বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

চিনি উহারে

নিয়ামৎ খান

বাইশ বছর আগে আমি একবার কার নিকোবর গেছলাম। সেখানে এক তুমুল বৃষ্টির সন্ধ্যেয় কাদামাখা আলোহীন রাস্তা দিয়ে বাবা আমাকে তিন মাইল হাঁটিয়ে নিয়ে গেছলেন কি নাকি কোন এক দোকানে রসোগোল্লা পাওয়া যায় সেখানে। রসোগোল্লা এমন কিছু দুর্লভ খাবার নয়, বিশেষ করে আর চার দিন পরে বাড়ি ফিরলেই অঢেল খাওয়া যাবে, তবু। এই ভেঞ্চারের কারণ নিয়ে পরে অনেক ভেবেছি। একটাই উত্তর পাই। অচেনা জায়গায় চেনা খাবারের কথা শুনলে মানুষের মনে বড্ড বেশি আনন্দ হয়। তাহলে এই নিয়ে দু চার কথা বলা যাক? বিষয়টা খুব হেলাফেলা করার মত নয় যাইই বলুন, এর জন্যে বললাম তো তুমুল বৃষ্টি, আরো কত কি তুচ্ছ করে ...ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে কহানী মে থোড়িসি টুইস্ট হ্যায়। বিদেশ বিভুঁইয়ে চেনা খাবার বলতে আমি লন্ডনের ব্রিক লেনের মাছের ঝোল, হিউস্টনে বৌদির দোকানের মিষ্টি দই বা অ্যাটলান্টার আলাদীনের মোগলাই পরোটার কথা বলব না। এ নিয়ে আগে অনেক লেখা আপনি পড়ে নিয়েছেন। আমি তাদের কথা বলছি যারা আজকে পুরোপুরি বিদেশী সিটিজেন কিন্তু নাম শুনেই আপনার মনে হবে চিনি উহারে। হয়তো কোনো এক কালে একই দেশে এঁদের জন্ম, তারপরে সবাই দূরদেশে পাড়ি জমিয়ে কালে কালে সেইখানকারই হয়ে গেছেন। তবে এই নামের উৎস-বিবর্তন-হেনা-তেনা, এ নিয়ে আমি বিশদে কিছু বলতে পারবোনা ভাইজান, এটি বড় ভাই কলিম খানের এলাকা। আমার কাজ শুধু খাদ্যভাই-বোনদের খুঁজে দেখা। তো, আসুন দেখি দু একজনকে।

খট্টাঙ্গ ও পলান্ন : খট্টাঙ্গের সঙ্গে এর আসলে কোন সম্পর্ক নেই (কিম্বা নিতান্ত দূর সম্পর্ক আছে, যদি খেতে পেলেই শুতে চাওয়ায় আপনি বিশ্বাসী হন ) তবু এই নামটা দিলাম, কেননা এমনি নাম দিলে বেশ চোখ-টানা হয়। তা পলান্নের কথা বলি। পলান্ন হল গিয়ে সাধু ভাষা। চলতি ভাষায় আমরা দিব্যি বলি পোলাও। পলান্ন থেকেই রিগ্রেশন হয়েছে না অন্য কোন ভাষা থেকে এসেছে সে তর্কে যাচ্ছিনা। তবে পোলাও আমাদের সবার চেনা। কিন্তু শুধু আমাদের নয়, আপনি ইরান দেশে যান,খাবার টেবিলে হামেশাই পাবেন "পোলো'। কখনো সুগন্ধী পাতা মিশিয়ে ভাজা ভাত, তখন তার নাম "সব্জি পোলো', কখনো মাছের টুকরো দিয়ে, তখন তার নাম নাম "মাহী পোলো', এমনি ধারা। তবে নাম যাইই হোক না কেন,স্বাদে খানিক তফাত থাক না কেন, এ সেই আদি ও অকৃত্রিম পোলাও। শুধু ইরান নয়, উজবেকিস্তানে গেলে শুনবেন "পিলাফ' (আজকাল আমেরিকাতেও এই নাম চালু হয়ে গিয়েছে), আর তুর্কি গেলে যে সুস্বাদু ভাতভাজা আপনার টেবিলে হাজির হবে, তার নাম "পিলাভ'।

এর শেষ কিন্তু এখানেই নয়। আরো মজার ব্যপার আছে । ভেবে দেখুন পলান্ন কিনা খাঁটি সংস্কৃত কথা। ক্লাস সেভেনের গ্রামার ক্লাসে আমরা পড়েছি এ আসলে পল্‌ মিশ্রিত অন্ন। সঙ্গে ব্র্যাকেটে লিখে দেওয়া ছিলো যে "পল্‌ অর্থাৎ মাংস'। মনে আছে তো? এই বার আসুন টুক করে একটু লাতিন অঞ্চলে ঘুরে আসি। স্পেনে আর লাতিন আমেরিকায় মুরগীর টুকরো মেশানো ভাতের নাম কি জানেন তো? "অ্যারোজ কন পোয়ো'। তা লাতিনে "ল' এর উচ্চারণ "য়' দিয়ে হয় বটে,বানানটি কিন্তু "পোলো'। আর এই পোলো বা পোয়ো হল গিয়ে মুরগীর মাংস। অর্থাৎ সেইই, পল্‌। বেশ ব্যপার, না?

আ গয়া, আ গয়া,হাল্‌ওয়া-ওয়ালা আ গয়া : সেই তো, হাল্‌ওয়া-ওয়ালা এলে কার না আনন্দ হয়? হাল্‌ওয়া আমরা সবাই ভালোবাসি। সুজির, গাজরের, বাদামের। পশ্চিমবঙ্গে আর বাংলাদেশে আমরা দিব্যি এর নাম করে নিয়েছি "হালুয়া'। জন্মের সময়ে এঁর নাম ছিলো "হাল্‌ভা', আরবদেশে। পরে অনেক অনেক দেশ-ভ্রমণ করে করে হালুয়ার বিস্তার এখন সারা পৃথিবী জুড়ে। ওরিজিনাল "হাল্‌ভা' নামে এঁকে পাবেন এস্তোনিয়ায়, বসনিয়ায়, আর্মেনিয়ায়, ইউক্রেনে, এমনকি আলবানিয়াতেও। অবশ্য স্বাদে তফাত আছে কিছু কিছু। যেমন আলবানিয়ার হাল্‌ভায় চকোলেট আর ভ্যানিলার স্বাদ, বসনিয়ায় আবার বাদামবাটার রমরমা। বলকান দেশগুলো, এই রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, বুলগেরিয়া, রাশিয়া এই সব দেশেও বাদামের হালুয়া পাবেন, তার নাম হলো "খালভা'। খাল্‌ভা গ্রীসে, ম্যাসিডোনিয়াতেও পাওয়া যায়, কিন্তু ওখানে তৈরী হয় তিলবাটা বা তাহিনি দিয়ে। ম্যাসিডোনিয়াতে হালুয়ার "তান আল্‌ভা' নাম হয়তো এই তাহিনি থেকেই এসেছে। আরো আছে, বাহরিনে, মাল্টায়, ইরানে, পোল্যান্ডে, হাঙ্গারীতে... কোথাও সুজির, কোথাও তিলের, কোথাও বাদাম থেকে তৈরী মাখনের, কোথাও সূর্য্যমুখী ফুলের বীজের। তাদেরও নাম হাল্‌ভা, বা খাল্‌ভা, কোথাও কোথাও চাল্‌ভা। এছাড়া সোমালিয়াতে "হাল্‌য়ো', সিংহলে "আলুয়া', কুর্দ এ "হেল্‌য়ো', বর্মায় "হালাওয়া'... হালুয়ার বিস্তৃতি চাট্টিখানি কথা নয়। সব থেকে আমার ভালো লেগেছিলো যখন এঁর নাম শুনেছিলাম তুর্কিতে। "বাদেম হালভেসি'। অর্থাৎ কিনা, আজ্ঞে হ্যাঁ, "বাদামের হালুয়া'।

শেষপাতে : মাংসভাত হলো, হালুয়া টালুয়াও হলো, এর মধ্যে হয়তো কাবাব-কেবাব-ক্যাবব-কেওয়াপ নিয়েও দু চার কথা বলা যেতো, তবে শেষপাতে যখন এসেই পড়েছি তখন আর পিছু না হেঁটে মিষ্টিকথা বলাই সমিচীন। ক'দিন আগে আমি পার্সিয়ান খাবার দাবারের কথা পড়ছিলাম। তাইতে এক মিষ্টির নাম দেখলাম "জুল্‌বিয়া' ( "জ' কে এখানে । এর মতো পড়ুন)। দই আর চিনি দিয়ে মাখা ময়দার গাঢ় গোলা একটা ফানেল দিয়ে গরম তেলে ফেলতে হয় যাতে বেশ প্যাঁচানো আকার হয়। তারপরে তাকে লাল করে ভেজে তুলে গোলাপজল মেশানো চিনির রসে ফেলা। তা এই রসমাখা লালচে ভাজা প্যাঁচালো জুল্‌বিয়ার কথা শুনে আপনার কারু কথা মনে পড়ছে না? ভাবুন তো, ভাবুন তো। হ্যাঁ, আপনি এক্কেবারে ঠিক ধরেছেন ভাই; "জলেবী' ... "জিলাবী'। তবেই বলুন....কি বলেছিলাম? শুনেই আপনার মনে হবে ..... "চিনি উহারে'।

পি-এস : এই সব খাদ্য ভাই-বোনদের খোঁজ আমাকে দিয়েছেন কুলিনারী ইনস্টিটিউট অফ অ্যামেরিকার "প্রোফেশন্যাল শেফ' বইটি,শারমিন জাইকাফ (সেভ্যর ম্যাগাজিন), সঈদ সিনা (অল্‌-পার্সিয়ান ডট অর্গ), স্যালি বার্ণস্টাইন (এথনিক কুইসিন) আর আমার শ্রদ্ধেয়া শিক্ষিকা শ্রীমতি ডনা বীচ (পেন্‌ ফস্টার কলেজ, কেটারিং বিভাগ)।



৭ই নভেম্বর, ২০০৯

30 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ টুকরো খাবার 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন