বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

শহীদুল জহিরের গল্প ও আটকে-পড়া বাঙালির যুদ্ধ - দ্বিতীয় কিস্তি

মাজুল হাসান

( প্রথম কিস্তির পর )

জহিরের আগে-পরে সরাসরি যুদ্ধের ওপর অনেক গল্প-উপন্যাস লেখা হয়েছে। তবে সেসবের বেশির ভাগই সাহিত্যিক মূল্য বিবেচনায় এক-একটা অশ্বডিম্ব। কারণ, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের কতগুলো জেনারেল ফিচার ঠিক করে গল্পের সেট-আপ দেয়া হয়েছে। যেন, বিষয়টা এমন দাঁড়িয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের গল্প মানে—কিছু রেপ, হিন্দু নিধন, রাজাকারের দৌরাত্ম্য আর দলমত নির্বিশেষে বাঙালীদের তীব্র সম্মুখ সমর। ফলে, সেসব লেখার অনেকগুলোই সৎ ডকুমেন্টেশন হয়তো হয়েছে, কিন্তু ভাল সাহিত্য হয়নি। জহির হয়তো এই কথা উপলব্ধি করতেন। আর সে কারণেই হয়তো তিনি মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেছেন ভিন্ন ভাবে; এপ্লাই করেছেন নিত্য-নতুন টেকনিক। উপন্যাসের কথা আগেই বলেছি। তা বাদে, আমরা যদি “কুয়ো” গল্পটির কথা ধরি তবে এটাকে অবশ্যই একটা মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতে হবে। কিন্তু এটা কি কেবল যুদ্ধের কাহিনি, নাকি আরো বেশি কিছু? কোথাও কোনো বীরত্ব নেই, নেই রেপ-সিন, তারপরেও সবকিছু কী রকম প্রতীক হয়ে ওঠে! কালের গন্ডি ভেঙে ফেলে জহির চলে আসেন নব্বই দশকের বাবরি মসজিদ ভাঙার পর হিন্দুদের উপর অত্যাচারের প্রসঙ্গটিতে। সমস্ত বিষয়টি এক সূত্রে গেঁথে “কাঁটা”য় একটি অভাবনীয় রূপক গল্প উপহার দিয়েছেন তিনি। এক্ষেত্রে তাকে সাহায্য করেছে তার অনির্দিষ্ট বয়ান কৌশল ও অনিশ্চিতায়ত্মক ডায়লগের আধিক্যযুক্ত নতুন এক ভাষা। যেখানে সোজা কথা সোজা করে বলেন না তিনি, বলেন ঘুরিয়ে ফিরেয়ে। কখনো আবার ভেঙে দেন ঘটনার ধারাক্রম। এতে পাঠককে সদা জাগ্রত থাকতে হয়। একটু বেপথ হলে তার অবস্থা হবে “সে রাতে পূর্ণিমা ছিলোর” মতো। তখন চাঁদের রহস্যময় আলোর কারণে আসল সত্য ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়ে যেতে বাধ্য। পাঠক ভাববেন তিনি গল্পটির পুরোটাই বুঝেছেন, ভিজুয়ালাইজ করেছেন। কিন্তু তা হবে বিভ্রমের শামিল। জহির হয়তো নিজেও বিভ্রম তৈরীর সচেতন চেষ্টা করেছেন।

যা হোক, কথা বলছিলাম জহিরের গল্পে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি ব্যবহারের মাত্রা-প্রকৃতি নিয়ে। জিঞ্জিরা ম্যাসাকারে কথা অনেকটাই এসেছে তার “প্রথম বয়ান” গল্পটিতে। (জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা, মহল্লায় বান্দর... এই গল্পগুলোতেও জিঞ্জিরার বর্ণনাও প্রায় একই রকম)। তবে এখানে যা বাড়তি, তা হলো, সুপিয়া বেগম কেরেক্টারটি, মূল চরিত্র আব্দুর রহমানের সাথে যার সম্পর্কটি শেষ পর্যন্ত অনির্দিষ্ট থেকে যায়। থেকে যায় ব্যাখ্যাতীত। মহল্লার রোকে বসে-বসে কেবল চপল কিশোরী সুপিয়ার চলে যাওয়া দেখে (তার ফুলের ডাল রেখে যাওয়া দেখেও) তার প্রতি রহমানের যে বিশেষ আকর্ষণের সূত্রপাত সেটাই গল্পে মূল সুর হয়ে ওঠে। আর এই ঘটনা ঘটাবার জন্য জহির বেছে নিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের সময়টাকে। সুপিয়ার সাথে রহমানের প্রথম সরাসরি কথা-বার্তা যুদ্ধ শুরু হবার পর, জিঞ্জিরায়, কোনো এক আশ্রিত বাড়িতে। এখানেও সুপিয়া-রহমান সম্পর্কের ধরণটি কিন্তু পরিস্কার হয় না। আর এর কারণ, জহিরের গসিপীয় ঢঙ। মুক্তিযুদ্ধের সময়টাকে যথেষ্ট স্পেস দেয়া সত্বেও আমার চোখে এই গল্পটি শেষ পর্যন্ত প্রেম বিষয়ক জটিলতাই ্মুখ্য হয়ে ওঠে। এখানে অনেকে, আমার বন্ধুজনেরা একটি প্রতীকায়ন আরোপের চেষ্টা করেন। কারো কারো মতে, রহমান যখন মহল্লা অনেক আগের কোনো কেরসিন বাত্তির খুঁটির খোঁজ করে তখন সে আসলে তার শেকড় অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ফিরার চেষ্টা করে। কিন্তু এমন ব্যাখ্যার বিপরীতে, পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে পুরনো প্রেমের স্মৃতিকাতরতার চেয়ে বেশি কিছু মনে হয় না। আমার মতে—প্রেম, স্মৃতিকাতরতা, সেই সাথে দাম্পত্য-জটিলতাই এই গল্পের কেন্দ্রবিন্দু।

আসলে, সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের ডকুমেন্টারির মতো, মুক্তিযুদ্ধকে গ্লোরিফাই করার জন্য কোনো গল্প লেখেন নি জহির। এমন কি পুরো গল্প আগাগোড়া মুক্তিযুদ্ধের সময়ের টাইমফ্রেমে বন্দী জহিরের এমন গল্পের সংখ্যা মাত্র একটি। সেটি হলো: “মহল্লায় বান্দর, আব্দুল হালিমের মা এবং আমরা”। এই গল্পে বান্দর হয়ে ওঠে রাজাকার-আল-বদর অথবা সে সময়ের লুটপাটকারী সুবিধাবাদীর প্রতীক। এ বাদে জহিরের অন্যান্য গল্পে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে তীব্র ঝলকানির মতো। আবার কখনো কখনো তা থেকে গেছে ক্রোমা-ক্যানভাসের মতো। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অনেক ঘটনাই জহিরের কলমে ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছে। আর সেটার পেছনে তাঁর ভাষা ও গল্প নির্মাণ টেকনিক বড় সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে। এক্ষেত্রে “কাঁটা” গল্পের কিছু খণ্ডিত অংশ কোট করা যেতে পারে—

“ক্যাপ্টেন যখন বলে, কলেমা বলো, তখন একে-একে সকলে কলেমা তৈয়বা পড়ে শোনায় কিন্তু এইদিন আবুবকর মওলানা বিষয়টি শেষ প্রান্ত পর্যন্ত নিয়ে যাবার জন্য প্রস্তুত ছিল, সে পাকিস্তানি মিলিটারির ক্যাপ্টেনের সাথে কথা বলার পর বন্দুক বাগিয়ে ধরে দুজন সিপাই এগিয়ে এসে লাইনের প্রথম ব্যক্তিকে বলে, লুঙ্গি উঠাও এবং তখন লাইনে দাঁড়ানো মহল্লার অন্য লোকেরা দেখে, আঠার নম্বর বাড়ির পাকা দাড়িওয়ালা ইদ্রিস মিয়া কিছুক্ষণ ইতস্তত করার পর লুঙ্গি উঁচু করে ধরে দিনের আলোর ভেতর খাতনা করা শিশ্ন উন্মুক্ত করে তার পরিচয় প্রমাণ করে এবং মহল্লার লোকেরা বলে যে তখন তারা ইদ্রিস মিয়ার চোখ থেকে শুভ্র দাড়ি বেয়ে অশ্রু নেমে আসতে দেখে।“

এতো কিছুর পরও কিন্তু সক্রিয় সমর কিংবা গেরিলা যুদ্ধের তেমন কোনো অভাবনীয় বর্ননা জহিরের গল্পে খুঁজে পাওয়া যায় না। তার লেখার মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব ও কারনামাগুলো লোকমুখে শোনা যায়। তারপর যখন তাদের গল্পের ফ্রেমের মধ্যে পাওয়া যায় তখন যুদ্ধ শেষ; এটাই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাবর্তন দৃশ্য। জহিরের গল্পে পাওয়া যায় না যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে যাওয়া হাজারো ছেলের অবর্ণনীয় ত্যাগের কথা। খাওয়া-পরার কষ্টের কথা বাদ দিলেও সেসময় অনেক তরুণ ট্রেনিং নিতে গিয়ে প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও নেতৃত্বহীনতার যে ভয়াবহ চিত্র দেখেছিল, তার কোনো কিছু জহিরের গল্পে আসেনি। আসেনি যুদ্ধকালীন সময়ে বাঙালীদের কূট-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। আর এই অনুপস্থিতির কারণ লুকানো আছে একটু আগে উদ্ধৃত তার সাক্ষাতকারেই। জহিরের ঝুলিতে যে সেসব অভিজ্ঞতাই ছিল না!? জহিরের সামনে যা ছিল তা হলো, আটকে পড়া অসহায় বাঙালী আর তাদের নিত্যদিনের রুদ্ধশ্বাস। পাক-হানাদার আর বদু মওলানার মতো রাজাকারের তাণ্ডব। সেই রুদ্ধশ্বাস উপলব্ধিতে জহিরের অবশ্য কোনো ভুল হয়নি। একদিক দিয়ে বলতে গেলে, জহির আসেল কোনো অসততার আশ্রয় নেন নি। যার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না সে বিষয়ে তিনি গাল-গল্প ফাঁদার চেষ্টা করেন নি। আর যাতে সম্পৃক্ত ছিলেন, চোখে দেখেছেন, গল্পে ঘটিয়েছেন তার সর্বোত্তম চিত্রায়ণ।

মহল্লার লোকেরা জানতে পারে যে, আব্দুল হালিমকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, সে নিখোঁজ হয়েছে, তার মায়ের জন্য রেখে গেছে ছোট্ট চিরকুট। ভূতের গলির লোকেরা যখন এই খবর পায় এবং তারপর তারা যখন গোপনে রাতের বেলা বিবিসি এবং স্বাধীন বাংলা বেতারে রুদ্ধদার খবর শোনে, তাদের মনে হয় যে, হয়তো আব্দুল হালিম কোথাও কোন সেক্টরে কোন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করছে। তখন একদিন তারা তার মৃত্যুর খবর শোনে, এবং তারা বলে, আহারে আব্দুল হালিম! মায়ের জন্য টেবিলের ওপর চিরকুট রেখে যাওয়ার মাস দুয়েক পর ভাদ্র মাসের ১৬ তারিখ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার সময় এক অপরিচিত যুবক আসে মহল্লায়, সে দ্রুত হেঁটে গিয়ে আব্দুল হালিমদের বাসার সম্মূখ দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে তারপর আমেনা বেগমের সাঙ্গে কথা বলে পিছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে যায়; এই যুবক আব্দুল হালিমের মৃত্যু খবর নিয়ে আসে। —মহল্লায় বান্দর, আব্দুল হালিমের মা এবং আমরা

আব্দুল হালিম নামের এই যুবক কিন্তু সত্যি কেরেক্টার। হালিম (আসল নাম কাঞ্চন) ছিলেন জহিরের মহল্লার বাসিন্দা; যুদ্ধ জয়ের পর বাড়ি ফেরার পথে বুড়িগঙ্গায় নৌকাডুবিতে মারা গিয়েছিলেন এই মুক্তিযোদ্ধা। গল্পে তাঁর মৃত্যুর সময়টা একটু চেঞ্জ করেছেন জহির। তাঁকে তিনি মেরে ফেলেন যুদ্ধে যাবার আগেই, অই একই বুড়িগঙ্গায় ডুবিয়ে।

তবে একটা বিষয় আমার কাছে ব্যক্তিগত ভাবে খুব খাপছাড়া মনে হয়। তখন তো লোকমুখে বঙ্গপোসাগরে মার্কিন রণতরী আসা, চীনের সাথে পাক-আঁতাত, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু অথবা বেঁচে থাকাসহ নানা বিষয়ে নানান কথা শোনা যাচ্ছিল। জহিরের গল্প বলার যে ধাঁচ তাতে এ বিষয়গুলো সহজেই আসতে পারতো। যথেষ্ট পলেটিক্যাল ওরিয়েন্টেশন ও এতো বেশি রাজনীতি সচেতন হয়েও জহির কেনো তার গল্পকে দেশীয় রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে আর্ন্তজাতিক প্রেক্ষাপটের সাথে রিলেট করতে পারলেন না?! বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অথবা পরবর্তী সময়ের  পরাশক্তিদের কূট-রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার (হস্তক্ষেপ) প্রসঙ্গগুলো এলে জহিরের গল্প হয়তো আরো বৈশ্বিক (যেমনটি দেখা যায় ল্যাতিন সাহিত্যে) হয়ে উঠত। এ প্রসঙ্গে সৈয়দ ওয়ালীউল্লার “কদর্য্য এশিয়া” উপন্যাসটির কথা মনে পড়ে, যেখানে আর্ন্তজাতিক রাজনীতির সাথে দেশীয় রাজনীতির সংশ্লিষ্টতার চিত্র তুলে ধরার একটি বড় ধরণের উদ্যোগ দেখা যায়।


                 ( আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)



37 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ অপর বাংলা  আলোচনা 
শেয়ার করুন


Avatar: h

Re: শহীদুল জহিরের গল্প ও আটকে-পড়া বাঙালির যুদ্ধ - দ্বিতীয় কিস্তি

এই প্রবন্ধের সংগে আমি সম্পূর্ণ একমত নই, তবে এইটা খুব ভালো প্রবন্ধ। যে বিষয়গুলো র অবতারণা করা হয়েছে, খুব ই প্রাসংগিক। এছাড়া, ঐতিহাসিক ঘটনা গুলো র উল্লেখ, আমাদের মত বিদেশী পাঠক দের পক্ষে গুরুত্ত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র। এইটা পড়ে খুব ই ভালো লাগলো।
সিরিয়ালাইজড লেখায়, আগের বা পরের কিস্তি গুলোর লিংক লেখার তলায় আনা থাকলে ভালো থাকতো।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন