যৌনতা ও রাজনীতিঃ এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে?

শৌভ চট্টোপাধ্যায়


ভূমিকা: অনিচ্ছুক পাঠকের জন্যে আশ্বাসবাণী

যৌনতার সঙ্গে রাষ্ট্রের (বা, বলা ভালো, ক্ষমতার) সম্পর্কটা সবসময়েই জটিল এবং, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, এরা একে অপরকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে ও নিজেও ব্যবহৃত হয়, বুঝে বা না-বুঝে। আবার সেই যৌনতা যদি প্রথাবিরুদ্ধ হয়, যদি তা হয় সমকামিতার মতো একদা-অপরাধ, তাহলে রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। কিন্তু শুধুই কি সংঘাত? আর সেই সংঘাতও কি কেবল দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল ক্ষমতার সঙ্গেই? তথাকথিত বামপন্থী উদারতাও কি বেমালুম হজম করে নিতে পারে যৌনতার ব্যতিক্রম বা ব্যতিক্রমী যৌনতা? না কি তাকেও ঢোঁক গিলতে হয়, যুঝতে হয় নিজের অন্তর্গত স্ববিরোধগুলির সঙ্গে?

এই স্বল্প পরিসরে আমরা এই প্রশ্নগুলি নিয়েই আলোচনা করতে চাই। এবং, সে আলোচনা যে নিছক নিরস তত্ত্বকথায় পর্যবসিত হবে না, এ গ্যারান্টি থাকছে লেখকের তরফ থেকে, থাকছে বিফলে মূল্য ফেরতের নিশ্চয়তাও। আসলে, আমাদের আলোচনার ভিত্তিভূমি তৈরি করেছে, না, কোনো তাত্ত্বিকের দুর্বোধ্য জার্গনবাজি নয়, একটি উপন্যাস ও একটি চলচ্চিত্র। মজার ব্যাপার হল, দুটৈ উঠে এসেছে লাতিন আমেরিকা থেকে---উপন্যাসটির লেখক আর্জেন্টিনীয়, আর চলচ্চিত্রটি কিউবার।


মাকড়শা-মানবীর চুম্বন: কিছু গল্প, কিছু টীকা, কিছু টিপ্পনি

বুঝ লোক যে জানো সন্ধান। আগের কিস্তিতে যে উপন্যাসটির কথা আমরা বলছিলাম, তা আসলে মানুয়েল পুইগের "কিস অফ দ্য স্পাইডার-উওম্যান" (স্প্যানিশ: El Beso de la Mujer Araña )। যাঁরা বইটি পড়েননি, তাঁদের সুবিধার্থে এখানে রইল একটি সংক্ষিপ্তসার।

গল্পটা দুজন বন্দীকে নিয়ে -- মোলিনা এবং ভ্যালেন্টিন। মোলিনা আসলে একজন পুরুষ সমকামী, জেলে এসেছে এক নাবালককে "বিপথগামী' করার অভিযোগে। আর ভ্যালেন্টিন এক আলোকিত বিপ্লবী -- সরকারকে উৎখাত করতে চায় এমন একটি বৈপ্লবিক দলের সদস্য। গোটা উপন্যাসটির মজা এই যে, এখানে কোনো সবজান্তা কথক নেই, নেই কোনো বর্ণনা। কেবলমাত্র মোলিনা আর ভ্যালেন্টিনের কথোপকথনকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে এই উপন্যাসের ন্যারেটিভ। এমনকি, সেই কথোপকথনেও বক্তার নাম দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেননি লেখক -- কেবলমাত্র "-' দিয়ে আলাদা করা হয়েছে দুজনের বক্তব্য। আর সেই নামহীন কথোপকথনের রেশ ধরেই আমাদের বুঝে নিতে হয় এই দুজনের সম্পর্কের বাঁকবদল এবং অন্তর্গত চোরাস্রোত। পাঠকের সক্রিয় অংশগ্রহণ এইভাবে আবশ্যিক হয়ে ওঠে গল্পটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে, তাকে পরিণতি দেওয়ার জন্যে।

ভ্যালেন্টিন, যে কিনা দিনবদলের স্বপ্নে আস্থা রাখে, সাহস রাখে স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের, তাকেও শুরুতে আমরা সিঁটিয়ে থাকতে দেখি -- মোলিনার উপস্থিতি তার কাছে আপত্তিকর, এমনকি বিবমিষা- উদ্রেককারী। তার মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের কাঠামোটিকে ভেঙে দিতে পারেনি তার রাজনৈতিক চেতনা। অথবা, হয়তো তার রাজনীতি গড়ে উঠেছে যৌনতার পরিসরটিকে একরকম বাদ দিয়েই। এই প্রসঙ্গে আমরা আবার ফিরে আসব এই প্রবন্ধের শেষভাগে, আপাতত, মোলিনার কথা।
মোলিনা সমকামী, কিছুটা মেয়েলি, এবং চরম সিনেমাখোর। বিশেষত, গ্যাদগ্যাদে সেন্টিমেন্টাল ছবি অথবা আজগুবি মেলোড্রামা তার সবচেয়ে পছন্দ। জেলে বসে সে এইসব সিনেমার গল্প শোনায় ভ্যালেন্টিনকে। ভ্যালেন্টিন শুরুতে বোর হয়, মোলিনার স্থূলরুচিতে কিছুটা বিরক্তও হয়তো বা। কিন্তু ক্রমশ এই গল্পের সূত্র ধরেই তারা একে অপরের কাছে আসে। ক্রমশ ভ্যালেন্টিন বুঝতে পারে মোলিনার চরিত্রের কোমল দিকগুলো, তার মধ্যবিত্ত নৈতিকতার সঙ্কীর্ণতাকে অতিক্রম করে সে ধীরে ধীরে মোলিনাকে গ্রহণ করতে শেখে।

দাঁড়াও পাঠকবর! এখানেই গল্পটা শেষ হয়ে যেতে পারত, একটি নরম বন্ধুত্বের মিলনান্তক আবহে। কিন্তু পুইগের উদ্দেশ্য তা ছিল না। তাই, শেষ অবধি, উপন্যাসটিকে একটি রাজনৈতিক ভাষ্য হিসেবে পড়ার স্বাধীনতা তিনি দিতে চান পাঠককে। আর তার জন্যে পুইগ ব্যবহার করেন আরেকটি কায়দা -- যথেচ্ছ পাদটীকার ব্যবহার। শুরুতে অদ্ভুত লাগলেও, ক্রমশ গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে গিয়ে আমরাই তৈরি করে নিতে থাকি উপন্যাসের নিহিত রাজনৈতিক বক্তব্যটি। পাদটীকাগুলি প্রায় সবক্ষেত্রেই মনোবিদ্যার বিভিন্ন তাত্ত্বিক লেখাপত্র থেকে সরাসরি উদ্ধৃতি অথবা তার টীকাভাষ্য। তার মধ্যেও বারবার ঘুরেফিরে আসে হারবার্ট মার্কিউজের লেখালিখি।

টীকা: এখানে হারবার্ট মার্কিউজের ব্যাপারে ছোটি সি জানকারি। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের তাত্ত্বিক মার্কিউজ বিখ্যাত হয়ে আছেন মার্ক্স ও ফ্রয়েডের চিন্তাধারাকে এক সুতোয় বাঁধার জন্যে। তাঁর "ইরস অ্যান্ড সিভিলাইজেশন' বইতে তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে পুঁজিবাদী সমাজ আসলে যৌনচেতনার অবদমনের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। তিনি বলেছিলেন, পুঁজিবাদী সমাজ আসলে আমাদের যথার্থ অবদমনহীন সমাজে উত্তরণের পথে বাধা সৃষ্টি করে। ফ্রয়েডের বক্তব্য ছিল, যৌনতা যে শক্তি বা এনার্জির জন্ম দেয় তাকে অবদমনের মাধ্যমেই সঠিক পথে চালনা করা সম্ভব এবং এভাবেই সমাজের অগ্রগতি ঘটে। নইলে, অনিয়ন্ত্রিত যৌনতা ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে এবং ভেঙে দিতে পারে সমাজের মূল বুনিয়াদটাই। আর তাই, সমাজের অগ্রগতির স্বার্থেই মানুষকে তাৎক্ষণিক আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে হয়, জড়িয়ে থাকতে হয় বিবেকদংশনের জালে। ফ্রয়েডের এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে মার্কিউজ বলেন, সমাজের "অগ্রগতি'র আসল অর্থ হল চলতি ব্যবস্থাকে ভবিষ্যতেও স্থিতিশীল রাখার চক্রান্ত। তাঁর মতে মূল বিরোধটা শ্রম (অলসতাহীন জীবন, রিয়্যালিটি প্রিন্সিপল) এবং যৌনতার (প্লেজার প্রিন্সিপল -- আলস্য ও আনন্দ) নয়, বরং বিরোধটা আসলে বিযুক্তিকৃত (এলিয়েনেটেড) শ্রম (পারফরমেন্স প্রিন্সিপল—অর্থনৈতিক শ্রেণীভেদ) বনাম যৌনতার। পুঁজিবাদী সমাজে যৌনতা বরাদ্দ কেবল উচ্চকোটির মানুষদের জন্যে, শ্রমিকদের জন্যে তা কেবল ততটুকুই বরাদ্দ যতটুকু তাদের শ্রমের ক্ষেত্রে অন্তরায় না হয়ে ওঠে। এইভাবে, উৎপাদন-সম্পর্ক (প্রোডাকশন রিলেশন) আমাদের যৌনতাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। মার্কিউজের বিশ্বাস ছিল সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা এই সম্পর্কটা বদলে দিতে পারে এবং আমরা পেতে পারি,"" a non-repressive civilisation based on 'non-repressive sublimation’' ''।

গল্পটাকে এইবার বোধ হয় আমরা একটু অন্যভাবে দেখতে শুরু করি। আমরা এতক্ষণে খেয়াল করি যে, মোলিনার সিনেমা-অবসেশন আটকে থাকে নিছক সিনেমা উপরের আবরণেই, তার সেন্টিমেন্টাল আবেদনে। মোলিনা কখনোই সিনেমার সমাজ-বাস্তবতার পটভূমি নিয়ে কথা বলে না, মাথাই ঘামায় না আসলে। তাই একটি চূড়ান্ত নাজি প্রোপাগান্ডা ছবি নিয়ে সে উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়ে, যেখানে এক ফরাসী মহিলা একজন নাজি অফিসারের প্রেমে পড়ে যায় এবং ফরাসী সেনাবাহিনীর গুলিতে আহত হওয়ার পর শেষে সেই অফিসারের বাহুবন্ধনেই মারা যায়। এর স্থূল রোম্যান্টিকতার আবহ তাকে যতটা নাড়া দেয়, প্রোপাগান্ডার দিকটা নিয়ে সে ততটাই নির্লিপ্ত থাকে। এই নির্লিপ্তি আসলে মোলিনার স্বেচ্ছা-আরোপিত। যে সমাজ তাকে গ্রহণ করতে নারাজ, যে সমাজ তাকে বিযুক্ত করেছে মূলস্রোত থেকে, যে সমাজ তাকে বারবার ঠেলে দিতে চায় অবদমনের দিকে, সেই সমাজের সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনো দরকার নেই তার। এটাই তার প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদের জেরেই সে হয়ে ওঠে নিছক ইন্দ্রিয়বাদী, তাৎক্ষণিক আনন্দ থেকে কোনো মূল্যেই বঞ্চিত করতে চায় না নিজেকে। এমন কি, সামান্য কিছু সুবিধার বিনিময়ে পুলিশের চর হয়ে ভ্যালেন্টাইনের দলবলের গোপন খবর জেনে নিতেও আপত্তি করে না সে। আর ক্ষমতা, সরকারি পুলিশ যার প্রতিভূ, তাকে নিছক এক পুতুলের মতোই ব্যবহার করে, নিজের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে যার জায়গা হবে আস্তাকুঁড়ে।

অন্যদিকে ভ্যালেন্টাইনের কাছে সবচেয়ে বড় তার আদর্শ, যার জন্যে সে আজ জেলে পচছে। তার চিন্তাভাবনায় ঘুরেফিরে আসে সমাজ ও রাজনীতি। সে বিশ্বাস করে সেই রাজনীতিতে, যা সমাজবদলের ডাক দেয়, ক্ষমতার সম্পর্কগুলোকে বদলে দিতে চায়। কিন্তু সেই রাজনৈতিক উদারতাও এক জায়গায় গিয়ে থেমে যায়, মোলিনার মতো সমকামীকে গ্রহণ করার সামর্থ্য যোগাতে পারে না। এখানেই বামপন্থী রাজনীতির অন্তর্গত স্ববিরোধের জায়গাটা উন্মোচিত হয়। হারবার্ট মারকিউজ-কথিত সমাজতন্ত্র, যা এনে দেবে "a non-repressive civilization" , বামপন্থার মূল ধারায় ব্রাত্য হয়ে যায়। যৌনতার পরিসরটি বামপন্থী রাজনীতিতে অনালোচিতই থাকে।

কিন্তু মোলিনার সাহচর্যে ভ্যালেন্টাইনের দৃষ্টিভঙ্গী বদলায়। প্রথাগত মতাদর্শের বাইরে বেরিয়ে সম্পর্কের বুননগুলিকে নতুন চোখে দেখার সাহস যোগায়। আবার অন্যদিকে, ভ্যালেন্টাইনের আদর্শ, তার রাজনৈতিক চেতনা মোলিনাকেও বদলে দেয়। ভ্যালেন্টাইনের আদর্শ যতই সহনশীল হয়ে ওঠে, মোলিনাকে গ্রহণ করার স্পেস তৈরি করে দেয়, মোলিনাও ততই রাজনীতিসচেতন হয়ে উঠতে থাকে। সমাজের সমস্যাগুলিকে নিয়ে ভাবার ক্ষমতা তৈরি হয়। তাই, শেষ অবধি, উপন্যাসটি আসলে যৌনতা (সেই যৌনতা, যা সমাজ-অনুমোদিত নয়) ও রাজনীতির পারস্পরিক সম্পর্কের বন হয়ে ওঠে -- যে সম্পর্ক আসলে একে-অপরের দ্বারা অতিনিয়ন্ত্রিত।


স্ট্রবেরি ও চকোলেট: কভি নিম নিম, কভি শেহদ শেহদ

সমকামিতা ও বামপন্থী রাজনীতির বিরোধের দিকটা আরো প্রকট হয়ে ওঠে টোমাস গুইটেরাজ আলিয়া ("মেমরিজ অফ আন্ডারডেভেলপমেন্ট"-খ্যাত) ও খুয়ান কার্লোজ ট্যাবিও পরিচালিত "স্ট্রবেরি অ্যান্ড চকোলেট' ছবিটিতে। যদিও, "কিস অফ দ্য স্পাইডার উওম্যান'-এর তুলনায় এর বুনন অনেক সরলরৈখিক ও সোজাসাপটা।

ছবির পটভূমি কাস্ত্রোর কিউবা। প্রেমিকার সঙ্গে সদ্য বিচ্ছেদ হওয়া ডেভিডের সঙ্গে আলাপ হয় দিয়েগোর, একটি পার্কের ক্যাফেতে। দিয়েগোকে প্রথমদর্শনেই সমকামী বলে চিনে নিতে ভুল হয়নি ডেভিডের (সাধারণ ছেলেরা চকোলেট অর্ডার করে, দিয়েগো অর্ডার দিয়েছিল স্ট্রবেরির!)। অন্যদিকে সুপুরুষ ডেভিডের প্রতিও আকৃষ্ট হয় দিয়েগো। ডেভিডকে কফির আমন্ত্রণ জানায় নিজের ফ্ল্যাটে এবং সেখানে তাকে সিডিউস করার চেষ্টাও করে।

শুরুতে দিয়েগোর প্রতি অবিমিশ্র ঘৃণাই পোষণ করেছিল পার্টির যুবসংগঠনের সদস্য ডেভিড। প্রথমত, দিয়েগো একজন সমকামী, যা কাস্ত্রোর কিউবায় বে-আইনি না হলেও, খুব সুনজরে দেখা হয় না। দ্বিতীয়ত, দিয়েগো মোটামুটি খোলাখুলিই কাস্ত্রো জমানার প্রতি নিজের অপছন্দ প্রকাশ করে (যদিও শুরুতে সে নিজে বাতিস্তার বিরুদ্ধে কাস্ত্রোর অভ্যুত্থানকে সমর্থন করেছিল -- এখানে দিয়েগোর সঙ্গে আলিয়ার মিলটা অপ্রত্যক্ষ থাকে না।)। আর তৃতীয়ত, ডেভিডের চোখে দিয়েগো একজন আপাদমস্তক বুর্জোয়া।

কিন্তু ক্রমশ দিয়েগোর প্রতি ডেভিড এক চোরা আকর্ষণ বোধ করতে শুরু করে। দিয়েগো নিজে একজন শিল্পী, নিয়মিত ছবির প্রদর্শনী করে, তার লেখালিখি দেশে-বিদেশে পঠিত ও আলোচিত। যেহেতু ডেভিড নিজেও কবিতা লেখার চেষ্টা করে, তাই দিয়েগোর চরিত্রের এই দিকটা তাকে আকর্ষণ করে। বিভিন্ন লেখালিখি নিয়ে আলোচনার সুযোগ পায় সে (যদিও, ডেভিডের লেখা বিপ্লবাত্মক কবিতাগুলো একবার পড়েই উড়িয়ে দেয় দিয়েগো)। ইতিমধ্যে, দিয়েগোর সঙ্গে ডেভিডের ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে ডেভিডকে চর হিসেবে ব্যবহার করতে চায় মিগেল (ডেভিডের বন্ধু, এবং পার্টিসদস্য)। ডেভিড তাতে সম্মত হলেও, যতোই দিয়েগোর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, ততোই সে দূরে সরে যায় মিগেল এবং পার্টির আদর্শ থেকে। যেমন শিল্প সম্বন্ধে তার দৃষ্টিভঙ্গী বদলায়, তেমনি যৌনতা-বিষয়ক ট্যাবুগুলো থেকেও সে মুক্ত হতে থাকে। শুধুই সমকামিতা নয়, বিষমকামী যৌনতার ব্যাপারেও তার গোঁড়ামি ও ছেলেমানুষি ধারণাগুলো বদলে যায়। এই কারণেই রজার এবার্ট লেখেন, 'Strawberry and Chocolate" is not a movie about the seduction of a body, but about the seduction of a mind. It is more interested in politics than sex - unless you count sexual politics... ' ।

আসলে, এখানে প্রশ্নটা যৌনতা, রাজনীতি এবং নন্দনতত্ত্বের। বামপন্থার ভেতরেও যে একটা গোঁড়ামি আছে, একটা অসহিষ্ণুতা আছে, সেটা ফুটে ওঠে সমকামিতার ব্যাপারে তার রক্ষণশীল মনোভাবের ভেতর দিয়ে, এমনকি শিল্পের ব্যাপারে তার সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গীর ভেতর দিয়েও। দিয়েগো এই গোঁড়ামির বিরুদ্ধে এক মূর্ত প্রতিবাদ -- তার সমকামিতা, শিল্প বিষয়ে তার চিন্তাভাবনা, এই সবকিছুর ভেতর দিয়েই।


উপসংহার: মিল, অমিল এবং বিরক্ত পাঠকের মুক্তির নি:শ্বাস

যে সব পাঠক মনে মনে আমাকে গালি দিচ্ছেন, এবং শুরুতে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া গিয়েছিল, তার খেলাপের দরুণ পয়সা ফেরত চাওয়ার জন্যে আস্তিন গোটাচ্ছেন, তাঁদের জন্যে সুসংবাদ -- এই আলোচনা প্রায় শেষের মুখে। এখন কেবল সুতো গোটানোর পালা।

মানুয়েল পুইগের "কিস অফ দ্য স্পাইডার উওম্যান" এবং আলিয়ার "স্ট্রবেরি অ্যান্ড চকোলেট"-এর মধ্যে মিলটা খুবই প্রত্যক্ষ। দু-ক্ষেত্রেই সমস্যাটা রাজনীতি ও যৌনতার, বিশেষত সমকামিতার, আন্ত:সম্পর্ক নিয়ে। দু-ক্ষেত্রেই সমকামিতার বিষয়ে বামপন্থী রক্ষণশীলতার সমালোচনার একটা জায়গা তৈরি করার প্রয়াস আমরা লক্ষ্য করি।

কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে, প্রথমটিতে স্বৈরাচারী শক্তি সমকামী মোলিনাকে (যে কিনা তাদের দ্বারাই জেলে বন্দী, নৈতিকতার খেলাপ-জাতীয় কিছু পাতি অপ্রমাণিত অভিযোগের দায়ে) ব্যবহার করেছিল বামপন্থী ক্ষমতাকে নির্মূল করার জন্যে। আর দ্বিতীয়টিতে বামপন্থী ক্ষমতা (অর্থাৎ, পার্টি) ডেভিডকে ব্যবহার করে সমকামী (এবং, তাদের দৃষ্টিতে প্রতিক্রিয়াশীল) দিয়েগোর বিরুদ্ধে। তাহলে, ক্ষমতার চরিত্র কী শেষ অবধি একই, মতবাদ-নির্বিশেষে? সবক্ষেত্রেই ক্ষমতা নিজেকে কায়েম রাখে অবদমনকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে?

একরাশ প্রশ্ন মাথায় রেখে আলোচনা শুরু করে ফের আমরা এভাবেই পৌঁছে যাই আরো একরাশ প্রশ্নের কাছে। হয়তো এইসব প্রশ্নের কোনো উত্তর হয় না, বা হলেও এক বা একমাত্র উত্তর বলে কিছু হয় না। তবুও, বারবার এইসব প্রশ্নগুলোকে উসকে দেয় বলেই "কিস অফ দ্য স্পাইডার উওম্যান' বা "স্ট্রবেরি অ্যান্ড চকোলেট' শিল্প হিসেবে সার্থক হয়ে ওঠে, রাজনৈতিক ভাষ্য হিসেবেও।


আগস্ট ৩০, ২০০৯


Avatar: .

Re: যৌনতা ও রাজনীতিঃ এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে?

.


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন