বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

meksikaan maanaDe

niyaama`t khaan


'সাত দিনে দুনিয়া পাড়ি'
যা:, তাই কখনো সম্ভব নাকি, ভূতের রাজার বর না থাকলে? কিন্তু মনে করুন ছোটবেলায় পড়া সেই সব রূপকথা। সেই যে উড়ুক্কু তোরঙ্গ চেপে দুনিয়া ঘুরে বেড়ানো যেত মনে আছে তো? তা আমরাও যদি ধরুন তোরঙ্গ নয় চুল্লীতে চেপে সাতদিনে দুনিয়া ঘুরে আসি? ভুতের রাজার বরেই যাব আজ্ঞে। দ্বিতীয় বর নয়, প্রথম বর। 'যেখানে খুশি যাইতে' নয়, 'যা খুশি তাই খাইতে পারি'র বর। সাতদিনে চলুন না কেন চেখে দেখা যাক সাত দেশের স্বাদ? তাইই তো বললাম আমাদের দুনিয়া পাড়ি চুল্লী চেপে।

আরে আমিও জানি মশাই যে ঐ সব ইতালিয়ান, লেবানীজ আর কি কি যেন সব রেস্তোরাঁ ভারতের শুধু বড় শহর গুলোতেই আছে। বোলপুর, কি রায়গঞ্জ, কি বার্ণপুরের লোকেদের কি তাহলে কখনো সেসব স্বাদের সাথে আলাপ হবে না? আহা, এও জানি মশাই যে এসব রান্না সাধারণ বাঙালীতে বাড়িতে ক'রে খাবার উপায় নেই, ঐ কি যেন লেখে বইয়ে 'রকেট লিফ', 'ব্যান্ডেল চীজ','কেপার্স' না আরো কি সব জিনিষ লাগে! সেসবের নামই বা কে শুনেছে, আর পাওয়াই বা যায় কোথায়! এসব ব্রাত্য শহরে তো আর নিউমার্কেট নেই? কিন্তু নিরাশ হবেন না বন্ধু। নিয়ামৎ খান এই আপনাদের সামনে হাজির করছে সাতদিনের টেস্ট-ট্র্যাভেল প্যাকেজ (আহা, 'টাইম ট্র্যাভেল' যদি হয় তো 'টেস্ট-ট্র্যাভেল'ই বা কি দোষ করলো?)। এতে সাত দিনে আপনি সাত দেশের স্বাদে পাড়ি জমাতে পারবেন, আর তার জন্য না লাগবে দাঁতভাঙা নামের কোনো উপকরণ, না লাগবে দুÖপ্রাপ্য কোনো সরঞ্জাম। সেরেফ পাড়ার মোড়ের দোকানে যা যা পাওয়া যায় তাই দিয়ে গ্যাসের উনুনেই আপনি পাকিয়ে তুলতে পারবেন এই স-অ-ব স্বাদ। প্রমিস!

সোমবারের বুলবুলভাজায় এই সোমবার থাকছে মেক্সিকান মানডে ।

মেক্সিকান মানডে : ফিশ টাকো

বেশ তাহলে সপ্তাহের শুরু করা যাক মেক্সিকো দিয়ে। আদি সময়ে এই 'স্ফটিক সীমান্তের' কাছে মানুষজনের খাবারদাবার ছিলো বুনো পশু পাখির শিকার করা মাংস, পোকা মাকড় আর ক্যাকটাস। শুনতে অবাক লাগবে হয়তো আপনার, কিন্তু অনেক মেক্সিকান রান্নাতেই ক্যাকটাস দেবার চল আজও দিব্যি রয়েছে। এমনকি পোকামাকড়ও খাবারের তালিকা থেকে বাদ যায়নি। ঝিঁঝিপোকা পোরা চকোলেট, সিনেমাহলে পপ্‌কর্ণের বদলে পিঁপড়ের চাট সবই চলে। কিন্তু সেইই পুরো মেক্সিকান কুইজিন নয়। সেই কোনকাল থেকে মেক্সিকোর খাবারদাবারের বিবর্তন হয়ে চলেছে। স্প্যানিশ সেট্‌লারদের সাথে এসেছিলো সেদেশের খাবারের প্রভাব, পাহাড়ে পাহাড়ে ভেড়া আর গরু চরাতে যেতো যেসব 'ভাকুয়েরো' বা রাখালরা তারা বার করেছিলো খোলা আকাশের নীচে আগুন জ্বালিয়ে বানানো যায় এমন রান্নাবান্না, উপকূলের দিক ঘেঁষে জেলেরা করতো মাছ-কাঁকড়া-ঝিনুকের রকমারি পদ।

এদেশের রান্নায় দেখবেন কয়েকটা জিনিষ পড়ে খুব বেশি। এই যেমন গিয়ে ভুট্টা,লেবু,ধনেপাতা। আর নানা রকম লঙ্কা। কত নাম লঙ্কার -- একটু মোটা বুড়ো আঙুলের মত হ্যালপিনিও, আরো মোটা লম্বাটে পোয়েব্‌লানো, সরু সরু আমাদের দেশের কাঁচলঙ্কার মত দেখতে সেরানো,বেদম ঝাল গোল কমলা রঙা হ্যাবানেরো। দেশটার জল-হাওয়া-মাটি এমন যে এইসব ফসলই হয় ভালো।

আর খাবারের নামই বা কত! বুরিতো, ফাহিতা,এনচিলাদা, টাকো। বেশির ভাগ খাবারেই কিন্তু ভুট্টার রুটির রয়েছে; তার ভেতরে হয়তো ভাত বা ঝলসানো মাংস পোরা, বা কোনটায় সব্জিপাতির সাথে মাংসের কিমা, হয়তো কারো ওপরে নানা রকম স্যস দেওয়া, কারো বা ভেতরে নানা রকম চীজ। আমরা বরং যেকোনো একটা বেছে নিই আজ। এই 'টাকো'ই বানানো যাক না।

টাকো জিনিষটা আসলে মেক্সিকোর স্যান্ডুইচ বলতে পারেন। তোর্তিয়া ব'লে রুটির ভেতরে সব্জি আর মাছ বা মাংসের পুর দেওয়া। মাংসের, বিশেষ করে ঝালঝাল শুয়োরের মাংসের পুর দেওয়া টাকোকে বলে 'টাকো আল পাস্তোর' আর মাছের পুর হলে তার নাম হয় 'এনসেনাদা'। বেশ নামগুলি, না?

অবশ্য শুধু মাছ মাংস কেন, মোরেলোস আর গ্যোয়েরের জেলার টাকোতে দিব্যি করে জ্যান্ত পোকামাকড়ের পুর দেওয়া হয়, ওহাকা আর পোয়েব্‌লা অঞ্চলে দেওয়া হয় শামুক আর গঙ্গাফড়িং। রুচির রকমফেরের কি আর শেষ আছে রে ভাই?

আবার ঐ রুটি বা তোর্তিয়ারও কত ধরণ আছে। রুটিটা যদি হয় তাওয়ায় সেঁকা, তখন সেই টাকো হবে সফ্‌ট-টাকো। আর রুটি তেলে ভেজে নিয়ে করলে পর তাকে বলে ক্রিস্পি-টাকো। সে রুটি ভুট্টারও হতে পারে, আবার এমনি গমের ময়দারও হয়।

ওদেশে এই টাকো খায় লোকে হয় সকালে ব্রেকফাস্টে আর নয়তো রাতের খাবারে। দুপুরবেলায় কিন্তু কোনো দোকানে আর টাকো পাবেননা। আবার সন্ধ্যে ছটা না বাজতেই রমরমিয়ে টাকোর বিক্কিরি শুরু হয়ে যায়, রেস্তোরাঁতে, রাস্তার ধারে ঝুপড়ি দোকানে,আমাদের ফুচকাওয়ালার মত ঠেলাগাড়িতে। ভাজা-সেঁকা-ঝলসানো মাংসের, মাছের, গরমাগরম রুটির গন্ধে চারদিক ম' ম' করে।

ইশ, শুনেই জিভে জল আসছে তো? বেশ তো চলুন,আজ আমরা বানাবো ফিশ টাকো। সেই 'এনসেনাদা'।

এর জন্য প্রথমেই আপনার লাগবে ভেটকী বা আড় মাছের ফিলে। মাছওয়ালাকে বললেই সেই ফিলে কেটে দেবে, আজকাল দেয়, ছোট শহরের ছোট বাজারেও। যতজনের জন্য বানাবেন তার দ্বিগুন ফিলে নিন কারণ আমরা প্রত্যেকের জন্য দুটো করে টাকো বরাদ্দ করেছি।

মাছের ফিলেতে নুন গোলমরিচ আর সামান্য লেবুর রস মাখিয়ে রাখুন মিনিট পনেরো। যতক্ষণ একটু ম্যারিনেড হচ্ছে সেই সময়ের মধ্যে খুব ঝিরি ঝিরি করে কেটে নিন বাঁধাকপি আর পেয়াঁজ। কতটা কাটবেন? এই মনে করুন প্রতিটা টাকোর জন্য দুই বড় চামচ আন্দাজ লাগবে। হল তো? আচ্ছা এবার একটা বড় বাটিতে আধ কাপ মত টক দই নিন, তাতে নুন দিন এক চিমটি, আর এক চামচ চিনি, অমনি ফেলে দিন ওর মধ্যে আধ চামচ সর্ষে গুঁড়ো। মিশিয়ে নিলেন বেশ করে? এর মধ্যে এবারে দিয়ে দিন ঐ সরু ক'রে কাটা বাঁধাকপি-পেয়াঁজ। একটু ধনেপাতা কুচিও দিন। খুব ভালো করে মিশিয়ে বাটি শুদ্ধু সরিয়ে রাখুন।

টাকোর জন্য মাছগুলোকে আমরা গোলায় ডুবিয়ে ভাজবো। আরেকটা বড় বাটিতে কর্ণফ্লাওয়ার (অভাবে সাদা ময়দা) আর জল দিয়ে গোলা বানান, খুব ঘন যেন না হয়। মোটামুটি বেগুনী করার জন্য আপনি যের'ম ঘনত্বের বেসনের গোলা বানান তার চেয়ে সামান্য পাতলা হলেই হবে। এর মধ্যে মিশিয়ে নিন এক চামচ ম্যাগীর হট অ্যান্ড স্যুইট স্যস। আর দিন একটু খানি চালের গুঁড়ো, তাহলে আরো মুচমুচে হবে ভাজা। উনুনে তেল গরম হতে বসিয়ে দিয়েছেন নিশ্চয়ই? ডুবো তেলে ভাজা হবে তো, সেই আন্দাজ করে তেল দেবেন। আমরা সুর্য্যমুখী বা বাদামতেল পছন্দ করি ভাজাভাজির জন্য। যতক্ষনে তেল গরম হচ্ছে আপনি ম্যারিনেড করা মাছের ফিলে গুলোকে কেটে ছোট টুকরো করে নিন। একটা ফিলে তিন টুকরো হবে, কেমন? তেল বেশ গরম হলে মাছের টুকরো ঐ গোলায় ডুবিয়ে তেলে দিন। বেশি ক্ষণ লাগেনা ভাজা হতে, ছোট টুকরো তো? বেশ বাদামী হলে ঝাঁজরি দিয়ে তুলে কাগজের ন্যাপকিনের ওপর রাখুন যাতে বাড়তি তেল শুষে নেয়। ব্রাউন কাগজের ঠোঙাতেও কাজ হয়।

সব মাছ ভাজা হলো তো? এবারে যতগুলো টাকো ততগুলো রুটি নিন। স্রেফ বাড়িতে রোজ রাত্রে যে রুটি হয় সেই রুটি। একেকটা রুটিতে অল্প করে হট অ্যান্ড স্যুইট স্যস মাখিয়ে নিন। এর ওপরে রুটির একদিকে রাখুন তিন টুকরো ভাজা মাছ। তার ওপরে দিন ঐ যে দই দিয়ে মাখা বাঁধাকপির কুচি, আগেই বলেছি তো, দুই বড় চামচ ক'রে। সামান্য লেবুর রস দিন এর ওপরে। এবারে রুটি'র অন্য দিকটুকু ভাঁজ করে এর ওপরে দিয়ে আধ খানা চাঁদের মত করে রাখুন।



টাকো খেতে হয় পুরোটা হাতে ধরে। এমন ভাবে ধরতে হবে যাতে চাঁদের খোলা দিকটা থাকে ওপর দিকে, আর কামড় বসাতে হয় পাশ থেকে। খাবার সময় পাশ দিয়ে প্রায়শই বাঁধাকপি কি দই, কি স্যস একটু গড়িয়ে পড়বে, হাতে মুখে মাখামাখি হবে। তা হোক, এই খাবারই অমন, একটু মেসি। তাতে কি? আর হ্যাঁ শুনুন, কেউ যদি বলে অথেন্টিক টাকোতে লেটুশ থাকে, চীজ থাকে, হেনা থাকে তেনা থাকে তো সেসব কথায় কান দেবেন না মশাই। বলেছি তো আমাদের উদ্দেশ্যই হলো সাধারণ বাঙালী বাড়িতে সহজে সুবিধায় বানানো। পাড়ার দোকানে কি সব চীজ রাখে? সব বাজারেই কি লেটুশ পাওয়া যায়? কিছুটা ইম্প্রোভাইজেশন তো আমাদের করতেই হবে। তবে কোনো চিন্তা নেই, আসল মেক্সিকোর খুব কাছাকাছি স্বাদই পাবেন আপনি এই টাকোতে। গ্যারান্টী।

২৩ শে অগস্ট, ২০১০

2 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ টুকরো খাবার 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন