বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

বাউনের খাদ্যপ্রেম - দ্বিতীয় কিস্তি

রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য

এবার দেখা যাক, সংস্কৃত সাহিত্যে খাবারের কী রকম বর্ণণা আছে! সাহিত্য তো আর খাবার ছাড়া হয় না। প্রেমও খাবার ছাড়া হয় না! আজকাল প্রেম করতে গেলেও একটা রেস্তোঁরায় বসতে হয়!

প্রেম- সাহিত্য- খাবার, এটা ত্রিকোণ! যাবে কোথায় বাছা? আড্ডা মারতে গেলেও খাবার! এই যে পলার বাড়ীতে আড্ডা মেরে এলাম, সেদিন! সেখানেও তো এক কিলো চাউমিনে, এক কিলো চিলি চিকেন আর গোটা দশেক সন্দেশ সাঁটিয়ে এলাম! সবাই আড্ডা মারবে কি! ওরা আমার খাওয়া দেখতেই ব্যস্ত! জল টল খেয়ে মনে হলো- না:! এবার বোধহয় পেটে কিছু দানাপানি পড়েছে!!!!!!!

নাম বলবো না! বললেই ক্ষেপে যাবে! এই তো সেদিন-সল্ট লেকের ভজহরি মান্নাতে, একজন আমায় হেব্বী খাওয়ালো! আমার খাওয়ার সময় রেস্তোঁরার লোকগুলো কেমন যেন সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছিল!

একজন ওয়েটার তো আর এক ওয়েটারকে ফিসফিস করে বলেই ফেল্লো- শুনেছিলাম- ভীম নাকি বক রাক্ষসকে মেরে ফেলেছে!!!!!!

কোথায়? এই তো সে!!!!!! এই লোকটা চলে গেলে মালিক কে বলে দোকান বন্ধ করে দে! আর তো খাবার নেই!

যাক! আসল কথায় আসি! আজকাল মাঝে মাঝে একটু বেলাইন হয়ে যাই আর কি!!!!!!

খ্রীষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে- দুজন বড় মাপের বাঙালী কবি বিরাট বিরাট সংস্কৃত কাব্য লিখেছিলেন।

এঁদের মধ্যে একজন- কবিকর্ণপূর পরমানন্দ সেন। বাড়ী - কাঞ্চনপল্লীতে মানে আজকাল যাকে কাঁচরাপাড়া বলে। বিরাট বড়লোকের ছেলে আর খুব গুণী( বদ্যিরা এরকমই হয়)।

"শ্রীশ্রীকৃষ্ণাহ্নিক- কৌমুদী' নামে একটা কাব্য লিখেছিলেন। এই কাব্যের দ্বিতীয় সর্গে ৮৫ থেকে ১১৮ শ্লোকে বসন্ততিলক আর পুষ্পিতাগ্রা ছন্দে শ্রী রাধার - রান্নার মনোরম বর্ণণা আছে।

আর একজন লেখক হলেন- শ্রী কৃষ্ণদাস কবিরাজ। এনার লেখা বইটির নাম হলো- "শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত' এবং "গোবিন্দলীলামৃত'।

এই "গোবিন্দলীলামৃত' তেই নানাধরণের খাবারের বর্ণণা আর রান্নার প্রণালী দেওয়া আছে।

তবে, শ্রী কৃষ্ণদাস কবিরাজ বেশ কিছুদিন বৃন্দাবনে থাকার ফলে একটু কম বর্ণণা দেওয়া আছে। কবিকর্ণপূর পরমানন্দ সেন বাংলাতে বসে লিখেছিলেন বলে বর্ণণাটা বেশ বিস্তৃত।

কবিকর্ণপুর বাথুয়া ( বাস্তুক), নটে ( মারিষ), নতির পত্র( পটলশাক) কলায়লতার শাক( কলায়বল্লী শিখা), ছোলার শাকের কচি ডগা ( চনকাগ্র শিখা), মটরশিখা, কোমল লাউডগা ( তুম্বিশিখা) আর পদিনার শাকের কথা উল্লেখ করেছেন- ৮৭ নং শ্লোকে। এই শাকগুলো নাকি শ্রীরাধা, শ্রীকৃষ্ণের জন্য ভালো সরষের তেলে ভেজেছিলেন ( ওই সরষের তেলটা আর পাওয়া যায় না বলে- আজকাল চারিদিকে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা, ব্রততীঞ্চ সব কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছেন)।

আমি নিজে পদিনার চাটনী খেয়েছি, কিন্তু পদিনা শাকভাজা আমার নিজের রাধা কোনোদিন ভেজে খাওয়ান নি! পড়ে বলেছিলাম, রান্না করতে! তা! যা প্রতিক্রিয়া হলো! যাক! অন্য দশ কথা এসে পড়বে!

ছোলার শাক আর মটর শাকের যে ঘন্ট হতে পারে, সে কথা কিন্তু কবিকর্ণপুর বলেন নি! শ্রীকৃষ্ণ কি ঘন্ট খেতেন না? কে জানে!!!!!! ঘন্ট খেলে যদি শ্রীরাধার প্রেম উবে যায়! তা হলেই তো ঘন্ট ঘেঁটে যাবে।

আমার শ্রীরাধা কিন্তু যে কোনো শাকই বড়ই ভালো রাঁধেন। এক থাল ভাত উড়ে যায় খালি ওই শাক দিয়ে।

কবিরাজ গোস্বামী আবার পাকা তেঁতুলের রস দিয়ে কলমি শাক, আর কাঁচা আম দিয়ে কালো নালতে পাতা রাঁধার কথাও বলেছেন।

এ ভাবে আমি খেয়েছি- উল্লুস!!!!!! জিভে জল এসে, কী বোর্ড পুরো ভিজে গেল।

কিন্তু, এই দুই কবির লেখাতে- পুঁই, পালং, মূলোর শাকের কথা পাই নি! কে জানে কেন!!!!! কবিরা কি এই শাকগুলো খেতে ভালোবাসতেন না! নাকি শ্রীকৃষ্ণের দৈববাণী হয়েছিল- বুঝলে হে- আমি ওই সব শাক খাই না! তাই লিখো না।

এবার আসি ভাজার কথায়!

ভাজার কথা বলতে গিয়ে কবি কর্ণপুর লিখেছেন ( শ্রীরাধা প্রেমে ভাজা ভাজা হয়েছিলেন কিনা!) - ( গোবিন্দলীলামৃত-৩.৯২-৯৩)

"বার্তাকু সূরণক মানক কর্করোথৈ
রম্ভামুঘোত্থ কণিশৈ: কচুভি: পটোলৈ:।
কুষ্মাণ্ডকৈর্লবলবৈ: শিতসূচিরাজী
বেধেন নীরসতমৈর্বিবিধাহ্‌স ভাজী।।'

----------------

বার্তাকু= বেগুন। সূরণক= ওল। মানক= মান। কর্করোথ= কাঁকরোল।

রম্ভামুঘোত্থ = গর্ভমোচার ছোট ছোট কাঁচা কলা। পটোলৈ:= পটল। কুষ্মাণ্ড= চালকুমড়ো।

এই আনাজগুলো ছোট ছোট করে কেটে ( কী ধৈর্য্য!!!!!! প্রেমে অধৈর্য্য হলে হয় না, এটাই বোধহয় কবি কর্ণপুর বোঝাতে চেয়েছেন!) সরু সূঁচ দিয়ে বিঁধিয়ে ভেতরের রস গুলো বের করে নিতে হবে। এরপর ডালের বেসনে চুবিয়ে সেগুলো সরষের তেলে ভাজতে হবে। এটা অবশ্য কবিরাজ গোস্বামীর বিধান।

সেই সময়ে আলু পাওয়া যেত না। গোল আলু- যেটা এখন আমরা খাই, সেটা টমাস রো জাহাঙ্গীরের সময় ভারতে এনেছিলেন। তাই বিভিন্ন শ্লোকে যে "আলুক' কথাটা আছে সেটা রাঙ্গা আলু বলে ধরতে হবে বলে গবেষকরা একমত।

কবিরাজ গোস্বামী, "ডিঙ্গিশ'( ঢ্যঁ¡ড়শ) চাকা চাকা করে কেটে ডালের বেসনে চুবিয়ে ঘিয়ে ভাজার কথা বারবার বলেছেন।

প্রেমের যে কত লাফড়া! উফস্‌। রান্নাঘরেই যদি সময়টা গেল, তবে প্রেমটা করবে কখন? যাক! ওনাদের ব্যাপার, ওনারা বুঝবেন! আমরা বরং সেই রান্নার রেসিপি গুলো দেখে নি!

একাল হলে, টিভিতে একটা প্রোগ্রাম করিয়ে নেওয়া হত, শ্রীরাধাকে নিয়ে! টি. আর.পি-র জন্য ভাবতে হতো না!!!!!! বকফুলভাজা নাকি- শ্রীকৃষ্ণের খুব প্রিয় ছিল! শ্রীরাধাকে তো শেষমেষ "বক'- ই তো দেখিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। মানে, আজকের ভাষায় যাকে বলে- হাফসোল।

বকফুলকে সংস্কৃতে, কাঞ্চনকলিকা বলে। শ্রী রাধা, বকফুলকে ঘিয়ে ভেজে টক দইতে ভিজিয়ে, নুন-লংকা মিশিয়ে একরকম "ডিস' তৈরী করেছিলেন। আমি টেষ্ট করেছি! দারুণ খেতে!

আপনারাও " টেরাই' করতে পারেন। কাসুন্দি, আদা- বাটা, নারকেল-বাটা দিয়ে কাঁঠালের বিচিও " টেরাই' করতে পারেন। "নতি পত্র' মানে নলতে পাতার শুক্তুনির রেসিপি চাই!!!!! কুছ পরোয়া নেহি!

"যস্মিন্‌ প্রতপ্ত-কটু তৈল্যা-তিক্তপত্রী:।
সৎকাসমর্দদলিতার্দ্রক-সাধুমৈত্রী:।।'


কাসুন্দি, মিহি করে আদা বাটা দিয়ে , নলতে পাতাকে ম্যারিনেট করতে হবে। তারপর সরষের তেল গরম করে ছেড়ে দিয়ে, নাড়াচাড়া করে নামিয়ে নিন। অহো!!!! কী "সাধুমৈত্রী:'- অর্থাৎ, কাসুন্দি, মিহি করে আদা বাটা, সরষের তেল আর নলতে পাতার কী অসাধারণ বন্ধুত্ত্ব!!!!!

এবার দেখি, শ্রী রাধা, আর কী কী বানিয়েছিলেন! শ্রীকৃষ্ণ আসছেন- প্রেমটা একটু মাখো মাখো করতে হবে না? মাখো মাখো করতে গেলে তো দুধের দরকার! শ্রীরাধা, দুগ্ধালাবু বা দুধলাউ তৈরী করতে বসলেন।

সৌস্মেণ জীরকং- নিভং পরিকৃত্য তুম্বীং
সিদ্ধাঞ্জকেন পয়সা চ নিধায় কম্বীম্‌।
আলোড্য দত্তঘনসারমপাচি দুগ্ধাহ-
লাবু: সিতামরিচ জীরক হিঙ্গুমুগ্ধা:।।

-----------

লাউকে জিরের দানার মত ঝিরিঝিরি করে কেটে, জল এবং দুধ মিশিয়ে সেদ্ধ করবে, আর সেদ্ধ করার সময় বারবার হাতা দিয়ে নাড়তে হবে। তারপর, কর্পূর, চিনি, মরিচ, জিরা, হিং দিয়ে ঘন হয়ে গেলে নামিয়ে নেবে।

তবে কবিরাজ গোস্বামী হিং দিতে কিন্তু বলেন নি। এটার নাম তিনি দিয়েছিলেন- দুগ্ধতুম্বী ( তুম্বী= লাউ)। এরপর, শ্রীরাধার মনে হলো- না:! কম পড়ে যাচ্ছে!!!! আবার তিনি কচি মোচা কেটে ," মরিচাঘ্য' রাঁধতে বসলেন। মোচার ছোটো ছোটো শস্য গুলো ঝিরি ঝিরি কেটে জলে ডুবিয়ে খানিকক্ষণ রেখে দিলেন। তারপর, দুধ, মরিচ আর হিং দিয়ে ঘন ঘন নেড়ে ফুটে গেলে নামিয়ে রেখে ঠাণ্ডা হতে দিলেন।

কবিরাজ গোস্বামী হিং দিতে এখানেও বলেন নি! শ্রীকৃষ্ণ হিং ভালোবাসতেন কিনা জানা যায় না, তবে কবিরাজ গোস্বামী হিং ভালোবাসতেন না- এটা পরিস্কার! এত কিছু করে, শ্রীরাধার মনে হলো, এবার কিছু "অম্ল' বা টক তৈরী করতে হবে। আজকাল হলে শ্রীকৃষ্ণ এত কিছু খাবার পর জেলুসিল খেতেন! কিন্তু, তখন তো ওসব পাওয়া যেত না! দেখি! শ্রীরাধা কী কী রাঁধলেন!!

  • পাকা কুমড়ো খণ্ড খণ্ড করে কেটে, সরষের তেলে ভেজে নিয়ে - ঘোল ( তক্র), আদা (আর্দ্রক), মৌরী ( মৌরিকা) ও হিং (হিঙ্গু) দিয়ে মিশিয়ে রাখলেন। তারপর ছানা আর মুগের বড়া দিয়ে পরিবেশন।
  • মূলা, পাকা চালতা চাকা চাকা করে কেটে, তক্র, গুড় এবং ভব্যখণ্ড ( পাকা তেঁতুল) দিয়ে আর রকম "অম্ল'।
  • মিষ্টি পাকা আম, জলে ভালো করে মেখে- তারপর আদাবাটা, চিনি আর দুধ!
এরকম আরও বারো রকম "অম্ল' র বর্ণণা পাওয়া যায়! এদের আবার মোট তিন রকমের ভাগও রয়েছে!

  • ঈষদম্ল( অল্প টক)
  • মধুরাম্ল ( মিষ্টি টক)
  • মধ্যাম্ল ( মাঝামাঝি টক)
"চিধ্যাম্রাতকচুক্রাম্রৈস্তত্তদ্‌ ব্যাদিযোগত:।
ঈষন্মধুরগাঢ়াম্লভেদাম্ল দ্বিষড়বিধ:।।'


অর্থ:- তেঁতুল,আমড়া,আমরুল ও আম এই চার রকমের টক, মুগের বড়ার সাথে মিলিয়ে বারো রকমের টক হত!

কিছু বুঝতে পারছেন? কোথায় লাগে আজকালকার বোতোলবন্দী সব সফ্‌ট ড্রিংকস?!!!!!!!!!!!!!

শেষে আসি মিষ্টির কথায়! যাকে বলে, মধুরেণ সমাপয়েৎ।

এই দুই কাব্যে- শাক, ভাজা, তরকারি, ডাল, টক ছাড়াও, নানা রকমের পিঠে আর পায়েসের বর্ণণাও আছে। পিঠেগুলোর নাম ভারী সুন্দর, কিন্তু সব সময় এর রেসিপি আমরা পাই না! ( কী দু:ক্কু!) কয়েকটা পিঠের নাম বলছি!

  • হংসকেলি
  • শোভারিকা
  • বেণী
  • চন্দ্রকান্তি
  • ললিতা! ( মাননীয় মান্না দে, আমার মনে হয়, এই পিঠেটা খেয়েছিলেন, না হলে ওই বিখ্যাত গানটা হতো না)
  • চিত্রা
  • কর্পূরকেলি
  • অমৃতকেলি
এখন আমরা যে মিষ্টিগুলো খাই, চারশ বছর আগেও সেই মিষ্টিগুলো ছিল!

"জীলাবিকা মউহরি পুরু পূপগূজা
নাড়ীচয়া: কৃত সরস্বতি* কাদি পূজা:।
খর্চুরদাড়িমক শর্করপালমুক্তা
লাড্ডুৎকরান্‌ বিধতি রেহত কলাভিযুক্তা:।।'


(*সরস্বতি- এই বানানটা সম্বোধনে বলে- ই কার হয়েছে)
জীলাবিকা=জিলিপি
পুরু= পুরী ( আটার তৈরী)
গূজা= গজা/ গুজিয়া
খর্চুর= খইচুর
দাড়িমক= কদমা ( মনে হয়)

যাই হোক, এবার বুইলেন তো!!!!!!!!! প্রেমের কী ল্যাঠা!!!!!!! খাও আর খেয়ে যাও! তারপর প্রেম করো!

শেষে ওই বিখ্যাত কবিতাটার দুই লাইন বলি!

এত খেয়ে তবু যদি নাহি ভরে মনটা
খাও তবে কচুপোড়া, খাও তবে ঘণ্টা!


সমাপ্ত


ঋণ:- উদ্বোধন শতাব্দী জয়ন্তী সঙ্কলনে, বিমান বিহারী মুখোপাধ্যায়ের রচনা:- সংস্কৃত সাহিত্যে বাংলার খাবার।

কোন বিভাগের লেখাঃ টুকরো খাবার 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন