ছত্তিসগড়ের টুকরোটাকরা

ঈপ্সিতা পালভৌমিক

এই লেখাটা কোনো প্রবন্ধ নয়। এটা ঠিক আমার নিজের লেখাও নয়। বিভিন্ন জনের লেখার টুকরো টাকরা দিয়ে বানানো একটা ধারাবিবরণী বলা যেতে পারে। ছত্তিসগড় বিশেষ জনসুরক্ষা অধিনিয়ম ২০০৫ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ডাক্তার বিনায়ক সেনের মুক্তি সহ বিভিন্ন দাবীতে কদিন আগে দেশের বিভিন্ন অংশের বেশ কিছু মানুষ জড়ো হয়েছিলেন ছত্তিসগড়ে। বিভিন্নরকম অভিজ্ঞতার সাক্ষী তাঁরা হয়েছেন। তার টুকরোটাকরা বিভিন্ন জন আমাকে বিভিন্ন ভাবে জানান। সেই টুকরোগুলোকে আলাদা-আলাদা করে দিলে সেটা একটা লেখা হয়না। অথচ অভিজ্ঞতাগুলো জানানো দরকার। তাই শুধু অভিজ্ঞতাগুলো জুড়ে দেবার কাজটাই আমি করেছি। লেখা হিসেবে পুরো ব্যাপারটা হয়তো দাঁড়ায়নি। সে উদ্দেশ্য ছিলওনা।

১৪ ই মে ২০০৯ -- অন্বেষা ভট্টাচার্যের বিবরণ থেকে

"ভাবতে পারো এক ৮৩ বছরের বৃদ্ধা বলেন ও জেল থেকে না বেরনো অব¢ধ আ¢ম মরব না।' বলতে বলতে পÊ¡ণহীতার চোখে জল এসে ¢গয়ে¢ছলো। পÊ¡ণহীতা ¢বনায়ক সেনের বড়ো মেয়ে। কথাটা বলে¢ছলেন ওঁর ঠাকুমা সম্পর্কে। ই¢লনা সেন (¢বনায়ক সেনের Ùত্রী) আর পÊ¡ণহীতা এসে¢ছলেন আমাদের হোটেলে। বলে¢ছলেন এরকমই অনেক কথা। পু¢লশ ঘর সার্চ করছে। খুঁজে পেয়েছে অপরা¢জতার (ছোটো মেয়ে) বীজগ¢ণত বই। বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে পু¢লশ অ¢ফসারের উক্তি - See all are coded language ।

ছত্তিসগড় বিশেষ জনসুরক্ষা অধিনিয়ম ২০০৫ এর অধীÝন শুধু ¢বনায়ক সেন নন গত দ¥বছরে ব¢¸দ হয়েছেন বহু মানুষ। ¢ব¢ভন্ন চেহারার ¢ব¢ভন্ন জী¢বকার মান¥ষ। তাদের মধ্যে ১৮০ জনের নাম প¥¢লশের খাতায় পাওয়া যায়। বা¢ক আরো ৫০ ¢ট ক্র¢মক সংখ্যা ¢কছু মানুষকে ¢ন¢র্দষ্ট করে যাদের নাম নেই, ধাম নেই, জী¢বকা নেই। মজার ব্যাপার হলো প¥¢লশের খাতায় ডাক্তার ¢বনায়ক সেনের জী¢বকা কু¢রয়ার। কারন উ¢ন না¢ক জেল থেকে নারায়ণ সান্যালের ¢চ¢ঠ ¢পযূষ …হর কাছে ¢নয়ে যেতেন। কিন্তু জেলার সাহেবের বয়ান অনুসারে ¢ত¢ন সর্বদা খাড়া হয়ে দাঁ¢ড়য়ে থাকতেন দুজনের কথোপকথনের সময়। য¢দ কোনো কারনে অন্যত্র যেতে হতো তো ওঁর অধعন কর্মচারীকে দাঁড় ক¢রয়ে তবেই যেতেন। সেখানে কোনো ¢চ¢ঠ আদান পÊদান ঘটত না।

জেলে ব¸দী করার কারণ গু¢ল খ¥বই অদ্ভ¥ত। একজন মাওবাদী প¥¢লশের গু¢লতে ¢নহত। তার বুক পকেটে এক ডাক্তারের (¢বনায়ক সেন নন) পেÊসক্রিপসন পাওয়া যায়। ব্যাস হয়ে গেলো, সেই ডাক্তার আজও জেলে ব¸দী। তারও মেয়াদ পÊ¡য় দুবছর হলো। আমরা গত ১৪ মে সকাল ১১ টা নাগাদ জড়ো হই রায়পুরে বুড়া তালাওয়ে এরিয়ায়। আমরা মানে ¢ব¢ভন্ন গো¢ষ্ঠ (মানবা¢ধকার গো¢ষ্ঠ থেকে ট্রেড ইউনিয়ন, জনতা, ম¢হলা, ছাত্র, স্বাস্থ্যকর্মী) ভারতের ¢ব¢ভন্ন প্রান্ত থেকে। আমরা পÊ¡য় ৬০০ জন। আমাদের সকলের দা¢ব ডাক্তার ¢বনায়ক সেনের মুক্তি, ছত্তিসগড় বিশেষ জনসুরক্ষা অধিনিয়ম ২০০৫ এর আওতায় যাঁরা ব¢¸দ আছেন তাঁদের সকলের মুক্তি এবং এই আইনের পÊত্যাহার, সালোয়া জুদুমএর অবসান, ঘর ছাড়াদের ঘরে ফেরানো।

সে¢দন যাঁরা যাঁরা বক্তব্য পেশ করে¢ছলেন তার মধ্যে ছিলেন রাজেন্দ্র সইল(পি ইউ সিএল, ছত্তিসগড়), রামদাস রাও(পি ইউ সিএল, কর্ণাটক), মেহের ইঞ্জিনিয়ার(বোস ইন্সটিটুট), কে জে মুখার্জি(জে এন ইউ), গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়। বক্তৃতা শেষ হলে আমরা গান করতে করতে, স্লোগান ¢দতে ¢দতে, ¢ম¢ছল করে এ¢গয়ে চ¢ল। আমাদের হাতে ¢ছলো পোÙটার, ব্যানার, কেউ কেউ মাথা ¢দয়ে চটের বع¡ ঝু¢লয়ে ¢ছলেন যাতে লেখা ¢ছলো - আমাদের দা¢ব ¢বনায়ক সেনের রেহাই। সাংবা¢দকরা ছ¢ব তুলে যা¢চ্ছলেন।

ঝাঁ ঝাঁ করছে রোদ। ৪৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। আমরা হেঁটে চলে¢ছ। সাইÝকল ¢রক্সার উপর ঠান্ডাজলের ডÊ¡ম বসানো। জনতা এ¢গয়ে চলেছে। ছত্তিসগ¢ড়রা (নারী-পুরুষ) কান মাথা সব ঢেকে ¢নয়েছে তাদের চিরাচরিত ওড়না ¢দয়ে। চোখ দুটো খা¢ল দেখা যাচ্ছে। বে¢শর ভাগ জনতাই শুধু ছত্তীশগ¢ড় আর ¢হ¢¸দ বোঝেন। আবার আমাদের সঙ্গে কর্ণাটক থেকে যারা এসেছেন তাঁরা কন্নড় ছাড়া আর ¢কছুই বোঝেন না। ¢ম¢ছলের দুধারে দু¢ট ভাষায় সেÓ¡গান চল¢ছল। আ¢ম কর্ণাটকের লোক তাই ওঁদের সঙ্গে অজানা ভাষায় গলা মেলালাম। ¢ঠক বুঝলাম না যা শুন¢ছ আর যা বল¢ছ দুটো এক ¢কনা।

¢ম¢ছল এসে থামলো নেতাজি সুভাষ হকি স্টেডিয়ামের সামনে। সালোয়া জুদুমএর পÊতীক এক কুশ পুত্ত¢লকাকে পোড়ানো হলো। আমরা গ্রেপ্তার হয়ে¢ছ। অবশ্যই স্বেচ্ছায়। পু¢লশ আমাদের নাম ¢লখ¢ছলো। আর গান বাজনা চল¢ছলো। আমার পার্শ্বব¢র্তনী এক ম¢হলা, ¢ত¢ন এসেছেন পুনে থেকে, সবাই বসে আ¢ছ গ্যালারিতে। পু¢লশ বাবার নাম ¢জজ্ঞেস করছে। ঘটনা চক্রে সেই ম¢হলা তাঁর বাবার নাম জানেননা। ¢শ¢ক্ষতা ম¢হলা পু¢লশ ¢কছুতেই মায়ের নাম ¢লখতে রা¢জ নন। শেষে উ¢ন পু¢লশের হাত থেকে খাতা কেড়ে ¢কছু ¢লখলেন। ১৩৫ জন পুরুষ আর ৯০ জন ম¢হলা গ্রেপ্তার হয়ে¢ছলাম সেদিন। আটকা ¢ছলাম ঘণ্টা দুয়েক ।
(এই অংশটি অন্বেষা ভট্টাচার্যের লেখা)

১৫ থেকে ১৭ই মে ২০০৯
অন্বেষা এর পর চলে আসে। কিন্তু কর্ণাটক সলিডারিটি গ্রুপের কিছু সঙ্গী সাথী তার পরেও থেকে যায় ঐ এলাকায়। আই আই এস সি ও জে এন সি এস আরে গবেষণারত সরিতা, অরভিন্দ, প্রথমেশ, সৌন্দর্য্য। ( এর পরের ঘটনা নিয়ে পরবর্তীকালে এরা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে একটি চিঠি পাঠায়। এই অনুচ্ছেদের বাকি ঘটনা সেই চিঠিটি এবং আংশিকভাবে তেহেলকার একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে)।
ওরা গিয়েছিল দান্তেওয়াডায়।
রায়পুরে থাকার সময় ই ওরা জানতে পারে দান্তেওয়াডার এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা পরিচালিত আশ্রমের কথা। হিমাংশু কুমারের বনবাসী চেতনা আশ্রম। হিমাংশু সমাজসেবী, মানবাধিকার কর্মীও বলা চলে। মীরাট থেকে এই দান্তেওয়াডায় চলে এসেছিলেন সতের বছর আগে। শিখেছেন গোন্ড ভাষা , আর তারপর, স্ত্রী বীণাকে সঙ্গী করে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন এই আশ্রম। যে সংস্থা আদিবাসী জনজাতিকে তাদের অধিকার নিয়ে সচেতন করিয়েছে, অধিকার রক্ষার জন্য ও ভঙ্গের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইএর পথ দেখিয়েছে, স্বাস্থ্য সচেতনতার শিক্ষা দিয়েছে, শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে, যেখানে এসবের সরকারী পরিষেবা বাস্তারের দুস্তর অরণ্য পেরিয়ে যেখানে আজ ও সেভাবে পৌছাতে পারেনি। এবং বলাবাহুল্য সলওয়া জুদুম শুরু হবার পর তার বিরোধিতা করার সাথে সাথে হিমাংশু সরকারের খারাপ খাতায় নাম লিখিয়েছেন।

প্রসঙ্গ যেহেতু ছত্তিসগড়, তাই এই পর্যন্ত পড়েই আরেকজনের কথা মনে পড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। তবে মিল থাকলেও, শংকর গুহ নিয়োগীর সাথে কিন্তু একটা মস্ত পার্থক্য আছে হিমাংশুর। হিমাংশু গান্ধীবাদী। এই মিলিটারি মাওবাদী অধ্যুষিত যুদ্ধা&#৩৪৭;²¡ন্ত বাস্তারের বুকে সতের বছর ধরে গান্ধীবাদী চেতনায় চলতে থাকা এক আশ্রম স্বভাবত:ই কৌতূহল উদ্রেক করে। অরভিন্দ, সরিতাদের ওখানে যাওয়াটা অনেকটা সেই কৌতূহল আর আশ্রমের কাজকর্ম নিজেদের চোখে দেখার আগ্রহ থেকেই ।

ওরা ওখানে পৌঁছায় ১৫ ই মে সকালে। তখনও জানা ছিলো না, কোন ঘটনার সাক্ষী হতে চলেছে ওরা। জানা তো ছিলোনা আশ্রমের কারোর ই, যে ১৭ ই মে আশ্রম টি ভেঙ্গে ফেলা হবে। ঐ মর্মে নোটিসটি আশ্রমে আসে ১৬ই মে, ১৩ই মে তে ইস্যু করা নোটিস। দু বছর আগে রাজ্য প্রশাসন একটি নোটিস দিয়েছিল, আশ্রমের জমিটি বনদপ্তরের, তাই আশ্রম তৈরি বেআইনি। কিন্তু আশ্রমবাসীদের কথায়, ওটা কৃষিজমিতে তৈরি এবং গ্রাম সভার সম্মতিক্রমে। তাই এই জমি ছাড়তে বললে গ্রামসভার সম্মতি নেবার প্রয়োজন ও আছে বটে। এ নিয়ে কোর্টে কেস চলছিল সরকারের সাথে। আর তারি মধ্যে এই নোটিস তাই, একেবারেই আকাশ থেকে পড়া ব্যাপার না হলেও বিনা মেঘে বজ্রপাতের কেস তো বটেই।

ওরা ১৭ তারিখ পর্যন্ত থেকে যায় ঐ আশ্রমে। নোটিস পাঠাতে দেরি হলেও , আশ্রম ভাঙ্গার কাজে কোনো দেরি কিন্তু দেখা যায় না। এই অনুচ্ছেদটি মূলত: সেই ধ্বংসলীলারই ধারাবিবরণী। সেই টাইমটেবল নিজেই নিজের কথা বলে, যা এখানে সাজিয়ে দেওয়া হল:

১৭ ই মে। সকাল ৬:৩০।
চলে আসে স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের বিশাল বাহিনী। গ্রামবাসীদের মানা করে দেওয়া হয় আশ্রমে ঢুকতে। হিমাংশু কুমার তখন গে®ছেন দান্তেওয়াডার কালেক্টরের সাথে দেখা করে আশ্রম ভাঙ্গার হুকুম রদ করাতে, শেষ চেষ্টা আর কি। ওনার অনুপস্থিতিতেই অবশ্য শুরু হয়ে গেলো ভাঙ্গার কাজ ।

৭:০০।
এসে গেল স্পেশাল টাস্ক ফোর্স, ডিস্ট্রিক্ট ফোর্স, ছত্তিসগড় পুলিশ। স্পেশাল পুলিশ অফিসাররাও হাজির।

৭:৩০।
এসে গেল ডেমোলিশন স্কোয়াড আর এলেন অপারেশনের Ë দায়িত্বে থাকা সাব ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট অঙ্কিত আনন্দ। কিছু সাংবাদিকও।
বীনা ও আশ্রমের স্বেচ্ছাসেবক কোপা কুম বলার চেষ্টা করলেন কিছু কথা বলতে,যা এতদিন বলে এসেছেন এবং কোর্টেও বলেছেন। কথোপকথনটি নিম্নরূপ:
বীণারা: 'এই আশ্রম তো কৃষিজমিতে তৈরি। এখানে কোনো কিছু করতে গেলেই তাই গ্রামসভার অনুমতি চাই'।
এস ডি এম: 'হামেন কিসি কে পারমিশন কি জরুরত নাহি হ্যায়। আপকো ৮ বাজে তক সময় দিয়া জাতা হ্যায়। আপকো যো সামান নিকালনা হ্যায় নিকালিয়ে'।
ঘড়ির কাঁটা ৭:৩০ ছাড়িয়ে গেছে তখন।

৮:০০ ।
বুলডোজার এϾট্র নিল, গেট গুঁড়িয়ে। জাভেদ ইকবাল, একজন ফিলান্স ফোটো জার্নালিস্ট , যার তোলা বাস্তারের ফেক এনকাউন্টারের ছবিআমরা আগেও দেখেছি, কিছুদিন ধরে আশ্রমে ছিলেন, কিছু কাজে। ভাঙ্গার কাজ শুরু হতে তিনি ক্যামেরাটা বের করছিলেন। এস ডিএমের অর্ডারে ওনাকে পুলিশ ভ্যানে টেনে তুলে নেওয়া হল। ক্যামেরা অবশ্যই বাজেয়াপ্ত। শুধু ওনার না, উপস্থিত সকলেরই ।

৮:১৫।
আমাদের বন্ধু প্রথমেশ এস ডিএমকে জি¡সা করল, এই ভাঙার আইনি বৈধতা আছে কি ? থাকলে তার কাগজ কোথায়।
এস ডি এম: " ইসকো লেকে যাকে বন্ধ করো ।'
প্রথমেশকে বন্দী করা হল পুলিশ ভ্যানে। তার আগে ঘাড়ে পড়েছে রাইফেলের বাড়ি আর পিঠে বুটের লাথ।

৮:২০।
অভয় সিং রাঠোর, হিমাংশু কুমারের ভাইপো, ভেরোনিকা কল্পনা গৌতম, পুনের সিমবায়োসিসের সামার ইন্টার্ন,এঁদের আটক করা হল, প্রথমেশের সাথেই এক ভ্যানে। পাহারারত পুলিশের উপর হুকুম রইলো যেনো কোনো কথা না বলেন এঁরা। খাবার বন্ধ। জল ও।

৮:৩০।
এইসব যখন চলছে, অরভিন্দ তখন অ¡শ্রমের ভিতরে, জিনিসপ&#৩৪৭; খালি করার কাজে হাত লাগাচ্ছে। বাইরে এসেছিল, নিজের ডায়রিটাতে নিতে।
এস ডি এম হুকুম দিলেন ওকেও আটক করতে। তোলা হল অন্য এক বাসে, লাঠি পেটা করতে করতে। জি¡সাবাদ শুরু হল। আর শুরু হল ঘুঁষি, চড়, থাপ্পড় আর গালিগালাজ বর্ষণ। " মাদারচোদ, তুম বাহারওয়ালে ইহাঁ আকে, নক্সালাইট অ্যাকটিভিটিস করতে হো! "
বারবার "না' বলা সত্ত্বেও এক ই প্রশ্ন, নক্সাল কিনা, কোন দলের নক্সাল। বলা বাহ্‌্‌ল্য, হিমাংশু কুমারকে নক্সাল নেতা বলেই উল্লেখ করা হচ্ছিল।
ও, পুলিশ এও জানিয়েছিল, একাধিকবার, যে তাদের হাতে ক্ষমতা থাকলে, তাদের এই মারধোর করার এত পরিশ্রম করার দরকার ই পড়তো না, সিধে গুলি করে খাল্লাস।

৯:১৫।
একজন এস্টিএফ অফিসিয়াল অন্য ভ্যান থেকে হেঁচড়ে টেনে বের করলেন জাভেদ ইকবালকে, শুরু হল লাথি ও জুতোপেটা।
" সালে মাদারচোদ,, তু পোলিশকে খিলাফ লিখতা হ্যায় ? "
"ভোঁসদিলে ,তু বডেপল্লী গয়া থা না ?"
বডেপল্লী গ্রামে গত ২৫ ও ২৬ এ এপ্রিল সিআর পি এফ, বি এস ও ও এস পি ও র একসাথে করা লুটপাট ও অত্যাচার নিয়ে ক'দিন আগে সিজিনেটে জাভেদের একটি সচি&#৩৪৭; প্রতিবেদন বেরিয়েছিল।

১০:০০।
একজন এস টি এফ অফিসিয়াল সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন, মারধোর করতে।
অরভিন্দের উপর মারধোরের তখন অবশ্য একটা বিরতি চলছে। তবে জেরা অব্যাহত এবং জেরার প্রশ্নগুলো এখন আরো গোদা। নক্সাল কিনা সে প্রশ্ন আর নেই। সেটা এতক্ষণে প্রশ্নাতীত। প্রশ্ন এখন হিমাংশু কুমারের নক্সলাইট কার্যকলাপের মধ্যে অরভিন্দের কতটা কী ভূমিকা ইত্যাদি ডিটেলিং নিয়ে।
মারধোরের ব্রেক শেষ। এবার সোজা বন্দুকের নল ঠেকানো হল অরভিন্দের কপালে। টি শার্ট টা আগেই খুলে ফেলা হয়েছে। জানানো হল, এবার ওকে নক্সালদের মত পোশাক পরানো হবে, এবং তারপর ... তারপর আর কি ,গুলি। কপালে বন্দুল ঠেকিয়ে বারবার একটাই কথা পুলিশের , স্বীকার করে নাও, তুমি হিমাংশু র নক্সালাইট কাজের সাথে যুক্ত আছো।
অরভিন্দ তখন ফুল ফোকাসে। চারপাশ থেকে পুলিশের সেলফোনে সেই বন্দুক ঠেকানো ছবি।
না:, পুলিশ গুলি চালায়নি। ফোকাসটাও একটু সরলো একটু বাদেই। ব্যস্ত হয়ে পড়লো পুলিস বাহিনী, হৈ হৈ কান্ড। আশ্রম থেকে পাওয়া গেছে জন্মনিরোধকের প্যাকেট। তাই নিয়ে প্রবল উত্তেজনা, জল্পনা: " মাদারচোদ নক্সালিয়োঁ কে লিয়ে রেন্ডিখানা চালাতা হ্যায়"।
ওগুলো ভিসিএ র স্বাস্থ্য প্রকল্পের জন্য রাখা থাকতো, সেকথা যে পুলিশ পরে মেনে নেয়, সে অবশ্য অন্য কথা।

১১:০০।
তবে অরভিন্দের উপর মারধোর এতক্ষণ অব্যাহত ই ছিল। থামলো আরেকজন এস টি এফ অফিসিয়াল আসার পর। তিনি বেশি ব্যস্ত ডায়ালগ দিতে।" আগর রাষ্ট্রপতি শাসন লাগু কর দে দে , তো হাম দস দিন মেঁ সারে নক্সালাইট্‌স কো খতম কর দেঙ্গে। সবকো খতম কর দেঙ্গে, গভরমেন্ট এক বার ডিসাইড কর লেগি তো কৈ প্রবলেম নহী হ্যায়। কোই নহি বঁচেগা,ফির নক্সাল হোনে কে লিয়ে। "

১২:০০।
অন্য ভ্যানের আটকদের মধ্যে দুজ®নের অবস্থা তখন প্রায় অ¡ন হবার মত। হুকুম ছিলো জল না দেবার। তবে সে হুকুম অমান্য করেই কয়েকজন কনস্টেবল লুকিয়ে জল এনে দিলেন।

১:০০
আশ্রম ভাঙ্গার কাজ প্রায় শেষ।
সব ভাঙ্গা হয়ে গেছে। ঘরদোর, চিকিৎসালয়,ডর্মিটরি, ট্রেনিং হল সব ই ।
সরকারের বসানো টেলিফোনের টাওয়ার আর হ্যা¾ড্‌পাম্প ও ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। আশেপাশে জড়ো হয়ে থাকা গ্রামবাসীরা প্রশ্ন করেনÀ, আমারা জল পাবো কোত্থেকে?
এসি্‌ডএমের চট্‌জলদি আশ্বাস, কালকেই ঠিক করে দেওয়া হবে পাম্প। জোগালেন আরো একটু ভরসা। জল বিনা ' ইক দিন মেঁ কৈ নহী মরতা' ।


২:৩০।
আশ্রম ভাঙ্গার কাজ শেষ।
হিমাংশু অনুরোধ করলেন পাঁচজন আটককে ছেড়ে দিতে। ছাড়া পাবার পর হিমাংশু কে সব মারধোর ও জেরার ব্যাপারে জানাল প্রথমেশ ও অরভিন্দ। ওদের ডায়রিও ফেরত দ্যায়নি পুলিশ।
এস ডি এম কে প্রশ্ন করলেন হিমাংশু। কেন ওদের সাথে এই ব্যবহার ?
অঙ্কিত আনন্দের উত্তর , হিমাংশুকে:পুলিশ স্টেশনে গিয়ে এ নিয়ে অভিযোগ দাখিল করুন।
সাথে হুকুম, অধ্বস্তন কর্মীদের : " সালো কো পোলিস থানে লে যাও, অউর ইতনা মারো কি দো দিন কুছ বোল না পায়ে"।

পাঁচজনকেই দেওয়া হল দান্তেওআডা পুলিশের হেফাজতে।
থানায় শ্রী আনন্দের হুমকির বয়ানের অনেকবার পুনরাবৃত্তির মাঝে কেউ ই আর সাহস করেনি এফ আই আর লেখাতে। এই অবৈধ আটক, অত্যাচারের লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে।

কেউ ই করেনা। দান্তেওয়াডায়।


১০ দিন পর
২ দিন আগেই রায়পুরের জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন বিনায়ক সেন।
খুশির হাওয়া বইছে মানবাধিকার কর্মীদের মহলে মহলে। দু বছর ব্যাপী যুদ্ধে অবশেষে জয়।
রায়পুর থেকে ৮০০ কিমি দূরে দান্তেওয়াডায় বইছে মে শেষের চড়া লু। গাছের তলায় বসে আছেন সাদা লুঙ্গি আর কুর্তা পরিহিত এক ভদ্রলোক। কথা বলছেন জনা দশেক গোন্ড আদিবাসীর সাথে। বহু দূরের কামানার গ্রাম থেকে হেঁটে এসেছেন তাঁরা, অভিযোগ জানাতে।
এর মধ্যেই মোবাইলে বাজল। রাজুর ফোন এসেছে। লিঙ্গগিরি গ্রামের বাসিন্দা রাজুর বোনকে ধর্ষণ করা হয়েছিল ক'দিন আগেই, বাবাকে খুন করা হয় পেটে বেয়নেট ঢুকিয়ে। গোটা গ্রামে চাল নেই। ভদ্রলোক ডিস্টিক্ট কালেক্টর কে ফোন করে চাল পাঠাবার ব্যবস্থা করলেন।
আবার কথা শুরু হয় কামানার বাসিন্দাদের সাথে। দু রাত আগে ওনাদের গ্রাম তছ্‌নছ হয়ে গেছে। একটি মুরগী, ছাগল ও আর পড়ে নেই। লুটেপুটে নেওয়া ও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে খাদ্যশস্য। থানায় গিয়ে এফ আই আর না করে এখানে এসেছেন কেনো তাঁরা? কারণ তাঁরা জানেননা কার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাবেন। যে রাজ্য সরকারের পুলিশ লুটপাট চালালো, তাঁদের নামে ?
তাই এসেছেন এই ভদ্রলোকের কাছে, যদি কোনোভাবে বিচারের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন, যেমন ভাবে দিয়েছেন গত স®তের বছর ধরে। সরকার ও আদিবাসীদের মধ্যে যোগসূ&#৩৪৭; হয়ে।
কিন্তু আর পারবেন কি ? যখন তিনি নিজেই রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়নের শিকার ?
হ্যাঁ, এই ভদ্রলোকই হিমাংশু কুমার।

হয়তো পারবেন হিমাংশু।
সতের বছর আগে যখন মীরাট থেকে আসেন, আজকের মতই সেদিন ও তো একটা গাছের তলায় দাঁড়িয়েই শুরু করেছিলেন কিন্তু হিমাংশু। সেখানে দাঁড়িয়েই আদিবাসীদের জি¡সা করতেন তাদের জীবন নিয়ে, কি তাদের দরকার, কি তাদের অভিযোগ। আস্তে আস্তে শুরু করেছিলেন আন্ত্রিক, ম্যালারিয়া ,সাপে কামড়ানো, নিউমোনিয়ার মত অসুখে সেবা, সাহায্য ইত্যাদি করা। আস্তে আস্তে আস্থাভাজন হয়ে উঠেছিলেন আসিবাসীদের। গ্রামসভা নিজের ই উদ্যোগে নিজেদের কিছু জমি দিয়েছিল , সেখানেই তৈরি হয়েছিল বনবাসী চেতনা আশ্রম। এই অব্দি তেমন কোনো অসুবিধা ছিলোনা। স্বাস্থ্য,শিক্ষা এসব নিয়ে একেবারে সরকারের পরিপূরক হিসেবে টিপিক্যাল এন জি ও ছাঁদে সমাজসেবামূলক কাজকর্ম করছেন, প্রশাসনের অস্বস্তির কোনো কারণ তো হয়নি।
ঝামেলার সূত্রপাত ২০০৫ এ। সালোয়া জুদুম শুরু হওয়ার পর। যেদিন অঙ্গনবাড়ীর কর্মী সোনিয়াকে নক্সাল সন্দেহে অকথ্য নির্যাতন করলো পুলিশ,গলায় দড়ি বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে গেলো। সোনিয়া আশ্রমে আশ্রয় চাইলো। একটু ইতস্তত করেছিলেন হিমাংশু। ভয় ও পেয়েছিলেন। সেই ভয়, দ্বিধা সব কাটিয়ে ওঠেন স্ত্রী বীনার একটি কথায়। 'আমরা তো মানবাধিকার কর্মী'।
এরপর এই সোনিয়ার কেসটি নিয়ে অন্তত হাজার বার (আক্ষরিক অর্থে সত্যি) অভিযোগ জানিয়েছেন, নানান মহলে। ফল? পুলিশী অত্যাচারের তদন্ত করতে পাঠানো হয় পুলিশের ই একটা দল। সে তদন্তের ফল আশা করি আর বলতে হবেনা।
ওদিকে জাতীয় মহিলা কমিশনের গিরিজা ব্যাস স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এটা তদন্ত করার মত আদৌ কোন কেস ই না।

কিন্তু সেই শুরু। সালওয়া জুদুম আর পুলিশের অন্যায় অত্যাচারের হিমাংশুর একের পর এক প্রতিবাদের। বিনায়ক সেনের মত ই।
আর সেই শুরু। প্রশাসনের গুডবুক থেকে বেরিয়ে তার ছিদ্রান্বেষী স্ক্যানারের তলায় চলে আসা। বিনায়ক সেনের মত ই। না, জেলে যেতে হয়নি।
কিন্তু বন্ধ করা হয়েছে ভিসিএর গ্রান্ট, ১৩-১৪ বছর আশ্রম চলার পর সরকারী নোটিস এসেছে, এটি জমির জবরদখল। আর তার পরে ১৭ই মে র ঘটনা তো জানাই।

তবে এই দু'দিনের নোটিসে আশ্রম ভেঙ্গে হিমাংশুর কাজকর্ম বন্ধ করার যে আশু প্রয়োজনীয়তা প্রশাসনের দেখা দিলো, তার পিছনে আরো কিছু সাম্প্রতিক কারণ আছে। সালোয়া জুদুমের চার বছরে প্রায় ছ'শো গ্রাম জোর করে খালি করিয়েছে ছত্তিসগড় প্রশাসন, গ্রামবাসীদের যেতে বাধ্য করেছে ক্যাম্পে যেতে। গত বছর সুপ্রীম কোর্ট সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিল,এই ক্যাম্পগুলি এবার ভেঙ্গে দিতে। সরকার রাজী হলেও বাস্তবে তার কিছুই কার্যকর করেনা। সেখানে , হিমাংশু চালু করেছিলেন এক 'হিউম্যান শিল্ড' ব্যবস্থার। যেখানে ভিসিএর কোনো স্বেচ্ছাসেবী গ্রামে গিয়ে নিজেরা কয়েকদিন থেকে ক্যাম্প থেকে গ্রামবাসীদের পুনর্বাসিত হতে সাহায্য করেছেন। জানিয়েছেন, সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশের কথা। আর এর ফল ও পেতে শুরু করেছিলেন বেশ কিছু গ্রামে। তারপর ই তো এই কান্ড।

সালোয়া জুদুম ছত্তিসগড়ে এখনো বহাল তবিয়তে। জানালেন হিমাংশু। ঐ কামানার গ্রামে ঐ লুটপাটের পিছনে পুলিশের সাথে আছে ক্যাম্পে থাকা কিছু আদিবাসীও। তাদের আর কোনো আয়ের রাস্তা বন্ধ। এই লুটপাট ছাড়া। তাই সেটা চলছেই।
অব্যাহত মিথ্যা এনকাউন্টার ও। কদিন আগেই সিংগ্রামে হয়ে গেছে, মারা গেছেন ১৯ জন আদিবাসী। সেই নিয়ে হিমাংশুর এফ আই আর নেয়নি পুলিশ। আরো অনেক অনেক এফ আই আরের মতন ই ।অØ&#৩৪৭;সজ্জিত 'স্পেশাল পোলিশ অফিসার' দের বিরুদ্ধে যাবার সাহস ই তো নেই পুলিশের। অথবা আরো অনেক এফ আই আর করার সাহসই হয়নি, প্রথমেশ , অরভিন্দদের মতন।

তাই, বিনায়ক সেন, হিমাংশু কুমার , কি প্রথমেশ, অরভিন্দদের কথা তাও জানতে পারলেও জানবো না, প্রায় রোজ এই এক ই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকা বা মরে যাওয়া কত জন আদিবাসীর কথা আমরা আদৌ জানতেই পারছিনা।


আগস্ট ৯, ২০০৯




আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন