বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ধূম

নিয়ামৎ খান

"" কৃপয়া ধূম্রপান করেঁ ''--
-------------------------
উঁহু, যা ভাবছেন তা নয়। প্যাসিভ স্মোকিং বিরোধী কট্টর জেহাদীদের খাপ থেকে ছোরা বার করার দরকার নেই। আর আমার তাম্রকূট-বিলাসী ভ্রাতা ও ভগিনীগণ, দাঁড়ান, এখুনি অমন চওড়া হাসি হাসবেন না। এ ধূম্রপান সে ধূম্রপান নহে। এ হলো একদম সত্যিকার ধূ¤ম্রপান মশাই, গেলাসে ঢেলে রীতিমত চুমুক দিয়ে পান। অর্থাৎ? আজ্ঞে হ্যাঁ ,আক্ষরিকার্থেই "লিকুইড স্মোক'।

হালের বারটেন্ডারদের কাছে নতুন জানলা খুলতে এসে গেছে,হ্যাঁ, আপনি যা ভাবছেন অথচ বিশ্বাস করতে পারছেন না সেই ধোঁয়া। একেবারে নিয্যস ধোঁয়া। আপনি আজীবন লেবু দিয়ে জিন্‌ এর কথা জেনে এসেছেন, কিম্বা টনিক ওয়াটার দিয়ে। কিন্তু ভাবুন তো ল্যাপস্যাং সাউচং এ ইনফিউস করা জিন্‌? বেশ ডিজাইনার পানা শোনাচ্ছে কিনা? আসলে এ হলো চেরিকাঠের ধোঁয়ায় কোকাকোলা সিরাপ নেড়েচেড়ে নিয়ে সেই দিয়ে আপনার চির চেনা জিন্‌ এর পরিবেশন। আটপৌরে থেকে পুরোপুরি ষোলসষয়ক্ষ এ যাকে বলে । স্রেফ একটু ধোঁয়ার ছোঁয়ায়।

এই ধোঁয়া দিয়ে সুরাশিল্পে যাঁরা রেনেসাঁস এনেছেন তাঁদের মধ্যে মেদিচির প্রায় সমকক্ষ হলেন হিউস্টনের "অ্যানভিল বার অ্যান্ড রিফিউজের' রবার্ট হুগেল। উনি শুধু ঐ খটোমটো নামঅলা জিন্‌টাই বানাননি। সুরাবৃন্দাবনের মধ্যমণি "রাই হুইস্কী'ও ওঁরই হাতে গড়া। রাই থেকে তৈরী হুইস্কীর মধ্যে চুরুটের ধোঁয়া আ-স্তে করে মিশিয়ে দেওয়া। এই মেশানোর যন্ত্রটিও অভিনব-- মাছের চৌবাচ্চার অ্যারেটার। আহা ওকি? মানেকা গান্ধীর ফলোয়াররা , ভাই নিশ্চিন্তে বসুন, এতে একটি মাছের গায়েও আঁচড় পড়েনা , কারণ আনকোরা নতুন তৈরী ফিশট্যাংক থেকে আগেই অ্যারেটারটা খুলে নেওয়া হয়। হুগেল এখন নানা রকম ফলের ধোঁয়া দিয়ে বিটার্সও বানাচ্ছেন। আনারসের ধোঁয়া নাকি দিব্যি লাগে, তবে আমেরটা তেমন জমেনা।

পোর্টল্যান্ড, অরেগনের "টিয়ারড্রপ ককটেল লাউঞ্জের' কো-ওনার ড্যানিয়েল শ্যুমেকারও কম যান না। শেক্সপীয়ারের কথাকে চরম গুরুত্ব দিয়ে শ্যুমেকার সাহেব জুতোর বদলে ককটেল বানান। ওঁর বিশেষত্ব হলো ধোঁয়াগন্ধী বরফ। বরফ জমিয়ে তাকে ধোঁয়ার পাত্রে ডুবিয়ে রেখে আবার রি-ফ্রিজ করা। তবে ধোঁয়ার গন্ধ খুব কড়া হয়ে যাক সেটা ওঁর পছন্দ নয়। শ্যুমেকার বলেন ধোঁয়াগন্ধী ককটেলের জন্যে সবচেয়ে ভালো হলো কার্পানো অ্যান্টিকা মিষ্টি ভারমুথ। এতে এমনিতেই লবঙ্গ, জায়ফল আর এস্‌প্রেসো ফ্লেভার আছে। এর সাথে সামান্য একটু ধূম্রগন্ধ দারুণ খোলতাই হয়।

যেসব বারটেন্ডারদের হাতের কাছে এই জাতীয় স্মোকিং অ্যাপারেটাসের অভাব তাঁরা পিছিয়ে আছেন ভাবলে কিন্তু ভুল হবে। এই যেমন ধরুন নিউইয়র্কের "এলিটারিয়া'র জোসেফ সুইফকা একখানা চমৎকার ককটেল বানিয়েছেন। তার নাম পাইপস্মোক। এতে কোন যন্ত্রপাতির ব্যবহার নেই,শুধুমাত্র নিপুণ ব্লেন্ডিং এর খেলা। বিভিন্ন ডিস্টিলারী থেকে নেওয়া সিংগ্‌ল্‌ মল্ট হুইস্কীর ব্লেন্ড দিয়ে সুইফকা এই পানীয় বানান। সেই ব্লেন্ডের নামটাও জবরদস্ত-- কম্পাস বক্সেস পীট মন্‌স্টার। খাস স্কট মুলুকের আইলে পীটফায়ারে ঝলসানো ধোঁয়াগন্ধী মল্ট। তার রইসীই আলাদা।

এই ধোঁয়ার গন্ধঅলা আইলের স্কচ দিয়েই নিউইয়র্ক সিটির "লিট্‌ল ব্রাঞ্চ' এর স্যাম রস বানিয়েছেন হালফিলের হিটলিস্ট টপার ককটেল "পেনিসিলিন'। পীট স্মোক্‌ড বার্লি থেকে বানানো লাফ্রোয়েগ হুইস্কী,আদার রস, মধু, আর গরমজল। ব্যস। এই পেনিসিলিন ধূমজ্বর সারায় কিনা তা এখনো জানা যাচ্ছেনা, তবে আপনার পানীয়কে "ধূম' জঁরে যে ফেলতে পারে সে বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

অতএব ভাইসব এগিয়ে আসুন। ভুলি ভেদাভেদ জ্ঞান দুনিয়ার সুরারসিক এক হউন। বার বা ককটেল লাউঞ্জ বা নিতান্ত রেস্তোরাঁর মত পাবলিক প্লেসে বসে নিশ্চিন্ত মনে ধূমপান করুন। কেননা জানবেন নবজাগরণ এসে গিয়েছে, আজকের এই গুর্মে যুগে আর ধুম্রপান মোটেই মানা নহী হ্যায়।

ধূম টু
-------
কথায় বলে "পানভোজন'। কাজেই "পান'এর কথা যখন উঠলো তখন ক্যান "ভোজন' বী ফার বিহাইন্ড? "ফার বিহাইন্ড' তো "ফার' মশাই,বরং কচিকাঁচা ড্রিংক গুলো যখন খানিকটা ধোঁয়া গিলে এমনি একটা আভাঁগার্দ হাবভাব করে তখন "ভোজ্য'বাবুরা প্রবীণ ঠাকুরদাপ্রতিম একটা মুচকি হাসি না দিয়ে পারেন না। আরে ধোঁয়ার সাথে খাবারের সম্পর্ক কি আজকের কথা রে দাদা? সেই কোন কাল থেকে.... যাক গে।

তবে ধোঁয়াটে খাবার সম্পর্কে সবই জানা খবর এমনটি ভাবলে কিন্তু আপনার ভুল হচ্ছে। আপনি নিশ্চয়ই এখুনি বলবেন ""দুত্তোর,খাবার স্মোক করতে যে কাঠের কুচি নয়তো কাঠকয়লা ব্যবহার হয় তা কে না জানে?''। এমনকি কেউ কেউ আরো দু কদম এগিয়ে বলবেন ""কাঠের কুচি বললে যথেষ্ট বলা হলো না। হিকোরি, মেপ্‌ল্‌, আপেল, চেরী.... কোন কাঠের নাম চান?'' ধীরে বন্ধু ধীরে। বলেছি তো জানা খবর নিয়ে আমরা লেবু কচলাবোনা। আসুন নতুন কিছু দেখি।

কাঠ আর চারকোলই খাবারে ধোঁয়া দেবার একমাত্র মালমশলা নয় কো। আপনি কি জানতেন যে চীনেরা খাবার স্মোক করেন চায়ের পাতা, চিনি আর চাল দিয়ে? চায়ের শুধু পাতাই নয়,চা গাছের কাঠের গুঁড়ো দিয়েও ধোঁয়া বানানো হয়। বানান নিউজিল্যান্ডের স্মোকাররা। উত্তর আমেরিকায় কোথাও কোথাও ব্যবহার হয় ভুট্টার খোল। জাপানীরা মাছ কিম্বা অন্য সী-ফুড স্মোক করার জন্য ধোঁয়া বানান সমুদ্রের আগাছা পুড়িয়ে।
আবার ভিজে ধোঁয়া দিয়েও খাবার স্মোক হয় । বড় একখান পাত্রে টগবগ করে জল ফুটবে, আর সেই বাষ্প দিয়ে স্মোকড্‌ হবে খাবার। এই বাষ্পকে সুগন্ধী করার জন্যে জলের মধ্যে দেওয়া হয় নানান হার্ব, রোজমেরী, মার্জোরাম, শেরভিল... যে খাবারের সাথে যে হার্বের গন্ধ চলে আর কি। শুধু হার্বই বা কেন? কেউ দেন কমলালেবুর, পাতিলেবুর, গন্ধরাজ লেবুর খোসা। কেউ দেন তেজপাতা। কেউ আঙুরগাছের শুকনো ডালপালা। কেউ দারচিনি, লবঙ্গ। হ্যাঁ, অবশ্যই ইচ্ছে হলে আপনি এই সব খোসা,হার্ব,পাতা-পাতালি সরাসরি আগুনের মধ্যেও ফেলে দিতে পারেন। তাইতে যে ধোঁয়া হবে সে ধোঁয়ার সুগন্ধও বড় কম নয়।

এ তো গেলো সব "ফোরেন' ধোঁয়ার কথা। জানেন কি আমাদের বাঙালী প্রথায় কি দিয়ে চমৎকার স্মোকড্‌ ফিশ বানানো হত? অভিনবত্বে প্রথম সারিতে থাকতে পারে -- আমাদের মুড়কি পোড়ার ধোঁয়া। খাসা নয়? আরো ছিলো। খড়ের কুচিতে গুড়ের রস মাখিয়ে মিষ্টি গন্ধ অলা ধোঁয়া। এই দিয়ে স্মোক করা রান্নার নামটিও কম মিষ্টি নয়। ইলিশ মাছের ধূম। কেমন হলো বলুন? স্মোকড্‌ হিলসার থেকে ঢের ভালো শোনাচ্ছেনা?

এই সমস্ত ধুমধামের খবর আমাকে যাঁরা দিয়েছেন তাঁরা হলেন "গুর্মে ম্যাগাজিন', "বেটার হোমস্‌ অ্যান্ড গার্ডেন ম্যাগাজিন', "উইকিপেডিয়া', আর লীলা মজুমদার-কমলা চট্টোপাধ্যায়ের লেখা "রান্নার বই'। অতএব ভাইসব, আবারও এগিয়ে আসুন। আমরাও পরাণ ভরে বাহু তুলে বদন খুলে গাই-- "ধূম মচা দে ধূম মচা দে ধূম।'

আগস্ট ১৭, ২০০৯

38 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ টুকরো খাবার 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন