো প্রেমিক ?
কলেজের ? আপিসের ?

হে পাঠক
হে সন্দিগ্ধ কপোত
মুকুর ভগ্ন হলে ,মুখে কি
জোয়ার খেলা মানা ?
 


মর্স কোড -  অধীশা সরকার

 


যাই, খানিকটা কানামাছি খেলে আসি।
 
সন্ধ্যে হলেই ভয় ভয় করে...
বাঘের অথবা বসন্তের ভয় নয়, এ ভয়টা অন্যরকম।
এ ভয়টা তলপেটের একটু ওপর থেকে কন্ঠার আগা পর্য্যন্ত উঠে এসে
বসে আছে রাজসিংহাসনে।
আগামী ভোটের আগে সে আসন টলানো যাবে না।
পরেও যাবে কিনা, জানা নেই।
 
অনেকেই জানে না, যে এই বছরটা শেষ থেকে শুরু হয়েছে।
... শুরুতে পৌঁছে শেষ হবে,
এবং আবার একটা মনোরম ডাস্টবিন উপহার দেবে।
যত জঞ্জাল জমা হয়েছে ঘরময়,
সবই তো নশ্বর নয়।
ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে তুলতে হবে অবিনশ্বর জঞ্জাল...
ন হন্যতে হন্যমান এ শরীরে...
কাজটা খুব কঠিন।
 
তার ওপর থেকে থেকে অবেলায় ঘুম পায়।
 
- হ্যাঁ গো... রাস্তাটা কোন দিকে?
- সেটা নির্ভর করছে তুমি কোথায় পৌঁছতে চাও তার ওপর।
- আর তেমন কোথাও পৌঁছনর যদি না থাকে?
- তাহলে যে কোনো রাস্তায় হাঁটলেই পৌঁছে যাবে ঠিক, যদি পেরোতে পারো যথেষ্ট পথ।
 
কতটা পথ যথেষ্ট? কতটা পথ?
সেই ক-বে থেকে খাচ্ছে, এখনো গিলছে না।
কণ্ঠনালিতে আটকে গেছে বিষ।
আটকে গেছে শব্দ... শব্দ... শব্দ...
লালন, লেনিন, লেনন। লেনন, লেনিন, লালন।
না না, ও কিছু না। টাং টুইস্টার।
অথবা, কোনো গোপন আঁতাত।
আলেয়ার মত জ্বলছে-নিভছে মর্স কোড।
 
কতটা পথ পেরলে তবে মানুষ চেনা যায়, মনের মানুষ চেনা যায়?

 



গুহালিপি - চিরন্তন কুণ্ডু



কেউ জানবে না । শুধু রাত্রি ধরে রাখবে জলছাপ ।
ভোর এসে দেখবে তার একটি দুটি রূপোলী পালক
উড়ে যাচ্ছে শূন্যপথে ।

আলোহাওয়া জানবে না । জানবে না ইতিহাস বই ।
দড়ির ওপর দিয়ে দমবন্ধ হেঁটে যেতে যেতে
দেওয়ালঘড়ির শব্দে নির্জন দুপুর
অন্ধকার সুড়ঙ্গের কালো রেলগাড়ি
কেঁপে উঠবে থরথর –
সেও জানবে না ।

শুধু রাত্রি ধরে রাখবে জলছাপ ।

অন্ধকারে লিখে রাখব তোমাকে যা কখনো বলিনি ।
 



  মনান্তর - নিশান চ্যাটার্জী 

লুকিয়ে রাখা কমণ্ডলু জল ছেটালো যজ্ঞময়,
শেষ বিকেলের আবছা আলোয়
অন্ধকারের বিরল ভয়
 
এসব কি আর ধর্মে সয়?
 
ধর্ম কিম্বা অধর্মতে
পুড়ছে সবই...
এই শহর।
 
কাছের যা সব দূর চলে যায়
মুখ-অচেনা পরস্পর।
 
কাষ্ঠবাড়ি তাঁতের শাড়ি উড়ছে ধোঁয়া নিরন্তর
তাড়িয়ে বেড়ায় হাল্কা চেনা বরফ ঘেঁষা মনান্তর।
 
বরফ পড়ে যজ্ঞজুড়ে, আগুন নেভে, উঠছে কাঁপ
মরচে পড়ে কাস্তে জোড়া, অস্ত্র ভোঁতা, ছিন্ন খাপ।
 
যজ্ঞ নেভে, মৃত্যুভীতি, কিম্বা বেঁচে থাকার ভয়
কেতন কোথায়, মরুৎকেতন?
উড়িয়ে দিলে শেষ বিজয়!
 
এসব কি আর ধর্মে সয়?              


 



স্বগতভাষণ -  সুমন মান্না



আমার কথার বেশিরভাগের
দায় নেই কাল জবাবদিহির
অস্থির-মতি শূন্য কলসী
মজা দিঘীর জন্মতিথির খোঁজে বেরোয়।
ত্রিসীমানায় কেউ কোত্থাও
থাকতে পারতো, যার চাহনি
সকাল সকাল চা বানাত
আদার কুঁচি থেঁতো করে।

এই প্রসঙ্গে কোন গানটি গাওয়া যাবে?
ঠিক করতেই দেরি হল,
রোদ চড়েছে, বাড়ছে আলো,
ভুল ধরাতেই ছন্দ ছিল ব্যক্তিগত, পথ হারালো।

আতান্তরে থমকে গিয়েও
চেনা হাতের লাগাম শাসন
ছন্নছাড়া রুখু-চুলের কথাগুলোর
কান পাকড়ে বাড়ি পাঠায় ধর্মপালন
স্নান করাতে গরম জলে।

দিঘীর বুকে সারা দিনমান
পাপড়ি ভাসে হৃৎকমলের।   
 


ফেরা-  মিঠুন ভৌমিক  
 




মেঘ হয়ে ফিরে যাওয়া, তার কাছে
ভাসিয়ে নিয়েছে ঘর, বুক, আর সে উঠোন
বৃষ্টিতে জমা জল, ঘোলা তবু নিজের মাটিতে।

সেইখানে জমা জল, পাক খায় খোঁপার মতন
নৌকাও ভাসে। শিরা উপশিরা ছোটে,
পাখিদের জলজ সবুজ শ্বাস মিশেছে নদীতে।

পাখির সবুজ শ্বাস, শান্তিতে খুলে থাকা ঠোঁট
ভিজে নৌকোর মত জেদ, আঙুলে মেখেছে।
দৃষ্টি আকাশবাতি, ঝোড়ো হাওয়া স্বস্তির দিন।

কাটাকুটি ভিজে চুল, ভাসমান জলযানে
এই ফিরে যাওয়া। শান্ত সবুজ ঘাসে আরামকেদারা
যেন শুয়ে আছে। বৃষ্টিতে জমা জল-

ঘোলা, তবু নিজের মাটিতে।





 

 চিত্রঃ মৃগাঙ্কশেখর গাঙ্গুলি



117 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ নববর্ষ ইস্পেশাল ২০১৩  কাব্যি 
শেয়ার করুন


Avatar: sosen

Re: কাব্যি

অনেক দিন পর নিশানের লেখা পড়লুম।
মিঠুনের লেখা টি আগেই পড়া, তা-ও আবার "শান্তিতে খুলে থাকা ঠোঁট "পড়ে ভারী আরাম হলো।
সবাই খুব ভালো।

Avatar: nina

Re: কাব্যি

বড় সুন্দর সবকটি----
স্বগতভাষণ---মনের মধ্যে গুনগুন করছে -----
ভুল ধরাতেই ছন্দ ছিল ব্যক্তিগত, পথ হারালো------

গুনগুন করছে--
বৃষ্টিতে জমা জল---
ঘোলা তবু নিজের মাটিতে-----


Avatar: ধুরন্ধর ঝাঁট

Re: কাব্যি

ভালো লাগছে


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন