বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

পিয়ুরসালা রানছো নি?

সামরান হুদা

ডাইলও দিয়ম চাইলও দিয়ম
            রসাই করি খাইয়ো
ঝড়বে নেহালি দিয়ম
            শুইয়া নিদ্রা যাইয়ো
(চট্টগ্রাম)

পিয়ুরসালা। নামটা একটু কেমন যেন, ঠিক খাবারের নাম বলে মনে হয় না কিন্তু তাতে কী! পিয়ুরসালা যেমন খাবার সেটা সত্যি এবং একটা কম্পলিট মিল। সক্কালবেলায় একথালা খেয়ে নিলে সন্ধের আগে অব্দি আর কোনো চিন্তা নেই ক্ষিদে নিয়ে। তবে খুব পরিচিত বা প্রচলিত খাবার এই পিয়ুরসালা নয়। বোধহয় আমাদের নানী বা পরনানীরা রেগুলার রাঁধতেন। আজকালকার দিনেও কেউ কেউ রাঁধেন, যেমন দারগীঝি। যেমন আমার মেঝফুফু। দারগীঝিকে তো আমি পাইনি, আমি শুধু তার গল্প শুনেছি মায়ের কাছে। বলা বাহুল্য সেই সব গল্প বেশিরভাগই খাবারের প্রসঙ্গে, দারগীঝিয়ের রান্নার প্রসঙ্গে। আমি খেয়েছি আমার মেঝফুফুর হাতের রান্না পিয়ুরসালা, আমার মা সেই পিয়ুরসালা খেয়ে বলেছিল, ভালো তবে দারগীঝিয়ের পিয়ুরসালার মতো নয়!

টাকানগর যা কিনা টেকানগর বা ট্যাহানগর নামে পরিচিত, সেই ট্যাহানগরের চৌধুরীবাড়ির ভেতরবাড়ি যিনি সামলাতেন, তিনি দারগীঝি। চৌধুরী ছুট্টু মিঞা সাহেবের প্রথম স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন প্রথম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে, দ্বিতীয় স্ত্রী, যিনি সাতগাঁও চৌধুরীবাড়ির মেয়ে, ছুট্টু মিঞা সাহেবের দ্বিতীয়া স্ত্রী হয়ে যখন ট্যাহানগরে এলেন, বাপের বাড়ির প্রথামত সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন দারগীকে। ভালো নাম তার কিছু একটা নিশ্চয়ই ছিল, তবে সে নাম দারগীঝিয়ের বাপের বাড়ি সাতগাঁওতেই থেকে গিয়েছিল, ট্যাহানগর চৌধুরীবাড়িতে সে সক্কলের দারগীঝি। তো ছুট্টু মিঞা সাহেবের এই গিন্নিও খুব বেশিদিন থাকেননি, ৩টি সন্তানের জন্ম দিয়ে কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে তিনিও বড়গিন্নির সাথে গিয়ে যোগ দেন পরপারে। ছুট্টু মিঞা সাহেব মানে আমার মায়ের মামা পড়েন মহা বিপদে। একে একে দুই দুইজন স্ত্রী মারা গেলেন এদিকে বাড়িতে নিজের তিনটি আর মরহুম ভগ্নী-ভগ্নীপতির পাঁচটি সব মিলিয়ে আট আটটি শিশু-কিশোর-কিশোরী। আত্মীয়-স্বজনদের পরামর্শ-উপদেশ আর আর কানে নেন না তিনি, এরপর আর বিয়ে করতে রাজী না হয়ে জমিদারী প্লাস এলাকার দায়-দায়িত্বের দিকেই মন দেন, অন্দরমহলের দায়িত্ব আপনা থেকেই পড়ে দারগীঝিয়ের কাঁধে বা হাতে।

জন্ম থেকেই জমিদারবাড়ির আঙিনায়-রান্নাঘরে বেড়ে ওঠা দারগীঝিয়ের কথা বা তার হাতের রান্নার কথা বলতে গিয়ে এখনও আমার মায়ের গলা ভার হয়ে আসে। এখনও কেউ ভালো কিছু রান্না করলে মা বলে, দারগীঝিয়ের মতন হইসে! আমার নানী জমিদারকন্যা-জমিদারের বিবি শুধু রান্নাঘরে মোড়ায় বসে রান্নার তদারকি করতেন, কী রান্না হবে সেটা বলে দিতেন, বাদবাকি কাজ দারগীঝিয়ের। ভালো-মন্দ রান্না যা হতো, সবই দারগীঝিয়ের হাতে, তা সে খাসির রেজালা হোক, বা মুর্গ মুসল্লম। বাড়ির রোজকার রান্না তো দারগীঝিই করে এমনকি ছেলে-পুলেদের সুন্নতের দাওয়াত মেয়ের বিয়ের তারিখের খানা, কারো বাড়িতে সুন্নত হলে সেখানে পাঠানোর পিঠে-নাশতা-মোরগ পোলাও সবটাই তাঁর ডিপার্টমেন্ট। ট্যাহানগর যাওয়ার রাস্তা বেশ অসুবিধেজনক হলেও ছুট্টুমিঞা সাহেবের বাড়িতে মেহমানের অভাব হতো না। বারো মাসই এইসব মেহমানদারির দায়িত্ব দশ হাতে সামলেছে দারগীঝি। যদিও এমনটাই শোনা, মায়ের কাছে ।

ট্যাহানগরের কথা একটু বলি। বিল-হাওড়ের মাঝখানে এক গ্রাম, বছরের ছয় মাস সেখানে যাওয়ার রাস্তাঘাট সব থাকে পানির তলায়। যাতায়াতের একমাত্র উপায় নৌকা। চারদিকে পানি আর মাঝখানে উঁচু খানিকটা জমি, ছোট্ট এক গ্রাম, ট্যাহানগর। আটচালা টিনের চালের কাঠের দোতলা বাড়ির সামনে গরু-ছাগলের সাথেই থাকতো একটা ঘোড়া। ছুট্টু মিঞা সাহেবের ছিল বজরা, যাতে করে তিনি পানির সময় কাজে বেরুতেন। সুদিনের জন্যে ছিল ঐ ঘোড়া, ক্ষেতের উপর বা শুকিয়ে যাওয়া বিলের উপর দিয়ে ঘোড়া হাঁকিয়ে সদর নাসিরনগরে যেতেন। জমিদারী চলে যাওয়ার পরে তিনি যেখানকার চেয়ারম্যান হন এবং একাধারে চল্লিশ বছর তিনিই থাকেন সেই এলাকার চেয়ারম্যান। বার পাঁচেক বোধ হয় বিনা নির্বাচনেই তাঁকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়েছিল। এদিকে ময়মনসিংহ, ওদিকে সিলেট আর এদিকে কুমিল্লা, তিন জেলারই বর্ডারলাইনে ট্যাহানগর দাঁড়িয়ে থাকলেও একটু বেশিই সে ঝুঁকেছিল ময়মনসিংহের দিকে। এদিকে সাতগাঁও পড়েছিল সিলেটে, দারগীঝি তাই কথা বলত সিলেটি টানে।

পিয়ুরসালার কথা বলছিলাম। খান সাহেব মানে আয়ূব খানের হাত ধরে চীন দেশ থেকে তখনও এই বাংলায় উচ্চফলনশীল ধান ইরি এসে পৌঁছুয়নি। ধান বলতে বর্ষার জলি-বষ্যাল-বোরো আর শীতের শাইলের কয়েক রকম ধান। এছাড়াও কিছু শখের ধানও ছিল বা আছে পিঠে-পোলাও খাওয়ার জন্যে, যার বেশির ভাগই এখন আর চাষ হয় না; খাসা, চিনিগুড়া, বাঁশফুল আর কাঁটাওয়ালা ধান আসমইত্যা। শাইল বরাবরই আলাদা করে রাখা থাকে বাড়ির লোকেদের জন্যে আর বাড়ির কাজের লোকেরা, মুনিষ বা আরও যারা পোষ্য, তাদের জন্যে জলি-বষ্যাল। পিয়ুরসালা দারগীঝি রাঁধতেন এই জলি বা বষ্যালের চাল দিয়ে। একটু মোটা আর লালচে রঙের চাল। তখনও, মানে দারগীঝিয়ের জমানায়, ঢেকিতে ভানা ধানই খাওয়া হতো, চালকল তো এসেছে আরও অনেক পরে।


আমরা ধান ভানি রে ঢেঁকিতে পাড় দিয়া
ঢেঁকি নাচে আমরা নাচি হেলিয়া দুলিয়া
আমরা ধান ভানি রে
(ময়মনসিংহ)

ঢেঁকিতে ধান ভানা রোজ রোজ হতো না। সপ্তায় একদিন বা পনের দিনে একবার। যেদিন ধান ভানা হয়, সেদিন আলো ফোটার সময় থেকেই সাজো সাজো ভাব। বস্তা বস্তা ধান মুনিষ এনে জমা করে ঢেঁকির ধারে। ধান বানার মানুষটি বেশিরভাগ সময়েই আসে পাড়া থেকে, এরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ধান শুধু ভানারই কাজ করে। কোথায় কুলো, কোথায় খলই, আর কোথায়ই বা পিড়ি। এই সব কিছুর যোগাড়ে সবচেয়ে ব্যস্ত থাকে মুনিষটি।

ঢেঁকি সাধারনত থাকে রান্নাঘরের এক ধার ধরে। একজন দাঁড়িয়ে ঢেঁকিতে পাড় দেয়, আরেকজন সামনে বসে হাত দিয়ে ধান ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেয়। ঘুরিয়ে না দিলে একই জায়গায় বারে বারে পাড় পড়ে একই জায়গার ধানের খোসা ওঠে, বাকি ধান থেকে যায় গোটা। অদ্ভুত এক শব্দ আর ছন্দে ঢেঁকি ওঠে, নামে আবার ওঠে আবার নামে। চলতেই থাকে যতক্ষণ না ঢেঁকিতে পাড়া দিতে থাকা রমণীটি ক্লান্ত হয়ে নেমে না আসেন। একজন নামলে অপরজন ওঠেন, যিনি বসে হাত দিয়ে ধান ঘুরিয়ে দিচ্ছিলেন। এই হাত দিয়ে ধান ঘোরানোর কাজটি যিনি করেন, তাকে থাকতে হয় খুব সজাগ, হাত চালাতে হয় ঢেঁকিরই ছন্দে। একটু এদিক ওদিক হলে ঢেঁকির পাড় এসে সোজা হাতের ঊপর। ঢেঁকির তালে ওঠে নামে নারী শরীর। সায়া-ব্লাউজহীন শরীরে প্রায় হাঁটুর উপর করে পরা আটপৌরে শাড়ির আঁচল শক্ত করে কোমরে গোঁজা, ঢেঁকি আর ধানের মিলনের ভোতা শব্দের সাথে মেশে চুড়ির রিনঝিন রিনঝিন, টুকরো কথা, উচ্ছল হাসি, আদিরসের কথা আর কখনো অপেক্ষারত শিশুর কান্না। সাজানো থাকে পান, তামাক, মুড়ি বা চিড়ে। বিশ্রামের সময়ে কোলে মাইটানা শিশু, হুকো হাতে মুড়ি চিবোতে চিবোতে ক্ষণিক সুখ-দুখের কথা। অল্পবয়েসি মেয়েরা ধান ভানতে ভানতে গীত গায়। নানান রকমের গীত গায় তারা। ধান ভানতে তারা বিয়ের গীতও গায়। একজন শুরু করলে আস্তে আস্তে গলা মেলায় অন্যেরাও। একসময় ঢেঁকির পাড়ের শব্দ যেন বাজনা হয়ে যায়, সঙ্গত করে সমবেত নারীকন্ঠের সঙ্গে। মেয়েলি গীতের সঙ্গে।


আম-তলায় ঝামুর ঝুমুর কলা-তলায় বিয়া
আইত্যাছে পাচির দামান গামছা মুরইয়া দিয়্যা,
উ গামছা ভালানা মাইয়া বিয়া দিমু না
যাওগা পুলার বাপ পুলারে হাতে নিয়া।
( মেয়েলি গীত)

বাড়ির মুনিষটির আর আরো যারা ছুটকো কাজের লোক আছে, তাদের সেদিন বারেবারেই ঘুরে ফিরে ধান ভানার জায়গায় কাজ পড়ে। কেউ আসে হুকো খেতে, কেঊ এসে বারে বারেই জানতে চায়, সে কী একটু ধান ঘুরিয়ে দেবে বসে? তাহলে একজন ক্ষণিক বসতে পারে! যারা ধান ভানে, তারা বাড়ির মুনিষের বাড়ানো সাহায্যের হাত বেশির ভাগ সময়েই অগ্রাহ্য করে, খুব ভালো করেই জানা আছে তাদের, মুনিষটি কেন এসে সামনে বসে ধান ঘুরিয়ে দিতে চায়। খেঁকিয়ে উঠে বিদেয় করে, 'নিজেগো কাম নিজেরাই করুম তুমরা নিজের কাম করো গিয়া।'

ধান যখন আধবানা হয়ে আসে তখন ঢেঁকি চলতে চায় না, থপ থপ শব্দ ওঠে ভুসির। চাল চলে যায় নিচের দিকে, উপরে থাকে শুধু ভুসি, ঝেড়ে আলাদা করে না দিলে শুধু ঢেঁকি চালানৈ সার হবে। ঢেঁকি থেকে নেমে এসে তখন কুলো নিয়ে বসতে হয়। ঝেড়ে আলাদা করে দেয় ওরা চাল আর ভুসিকে। ঘরের এক কোণায় গিয়ে বসে চলে এই ঝাড়াপর্ব। ঝাড়া হয়ে গেলে ঝাঁটা দিয়ে একদিকে সরিয়ে দেয় ভুসি, খলইতে করে চাল আবার ঢেঁকির তলায়, কাড়া হবে এবার। ডাক পড়ে মুনিষের, এসে যেন খলইভর্তি ভুসি নিয়ে যায় সে।

মাসের ডাল তো থাকে বস্তাতেই, যখন যেমন দরকার, হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ভাঙিয়ে নেওয়া হয় ডাল ভাঙানির যাঁতিতে। একই মাপের গোলাকার দুখানা পাথরের চাকতি একটার উপর একটা বসিয়ে বানায় ডালের ভাঙানোর যাঁতি। যে চাকতিটা উপরে বসে সেটার ঠিক মাঝখানে একটা গোল ফুটো থাকে, ইঞ্চিখানেক মতো চওড়া, যাতে বিঘতখানেক বা তার একটু বেশি লম্বা বাঁশের লাঠি বসিয়ে যাঁতিকে ঘোরানো হয়। উপরের পাথরের ধার ধরে থাকে আরেকটা গোল ফুটো, যাতে করে ডাল ঢালা হয় যাঁতিতে। সে এক মজার জিনিস। দেখারও বটে। একজন যাঁতির পাশে পিড়ি পেতে বসে দুই হাতে ঐ ছোট্ট লাঠি ধরে পাথরের চাকতি ঘোরাচ্ছে আর ওটাকে ঘোরাতে গিয়ে নিজেও ঘুরছে। ওপাশে আরেকজন বসে ধারের ফুটোতে ডাল ঢালছে। ঘররর ঘরররর শব্দ তুলে নিমেষে ফুটোর ডাল ঢুকে যাচ্ছে যাঁতির ভেতর আর যে গতিতে যাঁতি ঘুরছে ঠিক সেই গতিতে গোল চাকতির চারধারে ভেঙ্গে যাওয়া ডাল ছড়িয়ে পড়ছে। উড়ছে পাউডার হয়ে যাওয়া ডালের খোসা, ছড়িয়ে পড়ছে বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে। দুহাতে করে টেনে টেনে ভেঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ডাল এক জায়গায় জড়ো করে এবার কুলোয় করে ঝেড়ে নেওয়ার পালা। মাঝে মাঝেই বাড়ির কুচোরাও এসে বসে ডাল ভাঙতে। চেষ্টা করে ঐ ভারি যাঁতি ঐটুকুনি ছোট্ট লাঠি দিয়ে ঘোরাতে, পারে না, তবু বারে বারেই চেষ্টা চালিয়ে যায়। এও যেন এক খেলা। এই ডাল ভাঙতেও বাইরের লোক আসে কিন্তু বাড়ির মেয়ে বউরাও সক্কলকে নাশতা পানি দিয়ে নিজেরা খেয়ে আবার দুপুরের রান্নায় জুটে যাওয়ার আগে খানিক হাত লাগায় এসে। পিড়ি পেতে বসে গোল গোল ঘুরে যাঁতি ঘোরায়, ডাল ভাঙ্গে। ডাল ভাঙানি বউদের সাথে নিচু সুরে গলা মেলায় গীতে। হ্যাঁ। গীত হয় এখানেও।

কালাইর বুইনের
ব্যাল গাচতলা
লান্দিস নালো তোরা
লান্দিস- না
ওনালো, জোলা মাতি লান্দিস না-।।
কালাইর বুইনের
কোলই ক্ষ্যাতের মৈদে
লান্দিস নালো- তোরা
লান্দিস না- ।।
কালাইর বুইনের
কচু গাচতলা
লান্দিস- না
ওনালো- জোলা মাতি লান্দিস- না।। (মেয়েলি গীত)

বলছিলাম পিয়ুরসালার কথা। তবে পিয়ুরসালাতে ভাঙ্গা ডাল দেয়া হয় না, দিতে হয় খোসাশুদ্ধু আস্ত মাসের ডাল। মোটা মোটা করে কেটে নেওয়া আদা, খোসা ছাড়ানো গোটা গোটা রশুনের কোয়া, তেমনি মোটা আর লম্বা করে কাটা পেঁয়াজ, গোটা গোটা শুকনো লংকা। হাওড় অঞ্চলের বিখ্যাত লাল আর ঝাল লংকা। বিল-হাওড়ের মাঝখানের টাকানগর ও তার আশেপাশের অঞ্চল এতটাই নিচু যে বর্ষার পানি বড় অনায়াসে ডুবিয়ে দেয় ছোট্ট ছোট্ট ঐ গ্রামগুলোকে। আর সেই পানি থেকেও যায় রাজার মেজাজে বহুদিন। এমনিতেও সরু সরু নদী শিরা উপশিরার মতো বিছিয়ে আছে গোটা এলাকা জুড়ে, যদিও বর্ষায় কোনো নদীকেই আর আলাদা করে চেনা যায় না। যাবো না যাবো না করেও সেই পানি যখন যায় তখন বাড়ির নামায়, ছোট ছোট টুকরো জমিতে লংকার চাষ হয়। বেশ ঝাল হয় ওদিককার লংকা, সরু সরু দেখতে আর টকটকে লাল সেই লংকার রং। এক ফসল কেটে এনে চটজলদি আরেক ফসল লাগানোর তাড়া তখন থাকত না ফলে আরামসে ক্ষেতের মধ্যেই সেই লংকা পেকে লাল হতো। পানি সরে যাওয়ার পর পলি পড়া জমিতে চারিদিকে যখন সবুজে সবুজ ফসলের মাঠ, গ্রাম-বাড়ি-ঘর-দোরের আনাচ-কানাচ, তখন রং বদলায় সবুজ লংকারা। হালকা লাল, গাঢ় লাল, ফিকে লাল, কালচে লাল। শুধু লাল। সেই লংকা যখন গাছেতেই শুকোতে শুরু করে তখন কৃষক লংকাসুদ্ধু গাছ উপড়ে এনে উঠোনে ফ্যালে, ছড়িয়ে দেয় উঠোনময়।অসারাদিন রোদে থাকে লংকার গাছ, শুকিয়ে আসা লংকার ঝাঁঝে বাড়িতে টেকা দায়। গেরস্থের চোখে-মুখে লাগে না সেই ঝাঁঝ। বছরে ছ'মাস তো জমিন থাকে পানির তলায়, এখন, যখন ফসলের সময়, ফসল উঠসে ঘরে, ঝাঁঝ-ঝাল লাগলে চলবো! একটু শুধু সামলে রাখতে হয় বাড়ির ছোটদের। খেলতে গিয়ে লংকায় হাত না দেয় কেউ বিকেলবেলায় লংকার গাছকে লাঠি দিয়ে টেনে টেনে এক জায়গায় জড়ো করে রাখা হয়। নাকে-মুখে গামছা বেঁধে মেয়েরা সেই লংকা ভাঙে গাছ শুকিয়ে খটখটে হয়ে গেলে। বস্তায় বেঁধে গোলাঘরের মাচায় উঠে যায় শুকনো লংকা। বছরকার জন্যে।

হালের বলদ দিবে খুড়া
দিবে হে বীচির গুড়া
            ভেনে খাইতে ঢেঁকি কুলা দিবে
আমি পাত্র তুমি রাজা
আগে কর মোর পূজা
            অবশেষে ভাঁড়ুরে জানিবে
(কবিকঙ্কন চন্ডী)


পিয়ুরসালায় আর যা না পড়লেই নয় সে হচ্ছে শুকনো শিমের বীজ বা দানা। মাচায় মাচায় শিমগাছগুলো যখন পুরনো হয়ে আসে, শিম ফুরিয়ে যেতে থাকে, গরম এসে পড়ায় শিমের সময়ও ফুরিয়ে আসে তখন যে মাচার শিমে সবচাইতে বেশি পুরুষ্টু বিচি হয় সেই মাচার শিম আর তোলা হয় না খাওয়ার জন্যে। শিম-গাছসুদ্ধু মাচা এমনি রেখে দেওয়া হয়। গরম পড়ামাত্রই মরে যেতে থাকে শিমগাছেরা। শুকিয়ে আসতে থাকে লতা-পাতা আর শিম। যেসব মাচার শিম ফুরিয়ে গেছে মাচা থেকে নামিয়ে দেওয়া হয় সেসব কিন্তু মাচাতেই থেকে যায় শিমভর্তি বাকি গাছগুলো, যেগুলোকে রাখা হয়েছে বীজের জন্যে। মরা গাছের পাতা হলদে হয়ে আসে, ক্রমশ খয়েরি। গাছের জড় কেটে দেওয়া হয় যাতে মাটির রসে একটুও ভিজে না থেকে যায় লতা-পাতা-শিম, গাছেতেই না শুকোলে সেই বীজে পরের বছর ভাল গাছ হবে না। পাতাগুলো যখন শুকিয়ে গিয়ে প্রায় মুচমুচে হয়ে যায়, হাতে নিয়ে কচলে দিলে গুড়িয়ে গিয়ে পাউডার হয়ে যায় তখন মাচা থেকে টেনে টেনে নামানো হয় শুকনো গাছ। শুকিয়ে বেত হয়ে যাওয়া ডাল থেকে থোকা থোকা শুকনো শিম নামিয়ে উঠোনে মেলে দেওয়া হয় আরও খানিকটা শুকোনোর জন্যে। খুব বেশি রোদ খাওয়াতে হয় না অবশ্য। শিমদানা গাছে থাকতে থাকতেই হয়ে গেছে শুকনো কটকটে।

নানা রঙে চিত্রিত হয় শিমদানার শরীর। ঐটুকুনি একটা দানার গায়ে থাকে তিনটে চারটে করে রঙ। সাদা, কালো, খয়েরি, বাদামির ছোট্ট ছোট্ট ছোপ। চিত্রিত পাতলা খোসার ভেতর হালকা বাদামি রঙের দানা, খোসা ছাড়ানো শিমদানা দেখতেও অনেকটা চীনেবাদামের মত। মাটির খোলায় একে একে ভেজে নিতে হয় চাল, মাসকলাইয়ের ডাল, শুকনো শিমদানা। ভাজার সময় খোলায় থাকে বালি। গরম বালিতে কয়েকগাছা সরু করে চিরে নেওয়া বাঁশের কাঠি, যা দিয়ে সাধারনত নেড়ে নেড়ে ভাজা হয় চাল-ডাল বা শিমদানা। এই কাঠিগুলো দেখতে ঠিক যেন একগোছা চপস্টিক, শুধু আকারে দ্বিগুন লম্বা। পটপট শব্দে ফাটতে থাকে শিমদানা, চারপাশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে খইয়ের মতো। দু'ভাগ হয়েও খানিকটা শুধু জুড়ে থাকে, ঠিক যেন দুভাগ হুওয়া ছোট্ট ঝিনুক। খোলায় ভাজার সময় একটু সাবধানে থাকতে হয়, শুধু যে পটকা ফাটার শব্দে দুমদাম তারা ফাটে তাই নয়, খোলা ছেড়ে যত্র তত্র তারা ছিটকে ছিটকে পড়ে গরম বালির কণা সাথে নিয়ে। ভাজা শিমদানার রঙ গাঢ় বাদামি। খোলায় ভাজার সময় সোঁদা একটা গন্ধ বেরোয় শিমদানা থেকে, বালিতে ভাজা হয় বলে যোগ হয় একটা পোড়া পোড়া গন্ধ। অদ্ভুত এক গন্ধ। সোঁদা আর মাদক। যে কোনো রান্নার স্বাদ- গন্ধ পুরো পালটে দেয় এই ভাজা শিমদানা। হোক সে মুর্গি বা হাঁস।

ভাজা মাসের ডালের খোসা ছাড়ানোর কোনো প্রশ্ন নেই, কিন্তু খোসা ছাড়াতে হয় শিমদানার। রান্নাঘরের মেঝেতে দুই বা চারভাঁজে ভাঁজ করা চটের বস্তা বিছিয়ে নিয়ে তাতে গরম গরম শিমদানা ঢেলে নিয়ে দিয়ে আলতো হাতে নোড়া বুলিয়ে নিতে হয়, জোরে চাপ দিলে ভেঙে যাবে ভাজা দানা, কাজেই খুব সাবধান। উদ্দ্যেশ্য শুধুমাত্র খোসা ছাড়ানো, দানাটাকে ভাঙা নয়। এরপর কুলোয় করে চালঝাড়ার মতো করে ঝেড়ে-বেছে নেওয়া। আলাদা আলাদা পাত্রে সব ভিজিয়ে দেওয়া, ভাজা চাল, শিমদানা আর মাসের ডাল। খুব বেশি সময় ভেজানোর দরকার নেই, বেশ অনেকটা সময় দমে থাকবে জিনিসগুলো।

এই ভাজা শিমদানা খোলা থেকে নামা মাত্র মুঠো মুঠো চলে যায় বাড়ির পোলাপানদের হাতে। গরম গরম দানাগুলো তারা এহাতে ওহাতে বদলে বদলে নেয়, জোরে ফুঁ দিতে থাকে মুঠোয় ধরা লোভনীয় বস্তুটিতে, মুহূর্তেই হাত থেকে মুখে, মটমট শব্দ শোনা যায় শিমের দানা ভাঙার। জিভে গরম ছ্যাঁকা খাওয়ার আহা উহুঁ ও শোনা যায়।

রান্না আর এমন কী। খিচুড়ি যেমন চাপে তেমনি এও চাপিয়ে দিতে হয়। বড় হাঁড়িতে তেল বা ঘি গরম করে খানিকটা করে গরম মশলা আর আগে থেকে কেটে রাখা পেঁয়াজ। ভাজা ভাজা হয়ে এলে ভাজা-ভিজিয়ে রাখা জল ঝরানো চাল, মাসের ডাল আর শিমের বিচি। আন্দাজমতো লবন, আদাবাটা আর পেঁয়াজবাটা আর খোসা ছাড়ানো রসুন। খানিক নেড়ে-চেড়ে ইচ্ছেমতন পানি দিয়ে দেওয়া। চুলোর জ্বাল ধিমে। হতে এখন একঘন্টা সময় লাগবে। মাঝে-মধ্যে একটু নেড়ে দিতে হয়, নইলে ধরে যাওয়ার চান্স আছে ষোলআনা। আদাকুচি, আরও বেশ খানিকটা কাটা পেঁয়াজ পানি শুকিয়ে আসার সময় দিয়ে দেওয়া। আগে থাকতে দিলে এই কাটা বা কুচনো আদা-পেঁয়াজ সেদ্ধ হয়ে যাবে, উদ্দেশ্য সেটা নয়। নামানোর খানিক আগে দেওয়া, যাতে খাওয়ার সময় আধকাঁচা আদা-পেঁয়াজ কামড়ে পড়ে, স্বাদ এবং গন্ধ দুটৈ টাটকা পাওয়া যায়। পানি যখন মোটামুটি শুকিয়ে এসেছে বলে মনে হয়, তখন জিনিসটাকে দমে দেওয়া। মোটা তাওয়া হাঁড়ির তলায়, হাঁড়ির ঢাকনা যা কিনা দেখতে বড় একটা থালার মতো, তার উপর খানিকটা জ্বলন্ত কয়লা বিছিয়ে দেওয়া হাতায় করে। যেমনটা দমের যেকোনো রান্নায় দেওয়া হয়। ঐ কয়লা দেওয়ার আগে চামচে করে খানিকটা ঘি অবশ্যই ছড়িয়ে দিতে হয় উপর থেকে, বলার প্রয়োজন নেই যে সেটা ঘিয়ের টাটকা গন্ধের জন্যেই দেওয়া হয়।

বার মাসে তের খালে
আর খাবে কি?
আঊটা দুধে পাকা কলা
খিচড়ি ভাতে ঘি গো সজনী।
খিচড়ি ভাতে ঘি।
(বারমাস্যা/ চাং গান)


হাঁড়িতে চাল এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে পানি যতক্ষণ বেশি থাকে, চুলোর জ্বাল থাকে চড়া, মাঝে মাঝে শুধু একটু নেড়ে দেওয়া। কিন্তু পানি যখন ফুটতে শুরু করে, আর টান ধরে তখন জ্বাল কমিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে হয়, কখন পানি টেনে চালের গা মাখা মাখা হবে। তেমনটি হয়ে এলে হাঁড়ি নামিয়ে ভারি তাওয়ায় দমে বসাতে হয়, যাতে ধিমে আঁচে আধফোঁটা চাল, ডাল, শিমদানা ভাপে সেদ্ধও হয়ে আর তলায়ও না ধরে। এই দমে বসানোতে সঙ্গতে থাকা মশলার স্বাদ-গন্ধ ভালো মতন ঢুকে যায় চাল-ডালে। হাঁড়ির উপরের ঢাকনায় জ্বলন্ত কয়লা দেওয়ার উদ্দেশ্য, গরম ভাপটা যেন দু'দিক থেকেই পায় ভেতরকার পিয়ুরসালা।

জলি বা বষ্যালের চাল এমনিতেই লালচে রঙের তায় ঢেঁকিতে ভানা চাল আরৈ লাল হয়। যদিও বারে বারে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ভানা হয়, তারা যেটাকে বলেন 'কাড়া'। এক কাড়া, দুই কাড়া বা অনেক সময় তিন কাড়া। এক কাড়ার চাল একদম খয়েরি দেখতে হয়, যতবার কাড়া হতে থাকে, চালের রঙ হালকা হতে হতে একটা সাদাটে ভাব আসে বটে কিন্তু আসলে চালটা লালচে রঙের। পিয়ুরসালায় দেওয়া আস্ত মাসের ডাল, ভাজা শিমদানারও নিজস্ব রং আছে সব মিলিয়ে হালকা খয়েরি রঙের দাঁড়ায় আমাদের এই পিউরসালার। গন্ধ? ভাজা শিমদানা যাঁরা দেখেননি বা খাননি তাঁদের আমি কী করে বোঝাই স্বর্গীয় খাদ্যবস্তুটির স্বাদ-গন্ধ কেমন হয়! তো এই শিমদানা, ভাজা মাসের ডাল, আদাবাটা, কাটা পেঁয়াজ-রশুন, ঘি আর জলির চালের নিজস্ব সোঁদা গন্ধ মিলে মিশে যে গন্ধটি ছাড়ে, তাতে আশে-পাশের বাড়ির বাড়ির লোকজন এসে নাকি জানতে চাইত, দারগীঝি কিতা আইজ পিয়ুরসালা রানছো নি?

                                 দারগীঝি কিতা আইজ পিয়ুরসালা রানছো নি?

                      পিয়ুরসালা যেমন খাবার সেটা সত্যি এবং একটা কম্পলিট মিল

                      পিয়ুরসালা দারগীঝি রাঁধতেন এই জলি বা বষ্যালের চাল দিয়ে

                                            একটু মোটা আর লালচে রঙের চাল

                                            ভিজিয়ে রাখা জল ঝরানো চাল

                      তেমনি মোটা আর লম্বা করে কাটা পেঁয়াজ, গোটা গোটা শুকনো লংকা

                                            ভাজা শিমদানার রঙ গাঢ় বাদামি

                      যে কোনো রান্নার স্বাদ- গন্ধ পুরো পালটে দেয় এই ভাজা শিমদানা

                                 ঐটুকুনি একটা দানার গায়ে থাকে তিনটে চারটে করে রঙ

                                            নানা রঙে চিত্রিত হয় শিমদানার শরীর

                                            কিন্তু খোসা ছাড়াতে হয় শিমদানার

                      এছাড়াও কিছু শখের ধানও ছিল বা আছে যার বেশির ভাগই এখন আর চাষ হয় না


২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০

118 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ টুকরো খাবার 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন