বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

শহীদুল জহিরের গল্প ও আটকে-পড়া বাঙালির যুদ্ধ -প্রথম কিস্তি

মাজুল হাসান

 

অনেকে বলে থাকেন জহিরের মূল জায়গা মুক্তিযুদ্ধ। কথাটা হয়তো অংশত সত্যি। অংশত বললাম এই কারণে যে, কারো আসল জায়গা ওটা, ওটা ওমুকে ভাল পারে, এইসব বলে লোকে আসলে তাকে একটা গণ্ডিতে ফেলে দিতে চায়। এই ফেলে দেয়া তাকে প্রতিষ্ঠা বা খারিজের অপচেষ্টার নামান্তর। মানে, এর পেছনে রজনীতি ও রণনীতি দুটোই বিদ্যমান। তাই জহিরের লেখায়, বিশেষত গল্পে মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে এসেছে তা খতিয়ে দেখার একটু লোভ দেখা দিয়েছে। তবে আলোচনা বা বিশ্লেষণ যাই বলি না কেনো, প্রথমেই বলে নেই, আমার মতে, জহির নিত্য রাজনীতিময়। তবে এই রাজনীতিময় শব্দটির আমার নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে, যা জহিরের সামগ্রিক দর্শন, পাশাপাশি তার আন্তরিক প্রণোদনা ও সীমাবদ্ধতার সাপেক্ষে একটি তুলনামূলক অবস্থান মাত্র। যাক সে প্রসঙ্গ। চলে আসি মূলের কাছে। 

এ কথা সত্যি, জহিরের লেখায় ঘুরেফিরে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ এসেছে। কখনো ঝলকের মতো, কখনো বর্তমানের সাথে অতীতের সর্ম্পক কাঠামো তুলনায়, কখনো নিপাট স্মৃতি রোমন্থনে, কখনো বা প্রেমের জটিলটায় আরেকটু বেশি রুদ্ধশ্বাস বাড়াতে ব্যবহার করা হয়েছে যুদ্ধকালীন পটভূমি। তবে এ কথা সবাই মানবেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক জহিরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ফ্রেমওয়ার্ক বিচারে সবচেয়ে পরিপূর্ণ লেখাটি হলো “জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা”। মাত্র ৪৮ পৃষ্ঠার ছোট্ট এই উপন্যাসটিতে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে ভয়াবহ নৃশংতা ও আশা ভঙ্গের প্রমাণ হিসেবে, যার তুলনা অনেকে টেনেছেন হুয়ান রুলফোর “পেদ্রো পারামো”র সাথে। এই তুলনা যুগপৎ সম্মান ও সন্দেহের বিষয়। কারণ, এটা যদি কমপ্লিমেন্ট হিসেবেও ধরে নেয়া হয়, তারপরেও প্রশ্ন থাকে। প্রশ্নটা হলো—তারা কি মনে করেন, এতে করে জহিরের জাতের উত্তরণ বা অনমন ঘটবে?! জহির তো নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন, তিনি মার্কেজের কাছ থেকে জাদুবাস্তবতার তালিম নিয়েছেন। সেটা নতুন করে প্রমাণ-অপ্রমাণের কিছু নাই। কারণ, জাদুবাস্তবতা গল্প বলার একটা টেকনিক মাত্র। এই টেকনিক দিয়ে যা লেখা হবে তাই ভিনদেশী হয়ে যাবে এমন ভাবার কোনো অবকাশ নেই। আমার তো মনে হয় জহির অনেক বেশি স্বদেশী। স্বদেশী—নিজের শেকড়-মুখিতায়। তা না-হলে জহির এতো বহুলপাঠ্য হয়তো কখনোই হতে পারতেন না। নিরীক্ষা করে পাঠকপ্রিয়তা, এ কেবল জহিরের ভাগ্যে জুটেছে। আর জাদুবাস্তবতার প্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে জহির যে ভাষা বেছে নিয়েছেন তার সিনটাক্স বা পদবিন্যাস অনেকটা মুখের ভাষার কাছাকাছি। এটা অনেকটাই আমাদের গালগল্পের ঢঙ, যাতে দ্বিরুক্তি থাকে, মুদ্রাদোষ থাকে, থাকে অতিশায়ন। আর সবচে জরুরী জিনিস, তার লেখায় (ল্যাতিন আমেরিকা নয়) আমাদের প্রিয় মাতৃমৃত্তিকা বাঙলাই উঠে আসে। উঠে আসে বাঙলার রাজনৈতিক ও সামাজিক চিত্র, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ। 

 

"লক্ষ্মীবাজারের লোকদের মনে পড়ে, একাত্তর সনে বদু মওলানা নরম করে হাসত আর বিকেলে কাক ওড়াত মহল্লার আকাশে। এক থালা মাংস নিয়ে ছাদে উঠে যেত বদু মওলানা আর তার ছেলেরা। মহল্লায় তখনো যারা ছিল, তারা বলেছিল, বদু মওলানা প্রত্যেকদিন যে মাংসের টুকরোগুলো আকাশের দিকে ছুড়ে দিত, সেগুলো ছিল মানুষের মাংস। কারণ, মহল্লার সবচাইতে প্রাচীন মুসলমান পরিবারটির প্রধান, খাজা আহমেদ আলী বলেছিলেন যে, একদিন এক টুকরো ছুড়ে দেয়া মাংস কাকেরা ধরতে ব্যর্থ হলে সেটা এসে পড়েছিল তার বাড়ির ছাদের ওপর। তিনি ছাদের ওপর বিকেলের একচিলতে রোদে বসে অতীত যৌবনের স্মৃতির ভেতর নিমজ্জিত হয়ে ছিলেন, তখন মাংসখণ্ডটি তার পায়ের কাছে এসে পড়ে। তিনি কিছুক্ষণ দেখে অনুধাবন করেন যে টুকরোটির গায়ের একদিকে চামড়া রয়ে গেছে এবং তিনি দেখেন যে এই চামড়া একেবারে মসৃণ। এসব কথা মহল্লার সকলে পরে জেনেছিল। সেই বিকেলে মাংসটুকরোটি হাতে তুলে নিয়ে তিনি দেখেন যে, সেটার গায়ে ছোট্ট মুসুরের ডালের মতো একটি পাথরের ফুল। তিনি হাহাকার করে ওঠেন, দুহাতের অঞ্জলিতে টুকরোটি নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে বড় ছেলে খাজা শফিকের সহায়তায় সেটা দাফন করেন নিজের বাড়ির আঙিনায়। তারপর মাগরিবের নামাজ পড়ার সময় তিনি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন। একটি অদেখা মেয়ের জন্য লক্ষ্মীবাজারের এক বিষণ্ণ বৃদ্ধের হৃদয় সেদিন ভেঙে পড়ে। এখন তার বাসার আঙিনায় তার নিজের আর তার ছেলের জোড়া কবর।" —জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

 এই উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে রাজাকার ও পাক-আর্মিদের নৃশংসতা ও পরবর্তীতে স্বাধীনতা বিরোধীদের সাধারণ মা ও সামাজিকভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবার প্রোপটকে জাদুর মতো করে ধরা হয়েছে। জহির তার জাদুবাস্তব বয়ানে পাক-হানাদার ও দোসর বদু মওলানাদের নৃশংসতা ও বীভৎসতার যে বর্ননা দিয়েছেন তাতে যে কোনো পাঠক আঁতকে উঠবেন। এই জাদু-আবহ কিন্তু ঘটনার মূল টেস্টকে ক্ষুণ্ণ করে না, বরং তা হয়ে ওঠে বহুমাত্রিক। বাংলায় জাদুবাস্তবতার এতো বিশাল-বিপুল-সফল প্রয়োগ এর আগে ছিল প্রায় অজ্ঞাত। সব মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও তার লাভ-কির তিয়ান এই উপন্যাস। আর এর মূল মেসেজের জায়গাটি হলো: একাত্তরে স্বাধীনতা বিরোধীদের সীমাহীন দমন-পীড়ন ও বীভৎসতার কথা আজো ভুলে যায়নি নিহত-নির্যাতিত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবার-পরিজন। কিন্তু রাজাকার বদু মওলানা-আব্দুল গনির মতো সেই নির্যাতনের হোতারা আবারো সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশে। পরিতাপের বিষয়, এই উথ্থান বা পুনঃপ্রতিষ্ঠাকরণ মেনে নিয়েছে আজিজ পাঠানের মতো একসময়ের ডাকসাইটে মুক্তিযোদ্ধারাও। তাই আব্দুল মজিদদের আর কোনো আশ্রয়স্থল থাকে না; নিজ বাসা-বাড়ি ব্রিক্রি করে তাদের হতে হয় খড়কুটোর মতো উদ্বাস্তু।

 

এতো গ্যালো উপন্যাসের কথা। কিন্তু গল্পে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গটি কীভাবে ধরা দিয়েছে জহিরের লেখনীতে, কী-কী তথ্য-উপাত্ত কি-কি টেকনিকে গল্পে ইনপুট করা হয়েছে, আমার বিশেষ প্রচেষ্টা থাকবে সে স্বরূপটি উদ্ঘাটনের দিকে। 

উপন্যাসে জহিরকে অনেক বেশি এককেন্দ্রিক ও সুসংহত মনে হয়। কারণ, এসময় তাকে পারম্পরিক সাজুয্যপূর্ণ কাহিনী নির্মাণ করতে দেখি ( এখানে ভাষা ও জাদুবাস্তবতার প্রায়গিত জৌলুসের প্রসঙ্গটি উহ্য রাখছি)। কিন্তু গল্পে? গল্পে মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনায় এই জহিরই আবার অনেক বেশি বিক্ষিপ্ত। আর সেখানেও চলে আসে জহিরের গল্প বলার নিজস্ব টেকনিকের প্রসঙ্গটি। “পারাপার”এর পর আমরা জহিরের যেসব গল্প পাই, তাতে গল্পকেন্দ্র এতো বেশি ওঠানামা করে যে, তাকে তখন নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় ফেলা যায় না। বলা যায় না—“গল্পটার পটভূমি হলো এইটা..” অথবা বলা যায় না—“তিনি এইটা বলতে চাইছেন”। এক্ষেত্রে জহিরের টাইম লাইন ভেঙে ফেলার প্রবণতা সাধারণ পাঠকদের জন্য অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তবে যেহেতু জহিরের ভাষাটি বেশ সহজ এবং (সিনটাক্স) প্রায় কথ্য ঢঙের কাছাকাছি, সর্বোপরি একটা চাপা হিউমার তাতে বিরাজমান থাকে, সেকারণে গল্পটি না শেষ করেও পাঠক স্বস্তি পায় না। পাশাপাশি গল্পে নানান মাত্রার রূপক ও ইলিউশন ব্যবহার করে জহির গল্পকে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গায় দাঁড় করান। সব মিলিয়ে প্রথাগত গল্পের তুলনায় জহিরের গল্প অনেক বেশি স্ক্যাটার্ড।তবে তা মজাদার। জহিরের গল্প যারা পড়েছেন তারা জানেন, তার অনেক গল্পেই মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনীতি প্রবলভাবে হানা দেয়। “মহল্লায় বান্দর, আব্দুল হালিমের মা এবং আমরা” ও “কাঁটা”সহ জহিরের বেশ কয়েকটি গল্প তো সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক। তবে এসব গল্প তিনি লিখেছেন তার ট্রেডমার্ক গসিপীয় ঢঙে। আসলে, জহিরের গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এর বহুমুখী অর্থবোধকতা, তথা এর সম্প্রসারণশীলতা। জহির গল্পে যা বলেন অথবা বলেন না, তার চেয়েও বেশি কিছু, এমন কী সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু মানে দাঁড় করাতে পাঠককে তেমন বেগ পেতে হয় না। এতে করে পাঠক নিজের মতো করে গল্পটাতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারেন। যার ফলাফল: গল্পে আসে গতিশীলতা, সেই সাথে কল্পনার যথেষ্ট সুযোগ থাকায় তা হয়ে ওঠে পাঠকের মনোজগতের নিকটবর্তী। 

 
 
লক্ষণীয় যে, জহির তার গল্পে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলিয়েছেন মহল্লার সাধারণ মানুষের মুখ অর্থাৎ থার্ড পারসন প্লুরাল নাম্বার দিয়ে। বিভিন্ন জনের (আমরা, মহল্লার লোকেরা..) মুখ দিয়ে অথবা দোদুল্যমান স্মৃতি উপচে এসেছে সুবোধচন্দ্র ও তার স্ত্রীর মতো সংখ্যালঘুদের কথা, রাজাকারের কথা, পাক-আর্মির অত্যাচার, এসেছে জ্বালাও পোড়াও ডামাডোল। আবার কখনো বা শহর ছেড়ে পালানো ভীত সন্ত্রস্ত মানুষেরা উঠে এসেছে গল্পের ভরকেন্দ্রে। আমরা জানতে পারি নয়াবাজারে গোলাগুলি, রাতে কার্ফ্যু আর দিনে রাজাকারের তান্ডবের সেই ভীতিকর সময়ের কথা। পাক-আর্মির দোসররা যারা বাঙালিই ছিল, সেই সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে জহিরের একটি পরিস্কার অবস্থান রয়েছে। এই বাঙালি হত্যাকারী বাঙালিদের (রাজাকার, আল-বদর, শান্তি কমিটির সদস্য) স্বরূপ উন্মোচন ও তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রকাশে জহির সদা সচেষ্ট থেকেছেন। 
জহিরের গল্প পাঠক মাত্রই জানেন তার বেশ কিছু গল্পে ঘুরে ফিরে এসেছে জিঞ্জিরার স্মৃতি। জহির কিভাবে তার গল্পে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গটি এনেছেন সে আলোচনায় যাবার আগে এই জিঞ্জিরা ম্যাসাকার সম্পর্কে আলোকপাত করা জরুরী মনে করছি। চিটাগাং থেকে প্রকাশিত “কথা” নামের একটি লিটিলম্যাগে দেয়া সাক্ষাতকারে সে প্রসঙ্গে জহির বলেন—
 
“জিঞ্জিরায় থাকলাম একটা বাসায়, চরাইল নামের একটা গ্রামে একদিন থাকলাম, পরের দিন বের হয়া আসতে হইলো। দ্বিতীয় দিনের খুব সকালে পাকিস্তানী মিলিটারি তাদের অপারেশন শুরু করে, জিঞ্জিরার কোথাও বুড়িগঙ্গার কিনারা থেকে মিলিটারিরা গানবোট দিয়া গোলা ছোড়ে। .....। আমরা সকালে তখন ঘুমের মধ্যে ছিলাম, গোলার শব্দে জেগেই দেখি এই বাসায় আশ্রয় নেওয়া পনর বিশটা পরিবারের সকলে বাসা থেকে বের হয়া কোথাও পালায়া যেতে চাচ্ছে। ....। আমার পরিস্কার মনে আছে আমার মা তার দুই হাত দিয়া বুক চেপে ধরে আছে আতঙ্কে, আব্বার কোলে আমার ছোট ভাই আর আমার কোলে আমার একদম ছোট বোন। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম মাঠের ভিতর দিয়া ট্রেসার বুলেটের মতো লাল গুলি চলে যাচ্ছিল, পাকিস্তানী মিলিটরি হয়তো তাক করে গুলি ছুড়ছিল না, কিন্তু এগুলা ফাকা গুলিও ছিল না, মাঠের ভিতর দিয়া পলায়নরত মানুষের শরীরে লাগার মতো করেই এগুলা এলোপাথারিভাবে ছোড়া হচ্ছিল। আমার মনে আছে, যেদিক থেকে গুলি আসছিল আমি আমার বোনটাকে কোলের উল্টা দিকে নিলাম, কারণ, মনে হচ্ছিল তাহলে গুলি লাগলে আমার গায়েই লাগবে, আমার বোনের গায়ে লাগবে না। যা হোক, তখন দেখা গেলো যে দৌড়ায়া পালায়া অন্য কোথাও যাওয়ার রাস্তা নাই, মিলিটারি বৃত্ত তৈরী করে নিয়েছিল, আমরা দেখলাম দূরে আমাদের সামনের দিকেও মিলিটারি আছে। তখন আমরা অন্য একটা অপরিচিত বাসায় যায়া উঠলাম। ...। দুপুর পর্যন্ত অপারেশন চললো। তারপর আমরা পুনরায় চরাইল গ্রামে চেয়ারম্যান বাড়িতে ফিরা গেলাম। যায়া দেখি অন্য সকলেও ফিরা আসছে। হয়তো দুয়েক জনকে পাওয়া গেল না। সেদিন রাত কাটায়া পরদিন আবার ঢাকায় চলে এলাম, মগবাজার, নয়াটোলায়। সম্ভবত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে আমি আমার পরিবারের সাঙ্গে আমি গ্রামের বাড়ি চলে যাই। সম্ভবত জুলাই আগষ্টে আব্বার সঙ্গে আবার আমি ঢাকায় আসি, তারপর আব্বা সিরাজগঞ্জ ফিরা যান, কিন্তু আমি ঢাকায় একা থেকে যাই।“—শহীদুল জহিরের সাক্ষাতকার, কথা (কথাসাহিত্যের ছোট কাগজ)।
 
গল্প আলোচনায় লেখকের সাক্ষাতকারের এতো বৃহদাংশ কোট করা দেখে অনেকে বিরক্ত হতে পারেন। কিন্তু এই অংশটি আমার কাছে খুবই জরুরী মনে হয়েছে। লেখকের অভিজ্ঞতার চারণক্ষেত্রটি জানা না থাকলে তার সাহিত্য-দর্শন ও বক্তব্য, কিয়দংশে সীমাবদ্ধতা কোনোটাই বোঝা সম্ভব নয়। এখানে লক্ষণীয়: কিছুদিনের জন্য ঢাকা ছেড়ে পালালেও জহির কিন্তু যুদ্ধে যাননি। তার ভাষ্য মতে, নানা কারণে যাওয়া হয়ে ওঠেনি, হয়তো যুদ্ধের আকস্মিতা ও আকস্মিকভাবে খুব কম সময়ে মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ায় সেটা সম্ভব হয়নি। তবে যুদ্ধকালীন সময়ের একটা বড় অংশ তিনি কাটিয়েছেন রাজধানী ঢাকায়। ঢাকা তখন অনিশ্চিত অবরুদ্ধ নগরী। এই অবরুদ্ধ নগরীর কথাই এসেছে জহিরের লেখায়, যেখানে সবাই আটকে-পড়া, গ্রামে কী ভারতে অথবা অন্য কোথাও তারা পালিয়ে যেতে পারে নি, পালিয়ে গ্যালেও ফিরে এসেছেন আবারো (ঠিক জহির যেমন করেছিলেন)। সেজন্যই হয়তো, তার গল্পে মুক্তিযুদ্ধের যে বর্ণনা পাই, তা অসহায়, হতবিহ্বল, কখনো কখনো একেবারে অক্ষিদূরত্বে দেখা গুমোট সময়ের কহনকথা হয়ে ওঠে। তার গল্পে ঘুরেফিরে আসে ভূতেরগলি, লীবাজার, জিঞ্জিরা, আটকে পড়া মানুষ, যারা কথা বলে, কে যুদ্ধে গেলো, কার ছেলে মারা গেলো যুদ্ধে, কোন হিন্দুবাড়ি পুড়লো রাজাকারের আগুনে... এইসব বিবিধ বিষয়-আশয় নিয়ে। তবে যেমনটি হয়ে থাকে, জহির গল্প বলেন গসিপীয় ঢঙে, একটু ঘুরপথে, ঠিক তেমনি, মুক্তিযুদ্ধও তার গল্পে এসেছে একটু ঘুরপথে। এসব গল্পকে সেক্ষেত্রে বলা যেতে পারে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত “উমুক” গল্প। এই “অমুক” হতে পারে প্রেম, আটপৌরে জীবনযন্ত্রণার প্রতিনিধিত্বশীল শব্দ। 
 

                                                                                                                                  ( আগামী পর্বে সমাপ্য )



38 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ অপর বাংলা  আলোচনা 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন