বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1] [2] [3] [4] [5] [6] [7] [8] [9] [10] [11] [12] [13]     এই পাতায় আছে1--30


           বিষয় : ১৯৭১ :: মুক্তিযুদ্ধের কথা
          বিভাগ : অন্যান্য
          শুরু করেছেন :বিপ্লব রহমান
          IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:09 Dec 2012 -- 07:16 PM




Name:  বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:09 Dec 2012 -- 07:24 PM

বাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়--১৯৭১। মুক্তিযুদ্ধটি যেহেতু শুধু 'বাংলাদেশ' নামক ৫৬ হাজার বর্গমাইল স্বাধীনতার একক যুদ্ধ ছিলো না, এর ব্যপ্তি ছিলো সব ধরণের শোষণ থেকে মুক্তির, তাই এতে বাঙালির পাশাপাশি ভাষাগত সংখ্যালঘু আদিবাসী জনগোষ্ঠির মানুষও সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়।...দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু কাঙ্খিত মুক্তির লড়াই ফুরিয়ে যায়নি। নানা মাত্রায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলে আমাদের মুক্তির লড়াই। জয় বাংলা! ...


Name:   বিপ্লব রহমান           

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:09 Dec 2012 -- 07:31 PM

অপারেশন সার্চলাইট: পাক সামরিক জান্তার বেতার বার্তা
-- বিপ্লব রহমান

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় কারফিউ জারি করে মধ্যরাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়, তার আনুষ্ঠানিক নাম ছিলো 'অপারেশন সার্চলাইট'। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে বাঙালির স্বাধীনতার আন্দোলনকে হত্যাযজ্ঞে স্তব্ধ করে দেওয়ার এক নীলনকশা।


ঢাকার খিলগাঁওয়ের চৌধুরীপাড়ার বাসায় বসে সেদিন রাত দেড়টা থেকে পরদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনাদের বেতারবার্তা রেকর্ড করেছিলেন আণবিক শক্তি কেন্দ্রের পদার্থবিজ্ঞানবিদ ড. এম এম হোসাইন। এই অকুতভয় মুক্তিযোদ্ধার রেকর্ডকৃত বেতার বার্তার স্ক্রিপ্টে দেখা যায় পাকিস্তানি সেনাদের বেশ কিছু সামরিক সংকেত ব্যবহার করতে। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানায় অপারেশনের দায়িত্বে থাকা ইউনিটগুলোর কথোপকথনের ধারাভাষ্য থেকে বাঙালি নিধনের খণ্ডচিত্র ফুটে ওঠে।


বেতার বার্তায় একই সঙ্গে মূর্ত হয় প্রতিরোধের লড়াইও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাঙগ্রামী ছাত্র সমাজ ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনের বাঙালি পুলিশ বাহিনী প্রাচীন থ্রি নট থ্রি রাইফেলে রুখে দিতে চেয়েছিলেন পাক সামরিক জান্তার ট্যাঙ্ক, মর্টার, মেশিন গান। পিলখানার সীমান্তরক্ষী বাহিনী ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস)-এর বাঙালি সৈনিকরাও গড়ে তুলেছিলেন পাল্টা প্রতিরোধ যুদ্ধ। তবে দৃশ্যত এর কোনোটাই শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। তারা বীরের মৃত্যু বরণ করেছিলেন কাতারে কাতারে। আর পুরো ঢাকা পরিনত হয়েছিলো এক মৃত্যুপুরীতে। ...


'অপারেশন সার্চ লাইটের' বেতার বার্তায় 'ইমাম' বলতে গ্রুপ কমান্ডার ও 'মেইন বার্ড' বলতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বোঝানো হয়েছে। ইংরেজি-উর্দুতে মেশানো দীর্ঘ এই বেতারবার্তাটি সংগ্রহ ও অনুবাদ করেছেন সহব্লগার ও সাংবাদিক অমি রহমান পিয়াল।

পাকিস্তানি সেনাদের বেতার বার্তার স্ক্রিপ্টে দেখা যায়, কন্ট্রোল রুম ২৬, ৭৭, ৮৮ ও ৯৯ নম্বর ইউনিটকে নির্দেশ দিয়ে বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ও ইকবাল হলসহ (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক ছাত্রাবাস) ক্যাম্পাস এলাকার বড় বড় ভবন গুঁড়িয়ে দিতে। এই ছাত্রাবাস দুটি থেকে আসা পাল্টা প্রতিরোধ যুদ্ধ স্তব্ধ করার জন্যও ইউনিটগুলোকে বারবার নির্দেশ দেওয়া হয়।


একই সঙ্গে ইউনিটগুলোকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, মাইকে কারফিউ জারির কথা ঘোষণার পাশাপাশি এটিও প্রচার করতে, যেন কোথাও স্বাধীন বাংলার পতাকা বা কালো পতাকা উড়তে দেখা না যায়। পতাকা ওড়ানো বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার জন্যও নির্দেশ দেওয়া হয়। কন্ট্রোল রুম ইউনিটগুলোকে আরো নির্দেশ দিচ্ছে নগরীর সড়কগুলো থেকে ব্যারিকেড সরিয়ে ফেলতে। যেখানেই ব্যারিকেড দেখা যাবে, এর আশপাশের ঘরবাড়িতে গুলি চালাতে।



বেতার বার্তায় দেখা যায়, একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানায় সামরিক অভিযান চালানোর সময় পাকিস্তানি সেনারা পাল্টা প্রতিরোধ লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়। কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে ৪১, ৫৫, ৮৮, ৯৯ ও ২০০০ নম্বর ইউনিটের কথোপকথনে দেখা যায়, অভিযানের শুরুতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এই তিনটি স্থান দখল করতে পারেনি। বরং রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানায় কঠিন প্রতিরোধ যুদ্ধ চলেছে।


পুলিশ বাহিনী ও ইপিআর-এর মুক্তিকামী বাঙালিরা সামান্য অস্ত্র-শস্ত্র সম্বল করে পাকিস্তানি সেনাদের সাঁজোয়া যান, কামান, এম-২৪ ট্যাঙ্ক, মেশিনগান, রিকোয়েলস রাইফেল ইত্যাদি ভারী অস্ত্রশস্ত্রের বিরুদ্ধে আমরণ লড়াই করেন। এমনকি একপর্যায়ে হামলাকারীরা শক্তি বৃদ্ধি করতে সেনানিবাস থেকে গোলন্দাজ বাহিনীও তলব করতে বাধ্য হয়। স্থানীয় সেনা ইউনিটগুলো আহত বেশ কজন পাকিস্তানি সেনাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করার বিষয়েও কন্ট্রোল রুমকে অবহিত করে।


অন্যদিকে কন্ট্রোল রুম ৪১ নম্বর ইউনিটকে নির্দেশ দেয়, আক্রমণের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার রেললাইন (পলাশী এলাকায়) দিয়ে যেন কেউ পালাতে না পারে। তবে কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই পাকিস্তানি সেনারা টেলিভিশন ভবন (রামপুরা) ও রেডিওর সদর দপ্তর (শাহবাগ), রমনা থানা, কমলাপুর থানা এবং টেলিফোন এক্সচেঞ্জ দখল করে। একই সঙ্গে তারা বুড়িগঙ্গা নদীতেও নামায় গানবোট।



পাকিস্তানি সামরিক জান্তার ওই বেতারবার্তায় ধরা পড়ে, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, শাহবাগের পিপলস ডেইলি সংবাদপত্র ধ্বংস করে দেওয়া হয়। 'সেখানে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে'-- কন্ট্রোল রুমের কাছে স্থানীয় ৯৯ ও ৮৮ নম্বর সেনা ইউনিট এমন রিপোর্টও করে।


৪১ নম্বর ইউনিট কন্ট্রোল রুমের কাছে জানতে চায়, মোহাম্মদপুরের শারীরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (পরে সেখানে আলবদর সদর দপ্তর বসানো হয়, এটি ছিলো ১৯৭১ এর এক জল্লাদখানা) এলাকায় রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টিকারী যেসব 'দুষ্কৃতকারী'কে আটক করা হয়েছে, তাদের মেরে ফেলা হবে কি না। জবাবে বলা হয় তাদের দিয়ে ব্যারিকেড সরিয়ে ফেলতে। 'খতম'-এর বিষয়ে পরে জানানো হবে।


বেতার বার্তায় আরো দেখা যায়, কন্ট্রোল রুম ২৬ নম্বর ইউনিটের কাছে জানতে চায় আলফা-লিমা (আওয়ামী লীগ-এর সামরিক সংকেত) কার্যালয় দখল করা হয়েছে কি না। জবাবে বলা হয়, সেটি ভোরবেলায় দখল করা হবে। কন্ট্রোল রুম বারবার ২৬ ও ৭৭ নম্বর ইউনিটকে নির্দেশ দেয়, ভোর হওয়ার আগেই যেন সব লাশ সরিয়ে ফেলা হয়। এই বার্তা উর্দুতে অন্যান্য ইউনিটের কাছে পুনঃপ্রচার করার জন্যও নির্দেশ দেওয়া হয়।...

http://unmochon.net/node/1514



Name:  বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:09 Dec 2012 -- 07:35 PM

৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি যেভাবে রেডিওতে প্রচার হলো…

--বিপ্লব রহমান


১৯৭১ এর মার্চ মাসের সময়টা ছিলো উত্তাল। সেই দিনগুলোতে পাকিস্তান রেডিওর ঢাকা কেন্দ্রের কয়েক জন দুঃসাহসী শব্দ-সৈনিক, অকুতভয় মুক্তিযোদ্ধা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বেতারে সম্প্রচার করেছিলেন।

পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় শেখ মুজিব যে ভাষণ দেন, তা রেডিওতে সম্প্রচারের জন্য দুঃসাহসী সেসব শব্দ-সৈনিকের কাছে জাতি চীর কৃতজ্ঞ।

অগ্নিঝরা সেই ভাষণের মর্মকথা পৌঁছে গিয়েছিলো বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তে। এ ভাষণের মধ্য দিয়েই বাঙালির কিংবদন্তী নেতা শেখ মুজিব পাকিস্তান সরকারের সাথে যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা করেন। এ ভাষণ বাঙালির স্বাধিকারের আকাঙ্খাকে আরও উস্কে দিয়েছিলো। আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলো জনগণের মনে। এ ভাষণই ছিলো স্বাধীনতার সুস্পষ্ট ঘোষণা।...

পাকিস্তান রেডিওর শাহবাগ কেন্দ্রে প্রবেশ করাটাও তখন বেতার কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জন্য ছিলো কঠিন এক ব্যাপার। সম্প্রচারের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলো সামরিক সরকার। এসব সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহারের দাবিতে তাৎক্ষণিকভাবে রেডিওর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এক ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন।

যে আট-দশজন বেতারকর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ১৯৭১ এ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্র থেকে প্রচার করেন, তাদের একজন আশফাকুর রহমান খান। রেডিও পাকিস্তান ছেড়ে পরবর্তীতে তিনি যোগ দিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে।

বছর সাতেক আগে আমি এই অকুতোভয় শব্দ-সৈনিক আশাফাকুর রহমানের সন্ধান পাই আমারই আরেক সহকর্মী নজরুল ইসলামের মাধ্যমে। তিনি একসময় বাংলাদেশ বেতারে কাজ করার সময় এই ব্যক্তিত্ব সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন।

ধানমণ্ডির বাসায় আলাপকালে মুক্তিযোদ্ধা আশাফাকুর রহমান বারুদঝরা সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেন । তার কথোপকথন থেকে সে সময় আমি দেশের প্রথম অনলাইন দৈনিক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর জন্য তৈরি করি একটি বিশেষ প্রতিবেদন।

সে সময় আশফাকুর রহমান খান বলেন:

তখন আমার বয়স মাত্র ২৮। রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্রে অনুষ্ঠান সংগঠক হিসেবে সদ্য যোগ দিয়েছি। মার্চের শুরুতেই পাকিস্তানের সেনা সদস্যরা সশস্ত্র অবস্থান নেয় শাহবাগের ওই বেতার কেন্দ্রে। কোন অনুষ্ঠান যাবে আর কোনটি যাবে না, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার মেজর সিদ্দিক সালেক এটি নিয়মিত তদারকি করতেন । এরই মধ্যে আমরা আন্দোলন-সংগ্রামের খবর, শ্লোগান, গণসঙ্গীত, দেশাত্নকবোধক গান, নাটক — ইত্যাদি অনুষ্ঠান প্রচার করতাম।

আমাদের নেতৃত্ব দিতেন রেডিওর আঞ্চলিক পরিচালক আশফাকুজ্জামান খান। তিনিই গোপনে আমাদের জানান, আমরা সেনা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রেডিওতে সরাসরি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করবো। সে-কি উত্তেজনা আমাদের মধ্যে! ৬ মার্চ রাতেই রেডিওর প্রকৌশলীরা রমনা রেসকোর্স মাঠে যে মঞ্চ থেকে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেবেন, সেখানে টেলিফোনের তার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি বসায়।

আশফাকুর রহমান খান বলে চলেন:

৭ মার্চ বেলা ২টায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দেওয়ার কথা। বেলা ১২টা থেকে আমরা রেডিওতে কিছুক্ষণ পর পর ঘোষণা দিতে থাকি, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সরাসরি প্রচার করা কথা। বঙ্গবন্ধু একটু দেরিতে বেলা ২টা ২০মিনিটের দিকে মঞ্চে আসেন।

এদিকে একই সময় রেডিও অফিসে মেজর সিদ্দিক সালেক টেলিফোনে মেসেজ পাঠান-- নাথিং অব শেখ মুজিবুর রহমান উইল গো অন দ্য এয়ার আনটিল ফারদার অর্ডার।…

এই মেসেজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা প্রতিবাদ হিসেবে রেডিওর সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ করে দিয়ে অফিস ছেড়ে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে চলে যাই। ওই দিন আমরা রেডিওর অনুষ্ঠান বয়কট করি। সাভারে একটি বিকল্প শক্তিশালী ট্রান্সমিটার ছিলো। সেখান থেকে যেনো আবার অনুষ্ঠান প্রচার করা না হয়, সে জন্য সেখানে ট্রাংকল করে খবর দেওয়া হয় সকল রেডিও কর্মীকে আত্নগোপন করার জন্য। ওইদিন রেডিওতে আর কোনো অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়নি ।

তিনি স্মৃতি হাতড়ে বলে চলেন:

ওই সন্ধ্যায় আমরা এলিফ্যান্ট রোডের এক বাসায় গোপন বৈঠকে বসি। রাতে আমাদের নেতা আঞ্চলিক পরিচালক আশফাকুজ্জামান খবর নিয়ে আসেন, সেনাবাহিনী রাজি হয়েছে রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করতে। তবে শর্ত হচ্ছে, সবাইকে কাজে ফিরে যেতে হবে। পরদিন ৮ মার্চ সকাল ৭টায় আমরা আবার কাজে যোগ দেই। রেডিওতে প্রচার করা হয় রেকর্ড করা বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ: …এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম!…
_________
http://unmochon.net/node/1464


Name:  বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:09 Dec 2012 -- 08:30 PM

অগ্নিঝরা মার্চ: ৩ মার্চ, ১৯৭১
লিখেছেনঃ অমি রহমান পিয়াল
_______________________
মৌচাক মোড়ের ঠিক উল্টোদিকেই একটা স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। শহীদ ফারুক-তসলিম স্মৃতিস্তম্ভ। ১৯৭১ সালের এদিন ঢাকাসহ সারাদেশে গুলিতে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়। শহীদ ফারুক ইকবাল তাদের একজন। আবুজরগিফারী কলেজের এই ছাত্রলীগ নেতা (তখন এজিএস) বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় গুলিতে শহীদ হন। এনিয়ে আমাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের এক বড় বোন ডাঃ শিমুল কলি হোসেইনের স্মৃতিচারণটা হুবহু তুলে দিলাম:

এই লিখাটা লিখছি সম্পূর্ণ স্মৃতি হাতড়ে। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আমি ছিলাম শিশু। তাই কিছু ভুল-ভ্রান্তি থাকলেও পুরো ঘটনাটা আমার মনে আজও গেঁথে আছে। তখন আমরা থাকতাম পূর্ব মালিবাগে। আমার বাবার তিন ভাই ছিলেন। তার মধ্যে দু’জন ইতিমধ্যে গত হয়েছেন। মেঝ ভাইয়েরও বয়স হয়েছে। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। তিনি আর আমার চাচী পূর্ব মালিবাগে পাঁচকাঠা জমির উপর ছোট্ট একটা টিনের ঘর বানিয়ে থাকতেন। তাঁদের অনুরোধে ঝিকাতলার বিশাল বাড়ি ছেড়ে আব্বা আমাদের নিয়ে এসে উঠলেন চাচার বাড়ির প্রায় পাশেই। এই বাড়িতে কোন বাগান নেই, কোন ছাদ ও নেই। ইংরেজী এল আকারের টিনের একতলা বাড়ি আর সামনে ছোট্ট পাকা একটা উঠাণ। ঘরগুলির দেয়াল আর সীমানা প্রাচীর ইটের বলে রক্ষে! আমাদের বাড়ির লাইনে প্রায় দশ বারোটা বাড়ি, সামনে একটা রাস্তা তাতে কদাচিৎ দু’ একটা রিকশা চলত। পাড়ার ছেলে-মেয়েদের খেলার জায়গাটা ছিল ঐ রাস্তা। রাস্তার অপর পারে কিছু খালি প্লট ছিল আর তার ওপাশে ছিল মৌচাক-রামপুরা সড়ক যেটাকে ডি আই টি রোড বলা হতো। বেশ কিছু খেলার সাথী জুটে যাওয়ায় বাগান-ছাদের শোক কাটিয়ে উঠেছি। ভর্তি করিয়ে দিল সিদ্ধেশ্বরী স্কুলে।

এখনকার মত তখন পড়াশোনা এত কঠিন ছিল না। স্কুল থেকে এসেই গোসল করে খেয়ে বিকেল না হতেই সেই রাস্তায়। ডাংগুলি, সাতচাড়া, বরফপানি, মোরগ-লড়াই, বউচি চলত মাগরিবের আযানের আগ পর্যন্ত। মার্চের ২ তারিখে স্কুল ছুটি হয়ে গেলো। আর পায় কে! ৩ তারিখে আব্বা অফিসের জন্য বের হতেই ছুটে রাস্তায় চলে গেলাম। আন্দোলনের কারনে সবারই স্কুল ছুটি তাই সবাই সকাল সকাল আমার মত এসে জুটেছে। বেশ কিছুদিন থেকেই শহরে মিছিল হচ্ছে। মিছিল হলেই মিছিলের পিছে পিছে ছুটতাম। খুব সম্ভবত দুপুর ১২টা বা ১টা হবে, “বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো”, “তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা” ইত্যাদি শ্লোগানের শব্দ ক্রমশঃই কাছে আসতে লাগলো। মাঠ পেরিয়ে ডি আই টি রোডের দিকে চেয়ে দেখি বিশাল এক মিছিল মৌচাক থেকে মালিবাগ রেলক্রসিং এর দিকে যাচ্ছে। আর পায় কে! ভৌ দৌড়- পিছনে তাকিয়ে দেখি বেনু, মুকুল আরো ক’জনাও দৌড়াচ্ছে। মূহূর্ত্যের মধ্যেই আমরা মিছিলটিকে ধরে ফেল্লাম। আজকের মিছিলটি মনে হয় সবচেয়ে বড়। বড়দের সাথে গলা মিলিয়ে আমরাও শ্লোগান দিতে লাগলাম। রেলক্রসিং এর কাছাকাছি এসে মিছিলটি থেমে গেল। সবাই এত জোরে হাটছিল যে হঠাৎ থেমে যাওয়াতে হোক বা ধাক্কাধাক্কিতেই হোক পিছন থেকে ক’জন রাস্তায় পরে গেল। তখনো সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই শ্লোগান দিচ্ছে। শুরু হল হই-চই। কেউ কেউ বলছে সামনে পুলিশ, আর যেতে দিবে না।





হঠাৎ মনে হল দুপুরের খাবার সময় হয়ে এসেছে, মা তো খুঁজবে। অগত্যা অনিচ্ছা সত্বেও ফিরে এলাম। বাসায় এসে গোসল করে মাত্র খেতে বসেছি এমন সময় ভাইয়া কোত্থেকে দৌড়ে এল-হাঁপাতে হাঁপাতে বল্ল, “মিছিলে গুলি করেছে, ফারুক ইকবাল মারা গেছে”। আম্মা আতঁকে উঠলেন- সম্পর্কে আম্মা ফারুক ইকবালের মায়ের চাচী। আম্মাকে কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ না দিয়েই ভাইয়া যেদিক থেকে আসছিলেন সে দিকে দৌড় দিলেন। আমিও তার পিছু নিলাম। যেতে যেতে শুনলাম তাঁর লাশ আমবাগানে নিয়ে আসবে। আমাদের মত অনেকেই ও দিকে ছুটছে। আমবাগানে পৌঁছে দেখি অনেক মানুষ। সবার মুখে মুখে নানা ধরনের গুজব। কেউ বলছে “লাশ পুলিশে নিয়ে গেছে”, কেউ বলছে “না না পল্টনে নিয়ে গেছে” ইত্যাদি। আমরা বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বাসায় চলে এলাম।


বিকালের দিকে খবর পেলাম লাশ নিয়ে এসেছে। গিয়ে দেখি শুধু মানুষ আর মানুষ। গোসল করানো নিয়ে মতানৈক্য দেখা দিল। এক দল বলছে ফারুক শহীদ হয়েছে তাই তাঁকে গোসল দিতে হবে না। অন্যরা বলছে নবী করিম(সাঃ) এর সময় যুদ্ধক্ষেত্রে পানি ছিল না তাই পরনের কাপড় সহ গোসল ছাড়াই দাফন করা হতো, কিন্তু এক্ষেত্রে তো ওসব সমস্যা নাই। অবশেষে কাপড় দিয়ে ঘিরে তাঁকে গোসল দেয়া হলো। আমি মায়া ভাইকে (মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, বীরবিক্রম) চিনতাম। খুব সম্ভবতঃ মায়া ভাই বাংলাদেশের বিশাল নতুন পতাকা দিয়ে মুড়ে দিলেন ওর লাশ। সবাই তখন কাঁদছে। যতদূর মনে পড়ে তখন সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। এত লোক হয়েছিল জানাযায় যে একটু দাড়াঁনোরও জায়গা ছিল না। বাসায় ফিরে এসে শুনেছিলাম তাঁকে মৌচাক মার্কেটের কাছে সমাহিত করা হয়েছে। এ ঘটনার বেশ কিছুদিন পর আম্মা আমাকে নিয়ে ফারুক ইকবালের মায়ের সাথে দেখা করতে যান। আমার মনে আছে ফালু আপা ফারুক ইকবালের রক্তমাখা (রক্তের দাগ শুকিয়ে প্রায় খয়েরী হয়ে গিয়েছিল) শার্ট-প্যান্ট বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন।



পুনঃশ্চ- ২৭ মার্চ কার্ফূ ভাঙ্গার পর মালিবাগ থেকে পালিয়ে (সে কাহিনী আর এক দিন বলবো) গ্রামের বাড়ি আসি। এরপর আর কখনো মালিবাগের ঐ বাড়িতে গিয়েছি বা ফালু আপার সাথে দেখা করেছি কি না মনে পড়ে না। এরপর বহু বছর কেটে গেছে। আব্বা মারা যান ১৯৯৫ সালের ২৯ শে অক্টোবর দুপুরবেলা। সেই রাতে হঠাৎই ফালু আপা ফোন করেন। জানতে চান তাঁর চাচা কেমন আছেন, চাচার কথা খুব মনে পড়ছে ইত্যাদি। যখন শুনলেন আজই আব্বা ইন্তেকাল করেছেন তখন চুপ করে গেলেন। আমি ও খুব অবাক হলাম এই ভেবে যে কি ভাবে আজকের দিনেই ওনার আব্বার কথা মনে এল! কি রহস্যময় এই জগত!

আজ সারা বাংলাদেশে জাতীয় শোক দিবস পালন করা হয়। দিনের হাইলাইট ছিলো পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগের যৌথ আয়োজনে আয়োজিত এক সমাবেশে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ। তখনকার ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ পঠিত এই ইশতেহার ছিলো এক অর্থে মুক্তিযুদ্ধের রূপরেখাই। এতে বলা হয়:


১. এইসভা পাকিস্তানী উপনিবেশবাদ শক্তির লেলিয়ে দেওয়া সশস্ত্র সেনাবাহিনী কর্তৃক বাঙালীদের উপর গুলিবর্ষণের ফলে নিহত বাঙালী ভাইদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করিতেছে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার পরিজনের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করিতেছে এবং পাকিস্তানী উপনিবেশবাদ শক্তির সেনাবাহিনীর জঘন্য হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়িয়া তোলার জন্য আহ্বান জানাইতেছে।

২. এই সভা ভাড়াটিয়া সেনাবাহিনীর গুলিতে আহত স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহনকারী বীর বাঙালী ভাইদের বাঁচাইয়া রাখার জন্য স্বাস্থ্যবান বাঙালী ভাইদেরকে ব্লাডব্যাঙ্কে রক্ত প্রদানের আহ্বান জানাইতেছে।

৩. এই সভা পাকিস্তানী উপনিবেশবাদের কবল হইতে মুক্ত হইয়া স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা, শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা কায়েমের জন্য সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও নির্ভেজাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিয়া স্বাধীন বাংলাদেশে কৃষক-শ্রমিক রাজ কায়েমের শপথ গ্রহন করিতেছে।

৪. এই সভা স্বাধীন বাংলার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে পূর্ণ আস্থা রাখিয়া তাঁহার সফল সংগ্রাম চালাইয়া যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেছে।

৫. এই সভা দলমত নির্বেশেষে বাংলার প্রতিটি নরনারীকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম চালাইয়া যাওয়ার আহ্বান জানাইতেছে।

জয় বাংলা





ইশতেহার নং/ এক

(স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ঘোষণা ও কর্মসূচী)

স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ ঘোষণা করা হয়েছে :

গত তেইশ বছরের শোষণ, কুশাসন ও নির্যাতন এ'কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত করেছে যে, সাত কোটি বাঙালীকে গোলামে পরিণত করার জন্য বিদেশী পশ্চিমা উপনিবেশবাদীদের যে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র তা থেকে বাঙালীর মুক্তির একমাত্র পথ স্বাধীন জাতি হিসেবে স্বাধীন দেশের মুক্ত নাগরিক হয়ে বেঁচে থাকা। গত নির্বাচনের গণরায়কে বানচাল করে শেষবারের মতো বিদেশী পশ্চিমা শোষকেরা সে কথার প্রয়োজনীয়তা হাড়ে হাড়ে প্রমাণ করেছে।
৫৪ হাজার ৫ শত ৬ বর্গমাইল বিস্তৃত ভৌগলিক এলাকায় ৭ কোটি মানুষের জন্য আবাসিক ভূমি হিসেবে স্বাধীন ও সার্বভৌম এ'রাষ্ট্রের নাম "বাঙলাদেশ"। স্বাধীন ও সার্বভৌম "বাঙলাদেশ" গঠনের মাধ্যমে নিম্নলিখিত তিনটি লক্ষ্য অর্জন করতে হবে।

(১) স্বাধীন ও সার্বভৌম "বাঙলাদেশ" গঠন করে পৃথিবীর বুকে একটি বলিষ্ঠ বাঙালী জাতি সৃষ্টি ও বাঙালীর ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে।
(২) স্বাধীন ও সার্বভৌম "বাঙলাদেশ" গঠন করে অঞ্চলে অঞ্চলে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বৈষম্য নিরসনকল্পে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি চালু করে কৃষক, শ্রমিক রাজ কায়েম করতে হবে।
(৩) স্বাধীন ও সার্বভৌম "বাঙলাদেশ" গঠন করে ব্যক্তি, বাক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ নির্ভেজাল গণতন্ত্র কায়েম করতে হবে।

বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালনার জন্য নিম্নলিখিত কর্মপন্থা গ্রহণ করতে হবে :

(ক) বাঙলাদেশের প্রতিটি গ্রাম, মহল্লা, থানা, মহকুমা, শহর, জেলায় 'স্বাধীনতা সংগ্রাম কমিটি গঠন করতে হবে।

(খ) সকল শ্রেণীর জনসাধারণের সহযোগিতা কামনা ও তাদের ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।

(গ) শ্রমিক এলাকায় শ্রমিক ও গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের সুসংগঠিত করে গ্রামে গ্রামে, এলাকায় এলাকায় 'মুক্তিবাহিনী' গঠন করতে হবে।

(ঘ) হিন্দু-মুসলমান ও বাঙালী-অবাঙালী সাম্প্রদায়িক মনোভাব পরিহার করতে হবে এবং সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে।

(ঙ) স্বাধীনতা সংগ্রামকে সুশৃংখলার সাথে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে এবং লুঠতরাজসহ সকল প্রকার সমাজবিরোধী ও হিংসাত্মক কার্যকলাপ বন্ধ করতে হবে।

স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারা নিম্নরূপ হবে :

(অ) বর্তমান সরকারকে বিদেশী উপনিবেশবাদী শোষক সরকার গণ্য করে বিদেশী সরকারের ঘোষিত সকল আইনকে বেআইনী বিবেচনা করতে হবে।

(আ) তথাকথিত পাকিস্তানের স্বার্থের তল্পীবাহী পশ্চিমা অবাঙালী মিলিটারীকে বিদেশী ও হামলাকারী শত্রু সৈন্য হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং এ হামলাকারী শত্রুসৈন্যকে খতম করতে হবে।

(ই) বর্তমান বিদেশী উপনিবেশবাদী শোষক সরকারকে সকল প্রকার ট্যাক্স-খাজনা দেয়া বন্ধ করতে হবে।

(ঈ) স্বাধীনতা আন্দোলনকারীদের উপর আক্রমণরত যে কোন শক্তিকে প্রতিরোধ, প্রতিহত, পাল্টা আক্রমণ ও খতম করার জন্য সকল প্রকার সশস্ত্র প্রস্তুতি নিতে হবে।

(উ) বৈজ্ঞানিক ও গণমুখী দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে সকল প্রকার সংগঠন গড়ে তুলতে হবে।

(ঊ) স্বাধীন সার্বভৌম বাঙলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে 'আমার সোনার বাঙলা আমি তোমায় ভালবাসি......' গানটি ব্যবহৃত হবে।

(ঋ) শোষক রাষ্ট্র পশ্চিম পাকিস্তানী দ্রব্য বর্জন করতে হবে এবং সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

(এ) উপনিবেশবাদী পাকিস্তানী পতাকা পুড়িয়ে বাঙলাদেশের জাতীয় পতাকা ব্যবহার করতে হবে।

(ঐ) স্বাধীনতা সংগ্রামে রত বীর সেনানীদের সর্বপ্রকার সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদান করে বাঙলার স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ুন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক :

স্বাধীন ও সার্বভৌম বাঙলাদেশ গঠন আন্দোলনের এ পর্যায়ে নিম্নলিখিত জয়ধ্বনি ব্যবহৃত হবে--

* স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ-- দীর্ঘজীবী হউক।
* স্বাধীন কর স্বাধীন কর-- বাংলাদেশ স্বাধীন কর।
* স্বাধীন বাংলার মহান নেতা-- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।
* গ্রামে গ্রামে দূর্গ গড়-- মুক্তিবাহিনী গঠন কর।
* বীর বাংগালী অস্ত্র ধর-- বাংলাদেশ স্বাধীন কর
* মুক্তি যদি পেতে চাও-- বাংগালীরা এক হও।

বাংলা ও বাংগালীর জয় হোক

জয় বাংলা।

স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ।।


WITHDRAW FORCES AND TRANSFER POWER
Sheikh Mujibur Rahman's speech in a public meeting at Dacca on March 3, 1971



DACCA, March 3 : Awami League Chief Sheikh Mujibur Rahman today urged the authorities to withdraw the forces from the city and hand over the power to the elected representatives of the people.

The authorities must realise that the people wanted self-rule and if they were resisted by force they would not hesitate to sacrifice their life, the Awami League Chief said while addressing a massive public meeting at Paltan Maidan here this afternoon.

He also issued directives to the people of Bangla Desh not to pay any taxes until and unless power was transferred to the people's representatives.

The massive public meeting was organised by the Students' League as a part of the province-wide hartal call given by the Chief of the Awami League.

" By obstructing the constitutional method the authorities have virtually compelled the people to shed their innocent blood for realising their legal rights. This is absolutely intolerable. I appeal to the authorities concerned to immediately stop this wrong course by withdrawing Martial Law and transferring power to the elected representatives."

The massive public meeting was presided over by the Students' League Chief, Mr. Nure Alam Siddiqi. The meeting was also addressed, among others, by the General Secretary of Jatiya Sramik League Mr. Abdul Mannan, the General Secretary of the Students League, Mr. Shahjahan Siraj, and the General Secretary of the Dacca University Central Students Union (DUCSU) Mr. Abdul Quddus Makhan.

In an emotion choaked voice, the Sheikh in his 30-minute speech, called upon the people to continue their struggle in a peaceful and organised manner.

He urged the people to be alert against agent-provocators and to maintain complete peace and discipline, otherwise the purpose of the movement would be spoiled.

He called upon the people from all walks of life to rise to the occasion and protect the life and property of everyone living in this part of the country, whether Hindu or Muslim, Bengali or non-Bengali.

Reminding the authorities that he as well as the people of Bangla Desh were ready to die for the realisation of people's Icgitimate rights, he declared in clear-cut terms that the people were ready to face all the eventualities.

He said that he would never betray the cause of the people of Bangla Desh even facing death.

The Awami League Chief said that the authorities had taken action against those who had been asking for peaceful transfer of power.

Announcing his programme of action upto March 7 next, he said that he would seek help and co-operation from all shades of opinion for the success of the movement.
He said that the hartal would be observed throughout Bangla Desh everyday from 6 a.m. to 2 p.m. After the hartal the vehicles should be allowed to move. He suggested and urged the people to pay a bit more to the rickshaw pullers to cover their day's earnings.

He will address a mass rally at the Race Course Maidan at 2 p.m, on Sunday. He said that hartal was to be observed in all organisations, including Government offices, secretariat, High Court and other courts, semi-Government and autonomous corporations, PIA, Railway and other communication services, trans¬ports, all mills, factories, industrial and commercial establishments and markets.

He said that the forces were being maintained for protecting the country, and they could not be used against the common masses. Sheikh Sahib urged the authorities to pull back the forces to their barracks without further delay.

Sheikh Mujibur Rahman said that he had no language to condemn the incidents that took place in the city last night.

Sheikh Sahib made it clear that the present situation in the country was not the creation of his or any other people of Bangla Desh, but of the conspirators who had been trying to sabotage the peaceful transfer of power to the elected representatives of the people. The majority party had been even ignored while taking important national decisions, he said.

Sheikh Sahib advised each and every person of Bangla Desh to observe the hartal according to schedule in a peaceful and disciplined manner.

He, however, said that exemptions were to be extended only to ambulances, Press cars, hospitals, medicine shops, water and electricity supply.

Sheikh Sahib said that the speech at Paltan Maidan today might be his " last speech " and advised the people to continue their struggle in full swing even if he was absent. He said that there were a chain of leaders, among his companions who would be able to continue the struggle without any trouble.

The Sheikh who was earlier scheduled to lead a huge procession after the meeting, announced that the procession would not be led. Instead he led a prayer for the salvation of the departed souls of the martyrs who had, he maintained, died in the struggle for democracy.

Other speakers at the meeting called upon the people to maintain peace and harmony among the people, and desist from looting and other anti-social activities.

They declared in unequivocal terms that the people of Bangla Desh could not be suppressed any more and they must achieve their goal at any cost.

The meeting in a resolution condemned the firings in different parts of the city during the last two days and prayed for the salvation of the departed souls. It expressed its,deep sympathy with the members of the bereaved families.

In another resolution, the meeting called upon the people from all walks of life to take active part in the movement for the realisation of the people's rights under the dynamic leadership of Sheikh Mujibur Rahman.

The meeting took a fresh vow for the establishment of a society in Bangla Desh. where there would be no exploitation and people would live in peace.

Sheikh Mujib gave call for " peaceful satyagraha " movement for the realisation of the rights of the people of Bangla Desh and appealed to the people to main¬tain peace for the success of the struggle.

Sheikh Mujib also appealed to the people to guard against looting and arsor, and to maintain peace at all costs. Any attempt to disrupt peaceful life must be resisted, because without strict discipline no mass movement could attain any success

Sheikh Mujib appealed for communal peace and added the Biharis non-Muslims "are our sacred trust".

He referred to the sacrifice of lives by Bengalis during the last 23 years and during yesterday's observance of hartal in the City.

He said " I do not know how many people died yesterday," adding that he himself heard the firing of machine-gun. He also led the prayer at the meeting for those who died. The dead bodies of a few persons, who died yesterday, were also brought to the public meeting.

Sheikh Mujib said he wanted to spell out the future course of action, and added if the attitude of the Government remained unchanged till March 7 he would give out his mind at the race course, where he is scheduled to address a public meeting. He said if he failed to turn up for any unforeseen reasons, there would be others to announce the future course of action.

He said the maintenance of discipline was the prerequisite for the success of any mass movement. Without discipline no movement could achieve any tangible results " no matter how many lives we sacrifice." He particularly reminded the volunteers of their responsibilities in this connection.

Sheikh Mujib said " we are not responsible for the present state of affairs". He said they as the majority party in the country were in favour of the National Assembly session on February 15, but Mr. Z. A. Bhutto wanted it to be deferred to the first week of March, and when it was summoned to meet today he (Bhutto) oppose it again.

The Awami League Chief regretted the stand taken by the People's Party chief on the session of the National Assembly, which was to begin today, and added although they " were ready to attend the session the use of arms was " directed at the Bengalis. He also referred to threats of PPP chief to set afire West Pakistan if the session was not postponed.

Sheikh Mujib, in an apparent reference to West Pakistan leaders, said " If you do not want to frame one constitution let us frame our own constitution and you frame your own. Then let us see if we can live together as brothers."

The Awami League Chief said the people of Bangla Desh freed him from jail at the cost of their lives and shed their blood in the last. "We are ready to make further sacrifices and give more blood." He added: " You cannot suppress the Bengalis by killing 70,000,000 Bengalis."

Sheikh Mujib said if he died his soul would be there to be happy to find the Bengalis free and that they have two square meals a day to survive.

Sheikh Mujib said he did not have any grudge against the poor people of West Pakistan. They had been trying to live together for the last 23 years but West Pakistan now wanted to secede because they knew it well by now that they could not perpetuate their exploitation on them.

The Awami League leader also called upon the Press not to obey any restric¬tion on them. if an}, and if they failed to resist it they should refuse to attend their offices. He told the Press that •` it is a national struggle ". and everyone's participation is essential.

(THE DAWN, Karachi-March 4,1971)

Source: Bangladesh Documents, vol-1, page no. 195-197



অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও। ভাষণে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে অসহযোগ চালিয়ে যাওয়ার আহবান জানান। বলেন, বিশৃঙ্খল আন্দোলনে মরতেই হবে শুধু, দাবি আদায় করা যাবে না।গত কদিন ধরে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও অরাজকতায় জড়িতদের যে কোনো মূল্য প্রতিরোধের আহবান জানিয়ে মুজিব ৭ মার্চ রমনা রেসকোর্সে চূড়ান্ত কর্মসূচী ঘোষণা করবেন বলে জানান। তার আগে ইয়াহিয়া খান বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ১২ জন নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে ১০ মার্চ ঢাকায় এক আলোচনাসভার যে প্রস্তাব দেন তা প্রত্যাখান করেন মুজিব, বলেন শহীদদের রক্তের উপর দিয়ে কোনো আলোচনা হতে পারে না। হয় বাঙালীদের গুলি করা বন্ধ করতে হবে, নয়তো সাড়ে সাত কোটি বাঙালীকে তাদের মতো থাকতে দিতে হবে।


MUJIB REJECTS INVITATION

DACCA, March 3 : Sheikh Mujibur Rahman, President of the Awami League, rejected tonight the invitation of President Yahya Khan to attend the proposed meeting of the leaders of all the parliamentary groups in the National Assembly on March 10 in Dacca to solve the constitutional tangle.

Following is the full text of the statement.

" The radio announcement of the proposed invitation to the political leaders to sit with the President of Pakistan in conference in Dacca on March 10, coming as it does in the wake of widespread killing of the unarmed civilian population in Dacca, Chittagong and other places in Bangla Desh, while the blood of the martyrs on the streets is hardly dry, while some of the dead are still lying unburied and hundreds are fighting death in hospital comes as a cruel joke. This is more so since we are being called upon to sit with certain elements whose devious machinations are responsible for the death of innocent and unarmed peasants, workers and students.

" With the military build-up continuing with harsh language of weapons still ringing in our ears the invitation to such a conference is in effect being made at gun point.

" Under these circumstances, the question of accepting such invitations does not arise. I, therefore, reject such an invitation."


(THE DAWN, Karachi-March 4, 1971)

Source: Bangladesh Documents, vol – 1, page no. 197-198




এদিন টানা দ্বিতীয়দিনের মতো কারফিউ ভেঙ্গে রাস্তায় নামে জঙ্গী জনতা। সুবাদেই চলে গুলি। শুরুতেই উল্লিখিত ফারুক ছাড়াও ঢাকায় এদিন আরো মারা যান হানিফ, আবদুল হক, হুমায়ুন ও আবদুর রশীদ। এছাড়া নিহত আরো ১১ জনের লাশের পরিচয় পাওয়া যায়নি। গুলিবিদ্ধ হয়ে ৭০ জন আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হন। সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু তাদের দেখতে যান, সঙ্গী ছিলেন তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার আমির হোসেন ও গাজী গোলাম মোস্তফা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২৮ জন শিক্ষক এক যৌথ বিবৃতিতে দেশকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দেওয়ার ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে দেশবাসীর প্রতি আহবান জানান। এদিন শহীদ মিনারে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বে এক সমাবেশ আয়োজন করেন তারা। করাচিতে আয়োজিত এক নাগরিক সমাবেশে শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে প্রধানমন্ত্রীত্ব তুলে দেওয়ার আহবান জানানো হয়। এদিন পূর্ব পাকিস্তান জামাতে ইসলামীর আমির গোলাম আযম এক বিবৃতিতে অচলাবস্ধা নিরসনের জন্য নির্বাচিত গনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহবান জানায়। মর্নিং নিউজের ভাষ্যটি এরকম: Ghulam Azam yesterday appealed to authorities to transfer power to the elected representatives immediately. In a press statement issued in Dacca the provincial Jamaat chief said if the beloved country is to be saved from further catastrophe transfer of power must precede framing of the constitution let the representatives rule the country and framed constitution. The present situation of certainty must not be allowed to continue even for a single day.

ঢাকা, রংপুর, সিলেট, খূলনা ও দৌলতপুরে এদিন থেকে কারফিউর সময় বাড়ানো হয়। চট্রগ্রামে এদিন ৬০ জন নিহত হয়েছেন বলে খবর আসে পত্রিকায়।

(তথ্যসূত্র: ১৯৭১ সালের বিভিন্ন পত্রিকা ও বার্তাসংস্থা থেকে। )
____
http://www.amarblog.com/omipial/posts/144503


Name:  বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:09 Dec 2012 -- 08:34 PM

অগ্নিঝরা মার্চ: ২ মার্চ, ১৯৭১
লিখেছেনঃ অমি রহমান পিয়াল
______________________________

ঢাকা এদিন ছিলো হরতালের নগরী, মিছিলের নগরী এবং কারফিউর নগরী।দিনের হাইলাইট ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের জাতীয় পতাকা উত্তোলন।

সকাল থেকেই মিছিল ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়মুখী। স্মরণকালে এমন ছাত্র সমাবেশ দেখেনি কেউ! নিউমার্কেটের মোড় থেকে নীলক্ষেতের সড়ক দিয়ে পাবলিক লাইব্রেরি পর্যন্ত যার বিস্তার। এদিন বটতলায় ওড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা, ওড়ায় ছাত্রলীগের নেতৃত্বাধীন ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ।সমাবেশ শেষে বিশাল এক মিছিল রড ও লাঠি উচিয়ে ঢাকা শহর প্রদক্ষিন করে।

উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে এদিন থেকে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান কথাটা একরকম হাওয়া হয়ে যায় বাঙালীদের মুখ থেকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সন্ধ্যায় তার প্রেস কনফারেন্সে বারবার বাংলাদেশ উচ্চারণ করেন।

বায়তুল মোকাররমে পাকিস্তান ন্যাশনাল লীগ প্রধান আতাউর রহমান খান এক প্রতিবাদ সমাবেশ আয়োজন করেন বাংলা লীগের ব্যানারে। সে সমাবেশে উল্লেখযোগ্য যারা বক্তৃতা দেন তার মধ্যে ছিলেন শাহ আজিজুর রহমান, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী এবং মিসেস আমেনা বেগম।জামাতে ইসলামী এদিন এক বিবৃতিতে ভুট্টোর হুমকির নিন্দা জানায় এবং এই অচলাবস্থা নিরসনে তাকে ঋজু হওয়ার পরামর্শ দেয়।

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপ পল্টন ময়দানে সমাবেশ করে যাতে বক্তৃতা দেন সাইফুদ্দিন মানিক, মতিয়া চৌধুরী, মহিউদ্দিন আহমেদ, নুরুল ইসলাম সহ অনেকে।

ঢাকা শহরে ছিলো হরতাল। স্কুল-কলেজ, কল-কারখানা সবগুলো ছিলো জনশূন্য, কোনো অফিসে কাজ হয়নি। লোকসমাগম বলতে রাস্তায় এবং প্রতিবাদ সমাবেশে। আগেই বলা হয়েছে তাদের গন্তব্য।

সারাদিন একটি ট্রাকে করে আওয়ামী লীগের সদস্যরা সবাইকে শান্তি বজায় রাখার আহবান জানায়। বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় এটাই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ। স্টেডিয়াম ও তার আশেপাশের এলাকায়, নির্দিষ্ট করে বললে জিন্নাহ এভিনিউ (যা এখন বঙ্গবন্ধু এভিনিউ), বায়তুল মোকাররম ও নওয়াবপুরে অবাঙালীদের কিছু দোকান ভাংচুর ও লুটপাট হয়। তালিকায় একটা মদের দোকানও ছিলো যাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

সারা শহরে সরকারের পেটোয়া বাহিনী হরতাল ঠেকাতে মাঠে নামে। পঞ্চাশ জনের মতো গুলিবিদ্ধ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। এদের বেশীরভাগই তেজগাঁও এলাকার। তেজগাঁও পলিটেকনিক স্কুলের ছাত্র্ আজিজ মোর্শেদ ও মামুনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে আনার পর আজিজ মারা যান।

সামরিক আইন প্রশাসকের তরফে এদিন কারফিউ জারি করা হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে পরদিন সকাল ৭টা পর্যন্ত এই কারফিউ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অব্যহত থাকবে বলে ঘোষণা করা হয়। সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলন করেন শেখ মুজিবুর রহমান যাতে নিরস্ত্রদের উপর গুলি বর্ষণের তীব্র নিন্দা করা হয়। পরদিন ৩ মার্চ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত সারাদেশে অর্ধদিবস (ভোর ৬টা থেকে দুপুর ২টা) হরতালের ডাক দেন মুজিব।পরদিন ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে বৈঠক শেষে পল্টনে এক সমাবেশের ঘোষণা দেন তিনি।

MUJIB STRONGLY CONDEMNS FIRING-BANGLA DESH
CANNOT BE SUPPRESSED AS COLONY ANY MORE
Press statement issued on March 2, 1971


Sheikh Mujibur Rahman in a Press statement issued last evening, strongly condemned the killing of unarmed persons at Farm Gate and urged the government to desist forthwith from this reckless course. He reminded that Bengalees could not be suppresed any more and they would no longer tolerate exploitation as a colony or as a market.

Sheikh in his statement said, "Unarmed boys have been fired upon today. At least two have died, and several more are seriously injured. They have been shot at because they along with the rest of the people of Bangla Desh had stood up to protest against the gross insult inflicted upon Bangla Desh by the powers that be. I solemnly condemn such firing and urge the elements who are seeking to co-confront the people with force to desist forthwith fronr this reckless course. They should he reminded that firing upon unarmed masses amounts to genocide and is a crime against humanity. They should know that if Bangla Desh is a fire, as, it will be If such Confrontation continues then they will not be able to escape the flames.

"We, as the elected representatives of the seventy million people of Bangala Desh, were ready to sit with the representatives from the Western Wing on the 3rd March for the purpose of constitution-making. Indeed some of the represen¬tatives from the Western Wing had already come to Dacca. But then a sudden and unwarranted intervention prevented this sitting from taking place.

"The intervention was prompted by an intransigent minority group, which as the protector of the vested interests of the western wing and their bureaucratic lackeys, had declared that the sitting should not be held except on terms dictated by them. They had even gone to the length of nakedly threatening to "deal with" other west wing representatives who dared to defy such dictation. Such denial of the rights of the representatives of the majority of the people at the behest of an undemocratic minority is an intolerable insult to the people.

Since the people of Bangla Desh would not submit to such dictation or inti¬midation they are now saught to be confronted by force. It is tragic that planes which might have carried elected representatives from the Western Wing„ should instead be engaged in lifting military personnel and arms. If these measures are intended to cow down seventy million Bengalees, the spontaneous demonstrations of the will to resist displayed throughout Bangla Desh since yesterday should prove to the world that Bengalees cannot be suppressed anymore and that they are determined to be the free citizens of a free country. They will no longer tolerate being exploited as a colony or a market.

"At this critical hour it is the sacred duty of each and every Bengalee in every walk of life, including government officials, not to co-operate with anti¬people forces and indeed to do everything in their power to foil the conspiracy against Bangla Desh.

"Now that representatives have been elected by the people are the only legitimate source of authority, all authorities are, therefore, expected to take note of this fact.

"In the circumstances, there is no justification for the continuation of Martial Law or military rule by a single day. I, therefore, urge the immediate withdrawal of Martial Law, an immediate end to the 'confrontation' and the removal of obstacles to the exercise by the people's representatives of the power, that is rightfully theirs.

"Our movement will continue till the above demands are met and till the people of Bangla Desh realise their emancipation.

"I am announcing our programme of action till 7th March and am issuing she following directives to our people:

(a) Province-wide Hartal to be observed on each day from 3rd March 1971 to the 6th March, 1971 from 6 a.m. to 2 p.m. in all spheres including government offices, secretariat, High Court and other courts, semi-govern¬ment and autonomous corporation, PIA, Railways and other communi¬cation services, transport, private and public, all mills, factories, industrial and commercial establishments and market. 'Exemptions are ' to be extended to: Ambulances, press cars, hospitals, medicine shops, electric and water supply. All persons are urged to observe the Hartal in a peaceful and disciplined manner and to ensure that no untoward incident such as looting, burning, etc., takes place. In particular people should be alert against agent-provocators and should remember that everyone living in Bangla Desh, no matter where he originates from or the language he speaks is for us a Bengalee and their person, property and honour are our sacred trust and these must be protected.

(b) 3rd March which was to have been the day for the sitting of the National Assembly should be observed as a day of national mourning, on which occasion I will lead a procession from Paltan Maidan at 4 p.m. immedi¬ately after the conclusion of the meeting being held by Students League.

(c) In the event of radio, television or newspapers failing to cover our ver¬sion of events or our statements, all Bengalees serving in these agencies should refuse to co-operate with such gagging of the voice of the seventy million people of Bangla Desh.

(d) On 7th March 1971 at 2 p.m. I shall address a mass rally of our people at the Race Course Maidan, when further directives will be issued.
(e) I would urge our people to continue with our common struggle in a peaceful and disciplined manner, I would remind them that any breach of discipline would be against the interest of our movement and will serve the interest of agent provocators and the anti-people forces."

(THE PEOPLE, Dacca-March 3, 1971)

Source: Bangladesh Documents, Vol – 1, Page no – 191 - 193

(তথ্যসূত্র: ১৯৭১ সালের বিভিন্ন পত্রিকা ও বার্তাসংস্থা থেকে। )
___________
http://www.amarblog.com/omipial/posts/144469


Name:  দেব          

IP Address : 127.197.236.45 (*)          Date:12 Dec 2012 -- 12:49 AM

পাকিস্তানের একটি চ্যানেলে ১৯৭১ নিয়ে আলোচনা -


http://www.youtube.com/watch?v=BIxngLPOkIw

নিরপেক্ষ। দেখতে পারেন।


Name:  বিপ্লব রহমান           

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:12 Dec 2012 -- 05:10 PM

@ দেব, আপনার আগ্রহ ও বিনীত সংযোজনের জন্য ধন্যবাদ।

এপারে আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে ইউটিউব বন্ধ। তাই ভিডিও ক্লিপিংটি দেখতে পাচ্ছি না। অনুগ্রহ করে আপনি বা কোনো সুহৃদ যদি এর সারমর্ম লিখে দিন তো খুব ভালো হয়। চলুক।


Name:  বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:14 Dec 2012 -- 05:11 PM

অগ্নিঝরা মার্চ: ৩ মার্চ, ১৯৭১
লিখেছেনঃ অমি রহমান পিয়াল (তারিখঃ শনিবার, ০৩/০৩/২০১২ - ১২:১৭)
_________________________________

মৌচাক মোড়ের ঠিক উল্টোদিকেই একটা স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। শহীদ ফারুক-তসলিম স্মৃতিস্তম্ভ। ১৯৭১ সালের এদিন ঢাকাসহ সারাদেশে গুলিতে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়। শহীদ ফারুক ইকবাল তাদের একজন। আবুজরগিফারী কলেজের এই ছাত্রলীগ নেতা (তখন এজিএস) বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় গুলিতে শহীদ হন। এনিয়ে আমাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের এক বড় বোন ডাঃ শিমুল কলি হোসেইনের স্মৃতিচারণটা হুবহু তুলে দিলাম:

এই লিখাটা লিখছি সম্পূর্ণ স্মৃতি হাতড়ে। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আমি ছিলাম শিশু। তাই কিছু ভুল-ভ্রান্তি থাকলেও পুরো ঘটনাটা আমার মনে আজও গেঁথে আছে। তখন আমরা থাকতাম পূর্ব মালিবাগে। আমার বাবার তিন ভাই ছিলেন। তার মধ্যে দু’জন ইতিমধ্যে গত হয়েছেন। মেঝ ভাইয়েরও বয়স হয়েছে। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। তিনি আর আমার চাচী পূর্ব মালিবাগে পাঁচকাঠা জমির উপর ছোট্ট একটা টিনের ঘর বানিয়ে থাকতেন। তাঁদের অনুরোধে ঝিকাতলার বিশাল বাড়ি ছেড়ে আব্বা আমাদের নিয়ে এসে উঠলেন চাচার বাড়ির প্রায় পাশেই। এই বাড়িতে কোন বাগান নেই, কোন ছাদ ও নেই। ইংরেজী এল আকারের টিনের একতলা বাড়ি আর সামনে ছোট্ট পাকা একটা উঠাণ। ঘরগুলির দেয়াল আর সীমানা প্রাচীর ইটের বলে রক্ষে! আমাদের বাড়ির লাইনে প্রায় দশ বারোটা বাড়ি, সামনে একটা রাস্তা তাতে কদাচিৎ দু’ একটা রিকশা চলত। পাড়ার ছেলে-মেয়েদের খেলার জায়গাটা ছিল ঐ রাস্তা। রাস্তার অপর পারে কিছু খালি প্লট ছিল আর তার ওপাশে ছিল মৌচাক-রামপুরা সড়ক যেটাকে ডি আই টি রোড বলা হতো। বেশ কিছু খেলার সাথী জুটে যাওয়ায় বাগান-ছাদের শোক কাটিয়ে উঠেছি। ভর্তি করিয়ে দিল সিদ্ধেশ্বরী স্কুলে।




এখনকার মত তখন পড়াশোনা এত কঠিন ছিল না। স্কুল থেকে এসেই গোসল করে খেয়ে বিকেল না হতেই সেই রাস্তায়। ডাংগুলি, সাতচাড়া, বরফপানি, মোরগ-লড়াই, বউচি চলত মাগরিবের আযানের আগ পর্যন্ত। মার্চের ২ তারিখে স্কুল ছুটি হয়ে গেলো। আর পায় কে! ৩ তারিখে আব্বা অফিসের জন্য বের হতেই ছুটে রাস্তায় চলে গেলাম। আন্দোলনের কারনে সবারই স্কুল ছুটি তাই সবাই সকাল সকাল আমার মত এসে জুটেছে। বেশ কিছুদিন থেকেই শহরে মিছিল হচ্ছে। মিছিল হলেই মিছিলের পিছে পিছে ছুটতাম। খুব সম্ভবত দুপুর ১২টা বা ১টা হবে, “বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো”, “তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা” ইত্যাদি শ্লোগানের শব্দ ক্রমশঃই কাছে আসতে লাগলো। মাঠ পেরিয়ে ডি আই টি রোডের দিকে চেয়ে দেখি বিশাল এক মিছিল মৌচাক থেকে মালিবাগ রেলক্রসিং এর দিকে যাচ্ছে। আর পায় কে! ভৌ দৌড়- পিছনে তাকিয়ে দেখি বেনু, মুকুল আরো ক’জনাও দৌড়াচ্ছে। মূহূর্ত্যের মধ্যেই আমরা মিছিলটিকে ধরে ফেল্লাম। আজকের মিছিলটি মনে হয় সবচেয়ে বড়। বড়দের সাথে গলা মিলিয়ে আমরাও শ্লোগান দিতে লাগলাম। রেলক্রসিং এর কাছাকাছি এসে মিছিলটি থেমে গেল। সবাই এত জোরে হাটছিল যে হঠাৎ থেমে যাওয়াতে হোক বা ধাক্কাধাক্কিতেই হোক পিছন থেকে ক’জন রাস্তায় পরে গেল। তখনো সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই শ্লোগান দিচ্ছে। শুরু হল হই-চই। কেউ কেউ বলছে সামনে পুলিশ, আর যেতে দিবে না।




হঠাৎ মনে হল দুপুরের খাবার সময় হয়ে এসেছে, মা তো খুঁজবে। অগত্যা অনিচ্ছা সত্বেও ফিরে এলাম। বাসায় এসে গোসল করে মাত্র খেতে বসেছি এমন সময় ভাইয়া কোত্থেকে দৌড়ে এল-হাঁপাতে হাঁপাতে বল্ল, “মিছিলে গুলি করেছে, ফারুক ইকবাল মারা গেছে”। আম্মা আতঁকে উঠলেন- সম্পর্কে আম্মা ফারুক ইকবালের মায়ের চাচী। আম্মাকে কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ না দিয়েই ভাইয়া যেদিক থেকে আসছিলেন সে দিকে দৌড় দিলেন। আমিও তার পিছু নিলাম। যেতে যেতে শুনলাম তাঁর লাশ আমবাগানে নিয়ে আসবে। আমাদের মত অনেকেই ও দিকে ছুটছে। আমবাগানে পৌঁছে দেখি অনেক মানুষ। সবার মুখে মুখে নানা ধরনের গুজব। কেউ বলছে “লাশ পুলিশে নিয়ে গেছে”, কেউ বলছে “না না পল্টনে নিয়ে গেছে” ইত্যাদি। আমরা বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বাসায় চলে এলাম।

বিকালের দিকে খবর পেলাম লাশ নিয়ে এসেছে। গিয়ে দেখি শুধু মানুষ আর মানুষ। গোসল করানো নিয়ে মতানৈক্য দেখা দিল। এক দল বলছে ফারুক শহীদ হয়েছে তাই তাঁকে গোসল দিতে হবে না। অন্যরা বলছে নবী করিম(সাঃ) এর সময় যুদ্ধক্ষেত্রে পানি ছিল না তাই পরনের কাপড় সহ গোসল ছাড়াই দাফন করা হতো, কিন্তু এক্ষেত্রে তো ওসব সমস্যা নাই। অবশেষে কাপড় দিয়ে ঘিরে তাঁকে গোসল দেয়া হলো। আমি মায়া ভাইকে (মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, বীরবিক্রম) চিনতাম। খুব সম্ভবতঃ মায়া ভাই বাংলাদেশের বিশাল নতুন পতাকা দিয়ে মুড়ে দিলেন ওর লাশ। সবাই তখন কাঁদছে। যতদূর মনে পড়ে তখন সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। এত লোক হয়েছিল জানাযায় যে একটু দাড়াঁনোরও জায়গা ছিল না। বাসায় ফিরে এসে শুনেছিলাম তাঁকে মৌচাক মার্কেটের কাছে সমাহিত করা হয়েছে। এ ঘটনার বেশ কিছুদিন পর আম্মা আমাকে নিয়ে ফারুক ইকবালের মায়ের সাথে দেখা করতে যান। আমার মনে আছে ফালু আপা ফারুক ইকবালের রক্তমাখা (রক্তের দাগ শুকিয়ে প্রায় খয়েরী হয়ে গিয়েছিল) শার্ট-প্যান্ট বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন।


পুনঃশ্চ- ২৭ মার্চ কার্ফূ ভাঙ্গার পর মালিবাগ থেকে পালিয়ে (সে কাহিনী আর এক দিন বলবো) গ্রামের বাড়ি আসি। এরপর আর কখনো মালিবাগের ঐ বাড়িতে গিয়েছি বা ফালু আপার সাথে দেখা করেছি কি না মনে পড়ে না। এরপর বহু বছর কেটে গেছে। আব্বা মারা যান ১৯৯৫ সালের ২৯ শে অক্টোবর দুপুরবেলা। সেই রাতে হঠাৎই ফালু আপা ফোন করেন। জানতে চান তাঁর চাচা কেমন আছেন, চাচার কথা খুব মনে পড়ছে ইত্যাদি। যখন শুনলেন আজই আব্বা ইন্তেকাল করেছেন তখন চুপ করে গেলেন। আমি ও খুব অবাক হলাম এই ভেবে যে কি ভাবে আজকের দিনেই ওনার আব্বার কথা মনে এল! কি রহস্যময় এই জগত!




আজ সারা বাংলাদেশে জাতীয় শোক দিবস পালন করা হয়। দিনের হাইলাইট ছিলো পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগের যৌথ আয়োজনে আয়োজিত এক সমাবেশে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ। তখনকার ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ পঠিত এই ইশতেহার ছিলো এক অর্থে মুক্তিযুদ্ধের রূপরেখাই। এতে বলা হয়:


১. এইসভা পাকিস্তানী উপনিবেশবাদ শক্তির লেলিয়ে দেওয়া সশস্ত্র সেনাবাহিনী কর্তৃক বাঙালীদের উপর গুলিবর্ষণের ফলে নিহত বাঙালী ভাইদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করিতেছে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার পরিজনের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করিতেছে এবং পাকিস্তানী উপনিবেশবাদ শক্তির সেনাবাহিনীর জঘন্য হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়িয়া তোলার জন্য আহ্বান জানাইতেছে।

২. এই সভা ভাড়াটিয়া সেনাবাহিনীর গুলিতে আহত স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহনকারী বীর বাঙালী ভাইদের বাঁচাইয়া রাখার জন্য স্বাস্থ্যবান বাঙালী ভাইদেরকে ব্লাডব্যাঙ্কে রক্ত প্রদানের আহ্বান জানাইতেছে।

৩. এই সভা পাকিস্তানী উপনিবেশবাদের কবল হইতে মুক্ত হইয়া স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা, শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা কায়েমের জন্য সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও নির্ভেজাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিয়া স্বাধীন বাংলাদেশে কৃষক-শ্রমিক রাজ কায়েমের শপথ গ্রহন করিতেছে।

৪. এই সভা স্বাধীন বাংলার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে পূর্ণ আস্থা রাখিয়া তাঁহার সফল সংগ্রাম চালাইয়া যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেছে।

৫. এই সভা দলমত নির্বেশেষে বাংলার প্রতিটি নরনারীকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম চালাইয়া যাওয়ার আহ্বান জানাইতেছে।

জয় বাংলা




ইশতেহার নং/ এক

(স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ঘোষণা ও কর্মসূচী)

স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ ঘোষণা করা হয়েছে :

গত তেইশ বছরের শোষণ, কুশাসন ও নির্যাতন এ'কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত করেছে যে, সাত কোটি বাঙালীকে গোলামে পরিণত করার জন্য বিদেশী পশ্চিমা উপনিবেশবাদীদের যে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র তা থেকে বাঙালীর মুক্তির একমাত্র পথ স্বাধীন জাতি হিসেবে স্বাধীন দেশের মুক্ত নাগরিক হয়ে বেঁচে থাকা। গত নির্বাচনের গণরায়কে বানচাল করে শেষবারের মতো বিদেশী পশ্চিমা শোষকেরা সে কথার প্রয়োজনীয়তা হাড়ে হাড়ে প্রমাণ করেছে।
৫৪ হাজার ৫ শত ৬ বর্গমাইল বিস্তৃত ভৌগলিক এলাকায় ৭ কোটি মানুষের জন্য আবাসিক ভূমি হিসেবে স্বাধীন ও সার্বভৌম এ'রাষ্ট্রের নাম "বাঙলাদেশ"। স্বাধীন ও সার্বভৌম "বাঙলাদেশ" গঠনের মাধ্যমে নিম্নলিখিত তিনটি লক্ষ্য অর্জন করতে হবে।

(১) স্বাধীন ও সার্বভৌম "বাঙলাদেশ" গঠন করে পৃথিবীর বুকে একটি বলিষ্ঠ বাঙালী জাতি সৃষ্টি ও বাঙালীর ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে।
(২) স্বাধীন ও সার্বভৌম "বাঙলাদেশ" গঠন করে অঞ্চলে অঞ্চলে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বৈষম্য নিরসনকল্পে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি চালু করে কৃষক, শ্রমিক রাজ কায়েম করতে হবে।
(৩) স্বাধীন ও সার্বভৌম "বাঙলাদেশ" গঠন করে ব্যক্তি, বাক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ নির্ভেজাল গণতন্ত্র কায়েম করতে হবে।

বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালনার জন্য নিম্নলিখিত কর্মপন্থা গ্রহণ করতে হবে :

(ক) বাঙলাদেশের প্রতিটি গ্রাম, মহল্লা, থানা, মহকুমা, শহর, জেলায় 'স্বাধীনতা সংগ্রাম কমিটি গঠন করতে হবে।

(খ) সকল শ্রেণীর জনসাধারণের সহযোগিতা কামনা ও তাদের ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।

(গ) শ্রমিক এলাকায় শ্রমিক ও গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের সুসংগঠিত করে গ্রামে গ্রামে, এলাকায় এলাকায় 'মুক্তিবাহিনী' গঠন করতে হবে।

(ঘ) হিন্দু-মুসলমান ও বাঙালী-অবাঙালী সাম্প্রদায়িক মনোভাব পরিহার করতে হবে এবং সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে।

(ঙ) স্বাধীনতা সংগ্রামকে সুশৃংখলার সাথে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে এবং লুঠতরাজসহ সকল প্রকার সমাজবিরোধী ও হিংসাত্মক কার্যকলাপ বন্ধ করতে হবে।

স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারা নিম্নরূপ হবে :

(অ) বর্তমান সরকারকে বিদেশী উপনিবেশবাদী শোষক সরকার গণ্য করে বিদেশী সরকারের ঘোষিত সকল আইনকে বেআইনী বিবেচনা করতে হবে।

(আ) তথাকথিত পাকিস্তানের স্বার্থের তল্পীবাহী পশ্চিমা অবাঙালী মিলিটারীকে বিদেশী ও হামলাকারী শত্রু সৈন্য হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং এ হামলাকারী শত্রুসৈন্যকে খতম করতে হবে।

(ই) বর্তমান বিদেশী উপনিবেশবাদী শোষক সরকারকে সকল প্রকার ট্যাক্স-খাজনা দেয়া বন্ধ করতে হবে।

(ঈ) স্বাধীনতা আন্দোলনকারীদের উপর আক্রমণরত যে কোন শক্তিকে প্রতিরোধ, প্রতিহত, পাল্টা আক্রমণ ও খতম করার জন্য সকল প্রকার সশস্ত্র প্রস্তুতি নিতে হবে।

(উ) বৈজ্ঞানিক ও গণমুখী দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে সকল প্রকার সংগঠন গড়ে তুলতে হবে।

(ঊ) স্বাধীন সার্বভৌম বাঙলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে 'আমার সোনার বাঙলা আমি তোমায় ভালবাসি......' গানটি ব্যবহৃত হবে।

(ঋ) শোষক রাষ্ট্র পশ্চিম পাকিস্তানী দ্রব্য বর্জন করতে হবে এবং সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

(এ) উপনিবেশবাদী পাকিস্তানী পতাকা পুড়িয়ে বাঙলাদেশের জাতীয় পতাকা ব্যবহার করতে হবে।

(ঐ) স্বাধীনতা সংগ্রামে রত বীর সেনানীদের সর্বপ্রকার সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদান করে বাঙলার স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ুন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক :

স্বাধীন ও সার্বভৌম বাঙলাদেশ গঠন আন্দোলনের এ পর্যায়ে নিম্নলিখিত জয়ধ্বনি ব্যবহৃত হবে--

* স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ-- দীর্ঘজীবী হউক।
* স্বাধীন কর স্বাধীন কর-- বাংলাদেশ স্বাধীন কর।
* স্বাধীন বাংলার মহান নেতা-- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।
* গ্রামে গ্রামে দূর্গ গড়-- মুক্তিবাহিনী গঠন কর।
* বীর বাংগালী অস্ত্র ধর-- বাংলাদেশ স্বাধীন কর
* মুক্তি যদি পেতে চাও-- বাংগালীরা এক হও।

বাংলা ও বাংগালীর জয় হোক

জয় বাংলা।

স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ।।





WITHDRAW FORCES AND TRANSFER POWER
Sheikh Mujibur Rahman's speech in a public meeting at Dacca on March 3, 1971



DACCA, March 3 : Awami League Chief Sheikh Mujibur Rahman today urged the authorities to withdraw the forces from the city and hand over the power to the elected representatives of the people.

The authorities must realise that the people wanted self-rule and if they were resisted by force they would not hesitate to sacrifice their life, the Awami League Chief said while addressing a massive public meeting at Paltan Maidan here this afternoon.

He also issued directives to the people of Bangla Desh not to pay any taxes until and unless power was transferred to the people's representatives.

The massive public meeting was organised by the Students' League as a part of the province-wide hartal call given by the Chief of the Awami League.

" By obstructing the constitutional method the authorities have virtually compelled the people to shed their innocent blood for realising their legal rights. This is absolutely intolerable. I appeal to the authorities concerned to immediately stop this wrong course by withdrawing Martial Law and transferring power to the elected representatives."

The massive public meeting was presided over by the Students' League Chief, Mr. Nure Alam Siddiqi. The meeting was also addressed, among others, by the General Secretary of Jatiya Sramik League Mr. Abdul Mannan, the General Secretary of the Students League, Mr. Shahjahan Siraj, and the General Secretary of the Dacca University Central Students Union (DUCSU) Mr. Abdul Quddus Makhan.

In an emotion choaked voice, the Sheikh in his 30-minute speech, called upon the people to continue their struggle in a peaceful and organised manner.

He urged the people to be alert against agent-provocators and to maintain complete peace and discipline, otherwise the purpose of the movement would be spoiled.

He called upon the people from all walks of life to rise to the occasion and protect the life and property of everyone living in this part of the country, whether Hindu or Muslim, Bengali or non-Bengali.

Reminding the authorities that he as well as the people of Bangla Desh were ready to die for the realisation of people's Icgitimate rights, he declared in clear-cut terms that the people were ready to face all the eventualities.

He said that he would never betray the cause of the people of Bangla Desh even facing death.

The Awami League Chief said that the authorities had taken action against those who had been asking for peaceful transfer of power.

Announcing his programme of action upto March 7 next, he said that he would seek help and co-operation from all shades of opinion for the success of the movement.
He said that the hartal would be observed throughout Bangla Desh everyday from 6 a.m. to 2 p.m. After the hartal the vehicles should be allowed to move. He suggested and urged the people to pay a bit more to the rickshaw pullers to cover their day's earnings.

He will address a mass rally at the Race Course Maidan at 2 p.m, on Sunday. He said that hartal was to be observed in all organisations, including Government offices, secretariat, High Court and other courts, semi-Government and autonomous corporations, PIA, Railway and other communication services, trans¬ports, all mills, factories, industrial and commercial establishments and markets.

He said that the forces were being maintained for protecting the country, and they could not be used against the common masses. Sheikh Sahib urged the authorities to pull back the forces to their barracks without further delay.

Sheikh Mujibur Rahman said that he had no language to condemn the incidents that took place in the city last night.

Sheikh Sahib made it clear that the present situation in the country was not the creation of his or any other people of Bangla Desh, but of the conspirators who had been trying to sabotage the peaceful transfer of power to the elected representatives of the people. The majority party had been even ignored while taking important national decisions, he said.

Sheikh Sahib advised each and every person of Bangla Desh to observe the hartal according to schedule in a peaceful and disciplined manner.

He, however, said that exemptions were to be extended only to ambulances, Press cars, hospitals, medicine shops, water and electricity supply.

Sheikh Sahib said that the speech at Paltan Maidan today might be his " last speech " and advised the people to continue their struggle in full swing even if he was absent. He said that there were a chain of leaders, among his companions who would be able to continue the struggle without any trouble.

The Sheikh who was earlier scheduled to lead a huge procession after the meeting, announced that the procession would not be led. Instead he led a prayer for the salvation of the departed souls of the martyrs who had, he maintained, died in the struggle for democracy.

Other speakers at the meeting called upon the people to maintain peace and harmony among the people, and desist from looting and other anti-social activities.

They declared in unequivocal terms that the people of Bangla Desh could not be suppressed any more and they must achieve their goal at any cost.

The meeting in a resolution condemned the firings in different parts of the city during the last two days and prayed for the salvation of the departed souls. It expressed its,deep sympathy with the members of the bereaved families.

In another resolution, the meeting called upon the people from all walks of life to take active part in the movement for the realisation of the people's rights under the dynamic leadership of Sheikh Mujibur Rahman.

The meeting took a fresh vow for the establishment of a society in Bangla Desh. where there would be no exploitation and people would live in peace.

Sheikh Mujib gave call for " peaceful satyagraha " movement for the realisation of the rights of the people of Bangla Desh and appealed to the people to main¬tain peace for the success of the struggle.

Sheikh Mujib also appealed to the people to guard against looting and arsor, and to maintain peace at all costs. Any attempt to disrupt peaceful life must be resisted, because without strict discipline no mass movement could attain any success

Sheikh Mujib appealed for communal peace and added the Biharis non-Muslims "are our sacred trust".

He referred to the sacrifice of lives by Bengalis during the last 23 years and during yesterday's observance of hartal in the City.

He said " I do not know how many people died yesterday," adding that he himself heard the firing of machine-gun. He also led the prayer at the meeting for those who died. The dead bodies of a few persons, who died yesterday, were also brought to the public meeting.

Sheikh Mujib said he wanted to spell out the future course of action, and added if the attitude of the Government remained unchanged till March 7 he would give out his mind at the race course, where he is scheduled to address a public meeting. He said if he failed to turn up for any unforeseen reasons, there would be others to announce the future course of action.

He said the maintenance of discipline was the prerequisite for the success of any mass movement. Without discipline no movement could achieve any tangible results " no matter how many lives we sacrifice." He particularly reminded the volunteers of their responsibilities in this connection.

Sheikh Mujib said " we are not responsible for the present state of affairs". He said they as the majority party in the country were in favour of the National Assembly session on February 15, but Mr. Z. A. Bhutto wanted it to be deferred to the first week of March, and when it was summoned to meet today he (Bhutto) oppose it again.

The Awami League Chief regretted the stand taken by the People's Party chief on the session of the National Assembly, which was to begin today, and added although they " were ready to attend the session the use of arms was " directed at the Bengalis. He also referred to threats of PPP chief to set afire West Pakistan if the session was not postponed.

Sheikh Mujib, in an apparent reference to West Pakistan leaders, said " If you do not want to frame one constitution let us frame our own constitution and you frame your own. Then let us see if we can live together as brothers."

The Awami League Chief said the people of Bangla Desh freed him from jail at the cost of their lives and shed their blood in the last. "We are ready to make further sacrifices and give more blood." He added: " You cannot suppress the Bengalis by killing 70,000,000 Bengalis."

Sheikh Mujib said if he died his soul would be there to be happy to find the Bengalis free and that they have two square meals a day to survive.

Sheikh Mujib said he did not have any grudge against the poor people of West Pakistan. They had been trying to live together for the last 23 years but West Pakistan now wanted to secede because they knew it well by now that they could not perpetuate their exploitation on them.

The Awami League leader also called upon the Press not to obey any restric¬tion on them. if an}, and if they failed to resist it they should refuse to attend their offices. He told the Press that •` it is a national struggle ". and everyone's participation is essential.

(THE DAWN, Karachi-March 4,1971)

Source: Bangladesh Documents, vol-1, page no. 195-197


অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও। ভাষণে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে অসহযোগ চালিয়ে যাওয়ার আহবান জানান। বলেন, বিশৃঙ্খল আন্দোলনে মরতেই হবে শুধু, দাবি আদায় করা যাবে না।গত কদিন ধরে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও অরাজকতায় জড়িতদের যে কোনো মূল্য প্রতিরোধের আহবান জানিয়ে মুজিব ৭ মার্চ রমনা রেসকোর্সে চূড়ান্ত কর্মসূচী ঘোষণা করবেন বলে জানান। তার আগে ইয়াহিয়া খান বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ১২ জন নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে ১০ মার্চ ঢাকায় এক আলোচনাসভার যে প্রস্তাব দেন তা প্রত্যাখান করেন মুজিব, বলেন শহীদদের রক্তের উপর দিয়ে কোনো আলোচনা হতে পারে না। হয় বাঙালীদের গুলি করা বন্ধ করতে হবে, নয়তো সাড়ে সাত কোটি বাঙালীকে তাদের মতো থাকতে দিতে হবে।

MUJIB REJECTS INVITATION

DACCA, March 3 : Sheikh Mujibur Rahman, President of the Awami League, rejected tonight the invitation of President Yahya Khan to attend the proposed meeting of the leaders of all the parliamentary groups in the National Assembly on March 10 in Dacca to solve the constitutional tangle.

Following is the full text of the statement.

" The radio announcement of the proposed invitation to the political leaders to sit with the President of Pakistan in conference in Dacca on March 10, coming as it does in the wake of widespread killing of the unarmed civilian population in Dacca, Chittagong and other places in Bangla Desh, while the blood of the martyrs on the streets is hardly dry, while some of the dead are still lying unburied and hundreds are fighting death in hospital comes as a cruel joke. This is more so since we are being called upon to sit with certain elements whose devious machinations are responsible for the death of innocent and unarmed peasants, workers and students.

" With the military build-up continuing with harsh language of weapons still ringing in our ears the invitation to such a conference is in effect being made at gun point.

" Under these circumstances, the question of accepting such invitations does not arise. I, therefore, reject such an invitation."


(THE DAWN, Karachi-March 4, 1971)

Source: Bangladesh Documents, vol – 1, page no. 197-198



এদিন টানা দ্বিতীয়দিনের মতো কারফিউ ভেঙ্গে রাস্তায় নামে জঙ্গী জনতা। সুবাদেই চলে গুলি। শুরুতেই উল্লিখিত ফারুক ছাড়াও ঢাকায় এদিন আরো মারা যান হানিফ, আবদুল হক, হুমায়ুন ও আবদুর রশীদ। এছাড়া নিহত আরো ১১ জনের লাশের পরিচয় পাওয়া যায়নি। গুলিবিদ্ধ হয়ে ৭০ জন আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হন। সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু তাদের দেখতে যান, সঙ্গী ছিলেন তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার আমির হোসেন ও গাজী গোলাম মোস্তফা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২৮ জন শিক্ষক এক যৌথ বিবৃতিতে দেশকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দেওয়ার ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে দেশবাসীর প্রতি আহবান জানান। এদিন শহীদ মিনারে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বে এক সমাবেশ আয়োজন করেন তারা। করাচিতে আয়োজিত এক নাগরিক সমাবেশে শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে প্রধানমন্ত্রীত্ব তুলে দেওয়ার আহবান জানানো হয়। এদিন পূর্ব পাকিস্তান জামাতে ইসলামীর আমির গোলাম আযম এক বিবৃতিতে অচলাবস্ধা নিরসনের জন্য নির্বাচিত গনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহবান জানায়। মর্নিং নিউজের ভাষ্যটি এরকম: Ghulam Azam yesterday appealed to authorities to transfer power to the elected representatives immediately. In a press statement issued in Dacca the provincial Jamaat chief said if the beloved country is to be saved from further catastrophe transfer of power must precede framing of the constitution let the representatives rule the country and framed constitution. The present situation of certainty must not be allowed to continue even for a single day.

ঢাকা, রংপুর, সিলেট, খূলনা ও দৌলতপুরে এদিন থেকে কারফিউর সময় বাড়ানো হয়। চট্রগ্রামে এদিন ৬০ জন নিহত হয়েছেন বলে খবর আসে পত্রিকায়।

(তথ্যসূত্র: ১৯৭১ সালের বিভিন্ন পত্রিকা ও বার্তাসংস্থা থেকে। )
____
http://www.amarblog.com/omipial/posts/144503


Name:  বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:14 Dec 2012 -- 05:16 PM

স্যালুট জাঁ ক্যুয়ে!
লিখেছেনঃ অমি রহমান পিয়াল (তারিখঃ শুক্রবার, ২৫/১১/২০১১ - ০৭:৫৮)
____________________________________________________

৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ । ভারত আক্রমণ করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে তুমুল গতি দেয় পাকিস্তান। আর ১৩ দিন পরই মিত্রবাহিনীর হাতে ঢাকার পতন, স্বাধীন হয়ে যায় বাংলাদেশ। একই দিন আরেকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। প্যারিসের অর্লি বিমানবন্দরে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের একটি বোয়িংয়ের নিয়ন্ত্রণ নেন জাঁ ক্যুয়ে নামে এক ফরাসি যুবক। না, টাকা-পয়সা কিছু দাবি করেননি। অবিলম্বে ২০ টন মেডিকেল সামগ্রী ও রিলিফ প্লেনটিতে তোলা না হলে এটি বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন তিনি। আর সেগুলোর গন্তব্য হবে পূর্ব পাকিস্তান। স্বাধীনতার জন্য লড়তে থাকা বাংলাদেশে।




[ ফুটেজের ধারাবর্ণনার ইংরেজী অনুবাদ:

"This young 28 year old boy has spent the night in jail. He is called Jean Quai and is an old OAS who has fought then in Biafra and in Yemen and he wanted to be an help to bengali refugees. That is the reason why yesterday, during 8 hours, he has immobilized a pakistani Boeing. I figure out that some among you have followed this lets call it extraordinary, suspense the whole afternoon, due to the direct cameras of Jean Claude Ditierre et d'Armand Vande, and, i must add it was itself an event, because for the first time, the television did present directly an event in a continue way, same as till now the radio channels.

Anyway, to come back to this very surprizing adventure of yesterday, Hervé Chabalier has remade the film of what occured yesterday afternoon. It was at the time 17h05, moment where Chabalier will begin his story, and it had been 6 hours while the Boeing 720 had been immobilized in Orly airport. Since 11h50, the young air terrorist threatened the cockpit pilot with his weapon, a gun. He is eager to 20 metric ton of medicine, for the bengali population, or else he "is to be blast the whole plane". 17h15 the french authorities accept the conditions of Janquet, the first medicines have already landed in Orly airport, the terrorist accept than 8 passengers, a child among them, leave the plane.

These passengers, that you can see now, will be directly transported to Paris : the journalists won't be able to reach them. On the runway, the loading of medicine begins. Anti ear infection, powder milk essentialy. 19 hour a second truck full of medicine park near the plane. But this time, the warehousmen are disguised cops. This man who dirigate the conductor of the truck, on the right of your screen, will arrest in a few time the air pirat. Ideed the disguised policemen transport into the cockpit boxes of penicillin and take advantage of a moment of unawareness of the air pilot in order to belt him and master him.

The last passengers leave the plane, go down the gangway steps hurriedly, Janquet is carried in ambulance till Orly's police office, where he is given a first questioning. The crew go back to the air terminal, few minutes later there are the very first testimonies of passengers and policemen in front of the information cameras (Mr Peyresaube):"The young man, who looked about 24 years old, has given to the hostess, stewards and us the right to take some dinner" (Journalist):" And what was his behaviour toward you, has he diriged his gun toward you?" "Absolutely not, he was excessively full of amability, very nice" (Journalist)"Did he spoke to you?" (Mr Peyresaubes)"Oh yes he did, yes yes" (Journalist):"What did he said to you? (Mr Peyresaubes): "He said to us it was to give medicine, that we shouldnt be worried, and he has placed in the back of the plane a little girl with her mother, and then we when met the people who were carrying medicine, he has allowed to leave the old men,

" (Antoine Siblo, police officer): "We have taken advantage of an inattention moment of the boy, and because I was the closest from him, we reached him in hurry, he was surprized naturally (Jounalist)"I already know" (Antoine Siblo)"And in a reflex he pointed out his gun, myself to avoid the shoot i left in a hurry, and the bullet reached the pullover and the blazer made in setton" (Jounalist):"You were dressed up like bagagists, does the crew thought once that you all were policemen?" (Antoine Siblo):"No, I don't think so, at no time" (Journalist):"What concerns the medicins, they were instantanely carried out of the plane, and transported to Paris, but in fact it is only a transit." (Marquis (aristocrat title)of Agosti from the Malta order) " These medicine were all on the order of Malta, they are all here, and we will..."

(Journalist)"What will you do of these, now" (D'Agoste)" We will, well we will carried them out to the order of Malta order, and make them land to Pakistan too, because they were themselves supposed to reach Pakistan ! ".


সৌজন্য: তানভীর অর্ণব করিমের এক ফরাসি বান্ধবী]


ঘটনাটা যখন ঘটছে পশ্চিম জার্মানির ভাইস চ্যান্সেলর উইলি ব্র্যান্ডট ফ্রান্স সফরে এসে পৌছেছেন মাত্র প্রেসিডেন্ট পম্পেদ্যুর সঙ্গে বৈঠক করতে। ক্যুয়ের দাবি মেনে বিমানে রিলিফ সামগ্রী তোলা হয়। রেডক্রস ও বিমানবন্দর কর্মীদের ছদ্মবেশে পুলিশ অবশেষে তাকে গ্রেফতার করে। শেষ হয় প্রায় পাঁচ ঘন্টার এই ছিনতাই অধ্যায়। ওষুধ এবং রিলিফ সামগ্রী অবশ্য পূর্ব পাকিস্তানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় ফ্রান্স এবং সেটার দায়িত্ব দেওয়া হয় অদ্রে দা মাল্তে (Ordere de Malte) নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের ঘটনায় তা গুরুত্ব হারায় এবং চাপা পড়ে যায়। একইদিন অবশ্য এনবিসি আর এবিসি টিভিতে ঘটনাটি প্রচার করা হয়। তাদের ফুটেজ পাইনি। তবে নিউজ জিস্ট পাওয়া গেছে, তুলে দিলাম:


Headline: Pakistan / Paris Hijack
Abstract: (Studio) Hijacker seeks medical aid for E. Pakistan refugees from Paris.
REPORTER: Walter Cronkite
(Paris, France) Frenchman Jean Quai attempts hijack for Bangladesh cause. West German Chancellor Willy Brandt arrives at Orly airport for talks with French President Pompidou during hijack incident. Police dressed as Red Cross and airport workers take hijacker. Med. supplies still to go to Bangladesh.
REPORTER: Ed Bradley (ORTF newsfilm)
Broadcast Type: Evening News Segment Type: News Content


NBC Evening News for Friday, Dec 03, 1971
Headline: Pakistan / Paris Hijacking
Abstract: (Studio) Hijacking in name of E. Pakistan attempted at Orly Airport.
REPORTER: John Chancellor
(Paris, France) Pakistani International Airways jet threatened by bomb unless 20 tons medical supplies loaded for Bengali refugees. Police disguised as stevedores capture hijacker.
REPORTER: Aline Saarinen
Broadcast Type: Evening News Segment Type: News



Headline: Hijacking / Pakistan Relief
Abstract: (Studio) Jet liner captured by hijacker at Paris airport. Med. supplies
for E. Pakistan demanded.
REPORTER: Harry Reasoner
(Paris, France) Pakistan International Airlines plane delayed 5 hrs. by hijacker while tons of medical supplies loaded. Police in stevedore disguise capture hijacker Jean Quai. Med. goes on to E. Pakistan. Agencies providing medical supplies to send it to E. Pakistan voluntarily.
REPORTER: John Rolfson




CBS Evening News for Friday, Dec 03, 1971
Headline: Pakistan / Paris Hijack
Abstract: (Studio) Hijacker seeks medical aid for E. Pakistan refugees from
Paris.
REPORTER: Walter Cronkite
(Paris, France) Frenchman Jean Quai attempts hijack for Bangladesh cause. West German Chancellor Willy Brandt arrives at Orly airport for talks with French President Pompidou during hijack incident. Police dressed as Red Cross and airport workers take hijacker. Med. supplies still to go to Bangladesh.
REPORTER: Ed Bradley (ORTF newsfilm)




এই ঘটনার কয়েকদিন আগে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমন গড়তে এক বিশ্বসফরে বের হন। তিনি ফ্রান্সে যাওয়ার পর বিখ্যাত ফরাসি সাহিত্যিক আন্দ্রে মারলোও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অস্ত্র ধরার ইচ্ছে জানিয়ে বিবৃতি দেন:








জাঁ ক্যুয়ে আপডেট ব্লগার বেলের কাঁটার সৌজন্যে:


এইখানের খবরটা ছিল-
Captured Man Sought Help For Refugees- PARIS (AP) —

Disguised as mechanics and Red Cross workers, police Friday night overcame a hijacker who bargained for the live* of 28 persons in a Pakistani jetliner against 20 tons of medicine he demanded for Pakistan refugees. The hijacker, a 28-year-old French electronics technician identified as Jean Kay, fired a single shot as the police rushed him six hours after he took over the Pakistan International Airlines 720B at Orly Airport. The bomb with which he threatened to destroy the plane turned out to be a harmless box filled with electrical wires. Kay was seized after more than a ton of the medicine he demanded had been loaded into the plane, parked on the brightly lit apron of Orly's main runway. It was virtually at live same hour that India was
charging Pakistan with having launched a full-scale war over the Bengali issue.
The French Red Cross and the Order of the Knights Hospitaliers of Malta,, who collected the medicines, announced that the whole 20 tons would be sent to the Bengali refugees "but by another route and other means." Police described Kay's capture this way: While four policemen wearing Red Cross armbands loaded medicine at the rear of the aircraft, two others dressed as mechanics entered the cockpit through a small trapdoor. As the", four' at the rear pounced on Kay, he fired his 9mm pistol once, hitting a policeman's hand. Andre Peyresaubes, a French
travel agent who had boarded :he jet for its 1150 a.m. takeoff ror Karachi, said:
"We had just left the boarding area when the hijacker went Into the cockpit and ordered the pilot to cut his en- Bines. He threatened him with his gun. The Pakistani passengers seemed terrified because he said he was going to let everybody except them off in Belrut before heading for India. "The crew kept cairn throughout. The pirate recruit ed an interpreter among the passengers because the pilot spoke English. He was courteous and friendly and he let the passengers eat and move aboui pretty much as they wanted


এই লিঙ্ক থেকে




আর উইকিতে এটা পাওয়া গেছে। ট্রান্সলেট পেজের লিঙ্ক

জাঁ ক্যুয়ের ছবি


এখানে হাইজ্যাক সম্পর্কে লেখা হয়েছে:
In 1971 , John Kay is in Paris where he probably ended his book The Weapon in the heart, in his studio's 15th arrondissement , near the home of his father, Colonel in retirement . One of his idols, Andre Malraux , when he is 70 years old, was ready to fight for freedom from the so-called Bengal at the time, or " Pakistan Eastern ". To defend the oppressed people seeking to split Pakistan , the "country enraged by his independence," the former minister addresses a "Letter to President Nixon" in the newspaper " Le Figaro "of December 17 (page 1 and 3) and says he wants it from itself. He finally gives up, but not John Kay: 3 December 1971 , the mercenary takes hostage the passengers and crew of an aircraft , flight 711 of the Pakistan International Airlines at Orly , demanding drugs for Bangladesh in threatening them with a gun and a bomb, contained in a bag from which issue the son electrical firing. He was arrested a few hours, when the alleged shipment of drugs, a police decoy to board, not without having shot one of his assailants. The bag was filled as the pirate of books, a bible and an electric razor from which came the famous son, who simulated a bomb.


এ ব্যাপারে ব্লগার কাউসার রুশোর পোস্ট থেকে খানিকটা তথ্য সংযুক্তি:

বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে বহু ধরনের মানুষ বিচিত্র ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং তাঁদের একজন ছিলেন জঁ ইউজিন পল কে। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় এই ফরাসি লেখক জীবনে বিবিধ অভিজ্ঞতার অধিকারী হয়েছিলেন, চিন্তা-চেতনার দিক দিয়েও ছিলেন বিচিত্রমুখী। গোড়াতে তিনি ছিলেন ফরাসি সেনাবাহিনীর সদস্য, তারপর সেনাবাহিনী ত্যাগ করে যোগ দেন কুখ্যাত ওএএসে; যে গোপন বাহিনী মনে করত আলজেরিয়া হচ্ছে ফ্রান্সের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা কখনো হাতছাড়া হতে দেওয়া যায় না। আঁদ্রে মালরোর রচনা পড়ে বোধোদয় হয় পল কের। তিনি ওএএস ত্যাগ করে হয়ে ওঠেন বিশ্বপথিক। তবে পুরোনো মতাদর্শের জের একেবারে কাটিয়ে উঠতে পারেন না। স্পেন, লিবিয়া ও বায়াফ্রায় বিভিন্ন দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে ভিড়ে যান।

একাত্তর সালে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের বার্তা তাঁকে আলোড়িত করেছিল। এরপর আঁদ্রে মালরো যখন বাংলাদেশের পক্ষে লড়বার ব্রত ঘোষণা করেন, তখন গুরুবাক্যে বিশেষ অনুপ্রাণিত বোধ করেন পল কে। ৩ ডিসেম্বর তিনি প্যারিসের অরলি বিমানবন্দরে ব্যাগে বোমা নিয়ে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৭১১ বিমানটি দখল করতে সমর্থ হন। তাঁর ব্যাগ থেকে বের হয়ে আসা বৈদ্যুতিক তার জানান দিয়েছিল ভেতরে বহন করা বোমার। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামীদের জন্য জরুরি ওষুধ বহন করে নিয়ে যাওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। কয়েক ঘণ্টা পর ওষুধের কার্টন বোঝাই করবার অজুহাতে পুলিশ বিমানে ঢুকে তাঁকে পরাভূত করতে সমর্থ হয়। ব্যাগ খুলে দেখা যায় সেখানে রয়েছে কতক বই, এক কপি বাইবেল এবং একটি ইলেকট্রিক শেভার।

এই ঘটনার পরপরই উপমহাদেশে শুরু হয়েছিল সর্বাত্মক যুদ্ধ। সেই ডামাডোলে হারিয়ে গেল পল কে-র ঘটনা। অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে আনা মামলা চলেছিল বেশ কিছুকাল। আদালতে অভিযুক্তের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন আঁদ্রে মালরো স্বয়ং। অভিযোগ থেকে খালাস পাওয়া পল কে আবারও ঘুরে ফিরেছেন অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে। ১৯৮১ সালে তাঁকে দেখা গিয়েছিল হিমালয় এলাকায় তপস্যারত, এরপর কিছুকাল ছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়, পরে আবারও তাঁকে দেখা গেল কলকাতায়, সেখানে জননিরাপত্তা ভঙ্গের অভিযোগে কিছুদিন কাটান কারাগারে। ভারত থেকে বহিষ্কৃত হয়ে ১৯৮৫ সালে তিনি যান ওয়েস্ট ইন্ডিজে। এরপর তাঁর আর খোঁজ মেলেনি।


প্রীতমের সংযুক্তি:

দ্য টেররিস্ট লিস্ট নামে এই বইয়ে ক্যুয়ের নাম দেখা গেল।লেখকদ্বয় এডোয়ার্ড এফ মিকোলাস এবং সুসান সিমন্স।শাস্তি হিসেবে পাঁচ বছরের জেল হয়েছিল ক্যুয়ের।



উইকির লিঙ্কে একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার দেখলাম,বিচারকালীন সময়ে আঁদ্রে মালরো ক্যুয়ের পক্ষ্যে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।

André Malraux , the great defender of Bangladesh emerging, will testify on his behalf in his trial in October 1973 [11] . Il est condamné à 5 ans de prison avec sursis; il est donc libéré. He was sentenced to five years suspended sentence, so it is released. Son avocat était Jean-Marc Varaut. His lawyer was Jean-Marc Varaut



সংযুক্তি: ৭ আগস্ট '৭১ বাংলাদেশ সংগ্রামী বুদ্ধিজীবি পরিষদের প্রধান জহির রায়হানকে নীচের চিঠিটি লেখেন মালরো:



জানিনা সুশীল সমাজ নিয়ে এটা আবার ছিঃ ছিঃ করবে কিনা! বিমান ছিনতাইয়ের মতো ভীষণরকম দন্ডনীয় অপরাধমূলক কার্যক্রম আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে আবার কলঙ্কিত করছি না তো একে! শালারা....।
স্যালূট জাঁ ক্যুয়ে।



পাদটীকা : এনবিসি/এবিসির ফুটেজ খুজেছি, পাইনি। এটি ফরাসি একটি টিভির আর্কাইভ থেকে জোগাড় করেছি। আধঘণ্টার ফুটেজ থেকে এই অংশটুকু কমনসেন্স খাটিয়ে আলাদা করা। ফরাসি জানা কেউ অনুবাদ করে দিলে ভীষণ কৃতজ্ঞ থাকবো।
__________
http://www.amarblog.com/omipial/posts/140162


Name:  বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:14 Dec 2012 -- 05:19 PM

গোলাম নামা: আত্মপক্ষ সমর্থনের নামে ব্যাপক মিথ্যাচার ১
লিখেছেনঃ অমি রহমান পিয়াল (তারিখঃ বুধবার, ১৮/০১/২০১২ - ০৯:০০)
_________________________________________________________
[গত বছর ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবি হত্যা দিবসে গোলাম আযমের একটি সাক্ষাতকার প্রচারিত হয় বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে। মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে জামাতে ইসলামীর এই সাবেক আমিরের মিথ্যাচার নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এই লেখাটিতে হাত দিয়েছিলাম। কিন্তু বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও এটি পোস্ট করতে পারছিলাম না কয়েকটা কারণে। এক লেখাটা একটা দলিলভিত্তিক রূপ দেয়ার তাগিদ থেকে বারবার সংশোধন করছিলাম, দ্বিতীয় কারণটি ব্যক্তিগত ঝামেলা। বিশ্বস্ত কিছু মানুষের প্রতিশ্রুতি এবং সেটা না পূরণে যে ঝামেলা কারো জীবনে ওলটপালট হয়ে যেতে পারে এটা তারা কখনও বোঝেন না, কিংবা বোঝার চেষ্টা করেন না। যাহোক পরিস্থিতি যদি লেখালেখি বন্ধ রাখতে বাধ্য করে, সে ঝুঁকিতে যাওয়ার আগে পোস্টটা দিলাম।]

গোলাম আযমের ওই বিবৃতিমূলক সাক্ষাতকারের দুটো ভাগ আছে। প্রথমটি কূটিল এক রাজনৈতিক বিশ্লেষণে নিজের মুক্তিযুদ্ধকালীন অবস্থানকে জায়েজ করা। দ্বিতীয়টি মুক্তিযুদ্ধকালে তার অবস্থান কি ছিলো তার সাফাই। এই পোস্টে ওই দ্বিতীয় অংশটিকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। প্রথম অংশটি নিয়ে লিখলে তার দৈর্ঘ্য আরেকটি পোস্টের সমান হবে। সে দায়িত্ব না এড়িয়েই শুধু বলা যায় সেখানেও প্রচুর মিথ্যাচার। যার জবাবও দেওয়া হবে, প্রয়োজনে এই পোস্টের মন্তব্যেও দাখিল করা যাবে। এখানে সাক্ষাতকারের টেক্সট ব্যবহার করে তার উত্তরে প্রমাণ দাখিল করা হয়েছে যে গোলাম মিথ্যা বলেছে।

সাংবাদিকঃ আমরা তো জানি ১৯৯২ সালে গণ আদালত হয়েছিল, ১৯৯৪ সালে গণতদন্ত কমিশন হয়েছিল, সেই সময়টা তো আসছিল।
গোলাম আযমঃ এইটা একটা সেকশন করেছিল কিন্তু যুদ্ধাপরাধী শব্দ ব্যবহার করে নাই।

সাংবাদিকঃ প্রতীকি বিচার হয়েছিল।

সাংবাদিকঃ এবং আপনার বিরুদ্ধে ১৯৯২ সালের ২৬শে মার্চ সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে..

গোলাম আযমঃ যে ঘাতক নিমূর্ল কমিটি, জামায়াতে ইসলামীকে ঘাতক গালি দিয়েছে, কিন্তু যুদ্ধাপরাধী ইস্যু সামনে আনে নাই। রাজাকার বলে গালি দিয়ে কোন সময়, স্বাধীনতা বিরোধী বলেছে।

সাংবাদিকঃ এখন স্যার বিচারটা হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার। মানবতার বিরুদ্ধে যে কাজগুলি হয়েছে সেগুলির বিচার।

গোলাম আযমঃ হ্যা ঐটাই, মানবতাবিরোধী কাজটাকেই তো তারা যুদ্ধাপরাধ বলছে। দুইটা পরিভাষা তারা ব্যবহার করছে, আর ঐ আইনেই বিচার করছে যেটা যু্দ্ধাপরাধীদের জন্য করা হয়েছিল।




এগুলোর প্রমাণে ওপরের ছবিটিই যথেষ্ট,’৯৪সালে গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্ট হাতে জাহানারা ইমাম ও বেগম সুফিয়া কামাল। সেটার প্রচ্ছদেই স্পষ্ট লেখা যুদ্ধাপরাধী কথাটা। আর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি শুরু থেকেই আন্দোলন করে আসছে ’৭৩ সালের স্পেশাল ট্রাইবুনাল অ্যাক্ট দিয়ে এদেশীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে। তালিকায় শীর্ষ নামটি গোলাম আযমের। আর মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ নিয়ে গোলাম ও তার দল জামাতে ইসলামী যতই ঘোট পাকানোর চেষ্টা করুক। দুটো একই জিনিস। যুদ্ধাপরাধের মধ্যেই রয়েছে হত্যা, ধর্ষন, উচ্ছেদ ইত্যাদি মানবতাবিরোধী অপরাধ। এখানে ভিকটিমরা সশস্ত্র বা সামরিক বাহিনীর সদস্য নয়, বেসামরিক লোকজন যারা যুদ্ধের পক্ষ নয় কিন্তু যুদ্ধকালে হিংস্রতার শিকার। একইভাবে যুদ্ধাপরাধীদের মধ্যেই রয়েছে ঘাতক ও দালালের সংজ্ঞাও । দালাল তারাই যারা মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সব ধরণের সহায়তা করেছে রাজনৈতিক ও সামাজিক সমর্থনের মাধ্যমে। ঘাতক তারাই যারা পাকিস্তানীদের সঙ্গে কাধে কাধ মিলিয়ে হত্যা-ধর্ষণ ও লুন্ঠনে মেতেছে। তাই গোলাম ও তার দলকে ঘাতক বলা হয়েছে দালাল বলা হয়েছে, যুদ্ধাপরাধী বলা হয়নি এটা হচ্ছে মূর্খের দাবি, যা অল্পশিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিতদের কনভিন্স করবে। অবশ্য জামাত বরাবরই এদেশে শিক্ষায় অনগ্রসর অংশটাকে পুজি করে যা তা বুঝিয়ে ফায়দা লুটেছে। সময় এসেছে সেই মিথ্যাচারের মুখোশ খোলার।



১৯৭৩ সালে যে আইনটি করা হয়েছিলো সেটা পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধী ও তাদের এদেশীয় দালাল দুইপক্ষের কথা মাথায় রেখেই করা হয়েছিলো। এর আগে ’৭২ সালের দালাল আইনে যে বিচার চলছিলো তা ছিলো এদেশীয় আইন।এই বিচারকে আন্তর্জাতিক রূপ দিতেই স্পেশাল ট্রাইবুনাল এক্ট করা হয়। সেই আইনের শুরুতেই স্পষ্ট করে লেখা আছে:

ACT NO XIX OF 1973*

An Act to provide for the detention, prosecution and punishment of persons for genocide, crimes against humanity, war crimes and other crimes under international law

(Published in the Bangladesh Gazette, Extra., on July 20, 1973)

Whereas It is expedient to provide for the detention, prosecution and punishment of persons for genocide, crimes against humanity, war crimes and other crimes under international law and for matters connected therewith;
It is hereby enacted as follows :
1. Short title, extent and commencement.

(1) This Act may be called the International Crimes (Tribunals) Act 1973.
(2) It extends to the whole of Bangladesh.
(3) It shall come into force at once.

2. Definitions.
In this Act, unless there is anything repugnant in the subject or context.-
(a) 'auxiliary forces' includes forces placed under the control of the Armed Forces for operational, administrative, static and other purposes;
(b) 'Government' means the Government of the People's Republic of Bangladesh;
(c) 'Republic' means the People's Republic of Bangladesh;
(d) 'service law' means the Army Act, 1952 (XXXIX of 1952), the Air Force Act, 1953 (VI of 1953) or the Navy Ordinance, 1961 (XXXV of 1961) and includes the rules and regulations under any of them;
(e) 'territory of Bangladesh' means the territory of the Republic as defined in article 2 of the Constitution of the People's Republic Of Bangladesh;
(f) 'Tribunal' means a Tribunal set up under this act.


3.Jurisdiction of Tribunal and crimes.

(1) A tribunal shall have the power to try and punish a person irrespective of his nationality who, being a member of any armed, defence or auxiliary force, commits or has committed in the territory of Bangladesh, whether before or after the commencement of this Act, any of the following crimes.

(2) The following acts or any of them are crimes within the jurisdiction of a Tribunal for which there shall be individual responsibility, namely : -

(a) Crimes against Humanity : namely murder, extermination, enslavement, deportation, imprisonment, abduction, confinement, torture, rape or other inhumane acts committed against any civilian population or prosecution on political, racial, ethnic or religious ground whether or not in violation of the domestic law of the country where perpetrated;

(b) Crimes against Peace : namely planning, preparation, initiation or waging of a war of aggression or a war of violation of international treaties, agreements or assurances;

(c) Genocide : meaning and including any of the following acts committed with intent to destroy in whole or in part, a national ethnic, racial, religious or political group, such as :

(i) killing members of the group;
(ii) causing serious bodily or mental harm to members of the group;
(iii) deliberately inflicting on the group conditions of life calculated to bring about its physical destruction in Whole or in part;
(iv) imposing measures intended to prevent births within the group;
(v) forcibly transferring children of the group to another group;

(d) War Crimes : namely, violation of laws of customs of war which include but are limited to murder, ill treatment or deportation to slave labour or for any other purpose of civilian population in the territory of Bangladesh; murder, ill treatment of prisoners of war or persons on the seas, killing of hostages and detenues, plunder of public or private property, wanton destruction of cities, towns or villages or devastation justified by military necessity;

(e) violation fo any humanitarian rules applicable in armed conflicts laid down in the Geneva Conventions of 1949;

(f) any other crimes under international law;

(g) attempt abetment or conspiracy to commit any such crimes;
h. complicity in or failure to prevent commission of any such crimes.

4. Liability for Crimes.

(1) When any crime specified in section 3 is committed by several persons, each of such person is liable for that crime in the same manner as if it was done by him alone;

(2) Any Commander or superior officer who orders, permits, acquiesces or participates in the commission of any of the crimes specified in section 3 is connected with any plans or activities involving the commission of such crimes or who fails or omits to discharge his duty to maintain discipline or to control or supervise the actions of the persons under his command or his subordinates or any of them commit any such crimes or who fails to take necessary measures to prevent the commission of such crimes is guilty of such crimes.


আইনে স্পষ্ট করেই উল্লেখ হয়েছে সামরিক বাহিনী এবং তাদের সহযোগী বাহিনীর কথা। এখানে সামরিক বাহিনী মানে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। তাদের সহযোগী বাহিনী হচ্ছে রাজাকার (আল-শামস ও আল-বদর), মুজাহিদ, ইপিসিএএফ-এর মতো আধা-সামরিক বাহিনীগুলো। যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের স্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এই আইনে। সেইসঙ্গে চার নম্বর ধারায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে এসব অপরাধের দায়ভার কাদের ওপর বর্তাবে এবং গোলাম আযম সেই দায়েই অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের একজন হিসেবে।

প্রাসঙ্গিক লিংক, যা গোলামের প্রথমে বলা অভিযোগগুলোকেও খন্ডন করে:
১. যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবনা ও সম্পূরক আইনগুলো
২.যুদ্ধাপরাধীদের বিচার,বঙ্গবন্ধু সরকারের যাবতীয় সমস্যা নিয়ে ডেইলি স্টারের একটি আর্টিকেল
৩. যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাতিলের দাবিতে মাওলানা ভাসানীর অনশনের ওপর মার্কিন দূতাবাসের তারবার্তা
৪. সাধারণ ক্ষমার ওপর একটি প্রামাণ্য পোস্ট
৫.পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ওপর সে সময়কার কিছু পত্রিকার রিপোর্টগুলোর সংকলন
৬. সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর বাংলাদেশে তার প্রতিক্রিয়া নিয়ে মার্কিন দূতাবাসের তারবার্তা
৭. ৭৩ এর আইন নিয়ে একরামুল হক শামীমের একটি বিশ্লেষণ
৮. সিমলা চুক্তি, পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি ইত্যাদি নিয়ে ভারতীয়দের ভাষ্য

সাংবাদিকঃ এখন স্যার কালকে অভিযোগে আপনার বিরুদ্ধে ৫২টি অভিযোগ এনেছে এবং শতাধিক আপনার বিরুদ্ধে ঘটনার কথা বলেছে যে, সেগুলির ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কি?

গোলাম আযমঃ তো এগুলি, আমার বক্তব্য হলো যে, একটা অভিযোগ নয় সবগুলি অপবাদ, এলিগেশন। তো তারা এলিগেশন দিয়েছে, আমি কোর্টেও বলব, আমাকেতো কোর্টে হাজির করতে হবে, হাজির হতে হবে, আমি বলবো যে একটাও প্রমাণ করুক। আমি চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি, একটাও প্রমাণ করতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ। শুধু শুধু একটা অভিযোগের নামে অপবাদ যেতে পারে, প্রমাণ না দিতে পারলে এটার কি হবে? আমি নিশ্চিত যে প্রমাণ করতে পারবে না একটাও।



প্রাথমিকভাবে গোলামের বিরুদ্ধে ৫২টি অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছিলো। সেগুলো অগোছালো ও সুবিন্যস্ত নয় বলে আদালত তা ফেরত পাঠিয়েছিলো। দ্বিতীয় দফা তার বিরুদ্ধে ৬২টি অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহায়তা ও তাদের সঙ্গে চক্রান্তের ৬টি, তাদের সঙ্গে পরিকল্পনার ৩টি, উস্কানি দেয়ার ২৮টি, সম্পৃক্ততার ২৪টি এবং ব্যক্তিগতভাবে হত্যা ও নির্যাতনের একটি অভিযোগ রয়েছে। এখন তার দলের আরো অনেকের মতো গোলাম যদি মনে করে নিজের হাতে গুলি না চালালে কিংবা ধর্ষণে অংশ না নিলেই সে নিরপরাধ, তাহলে সেটা নিতান্তই দলীয় সমর্থকদের প্রবোধ দেওয়ার নিমিত্তে মিথ্যাচার।

গোলামের চ্যালেঞ্জটা সহজেই গ্রহণ করা যায়। কারণ আগেই বলেছি তার বিচার হচ্ছে ‘৭৩এর স্পেশাল ট্রাইবুনাল অ্যাক্টের ৪ নম্বর ধারায় উল্লিখিত দায়ভারের নিমিত্তে। এখন এখানে তাকে অভিযুক্ত করার জন্য নীচের কারণগুলোই যথেষ্ট:

১. গোলাম আযম ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান জামাতে ইসলামীর আমির ছিল। দলীয় প্রধান হিসেবে গোটা দেশে মুক্তিযুদ্ধকালে তার দলের যাবতীয় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ভার তার ওপর বর্তায়।
২. গোলাম আযম পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী শান্তি কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং শীর্ষ নেতাদের একজন ছিলো। শান্তি কমিটির নেতৃত্বে সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ভার তার ওপর বর্তায়।
৩. জামাতে ইসলামী পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর যাবতীয় তৎপরতাকে রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছিলো। এসব তৎপরতায় গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট এবং বাস্তভিটা থেকে উচ্ছেদের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ অন্তর্ভূক্ত। এসব অপরাধের সমর্থন গোলাম জামাতের দলীয় প্রধান হিসেবেই অনুমোদন করেছে।
৪. জামাতে ইসলামী রাজাকার বাহিনী এবং এর অধীনস্থ বিশেষ ঘাতক সংস্থা আল-বদর গঠন করে। এসব বাহিনী পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সহযোগী বাহিনী হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে অভিযুক্ত। যেহেতু শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমোদন ও আদেশক্রমেই রাজাকার এবং আল-বদর বাহিনীর সৃষ্টি, তাই তখনকার আমির গোলাম আযমকে সেই অনুমোদন ও আদেশের দায় নিতেই হবে। এখানে এটা উল্লেখ করা দরকার যে রাজাকার বাহিনীকে (আল-শামস ও আল-বদর) ব্যবহার করে জামাতে ইসলামী তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের নির্মূল এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ চালাচ্ছে এমন অভিযোগ তাদের সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোই সেসময় করেছিলো। গোলাম আযম ও তার দল এসব সমালোচনাকে ইসলাম ও পাকিস্তান বিরোধী বলে পাল্টা বিবৃতি দিয়ে নিজেদের কর্মকান্ডকে নায্য বলে দাবি করে।
৫.আল-বদর বাহিনী সুনির্দিষ্টভাবে গঠিত হয়েছিলো জামাতের ছাত্রসংগঠন পূর্ব পাকিস্তানী ইসলামী জামাতে তালাবা বা ইসলামী ছাত্র সংঘের (বর্তমানে ইসলামী ছাত্র শিবির)সদস্যদের নিয়ে। বিজয়ের আগে বুদ্ধিজীবি হত্যার জন্য এই আল-বদর সদস্যরা অভিযুক্ত। রাজাকার ও আল-বদর বাহিনীর প্রশিক্ষণ শিবিরগুলোতে গিয়ে তাদের উৎসাহ প্রদান এবং তাদের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করার দায়ে গোলাম অভিযুক্ত।


দেখা যাক এই অভিযোগগুলোর স্বপক্ষে কি কি প্রমাণ আছে আমাদের হাতে।

১. প্রসঙ্গ আমির হিসেবে দলীয় দায়:

১৯৭১ সালে প্রকাশিত যাবতীয় পত্র-পত্রিকায় গোলাম আযমকে পূর্ব পাকিস্তান জামাতে ইসলামীর আমির বলে সম্বোধন করা হয়েছে এবং সে ওই পদবীতেই যাবতীয় বক্তৃতা ও বিবৃতি দিয়েছে যার একটির ছবি নীচে দেওয়া হলো


জামাতে ইসলামী দলীয়ভাবে কি ধরণের মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে তার প্রমাণ হিসেবে তুলে দেওয়া যেতে পারে একটি ভিডিও ফাইল। ব্রিটেনভিত্তিক চ্যানেল ফোর প্রযোজিত ‘ওয়ার ক্রাইমস ফাইল’ নামের তথ্যচিত্রটি থেকে নেওয়া এই ফুটেজে সিলেটে জামাতের একটি জনসভার কর্মকান্ড এবং তারপর সংঘটিত একটি হত্যাকান্ডের বর্ণনা শোনা যাক প্রত্যক্ষদর্শীর মুখে। প্রসঙ্গত এ হত্যাকাণ্ড জামাত রাজাকার বা আলবদরের সামরিক লেবাসে ঘটায়নি:







২. প্রসঙ্গ শান্তি কমিটির নেতৃত্বের দায়:

১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল নুরুল আমিনের নেতৃত্বে খাজা খয়েরউদ্দিন এবং গোলাম আযমসহ ১২ জন রাজনৈতিক নেতা পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করে এবং সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক সমর্থন দেওয়ার আশ্বাস দেয় এবং এ জন্য ‘সর্বদলীয় নাগরিক কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দেয়। এ বিষয়ে ৫ এপ্রিল প্রকাশিত পূর্বদেশ পত্রিকায় লেখা হয় প্রতিনিধিদল টিক্কা খানকে ‘অবিলম্বে সমগ্র প্রদেশে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সামরিক আইন প্রশাসনকে সম্পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস এবং জনগণের মন থেকে ভিত্তিহীন ভয় দূর করার উদ্দেশ্যে ঢাকায় নাগরিক কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়।’ টিক্কা খান তাদের ‘শুধু বক্তৃতা বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের অখন্ডতা রক্ষায় ফলপ্রসু কাজ করতে নির্দেশ দেন।’ …‘বৈঠক শেষে নেতৃবৃন্দ রেডিওতে ভাষণ দিয়ে সামরিক কর্তৃপক্ষকে সহায়তার প্রতিজ্ঞা করেন’ সে প্রতিজ্ঞা পালন করেছিল গোলাম আযম।



টিক্কা চেয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের এসব মৌলবাদী দল একই প্লাটফর্মে থেকে সামরিক বাহিনীকে সার্বিক সহযোগিতা করবে। সেটা ধাক্কা খায় শান্তি কমিটির নেতৃত্ব নিয়ে জামাতের সঙ্গে নেজামে ইসলামী, মুসলিম লীগের তিনটি অংশ (কাউন্সিল, কাইয়ুম ও কনভেনশন) এবং পিডিপির সংঘাতে।বিশেষ করে মৌলভী ফরিদ আহমদ (নেজামে ইসলামী প্রধান) ও নুরুজ্জামান (পাকিস্তান পিপলস পার্টির পূর্ব পাকিস্তান প্রধান) জামাতের নেতৃত্বে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায়। এ কারণে ৬ এপ্রিল পাকিস্তান অবজারভার সম্পাদক হামিদুল হক চৌধুরীকে নিয়ে টিক্কা খানের সঙ্গে আবারও দেখা করে গোলাম আযম এবং আগের প্রস্তাবনাটি আরেকটু ঘষামাজা করে ‘নাগরিক শান্তি কমিটি’ গঠনের অনুমোদন চায়। মূলত হামিদুল হক চৌধুরীর মধ্যস্থতাতেই জামাতের সঙ্গে অন্য দলগুলোর মতপার্থক্য ভুলে রাজনৈতিক সমঝোতা হয় সর্বদলীয় শান্তি কমিটি গঠনে।



৯ এপ্রিল পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর হিসেবে শপথ নেয় টিক্কা খান। একই দিন খাজা খয়েরউদ্দিনকে আহবায়ক করে ১৪০ জন সদস্য নিয়ে ঢাকায় নাগরিক শান্তিকমিটি আত্মপ্রকাশ করে। এর সংগঠক হিসেবে নাম দেওয়া হয় তিনজনের: অধ্যাপক গোলাম আযম, এ.কিউ.এম শফিকুল ইসলাম এবং মওলানা সৈয়দ মাসুম। তবে পত্রিকায় এই খবর আসে ১১ এপ্রিল। কারণ গঠনের পরপরই এর নেতৃত্বে আবারও কোন্দল দেখা দেয়। ১০ তারিখ মৌলভী ফরিদ আহমদকে সভাপতি করে ৯ সদস্যের একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করে মূল শান্তি কমিটি থেকে বের হয়ে যায় এবং গঠন করে ‘পূর্ব পাকিস্তান শান্তি ও কল্যান কাউন্সিল’।



১৩ এপ্রিল বায়তুল মোকাররমে জোহারের নামাজের পর একটি মিছিল বের করে শান্তি কমিটি। ‘পাক-চীন জিন্দাবাদ, দুষ্কৃতিকারীরা দূর হও, মুসলিম জাহান এক হও, ভারতকে খতম করো’ ইত্যাদি ফেস্টুন নিয়ে মিছিলটি ঢাকার প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে নিউমার্কেটে শেষ হয়। মিছিল শেষে খাজা খয়েরউদ্দিন বক্তৃতা করে এবং মোনাজাত পরিচালনা করে গোলাম আযম। সমাবেশ শেষে মিছিলকারীরা আজিমপুর কলোনী, শান্তিনগর, শাখারি বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে বাঙালীদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন দেয় এবং অনেককে হত্যা করে রাস্তায় ফেলে রাখে।




১৪ এপ্রিল নাগরিক শান্তিকমিটির বৈঠক বসে। সেখানে নাম পরিবর্তন করে ‘পূর্ব পাকিস্তান কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি’ রাখা হয়। এর ফলে কমিটি সারা পূর্ব পাকিস্তানে তাদের শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ চালিয়ে যেতে পারবে বলে সভার প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়। প্রস্তাবে আরো বলা হয় প্রয়োজন অনুসারে কমিটি যে কোনো সময় সদস্য সংখ্যা বাড়াতে পারবে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা মহকুমা, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউনিট গঠন করে ‘মিশনের কাজ’ সাফল্যমন্ডিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভা যে কোন বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কার্যকর করার জন্য ২১ সদস্যের একটি ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করে যার অন্যতম সদস্য ছিল গোলাম আযম। বর্ষীয়ান খায়েরউদ্দিনকে সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করলেও জামাতে ইসলামীর হাতেই ছিলো এর নেতৃত্ব। যার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে শান্তি কমিটির কেন্দ্রীয় অফিসের ঠিকানা। মগবাজারের ৫ নং এলিফেন্ট লেনের সেই বাড়িটি এখন বাংলাদেশ জামাতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ১৬ এপ্রিল আবার টিক্কা খানের সঙ্গে বৈঠক করে নিজেদের কার্যক্রম শুরু করার কথা জানায় গোলাম আযমসহ শান্তি কমিটির শীর্ষ নেতৃত্ব।




প্রথমেই এটা জেনে নেওয়া যাক শান্তি কমিটি আসলে কতখানি শক্তিধর ছিলো যে তাদের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মতো একই যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করা যাবে! বিস্তারিত আখ্যানে যাওয়ার আগে সে সময়কার রাজনৈতিক প্রেক্ষিতটা আমলে আনা যাক। পূর্ব পাকিস্তান তখন সামরিক আইনের আওতায় চলছিলো এবং সামরিক বিধিবলে সব ধরণের মিটিং-মিছিল এবং বেসামরিক লোকজনের সশস্ত্র চলাফেরা নিষিদ্ধ ছিলো। তবে ইসলামী সমাবেশের ক্ষেত্রে এই আইন ছিলো শিথিল, শান্তি কমিটির ক্ষেত্রে পুরোপুরি ছাড় দেওয়া হয়েছিলো আইনটিতে। ১৫ জুন সামরিক অধ্যাদেশ নং-২১ জারি করে এলাকাভিত্তিক ও আঞ্চলিক সব স্থানীয় কমিটিকে বিলুপ্ত করার অধিকার আদায় করে টিক্কা খানের অধীনস্থ প্রশাসন। মহল্লার সর্দার প্রথা, ইউনিয়ন কমিশনার কিংবা চেয়ারম্যানদের ক্ষমতা বিলুপ্ত করে সে জায়গাটা এককভাবে দেওয়া হয় শান্তি কমিটিকে। তারাই সরাসরি সামরিক প্রশাসকের বেসামরিক প্রতিনিধির মর্যাদা পায়। একইভাবে অস্ত্রবহন ও স্থানান্তরের বিধিটিও (সামরিক অধ্যাদেশ নং-১২২) শান্তি কমিটির অধীনে অস্ত্র প্রশিক্ষণ এবং তাদের সেগুলো ব্যবহারের অনুমোদন জায়েজ করা হয়।



মূলত আওয়ামী লীগ, হিন্দু এবং স্বাধীনতাপন্থীদের তালিকা তৈরি করে সেগুলো সামরিক প্রশাসনকে সরবরাহ করার দায়িত্বে ছিলো শান্তি কমিটি। পরে তারা এই সহযোগিতা সামরিক ক্ষেত্রেও বিস্তৃত করার অধিকার আদায় করে নেয়। গঠন করে বিভিন্ন রকমের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। এমন বাহিনীর মধ্যে রাজাকার,মুজাহিদ, ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সেস অন্যতম। শান্তি কমিটির ছায়ায় জামাত গঠন করে রাজাকার যার দুটো শাখা ছিলো আল-শামস (সদস্য ও সমমনাদের নিয়ে গঠিত) এবং আল-বদর (ইসলামী ছাত্র সংঘের সদস্যদের নিয়ে গঠিত)। মুজাহিদ বাহিনীও শান্তিকমিটির আওতাভুক্ত হলেও এতে অন্তভূর্ক্ত ছিলো অন্য দলগুলোর সদস্যরা। যদিও এদের অস্ত্র বন্টন ও সনদ জামাতে ইসলামীর প্যাডেও অনেকসময় দেওয়া হয়েছে। এর একটা কারণ হতে পারে মূল প্রতিপক্ষ নেজামে ইসলামীর চেয়ে জামাতের সাংগঠনিক বিন্যাস আরো বিস্তৃত ছিলো এবং মুসলিম লীগ তিন খন্ডে বিভক্ত হওয়ায় তারাও বাধ্য হয়ে জামাতের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিলো।



রাজাকার নির্বাচন, নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ শান্তি কমিটির অন্যতম দায়িত্ব ছিলো। এর প্রমাণ হিসেবে ‘৭১এর ২১ জুন শান্তি কমিটির ওয়ার্কিং কমিটির তরফে শাখা কমিটিগুলোর কাছে পাঠানো নির্দেশনাটি তুলে ধরা যেতে পারে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সংগ্রহে থাকা এই দলিলটিতে একদম উপরে ডানে ওয়ার্কিং কমিটির এক নম্বর সদস্য হিসেবে গোলামের নাম লেখা হয়েছে। নির্দেশনার ‘ই’ পরিচ্ছদে বলা হয়েছে:
সামরিক প্রশাসকের দফতর থেকে আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোতে দেশপ্রেমিকদের নিয়ে রাজাকার এবং গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন করার নির্দেশ পাঠানো হয়েছে এবং তাদের রাইফেল এবং প্রয়োজনীয় ট্রেনিং দেওয়া হবে । জেলা এবং বিভাগীয় শান্তি কমিটিগুলোকে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট সামরিক আইন প্রশাসকের কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে কারণ শান্তি কমিটির সুপারিশেই সরকার রাজাকারদের প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোয় শান্তিকমিটির তত্বাবধানে অবিলম্বে প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপ-কমিটি গঠন করতে হবে এবং তারা শুধু এই বিষয়টাতেই পুরোপুরি এবং সর্বোতভাবে মনযোগ দেবে। একই নির্দেশনায় পরিত্যক্ত বাড়িঘর দখলের নির্দেশনাও রয়েছে।




শান্তি কমিটির দেশজুড়ে স্বাধীনতাবিরোধী তৎপরতায় কতখানি সংশ্লিষ্ট ছিলো তার প্রমাণ হিসেবে আমরা কিছু উপাত্ত তুলে ধরতে পারি:

ক. ঢাকা শহরের একজন রাজাকারের পরিচয়পত্র। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত এ পরিচয়পত্রটিতে শান্তি কমিটির উল্লেখ লালদাগ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে



খ. পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে কষ্ট করে ঘরে ঘরে ঢুকে ধর্ষণ করতে হতো না। বরং শান্তি কমিটিই তাদের জন্য নিয়মিত মেয়ে সরবরাহের দায়িত্ব নিয়েছিলো। প্রমাণ হিসেবে একটা চিঠি তুলে দেওয়া যেতে পারে। ‘৭১এর ২৮ মে বরিশালের ঝালকাঠি শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছলিমুদ্দিন মিয়া এক চিঠি পাঠিয়েছিলেন কীর্তিপাশা ইউনিয়ন শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আজহার মিয়াকে। শান্তি কমিটির আঞ্চলিক প্যাডে লেখা চিঠির কথাগুলো এরকম:

"ভাই সাহেব
সালামবাদ সমাচার, আপনার কীর্তিশালা কমিটিতে ইউনিট কমান্ডার হিসেবে আঃ রবের নাম শাহ আলম ছার পাশ করিয়া নিয়েছেন। অল্প কয়েকদিনের মধ্যে উত্তর দিকের শয়তান দমন করার জন্য যাইতে হইবে। আপনার এলাকার সব ইন্ডিয়ান দালালদের যত তাড়াতাড়ি পারেন ধরিয়া ক্যাম্পে পাঠাবেন। ওদের হেদায়েত করার পর উত্তর দিকের অপারেশন শুরু করা হইবে। এদিকে ইতিপূর্বে পাঠানো অস্ত্র যেন ইন্ডিয়ার দালালরা খুঁজে নিতে না পারে। বেগ সাহেবের জন্য ভালো মাল পাঠাবেন। রোজ অন্তত একটা অন্যদের জন্য মাল পারেন। খোদা আমাদের সহায় আছেন। আল্লাহ হাফেজ।"




গ. মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে রক্ষিত এই চিঠিটি বঙ্গবন্ধুকে লিখেছিলেন এক বীরাঙ্গনার বাবা। ১৩ ডিসেম্বর তার বাড়ি ঘেরাও করে তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার পাশাপাশি মেয়েকে তুলে নিয়ে যায় রাজাকাররা।



ঘ. ৩১ জুলাই নাটোরের মিনার সিনেমা হলের ম্যানেজারকে পাঠানো চিঠি। প্রশিক্ষণরত রাজাকারদের মাইন্ড রিফ্রেশের জন্য নাইটশোতে বিনে পয়সায় সিনেমা দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে শান্তি কমিটির প্যাডে:



ঙ. ভুরুঙ্গমারির এক মুসলিম লীগ নেতার ক্ষতিপূরণ চেয়ে আবেদন পত্র। শমসের-ই-মূর্তজা নামে ওই লোক দাবি করে মুক্তিবাহিনী তার ঘরবাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে এবং রংপুরে একটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি দখল করে সেখানে বাড়ি নির্মাণে সহায়তা চেয়ে ১৮ হাজার ৩২০ টাকা দাবি করে। তার আবেদনটি মঞ্জুর করে শান্তি কমিটি :



চ. ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী এবং দুষ্কৃতিকারীদের (দুটোই ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের জামাতি সম্বোধন) নিয়মিতই তারা হত্যা করছিলো এবং সেগুলো খবরও হচ্ছিলো। প্রমাণ হিসেবে দেওয়া যেতে পারে ৬ আগস্ট পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায় প্রকাশিত তাদের একটি সাফল্যের খবর। কুষ্টিয়ার কুমারখালিতে ৬ জন ভারতীয় দালালকে (মুক্তিযোদ্ধা) হত্যা এবং দুজনকে বন্দী করার ওই খবরে স্থানীয় শান্তিকমিটির চেয়ারম্যানের (জামাত সদস্য) স্ত্রীও অংশ নিয়েছেন বলে লেখা হয়।



৩. প্রসঙ্গ :পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক সমর্থনের দায়

জামাতের রাজনৈতিক সহযোগিতার প্রমাণ হিসেবে আমরা আমলে নিতে পারি ১৯৭১ সালের ১৮ থেকে ২১ আগস্ট লাহোরে অনুষ্ঠিত জামাতের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকের সারবেত্তাকে। টানা চারদিনের ওই বৈঠক শেষে জামাতে ইসলামী এর কেন্দ্রীয় নেতাদের সম্মতিক্রমে একটি রাজনৈতিক সংহতিপত্র (পলিটিকাল রেজ্যুলুশন) প্রকাশ করে যেখানে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর যাবতীয় কর্মকান্ডকে বৈধ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং তাতে সমর্থন জানানো হয়। একই বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তানের শান্তি শৃংখলা ফেরাতে সেনাবাহিনীকে আরো কঠোর হওয়ার আহবান জানায় তারা। ২০ আগস্ট পাকিস্তানী বার্তাসংস্থা পিপিআইর বরাত দিয়ে ‘ Jamaat upholds action to crush armed rebellion’ শিরোনামে দ্য মর্নিং নিউজ পত্রিকায় লেখা হয়:
The action taken by the Government of Pakistan to crush the armed rebellion in East Pakistan by the outlawed Awami League in connection with Indian warlords and their agent has been fully upheld by the central council of the Jamaat-i-Islami which went into session for the third consecutive day here today under the presidentship of the Deputy chief of the party Maulana Abdur Rahim.


আগেই বলা হয়েছে সামরিক সমর্থনে বাকি রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে আলাদাভাবে নিজেদের চেনাতে উদ্যোগী ছিলো জামাত। এর নমুনা মেলে গোলামের একটি বক্তব্যে। ১৭ আগস্ট ওই বৈঠক উপলক্ষ্যে লাহোরে নামার পর পাকিস্তানি সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাব দেয় সে।পূর্ব পাকিস্তানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জোটে জামাতের অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে গোলাম স্পষ্ট জানায় : Jamaat had nothing to do with the merger of various political parties. The Jamaat, he said, would keep its entity as it could not accept readymade leadership. (morning news 18th august 1971)

দলীয় সংবিধানে এই সমর্থনকে সর্বসম্মতিতে পাশ করানোর আগে থেকেই অবশ্য বক্তৃতা বিবৃতিতে এসব কথা বলে আসছিলো গোলাম আযম। প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা যেতে পারে ২০ জুন লাহোরে জামাত কার্যালয়ে তার বক্তৃতার অংশবিশেষ। ২১ জুন বার্তাসংস্থা এপিপির বরাতে ‘সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া দেশকে রক্ষা করার বিকল্প ছিলো না’ শিরোনামে গোলামের বক্তব্য ছাপে পাকিস্তানের বিভিন্ন পত্রিকা।



(চলবে---)
___________
http://www.amarblog.com/omipial/posts/142632


Name:  বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:14 Dec 2012 -- 05:22 PM

গোলাম নামা: আত্মপক্ষ সমর্থনের নামে ব্যাপক মিথ্যাচার-২
লিখেছেনঃ অমি রহমান পিয়াল (তারিখঃ মঙ্গলবার, ২১/০২/২০১২ - ০২:৩৩)
__________________________________________________________
৪ ও ৫. প্রসঙ্গ:রাজাকার ও আল-বদরের মাধ্যমে সামরিক সহযোগিতার দায়

জামাতের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক এবং সেনাবাহিনীর কর্মকান্ডে সমর্থনসূচক সংহতিপত্র ঘোষণার পরদিনই অর্থাৎ ২২ আগস্ট ‘রাজাকার অধ্যাদেশ’ ঘোষণা করে পাকিস্তান সরকার । এই অধ্যাদেশ বলে আনসার বাহিনী বিলুপ্ত করে এর যাবতীয় তহবিল, সম্পদ, এবং সুযোগ সুবিধা রাজাকার বাহিনীর জন্য বরাদ্দ করা হয়।

সেখানে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে ভবিষ্যতে রাজাকারদের পুলিশ আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। এটা ভাবা ভুল হবে যে এই অধ্যাদেশ ঘোষণার পর রাজাকার বাহিনী গঠন শুরু হয়। বরং এটি দিয়ে রাজাকারদের সেনাবাহিনীর সহযোগী সংগঠন হিসেবে বৈধতা দেওয়া হয়। এই রাজাকাররা এতদিন ছিলো জামাতে ইসলামীর সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি সশস্ত্র দলমাত্র।



‘৭১এর মে মাসে খুলনা শাহজাহান আলী রোডে অবস্থিত আনসার ক্যাম্পে ৯৬ জন জামাত কর্মীকে সশস্ত্র প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রাজাকার বাহিনীর সূচনা করে মওলানা একেএম ইউসুফ। এই আনসার ক্যাম্পই পরে অধ্যাদেশবলে রাজাকার সদর দফতর হিসেবে ঘোষিত হয়। শুরুতে এই বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট এলাকার ইসলামী ছাত্র সংঘের (জামাতের ছাত্র সংগঠন যার নাম এখন ইসলামী ছাত্র শিবির) সভাপতিকে। রাজাকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে আনসার অধ্যাদেশকে সংশোধন করে এই বাহিনীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আত্মীকরণ করা হয়। এই বাহিনীকে দুটো ভাগে ভাগ করা হয়, আল-শামস ও আল-বদর। অছাত্র, বয়স্ক, অর্ধ শিক্ষিত এবং অশিক্ষিতদের নিয়ে আল-শামস গঠন করা হয়। এদের মধ্যে জামাতিরাই ছিলো সংখ্যাগরিষ্ঠ। আল-বদর গঠন করা হয় শুধু ইসলামী ছাত্র সংঘের ছাত্রদের নিয়ে যাদের আরেকনাম ছিলো ইসলামী জমিয়াতুল তালিবা। এরা ছিলো বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঘাতক দল। আল-শামস পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে যৌথ অভিযানের পাশাপাশি রাস্তা,পুল পাহারা দিতো অন্যদিক আল-বদরের দায়িত্ব ছিলো স্পেশাল মিশন। আর সেই বিশেষত্ব তারা দেখিয়েছে দেশ স্বাধীনের আগে আগে বুদ্ধিজীবি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে। প্রসঙ্গত, আল-বদরও কিন্তু একটি আঞ্চলিক বাহিনী হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলো। ময়মনসিংহ ছাত্র সংঘের সভাপতি আশরাফ হোসাইন জামালপুরে এ বাহিনী গঠন করে ২২ এপ্রিল (যদিও ভিন্ন সূত্রে এই বাহিনীর গঠনকাল উল্লেখ করা হয়েছে ২৭ জুন বলে)। রাজাকার বাহিনীতে জামাতের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পর ছাত্রসংঘ আলাদা হয়ে যায় আল-বদর নাম নিয়ে।



সাধারন নাগরিকদের সশস্ত্র করে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি দুষ্কৃতিকারী ও ভারতীয় চরদের (দুটোই মুক্তিযোদ্ধাদের জামাতি সম্বোধন) দমন করার আবেদন জামাত শুরু থেকেই করে আসছে। রাজাকার অধ্যাদেশের আগেই এধরণের ঘাতক বাহিনী গঠন করলেও এদের সরকারী স্বীকৃতির জন্য মরিয়া ছিলো তারা, কারণ তাদের পরিকল্পনায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার যে নীল নকশাটি ছিলো তা অন্যভাবে বাস্তবায়ন করলে আইনী ঝামেলায় পড়ার সমূহ সম্ভাবনা (যে বিপদে এখন গোলাম ও জামাত পড়েছে যুদ্ধাপরাধ বিচার ট্রাইবুনালে) ছিলো। এ কারণেই দলীয় ক্যাডারদের সরাসরি সামরিক বাহিনীর তত্বাবধানে ট্রেনিং দেওয়ার আবেদন জানিয়েছে গোলাম আযম তার বিভিন্ন বক্তৃতায় এবং জামাতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামও এ নিয়ে অনেকবার সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে। উদাহরণ দেওয়া যাক,২০ জুন লাহোরে জামাতের প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন আহবান করে গোলাম। সেখানে সে বলে, the authorities should win the confidence of the people in East Pakistan. The citizens should feel confident and should know that they were trusted by the administration. He also said that miscreants were still active there and to counter their activities, peace loving citizens should be armed for their own defence.’ (The Morning News, 21 June 1971).



একই দিন একই বিষয়ে দৈনিক সংগ্রাম ‘গোলাম আযমের সংবাদ সম্মেলন’ শিরোনামে লেখে: ‘পূর্ব পাকিস্তানে পূর্ণ শান্তি প্রতিষ্ঠা ও দুষ্কৃতিকারীদের উচ্ছেদের ব্যাপারে অধ্যাপক গোলাম আযম তার সাংবাদিক সম্মেলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পেশ করেছেন। তিনি দুষ্কৃতিকারীদের মোকাবেলার উদ্দেশ্যে দেশের আদর্শ ও সংহতিতে বিশ্বাসী লোকদের হাতে অস্ত্র সরবরাহ করার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। সুতরাং দুষ্কৃতিকারীদের মোকাবেলায় দেশের আদর্শ সংহতিতে বিশ্বাসী লোকদের কর্মতৎপরতাকে অধিকতর ফলপ্রসূ করে তোলার উল্লেখিত প্রস্তাবটিকে সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দেখবেন বলে আমাদের বিশ্বাস আছে।’ বিবৃতিতে ঢালাওভাবে বলা হলেও পরবর্তীতে অনেক বক্তৃতায় পাকিস্তানের আদর্শ ও সংহতিতে বিশ্বাসী হিসেবে শুধুমাত্র জামাতকেই মেনেছে গোলাম। মূলত দলীয় বাহিনীকে সামরিক লেবাস পড়াতে ইয়াহিয়ার ছাড়পত্র আনতেই সেবার পাকিস্তানে গিয়েছিলো গোলাম। আর তার প্রমাণ পাওয়া যায় জুনের শেষ সপ্তাহেই রাজাকারদের অস্ত্র সজ্জিত ও ট্রেনিং দেওয়ার সামরিক অনুমোদন, যার কথা প্রথম পর্বে শান্তি কমিটি সাক্ষরিত দলিলটিতে বলা হয়েছে।



দৈনিক সংগ্রামও এ ব্যাপারে নিয়মিতই সম্পাদকীয় এবং উপসম্পাদকীয় ছেপেছে। রাজাকার-আলবদরের প্রাথমিক আইডিয়াটা প্রকাশনায় আসে মূলত তাদের তরফেই। এ ব্যাপারে ২৮ মে ‘বিভিন্ন স্থানে হত্যাকাণ্ড’ শিরোনামের সম্পাদকীয়টি বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। সেখানে লেখা হয়: ‘দেশের অভ্যন্তরে অবস্থানরত এসব দুষ্কৃতিকারী দমনের ব্যাপারে আমরা ইতিপূর্বেও সম্পাদকীয় এবং উপসম্পাদকীয় একাধিক নিবন্ধে বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছি। আমাদের বিশ্বাস পাকিস্তান ও জাতীয় আদর্শে বিশ্বাসী নির্ভরযোগ্য লোকদের সমন্বয়ে একটি বেসামরিক পোষাকধারী বাহিনী গঠন করে তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলে অতি তাড়াতাড়ি এসব দুষ্কৃতিকারীকে নির্মূল করা সহজ হবে।’



রাজাকারদের একটি অধ্যাদেশের আওতায় আনার জন্য জামাতের চাপের নজির আরো পাওয়া যাবে। যেমন ১ আগস্ট পিরোজপুরে জামাতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র সংঘের এক সমাবেশে ইসলাম পন্থী জনগণকে সশস্ত্র ট্রেনিং দেওয়ার দাবি জানানো হয়। অথচ সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে তাদের ট্রেনিং চলছিলো জুনের শেষভাগ থেকেই। ১৭ জুলাই পাকিস্তান অবজারভার টাঙ্গাইলে রাজাকারদের ট্রেনিং দেখতে যাওয়া নিয়াজীর একটি ছবি ছাপে। ৪ জুলাই সংগ্রামের প্রথম পাতার প্রথম কলামে ‘আজ বিশ্ববিদ্যালয় ময়দানে রাজাকারদের গুলি চালানোর ট্রেনিং’ শিরোনামে লেখা হয়: ‘যেসব রাজাকার ট্রেনিং গ্রহণ করছেন আজ সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ময়দানে তাদেরকে ক্ষুদ্র অস্ত্রের সাহায্য গুলি চালনা শিক্ষা দেওয়া হবে।’ ৯ জুলাই জামাতের সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেকের বরাতে ‘জনগন ভারতে অভিসন্ধি বুঝতে পেরেছে’ শিরোনামে লেখা হয়, ‘সশস্ত্র দুষ্কৃতিকারী ও ডাকাতদের নির্মূলের জন্য জনগন এখন স্বেচ্ছায় রাজাকার ট্রেনিং নিচ্ছে’। ২৬ জুলাই আরেকটি সম্পাদকীয়তে রাজাকারদের প্রশংসা করে লেখা হয় ‘ইতিমধ্যে প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় রেজাকার বাহিনী গঠিত হয়ে তারা দুষ্কৃতিকারীদের দমনে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। যেসব স্থানে রেজাকার বাহিনী গঠিত হয়নি, সেসব স্থানেও শিগগিরই গঠিত হতে যাচ্ছে।… দুষ্কৃতিকারীদের দমনে যাতে আদৌ সেনাবাহিনী ব্যবহারের প্রয়োজন না হয়সে লক্ষ্য নিয়েই জনগন ও অন্যান্য সংস্থাকে পারস্পরিক সহযোগিতা সহকারে কাজ করে যেতে হবে।’ ৪ আগস্ট ‘রাজাকার বাহিনীর প্রথম গ্রুপের ট্রেনিং সমাপ্ত’ শিরোনামে খবর ছাপায় সংগ্রাম।



পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানী সেনাপ্রধান লে.জেনারেল নিয়াজী তার 'The Betrayal of East Pakistan' বইয়ে লিখেছেন "The proposal for raising an organised Razakar Force remained under consideration with HQ, CMLA and GHQ for a long time. Although their recruitment had started earlier, sanction for the raising of this force was given at the end of August 1971….A separate Razakars Directorate was established, and the whole set up started taking proper shape. Two separate wings called Al-Badr and AL-Shams were organised. Well educated and properly motivated students from the schools and madrasas were put in Al-Badr wing, where they were trained to undertake 'Specialised Operations', while the remainder were grouped together under Al-Shams, which was responsible for the protection of bridges, vital points and other areas,"



রাজাকার এবং আল-বদর যে জামাতে ইসলামী ও তার ছাত্রসংগঠনের নিয়ন্ত্রণে ছিলো এর স্বপক্ষে ভুড়িভুড়ি প্রমাণ পাওয়া যায়। সাবেক পাকিস্তানী জেনারেল হাকিম আহমেদ কোরেশী The IndoPak War নামে একটি বই লিখেছেন, ২০০২ সালে অক্সফোর্ড থেকে প্রকাশিত বইটির পৃষ্টা ৯১য়ে লেখা হয়েছে: “Maulana Tufail Muhammad of the Jamaat-e-Islami visited us after the military action. He was, I think, the only leader of national stature from West Pakistan who took the trouble of travelling to the remote corners of East Pakistan to make a personal assessment of the prevailing conditions. It was good to know that, besides men in uniform, there were others equally concerned about the future of this ideologically and geographically unique country. The Maulana was particularly concerned about the performance of the Razakars, (volunteers) locally recruited and belonging to his party, and was happy to learn that their conduct was commendable. He jokingly remarked that his party cadres had always come to the rescue of the Army in tough situations, but my state of mind at the time was not receptive to this light-hearted observation; I thought it limited the scope of co-operation between Jamat and the Army. In fact, neither was the Army acting to preserve itself, nor the mujahids to perpetuate army rule; they were co-operating in the national interest, not doing each other any favours. Let it be said, to the credit of Jamat-i-Islami and these motivated Bengali Muslims, that they stuck it out with us till the end. They were prepared to go all the way to their graves in the name of Islam and Pakistan; unfortunately we decided to raise the white flag.”

[ সামরিক হস্তক্ষেপের পর জামায়াতে ইসলামীর মওলানা তোফায়েল মোহাম্মদ আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। আমার ধারণা জাতীয় পর্যায়ের তিনিই একমাত্র পশ্চিম পাকিস্তানী নেতা যিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো ঘুরে সেখানকার সার্বিক অবস্থা অনুধাবনের চেষ্টা করেছেন। জেনে ভালো লাগলো যে সামরিক উর্দির বাইরেও এদেশের আদর্শিক ও ভৌগলিক একতা নিয়ে ভাবার মতো অন্যরাও আছে। মাওলানার যাবতীয় উদ্বেগ দেখা গেলো রাজাকাররা কেমন করছে তা নিয়ে, কারণ এসব স্বেচ্ছাসেবকরা স্থানীয় পর্যায়ে অধিভুক্ত এবং তার দলের সদস্য। তাদের কার্যক্রমের প্রশংসা শুনে বেশ খুশীই হলেন তিনি। মজা করে বললেন তার দলের ক্যাডাররা বরাবরই সামরিক বাহিনীকে কঠিন পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করে অভ্যস্ত। কিন্তু আমার মন তখন এসব রসিকতা বোঝার মতো অবস্থায় ছিল না। বরং মনে হচ্ছিল এতে জামায়াত এবং সেনাবাহিনীর পারস্পরিক সহযোগিতায় সীমাবদ্ধতা তৈরী হচ্ছে। বাস্তবে সেনাবাহিনী যেমন অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়ছিল না, তেমনি এসব মুজাহিদরাও তাদের টিকিয়ে রাখার জন্য কাজ করছিল না। তারা জাতীয় স্বার্থেই পরস্পরকে সহযোগিতা করছিল, কেউ কারো উপকার করছিল না। তবে জামায়াতে ইসলামী এবং এসব উজ্জীবিত বাঙালী মুসলমানদের প্রশংসা করে বলতেই হয় যে তারা আমাদের সঙ্গে একদম শেষ পর্যন্ত লেগে ছিল।ইসলাম এবং পাকিস্তানের জন্য তারা মরতেও প্রস্তত ছিল কিন্তু দূর্ভাগ্য যে আমরা আত্মসমর্পন করে ফেললাম।]



এ ব্যাপারে সবচেয়ে চমকপ্রদ উদ্ধৃতিটি আসলে ব্রিগেডিয়ার (অবঃ) সিদ্দিক সালিকের। উইটনেস টু সারেন্ডার বইয়ে যুদ্ধবন্দী এই পাকিস্তানী সেনাকর্মকর্তা লিখেছেন: ‘In September 1971 a political delegation from erstwhile West Pakistan complained to General Niazi that he had raised an army comprising men nominated by Jamaat-e-Islami. …The general [Niazi] called me to his office and said: From now on, you will call the Razakars -- Al-Badr and Al Shams -- to give the impression that they do not belong to one single party." [page; 105]
ভাবানুবাদ হচ্ছে:
১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর পশ্চিম পাকিস্তানের একটি রাজনৈতিক প্রতিনিধিদলের সদস্যরা জেনারেল নিয়াজীর কাছে অভিযোগ করে যে তিনি জামাতে ইসলামী মনোনীতদের নিয়ে একটি সামরিক বাহিনী গঠন করেছেন। জেনারেল আমাকে তার অফিসে ডেকে নির্দেশ দিলেন, এখন থেকে তুমি রাজাকারদের আল-বদর ও আল শামস বলে অভিহিত করবে যাতে বোঝা যায় এরা কোনো একটি সুনির্দিষ্ট দলের সদস্য নয়। যে অভিযোগের উল্লেখ সিদ্দিক সালিক করেছেন সেটি মোটেও হালকা কিছু নয়।




সালিক যা বলেছেন সেই অভিযোগ এসেছিলো পিপলস পার্টির তরফে। সেবার পূর্ব পাকিস্তান সফর করে এসে মাহমুদ আলি কাসুরি অভিযোগ করেন জামাতে ইসলামী ক্যাডাররা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নিশ্চিহ্ন করার কাজে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করছে। এ ব্যাপারে পিপিপি প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোও একটি বিবৃতিতে বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানে ডানপন্থী রাজাকাররা বামপন্থীদের হত্যা করছে।’ এর প্রতিবাদ করেন মুসলিম লীগ (কাইয়ুম)প্রধান খান কাইয়ুম খান। ৬ সেপ্টেম্বর ‘অপবাদ মূলত সামরিক সরকারকেই দেওয়া হচ্ছে’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে লেখে, ‘যে রেজাকারদের সর্বদলীয় শান্তি কমিটির সহযোগিতায় সামরিক সরকারই বাছাই করেছেন এবং ট্রেনিং দিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণে কাজে লাগিয়েছেন, তারা কি করে দল বিশেষের পক্ষ হয়ে অন্যান্য দলের কর্মীদের খতম করেছে তা ভাবতেই অবাক লাগে। অপবাদ কি মূলত সামরিক সরকারকেই দেওয়া হচ্ছে না?’



অক্টোবরে এই বিতর্ক আবার শুরু হয়। ১১ অক্টোবর বার্তা সংস্থা রয়টার্স সংবাদ পরিবেশন করে ‘PEOPLE'S PARTY LEADER ADMITS RAZAKAR TERROR’ শিরোনামে, যেখানে লেখা হয়: A leading People's Party official dropped out of a party delegation hours before it left for East Bengal, alleging that power in the eastern wing had been handed over to reactionary and anti-people parties who had massacred political opponents. Meiraj Mohammed Khan, the party's Karachi secretary, said yesterday (October 10) that he felt it was "futile for me to go".
The 10-man party delegation was scheduled to go to Dacca to survey the situation in view of forthcoming by-elections for 78 seats formerly held by mem¬bers of the Awami League.
Meiraj alleged that in East Bengal "power in effect has been transferred to those reactionary and anti-people political parties defeated in the elections and rejected by the people".
He named one party-the Muslim Jammaat-e-Islami group-of indulging in wholesale massacre of political opponents for which they are using their Razakars.



এমন নয় যে শুধু পশ্চিম পাকিস্তানেই এনিয়ে বিতর্ক উঠেছিলো। জামাতে ইসলামী যে রাজাকারদের রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে সে অভিযোগ উঠেছিলো জামাতের রাজনৈতিক সহযোগী দলগুলোর মধ্যেও। তার প্রমাণ মেলে পাকিস্তান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের এক গোয়েন্দা নথিতে । ৩ অক্টোবর নুরুল আমিনের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডিপি) নির্বাহী কমিটির এক জরুরী সভায় পূর্ব পাকিস্তানে হত্যা ও নৈরাজ্যের জন্য জামাতে ইসলামী এবং রাজাকারদের দায়ী করে বক্তৃতা দেয় কজন নেতা। মজার ব্যাপার হচ্ছে রাজাকারদের নিয়ে পিপিপির ভাইস চেয়ারম্যান মিয়া মাহমুদ আলী কাসুরি আর নুরুল আমিনের প্রশংসা নিয়ে ১৩ নভেম্বর একটি সংবাদ ছাপে হামিদুল হক চৌধুরী সম্পাদিত পাকিস্তান অবজারভার। লাহোর থেকে তাদের বিশেষ সংবাদদাতার পাঠানো ‘Row over Razakars: PPP’s Mysterious Seats’ খবরটি মোটামুটি জামাতের লাইনে পরিবেশিত এবং পিপিপিকে একহাত দেখে নেওয়া হয়েছে।



রাজাকারদের সবচেয়ে দূর্ধর্ষ অংশ আল-বদরের সঙ্গে বর্তমান জামাত নেতৃত্বের সম্পর্ক কি? এ প্রসঙ্গে সে সময় ইসলামী ছাত্রসংঘের শীর্ষ নেতৃত্বের তালিকাটা তুলে ধরা জরুরী যারা বাই ডিফল্ট আল বদরেরও শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলো । তালিকায় চোখ বোলালেই বোঝা যায় এই লোকগুলোই এখন জামাতে ইসলামীর বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত। তাই চলমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে তাদের গ্রেফতার এবং কাঠগড়ায় ওঠানোটা যদি জামাতের শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজনৈতিক হেনস্থা বোঝায়, সেটা হবে আরেকটি বড় মিথ্যাচার। বরং এটিই হচ্ছে ঘটনার পর্যায়ক্রমে বাধ্যতামূলকভাবেই প্রত্যাশিত এক প্রক্রিয়ামাত্র। বন্ধু ফখরুল আরেফীন একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন ‘আল-বদর’ নামে যা বর্তমান ট্রাইবুনালে অন্যতম প্রামান্য উপাত্ত হিসেবে গৃহীত হয়েছে। তার কয়েকটি ফুটেজ এই পোস্টে আমি ব্যবহার করেছি। এর একটি আল-বদর ও জামাত নেতৃত্বের সম্পর্ক নিয়ে যাতে স্পষ্ট এতে আলী আহসান মুজাহিদ, মতিউর রহমান নিজামীদের সংশ্লিষ্টতা। প্রখ্যাত মুক্তিযুদ্ধ গবেষক এবং ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির কনভেনর ডা.এম এ হাসান,সদ্য প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব কামালের মুখে শোনা যাক:








এবার আসা যাক এ সংক্রান্ত সবচেয়ে অথেনটিক উপাত্তটিতে। ১৯৭১ সালে এই ছাত্র সংঘের সদস্যদের আল-বদর নামের খুনে বাহিনীতে রিক্রুট করার দায়িত্ব ছিলো আইএসআইর মেজর রিয়াজ হুসেইন মালিকের ওপর। বলা হয়, আল-বদর নামটাও তারই দেওয়া। উইকিপিডিয়াতে লেখা হয়েছিলো (অতীতবাচ্যে বললাম কারণ আমার একটা পোস্টে এই উদ্ধৃতিটা ব্যবহার করার পর দেখা গেছে লেখাটা এডিট করে সেখানে বসানো হয়েছে যে যদিও জামাতে ইসলামীর অঙ্গ সংগঠন হিসেবে আল বদরদের অভিযুক্ত করা হয়, কিন্তু আসলে তাদের তেমন ট্রেনিং ছিলো না, অস্ত্রও ছিলো না। বরং এদের বেশীরভাগ ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের দলে যোগ দিয়েছে। নাউজুবিল্লাহ!) : The name Al-Badar was given by major Riaz hussain during the passing out ceremony of first Al-badar group. ১৯৯৭ সালে পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে উর্দূতে একটা প্রামান্য চিত্র তৈরি হয় ‘জমিয়াত কি পঞ্চাশ সাল’ নামে। সেই বিশাল প্রামান্যচিত্রে পূর্বপাকিস্তানের ইসলামী জমিয়াতে তালাবা সম্পর্কে রিয়াজ হুসেইনের প্রশংসাধন্য বয়ান মিলে। প্রামান্য চিত্রটির একটা সংক্ষিপ্ত ভার্সন আছে ইউটিউবে। ‘আল-বদর ১৯৭১’ নামে ওই ফুটেজটি পাকিস্তানীদেরই আপলোড করা। সেখানে ভূমিকায় সমাজতান্ত্রিক ও সেক্যুলার ছাত্রদের (ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন) মোকাবেলায় যোগ্য প্রতিপক্ষ হিসেবে আইজেটিকেই মানা হয়। এবং এসব প্রগতিশীল ছাত্ররা যখন মুক্তিবাহিনীর সদস্য হিসেবে সক্রিয়, তখন তাদের ঠেকাতে ছাত্রসংঘের বন্দুক ধরাও ফরজ বিবেচিত হয়েছে। রিয়াজ হুসেইন উর্দুতে কয়েকটা ঘটনার বর্ননা দিয়া এদের মাহাত্ম প্রচার করেছে এবং শুরুতেই উল্লেখ করেছে ইসলামী ছাত্রসংঘের নাম, তাদের ইসলাম প্রেম ও পাকিস্তান প্রেম। বিভিন্ন কাহিনীর মধ্যে রয়েছে একজন ছাত্রসংঘ সদস্য নাকি তার আপন ভাইকে পাকিস্তানীদের হাতে তুলে দিয়েছে সে মুক্তিবাহিনী এবং সুবাদে ভারতের দালাল বিধায়। তার যুক্তি এমন ভাইয়ের মরে যাওয়াই উচিত যে তার কোটি মুসলমান ভাইর সঙ্গে বেইমানি করছে! আরেকজন মুক্তিবাহিনীর হাতে নিহত ভাইয়ের জানাজা পড়েই (সে জানাজায় নাকি রিয়াজও ছিলো) আবার ডিউটিতে হাজির। এরকমই নানা গল্পের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের গুণ কীর্তন করা হয়েছে।








পাকিস্তানের জমিয়াতে তালাবার ওয়েবসাইটেও রয়েছে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে সংগঠনটির বীরত্বের কথা। তখনকার গোটা পাকিস্তানের সভাপতি মতিউর রহমান নিজামী সম্পর্কে সেখানে লেখা হয়েছে: Motiur Rahman Nizam is the current chief (Ameer) of the Jamaat-e-Islami Bangladesh, which is the largest Islamic political party in Bangladesh. Nizami rose in the ranks of the Jamaat-e-Islami in East Pakistan in the 1960s, after being a leader of a student organization, Islamic Chhatro Shango (now Islami Chhatro Shibir). During the liberation war of 1971, Nizami actively supported the cause of West Pakistan and formed the Al-Badr Force in which he acted as the supreme commander of the Al-Badr Militia.


সেখানে উল্লেখ রয়েছে গোলাম আযমেরও।এবং আমরা যেটাকে তার অপরাধ হিসেবে গন্য করি তাই লেখা হয়েছে তার প্রশংসাসূচক বয়ানে: (Prof.Ghulam Azam ) (Born 7 November 1922) He is a Bangladeshi political leader who is regarded in his country as a war criminal of the Liberation War of Bangladesh. The former Ameer of Jamaat-e-Islami Bangladesh, he opposed the independence of Bangladesh during and after the 1971 war and led the formation of Shanti Committee, Razakar and Al-Badr to thwart the Mukti Bahini that fought for independence. He also lobbied against the acknowledgment of new-born Bangladesh after 1971 with a opened demand called 'Bangladesh Na Manjoor' (Bangladesh not approved). During this activity Ghulam Azam sent requests to Middle Eastern countries to deny recognition to Bangladesh. This continued until the late 1980s.

বর্তমান ইসলামী ছাত্র শিবিরের সঙ্গে তাদের পাকিস্তানী মূল সংগঠনের এখনও যোগাযোগের উল্লেখ নিয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে অন্য পোস্টে।









আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রমাণ মানা যেতে পারে ইসলামী ছাত্রসংঘের সাবেক সদস্য এবং ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশের নেতা মিসবাহউর রহমান চৌধুরীর মতিউর রহমান নিজামীকে অভিযুক্ত করে দেওয়া বক্তব্য এবং আল-বদর গঠন সংক্রান্ত ছাত্রসংঘের একটি নির্দেশনামাকে।এক টিভিসাক্ষাতকারে মিসবাহ সে সময় ইসলামী ছাত্রসংঘের সদরদপ্তর থেকে আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোতে পাঠানো একটি চিঠি তুলে ধরেছেন যেখানে লেখা হয়েছে:
‘আগামী ১০ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র সংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছাত্র সংঘের সকল নেতাকর্মীকে আল-বদর বাহিনীতে যোগদানের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হইয়াছে। ১০ আগস্ট আপনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মৌলভীবাজার কমান্ডের অফিসে সকাল ১০টার মধ্যে মেজর ফখরুল ইসলামের সাথে সাক্ষাত করিয়া যোগদানপত্র গ্রহণ করিবেন।'



আল-বদরদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগটি আমাদের বুদ্ধিজীবি হত্যাকাণ্ডের। পাকিস্তান বাহিনীর সমান্তরালে জামাতে ইসলামী ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের ক্যাডাররা আল-বদর নামে এই জঘন্য গণহত্যাটি শুরু করেছিলো অক্টোবর থেকে যা তীব্রতা পায় ডিসেম্বরে এবং চলে আমাদের স্বাধীনতার আগেরদিন পর্যন্ত। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়েই শহীদ বুদ্ধিজীবিদের স্বজনরা মামলা করেছেন এবং অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযুক্তরা কেউই পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তা নয়, সবই আল-বদরের সদস্য যাদের তারা সরাসরি চিহ্নিত করেছেন বুদ্ধিজীবিদের অপহরণের সময়। নীচের ভিডিও ফুটেজটিতে নিহত বুদ্ধিজীবিদের কয়েকজন স্বজন জানাচ্ছেন তাদের এ সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা:








এ প্রসঙ্গে ব্রিটেনে পালিয়ে থাকা কুখ্যাত তিন যুদ্ধাপরাধী নিয়ে চ্যানেল ফোর নির্মিত ‘ওয়ার ক্রাইমস ফাইল’ তথ্যচিত্রটি থেকে কিছু ফুটেজ ব্যবহার করা যায়। প্রফেসর আনিসুজ্জামান বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ডে আল-বদরদের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে বলেছেন:







বুদ্ধিজীবি নাজমুল হকের অপহরণ সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছেন সেসময় হত্যা তালিকায় থাকা এবং ঘটনার সময় পাশের বাড়িতে লুকিয়ে থাকা বিবিসির সাবেক সাংবাদিক আতাউস সামাদ। সেইসঙ্গে তার ভাড়াটে মোশতাকুর রহমান এবং মাহমুদুর রহমান বলেছেন আতাউস সামাদের খোজে আসা আল-বদরদের সম্পর্কে। ফুটেজটিতে আরো রয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবি সিরাজুদ্দিন হোসেনের স্ত্রী নুরজাহান সিরাজীর বক্তব্য:








বুদ্ধিজীবিদের ধরে নিয়ে রাখা হতো মোহাম্মদপুর ফিজিকাল ট্রেনিং সেন্টারে। এটা ছিলো আল-বদর সদর দপ্তর। গুলি করে মারার আগে নৃশংস অত্যাচার করা হতো তাদের ওপর । '৭১ সালে ওই ট্রেনিং সেন্টারের দারোয়ান রহম আলী জানিয়েছেন তার অভিজ্ঞতা:








আল-বদরদের নৃশংসতার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী মোহন মুন্সীও ক্যাম্পের দ্বাররক্ষক ছিলেন। শেরপুরের আল বদরদের নৃশংসতা এবং বতর্মান জামাত নেতা কামারুজ্জামান সম্পর্কে এরকমই বর্ণনা উঠে এসেছে তার এবং নিহতদের স্বজনদের মুখেও:








সেই খুনীদের হাত থেকে পালিয়ে আসার ভাগ্য খুব অল্প ক’জনের হয়েছে। তাদের একজন ঢাকার গ্রিনল্যান্ড মার্কেন্টাইল ব্যাংকের চিফ একাউনটেন্ট মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। এখন পর্যন্ত খোঁজ মেলা অল্প ক'জন ভাগ্যবানের তিনি একজন যিনি আল-বদরদের হাত থেকে পালাতে পেরেছিলেন। ১৯৭১ সালের ২১ ডিসেম্বর দৈনিক বাংলায় ছাপা হয়েছিলো ‘বধ্যভূমির অভিজ্ঞতা’ শিরোনামে তার সেই বন্দীজীবন ও মৃত্যুর মুখ থেকে পালানোর কাহিনী ।








সারা দেশজুড়ে জামাত ও আলবদরদের নৃশংসতার নানারকম সাক্ষ্যই মিলেছে। শুধু হত্যাতালিকা তৈরী নয়, সিলেটের চা-বাগানে আল-বদররা গণধর্ষনেও যুক্ত ছিলো বলে প্রমাণ মিলেছে চ্যানেল ফোরের প্রামান্যচিত্রে। স্বাধীনতার পর সিলেটের বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করা সৈয়দা জেবুন্নেসা হক জানাচ্ছেন সেপ্টেম্বরে সংঘটিত এমন এক নৃশংসতার কথা:








বুদ্ধিজীবি হত্যাকাণ্ডে উস্কানী দিয়ে গোলাম আযাম ও জামাতের মুখপাত্র সংগ্রামের প্রচুর উপসম্পাদকীয় ও বিবৃতির খোজ মেলে। তার কয়েকটি তুলে ধরা যাক। দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে ‘সম্পাদক সমীপেষু’ কলামে আব্দুল বারী নামে এক আলবদর কমান্ডারের এই চিঠিটি ছাপা হয় :
জনাব,
স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান আলবদর বাহিনীর নাম আজ প্রদেশের প্রত্যন্ত প্রান্তরে পৌঁছে গেছে। গত ২৭ জুন জামালপুর মহকুমায় আলবদর বাহিনী গঠিত হবার পর আজ সমগ্র মোমেনশাহী জেলা ও প্রদেশের আরো দুয়েকটি জেলায় এর কাজ শুরু হয়েছে বলে সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। আলবদর বাহিনী পাকিস্তানবাদী ইসলামপন্থী দেশপ্রেমিক ছাত্রদের দ্বারা গঠিত। এতে ইস্কুলের ১২ বছরের ছেলে থেকে আরম্ভ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ছাত্র রয়েছে।
যতদূর জানা যায়, পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে জামালপুর মহকুমাতেই পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। এখানে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ৪০% থেকে ৫০% ছেলে পরীক্ষা দিয়েছে। জামালপুর মহকুমার শেরপুর, নলিতাবাড়ি, ইসলামপুর, দেওয়ান গঞ্জ ও জামালপুর শহরে দুষ্কৃতিকারীদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে।
জামালপুরের বিভিন্ন জায়গায় সীমান্তবর্তী এলাকায় আলবদর বাহিনী সাহসিকতা ও সাফল্যের সঙ্গে ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের মোকাবেলা করেছে। আলবদর বাহিনীর তৎপরতা দেখে ভারতীয় অনুচর নাপাক বাহিনীর লোকেরা জামালপুর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে বলে ক্রমাগত সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। আলবদর বাহিনীর বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রতিটি ছেলেই শিক্ষিত এবং নামাজ পড়ে। ধনসম্পদ ও নারীর প্রতি কোনো লোভ নেই। বদর বাহিনীর গত তিনমাসের কাজে কোনো চারিত্রিক দূর্বলতা দেখা যায়নি। এজন্যই জনগণের কাছে আশার আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাদের প্রিয় নাম আলবদর। জামালপুরে রেজাকার, পুলিশ, মুজাহিদ ও রেঞ্জাররা পুল ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পাহারা দিচ্ছে আর পাক ফৌজ ও আলবদর বাহিনী অপারেশন করছে।
আমি পূর্ব পাকিস্তানের দেশপ্রেমিক ইসলামপন্থী ছাত্রজনতার কাছে আহবান জানাচ্ছি সামরিক কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা ও সাহায্য নিয়ে দ্রুত প্রদেশের সর্বত্র আলবদর বাহিনী গঠন করতে। বদর বাহিনী ছাড়া শুধু রেজাকার ও পুলিশ দিয়ে সম্পূর্ণ পরিস্থিতি আয়ত্বে আনা সম্ভব নয়। আমাদের কাছে রেজাকার, বদর বাহিনী ও মুজাহিদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আমরা সবাইকে মনে করি সমান। ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী ও তার দালালদের শায়েস্তা করতে আজ তাই প্রদেশের সর্বত্র আলবদর বাহিনী গঠন করা প্রয়োজন।
দেশের বর্তমান নাজুক ও সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে যত তাড়াতাড়ি আলবদর বাহিনী প্রদেশের সর্বত্র গঠিত হয় ততই দেশ ও জাতির মঙ্গল। আল্লাহ আমাদের তার পথে কাজ করা তৌফিক দান করুন। আমিন।

মোহাম্মদ আব্দুল বারী
ইনচার্জ, আলবদর ক্যাম্প, ইসলামপুর থানা, মোমেনশাহী
ও প্রচার সম্পাদক, জামালপুর মহকুমা শান্তি কমিটি


স্বাধীনতার পর এই আব্দুল বারীর ব্যক্তিগত ডায়েরিটি উদ্ধার করা হয়। সেখানে মিলে চিঠির সঙ্গে বদরদের চারিত্রিক গুণাবলীর অসঙ্গতির চিত্র। ১৯৭২ সালের ১০ মার্চ দৈনিক ইত্তেফাকে মুদ্রিত ডায়েরির প্রধান বিবরণগুলি হচ্ছে :

টাঙ্গাইলে successful operation হয়েছে। হাজার দেড়েকের মতো মুক্তিফৌজ মারা পড়েছে আলবদর ও আর্মির হাতে।
1.Haidar Ali 2. Nazmul Haque. Rs 2500.00

তিতপল্লার শিমকুড়া গ্রাম- জব্বারের কাছে ২৯/১০/৭১ আর তিন হাজার নেওয়ার পরিকল্পনা আছে
24-10-71… … Prostitution Quarter
26-10-71… Raping Case… Hindu Girl


আল-বদরদের একদম স্পেসিফিক মিশনই ছিলো দেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করা। এটি যত না পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তার চেয়েও বেশী ছিলো জামাতে ইসলামীর নিজস্ব এজেন্ডা। কারণ যেসব মিথ্যাকে অবলম্বন করে তারা রাজনীতি করে তার মুখোশটা সহজেই খুলে দেওয়ার ক্ষমতা এই বুদ্ধিজীবিরা রাখতেন। দেশের জনগনের একটা বড় অংশই অশিক্ষিত বলে এদের ধর্মের দোহাই দিয়ে বশে রাখা যায়, শিক্ষিতদের সেটা সম্ভব নয়। জামাত-শিবির মিথ্যা অপপ্রচার এবং ঘটনা বিকৃত করে নিজের ফায়দায় কাজে লাগানোর যে চর্চায় অভ্যস্ত যুগ যুগ ধরে তা বজায় রাখতে এদের নিশ্চিহ্ন করাটা তাই জরুরী ছিলো। আগেই বলেছি এ ব্যাপারে অজস্র এবং অসংখ্যবার উস্কানী এসেছে গোলাম আযমসহ জামাতের বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্বের তরফে। এ প্রসঙ্গে নীচে দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত কিছু সংবাদ ও সম্পাদকীয়র অংশ বিশেষ তুলে ধরা হলো। তাতেই পাঠক প্রমাণ পাবেন গোলাম আযম, জামাতের শীর্ষ নেতৃত্ব কোনোভাবেই রাজাকার এবং আল-বদরদের সংগঠিত এবং ব্যবহার করে এসব হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। এবং যুদ্ধাপরাধ আদালতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কোনো অভিযুক্তের উপস্থিতি ছাড়াই স্রেফ এই একটি সুনির্দিষ্ট গণহত্যার অপরাধেই তাদের প্রত্যেকের শাস্তি হতে পারে।

২ সেপ্টেম্বর দৈনিক সংগ্রাম এক সম্পাদকীয়তে গোলাম আযমের সুপারিশ মেনে বেসামরিক পাকিস্তানপন্থীদের সশস্ত্র করার জন্য সরকারকে অভিনন্দন জানায়। সে লেখায় মওলানা আবদুর রহিমের বরাতে বাংলাদেশের পক্ষে প্রোপোগান্ডা চালানোর জন্য বিভিন্ন সরকারী অফিসের কর্মচারীদের অভিযুক্ত করা হয়:




১১ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুবাষিকীতে কার্জন হলে ইসলামী ছাত্র সংঘের এক অনুষ্ঠানে আল-বদরদের আগমনী উপলক্ষ্যে শুভেচ্ছা বার্তা শোনা যায় গোলামের কণ্ঠে:



১৪ সেপ্টেম্বর দৈনিক সংগ্রামে গোলামের একটি সাক্ষাতকারে দ্বিতীয় কিস্তি প্রকাশিত হয়। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের চেয়ে বরং তাদের প্রতি সহমর্মীদের সমাজের বিভিন্ন অবস্থান থেকে খুজে বের করার নির্দেশ দেয়:



১৭ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরে আলবদর হেডকোয়ার্টার সফর করে গোলাম এবং সেখানে তাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেয়। বক্তৃতায় সেনাবাহিনীর কাজের সুবিধার্থে ঘরের শত্রু অর্থাৎ স্বাধীনতাকামীদের খুজে বের করে হত্যার নির্দেশ দেয় সে:



২৩ সেপ্টেম্বর মতিউর রহমান নিজামী কোনো রাখঢাক না করেই সুস্পষ্ট অভিযোগের আঙুল তোলে বুদ্ধিজীবিদের বিরুদ্ধে। ইসলামিক একাডেমিতে আয়োজিত সিরাত সম্মেলনে গোলাম আযমের উপস্থিতিতে পাকিস্তান ছাত্রসংঘ প্রধান বলে, যারা ইসলামকে ভালোবাসে, শুধু মাত্র তারাই পাকিস্তানকে ভালোবাসে। এবারের উদঘাটিত এই সত্যটি যাতে আমাদের রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবিরা ভুলে যেতে না পারেন, সেজন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।




দলীয় কর্মীদের স্ট্যাটাস বাকিদের চেয়ে উচুতে রাখতেই ৭ নভেম্বর সংগ্রাম তাদের সম্পাদকীয়তে লেখে যে সেনাবাহিনীর পরই রাজাকারদের অবস্থান:




১০ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ভারতের দালাল ও বিশ্বাসঘাতকদের খুজে বের করে হত্যা করার যুক্তি দেয় দৈনিক সংগ্রাম 'বাবুদের আরেক রূপ' শিরোনামে:



১২ নভেম্বর 'রোকেয়া হলের ঘটনা' শিরোনামে এক উপসম্পাদকীয়তে আবারও অফিস এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে থাকা সন্দেহজনকদের খুজে বের করে হত্যার কথা বলে সংগ্রাম:



১৪ নভেম্বর মতিউর রহমান নিজামির লেখা 'পাকিস্তান ও আল বদর' নামে একটা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় সংগ্রামে। সেখানে নিজামী লেখে:
... আমাদের পরম সৌভাগ্যই বলতে হবে। পাকসেনার সহযোগিতায় এ এ দেশের ইসলামপ্রিয় তরুণ ছাত্র সমাজ বদর যুদ্ধের স্মৃতিকে সামনে রেখে আলবদর বাহিনী গঠন করেছে। বদর যুদ্ধে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল তিনশত তের। এই স্মৃতিকে অবলম্বন করে ৩১৩ জন যুবকের সমন্বয়ে এক একটি ইউনিট গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বদর যোদ্ধাদের সেইসব গুণাবলীর কথা আমরা আলোচনা করেছি, আলবদর তরুণ মুজাহিদদের মধ্যে ইনশাল্লাহ সেই সর্বগুণাবলী আমরা দেখতে পাব।

পাকিস্তানের আদর্শ ও অস্তিত্ব রক্ষার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে গঠিত আলবদরের যুবকেরা এবারে বদর দিবসে নতুন করে শপথ নিয়েছে, তাদের তেজোদ্দীপ্ত কর্মীদের তৎপরতার ফলেই বদর দিবসের কর্মসূচী দেশবাসী তথা দুনিয়ার মুসলমানদের সামনে তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছে। ইনশাল্লাহ, বদর যুদ্ধের বাস্তব স্মৃতিও তারা তুলে ধরতে সক্ষম। তরুণ যুবকরা আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হিন্দু বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে হিন্দুস্তানকে খতম করে সারা বিশ্বে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করবে।’




একই সংখ্যায় আলী আহসান মুজাহিদ লেখে 'অস্ত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র, যুক্ত নয় নামে একটি প্রবন্ধ। ২৩ নভেম্বর সারাদেশে জরুরী অবস্থা জারী করে ইয়াহিয়া সরকার। এ সময়ই মাঠে নামে আল-বদর। এর আগে তারা তাদের টার্গেট বুদ্ধিজীবিদের একটি চিঠি পাঠায়। শহীদ সিরাজউদ্দিন হোসেনের পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া একটি চিঠিতে লেখা ছিলো:
শয়তান,
ব্রাক্ষণ্যবাদী হিন্দুদের যেসব পা চাটা কুকুর আর ভারতীয় ইন্দিরাবাদের দালাল নানা ছুতানাতায় মুসলমানদের বৃহত্তম আবাসভূমি পাকিস্তানকে ধ্বংস করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে তুমি তাদের অন্যতম। তোমার মনোভাব, চালচলন ও কাজকর্ম কোনোটাই আমাদের অজানা নেই। অবিলম্বে হুশিয়ার হও এবং ভারতের পদলেহন থেকে বিরত হও, না হয় তোমার নিস্তার নেই। এই চিঠি পাওয়ার সাথে সাথে নির্মূল হওয়ার জন্য প্রস্তুত হও।
শনি



১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলা হত্যাকান্ডের অপারেশন ইন চার্জ ছিলো চৌধুরী মঈনউদ্দিন , যে এখন ইংল্যান্ডে বসে বিরাট ধর্মীয় নেতা বনে গেছে। আর মূল ঘাতকের ভূমিকায় ছিলো আশরাফুজ্জামান , যে এখন নিউইয়র্কে এক মসজিদে ইমামতি করছে। স্বাধীনতার পর মোস্ট ওয়ান্টেড এই দুজন এখন ইসলাম বিক্রি করে খাচ্ছে বিদেশে। এবং জামাতে ইসলামীর নেতা হিসেবেই।



আল-বদরদের মাটিলেপা মাইক্রোর (যেটি করে তারা বুদ্ধিজীবিদের তুলে নিয়ে আসতো) ড্রাইভারের স্বীকারোক্তিতে জানা যায় ইসলামী ছাত্র সংঘের হাই কমান্ডের কার কি ভূমিকা। ক'দিন পর ধরা পড়া জামাতের প্রচার সম্পাদক (বর্তমানে আধুনিক প্রকাশনীর দায়িত্বে এবং বাংলাদেশের বেশ ক'জন উঠতি বুদ্ধিজীবির দেখাশোনা করে) আবদুল খালেক তার জবানবন্দীতে স্বীকার করে ইসলামী ছাত্র সংঘের এই ভয়াবহ নীলনক্সা।


এতো নৃশংস নির্মমতার সঙ্গে বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করা হয়েছে যে অনেকের লাশের হদিসও মেলেনি। আজ, এই চল্লিশ বছর বুকে পাথর বেধে রাখা শহীদের স্বজনরা সেই হত্যাকান্ডের বিচারের উপলক্ষ্য পেয়েছে। তা ভন্ডুলের চেষ্টা চলবে, কিন্তু অস্বীকার করার প্রবণতা আমরা রুখে দেবো। মাথায় টুপি পড়ে, হাতে কোরান নিয়ে যারা গণহত্যায় নামতে পারে, তারা মুসলমান নয়, মোনাফেক। এরা মিথ্যেবাদী প্রতারক। এদের রেহাই আল্লাহ এই দুনিয়াতেও দেননি। ( পরের পর্ব )
_________________________________________
http://www.amarblog.com/omipial/posts/144036


Name:  বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:14 Dec 2012 -- 05:25 PM

গোলাম নামা: আত্মপক্ষ সমর্থনের নামে ব্যাপক মিথ্যাচার-৩

লিখেছেনঃ আমার ব্লগ গবেষণা ... (তারিখঃ সোমবার, ২০/০২/২০১২ - ২২:১২)

[ এই পর্বে যাওয়ার আগে পাঠকদের একটা বিষয়ে না জানালেই নয়। ১৩ ডিসেম্বর রাতে গোলাম যে সাফাইটি দিলো এখন মোটামুটি পরিষ্কার তা কাদের জন্য। সম্প্রতি ব্যর্থ হওয়া যে সেনা অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা জামাত নিয়েছিলো হিজবুত তাহরীরকে ঢাল বানিয়ে, তা থেকে লাভবান হতো একটি দলই, জামাতে ইসলামী। এবং বুক ফুলিয়ে বেরিয়ে যেতো যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দলটির নেতৃবৃন্দ।

গোলাম তার বয়ান দিয়েছে জাতিকে তার নিরপরাধের সাফাই দিতে নয়, বরং ভিন্ন উদ্দেশ্য ছিলো তার। একইসময়ে আরো একাধিক সাক্ষাতকার নামী ও বেনামী কিছু মাধ্যমের মারফতে ইউটিউবে পাওয়া যাচ্ছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই পরিকল্পিত সাক্ষাতকারটির বেশীরভাগ কথাই পুনরাবৃত্তি মাত্র। ছাত্র শিবির ও জামাতের প্রতিটি সমর্থকের জন্য যে বইটি পড়া ফরজ, তা হচ্ছে ‘জীবনে যা দেখলাম’। ৮ খন্ডের এই বইটি মূলত গোলামের আত্মজীবনি বলে প্রচারিত। এর তৃতীয় খন্ডে মুক্তিযুদ্ধে তার এবং দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছিলো গোলাম যা ছিলো একইরকম মিথ্যাচারে পরিপূর্ণ (পোস্টে এর অনেক উদ্ধৃতি সঙ্গত কারণেই ব্যবহৃত)। মূলত যুদ্ধাপরাধের দায় থেকে বাচতে এবং সমর্থক ও সদস্যদের চোখে মহান ইসলামী ব্যক্তিত্বের ভাবমূর্তি ধরে রাখতে এই মিথ্যাচার গোলাম এবং জামাতের খুনী নেতাদের জন্য জরুরী ছিলো। জামাত-শিবিরের প্রতিটি সদস্য এই বইয়ের প্রতিটি অক্ষর বিশ্বাস করে এবং সেভাবেই মুক্তিযুদ্ধকে মূল্যায়ন করে। ১৩ ডিসেম্বরের সাক্ষাতকারে সেই পুনারাবৃত্তি আসলে তাদের সেই বিশ্বাসকে আরো জোরদার করতে, যাতে গ্রেফতার হলে এবং সেটা ঠেকাতে সামরিক অভ্যুত্থানে জামাত ও শিবির কর্মীরা জান কবুল করে দেয়। আশা করছি না এই লেখা পড়ে তাদের কোনো একজন যুক্তি দিয়ে ব্যাপারটা দ্বিতীয়বার ভাববে, বরং গোলামের মিথ্যাচারকে সহী ধরে নিয়ে আমার এই পোস্টের বর্ণনাকেই চরম মিথ্যে বলে রায় দেবে। বাট এগেইন দ্যাটস হোয়াই গোলাম আযম ইজ আ প্রফেসর, প্রফেসর অব প্যাথলজিকাল লাইজ, সো শুড বি হিজ ফলোয়ারস। বইটির উল্লেখ আরেকটি কারণে জরুরী ছিলো, অনেকেই ভাবতে পারেন টিভির সামনে কথা বলতে গিয়ে বয়সজনিত কারণে অনেক বিষয়ে হয়তো সময়-তারিখ ভুল বলেছে গোলাম, কোনো ব্যাপারে স্মৃতিবিভ্রান্তিতে ভুগেছে। এই ভাবনাটা মিথ্যে, গোলামের আত্মজীবনী ২০০১ সালে প্রকাশিত হয়েছে, তার আগে দৈনিক সংগ্রামে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছে। আগেই বলেছি, ১১ বছর আগের এই মিথ্যেবাদিতার সঙ্গে ১৩ ডিসেম্বরের টিভিবয়ানের হুবহু মিল। মুক্তিযুদ্ধের আগে এবং পরের সময়ে ঘটা বহু ঘটনা নিয়েও সে মনগড়া ইতিহাস বলেছে, কিন্তু সেগুলো আমলে না নিয়ে প্রাসঙ্গিক থাকলাম। ]


প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব

সাংবাদিকঃ তারা বলেছেন যে ২৫ মার্চ যে সার্চ লাইট একটা অপারেশন হয়েছিল, অপারেশন সার্চ লাইট, এর ঠিক ৪ দিন পরে আপনি এবং আপনার নেতৃত্বে কয়েকজন গিয়ে টিক্কাখানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন (৪ঠা এপ্রিল).

গোলাম আযমঃ আমার নেতৃত্বে না, নূরুল আমীন সাহেবের নেতৃত্বে। নেজামে ইসলাম পার্টি, মুসলিম লীগ; আমরা ওনার সঙ্গে দেখা করে বললাম যে, এই যে ২৫শে মার্চে যে আচরণ করা হয়েছে পাবলিককে মারা হয়েছে, এটা করলে তো জনগনের সমর্থন আপনারা পাবেন না, এটা কেন করলেন? তিনি বললেন যে, যে বিদ্রোহ হয়েছে, এ বিদ্রোহ দমন করার জন্য এটা ছাড়া আমাদের উপায় ছিল না। মানে নয়া বাজার পুরাই পুড়াইয়া দিয়েছে, ঐ যে কাঠের দোকান গুলো ছিল, এখন কি কাঠের দোকানগুলি আছে কি না আমি জানি না, সেগুলি সব পুড়াইয়া দিয়েছে, তারপরে শেল নিক্ষেপ করেছে, আমার বাড়ীতেও শেল এসে পড়েছে, তো, উনি বললেন যে আর হবে না, এই বিদ্রোহ দমন করার জন্য এটা করতে বাধ্য হয়েছি। তো, আমরা বললাম যে দেখেন, সেনাবাহিনী ময়দানে নামলে বাড়াবাড়ি তারা করে, দেশের সেনাবাহিনী দেশের জনগনের সঙ্গেও বাড়াবাড়ি করে, তো বাড়াবাড়ি করলে জনগন প্রতিকারের জন্য কার কাছে যাবে? রাজনৈতিক দলের কাছেই তো আসবে। তো, যেহেতু আ’লীগের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সব দেশ থেকে চলে গেছে সব ভারতে, এখন আমাদের কাছে তারা আসে, আমরা তাদেরকে কি করবো? আমরা এটুকু সুযোগ চাই যে, আমাদেরকে এ সুযোগ দেন, আমাদের কাছে যদি কোন কমপ্লেইন আসে, তাহলে যেন সে কমপ্লেইন আপনাদের কাছে পেশ করতে পারি এবং প্রতিকার করা সম্ভব হয়। তো ব্রি: রাও ফরমান আলী খান, উনি বসতেন গভর্নর হাউজে, যদিও টিক্কা খান গভর্নর ছিলেন এবং চীফ মার্শাল এডমিনিস্ট্রেটর ছিলেন, ইনি বসতেন ক্যান্টনমেন্টে। আমরা সেখানেই দেখা করেছি তার সঙ্গে। তখন সঙ্গে সঙ্গে তিনি ফরমান আলী খানকে হুকুম দিলেন যে জরূরী টেলিফোন সব দিয়া দেন, যাতে তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে এবং কমপ্লেইন করতে পারে এবং এটার জন্যই শান্তি কমিটি করা হয়েছিল, শান্তি কমিটির কাজ এটাই ছিল।


সিরিয়ালি আসা যাক। ৪ এপ্রিল টিক্কা খানের সঙ্গে নুরুল আমিনের নেতৃত্বে ১২ জন ইসলামপন্থী দলের সাক্ষাতের কাহিনী প্রথম পর্বেই আলোচনা হয়েছে, সেখানে কি কি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে সেটাও উল্লিখিত। বিস্তারিত বলা হয়েছে শান্তি কমিটির গঠন প্রক্রিয়া নিয়েও । তবে গোলামের ভার্সন ভিন্ন। আত্মজীবনিতে সে এই কমিটি গঠনের দায় চাপিয়েছে মৌলভী ফরিদের উপর, যে কিনা জামাতের সঙ্গে মতপার্থক্যের জন্য আলাদা ভাবে ‘ইস্ট পাকিস্তান পিস অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি’ খুলেছিলো মওলানা নুরুজ্জামানকে সাথে নিয়ে। একইভাবে গোলাম বইয়ের মতো টিভিবক্তব্যেও এড়িয়ে গেছে টিক্কা খানের সঙ্গে শান্তি কমিটি বিষয়ে এক সপ্তাহে তিন তিনবার সাক্ষাতের কথা (যা প্রমাণসহ দাখিল করা হয়েছে প্রথম পর্বে)। কারণটা ইতিমধ্যে পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার কথা। শান্তি কমিটির অন্যতম সংগঠক এবং শীর্ষ নেতা হিসেবে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে যে যুদ্ধাপরাধের দায় তার ওপর চাপে সেটা মিথ্যাচারের মাধ্যমে এড়িয়ে যাওয়া। প্রসঙ্গত যে কথাটা না বললেই নয়, নুরুল আমিনের নেতৃত্বে টিক্কা খানের কাছে গেলেও শান্তি কমিটির কোনো পদেই নুরুল আমিন ছিলো না। নিচে ৭ এপ্রিল বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হওয়া একটি সরকারী প্রেসনোট, যেখানে বলা হয়েছে গোলাম আযম আগের দিন অর্থাৎ ৬ এপ্রিল আলাদাভাবে টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং অন্যদের মতো সেনাবাহিনীকে সবধরণের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। দুই সাক্ষাতে মাত্র একদিনের গ্যাপ! অথচ কথা সেই একই- সবধরণের সহযোগিতা!



…এবং আমিতো অনেক লোককে সেভ করেছি, তাদেরকে জীপ থেকে উদ্ধার করেছি। একজন এখনো বেঁচে আছেন, সাইফুদ্দিন (পাশে একজনকে প্রশ্ন করে গোলামা জানতে পারে সে অনেক আগেই মারা গেছে ) । আমি দুপুরে খাচ্ছি, তার ওয়াইফ এসে বারান্দায় কান্নাকাটা করছে। কি ব্যাপার? বললো যে ওনাকে ধরে নিয়া গেছে, তো আমি পার্টিকুলারস নিলাম। রাও ফরমান আলী আমাকে বলেছিলেন যে সার্কিট হাউজে ব্রিগেডিয়ার কাশেম বসে, কোন কমপ্লেন হলে ওনার কাছে আগে বলবেন। আমি ওনাকে ফোন করলাম। এরপরে, দু’দিন পরে বোধহয়, ঐ লোকের নাম সূর্য মিয়া, ডাক নাম ছিল সূর্য মিয়া, উনি আমার বাড়ী এসে পৌছলেন। আমি জিজ্ঞাস করলাম, কেমন করে আসলেন, কিভাবে আসলেন? বললেন যে সার্কিট হাউজের ওখানে আর্মির গাড়ীতে আমাকে নিয়া আসছে, এবং লাথি দিয়া আমাকে গাড়ী থেকে ফেলে দিয়েছে, এ কথা বলে যে, গোলাম আযম নাকি কে সুপারিশ করছেন তোর পক্ষে, তো যা, এই বলে গাড়ী থেকে লাথি দিয়া আমাকে ফেলে দিল, আমি সেন্সলেস হয়ে গেলাম, তারপর যখন নাকি সেন্স ফিরেছে তারপরে একটা রিক্সা ডেকে আমি ডাকলাম, এই রিক্সাতে উঠে আপনার বাড়ীতে আসছি। এইভাবে মানুষের যেটুকু সম্ভব খেদমত করেছি।…




অনেক লোকের কথা গোলাম বলেছে বটে, কিন্তু তার জীবনে একটাই উদাহরণ দেখা গেছে সেটা সূর্য মিয়া। গোলামের আত্মজীবনীতেও একই কাহিনী একইভাবে পরিবেশিত হয়েছে। নামটা সে সময়কার প্রথা অনুযায়ী সুরুজ মিয়া না হয়ে স্মার্টলি সুর্য রাখার পিছনে একটু বাঙালীয়ানা (মানে হিন্দুয়ানা) জাতীয় কৌশলী ব্যাপার আছে। সেটা আরেকটু প্রকট হয় যখন আত্মজীবনীতে গোলাম লেখে: ডাক নাম সূর্য মিয়া, আসল নাম সম্ভবত (!) সাইফুদ্দিন। ফার্স্ট ক্লাস কনট্রাকটর। শেখ মুজিবের আত্মীয়। আরও জানলাম সুর্য মিয়া আমার ছোট ভগ্নিপতি মগবাজারের কাজী সাহেবের সাথে সম্পর্কে খালাতো ভাই। কাজী সাহেবকে ফোন করে জানলাম যে খুবই ভালো লোক। রাজনীতির ধারে কাছেও নাই। শেখ মুজিবের আত্মীয় হওয়া ছাড়া তার আর কোনো অপরাধ নাই। (যাক লতায় পাতায় গোলাম আযমও শেখ মুজিবের আত্মীয় বের হলো তার এই দাবিনামায়!)। কাহিনীতে থার্ড টুইস্ট, তাকে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠক সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়েছে। তো এক ঢিলে গোলাম তিন পাখি মারলো এই উপকারী উদাহরণ দিয়ে, বোঝালো মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক কিংবা বাঙালী নাম সমস্যা না (শান্তি কমিটির দায়িত্ব নিয়ে গোলাম প্রথম যে কাজ করেছে তা হলো ঢাকা শহরের ২০৪টা সড়ক, লেন ও রাস্তার নাম বদলিয়ে মুসলমানি নাম রাখা)। এমনকি মুজিবের আত্মীয় হলেও তাকে বাঁচাতে কার্পন্য করেনি সে। আত্মজীবনিতে এই কাহিনীতে আরো বাড়তি ব্যাপারস্যাপার আছে। ভীত সুর্য মিয়া বাড়িতে না ফিরে তার চার যুবতী কন্যাসহ গোলামের বাসাতেই আশ্রয় নেয়। একমাস পর পাশের বাড়ির দোতলা ভাড়া করে তাদের রাখে গোলামের ছোটো ভাই মোকাররম। এবং সুর্য মিয়া প্রতিদান চুকায় বিজয়ের পর। ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের হামলার আশঙ্কায় গোলামের পরিবার পরিজন তার বাড়িতেই আশ্রয় নেয়।




বাস্তবে আমরা সিরু মিয়া নামের একজনের অস্তিত্ব খুজে পাই । পবিত্র রমজানের শুরুতে আনোয়ারা নামে একজন মহিলা তার দূর সম্পর্কের আত্মীয় মোহসিনকে ধরে গোলাম আযমের সাহায্যপ্রার্থী হয়। খিলগাও গভর্মেন্ট হাইস্কুলের শিক্ষক মোহসিন গোলামের দুই ছেলেকে প্রাইভেট পড়াতেন। আনোয়ারার আর্জি ছিলো তার স্বামী দারোগা সিরু মিয়া এবং একমাত্র ছেলে ক্লাস এইটের ছাত্র আনোয়ার কামালকে পাকিস্তানীদের হাত থেকে বাঁচানো যাদের কুমিল্লা জেলে রাখা হয়েছে। গোলাম সব শুনে একটি চিঠি লিখে দেয় এবং সেটা কুমিল্লা জেলা রাজাকার প্রধানকে দিলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেয়। ১ নভেম্বর আনোয়ারার ভাই ফজলু চিঠিটি নিয়ে কুমিল্লা যান, রাজাকার কমান্ডারকে চিঠি দেন। সে চিঠি পড়ে জানায় ঈদের পরদিন সিরু মিয়া আর তার ছেলেকে ছেড়ে দেওয়া হবে। প্রতিশ্রুতিমতো ফজলু ঈদের পরদিন কারাগারে গেলে তার হাতে সিরু মিয়া ও কামালের জামা-কাপড় তুলে দেওয়া হয়। ঈদের দুইদিন আগে তিতাসের পাড়ে ৪০ জন স্বাধীনতাকামীর সঙ্গে গুলি করে মারা হয় সিরু মিয়া ও তার ১৪ বছর বয়সী সন্তান কামালকে। গোলাম চিঠিতে লিখেছিলো: এই মহিলাকে তার স্বামী ও সন্তানের কাপড় ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। কতটা নির্মম হলে মানুষ এমন রসিকতা করতে পারে!



গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ৬২টি অভিযোগের মধ্যে একটি হত্যাকাণ্ড সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ, সেটি এই সিরু মিয়া ও তার সন্তানের হত্যাকাণ্ড। গোলামের এই চিঠিটির উল্লেখ করেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং। ১৯৯২ সালের ১৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে তখনকার বিরোধী নেত্রীর ভূমিকায় তিনি গোলাম আযমকে সিরু মিয়া হত্যাকাণ্ডের দায়ে সরাসরি অভিযুক্ত করে বলেন:
মাননীয় স্পিকার,এটা অত্যন্ত দূর্ভাগ্যজনক বিষয় যে এতদিন পর আমাদের প্রমাণ করতে হচ্ছে যে গোলাম আযম রাজাকার প্রধান ছিলেন কিনা? গোলাম আযম যে একজন হত্যাকারী ছিলেন, তার একটি প্রমাণ আমি এখানে দিচ্ছি। হোমনা থানার প্রতিনিধি নিশ্চয়ই এখানে আছেন। কুমিল্লার হোমনা থানার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জনাব সিরু মিয়া দারোগা ও তার কিশোর পুত্র আনোয়ার কামালকে গোলাম আযমের লিখিত পত্রের নির্দেশে হত্যা করা হয়। সিরু মিয়া দারোগা মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিন থেকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ট্রেনিং ও অপারেশন চালাতেন। '৭১এর ২৭ অক্টোবর সিরু মিয়া দারোগা এবং তার কিশোর পুত্র আনোয়ার কামাল মুক্তিযুদ্ধে ট্রেনিং ক্যাম্পে যাওয়ার সময় অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে। সিরু মিয়া মুক্তিযুদ্ধে অনেক দুঃসাহসিক কাজ করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কাজ করেছিলেন যে তিনি আমাদের প্রবাসী বিপ্লবী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের স্ত্রী বেগম তাজউদ্দিনকে সপরিবারে কুমিল্লা সীমান্ত পার করে পৌছে দিয়েছিলেন। সেই সিরু মিয়াকেও গোলাম আযমের নির্দেশে হত্যা করা হয়েছিলো। তার নজির ও প্রমাণ (একখানা কাগজ দেখিয়ে) এই কাগজে রয়েছে। আপনি চাইলে এই কাগজও আপনার কাছে দিতে পারি।


গোলামের নির্দেশনামার নজীর ও প্রমাণ কিংবা তার অনুলিপি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আছে। এবং এই একটি অভিযোগই তাকে ফাঁসিতে চড়ানোর জন্য যথেষ্ট বলে বিবেচিত বলে আমার ব্যক্তিগত অভিমত। গোলামের বড়াই শুনে আরেকটি প্রাসঙ্গিক ঘটনা না জানিয়ে পারছি না। মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নজরুল ইসলামও মার্চের সেই দিনগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিলেন মগবাজারে এক আত্মীয়ের বাসায়। তিনি ভারত যাওয়ার পর তার পরিবার ছিলো সেখানে, গোলাম আযম ছিলো তার প্রতিবেশী। ২৫ মার্চের আগে গোলামের সঙ্গে কথাবার্তাও বলেছেন নজরুল। অথচ ২৭ মার্চ সেই বাড়িটি ঘেরাও করে মেশিনগানের গুলিবর্ষন করেছে পাকবাহিনী । বর্তমান মন্ত্রী আশরাফুল ইসলাম ও তার ভাইরা দেয়াল টপকে পালিয়ে প্রাণে বেঁচে যান। গোলাম আযম এগিয়ে আসেননি তার বিপন্ন এই প্রতিবেশীদের বাঁচাতে। অথচ সে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সন্দেহে আটক শেখ মুজিবের এক আত্মীয়কে রক্ষা করে বলে মিথ্যে গল্প ফাঁদে। সারা দেশে আর একজন মানুষও নাই যে এগিয়ে এসে বলবে যে গোলাম আযম আমাকে বা আমার পরিবারকে মুক্তিযুদ্ধের সময় রক্ষা করেছিলো! অথচ সিরু মিয়ার সঙ্গে সূর্য মিয়ার ঘটনার কি কাকতালীয় মিল, শুধু গোলামের ভূমিকাটুকু বাদে।

…যারা অন্যান্য পার্টির লোক ছিল, মুসলিম লীগ ছিল, ডেমোক্রেটিক পার্টি ছিল, নেজামে ইসলাম পার্টি ছিল, আমি এরকম অভিযোগ পেয়েছি যে তারা এরকম কমপ্লেইন করে কিছু কামাইও করেছে, খেদমত করেছে কিন্তু টাকা পয়সা কামাইও করেছে। তো এই কাম তো আর আমি করতে পারি নাই। তো এভাবে আমরাতো আর কিচ্ছুই করতে পারি নাই।…




গোলাম আযমের উচ্চাকাঙ্খা এসব খুচরা লাভের আশায় আটকে ছিলো না। তার স্বপ্ন ছিলো জামাতকে আওয়ামী লীগ ও কম্যুনিস্ট মুক্ত পূর্ব পাকিস্তানে এক নম্বর রাজনৈতিক দল হিসেব প্রতিষ্ঠা। সুবাদেই প্রধানমন্ত্রীর মতো বড় পদে যাওয়া। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে তার ‘পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রধানমন্ত্রী করতে হবে’ দাবিতে সাড়া দিয়ে যখন নুরুল আমিনকে বিবেচনায় আনলো ইয়াহিয়া, গোলাম তাতে সমর্থন দিলেও খুশী মনে মেনে নেয়নি। আর নুরুল আমিনের পিডিপি স্বয়ং অভিযোগ এনেছে জামাতের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডের (দ্বিতীয় পর্বে)। নভেম্বরের শেষটুকু দীর্ঘ লবিং করেও গোলামের ভাগে শিকে ছেড়েনি। বরং ভু্ট্টো পরিহাসের সুরেই বলেছেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের কিছু বাতিল নেতা ক্ষমতার ভাগ নিতে দিনরাত লাহোর-ইসলামাবাদ-করাচি করে যাচ্ছে অথচ এই সংকটময় মুহূর্তে তাদের উচিত পূর্ব পাকিস্তানের জনগনের পাশে থাকা, সেখানেই তাদের বেশী প্রয়োজন।’ পিপিপির ভাইস চেয়ারম্যান মিয়া মাহমুদ আলী কাসুরী ১১ নভেম্বর এক বিবৃতিতে সরাসরিই গোলাম আযমকে অভিযুক্ত করেছেন যে গোলাম আযম শেখ মুজিবের জায়গা দখল করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। অন্যদিকে মওলানা কাওসার নিয়াজী গোলাম আযম ও জামাতের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন আল-বদর গঠন করে বামপন্থীদের নির্মূলের। জবাবে, ১২ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বিবৃতি পাঠ করে গোলাম বলে, "Unable to refute the accusation that leftists were - supporting the secessionist movement in East Pakistan, Moulana Kausar Niazi has brought charges against Gholam Azam and the Al-Badr."

গোলাম আযমঃ …আর্মির সঙ্গে সহযোগিতা করার সুযোগ কি, সহযোগীর কোন, আর্মির কাজ হচ্ছে আর্মস দিয়ে কাজ করার, আমরা কি সহযোগিতা করবো। তারপরে, তাদের বিরোধিতা করা, বিরুদ্ধে কোন কথা বললেও পত্রিকায় তো আসে না।…




আগের দুটো পর্ব পড়া থাকলে এই কথার পর পাঠক অট্টহাসি দিলে অবাক হবো না। সবধরণের সহযোগিতা দিয়ে শান্তি কমিটির মতো সংগঠনের যাত্রা শুরু যার মাধ্যমে, রাজাকার-আল বদরের মূলশক্তির উৎস যে রাজনৈতিক দল- তার প্রধানের মুখে এমন ডাহা মিথ্যে শুনলে একজন ভন্ড ধর্ম ব্যবসায়ীকে চাক্ষুস দেখার পুলক মিলে বটে, তবে সেটা সুখানুভূতি নয়। বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হওয়া ২১ জুন তার সুপারিশটা একটু পড়ে দেখুন:



গোলাম আযমঃ …এই ২৫শে মার্চের ২ দিন পরে বোধহয় কেরানীগঞ্জেও এরকম হত্যা করা হলো। না, আরো কয়দিন পরে। মানে, টিক্কা খানের সঙ্গে আমার দেখা করার পরের দিনই আমি শুনলাম যে আমাদের লোকও মারা পরছে এই কেরানীগঞ্জে। আমি টেলিফোন করে টিক্কা খানকে বললাম, আপনি বলছেন যে আর এ রকম হবে না, এই যে এই কেরানীগঞ্জে হলো? বললো যে, আমাদের কাছে কমপ্লেইন এসেছে যে, ঢাকা থেকে পালাইয়া এরা, যারা আমাদের বিদ্রোহী, তারা কেরানীগঞ্জে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে, সে জন্য আমরা এটা করেছি। আমি বললাম, আবার তো করলেন, কিন্তু মরলো তো সাধারণ লোক, যাদের বিরুদ্ধে আপনাদের অভিযোগ তারা তো সেখান থেকে পালাইয়া গেছে, চলে গেছে ইন্ডিয়া, এ সাধারণ লোক মরলো। তো, এইভাবে যতটা সম্ভব প্রতিকার করার চেষ্টা হয়েছে।…


কেরানীগঞ্জের গণহত্যার ঘটনা নিয়ে সিদ্দিক সালিক ভিন্ন কথা বলেছেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী ডানপন্থী রাজনীতিবিদরা কেউ কেউ তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূলের কাজেও যে ব্যবহার করতো তার একটা উদাহরণ সালিক দিয়েছেন কেরানিগঞ্জের ঘটনায়:
…Some of them were genuinely interested in the integrity of Pakistan and they risked their own lives to cooperate with the Army, but a few of them also used their links with the Army to settle old score with pro-AL people. For instance, a rightist politician arrived one day in Martial law headquarters with a teen aged boy. He met me by chance on the Veranda and whispered in confidence that he had some vital information to impart about the rebels. I took him to the appropriate authority where he said that the boy, a nephew of his, had managed to escape from a rebels' concentration in Keraniganj across the Burhi Ganga River. The boy added that the rebels not only harassed the locals but also planned to attack Dacca city at night.
A 'cleaning operation was' immediately ordered. The commander of troops was briefed. The field guns, mortars and recoilless rifles were readied to 'soften' the target in a pre-dawn bombardment. The troops were to make a pincer move to capture it at day-break. I watched the progress of the action in the operations room where the gunfire was clearly audible. Soon some automatic weapons also joined the battle. Many people feared that the attacking battalion might not be able to bag all the 5,000 rebels reported in the locality. The operation was over after sunrise. It was confirmed that the target had been neutralised without any casualties to our troops.In the evening I met the officer who carried out the attack. What he said was enough to chill my blood. He confided. 'There were no rebels, and no weapons. Only poor country-folk, mostly women and old men got roasted in the barrage of fire. It is a pity that the operation was launched without proper intelligence. I will carry this burden on my conscience for the rest of my life'…(Witness to Surrender: page 94-95)


ভাবানুবাদ এরকম: (ডানপন্থী ইসলামীদলগুলোর) অনেকেই অখন্ড পাকিস্তানের ব্যাপারে আন্তরিক থাকলেও এদের অনেকে আবার সেনাবাহিনী ষঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে ব্যবহার করে আওয়ামীপন্থীদের নির্মূলে কাজে লাগিয়েছে। যেমন একদিন এক ডানপন্থী নেতা এক কিশোরকে সঙ্গে নিয়ে সামরিক প্রশাসকের দপ্তরে এলেন। বারান্দায় তার সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গেলো, আমাকে চুপিসারে বললো বিদ্রোহীদের (স্বাধীনতাপন্থী) ব্যাপারে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। আমি তাকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়ে যাওয়ার পর সে জানালো সম্পর্কে তার ভাগ্নে/ভাতিজা কিশোরটি বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জ থেকে পালিয়ে এসেছে, সেখানে বিদ্রোহীদের বিশাল একটি দল অবস্থান করছে।
সঙ্গে সঙ্গে ‘নির্মূল অভিযান’-এর আদেশ এলো। সেনাদের অধিনায়ককে ব্রিফ করা হলো। ভোরের আগেই গোলন্দাজ আক্রমণে এলাকাটা নিয়ন্ত্রণে আনার সুবিধার্থে ফিল্ডগান, মর্টার এবং রিকয়েলেস রাইফেল ব্যবহার করা হলো। দিনের শুরুতেই সেনারা জায়গাটা দখলে নিতে ইচ্ছুক। আমি অপারেশন রুমে থেকে অভিযানের অগ্রগতি দেখলাম, গোলার শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিলো সেখান থেকে। কিছুক্ষণ পর সেখানে যুক্ত হলো স্ব্য়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির আওয়াজ। অনেকেই ভয় পাচ্ছিলেন আক্রমণকারী ব্যাটেলেয়নটির পক্ষে হয়তো ৫ হাজার বিদ্রোহীদের সবাইকে আয়ত্বে আনা সম্ভব হবে না। ভোরের পরপরই অভিযান শেষ হয়ে গেলো। নিশ্চিত করা হলো আমাদের পক্ষে কোনো হতাহত ছাড়াই জায়গাটা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। সন্ধ্যায় অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া অফিসারের সঙ্গে দেখা করলাম। সে যা বললো শুনে রক্ত হীম হলে এলো আমার। সে চুপিসারে জানালো, ‘ওখানে কোনো বিদ্রোহী ছিলো না। বিরামহীন গুলির শিকার সব এলাকার গরীব লোকজন, বেশীরভাগই নারী এবং বৃদ্ধ যারা ওই আগুনের কুন্ডলীতে সেদ্ধ হয়েছে। দুঃখজনকভাবে ভালোমতো খোজ না নিয়েই অভিযানের আদেশ দেওয়া হয়েছে। সারাজীবন আমার বিবেকের কাছে এজন্য দায়বদ্ধ থাকবো আমি।’

মিথ্যে তথ্য দিয়ে এমন গণহত্যার ঘটনা অসংখ্য ঘটেছে গোটা একাত্তর জুড়ে। সেই গণহত্যার ধরণটা কেমন তার একটি ফুটেজ দিয়ে আবারও আমাদের ঝিমিয়ে পড়া বিবেককে জাগিয়ে তুলি:


গোলাম আযমঃ …পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস ১৪ই আগস্ট। ১৪ই আগস্টে কার্জন হলে নূরুল আমীন সাহেবের নেতৃত্বে, সভাপতিত্বে জনসভা হলো। সে জনসভায় আমার আগে দু’একটা বক্তৃতা হয়েছে, আমার বক্তৃতা থেকে আমি এই অভিযোগ বললাম যে, এ আর্মি যে সমস্ত কাজ করছে এ কাজের দ্বারা জনগণ পাকিস্তান বিরোধী হয়ে যাচ্ছে। তারা পাকিস্তান এক রাখার জন্য কাজ করছে বলে দাবী করে, অথচ পাকিস্তান ভাংছে তাদের কাজে। পাকিস্তান টিকবার কোন আমি সম্ভাবনা দেখি না। আমার বক্তৃতার পরে যারা বক্তৃতা করেছেন তাদের এই লাইনেই বক্তৃতা করতে হয়েছে।…




‘সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া দেশকে উদ্ধার করার বিকল্প ছিলো না’- দুদিন পরপর বিভিন্ন বক্তৃতায় এ বয়ান দিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলা গোলামের আরেকটি মিথ্যাচার এটি। জনসভা নয়, শান্তি কমিটি আয়োজিত একটি সিম্পোজিয়াম ছিলো এটি। সেখানে প্রত্যেকের বক্তৃতার রেকর্ড আছে। গোলাম সেনাবাহিনীর সমালোচনা করেছে আর সবাই তাকে অনুসরণ করেছে কথাটা সত্যি নয়। বরং সে সেনাবাহিনীকে অনুরোধ করেছে শান্তি কমিটির উপর আস্থা রাখতে, দেশের জনগণকে বোঝানোর ভারটা তাদের ওপরই ছেড়ে দিতে। গোলাম অবশ্য আত্মজীবনিতে বেশ ফুলিয়ে ফাপিয়েই লিখেছে তার সেদিনের বক্তৃতার কথা। টিভিতে বলেছে তার আগে দুয়েকজন বক্তৃতা দিয়েছে, কিন্তু জীবনিতে লিখেছে তার আগের দুজন তখনো আসেনি বলে তাকেই প্রথম বক্তৃতা দিতে হয়। ইত্যাদি ইত্যাদি।



আসল কাহিনী সে সময় শান্তি কমিটির সঙ্গে বেসামরিক প্রশাসনের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চরমে ওঠে। জেলা ও মহকুমা প্রশাসক থেকে শুরু করে পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও সেনা পদলেহনের সুবাদে শান্তি কমিটি নেতাদের খবরদারিতে অতীষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। একইসঙ্গে বিহারী ও অবাঙ্গালীদের নিয়ে গড়া ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সেসের (ইপিসিএএফ) কাছেও রাজাকারদের হেনস্থা হতে হচ্ছিলো প্রায়ই। তারা রাজাকারদের নিয়ে কোনো যৌথ অভিযানে যেতে চাইতো না, অথচ পত্রিকাগুলোয় ফলাও করে ছাপা হতো এদেরই সাফল্যের কীর্তি।



শান্তি কমিটির কার্যক্রমে কোনো বিধি আরোপ হলে কিংবা তাদের ক্ষমতা খর্ব করা হলে জামাতের এজেন্ডা বাস্তবায়নে বিপর্যয় ঘটে যেতো। এ কারণে একই দিন দৈনিক সংগ্রামে দুটো উপসম্পাদকীয় ছাপা হয় একটিতে শান্তি কমিটির কিছু বাড়াবাড়ির সমালোচনা করে, এবং অন্যটিতে এর অপরিহার্যতা বর্ণনা করে। ‘শান্তি কমিটির কর্তব্য ও গুরুত্ব’ শিরোনামে লেখা হয়, ‘পূর্ব পাকিস্তান শান্তি কমিটির বয়স আজ সাড়ে চার মাস অতিক্রান্ত হতে চলেছে। তবে শান্তি কমিটির অপ্রশংসনীয় কাজ যে আদৌ নেই তাও বলা চলে না। কারণ দেশের মানুষ দিয়েই শান্তি কমিটি গঠিত। আকাশের ফেরেশতাদের দ্বারা নয়। তাই দেশের মানুষও যেমন ভুলত্রুটি মুক্ত নয়, তেমনি মুক্ত নয় তাদের নিয়ে গড়া শান্তি কমিটি। এ কারণেই কোথাও বা শান্তি কমিটি নাকি অশান্তি কমিটিরই নামান্তর হয়ে দাড়িয়েছে।’ শান্তি কমিটির ভাবমূর্তি ফেরাতেই জামাতের অপরিহার্যতার ইঙ্গিত দিয়ে ‘শুধু সেনাবাহিনী পাকিস্তানকে বাঁচাতে পারবে না’ শিরোনামে বলা হয়,
‘ভুলে গেলে চলবে না পাকিস্তানের নেতা উপনেতা খতম হলে জনতাও হতাশ পড়বে। তখন শুধু সেনাবাহিনী পাকিস্তানকে বাঁচাতে পারবে না। এ কারণেই আজ সবচেয়ে প্রয়োজন হচ্ছে নিখুঁত ও এককেন্দ্রিক শান্তি কমিটি ও তার অধীনে নির্ভেজাল ও প্রয়োজনীয় রেজাকার বাহিনী। এ দুটো সংগঠন যদি সুষ্টভাবে চালু হয়ে যায় তাহলে সেনাবাহিনী যেমন বহিঃশত্রুর মোকাবেলায় পূর্ণ আত্মনিয়োগ করতে পারবে, তেমনি শান্তি কমিটি ও রেজাকার বাহিনী পঞ্চম বাহিনীকে শায়েস্তা করার জন্য যথেষ্ট হবে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য ভারতীয় গেরিলাদের বিরুদ্ধে পাল্টা গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলার ব্যাপারেও গভীরভাবে বিবেচনা করা উচিত।’



মূলত গোলাম আযম ও তার সঙ্গীদের শান্তি কমিটির কর্তৃত্ব অক্ষুন্ন রাখার ওই দাবিনামা মানতে বাধ্য হয় সামরিক আইন প্রশাসন এবং এই মর্মে নির্দেশ জারি করা হয় যে বেসামরিক প্রশাসনিক কর্মকর্তারা (ডিসি, মহকুমা অফিসার, টিএনও ইত্যাদি) শান্তি কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তাতে সংশ্লিষ্ট সামরিক প্রশাসনের অনুমোদন নেবে। মুখে বললেই হবে না, স্বপক্ষে প্রমাণও দাখিল করতে হবে। তাই এর একটা নমুনা নীচে দেওয়া গেলো। ৩০ আগস্ট এই চিঠিটি পাঠানো হয় যশোর সহকারী সামরিক আইন প্রশাসকের দপ্তর থেকে, যাতে সইকরেছে মেজর মোহাম্মদ আমিন। রাজাকারদের বেতন নিয়মিত পরিশোধ হচ্ছে তার নিশ্চয়তা চেয়ে পাঠানো প্রশাসনিক চিঠিটির অনুলিপি যশোরের ডিসির পাশাপাশি যশোর জেলার শান্তি কমিটি সভাপতির কাছেও দেওয়া হয়েছে। ৭ সেপ্টেম্বর এ ব্যাপারে আরো তথ্য চেয়ে ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে তা ফরোয়ার্ড করা হয়েছে যশোর শহর শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানকে।



রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিবেদিতপ্রাণ অনুচর শান্তি কমিটির মর্যাদা যে বেসামরিক প্রশাসনের বরাবর ছিলো তার আরেকটি প্রমাণ ওই যশোরের ডেপুটি কমিশনার অফিস থেকে পাঠানো একটি নির্দেশনা যাতে সই করেছেন সহকারী ডেপুটি কমিশনার তাজুল ইসলাম। যশোর সদর, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও নড়াইলের সাব ডিভিশনার অফিসারদের (এসডিও) পাঠানো ওই সরকারী চিঠিতে নিহত রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যদের রিলিফের আটা বিলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এজন্য এলাকাপ্রতি বরাদ্দ আটার পরিমান (মন হিসেবে) উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারী চিঠিটির নীচেই এর অনুলিপি পাঠানো হয়েছে যশোর সামরিক আইন প্রশাসকের দপ্তরে যেখানে পুরা সিদ্ধান্তটি তাজুল ইসলামের চেম্বারে শান্তি কমিটির জেলা সভাপতির উপস্থিতিতে সামরিক আইন প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে বলে লেখা হয়েছে।



সামরিক বাহিনীর সমালোচনা দূরে থাক, পূর্ব পাকিস্তানে শান্তি ফেরাতে বেসামরিক প্রশাসন চালু ও সামরিক বাহিনীকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার রাজনৈতিক দাবিটির কড়া সমালোচনা করে উদ্বেগ জানায় সংগ্রাম ১ সেপ্টেম্বরের সম্পাদকীয়তে।





গোলাম আযমঃ …কিন্তু এসব তো কোনটাই পত্রিকায় আসে নাই। তখন তো পত্রিকা সেন্সরড হতো।
সাংবাদিকঃ তখন তো আপনাদের পত্রিকা ছিল, সংগ্রাম।

গোলাম আযমঃ পত্রিকা তো সেন্সরড হতো। পত্রিকার তো ক্ষমতা ছিল না যে স্বাধীন ভাবে ছাপায়। সেন্সর করে যা দিত তাই ছাপতে পারতো। বায়তুল মোকাররমে মিটিং করে আমি তাদের বিরুদ্ধে এই সমস্ত অভিযোগ করেছি, কোনটাই পত্রিকায় আসে নাই।

সাংবাদিকঃ আপনি কি এটা বলতে চাচ্ছেন যে ঐ সময়ের পত্রিকায় যা ছাপা হয়েছে আপনাদের নামে সেগুলি সব ভুল ছিল বা পাকিস্তানের চাপে পড়ে পত্রিকা ভুল সংবাদ প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছিল?

গোলাম আযমঃ ভুল সংবাদ প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছিল কিনা আমি বলতে পারি না, আমি বলতে পারি আমার বক্তব্য আসতে দেয় নাই পত্রিকায়। তাদের বিরুদ্ধে যেগুলি যায় সেগুলি কোন কথা আসতে দেয় নাই।

সাংবাদিকঃ এটা কি একদম সংগ্রামসহ সব পত্রিকায়?

গোলাম আযমঃ সব পত্রিকায়।


মিনিমাম হোমটাস্ক না করা বোকা সাংবাদিককে (এখন মনে হচ্ছে তাকে আসলে নির্দিষ্ট প্রশ্নপত্র সাপ্লাই করা হয়েছে জামাতের তরফে) এটা গোলামের ধূর্ত জবাব। এটা সত্যি যে সে সময় পত্রিকাগুলো সেন্সরশিপের আওতায় ছিলো। কিন্তু গোলাম তার জীবনি কিংবা টিভিতে নিজের যে সাধু ভাবমূর্তি দেখানোর প্রয়াস নিয়েছে একাত্তরে সে অবস্থানে সে কিংবা জামাতে ইসলামী ছিলো না। প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক, প্রচণ্ড হিংস্র ও প্রতিশোধপরায়ন মানসিকতা নিয়ে তারা এবং তাদের মুখপত্র সংগ্রাম সেনাবাহিনীর তাবেদারি করে গেছে স্রেফ স্বার্থহাসিলের লক্ষ্যে। তারা কস্মিনকালেও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো মন্তব্য করে নিজেদের বিপন্ন করার ঝুঁকিতে যায়নি। আর সংগ্রামে তাদের অজস্র অসংখ্য স্বাধীনতাবিরোধী কার্যক্রম, বক্তৃতা, বয়ান ও উস্কানীকে যদি কোনো সাংবাদিক পত্রিকার ‘ইচ্ছাকৃত ভুল সংবাদ’ বলে মুখে উত্তর তুলে দিতে চায় যুদ্ধাপরাধের অকাট্য সব প্রমাণের বিপরীতে, তার মেধা নিয়ে আসলেই প্রশ্ন জাগে।



গোলাম সে সূত্রেই বলতে পেরেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সে যেসব সমালোচনা করেছে সেগুলো পত্রিকায় আসেনি, সম্ভাবনা হিসেবে সাংবাদিকের কনফিউশনে বাতাস জুগিয়েছে ইচ্ছেকৃতভাবে তাদের মুখে কথা বসিয়ে দেওয়ার। এটা সত্যি সে সময় পত্রিকাতে সেন্সরশিপ ছিলো, সেনাকার্যক্রম কিংবা পাকিস্তানের অখন্ডতার বিরুদ্ধে যায় এমন কিছুর প্রকাশ ছিলো নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য। এবং যদি ধরেও নিই এই সেন্সরশিপের কারণে গোলামের যাবতীয় বক্তব্য ভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে এবং দৈনিক সংগ্রাম প্রতিদিন আসলে সেনাসদর থেকে পেস্টিং হয়ে প্রকাশিত হতো, তারপরও কথা থাকে।’৭১ এর ২ সেপ্টেম্বর পত্রিকা থেকে সেন্সরশিপ তুলে নেয় পাকিস্তান সরকার। এই ২ তারিখের পর থেকে গোলাম যেসব বক্তৃতা বিবৃতি দিয়েছে, উস্কানিমূলক নির্দেশনা দিয়েছে সেগুলোর দায় কি সে নেবে? জামাতে ইসলামী নেবে? ইসলামী ছাত্র সংঘের শীর্ষ নেতৃত্ব নেবে? সংগ্রাম নেবে? নিতে বাধ্য তারা। সেনাবাহিনীর তাবেদারি, মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাপন্থীদের হত্যা এবং বুদ্ধিজীবি হত্যাকাণ্ডের যাবতীয় উস্কানীমূলক বক্তব্য বিবৃতি ওই সেন্সরশিপ তুলে নেওয়ার পরেও দেওয়া হয়েছে। ২৫ সেপ্টেম্বর এক বক্তৃতার (২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত) বক্তব্য নীচে দেওয়া হলো যেখানে পাকিস্তান রক্ষায় জামাত কি কি করেছে তার উল্লেখ রয়েছে:



আগেই বলা হয়েছে সেন্সরশীপ চলাকালে অন্য পত্রিকাগুলোয় যখন পাকিস্তানী বার্তাসংস্থা এপিপির খবর দিয়ে পাতা সাজিয়েছে তখন জামাতের মুখপত্র সংগ্রামকে সে পথে হাটতে হয়নি। তারা শুরু থেকেই সেনাবাহিনীর পক্ষ নিয়ে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করার প্রয়াস পেয়েছে, বাকিরা যখন কোনোমতে টিকে থাকার লড়াইয়ে, সংগ্রাম তখন সার্কুলেশনে দেশের এক নম্বর পত্রিকা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। নমুনা মেলে ৪ সেপ্টেম্বরের সম্পাদকীয়তে। ‘সংবাদপত্রগুলোর ভূমিকা ছিলো জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার নামান্তর’ শিরোনামে পাকিস্তান সরকারের এই প্রেস সেন্সরশীপ আরোপের জন্য প্রতিপক্ষ সংবাদপত্রগুলোকে দায়ী করে রীতিমতো তুলোধুনো করা হয়। ইত্তেফাক, পূর্বদেশ, আজাদ, মর্নিংনিউজসহ যেসব পত্রিকা শুরু থেকে মুজিবের স্বাধীকার আন্দোলনকে সমর্থন এবং মার্চের শুরু থেকে অসহযোগ আন্দোলনের পক্ষ নিয়েছিলো তাদের অভিযুক্ত করে সংগ্রাম যা লেখে তা নিচের ছবিতে তুলে দেওয়া হলো। বলা বাহুল্য এসব পত্রিকার সেসব অকুতোভয় সাংবাদিককে জীবন দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছে ডিসেম্বরে, স্বাধীনতার প্রাকপ্রহরে।



বায়তুল মোকাররমে জনসভা খুব বেশী করেনি গোলাম আযম। একাত্তরে এপ্রিলের ওই শান্তিকমিটির শোভাযাত্রার পর ১৬ অক্টোবর একটি জনসভা করেছে সে জামাতে ইসলামীর। সেখানে বরং জামাত শান্তিকমিটির হয়ে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে দাবি করে সে বলে :"The Jamaat, in its atlempt to bring back normal conditions in the entire country, has been working tirelessly with the Peace Committee." এর প্রেক্ষিতটাও জানা প্রয়োজন। তখন ডক্টর মালেককে গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তার অধীনে এক মন্ত্রীসভাও গঠন করা হয়েছে যাতে ছিলো জামাতের দুজন- আব্বাস আলী খান ও সোলায়মান। রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে কিছু অংশে নতুন করে নির্বাচন হবে ঘোষণা দিয়ে সত্যি সত্যি ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে ইয়াহিয়া। পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রধানমন্ত্রী বেছে নেওয়া হবে এমনই এক জল্পনায় নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতেই ওই জনসভা আয়োজন করে জামাত। সেখানে আওয়ামী লীগ ও পিপলস পার্টিকে আঞ্চলিক দল সম্বোধন করে এর দুই নেতা শেখ মুজিব ও ভুট্টোকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যা দিয়ে গোলাম জামাত ও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বোঝানোর প্রয়াস পায়। সমালোচনা থেকে বাদ যায় না ন্যাপের দুই প্রধান ভাসানী এবং অধ্যাপক মোজাফফর, সাবেক প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান, দালাল রাজনীতিবিদ শাহ আজিজুর রহমানও (গোলামের নাগরিকত্ব ঝুলিয়ে দিয়েছিলো শাহ আজিজ এই একটা কারণেই)। আর তারই প্রেক্ষিতে গোলাম বলে: ‘দেশে একমাত্র বেসামরিক সরকারই স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে পারে। জামায়াতে ইসলামী গোটা দেশে বেসামরিক সরকার কায়েমের পথকে সুগম করার জন্যই শান্তি কমিটির মাধ্যমে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে…।’ তখন পত্রিকায় সেন্সরশীপ ছিলো না। সে যা বলেছে, তাই ছাপা হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায় নিখিল পাকিস্তান জমিয়াতে উলেমায়ে ইসলামের প্রচার সম্পাদক মওলানা আবদুল হাকিমের বক্তৃতা। ৯ সেপ্টেম্বর মর্নিং নিউজে এটি প্রকাশ হয়। সেখানে তিনি স্পষ্ট বলেছেন পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাবলী এই প্রদেশের প্রতি গত ২৪ বছরের বঞ্চনার কারণে ঘটেছে। গোলামের হিসেবে এখানে সামরিক শাসনের সমালোচনামূলক কথাবার্তা যথেষ্টই ছিলো। পাশাপাশি হাকিম দাবি তুলেছিলেন যাতে শান্তি কমিটিতে সব দলের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হয়:
E. Pak crisis Result of Injustices

The publicity secretary of the All Pakistan Jamiat-e-Ulama-e-Islam, Maulana Abdul Hakim, said in Dacca yesterday that the present situation in East Pakistan was the result of the injustice done to this province during the last 24 years, reports APP.

Addressing a press conference at Ahsan Manzil, Dacca yesterday morning, Maulana Hakim maintained that the country would not have faced such a crisis, had the majority province been allowed to enjoy its due share in all spheres of national life.

He expressed the hope that the future constitution of the country to be produced by the president should invariably incorporate the Islamic country principles of Justice so that no province could be deprived of its due share in future.

The Jamiat Publicity secretary felt that the first and foremost duty should be to restore confidence of the people of this providence. He appealed to all the political parties not to exploit the crisis in their own benefits or interests,

He also observed that in view of Indian threat the people in general, and the Razakars, in particular, should be given full military training (Fouji training). So that they could face the enemies till the arrival of armed forces in their aid.

Regarding the publicity and information media of the country, he emphasised the need for having more powerful transmission of Radio Pakistan, so that its programmes could be heard from foreign countries. "We must have to reply to the All India Radio; and BBC through our transmitting centres," he added.

He was also in favour of introducing Arabic programme so that the Arab countries might not misunderstand us in the circumstances. This was what the All India Radio and BBC were doing to mislead the Arabs about the situation in Pakistan, he continued.

He also suggested that the peace committee must be represented by members of all the political parties.



সাংবাদিকঃ গেল যে নির্বাচন, সে নির্বাচনের পর থেকেই তারা যখন জানতে পেরেছে যে ইসলামিক বিশেষ করে জামায়াত যদি বিএনপির সাথে এক হয় সেক্ষেত্রে তারা ক্ষমতায় আসতে পারবে না, সেহেতু তারা যুদ্ধাপরাধের এই বিষয়টা তারা সামনে এনেছে। এই সামগ্রিক যে প্রক্রিয়া, এই প্রক্রিয়াটাকে আপনি কিভাবে দেখছেন? এখন যে চলমান প্রক্রিয়াটা।

গোলাম আযমঃ মানে প্রক্রিয়া হইলো যে আ’লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ষড়যন্ত্র, আ’লীগ যাতে ক্ষমতায় যেগে পারে সেজন্য এটা একটা ষড়যন্ত্র। আওয়ামী লীগের বিকল্প যে দলটা তারা যাতে বিজয়ী হতে না পারে সেজন্য এটা ষড়যন্ত্র। যে উদ্দেশ্যে তারা কেয়ারটেকার সিস্টেম গুটাইয়া দিল, সে উদ্দেশ্যেই তারা এগুলি সব করছে।




এই অংশটা তার যুদ্ধাপরাধ ঢাকার সাফাই মাত্র। কারণ যুদ্ধাপরাধের বিচার আওয়ামী লীগের দাবি না, এটা কোনো রাজনৈতিক দাবি না। এটা জনগনের দাবি, শহীদ, বীরাঙ্গনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্বজনদের দাবি। ‘৭৫এ জাতির জনক হত্যার পর সব আইন বিলুপ্ত করে আবারও অধিষ্ঠিত এসব ঘাতক দালালের বিচার করতে হলে উপায় ’৭৩ এর ওই বিশেষ আইনটি। আর তা বাস্তবায়িত করতে চাই মুক্তিযুদ্ধমনস্ক এবং বিচারের প্রতি সহানুভূতিশীল কোনো সরকার যারা বাদি হয়ে মামলা করবে এদের বিরুদ্ধে। গত নির্বাচনে সেই প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় এসেছে আওয়ামী লীগ। সেটা বাস্তবায়ন করছে তারা জনগনের চাপেই। নিজের সাফাইয়ে গোলামের এজাতীয় মিথ্যাচার নতুন কিছু নয়,স্বাধীনতা বিরোধীতায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়া দলটির নেতা গোলামের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়া দলটির প্রতি বিদ্বেষ বেশ প্রাচীন, যার বর্ননা ছত্রে ছত্রে মেলে তার আত্মজীবনিতে। বরং মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা বাঙালী জাতীয়তাবাদ যে আসলে একটি হিন্দুয়ানি কনসেপ্ট এবং এটি মানা মানে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলমানদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়া, ভারতের দাসত্ব বরণ করা- এমন উদ্ভট তত্ব একমাত্র গোলামের মতো ফ্যানাটিকের মাথা থেকেই আসতে পারে।



আওয়ামী লীগকে ছোট করতে এবং নিজের যুদ্ধাপরাধ ধামাচাপা দিতে ইতিহাস বিকৃতি ও ফ্যাক্ট টুইস্টিংয়ের চরম উদাহরণ দিয়েছে সে, যেমন ৭ মার্চ মুজিবের জয় পাকিস্তান বলা, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের জয়গান এবং স্বাধীনতা মানে আসলে ভারতের কাছে পাকিস্তানের পরাজয়- প্রতিটি বাক্যে এই একটাই বার্তা, বাংলাদেশ হিন্দু ভারতের গোলাম, আর জামাত এটা ঠেকাতে এবং এ থেকে মুক্তি দিতে লড়ে আসছে একাত্তর থেকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগ কেনো জামাতকে শত্রু মেনেছে তার একটা হাস্যকর কারণ দিয়েছে গোলাম আত্মজীবনীতে। ৯ এপ্রিল রেডিওতে একটা ভাষণ দিয়েছিলো সে। তার ভাষায়, ‘এতে নির্বাচন, আওয়ামী লীগ, স্বাধীনতা আন্দোলন, সামরিক অভিযান ইত্যাদির কোনো উল্লেখ না করে ভারতে মুসলমানদের দুর্দশার বিবরণ দিয়ে ভারত যে মুসলমানদের বন্ধু হতে পারে না তা প্রমাণ করলাম।…আমার রেডিও ভাষণে সামরিক সরকার সন্তুষ্ট না হলেও আওয়ামী লীগ মহলের বুঝতে বিলম্ব হয়নি যে আমরা তাদের বিরোধী।রেডিওতে এ ভাষণ প্রচারের পর সারাদেশেই জামায়াতের সাথে জড়িত সবাই আওয়ামীদের হুমকির সম্মুখীন হয়।তার মানে সেই রাজনৈতিক বৈরিতাই আওয়ামী লীগ এখনও চালু রেখেছে!

(চলবে)
______________________
http://www.amarblog.com/research/posts/144020


Name:  বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:14 Dec 2012 -- 05:27 PM

অপারেশন মোনায়েম খাঁ কিলিং
লিখেছেন: বিপ্লব রহমান • প্রকাশকাল: 30 নভেম্বর 2011 - 8:54অপরাহ্ন
_________________________________________________________
এক। তার সঙ্গে আমার পরিচয় বছর সাতেক আগে দৈনিক যুগান্তরে কাজ করার সময়। তখন বন্যায় ঢাকার নিম্নাঞ্চল ডুবতে শুরু করেছে।মোজাম্মেল হক, বীর প্রতীক (৫০) আবার ঢাকার উপকণ্ঠ ভাটারা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। তো বন্যা দুর্গত আর ও ত্রাণ তৎপরতা নিয়ে তিনি তখন খুব ব্যস্ত। কালো রঙের একটি সেড তোলা টুপি পড়ে দিনরাত মোটর সাইকেল দাবড়ে বেড়াচ্ছেন।

আমি মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সাহসী ভূমিকার কথা আগেই জেনেছিলাম পত্রিকা পড়ে। সে সময় তাঁর ব্যস্ততার কারণে অবশ্য এ নিয়ে কথা হয়নি। তবু পেশাগত সম্পর্কের বাইরে এক ধরনের শ্রদ্ধাপূর্ণ বন্ধুত্ব হয়। মানুষ হিসেবে তিনি খুব স্পষ্টবাদী, কাউকে তোয়াক্কা করা তার ধাঁতে নেই।

সে সময় একগাদা সাংবাদিকের সামনে এক দুপুরে চরম বিরক্তির সঙ্গে তিনি বলেই ফেললেন, “খোকা ভাই (মেয়র সাদেক হোসেন খোকা) আসবেন বিকালে। এর আগে ত্রাণ দিতে উনি নিষেধ করেছেন। মেয়র হিসেবে উনি ত্রাণ কাজের উদ্বোধন করতে চান! আরে মিয়া, সেই সকাল থেকে বন্যার্তরা এক হাতা খিচুড়ি খাওয়ার জন্য রোদের মধ্যে বসে আছে। খিদা কি আর এই সব মেয়র - ফেয়র, আর টিভি ক্যামেরা বোঝে? ত্রাণ লাগাও, ত্রাণ লাগাও। মেয়র আসলে তখন দেখা যাবে!”

তার নির্দেশে তখনই খিচুড়ি বিতরণ শুরু হয়ে যায়।

স্থানীয় বিএনপি নেতারা আর পুলিশ কর্মকর্তারা কী যেনো তাকে বোঝাতে চান, মাইকের শব্দে ভাল করে বোঝা যায় না। মোজাম্মেল ভাই শুধু মাথা নাড়েন। মাছি তাড়ানোর মতো বার দুয়েক হাত নাড়েন নেতা আর পুলিশ কর্তাদের উদ্দেশে।

জনপ্রিয় এই মানুষের সঙ্গে ঘন্টা তিনেক আলাপচারিতা হয় ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে। বিষয় -- মহান মুক্তিযুদ্ধ। প্রিয় পাঠক, আসুন তারই বয়ানে শুনি, ১৯৭১ এর সেই আগুন ঝরা দিনগুলোর কথা। শুনি, কিশোর মুক্তিযোদ্ধার সেই দুর্ধর্ষ 'অপারেশন মোনায়েম খান কিলিং'এর কথা।...

“১৯৭১ সালে আমি শাহীনবাগের স্টাফ ওয়েল ফেয়ার হাই স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র। বয়স মাত্র ১৪ বছর। বাড্ডা, ভাটারা, ছোলমাইদ তখন পুরোপুরি গ্রাম। মাইলের পর মাইল ধানের ক্ষেত, খাল - বিল - জলায় বিস্তৃর্ণ এলাকা। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টও তখন খুব কাছে মনে হয়। পাকিস্তানী সেনারা প্রায়ই আমাদের গ্রামের আশেপাশের মাঠে প্রশিক্ষণ নিতো।...আমার বাপ - চাচারা সবাই কৃষক, নিরক্ষর মানুষ। আমরা স্কুলে পড়ি। পড়ার ফাঁকে তাদের কৃষিতে সাহায্য করি, গরু চড়াই।”

“২৫ মার্চের রাতে বাবা ধানী জমিতে সেচ দিচ্ছিলেন। আমি গিয়েছি তাঁর জন্য খাবার নিয়ে। হঠাৎ ক্যান্টনমেন্ট থেকে গুলির শব্দ। মর্টারের ফায়ার আর ফ্লেয়ার গানের আলোয় পুরো আকাশ মাঝে মাঝে ঝলসে ওঠে।... বাবা বললেন, যুদ্ধ শুরু হয়েছে। তাড়াতাড়ি বাড়ি চল।”


আমি তাকে জিগেষ করি, “আপনি ওই বয়সে যুদ্ধে গেলেন কোন চেতনা থেকে?”

তিনি বলেন, “তখন ওই বয়েসেই ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের পাক সেনাদের অত্যাচারের বেশ কিছু কথা আমরা শুনেছিলাম। গ্যারিসন সিনেমা হলে স্ত্রীকে নিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন আমাদের গ্রামের এক লোক। পাক সেনারা তাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে তার স্ত্রীকে গণধর্ষণ করে। এছাড়া আমাদের গ্রামের পাশে প্রশিক্ষণ নিতে এসে তারা সদ্য প্রসূতি আরেক গৃহবধূকেও গণধর্ষণ করে।”

“আমরা বাসে চড়লে অবাঙালী কন্ডাক্টর - হেল্পাররা আমাদের সিট থেকে তুলে দিয়ে বিহারীদের সেই সিটে বসতে দিতো। তাছাড়া সে সময়ের ছাত্রলীগ নেতা, বিকমের ছাত্র আনোয়র হোসেন (বীর প্রতীক) ভাই আমাদের বলতেন, পূর্ব পাকিস্তানে কাগজের কল হওয়া সত্বেও এখানে কাগজের দিস্তা যখন ১৪ আনা, তখন পশ্চিম পাকিস্তানে কাগজের দাম ছিলো ৬ আনা। বাবার কাছে শুনেছিলাম, ১৯৬১ - ৬২ তে পাকিস্তান সরকার আমাদের তিন একর জমি অধিগ্রহণ করে মাত্র দেড় হাজার টাকা দাম দিয়েছিল।”

“আনোয়ার ভাই বলতেন, দেশ স্বাধীন করে বাঙালিদের নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে এই সব অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। ২৫ মার্চের পর রেডিওতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের খবরে শুনতাম পাক সেনাদের বর্বরতার কাহিনী। শুনতাম মুক্তি বাহিনীর অগ্রযাত্রার খবর। এ সবই আমাদের যুদ্ধে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছে।”

মোজাম্মেল হক বলে চলেন, “আমি অন্য তিন চাচাতো ভাই আজাহারুল ইসলাম বকুল, গিয়াস উদ্দিন ও আবু সাঈদের সঙ্গে পরামর্শ করলাম, এক রাতে রহিমুদ্দীন ও আনোয়ার ভাইয়ের সঙ্গে বাড়ি থেকে পালিয়ে কুমিল্লা বর্ডার দিয়ে ত্রিপুরা যাবো। সেখানে ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করবো। কিন্তু পরিকল্পনা বাড়িতে আগেই ফাঁস হয়ে যাওয়ায় আমি, বকুল আর সাঈদ পালাতে পারিনি। অন্য ঠিকই ত্রিপুরা চলে গিয়েছিলো।”

“এদিকে আমার মন মানে না। স্বাধীন বাংলা বেতারের খবর শুনি, দেশের জন্য আমার প্রাণ কাঁদে। মনে হয়, সব তরুণ - যুবারা যুদ্ধ করছে, আর আমরা মায়ের আঁচলের ছায়ায় আরাম - আয়াশে আছি। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়। ১০ - ১৫ দিন বাড়িতে বসে থাকার পর আমি আর সাঈদ আবার যুক্তি করলাম, বাড়ি থেকে পালাবো, যুদ্ধে যাবো। এবার বাবা - মাকে বললাম, যদি টাকা - পয়সা দিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি না দাও, তাহলে টাকা - পয়সা ছাড়াই বাড়ি থেকে পালাবো। তখন বাপ - চাচারা পরামর্শ করে টাকা - পয়সা দিয়ে আমাদের যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দেন।”

“তাহলে শেষ পর্য়ন্ত বাড়ির সম্মতিতে যুদ্ধে যান?”

“হ্যাঁ, আমি আর সাঈদ কিছু টাকা জুতোর ভেতর আলাদা করে লুকিয়ে, জামা - কাপড় গুছিয়ে এক রাতে রওনা হই। নরসিংদী পর্যন্ত বাসে, তারপর লঞ্চে কমিল্লার নবীনগর। শুনেছিলাম, কুমিল্লার সিএনবি রোড পার হলেই ত্রিপুরার বর্ডার। পথে পথে শত শত মানুষের দেখা পাই, যারা পরিবার - পরিজন নিয়ে দলে দলে শারণার্থী হিসেবে ভারত যাচ্ছেন। কেউ বা আবার যাচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে। কুমিল্লা পৌঁছে আমরা একটি রিকশা ভাড়া নেই সিএনবি রোড যাবো বলে।”

“কিন্তু রিকশা ওয়ালা আমাদের ঘুর পথে নিয়ে যেতে যেতে সন্ধ্যা করে ফেলে। তখন আমরা রিকশা ছেড়ে দিয়ে হাঁটা শুরু করি। পথ - ঘাট কিছুই চিনি না। এক লোক আমাদের এসে বলে, আপনারা আমার বাসায় চলেন, রাতটা কাটান, ভোরে আমরাই আপনাদের বর্ডার পার করে দেবো। আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক।”

“উপায় না দেখে আমরা সেই রাতে ওই লোকের বাসায় উঠি। রাতে খাবারের জন্য একটা মোরগ কিনবে বলে সেই লোক আমাদের কাছ থেকে টাকা চেয়ে নেয়। সারারাত বর্ডারে মর্টার বিনিময়ের শব্দ শুনি। গোলাগুলি বন্ধ হলে ভোরের দিকে দুজন লোক আমাদের সিএনবি রোডে নিয়ে যায়। তারা গোমতি নদী দেখিয়ে বলে, ওই পারে ইন্ডিয়া। লোক দুজন আমাদের পকেট হাতড়ে টাকা - পয়সা সব রেখে দেয়। জুতার ভেতরে লুকানো সামান্য কিছু টাকা তখন আমাদের শেষ সম্বল।”

“লুঙ্গী পরে ছোট্ট গোমতি নদী হেঁটে পার হই। ত্রিপুরা সীমান্তের উঁচু পাহাড় দেখা যায়।”


আমি বলি, “তাহলে, সীমান্ত পার হয়ে ট্রেনিং নিলেন। আর যুদ্ধ শুরু হলো?”

“আরে নারে ভাই, অত সহজে হয় নাই। প্রথমবার ভয়ে পালিয়ে এসেছি। ওপারে গিয়ে কোনাবন হয়ে কলেজটিলা ট্রিনিং ক্যাম্পে পৌঁছাই। সেখানে ক্যাম্প চিফ ছিলেন ছাত্রলীগ নেতা রশিদ ভাই। সেখানে আমাদের ১৫ দিন রাখা হয়। থাকা - খাওয়ার অবস্থা আর বলতে! খাবার বলতে শুধু ডাল আর ভাত। আর ডাল যে দুর্গন্ধ হতে পারে, তা বলার নয়। আমরা রশিদ ভাইকে অতিষ্ট করে মারি, ভাই, আমাদের ট্রেনিং এ পাঠাবেন না?”

“তিনি আমাদের পাঠালেন পাশের নির্ভয়পুর ট্রেনিং ক্যাম্পে। সেখানে পৌঁছে দেখি, ক্যাম্পের নামই শুধু নির্ভয়পুর, আসলে নবাগতদের ভয় পাওয়ানোর মতো সব রকম ব্যবস্থাই সেখানে আছে। ট্রেনিং নিতে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের সবার ‘চোখ উঠেছে’। জ্বর আর ডায়রিয়ায় একেকজনের অবস্থা কাহিল। পরিস্থিতি দেখে নামধাম রেজিস্ট্রি করার আগেই আমার চাচাতা ভাই বেঁকে বসে। সে আমাকে বলে, ‘চল, আমরা পালিয়ে দেশে ফিরে যাই। এখানে ট্রেনিং নিতে গেলে আর বাঁচতে হবে না। যুদ্ধের আগেই অসুখে এখানেই আমাদের মরতে হবে!’...তার কথা শুনে আমি সত্যি সত্যি ভয় পাই। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আমরা চোরের মতো পালিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আবার গ্রামে ফিরে আসি।”...

দুই। “রোগ - শোকের ভয়ে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং না নিয়েই ত্রিপুরা থেকে দুই ভাই পালালেন, দেশে গ্রামের বাড়িতে ফিরলেন। তারপর?” আমি তাকে জিজ্ঞেস করি। মোজাম্মেল হক একটু স্থির হয়ে দম নেন। তারপর স্মৃতি হাতড়ে বলতে শুরু করেন আবার।

“তো ঢাকার গ্রামের বাড়ি ভাটারায় ফিরে সবার কাছে সত্যি কথাটাই বললাম। বাড়ির লোকজন তো মহাখুশী, যাক, ঘরের ছেলে ভালোয় ভোলোয় ঘরে ফিরেছে। ওই সব যুদ্ধের ভুত পালিয়েছে।”

“তখন রহিমুদ্দীন মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে গ্রামে ফিরে আসে। সে আমাকে বলে, ইন্ডিয়ায় যে গেরিলা ট্রেনিং নিয়েছি! আর হাতিয়ার আমাদের দিয়েছে! বুঝলি, তোদের মতো ভীতুদের আর দরকার নেই। এবার আমরাই দেশ স্বাধীন করে ফেলবো।”

“রহিমুদ্দীনের কথাটা আমার খুব মনের ভেতরে গিয়ে লাগে। ১০ - ১৫ দিন খুব অস্থিরতার মধ্যে কাটে। একদিন তাঁকে আবার ধরি, রহিম ভাই, আমি ভুল করেছি, তুমি আমাকে ট্রেনিং এ পাঠাও। আমি যুদ্ধে যাবো। সে কিছুতেই রাজী হয় না। শেষে আমাকে বলে, মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার আগে তোমাকে সাহসিকতার পরীক্ষায় পাস করতে হবে। পাস করলে তারপর দেখা যাবে।”

“আমি রাজী হলে, জুন - জুলাই মাসে রহিমুদ্দীন এক সন্ধ্যায় আমাকে একটি হ্যান্ড গ্রেনেড দেয়। এর ব্যবহার শিখিয়ে দিয়ে বলে, এই বোমার ৩৬ টি টুকরো আছে। এটি ফাটলে ৩০ গজের মধ্যে যারা আছে, তারা সবাই মারা যাবে। তোমাকে এটি বিদেশীদের মার্কেটে মারতে হবে। পারলে সাহসিকতার পরীক্ষায় পাস।”


“পরে গ্রেনেডটিকে আমি প্যান্টের পকেটে নিয়ে রহিমুদ্দীনসহ গুলশান ২ নম্বর ব্রিজের পাকিস্তানী চেক পোস্ট সহজেই পার হয়ে যাই। সেখানে পাক সৈন্যদের সহায়তা করতো যে বাঙালি, সে আমাদের গ্রামেরই এক লোক। তাছাড়া ছাত্র হিসেবে আমার পরিচয়পত্র ছিলো। আমার অসুবিধা হয় না।”

“দুজনে একটা বেবী ট্যাক্সি নিয়ে গুলশান ১ নম্বর ডিআইটি মার্কেটে যাই। সেখানে বিদেশীদের আনাগোনা। রহিমুদ্দীন ‘রেকি’ করে বলে, এখানে সুবিধা হবে না, প্রচুর মিলিটারির পাহারা।”

“আমরা দুজনে একটি আরেকটি বেবী ট্যাক্সি নিয়ে মহাখালি টিবি হাসপাতাল গেটের দিকে যেতে থাকি। পথে বিদেশী পতাকা ওড়ানো একটি বাসা দেখি। ট্যাক্সি ঘুরিয়ে আবারো ওই পথে যাওয়ার সময় রহিমুদ্দীন আমাকে ইশারা করে। আমি চলন্ত বেবী ট্যাক্সি থেকে গ্রেনেডটির পিন খুলে ওই বাড়ির ভেতর ছুঁড়ে মারি।”...

“কিছুদূর যাওয়ার পরেই বিকট শব্দে গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত হয়। অবাঙালি বেবী চালক ব্রেক কষে আমাদের বলে, কেয়াঁ হুয়া হ্যায়? রহিমুদ্দীন তাকে ধমকে বলে, বোমা ফুটায়া! সালে লোগ, চালাও বেবী!”

“কিছুদূর গিয়ে আমরা বেবী ছেড়ে দিয়ে ঘুর পথে বাড্ডায় এক আত্নীয়র বাসায় ওই রাতটি কাটাই। পরদিন পত্রিকায় দেখি, বড় বড় হেড লাইনে খবর -- দুস্কৃতিকারীরা বিদেশী দূতাবাসে গ্রেনেড হামলা করেছে! সেটি কোন দূতাবাস ছিল, এখন আর মনে নেই।”...

“তারপর?” বালক - বিস্ময়ে আমি জানতে চাই।

মোজাম্মেল ভাই বলেন, “আর কী! রহিমুদ্দীনের পরীক্ষায় পাস। একদিন রাতে বাড়িতে ফিরে দেখি মা কাঁঠালের পিঠা বানিয়েছেন। সেই পিঠা খেতে খেতে মাকে আমি বলি, মা, আমি কাল সকালেই ট্রেনিং নিতে ইন্ডিয়া যাবো। আমাকে কিছু টাকা দিতে পারো?”

“মা বলেন, তোর বাবা তো বাড়িতে নেই। আর আমার কাছে তো টাকা - পয়সা থাকে না। দেখি, তোর চাচীর কাছে কিছু পাওয়া যায় কী না।”

“মা টাকা ধার করতে চাচীর বাসায় গেছেন। একটু পরে চাচা এসে আমাকে ধমকানো শুরু করলেন, এই সব কী? দুদিন পর পর যুদ্ধ, যুদ্ধ করে বাসায় অশান্তি করা! একবার আমার ছেলেকে (চাচাতো ভাই সাঈদ। ওই যে অসুখ - বিসুখের ভয়ে আমরা দুজন ত্রিপুরা থেকে ট্রেনিং না নিয়েই পালালাম!) উস্কানী দিয়ে ইন্ডিয়ায় নিয়ে গেলি। ট্রেনিং না নিয়েই পালিয়ে এলি। এখন আবার ট্রেনিং এর যাওয়ার জন্য বায়না ধরা।... এবার যেতে হলে তুই একই যা। আমার ছেলেকে সঙ্গে নিবি না!”

“আমি বললাম, টাকা দাও, না দাও, এবার আমি যাবোই। একাই যাবো, মরতে হলে একাই মরবো। তোমার ছেলেকে এবার নেবো না।”

“তো পরদিন ভোরে মা’র ধার করা ২৪৬ টাকা নিয়ে আমি গুলশান ২ নম্বর বাস স্ট্যান্ডে যাই। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা রহিমুদ্দীন আগে থেকেই আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। দুজনে ইপিআরটিসির বাস ধরে ভাঙা পথে কুমিল্লা পৌঁছাই। আবার সেই গোমতি নদী পর হয়ে পৌঁছাই মেলাঘর ট্রেনিং সেন্টারে। সেখানে ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর এটিএম হায়দার আমাকে দেখেই রহিমুদ্দীনকে ধমক, কী সব পোলাপাইন নিয়ে এসেছো! এই সব দিয়ে কী যুদ্ধ করা যায়? রহিমুদ্দীন আমার পক্ষে ওকালতি করে বলে, স্যার, ও ছোট হলেও খুব সাহসী। ঢাকার বিদেশী দূতাবাসে হ্যান্ড গ্রেনেড চার্জ করেছে!”

“শুরু হলো ট্রেনিং? কী কী অস্ত্র চালানো শিখলেন?”

“হ্যাঁ, মেজর হায়দারের সম্মতিতে এইবার সত্যি সত্যি গেরিলা ট্রেনিং শুরু হলো মেলাঘরে। ২১ দিনের ট্রেনিং এ আমি লাইট মেশিন গান (এলএমজি), কয়েক ধরণের রাইফেল, স্টেন গান, প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ, এন্টি ট্যাংক মাইন, ১৬ ইঞ্চি মাইন, ফসফরাস বোমা, গ্রেনেড থ্রোইং, অ্যামবুশ প্রশিক্ষণ নেই।”

“২১ দিন পর ১৫ জন নিয়ে আমাদের ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গেরিলা গ্র“প তৈরি হলো। এর গ্র“প কমান্ডার হলেন এমএন লতিফ। আর সেই রহিমুদ্দীনকে করা হলো ডেপুটি কমান্ডার।”

“একদিন মেজর ফেরদৌস, ক্যাপ্টেন আয়েন উদ্দীন ও আনোয়ার হোসেন (বীর প্রতীক) আমাদের একটু ভাল খাইয়ে - দাইয়ে রাতের বেলা বিদায় দিলেন। কিন্তু যাদের সীমান্ত রেকি করতে পাঠানো হয়েছিলো, তার ঠিক ভাবে ডিউটি না করেই ক্লিয়ারেন্স দেয়। আমরা ১৫ জন কুমিল্লার সিএনবি রোডে উঠতেই পাক সেনাদের অ্যামবুশের মুখে পড়লাম। তিন - চারটা ব্যাংকার থেকে শুরু হলো ক্রমাগত মেশিনগানের গুলি।”

“ওই রাতে এক পাট ক্ষেতে পালিয়ে পরদিন বুকে ভর দিয়ে একটু একটু করে আবার ইন্ডিয়ার মেলাঘরে পৌঁছাই। দেখি আমরা ১৫ জনই অক্ষত আছি। কিন্তু মেজর হায়দার এবার বেঁকে বসলেন, এদের মর‌্যাল ডাউন হয়ে গেছে। এদের দিয়ে আর যুদ্ধ হবে না! তিনি নির্দেশ দিলেন, আমাদের কোনো একটি গেরিলা ইউনিটে গোলা বারুদ বহনকারী হিসেবে যোগানদারের দায়িত্ব পালন করতে!”

মোজাম্মেল হক বলে চলেন, “এই কথায় সবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। এতো কষ্ট করে ট্রেনিং নিলাম, আর শেষে কী না যোগানদার! আমরা কী যুদ্ধ করবো না!”

“আমি বুদ্ধি করে প্রতিদিন রুটিন করে মেজর হায়দারের অফিসের সামনে অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে লাগলাম। ১৫ - ২০ দিন পর উনি আমাকে ডেকে বললেন, এই তোর কী হয়েছে? প্রত্যেক দিন এখানে দাঁড়িয়ে থাকিস কোনো? আমি বলি, স্যার আমাদের যুদ্ধে পাঠান। আমরা মরতে ভয় পাই না। মেজর সাহেব বলেন, তোদের দিয়ে তো যুদ্ধ হবে না। তোদের মর‌্যাল বলতে আর কিচ্ছু নেই। আমি নাছোড়বান্দা, না স্যার। আমরা পারবো। আমাদের একটা অপারেশন দিয়েই দেখুন না!”

“মেজর হায়দার বলেন, তুই কাউকে মারতে পরবি? কোনো চিন্তা না করেই বলি, স্যার, পাকিস্তানের স্পীকার আব্দুল জব্বার খানকে মারতে পারবো। মেজর সাহেব আমাকে একটা চড় মারেন। বলেন, বেয়াদব, জানিস, এটা কতো কঠিন কাজ? আচ্ছা, তুই ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসিন্দা পাক গভর্নর মোনায়েম খানকে মারতে পারবি?”
“এইবার আমি বলি, স্যার, এটা আমার জন্য অনেক সহজ। আমি তার বাসা চিনি। ছোট বেলায় তার বাসার ওখানে খেলতে গিয়েছি। আমার এক দূর সম্পর্কের জব্বার চাচা তার বাসার গোয়ালা।”

“মেজর হায়দার হেসে হুকুম দেন, গেট টেন, উল্লুক কা পাঁঠা।”

“সঙ্গে সঙ্গে আমি ১০ টা বুক ডন দিতে লেগে যাই। বুঝতে পারি, আমাকে মোনায়েম খান কিলিং অপারেশনের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে!”

“এবার আমি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করি, স্যার, যদি অপারেশন সাকসেস হয়, আমাকে কী পুরস্কার দেবেন?”

“তুইই বল, তুই কী চাস?”

“অপারেশন শেষে আমি আপনার কোমরের রিভলবারটা চাই!”

“গেট লস্ট! উল্লুক কা পাঁঠা!”

“...ক্যাম্পে ফিরে গ্র“পকে এই খবর বলি। কেউ বিশ্বাস করে না। একটু পরে অর্ডার আসে, আমাদের ঢাকায় অপারেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে! খুশীতে সবাই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে।”

“এরপরেও সীমান্তের একটি ছোটখাট যুদ্ধে আমাদের সাহসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। আমরা ১৫ জনের গ্র“প নারায়নগঞ্জের রূপগঞ্জে পৌঁছাই। সঙ্গে যার যার হাতিয়ার জামার নীচে আর ব্যাগের ভেতর লুকানো।”

“সেখান থেকে আমি ভাটারার গ্রামে ফিরি। আমার মাথায় তখন একটাই চিন্তা -- অপারেশন মোনায়েম খান।”...

“আমি মোনায়েম খানের গোয়ালা জব্বার চাচাকে খুঁজে বের করে তাকে সব কিছু বলি। তিনি আমাকে বলেন, তুই তার রাখাল শাজাহানের সঙ্গে খাতির কর। তোর কাজ হবে। খবরদার, আমার কথা কিছু বলবি না!”

“জব্বার চাচা একদিন দূর থেকে শাজাহানকে চিনিয়ে দেন। সে তখন বনানীতে মোনায়েম খানের বাসার পাশে গরু চড়াচ্ছে। আমি তার সাঙ্গে এটা - সেটা গল্প জুড়ি। মোনায়েম খানের ওপর রাখালের খুব রাগ।”

“কথায় কথায় শাজাহান বলে, মোনায়েম খান একটা জানোয়ার! আমাকে বেতন তো দেয়ই না, উল্টো নানান নির্যাতন করে। একেকটা সিন্ধী গাই ২০ - ২৫ সের দুধ দেয়। এক ফোঁটা দুধও আমাকে খেতে দেয় না। গাই দোয়ানোর সময় মোড়া পেতে সে নিজেই বসে থাকে, যেনো দুধ চুরি না হয়। পাঁচবার বাসা থেকে পালিয়েছি। প্রত্যেকবার পুলিশ দিয়ে আমাকে ধরিয়ে এনেছে। মুক্তিরা এতো মানুষকে মারে, এই ব্যাটাকে মারতে পারে না!”

“আরেকটু খাতির হওয়ার পর একদিন শাজাহানকে আমি বলি, আমার সঙ্গে মুক্তিদের যোগাযোগ আছে। আপনি যদি সহায়তা করেন, তাহলে আমি তাদের খবর দেই, আপনি মোনায়েম খানকে মারার ব্যবস্থা করুন। শাজাহান রাজী হয়। আরও দু - একদিন ঘোরানোর পর শাজাহান অস্থির হয়ে পড়ে, কই, আপনার মুক্তিরা তো আসে না!”

“একদিন বিকালে আমি একটি চটের ব্যাগে আমার স্টেন গান, দুটি ম্যাগজিন, একটি হ্যান্ড গ্রেনেড আর একটি ফসফরাস বোমা নিয়ে শাজাহান ভাইয়ের কাছে হাজির হই। তাকে বলি, আজ সন্ধ্যায় একটু দেরীতে গরুগুলোকে মোনায়েম খানের বাসায় ঢোকাতে হবে। আর আমাকে লুকিয়ে নিয়ে যেতে হবে বাসার ভেতর। সেই প্রথম শাজাহান ভাই বোঝেন, এতোদিন আমার কাছে মুক্তিবাহিনীর যে গল্প তিনি শুনেছেন, আমিই সেই মুক্তি বাহিনী! তিনি আমার প্রস্তাবে রাজী হন।”

তিন। আমি বলি, “তো অস্ত্র - শস্ত্র নিয়ে মোনায়েম খানের বাসার ভেতর ঢুকলেন? শুরু হলো অপারেশন?”

মোজাম্মেল ভাই বলেন, “ওই দিন বাসার ভেতরে ঢুকতে পারলেও সেদিনই অপারেশন করতে পারিনি। পর পর দুবার ব্যর্থ হই। ... প্রথমবার ওই সন্ধ্যায় মোনায়েম খানের বাসায় ঢুকে গেটের পাশের কলাবাগানের ঝোঁপে ঘাপটি মেরে বসে থাকি। একটু পরে তার রাখাল সেই শাজাহান ভাই এসে খবর দেয়, মোনায়েম খানের শরীর খারাপ। সে দোতলায় উঠে গেছে। দোতলায় যেতে গেলে তার ছেলের ঘরের সামনে দিয়ে যেতে হবে। আবার বাড়ি ভর্তি লোকজন।”

“অপারেশন ওইদিন স্থগিত রেখে আমি সেখান থেকে চলে যাই পাশের বনানী খ্রিস্টান পাড়ায়। সেখানে প্রচুর ইটের পাঁজা ছিল। ইটের পাঁজায় হাতিয়ারের ব্যাগটি লুকিয়ে চলে আসি।”

“পরে আরেকদিন সন্ধ্যায় হাতিয়ারের ব্যাগ নিয়ে শাজাহান ভাইয়ের সঙ্গে আবার মোনায়েম খানের বাসায় যাই। আবার সেই কলাবাগানে ঘাপটি মেরে বসা। কিন্তু তখন একটি উজ্জল বৈদ্যুতিক বাল্বের আলোয় চারপাশের সব কিছু পরিস্কার। আমি অন্ধকারের আড়াল পেতে সেই বাতিটি ইট মেরে ভেঙে ফেলি। এতেই বিপত্তি দেখা দেয়।”

“একজন চাকর ভাঙা বাল্ব দেখে চিৎকার - চেঁচামেচি শুরু করে, বাড়িতে চোর ঢুকেছে! মোনায়েম খানের বাসা পাহারা দিতো যে সব বেলুচিস্তানের অবাঙালি পুলিশ, তারা হুইসেল বাজিয়ে, টর্চ মেরে চোর খোঁজাখুঁজি শুরু করে। আমি বিপদ দেখে আবার পালাই।”

আমি বলি, “ও আচ্ছা। কিন্তু এতোদিন পত্রিকায় কিন্তু এই সব ঝক্কি - ঝামেলার কথা পড়িনি। আমি ভেবেছি”...।

মোজাম্মেল ভাই হাসেন, “আরে পত্রিকা ওয়ালারা এতো কথা লিখতে চায় না। ওরা হচ্ছে, সংক্ষেপে বিস্তারিত!”

“তো তারপর তো আমার মন খুব খারাপ। পর পর দুবার অপারেশনে বাধা। আর বুঝি হবে না! এদিকে শাজাহান ভাই ভাটারা এসে একদিন আমাকে ধরে, কী ভাই, যুদ্ধ হবে না? তার কথায় আবার মনোবল ফিরে পাই।”

“এবার সহযোগি হিসেবে সঙ্গে নেই আনোয়ার ভাইকে (আনোয়র হোসেন, বীর প্রতীক)। আবারো সন্ধ্যার পর মোনায়েম খানের বাসার ভেতরের সেই কলাঝোপে দুজন লুকিয়ে বসে থাকি। একটু পরে শাজাহান ভাই এসে খবর দেয়, আজকে অপারেশন সম্ভব। মোনায়েম খান, তার মেয়ের জামাই (জাহাঙ্গীর মো. আদিল) আর শিক্ষামন্ত্রী (আমজাদ হোসেন) বাসার নীচ তলার ড্রইং রুমে বসে গল্প - গুজব করছেন।”

“আমি জানতে চাই, কে মোনায়েম খান, চিনবো কী ভাবে? শাজাহান ভাই জানান, একটি সোফায় তিনজনই একসঙ্গে বসে আছে। মাঝের জনই মোনায়েম খান, তার মাথায় গোল টুপি রয়েছে।...আমি অপারেশনের পরের পরিস্থিতি আন্দাজ করে গোয়লা জব্বার চাচা আর শাজাহান ভাইকে জামা - কাপড় নিয়ে বাসা থেকে পালাতে বলি।”

“শুনশান নিরবতার মঝে হাতিয়ার বাগিয়ে আমরা দুজন মূল বাড়িটির দিকে এগিয়ে যাই। আমার প্ল্যান হচ্ছে, স্টেন গানের একটি ম্যাগজিন পুরো খরচ করবো মোনায়েম খানের ওপর। বাকি দুজনকে আরেকটি ম্যাগজিন দিয়ে ব্রাশ করবো।...ব্যাকআপ আর্মস হিসেবে হ্যান্ড গ্রেনেড আর ফসফরাস বোমা তো আছেই।”

“আমরা বাড়ির ড্রইং রুমের দরজায় পৌঁছে দেখি দরজাটি খোলা। দরজার দিকে মুখ করে তিনজন একটি সোফায় ঘনিষ্টভাবে বসে মাথা নীচু করে কোনো শলা - পরামর্শ করছে। মাঝখানে গোল টুপি মাথায় মোনায়েম খান। আমি স্টেন দিয়ে ব্রাশ করি। কিন্তু একটি মাত্র সিঙ্গেল ফায়ার বের হয়, গুলিটি মোনায়েম খানের পেটে লাগে। সে ‘ও মা গো’ বলে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ...বাকি দুজন ভয়ে ‘বাবা গো, মা গো, বাঁচাও, বাঁচাও’ চিৎকার শুরু করে।...আমার স্টেন গান দিয়ে আর ফায়ার হয় না। আমি ম্যাগজিন বদলে বাকী ম্যাগজিন দিয়ে ফায়ার করার চেষ্টা করি, তাতেও কাজ হয় না। আনোয়ার ভাই সেফটি পিন খুলে গ্রেনেডটি ছুঁড়ে মারেন। এবারো ভাগ্য খারাপ। গ্রেনেডটিও ছিলো অকেজো, সেটি দেয়ালে বারি খেয়ে ফেরত আসে।”

“এদিকে তার বাড়ির বেলুচিস্তানী পুলিশরা চিৎকার - চেঁচামেচি শুনে একের পর এক ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করতে থাকে। আমরা দেয়াল টপকে পালাই।”

“দৌড়ে গুলশান - বনানী লেকের কাছে পৌঁছে দেখি জব্বার চাচা আর শাজাহান ভাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আমি আনোয়ার ভাইকে ওদের সঙ্গে লেক সাঁতরে ওপারে চলে যেতে বলি। স্টেন গান নিয়ে আমার পক্ষে সাঁতার দেওয়া হয় না। ...খুঁজতে খুঁজতে আমি একটি কোষা নৌকা পেয়ে যাই। সেটা নিয়ে আমি গুলশান ২ নম্বর ব্রিজের কাছাকাছি আসি।”

“এদিকে গোলাগুলির শব্দে একের পর এক পাক আর্মির ট্রাক মোনায়েম খানের বাসার দিকে রওনা হয়েছে। দূরে বড় রাস্তা দিয়ে ট্রাকের চলাচল দেখি। ওই ব্রিজটির ওপর আর্মির চেক পোস্ট ছিলো। আমি ধরা পড়ার ঝুঁকি নিয়েই ক্রলিং করে ব্রিজের নীচ দিয়ে একটু একটু করে ভাটারা পৌঁছাই।”

“ভাটারা বাজারে তখন একটি চায়ের দোকানে সহযোগি তিনজন আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। স্টেনগান কাঁেধ সেই প্রথম গ্রামের মানুষ আমাকে দেখে। এর আগে তারা কানাঘুষায় শুনেছিল, আমি ট্রেনিং নিয়েছি। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করেনি। তখন আমাকে দেখে ভয়ে সবাই দৌড়ে পালায়। আমি শীতে কাঁপতে কাঁপতে (তখন অক্টোবর মাস) কোন রকমে আনোয়ার ভাইকে স্টেনগান দিয়ে বলি, আমার খুব শরীর খারাপ লাগছে! এর পর আমি জ্ঞান হারাই।”

“জ্ঞান ফিরে আসে রাতে আমার বাড়িতে। দেখি, বাড়ির লোকজন ছাড়াও জব্বার চাচা, শাজাহান ভাই আর আনোয়ার ভাই আমাকে ঘিরে আছেন।

আনোয়ার ভাই বলেন, এখানে থাকা নিরাপদ নয়। আমরা নারায়নগঞ্জের রূপগঞ্জে যাচ্ছি। তুমিও আমাদের সঙ্গে চলো। আমি তাদের বলি রওনা হয়ে যেতে। আমি রাতটুকু এখানেই বিশ্রাম নিয়ে পরদিন রূপগঞ্জে পৌঁছাবো।”

“পরদিন সকালে ঘুমিয়ে আছি, আমার এক চাচা এসে বললেন, রাতে আকাম করে এসে এখনও তুই বাড়িতে! রেডিও খবরে বলছে, মোনায়েম খান মারা গেছে। এখনই তুই পালা।...আমি রূপগঞ্জে পালিয়ে যাই। সেখানে আমাদের গ্র“পের অন্য সহযোদ্ধারা আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।”

চার। এবার আমি একটু অফ ট্র্যাকে যাই। জানতে চাই, “আচ্ছা মোজাম্মেল ভাই, স্বাধীনতার ৩৬ বছরেও তো স্বাধীনতা বিরোধী - যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হলো না। এর কারণ কী বলে মনে হয়?”

মোজাম্মেল হক বলেন, “অতীতে রাজনৈতিক দলগুলো কোনো না কোনো স্বার্থের কারণে জামায়াতসহ স্বাধীনতা বিরোধী -- যুদ্ধাপরাধীদের লালন - পালন করেছে। তারা ক্ষমতার লোভে ঘৃণ্য এই সব চরম অপরাধীদের সঙ্গে আপোষ করেছে।”

“আপনি কী মনে করেন, দল নিরপেক্ষ এই সেনা সমর্থিত তত্ত্ববধায়ক সরকার যে এখন স্বাধীনতা বিরোধী - যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলছে, এই দাযিত্ব তাদেরই নেওয়া উচিৎ?”

“অবশ্যই। সবদেশে সরকার পক্ষই স্বাধীনতা বিরোধী - যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দায়িত্ব নেয়। এই সরকার দুর্নীতি ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে এরই মধ্যে সুনাম কুড়িয়েছেন। এখন তাদের উচিত হবে বক্তৃতাবাজীর বাইরে চরম অপরাধী হিসেবে স্বাধীনতা বিরোধী - যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজটা অন্তত শুরু করা। নইলে আমরা ধরে নেবো, অতীতের সরকারগুলোর মতো দলনিরপেক্ষ এই তত্ত্বাধবায়ক সরকারেরও কোনো কেনো স্বার্থ রয়েছে; তারাও আপোষকামী। এ ক্ষেত্রে অতীতের সরকারগুলোর সাথে তাদের কোনো পার্থক্য থাকবে না।”

তার কাছে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সহযোদ্ধাদের কথা জানতে চাই। মোজাম্মেল ভাই বলেন, “১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও মিরপুরে বিহারীদের কাছে প্রচুর অস্ত্র ছিল। তারা তখনও অস্ত্র সমর্পন করেনি। বিহারীদের পরাজিত করতে সে সময় একাধিক যুদ্ধ হয়। আমি নিজেও এরকম কয়েকটি যুদ্ধে অংশ নেই। মুক্তিযোদ্ধা জহিরুদ্দীন ঢালি ও দিল মোহাম্মাদ ঢালি একটি প্রাইভেট কার নিয়ে মিরপুরে ঢোকার চেষ্টার করলে দুই দিক থেকে বিহারীরা গুলি করে তাদের খুন করে। সহযোদ্ধাদের এমন করুন মৃত্যূর খবরে আমি নিজেই তাদের লাশ নিয়ে আসার জন্য অপারেশন চালাই। দেখি, গুলিতে ঝাঁঝড়া হওয়া গাড়ির ভেতরে তাদের দুজন রক্তাক্ত অবস্থায় মরে পড়ে আছেন। তীব্র আক্রমনের মুখে তাদের লাশ আর নিয়ে আসতে পারিনি। কিন্তু সব সময়েই তাদের কথা মনে পড়ে।”...

“আর মুক্তিযোদ্ধাদের তো কেউ ঠিকভাবে মূল্যায়নই করেনি” বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি, “সারাদেশেই সব মুক্তিযোদ্ধারাই অবহেলিত। আর এখন সবখানেই রাজাকার, আলবদর, আল শামসের জয়জয়াকার। ...যখন পত্রিকায় পড়ি, মুক্তিযোদ্ধা রিকশা চালান, ভিক্ষে করেন, তখন মনে হয়, এই রকম বাংলাদেশ তো আমরা চাইনি। ...একদিকে টাকার পাহাড় গড়ে উঠছে, আরেকদিনে মানুষ অভাবে, অনাহারে, অপুষ্টি আর অশিক্ষায় ধুঁকে ধুঁকে মরছে।...আমাদের দাবি, খুব সামান্য -- মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারগুলোকে যেনো রাষ্ট্র নূন্যতম সন্মান দেয়। কিন্তু গত ৩৬ বছরে কোনো সরকারই এই কাজ করেনি।”

“মুক্তিযোদ্ধাদের দুরাবস্থা দেখে, এখন মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করি, তাহলে কী একাত্তরে আমরা ভুল করেছি? গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জমি - জমা সংক্রান্ত ৫০ টি মিথ্যে মামলায় আমাকে হয়রানী করা হয়। এর মধ্যে ৮ টি মামলায় আমাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে দুমাস জেল খাটতে হয়। অথচ আমি একজন বীর প্রতীক, ইউপি চেয়ারম্যান। তাহলে সারাদেশে অন্য সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের কী অবস্থা, তা তো সহজেই অনুমেয়।”

মোজাম্মেল হক, বীর প্রতীকের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতা শেষে আমি যখন ফিরে আসছিলাম, তখন অন্য নানান কথা সঙ্গে তার সেই শেষ কথাটিই বার বার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে, “ তাহলে কী একাত্তরে আমরা ভুল করেছি?”...
---
কৃতজ্ঞতা: বিশিষ্ট মুক্তিযুদ্ধ গবেষক এমএমআর জালাল।
---
http://unmochon.net/node/1178


Name:  বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:14 Dec 2012 -- 05:28 PM

আজম খানের মুক্তিযুদ্ধ
লিখেছেন: বিপ্লব রহমান • প্রকাশকাল: 8 ডিসেম্বর 2011 - 5:07অপরাহ্ন
____________________________________________________
[প্রয়াত পপসম্রাট ও মুক্তিযোদ্ধা আজম খান। অনেকে তার মুক্তিযুদ্ধটিকে 'একাত্তরের বেহাত বিপ্লব' হিসেবে চিহ্নিত করতে চান। আসলে কী তাই? কেমন ছিলো, এই শিল্পীর রণাঙ্গনের দিনগুলো? কী ছিলো তার দেশচিন্তা? যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশকেই বা কীভাবে দেখেছিলেন এই মুক্তিযোদ্ধা? দেশ ও সঙ্গীত নিয়ে কী ছিলো তার চিন্তা-ভাবনা? ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর একটি বার্তা সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে এই লেখককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আজম খান বলেছিলেন সেসব কথা। এরইভিত্তিতে চলতি স্মৃতিকথাটি লেখা হচ্ছে।]

এক। আমার নকশালাইট বড়ভাই মানব ৭০ দশকে যখন লম্বা চুল রেখে, বেল বটম প্যান্ট পরে, গিটার বাজিয়ে আজম খানের গান করতেন, তখন সেই শৈশবে পপ সম্রাট এই শিল্পীর গানের সঙ্গে পরিচয়। আরো পরে লংপ্লেয়ারে তার নানান হিট গান শুনেছি।

তাকে আমি সামনা – সামনি প্রথম দেখি ১৯৮৬ – ৮৭ সালে, এএইচসিতে পড়ার সময়। বুয়েটের মাঠে কনসার্ট হচ্ছে — গাঁদাগাদি ভীড়, গাঁজার ধোঁয়া, ‘গুরু, গুরু’ জয়োধ্বনী, আর তুমুল হট্টোগোলের ভেতর সেদিন শিল্পীকে ভাল করে চোখেই পড়েনি। তবু রাতে বন্ধুরা দল বেঁধে গান করতে করতে ফিরেছিলাম:

হাইকোর্টের মাজারে, কতো ফকির ঘোরে, কয়জনা আসলও ফকির?…

মুক্তিযুদ্ধের সময় আগরতলার রনাঙ্গণে তার মুক্তিযোদ্ধাদের গান গেয়ে শোনানোর কথা জানতে পারি ‘একাত্তরের দিনগুলি’তে। তো, আজম খান সব মিলিয়ে আমার কাছে এক বিরাট আইকন।

শুধু মাত্র মুক্তিযুদ্ধকে ফোকাস করে শিল্পীর সঙ্গে কথোপকথনের জন্য আমি তার ফোন নম্বর খুঁজতে শুরু করি। এ পত্রিকা, সে পত্রিকার অফিসে খোঁজ করে কোথাও তার নম্বর পাই না।
আমার সাবেক কর্মস্থল দৈনিক যুগান্তরের বিনোদন পাতার এক সাংবাদিক আমাকে জানালেন, তিনি মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না। আর তার বাসার ল্যান্ড ফোনটিও অনেকদিন ধরে বিকল!

তবু লোকেশন জেনে হাজির হই এক বিকালে তার উত্তর কমলাপুরের বাসায়। একটি দাঁড় করানো জুতোর বাক্সর মতো লম্বালম্বি পুরনো একচিলতে দোতলা ঘর। সরু সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে দরজা ধাক্কাতে একটি মেয়ে বের হয়ে এসে বললেন, আঙ্কেল তো খুব অসুস্থ্য। আজ দেখা হবে না। আপনি কাল সকালে আসুন।

পরদিন সকালে আবার হামলা। এবার দরজা খোলা। নক করতেই সেই বিখ্যাত খনখনে গলা, কে রে?…

আমি উঁকি দিয়ে অনেকটা ঠেলেই ঘরে ঢুকে পড়ি। একটা সালাম ঠুকে ভয়ে ভয়ে বলি আগমেনর হেতু।

শিল্পী তখন একটি খাটে শুয়ে পা দুলাচ্ছেন। পরনে একটি সাদা টি শার্ট আর ট্র্যাকিং প্যান্ট। ফর্সা, লম্বা আর হাড্ডিসার ফিগারে সে সময়ের ৫৭ বছর বয়সেও তাকে সুদর্শন লাগে। সব শুনে তিনি বলেন, একাত্তরের কথা কেউ মনে রেখেছে না কি? আর তাছাড়া আমি তো যুদ্ধ শুরু করেছিলাম মাত্র, শেষ করতে পারি নি। আমার যুদ্ধ ভারতীয় সেনারাই তো শেষ করে দিলো!…

শুরু হলো আনুষ্ঠানিক কথোপকথন। মাঝে মাঝে বিছানার পাশে রাখা একটি গিটার ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখেন। খুক খুকে কাশি দেখে বুঝি, তার শরীর বেশ খারাপ করেছে।…

দুই। যুদ্ধে গেলেন কেনো?… আমি জানতে চাই।

আজম খান বলেন, ১৯৬৮ টিতে ছাত্রাবস্থায় আমরা বন্ধু – বান্ধব মিলে গান করতাম। সেই সময় আমি গণসঙ্গীত শিল্পী গোষ্ঠি ‘ক্রান্তি’র সঙ্গে যুক্ত হই। ঢাকায়, ঢাকার বাইরে গান করতে গেলে পুলিশ নানা রকম হয়রানী করতো।

১৯৬৯ সালে গণঅভূত্থানের সময় দেশপ্রেম থেকে আমরা রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে অবরোধ তৈরি করতাম। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ভয়ে বাসায় টেঁকা যেতো না। সেই সময় বন্ধু – বান্ধব দল বেধে সিদ্ধান্ত নিলাম, ঢাকায় থাকলে এমনিতেই মরতে হবে, তার চেয়ে যুদ্ধ করে মরাই ভাল। তখন সবাই একসঙ্গে যুদ্ধে যাই।

আম্মাকে বললাম, আমি যুদ্ধে যাচ্ছি। আম্মা বললেন, যুদ্ধে যাবি, ভাল কথা, তোর আব্বাকে বলে যা। আব্বা ছিলেন সরকারি চাকুরে। ভয়ে ভয়ে তাকে বলালাম, যুদ্ধে যাচ্ছি। উনি বললেন, যাবি যা, তবে দেশ স্বাধীন না করে ফিরবি না! তার কথা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। একটা সালাম দিয়ে যুদ্ধে যাই। তখন আমার বয়স ২১ বছর।

জানতে চাই, মাসটি মনে আছে?

শিল্পীর সরল জবাব, আরে না রে ভাই, যুদ্ধের সময় এতো মাস – তারিখ মনে রাখা সম্ভব নয়।… প্রথমে কুমিল্লা বর্ডার দিয়ে ত্রিপুরার আগরতলা যাই। সেখান থেকে মেলাঘরে মুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের সেক্টরে মেজর এটিএম হায়দারের কাছে দু’মাস গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেই। কুমিল্লার সালদায় পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর সঙ্গে একটি সম্মুখ সমরে সাফল্যের পর আমাকে ঢাকার গেরিলা যুদ্ধের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলে চলেন, ১৯৭১ সালে ঢাকার মুক্তিবাহিনীর একটি গেরিলা গ্রুপের সেকশন কমান্ডার হিসেবে আমি যাত্রা বাড়ি, ডেমরা, গুলশান, ক্যান্টনমেন্ট এলাকাসহ বেশ কয়েকটি সম্মুখ সমরে যুদ্ধ করি, এ সব যুদ্ধের নেতৃত্ব দেই।

মুক্তিযুদ্ধের কোনো বিশেষ স্মৃতি?…এমন কৌতুহলের জবাবে আজম খান বলেন, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জাকিরের কথা প্রায়ই মনে পড়ে। ঢাকার গোপীবাগে একজন আহত মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচাতে গিয়ে সে পাকিস্তানী সেনাদের গুলিতে মারা যায়।… সে সময় জাকিরের মৃত্যূর খবর আমি গ্রুপের কাছে চেপে গিয়েছিলাম, নইলে তারা মনোবল হারাতে পারতো।

অবহেলিত মুক্তিযোদ্ধাদের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, এই তো সেদিন ফকিরাপুলে আমার গ্রুপের একজন মুক্তিযোদ্ধাকে দেখি, ফুটপাতে চা বিক্রি করছে! কি আর করবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যার ভেতর আছে, সে তো আর চুরি করতে পারে না!…

মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো সরকারই তো মূল্যায়ন করেনি। এর পাশাপাশি অনেক বিপথগামী মুক্তিযোদ্ধা সে সময় লুঠপাঠ – ডাকাতি করেছে, বিহারীদের বাড়ি – জমি দখল করেছে, মা – বোনদের ইজ্জতহানী করেছে। অনেকে ডাকাতি করতে গিয়ে গণপিটুনিতে মারাও গিয়েছে।

আমি নিজেও এ সব কারণে অনেক বছর নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দেই নি।…বিপথগামী মুক্তিযোদ্ধাদের কারণে জাতিও বহুবছর মুক্তিযোদ্ধাদের সন্মানের চোখে দেখেনি।

আমি জানতে চাই, স্বাধীনতা বিরোধী — যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কী ভাবে সম্ভব?

‘অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন স্বাধীনতা বিরোধী – যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কঠিন হয়ে গেছে’ — কথা জানিয়ে শিল্পী বলেন, এখন রাজাকার, আল – বদর, আল – শামসরা সংগঠনিকভাবে অনেক বেশী শক্তিশালী। একজন গোলাম আজমের বিচার করলেই এদের ভিত্তি নির্মূল করা যাবে না। এদের যে বিস্তৃতি গত ৩৬ বছরে ঘটেছে, তাকে উৎখাত করা সত্যিই কঠিন। তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার একদিন না একদিন হতেই হবে।

তিনি আরো বলেন, স্বাধীনতার পর পরই এই বিচার হওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু তা হয়নি, কারণ ভারত সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে পাকিস্তানী সেনাদের স্বসন্মানে পাকিস্তানে ফেরৎ পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে এর পরের সরকারগুলো ক্ষমতার লোভে পাক সেনাদের সহযোগি যুদ্ধাপরাধীদের লালন – পালন করেছে।

কিন্তু তা না হয়ে ভারত যদি মুক্তিযুদ্ধে শুধু সহায়কের ভুমিকা পালন করতো, আমরা নিজেরাই যদি আমাদের যুদ্ধ শেষ করতে পারতাম, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। নয় মাসে নয়, নয় বছর পরেও দেশ স্বাধীন হলে আমরা স্বাধীনতা বিরোধী – যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে পারতাম।

কিন্তু যুদ্ধাপরাধ কখনো তামাদী হয় না। তবে এদের বিচার বিলম্বিত হওয়ায় অনেক সাক্ষ্য – প্রমান সংগ্রহ করা এখন কঠিন হয়ে গেছে। তাই অনেক দেরীতে হলেও আন্তর্জাতিক আদালত বসিয়ে এর বিচার করা উচিত। এ জন্য সরকারের সদিচ্ছা ছাড়াও আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন।

স্বাধীনতা বিরোধী – যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দায়িত্ব সৎ ও দেশপ্রেমিক সরকারকেই নিতে হবে। তবে যতদিন এটি জাতীয় দাবিতে পরিনত না হবে, ততদিন কোনো সরকারই এই বিচার করবে না।

তিন। এবার আমি পপ সম্রাটের গানের জগতে ফিরে আসি। সেখানেও আমার জিজ্ঞাস্য মুক্তিযুদ্ধ।

আমি জানতে চাই, আচ্ছা, আজম ভাই, মুক্তিযুদ্ধের পর ‘রেল লইনের ওই বস্তিতে’ বা ‘ফ্রাস্টেশন’ — ইত্যাদি গানে আপনার হতাশা ফুটে উঠছে কেনো? গানের ভেতরে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল দিকগুলো কেনো প্রকাশ পায়নি?

শিল্পীর অকপট স্বীকারোক্তি, তখনকার প্রেক্ষাপটে এই সব গান করেছিলাম।… যে আশা নিয়ে আমরা যুদ্ধে গিয়েছিলাম, যুদ্ধের পর আমাদের সে আশা পূরণ হয়নি। পাকিস্তান আমলে ঘুষ – দুর্নীতি ছিল না। বাজারে সব জিনিষের একদর ছিল। আর যুদ্ধের পর ঘুষ – দুর্নীতি, কালোবাজারী, লুঠপাটে দেশ ছেয়ে গেল। সব জিনিষের দাম হু হু করে বাড়তে লাগলো। শুরু হলো ১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষ। আর বঙ্গবন্ধু রক্ষীবাহিনী গঠন করে আরেকটি বড় ভুল করলেন। সারাদেশে শ্লোগান উঠলো — সোনার বাংলা শ্মাশান কেনো?… এই পরিস্থিতিতে তখন ওই সব হতাশার গান।

‘এখন কী নতুন প্রজন্মকে নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের গান, নতুন আশার গান শোনাবেন?’ এমন প্রশ্নের জবাবে হতাশা ছড়ায় শিল্পীর গলায়, এই প্রজন্মের কেউ তো মুক্তিযুদ্ধের গান শুনতে চায় না! এদের জন্য এই সব গান করে লাভ নেই। তারা তো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসই জানে না।…তবু এখন দেশ গড়ার গান করছি। দেশের দুঃসময়ে আমাদের আমি এই প্রজন্মকে অন্য এক মুক্তির গান শোনাতে চাই। কারণ এ দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি, প্রগতিশীল চিন্তা – চেতনার মুক্তি এখনো আসেনি।…

চার। কথোপকথনের শেষ পর্যায়ে এসে হাজির হন তখনকার সহকর্মি ফটো সাংবাদিক ফিরোজ আহমেদ। বাসার সঙ্গের খোলা ছাদে একটি বাতাবি লেবুর গাছ।

ফিরোজ বললেন, আউটডোরে এখানেই ছবি ভাল হবে।

আমি বললাম, আজম ভাই, সাদা জামাটা বদলে নেবেন না কী? রঙিন জামায় ছবি ভাল আসবে।

তিনি শিশু সুলভ হাসি দিয়ে বললেন, দাঁড়াও একটা সবুজ জ্যাকেট পরে আসি… বেশ খানিকটা ফ্রিডম ফাইটার, ফ্রিডম ফাইটার দেখাবে!

শুরু হলো, আমাদের ফটো সেশন।…

http://unmochon.net/node/1200


Name:  বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:14 Dec 2012 -- 05:30 PM

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেখে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর
বিপ্লব রহমান
__________________________________________
'একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং সারা দেশের অবহেলিত মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন আমার জীবনের শেষ ইচ্ছা।' পপসম্রাট ও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা আজম খান এক অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় এভাবেই তাঁর এক অন্তিম চাওয়ার কথা প্রকাশ করেছিলেন।
ঢাকার উত্তর কমলাপুরে শিল্পীর বাসভবনে একটি বার্তা সংস্থার পক্ষে সাক্ষাৎকারটি ধারণ করা হয়। দিনটি ছিল ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর। তখনো ধরা পড়েনি তাঁর মরণব্যাধি ক্যান্সার। তবে সে সময়ও শিল্পী ছিলেন বেশ অসুস্থ। আলাপচারিতার পুরো সময়ই শুয়ে ছিলেন। মাঝেমধ্যে বিছানার পাশে রাখা একটি গিটার ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখেন।
খুসখুসে কাশি জানান দিচ্ছিল পপসম্রাটের শরীর বেশ খারাপ।
জলপাই রঙের ট্র্যাকস্যুট পরা শিল্পী সেদিন দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন, 'অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কঠিন হয়ে গেছে। এখন রাজাকার, আলবদর, আলশামসের লোকেরা সাংগঠনিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী। একজন গোলাম আযমের বিচার করলেই তাদের ভিত্তি নির্মূল করা যাবে না। তাদের যে বিস্তৃতি গত ৩৬ বছরে ঘটেছে, তাকে উৎখাত করা সত্যিই কঠিন। তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার একদিন না একদিন হতেই হবে! কারণ যুদ্ধাপরাধ কখনো তামাদি হয় না।'
যুদ্ধাপরাধের বিচার অপূর্ণ থাকায় আজম খান সেদিন আরো বলেছিলেন, 'মুক্তিযুদ্ধ আসলে শেষ হয়নি। একাত্তরের কথা কেউ মনে রেখেছে না কি? তা ছাড়া আমি তো যুদ্ধ শুরু করেছিলাম মাত্র, শেষ করতে পারিনি। আমার যুদ্ধ ভারতীয় সেনারাই তো শেষ করে দিল! ১৯৭১ সালে মিত্রবাহিনীর সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এ দেশের মুক্তিযোদ্ধারাই চালিয়ে নিয়ে গেলে তখনই হয়তো আমরা একাত্তরের ঘাতক-দালালদের বিচার করতে পারতাম। যুদ্ধাপরাধী সেনাবাহিনীকে পাকিস্তানে ফিরে যেতে দিতাম না।'
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি হাতড়ে শিল্পী বলে চলেন, '১৯৬৮ সালে ছাত্রাবস্থায় আমরা বন্ধুবান্ধব মিলে গান করতাম। যুক্ত হয়েছিলাম গণসংগীত শিল্পীগোষ্ঠী 'ক্রান্তি'র সঙ্গে। ঢাকায়, ঢাকার বাইরে গান করতে গেলে পুলিশ হয়রানি করত। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশপ্রেম থেকে আমরা রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে অবরোধ তৈরি করতাম। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে বন্ধুবান্ধব মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, ঢাকায় থাকলে এমনিতেই মরতে হবে, তার চেয়ে যুদ্ধ করে মরাই ভালো। তখন সবাই একসঙ্গে যুদ্ধে যাই।'
'আম্মাকে বললাম, আমি যুদ্ধে যাচ্ছি। আম্মা বললেন, যুদ্ধে যাবি, ভালো কথা, তোর আব্বাকে বলে যা। আব্বা ছিলেন সরকারি চাকুরে। ভয়ে ভয়ে তাঁকে বলালাম, যুদ্ধে যাচ্ছি। তিনি বললেন, যাবি যা, তবে দেশ স্বাধীন না করে ফিরবি না! তাঁর কথা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। আব্বাকে সালাম করে যুদ্ধে যাই। তখন আমার বয়স ২১ বছর।'
একাত্তরের স্মৃতি হাতড়ে শিল্পী জানান, রণাঙ্গনে সাফল্যের পর তাঁকে একটি গেরিলা দলের প্রধান করে ঢাকায় পাঠানো হয়। তিনি বলেন, 'প্রথমে কুমিল্লা বর্ডার দিয়ে ত্রিপুরার আগরতলা যাই। সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের সেক্টরে মেজর এ টি এম হায়দারের কাছে দুই মাস গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিই। কুমিল্লার সালদায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে একটি সম্মুখ সমরে সাফল্যের পর আমাকে ঢাকায় গেরিলা যুদ্ধের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ... ১৯৭১ সালে ঢাকার মুক্তিবাহিনীর একটি গেরিলা গ্রুপের সেকশন কমান্ডার হিসেবে আমি ঢাকার যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, গুলশান, ক্যান্টনমেন্ট এলাকাসহ বেশ কয়েকটি সম্মুখ সমরে যুদ্ধ করি। আমি এই সব যুদ্ধের নেতৃত্ব দিই।'
যুদ্ধের বিশেষ কোনো স্মৃতির কথা জানতে চাইলে আজম খান বলেছিলেন, 'শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জাকিরের কথা প্রায়ই মনে পড়ে। ঢাকার গোপীবাগে একজন আহত মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচাতে গিয়ে সে পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে মারা যায়।... সে সময় জাকিরের মৃত্যুর খবর আমি গ্রুপের কাছে চেপে গিয়েছিলাম। নইলে তারা হয়তো মনোবল হারাত।'
অবহেলিত মুক্তিযোদ্ধাদের কথা বলতে গিয়ে শিল্পী হয়ে পড়েছিলেন আবেগতাড়িত। 'এই তো সেদিন ফকিরাপুলে আমার গ্রুপের একজন মুক্তিযোদ্ধাকে দেখি, ফুটপাতে চা বিক্রি করছে! কী আর করবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যার ভেতর আছে, সে তো আর চুরি করতে পারে না!'
১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালে 'ফ্রাসটেশন', 'রেল লাইনের ওই বস্তিতে'সহ নানা হতাশার গান পপসম্রাটের গিটারের সুরে ধ্বনিত হয়েছে। এর কারণ জানতে চাইলে শিল্পী সেদিন বলেন, 'তখনকার প্রেক্ষাপটে এই সব গান করেছিলাম। যে আশা নিয়ে আমরা যুদ্ধে গিয়েছিলাম, যুদ্ধের পর আমাদের সে আশা পূরণ হয়নি। পাকিস্তান আমলে ঘুষ-দুর্নীতি ছিল না। বাজারে সব জিনিসের একদর ছিল। আর যুদ্ধের পর ঘুষ-দুর্নীতি, কালোবাজারি, লুঠপাটে দেশ ছেয়ে গেল। সব জিনিসের দাম হু হু করে বাড়তে লাগল। শুরু হলো ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ। সারা দেশে স্লোগান উঠল, সোনার বাংলা শ্মশান কেন? এ রকম পরিস্থিতিতে ওই সব হতাশার গান গাই।'
নতুন প্রজন্মকে নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের গান শোনানোর স্বপ্ন দেখে গেছেন শিল্পী আমৃত্যু। বলেছিলেন, 'এই প্রজন্মের কেউ তেমনভাবে মুক্তিযুদ্ধের গান শুনতে চায় না। তারা তো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসই ভালো করে জানে না। তবু এখন দেশ গড়ার গান করছি। দেশের দুঃসময়ে আমি এই প্রজন্মকে অন্য এক মুক্তির গান শোনাতে চাই। কারণ এ দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি, প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার মুক্তি এখনো আসেনি।'
_________________________
http://www.kalerkantho.com/?view=details&type=rel_news&pub_no=543&cat_
id=1&menu_id=13&news_type_id=1&index=0&main_index=4&archiev=yes&arch_d
ate=06-06-2011



Name:  বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:14 Dec 2012 -- 05:41 PM

একাত্তরের রবিনহুড!
লিখেছেনঃ অমি রহমান পিয়াল (তারিখঃ রবিবার, ২৭/১১/২০১১ - ২৩:২৩)
________________________________________________________
খানিকটা তন্দ্রার ঘোরেই ছিলেন মারিও রয়ম্যান্স। চোখ মেলতেই সামনে থাকা টিভিতে দৃষ্টি আটকে গেলো। সংবাদ পাঠকের সামান্য বর্ণনার পর পর্দায় ভেসে উঠলো কোনো মতে গা ঢাকা এক মায়ের কোলে অপুষ্ট এক শিশুর ছবি। জায়গাটা পূর্ব পাকিস্তান। সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনের নামে ভয়াবহ এক গণহত্যা চলছে। লাশ কুকুরে খাচ্ছে। লোকজন পালাচ্ছে। গন্তব্য একটাই, সীমান্তের ওপারে ভারতে। আর সহ্য হলো না, উঠে নব ঘোরালেন। বন্ধ করে দিলেন টিভি।

কিন্তু দৃশ্যগুলো আটকে গেলো মাথায়। ঠিক কোন জায়গাটা এমন নাড়া দিয়ে গেলো এই ফ্লেমিশ (বেলজিয়ামের ডাচভাষী) তরুণকে তা নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারবে না হয়তো। ওই শিশু কোলে বিপন্ন মা কি! সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। সপ্তাহখানেক পরে টেলিফোনে লা সোয়েরে পত্রিকাকে মারিও বলছেন, ‘আমি কিন্তু পেশাদার অপরাধী নই বরং শিল্পরসিক। আমার বয়স মাত্র ২০, একজন এতিম। মা বেচে থাকলে হয়তো এই কাজটা আমি করতাম না। কিন্তু মানুষের দূর্ভোগ আমার সহ্য হয় না।...'



কি প্রসঙ্গে মারিও এই কথাগুলো বলছেন! কেনো দিচ্ছেন এই সাফাই! জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে চল্লিশ বছর পেছনে। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যখন চলছে, তখন দূরের ব্রাসেলসে বসে টিভিতে বাঙালীদের দুর্দশা দেখে অস্থির হয়ে পড়েন ২১ বছর বয়সী এই তরুণ। কিছু একটা করার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর যা করলেন সেটা বেলজিয়ামের ইতিহাসে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অপরাধের তালিকায় শীর্ষেই রয়ে গেছে। ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে ব্রাসেলসের মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস থেকে খোয়া গেলো ১৭ দশকের শিল্পী ইয়োহান ভারমিয়ারের আঁকা ‘দ্য লাভ লেটার’ নামের মাস্টারপিসটি। পরদিন জাদুঘর কর্তৃপক্ষের মাথায় বাজ পড়লো। বিশেষজ্ঞরা রায় দিলো এটা পেশাদার চোরদের কাজ। অপরাধীদের ধরতে অভিযানে নামলো বিশাল পুলিশ বাহিনী। তখনও কারো ভাবনাতেও আসেনি আনাড়ি এক তরুণ নিতান্তই ঝোঁকের মাথায় শিল্পমূল্যে অমূল্য এবং সেসময়কার বাজারদরে ৫ মিলিয়ন ডলারের পেইন্টিংটি দিশেহারার মতো লুকানোর পথ খুঁজছে।



ব্রাসেলসের সেই জাদুঘরে সে সন্ধ্যাতেই উদ্বোধন হয়েছিলো র‌্যঁবা এন্ড হিজ টাইম নামে ওই প্রদর্শনীটি। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি ও ডেনমার্কের জাদুঘর থেকে বহুমূল্য সব চিত্র নিয়ে আসা হয়েছিলো ধারে। ভারমিয়ারের মাস্টারপিসটি এসেছিলো আমস্টারডামের রাইখস মিউজিয়াম থেকে। মূলত ষোড়শ ও সতেরো দশকের ডাচ শিল্পীদের নিয়েই ওই প্রদর্শনী যা উদ্বোধন করেন বেলজিয়ামের রাজকন্যা পামেলা। তিনিই দ্য লাভ লেটারকে অক্ষত দেখা শেষজন। দর্শকদের একজন হয়েই সে প্রদর্শনীতে আসেন মারিও। চিত্রকলা সম্পর্কে জ্ঞান আছে বলেই জানতেন কোনটি তার প্রয়োজন, আগেই দেখে রাখেন তার লক্ষ্যের অবস্থান। অবশ্য সাইজও একটা ব্যাপার ছিলো। লাভ লেটার আঁকা হয়েছে ১৫ বাই ১৭ ইঞ্চি ক্যানভাসে। দর্শকরা যেখন বের হচ্ছে, মারিও তখন লুকিয়ে পড়েন এক দেরাজে। জাদুঘরের নিরাপত্তাব্যবস্থা এখনকার মতো এমন আহামরি ছিলো না সে সময়। চার জন পুলিশ ভেতরে টহল দিতেন কোনো অস্ত্র ছাড়াই। রাত একটু গভীর হলেই বেরিয়ে আসেন মারিও। এরপর চলে যান ভারমিয়ারের ছবির সামনে। কিন্তু সেটা বেশ শক্ত করেই সাটানো ওয়ালে। এবার পকেট থেকে একটা আলু কাটার ছুরি বের করলেন। তারপর চারপাশ থেকে কেটে নিলেন ক্যানভাসটা। মুড়িয়ে ভাজ করে পকেটে ভরলেন। তারপর ভেন্টিলেটার বেয়ে বাইরে বেরিয়ে ট্যাক্সি চড়ে সোজা বাসায়। টঙ্গারেনের এক কয়লাখনির পাশে।



হাতে তো পেলেন। এবার এটা কোথায় রাখবেন এনিয়ে শুরু তার টেনশান। প্রথমে ঘরে রাখলেন, তারপর সেখানে নিরাপদ নয় ভেবে পাশের জঙ্গলে গিয়ে মাটি চাপা দিলেন। রাতে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় আবার সেটা তুলে আনলেন ঘরে। নিজের ও কব্জায় থাকা সম্পদের নিরাপত্তাহীনতায় আতঙ্কিত মারিও পরদিন বল্ডারবার্গের হোটেল সিতেওয়েতে কাজের জন্য যোগাযোগ করলেন। তাকে ওয়েটার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো। ভবিষ্যতে তার পরিচয় দেওয়ার সময় এই পেশাটাই উল্লেখ হবে বারবার। ইতিহাসে ভারমিয়ারের নাম ও সেরা কীর্তিটির সঙ্গে উচ্চারিত হবে অনামা এক বেলজিয়ান ওয়েটারের কথাও। যাহোক, কাজটা পেয়ে অনেকখানি নিশ্চিন্ত হলেন মারিও। কারণ তাকে থাকার জন্য একটা ঘরও দেওয়া হয়েছে। সেখানে তোষকের নিচে একটা বালিশের কভারের মধ্যে ঠাই নিলো ভারমিয়ারের প্রেমপত্র। এর হদিশ পেতে বড় অংকের পুরষ্কার ঘোষণা করা হয়েছে ইতিমধ্যে।



এভাবেই সপ্তাহখানেক কেটে গেলো। মারিও এদিকে রেডিওতে শুনে যাচ্ছেন পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা। কিরকম নৃশংসতা চললে লাখে লাখে মানুষ অজানার উদ্দেশ্যে সীমান্তপাড়ি দেয়! ১ অক্টোবর রাতে ফোন করলেন লা সয়ের পত্রিকায়। নিজের পরিচয় দিলেন থিল ফন লিমবার্গ বলে। ইংরেজীতে যা থিল অব লিমবার্গ। থিল উইলেনস্পিজেল হচ্ছেন ফ্লেমিশ লোকগাঁথার রবিনহুড (জার্মানি-হল্যান্ডেও যার সমান মর্যাদা)। তাসের গায়ে জোকারের যে ছবিটা থাকে সেটা কিন্তু এই থিলেরই প্রতিকৃতি। প্রচলিত আছে তিনি হাসি এবং মজার ছলে দূর্নীতিবাজদের মুখোশ খুলতেন একইসঙ্গে ধনীদের সর্বস্ব লুটে তা বিলিয়ে দিতেন গরীবদের। লা সয়েরের সাংবাদিক ওয়াল্টার শুল্ডেনকে মারিও জানালেন যে চুরি যাওয়া ভারমিয়ার এখন তার কাছে। এটা ফেরত পেতে হলে কর্তৃপক্ষকে ২০০ মিলিয়ন ফ্রাংক (চার মিলিয়ন ডলার) মুক্তিপণ দিতে হবে। তবে শর্ত আছে। টাকাটা তাকে নয়, দিতে হবে ক্যাথলিক দাতব্য সংস্থা কারিতাসে। আর সেটা খরচ করতে হবে পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের পেছনে!



ওয়াল্টার তার পরিচয় জানতে চাপাচাপি করেছিলেন। জবাবে নিজেকে লিমবার্গের থিল হিসেবেই দাবি করেন মারিও। পাশাপাশি একটা হুমকিও দেন, মুক্তিপণ ছাড়া পেইন্টিংটা উদ্ধারের চেষ্টা করা হলে এটা চিরতরে হারিয়ে যাবে। তার কাছে ল্যাটিন আমেরিকার এক ক্রেতার হদিস আছে, প্রয়োজনে সেটা তার কাছে বিক্রি করে দেবেন। আর বাকি যে ৩৯টা ভারমিয়ার আছে, সেগুলোও চুরি করবেন। স্বাভাবিকভাবেই ওয়াল্টার তার কাছে জানতে চান পেইন্টিংটা তার কাছে আছে এর প্রমাণ কি। তখন তাকে গোপন এক জায়গায় দেখা করার প্রতিশ্রুতি দেন মারিও, সঙ্গে ক্যামেরাও নিয়ে আসতে বলেন। ভোরের আলো ফোটার ঘণ্টাখানেক আগে লিমবার্গের ওই জঙ্গলের পাশে দেখা হয় দুজনের। প্লাস্টিকের একটা মুখোশ পড়ে ওয়াল্টারের মুখোমুখি হন মারিও। তারপর তাকে চোখবেধে নিয়ে যান গন্তব্যে। সেখানে গাড়ির হেডলাইটের আলোয় ফ্লাশ জালিয়ে ছবি তোলেন ওয়াল্টার। রোববার দুটো ছবি সহ লিমবার্গের থিলের দাবিনামার খবর ছাপায় লা সয়ের। সাথে সাথে সাড়া পড়ে যায় গোটা বেলজিয়ামে।



এদিকে বেলজিয়ান রেডিও জানায় দু’দিন আগে তারা একই দাবিনামার চিঠি পেয়েছিলো। কিন্তু সেটা বিশ্বাসযোগ্য না হওয়ায় তারা প্রচার করেনি, বরং পুলিশকে দিয়েছে তদন্ত করতে। লা সয়েরের খবরে ডাচ জাদুঘর কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে ব্রাসেলসে আসে। তবে পেইন্টিংটা সত্যিই আসল কিনা সেটা যাচাই করার জন্য তারা একজন বিশেষজ্ঞ দিয়ে তা পরীক্ষা করার আবেদন জানায়। এসময় কোনোধরনের পুলিশি বাধার মুখে তাকে পড়তে হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেয় তারা। টোপ গেলেননি মারিও। দু’দিন পর ‘হেট ফক’ নামে আরেকটি পত্রিকায় টেলিফোন করেন তিনি। এবার সময়সীমা বেধে দেন। ৬ অক্টোবরের মধ্যে মুক্তিপণ বাবদ ২০০ মিলিয়ন ফ্রাঙ্ক পরিশোধ না করলে তিনি পেইন্টিংটি বিক্রি করে দেবেন বলে হুমকি দেন। শুধু তাই নয়, পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের জন্য এই মুক্তিপণ পরিশোধের ঘটনাটা টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করতে হবে- এই শর্তও জুড়ে দেন। সেখানে প্রেমপত্রের বীমার দায়িত্বে থাকা ব্রিটিশ কোম্পানি গ্রায়েম মিলারকে উপস্থিত থাকতে হবে চুক্তিপত্রে সই করার সময়। প্রস্তাব শুনে হতভম্ব হয়ে পড়ে কর্তৃপক্ষ। এত অল্প সময়ে এতটাকা সরাসরি সম্প্রচার করা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হস্তান্তরকে অসম্ভব বলে জানায় তারা।



বিআরটি রেডিওতে এই বক্তব্য শুনে ৬ তারিখ সকালে সেখানেই ফোন করলেন মারিও। সেসময় চলছিলো জনপ্রিয় শো ‘টু বেড অর নট টু বেড’, মারিওকে সেখানেই সরাসরি এন্ট্রি দেওয়া হয়। নিজের দাবি এবং এর প্রেক্ষাপট হাজার হাজার তরুণ-যুবার সামনে তুলে ধরেন লিমবার্গের রবিনহুড। তার সোজাসাপ্টা কথাবার্তা, মহত্ব ও সরলপনায় মুগ্ধ বনে যায় তারা। এদিকে কিন্তু সর্বনাশ হয়ে গেছে। হ্যাসেটের একটি পেট্রোলপাম্প থেকে ফোন করেছিলেন মারিও। সেটা পাম্পের অপারেটর শুনে ফেলেন। পুরষ্কারের লোভে খবর দেন পুলিশে। মপেডে চড়ে বেশীদূর যেতে পারেননি। ধাওয়ার মুখে আশ্রয় নেন এক গোয়ালে। লিমবার্গের রবিনহুডকে দুটো গরুর মাঝখানে গোবরের স্তুপে কয়েকটা খড় দিয়ে ঢাকা অবস্থায় আবিষ্কার করে পুলিশ। হোটেল সিতেওয়ের রান্নাঘরের পেছনে শোবার ঘর থেকে উদ্ধার হয় দোমড়ানো প্রেমপত্র। জানা যায় ট্যাক্সিতে বাড়ি ফেরার পথে ওটার ওপর বসেছিলেন মারিও। মাসছয়েক পর মার্কিন বিশেষজ্ঞ শেলডন কেকের তত্বাবধানে খানিকটা চেহারা ফেরে দ্য লাভ লেটারের। জোড়া লাগে ক্ষতস্থান। স্বস্তি ফেরে শিল্পরসিকদের মনে। মন্দের ভালো প্রেমপত্রকে ফিরে পাওয়াটাকেই বিশাল কিছু বলে প্রবোধ মানেন তারা।




লিমবার্গের থিলের গ্রেফতারের খবরে জনগনের মধ্যে কিন্তু উল্টো প্রতিক্রিয়া ঘটে। একটা মহৎ লক্ষ্যে তার মতো সরল-সিধে তরুণের এমন বেপরোয়া ও অভিনব উদ্যোগকে অপরাধ বলে মানতে অস্বীকার করে তারা। সংবাদপত্রগুলো, রেডিও-টিভি তার পাশে দাঁড়ায়। এমনকি তার হোটেলের মালিক-কর্মচারিরাও রাস্তায় নামেন মারিওর নিঃশর্ত মুক্তিদাবি করে পিটিশনে সাক্ষর সংগ্রহে। সেই সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে দাতব্য সংস্থাগুলো। মারিওর আসল পরিচয় ছাপিয়ে সবার মুখে থিল অব লিমবার্গই ব্যাপ্তি পায়। পাবলিক সেন্টিমেন্টে প্রশাসন নরম হতে বাধ্য হয়। দুবছরের কারাদন্ড হয় মারিওর, কিন্তু ছয়মাস সাজা খেটেই মুক্তি পেয়ে যান তিনি।



ট্রাজেডির সেটা শুরু মাত্র। কারাবাস তার ওপর প্রচণ্ড মানসিক আঘাত হয়ে এসেছিলো। তার প্রায় সব চুলই পড়ে যায়। অপ্রকৃতস্থ মারিও হোটেলে কাজে ফিরলেও মাসখানেক পর কাউকে কিছু না বলে উধাও হয়ে যান। পরিচিত এক মেয়েকে বিয়ে করেন, তার একটি মেয়েও হয়। কিন্তু দু’জনের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। জানা যায় মারিও স্ত্রীকে মারধোর করতেন, তার ওপর শয়তান ভর করেছে এই অভিযোগে। শোনা যায় ল্যুভর থেকে দ্য ভিঞ্চির মোনালিসা চুরি করার পরিকল্পনা করেন মারিও এবং গ্রেফতার হন প্যারিসে। সময়টায় পুরোপুরি ভবঘুরে তিনি। রাস্তায় রাস্তায় কাটাতেন, শুতেন গাড়িতে। ১৯৭৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর লিজে এক রাস্তার পাশে পার্ক করে রাখা গাড়িতে মুমূর্ষ অবস্থায় পাওয়া যায় মারিওকে। বলা হয় তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। আভ্যন্তরীন রক্তক্ষরণে দশদিন পর ১৯৭৯ সালের ৫ জানুয়ারি মারা যান লিমবার্গের রবিনহুড। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক অজানা-বেনামী সুহৃদ। জন্মস্থান টঙ্গারেনের নেরেমে এক পুরোনো কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে।




কিন্তু এখানেই শেষ নয় মারিও উপাখ্যান। বছর দুয়েক আগে হ্যাসেল্টের কুরিঞ্জেন ব্রিজের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন এক প্রেমিকজুটি। স্যু সমার্সের জন্ম ‘৭১য়ে, দ্য মর্ণিং পত্রিকার আদালত প্রতিবেদক। একটু ফিকে হয়ে আসা বিশাল এক গ্রাফিটি (আমরা যাকে চিকা বলি) তার নজর কাড়লো, লেখা- লং লিভ থিল। এর মানে কি জানতে চাইলেন চালকের আসনে থাকা স্টিন মিউরিসের কাছে। স্টিন একাধারে গায়ক, সঙ্গীতকার এবং টিভিঅনুষ্ঠান নির্মাতা। চলচ্চিত্রও বানিয়েছেন কয়েকটা। স্টিন পুরো ঘটনাটা বলতে পারলেন না, আবছা কিছুটা জানেন লোকশ্রুতি হিসেবে। কারণ ১৯৭১ সালে তারও বয়স ছিলো মাত্র ৬। এরপর দুজন ঠিক করলেন ঘটনাটা জানতে হবে। ঘাটতে ঘাটতেই পুরো ইতিহাসটা তাদের সামনে চলে এলো। পাশাপাশি জানলেন ওই গ্রাফিটি হোটেল সিতেওয়ের মালিকের ছেলের হাতের আঁকা। জানলেন ২০০৭ সালে দ্য কোয়েস্ট নামে একটি থিয়েটার গ্রুপ মারিওকে নিয়ে একটি নাটক করেছে।



চমকিত এই জুটি ঠিক করলেন লিমবার্গের রবিনহুডকে আবার জনসমক্ষে আনার, তাকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার। স্টিন সিদ্ধান্ত নিলেন মারিওর ঘটনা নিয়ে একটা তথ্যচিত্র বানাবেন আর স্যু ঠিক করলেন বই লিখবেন। মারিওর অভিযাত্রার ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে মুক্তি দেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও গত বছর ১০ অক্টোবর হোটেল সিতেওয়েতে একটি প্রিমিয়ার হয়েছে ‘থিল ফন লিমবার্গ’ নামের ডকুমেন্টারিটির। অবশ্য একই নামে একটি শর্টফিল্মও তৈরি করেছেন আরেক ডাচ পরিচালক থমাস বিয়ারটেন। তবে তারটার সঙ্গে গুণগত মানে ব্যাপক পার্থক্য স্টিনের তথ্যচিত্রের। সেখানে আর্কাইভাল ফুটেজ, পত্রিকার কাটিং এবং সংশ্লিষ্ঠদের সাক্ষাতকার দিয়ে মারিও রয়ম্যান্সের তখনকার মনোজগতটা উম্মোচন করেছেন তিনি। একইদিন স্যু সমার্সও প্রকাশ করেছেন তার বই ‘মারিও’।


কি দূর্ভাগা জাতি আমরা। মুক্তিযুদ্ধের এক পরম সুহৃদের নামটাই জানতে চল্লিশ বছর চলে গেলো আমাদের!

স্টিন মিউরিসের ডকুমেন্টারির প্রিভিউ দেখতে পারবেন এখানে:
http://video.canvas.be/documentaire-tijl-van-limburg

বিয়ারটেনের শর্টফিল্মটা দেখতে পাবেন এখানে:

ডিসক্লেইমার : ডাচ কিছু নামের উচ্চারণে আমার ভুল হতে পারে, সেটা ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখতে অনুরোধ রইলো।

(পোস্টটা উৎসর্গ করছি ব্লগার কুহককে, কেনো জানি তার মাঝেও মারিওর খানিকটা ছায়া পাই)।
________________________
http://www.amarblog.com/omipial/posts/140328


Name:  বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:14 Dec 2012 -- 05:43 PM

মুজিব বাহিনী : একাত্তরের এক রহস্যময় অধ্যায়
লিখেছেনঃ অমি রহমান পিয়াল (তারিখঃ সোমবার, ০৫/০৯/২০১১ - ১৭:২০)
__________________________________________________________
(কোনো এক বিচিত্র কারণে পোস্টটি সামু এবং আমু দুই জায়গা থেকেই গায়েব হয়ে গেছে, তাই রেফারেন্সের স্বার্থেই এটি আবারও পোস্ট করা হলো। )

(....মুক্তিবাহিনীর সবচেয়ে বড় অংশটি এসেছিল ছাত্রদের মধ্যে থেকে। এরা একইসঙ্গে ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক মতবাদের অনুসারী। সুবাদেই আদর্শগত সংঘাত এবং ভিন্ন নেতৃত্বকে অস্বীকার করার একটা প্রবণতা এদের মধ্যে খুব প্রবল। সেদিক থেকে আদর্শ গেরিলা ছিলেন মাটি থেকে উঠে আসা- কৃষক শ্রেনীর লোকজন। এদের মিথ্যে অহম ছিলো না, একজোড়া জাঙ্গলবুটের জন্য হা-পিত্যেশও তারা করেনি, খাবার না পেলে খায়নি, পরিধেয় বা বিছানা নিয়েও মাথা ঘামায়নি। স্রেফ স্বাধীনতার স্বপ্ন বুকে নিয়ে এরা মাটি কামড়ে লড়ে গেছে....
মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে ভারতীয় সামরিক কমান্ডের মূল্যায়ন।)


প্রাক-কথা
মুক্তিযুদ্ধের মাঝপথে আচমকাই রণাঙ্গনে নতুন একটি নাম ছড়িয়ে পড়লো। মুজিব বাহিনী। নিয়মিত বাহিনীর পাশাপাশি গণবাহিনীর যোদ্ধারা যখন কাধে কাধ মিলিয়ে লড়ছে, তখন আচমকা এমন একটা বাহিনী কি কারণে কিভাবে জন্ম নিলো তা ছিল রহস্য। এরা মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বাধীন ছিল না। মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক এমএজি ওসমানী কিংবা পূর্বাঞ্চলে ভারতীয় বাহিনীর অধিনায়ক জেনারেল অরোরাও এদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পাননি। মূলত মার্চের আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া ছাত্রলীগের তিন জঙ্গী ছাত্রনেতা আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, সিরাজুল আলম খান এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মণি ছিলেন এই বাহিনীর নেতৃত্বে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র’য়ের বিশেষ তত্বাবধানে ও বিখ্যাত সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল সুজন সিং উবানের ট্রেনিংয়ে ১০ হাজার সদস্যের এই এলিট বাহিনী যতখানি মুক্তিযুদ্ধ করেছে তারও বেশী দুর্নাম কুড়িয়েছে বামপন্থী নির্মূল অভিযানে। ভিন্নমত ও ভিন্ন আদর্শের মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন এদের লক্ষ্য। সত্যি কি তাই! অথচ মুজিব বাহিনী সম্পর্কে জানতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে হাসানুল হক ইনুর মতো অনেক সিলমারা বামপন্থী ছিলেন মুজিব বাহিনীর রাজনৈতিক ইনস্ট্রাকটর ও মোটিভেটর। এই যোদ্ধাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে নামার সুযোগ পাননি। আবার স্বাধীনতার পর এরাই পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়েছেন রক্ষীবাহিনী ও গণবাহিনীর আদলে। আলোচ্য পোস্টে বিভিন্ন প্রেক্ষিত থেকে মুজিব বাহিনীর জন্ম, সমসাময়িক প্রতিক্রিয়া, নিজেদের কোন্দল, অপপ্রচার, উবান ও সংশ্লিষ্ট ছাত্র নেতাদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। মূল প্রয়াস অবশ্যই একাত্তরের এই রহস্যময় বাহিনী ও এর কার্যক্রম নিয়ে আলোকপাত। সিরিজ ধরে শেষ করতে পারি না বলে এক সঙ্গে পুরোটা লিখলাম। মূলত সিরিয়াস পাঠকের জন্য এই লেখা।

‘সানী ভিলা’
কলকাতা ভবানীপুর পার্কের পাশে হালকা গোলাপী রংয়ের একটি দোতলা বাড়ি। বাসিন্দাদের নাম তপু বাবু, রাজু বাবু, সরোজ বাবু, মণি বাবু, মধু বাবু। আশেপাশের মানুষ তাই জানে। কিন্তু ঠিকানা ধরে যখন কেউ সেখানে যায় তখন তার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় ছদ্মনামগুলো। তপু ওরফে তোফায়েল আহমেদ, রাজু ওরফে আবদুর রাজ্জাক, সরোজ আকা সিরাজুল আলম খান, ফজলুল হক মণি ওরফে মণি বাবু এবং বঙ্গবন্ধুর দেহরক্ষী মুন্সীগঞ্জের মহিউদ্দিন বা মন্টু বাবু। নয় নম্বর সেক্টর থেকে নির্দেশ পেয়ে আসা বরিশাল ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ওবায়দুর রহমান মোস্তফার জবানীতে : বাড়ির দোতলায় একটি কক্ষে তোফায়েল ভাই, রাজ্জাক ভাইসহ আরও কয়েকজন আমাকে নিয়ে বৈঠক করলেন। ঐ বৈঠকে বসে জানলাম, আগরতলায় শেখ ফজলুল হক মণিসহ ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও কৃষক লীগের ভারতে আগত সদস্যদের নিয়ে মুজিব বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে আগরতলাতে হেডকোয়ার্টার করা হয়েছে। ইতিমধ্যে নাকি বেশ কয়েক হাজার মুজিব বাহিনীর সদস্য ভারতের পার্বত্য দুর্গম এলাকা টেন্ডুয়াতে (তানদুয়া) প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ট্রেনিং নেয়া আরম্ভ করেছে।



২১ নম্বর রাজেন্দ্র রোডের ‘সানী ভিলা’ নামে এই বাড়িটির মালিক প্রয়াত চিত্তরঞ্জন সুতার। পিরোজপুরের বাটনাতলার এই অধিবাসী পাকিস্তান কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন এবং কংগ্রেস নেতা প্রণব কুমার সেনের মেয়েকে বিয়ে করেন। ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচনে জয়ী হন, অসহযোগ আন্দোলনের শুরুতে ভারতে চলে যান। স্বাধীনতার পর ’৭৩ সালে আবারও নির্বাচিত হন এবং ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ ত্যাগ করেন। আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমদের ভাষ্য অনুযায়ী চিত্তরঞ্জনের মাধ্যমেই মেজর জেনারেল উবানের সঙ্গে যোগাযোগ হয় তাদের। মার্চের উত্তাল দিনগুলো শুরু হওয়ার অনেক আগেই (১৮ ফেব্রুয়ারি) বঙ্গবন্ধু উল্লিখিত চার নেতাকে এই বাড়িটির ঠিকানা দিয়ে দেন এবং চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে দেখা করে অস্ত্র ও ভারতীয় সহায়তা নেওয়ার নির্দেশ দেন। অবশ্য ২৫ মার্চের আগে আরেকবার ডাঃ আবু হেনা ছাত্রনেতাদের প্রতিনিধি হিসেবে সুতারের কাছে পাঠানো হয় সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা জানতে। মোটামুটি ‘সানী ভিলা’কেই ধরে নেওয়া যায় ‘মুজিব বাহিনী’র জন্মস্থান হিসেবে। এখানেই উবানের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রস্তাবিত বাহিনীর খসড়া পরিকল্পনাটি জানান মণি-সিরাজ-রাজ্জাক-তোফায়েল। এই বৈঠকে সুতার ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন আসম আব্দুর রবও।

‘জয় বাংলা বাহিনী’র উত্তরসূরী
এই পর্যায়ে এসে আমাদের কিছু চমকপ্রদ প্রাসঙ্গিক ইতিহাস জানা হয় । মুজিব বাহিনীর পেছনে যারা ছিলেন তারা একইসঙ্গে আবার সমাজতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদেরও সদস্য, যার সূচনা সেই ১৯৬২ সালে। বলা হয় ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনী এই সংগঠনটির মূল পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছে একদম শুরু থেকেই। এদের মধ্যে আবার ফজলুল হক মণি এবং তোফায়েল আহমেদ বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। এটির অস্তিত্ব প্রকাশ হয় ১৯৭২ সালে যখন ছাত্রলীগে মতভেদ চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে এবং সিরাজুল আলম খান তার অধীনস্তদের নিয়ে জাসদ গড়তে যাচ্ছেন। ’৬২ সালে সিরাজুল আলম, রাজ্জাক এবং কাজী আরেফ আহমেদ পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করার জন্য এই বিপ্লবী পরিষদের জন্ম দেন। বঙ্গবন্ধুকে এ সম্পর্কে জানানো হয় ’৬৯ সালে তিনি ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ থেকে মুক্ত হয়ে ফেরার পর। রাজ্জাকের ভাষ্যমতে মুক্তিযুদ্ধ যখন প্রায় অনিবার্য রূপ নিতে যাচ্ছে তার আগে মণি এবং তোফায়েলকে এই পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করেন তারা। এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ১৮ জানুয়ারী (মাসুদুল হকের ভাষ্যে ফেব্রুয়ারী হবে) একান্ত বৈঠক করেন। সেখানেই তাদের নির্দেশ দেওয়া হয় সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি নিতে এবং চারজনকে এর কো-অর্ডিনটর হতে। পাশাপাশি তাজউদ্দিন আহমদেকেও সঙ্গে নিতে বলেন বঙ্গবন্ধু। মার্চের পর সবাই ঠিকানা মতো (সানী ভিলা) গিয়ে জানতে পারেন তাজউদ্দিন সেখানে জাননি। বরং নিজেকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করে মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার গঠন করেছেন।

তোফায়েল আহমেদ জানিয়েছেন এই পরিকল্পনাটা আরো আগেই নিয়েছিলেন মুজিব। ১৯৬৯ সালে লন্ডন থেকে ফেরার পর তিনি সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য তার একটি বিশেষ পরিকল্পনার কথা জানান। আর এই উদ্দেশ্যে প্রতিমাসে ২৫ জন নির্বাচিত যোদ্ধাকে ভারতে বিশেষ ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এর মধ্যেই সত্তরের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হয়ে যাওয়ায় পরিকল্পনাটি স্থগিত রাখা হয়। নির্বাচনের দায়িত্ব পান মণি-সিরাজ-রাজ্জাক ও তোফায়েল। এর মধ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় নিহত সার্জেন্ট জহুরুল হকের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করে ছাত্রলীগ। আর এর একাংশ থেকে ‘১৫ ফেব্রুয়ারী বাহিনী’ নামে একটি দল মার্চ পাস্ট করে বিশ্ববিদ্যালয়সহ শহরে। এই মিছিলে ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। তবে এই বাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কে ফজলুল হক মণি এবং ডাকসু সভাপতি আসম রব ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখন কিছুই জানতেন না। এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নগর ছাত্রলীগ সভাপতি মফিজুর রহমান ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক হাসানুল হক ইনু। এখানে স্পষ্টতই চার নেতার মধ্যে আদর্শগত ক্ষেত্রে খানিকটা মতবিরোধের আঁচ পাওয়া যায়। আর তা স্পষ্ট হয়ে যায় সেবছরই ১২ আগস্ট ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে ৩৬-৯ ভোটে স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রস্তাবটি পাশ হয়। নুরে আলম সিদ্দিকী, মাখনসহ যারা বিরোধিতা করেন তারা সবাই শেখ মণির অনুসারী। মণি তখন ছাত্র নন, কিন্তু ছাত্রলীগের একটি অংশকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার অনুসারীদের হারিয়ে সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বাধীন অংশটির এই জয় দুজনের শীতল সম্পর্ককে আরো শীতল করে দেয়। আর এর প্রভাব মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিব বাহিনীতে তেমন না পড়লেও স্বাধীনতার পর মারাত্মক রূপ নেয় যার প্রেক্ষিতে রক্ষী বাহিনী-গণবাহিনীর সংঘর্ষে তার ভয়াবহ প্রকাশ ঘটে। যুদ্ধকালীন সময়ে সমাজতন্ত্র এবং মুজিববাদে সমান অনুগত আবদুর রাজ্জাকই মূলত সিরাজ-মণির মধ্যেকার ভারসাম্য বজায়ে বড় অবদান রাখেন। তবে মুজিব বাহিনীর মূল পরিকল্পনায় তখনকার ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নূরে আলম সিদ্দিকী ও শাহজাহান সিরাজকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। দুজনেই মণির অনুসারী ছিলেন।






বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের ওই ট্রাম্পের আগে জন্ম ‘জয় বাংলা বাহিনী’র। মূলত ছয় দফার ঘোষণা বার্ষিকী ৭ জুনকে সামনে রেখে এটি গঠিত হয়। ’১৫ ফেব্রুয়ারী বাহিনী’র সদস্যরা স্বাধীনতার লড়াইয়ের জন্য যথেষ্ট উপযুক্ত নয় এই বিচারে আরেকটু জঙ্গী হিসেবে এর সংগঠন। সিদ্ধান্ত হয় সেদিন শহীদ মিনার থেকে পূর্ণ সামরিক কায়দায় মার্চ পাস্ট করে তারা পল্টন ময়দান যাবেন। সেখানে শ্রমিক লীগের বঙ্গবন্ধুকে অভিবাদন জানানোর কর্মসূচী আর তাতে গার্ড অব অনার দেওয়ার কথা ছাত্রলীগের। আগের রাতে অর্থাৎ ৬ জুন ইকবাল হলে ‘জয় বাংলা বাহিনীর পতাকা’র নকশা করেন কুমিল্লা থেকে হঠাৎ ঢাকায় আসায় শিব নারায়ণ দাস। এটিই পরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকায় পরিণত হয়। ৪২ বলাকা ভবনে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় অফিসের লাগোয়া ‘নিউ পাক ফ্যাশন টেইলার্স’ থেকে তৈরী হয় স্বাধীন বাংলার মানচিত্র সম্বলিত সেই প্রথম পতাকা যা সেলান আবদুল খালেক মোহাম্মদী। ‘জয় বাংলা বাহিনী’ পরিকল্পনা মতো মার্চ করে পল্টন যায়, কিন্তু পতাকাটি গোটানো অবস্থায় বয়ে নিয়ে যান আসম রব। মিছিলে ওড়ে ছাত্রলীগের পতাকা যা থাকে ইনুর হাতে। অভিবাদন মঞ্চে হাটু গেড়ে মুজিবকে পতাকাটি উপহার দেন রব। মুজিব সেটা খুলে দেখেন এবং আবার গুটিয়ে রবকে ফেরত দেন। এটি এরপর থাকে ইনুর হাত ঘুরে হাতে পান ছাত্রলীগ নগর সম্পাদক শেখ মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় আবার ওড়ে সেই ‘জয় বাংলা বাহিনী’র পতাকা। এরপর তা হয়ে যায় জাতির পতাকা, জাতীয় পতাকা। শেখ মুজিব জানতেন ‘জয় বাংলা বাহিনী’র অস্তিত্বের কথা। ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসের বদলে প্রতিরোধ দিবস পালন করে আওয়ামী লীগ। সেদিন পল্টনে আবারও ওড়ে পতাকা। আর এদিন ধানমন্ডী ৩২ নম্বরে নিজের বাসা থেকে দর্শনার্থীদের উদ্দেশ্যে মুজিবের বক্তৃতায় আসে ‘জয় বাংলা বাহিনী’র নাম (ভিডিও ফুটেজ দেখুন)। গোটা মার্চ জুড়েই এরা ডামি রাইফেল নিয়ে ছাত্রলীগ কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। মোটামুটি একটা মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া হয় সশস্ত্র সংগ্রামের।

মুজিব বাহিনীর প্রেক্ষিত ও বিস্তার
ফেব্রুয়ারিতে মুজিবের সঙ্গে চার ছাত্র নেতার বৈঠকের ব্যাপারটি তাজউদ্দিনের গোচরে ছিল। কিন্তু কলকাতায় যাওয়ার পর তাদের উপেক্ষা করে একক সিদ্ধান্তে এগিয়ে যান তিনি। বিভিন্ন সূত্রে এটা আগেও অনেকবার উল্লেখ হয়েছে যে তাজউদ্দিনের এই প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণ একদমই মেনে নিতে পারেননি শেখ মণিসহ বাকিরা। বরং সিনিয়ারিটি অনুযায়ী এই ক্ষেত্রে তারা সৈয়দ নজরুল ইসলামকেই চাইছিলেন। কিন্তু সেটা পরে, তার আগে তাদের দাবি ছিলো মুক্তিযুদ্ধ চলবে একটি বিপ্লবী কমান্ড কাউন্সিলের অধীনে আর তার নেতৃত্ব দেবেন তারা চারজন- বঙ্গবন্ধু তাদেরকেই মনোনীত করে গেছেন এজন্য। গ্রহণযোগ্যতা ও অন্যান্য প্রেক্ষাপটে এই দাবিটি উপেক্ষা করা অবশ্যই আমাদের স্বাধীনতার পক্ষে গিয়েছে। যদিও সৈয়দ নজরুলের ছেলে সৈয়দ আশরাফ (বর্তমানে মন্ত্রী) এবং বঙ্গবন্ধু তনয় শেখ জামালও ছিলেন মুজিব বাহিনীর অন্যতম সদস্য। এবং উবান ও নজরুলের হস্তক্ষেপেই তাজউদ্দিনের পেছনে লাগা বন্ধ করেন মণি ও অন্যরা। উবান পরে রক্ষী বাহিনীর দায়িত্বও নেন।

তাজউদ্দিনের ব্যাপারে তাদের সবচেয়ে বড় অভিযোগটি ছিল ‘বঙ্গবন্ধু’ আর ফিরবেন না এটা ধরে নিয়ে তিনি যুদ্ধ পরিচালনা করছেন। নিজেকে সেভাবেই অধিষ্ঠিত করছেন (এই প্রচারণাটা স্বাধীনতার পর তাজউদ্দিনের বিপক্ষে গেছে)। পাশাপাশি তিনি মাওলানা ভাসানীসহ কমিউনিস্ট দলগুলোর সদস্যদেরও গুরুত্ব দিচ্ছেন। এর পেছনে আমিরুল ইসলাম ও মাঈদুল ইসলামকে (মূলধারা ‘৭১এর লেখক) দায়ী করেন তারা। তাদের আশঙ্কা জাগে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব এসব বামপন্থীদের কব্জায় চলে যাবে। এই প্রেক্ষিতেই বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স নামে একটি বিশেষ বাহিনীর পরিকল্পনা নেন চারজন। আর তার ‘মুজিব বাহিনী’ নাম করণের পেছনে কারণ মুজিববাদ (জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র) কায়েম। এ বিষয়ে উবান লিখেছেন : Because of their single-minded loyalty to Mujib and their closeness to him, they were more eager to be known as the Mujib Bahini. They had been issuing certificates of genuineness, selecting from their old colleagues. Choosing enough sacrificing, upright and faithful men from Bangladesh, they were putting pressure that they should receive unconventional training in fighting techniques unlike the commando training received by members of the Mukti Bahini. Perhaps they wanted to give leadership to such a political party which has its organisational branches in each town, thana and tehsil.'

মে মাসের শুরুতে ‘সানী ভিলা’র সেই বৈঠকে উবানকে তাদের পরিকল্পনা জানান চার নেতা। পরিকল্পনাটি তার পছন্দ হয় খুবই। এখানে বলে রাখা দরকার মুজিব বাহিনীর গঠন এবং ট্রেনিংয়ের ব্যাপারটি পুরোটাই গোপনে ব্যবস্থা করা হয় আর এ ব্যাপারে ভারতীয় সেনা প্রধান এবং ওয়ার কাউন্সিল হেড জেনারেল স্যাম মানেকশ ছাড়া আর কেউই কিছু জানতেন না। এ কারণে মুজিব বাহিনীকে ‘স্যামস বয়েজ’ নামে উল্লেখ করতো ভারতীয় বাহিনী। উবান জানাচ্ছেন পরে তাজউদ্দিনকে মানেকশ সরাসরি বলেছেন যে সেনাবাহিনীর বিশেষ দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য তিনি (মানেকশ) নিজেই গড়ে তুলেছেন এই বাহিনী। তিব্বতীদের নিয়ে গড়া স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের সফল রূপকার উবানকে দায়িত্বটা দেওয়া হয় উপর মহল থেকে। র’ প্রধান আরএন কাও যিনি একই সঙ্গে ভারতীয় কেবিনেট সেক্রেটারিয়েটের সচিবও ছিলেন এই ক্ষেত্রে উবানের ইমিডিয়েট বস। সে মাসেই (২৯ মে, ১৯৭১) ২৫০ জনের প্রথম দলটি দেরাদুনের দেড় কিলোমিটার দূরে পাহাড়ী শহর তানদুয়ায় প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করে। মেঘালয়ের হাফলংয়ে আরেকটি ট্রেনিং ক্যাম্প খোলা হয়, কিন্তু একটি ব্যাচ এখানে ট্রেনিং নেয়, তারপর ক্যাম্পটি তুলে নেওয়া হয়। প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণে ছিল ভারতীয় সেনা কর্মকর্তারা। এদের মধ্যে উল্লেখ্য মেজর মালহোত্রা যিনি পরে রক্ষী বাহিনীর প্রশিক্ষনেও দায়িত্ব পালন করেন। প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ শেষে তাদের মধ্যে থেকে আটজনকে বাছাই করা হয় প্রশিক্ষক হিসেবে-হাসানুল হক ইনু, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, আফম মাহবুবুল হক, রফিকুজ্জামান, মাসুদ আহমেদ রুমী (প্রয়াত ক্রীড়া সাংবাদিক), সৈয়দ আহমদ ফারুক, তৌফিক আহমদ ও মোহনলাল সোম। পরে প্রশিক্ষকের সংখ্যা বাড়িয়ে ৫২ করা হয়, ২০ নভেম্বর ১৯৭১ মুজিব বাহিনীর ট্রেনিং বন্ধ করে দেওয়া হয়। সে পর্যন্ত ১০ হাজার মুজিব বাহিনী সদস্য প্রশিক্ষণ নেন। নেতাদের মধ্যে রাজ্জাকই প্রথম ব্যাচের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সামরিক ট্রেনিং নেন, বাকিরা নেন প্রাথমিক প্রশিক্ষণ। এ ব্যাপারে প্রয়াত কামরুল ইসলাম একটি সাক্ষাতকারে তাদের প্রশিক্ষণের ধারা উল্লেখ করেন (ভিডিও ফুটেজ দেখুন)।






বাংলাদেশকে মোট চারটি সেক্টরে ভাগ করা হয় মুজিব বাহিনীর অপারেশনের জন্য। উত্তরাঞ্চলীয় সেক্টর কমান্ডার ছিলেন সিরাজুল আলম খান যার আওতায় ছিল বৃহত্তর রংপুর, রাজশাহী, পাবনা, দিনাজপুর। তার সেকন্ড ইন কমান্ড ছিলেন মনিরুল ইসলাম ওরফে মার্শাল মনি। দক্ষিণাঞ্চলীয় সেক্টর (বৃহত্তর খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, বরিশাল ও পটুয়াখালী) ছিল তোফায়েল আহমদের অধীনে, সহ অধিনায়ক ছিলেন কাজী আরেফ আহমেদ। শেখ ফজলুল হক মণির কমান্ডে ছিল পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টর (বৃহত্তর চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট এবং ঢাকা জেলার কিছু অংশ), তার সহ-অধিনায়ক ছিলেন রব ও মাখন। আবদুর রাজ্জাকের দায়িত্বে ছিল কেন্দ্রীয় সেক্টর যা গঠিত ছিল বৃহ্ত্তর ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল এবং ঢাকা নিয়ে। তার সহ-অধিনায়ক ছিলেন সৈয়দ আহমদ। চার নেতা ছিলেন জেনারেল সমমর্যাদার, তাদের যাতায়তের জন্য হেলিকপ্টার বরাদ্দ ছিল, প্রত্যেক সেক্টরের জন্য আলাদা অর্থ বরাদ্দ ছিল যা বন্টনের দায়িত্ব ছিল নেতাদের হাতে।

আলাদা ওয়ারলেস সিস্টেম আলাদা কোডের অধীনে মুজিব বাহিনী ছিলো আদপে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের একদল মুক্তিযোদ্ধা। বিভিন্ন সাক্ষাতকারে এর নেতারা বলেছেন পাঁচ বছর মেয়াদী একটি পরিকল্পনা নিয়ে এই বাহিনী গঠন করা হয়। প্রাথমিক পরিকল্পনায় ছিল দেশের মধ্যে ছোট ছোট পকেট তৈরি। সেসব পকেটে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল বানানো। প্রতিটি থানায় (পরে উপজেলা) ৫ জনের একটি সেল তৈরি করা হতো যার দায়িত্বে থাকতেন একজন সংগঠক ও তার সহকারী। আশ্রয়স্থলের জন্য একজন নেতা থাকতেন এবং বাকি দুজনের দায়িত্ব ছিলো বাহকের। এরপর সেখানে যোদ্ধারা আশ্রয় নিয়ে লড়াই শুরু করবেন, প্রতিবিপ্লবী ও দালালদের হত্যা করবেন। আর মুক্তাঞ্চল তৈরী হওয়ার পর তার রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হবে মুজিববাদের ভিত্তিতে যা আদপে আওয়ামী লীগ এবং আমাদের স্বাধীনতারও চার মূলনীতি। জুনের মাঝামাঝি ২২৩টি থানা মুজিব বাহিনীর আওতায় চলে আসে। এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত বলেছেন হাসানুল হক ইনু। তার বক্তব্য অনুযায়ী সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তারা ধাপে ধাপে এগোনোর পরিকল্পনা নেন। এই উদ্দেশ্যে প্রতিটি থানায় একজন কমান্ডারের অধীনে দশজন ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুজিব বাহিনী সদস্যের একটা দল করা হবে। এদের একজন রাজনৈতিক কমান্ডারও থাকবে যার কাজ দলকে রাজনৈতিকভাবে উদ্বুদ্ধ করা। একই পদ্ধতিতে জেলা পর্যায়েও কমান্ড গঠন করা হয় এবং সেখানেও রাজনৈতিক কমান্ডার হিসেবে একজন নিয়োগ পান।

মুজিব নগরে প্রতিক্রিয়া ও প্রাথমিক সংঘাত

সে সময় কলকাতা থেকে আওয়ামী লীগের প্রচারপত্র হিসেবে বের হতো সাপ্তাহিক জয় বাংলা। কিন্তু আলোড়ন তুললো শেখ মণির সম্পাদিত সাপ্তাহিক বাংলার বাণী। একদল তরুণ সাংবাদিকের এই পত্রিকাটি অল্প সময়ে গ্রহণযোগ্যতা পেল পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক মহলে। পাশাপাশি রুষ্ট হলেন মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ওসমানী। কারণ বাংলার বাণীতে বাংলাদেশের যে কোন রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের যেসব সাফল্যের খবর ছাপা হতো তাতে মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিবাহিনী না লিখে মুজিব বাহিনী লেখা হতো। মুক্তি বাহিনীর সদর দপ্তরে জনসংযোগ কর্মকর্তা নজরুল ইসলামের ভাষ্যে : বাংলার বাণীতে যেদিন প্রথম মুক্তিবাহিনীর স্থলে মুজিব বাহিনী লেখা হলো, সেদিন জেনারেল ওসমানী আমাকে একান্তে ডেকে নিয়ে খুবই কড়া ভাষায় বললেন, নজরুল সাহেব, মুজিব বাহিনী কি? ওসব কারা লিখছে? কেন লিখছে? আপনি এ সম্পর্কে তদন্ত করে জানাবেন আর বলবেন যেন ভবিষ্যতে মুজিব বাহিনী আর না লেখা হয় এতে করে আমাদের নিয়মিত বাহিনীতে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। তটস্থ নজরুল নিজেও বাংলার বাণীতে লিখতেন, কিন্তু ওসমানীকে জানাননি। দিন কয়েক পর নজরুল জানালেন তার তদন্তের ফল। বললাম, স্যার এই পত্রিকা শেখ ফজলুল হক মণি সাহেবের। এ কথা বলতেই জেনারেল সাহেবের উন্নত গোফগুলো নুয়ে গেলো। এরপর হু বলে একটা গম্ভীর ধরণের শ্বাস ফেলে বললেন, ঠিক আছে। খানিকপর ওসমানীর মুখ থেকে বেরুলো : সব কিছুতে একটা ডিসিপ্লিন আছে। এখানে আমরা রং তামাশা করতে আসিনি। বিদেশের মাটিতে আমরা যে বিশৃংখলা ও অনৈক্য দেখাচ্ছি, তা জাতির জন্য মঙ্গল নয় নজরুল সাহেব। এতে আমাদের সম্পর্কে এদের ধারণা খুব খারাপ হবে। আর আমাদের এই অনৈক্য ও বিশৃংখলার কথা কি মনে করেন কলকাতার এই চার দেয়ালের ভেতরে বন্দী থাকবে? শত্রুপক্ষ এর সুবিধা নিশ্চয়ই নেবে। আপনি-আমি এখানে বসে বসে নানান বাহিনী গঠন করি, আর যে ছেলেটি বাংলাদেশের পথে-জঙ্গলে কিংবা নদীতে ট্রিগারে আঙুল লাগিয়ে নিজের জীবনকে বাজী রেখে শত্রু হননের অপেক্ষায় বসে রয়েছে, তার কথা কি আমরা চিন্তা করি? বিষয়টি আমি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিতে আনবো।


ওসমানীর সংশয় একেবারে অমূলক ছিলো না। কাছাকাছি হওয়ায় প্রচারণায় সবচেয়ে বেশী লাইনেজ পেতো মেজর জলিলের নয় নম্বর সেক্টর। এ নিয়ে জিয়াউর রহমান সহ অন্য সেক্টর কমান্ডাররা অসন্তুষ্ট ছিলেন। নজরুল লিখেছেন : সেদিনের মেজর জিয়াউর রহমান একজন সেক্টর কমান্ডার, একবার কলকাতায় এসে আমাকে বলেছিলেন আপনি তো শুধু মেজর জলিল সাহেবের সেক্টর নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন। আমাদের দিকেও একটু খেয়াল-টেয়াল রাখবেন। মুক্তিযুদ্ধের শেষার্ধে জিয়াকে যখন এক নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব ছেড়ে একটি ব্রিগেড গঠন করার নির্দেশ দেওয়া হয়, জিয়া তা পালন করলেন ঠিকই কিন্তু তার দলের নাম রাখলেন ‘জিয়া বাহিনী’। এমনিতে ওসমানী ‘মুজিব বাহিনী’ নিয়ে ভীষণ ক্ষিপ্ত ছিলেন, জিয়ার এই পদক্ষেপ আগুনে ঘি ঢাললো। ওসমানী জিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক কমান্ডকে অস্বীকার করার অভিযোগ এনে তার নেতৃত্ব কেড়ে নিয়ে তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিলেন। সিদান্তটি সত্যি কার্যকর করা হলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অবস্থা কি হতো ভাবতেই শিউরে উঠি, তবে তা হয়নি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের বিচক্ষণতার কারণে। তিনি ওসমানীর সিদ্ধান্তটি বাতিল করে আরো দুটি বাহিনী গঠন করার পাল্টা নির্দেশ দিলেন। ‘খালেদ বাহিনী’ ও ‘শফিউল্লাহ বাহিনী’র জন্ম এভাবেই। আমরা যাদের জেড ফোর্স, কে ফোর্স ও এস ফোর্স হিসেবে চিনি।

আসা যাক তাজউদ্দিনের প্রতিক্রিয়ায়। তিনি বিরক্ত হলেও নিরূপায় ছিলেন। তবে উবান লিখেছেন অন্যভাবে : অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার মানেই অপরিহার্যভাবে মি. তাজউদ্দিন। তিনি মুজিব বাহিনী নেতাদের দু চোখে দেখতে পারতেন না। এবং তাদের প্রতিটি অভিযোগকে বাজে কথা বলে উড়িয়ে দিতেন। ‘মুজিব বাহিনী’ নামে একটি সংগঠন মাঠে নেমেছে এটা প্রথম জানাজানি হয় আগস্টের শুরুতে যখন বিভিন্ন সেক্টরে মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে মুজিব বাহিনীর পরিচয়গত সংঘাত সৃষ্টি হয়। ২ নম্বর সেক্টরে খালেদ মোশাররফের বাহিনীর চ্যালেঞ্জে পড়েন ভারতীয় সেনাবাহিনীর পোষাক পড়া অত্যাধুনিক অস্ত্রসহ ৪০ জন মুজিব বাহিনী সদস্য। পরে উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপে এটির সমাধান হয়। এছাড়া নয় নম্বর সেক্টরেও ঘটে এমন ঘটনা। মেজর জলিল এক সাক্ষাতকারে বলেছেন : ‘আমার সেক্টরে হিঙ্গেলগঞ্জ ফিল্ডে যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তারা ২২ জনকে গ্রেপ্তার করেন। তারা তখন ভেতরে অনুপ্রবেশ করছিল। সেখানে তাদের চ্যালেঞ্জ করা হয়। এক ভদ্রলোক নিজেকে ক্যাপ্টেন জিকু (জাসদ নেতা নুরে আলম জিকু) বলে পরিচয় দেন। তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়।’

এই অবস্থায় মুজিব নগর সরকারের সঙ্গে কলকাতার হিন্দুস্তান ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন মুজিব বাহিনীর নেতারা। ভারত সরকারের পক্ষে ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ প্রতিনিধি ডিপি ধর এতে অংশ নেন আর মুজিব নগর সরকারের তরফে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন। সেপ্টেম্বর মাসে আরেকটি বৈঠক হলেও প্রথমবারই একটি আপোষরফায় আসে দুপক্ষ। বৈঠকে শাহজাহান সিরাজকে দেওয়া হয় মুজিব বাহিনী ও তাজউদ্দিন সরকারের মধ্যে লিঁয়াজো রাখার দায়িত্ব। এ বৈঠকেই সিদ্ধান্ত হয় সীমান্ত থেকে ২০ মাইল পর্যন্ত মুক্তি বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করবে, তারপর থেকে ভেতরের দিকের দায়িত্ব নেবে মুজিব বাহিনী। তাদের অপারেশন সম্পর্কে তারা কাউকে জানাতে বাধ্য থাকবে না, তবে শুধুমাত্র স্থানীয় সেনা ইউনিট কমান্ডারই জানবেন তাদের অনুপ্রবেশে কথা, তার অনুমতিই নিয়েই তারা ভেতরে প্রবেশ করবেন। ওসমানী, তাজউদ্দিন কিংবা অরোরা কারোই এই বাহিনীর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো তাদেরকে জানানো হবে।

মুজিব বাহিনীর যুদ্ধ : উদ্দেশ্য বামপন্থী নির্মূল!

এখানে উল্লেখ না করলেই নয় মুক্তিবাহিনীর রিক্রুটের জায়গাগুলোতে (যুব শিবির) আওয়ামী লীগের নেতারা স্ক্রিনিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তাদের কাজ ছিল মুক্তিবাহিনীতে যেন আওয়ামী ঘরানার বাইরে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রবেশ না ঘটে। কিন্তু তারপরও তা ঠেকানো যায়নি। উবান লিখেছেন : Young men had been coming in their thousands at this time to have training, but there was no satisfactory procedure to find out the sincerity and motive of all those who were coming for the purpose of training. For this the training camps had to depend on the certificates given by the National Assembly members (MNA) appointed by the provisional government about the sincerity of the trainees. MNAs used to issue the certificates, blindly based on the list prepared by the Bengali officers, but some of these trainees had a future political motive. As a result, a few groups vanished with their weapons into the deep interior of Bangladesh, while some others would return after hiding their weapons and report that the weapons had been captured and gone out from their hands. To put an end to these unhappy activities, a fullproof solution was put forward, but the senior officials did not accept it, because, being in higher positions, they considered their knowledge to be superior too.'


উবান জুলাইয়ের দিকে ব্যক্তিগতভাবে এনিয়ে উচ্চপর্যায়ে অভিযোগ করেছিলেন। তার অভিযোগ ছিলো জিয়া এবং খালেদ মোশাররফসহ বেশ কজন সামরিক অফিসারের বিরুদ্ধে তার অভিযোগে উল্লেখ করেন যে মুক্তিবাহিনীতে এদের প্রশ্রয়ে কিছু নকশালপন্থী এবং চীন পন্থী পাকিস্তানি এজেন্টের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তার সেই অভিযোগে (ইমেজ ফাইল দেখুন) রাশেদ খান মেনন ও তার ভাইদের নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি জিয়া-খালেদরা ব্যক্তিগত বাহিনী তৈরি করছেন যার মাধ্যমে স্বাধীনতার পর ক্ষমতা দখল করার মতলব আঁটছেন। সে সময় কমরেড ফরহাদের নেতৃত্বে ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যরা আলাদা ভাবে ট্রেনিং নিচ্ছিলেন। নিচ্ছিলেন চীনা পন্থী ন্যাপ ভাসানীর সদস্যরাও। এ সময় বারবার সর্বদলীয় একটি বিপ্লবী সরকার গঠনের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল তাজউদ্দিনকে। এ ব্যাপারে অবশ্য ইন্দিরারই অমত ছিল। কারণ বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশ কেসটি ছিল নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা না দিয়ে উল্টো হত্যা নির্যাতনের মাধ্যমে দেশছাড়া করার। মুজিব নগর সরকার ছিলো তার আদর্শ প্রতিরূপ। সেখানে সর্বদলীয় বিপ্লবী সরকার মানে পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধ কিংবা ভারতের উস্কানিতে বিচ্ছিন্নতাবাদের অপচেষ্টা জাতীয় থিওরিগুলোকে প্রতিষ্ঠা দেওয়া।



মুজিব বাহিনীর নেতারাও এনিয়ে বারবার অভিযোগ করেছেন যে ভারত সরকার নকশালপন্থী-চীনপন্থীদেরও ট্রেনিং দিচ্ছে এবং এ ব্যাপারে তাদের অপছন্দের কথাও তারা উবানকে জানিয়েছেন। উবান এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন তার লেখায়: These four leaders inform us that many undesirable persons similar to the Naxalites are making inroads (into the Mukti Bahini) in Bangladesh and are getting training and weapons. They warn that these weapons will not be used against the Pakistanis; rather, they are being hidden in Bangladesh so that they can be used after independence in support of movements similar to the Naxalite one. In fact, they mention the names of the pro-Chinese communist leaders who are connected to some army officials of Bangladesh and through whose approval a large number of communist cadres were being recruited and trained and armed with weapons. The matter was brought to the notice of the authorities confidentially, but the result was nil.
The young leaders have seen Bangladesh's Naxalite men gossiping with the Indian officials in an aristocratic hotel of India. Perhaps the Naxalites lived in such hotels. The young leaders knew that during military rule in East Pakistan those people had been their worst enemies. It was originally against them that the youth organisation of the Awami League was established. The young leaders failed to understand why India was partial towards their identified enemy. So they mistakenly concluded that the goal of our government was to enable a communist party to stand on solid ground in Bangladesh. They also came to know through a reliable source that the Marxist workers and Moulana Bhasani's followers were getting separate training and weapons.

এ বিষয়ে উবান তুলে ধরেছেন এ বিষয়ে এক কথোপকথনে আরএন কাওর মন্তব্য : Moulana Bhasani's Naxalites are getting their training in a different venue. They had not been put in my custody, because he was certain I would not keep any such promise and the young leaders would very soon find out where those trainees were. This would cause a very serious disturbance. কাও বরং এর দায় চাপিয়েছেন তাজউদ্দিন সরকারের উপরই : We have done nothing against the wishes of the provisional government of Bangladesh and they think Bhasani's men are a very valuable resource against the Pakistanis. How can we disregard their advice? Tell your young leaders that even if they do not like it they have to swallow it. In the overall planning we will support them only as a key branch, but not as an entity possessing an independent political leadership. We cannot do anything if they do not walk on the right path. Let them go to the dogs.

এ পর্যায়ে এসে পড়ে ‘মুজিব বাহিনী’র বামপন্থী নির্মূল অভিযান বিষয়ে প্রচারণা। এক্ষেত্রে এটি উল্লেখ না করলেই নয় মুজিব বাহিনীর রাজনৈতিক মোটিভেশনে সমাজতন্ত্র ছিল প্রধান বিষয়, এবং তাদের ৮০ ভাগই ছিলেন বাম ধারায় উৎসর্গকৃত। পরবর্তীতে জাসদ গঠনে এরাই নিয়েছিলেন মূল ভূমিকা। তারপরও এই অভিযোগ উঠেছে, বিশেষ করে ঢাকার অদূরে সাভারে সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টির সেকেন্ড ইন কমান্ডসহ ৫ সদস্যকে হত্যা করে মুজিব বাহিনীর সদস্যরা। বলা হয় শেখ মণির নেতৃত্বাধীন অংশই এই বিষয়ে অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করেছেন। পাশাপাশি এও আমাদের মনে রাখা দরকার দেশের ভেতরে থাকা চীনপন্থী সমাজতান্ত্রিক দলগুলোর কয়েকটি শুরুতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিলেও গণচীনের মনোভাবের প্রেক্ষিতে তারাও অবস্থান পাল্টায় এবং মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামে। সর্বহারা, মতিন-আলাউদ্দিন গ্রুপ, তোয়াহা গ্রুপ সবার সঙ্গেই এই সংঘর্ষ চলতে থাকে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগটি এসেছিল যে তাজউদ্দিনকে হত্যা করতে তারা একজন ঘাতক পাঠায় মুজিবনগরে যে আত্মসমর্পন করে। অভিযোগটি বানোয়াট এবং মুজিব বাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য করা হয়েছিল বলে সাক্ষাতকারে জানিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।

মুজিব বাহিনী তাহলে কি যুদ্ধ করেছে? নাকি আওয়ামী লীগ বিরোধী আর কম্যুনিস্ট নিধনেই নিয়োজিত থেকেছে। প্রসঙ্গতই উল্লেখ করা যেতে পারে আবদুর রাজ্জাকের ভাষ্য : এ অভিযোগ সঠিক নয়। আমরা কমিউনিস্টদের হত্যা করার নির্দেশ দেইনি। আমাদের বৈঠকে এ ধরনের কোন প্রশ্নই ওঠেনি। কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রশ্ন আসলে আমাদের চারজনের বৈঠক হতো। হ্যাঁ, আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল যদি অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের বাহিনী আমাদের আক্রমণ করে তাহলে প্রথমে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবো। এড়াতে না পারলে প্রতিরোধ করবো। কিন্তু কমিউনিস্ট বাহিনীর সঙ্গে কোনো সংঘর্ষ হয়নি। আর কমিউনিস্ট বাহিনী তো ভেতরে ঢুকতেই পারেনি। তখন তো তারা ট্রেনিংই নিচ্ছে। কমিউনিস্ট বাহিনী আসলে যুদ্ধে যেতেই পারেনি। আমাদের বাহিনী ট্রেনিং নিয়ে ভেতরে ঢুকেছে।

এখানে বোঝা যাচ্ছে রাজ্জাক কমিউনিস্ট বাহিনী বলতে বুঝিয়েছেন দেশের বাইরে থেকে ট্রেনিং নিয়ে অনুপ্রবেশ করা বামদলীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কথা। কিন্তু যারা ভেতরে ছিলো তাদের ব্যাপারে তার কোনো মন্তব্য নেই। বরং মুজিব বাহিনী আসলে যে দীর্ঘ মেয়াদী যুদ্ধ পরিকল্পনার ফসল সেটা পরিষ্কার করেছেন একই বক্তব্যে : আমরা তো সর্বাত্মক যুদ্ধ করতে পারিনি। আমাদের পরিকল্পনা ছিলো মুজিব বাহিনী প্রথমে ভেতরে ঢুকবে। তারপর অস্ত্রশালা তৈরি করবে। এরপর আশ্রয়স্থল গড়ে তুলবে। তারপর সংগঠন গড়ে তুলবে। মুজিব বাহিনীর সংগঠন। এরপর থানা কমান্ড করবে। থানা কমান্ড করার পর প্রথম কার্যক্রমটা হবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী অর্থাৎ রাজাকারদের ওপর হামলা চালাবে, তাদের সরবরাহ লাইনের ওপর হামলা চালাবে। গেরিলা কৌশলে ওদের দূর্বল করে দেবে।

সর্বশেষ হলো, ওরা যখন দূর্বল হয়ে পড়বে, তখন পাকবাহিনীর ওপর আঘাত হানো। আমরা তখন এ কাজই করছি। প্রাথমিক কাজ আমাদের মোটামুটি হয়ে গিয়েছিল। আমাদের ট্রেনিংপ্রাপ্ত সদস্যরা যেখানে যেতে পেরেছে, সেখানেই থানা কমান্ড হয়ে গেছে। আমরা জনগনের সাথে মিলে যুদ্ধ করছি। কিছু কিছু রাজাকারও খতম হচ্ছে। কিন্তু মূল জায়গাটা মানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সামনে না পড়লে যুদ্ধ করিনি। দু-চার জায়গায় সামনে পড়ে গেছি, লড়াই হয়েছে। আমরা তো যুদ্ধ শুরুই করিনি। আমাদের তো পাঁচ বছরের পরিকল্পনা। প্রথম বছর কী করবো, তৃতীয় ও চতুর্থ বছরে কী করবো। তারপর সরকার গঠন করবো। এই ছিল আমাদের সামগ্রিক পরিকল্পনা। আমরা যদি সফল হতাম, তাহলে কোন ঘাস থাকতো না। আগাছা থাকতো না। সমাজদেহ থেকে সব আগাছা উপড়ে ফেলতাম। প্রতিবিপ্লবীদের থাকতে হতো না। হয় মটিভেট হয়ে এদিকে আসতে হতো, নইলে নিশ্চিহ্ন হতে হতো।

শেষ লাইন ক’টিই আসলে বলে দেয় সব কথা। মুজিববাদী সমাজতন্ত্র যা গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র হিসাবে তার দ্বিতীয় বিপ্লব তথা বাকশালে উল্লেখ করেছিলেন মুজিব, তা মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বা মাওবাদী ঘরানায় কতখানি গ্রহণযোগ্য ছিলো তা পরের ব্যাপার। কিন্তু এই দলগুলো স্বাধীনতার পরও যুদ্ধ চালিয়ে গেছে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ঠেকানোর নামে। তাদের তখনকার থিসিসগুলো শেষ পর্যন্ত নিজেরাই ভ্রান্ত বলে স্বীকার করেছে এর বর্ষীয়ান নেতারা। তোয়াহার মতো কমরেড জিয়ার জনদলকে সর্মথন দিয়ে এমপিও হয়েছেন। লিন বিয়ানের লেখা যে জনযুদ্ধ পড়ে নকশালবাদীরা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তিনি চিহ্নিত হয়েছেন মাও সেতুংকে হত্যার মাধ্যমে অপসারণের ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে, তাকে এবং সে সময় গণচীনের রাজনৈতিক আদর্শের প্রচারণায় থাকারা (চার কুচক্রী) সবাই প্রতিবিপ্লবী আখ্যা পেয়েছেন। শেষ বিচারে সবই ভুল দর্শনে ভুল যুদ্ধ বলে রায় পেয়েছে, জনগনের সঙ্গে থাকার বদলে জনবিচ্ছিন্ন যুদ্ধ হিসেবে।



এক্ষেত্রে না বললেই নয় যে মুজিব বাহিনীর বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার তার সবকটিই শেখ মণির অংশটির বিরুদ্ধে। অধ্যাপক আহসাবউদ্দীন আহমেদ নামে একজন ‘ইন্দিরা গান্ধীর বিচার চাই’ নামে একটি বই উৎসর্গ ১৬ জন বামপন্থীর উদ্দেশ্যে যার ১৪ জনকে নাকি মুজিব বাহিনী সদস্যরা হত্যা করেছেন। এরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালী থানার নাপোড়া পাহাড়ের ঘুমন্ত অবস্থায় ব্রাশ ফায়ারে হত্যার শিকার হন। একইভাবে সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় কাজী জাফর-মেনন গ্রুপের কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটির নেতা সৈয়দ কামেল বখতের হত্যার দায়ও মুজিব বাহিনীর ওপর চাপিয়েছেন তার বড়ভাই দীদার বখত (এরশাদের প্রতিমন্ত্রী)। নরসিংদীতে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গেও লড়াইয়ে এক পর্যায়ে সমঝোতা করেন সিরাজুল আলম খান ও আবদুর রাজ্জাক। এছাড়া পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে বন্দী ও রাঙ্গামাটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা স্বপন চৌধুরীকে (ছাত্রলীগের সম্মেলনে সমাজতান্ত্রিক স্বাধীন বাংলা প্রস্তাবনার উদ্যোক্তা) গুম করার অভিযোগও ওঠে শেখ মণি গ্রুপের বিরুদ্ধে।

এসব বিষয়ে অভিযোগগুলো বেশীরভাগই এসেছে স্বাধীনতার পর জাসদে যোগ দেওয়া নেতাদের তরফে এবং তখন তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে বড় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন শেখ মণি। স্বাধীনতার পর পর যখন মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণের অনুরোধ করে ভারতীয় বাহিনী ও দেশে ফেরা বাংলাদেশ সরকার, তখন এই মণিই রূখে দাঁড়ান এই বলে যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে না ফেরা পর্যন্ত তার দলের কোনো সদস্য অস্ত্র নামিয়ে রাখবে না। প্রয়োজনে গৃহযুদ্ধ হবে। ডিপি ধরের সঙ্গে তার এমন কথোপকথন এসেছে উবানের বইয়ে। 'Bangladesh is now free. Under the sacrificing Prime Minister Tajuddin, the provisional government has started the work in full swing. The new government of Bangladesh has directed the return of all illegal weapons and the very first of those who were told to do it were the boys of the Mujib Bahini. Sheikh Moni was furious about this.'
He made a definite complaint to me about the dicta adopted by Tajuddin. Among them were his staying in power and preparing a leftist force. He even showed me a group of armed communist youths in the corridors of the Hotel Intercontinental who had black bands tied around their foreheads. 'I was a witness to a hot debate between Sheikh Moni and Shree D. P. Dhar in connection with the surrender of weapons. Moni told Shree Dhar they would not surrender their weapons before Sheikh's arrival in Dhaka and, if necessary, they would wage a civil war' Moni later said to me that his observation hitherto has confirmed that Shree Dhar was a sworn enemy of his country

শেষ কথা : মুজিব নগর সরকারের অলক্ষ্যে গড়ে ওঠা ‘মুজিব বাহিনী’ শেষ বিচারে একটি ফ্রাংকেস্টাইন হিসাবেই আত্মপ্রকাশ করেছে, যার প্রমাণ মিলেছে স্বাধীনতার পর। মুজিব নগর সরকারকে বিরক্ত না করে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত থাকা কিংবা অনুগতদের আদর্শিক লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধকরণ কিংবা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে র’য়ের নীলনক্সার বাস্তবায়ন- যেভাবেই এর মূল্যায়ন করা হোক না কেন আদপে মুক্তিযুদ্ধকালে এর কার্যক্রম খোদ ভারতীয় বাহিনীর কাছে ‘রহস্যঘেরা’। যারা এ নিয়ে মুখ খুলেছেন বা লিখেছেন সেখানেও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে তার রাজনৈতিক আদর্শ, রাজনৈতিক পরিচয়। তারপরও একদম কিছু না জানার চেয়ে কিছুটা জানা, জানার পর খুটিনাটি ব্যবচ্ছেদ ও নিজস্ব অনুসিদ্ধান্ত প্রয়োগের স্বাধীনতা পাঠকমাত্রই রাখেন। আমার পোস্টের উদ্দেশ্যও তাই, সে সুযোগটা আপনাদের দেওয়া।

তথ্যসূত্র :
মাসুদুল হক : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘র’ এবং সিআইএ
সুজন সিং উবান : ফ্যান্টমস অব চিটাগং : দ্য ফিফথ আর্মি ইন বাংলাদেশ
নজরুল ইসলাম : একাত্তরের রণাঙ্গন অকথিত কিছু কথা
ওবায়দুর রহমান মোস্তফা : মুক্তিযুদ্ধে নবম সেক্টর ও আমার যুদ্ধকথা
সিরাজউদ্দীন আহমেদ : প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ
মুক্তিযুদ্ধ কোষ (তৃতীয় খন্ড) এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর দলিলপত্র


ছবি : উবানের সঙ্গে মুজিব বাহিনীর চার নেতা (বা থেকে রাজ্জাক, তোফায়েল, উবান, শেখ মণি ও সিরাজ), তেনদুয়া ক্যাম্পে মুজিব বাহিনীর সদস্যদের শপথ (সবার ডানে ইনু), মুজিব বাহিনীর সনদপত্র, ভারতীয় বাহিনীর দুটো দলিলের কিয়দাংশ।
__________________________
http://www.amarblog.com/omipial/posts/136404


Name:  বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:14 Dec 2012 -- 05:59 PM

1971 Bangladesh atrocities
From Wikipedia, the free encyclopedia
__________________________________________
Coordinates: 23°N 90°E
Beginning with the start of Operation Searchlight on 25 March 1971 and due to the Bangladesh Liberation War, there were numerous human rights abuses in East Pakistan (now Bangladesh) perpetrated by the Pakistan Army, with support from local political and religious militias, especially against Hindus.[1][2] Time reported a high ranking U.S. official as saying "It is the most incredible, calculated thing since the days of the Nazis in Poland."[3]
Contents [hide]
1 Overview
2 Operation Searchlight
3 Casualties
4 Killing of intellectuals
5 Violence against women
6 Violence against minorities
7 Violence against alleged collaborators
8 International reactions
9 War crimes trial attempts
10 See also
11 Further reading
12 References
13 Notes
14 External links
[edit]Overview

Bangladeshi authorities claim that as many as 3 million people were killed, although the Hamoodur Rahman Commission, an official Pakistan Government investigation, put the figure as low as 26,000 civilian casualties.[4] The international media and reference books in English have also published figures which vary greatly from 200,000 to 3,000,000 for Bangladesh as a whole, with 300,000 to 500,000 being a figure quoted by news outlets such as the BBC for the estimated death toll as counted by independent researchers.[5] As a result of the conflict, a further eight to ten million people fled the country at the time to seek refuge in neighboring India.[6]
Many of those killed were the victims of militias who fought with the West Pakistan Army: Razakars, Al-Shams and Al-Badr forces,[7] at the instruction of the Pakistani Army.[8] There are many mass graves in Bangladesh, and more are continually being discovered (such as one in an old well near a mosque in Dhaka, located in the non-Bengali region of the city, which was discovered in August 1999).[9] The first night of war on Bengalis, which is documented in telegrams from the American Consulate in Dhaka to the United States State Department, saw indiscriminate killings of students of Dhaka University and other civilians.[10]
Some women were raped, tortured and killed during the war. The exact numbers are not known and are a subject of debate with some sources quoting figures as high as 400,000. One particular revelation concerns 563 young Bengali women, some only 18, who were held captive inside Dhaka's dingy military cantonment since the first days of the fighting. They were seized from Dhaka University and private homes and forced into military brothels, with some of the women carrying war babies being released.[11]
There was significant sectarian violence not only perpetrated by the West Pakistani army,[1] but also by Bengali nationalists against non-Bengali minorities, especially Biharis.[12]
On 16 December 2002, the George Washington University's National Security Archive published a collection of declassified documents, consisting mostly of communications between US embassy officials and USIS centers in Dhaka and India, and officials in Washington DC.[13] These documents show that US officials working in diplomatic institutions within Bangladesh used the terms selective genocide[14][15] and genocide (see The Blood Telegram) to describe events they had knowledge of at the time. The complete chronology of events as reported to the Nixon administration can be found on the Department of State website.[16]
Every major publication and newspaper in Bangladesh and some international publications on genocide and human rights abuses use the term genocide to describe the event.[17][18][19][20][21]
[edit]Operation Searchlight

Main article: Operation Searchlight
Operation Searchlight was a planned military operation carried out by the Pakistan Army to curb elements of the separatist Bengali nationalist movement in erstwhile East Pakistan in March 1971.[22] Ordered by the government in West Pakistan, this was seen as the sequel to Operation Blitz which had been launched in November 1970.
The original plan envisioned taking control of the major cities on 26 March 1971, and then eliminating all opposition, political or military,[23] within one month. The prolonged Bengali resistance was not anticipated by Pakistani planners.[24] The main phase of Operation Searchlight ended with the fall of the last major town in Bengali hands in mid May.
[edit]Casualties

The number of civilians that died in the Bangladesh War is not accurately known. There is a great disparity in the casualty figures put forth by Pakistan on one hand (25,000, as reported in the Hamoodur Rahman Commission[25]) and India and Bangladesh on the other hand. (From 1972 to 1975 the first post-war prime minister of Bangladesh, Sheikh Mujibur Rahman, claimed on several occasions that at least three million died).[26] The international media and reference books in English have also published figures which vary greatly: varying from 5,000–35,000 in Dhaka, and 200,000–3,000,000 for Bangladesh as a whole.[27] It is believed in certain quarters that the figure of three million has its origins in comments made by Yahya Khan to the journalist Robert Payne on 22 February 1971: "Kill three million of them, and the rest will eat out of our hands."[28][29]
Matthew J. White, in his 2012 book The Great Big Book of Horrible Things, estimates the total Bengali civilian death toll at 1.5 million.[30]
In October 1997 R. J. Rummel published a book, which is available online, titled Statistics of Democide: Genocide and Mass Murder Since 1900. In Chapter 8, Statistics Of Pakistan's Democide - Estimates, Calculations, And Sources, he states:
“ In East Pakistan (now Bangladesh) [General Agha Mohammed Yahya Khan and his top generals] also planned to murder its Bengali intellectual, cultural, and political elite. They also planned to indiscriminately murder hundreds of thousands of its Hindus and drive the rest into India. And they planned to destroy its economic base to insure that it would be subordinate to West Pakistan for at least a generation to come. This despicable and cutthroat plan was outright genocide.[31] ”
Rummel goes on to collate what he considers the most credible estimates published by others into what he calls democide. He writes that "Consolidating both ranges, I give a final estimate of Pakistan's democide to be 300,000 to 3,000,000, or a prudent 1,500,000."
The Office of the Historian of the United States Department of State held a two-day conference in late June 2005 on U.S. policy in South Asia between 1961 and 1972.[32] According to a newspaper report published in both Pakistani and Bangladeshi newspapers, Bangladeshi speakers at the conference stated that the official Bangladeshi figure of civilian deaths was close to 300,000, which was wrongly translated from Bengali into English as three million. Ambassador Shamsher M. Chowdhury acknowledged that Bangladesh alone cannot correct this mistake and suggested that Pakistan and Bangladesh should form a joint commission to investigate the 1971 disaster and prepare a report.[33]
[edit]Killing of intellectuals

Main article: 1971 killing of Bengali intellectuals


Rayerbazar killing field photographed immediately after the war started, showing bodies of intellectuals who demanded a separate, autonomous state from Pakistan (Image courtesy: Rashid Talukdar, 1971)
During the war, the Pakistan Army and its local collaborators carried out a systematic execution of the leading Bengali intellectuals. A number of professors from Dhaka University were killed during the first few days of the war.[2][34] However, the most extreme cases of targeted killing of intellectuals took place during the last few days of the war. Professors, journalists, doctors, artists, engineers, writers were rounded up by Pakistan Army and the Razakar militia in Dhaka, blindfolded, taken to torture cells in Mirpur, Mohammadpur, Nakhalpara, Rajarbagh and other locations in different sections of the city to be executed en masse, most notably at Rayerbazar and Mirpur.[35][36][37][38] Allegedly, the Pakistani Army and its paramilitary arm, the Al-Badr and Al-Shams forces created a list of doctors, teachers, poets, and scholars.[39][40]
During the nine month duration of the war, the Pakistani army, with the assistance of local collaborators systematically executed an estimated 991 teachers, 13 journalists, 49 physicians, 42 lawyers, and 16 writers, artists and engineers.[37] Even after the official ending of the war on 16 December there were reports of firing from the armed Pakistani soldiers or their collaborators. In one such incident, notable film-maker Jahir Raihan was killed on January 30, 1972 in Mirpur allegedly by the armed Beharis. In memory of the persons killed, December 14 is mourned in Bangladesh as Shaheed Buddhijibi Dibosh ("Day of the Martyred Intellectuals").[8][41][42]
Several noted intellectuals who were killed from the time period of 25 March to 16 December 1971 in different parts of the country include Dhaka University professors Dr. Govinda Chandra Dev (Philosophy), Dr. Munier Chowdhury (Bengali Literature), Dr. Mufazzal Haider Chaudhury (Bengali Literature), Dr. Anwar Pasha (Bengali Literature), Dr M Abul Khair (History), Dr. Jyotirmoy Guhathakurta (English Literature), Humayun Kabir (English Literature), Rashidul Hasan (English Literature) and Saidul Hassan (Physics), as well Dr. Hobibur Rahman (Professor of Mathematics at Rajshahi University), Dr. Mohammed Fazle Rabbee (Cardiologist), Dr. Alim Chowdhury (Ophthalmologist), Shahidullah Kaiser (Journalist), Nizamuddin Ahmed (Journalist),[43] Selina Parvin (Journalist), Altaf Mahmud (Lyricist and musician), Dhirendranath Datta (Politician), and Ranadaprasad Saha (Philanthropist).
[edit]Violence against women

Main article: Rape during the Bangladesh Liberation War
Numerous women were tortured, raped and killed during the war.[44] Again, exact numbers are not known and are a subject of debate. Bangladeshi sources cite a figure of 200,000 women raped, giving birth to thousands of war-babies. The Pakistan Army also kept numerous Bengali women as sex-slaves inside the Dhaka Cantonment. Most of the girls were captured from Dhaka University and private homes.[11]
Among other sources, Susan Brownmiller refers to an even higher number of over 400,000. Pakistani sources claim the number is much lower, though having not completely denied rape incidents.[45][46][47] Brownmiller quotes:[48]
Khadiga, thirteen years old, was interviewed by a photojournalist in Dacca. She was walking to school with four other girls when they were kidnapped by a gang of Pakistani soldiers. All five were put in a military brothel in Mohammedpur and held captive for six months until the end of the war.
The licentious attitude of the soldiers, although generally supported by the superiors, alarmed the regional high command of Pakistan army. On April 15, 1971, in a secret memorandum to the divisional commanders, Niazi complained,
“ Since my arrival, I have heard numerous reports of troops indulging in loot and arson, killing people at random and without reasons in areas cleared of the anti state elements; of late there have been reports of rape and even the West Pakistanis are not being spared; on 12 April two East Pakistani women were raped, and an attempt was made on two others.[49] ”
Another work that has included direct experiences from the women raped is Ami Birangona Bolchhi ("I, the heroine, speak") by Nilima Ibrahim. The work includes in its name from the word Birangona (Heroine), given by Sheikh Mujibur Rahman after the war, to the raped and tortured women during the war. This was a conscious effort to alleviate any social stigma the women might face in the society. How successful this effort was is doubtful, though. In October 2005 Sarmila Bose (a Boston, Massachusetts born Harvard-educated Bengali Indian academic), published a paper suggesting that the casualties and rape allegations in the war have been greatly exaggerated for political purposes.[50][51] A number of researchers have shown inaccuracies in the work, including flawed methodology of statistical analysis, misrepresentation of referenced sources, and disproportionate weight to Pakistan army testimonies.[52]
[edit]Violence against minorities

The minorities of Bangladesh, especially the Hindus, were specific targets of the Pakistan army.[1][2] There was widespread killing of Hindu males, and rapes of women. Documented incidents in which Hindus were massacred in large numbers include the Chuknagar massacre, the Jathibhanga massacre, and the Shankharipara massacre.[53] More than 60% of the Bengali refugees who fled to India were Hindus.[54] It is not exactly known what percentage of the people killed by the Pakistan army were Hindus, but it is safe to say it was disproportionately high.[55] This widespread violence against Hindus was motivated by a policy to purge East Pakistan of what was seen as Hindu and Indian influences. The West Pakistani rulers identified the Bengali culture with Hindu and Indian culture, and thought that the eradication of Hindus would remove such influences from the majority Muslims in East Pakistan.[56] Buddhist temples and Buddhist monks were also attacked through the course of the year.[57]
R.J. Rummel has stated that
The genocide and gendercidal atrocities were also perpetrated by lower-ranking officers and ordinary soldiers. These “willing executioners” were fueled by an abiding anti-Bengali racism, especially against the Hindu minority. “Bengalis were often compared with monkeys and chickens. Said General Niazi, ‘It was a low lying land of low lying people.’ The Hindus among the Bengalis were as Jews to the Nazis: scum and vermin that [should] best be exterminated. As to the Moslem Bengalis, they were to live only on the sufferance of the soldiers: any infraction, any suspicion cast on them, any need for reprisal, could mean their death. And the soldiers were free to kill at will. The journalist Dan Coggin quoted one Pakistani captain as telling him, "We can kill anyone for anything. We are accountable to no one." This is the arrogance of Power.
—R.J. Rummel, Death by Government[58]
[edit]Violence against alleged collaborators

In 1947, at the time of partition and the establishment of the state of Pakistan, Bihari Muslims, many of whom were fleeing the violence that took place during partition, migrated from India to the newly independent East Pakistan. These Urdu-speaking people held a disproportionate number in the new country's population. Biharis were adverse to the Bengali language movement and the subsequent nationalist movements as they maintained allegiance toward West Pakistani rulers, causing anti-Bihari sentiments among local nationalist Bengalis. B When the war broke out in 1971, the Biharis sided with the Pakistan army. Some of them joined Razakar and Al-Shams militia groups and participated in the persecution and genocide of their Bengali countrymen including the widespread looting of Bengali properties and abetting in other criminal activities against them.[2] R J Rummel estimated that 150,000 non-Bengals were massacred by Awami League aligned militias, with a low estimate of 50,000 and a high estimate of 500,000.[59][60][61]
There are many reports of massacres of Biharis and alleged collaborators that took place in the period following the surrender of the Pakistan Army on December 16, 1971.[62] In an incident on December 19, 1971, captured on camera and attended by members of foreign press, Abdul Kader Siddiqui and Mukti Bahini guerrilas under his command bayoneted and shot to death a group of war prisoners accused of belonging to the Razakar paramilitary forces.[63][64]
[edit]International reactions

Time reported a high U.S. official as saying "It is the most incredible, calculated thing since the days of the Nazis in Poland." [3] Genocide is the term that is used to describe the event in almost every major publication and newspaper in Bangladesh,[17][65] and is defined as "the deliberate and systematic destruction, in whole or in part, of an ethnic, racial, religious, or national group" [66]
A 1972 report by the International Commission of Jurists (ICJ) noted that both sides in the conflict accused each other of perpetrating genocide. The report observed that it may be difficult to substantiate claims that 'whole of the military action and repressive measures taken by the Pakistan army and their auxiliary forces constituted genocide' intended to destroy the Bengali people in whole or in part by the Pakistan army, and that 'preventing a nation from attaining political autonomy does not constitute genocide: the intention must be to destroy in whole or in part the people as such'. The difficulty of proving intent was considered to be further complicated by the fact that three specific sections of the Bengali people were targeted in killings by the Pakistan army and their collaborators: members of the Awami League, students, and East Pakistan citizens of Hindu religion. The report observed, however, that there are is strong prima facie case that there were particular acts of genocide committed, especially towards the end of the war, where Bengalis were targeted indiscriminately. Similarly, it was felt that there is a strong prima facie face that crimes of genocide were committed against the Hindu population of East Pakistan.[67]
As regards the massacres of non-Bengalis by Bengalis during and after the Liberation War, the ICJ report argued that it is improbable that 'spontaneous and frenzied mob violence against a particular section of the community from whom the mob senses danger and hostility is to be regarded as possessing the necessary element of conscious intent to constitute the crime of genocide', but that, if the dolus specialis were to be proved in particular cases, this would have constituted acts of genocide against non-Bengalis.[68]
Many international publications on genocide and human rights abuses classify the atrocities of 1971 as an act of genocide by West Pakistan.[18][19][20][21][69]
After the minimum 20 countries became parties to the Genocide Convention, it came into force as international law on 12 January 1951. At that time however, only two of the five permanent members of the UN Security Council were parties to the treaty, and it was not until after the last of the last five permanent members ratified the treaty in 1988, and the Cold War came to an end, that the international law on the crime of genocide began to be enforced. As such, the allegation that genocide took place during the Bangladesh Liberation War of 1971 was never investigated by an international tribunal set up under the auspices of the United Nations.
Although both Pakistan and its primary ally USA have denied genocide allegations,[70] the word ‘genocide’ was and is used frequently amongst observers and scholars of the events that transpired during the 1971 war.[31][71] It is also used in some publications outside the subcontinent; for example, The Guinness Book of Records lists the Bengali atrocities as one of the top 5 genocides in the 20th century.[69]
On 16 December 2002, the George Washington University’s National Security Archives published a collection of declassified documents, mostly consisting of communications between US officials working in embassies and USIS centers in Dhaka and in India, and officials in Washington DC.[72] These documents show that US officials working in diplomatic institutions within Bangladesh used the terms ‘selective genocide’[14] and ‘genocide’ (Blood telegram) to describe events they had knowledge of at the time. They also show that President Nixon, advised by Henry Kissinger, decided to downplay this secret internal advice, because he wanted to protect the interests of Pakistan as he was apprehensive of India's friendship with the USSR, and he was seeking a closer relationship with China, who supported Pakistan.[73]
In his book The Trial of Henry Kissinger, Christopher Hitchens elaborates on what he saw as the efforts of Kissinger to subvert the aspirations of independence on the part of the Bengalis. Hitchens not only claims that the term genocide is appropriate to describe the results of the struggle, but also points to the efforts of Henry Kissinger in undermining others who condemned the then ongoing atrocities as being a genocide.
However according to Sarmila Bose, a senior research fellow at Oxford University, many Bangladeshi civilians themselves took part in the atrocities and Pakistani troops did not act alone her book has proved highly controversial within India and Bangladesh as the popular narrative she states within these countries is that Bangladeshi nationalists won independence in 1971 from Pakistan. She also stated that the death toll was highly inflated.[74]
[edit]War crimes trial attempts

Immediately after the war, the topic of putting the war criminals to trial arose. Just as the war ended, Bangladeshi prime minister Tajuddin Ahmed admitted to Professor Anisuzzaman that the trial of the alleged Pakistani military personnel may not be possible because of pressures from the U.S., and that neither India nor the Soviet Union were interested in seeing a trial.[citation needed] As early as December 22, 1971, the Indian Army was conducting investigations of senior Pakistani Army officers connected to the massacre of intellectuals in Dhaka, with the aim of collecting sufficient evidence to have them tried as war criminals. They produced a list of officers who were in positions of command at the time, or were connected to the Inter-Services Screening Committee.[75]
On December 24, 1971 Home minister of Bangladesh A. H. M. Qamaruzzaman said, "war criminals will not survive from the hands of law. Pakistani military personnel who were involved with killing and raping have to face tribunal." In a joint statement after a meeting between Sheikh Mujib and Indira Gandhi, the Indian government assured that it would give all necessary assistance for bringing war criminals into justice. In February 1972, the government of Bangladesh announced plans to put 100 senior Pakistani officers and officials on trial for crimes of genocide. The list included General A. K. Niazi and four other generals.[76] After the war, the Indian Army held 92,000 Pakistani prisoners of war,[77] and 195 of those were suspected of committing war crimes. All 195 of them were released in April 1974 following the tripartite Simla agreement between Bangladesh, Pakistan and India, and repatriated to Pakistan, in return for Pakistan's recognition of Bangladesh.[78] Furthermore, there was no obligation on Pakistan to carry out investigations of allegations against the suspects, or to provide reparation to Bangladesh.
On July 30, 2009, the Minister of Law, Justice and Parliamentary Affairs of Bangladesh stated that no Pakistanis would be tried under the International Crimes (Tribunals) Act 1973.[79] This decision has drawn criticism by international jurists, as it effectively gives immunity to the army commanders of the Pakistan Army who are generally considered to be ultimately responsible for the majority of crimes of 1971.[79]
The Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) Order 1972 was promulgated to bring to trial those Bangladeshis who collaborated with and aided the Pakistan Armed forces during the Liberation War of 1971.[80] There are conflicting accounts of the number of persons brought to trial under the 1972 Collaborators Order, ranging between 10,000 and 40,000.[81] At the time, the trials were considered problematic by local and external observers, as they appear to have been used for carrying out political vendettas. R. MacLennan, a British MP who was an observer at the trials stated that 'In the dock, the defendants are scarcely more pitiable than the succession of confused prosecution witnesses driven (by the 88-year old defence counsel) to admit that they, too, served the Pakistan government but are now ready to swear blind that their real loyalty was to the government of Bangladesh in exile.'[82]
The government of Bangladesh issued a general amnesty on November 30, 1973, applying to all persons except those who were punished or accused of rape, murder, attempt of murder or arson.[81] The Collaborators Order 1972 was revoked in 1975.
The International Crimes (Tribunals) Act 1973 was promulgated to prosecute any persons, irrespective of nationality, accused of committing crimes against peace, crimes against humanity, war crimes, ‘‘violations of any humanitarian rules applicable in armed conflicts laid out in the Geneva Conventions of 1949’’ and ‘‘any other crimes under international law’’.[83] Detainees held under the 1972 Collaborators order who were not released by the general amnesty of 1973 were going to be tried under this Act. However, no trials were actually held, and all activities related to the Act ceased after the assassination of Sheikh Mujibur Rahman in 1975.
There are no known instances of criminal investigations or trials outside of Bangladesh of alleged perpetrators of war crimes during the 1971 war. Initial steps were taken by the Metropolitan Police to investigate individuals resident in the United Kingdom who were alleged to have committed war crimes in a Channel 4 documentary film aired in 1995. To date, no charges have been brought against these individuals.[84]
On December 29, 1991 Ghulam Azam, who was accused of being a collaborator with Pakistan during 1971, became the Chairman or Ameer of the political party Jamaat-e-Islami of Bangladesh, which caused controversy. This prompted the creation of a 'National Committee for Resisting the Killers and Collaborators of 1971', after a proposal of writer and political activist Jahanara Imam. A mock people's court was formed which on March 26, 1992, found Ghulam Azam guilty in a mock trial and sentenced him to death.
A case was filed in the Federal Court of Australia on September 20, 2006 for alleged crimes of genocide, war crimes and crimes against humanity during 1971 by the Pakistani Armed Forces and its collaborators. Raymond Solaiman & Associates acting for the plaintiff Mr. Solaiman, have released a press statement which among other things says:[85]
“ We are glad to announce that a case has been filed in the Federal Magistrate's Court of Australia today under the Genocide Conventions Act 1949 and War Crimes Act. This is the first time in history that someone is attending a court proceeding in relation to the [alleged] crimes of Genocide, war crimes and crimes against humanity during 1971 by the Pakistani Armed Forces and its collaborators. The Proceeding number is SYG 2672 of 2006. On October 25, 2006, a direction hearing will take place in the Federal Magistrates Court of Australia, Sydney registry before Federal Magistrate His Honor Nicholls. ”
On May 21, 2007, at the request of the applicant "Leave is granted to the applicant to discontinue his application filed on September 20, 2006." (FILE NO: (P)SYG2672/2006)[86]
In March 2010, the International Crimes Tribunal (ICT) was formed in Bangladesh to hold trials of Bangladeshi citizens accused of involvement in crimes against humanity, including genocide, rape, murder and arson during the 1971 Liberation war. The ICT, despite its name, is of local nature and has had no involvement from the United Nations. It has been criticised by the Human Rights Watch [87] and prominent Western jurists for bias and deficient legal provisions.[88]
Charge such as planning to commit crime, murder and torture have been framed against eight members, including former leader Ghulam Azam, of Jamaat-e-Islami party. Three of these have been indicted. The members have termed the charges as political.[89]
_______________
http://en.wikipedia.org/wiki/1971_Bangladesh_atrocities


Name:  বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:14 Dec 2012 -- 06:16 PM

বেঁচে থাকুক মুক্তিযুদ্ধ, বেঁচে থাকুক বীরাঙ্গনা ৭১’
লিখেছেন: মুনসুর সজীব
তারিখ: ২৯ অগ্রহায়ন ১৪১৯ (ডিসেম্বর ১৩, ২০১২)
___________________________________________________________
একাত্তর। মজবুত হাড় মাংসের বুনিয়াদ, মাটি-প্রানের চর্বি, আঠালো রক্তের জমাট দলা, আর এক গর্তে সহস্র আত্মার গলিত আকুতি আর একটা স্বপ্নের নাম একাত্তর। একটা বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্নের সমাপ্তির নাম একাত্তর। মুক্তিযুদ্ধ। প্রাপ্তি আর ত্যাগের রক্তাক্ত সমীকরণ।

অতঃপর সবুজ ঘাসের চাদরে লাল সূর্যের দীপাবলি। মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। । বড় শক্ত এ জাতির ভিত্তি। বড় মজবুত এ বেড়ে ওঠা মানব শেকল। শেকলে শেকলে মুক্তির টান। মানুষে মানুষে প্রানের টান। তবু মুক্তি আসেনি। জীবিত আত্মার মুক্তি বিলম্বিত মৃত আত্মার ফুঁপিয়ে ওঠা কান্নার অসহ্য নীরব আর্তনাদে। কেঁদে ওঠে বুক, আর্তনাদ করে ওঠে ভেতরটা। এ জাতির বেড়ে ওঠার সুতায় রক্তের দাগ। কষ্ট-কান্না-রক্ত-অভিশাপের দাগ। কোটি মানবের কানে বাজে মৃত প্রানের ছায়ার নিনাদ।

পাপ মুক্তি চাই। স্বীকার করে নিতে চাই তোমরা ছিলে। মনে আছে তোমরা আছ। বিশ্বাসে নিলাম তোমরা থাকবে । তোমরা আছ আমাদের মাঝে। তোমরা থাকবে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনাচরণের লুকানো দীর্ঘশ্বাসে। তোমরা ৭১। তোমরা বিজয়। তোমরা প্রভাতফেরী। তোমরা স্বাধীনতার ঘোষণার প্রতি শব্দের স্পন্দন। তোমরা বিজয় মিছিলে আমাদের স্লোগানের সুর। তোমরা এই রাজপথ-সমাজ-মুক্তির নির্মাণ-কাব্যের প্রতি স্তবকে মিশে থাকা রক্তের ফোঁটা।

তোমরা মা। তোমরা জন্ম দাও নি। তবু বেয়নটের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত তোমাদের জরায়ুতে এ জাতির প্রথম প্রাণস্পন্দন। তোমরা লালন করনি। তবু তোমাদের কেটে নেয়া স্তন থেকে চুইয়ে পড়া রক্ত এ মাটিকে প্রথম মাতৃ দুগ্ধ পানের অনুভূতি দিয়েছে। তোমরা আঁচল দিয়ে আগলে রাখনি। তবু বদ্ধ ঘরের সিলিঙে ঝুলানো আঁচলে তোমাদের নিষ্প্রাণ দেহ এ জাতির বুকে জেগে-ওঠা রক্তের স্রোত বইয়ে দিয়েছে। তোমরা বীরাঙ্গনা। তোমরা বীর মুক্তিযোদ্ধা। তোমাদের ইজ্জত-সম্ভ্রম আর আত্মত্যাগ এ জাতিকে বিজয় এনে দিয়েছে, মুক্তি এনে দিয়েছে। কথা দিচ্ছি ভুলবো না। কথা দিচ্ছি বাংলাদেশের বেড়ে ওঠা, বেঁচে থাকার ইতিহাসে তোমাদের নাম রক্ত-কালিতে লেখা থাকবে চিরকাল।

বলছি একাত্তরের কথা। বলছি বীরাঙ্গনাদের কথা। বলছি সেই মা-বোনদের কথা যাদের আত্মার কান্না আজও আমাদের মৃত প্রায় বিবেক বিজয় দিবসের প্রথম প্রহরে কিংবা নীরব গভীর রাতে শুনতে পায়। যাদের ছায়া আজো কোন বধ্যভূমির বদ্ধ আধার কুঠুরিতে মুক্তির প্রত্যাশায় আহাজারি করে যায়। যাদের লুণ্ঠিত সতীত্ব, যাদের রক্ত আমাদের স্বাধীনতার দলিলকে সতীত্ব দিয়েছে। যাদের নগ্ন-নিষ্প্রাণ-ধর্ষিত দেহ আজো আমাদের বুকে দায় মুক্তির নির্মম চাপের মতো অনুভূতি দেয়। অন্ধকার কুঠুরিতে তারা ফুঁপিয়ে কেঁদেছে। প্রান ভিক্ষা চেয়েছে। সম্ভ্রম ভিক্ষা চেয়েছে। ভুল করেছে। তারা ওদের মানুষ ভেবেছিল। হায়নার হাসিকে আমাদের মায়েরা মানুষের হাসি ভেবে ভুল করেছিল।

Gen. A. A. Khan Niazi did not deny rapes were being carried out and opined, in a Freudian tone, “You cannot expect a man to live, fight, and die in East Pakistan and go to Jhelum for sex, would you?”

তারা হয়তো কোনদিনও জানতে পারেনি পাঠান পশুটা আর তার বাংলাদেশি আত্মগামী কুকুরগুলো তাদের গনিমতের মাল হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। আর লক্ষ লক্ষ পাকি পশুরা দীর্ঘ নয় মাস ধরে, এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার বর্গমাইল জুড়ে পাশবিক কামনায় রক্তাক্ত করেছে আমাদের চার লক্ষ মা বোনকে। আমাদের মায়েরা আমাদের বোনেরা প্রতিনিয়ত বাধ্য হয়েছে ইজ্জত বিলিয়ে দিতে। হায়নারা কামড়ে কামড়ে ছিলে নিয়েছে আমাদের মা বোনদের শরীরের রক্ত মাংস। লাঠি-বন্দুকের নল-বেয়নট দিয়ে খুছিয়ে ক্ষত বিক্ষত করেছে তাদের বুক,উরু,যোনি। অসহ্য দমবন্ধ এই নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারিয়ে যাওয়া বীরাঙ্গনারা হটাৎ জেগে উঠে আবারো আৎকে উঠেছে। তার চোখের সামনে, মুখের উপর বারেবার গলে পড়ছে পাকি মুখনিঃসৃত কামনার লালা। আবারো ধর্ষণ। গনধর্ষণ। বাঁচার আকুলতা নিয়ে বীরাঙ্গনাদের নির্লিপ্ত আর্তনাদ। দরজার ওপাশে বসে থাকা কিছু মাওদুদী বাদী জারজদের খিলখিল হাসি। পাশবিক কামনার কানাকানি। এ যে গনিমতের ফজিলত। এ যে যুদ্ধদিনের উপহার।

পশ্চিম পাকিস্তানি সরকারের সেনাবাহিনী এবং পা চাটা এ দেশীয় কুকুর গুলো ধর্মের দোহাই দিয়ে, পাকিস্তান রক্ষার(?) তাগিদে এ দেশে গণহত্যা আর গণধর্ষণ শুরু করেছিল। নিরীহ নিরস্র বাঙালি ললনারা ধর্মের দেয়ালের আড়ালে লুকিয়েও বাঁচতে পারে নি। বাঁচাতে পারে নি সম্ভ্রম। গণহত্যা-গণধর্ষণ-পাশবিকতার আবার ধর্ম কি? বাংলার হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কেউ বাঁচতে পারে নি নয় মাসের মধ্যযুগীয় বর্বরতার কাছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চীনের জিয়ান জু প্রদেশের নানজিং শহরে জাপানীদের এবং রাশিয়ায় জার্মান নাযি বাহিনীর ধর্ষণলীলার সাথে একাত্তরের ধর্ষণকে তুলনা করে সুসান মিলার তার রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন-

In her ground-breaking book, Against Our Will: Men, Women and Rape, Susan Brownmiller likened the 1971 events in Bangladesh to the Japanese rapes in Nanjing and German rapes in Russia during World War II. “… 200,000, 300,000 or possibly 400,000 women (three sets of statistics have been variously quoted) were raped. Eighty percent of the raped women were Moslems, reflecting the population of Bangladesh, but Hindu and Christian women were not exempt. … Hit-and-run rape of large numbers of Bengali women was brutally simple in terms of logistics as the Pakistani regulars swept through and occupied the tiny, populous land …” (p. 81).

রক্ষা পায়নি ১৩ বছরের শিশুও। কি নির্মম কতো নিষ্ঠুর ছিল এই জাতির প্রতি পাকি ট্রূপ। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে কিংবা বাড়ি থেকে স্কুলে যাওয়ার পথে বহু মেয়ে শিশু-কিশোরীকে জোর করে ধরে নিয়ে করা হয়েছে পৌনঃপুনিক ধর্ষণ। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হয়েছে এইসব বন্দী শিশুরা।

Khadiga, thirteen years old, was . . . walking to school with four other girls when they were kidnapped by a gang of Pakistani soldiers. All five were put in a military brothel in Mohammedpur and held captive for six months until the end of the war. Khadiga was regularly abused by two men a day; others she said, had to service seven to ten men daily. . . . At first, Khadiga said, the soldiers tied a gag around her mouth to keep her from screaming. As the months wore on and the captives’ spirit was broken, the soldiers devised a simple quid pro quo. They withheld the daily ration of food until the girls had submitted to the full quota.

- Khadiga, Kamala Begum: interview with Berengere d’Aragon3

যুদ্ধ দিনের বিয়ে। একটা প্রহসনের মতো ছিল। মেয়ের ইজ্জত-সম্ভ্রম রক্ষার তাগিদে মেয়েকে কোন এক পুরুষের হাতে তুলে দিতে চাইত মা-বাবারা। এটাও কি কম ত্যাগ? কোন উৎসব থাকতো না সেই সব বিবাহে। থাকতো না নাচ-গান কিংবা ভগ্নিপতি-শ্যালিকার খুনসুটি। শুধুই মলিন নিরবতা। বাতাসের শব্দও তখন সেনা-বুটের গমগম আওয়াজের মতো মনে হতো। তবু কি শেষ রক্ষা হতো? তবু থেমে থাকেনি মৃত্যুর মিছিল। তবু থেমে থাকেনি বৈধব্যের গান। তবু থেমে থাকেনি ইজ্জত হারানোর নীরব আর্তনাদ। অভিশাপ দেই। বারংবার অভিশাপ দেই-

Two [Pakistani soldiers] went into the room that had been built for the bridal couple. The others stayed behind with the family, one of them covering them with his gun. They heard a barked order, and the bridegroom’s voice protesting. Then there was silence until the bride screamed. Then there was silence again, except for some muffled cries that soon subsided. In a few minutes one of the soldiers came out, his uniform in disarray. He grinned to his companions. Another soldier took his place in the extra room. And so on, until all the six had raped the belle of the village. Then all six left, hurriedly. The father found his daughter lying on the string cot unconscious and bleeding. Her husband was crouched on the floor, kneeling over his vomit.

বীরাঙ্গনা ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী। একজন ভাস্কর। একজন জীবন্ত কিংবদন্তী। একজন বীরঙ্গনা একাত্তরে ২৩ বছরের তরুণী। কোমলমতি স্ত্রী। তিন সন্তানের মমতাময়ী মা। তার স্বামী-সন্তানের সামনে দিয়েই তাকে সেনা-ট্রাকে করে তুলে নিয়ে যায় পাক আর্মি। দীর্ঘ সাত মাস ঢাকার একটি সেনা ক্যাম্পে তার উপর চালানো পাশবিক অত্যাচার। তার ভাষায়-

“I was subjected to extreme physical and mental torture. They had no mercy. Many of my friends and relatives were killed in front of me,”

পশুরা ছাড়েনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদেরও। পাক অফিসারদের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী হল গুলো ছিল শিক্ষিতা, রূপবতী, নাচ-গান জানা মধ্যবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্ত মেয়ে পাওয়ার সবচেয়ে সুবিদা জনক স্থান। পাকি মেজর আসলাম ৩ অক্টোবর ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে গিয়ে দায়িত্বরত মহিলা সুপারেন্ডেণ্টকে জানান তেজগাঁও ক্যান্টনমেন্ট এ অনুষ্ঠেয় সেনাবাহিনীর একটা প্রোগ্রামে কিছু নাচ গান জানা মেয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেন। কিন্তু মহিলা সুপারেন্ডেণ্ট জানান যুদ্ধের কারনে বেশিরভাগ মেয়েই হল ত্যাগ করেছে, মাত্র ৪০ জন আবাসিক ছাত্রী আছে হলে। নিজ দায়িত্বের অংশ হিসাবে তিনি তাদের তেজগাঁ পাঠাতে অস্বীকার করেন। মেজর আসলাম চলে যান এবং চারদিন পর ৭ অক্টোবর ১৯৭১ ফিরে আসেন আরও কিছু সেনা অফিসার নিয়ে। অসহায় মহিলা তত্ত্বাবধায়কের সামনে দিয়ে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যান মেয়েদের। খোলামেলা ভাবেই চলতে থাকে তাদের উপর পাশবিক অত্যাচার। ১৬ ডিসেম্বরের পরে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকার বিভিন্ন সেনা ক্যাম্প থেকে রেডক্রস আর মুক্তিবাহিনী উদ্ধার করে শতশত মৃত-অর্ধমৃত, ধর্ষিতা লাঞ্ছিত আর অত্যাচারে মানসিক ভারসম্য হারিয়ে ফেলা ছাত্রীদের –

“ …..Some army officer raided the Rokeya Hall, the girls’ hostel of Dacca University, on October 7, 1971. Accompanied by five soldiers, Major Aslam had first visited the hostel on October 3, and asked the lady superintendent to supply some girls who could sing and dance at a function to be held in Tejgaon Cantonment. The superintendent told him that most of the girls had left the hostel after the disturbances and only 40 students were residing but as a superintendent of a girls’ hostel she should not allow them to go to the cantonment for this purpose. Dissatisfied, Major Aslam went away. Soon after the superintendent informed a higher army officer in the cantonment, over the telephone, of the Major’ s mission.

However, on October 7, at about 8 p.m. Major Aslam and his men raided the hostel. The soldiers broke open the doors, dragged the girls out and stripped them before raping and torturing them in front of the helpless superintendent. The entire thing was done so, openly, without any provocation, that even the Karachi-based newspaper, Dawn, had to publish the story, violating censorship by the military authorities. In seven days after liberation about 300 girls were recovered from different places around Dacca where they had been taken away and kept confined by the Pakistani army men. On December 26, altogether 55 emaciated and half-dead girls on the verge of mental derangement were recovered by the Red Cross with the help of the Mukti Bahini and the allied forces from various hideouts of the Pakistani army in Narayanganj, Dacca Cantonment and other small towns on the periphery of Dacca city.



পাকি সেনাবাহিনী এ দেশের নারীদের শরীরে স্থায়ী করে দিয়ে যায় অসহ্য যন্ত্রণার নির্মম বিষ। নির্লিপ্ত ধর্ষণে হাজার হাজার নারী হয়ে পড়ে অন্তঃসত্ত্বা। পেটে সন্তান। বুকে পাকি নির্যাতনের চাক চাক কস্টের দাগ। সাথে অনিচ্ছা মাতৃত্বের দায়। সন্তান জন্মদান আর বেঁচে থাকার মাঝের যে ভয়ংকর দোটানা। এ শুধু একজন বীরাঙ্গনাই জানেন। এই চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেকে আত্মহত্যা করেন। পাকি বীর্য কেড়ে নেয় দুটি নিষ্পাপ প্রান। রেডক্রস আর অন্যান্য সংস্থার সহায়তায় অনেকে বেছে নেয় এবরশন এর পথ। সেটাও মোট ধর্ষিতার ১০ ভাগেরও কম।

That rape was endemic in 1971 contrary to some contentions that it was isolated. According to him, the numbers were high and many were forced to get abortions. “It is difficult to put a figure in it. About 100 a day in Dhaka and in variable numbers in lot of other towns. And some would go to Calcutta…(for abortions)



এতো গেল যারা প্রতিনিয়ত এবরশন করেছেন তাদের কথা। আর যারা তা করতে পারেন নি তাদের কি হল? তাদেরও সন্তান সময়ের আগেই ভূমিষ্ঠ হয়েছে। না কোন ডাক্তার কিংবা নার্স না বরং পাকি কুকুর গুলো ধারালো অস্র দিয়ে কেটে নিয়েছে তাদের পেট। টেনে হিঁচড়ে বের করে এনেছে পেটের সন্তান। মৃত মা। মৃত সন্তান। সেনা ক্যাম্পের অন্ধকার ঘর গুলো হয়ে উঠলো রক্তাক্ত আঁতুড় ঘর। কাঁচা মাংসের কসাই খানা।

We have collected numerous evidences on the rape, molestation and torture of Bangalee women by the Pakistani army. Rauful Hossain Suja, the son of martyr Akbar Hossain of Pahartali, Chittagong, went to the FOY’S LAKE KILLING ZONE to look for his father’s dead body. They found dead bodies of approximately 10,000 Bangalees, most of them were brutally slaughtered. In their desperate search for their father’s dead boy, they found dead bodies of 84 pregnant women whose abdomens were slashed open. This type of brutality took place almost every where in Bangladesh. Raped women were also locked up naked in various military camps so as to deny them termination of their anguish through suicide.

আর যারা বেঁচে ছিলেন তাদের জীবন ছিল অভিশপ্তের চেয়েও বেশী কিছু। শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দীর্ঘ বন্দী জীবনের নোংরা কামনার কাঁচা দাগ। বুক জুড়ে যুদ্ধশিশু। পিতৃ পরিচয়হীন সন্তান নিয়ে সমাজে আশ্রয় নেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-সমাজ এ সন্তান গ্রহনে অস্বীকৃতি জানায়। নিরুপায় তাদের অনেকে আত্মহত্যা করেন। কেউ কেউ স্বামীর হাতে নিহত হন। কেউ নিজ হাতে হত্যা করেন নিজের পাকি-শঙ্কর সন্তানকে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি দিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে তাও সামগ্রিক ভাবে সফল হয় নি। কারন ৭১ এর নয় মাস কেড়ে নিয়েছে তাদের আবেগ, বেঁচে থাকার আকাঙ্খা। যারা পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্প গুলোতে রক্ষিতার মতো জীবন পার করেছেন তাদের অনেকেই পাকিস্তানি অফিসারদের পায়ে পড়ে ভিক্ষা চেয়েছেন যেন তাদের সঙ্গে করে পাকিস্তান নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্ত পাকিরা ভোগের বস্তুকে সঙ্গিনী করতে রাজি ছিল না।

Dr. Davis talks about how Sheikh Mujibur Rahman labeled the rape survivors as “war heroines” to help them reintegrate into their communities, but the gesture largely did not work. After being assaulted and impregnated by Pakistani soldiers, the Bangladeshi women were completely ostracized by society. Many were killed by their husbands, committed suicide, or murdered their half-Pakistani babies themselves. Some women were so scared to go back home after being held captive in Pakistani rape camps, they begged their Pakistani captors to take them back to Pakistan with them.

সবচেয়ে বড় সমস্যার জন্ম হয় যুদ্ধ শিশুদের লালন নিয়ে। সমাজ-পরিবার তাদের স্বীকৃতি দিতে বরাবরই অস্বীকার করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মা তার সন্তান রাখতে অস্বীকার করেন। এই সব যুদ্ধ শিশুদের লালনের জন্য এগিয়ে আসে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনগুলো এবং মাদার তেরেসার মতো মানুষেরা। তারা শিশুগুলোকে বিভিন্ন হোমে এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, এবং কানাডার বিভিন্ন পরিবারে দত্তক হিসেবে পাঠানোর ব্যবস্থা নেন। যেখানে নিষ্পাপ এই শিশুরা, জন্মই যাদের পাপ ভিন্ন পরিবেশে, ভিন্ন সংস্কৃতিতে, ভিন্ন পরিচয়ে, ভিন্ন ধর্ম পরিচয়ে বেড়ে ওঠার বাধ্য জীবনে পাচার হয়।

Rape was not the only issue but war babies were also a major problem that needed addressing. There were several agencies that became involved in organising these war children’s transfer to Europe where babies in new homes were very welcome. It had coincided with restrictions on availability of babies for adoption there.

কোলকাতায় মাদার তেরেসার হোমে সন্তানকে রেখে আসার আগে যুদ্ধ শিশু কোলে এক কিশোরী মা-



Bangladesh government, at instigation of US social workers, is setting up a legal machinery for international adoption of child victims of occupation and war, including unwanted offspring of women raped by Pakistani soldiers; This step is considered a significant precedent in Bangladesh, where adoption of children by strangers is an unknown concept; International Social Service American Branch General Director W C Klein says the service has suggested adoption as an alternative to prevailing practice of abortion, infanticide and selling of unwanted children to beggars, who use them to elicit sympathy. The New York Times, May 29, 1972 .

Dead Reckoning: Memories of the 1971 Bangladesh War বইয়ে শর্মিলা বোসের পাকি বাহিনীর যুদ্ধাপরাধ আর নারকীয় নির্যাতনকে হালকা করে দেখার নোংরা প্রয়াসকে ধিক্কার জানাই। অধ্যাপক বোস বারবার বুঝাতে চেয়েছেন এ দেশে পাকিরা কোন যুদ্ধাপরাধ করেনি। গণহারে ধর্ষণ নির্যাতন করেনি বরং এটা ছিল একটা গৃহযুদ্ধ। তিনি এটাও বলেছেন একাত্তরের ধর্ষণ গণহত্যা সম্পর্কে তথ্য বাংলাদেশী এবং ভারতীয় ইতিহাসবিদের বাড়িয়ে বলা। তার মতে এটা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার প্রচেষ্টা। তিনি এও বলেছেন একাত্তরের ধর্ষণের বিবরণ লিখতে যেখানে ১০০ সব্দ প্রয়োজন সেখানে ৬৫০০ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি একাত্তরের নির্মম ধর্ষণের ইতিহাস ১০০ শব্দে লেখার পক্ষপাতি! তিনি আমাদের মুক্তিবাহিনীকে বিদ্রোহী বাহিনী (!) বলে আখ্যা দিয়েছেন।

“The issue of rape amounted to about 100 words out of a nearly 6,500 word paper on the subject of patterns of violence in 1971।
“As I pointed out in the discussion that followed, there is evidence elsewhere that rape certainly occurred in 1971. But it seems — from this study and other works — that it may not have occurred in all the instances it is alleged to have occurred.”



শর্মিলা বোসের উদ্দেশে বলতে চাই ওটা কোন গৃহযুদ্ধ ছিল না। ওটা ছিল আমাদের মহান মুক্তি সংগ্রাম। ওরা কোন বিদ্রোহী বাহিনী ছিলনা, ওরা ছিল মহান মুক্তিযোদ্ধা। ওরা ছিল আমাদের বিজয় রথের সারথি। একাত্তরের ধর্ষণ কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। ওটা ছিল পাকি পাপে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া আমাদের মহান বীরাঙ্গনাদের অভিশপ্ত দিনযাপন। এ ইতিহাস ১০০ শব্দে নয় ১০০ কোটি শব্দে লিখেও শেষ করা যাবে না। একাত্তরে ধর্ষণ হয়েছে। প্রতিদিন আমাদের মা বোনেরা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। প্রতি মুহূর্তে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ইতিহাস মিথ্যা বলে না।
___________
http://mukto-mona.com/bangla_blog/?p=31681#comments


Name:  বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:14 Dec 2012 -- 06:22 PM

"বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ডঃ ধর্মের নামে একটি জাতিকে মেধাশূন্য করা এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চার অপমৃত্যু"
- লিখেছেনঃ সন্যাসী

বুদ্ধিজীবি হত্যা সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই। শুধু একটা প্রশ্নই মনে জাগে কতটা পাশবিকতা মানুষকে এরকম একটি সিদ্ধান্ত নিতে প্রণোদিত করতে পারে?! পাশবিকতা শব্দটাও বোধ হয় একদমই যথার্থ নয় কারণ পশু কখনও এরকম আচরণ করে না।

২৫শে মার্চ রাত থেকেই পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী এদেশের শিক্ষক-ছাত্রদের হত্যা শুরু করে। ঐরাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক ও ছাত্রদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এরপর পাক সামরিক বাহিনীর সাথে তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস পুরো মুক্তিযুদ্ধকালীন সারা দেশ জুড়েই এই হত্যাযজ্ঞ চালায়। ডিসেম্বরের প্রথমদিকে যখন পাকিস্তানের পরাজয় কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন তারা এদেশী দোসরদের সাথে বসে আমাদের বুদ্ধিজীবিদের তালিকা করতে শুরু করে। যে মানুষ নামক জানোয়াররা এই কাজে সহায়তা করেছে তারা তখন মুক্তিযুদ্ধের সেই শেষ দিকে এসেও কীভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে এই খুনের জন্য সহযোগীতা করেছে তা আমার মনে কেবলই প্রশ্ন জাগায়। তারা জানত যে বাংলাদেশ স্বাধীন হচ্ছে এবং এই স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবেই তাদের এদেশে বাস করতে হবে। তবুও মুক্তিযুদ্ধের প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে বাংলাদেশী এই জানোয়ারগুলো পাকিস্তানী সেনাবাহিনীদের সহায়তা করে যাচ্ছিল। পাক সেনাবাহিনীকে এদেশী বুদ্ধিজীবিদের নামের তালিকা প্রণয়ন করতে সাহায্য করা এবং ১৪ ডিসেম্বর পাক সেনাবাহিনীর সাথে মিলে বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করার মত কোন্ যুক্তি থাকতে পারে এই জানোয়ারগুলোর মধ্যে?

যুক্তি অবশ্যই ছিল। পূর্ব পাকিস্তানকে যেহেতু তারা আর রাখতেই পারছেনা তাই পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে মেধাশূণ্য করা আর তাদের দোসরদের উদ্দেশ্য ছিল যে চেতনাকে ধারণ করে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সূচণা সেই চেতনার ধারকদের বিনাশ করা। পরবর্তীতে যখন এই দোসরগুলো আবার সংগঠিত হল এবং সাবেক সেনাশাসক জিয়াউর রহমান ধর্মের নামে তাদেরকে রাজনীতিতে প্রবেশ করার সুযোগ করে দিল তখনও তারা মুক্তিযুদ্ধের সেই চেতনাকে বিনাশে উদ্যোগী হল এবং এখনো সক্রিয় আছে।

বুদ্ধিজীবিদের তালিকা দেখলে আমরা দেখতে পাই পাকবাহিনী এবং রাজাকার-আলবদররা সবচেয়ে বেশী হত্যা করেছে শিক্ষকদের। মোট ৯৯০ জন শিক্ষককে তারা হত্যা করেছে। শিক্ষকদের মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে খ্যাত ছিল। উপমহাদেশের সর্বোচ্চ প্রগতিশীল শিক্ষকদের উপস্থিতি ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমাদের মুক্তবুদ্ধি চর্চা তথা প্রগতিশীল সাহিত্যিক, শিল্পী, কবিদের অনেকেরই বিদ্যাপিঠ ছিল এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বাদে আরো যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের মধ্যে দেখা যায় বেছে বেছে প্রগতিশীল সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ডাক্তার, পেশাজীবিদের নাম।

১৯৭১ এ যারা স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থান নিয়েছিল তাদের মধ্যে একটা দল ছিল নিস্ক্রিয়। কেবল চীনপ্রীতির জন্য তারা নিস্ক্রিয় থেকেছে। যদিও তাদের ভিতরে পরবর্তীতে এর পরিবর্তন দেখা যায়। বাকি ভারী দলটা যারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সবধরণের সহায়তা করেছিল তাদের প্রধান পরিচয় তারাই বর্তমানে এদেশের ইসলামের ধারক-বাহক ও প্রচারক। চিরকালই প্রগতিশীলতা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চাকে এরা প্রধান শত্রু বলে মনে করে এসেছে। ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশী বাঙালীদের মধ্যে যে প্রগতিশীল, ধর্মনিরেপক্ষ চেতনার জন্ম দেয় তারই ফসল ১৯৭১; ভাষা আন্দোলনই বাংলাদেশী বাঙালীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয় ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা। যে চেতনাকে ইসলাম তাদের ধর্মের শত্রু বলে বিবেচনা করে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটি অন্যতম প্রধান উপাদান ছিল ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা। সুতরাং দেখা যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে বুদ্ধিজীবি হত্যার মাধ্যমে রাজাকার-আলবদর-আলশামস সহ সকল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পাকিদোসরগুলো চেয়েছিল এদেশ থেকে প্রগতিশীলতা তথা মুক্তবুদ্ধি চর্চার বিনাশ ঘটানো।

ধর্মগুলো সবসময়েই মুক্তবুদ্ধি চর্চাকে গলাটিপে মেরে ফেলতে চাইলেও এ চর্চা থেমে থাকেনি। আমাদের মুক্তবুদ্ধি চর্চার ইতিহাস অনেক পূরাণো। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম মুক্তবুদ্ধির দর্শণ চার্বাক দর্শণ। ঋগবেদের দু’একটি ঋকেও এধরণের কিছু নিদর্শণ পাওয়া যায়। বাঙালীদের প্রথম এ জাতীয় দর্শণের সাথে পরিচয় ঘটে গৌতম বুদ্ধের দর্শণের মাধ্যমে। তাছাড়া বাঙালীর লৌকিক ঐতিহ্যের দিকে দৃষ্টিপাত করলেই দেখতে পাওয়া যায় পাশ্চাত্য তথা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত কিছু সংখ্যক বাঙালীর মধ্যেই যে মুক্তবুদ্ধির চর্চা সীমিত থেকেছে এমন ধারণা মোটেই সত্য নয়। বরং প্রকৃতপক্ষে প্রাক-আধুনিককাল থেকেই বাংলার সাধারণ মানুষও মুক্তবুদ্ধি ও যুক্তিবাদিতার চর্চা করে এসেছে নানা প্রতিকূলতার চাপের মধ্যেও। কখনো কখনো সে স্রোত-ধারা ক্ষীণ বা অবদমিত হয়েছে, কখনো বা উর্ধগামীও হয়েছে; কিন্তু কখনোই সে স্রোত একেবারে শুষ্ক, রুদ্ধ বা স্তব্ধ হয়ে যায়নি।

বস্তুত হিন্দু, বৌদ্ধ, ইসলাম ইত্যাদি প্রথাগত ধর্ম আমাদের সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে রাষ্ট্রযন্ত্রের শাসকদের ধর্মকে কেন্দ্র করেই। কিন্তু সব ধর্মগুলোই বাঙালী লোকসমাজে প্রবেশ করে ক্রমেই তাদের শাস্ত্রীয় বিশুদ্ধতা হারিয়ে লৌকিক ধর্মে পরিণত হয়েছে। বাঙালীর লৌকিক ধর্মগুলো প্রথাগত শাস্ত্রধর্মের রক্ষণশীল তত্ত্ব ও বিধানকে বরাবরই প্রত্যখান করেছে এবং সে প্রত্যাখানে লোকসাধারণের কাণ্ডজ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধিই নির্ধারক ভূমিকা গ্রহণ করেছে।

আমাদের দেশের মুক্তবুদ্ধি চর্চার আরেক নিদর্শণ এদেশের বাউল সমাজ। লালন ফকিরের গান এক্ষেত্রে উজ্জ্বল উদাহরণ।
“সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে/লালন বলে জাতের কি রূপ/দেখলাম না এই নজরে।“
”যদি ছুন্নত দিলে হয় মুসলমান/নারীর তবে কি হয় বিধান?/বামন চিনি পৈতা প্রমাণ/বামনী চিনি কিসে রে?”

জালাল উদ্দীন খাঁর লেখায় দেখতে পাই-
“ধর্ম হতে এই জগতে দলাদলিই কেবল সার/ভুলে পড়ে জালাল ঘোরে মন হইল না পরিষ্কার/এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডময় একের মন্দ অন্যে কয়/করে কত হিংসার উদয় ঘৃণার চক্ষে চায় আবার/কাগজের এই বস্তা ফেলে মহাসত্যের দেশে গেলে/ভেসে যাবে সব সলিলে ধর্ম বলতে নাই কিছু আর”
কিংবা
“মানুষ থুইয়া খোদা ভজ, এ মন্ত্রণা কে দিয়াছে মানুষ ভজ।”

কবি দ্বিজ দাসের লেখায় ফুটে ওঠে স্পষ্ট অবিশ্বাস-
“কেউ বলে আছ তুমি কেউ বলে নাই/আমি বলি থাকলে থাকুক না থাকিলে নাই/যারে নয়নেও দেখি নাই শ্রবণেও শুনি নাই/আছ কি না আছ মেলে না প্রমাণ/পাগল দ্বিজদাসের গান।“

এদেশে এখন বাউল ভাস্কর্য ভাঙা হয়। কেন ভাঙা হয় তার উত্তর খুঁজতে দার্শণিক হতে হয় না। বাউলদের মুক্তবুদ্ধি চর্চাকে ধর্ম তথা ইসলাম ভয় পায়। যেন বাউলদের ভাস্কর্য ভাঙলেই ওঁরা বোবা হয়ে যাবে। ওঁদের সাহিত্য, ওঁদের গান মানুষের মন থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। হুমায়ুন আজাদকে মেরে ফেলতে পারলেই যেন তাঁর সকল সাহিত্যকর্ম বিলুপ্ত হয়ে যাবে। একাত্তরে বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করে যেমন ওরা বাঙালী জাতিকে মেধাহীন করেছিল, তেমনি এখনো এই জানোয়ারগুলোকে এতটুকু সুযোগ দিলে এরা নিশ্চিহ্ন করে দিবে বাঙালি জাতির সকল প্রগতিশীলদের।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যে ত্রিশ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছিল তার বিরাট একটা অংশ ছিল ছাত্র। তখনকার সময়ের প্রায় সকল প্রগতিশীল চিন্তার ছাত্ররাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল এবং তাদের অনেকেই যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেছে। স্বল্পশিক্ষিত একটা জাতিগোষ্ঠির জন্য একসাথে এতগুলো ছাত্রের মৃত্যুই ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি। তার সাথে বেছে বেছে শীর্ষ বুদ্ধিজীবিদের হত্যা জাতি হিসেবে আমাদের কতখানি পিছিয়ে দিয়েছে তার নিদর্শন আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

আজ আমাদের দেশে মুক্তবুদ্ধি চর্চার মানুষের বড়ই সংকট। শুধু সংকট নয়, তাদের জীবনই ঝুঁকিপূর্ণ। একজন মুক্তবুদ্ধি চর্চাকারী যখন খুনের হুমকি পায় তখন থানায় যেতে ভয় পায়। কারণ এখন রাষ্ট্রীয়ভাবেই এ দেশে মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে ঠেকানোর জন্য উঠে পড়ে লেগে থাকে সরকারগুলো। শুধু ক্ষমতার লোভে বি.এন.পির মত রাজনৈতিক দল ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতির বিরোধিতা করে, ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের বিরোধিতা করে, জামাতের মত যুদ্ধাপরাধী দলের সাথে জোট বাঁধে। আওয়ামী লীগের মত রাজনৈতিক দল মাদ্রাসা শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার সমতুল্য ঘোষণা দেয়। বিসমিল্লাহ আর রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের সাথে ধর্মনিরপেক্ষ নামক এক জগাখিচুরী সংবিধানের খসড়া অনুমোদন করে। ভোটের আগে আওয়ামী রাজনীতিবিদের সাথে রাজাকারের কোলাকুলির ছবি দেখতে পাই পত্রিকায়। এটা এখন আর বুঝতে বাকি নেই যে, বর্তমান তরুণ প্রজন্মের দাবীকে উপেক্ষা করতে পারেনি বলেই আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধী বিচারের কাজ হাত নিয়েছে, মোটেই স্বেচ্ছায় নয়।

বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করা না হলে আমরা অর্থনৈতিকভাবে বর্তমানের চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে থাকতাম এরকম আমি নিশ্চিত করে বলছি না। তবে আমাদের দেশের মুক্তবুদ্ধি চর্চার এই বেহাল অবস্থা হতো না এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। প্রগতিশীলতার এমন অপমৃত্যু হতো না। আমরা হতাম না এমন নৈতিকতাহীন জাতি। যে বুদ্ধিজীবিদের সেদিন হত্যা করা হয়েছিল তারা একদিকে যেমন এ দেশকে আরো অনেক কিছু দিতেন, তেমনি এই পাকি শুয়োরদের সহায়তাকারী এদেশী জানোয়ারগুলোর আস্ফালনও এতখানি বৃদ্ধি পেত না। এদেশের মুক্তবুদ্ধি চর্চাকারীদের জীবন এমন বিপন্ন হতো না। বিপন্ন হতো না এ জাতির ভাগ্যাকাশ।

পোস্টটির লিংকঃ http://www.somewhereinblog.net/blog/sannyasi/29287798


Name:  বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:14 Dec 2012 -- 07:42 PM

ডাক্তার ডেভিসের ডায়েরি : দ্য চেঞ্জিঙ ফেস অব জেনোসাইড
লিখেছেনঃ অমি রহমান পিয়াল (তারিখঃ মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৬:৪৯)
_____________________________________________________
আমার কথা: আর্কাইভ খুড়ে এই লেখাটা তুলে আনার পেছনে অনেকগুলো কারণ আছে। প্রথম কথা মুক্তিযুদ্ধের উপর আমার প্রথমদিকের কাজগুলো নতুন নতুন লেখার ভিড়ে আড়ালে চলে গেছে। যখন এসব লেখা তখন ব্লগার বলতে জনাপঞ্চাশেক, পাঠকও। তারপর এই দীর্ঘ ছয়বছরে এসব প্রসঙ্গে আরো লেখালেখি হয়েছে, সেখানে হয়তো সম্পূরক লিংক হিসেবে যোগ করেছি, সেগুলো কেউ ক্লিক করেছেন, কেউবা এড়িয়ে গেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশের একজন মনোবিদের একটা সাক্ষাতকার নিয়ে কাজ করছিলাম, যিনি বীরাঙ্গনাদের চিকিৎসা দিয়েছেন। সেই লেখাটা ব্লগে দেওয়ার আগে সেই সময়কালটা বুঝতেও এই লেখাগুলোর গুরুত্ব আছে। এগুলো মূলত বিশাল একটা সিরিজের অংশ হিসেবে ছিলো, এখানে একত্রিত করে দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয়ত বীরাঙ্গনাদের অনেকে যে যুদ্ধশিশুদের জন্ম দিয়েছেন, তাদের নিয়ে কিছু কল্পকথার প্রসব চোখে পড়েছে। সেই শিশুদের জন্য মায়েদের হাহাকার, তাদের যদি আবার দেখা হয় এনিয়ে মেহেরজান টাইপের সংলাপ। এ প্রসঙ্গে আমার বক্তব্য হচ্ছে এসব অত্যন্ত নির্দয় কল্পনা। একজন সন্তান আসে বাবা-মায়ের ভালোবাসার ফসল হয়ে, তার ভ্রূণ অবস্থা থেকে ভুমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত মমতার স্পর্শ দেয় মা নিউরনে নিউরনে। কিন্তু যুদ্ধশিশু? এদের জন্ম দেওয়া মায়েরা কি সেই ভালোবাসা ধারণ করেছেন? আধো নেংটা হয়ে ট্রেঞ্চে পড়ে থাকা এই মায়েরা কি দিন গুনেছেন সন্তান জন্মের নাকি নরক থেকে উদ্ধারের? তাদের তো মাথার চুলটাও কেটে ফেলা হতো যাতে ঝুলে আত্মহত্যা করতে না পারে। এইরকম একটা শিশু ধরা যাক বড় হয়ে তার মায়ের সামনে এলো বললো মা আমি খুজে বের করেছি তোমাকে। তারপর সেই মায়ের স্মৃতিতে কোন ছবিটা আসবে? নিষ্ঠুর লালসায় তার শরীরটা খুবলে খাওয়া কিছু হায়েনার নয় কি! সেই মা কি বলবে বুকে আয় বাবা, কত খুজেছি তোকে, কত ভেবেছি তোকে? যদিও জানি না আমাকে দিনের পর দিন নির্মম লালসায় ধর্ষণ করা ৪০-৫০ জন হারামজাদার ঠিক কোনজন তোর বাবা।


ডক্টর জিওফ্রে ডেভিস এই বীরাঙ্গনাদের নিয়েই কাজ করেছেন। স্বাধীনতার পরপর এই দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ সমস্যা ছিলো এটি। সামাজিক তো বটেই। মূল লেখাটি ডেভিসের রোজনামচা, এই দেশে তিনি যে কাজ করেছেন তার পেশাদার লগবইটি অনুবাদ করেছি আমি, তাতে ফুটে উঠেছে সেইসময়কার বাস্তবতা। ডেভিসের সাক্ষাতকার নিয়েছিলেন ডক্টর বীনা ডি কস্টা, সম্পূরক তথ্য হিসেবে যোগ করেছি সেটাও। এর বাইরে কিছু ভিডিও ফুটেজ। ২০০৮ সালের ৩ অক্টোবর ডক্টর ডেভিস মারা গেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধের একজন সুহৃদ হিসেবে তাকে সম্মাননা দিয়েছেন। ডেভিসের ইচ্ছে ছিলো যুদ্ধাপরাধের বিচারে বাংলাদেশকে ন্যায় বিচার পাইয়ে দিতে সাহায্য করা। যেটা সম্ভবত পেশাদারী সাক্ষ্যের মাধ্যমে। সে ইচ্ছেটে অপূর্ণই থেকে গেছে তার। শিরোনামের ছবিটার জন্য কৃতজ্ঞতা অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী মাহবুব সুমনকে, ডক্টর ডেভিসের মেয়ের কাছ থেকে এই ছবিটা নিয়ে আমাকে মেইল করেছিলেন। ১৯৭২ সালে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে অবকাশের সময় একজন বাঙালী মাঠকর্মকর্তার সঙ্গে ছবিটি তুলেছিলেন ডেভিস। যার কর্তিত অংশ বিভিন্ন জায়গায় চোখে পড়ে আমাদের।








দ্য চেঞ্জিং ফেস অব জেনোসাইড : ড. জিওফ্রে ডেভিসের রোজনামচা

[এটি ডাঃ জিওফ্রে ডেভিসের নিজের লেখা। ১৯৭২ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে ধর্ষিতা নারীদের গর্ভপাতে সাহায্য করতেই এ দেশে এসেছিলেন এই অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসক। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর নাগাদ মাস ছয়েকের অভিজ্ঞতাই তুলে ধরেছেন। এতে আনুষঙ্গিক উপাত্ত হিসেবে এসেছে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কিছু কাভারেজের অংশ বিশেষও। এবং তার অনেকখানিই আমাদের প্রতিষ্ঠিত বা এখন পর্যন্ত জানা জ্ঞানের সঙ্গে যায় না। আমি মূলত জোর দিয়েছি ডেভিসের সে সময়কার অভিজ্ঞতার ওপর, প্রসঙ্গক্রমেই এসেছে টিওপি (টার্মিনেশন অব প্রেগনেন্সি) করতে গিয়ে কী ধরণের অদ্ভুতুরে সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে তাকে ও তার দলকে। মোকাবেলা করতে হয়েছে অদ্ভুত সব পরিস্থিতি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিশেষ করে গাইনীর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য অবশ্যপাঠ্য মনে হয়েছে ডেভিসের অভিজ্ঞতা]

মূল লেখা: ddavis
দমনপীড়নে বাংলাদেশের অধিকারবোধ টিকিয়ে রাখতে বিশাল এক পরিকল্পনা ছিল পাকিস্তানের। ইসলামাবাদের তরফে পাকিস্তানী সেনাদের ওপর ছিল তাই এক বিশেষ নির্দেশনা। বিবাহিত কিংবা কুমারী, যতবেশি সম্ভব বাঙ্গালী মেয়েকে গর্ভবতী করা! বিশেষ এই নির্দেশের একটা বিশেষত্ব ছিল যে বাঙ্গালীদের চিরকালীন অহমের জাতীয়তাবোধে একটা আঘাত হানা। শংকর এক জাত সৃষ্টির মাধ্যমে সেটাকে টলিয়ে দেওয়া। আবার একটি ধর্মীয় নির্দেশনাও, কোনো মুসলমান আর যার সঙ্গেই লড়ুক, তার বাবার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে না।








বিজয়ের পর স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার অসহায়ভাবে আবিষ্কার করল এত দুর্যোগের ভিড়ে নতুন আপদ । বিশাল সংখ্যক কুমারী গর্ভবতী, যাদের বেশিরভাগই কুড়ি পেরোয়নি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাহায্য চাওয়া হলো। একই সঙ্গে তাড়াহুড়ো করে দেশব্যাপী একটি গর্ভপাত কর্মসূচী নেওয়া হলো। তখনই আবিস্কৃত হলো দেশটির আইনীব্যবস্থা মান্ধাতা আমলের। জনসংখ্যা নিয়ে হিমশিম খাওয়া দেশগুলোর একটি এই বাংলাদেশের পেনালকোডে এখনো ৩১২ ও ৩১৩ ধারা বলবৎ। ১৮৬১ সালে প্রবর্তিত ব্রিটিশ আইনের ৫৮ ও ৫৯ ধারাই এগুলো।

তারপরও হালকা বিমানে করে দেশব্যাপী প্রচারপত্র ফেলা হলো গর্ভপাতের নিয়মকানুন জানিয়ে। এটা বেশ কার্যকর প্রচারণা হয়েছিল, যার ফলে সামাজিক সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠা গিয়েছিল অনেকখানি। অবশ্য এছাড়াও প্রথাগত সব মাধ্যমও ব্যবহার করা হয়েছে।

'৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লিগ ৯৮% ভোট নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ বিজয়ী হয়। সেটা মেনে নিতে পারেনি পশ্চিমা সেনা বাহিনী এবং জুলফিকার আলী ভুট্টোর মতো কিছু নেতা। ক্ষমতার এই টানাপোড়েনে ক্রমশই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিল বাংলাদেশ। '৭১ সালের মার্চে ইয়াহিয়া খানকে তার রাজনৈতিক ও সামরিক গোয়েন্দারা বোঝালো যে ছোটমাপের একটা সামরিক হামলা দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতাকামীদের নিস্তব্ধ ও নিমর্ূল করে দেওয়া সম্ভব। ২৫ মার্চ রাতে ঠিক তাই করল পাকিস্তানী সেনারা, এবং হতভম্ব হয়ে আবিষ্কার করল তুমুল প্রতিরোধের শিকার তারা! সশস্ত্র এই প্রতিরোধ অচিরেই ছড়িয়ে গেল সারা দেশে। তাড়াহুড়ো করে গড়ে তোলা মুক্তিফৌজ (পরে মুক্তিবাহিনী) ঢাকার দক্ষিণে কুমিল্লায় পাকবাহিনীকে আক্রমণ করে বসল। ১৩ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গায় স্বাধীন পুর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠিত হলো। সেখান থেকেই ব্যাপ্তি নিল পুরো মাত্রার গৃহযুদ্ধ। বাংলাদেশ বারবার বিদেশী সাহায্য চাইল। একমাত্র রাশিয়া সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল।

মে মাসে রাজনৈতিক মিত্রতা এক অদ্ভুত রূপ নিল। মুক্তিফৌজ ভারতীয় ও বার্মিজ মাওবাদী গেরিলাদের সঙ্গে কাধে কাধ মিলিয়ে লড়তে শুরু করল। এরাই যুদ্ধশেষে নকশাল ও মেসো সন্ত্রাসবাদী গ্রুপ গড়ে তুলল আর তখন মুক্তিবাহিনীই তাদের দমনে নামল। রাশিয়া বাংলাদেশকে সমর্থন দিচ্ছিল। আমেরিকা ছিল দ্বিধাগ্রস্থ। আগের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তারা পশ্চিম পাকিস্তানকে সাহায্য করছিল এবং নিশ্চিত ছিল তারাই জিতবে। কিসিঞ্জার ইসলামাবাদকে ব্যবহার করছিলেন পিকিংয়ের সঙ্গে সমঝোতার একটা ক্ষেত্র হিসেবে। পিকিং যখন পাকিস্তানের পক্ষ নিল, ভারত সর্বাত্মক সহযোগিতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাংলাদেশের পক্ষে। ঘটনাটা ঘটল মে মাসে, তবে রুশদের বাদ দিলে পুরো ব্যাপারটাই রইল আনঅফিশিয়াল- প্রকাশ্য নয়। ১৯৭১ ও '৭২ সালে ভারত ও বাংলাদেশের হোটেলগুলোর রেজিস্টার পরীক্ষা করে বিপুল সংখ্যক রাশিয়ান উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এপ্রিলে এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে ‘স্রেফ সামরিক অভিযানই পশ্চিম পাকিস্তানের একমাত্র এজেন্ডা নয়। শহরের পর শহর পাকিস্তানী সেনারা পরিকল্পিতভাবে ধংস করতে শুরু করল পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক খাতগুলো যাতে স্বাধীনতা আন্দোলনকে বিনাশ করা যায়। ইসলামাবাদ হাইকমান্ডের (আসলে রাওয়ালপিন্ডি) নির্দেশে সৈন্যরা নিয়মমেনে গুলি করে মারতে লাগল ছাত্র, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, বুদ্ধিজীবি এবং সম্ভাব্য নেতৃত্বের সম্ভাবনাময় যে কাউকে। সেটা তারা স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হোক বা না হোক (নিউজউইক, ২৬ এপ্রিল '৭১)। 'তারা নিশ্চিত হতে চাইছিল যাতে তাদের বিরুদ্ধে আর কেউ মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে' (একজন মুক্তিযোদ্ধার উক্তি যিনি সিলেট ও কুমিল্লায় যুদ্ধ করেছেন)।

এরপর নাটকীয় মোড় নিল পরিস্থিতি। ২৪ মে '৭১ টাইমসে লেখা হলো : 'পরিকল্পিতভাবেই সব হচ্ছে। ক্রায়ার (লুই ক্রায়ার তখনকার বিখ্যাত সাংবাদিকদের একজন) জানাচ্ছেন হত্যাকান্ড একটা নির্দিষ্ট রূপরেখা মেনে এগোচ্ছে। সরকারী বাহিনী বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত কোনো শহর দখলের জন্য কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে উস্কানী দিয়ে। বাঙ্গালীরা প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে স্বাধীনতাবিরোধীদের হত্যা করছে আর তারপর তারা সব অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।'

উদ্ধৃতিটা এ কারণেই চমকপ্রদ, যে এখানেই প্রথম আমরা বাঙ্গালীদের হাতে বাঙ্গালীদের নিহত হওয়ার খবর পাই। পরে ব্যাপারটা বিস্তারিত ব্যাখ্যা পেয়েছি ব্যারিস্টার শামসুল হকের কাছ থেকে। উনি ত্রিশ বছরের ওপর মুসলিম লীগ করেছেন এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন তারও বেশিকাল ধরে। তার মতে পাকবাহিনী যে কোনো শহর দখল করতে গিয়ে হিন্দুদের ওপরই আক্রমন করত। অন্যদিকে মুক্তিবাহিনী মারত শহরের অভিজাতদের কারণ তাদের ভাষায় তারা ছিল 'দালাল'। এই দালালের সংজ্ঞাটা ছিল এরকম, 'যারাই পাকিস্তান সরকারের পক্ষে কাজ করছে তারা দালাল, সেটা যুদ্ধের আগে বা যুদ্ধকালীনই হোক। এদের দেখলেই গুলি করে মেরে ফেলতে হবে।'








যুদ্ধের পরপরই এই দালালরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। যারা বিদেশে পালাতে পারেনি এবং ধরা পড়েছে, তাদের ঢোকানো হয়েছে কারাগারে। আমি তাদের অনেককে কারাগারে পেয়েছি। নোয়াখালি জেলের কথাই বলি। সেখানের ধারণক্ষমতা ২৫০ জনের। '৭২ সালের ১ মে কয়েদীদের সংখ্যা ছিল ১,২৫০ জন (আমি ছিলাম ওখানে, তাদের গুনেছি, কথা বলেছি)। কেউ কেউ ঘুষ দিয়ে বেরিয়ে গেছে, কিন্তু ১২৫০ ছিল একটা ধ্রুব সংখ্যা। তাদের অবস্থা বেশ শোচনীয়।
তথ্যটা এ কারণেও যে প্রাসঙ্গিক, যুদ্ধ পরবর্তী এই যে অবস্থা সেজন্যও তাদের দায় অনেকখানি । এই যে ব্যাপক আকারে গর্ভপাত কর্মসূচী, তার পেছনের কারণ হিসেবে এসব দালালদের ভূমিকাটাই ছিল আসল। সানডে টাইমস (২০ জুন ’৭১) লিখেছে রাজাকাররা তাদের কর্মকাণ্ড এখন হত্যা ও চাঁদাবাজিতেই আটকে রাখেনি, এখন তারা বেশ্যালয়ও খুলেছে। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে তারা একটি শিবির খুলেছে যেখানে অল্পবয়সী সুন্দরী মেয়েদের আটকে রাখা হয়েছে, রাতে পাকবাহিনীর অফিসারদের সরবরাহ করা হয় তাদের। এছাড়াও প্রতিদিনই অনেক মেয়ে অপহরণ করছে তারা নিজেদের জন্যও, এদের অনেকেই আর ফিরে আসেনি...’।

২১ জুন ’৭১ টাইম পত্রিকায় পেত্রাপোলের উদ্বাস্তু শিবিরের এক ষোড়শীর জবানীতে লেখা হয়েছে, ‘ওরা আমার বাবা-মাকে মেরে ফেলেছে, দুজনকেই বন্দুকের বাট দিয়ে পেটাতে পেটাতে মেরেছে। এরপর মেঝেতে আমাকে চিৎ করে শুইয়ে তিনজন মিলে ধর্ষণ করেছে।’ একই প্রতিবেদনের ভাষ্য, ‘ভিটেমাটি ছেড়ে প্রাণভয়ে পালাতে থাকা পরিবারগুলোর মেয়েদেরও হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং এরপর বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে পাকবাহিনীর কাছে। অবশ্য পরিবারগুলো মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ছুটিয়ে নিয়েছে অনেককে। যারা পারেনি, তাদের ঠাই হয়েছে রাজাকারদের খোলা বেশ্যালয়ে।’

২ আগস্ট ১৯৭১ নিউজউইকের প্রতিবেদন, ‘আগুনে পোড়া গ্রামকে পেছনে ফেলে দুই কিশোরী মেয়ে নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পালাচ্ছিলেন চন্দ্র মন্ডল। কাদামাটির ভেতর দিয়ে। একটু পর সৈন্যদের হাতে ধরা পড়লেন। অসহায় চোখে তাকে দেখতে হলো তার মেয়েদের ধর্ষনের দৃশ্য। বারবার, বারবার, বারবার।’

১১ অক্টোবর ’৭১ নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, ‘১১ এপ্রিল সৈন্যরা আমাদের গ্রামে এল। একদল এসে আমাকে বাড়ির বাইরে নিয়ে গেল কী যেন দেখাতে। ফিরে এসে দেখি আমার বোন নেই। আমার প্রতিবেশীর মেয়ে এবং এক হিন্দুর মেয়েও একইরকম নিখোজ। মে মাসের মাঝামাঝি আমার বোন আর প্রতিবেশিকে ওরা ছেড়ে দিল। কিন্তু হিন্দু মেয়েটার খোঁজ পাওয়া গেল না। ফিরে আসা দুজনই গর্ভবতী, বাচ্চা হবে। ওদের দিয়ে কাপড় ধোঁয়ানো হতো এরপর প্রতিদিন দু-তিনবার করে সৈন্যদের সঙ্গে শুতে হতো।’

১৫ নভেম্বর ’৭১ নিউজউইক লিখেছে, ‘সম্প্রতি পাকবাহিনী ডেমোরা গ্রাম চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে (এখানে মুক্তিবাহিনী কখনোই আসেনি), ১২ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সব নারীকে ধর্ষন করে এবং ১২ বছরের ওপর সব পুরুষকেই গুলি করে মারে।’

’৭২ সালের জানুয়ারির শেষ নাগাদ হঠাৎ করেই বাংলাদেশ উপলব্ধি করল বড় এক দুর্যোগ অপেক্ষায়। যুদ্ধ শেষ হলেও বিশাল এক বোঝা তাদের ঘাড়ে চাপল বলে- অনাকাঙিখত মাতৃত্বের বোঝা। প্রচুর ধর্ষিতা রমনীই তখন মা হতে চলেছেন, কারো বা শেষ সময় আসন্ন। ধারণা করা হয় পুরো ব্যাপারটাই ছিল পাকবাহিনীর এক পরিকল্পিত নীলনক্সা। এমন কোনো প্রমাণ নেই যে ইসলামাবাদের রাজনৈতিক বা সামরিক হাইকমান্ড সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছে, কিন্তু বেশ কজন পাঞ্জাবী অফিসারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে ব্যাপারটা আনঅফিশিয়ালি হলেও পরিকল্পিত (উদাহরণ, জুন মাসে ঢাকা এয়ারপোর্টে ফন শুলজকে দেওয়া এক পাক মেজরের সাক্ষাৎকার)।








সমস্যাটার চরম মাত্রার ব্যাপ্তি সম্পর্কে প্রথম ধারণা পাওয়া গেল কলকাতা থেকে আসা খবরে। প্রচুর মেয়ে সেখানে গিয়েছেন গর্ভপাত ঘটাতে। সেখানকার এক ডাক্তার ঢাকা এলেন এবং এর ফলে স্থানীয়ভাবে তদন্ত করে জানা গেলো আসলেই সংখ্যাটা বিশাল। তাড়াহুড়োয় তখন একটি সংগঠন দাঁড় করানো হলো- দ্য ন্যাশনাল বোর্ড অব বাংলাদেশ উইম্যানস রিহ্যাবিলেশন প্রোগ্রাম। প্রচুর অর্থ সংস্থান করা হলো এবং তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলো যে কোনো মূল্যে সমস্যাটা মেটাতে। সমস্যা শুধু অবাঞ্ছিত গর্ভবতীরাই নন। আরো ছিলেন বিধবা নারী যাদের অনেক সন্তান, সৈন্যদের হাতে আহত নারী (এমন নয় তারা ধর্ষিতা বা গর্ভবতী), ধর্ষিতা কিন্তু গর্ভবতী নন এবং পরিবার তাড়িয়ে দিয়েছে এমন মেয়েরা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের বোঝা যারা খালাস করতে চাইছিল। ফেব্র“য়ারির মাঝামাঝি বিদেশী উপদেষ্টাদের সহায়তায় ঢাকায় একটি ক্লিনিক খোলা হলো। ফেব্রুয়ারির শেষনাগাদ শুরু হলো টিওপি (টার্মিনেশন অব প্রেগনেন্সি)। গর্ভপাত।

ঠিক কতজন নারী ধর্ষিতা হয়েছেন তার সংখ্যা বের করার অনেক চেষ্টাই নেওয়া হয়েছে। সরকারী হিসেবটা ছিল দুই লাখ। অংকটা এরকম : হানাদার দখলদারিত্বের সময়কালে প্রতিটি থানায় প্রতিদিন গড়ে দু’জন করে মেয়ে নিখোঁজ হয়েছেন। থানার সংখ্যা ৪৮০টি এবং দখলদারিত্ব স্থায়ী হয়েছে ২৭০ দিন। ৪৮০ কে ২৭০ ও ২ দিয়ে গুণ করে পাওয়া গেছে ২ লাখ ৬৮ হাজার ২০০ জন। অন্যান্য কারণে মেয়েরা নিখোঁজ হয়েছেন ধরে নিয়ে সংশ্লিষ্ট বোর্ড সংখ্যাটাকে রাউন্ড ফিগারে এনেছেন দুই লাখে! এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের এইটাই অফিশিয়াল ধর্ষিতার সংখ্যা। এটা অবশ্যই অনেক কমিয়ে বলা। কারণ :

১. তারা আমলে নিয়েছেন শুধু নিখোঁজ রিপোর্ট পাওয়া মেয়েদের। অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারগুলো চেপে গিয়েছেন তাদের মেয়েদের অবস্থান ও অবস্থা। অনেকটা লোক-লজ্জায়, সম্মানহানী ও প্রাণহানির ভয়ে। এবং অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যাদের কাছে অভিযোগ করবেন তাদের কাছেই মেয়ে, অর্থাৎ রক্ষকই ভক্ষক।
সাধারণভাবে দেখতে গেলে এই বিশাল অংশটা যুদ্ধকালীন সময়টায় আটকবস্থাতেই ছিল যদ্দিন না পাকসেনাদের কাছে তারা বোঝা হয়ে পড়েছে। বোঝা বলতে শারীরিক ব্যবহারের অযোগ্য (গর্ভবতী, যৌনরোগগ্রস্থ, কিংবা দুটোই)। এরপর মেয়ে যদি মুসলমান হয় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, হিন্দু হলে মেরে ফেলা হয়েছে। অনেক মুসলমান মেয়েকেও হত্যা করা হয়েছে, অনেকে আত্মহত্যা করেছেন। এবং হত্যাকাণ্ডের শিকার ও আত্মহত্যাকারীদের সঠিক সংখ্যাটা আন্দাজে বলাটা কঠিন। যুদ্ধ শেষে আত্মহত্যার যে সরকারী হিসেব পাওয়া গেছে তাতে সংখ্যাটা ২০০ (জানুয়ারি থেকে এপ্রিল ’৭২)। এ সংখ্যাটা সত্যি হতে পারে কারণ হত্যা তদন্ত এড়াতেই পরিবারগুলো আত্মহত্যার ঘটনা থানায় জানাতে বাধ্য ছিল।

২. সংখ্যাটায় পাকসেনাদের অস্থায়ী অবস্থানকে গোনায় নেওয়া হয়নি। মানে তারা একটা গ্রাম বা অঞ্চলে হামলা করল এবং গণহারে ধর্ষণ চালাল। পুরোপুরি ধংস হয়নি কিন্তু আক্রমণের শিকার এরকম গ্রামের সংখ্যা বাংলাদেশের তিনভাগের এক ভাগ। সুবাদেই ধর্ষণের সংখ্যাও ছিল অগণিত, যদিও সবক্ষেত্রেই গর্ভধারণ অনিবার্য ছিল না।

৩. রাজাকার ও পাকিস্তানের দালালরা উদ্বাস্তুদের ওপর হামলা চালিয়ে প্রচুর মেয়ে অপহরণ করেছিল (এ ব্যাপারে আগেও বলা হয়েছে)। অনুমান করা হয় ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল এক কোটি বাঙ্গালী, আর তাদের মধ্যে ১৫ লাখ ছিলেন নারী (চারটি শিশুর পরিবারকে গড় ধরে সংখ্যাটা বের করা হয়েছে)।

বাংলাদেশে আদমশুমারীর হাল বরাবরই করুণ, অনুমান নির্ভর। ১৯৭১ সালে বলা হয় সংখ্যাটা ছিল সাড়ে সাত কোটি (এটা নয় কোটি হওয়াও খুবই সম্ভব)। এর থেকে এক কোটি লোক বাদ দিন, যারা পাশের দেশ ভারতে আশ্রয় নিয়েছে কিংবা শহর বা নগর বা ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য কোথাও আশ্রয়ের খোজে গেছে। বাকি থাকে সাড়ে ৬ কোটি। এদের মধ্যে ধরি দশ লাখ তরুণী-যুবতী, যারা সন্তান জন্মদানে সক্ষম। এদের এক তৃতীয়াংশ যদি ধর্ষিতা হন তাতেও সংখ্যাটা দাঁড়ায় ৩ লাখ। ৩% বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই দেশে নিশ্চিতভাবেই ধরে নেওয়া যায় এদের অর্ধেক গর্ভধারণ করেছেন। ধর্ষনের কারণের এদের একজনও যদি গর্ভধারণ না করে (যেটা অবাস্তব), তারপরও দেড় লাখ নারী রয়ে যান যারা গর্ভবতী।

এদের সঙ্গে (১) নং বর্ণনার মেয়েদের ২ লাখ যোগ করুন (এখানে নিশ্চিত থাকতে পারেন তাদের সবাই গর্ভবতী এবং তাদের ঘরছাড়া হওয়ার পেছনে এটাই ছিল প্রধান কারণ)। একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, মেয়েদের সংখ্যা প্রতিদিন বদলাতো এবং গর্ভবতীরাই ছিল আশ্রয়হীনা। ধরে নিতে হবে দু লাখ একটা রক্ষণশীল সংখ্যা। গর্ভবতীদের ১০ ভাগ দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই সন্তান জন্ম দিয়েছেন। এভাবে ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ অবাঞ্ছিত গর্ভবতীদের সংখ্যা ছিল সাড়ে তিন লাখ। ঘটনার পরবর্তী প্রবাহের আলোকে ব্যাপারটা চমকপ্রদ।

যেসব জেলা আমি ঘুরেছি, এদের বেশিরভাগেই দেখা গেছে অবাঞ্ছিত গর্ভবতীদের সংখ্যা অনুমানের চেয়ে কম। হিসেবের মধ্যে নিতে পারেন ইতিমধ্যে প্রসব করা এবং আত্মহত্যাকারীদের। সংখ্যাটা ছিল গ্রাম পিছু ১০ জন করে! যেসব জায়গায় সামরিক কর্মকাণ্ড ব্যাপক এবং দীর্ঘস্থায়ী ছিল (গোটা দেশের অর্ধেক জনপদ), সেখানে যখনই কোনো গ্রামবাসীর সঙ্গে কারো মাধ্যমে যোগাযোগ করেছি অবিশ্বাস্য এক ছবি পেয়েছি।

ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ থানা পিছু ছিল দেড়হাজার করে এবং জানুয়ারির শেষ নাগাদই গ্রামের দাই, হাতুরে ও হোমিওপ্যাথরা মিলে এদের বেশিরভাগেরই ব্যবস্থা করে ফেলে। রয়ে যায় অল্প কজনা। থানা পিছু দেড় হাজার করে ৪৮০টি থানায় (যেহেতু প্রশাসনিক ভবন, এখানে সামরিক অবস্থান দীর্ঘমেয়াদী হওয়াটাই স্বাভাবিক) ৩ লাখ ৬০ হাজার পোয়াতির সন্ধান পাওয়া যায়। অন্য যে কোনো পদ্ধতিতে হিসেব করলেও সংখ্যাটা এর ধারে কাছেই থাকবে।

আমার ব্যক্তিগত মতামতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের পেছনে এসব কারণই অনেকাংশেই সঠিক ছিল এবং এদের একটা বড় অংশ স্থানীয় পর্যায়ে অনিরাপদ প্রক্রিয়াতেই গর্ভখালাস করিয়েছেন।
স্থানীয়ভাবে যে পদ্ধতিতে গর্ভপাত ঘটানো হতো সেটা অবৈজ্ঞানিক হলেও যথেষ্ট কার্যকর বলেই বিবেচিত হয়েছিল। বেশীরভাগ গ্রামেই দেখা গেছে ৫ থেকে ৬ ইঞ্চি লম্বা ও পৌনে ইঞ্চি চওড়া একটা চোখা কাঠি ব্যবহার করা হতো। এটা যোনীপথে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো যতক্ষণ না তা জরায়ুর দেওয়াল ছোঁয়। বেশীরভাগ এলাকাতেই কাঠির ধরণটাকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হতো না, একটা হলেই হলো। বিবাহিতারা ব্যাপারটা নিজেই করত আর অবিবাহিতদের নিয়ে যাওয়া হতো স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের কাছে (এসব জায়গায় বিয়ের আগে গর্ভবতী হওয়ার ঘটনা আগেও ঘটেছে, তবে কী হারে সেটা জানা যায়নি)। কাঠিটা জায়গামতো রেখে খোঁচানো হতো যতক্ষণ না ব্যাথা উঠে জরায়ুর পেশী এটাকে ঠেলে বের করে দেয়, সুবাদেই গর্ভপাত। জানা গেছে এটি শতভাগ কার্যকর বলে স্বীকৃত পদ্ধতি, তবে একটু ধীরগতি।

ব্যাপারটা ত্বরান্বিত করতে অন্য অনেক পদ্ধতি যুক্ত হতো। স্থানীয় করবী নামের একটি গাছের মুলের রস খেয়ে বা মুলটা সরাসরি প্রবেশ করিয়ে (কবিরাজ ও আয়ুর্বেদ পদ্ধতি) গর্ভপাত ঘটানো সম্ভব। আর যাদের অ্যালোপ্যাথি ওষুধের কথা শুনেছে (এবং খানিকটা বিশ্বাসও করত) তারা ব্যবহার করেছে কাঠি ঢোকানোর পরদিন একডোজের ৯ গ্রাম ভিটামিন সি (০.৫গ্রামের ৮টি ট্যাবলেট) যাতে ৪৮ ঘন্টায় গর্ভপাত হতো। পদ্ধতিটার কার্যকারিতা সন্দেহাতীতভাবেই প্রমাণিত।

এছাড়া অনেককে কাঠি প্রবেশের পর প্রতিদিন ৪/৫টি গর্ভনিরোধ পিল খাওয়ানো হতো, ৫ থেকে ৭দিন ধরে। আর কোর্স শেষ করার দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিনে গর্ভপাত ঘটত। পিলের সরবরাহকারী আইপিপিএফ, সুইডিশ সরকার ও অন্যরা জেনে নিশ্চিত খুশী হবেন যে তাদের যোগানটা বৃথা যায়নি। স্থানীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলো থেকে এই পিল বিনামূল্যেই পেত ব্যবহারকারীরা।

তো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরের কথা, বাংলাদেশ সরকারের কাছে অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের ভীতিকর ধাক্কাটা লাগার আগেই দেখা গেল সাধারণ গ্রাম্য চিকিৎসকরাই তা অনেকখানি সমাধান করে ফেলেছে। কিন্তু দুঃজনকভাবেই বলতে হচ্ছে, এর ফলে এরা বাড়তি দুটো বড় ধরণের সমস্যার জন্ম দিল।গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলো গর্ভপাত পিছু ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা খরচ করতে গিয়ে আরো ফতুর হয়ে পড়ল।গ্রামের কুমারীরা স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি গাইনি সমস্যায় আক্রান্ত হলো (যার মধ্যে বাড়তি ছিল পাক সেনাদের বদৌলতে পাওয়া যৌন রোগও)।এসব কারণে গ্রামবাসীরা আরো নির্বাক হয়ে গেল, চেপে যাওয়ার প্রবণতাটা তৈরি হলো তাদের মধ্যে।

ইংল্যান্ডে আমাকে বলা হয়েছিল বাংলাদেশে ২ লাখের মতো অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের শিকার নারীর অস্তিত্ব রয়েছে (মার্চ ১৯৭২)। এও জানানো হলো ঢাকায় একটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে তবে সেখানে বাঙ্গালী কর্মচারিরা কাজ করছে এবং অবৈধ গর্ভপাত বিষয়ক আইনটি স্থগিত করা হয়েছে এই কর্মসূচীটি সুচারুভাবে শেষ করার জন্য। আমার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সকলকে গর্ভধারণের মেয়াদ বেড়ে যাওয়ার পর কীভাবে সফলভাবে গর্ভপাত করানো সম্ভব (টার্মিনেশন অব অ্যাডভান্সড প্রেগনেন্সি)।

প্রথম কয়েকদিনের অভিজ্ঞতায় আমি অবাক হয়ে দেখলাম যেমন আশা করেছিলাম সে হারে মেয়েরা আসছে না। সাধারণ ব্যাখ্যাটা ছিল তেমন একটা প্রচারণা হয়নি আর ব্যাপারটা দারুণ অনিশ্চয়তায় ভরা। কিন্তু বোর্ড বিশ্বাস করত যে প্রচারণ যথেষ্টই হয়েছে এবং যাদের প্রয়োজন তাদের কাছে বার্তাটা ঠিকই পৌছেছে। মেয়েরা কম আসার কারণ মুসলিম পরিবারগুলোর রক্ষণশীলতা। কুমারী মা সমাজে ভীষণ এক অপমান। যৌন নির্যাতনের শিকার যে কোনো মেয়েই ছিল পরিবারের কাছে এক লজ্জাকর বোঝা। পরিবারে এদের কারো অস্তিত্ব স্বীকার করাটা সমাজের কাছে একঘরে হয়ে পড়ার ঝুঁকি যা কেউ নিতে চাইছিল না।

এমনিতেই মেয়েরা বিশেষ করে মফঃস্বল বা গ্রামগুলোতে পরিবারের ওপর একটা চাপ (সম্ভবত ডেভিস যৌতুক দিয়ে বিয়ে দিতে হয় বুঝিয়েছেন), আর ধর্ষণের ঘটনা জানাজানি হলে তাকে বিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে না। এও ধারণা করা হয়েছিল প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে সেভাবে হয়তো খবর পৌছেনি, তবে খবরটা গেলেই মেয়েদের সংখ্যা বাড়বে। বোর্ডের মধ্যে এমন সিদ্ধান্তও নেওয়া হলো জেলা সদরগুলোর প্রতিটিতেই একটি করে বিশেষ ক্লিনিক খোলার।

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা ক্লিনিকে ৮৪টি কেস সামাল দেওয়া হলো। মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সংখ্যাটা দাঁড়াল ১৩০। কোথাও একটা গলদ ছিল, নইলে ধারণার সঙ্গে বাস্তবের এই অমিল হবে কেন! আমরা হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলাম, বুঝতে পারছিলাম না আসলে কী হবে। আমি বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুর রওয়ানা দিলাম যন্ত্রপাতির দুটো পূর্ণাঙ্গ সেট নিয়ে, সঙ্গে দুশো টিওপি সারার জন্য যথেষ্ট পরিমান ওষুধ।

রংপুরে গিয়ে জানলাম স্থানীয় সদর হাসপাতালে মেয়েদের ভর্তি করা হয়েছে এবং স্থানীয় গায়েনিকোলোজিস্ট তার সীমিত সামর্থ্য নিয়েও দারুণ কাজ করেছেন। তার ছিল না স্যালাইন, প্লাজমা, পিট্রোসিন সত্যি বলতে কোনো ধরণের অক্সিটোসিক এমনকি কোনো এন্টিবায়োটিকও!

দিনাজপুরে গিয়ে প্রথম ধাক্কাটা খেলাম। সেখানকার সিভিল সার্জন মন্তব্য করে বসলেন টিওপি ব্যাপারটার বৈধতা নিয়ে তার যথেষ্টই সন্দেহ আছে এবং সরকারী এমন কোনো নির্দেশনা তিনি পাননি যাতে এটার অনুমতি দিতে পারেন। তার কথা সরকারী মহলে ব্যাপারটা নিয়ে যে আলাপ হয়েছে তাতে জেলাসদরগুলোয় গর্ভবতীদের খুঁজে বের করে সবাইকে গর্ভপাত করাতে রাজী করানোর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু চিকিৎসকরা কেউ এতে সায় দেননি। চিফ মেডিকেল অফিসার এও জানালেন একজন ফিরিঙ্গি হিসেবে (উনি ফেরাং শব্দটা ব্যবহার করেছেন) যেখানেই যাই আমাকে এ ব্যাপারে কেউ কিছু বলবে না, কারণ বাংলাদেশের সামাজিক আচারে বিদেশী অতিথিদের লজ্জা দেওয়ার রীতি নেই। তারা এও জানালো বিএমএর স্থানীয় শাখার প্রেসিডেন্ট (একজন খাটি মুসলিম) তাদেরকে গত ডিসেম্বরে মরক্কোয় অনুষ্ঠিত মুসলিম আইপিপিএফ কনফারেন্সের মতামতের উদাহরণ দিয়েছেন যাতে পরিবার পরিকল্পনার খানিকটা অংশ যৌক্তিক মানা হলেও গর্ভপাতকে বলা হয়েছে নিষিদ্ধ। যেহেতু প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তারা এর ব্যত্যয় ঘটাতে পারেন না। পরদিন সকালে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। এমনিতে ভদ্রতা ও সৌজন্যবোধের কমতি না দেখালেও তার মতবাদ থেকে নড়লেন না। এও জানিয়ে দিলেন তার এলাকায় তিনিই হর্তাকর্তা, যা বলবেন সেটাই হবে।
সিভিল সার্জন ও চিফ মেডিকেল অফিসার আরো একটা হতাশা জানালেন। সবাই যেখানে কিছু না কিছু পাচ্ছে (টিওপির জন্য রোগি রেফার করলে মাথাপিছু ১০টাকা দেওয়া হতো) সেখানে তারা কেন মাগনা অপারেশন করে যাবেন! এ’দুটো চমকপ্রদ প্রসঙ্গ এরপর আমি যেখানেই গিয়েছি শুনতে হয়েছে, স্রেফ ভাষা বা বলার ধরণটা বদলে গেছে।

ঢাকায় ফিরে আমি বোর্ড চেয়ারম্যানকে জানালাম বিষয়টা। উনি বললেন জেলা পর্যায়ে প্রশাসনগুলো এখন ভীষণরকম দুর্নীতিবাজ, টাকা দিলে পরিস্থিতি আরো বিগড়ে যাবে। ভ্যাসেকটমি নিয়ে বছরখানেক আগে এরকম কিছু ঘটনার কথা আমি আগেই শুনেছিলাম (টাকা নিয়ে অনেক সক্ষম পুরুষও নির্বীজ হয়েছেন এবং শাড়ি-লুঙ্গি আড়াইশ টাকার বিনিময়ে কুমারি মহিলাদের লাইগেশন করানোর ঘটনা বাংলাদেশে আশির দশকেও প্রচুর ঘটেছে- অঃরঃপিঃ), তাই তার কথা শুনে অবাক হলাম না। আর বিষয়টার বৈধতার প্রশ্নে নিশ্চিত করলেন যে স্বাস্থ্য সচিব একটি বিবৃতি দিয়েছেন ইতিমধ্যে। এতে বলা হয়েছে পাকিস্তানী সেনাদের কাছে ধর্ষিতা হয়ে যেসব মেয়ে গর্ভবতী হয়েছেন, তাদের গর্ভপাত ঘটানো বৈধ। উনি এও বললেন যে পেনাল কোডের ৩১২ ও ৩১৩ ধারায় মুসলমানদের নিশ্চিন্ত করার মতো একটি বাক্য রয়েছে যে ‘মায়ের জীবন বাঁচাতে গর্ভপাত করানো যাবে’। ধর্মীয় ব্যাপারটা সামাল দেওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট।

ময়মনসিংহে গিয়ে একই সমস্যার মুখে পড়লাম। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ১২০ জন ডাক্তার-কর্মচারী ও ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে আমি যখন একটি লেকচার দিলাম তখন ৯০ ভাগ সম্পুরক প্রশ্নই এলো গর্ভপাতের বৈধতা নিয়ে, এর টেকনিক নিয়ে নয়।

ঢাকাতে আমি সেই চিঠিটার একটা কপি জোগাড় করার চেষ্টা করলাম যাতে গর্ভপাত কর্মসূচীর অনুমতি দেওয়া হয়েছে (অবৈধ হলেও)। স্বাস্থ্য সচিব সেটা শুনেছি সব জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন ও চিফ মেডিকেল অফিসারের কাছে পাঠিয়েছেন। একটা অনুলিপিও পেলাম না, এমন কারো দেখাও পেলাম না যে কিনা এর কোনো কপি নিজের চোখে দেখেছে। আমি সরাসরি সচিবের সঙ্গে দেখা করলাম। শুরুতে পাঠিয়েছেন বললেও পরে স্বীকার করলেন আসলে এ ধরণের কোনো চিঠিই পাঠানো হয়নি। আমি তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিভাগীয় প্রধান আব্দুর রব চৌধুরিকে নিয়ে একটা বৈঠক ডাকলাম। আর সেখানেই বিষয়টা নিয়ে রাজনৈতিক চিন্তাধারার বিভেদ ও দলাদলিটা আরো পরিষ্কার হয়ে গেল। উনি স্বাস্থ্য সচিবকে ফোন করলেন এবং জানলেন চিঠি নাকি পাঠানো হয়েছে (আমি আর বললাম না আমাদের আগের দিনের সাক্ষাতের সারবেত্তা)। আমরা তারপরও একরকম জোরাজুরি করেই তার কাছ থেকে একটা চিঠি আদায় করে নিলাম। বললাম হয়তো দূরদূরান্তে সচিবের চিঠিটি যায়নি। সৌভাগ্যক্রমে কথাবার্তাগুলো আমি রেকর্ড করেছিলাম। পরে বিভিন্ন জেলায় যখন চিঠিতেও কাজ হয়নি, তখন তা বাজিয়ে শোনানোর পর ফল পেয়েছি।

পরিস্থিতি দাড়ালো এরকম, ঢাকা থেকে জাতীয় বোর্ড জেলা পর্যায়ে নির্দেশ পাঠাবেন যাতে আবাসন জোগাড় করা হয়। সেগুলো ঢাকার সেবা সদনের (ক্লিনিকটির নাম) আদলে ক্লিনিকে রূপ দেওয়া হবে। স্থানীয় বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে এ বাবদ টাকা পাঠানো হবে, আর স্থানীয় বোর্ড তখন টাকা পেয়ে পাল্টা চিঠিতে জানাবেন যে তারা-
১. প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাচ্ছেন না, এবং
২. চিকিৎসকের অভাব, কিংবা
৩.চিকিৎসক আছেন কিন্তু তিনি জানেন না অ্যাডভান্সড প্রেগনেন্সির ক্ষেত্রে কীভাবে গর্ভপাত ঘটাতে হয়;
৪.দূরান্ত থেকে রোগী আনার জন্য পর্যাপ্ত যানবাহন নেই, এবং
৫.বেশীরভাগ রোগীর সঙ্গেই একজন করে আত্মীয় (যদি কুমারী হয়) বা বাচ্চাকাচ্চা (বিবাহিতা হলে) আছে। রোগী ক্লিনিকে থাকলে, তাদের কোথায় রাখা হবে?আমার কাজ ছিল কর্মসূচির অংশ হিসেবে হাসপাতালগুলো তালিকাভুক্ত করা। আর পুনর্বাসন থেকে ক্লিনিকের দিকটাকে আলাদা রাখা। বোর্ডকে সন্তুষ্ট করে প্রতিটি এলাকায় আলাদা ক্লিনিক খোলা ছিল অসম্ভব। তাই আমি পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে খোলা জায়গাগুলোই ক্লিনিক হিসেবে ব্যবহার করতে তাদের রাজী করালাম।

এরপর বোর্ডের সদস্যদের হাসপাতালের নির্বাহী ও ক্লিনিকের কর্মচারীদের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিলাম। এতে সব জায়গাতেই হাসপাতালগুলোয় টিওপির জন্য রোগী ভর্তি করা সম্ভব হলো। সেজন্য অবশ্য ব্যাপারটা জীবন্ত ভ্র“নকে বের না করেই করা সম্ভব- তা করে দেখাতে হলো আমাকে। এই সমঝোতার পর প্রতিটি এলাকাতেই একটা চুক্তিমতো হলো। বোর্ড প্রত্যেক এলাকায় নিজ দায়িত্বে মেয়েদের জোগাড় করে তাদের কেন্দ্রে রাখত, যখন বিছানা পাওয়া যেত হাসপাতালে ভর্তি করাত। এরপর টিওপি শেষে তাদের বিভিন্ন কাজের ট্রেনিং দিত অথবা তারা যতদিন ইচ্ছা বোর্ডের খরচে পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকত। যেসব এলাকায় ভালো হাসপাতাল নেই, তারা সবচেয়ে কাছের বড় হাসপাতালে মেয়েদের পাঠাতে শুরু করল। টিওপি শেষে নিজেদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে তাদের ফিরিয়ে নিতে লাগল। দেশজুড়েই বেশ সন্তোষজনকভাবেই তা চলতে লাগল আর এর কার্যকারিতা এতটাই যে এ নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যার কোনো অবকাশ নেই।

টিওপিতে যে পদ্ধতিগুলো কাজে লাগানো হতো :

কারমান সুপারকয়েলস : এতে দুটো বড় অসুবিধা। প্রসব হয়ে যেত, বিশেষ করে যখন মাল্টিপল কয়েল প্রবিষ্ট করানো হতো। প্রায় সব রোগীরই দেখা যেত শরীরে জ্বর এসেছে। আমার ধারণা কয়েলগুলো স্থানীয়ভাবে ঠিক মতো স্টেরিলাইজ করা যেত না বলেই এমনটা হতো। দ্বিতীয়ত, ঢাকার বাইরে পাওয়া যেত না, আর এখানেও (ঢাকায়) সরবরাহ ছিল কম।
ক্যাথেটার (মল্লিকস মেথড) : এরও দুটো বড় সমস্যা ছিল। সবসময়ই ভ্রূন জীবন্ত অবস্থায় প্রসব হতো আর মারাত্মক ধীরগতি ছিল এর কার্যকারিতার। ক্যাথেটার কয়েকবার বদল করার পরও দেখা যেত পদ্ধতিটা কাজ করছে না।
১ ও ২ উভয় পদ্ধতিতেই বাড়তি সমস্যা ছিল। যেহেতু দুজায়গাতেই অবিকৃত ভ্রূন প্রত্যাশিত ছিল (সেটা জীবিত মৃত যাই হোক না কেনো), প্রসব যন্ত্রণা ছিল প্রচণ্ড এবং কিছু ক্ষেত্রে টিওপি এড়াতে হতো। এটা বিশেষ করে হতো অবিবাহিতাদের ক্ষেত্রে।
এমনিওটিক রিপ্লেসমেন্ট : ১৯৬২ থেকে ’৬৯ পর্যন্ত এই পদ্ধতিতে এত বিপর্যয় ঘটত যে এটা তুলে দেওয়ার জন্য বিশেষ সুপারিশ হয়েছিল। তারপরও এটা চালু ছিল এবং মাঝে মাঝে কাজও করত।
হিস্টারেক্টামি : আমার জানা মতে দুটো রোগীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু প্রচুর সময় নিত এবং ব্যবহার্য জিনিসপত্র অন্য কাজে ব্যবহার করা হত বলে বর্জন করা হয়েছিল।
কৃত্রিম প্রসব বেদনা জাগানো এবং আম্বালিকাল কর্ড (নাড়ি) ছেদন : ঢাকা বাদে (এখানে কারমান কয়েল পদ্ধতিটাই বেশি ব্যবহৃত) গোটা দেশেই এটা ব্যবহার করা হতো সহজ ও কার্যকর বলে। তবে এতেও অনেক সমস্যা ছিল। এতে বিশেষ নিরাপত্তা ও নির্দিষ্ট মাত্রার দক্ষতা ছিল খুব প্রয়োজন।
মেমব্রেন রাপচার এবং অমটোসিন ইনফিউসন : সীমিত সাফল্যে নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে ব্যবহৃত। ধীর গতি, অনিশ্চিত এবং জীবিত ভ্র“ন প্রসব হতো।

ধারণার চেয়ে কম সংখ্যায় টিওপি কেস আসার কারণ :

সরকারীভাবে সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার অনেক আগেই স্থানীয় চিকিৎসকরা অনেক মেয়ের গর্ভপাত ঘটিয়ে ছিলেন। একজন এখনও (লেখা হয়েছিল ২ মে ‘৭২) ঢাকায় কর্মরত আছেন। উনি সেবা সদনের কাছেই থাকেন। আটশ থেকে নয়শো মেয়ের গর্ভপাত করেছেন, যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা গর্ভধারণের শুরুর দিকে। যদিও একাজের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে আমি মনে করি তাকে কাজ করতে উৎসাহ দেওয়া হোক।
এ দেশে এখনও গর্ভপাত নিয়ে বেশ ধোয়াশা রয়েছে। আর কোনো সরকারী সংস্থাই ব্যাপারটা খোলাখুলি স্বীকৃতি দিতে নারাজ।
ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞাও একটা কারণ। এবং অনেক ডাক্তারই এ ব্যাপারে একরোখা (আগে উদাহরণ দেওয়া হয়েছে)।
বোর্ডের সাংগঠনিক সমস্যার কারণে প্রতিটি জেলায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে তাদের যোগাযোগে ঘাটতি ছিল। স্থানীয় প্রশাসনে রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য এটা আরো বেড়ে গিয়েছিল। জেলা প্রশাসকরা দেখা যেত কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকতেন। যেহেতু অনুদানটা তাদের উদ্দেশ্যে পাঠানো হতো, বোর্ডের জন্য অনেক কঠিন হয়ে যেত বাকিটা।
৫. রাজনৈতিক কার্যক্রম ব্যাপ্তি পাচ্ছিল খুব। সুবাদেই জেলাগুলোয় চলছিল জোর বদলির হিড়িক। সিভিল সার্জনের মতো পদগুলো ছিল রাজনৈতিক নিয়োগ। এ কারণেই কেউই এক জায়গা থিতু হতে পারছিল না। চিকিৎসকরাও এর ফেরে পড়েছিলেন। সেজন্য একদিন একজন পাওয়া গেলেও পরদিন তাকে পাওয়া যাবে সে নিশ্চয়তা ছিল না।
৬. সব জায়গাতেই এমন একটা দাবি ছিল যে ডাক্তারদের অপারেশন বাবদ টাকা দিতেই হবে। এটা জাতীয় বোর্ড মানেনি। ভ্যাসেকটমি কর্মসূচীর সময় যা হয়েছিল, বোর্ড দ্বিতীয় দফা সেটা এড়াতে চেয়েছিল।
৭. জেলা সদরগুলোয় রোগী আনার জন্য যানবাহন পাওয়া খুব কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছিল। এমন নয় যে যানবাহনের অভাব ছিল। এটা আসলে কর্মসূচীতে অসহযোগিতার একটা উদাহরণ মাত্র।
৮. কিছু জেলায় প্রশাসন এমনই দুর্নীতিবাজ হয়ে পড়েছিল যে ভালো কিছু করাই ছিল অসম্ভব। স্থানীয় বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে জেলা প্রশাসকের বরাতে টাকা পাঠানো হতো। আর উনি বোর্ড গঠন করা তো দূরে থাক, কাল্পনিক সব খাতে খরচ দেখিয়ে পুরো টাকা মেরে দিতেন।
৯. অত্যাচারিতাদের অস্তিত্ব স্বীকার করতে পারিবারিক অনীহা। যদিও উদাহরণ কমই এমন। জাতীয় বোর্ড এভাবে ভেবেছে কারণ গ্রামের সামাজিক কাঠামো সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের অভাব। বেশিরভাগ গ্রামেই দেখা গেছে আত্মীয়স্বজনরা মিলে একটা বড় বসত। তাই কোনো পরিবার প্রতিবেশীদের নিন্দার ভয়ে নিপীড়িতাদের কথা লুকিয়ে যাবে, ভাবনাটাই ভুল।
১০. পেশাগত আবেগে পশ্চিম ইউরোপের ডাক্তারদের চেয়ে কম যান না বাঙালীরা। বিশেষ করে গর্ভপাতের ব্যাপারে। যারা বিদেশে কখনো যাননি, বা বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ হয়ে আসাদের সঙ্গে যাদের যোগাযোগ কম ছিল, তারা টিওপির ব্যাপারে ছিলেন একরোখা। আর ব্রিটেন থেকে পাশ এসেছেন যারা, তাদেরও দেখা গেছে গর্ভপাতে তীব্র আপত্তি। এ ব্যাপারে হার ব্রিটানিক ম্যাজেস্টিস রয়াল কলেজ অব অবস্টেট্রিকস অ্যান্ড গায়েনোকোলজির দায়টা নিঃসন্দেহে ব্যাপক। এটা শুধু এই কর্মসূচীর ক্ষেত্রেই নয়, পরিবার পরিকল্পনার ব্যাপারেও খুব খাটে।
১১. গর্ভধারণের তৃতীয় ধাপে টিওপিতে যে ধরণের পদ্ধতি ব্যবহার হতো তাতে জীবন্ত ভ্র“ন প্রসব করতেন মেয়েরা। এটা অনেক জায়গাতেই অনুৎসাহিত করা হতো আর এ ব্যাপারে আমার পুরো সমবেদনা রয়েছে।
১২. দীর্ঘমেয়াদে মেয়েদের ক্লিনিকে রাখাটা ছিল একটা রাজনৈতিক অদূরদর্শীতা, ভুল। এটা আরো খারাপ রূপ নিয়েছে মাদার তেরেসার ঘটনায়। পূর্ণ মেয়াদী তিনটা প্রসব হয়েছিল সাভারে এবং বাচ্চাগুলো তুলে দেওয়া হয়েছিল মাদার তেরেসার হাতে। এরা পরে মারা গিয়েছিল। গুজব রটেছিল এই তিনটি মেয়েকে ক্লিনিক থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, তারা কী করবে দিশা না পেয়ে বাচ্চা সমর্পণ করেছিল। আর যেহেতু গর্ভপাতের কারণেই তারা মারা গেছে। এতে ক্লিনিকের ভাবমূর্তি মোটেও উজ্জল হয়নি। এটা বলে রাখা দরকার অপুষ্টি ও অন্যান্য কারণে নবজাতকদের মৃত্যুর হার বাংলাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বরাবরই বেশি। স্বাভাবিক প্রসবেই শিশুদের আকার ছিল বেশ ছোট। ৩০ সপ্তাহের ভ্র“ণের সঙ্গে পশ্চিমের ২০ সপ্তাহের ভ্রূনের মিল পাওয়া যায়। এতে অবশ্য কর্মসূচীর সুবিধাই হয়েছে। ২০ সপ্তাহ পর্যন্ত ভ্র“নের আকার একইরকম, এরপর পশ্চিম থেকে একদমই আলাদা।

(এরপর বাকিটায় ডেভিস গর্ভপাতের ক্লিনিকাল প্রসিডিউর দিয়েছেন বলে তা বাদ রাখা হলো)


ডক্টর ডেভিসের সাক্ষাতকার


(প্রাক কথন : কাগজপত্র বলছে যুদ্ধপরবর্তীকালীন সময়ে বাংলাদেশে কর্মরত চিকিৎসকদের একজন ছিলেন জিওফ্রে ডেভিস। সিডনিতে তার এই সাক্ষাৎকারটা নিয়েছিলেন বীনা ডি’কস্টা। সাক্ষাৎকার কাল ২০০২ সাল। স্বাধীনতার ৩২ বছর পর। অনেক ঘটনাই তখন ডেভিসের স্মৃতিতে ঝাপসা।

নিউসাউথওয়েলস থেকে পাশ করা ডেভিস বাংলাদেশে ছিলেন মার্চ ’৭২ থেকে মাস ছয়েক। ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যানড প্যারেন্টহুড, ইউএনএফপিএ এবং হু’র তত্ত্বাবধানে কাজ করেছেন। তার কাজের ধরণের স্পর্শকাতরতা বিবেচনা করেই এসব সংগঠনের কেউ তাকে নিজেদের একজন বলে স্বীকৃতি দেয়নি। উনি স্মরণ করেছেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাদের পাশবিকতা থেকে বেচে যাওয়া মেয়েদের জন্য কিছু করতেই আমি ছিলাম সেখানে। যাদেরকে সম্ভব গর্ভপাত করানো হয়েছে, যাদের সম্ভব হয়নি সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায়, তাদের প্রসবে সাহায্য করা হয়েছে। সেটা সাফল্যের সঙ্গেই আমরা করেছি। বাংলাদেশে তখন সংখাতত্ত্বে সব কিছুই ছিল বড় রকমের। আমি ক্ষয়ক্ষতির কথা বলছি। যখন সেখানে পৌছলাম এদের অনেকেই হয়তো মারা গেছে, নয়তো পরিবারে ফিরে গেছে। এটাই সবাইকে আতঙ্কিত করে তুলেছিল। আমাদের কিছু করা দরকার। আমরা ভেবে উপায় বের করার চেষ্টায় ছিলাম। ইংল্যান্ডের একজন ছিল আমার সঙ্গে। পরে আর তার হদিশ পাইনি। অদ্ভুত এক ব্যাপার।)

বীনা : আপনি কি স্বেচ্ছায় গিয়েছিলেন?
ডেভিস : হ্যাঁ।

বীনা : কেন আপনি আগ্রহী হলেন?
ডেভিস : অ্যাডভান্সড প্রেগনেন্সি (গর্ভপাতের নিরাপদ সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়া) টার্মিনেটিংয়ে আমার বিশেষ একটি টেকনিক ছিল। আমি যুক্তরাজ্য থেকে মূলত ট্রেনিং নিয়েছি। যাহোক, আমি সাধারণত ৩০ সপ্তাহের নিচের গর্ভবতীদের গর্ভপাত করিয়েছি।
বীনা : ঢাকায় কোথায় কাজ করেছেন?
ডেভিস : ধানমন্ডীর একটি ক্লিনিকে। এছাড়া আরো অনেক শহরেই যেখানে হাসপাতাল বলে কিছু অবশিষ্ট ছিল। যেহেতু সংখ্যাটা অনেক বেশি, তাই মূলত আমি স্থানীয়দের শিখিয়ে দিচ্ছিলাম কীভাবে কী করতে হবে। তারা শিখে নিলে আমি অন্য কোথাও চলে যেতাম একই কাজ করতে।

বীনা : তথ্য সংরক্ষণের স্বার্থেই জানতে চাচ্ছি, ঠিক কী ধরণের কাজ করতেন ওখানে নির্দিষ্ট করে বলবেন কী?
ডেভিস : আমি ওখানে যাওয়ার আগে নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র নামে একটা সংস্থা হয়েছিল যার দায়িত্বে ছিলেন বিচারপতি সোবহান। তারা চেষ্টা করছিলেন গর্ভবতী সব মেয়েদের নিরাপদ কোনো এক জায়গায় জড়ো করতে। যাদের গর্ভপাত করানো সম্ভব, করাতে। আর বাচ্চা হলে তাদেরকে ইন্টারন্যাশনাল সোসাল সার্ভিসের হাতে তুলে দিতে।

বীনা : সেসময় আপনার সঙ্গে কাজ করেছেন এমন কারো নাম মনে আছে?
ডেভিস : যুদ্ধ পুনর্বাসন সংস্থার প্রধান ছিলেন জাস্টিস সোবহান আর এ ব্যাপারে সবচেয়ে তৎপর মানুষটি ছিলেন ফন শুখ। তার নামের প্রথম অংশটা স্মরণ করতে পারছি না। তার স্ত্রীর নাম ছিল সম্ভবত মেরি। তারা আর্থিক সহায়তা দিচ্ছিলেন। বাঙ্গালী কর্মকর্তাদের নাম আমার মনে নেই। তাছাড়া ইতিহাসের এই অংশটুকু কেউই মনে রাখতে চাইছিল না।

বীনা : এ কথা কেনো বললেন?
ডেভিস : ওহ, কারণ পুরো ব্যাপারটা গর্ভপাত এবং বাচ্চাদের দত্তকের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। আরেকটা প্রেক্ষাপট হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তান কমনওয়েলথভুক্ত দেশ ছিল, তাদের সব অফিসাররাই ইংল্যান্ডে ট্রেনিং নেওয়া। এটা এক অর্থে ব্রিটিশ সরকারের জন্যও ছিল বিব্রতকর। পশ্চিম পাকিস্তানী কর্মকর্তারা বুঝতে পারছিল না এ নিয়ে এত হৈ চৈ করার কী আছে! আামি ওদের অনেকের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। কুমিল্লার একটি কারাগারে আটক ছিল তারা এবং খুবই বাজে অবস্থায় (ব্যাপারটা আমার কাছে অবশ্য উপভোগ্য ঠেকেছে)। ওরা বলত, ‘এসব কী হচ্ছে? আমরা কী করতে পারতাম? যুদ্ধ হচ্ছিল তো!’

বীনা : মেয়েদের ধর্ষণ করাকে কীভাবে তারা ন্যায়সঙ্গত ভাবল?
ডেভিস : টিক্কা খান নাকি তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, বুঝিয়েছিলেন একজন ভালো মুসলমান তার পিতা ছাড়া আর সবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে! তাই তারা যতজন সম্ভব বাঙ্গালী মেয়েদের গর্ভবতী করার চেষ্টা করেছে। এটাই ছিল ওদের থিওরি।

বীনা : মেয়েদের কেন গর্ভবতী করতে হতো? তার কারণ বলেছে আপনাকে?
ডেভিস : হ্যাঁ, এর ফলে গোটা পূর্ব পাকিস্তানে একটা নতুন প্রজন্ম জন্ম নেবে যাদের শরীরে থাকবে পশ্চিম পাকিস্তানী রক্ত। সেটাই তো ওরা বলল।

বীনা : পাকিস্তানের অনেক তথ্য উপাত্তে দেখা যাচ্ছে ধর্ষনের সংখ্যা নাকি ইচ্ছা করেই বাড়িয়ে বলা হয়েছে। আপনি কী তা সত্যি মানেন?
ডেভিস : না না, প্রশ্নই ওঠে না। বরং তারা যা করেছে সেটাই রক্ষণশীলতার কারণে অনেকখানি চেপে যাওয়া হয়েছে। ওরা কীভাবে শহর দখল করত তার বর্ণনা খুবই চমকপ্রদ। পদাতিকদের পেছনে রেখে গোলন্দাজদের দিয়ে হাসপাতাল ও স্কুলে কামান দাগত। এতে গোটা শহরে একটা ভীতিকর আতঙ্ক তৈরি হতো। আর তারপরই পদাতিকরা ঢুকে মেয়েদের ওপর হামলা চালাত। একদম ছোট শিশু বাদ দিলে, একটু পরিণত মেয়েদের তারা শিকার বানাত। বাকিরা অংশ নিত শহর জ্বালানো পোড়ানোয়। পূর্ব পাকিস্তান সরকার এবং আওয়ামী লিগের সমর্থক সবাইকে গুলি করে মারা হতো। আর মেয়েদের সশস্ত্র পাহারায় রাখা হতো কোনো জায়গায় যাতে সৈন্যরা তাদের ব্যবহার করতে পারে। বিভৎস একটা ব্যাপার। এমন কোনো ঘটনা আগে ঘটেছিল বলে আমার অন্তত জানা নেই। তারপরও ঠিক এমনটাই ঘটত।
বীনা : যুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে ক্লিনিকের নারী-পুরষ বা সমাজকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন কখনো? নির্দিষ্ট করে বললে ধর্ষণের শিকার মেয়েদের সঙ্গে?
ডেভিস : হ্যাঁ, প্রায় সবসময়ই শুনতাম। তাদের কিছু গল্প ছিল মর্মস্পর্শী। বিশালাকৃতির পাঠান সৈন্যরা একের পর এক ওদের ধর্ষণ করে যাচ্ছে। বিশ্বাসই হয় না কেউ অমন করতে পারে। স্বচ্ছল ঘরের এবং সুন্দরী মেয়েদের অফিসারদের জন্য রেখে দেওয়া হতো। বাকিদের বাটোয়ারা করে দেওয়া হতো অন্যদের মাঝে। আর মেয়েদের ওপর বর্বরতার কোনো সীমা ছিল না। ওদের ঠিকমতো খেতে দেওয়া হতো না, অসুস্থ্য হলে ওষুধ ছিল না। অনেকেই ক্যাম্পেই মরে গেছে। পুরো ব্যাপারটা নিয়ে অবিশ্বাসের একটা আবহ ছিল। কেউ স্বীকার করতে চাইত না ঘটনাগুলো সত্যি ঘটেছে! কিন্তু চাক্ষুস প্রমাণ বলে দিচ্ছিল কী ঘটেছিল, সত্যিই ঘটেছিল।

বীনা : বুঝতে পারছি আপনি কী বলতে চাইছেন। কারণ আমি গত চারবছর ধরে এদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। যেহেতু সংখ্যাটা বিশাল ছিল তাই তাদের অনেককেই পাওয়ার কথা। কিন্তু অনেক খেটে মাত্র কয়েকজনের দেখা পেয়েছি।
ডেভিস : সেটাই, কেউ স্বীকার করার কথা না। তারা স্রেফ চেপে গেছে, ভুলে গেছে। এমনটাই হয়।

বীনা : কিন্তু তখন কি ব্যাপারটা অন্যরকম ছিল, মানে যুদ্ধের পরপর? কেউ কী তাদের দুঃস্মৃতির কথা বলেছিল?
ডেভিস : না, কেউই ব্যাপারটা নিয়ে মুখ খলতে চায়নি। প্রশ্ন করলে একটা উত্তরই মিলত। বেশিরভাগ সময়ই তা ছিল তাদের মনে নেই। আর পুরুষরাও এ ব্যাপারে একদমই কথা বলতে চাইত না! কারণ তাদের চোখে এসব মেয়ে ভ্রষ্টা হয়ে গেছে। আর বাংলাদেশে এমনিতেও মেয়েদের অবস্থান সামাজিক পর্যায়ে অনেক নিচে। ভ্রষ্টা হয়ে যাওয়া মানে তাদের এমনিতেই আর কোনো মর্যাদা রইল না। তাদের মরে যাওয়াই ভালো। আর পুরুষরা তাদের মেরেও ফেলত। বিশ্বাস হচ্ছিল না। এটা পশ্চিমা সমাজের একদমই বিপরীত! একদমই উল্টো!

বীনা : আপনি নিশ্চয়ই বাংলা জানতেন না। যোগাযোগে সমস্যা হতো না?
ডেভিস : না, আমার একজন দোভাষী ছিল। তারা খুব দ্রুতই সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করেছিল। আমাকে একটা ল্যান্ড রোভার, একজন ড্রাইভার ও ফিল্ড অফিসার দেওয়া হয়েছিল যিনি দোভাষীর কাজও করতেন। ড্রাইভারের নাম মমতাজ। ফিল্ড অফিসার একজন সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন, নাম মনে নেই। তাছাড়া ওদের বেশিরভাগই ভালো ইংরেজি বলতে পারত।

বীনা : আপনার মতে মেয়েগুলো কেনো নির্বাক থাকত?
ডেভিস : বুঝতেই পারছেন, আতঙ্কে। তারাই সবই দুঃস্বপ্নে ছিল। সেটা সামলে ওঠা তো কঠিন কাজ! বেশিরভাগই ছিল চরম উদ্বেগে। কারণ আমরা ছিলাম বিদেশী এবং ওরা কেউই বিদেশীদের বিশ্বাস করত না। আমরা ওদের কী করব সেটাই ওরা বুঝতে পারছিল না...

বীনা : রেপ ক্যাম্প ছিল এমন জায়গাগুলোতে গিয়েছেন কখনো?
ডেভিস : ধর্ষন শিবিরগুলো বিলুপ্ত হয়েছিল, পুনর্বাসন কর্মীরা মেয়েদের তাদের গ্রামে বা শহরে পাঠানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু এমন ঘটনা অনেক ঘটেছে যে কোনো মেয়েকে তার স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার পর সে তাকে মেরে ফেলেছে। কারণ সে ভ্রষ্টা। অনেক ক্ষেত্রে তারা জানতেই চাইত না কী হয়েছে। এছাড়া দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোয় নদীতে (ডেভিস শুধু যমুনার উল্লেখ করেছেন) প্রচুর লাশ পাওয়া যেত। এসব ঘটনাই ইউরোপের মানুষকে উৎকণ্ঠিত করে তুলেছিল।

বীনা : মেয়েগুলোর কথা মনে আছে? কতজনের গর্ভপাত করিয়েছেন?
ডেভিস : সঠিক পরিসংখ্যান মনে করা কঠিন। তবে দিনে শ’খানেক তো বটেই।

বীনা : ঢাকায় নাকি অন্যান্য শহরেও?
ডেভিস : আসলে একটা নির্দিষ্ট সংখ্যায় আনাটা কঠিন ব্যাপার। ঢাকায় প্রতিদিন শ’খানেক আর ঢাকার বাইরে এর কম-বেশি হতো। আর অনেকেই কলকাতায় গিয়েছিল।

বীনা : আপনার কী আনুপাতিক হারটা মনে আছে? যেমন ধরুণ শ্রেণী ভেদে, ধর্মভেদে কতজন নারীকে দেখেছেন আপনি?
ডেভিস : শ্রেণীভেদ ঠিক আছে, কিন্তু কারো ধর্ম আমরা বিবেচনায় আনিনি। আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল তাদের বিপদমুক্ত
করা। সাধারণভাবে ধনী পরিবারের মেয়েরা যুদ্ধ থামার পরপরই কলকাতায় চলে গিয়েছিল গর্ভপাত করাতে।

বীনা : মেয়েদের কী জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তারা গর্ভপাত চায় কীনা? তাদের কী কোনো মতামত নেওয়া হয়েছিল?
ডেভিস : হ্যা অবশ্যই। আমাদের কাছে আসা সব মেয়েই গর্ভপাত ঘটাতে চেয়েছিল। আমাদের তো মনে পড়ে না এর ব্যতিক্রম কখনো ঘটেছে। অন্তত আমার চোখে পড়েনি। যাদের বাচ্চা হয়েছে, তারা শিশুদের তুলে দিয়েছে পুনর্বাসন কর্মীদের হাতে। এভাবেই এসব শিশু আইএসএস এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে আশ্রয় পেয়েছে। কতজন, সংখ্যাটা বলতে পারব না।



বীনা : ক্ষমা চাইছি এ ব্যাপারে আরেকটু খুটিনাটি জানতে। কিন্তু আমি খুবই আগ্রহী এটা জানতে যে মেয়েরা এই পুনর্বাসনের ব্যাপারটায় সত্যিই সম্মত ছিল কীনা। আপনার কী মনে পড়ে কোনো মেয়ে গর্ভপাত ঘটাতে না চেয়ে কান্নাকাটি করেছিল কীনা?
ডেভিস : না, কেউ কাঁদেনি। তারা এ ব্যাপারে খুবই কঠোর ছিল। একদমই চোখের জল ফেলেনি। চুপচাপ সয়ে গেছে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমাদের কাজ অনেক সহজ হয়েছে তাতে!
বীনা : আপনি বলেছেন যেসব মায়েরা শুধু গর্ভপাত ঘটাতে চাইত, তাদেরকেই আপনি সাহায্য করেছেন। আমি সেই প্রসঙ্গে ফিরছি। মেয়েরা কাদের কাছে তাদের সম্মতি জানাত? সংশ্লিষ্ট ডাক্তার, নার্স বা সমাজকর্মীদের কাছে?
ডেভিস : হ্যা

বীনা : তাদের কী কোনো কাগজপত্র সাক্ষর দিত হতো?
ডেভিস : আমার ধারণা তাদের একটা সম্মতিপত্র সই দিত হতো। যদিও নিশ্চিত নই। সরকার পরাক্ষভাবে সেটা ব্যবস্থা করত। মূলত পুরাটার দায়িত্বে ছিল পুনর্বাসন সংস্থাই। এবং নারী সংস্থা। এটা নিশ্চিত, গর্ভপাত করাত চায় না এমন কেউ ক্লিনিকের ধারেকাছে ঘেষত না। তাই এটা কোনো ইস্যু নয়।

বীনা : আপনি কী শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গর্ভপাতই করিয়ে গেছেন? সে সময় অনেকেই কি অ্যাডভান্সড স্টেটে ছিলো না?
ডেভিস : হ্যা, যে ছয় মাস ছিলাম আমি শুধু গর্ভপাতই করে গেছি। তাদের অপুষ্ঠি এমন ছিল যে ৪০ সপ্তাহর ভ্রূণও দেখতে অন্য কোথাকার ১৮ সপ্তাহর ভ্রূণের মতো ছিল।

বীনা : আপনার কী মনে পড়ে সেসব নারীদের কোনোরকম মানসিক সাহায্য করা হয়ছিল কীনা?
ডেভিস : কাউন্সেলিং? হ্যা, পুনর্বাসন সংস্থাগুলার দায়িত্ব ছিল তা। নারী সমাজকর্মীরা এ নিয়ে ওদের সঙ্গ কথা বলতন। তবে আমার মনে হয় না এতে কোনো কাজ হতো। কারণ সবাই ছিল অপুষ্ঠির শিকার, ভয়ানক ধরণের সব যৌন রোগ ছিল তাদর শরীরে। নারকীয় অবস্থা। দেশে তখন ওষুধ, সুবিধাদি বা সংশ্লিষ্ট রসদও অপ্রতুল। যা ছিল তাও বরাদ্দ ছিল আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। মেয়েদের জন্য তেমন কিছুই না। আমরা আমাদের নিজেদের ওষুধপত্র নিয়ে কাজ করছি।

বীনা : আপনি কোত্থেকে পেতেন? তা কি যথেষ্ট ছিল?
ডেভিস : ইংল্যান্ড থেকে। আমাকে বলা হয়ছিল নিজের জিনিস নিয়ে আসতে। এছাড়াও আমি দুই সেট যন্ত্রপাতি ও অ্যান্টি বায়োটিক নিয়ে এসেছিলাম।

বীনা : আপনি এই দুই সেট ইন্সট্রুমেন্ট গোটা ছয় মাস ব্যবহার করেছেন?
ডেভিস : হ্যা, বেশিরভাগ হাসপাতালের যন্ত্রপাতিই ধংস হয়ে গিয়েছিল, খুব বেশী কিছু ছিল না। আর ওষুধপত্র সব বরাদ্দ ছিল যুদ্ধাহত পুরুষদের জন্য।

বীনা : ব্যাপারটা কি নিরাপদ ছিল?
ডেভিস : হ্যা, যে সব রোগাক্রান্ত ছিল মেয়েগুলো তার তুলনায় নিরাপদ তো বটেই। বিশেষ করে অল্পবয়সীদের জন্য।

বীনা : তাহল আপনি একই সঙ্গে গর্ভপাত এবং দত্তকদানের সঙ্গে জড়িত ছিলন?
ডেভিস : হ্যা। তব দত্তক কর্মসূচীর কথা উঠল সেটা শুধু মাত্র আইএসএসক দিয়ে দেওয়াতেই ছিল সীমাবদ্ধ। যে কোনো শিশু এমনকি নবজাতকও- এক হিসাবে কম নয়। কারণ সংখ্যাটা ছিল বিশাল। যুদ্ধের সময় যে জায়গায় এসব মেয়েদের রাখা হতো তা নিশ্চয়ই বেশ বড়ই ছিল, কিন্তু আমি যখন ওখান গেছি সেসব ছিল পরিত্যক্ত।



বীনা : ঢাকা শহরের বাইরে যেসব জায়গায় গিয়ছিলেন তার কথা বলুন, সেখানকার সুবিধাদি কেমন ছিল?
ডেভিস : হাসপাতাল আর পুনর্বাসন সংস্থা... নাম মনে নেই সেটার। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা পুনর্বাসন কেন্দ্র বা সেরকম কিছু হব। বেশিরভাগ বড় শাখাগুলা ছিল তাদের অধীনে। আর আমি যাওয়ার আগে গর্ভপাতর সংখ্যা ছিল কম, কারণ কেউই সেটা করতে চাচ্ছিলো না। বেশিরভাগ চিকিৎসাকর্মীর মতই ব্যাপারটা ছিল অনৈতিক। যাহাক আমি স্বরাষ্ট্র সচিব রব চৌধুরীর একটা অথারাইজশন লেটার নিয়ে কাজ শুরু করে দিলাম। এতে লেখা ছিল আমি যাই করব তা হচ্ছে আইনগতভাবে বৈধ এবং তারা যেন আমাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেয়। চিঠিটা খুঁজে পাইনি আর।। আছে হয়তো কোথাও... বাংলাদেশের অনেক কাগজ পত্র... আমি যত্ন করে তুলে রেখেছিলাম কারণ বেচে থাকতে এমন কিছুর অভিজ্ঞতা কখনো হবে বলে মনে হয়নি আর। তাই রেখে দিয়েছিলাম। সে সময়টাতে ব্যাপারটা ছিল কঠিন, নারকীয় এক অভিজ্ঞতা।

বীনা : সব মেয়েই কী গর্ভপাত বা সন্তান দিয়ে দিতে রাজি ছিল? একজনও কি বাচ্চা রেখে দিতে চায়নি?
ডেভিস : সত্যি বলতে, কয়েকজন চেয়েছে

বীনা : তাদের কী হয়ছিল জানেন?
ডেভিস : আমার কোনো ধারণা নেই। আইএসএস ওখানে ছিল যতগুলা সম্ভব শিশু দত্তক নিতে। কারণ আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরাপে দত্তক শিশুর আকাল পড়ছিল, আর সে ঘাটতিটা তারা পূরণ করতে চাইছিল।

বীনা : ইন্টরন্যাশনাল সোশাল সার্ভিস?
ডেভিস : হ্যা, এটা ওয়াশিংটন ডিসি ভিত্তিক। দত্তকর ব্যাপার সংশ্লিষ্ট বিশাল এক সংগঠন।

বীনা : সেই মায়েদের কী হয়েছিল?
ডেভিস : গর্ভপাত কিংবা ডেলিভারির পর তারা কিছুকাল ক্লিনিকে থাকত। তারপর পুনর্বাসন কেন্দ্রের হেফাজতে যেতো। সেখানে তারা যতদিন ইচ্ছা থাকতে পারত। আর তারপর তাদের নানা ধরণের ট্রেনিং দেওয়া হতা। আমি কয়কজনকে দেখেছি। পুঁজি নিয়ে তারা কাপড় বানাচ্ছে। ঢাকা, দিনাজপুর, রংপুর, নোয়াখালিতে।

(শেষ কথা : ইন্টারভিউ শেষে বাংলাদেশে ফেরার ব্যাপারে বীনার সঙ্গে অনেক আলাপ করেছেন ডেভিস। তাদের আলোচনার একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল যুদ্ধাপরাধীদের সম্ভাব্য বিচার নিয়ে। জিওফ বীনার হাত শক্ত করে ধরে নিজের বুকে রাখলেন। চোখে জল নিয়ে জানালেন তার সামর্থ্যের পুরাটা দিয়েই তিনি বাংলাদেশকে ন্যায়বিচার পেতে সাহায্য করবেন।)
ক্যাটেগরি: যুদ্ধাপরাধ ও ট্রাইব্যুনাল, যুদ্ধাপরাধ, ইতিহাস, আমারব্লগ রিসার্চ, মানবতা, মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১
অমি রহমান পিয়াল-এর ব্লগ


প্রিয় থেকে বাতিল ২৮৯৬ বার পঠিত Twitter-এ প্রকাশ করুন
মন্তব্য


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৬:৫৩ তারিখে #দেবা ভাই# বলেছেন
মাত্র ২ সেকেন্ডের হেরফের!!

-----------------------------------------------------

আমি পথ চেয়ে আছি মুক্তির আশায়...
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৬:৫৭ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
বুঝলাম না
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বৃহঃ, ১৭/০৫/২০১২ - ০৮:১৭ তারিখে তালপাতার সেপাই বলেছেন
বড়ো শেয়ালের লেখা এ প্লাস সবসময়! কিন্তু এটা পড়ে মাথায় রক্ত চরে গেলো।
সাবাস! সোজা প্রিয়তে নিয়ে ফেবুতে দিলাম।

✪✪✪✪✪
লাফাই ঝাপাই,
আকাস বাতাস কাপাই
আমি তালপাতার সেপাই
বিদ্র : দেশ রাজাকার মুক্ত করতে না পারি, ঘৃণা করা ঠেকায় কে?
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৬:৫৮ তারিখে কর্নফুলির মাঝি বলেছেন
কাল প্রেজেন্টেশন কালকের জন্য তুলে রাখলাম।
===================================================================
যেখানে পাইবে ছাগু আর বাদাম

চলিবে নিশ্চিত উপর্যপরি গদাম...............
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৯:০২ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
ঠিকাছে, মূল লেখাটা লাগলে আলাদাভাবে দেওয়া যাবে। ওইটার ক্লিনিকাল ইমপোর্টেন্সও খুবই গুরুত্বপূর্ণ
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৩:৪২ তারিখে কর্নফুলির মাঝি বলেছেন
ঠিকাছে, মূল লেখাটা লাগলে আলাদাভাবে দেওয়া যাবে। ওইটার ক্লিনিকাল ইমপোর্টেন্সও খুবই গুরুত্বপূর্ণ

পড়তে সময় লাগালাম ঘন্টা খানেক। আবার পড়লাম। তারপর চেষ্টা করলাম বাংলাদেশের প্রকৃত মানুষের সংখ্যা কেমন চিন্তা করতে। খারাপ লাগলো হদিস করতে পারলাম না বলে।
তারপর সাকা চৌধুরীর উকিলের কথা মনে পড়লো । আরো হারিয়ে গেলাম।

ধন্যবাদ কমরেড। কষ্টটা আরো বাড়িয়ে দিলেন। ৭১-এর অন্তত ১৫-২০ বছর আগে জন্ম না নেওয়ার কষ্ট।


** পারলে আমাকে মূল লেখাটা ফেবু মেসেজে দিয়েন হার্ড কপি করে রাখতে চাই।
===================================================================
যেখানে পাইবে ছাগু আর বাদাম

চলিবে নিশ্চিত উপর্যপরি গদাম...............
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৬:২২ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
মূল লেখাটা এইখানে পাবা
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৭:০২ তারিখে কাঠ মোল্লা বলেছেন
আগে পড়া হয়নি এবার পড়লাম এবং প্রিয়তে নিলাম।
__
দুই ধরন ধরণীর অধিবাসীর--
যাদের বুদ্ধি আছে, নাই ধর্ম,
আর যাদের ধর্ম আছে, অভাব বুদ্ধির।
--একাদশ শতকের অন্ধ আরব কবি আবুল 'আলা আল-মা'আররি।
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৯:০২ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
ধন্যবাদ
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৭:০৫ তারিখে সনজু বলেছেন


প্রিয়তে নিলাম।চমতকার হয়েছে।।
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৯:০৩ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
ধন্যবাদ
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৭:৫৬ তারিখে পুরোকবি বলেছেন
সরাসরি প্রিয়তে।


এসব পড়লে রাগে, ক্ষোভে, দুঃখে ভেতরটা চুরমার হয়ে যায়। আলস্যে থিতিয়ে যাওয়া নিথর ধমনীগুলো বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৯:০৩ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
ধন্যবাদ
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৮:০০ তারিখে সাদা স্বপ্ন বলেছেন
এই দলিল গুলো সংরক্ষণ করতে হবে । পৌঁছে দিতে হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ।
--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
" যারা পাকিস্তানের সাথে রিকন্সিলিয়েশন এর ধুয়া তোলে , থুথু ছিটাই সেসব বেজন্মাদের মুখে "
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৯:০৩ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
ঠিক বলেছেন
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৮:১২ তারিখে অপরাজিতা বলেছেন
রেখে দিলাম যত্ন করে, আপনার বেশিরভাগ লেখার মতই।
aparajita
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৯:০৩ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
আপনাকেও ধন্যবাদ
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৮:২৩ তারিখে চলনামৃত বলেছেন
এইরকম একটা শিশু ধরা যাক বড় হয়ে তার মায়ের সামনে এলো বললো মা আমি খুজে বের করেছি তোমাকে। তারপর সেই মায়ের স্মৃতিতে কোন ছবিটা আসবে?
এটা নির্ভর করে সেই মায়ের অনুভূতি লেখনী বা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে কে প্রকাশ করছে। যদি মেহেরজানের পরিচালক বা দেয়ালের লেখক গোছের কেউ সে অনুভূতি প্রকাশ করতে যায়, তাহলে একরকম! আর নিরেট বাস্তবতায় অন্যরকম।
আপাততঃ ধন্যবাদ জানিয়ে প্রিয়তে রাখলাম, সময় নিয়ে পড়তে হবে।
_____________
কবে কোন প্রদোষকালে
এসেছিলে হেথা হে প্রাকৃতজন
এ বিলের জেলেদের জালে
পেয়েছিলে কবে সে রুপকাঞ্চন
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৯:০৪ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
ধন্যবাদ
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৮:২৪ তারিখে আমি বাঙ্গাল বলেছেন
একটু শান্তি পেতাম যদি পিয়াল ভাইয়ের এই লেখাটা শর্মিলা বসুর-----------------------------------
থাক পোস্টটার মর্জাদার কথা ভেবে আর কিছু বললাম না।
__________________________________
শোনহে অর্বাচিন, জীবন অর্থহীন.............
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৯:০৭ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
শর্মিলার জবাব আরো বড় বিস্তারে দেওয়া হইছে। সিসিফাসের ব্লগ দেখেন
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৮:৪৩ তারিখে মো: ফখরুল ইসলাম বলেছেন
সম্ভাবনার পথ বেয়ে উঠে যান সাফল্যের শিখরে।
|_-|_-|_-|_-|_-|_-|_-|_-|_-|_-|
সে আসে গৌরবান্বীত মহীমায়।
অপরাজেও মানবতার দাম্ভীকতায়।
ধ্বংসস্থুপের বেদীতে রক্তিম জবায়।
স্বাধীনতা আসে অবশেষে এ বাংলায়।
http://www.prothom-aloblog.com/posts/18/161016
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৯:০৭ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
ধন্যবাদ
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৮:৪৯ তারিখে বেলের কাঁটা.. বলেছেন
অমি পিয়ালের সন্ধানে আমুতে রেজিঃ করে ঘেটে ঘেটে আগেও পড়েছিলাম।
আজ শেয়ার দিলাম।

বস ,আগের প্রতিটি লেখা রিপোস্ট করেন কিংবা একটা ইবুক করে রাখা যায় কিনা ভেবে দেখবেন।
--------------------------------------------------------------------------
"লাল সবুজের বাংলাদেশ ছাগুদের জন্য না" - ডাক্তার আইজু
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৯:০৭ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
পরিকল্পনা আছে
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ২১:২৫ তারিখে দ্রোহের মন্ত্র \m/ বলেছেন
কিংবা একটা ইবুক করে রাখা যায় কিনা ভেবে দেখবেন।



সহমত। আমার তো ইচ্ছা হার্ডকভারের বই আকারে বের করা হোক। আমারপ্রকাশণীর ফান্ড না থাকলে ব্লগাররা চান্দা তুলবো
___________________
------------------------------
শ্লোগান আমার কন্ঠের গান, প্রতিবাদ মুখের বোল
বিদ্রোহ আজ ধমনীতে উষ্ণ রক্তের তান্ডব নৃত্য।।
দূর্জয় গেরিলার বাহুর প্রতাপে হবে অস্থির চঞ্চল প্রলয়
একজন সূর্যসেনের রক্তস্রোতে হবে সহস্র নবীন সূর্যোদয়।।
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০০:৪৯ তারিখে বেলের কাঁটা.. বলেছেন
আমারপ্রকাশণীর ফান্ড না থাকলে ব্লগাররা চান্দা তুলবো


উদ্যোগটা নাও
--------------------------------------------------------------------------
"লাল সবুজের বাংলাদেশ ছাগুদের জন্য না" - ডাক্তার আইজু
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৯:১১ তারিখে প্রীতম বলেছেন
সাক্ষাতকারটা আগেই পড়েছি,সামুর পোস্টে।সম্ভবত ডেইলি স্টারে দেখেছিলাম ইংরেজিটা।লগবুকটা অসাধারণ।কোন একদিন হয়তো আমরা পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদেরকে বিচারের সামনে আনতে পারবো,সেইদিন এইরকম কয়েকটি ডকুমেন্টই ওদের ঝুলিয়ে দিতে যথেষ্ট হবে।ড. ডেভিসের জন্য নতজানু শ্রদ্ধা।

গণহত্যার সবচেয়ে অমানবিক,সবচেয়ে নৃশংস,সবচেয়ে নিষ্ঠুর অংশ সম্ভবত ধর্ষণ।একজন নারীকে ধর্ষণ করতে গিয়ে কত ধরণের মনস্তত্ব কাজ করে সেটা চিন্তা করলে শিউরে উঠতে হয়।

১৯৭১ সালে বলা হয় সংখ্যাটা ছিল সাড়ে সাত কোটি (এটা নয় কোটি হওয়াও খুবই সম্ভব)। এর থেকে এক কোটি লোক বাদ দিন, যারা পাশের দেশ ভারতে আশ্রয় নিয়েছে কিংবা শহর বা নগর বা ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য কোথাও আশ্রয়ের খোজে গেছে। বাকি থাকে সাড়ে ৬ কোটি। এদের মধ্যে ধরি দশ লাখ তরুণী-যুবতী, যারা সন্তান জন্মদানে সক্ষম। এদের এক তৃতীয়াংশ যদি ধর্ষিতা হন তাতেও সংখ্যাটা দাঁড়ায় ৩ লাখ। ৩% বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই দেশে নিশ্চিতভাবেই ধরে নেওয়া যায় এদের অর্ধেক গর্ভধারণ করেছেন। ধর্ষনের কারণের এদের একজনও যদি গর্ভধারণ না করে (যেটা অবাস্তব), তারপরও দেড় লাখ নারী রয়ে যান যারা গর্ভবতী

এই কথাগুলি টেপ করে শর্মিলা আর সাইকিয়ার কানের পাশে প্রতিদিন কমপক্ষে বারো ঘন্টা করে শোনানো প্রয়োজন।

একাত্তরের ধর্ষিতারা হাজার রকম প্রেজুডিসের শিকার ছিলেন,সেটা জানতাম।গর্ভপাতের বৈধতা সংক্রান্ত বিভ্রান্তিগুলো দেখে নতুনভাবে উপলব্ধি করলাম বিষয়টা।

চন্দ্র মন্ডল সম্ভবত পালাচ্ছিলেন না,সাধারণ ক্ষমার কথা শুনে ফিরে আসছিলেন,বাড়ির কাছে আসতেই ঘটনাটা ঘটে।

আপনারে আর ধন্যবাদ কী দিমু ! তার চেয়ে একটা আবদার রাইখা যাই।৭২ সালে বিচিত্রা ( সম্ভবত ) পত্রিকায় প্রকাশিত ড. ডেভিসের সাক্ষাতকারটা চাই আপনার কাছে।
*****************************
আমার কিছু গল্প ছিল।
বুকের পাঁজর খাঁমচে ধরে আটকে থাকা শ্বাসের মত গল্পগুলো
বলার ছিল।
সময় হবে?
এক চিমটি সূর্য মাখা একটা দু'টো বিকেল হবে?
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৯:১৪ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
ধন্যবাদ প্রীতম, জোগাড় করতে পারলে নিশ্চয়ই দিবো
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৯:৩১ তারিখে বাউল বলেছেন
সময় নিয়ে পড়তে হবে।
----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
ন্যায় আর অন্যায়ের মাঝখানে নিরপেক্ষ অবস্থান মানে অন্যায়কে সমর্থন করা। -মতিয়া চৌধুরী
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ২০:৩৫ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
তাতো বটেই
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ১৯:৪২ তারিখে জটিল বাক্য বলেছেন
একটি যুদ্ধ শিশু এবং একজন বীরাঙ্গনা মায়ের কাহিনী নিয়ে শিরীন মজিদের একটি উপন্যাস পড়েছিলাম ১২ বছর বয়সে। হাউ মাউ করে কেঁদেছিলাম। ২০ বছর পর এই লেখা পড়ে কিছুতেই লুকাতে পারছি না চোখের জল।


-----------------------------------------------------------------------------------------
আমি আমার ভেতরে প্রতিনিয়ত বংশবৃদ্ধি করছি
যেমনটি করে থাকে অকোষী জীব হাইড্রা ।
বিলুপ্ততা ঠেকানোর কিংবা টিকে থাকার লক্ষ্যে নয়
নশ্বরতা আবিস্কারের লক্ষ্যে।
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ২০:৩৬ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
বইটা পড়া হয়নি
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ২০:১৯ তারিখে বিপ্লব রহমান বলেছেন


ছবি: ধর্ষিত নারী, ত্রিপুরার শরণার্থী শিবির, ১৯৭১, কিশোর পারেখ।


ডক্টর ডেভিসকে বিনম্র শ্রদ্ধা।
অনেক ধন্যবাদ অরপি।
ই-বুক :: রিপোর্টারের ডায়েরি: পাহাড়ের পথে পথে
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ২০:৩৬ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
ধন্যবাদ। এটা ত্রিপুরা শরণার্থী শিবির না, ঢাকাই সম্ভবত। কিশোর পারেখের মূল বইটা আপলোড করা আছে
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


রবিবার, ০৪/১১/২০১২ - ২১:১৭ তারিখে বিপ্লব রহমান বলেছেন
অনেক দেরীতে বলছি পিয়াল ভাই, আপনার তথ্যটি নোট করে রাখলাম। অন্য আরেকটি লেখায় এই লেখাটি রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছি। এই সুযোগে লেখাটি আরেক বার পড়লাম। আমার মনে হয়, আসলে মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষিতা নারীদের 'বীরাঙ্গনা'র তকমা দেওয়াটি ছিলো মারাত্নক ভুল; তাদের সে সময় 'মুক্তিযোদ্ধা' হিসেবে পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় সন্মান জানালে তা হতো সঠিক পদক্ষেপ।

না, কেউই ব্যাপারটা নিয়ে মুখ খলতে চায়নি। প্রশ্ন করলে একটা উত্তরই মিলত। বেশিরভাগ সময়ই তা ছিল তাদের মনে নেই। আর পুরুষরাও এ ব্যাপারে একদমই কথা বলতে চাইত না! কারণ তাদের চোখে এসব মেয়ে ভ্রষ্টা হয়ে গেছে। আর বাংলাদেশে এমনিতেও মেয়েদের অবস্থান সামাজিক পর্যায়ে অনেক নিচে। ভ্রষ্টা হয়ে যাওয়া মানে তাদের এমনিতেই আর কোনো মর্যাদা রইল না। তাদের মরে যাওয়াই ভালো। আর পুরুষরা তাদের মেরেও ফেলত। বিশ্বাস হচ্ছিল না। এটা পশ্চিমা সমাজের একদমই বিপরীত! একদমই উল্টো!

ডা. ডেভিসের এই কথাটি যখন পড়ছিলাম, তখন চোখের পাতা কেঁপে উঠলো!
ই-বুক :: রিপোর্টারের ডায়েরি: পাহাড়ের পথে পথে
সম্পাদনা করুন জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ২০:৫০ তারিখে উদাসী পথিক বলেছেন
অফিস থাকতে পোস্টটি দেখেছিলাম কিন্তু সেখানে বসে এই লেখা পড়া যুতসই লাগেনি।
বাসায় ঢুকেই মাত্র ভাতের প্লেট সামনে নিয়ে পড়তে বসলাম।
পড়া শেষ হলো। খাবার তেমনি পরে রইলো।

প্রিয়তে এবং শেয়ার্ড।


*************************************************************************************
আমি অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না;
আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছুবার সময় আছে,
পৌঁছে অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করবার অবসর আছে।
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০১:০২ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা। আসলে ছয় বছর আগে জোশই অন্যরকম ছিলো হয়তো
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ২২:১৯ তারিখে নির্ঝর বড়ুয়া বলেছেন
প্রিয়তে নিলাম, বাসায় গিয়ে পুরটা পড়ব। যতটুক পরেছি, স্যালুট বস।
........................................................
'একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই ভাবি।
একজন বাঙালি হিসেবে জা কিছু বাঙালিদের শঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়..' -- বঙ্গবন্ধু শেখ মূজিব।
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০১:০৩ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
থ্যাংকস নির্ঝর
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ২২:৫০ তারিখে সিরাজুল লিটন বলেছেন
পড়া শেষ করলাম। তথ্যবহুল কষ্টসাধ্য লেখা।শেয়ার দিলাম।
ডক্টর ডেভিসকে বিনম্র শ্রদ্ধা।
.
.
__________________
অপণা মাংশেঁ হরিণা বৈরী।
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০১:০৩ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
ধন্যবাদ লিটন
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ২৩:১০ তারিখে শর্মা-ই-আযম বলেছেন
এমন একটি দলিল দিয়ে ঋণী করে ফেললেন। পড়তে পড়তে মাথাটা গরম হয়ে গেছে।

উফ! ভয়াবহ!!!!!
-----
তেল নেই সলতে পুড়ছে
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০১:০৩ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
এসব আমারও ঋণশোধ
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ২৩:১২ তারিখে অনিমেষ রহমান বলেছেন
পড়লাম আর কয়েকজনকে লিঙ্কটা মেইল করলাম।
ধন্যবাদ!!
_____________________

ক্ষুদ্র স্বার্থ ভুলে মুক্তির দাঁড় টান।
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০১:০৪ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
অনেক ধন্যবাদ আপনাকেও
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


মঙ্গলবার, ১৫/০৫/২০১২ - ২৩:৩২ তারিখে জামাতহেটার(M.R.9) বলেছেন

....................................................................................


আমরা ছুডলোক, গালিবাজ। জামাত শিবির ছাগুর বিরুদ্ধে গালাগালি করেই যাব, প্রতিরোধ করেই যাব। সুশীলতার মায়েরে বাপ। আমরা ছাগু ও সুশীলদের উত্তমরূপে গদাম দিয়ে থাকি
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০১:০৪ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
ধন্যবাদ
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০০:০৬ তারিখে পঁচিশে বৈশাখ বলেছেন

কি বলবো ভাষাই খুঁজে পাচ্ছিনা, বাকরুদ্ধ।
..............................................................

সেদিন উতলা প্রাণে, হৃদয় মগন গানে,
কবি এক জাগে_
কত কথা পুষ্পপ্রায় বিকশি তুলিতে চায়
কত অনুরাগে
একদিন শতবর্ষ আগে।।
আজি হতে শতবর্ষ পরে
এখন করিছে গান সে কোন্ নূতন কবি
তোমাদের ঘরে!
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০১:২৯ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
কিছু বলার চেয়ে ধারণ করাটাই বেশী জরুরী
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০৩:৩৩ তারিখে পঁচিশে বৈশাখ বলেছেন
ধন্যবাদ, আমি চেষ্টা করবো।
..............................................................

সেদিন উতলা প্রাণে, হৃদয় মগন গানে,
কবি এক জাগে_
কত কথা পুষ্পপ্রায় বিকশি তুলিতে চায়
কত অনুরাগে
একদিন শতবর্ষ আগে।।
আজি হতে শতবর্ষ পরে
এখন করিছে গান সে কোন্ নূতন কবি
তোমাদের ঘরে!
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০০:৩৬ তারিখে আব্দুল্লাহ্ আল শা... বলেছেন
ভাল লাগলো ।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।জানছি জানাবো সবাইকে।
A.A.S.Billah
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০১:২৯ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
ধন্যবাদ
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০০:৪৫ তারিখে মাসুম আল মামুন বলেছেন
খুব ভাল লাগলো। বুঝতে পারলাম আমরা একেবারেই অন্ধকারে আছি। ধন্যবাদ পিয়াল ভাই।
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০১:২৯ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
অনুভূতিটা নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০০:৪৮ তারিখে কারিমাট বলেছেন
প্রিয়তে
''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""

কষ্ট পোড়াতে চাই বলে অশ্রু খুঁজি........
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০১:৩০ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
ধন্যবাদ
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০১:০২ তারিখে ভেলাস্কেথ বলেছেন
এই ব্লগে পরা আমার প্রথম পোস্ট। প্রথম কমেন্টও এইটাই। অসাধারণ। আমি বাকরুদ্ধ। অমি রহমান পিয়ালের নাম অনেক শুনেছি উনার লেখার কথাও শুনেছি। এই প্রথম পরলাম। আপনাকে হাজার সালাম।
===================

ছবি যেন শুধু ছবি নয়
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০১:৩০ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
মন্তব্যে খুশী হলাম, তবে আমার সম্পর্কে লোকে ভালো কথা কমই শোনে, কারণ অনলাইনে এখনও ছাগুদের সংখ্যাটাই আশঙ্কাজনক হারে বেশী
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০১:৫৩ তারিখে শনিবারের চিঠি বলেছেন
লেখাটা নিয়ে কিচ্ছু বলার নাই। আমি তো চেনা বামুন, পৈতা বলে লাগে না, খামোখা পৈতা দেখায়ে লাভ কি।

তবে আপনি অমি রহমান পিয়াল ভাই না হইয়্যা অ্যামি রহমান পিয়া আপু হইলে খোদার কসম আপনার বাসার সামনে অনশন ধর্মঘট করতাম- বিয়া না করা পর্যন্ত।
..................................................................

বারান্দা জুড়ে হাসি অচেনা চোখের জল
বিকেলের শরীর ছুঁয়ে আমার কবিতা চঞ্চল
.. .. .. .. ..
শুধু কবিতাটুকু সত্যি আর সব মিথ্যে নামে আসে
ওই আকাশটাকে দেখো- সে কবিতাই ভালোবাসে
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৫:৫৪ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
শুরুতে লেখা দ্বিতীয় প্যারাটা তোর ওই লেখাটার প্রতিক্রিয়া মন্তব্য ছিলো যা তুই ড্রাফট করছোস। আর তুই একা না ফেসবুকে এমন ভাবনায় ভাবিত হইয়া আরো কিছু লেখা পড়লাম। তাই মেজাজ খারাপ হইছিলো
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০২:৫৫ তারিখে পাপলু বাঙ্গালী বলেছেন
সরাসরি প্রিয়তে নিলাম। আরও ভালভাবে পড়তে হবে।
অনেক ধন্যবাদ অমি দা।
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৮:২৮ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
ধন্যবাদ
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০৩:২৪ তারিখে টোনাটুনির সংসার বলেছেন
বস, লেখাটা পড়ে এই রাত জাগা সময় এবং নিজেরে ধন্য মনে করতেসি।
---------------------------------------------------------------------------------
'মুক্তিযোদ্ধা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান, দেশ ও জনগণের অতন্দ্রপ্রহরী ১৯৭১ সালের বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোসলেম উদ্দিন...।'
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৫:৫৫ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
ধন্যবাদ
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০৫:০৪ তারিখে (সিসিফাস) বলেছেন
আপনার এই পোস্ট পড়া হয়নাই, এখন পড়লাম।

কিছু শুয়োড়ের পাল সুশীল আছে যারা এইসব সত্য জানার পর তেনা পেচায়, ইদানীং হতাশ হয়ে গেছি ভাই; সব শালারা ন্যাঞ্জাধারী মাতারী।


অঃটঃ-এ কিছু কথাঃ

আমারব্লগের প্রথম পাতায় এধরণের দামী পোস্টগুলো কোন ভাবে মাঝে মাঝে হাইলাইট করা যায়? এইসব পোস্ট কখনও পুরানো হয় না, নিয়মিত বিরতিতে সবার সামনে আনা উচিত। কারণ, ছাগুদের জন্ম প্রতিনয়ত হয়, ইঁদুরের চেয়ে দ্রুত গতিতে।

"আমারব্লগ রিসার্স" ট্যাবের পাশাপাশি, মাঝে মাঝে এই লেখাগুলোকে কোন না কোন ভাবে প্রথম পাতায় আনা উচিত। বছরের প্রতিদিনই কোন না কোন পোস্ট এরকম প্রথম পাতায় আসুক। কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেছি।
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৫:০০ তারিখে শনিবারের চিঠি বলেছেন
সিসিফাস

কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেছি।


করছেন একটা কাম; কর্তৃপক্ষ তো আন্ধা, এদের দৃষ্টি আকর্ষণে কোনো ফায়দা হবে না। এখনও প্রতিষ্ঠাকাল ১৪ এপ্রিল বদলাইয়্যা পহেলা বৈশাখ দিতে পারে নাই। আমার ব্লগ কর্তৃপক্ষ যেই হারে গর্জায় তার জিরো পয়েন্ট টু ফাইভ পারসেন্টও যদি বর্ষাইতো তাইলে আজকে অনেক কিছুর কাহিনীই অন্য রকম হইতে পারতো।
..................................................................

বারান্দা জুড়ে হাসি অচেনা চোখের জল
বিকেলের শরীর ছুঁয়ে আমার কবিতা চঞ্চল
.. .. .. .. ..
শুধু কবিতাটুকু সত্যি আর সব মিথ্যে নামে আসে
ওই আকাশটাকে দেখো- সে কবিতাই ভালোবাসে
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৫:৫৫ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
ধন্যবাদ, ব্যাপারটা মাথায় থাকলো
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০৯:৩৭ তারিখে রীতু বলেছেন
পিয়াল ভাই, আগে না পড়ে শেয়ার করেছিলাম সময়ের অভাবে। এখন পড়লাম। নিজে মেয়ে এবং মা বলেই কিনা জানিনা আমি আমি শিউড়ে উঠছি বারবার! মনে আছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনে মার কাছে অনেকসময় আক্ষেপ করতাম, কেন যুদ্ধের সময় বড়ো ছিলাম না। মা আতংকিত স্বরে বলতেন তাঁর চৌদ্দপুরুষের ভাগ্যে। আজ বুঝি! আমার মাও নিতান্ত অল্পবয়সী ছিলেন তখন। বাবা, দাদু, কাকুরা মা, কাকি আর পিসিকে নিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন প্রত্যন্ত অঞ্চলে পুরোটা সময়। মায়ের আতংকের কথা মনে পড়ল।।।।।

ঘৃনা প্যকাশের যথার্থ ভাষা নেই। পাকিদের ঘৃনা করি, কিন্তু আজো যারা এদের সাপোর্ট করছে তাদের কি করা উচিৎ!!!! আরো কতদিন আমরা বইবো এ লজ্জার ভার। কবে হবে আমাদের এ দায়মুক্তি!!!!
--

রীতু
"আমার মুক্তি আলোয় আলোয়, এই আকাশে। আমার মুক্তি ধুলায় ধুলায়, ঘাসে ঘাসে.."
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৫:৫৬ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
সেটাই এই অন্যায়ের প্রতি আক্রোশ ও ঘৃণাবোধের ওপর ভালোবাসার মলম লাগানোর ষড়যন্ত্র চলছে, রিকনসিলিয়েশন।
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ০৯:৪৪ তারিখে শেখের পো বলেছেন
বিচার করাটাই এখন মূল ব্যাপার। যতদিন এই অপরাধের বিচার না হবে, ততদিন গ্লানি আরো চেপে বসবে।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
ন্যায়ের কথা বলতে আমায় কহ যে
যায় না বলা এমন কথা সহজে
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৮:২৮ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
রাইট
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১০:০১ তারিখে আদিল মাহমুদ বলেছেন
ডক্টর ডেভিসের কথা হালকার ওপর একটা লেখায় লিখছিলাম। ভদ্রলোক কিছুদিন আগে মনে হয় মারা গেছেন।

'৭১ সালের পাহ ধর্ষন কোন সাধারন যুদ্ধকালীন বিচ্ছিন্ন বা বিশৃংখল কিছু সৈনিকের কাজ ছিল না। এসব কাগজে কলমে প্ল্যান্ড না হলেও অন্তত পাকিস্তানী মাইণ্ড সেটের দীর্ঘদিনের পুষে রাখা জাতিগত বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ ছিল যার জন্য এসবে শীর্ষ জেনারেল থেকে সিপাহী সবারই পূর্ন সায় ছিল। হিন্দু ঘেষা বাংগালীকে সাচ্চা মুসলমান বানানোর এই মোক্ষম সুযোগ তারা হাতছাড়া করতে চায়নি।

এ সম্পর্কে ডেভিসের সাথে ধৃত পাক সেনাদের বক্তব্যেঃ

‘What are they going on about? What were we supposed to have done? It was a war!” Dr. Davies also adds, “They had orders of a kind or instruction from Tikka Khan to the effect that a good Muslim will fight anybody except his father. So what they had to do was to impregnate as many Bengali women as they could. That was the theory behind it
http://www.amarblog.com/adilmahmood/posts/143042

সে সময় মাদার তেরেসা এবং তাদের আশ্রমও নির্যাতিতা নারীদের জন্য কিছু কাজ করেছিল। যথারীতি আমাদের আলেম সমাজ মুক্তিযুদ্ধে কৃতিত্বপূর্ন ভূমিকা রাখার পর এ ক্ষেত্রেও বিশেষ ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেন। তখন যুদ্ধ শিশুদের কাফের নাছারাদের দেশে দত্তক নিয়ে যাবার ব্যাপারে তারা আপত্তি তুলেছিলেন, কারন শিশুরা তো বড় হয়ে বিধর্মী হয়ে যাবে, মুসলমান থেকে ধর্মান্বরিত হয়ে যাবার মত বড় পাপ আর কি হতে পারে।
------------------------------------------------
স্বাধীনতার ৪০ বছর পরেও কি স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধাচারণ করার কেউ আছে?..আমার তো মনে হয় না কোন পাগল ছাড়া কেউ এখন স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধাচারণ করতে পারে! - ফারুক ভাই
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৫:৫৯ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
অনেক ধন্যবাদ আদিল ভাই। বাংলাদেশের প্রথম যুদ্ধ শিশু জয়। এটা আমার শুরুর দিকের কাজ, মৌলিক কাজ, এর আগে তারে নিয়া কেউই লেখে নাই। জয় কিন্তু কোনো বীরাঙ্গনার সন্তান না, শেলিঙয়ে এতিম। খুব ইচ্ছা ছিলো এর খোজটা বের করার। ব্যর্থ হইছি। মাদার তেরেসার ওপর নিউইয়র্ক টাইমসে চমৎকার একটা রিপোর্ট আছে, আমিও একটা লিখছিলাম
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৭:২৫ তারিখে আদিল মাহমুদ বলেছেন
আপনাকেও ধন্যবাদ, বদর ভাই।

জয় এর লেখা আগে পড়ছিলাম। মাদার টেরেসার লেখাটা পড়ি নাই আগে।

যুদ্ধের পর পর জন্ম নেওয়াদের গনহারে জয়, মুক্তি নাম রাখার প্রবনতা ছিল। আমার নামও প্রথম কিছুদিন জয় ছিল।
------------------------------------------------
স্বাধীনতার ৪০ বছর পরেও কি স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধাচারণ করার কেউ আছে?..আমার তো মনে হয় না কোন পাগল ছাড়া কেউ এখন স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধাচারণ করতে পারে! - ফারুক ভাই
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৮:৪২ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
বদর ভাই কেডা!
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৮:৪৯ তারিখে আদিল মাহমুদ বলেছেন

------------------------------------------------
স্বাধীনতার ৪০ বছর পরেও কি স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধাচারণ করার কেউ আছে?..আমার তো মনে হয় না কোন পাগল ছাড়া কেউ এখন স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধাচারণ করতে পারে! - ফারুক ভাই
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৭:৩৫ তারিখে আদিল মাহমুদ বলেছেন
মাদার টেরেসার লেখাটা পড়লাম।

বিস্ময়কর (আসলে বিস্ময়ের তেমন কিছু নাই) ব্যাপার হল যে '৯৭ সালে মাদার টেরেসা যখন মারা যান তখন তার এসব ভূমিকা আমাদের পত্রপত্রিকায় এসেছিল বলে মনে পড়ে না। জাতি তখন সুন্দরী প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যু নিয়ে গভীরভাবে শোকাহত। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ডায়ানা ফ্যান ক্লাবও গজিয়ে উঠছিল তখন।
------------------------------------------------
স্বাধীনতার ৪০ বছর পরেও কি স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধাচারণ করার কেউ আছে?..আমার তো মনে হয় না কোন পাগল ছাড়া কেউ এখন স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধাচারণ করতে পারে! - ফারুক ভাই
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৮:১২ তারিখে #দেবা ভাই# বলেছেন
আমি ডায়ানাকে ভালা পাই।

-----------------------------------------------------

আমি পথ চেয়ে আছি মুক্তির আশায়...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ২০:২৪ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
এইটা পড়েন তাইলে আদিল ভাই, ডিটেলে
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১১:০৫ তারিখে মাসুদ খান বলেছেন
অনেক অনেক ধন্যবাদ পিয়াল ভাই । অনেক কিছুই জানতে পারলাম ।

" মুক্তি এখনো আসে নি, বিপ্লব অপেক্ষমাণ "
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১২:৩৬ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
আপনাকেও ধন্যবাদ
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৩:৫১ তারিখে বিভা বলেছেন
দুই দিন ধরে পড়ছি তো পড়ছি। প্রিয়তে আছে আবার পড়ব।
""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""
স্বেচ্ছায় নেওয়া দুঃখকে ঐশ্বর্যের মতই ভোগ করা যায় ........................
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৪:১২ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
ধন্যবাদ
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৬:১০ তারিখে মাটির মানুষ বলেছেন
অসাধারণ লেখা। প্রিয়তে নিলাম
------------------------------------------------
পূজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল মূর্খরা সব শোন
মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোন
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৮:২৯ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
আপনাকেও ধন্যবাদ
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৬:৪৪ তারিখে নিমোডস্ বলেছেন
সত্যি খুব দুঃখ হয়, আর প্রচন্ড রাগ লাগে। আমরা জাতি হিসাবে কি সব ভুলে যাবো?
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৮:২৯ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
না, সে সুযোগ আপনাদের দেবো না
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৮:১২ তারিখে #দেবা ভাই# বলেছেন
পড়লাম।


-----------------------------------------------------

আমি পথ চেয়ে আছি মুক্তির আশায়...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৮:১৫ তারিখে কর্নফুলির মাঝি বলেছেন
লেট লতিফ।
===================================================================
যেখানে পাইবে ছাগু আর বাদাম

চলিবে নিশ্চিত উপর্যপরি গদাম...............
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৮:৩৩ তারিখে #দেবা ভাই# বলেছেন
সবচেয়ে প্রথম কমেন্টটা যে আমার সেটা কি দেখেছেন??

-----------------------------------------------------

আমি পথ চেয়ে আছি মুক্তির আশায়...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৮:৩০ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
ধন্য হইলাম
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ১৮:৩৪ তারিখে #দেবা ভাই# বলেছেন


-----------------------------------------------------

আমি পথ চেয়ে আছি মুক্তির আশায়...
জবাব দিন


বুধবার, ১৬/০৫/২০১২ - ২০:০২ তারিখে জিনিয়াস বলেছেন
পিসি খারাপ থাকার কারণে হয়তো দেরী হল পড়তে। পড়লাম। জানলাম জানা ব্যাপার গুলোকে নতুন ভাবে। শুভেচ্ছা থাকলো।
--------------------------------------------------------
সোনালী স্বপ্ন বুনেছি
পথ দিয়েছি আধারী রাত ........
জবাব দিন


বৃহঃ, ১৭/০৫/২০১২ - ২১:২৫ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
ধন্যবাদ
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


বৃহঃ, ১৭/০৫/২০১২ - ০৩:২২ তারিখে মুক্তিযোদ্ধা৭১ বলেছেন
লেখাটা পড়তে কার কতটা সময় লেগেছে তা আমার জানার কথা না, তবে আমার লাগলো সম্ভবত ৩-৪ ঘন্টা। কোনো কোনো লাইন বা প্যারা একধিকবার। সবগুলো মন্বতব্যও চোখ বুলাই। গোটা লেখাটা পড়তে পড়তে সেই '৭১-৭২ সালের দিনগুলোতে ফিরে যাই, আর আমার চারপাশের ঘটে যাওয়া সেইসব নারকীয় ঘটনার স্মুতিগুলো হাতড়াই।
জবাব দিন


বৃহঃ, ১৭/০৫/২০১২ - ২১:২৫ তারিখে অমি রহমান পিয়াল বলেছেন
অনেক ধন্যবাদ
...................................................................................

অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি...
জবাব দিন


শনিবার, ১৯/০৫/২০১২ - ০২:৩৫ তারিখে তানবীরা বলেছেন
যুদ্ধের পর বিদেশে দত্তক দেয়া কিছু যুদ্ধ শিশুর সাথে আমার যোগাযোগ আছে। তারা জানেন কেনো তাদের মাতৃভূমিতে জায়গা হয়নি, কেনো তারা আজ এখানে। তারা প্রায়ই বাংলাদেশে বেড়াতে যান। পাকিস্তানকে ঘৃনা করেন আর বাংলাদেশকে ভালোবাসেন। আমরা বাংলাদেশে বড় হওয়া মানুষেরা বিদেশে কামলা দিয়ে খেলেও তারা ঈর্ষনীয় সব পদে এবং সামাজিক অবস্থানে আছেন এখানে। সরকার তাদের সাথে যোগাযোগ করলে, ইস্রায়েলের মতো আমাদেরও বিশ্বে একটা পজিশন তৈরী হতো বলে আমার ধারনা। এ দিকটা কেন কেউ ভেবে দেখছেন না কে জানে?
__________
http://www.amarblog.com/omipial/posts/147588


Name:  বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:14 Dec 2012 -- 08:35 PM

** দুঃখিত। ভুলবশতঃ ওপরের ব্লগনোটের মন্তব্যগুলোও হুবহু চলে এসেছে। অবশ্য কয়েকটি মন্তব্য বেশ চোখা। -:)


Name:   বিপ্লব রহমান           

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:14 Dec 2012 -- 08:36 PM

তোমাদের যা বলার ছিলো, বলেছে কী তা বাংলাদেশ?
লিখেছেন: বিপ্লব রহমান
তারিখ: ৩০ অগ্রহায়ন ১৪১৯ (ডিসেম্বর ১৪, ২০১২)
____________________________________________

এক। প্রজন্ম ‘৭১ এর সাইদুর রহমানের সঙ্গে আমার পরিচয় সাংবাদিকতার শুরুতে সেই ১৯৯২ – ৯৩ সালের দিকে। তখনও রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে বর্তমান শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি সৌধটি গড়ে ওঠেনি। তবে সে সময় প্রজন্ম ‘৭১ নিজ উদ্যোগে একটি ছোট্ট স্মৃতিসৌধ গড়ে সেখানেই প্রতিবছর ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে আসছিলো। সরকারের কাছে এ নিয়ে তারা অনেক ধর্ণা দিয়েও সরকার পক্ষকে উদ্যোগি করতে পারেননি।

সে সময় ‘সাপ্তাহিক খবরের কাগজ’ এ অরক্ষিত রায়ের বাজার বধ্যভূমির ওপর একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করার জন্য আমি শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারগুলোর সঙ্গে একে একে দেখা করে সাক্ষাৎকার নিতে শুরু করি।

দুই। সে সময় সাইদুর রহমানের সঙ্গে আমার কথা হয় তার কর্মস্থল মতিঝিলের একটি ব্যাংকের সদর দপ্তরে। তিনি বলছিলেন ‘৭১ সালের কথা।

তখন তিনি পাঁচ-ছয় বছরের শিশু। সৈয়দপুরে যৌথ পরিবারের আদরে আনন্দময় শৈশব জীবন কাটছে তার। ‘৭১ এর উত্থাল দিনগুলোতে বিহারী রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি হিসেবে চিহ্নিত তাদের বাড়ি আক্রমণ করে বসে।

বাড়ির বড়রা শিশু সাইদুর আর তার পিঠেপিঠি দুই বোনকে একটি বড়ো ঘরে খাটের নীচে হাঁড়িকুড়ির পেছনে লুকিয়ে রাখেন।

তারপরেই ঘটে যায় তার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি!

রাজাকাররা ওই ঘরে সাইদুরের মা-বাবা, অন্যান্য ভাই-বোন, আত্নীয় – স্বজন সবাইকে ধরে এনে কসাইয়ের মতো জান্তব উল্লাসে রাম দা দিয়ে একে একে কুপিয়ে হত্যা করে!

আর এ সবই ঘটে যায় শিশুটির চোখের সামনে। জীবনের ভয়ে ছোট্ট সাইদুর টুঁ শব্দটি করার সাহসও পায়নি।

তিন। এর পর বহুবছর ওই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি তাকে তাড়া করে ফেরে। বেশ কিছুদিন শিশুটি মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগেছে। এখনো স্বজনের আর্তনাদ তাকে আর ১০টা মানুষের মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে দেয় না।…

ব্যাংকার সাইদুর রহমান যখন তাঁর এই দুঃসহ স্মৃতিকথা আমাকে বলছিলেন, তখন বার বার গভীর বেদনায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলো তার মুখ, ভেঙেচুরে যাচ্ছিলো তার কন্ঠস্বর!

কথা বলতে বলতে তিনি বলপয়েন্ট দিয়ে নিউজপ্রিন্টের একটি প্যাডের পাতায় কাটাকুটি করে কি যেনো একটি কথা বারবার লিখছিলেন।

সাক্ষাৎকার শেষে তার অনুমতি নিয়ে আমি নিউজপ্রিন্টের ওই কাগজটি চেয়ে নেই। বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করি, অনেক কাটাকুটির ভেতর ঝকঝকে হরফে তিনি একটি কথাই বারবার লিখেছেন:

তোমাদের যা বলার ছিলো, বলেছে কী তা বাংলাদেশ?
তোমাদের যা বলার ছিলো, বলেছে কী তা বাংলাদেশ?
তোমাদের যা বলার ছিলো, বলেছে কী তা বাংলাদেশ?

শেষ পর্যন্ত খবরের কাগজের ওই প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের ভেতর স্ক্যান করে সাইদুর রহমানের হাতে লেখা নিউজপ্রিন্টের টুকরো অংশটিও তুলে দেওয়া হয়। লেখাটির শিরোনামও দেই:

তোমাদের যা বলার ছিলো, বলেছে কী তা বাংলাদেশ?

প্রতিবেদনটিতে সরকারি উদ্যোগে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে একটি স্মৃতিসৌধ গড়ার জন্য শহীদ পরিবারগুলোর আকুতি তুলে ধরা হয়। পরে প্রজন্ম ‘৭১ এই লেখার শিরোনাম নিয়ে একটি পোস্টারও প্রকাশ করে।

চার। এরপর বিএনপি সরকার বদ্ধভূমিতে স্মৃতিসৌধ স্থাপনের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করলেও এর নথি আর উর্ধ্ব দিকে ধাবিত হয় না। সাইদুর রহমানসহ প্রজন্ম ‘৭১ এর সদস্যরা সরকারি উচ্চ মহলে দৌড়-ঝাঁপ শুরু করেন। তবু কিছুতেই কিছু হয় না। একটি একটি করে বছর গড়ায়।

প্রজন্ম ‘৭১ এর নিজেদের গড়া ছোট্ট স্মৃতি সৌধটি প্রতি বছর ভেঙে পড়ে। প্রতি বছর পিলার আকৃতির ওই সৌধটি ১৪ ডিসেম্বরের আগে আবার গড়া হয়। আবারও দিন যায়।

শেষে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে স্মৃতি সৌধর সরকারি প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখে। তৈরি হয় বর্তমান সৌধটি।

পাঁচ। সাপ্তাহিক খবরের কাগজের ওই প্রচ্ছদ প্রতিবেদন লেখার পর বহুবছর সাইদুর রহমানের সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই।…

২০০০ সালের দিকে একুশে টেলিভিশনের (ইটিভি) কারওয়ান বাজারের ভবনে কি একটা কাজে বিখ্যাত সাংবাদিক সায়মন ড্রিং এর কাছে গিয়েছি। লিফটের ভেতর এক অচেনা ব্যক্তি আমার নাম ধরে ডাকেন। লোকটিকে আমার খুব চেনা চেনা মনে হলেও আমি তাকে পুরোপুরি চিনে উঠতে পারি না। তখন তিনি নিজের নাম বলতেই হঠাৎ এক নিমিষে আমার মনে পড়ে যায় সব।

সাইদ ভাই তখন ইটিভিতে সংবাদ পাঠক হিসেবে খণ্ডকালীন কাজে যোগ দিয়েছেন। ইটিভি বন্ধ হওয়ার পর তিনি চ্যানেল আই এ সংবাদ পাঠ করতে থাকেন।

এখনো প্রায় রাতে চ্যানেল আই সংবাদ দেখতে বসলে আমি তাকে খবর পড়তে দেখি। মাঝে চ্যানেল আই টক-শোতে কয়েকবার অংশ নিয়েছি। প্রতিবার কাজ শেষে সাইদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে এসেছি।

নতুন করে শুরু হওয়া ইটিভির একটি অনুষ্ঠানে কিছুদিন আগে আবারো দেখি তাকে। সেদিন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে একটি টক-শোতে সরাসরি প্লাজমা টিভিতে স্টুডিওতে হাজির সাইদুর রহমান।

তিনি খুব স্পষ্ট গলায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করে বললেন:

যতদিন এই বিচার না হবে, ততদিন অন্তত আমি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাইতেই থাকবো। … এমন কি মৃত্যূর সময় শেষ নিঃশ্বাস ফেলার আগে যদি একটি মাত্র মুহূর্ত পাই, তখনও এ দেশের মানুষের কাছে বলবো, আমি এর বিচার চাই!…

___

http://mukto-mona.com/bangla_blog/?p=31837


Name:   বিপ্লব রহমান           

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:15 Dec 2012 -- 06:54 PM

পাহাড়ের মুক্তিযুদ্ধ: অন্য আলোয় দেখা-০১
লিখেছেন: বিপ্লব রহমান
তারিখ: ১ পৌষ ১৪১৮ (ডিসেম্বর ১৫, ২০১১)
__________________________________________________

[সাবেক চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধকে বহুবছর ধরে বিভ্রান্তির ঘেরাটোপে রাখা হয়েছে। খাটো করে দেখা হয়েছে পাহাড়ি জনগণের মুক্তিযুদ্ধ তথা ১৯৭১ সালে তাদের সব ধরণের চরম আত্নত্যাগের ইতিহাস। একই সঙ্গে সারাদেশে আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের আত্নত্যাগকেও অনেক ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন করার অপপ্রয়াস চালানো হয়। এ কারণে লেখার শিরোনামে 'অন্য আলোয় দেখা' কথাটি যুক্ত করা হয়েছে। বলা ভালো, এটি মুক্তিযুদ্ধের ওপর কোনো গুঢ় গবেষণাকর্ম নয়; এটি নিছকই পাহাড়ের মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি আলোচনার অবতারণা মাত্র।]

পাহাড়ের হত্যাযজ্ঞ পর্ব: একটি অপ্রকাশিত দলিল

১৯৬০ কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিয়ে কাপ্তাই জলবিদ্যুত নির্মাণ করা হলে প্রায় এক লাখ পাহাড়ি মানুষ সহায়-সম্বল হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে পড়েন। তাদের অনেকেই প্রধানত ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরামে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ সালে তখনকার ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ত্রিপুরা রাজার সঙ্গে সাাতে এলে ত্রিপুরার পাহাড়ি শরণার্থীরা আট পৃষ্ঠার পুস্তিকা আকারে তাকে একটি স্মারক লিপি হস্তান্তর করেন। সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি ১৯৭১-৭২ সালে পাকিস্তানী বাহিনী, কতিপয় বিপথগামী মুক্তিবাহিনী ও বাংলাদেশ রাইফেলস, বিডিআর (এখন বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ, বিজিবি) সদস্য কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরস্ত্র পাহাড়ি জনপদে চালানো একাধিক একাধিক হত্যাযজ্ঞ, লুঠতরাজ ও অপারেশনের রোমহর্ষক বর্ণনা দেওয়া হয়।

১৯৭১ সালে তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় যেমন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন, তেমনি মং রাজা মং প্র“ সেইন আবার মুক্তিযুদ্ধের পে কাজ করেছেন। সে সময় রাজা মং প্র“ সেইন মুক্তিবাহিনীর জন্য নিজ প্রাসাদ উজাড় করে দেন। মুক্তিযোদ্ধারা তার প্রাসাদে থেকেই যুদ্ধ করেছিলেন, বহু সাহায্য পেয়েছিলেন। এছাড়া পাহাড়ি নেতা এমএন লারমা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেন। চাকমা রাজার কাকা শ্রী কেকে রায়ও ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক। কিন্তু শুধু সন্দেহের বশে তাকে ত্রিপুরায় আটক করা হয়েছিল। স্মারকলিপিটিতে এসব বিষয়ও তুলে ধরা হয়। এই অধ্যায়টি আমরা পরের পর্বগুলোতে আলোচনা করবো।


এই লেখক ১৯৯৬-৯৭ সালে এপারের পাহাড়ি শরণার্থীদের ওপর সরেজমিন প্রতিবেদন তৈরির জন্য তথ্য-সাংবাদিকতার পেশাগত কাজে একাধিকবার ত্রিপুরা রাজ্য সফর করেন। সে সময় ত্রিপুরার স্থায়ী বাসিন্দা, স্কুল শিক ও বর্ষিয়ান পাহাড়ি নেতা শ্র“তরঞ্জন (এসআর) খীসা লেখককে দুর্লভ স্মারকলিপির একটি কপি হস্তান্তর করেন। এসআর খীসার ছোট ভাই ভবদত্ত খীসা ছিলেন রাঙামাটির একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক।

প্রসঙ্গত, শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে পাহাড়িদের যে প্রতিনিধি দল ওই স্মারকলিপিটি দিয়েছিলেন, তার মধ্যে এসআর খীসা নিজেও ছিলেন। সে সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিলেও পরে তা আর কখনোই পূরণ হয়নি। দৃশ্যত, তিনি হয়তো এ নিয়ে তখন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে বিব্রত করতে চাননি। পাহাড়ের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের পাশাপাশি চাপা পড়ে গেছে ওই চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন পর্বটিও।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে দেওয়া ইংরেজী স্মারকলিপিটির প্রচ্ছদে লেখা হয়:



MEMORANDUM OF THE TRIBAL PEOPLE OF TRIPURA TO THE PRIME MINISTER OF INDIA.

ON

POLITICAL DEVELOPMENT IN THE CHITTAGONG HILL TRACTS FROM 1947-1972.

ON

Killing, raps, arson and loot committed by the MUKTIBAHINI and the BANGLADESH RIFELS before and the after liberation of Bangladesh. The forceful occupation of Tribal lands by the Muslim of Bangladesh.

ON

Violation of the CHARATER OF HUMAN RIGHTS and the Principals of Secularism

ON

Stoppage of rising the height of the ‘KAPTAI HYDEL PROJECT DAM’ to supply electricity to Tripura and Mizoram.

ON

Humble suggestion put forth by the Tribals of Tripura for implementation in the Chittagong Hill Tracts.

এতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের প্রত্য মদদে ১৯৭১ সালের নৃশংস হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা দেওয়া হয়। যেখানে দেখা যায় রাজাকার নিধনের নামে চাকমাদের সে সময় স্রেফ জবাই করা হয়েছিল! এতে বলা হয়:



…. During this time Mr. KK Roy, an uncle of Chakma Chief and an Awami League nominee to the provincial Assembly from from Chittagong Hill Tracts crossed into India with an intention of contacting Awami League hierarchy and explaining matters. But he was apprehended and arrested by Tripura police at Subrum on April 22, on the instruction of HT IMAM and B. Rahman, the SP of Chittagong Hill Tracts.

Mr. Imam after crossing into the India became the administrator of the Bangladesh Eastern Zonal office in Tripura. In absolute violation of the principals of secularism he unleashed in India a vicious anti-Chakma campaign. Leading dailies published at random his fabricated stories openly denouncing the Chakma and their chief as Pak-Mizo collaborators. He malicious propaganda incited and encouraged the Mukti Bahini to adopt the inhuman slogan ‘SLAUGHTER THE CHAKMAS’. As a result of this policy hundreds of tribals, mainly Chakmas, have been butchered, their homes burned, their place of religion ransacked, their women raped and their land forcibly occupied…

এরপর স্মারকলিপিতে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয় আওয়ামী লীগ, মুক্তিবাহিনী, বিডিআর নামধারী কতিপয় সন্ত্রাসীরা একের পর এক গণহত্যা, গণধর্ষণ, লুণ্ঠন ও জ্বালাও-পোড়াও অপারেশনের সব নৃশংস ঘটনা।


এর মধ্যে ১৯৭১ এর মে মাসে ক্যাপ্টেন খালেক ও জমাদার খায়রুজ্জামানের নেতৃত্বে রাঙামাটির তবলছড়ি, তনদাং, রামসিরা, দেওয়ানপাড়া এবং রামগড় অপারেশন, ৫ ডিসেম্বর পানছড়ির শীলাছড়ি অপারেশন (৩২ জন নিহত), ১৪ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি অপারেশন (২২জন নিহত), ২১ ডিসেম্বর দীঘিনালার তারাবনিয়া অপারেশন ( নয়জন নিহত) উল্লেখ যোগ্য। ১৯৭২ সালের ফেব্র“য়ারিতে রাঙামাটি থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করা হলে বিডিআর সদস্যরা বিস্তৃর্ণ পাহাড়ে দফায় দফায় অপারেশন চালিয়ে হত্যা, ধর্ষন ও লুঠতরাজ করে। এরমধ্যে ২২ মার্চ ধালিয়া গ্রামে, ২২ ও ২৩ এপ্রিল বরইরাগি বাজারে, ৩০ এপ্রিল মাইচছড়িতে, ৮ মে খাগড়াছড়ির তারাবনিয়া, লোগাং বাজার অপারেশন উল্লেখযোগ্য। ২৯ মার্চ ১৯৭২ সালে প্রায় ২০০ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী রামগড়ের মানিকছড়ি, চিকনপাড়া, সাঙ্গুপাড়া, পাক্কামুড়া ও গোদাতলা গ্রামে একযোগে অপারেশন চালায়। ঘটনার তদন্তের নামে ২ এপ্রিল পুলিশ বাহিনী একই গ্রামগুলোতে আবারো তল্লাসী অভিযান চালায়। …

রাঙামাটি মুক্ত হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতারা রাজকার আখ্যা দিয়ে বহু সংখ্যক পাহাড়ি জনসাধারণকে আটক করে। সে সময় মং রাজা ও সরকারের আদিবাসী উপদেষ্টা প্রু সেইন আটকৃতদের মুক্তি দাবি করে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে টেলিগ্রাম করেন। স্মারকলিপিতে উল্লেখিত টেলিগ্রামটি নিম্নরূপ:


‘VISITED RANGAMATI ON SIXTH INSTANT STOP EXTREMELY AGGRIEVED TO FIND INNOCENT TRIBAL PEOPLE ARRESTED INDISCRIMINATELY AS ALLEGED COLLABORATORS STOP EARNESTLY REQUESTED INSTRUCT CIVIL ADMINISTRATION IMMEDIATE RELEASE OF ALL TRIBALS SO FAR ARRESTED WITHOUT PREJUDICE AND FURTHER ARREST BE CEASED STOP= MONG RAJA AND THE TRIBAL ADVISOR TO BANGLADESH’


http://mukto-mona.com/bangla_blog/?p=20676


Name:  বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:15 Dec 2012 -- 06:56 PM

পাহাড়ের মুক্তিযুদ্ধ: অন্য আলোয় দেখা-০২
লিখেছেন: বিপ্লব রহমান
তারিখ: ৭ পৌষ ১৪১৮ (ডিসেম্বর ২১, ২০১১)
_________________________________________


[সাবেক চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধকে বহুবছর ধরে বিভ্রান্তির ঘেরাটোপে রাখা হয়েছে। খাটো করে দেখা হয়েছে পাহাড়ি জনগণের মুক্তিযুদ্ধ তথা ১৯৭১ সালে তাদের সব ধরণের চরম আত্নত্যাগের ইতিহাস। একই সঙ্গে সারাদেশে আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের আত্নত্যাগকেও অনেক ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন করার অপপ্রয়াস চালানো হয়। এ কারণে লেখার শিরোনামে 'অন্য আলোয় দেখা' কথাটি যুক্ত করা হয়েছে। বলা ভালো, এটি মুক্তিযুদ্ধের ওপর কোনো গুঢ় গবেষণাকর্ম নয়; এটি নিছকই পাহাড়ের মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি আলোচনার অবতারণা মাত্র।]



ত্রিদিব রায়ের ভূমিকা, ১৯৭১

লেখার শুরুতেই বিশিষ্ট মুক্তিযুদ্ধ গবেষক অমি রহমান পিয়ালকে উদ্ধৃত করা যাক। এই লেখকের পাহাড়ের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি খসড়া নোটে তথ্য ঘাটতি দেখা দেওয়ায় অরপিকে ইমেল করে ১৯৭১ সালে সাবেক চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের ভূমিকাসহ এ সংক্রান্ত মতামত জানাতে অনুরোধ করা হয়েছিল। ওই ইমেইল বার্তার জবাবে তিনি একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে খুব চমৎকার করে তুলে ধরেন পুরো বিষয়। অরপি বলছেন:

অমি রহমান পিয়াল
জুন ২৫, ২০১১ at ৮ : ৫৯ অপরাহ্ণ লিঙ্ক

সুপ্রিয় বিপ্লব রহমান, আপনার মেইল পেয়ে পোস্টটি পড়লাম এবং অনুরোধ রাখতেই আমার বক্তব্য রাখলাম। বিব্রতবোধ করছি এইজন্য যে সে বক্তব্য আপনার পোস্টের বক্তব্য সমর্থন নাও করতে পারে। তার আগে বলে নিচ্ছি যে আমি আরাফাতুর রহমানের লেখাটা পড়িনি। আপনারটা পড়েই আমার যা বলার বলছি। কোনো বাতুলতা নিজগুণে ক্ষমা করবেন।

প্রথমে আসি আদিবাসী রাজাকার প্রসঙ্গে।অবাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলো। পক্ষে এবং বিপক্ষে। এখানে লক্ষণীয় তাদের বসবাসের জায়গাটা সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় সেখানে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং মুক্তিবাহিনী- দুইপক্ষই ছিলো ভীষণভাবে ত্ৎপর। এই পর্যায়ে এসে আদিবাসীরা গোষ্ঠীগতভাবে সিদ্ধান্ত নেয় তারা কোন পক্ষে যাবে। সাওতাল এবং গারোরা সরাসরি পাকিস্তানের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। চাকমারা পক্ষে।(মগরা নিরপেক্ষ অবস্থান নিলেও তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছে আবার পাকিস্তানীদের বার্মায় পালাতেও সাহায্য করেছে।)এটা গোষ্ঠীগত সিদ্ধান্ত, গোষ্ঠী প্রধানের নির্দেশ। এখানে সমর্থন অর্থে বলা হয়েছে। এই সমর্থনের অর্থ ইনটেলিজেন্স, আশ্রয় এবং লোকবল দিয়ে সহায়তা।

প্রত্যক্ষ লড়াইয়ে মুক্তিবাহিনীর হয়ে গারোরা লড়েছেন, সাওতালরা লড়েছেন। ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ এবং ইপিআরের সদস্য যেসব আদিবাসী ছিলেন তারা লড়েছেন। এদের মধ্যে মারমা-মুরং-গারো-লুসাই সব গোষ্ঠীই ছিলেন,ছিলেন চাকমারাও। তারা তাদের সম্প্রদায়গত সিদ্ধান্তের বদলে প্রায়োরিটি দিয়েছেন কর্তব্যবোধ এবং ক্যামোরেডরিকে।

চাকমাদের জন্য এই সিদ্ধান্তটা এসেছে রাজা ত্রিদিব রায়ের তরফে।অতিনি গোষ্ঠীপ্রধান। এপ্রিলের শুরুতেই রাঙ্গামাটিতে পাকিস্তান থার্ড কমান্ডো ব্যাটেলিয়ান অবস্থান নেয়। স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপের এলিট কমান্ডোদের প্রধান মেজর জহির আলম খান (শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করেছিলেন তিনিই) ত্রিদিব রায়ের সঙ্গে দেখা করে সবধরণের সহায়তার প্রতিশ্রুতি পান। সঙ্গে যোগ দেয় লালডেঙ্গার নেতৃত্বাধীন মিজোদের একটি ব্রিগেড। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে মুক্তিবাহিনী এবং বিএসএফের সম্ভাব্য ত্ৎপরতা এবং তা ঠেকানোর জন্য সহায়তার কথা ছিলো সে প্রতিশ্রুতিতে। শুধু ত্রিদিব রায়ের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী দলই নয়, রাঙ্গামাটিতে ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সেস (ইপিসিঈফ) প্রাথমিকভাবে যোগ দেয় প্রায় শ ’ তিনেক চাকমা। যুদ্ধশেষে গোটা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় বাহিনীর হাতে গ্রেফতারের সংখ্যাটা এক মাসে ছিলো দেড় হাজারের ওপর। যদিও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আওতায় তাদের সবাইকেই পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।

এমনকি দুর্গমতার কারণে পাহাড়ের অধিকাংশ এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের কোনো ঢেউই লাগেনি- আপনার এই কথাটি পুরোপুরি ঠিক নয়। ৩ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনী আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণার অনেক আগে থেকেই পাহাড় ছিলো উত্তাল। এখানে অপারেশনাল ছিলো মেজর জেনারেল সুজয় সিং উবানের তত্বাবধানে থাকা মুজিব বাহিনীর একটা অংশ (শেখ মনির নেতৃত্বাধীন) এবং উদ্বাস্তু তিব্বতীদের নিয়ে গড়া স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স। চেহারায় সাদৃশ্য থাকার কারণে (মঙ্গোলয়েড) তিব্বতীরা নভেম্বরের শুরু থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে অপারেশনে নামে (অপারেশন মাউন্টেন ঈগল)। এই লড়াইয়ে পাকিস্তানীদের পাহাড়ে গাইড এবং ইন্টেলিজেন্স দিয়ে সহায়তার দায়িত্ব পালন করে ইপিসিঈফের চাকমারা।

এখন ত্রিদিব রায়কে আপনি স্রেফ পাকিস্তানের একজন দেশপ্রেমিক নাগরিক বা যে তকমাই দিতে চান না কেনো, তার প্রাথমিক পরিচয় তিনি চাকমাদের রাজা। এমন যদি হতো তিনি শুধু রাঙ্গামাটির চাকমাদের রাজা, বা অন্যরা তাকে রাজা বলে স্বীকার করতো না তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু রাজার দায় তার গোষ্ঠীর ওপর খানিকটা বর্তায় বৈকি!পার্বত্য চট্টগ্রামের দুয়েকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদে (সেগুলো বেশ চমকপ্রদ একদিন শেয়ার করা যাবে) চাকমারা তাই রাজার নির্দেশই পালন করেছে। কিংবা সে নির্দেশের বিপক্ষে যায়নি। ত্রিদিব রায় শুধু তার গোষ্ঠীকেই সহায়তার নির্দেশ দিয়ে বসে থাকেননি। নিজে মাঠে নেমেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কূটনৈতিক সমর্থন আদায় করতে গেছেন কলম্বো, সেখানে সিংহলীজ ছাত্রদের ধিক্কার শুনে ফিরেছেন। স্বাধীনতার পরপর পাকিস্তানকে সহায়তার জন্য যে ১২ জনের নাগরিকত্ব বাতিল এবং সহায়সম্পত্তি ক্রোক করা হয় আদালতের নির্দেশে সে তালিকায় গোলাম আজমের সঙ্গে রাজা ত্রিদিব রায়ও আছেন। তিনি নাগরিকত্ব ফিরে পেতে কোনো তদবির করেননি। যদিও সহায়সম্পত্তি ফিরে পেয়েছেন।

প্রশ্ন উঠতে পারে যে যুক্তিতে গোলাম আজমের বিচার করা যায়, সেই একই যুক্তিতে ত্রিদিব রায়কেও আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় কিনা। আমার ধারণা যায়, যদিও তিনি পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে সে দেশেই রয়ে গেছেন, কয়েকদফা মন্ত্রীত্বের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ধরাছোয়ার বাইরেই। বাকি থাকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহায়তাকারী অক্সিলারি ফোর্সের চাকমারা। এরা সাধারণ ক্ষমা পেয়েছে। এদের কারো বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ এব লুটপাটের অভিযোগ ছিলো না। দে জাস্ট মার্চড এলং ফলৈং দেয়ার কিং। তবে সেরকম কোনো প্রমাণ নিয়ে কেউ যদি আসে, তাহলে নিশ্চয়ই তাদেরও বিচার করা যাবে। ব্যাস এটুকুই।



আগেই বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে ত্ৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় যেমন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন, তেমনি মং রাজা মং প্রু “ সেইন আবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। সে সময় রাজা মং প্র “ সেইন মুক্তিবাহিনীর জন্য নিজ প্রাসাদ উজাড় করে দেন। মুক্তিযোদ্ধারা তার প্রাসাদে থেকেই যুদ্ধ করেছিলেন, বহু সাহায্য পেয়েছিলেন। এছাড়া পাহাড়ি নেতা এমএন লারমা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেন। চাকমা রাজার কাকা শ্রী কেকে রায়ও ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক। কিন্তু শুধু সন্দেহের বশে তাকে ত্রিপুরায় আটক করা হয়েছিল। পাহাড়িদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় অধ্যায়টি আমরা তৃতীয় ও শেষ পর্বে আলোচনা করবো।

ব্রিগেডিয়ার (অবঃ) জহির আলম খান পাকিস্তান ডিফেন্স জার্নালে একটি সাক্ষাতকার দিয়েছিলেন। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের কথাও ছিলো (একাত্তরের মাঝপথে তাকে পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়)। সেখানে ত্রিদিব রায়ের অনুসারী চাকমাদের একাংশের সহায়তার বিষয়ে মতামত হচ্ছে :

The Chakma and the Mizo tribesmen co-operated with the Pakistan Army in 1971. You were closely associated with them. How was the experience?

We landed in Rangamati just after nightfall, the next morning I called on Raja Tridiv Roy, the Chakma Chief, He lived in an old bungalow on an island separated from the mainland by a channel about fifty yards wide.

I explained to the Raja that the army had come to re-establish the control of the Pakistan Government on the Hill Tracts and asked for his co-operation in maintaining peace and to keep me informed about any rebel movement, concentration and activity, the Raja agreed and co-operated right upto the surrender. At the request of our government Raja Tridiv Roy came to West Pakistan before our surrender in East Pakistan, he was our ambassador in a number of countries and now lives in Islamabad.

[লিংক]

সাবেক চাকমা রাজা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে বিদেশেও সক্রিয় ছিলেন। ২৬ সেপ্টেম্বর মার্কিন দূতাবাসের গোপন তারবার্তায় জানায়, রাজা ত্রিদিব রায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বিশেষ দূত হিসেবে শ্রীলঙ্কা যান। তারবার্তাটি নিম্নরূপ:

Department of State

TELEGRAM

CONFIDENTIAL 444

COLOMB 03360 270603 Z
19
ACTION NEA-11
INFO : OCT-01 EUR-14 CIAE-00 DODE-00 PM-06 H-02 INR-06 L-03 NSAE-00 NSC-10 P-
03 RSC-01 PRS-01 SS-14 USIA-12 10-12 SP-02 ORM-03 AID-20 RSR-01 EA-11 /133 W
……….060184
P 261110 Z NOV 71
FM AMEMBASSY COLOMBO
TO SECSTATE WASHDC 7259
INFO AMEMBASSY ISLAMABAD
AMEMBASSY LONDON
AMEMBASSY NEW DELHI
USMISSION USUN
CONFIDENTIAL COLOMBO 3360
SUBJ : PRESIDENT YAHYA KHAN’S SPECIAL ENVOY TO CEYLON

1. SUMMARY: Raja Tridiv Roy in Ceylon as representative of GOP President Khan. Main thrust of mission seems aimed at Ceylon’s Buddhist majority. Roy suggests Pakistan would welcome Bandaranaike’s involvement in Indo-Pak dispute. Local interest in dispute running quite high. End summary.

2. Raja Tridiv Roy, identified by press reports as quote Pres Yahya Khan’s special envoy to ceylon unquote arrived Colombo Nov 25 and is scheduled meet with PM Bandaranike on Nov 26. Roy accompanied on visit by S.L. Leghari, director of Foreign Affairs, GOP. Roy identified as hereditary chief Chakma community in Chittagong hills, quote one of the largest Buddhist groups in East Pakistan unquote. In addition to scheduled meetings with PM and other cabinet members he has met with representatives of All-Ceylon Buddhist Congress and Young Men’s Buddhist Association.

3. Main reason for Roy visit reportedly is to convey to PM Bandaranaike President Khan’s assessment quote of the serious threat to peace posed by the full¬scale assaults on Pakistan’s borders …and to explain to Mrs Bandaranaike the treatment meted out to minorities, particularly to Buddhists in East Pakistan. Unquote.

4. In Nov 26 Sun Roy stated that quote all countries have high regard or Prime Minister Bandaranaike. Any formula put forward by her to ease the situation in East Pakistan would be most welcome. Unquote. With regard refugee problem, Roy stated that quote Pakistan has opened the door for the refugees to return to their homeland,
but India is trying to discourage them from going home in order to increase tensions in the area. Unquote. Published itinerary calls for him to visit Thailand, Nepal and Burma following visit here.

5. Roy visit seems to be bringing Pakistan question back to front burner in local debates. Group calling itself Ceylon Committee for Human Rights in Bangla Desh was refused interview with Roy and promptly branded him quote an outcast.. .who cannot reconcile the teachings of the compassionate Buddha with murder, rape and pillage by the military clique whose cause he had come here to espouse. Unquote. Nov 26 Daily News editorial roundly criticized both sides in the conflict but placed major blame for military activity on India, arguing that quote anybody who believes that Pakistan, in her present plight, would launch a war against India should surely have his brains washed again in the holy Ganges. Unquote.

6. Comment: Roy’s suggestion that intervention by PM Bandaranaike would be welcomed by Pakistan raises possibility that such role may be attempted again. As shown by Indian Ocean Peace Zone proposal, PM Bandaranaike is seeking new prestige in international arena. Successful involvement in Indo-Pak dispute could earn for her that prestige as well as score domestic points because of the increased interest in the conflict here in Ceylon. GP-3
STRAUSZ-HUPE

Source: The American Papers – Secret and Confidential India.Pakistan.Bangladesh Documents 1965-1973, University Press Limited, p.73 – 733

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দৈনিক বাংলায় একটি তালিকা ছাপা হয় যেখানে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে সহায়তার অভিযোগে দালাল আইনে অভিযুক্তদের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়; নুরুল আমিন, সবুর খান, গোলাম আযমসহ দালালদের সে তালিকায় ৮ নম্বরে ছিলো ত্রিদিব রায়ের নাম।

[লিংক]


এদিকে জনৈক আরাফাতুর রহমান জানাচ্ছেন:

চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের সহযোগিতায় রাঙামাটিতে গণহত্যা চলে। এই সময়ে রাঙামাটি মুক্ত করতে যাওয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের ছাত্র এবং এফ রহমান হলের আবাসিক ছাত্র ইফতেখারসহ ৮-১০ জনের একদল মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করা হয়।

চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় তার বির্তকিত বই The Departed Melody-তে লেখেন, ১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল সকালে তিনি (রাজা ত্রিদিব রায়) তার ভগ্নিপতি কর্নেল হিউম, ম্যাজিট্রেট মোনায়েম চৌধুরী, মোঃ হজরত আলী এবং আরো কয়েকজন বাঙালি মুসলিম লীগ নেতাসহ চট্টগ্রামের নতুন পাড়ায় অবস্থিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেন্টার-এর পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেন। পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয় যে ম্যাজিস্ট্রেট মোনায়েম চৌধুরী এবং রাজা ত্রিদিব রায়ের সঙ্গে আসা আরো কয়েকজন বাঙালি ঢাকা থেকে আসা জুনিয়র অফিসারকে সঙ্গে করে কাপ্তাইয়ে যাবেন। ঠিক সেদিনই বিকেলে কাপ্তাই থেকে সেনাবাহিনীর একটি দল কয়েকটি লঞ্চ এবং স্পিডবোট নিয়ে রাঙামাটি আসে এবং বিনা প্রতিরোধে দখল করে নেয়।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রামের বলাকা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত (ফেব্রু-২০১১) ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস’ বইয়ে জামালউদ্দিন লেখেন, ‘…অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পাক দালাল খ্যাত চিহ্নিত এক উপজাতীয় নেতার (রাজা ত্রিদিব রায়) বিশ্বাসঘাতকতায় ঐ দিনই পাকিস্তানি বর্বর বাহিনী রাঙামাটিতে এসে চুপিসারে অবস্থান নেয়, যা মুক্তিযোদ্ধাদের জানা ছিল না। ভারত প্রত্যাগত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের বাংলোর কাছাকাছি পৌঁছার সাথে সাথে সেখানে ওৎ পেতে থাকা পাকিস্তানি সৈনিকেরা মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে ফেলে। এই দলের মধ্যে ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইফতেখার।’ [পৃষ্ঠা ৩৭৯-৩৮০]

এর আগে রাঙামাটি মহকুমা সদরের এসডিও আবদুল আলী কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে দুটি স্পিডবোটে করে মহালছড়ি থেকে রাঙামাটি আসেন। স্পিডবোটে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা এস এম কালাম, আবদুল শুকুর, শফিকুল ইসলাম, মামুন, সামসুল হক মাস্টার এবং রাঙামাটি হাইস্কুলের তদানীন্তন হেডমাস্টার রহমান আলীর ছেলে ইফতেখার। এর মধ্যে স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করার জন্য আবদুল আলীকে রাঙামাটিতে পুলিশ লাইনের এক ব্যারাকে আটক করে রেখে তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্লেড দিয়ে আঁচড় দেয়া হয়েছিল। এরপর সেসব জায়গায় লবণ দেওয়া হয়েছিল। তাছাড়া তাকে একটি জিপের পিছনে বেঁধে টেনে রাঙামাটির বিভিন্ন জায়গায় ঘোরানো হয়েছিল। সূত্র : ‘মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রাম’ শরবিন্দু শেখর চাকমা, (অঙ্কুর প্রকাশনী, জানু-২০০৬ পৃষ্ঠা ২৫]।

[লিংক]

তবে ওই লেখক তার লেখায় মুক্তিযুদ্ধে পাহাড়িদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথা বেমালুম চেপে যান। এমনকি লেখাটি যে কেউ পড়লে ধারণা জন্মাতে পারে যে, ১৯৭১ এ আদিবাসী মাত্রই ত্রিদিব রায়ের অনুসারি তথা রাজাকার ছিলেন! তিনি ভুলে যান কথিত ‘আদিবাসী রাজাকারের বংশধর’, বর্তমান চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় ১৯৭১ এ মাত্র ১১ বছরের বালক ছিলেন এবং পিতার কৃতকর্মের দায়ভার কোনোভাবেই তার ওপর বর্তায় না এবং চাকমা রাজা হিসেবে তার এ পর্যন্ত সমস্ত কর্মকাণ্ড আদিবাসী তথা বাংলাদেশের স্বার্থই রক্ষা করে। বিশিষ্ট আদিবাসী গবেষক রাজা দেবাশীষ পার্বত্য সমস্যা নিয়ে লিখেছেন অসংখ্য গবেষণাগ্রন্থ, প্রবন্ধ, নিবন্ধ; এমনকি ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির খসড়াটিও তারই করা। চাকমা ভাষায় রয়েছে তার লেখা ও সুর করা অসংখ্য গান এবং গুনি এই ব্যক্তি বাঁশির সুরে ধরেছেন পাহাড়ি লোক ঐতিহ্য। সংক্ষেপে, রাজপরিবারের আশিবার্দে নয়, নিজস্ব যোগ্যতায় বর্তমান চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় পরিনত হয়েছেন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বে।

কিন্তু আরাফাতুর রহমান উগ্র জাতিগত বিদ্বেষজনিত কারণে আরো লেখেন:



এই যুদ্ধাপরাধীদের বংশধররা বংশপরম্পরায় বাংলাদেশের বিরোধিতা করে আসছে। বর্তমান আমরা তাদেরই আবার দেশের প্রতিনিধি বানিয়েছি বিশ্বদরবারে, জাতিসংঘে। যুদ্ধাপরাধী চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় এবং বিচারপতি সায়েমের উপদেষ্টা ত্রিদিব রায়ের মা বিনীতা রায়ের বংশধর এবং উত্তরাধিকারী দেবাশীষ রায় বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নিজামী ও মুজাহিদের মতো তার গাড়িতেও বাংলাদেশের পতাকা উড়েছে। তিনি সম্প্রতি মেক্সিকোর কানকুনে শেষ হয়ে যাওয়া জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি দলের পক্ষে কাজ করেছেন। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সংগঠন ইউএনএফসিসিসি (UNFCCC) এবং ইউ এন পার্মানেন্ট ফোরাম অন ইনডিজিনাস ইস্যুর বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। (সূত্র : প্রথম আলো, ০২ জানুয়ারি ২০১১)

রাজাকার ফজলুল কাদের চৌধুরীর পুত্র হিসেবে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী যদি ওআইসির (ঙওঈ) মহাসচিব পদের জন্য নির্বাচন করে দেশের ভাবর্মূতি নষ্ট করতে পারে তাহলে কেন ত্রিদিব রায়ের মতো প্রমাণিত রাজাকারের পুত্র বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে? এখন তো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উজ্জীবিত সরকার। তাদের অপরাধের কেন বিচার হবে না?

[লিংক]

এ যেনো আমতত্ত্ব। আম গাছে তো আমই ফলে নাকি? ফকাচৌ’র পুত্র সাকাচৌ যুদ্ধাপরাধী হলে ত্রিদিব পুত্র দেবাশীষ কেনো বালক রাজাকার হবেন না? লা জবাব গরলীকরণ!!
_____________________________
http://mukto-mona.com/bangla_blog/?p=21015


Name:  বিপ্লব রহমান           

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:15 Dec 2012 -- 06:58 PM

পাহাড়ের মুক্তিযুদ্ধ: অন্য আলোয় দেখা- শেষ পর্ব
লিখেছেন: বিপ্লব রহমান
তারিখ: ১১ পৌষ ১৪১৮ (ডিসেম্বর ২৫, ২০১১)
_________________________________________

[সাবেক চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধকে বহুবছর ধরে বিভ্রান্তির ঘেরাটোপে রাখা হয়েছে। খাটো করে দেখা হয়েছে পাহাড়ি জনগণের মুক্তিযুদ্ধ তথা ১৯৭১ সালে তাদের সব ধরণের চরম আত্নত্যাগের ইতিহাস। একই সঙ্গে সারাদেশে আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের আত্নত্যাগকেও অনেক ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন করার অপপ্রয়াস চালানো হয়। এ কারণে লেখার শিরোনামে 'অন্য আলোয় দেখা' কথাটি যুক্ত করা হয়েছে। বলা ভালো, এটি মুক্তিযুদ্ধের ওপর কোনো গুঢ় গবেষণাকর্ম নয়; এটি নিছকই পাহাড়ের মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি আলোচনার অবতারণা মাত্র।]

দ্বিতীয় পর্ব

পাহাড়িদের প্রতিরোধ লড়াই, ১৯৭১



পুনর্বার বলা ভালো, ১৯৭১ সালে ত্ৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় যেমন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন, তেমনি মং রাজা মং প্রু “ সেইন আবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। সে সময় রাজা মং প্রু “ সেইন মুক্তিবাহিনীর জন্য নিজ প্রাসাদ উজাড় করে দেন। মুক্তিযোদ্ধারা তার প্রাসাদে থেকেই যুদ্ধ করেছিলেন, বহু সাহায্য পেয়েছিলেন। এছাড়া পাহাড়ি নেতা এমএন লারমা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেন। চাকমা রাজার কাকা শ্রী কেকে রায়ও ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক। কিন্তু শুধু সন্দেহের বশে তাকে ত্রিপুরায় আটক করা হয়েছিল। পাহাড়িদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় অধ্যায়টি আমরা চলতি তৃতীয় ও শেষ পর্বে আলোচনা করছি।

‘৭১ এর ২৫ মার্চ পাকিস্তানী সামরিক জান্তা গণহত্যা শুধু করলে সারাদেশের মতো পাহাড়েও তরুণ ছাত্র-যুবারা মুক্তিযুদ্ধের সর্বাত্নক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এই প্রতিরোধ লড়াইয়ে সে সময় বাঙালিদের পাশাপাশি পাহাড়ি আদিবাসীরা সমানভাবে অংশ নিয়েছিলেন। কাজেই ত্রিদিব রায় ও তার অনুসারী মুষ্টিমেয়দের পাকিস্তানপন্থী ভূমিকাকে কেন্দ্র করে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম বা সারাদেশের আদিবাসীদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথাকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। বরং কার্যত অমন চেষ্টা উগ্র জাতিগত বিদ্বেষ ও ইতিহাস বিকৃতিকেই উস্কে দেয় মাত্র।

খোদ সরকারের রাঙামাটি জেলার তথ্য বাতায়নে বলা হচ্ছে:

১৯৭১ এর মার্চ মাসে রাঙ্গামাটি জেলা সদরে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল রাঙ্গামাটি সরকারী কলেজের ত্ৎকালীন ছাত্রনেতা গৌতম দেওয়ান এবং সুনীল কান্তি দে এর নেতৃত্বে।

মুক্তিযুদ্ধকালীন রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়িতে অবস্থিত ফারুয়া ও শুকরছড়ির মোহনায় পাক সামরিক ঘাঁটি ছিল। সেখানে পাঞ্জাবী, রাজাকার, আলবদরসহ ২৫০ জন সৈন্য অবস্থান করত। সেখানে পাক সেনাবাহিনীর কয়েকটি স্টীমার ও গানবোটও ছিল। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে পাইলট মান্নানসহ মুক্তি বাহিনীর একটি দল পাহাড়ী এলাকায় পথ হারিয়ে রাতের অন্ধকারে ফারুয়াস্থ পাক বাহিনীর ক্যাম্পের অভ্যন্তরে এসে পড়ে। তারা চাকমাদের সহায়তায় নৌকায় করে শুকরছড়ি এলাকায় নিরাপদ স্থানে পৌঁছে যায়।

১৭ ডিসেম্বর মিত্র বাহিনীর পূর্বাঞ্চল কমান্ডের অধিনায়ক জেনারেল সিং ওভান এবং শেখ ফজলুল হক মনি ভারতীয় হেলিকপ্টারযোগে রাঙ্গামাটির পুরাতন কোর্ট বিল্ডিং মাঠে অবতরণ করেন। এখানে তাঁদের অভ্যর্থনা জানান ত্ৎকালীন ছাত্রনেতা গৌতম দেওয়ান, আবদুর রশীদ, মোঃ ফিরোজ আহম্মদ, মনীষ দেওয়ান (পরবর্তীতে কর্ণেল)সহ হাজারো ছাত্র-জনতা।

[লিংক]

এতে পাহাড়িদের প্রতিরোধ লড়াইয়ের পাশাপাশি সাধারণ নিরস্ত্র পাহাড়ি জনতার চরম আত্নত্যাগের কথা তুলে ধরে আরো বলা হয়:

পাক বাহিনীরা পার্বত্য জেলা সদর রাঙ্গামাটি ও মহকুমা সদর রামগড় এবং বান্দরবান দখল করার পর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে ঘাঁটি স্থাপন করে এবং ঘাঁটিসমূহ সুদৃঢ় করে নেয়। তারা বিভিন্ন এলাকায় শাখা কমিটি গঠন করে তাদের মাধ্যমে পার্বত্য এলাকায় রাজাকার বাহিনী ও হিলরাজ বাহিনী গঠন করে এবং বিভিন্ন এলাকায় হানা দিয়ে বর্বর অত্যাচার চালায় ও ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দেয়। পাকবাহিনী রামগড়, গুইমারা, মানিকছড়িসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে পাহাড়ী রমনীদের জোর পূর্বক ধরে নিয়ে অমানুষিকভাবে ধর্ষণ করে এবং ক্যাম্পে উলঙ্গ অবস্থায় বন্দী করে রাখে।

১নং সেক্টরের আওতায় সর্বপ্রথম ৫ মে ২৫ সদস্য বিশিষ্ট পার্বত্য চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা দল গঠন করা হয়। এই দল গঠনের নেতৃত্ব দেন হেমদা রঞ্জন ত্রিপুরা। এটি পরবর্তীতে একটি পূর্ণাঙ্গ কোম্পানী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। শ্রী ত্রিপুরাকে কোম্পানী কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। এই কোম্পানীর অধীনে গ্রুপ নং- ৯১, ৯২, ৯৩, ৯৪ এবং ৯৫ সংযুক্ত করা হয়। উক্ত গ্রুপগুলির ট্রেনিং কেন্দ্র ছিল ভারতের অম্পি নগর এবং ১নং সেক্টর হেডকোয়ার্টার হরিণা। ১নং সেক্টরের অধীনে হরিণা থেকে ৩০ কিঃ মিঃ দূরবর্তী সীমান্ত এলাকা ভারতের বৈষ্ণবপুরে আগস্ট মাসের প্রথম দিকে সাব-সেক্টর স্থাপন করা হয়। সেখানে অবস্থানরত গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় গেরিলা আক্রমণ পরিচালনা করা হয়।

পার্বত্য এলাকায় অবস্থানের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের চলাচলের সুবিধা, শত্রুপক্ষের ঘাঁটি আক্রমণ এবং পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে বর্তমান খাগড়াছড়ি জেলার অন্তর্গত নাকাপা, কুমারীপাড়া, পাগলা পাড়া, মানিকছড়ি, ডাইনছড়ি, যোগ্যাছলা ও গাড়ীটানা এলাকার গহীন অরণ্যে মুক্তিবাহিনীর গোপন ক্যাম্প বা আশ্রয়স্থল করা হয়। এই সমস্ত গোপন গেরিলা ক্যাম্পে ঐ এলাকার হেডম্যান কার্বারীসহ সকল স্তরের জনগণ খাদ্যশস্য সরবরাহ করত এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন ঐ সমস্ত এলাকার জনগণ মুক্তিযোদ্ধাদেরকে পাকবাহিনীর গতিবিধি এবং তাদের অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে সাহায্য করত।

[লিংক]

অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধে গৌরবময় অবদান রাখা এমএন লারমা ও মং রাজা রাজা মং প্রু সাইন প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আদিবাসী গবেষক মঙ্গল কুমার চাকমা তার ‘মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্যাঞ্চলের জুম্ম জনগণ ও প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়’ নামক ’ লেখায় জানাচ্ছেন :

… সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে জুম্ম ছাত্র-যুবকরাও আন্দোলনে যোগ দিতে সংগঠিত হতে থাকে। ত্ৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। জুম্ম ছাত্র-যুবকদেরও উদ্বুদ্ধ করেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য। ১৯৭০ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী-লীগের প্রাথী কোকনদাক্ষ রায়ও (রাজা ত্রিদিব রায়ের কাকা) মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে গিয়েছিলেন। এ-সময় কয়েকশো জুম্ম ছাত্র-যুবকও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ত্রিপুরা রাজ্যে গিয়েছিলো। প্রথম অবস্থায় তারা অনেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণও করেছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে এইচ টি ইমামের প্ররোচনায় জুম্ম ছাত্র-যুবকদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ বন্ধ করে দেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ-সময় ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় কোকনদাক্ষ রায়কেও কোনো অজুহাত ছাড়াই গ্রেফতার করা হয়। ফলে অনেক জুম্ম ছাত্র-যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে না পেরে পার্বত্য চট্টগ্রামে ফেরত আসে।…

[লিংক]

মঙ্গল কুমার চাকমা আরো জানান:

মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন মং সার্কেলের ত্ৎকালীন রাজা মং প্র¦ সাইন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে-সাথে যখন শতো-শতো লোক পরিবার-পরিজন নিয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে যাচ্ছিল, তখন তিনি খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়িস্থ রাজবাড়ীতে তাদের খাওয়া-দাওয়া-সহ নানাভাবে সহায়তা প্রদান করেন। পাক-সেনারা রামগড় দখল করার পূর্বেই তিনি ত্রিপুরা পালিয়ে যান। সেখানে গিয়েও তিনি বসে থাকেননি। কর্ণেলের ব্যাজ পরে তিনি কুমিল্লার আখাউড়াতে যুদ্ধ করেছিলেন। সেজন্য পাক সেনারা মানিকছড়িতে এসে রাজবাড়ী, ত্ৎসংলগ্ন বৌদ্ধ মন্দির ও গ্রামের জুম্মদের ঘারবাড়ী ধ্বংস ও লুটপাট করে।

ত্ৎসময়ে ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেল (ইপিআর) বাহিনীতে কিছু জুম্ম ছিলো। তারা সবাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে রমণী রঞ্জন চাকমা রামগড় সেক্টরে পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধে নিহত হন। সিপাহী হেমরঞ্জন চাকমা বগুড়া সেক্টরে নিখোঁজ হন। তার লাশও পাওয়া যায়নি। সিপাই অ্যামি মারমাও বগুড়া সেক্টরে যুদ্ধে শহীদ হন। পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অসম সাহসিকতার জন্য বান্দরবানের অধিবাসী ত্ৎকালীন ইপিআরের রাইফেলম্যান উখ্য জিং মারমাকে যুদ্ধের পরে বীরবিক্রম খেতাবে ভূষিত করা হয়। তিনি এখনও বেঁচে আছেন। অভাব-অনটনের মধ্যে কষ্টকর জীবন অতিবাহিত করছেন বান্দরবান শহরে।

সে-সময় পূর্ব পাকিস্তান পুলিস-বাহিনীতেও কিছু জুম্ম চাকরীরত ছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম বিমলেশ্বর দেওয়ান ও ত্রিপুরা কান্তি চাকমা-সহ ২০ / ২২ জন জুম্ম সিভিল কর্মকর্তা ও কর্মচারী ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এঁদের মধ্যে বরেন ত্রিপুরা, কৃপাসুখ চাকমা ও আনন্দ বাঁশী চাকমা ছিলেন অন্যতম।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মেজর জিয়াউর রহমান তাঁর বাহিনী ও ইপিআর বাহিনী নিয়ে রাঙ্গামাটি হয়ে ত্রিপুরা পাড়ি দিয়েছিলেন। জিয়া বাহিনী-সহ রাঙ্গামাটি পৌঁছলে জুম্ম জনগণই তাদেরকে খাদ্য ও অন্যান্য রসদ যুগিয়েছিলো। রাঙ্গামাটি জেলার বন্দুকভাঙ্গায় যেখানে বর্তমানে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফের সমাধিক্ষেত্র রয়েছে, সেখানে পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধের পর মেজর জিয়া তাঁর বাহিনী নিয়ে জুম্মদের গ্রামের ভিতর দিয়ে নানিয়ারচর, মহালছড়ি ও খাগড়াছড়ি হয়ে রামগড় সীমান্তে চলে যান। সে-সময় গ্রামে-গ্রামে জুম্ম গ্রামবাসীরা মেজর জিয়ার বাহিনীকে খাদ্য-সহ নানাভাবে সহায়তা করেছিলো। কথিত আছে, খাগড়াছড়ি জেলার কমলছড়ি গ্রামের পাশ দিয়ে চেঙ্গী নদী পার হওয়ার সময় নদীতে হাঁটু পানি থাকায় যাতে জুতা-প্যান্ট ভিজে নষ্ট না হয় সে-জন্য কমলছড়ি গ্রামের জনৈক মৃগাঙ্গ চাকমা মেজর জিয়াকে পিঠে তুলে নদী পার করে দেন। জিয়ার বাহিনীকে সহায়তা দেয়ার জন্য পাক-বাহিনী মহালছড়ির সভ্য মহাজন, গৌরাঙ্গ দেওয়ান ও চিত্তরঞ্জন কার্বারীকে ধরে নিয়ে যায়। পাকবাহিনী তাদেরকে আর ফেরত দেয়নি। তাদের লাশও পাওয়া যায়নি। শুধু তাই নয়, এজন্য অনেক জুম্ম নারী বিভিন্ন জায়গায় পাক সেনা সদস্যের ধর্ষণেরও শিকার হয়।

[লিংক]



পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সে সময় যে অল্প কয়েকজন পাহাড়ি আদিবাসী নিরাপত্তা বিভাগে সরকারি চাকরিতে ছিলেন, তাদের মধ্য অন্যদম শহীদ খগেন্দ্র নাথ চাকমা (দ্রষ্টব্য: সূচনা ছবি, তন্দ্রা চাকমা)। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কুমিল্লার মুরাদনগরে সার্কেল ইন্সপেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে শ্রী খগেন্দ্র নাথ চাকমা পাকিস্তানী বাহিনীর কর্তৃক নিহত হন।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশের প্রায় ৭৫ টি ভাষাগত সংখ্যালঘু জনজাতি্‌ আদিবাসী- মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ইউকে চিং হচ্ছেন একমাত্র বীরবিক্রম উপাধিপ্রাপ্ত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা। তিনিও সীমান্ত রক্ষী বাহিনী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস– ইপিআর’ এ কর্তব্যরত অবস্থায় ১৯৭১ সালে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ইপিআরের নায়েক হিসেবে তিনি রংপুরের হাতিবান্ধা বিওপিতে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে রংপুর ৬ নম্বর সেক্টরে মেজর বাশারের নেতৃত্বে নয়জন বাঙালি ইপিআর সৈনিককে নিয়ে পাটগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করেন। দেশকে পাক হানাদার মুক্ত করতে বিওপিতে কর্মরত একজন বিহারি ও দুজন পাঞ্জাবিকে হত্যা করেন তিনি। টানা নয় মাস সম্মুখ যুদ্ধ করে দেশকে শত্রুমুক্ত করেন ইউকে চিং। তবে যদিও অভাব-অনটন এখন ৭৭ বছর বয়সী এই বীরবিক্রমের নিত্য সঙ্গী। অসংখ্য পদক বা সরকারি সন্মাননা — কোনটিই এই বীর যোদ্ধার বাকি জীবন ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারছে না (দ্রষ্টব্য ছবি: বাংলানিউজ টোয়েন্টফোর ডটকম)।

[লিংক]

স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে ভাষাগত সংখ্যালঘু জনজাতি গোষ্ঠিগুলো উপেক্ষিত থেকে যাওয়ার ধারাবাহিকতায় বরাবরই মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের পাতায় উপেক্ষিত থেকে যায় আদিবাসী, উপেক্ষিত থেকে যায় ১৯৭১ এর তাদের প্রতিরোধ লড়াই, সব ধরণের আত্নগ্যাগ, এমন কি মুক্তিযুদ্ধের শেষপ্রান্তেও এসে মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ রাইফেলস — বিডিআর নামধারী কতিপয় বিপথগামী দুর্বৃত্তের হত্যাযজ্ঞ, যা এই ধারাবাহিকের প্রথম পর্বে বর্ণনা করা হয়েছে।

তাই বাংলাদেশ যেমন বহু জাতি, বহু ভাষা ও বহু সংস্কৃতির দেশ, এদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও তেমনি বহু জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের আত্নত্যাগের ইতিহাসে বর্ণিল।
___________________________
http://mukto-mona.com/bangla_blog/?p=21204


Name:  বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:15 Dec 2012 -- 07:00 PM

দেশের একমাত্র আদিবাসী বীরবিক্রম ইউকেচিং
এস বাসু দাশ, জেলা প্রতিনিধি
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
______________________________________
বান্দরবান : বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি এই ৩ পার্বত্য জেলাসহ সারা দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ইউকেচিং হচ্ছেন একমাত্র বীরবিক্রম উপাধিপ্রাপ্ত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা।

মুক্তিযুদ্ধে তার অসামান্য অবদানের কথা এসে যায় ইতিহাসের পাতা উল্টালেই। যদিও
অভাব-অনটন এখন ৭৭ বছর বয়সী এই বীরবিক্রমের নিত্য সঙ্গী। তিনি এখন চিন্তিত তার বাকি জীবন ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে তিনি যুদ্ধে যোগ দেন। ২৫ মার্চ ইপিআরের নায়েক হিসেবে তিনি রংপুরের হাতিবান্ধা বিওপিতে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে রংপুর ৬ নম্বর সেক্টরে মেজর বাশারের নেতৃত্বে ৯ বাংলাদেশি ইপিআর সৈনিককে নিয়ে পাটগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করেন। দেশকে পাক হানাদার মুক্ত করতে বিওপিতে কর্মরত ১ বিহারি ও ২ পাঞ্জাবিকে হত্যা করেন তিনি। টানা নয় মাস সম্মুখ যুদ্ধ করে দেশকে শত্রুমুক্ত করেন তিনি।

বাংলাদেশ সরকারের দেয়া খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৬৭৬ জন। এর মধ্যে ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ, ৬৮ জন বীরউত্তম, ১৭৫ জন বীরবিক্রম ও ৪২৬ জনকে বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত করে সরকার।

স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ইউকেচিংকে বীরবিক্রম উপাধিতে ভূষিত করে সরকার।

ইউকেচিং বিভিন্ন সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন।

বীরবিক্রম ইউকেচিং বাংলানিউজকে জানান, অভাব নিত্যসঙ্গী হলেও তিনি তার ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দেননি কোনদিন, কারও কাছে হাত পাতেননি। ২ ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার চালাতে তার বেশ কষ্ট হয়। তার ছেলে মেয়েরা সাঙ্গু নদীর চরে অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করে যা আয় করেন তা দিয়ে কোন মতে প্রতিদিনের আহারের জোগাড় হচ্ছে।

বান্দরবানের সাঙ্গু নদীর তীর ঘেঁষে পাহাড়ের পাদদেশে লাংগিপাড়ায় ১ জীর্ণশীর্ণ ঘরে পরিবার নিয়ে বাস করতেন ইউকেচিং। পরে ২০১০ সালে বান্দরবান ৬৯ পদাতিক ব্রিগেডের পক্ষ থেকে তার বাড়িটি পুননির্মাণ করে দেয়া হয়। গত বছর তার নামে স্থানীয় ১টি সড়কেরও নামকরণ করা হয়।

গত বছরের ১৩ অক্টোবর তার হাতে দেড় লক্ষ টাকার চেক তুলে দেয় জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মাননা ভাতা পেলেও এর বাইরে তেমন কোন আর্থিক সহায়তা পাননি তিনি।

এরপরও এই বীরবিক্রম বাংলানিউজকে বলেন, ‘দেশমাতৃকার জন্য যুদ্ধ করে আমি মহাখুশি, ১টি স্বাধীন দেশ পেয়েছি, নতুন লাল সবুজের পতাকা পেয়েছি, এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে।’

তবে স্থানীয় অনেকে মনে করেন, দেশের অন্য বীরবিক্রম উপাধিপ্রাপ্তদের মতো ইউকেচিংয়ের সম্মান এবং সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি।

বাংলাদেশ সময় : ১৫৪৪ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ১৩, ২০১১
_____________________
http://www.banglanews24.com/l/details.php?nssl=601ae2494ebe4209648c3b6
d750350d4



Name:  বিপ্লব রহমান           

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:15 Dec 2012 -- 07:02 PM

মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী :: গুচ সংকলন
http://www.guruchandali.com/guruchandali.Controller?portletId=8&porlet
Page=2&contentType=content&uri=content1324204680893#.UMx5g-SGzIc



Name:  বিপ্লব রহমান           

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:15 Dec 2012 -- 07:07 PM

১৯৭১: সূচনাপর্ব
বিপ্লব রহমান
______________________
০১. ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে ১৯৭১ এর মহান জনযুদ্ধটি মুক্তিযুদ্ধই ছিলো, এটি ছিলো ছাত্র-শিক্ষক-জনতা-সাধারণ মানুষ সকলের মুক্তির সংগ্রাম, মোটেও কেবলমাত্র স্বাধীনতার সংগ্রাম বা একখণ্ড দেশপ্রাপ্তির লড়াই তো নয়ই [এ কারণেই আদিবাসীরাও বাঙালির পাশাপাশি এতে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেন, স্বাধীন দেশে সব রকমের মুক্তির স্বপ্ন দেখেন তারাও, যদিও যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে তাদের সে স্বপ্ন নির্মমভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, 'তোরা সব বাঙালি হইয়া যা' ], শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলার মানুষের স্পিরিটটুকু ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়, বাঙালি ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন প্রায় কিংবদন্তীতুল্য নেতা, বঙ্গবন্ধু [এতে নিজস্বপন্থায় বিপ্লবকাঙ্খায় সরাসরি অংশ নিয়ে অবদান রাখে কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন দল ও উপদল, এমকি সিরাজ সিকদার, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে তাদের সকলকেই মুজিব-জিয়া স্বৈর শাসনে নির্মমভাবে খুন হতে দেখা যায়, উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রপাগান্ডায় তারা থাকেন উপেক্ষিত এবং 'কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?'], সাতের দশকে অগ্নিগর্ভ পূর্ব বাংলায় শেখ মুজিব ও বাংলাদেশ এক পর্যায়ে সমর্থক হয়ে পড়ে [স্বাধীনতার পর সেই মোহ চূর্ণ হয় অচিরেই, বঙ্গবন্ধু শেষ পর্যন্ত আর বঙ্গের বন্ধু থাকেননি, নায়ক থেকে খলনায়কে তার উত্তোরণ ঘটে দ্রুত, সহযোগি ভক্তকূল তাকে সামনে রেখে সব রকম দেশবিরোধীতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও লুঠপাটে মত্ত হয়], যদিও মুক্তিযুদ্ধের নিয়ামক এই শক্তিটি এর আগে ১৯৪৭-এ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় জোর ভূমিকা রেখেছে।

সে সময় একমাত্র বাংলা এবং পাঞ্জাব প্রদেশেই মুসলিম লীগ সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জোরেই মুসলিম লীগ পাকিস্তানের সম্বাবনা ভারতবর্ষের বাদবাকি মুসলমানদের দেখাতে সাহস করে। তখন শেখ মুজিবও সেই আন্দোলনেরই বলিষ্ঠকর্মি ছিলেন [এবং মওলানা ভাষানী]। শেখ মুজিব তখন মুসলিম লীগের রক্ষণশীল সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের কর্মি ছিলেন। সোহরাওয়ার্দীদের বিরুদ্ধে ছিলেন আবুল হাশিমের মতো প্রগতিশীল তরুণ নেতা। বাংলার অখণ্ডতা ঠেকাতে আবুল হাশিম-শরত বোস প্রমুখের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় ১৯৪৭-এর পর আবুল হাশিম রাজনীতিই ছেড়ে দেন। কিন্তু শেখ মুজিব টিকে থাকেন। হাশিমপন্থীরা গোপনে কমিউনিস্টদের সমর্থন দিতে থাকে আওয়ামী লীগের ভেতর। তার বাইরে স্বতন্ত্র ছাত্র-যুব সংগঠনও করতেন তারা, সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যও ছিলোন।

০২. পাক উপনিবেশটি ক্রমেই পূর্ব বাংলার হাতে-পায়ে শেকল হয়ে এঁটে বসে। পাকিস্তানে প্রথমত আঘাত হানেন তারাই, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে, এর আগে হাজং বিদ্রোহের সশস্ত্র লড়াইয়ে। ১৯৫২-র পরপরই কমিউনিষ্টরা স্পষ্ট বুঝেছিলেন পাক শাসনে মুক্তি নেই, নইলে কৃষক-শ্রমিক স্বরাজও সম্ভব নয়, বাংলাকে স্বাধীন না করলে রাষ্ট্র বিপ্লবও সম্ভব নয়। ভাষা আন্দোলনের অগ্রসর কর্মি — ভাষা মতিন, অলি আহাদদের পরের কার্যক্রম দেখলে সেটা মনে হয়।

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট গঠন করে বাঙালিদের সব দল এক হয়ে মুসলিম লীগকে শেকড়শুদ্ধ উপড়ে ফেলে দেশ স্বাধীনের শর্ত তৈরী করে, মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নযাত্রা শুরু এরই আগেই হয়। তখন স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার দুটি স্পষ্ট ধারা সমান্তরাল চলতে শুরু করে। একদিকে কমিউনিষ্ট প্রভাবিত ছাত্ররা সশস্ত্র গণযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাকে স্বাধীন করতে চান, আরেকদিকে জাতীয় নেতৃত্বের প্রতি আস্থায় সাংবিধানিক পথে পূর্ণ স্বাত্তশাসনের মাধ্যমে অখণ্ড পাকিস্তানের জায়গায় ফেডারেল পাকিস্তানের স্বপ্ন। শেষোক্ত এই ধারাটিই ২১ দফার প্রবক্তা।

কিন্তু পাক সরকার ২১ দফা মানতে প্রবলভাবে অস্বীকার করে, মাওলানা ভাসানী ১৯৫৬-তে ঘোষণা করেন, এ রকম হলে বাঙালিরা আলাদা রাস্তা ধরবে, এক সঙ্গে থাকবে না। সোহরাওয়ার্দীর প্রধান অনুসারী শেখ মুজিব তার নেতার পথেই থাকেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্র্দী মত দেন, ৯৮ ভাগ স্বাধীনতা তো দেওয়াই হয়েছে।

০৩. আইয়ুব শাহী কমিউনিস্ট কার্যক্রম নিষিদ্ধ করলে তাদের একটি বড় অংশ মওলানা ভাষানীর সমর্থক হয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে থাকেন। কাগমারি সম্মেলনে দলে দলে বিপ্লবী কমিউস্টরা যোগ দেন ['পাকিস্তান, ওয়ালাইকুম আস সালামালাইকুম']। আমেরিকার সঙ্গে সামরিক চুক্তির পক্ষে-বিপক্ষের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ভাগ হয়। মুসলিম কাম মার্কিন কাম পাকিস্তানপন্থীদের নেতা থাকেন সোহরাওয়ার্দী ও মুজিব। ভাষানী ন্যাপ গঠন করে পৃথক হন।

আওয়ামী লীগের ভেতরের কমিউনিস্টপন্থীরা তখন মস্কো-চীন দুই গ্রুপে ভাগ হয়। তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় এর আগেই কমিউনিস্টদের অপর অংশটি আওয়ামী লীগে ঢুকেছিলো। মস্কোওয়ালারা চলে যায় মুজিবের সঙ্গে আর চীনারা ভাষানীর সঙ্গে।

১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি সোহরাওয়াদী গ্রেফতার হলে ৩১ জানুয়ারি ৪ টি ছাত্র সংগঠন মধুর ক্যান্টিনে যৌথভাবে বসে। সভা থেকে আন্দোলনের কর্মসূচি নেওয়া হয়। সকল আন্দোলন কর্মসূচিকে সংগঠিতভাবে রূপ দেওয়ার জন্য ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ পাকিস্তান স্টুডেন্ট ফোরাম নামে সাধারণ ছাত্রদের একটি মোর্চা গঠন করে। এরই মধ্যে একদল জঙ্গি ছাত্র বেঙ্গল লিবারেশন ফোর্স নামে একটি বাহিনী তৈরি করে। ছাত্ররা তখনই বুঝেছিলো, তাদের লড়তে হবে আইয়ুব শাহীর সেনাদের সঙ্গেই। স্বাধীনতার দুই পথের পার্থক্য তখন আরো স্পষ্ট হয়।

০৪. উপমহাদেশ ও বিশ্ব রাজনীতিতে ১৯৬৫-৬৬ সালে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকট হয়। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে একমাত্র বাঙালিরাই বীরের মতো লড়ে পাকিস্তানের সন্মান অক্ষুন্ন রাখে। কিন্তু তারা দেখতে পায়, যুদ্ধে পূর্ব বাংলা অরক্ষিত ছিলো। সেটি বাঙালির বৈষম্যকে প্রকট করে। প্রণীত হয় ছয় দফা। যার প্রণোদনা এসেছিলো বামপন্থি শিক্ষক নাজমুল করিমের বই থেকে।

লক্ষনীয়, যে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো, সে দ্বিজাতিত্ত্বওয়ালারাই স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলো, পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের দুই অংশের জনগণ সমান নয়। এ থেকে আওয়ামী লীগ বামপন্থীদের প্রেরণায় তৈরি করলো বাঙালিদের আরেক দ্বিজাতিত্ত্ব, পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষ এক জাতি নন! সে সময় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবসহ ৩৪জন সশস্ত্র অভুত্থানের পরিকল্পনার অভিযোগে গ্রেফতার হন, তারা তা অস্বীকার করেন। পূর্ব বাংলা ক্ষুব্ধ থেকে বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল মুজিব জেলে ছিলেন।

অন্যদিকে, ১৯৬৬ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক বিপ্লববের ঢেউ সারা বিশ্বে আছড়ে পড়ে। গেরিলা যুদ্ধের মহানায়ক মাওসেতুং প্রদর্শিত সশস্ত্র বিপ্লবের ঢেউ আলোড়ণ তোলে ভারত ও পূর্ব বাংলায় [ 'মোর গাঁয়েরও সীমানায়/পাহাড়ের ওপারে/নিথীশ রাত্রির প্রতিধ্বনী শুনি/নতুন দিনের যেনো/পদধ্বনী শুনি', ভূপেন হাজারিকা]। ভিয়েতনাম ও কিউবার সশস্ত্র গেরিলা বিপ্লবী সংগ্রামও কমিউনিস্টদের উজ্জীবীত করে ['তোমার নাম, আমার নাম/ভিয়েতনাম! ভিয়েতনাম!']

আরো পরে ভারতের নকশাল বাড়ি আন্দোলনের নেতা চারু মজুদারের ‘শ্রেণী শত্রু খতমের লাইন’ও এপারের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে প্রভাবিত করে ['৭০ দশককে মুক্তির দশকে পরিনত করুন']। এরই পথ ধরে পরে বিপ্লবকাঙ্খি চীনপন্থী কমিউনিস্টরা নিজ নিজ নেতা ও তত্ত্বের সমর্থনে সশস্ত্র হতে শুরু করেন [এবং সিরাজ সিকদার]।

[দ্রষ্টব্য: সিরাজ সিকদার: অন্য আলোয় দেখা http://www.unmochon.net/node/639 ]

এদিকে আগরতলা ষড়যন্ত্রের ক্ষোভের পথ ধরে আসে ১৯৬৯ এর গণঅভুত্থান। ছাত্র-শ্রমিক-জনতার যুথবদ্ধ যে জঙ্গি আন্দোলন সে সময় হয়, তা-ই রচনা করে ১৯৭১ এর জনযুদ্ধের পটভূমি।

০৫. আরো লক্ষ্যনীয়, ১৯৫২ সালের পর তখনও শেখ মুজিব সংগ্রামের কেন্দ্রে ছিলেন না, প্রধান নেতাও ছিলেন না। ভাষানী, তোয়াহা এবং ছাত্রনেতারাই আন্দোলন চালিয়ে যান। তারা সেনা নিবাস ঘেরাও করে শেখ মুজিবকে মুক্ত করেন। কিন্তু শেখ মুজিব আবারো তার অতি চেনা নির্বাচনের পথেই হাঁটলেন। তখন তার জন্য সেটিই ছিলো স্বাভাবিক ও সহজ। কারণ তিনি বিপ্লবী ছিলেন না, ভাষানী মতের তো নয়ই। ১৯৭০ এর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন ন্যাপ-ভাষানী এবং প্রায় সকল কমিউনিস্ট পার্টি বর্জন করে। ভাষানীর শ্লোগান ছিলো: ভোটের আগে ভাতা চাই। কমিউনিস্ট শ্লোগান ছিলো: ভোটের বাক্সে লাথি মারো, সমাজতন্ত্র কায়েম করো। বামপন্থীদের একটা বড় অংশ এবং ছাত্ররা মিলে তখনই স্বাধীন পূর্ব বাংলার কর্মসূচি ঘোষণা করে [এবং সিরাজ শিকদার]। তারা বাহিনী গঠনের কাজে মন দেন; মুজিবের প্রস্তুতি ছিলো নির্বাচন কেন্দ্রীক।

ভাসানী ও চীনাপন্থীরাও নির্বাচন বাদ দিয়ে জনযুদ্ধ তথা মুক্তিযুদ্ধের জমিন তৈরিতে ব্যস্ত হন। সে সময়, ভাষানী বা মুজিব, কে কার থেকে বেশী জনপ্রিয় তা বোঝা ছিলো মুশকিল। তবে তখন শহর থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জে কমিউনিষ্টদের সাংগঠনিকভিত্তি ছিলো দৃঢ়। কোনো জোর প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় ভোটে শেখ মুজিব নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেন।

নির্বাচনের কয়েকদিন আগেই উপকূলীয় অঞ্চলে বিরাট ঘূর্ণিঝড়ে কয় লাখ মানুষ মারা যায়। ভাসানী সেখানে ত্রাণ দিয়ে এসে পত্রিকায় বিবৃতি দিলেন, ‘ওরা কেউ আসেনি’ [পাক সরকার]। নির্বাচনোত্তর ক্ষমতা মুজিবের কাছে হস্তান্তর করতে পাক-সরকার কালক্ষেপন করতে থাকে। আসলে তারা সময় নিচ্ছিলো সামরিক প্রস্তুতির। ভেতরে ভেতরে প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ভাষানীর জনসমর্থনও বাড়তে থাকে ['ভোটের বাক্সে লাথি মারো']।

০৬. ১৯৭১ এর ৩ জানুয়ারি, নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি আবার রমনা রেসকোর্স ময়দানে গণআবেদন তৈরি করতে সক্ষম হয়। এদিন সেখানে আইনসভার সকল পূর্ব পাকিস্তানী সদস্যদের সভা ডাকেন শেখ মুজিব। তিনি তাদের শপথ বাক্য পাঠ করান, তারা আওয়ামী লীগের ছয় দফা ও সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা দাবিনামার প্রতি বিশ্বস্ত থাকবেন।

১৯৭১ এর ফেব্রুয়ারি- মার্চের ঘটনাবলি স্বাক্ষ্য দেয়, ফেডারেল পাকিস্তানের সম্ভাবনা বাস্তবে আর সম্ভব নয়। কিন্তু তখনো পাকিস্তানের মধ্যে ছয় দফার বাস্তবায়নের কাঁঠালের আমস্বত্তটি মুজিবের কাছে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়নি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকল্পনাতেই অনঢ় ছিলেন। কারণ কারণ নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি ছিলো তার অগাধ আস্থা, নির্বাচনী রায় এবং জনগণের সমর্থনে এরচেয়ে বেশী তার কাছে আশা করাও বাতুলতা [মুজিব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্বের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েছিলেন]।

তবে বাস্তবতার কঠিন জমিনে শিগগিরই তিনি নেমে আসেন। ১৯৭১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ইয়াহিয়া ঘোষণা করেন, জাতীয় পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হবে ৩ মার্চ, ঢাকায়। ১৫ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো ঘোষণা দেন, ছয় দফা জনিত সৃষ্টি জটিলতার অবসান না হলে তার দল জাতীয় পরিষদের সভায় যোগ দেবে না। ২১ ফেব্রুয়ারি মুজিব কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে দাঁড়িয়ে আবারও ছয় দফার ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসন আদায়ে তার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

এ পর্যায়ে পাক চক্রান্ত আরো প্রকাশ্য হয়। ইয়াহিয়া মন্ত্রীসভা ভেঙে দিয়ে জেনারেলদের বৈঠক করে নিজস্ব কায়দার সঙ্কট সমাধান করতে উদ্যোগ নেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি মুজিব সাংবাদিকদের বলেন, অধিকার আদায় ও স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠায় পুর্ব পাকিস্তান দরকার হলে লড়াই করবে। ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সকল সদস্যের কাছে ঢাকা অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু পরের দিন ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দেন।

এ হেন খবরে ঢাকা ও চট্টগ্রামের জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। লাখ লাখ ছাত্র-জনতা ঢাকার পূর্বাণী হোটেলে, আওয়ামী লীগের কাউন্সিলস্থলে জড়ো হন। তারা সেখানে দাঁড়িয়ে দাবি তোলেন, শেখ মুজিব যেনো এখনই জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করেন। তারা পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে বিক্ষোভ করে।

এদিকে, ছাত্রনেতারা সংগ্রামের প্রস্তুতির জন্য ‘স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে। এর নেতা ছিলেন নুরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, আসম আব্দুর রব এবং রুহুল কুদ্দুস মাখন [খলিফা চতুষ্টয়]। তারা স্বাধীনতার সংগ্রামে যৌথভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৭১ সালের মার্চে এই প্রথম স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রস্তুতি প্রধান ধারা হয়ে ওঠে [অবশ্যই মুজিবও তার 'নিয়মতান্ত্রিক স্বায়ত্তশাসন' দাবি থেকে ক্রমেই সরে আসেন, তবে এই মোহভঙ্গ হতে একটি গণহত্যার প্রয়োজন পড়ে এবং আত্নসমর্পন]। এই দাবির শক্তি ও জনসমর্থন সাংবিধানিক নিয়মতান্ত্রিকপন্থী তো ছিলোই না, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধই ছিলো এর একমাত্র লক্ষ্য। ২ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে ছিলো স্বতষ্ফূর্ত হরতাল। ঢাকা এবং এর আশেপাশের এলাকা থেকে অগনিত মানুষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় সমবেত হন। সেখানে ছাত্র-জনতা জাতীয় স্বাধীনতার ধ্বনী তোলে এবং স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা দৃঢ় সিদ্ধান্তে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র পরিষদের ভিপি, ছাত্রলীগ নেতা আসম আব্দুর রব বিপুল করতালি ও গগনবিদারী জয়োধ্বনী ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন [পতাকার নকশাবিদ শিবনারায়ন দাস]।

০৭. এ ভাবেই জনগণের নিরঙ্কুশ সমর্থন ইত্যাদির পরও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ শেষ হয়ে যায়। দেশ এগিয়ে চলে ইতিহাসের নির্ধারিত পথে– রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামে। পরের ঘটনাবলীও তাই অনিবার্যভাবে সেই সংঘাতের দিকেই ধাবিত হয়। শেষে ২৫ মার্চ রাতে জাতি মুখোমুখি হয় সামরিক জান্তার ভয়াল আক্রমনের [ওই সন্ধ্যাতেও মুজিব গোল টেবিল বৈঠক চালিয়ে গেছেন, সমঝোতার পথ]।

স্পষ্টতই তিনি ভুল পথে হেঁটেছিলেন, ওই সান্ধ্য-বৈঠক সে প্রমানই বহন করেন। মুজিব ব্যাখ্যা মতে, তিনি ভারতের কাছে যেতে চাননি [কিন্তু যেতে কী হয়নি, যেতে কী হতো না?] এবং তিনি লোকক্ষয় এড়াতে বৈঠক অব্যহত রেখেছিলেন [ কিন্তু গণহত্যা কী এড়ানো গেছে? বরং পূর্ব প্রস্তুতি থাকলে লোকক্ষয় আরো কত হতো, প্রতিরোধ লড়াইটি হতো অনেক জোরদার]।

৭ মার্চ মুজিব গণসমূদ্রে উচ্চারণ করেছিলেন সেই অস্মরণীয় কাব্য ‘এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’। কিন্তু লক্ষ্যনীয়, ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো/ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ো’ ছাড়া যুদ্ধের জন্য মুজিব অনুসারীদের তখনো কোনো প্রস্তুতিই ছিলো না।

নির্মোহ বিচারে ৭ মার্চের ভাষণের কাব্যময় আবেগকে মুজিব নিজেই ধারণ করেননি [মার্চের আগে তো নয়ই]। ‘যার যা কিছূ আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে’ হুংকারের পর দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে তিনি জনতার হাতে লাঠি ধরিয়ে দিয়েছেন! স্বাধীনতা সংগ্রামের এমন নেতার এ হেন নজির বিশ্বজোড়া মেলা দায়ই বটে। বিশ্বের আর কোনো নেতা যুদ্ধ ঘোষণা করে আত্মসমর্পণের জন্য ঘরে বসে থেকেছেন? নাকি তখনো তিনি পাক- প্রধামন্ত্রীত্বের খোয়াবে বিভোর ছিলেন? গুঢ় বাস্তবতা এই যে, মুজিব তখনো মার্কিনের বন্ধু ছিলেন, তাদের কাছেই সমাধান চাইছিলেন [দ্র. সম্প্রতি প্রকাশিত সিআইএ-এর নথি]। মুজিব সারা জীবন নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন, আলোচনা ও নির্বাচন করে এসে জনযুদ্ধের দাবি মেটাতে না পেরে কারাবরণ করেন। তার অনুসারী আওয়ামী নেতারা জাতিকে অরক্ষিত রেখে যে যেভাবে পারেন ভারতে চলে গেলেন।

মুক্তিকামী জাতি দেশেই থেকে সমাজকে বাঁচিয়ে রেখেছে, সন্তানদের পাঠিয়েছে রণাঙ্গনে। গণহত্যার পর গণহত্যা, ধর্ষনের পর ধর্ষন, জ্বলে-পুড়ে খাঁক হতে হতে পুরো জাতি তার জাতীয় নেতাকে ছাড়াই যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে [যদিও লক্ষন রণনীতিতে মুক্তিযুদ্ধটি এবং স্বাধীনতার সংগ্রামটি হয়েছে শেখ মুজিবের নামেই, এর নেতৃত্বে থাকে আওয়ামীলীগ।]


[দ্রষ্টব্য: শেখ মুজিব- আহমেদ শরীফের ডায়েরী থেকে- http://www.amarblog.com/raselpervez/posts/76302]

০৮, [পুনর্বার, অতএব সংক্ষেপে] আমরা যারা প্রজন্ম ৭১, তারা অসংখ্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই-পত্র পড়ে, চলচ্চিত্র দেখে, স্বাধীন বাংলা বেতারের গান শুনে, জহির রায়হান, তারেক মাসুদ, জাহানারা ইমাম, অ্যান্থনী মাসকেরেনহাস তো বটেই..[এমন কি ড. আহমদ শরীফ এবং সিরাজ সিকদার]…ইত্যাদিতে মুক্তিযুদ্ধের সব ঘটনা প্রবাহ বুঝতে চেষ্টা করি।

অনুধাবন করার চেষ্টা করি, বাঙালির গৌরবের শ্রেষ্ঠ ইতিহাসের ঘটনাটিকে অনুধাবনের জন্য এবং যুদ্ধোত্তোর বাংলাদেশ। …এই পঠন-পাঠনটিও অব্যহত থাকে এবং বিতর্ক তো বটেই।

তবে ইতিহাসের ঘটনাবলিকে [ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব শেখ মুজিব তো বটেই] বোধহয় নির্মোহভাবেই দেখা ভালো। এখানে আবেগতাড়িত হয়ে ভাব-বুদ্বুদে মজে গিয়ে দেবোত্ব আরোপ করার যৌক্তিকতা দেখি না। মুক্তিযুদ্ধের বিপরীত এই পাঠটিকেই বরং বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া কর্তৃব্যজ্ঞান করি; কারণ শেষ পর্যন্ত এটি বাঙালির মুক্তিযুদ্ধই ছিলো, নিছক স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিলো না। এখানেই মুক্তি সংগ্রামের জনযুদ্ধটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে; যা দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও নানা মাত্রায় [চেতনা ও বিনির্মানে] অব্যহত রাখার দাবি রাখে।

এর সূচনা সাতের দশকে বাম ভাবাদর্শে সশস্ত্র পন্থায় হয়েছিলো, ১৯৭১ এ স্বাধীনতা একটি চূড়ান্তপর্ব মাত্র, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধটি শেষ হয়ে যায়নি, এটি অব্যহতভাবে এগিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম ও চেতনাটিকে অব্যহত রাখা জরুরি; যদিও শেখ মুজিব এবং আওয়ামী অনুসারীরা যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে এটিকে বরাবরই স্বাধীনতার সংগ্রামেই আটকে রাখতে চেয়েছে, বাঙালির মুক্তি সংগ্রামটিকে তারা শেষ পর্যন্ত [এবং কি নিষ্ঠুরভাবে পরের সব কয়েকটি অধ্যায়ে] জিইয়ে রাখতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। বাকশালী একনায়কতন্ত্র/ফ্যাসিজমের বিষবৃক্ষ মুজিব দর্শনের ঔরসজাত এই সীমাবদ্ধতারই ফল। অবশ্য আটার কলের কাছে আখের রস চেয়ে লাভ কী?

দেখতে পাই, মুক্তিযুদ্ধকে নিজস্বপন্থায় সে সময় যেসব কমিউনিস্ট পার্টি এগিয়ে নিতে চেয়েছিল [অধিকাংশই দক্ষিনপন্থা এবং চরমপন্থার ঝোঁকের কারণে শেষ পর্যন্ত হঠকারিতার চোরাবালিতে আটকে যায়, নকশালী কায়দায় আত্নঘাতিতায় নিক্ষিপ্ত হয়], পুরো সাতের দশক ধরে মওলানা ভাসানী তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়/সমর্থন দিলেও শেষ পর্যন্ত তিনিও তার সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন, অতি গুঢ় বাস্তবতা অনুভব করেই [আবার পাইপগান/এতো বেশী গরম হয়ে আসে যে/ক্রমশ এর ব্যবহার কমে আসছে]।

তাই আমাদের দেখার চোখটি যেনো সাদাকালো হয়, পরিশেষে এ আহ্বান জানাই।
____
গুচ'র অন্য একটি টই থেকে।



Name:   বিপ্লব রহমান          

IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:15 Dec 2012 -- 07:09 PM

সিরাজ সিকদার: অন্য আলোয় দেখা
লিখেছেন: বিপ্লব রহমান • প্রকাশকাল: 3 আগস্ট 2011 - 5:09অপরাহ্ন
_____________________________________________________
[এসএস'কে নিয়ে এ পর্যন্ত কম লেখা হয়নি। বেশীরভাগ লেখাই কোনো দলীয়স্বার্থ পূরণের জন্য। অনেকে ব্যক্তি এসএস'র জীবন নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করে তার বিপ্লবীত্বকে খাটো করেছেন। কেউ তাকে 'ভুল/বেহাত বিপ্লব'এর দোসর বলেই মূল্যায়নটি শেষ করতে চান। এই সব দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে বলে লেখার শিরোনামে 'অন্য আলোয় দেখা' কথাটি যুক্ত করা হয়েছে। এটি মোটেই এসএস'র কর্মকাণ্ডের সামগ্রীক মূল্যায়ন নয়। এটি ভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে নির্মোহভাবে এই শহীদ দেশপ্রেমিক বিপ্লবীকে দেখার একটি ছোট্ট প্রয়াস।]

আর কয়েকটা শত্রু খতম হলেই তো গ্রামগুলো আমাদের/ জনগণ যেনো জল, গেরিলারা মাছের মতো সাঁতরায়…সিরাজ সিকদার।

অস্ত্র কোনো নির্ধারক শক্তিনয়, নির্ধারক শক্তি হচ্ছে মানুষ। সংগঠিত জনগণ অ্যাটম বোমার চেয়েও শক্তিশালী।…মাওসেতুং।



১। সর্বহারা পার্টি গঠন, ১৯৭১
গেরিলা যুদ্ধের মহানায়ক মাওসেতুং-এর নেতৃত্বে চীনের বিপ্লব ও চীনের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ ছয়ের দশকের শেষভাগে সারা বিশ্বের মতো ছড়িয়ে পড়েছিলো যুদ্ধোপূর্ব বাংলাদেশেও। পাকিস্তানী শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট, অগ্নিগর্ভ পূর্ব বাংলাকে বেশ কয়েকটি বামপন্থী গ্রুপ সশস্ত্র পন্থায় মুক্ত করতে চেয়েছিলো।

এ সময় পাকিস্তানের অভ্যন্তরেও বিকশিত হতে থাকে জাতীয় মুক্তির প্রশ্ন। পাকিস্তানপর্বে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ থাকায় কমিউনিস্ট পার্টি মূলত আওয়ামী লীগ ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) মধ্যে মিশে গিয়ে কাজ করতে থাকে। পাকিস্তান সৃষ্টির কয়েক বছরের মধ্যেই বাঙালিদের স্বপ্নভঙ্গ হতে থাকে। এ পর্যায়ে কমিউনিস্ট পার্টি ও বামপন্থীরা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার নানা প্রক্রিয়া হাতে নেয়। এ সময় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনও জমে ওঠে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার নামে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয় লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন ও তাঁর সঙ্গীদের। মামলার শেষ পর্যায় এসে শেখ মুজিবুর রহমানকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।


অন্যদিকে ১৯৬৭ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির ফাশিদেওয়া, নকশালবাড়ীতে ঘটে যায় এ সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ। সেই বিদ্রোহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কমিউনিস্ট বিপ্লবের পথ হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ নেয় চারু মজুমদারের নেতৃত্বে একদল কমিউনিস্ট। পরে যাঁরা কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া-- সিপিআই (এমএল) নামে পার্টি তৈরি করেছিলেন, যা ভারতীয় উপমহাদেশে নকশাল আন্দোলন নামে পরিচিত হয়েছিল। নকশালবাড়ীর সেই প্রবল জোয়ার পূর্ব পাকিস্তানেও আছড়ে পড়ে।

পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি আগেই রুশ ও চীন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। একটি ধর্মভিত্তিক বৈরী রাজনৈতিক আবহাওয়ায় কমিউনিস্ট হিসেবে রাজনৈতিক চেতনা বিকাশের পথ তখন সহজ ছিল না, খুব কম লোকই সেই পথে এগোতে পেরেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলনে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের মেধাবী ছাত্র সিরাজুল হক সিকদার বা সিরাজ সিকদার। ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের ছাত্র বুয়েটের লিয়াকত হল শাখার সভাপতি সিরাজ সিকদার ওই বষয়েই পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) সদস্যপদ ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) চারু মজুমদারের সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের তত্ত্বকে হঠকারী হিসেবে আখ্যায়িত করল। এর প্রতিক্রিয়ায় পার্টি থেকে বেরিয়ে আসেন সিরাজ সিকদার।

এই উত্তাল পরিস্থিতিতে তরুন বিপ্লবী সিরাজ সিকদার প্রথমে মাওসেতুং গবেষণা কেন্দ্র নামে একটি পাঠচক্রের মাধ্যমে শিক্ষিত ও বিপ্লব আকাঙ্খী যুবকদের সংগঠিত করেন। ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি গঠন করেন পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন। প্রতিষ্ঠার পরেই এ গ্রুপটির মূল থিসিস ছিলো: পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের একটি উপনিবেশ এবং ‘জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের’ মাধ্যমে এ উপনিবেশের অবসান ঘটাতে হবে। এ লক্ষ্যে সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে একটি বিপ্লবী পরিষদ গঠিত হয়।

ছয়-দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ এর নির্বাচনের পর ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মনি সিংহের নেতৃত্বাধীন মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।

অন্যদিকে পিকিংপন্থী পূর্ব বাংলার কমিউন্স্টি পার্টির নেতৃত্বে ছিলো দুটি ভাগ। একটি অংশ টিপু বিশ্বাস ও দেবেন সিকদার মুক্তিযুদ্ধকে ‘জাতীয় মুক্তি আন্দোলন’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। অন্যদিকে মতিন-আলাউদ্দীনের দল ‘দুই শ্রেণী শত্রু’ মুক্তিবাহিনী ও পাক-বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করার পক্ষপাতি ছিলো। এ পার্টির নেতারা রাজশাহীর আত্রাই অঞ্চলে ছিলো বেশ তৎপর।

অন্যদিকে পিকিংপন্থী পূর্ব বাংলার কমিউন্স্টি পার্টির নেতৃত্বে ছিলো দুটি ভাগ। একটি অংশ টিপু বিশ্বাস ও দেবেন সিকদার মুক্তিযুদ্ধকে ‘জাতীয় মুক্তি আন্দোলন’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। অন্যদিকে মতিন-আলাউদ্দীনের দল ‘দুই শ্রেণী শত্রু’ মুক্তিবাহিনী ও পাক-বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করার পক্ষপাতি ছিলো। এ পার্টির নেতারা রাজশাহীর আত্রাই অঞ্চলে ছিলো বেশ তৎপর।

১৯৭১ সালের ২ মার্চ এই বিপ্লবী পরিষদ শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি লেখে, যা লিফলেট আকারে সারাদেশে প্রচার করা হয়। এতে স্পষ্ট লেখা হয়:

আপনার ও আপনার পার্টির ছয় দফা সংগ্রামের রক্তাক্ত ইহিতাস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে, ছয় দফার অর্থনৈতিক দাবিসমূহ বাস্তবায়ন সম্ভব সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যমে, পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন, মুক্ত ও স্বাধীন করে। আপনাকে ও আপনার পার্টিকে পূর্ব বাংলার সাত কোটি জনসাধারণ ভোট প্রদান করেছে পূর্ব বাংলার উপরস্থ পাকিস্তানের অবাঙালি শাসকগোষ্ঠীর ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের অবসান করে স্বাধীন ও সার্বভৌম পূর্ব বাংলা কায়েম করার জন্য। পূর্ব বাংলার জনগণের এ আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন আপনার প্রতি ও আওয়ামী লীগের প্রতি নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলো পেশ করছে :

১. পূর্ব বাংলার নির্বাচিত জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে এবং সংখ্যাগুরু জাতীয় পরিষদের নেতা হিসেবে স্বাধীন, গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ, প্রগতিশীল পূর্ব বাংলার গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা করুন।

২. পূর্ব বাংলার কৃষক-শ্রমিক, প্রকাশ্য ও গোপনে কার্যরত পূর্ব বাংলার দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক পার্টি ও ব্যক্তিদের প্রতিনিধি-সংবলিত স্বাধীন, শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ, প্রগতিশীল পূর্ব বাংলার প্রজাতন্ত্রের অস্থায়ী সরকার কায়েম করুন।

৩. পূর্ব বাংলাব্যাপী এ সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের আহ্বান জানান। এ উদ্দেশ্যে পূর্ব বাংলার জাতীয় মুক্তিবাহিনী গঠন এবং শহর ও গ্রামে জাতীয় শত্রু খতমের ও তাদের প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের আহ্বান জানান।


৪. পূর্ব বাংলার জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনার জন্য শ্রমিক-কৃষক এবং প্রকাশ্য ও গোপনে কার্যরত পূর্ব বাংলার দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক পার্টি ও ব্যক্তিদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে 'জাতীয় মুক্তি পরিষদ' বা 'জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট' গঠন করুন।

৫. প্রকাশ্য ও গোপন, শান্তিপূর্ণ ও সশস্ত্র, সংস্কারবাদী ও বিপ্লবী পদ্ধতিতে সংগ্রাম করার জন্য পূর্ব বাংলার জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।

(এরপর ৬ নম্বর পয়েন্টে শ্রমিক আন্দোলনের খোলা চিঠিতে ১৩টি করণীয় নির্ধারণ করে। এর মধ্যে গ্রামাঞ্চলে জমি বণ্টন, শ্রমিকদের শ্রম শোষণ বন্ধ, ভাষাগত, ধর্মীয়, জাতিগত সংখ্যালঘুদের সম-অধিকার দেওয়ার বিধানসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা হাজির করে)।

কিন্তু আওয়ামী নেতারা সিরাজ সিকদারের এই আহ্বান উপেক্ষা করেন, যা পরে গড়ায় দুই পার্টির এক রক্তাক্ত ইতিহাসে।

১৯৭০ সালে সিরাজ সিকদারের বিপ্লবী পরিষদ বিভিন্ন জেলায় পাকিস্তানী প্রশাসন ও শ্রেনী শত্রুর বিরুদ্ধে গেরিলা অপারেশন চালায়। ওই বছরের ৮ জানুয়ারি তারা ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ ও ময়মনসিংহে ওড়ায় স্বাধীন পূর্ব বাংলার পতাকা।

পাকিস্তানী বাহিনীর আকস্মিক হামলার পর সিরাজ সিকদার বরিশালের পেয়ারা বাগানে গড়ে তোলেন প্রতিরোধ যুদ্ধ। ৩০ এপ্রিল জন্ম নেয় জাতীয় মুক্তিবাহিনী। রণকৌশল নির্ধারণ ও যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সিরাজ সিকদারের সভাপতিত্বে প্রতিষ্ঠা হয় ‘সর্বোচ্চ সামরিক পরিচালনা কমিটি’। ৩ জুন পার্টির নতুন নাম দেয়া হয়: পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি।

বরিশাল থেকে শুরু করে দেশের কয়েকটি উপকূলীয় অঞ্চল–বিক্রমপুর, মানিকগঞ্জ, পাবনা, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় সর্বহারা পর্টির গেরিলারা পাক-বাহিনীর সঙ্গে বীরত্বপূর্ণ লড়াই করে।

সে সময় সর্বহারা পার্টি শত্রুমুক্ত এলাকায় (মুক্তাঞ্চল) বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনার জন্য বেশ কিছু পর্ষদ গঠন করে। কিন্তু এই সময় সিরাজ সিকদার ত্রি-মুখী লড়াইয়ের রণ কৌশল ঘোষণা করেন, যাতে সর্বহারা পার্টি ব্যপক লোকবল হারায়। আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে মুজিব বাহিনী ও সর্বহারা পার্টির মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বেশ কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়।

এমনই পরিস্থিতিতে অক্টোবরে সর্বহারা পার্টি দলের গেরিলাদের নির্দেশ দেয় পাক-বাহিনী, ভারতীয় বাহিনী ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করতে। কারণ সিরাজ সিকদার পাকিস্তানকে উপনিবেশবাদী , ভারতকে অধিপত্যবাদী এবং আওয়ামী লীগকে ভারতপন্থী আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।

নভেম্বরের মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থক মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে সর্বহারা পার্টির বহু সদস্য নিহত হয়েছিলো।

২। নকশালী মূল্যায়ন: আই অ্যাম দা পার্টি!
১৯৬৬ সালের চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের একটি বড় ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে দুই বাংলায়। ‘গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও’ মাওসেতুং এর এই দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধ, তথা সশস্ত্র কৃষক বিপ্লবের রনোনীতি গ্রহণ করে যুদ্ধপূর্ব সময়ের বামপন্থী দলগুলোর একাংশ। সাধারণভাবে এসব বামদলগুলো পিকিংপন্থী (পরে নকশাল) হিসেবে চিহ্নিত হয়। এরই একটি পূর্ব বাংলার কমিউন্স্টি পার্টি; এই পার্টির নেতৃত্বে ছিলো আবার দুটি ভাগ। একটি অংশ টিপু বিশ্বাস ও দেবেন সিকদার মুক্তিযুদ্ধকে ‘জাতীয় মুক্তি আন্দোলন’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তারা ১৯৭১ সালে রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, দিনাজপুরসহ উত্তরবঙ্গ এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে তোলেন পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ। তবে স্পষ্টতই এর বেশীরভাগ প্রতিরোধ যুদ্ধই পরিচালিত হয় মুজিব বাহিনীর বিরুদ্ধে।

এর আগে অগ্নিগর্ভ যুদ্ধপূর্ব বাংলাদেশে ১৯৬৯-৭০ সালে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানীর ন্যাপের নেতৃত্বে লাল টুপির সম্মেলন এবং সন্তোষ কৃষক সম্মেলনেও পিকিংপন্থী নেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (দেবেন সিকদার) কেন্দ্রীয় নেতা আজিজ মেহের ১৯৬৯ সালে সার্বক্ষনিক কর্মী হিসেবে পার্টির ঢাকা, ময়মনসিংহ ও বরিশাল আঞ্চল তদারকির দায়িত্ব পালন করেন। এরই মধ্যে ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের নয়া প্রেসিডেন্ট হিসেবে সারাদেশে সামরিক আইন জারী করেছেন।

প্রকাশ্য রাজনীতি ছেড়ে আত্নগোপনে থেকেই পার্টির নেতারা চেষ্টা করলেন মাওবাদী ছোট ছোট গ্রুপগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার। মূল দায়িত্ব দেয়া হলো আজিজ মেহেরকে। বরিশালে একজন অ্যাডভোকেটের নেতৃত্বাধীন গ্রুপের সঙ্গে আজিজ মেহেরের প্রথম দফা বৈঠক অসফল হয়। পরে মাওপন্থী ছাত্রদের একটি গ্রুপ তাদের কর্মসূচির সঙ্গে একাত্নতা প্রকাশ করে পার্টিতে যোগ দেয়। এর পর ঐক্যের ডাক নিয়ে আজিজ মেহের সাক্ষাৎ করেন সর্বহারা পার্টির প্রধান সিরাজ সিকদারের সঙ্গে।

বাকী কথা আজিজ মেহেরের ভাষ্যে:

…একটি গ্রুপ কমরেড সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে তখন বিকশিত হচ্ছে ঢাকায় এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। যদিও তার সম্পর্কে বামপন্থী-বুদ্ধিজীবী মহলে নানা বিভ্রান্তি। কেউ মনে করতেন, এরা অ্যাডভেঞ্চারিস্ট, সন্ত্রাসবাদী; কেউ মনে করতেন, সিরাজ সিকদার হচ্ছেন সিআইএ’র এজেন্ট। তবে আমাদের পার্টি এ বিষয়টি এমন একপেশে, যান্ত্রিকভাবে দেখতো না। আমি মনে করি, কমরেড সিরাজ সিকদারের একটি বিপ্লবী আকাঙ্খা ছিলো। কথাবার্তা, চলাফেরা– সবকিছুর মধ্যে ছিলো একটা আকর্ষণীয় ব্যপার। তরুণ ছাত্রকর্মী, যারা বিপ্লবের জন্য ছিলো ব্যাকুল, তারা সহজেই আকৃষ্ট হয়েছিলো। তারা কয়েকটা গেরিলা গ্রুপ করে, কয়েকটি সরকারি অফিসে বোমাবাজী করে, দেয়াল লিখনে বেশ সাড়া জাগিয়েছিলো। বিশেষ করে সিরাজ সিকদারের থিসিস আকৃষ্ট করেছিলো ছাত্র-তরুণদের।

কিন্তু আমরা মনে করতাম, এদের কর্মকাণ্ডে যতটা রোমান্টিক বিপ্লবী উপদান আছে, ততটা মার্কসীয় উপাদান নেই।

তবু অনেক চেস্টার পর ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় কমরেড সিরাজ সিকদারের সঙ্গে আমার দেখা হলো। উনি আমাদের পার্টির দলিলই পড়েননি! তার ব্যাগে দলিল ভড়ে দিলাম। সব শুনে উনি বললেন, ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার কোনো ইচ্ছা ‘তার বা তার পার্টির’ নেই। কথা শুনে মনে হলো: উনিই পার্টি!

কথাবার্তার সময় সিরাজ সিকদার বার বার তার কোটের পকেট থেকে মাওসেতুং এর লাল বই (কোটেশন ফ্রম মাওসেতুং, রেড বুক হিসেবে সারা বিশ্বে বহুল প্রচারিত) বের করে দু-এক পাতা দেখে নিচ্ছিলেন। ওনার শোল্ডার হোল্ডারে একটা রিভলবার দেখতে পেলাম। সব কিছুই যেনো একটা ‘শো’ বলে মনে হচ্ছিলো।

মনে হলো, উনি একজন উচ্চাকাঙ্খী বামপন্থী নেতা। রোমান্টিক কর্মকাণ্ডের জন্য তার গ্রুপের কিছুটা বিকাশ হয়তো হবে; তার কোনো ভবিষ্যত নেই। আমাদের পার্টির ঐক্য হলো না।…



৩। তোমার নাম, আমার নাম/ ভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম!
সাতের দশকের শুরুতে ওপারে ভারতে চারু মজুমদারের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট) বা সিপিআই (এম-এল) জলপাইগুড়ির নকশালবাড়িতে সফলভাবে সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ সংগঠিত করে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র একে ‘বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ’ হিসেবে চিহ্নিত করলে চারু মজুমদার পার্টিতে ঘোষণা করেন:

নকশালবাড়ির পথ ধরেই ভারতে কৃষক বিপ্লব বিদ্রোহ হবে; মাওসেতুং-এর দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধের পথই আমাদের পথ; জনযুদ্ধই মুক্তির সদন…

কলকাতার দেয়ালে লেখা হয়:

নকশালবাড়ি লাল সেলাম!

চীনের চেয়ারম্যান, আমাদের চেয়ারম্যান!

বন্দুকের নল থেকেই রাজনৈতিক ক্ষমতা বেরিয়ে আসে!

৭০এর দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করুন!

হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী চার মজুমদারের উদাত্ত আহ্বানে বিপ্লবের আগুনে ঝাঁপ দেয়।

সে সময় নকশালরা সাইকেলের পাইপ কেটে ছড়ড়ার বুলেট ব্যবহার করে হাতে তৈরি সিঙ্গেল শট বন্দুক ‘পাইপগান’ বানায়। আর পুলিশের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া থ্রি নট থ্রি রাইফেলের নল ও কুঁদো ছেটে ছোট আকৃতি দিয়ে তৈরি করা হয় সহজে বহনযোগ্য কাটা-রাইফেল। এছাড়া কাঁচের বোতলের ভেতর আলকাতরা ও পেট্রোলের মিশ্রনে তৈরি হয় মলটোভ বোমা। নকশালবাদী আন্দোলনে গ্রাম ও শহরে ‘শ্রেনী শত্রু খতমের লাইনে’ বিপ্লব করতে এই অস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার শুরু করে। সঙ্গে রাম দা তো ছিলোই।

নকশালবাদী আন্দোলনের ঢেউ এপারে মাওপন্থী বাম দলগুলোর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে, এ কথা আগেই বলা হয়েছে। সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি সরাসরি চারু মজুমদারের খতমের লাইন গ্রহণ না করলেও নকশালী কায়দায় জনবিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী লাইন, তথা জোতদার নিধন কর্মসূচি চালায়। এপারেও নকশালাইট ও সর্বহারাদের মধ্যে পাইপ গান ও কাটা রাইফল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

নকশালবাড়ি আন্দোলনের পটভূমিতে কবি সুবিমল মিশ্র লিখলেন:

আবার পাইপ গান এতো বেশী গরম হয়ে আসে যে, ক্রমশ এর ব্যবহার কমে আসছে। …

অর্থাৎ মাওবাদী গ্রুপগুলো সাতের দশকে ‘শ্রেণী শত্রু খতমের’ নামে যখন পাইপগানের যথেচ্ছ ও ব্যাপক ব্যবহার শুরু করে, এমন কী তা দলীয় কোন্দল মেটাতেও ব্যবহার হতে থাকে, তখন তারা আদর্শচ্যূত হয়ে পড়ে। জনযুদ্ধের অস্ত্রের বিপ্লবী ব্যবহার না হয়ে, তা ব্যবহত হতে থাকে গোষ্ঠি বিপ্লবের নামে, কখনো ব্যক্তি স্বার্থ রক্ষাতেও। …

পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) কেন্দীয় নেতা, নকশালপন্থী আজিজ মেহের নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলছেন, চারু মজুমদারের মতো এপাড়েও শিক্ষিত তরুণ সমাজ সহজেই সিরাজ সিকদারের বিপ্লবের থিসিসে আকৃষ্ট হয়।

সরকার বিরোধী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায়ে পাকিস্তান সরকার মুক্তিযুদ্ধের সময় আজিজ মেহেরকে আটক করে ব্যপক নির্যাতন করে এবং তাকে সশ্রম কারাদন্ড দিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয় ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে। নতুন রাজনৈতিক বন্দী এবং কয়েকজন বাঙালি জেল পুলিশের বরাতে তিনি তখন দেশের সব খবরাখবরই পেতেন। এমন কী পার্টির নেতাদের সঙ্গেও তার গোপন চিঠিপত্রের লেন দেন চলছিলো।

আজিজ মেহের বলেন,

…ওদিকে কিন্তু ভারতে নকশাল দমনের নামে হাজার হাজার তরুনকে হত্যা করা হচ্ছে; গ্রেফতার করে বিনা বিচারে আটক করে রাখা হচ্ছে। বাংলাদেশের বামেরা কখনো ডানে, কখনো বামে হেলছেন। কিন্তু তারা প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন, শ্রেণী শত্রু খতম করছেন, কখনো মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন। আমরা সব খবরই জেলে বসে বিশেষ চ্যানেলে পেতাম।

এই সময় কিউবায় ফিদেল ক্যাস্ট্রো-চে গুয়েভারার বিপ্লবী আন্দোলন এবং ভিয়েতনামে হো চি মিনের কৃষক বিপ্লব ওপার বাংলা-ওপার বাংলায় তরুনদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিলো। সারাদেশে শ্লোগান ওঠে:

তোমার নাম, আমার নাম
ভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম!

এদিকে ১৯৭২-৭৪ মাওবাদী বা পিকিংপন্থী গ্রুপগুলোর মধ্যে সশস্ত্রপন্থার রণোনীতি নিয়ে বিভেদ দেখা দেয়। শিগগিরই শুরু হয়ে যায় পরস্পরকে বহিস্কার ও মৃত্যূদণ্ড ঘোষণা। সিরাজ সিকদার সর্বহারা পার্টিকে নিস্কন্টক রাখতে ‘নিপাত চক্র’ নামে পার্টির ভেতরে একটি অনুগত গ্রুপ করেছিলেন। এদের মূল কাজ ছিলো, পার্টির ভেতরের প্রতিক্রিয়াশীলদের হত্যা করা।

আজিজ মেহের জেল খানার জীবনের স্মৃতি চারণ করে বলেন,

…আমাকে নিউ ২০ সেলে স্থানান্তর করা হলো। পাশের সেলে ছিলো বৃহত্তর বরিশালের কাকচিরা গ্রামের ও বরিশাল কলেজের ছাত্র কমরেড সেলিম শাহনেওয়াজ। সে ছিলো সিরাজ সিকদারের পার্টির সদস্য। ১৯৭১ এর পরে ১৯৭৩ এ পার্টির সঙ্গে মতানৈক্য হওয়ায় সিরাজ সিকদারের নির্দেশে এই আত্নত্যাগী তরুণকে হত্যা করা হয়। যেমন হত্যা করা হয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হুমায়ুন কবিরকে।…

যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে শেখ মুজিবের প্রধান রাজনৈতিক শত্রুতে পরিণত হয় মাওপন্থীরা।

আজিজ মেহের বলছেন,

(১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর জেল থেকে বেরিয়ে) আমি দ্রুত পার্টি লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম এবং (আত্ম-গোপনের জন্য) ঢাকায় কয়েকটি শেল্টার ঠিক করে ফেললাম। ১৯৭১ সালে আমাদের পার্টি বিশেষ এক অধিবেশনে চারু মজুমদারের নকশালী লাইন গ্রহণ করে। সে সময় তারা শ্রেণীশত্রু খতমের পাশাপাশি পাক-বাহিনীকেও মোকাবিলা করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তোয়াহা ও সিরাজ সিকদারের পার্টি একই রকম কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। ফলে বাংলাদেশ সরকার ও মুজিব বাহিনীর প্রধান টার্গেট ছিলো এই সব গ্রুপ। সারাদেশে ‘ধরো আর মারো’ শুরু হয়ে গেলো। শেখ মুজিব এক জনসভায় ঘোষণা করলেন: নকশাল দেখা মাত্র গুলি করা হবে। মওলানা ভাসানী প্রতিবাদ করে বিবৃতি দিলেন: নকশাল কারো গায়ে লেখা থাকে না। বিনা বিচারে কাউকে হত্যার অধিকার সরকারের নেই।…

এদিকে ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের দিনে সর্বহারা পার্টি সারাদেশে হরতালর ডাক দেয়। পার্টির মুখপত্র ‘স্ফুলিঙ্গ’ ও প্রচারপত্রে বলা হয়,

১৬ ডিসেম্বর হচ্ছে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদী শক্তির কাছে মুজিব সরকারের আত্ম সমর্পণ দিবস। একমাত্র জনযুদ্ধের মাধ্যমেই জনগণের বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠা করে প্রকৃত বিজয় আসতে পারে।

মাওবাদীদের বিরুদ্ধে মুজিব সরকারের ব্যপক দমন-পীড়ন, হত্যা-নির্যাতনের প্রতিবাদে সর্বহারা পার্টি ঢাকায় হরতাল আহ্বান করলে সন্তোষ থেকে মওলানা ভাসানী বিবৃতি দিয়ে একে সমর্থন করেন। হরতাল সফল হয়।…

৪। কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?
সাতের দশকের নকশাল নেতা আজিজ মেহের বলছেন:

১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের দিনে সর্বহারা পার্টি সারাদেশে হরতালর ডাক দেয়। পার্টির মুখপত্র ‘স্ফুলিঙ্গ’ ও প্রচারপত্রে বলা হয়, ১৬ ডিসেম্বর হচ্ছে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদী শক্তির কাছে মুজিব সরকারের আত্মসমর্পণ দিবস। একমাত্র জনযুদ্ধের মাধ্যমেই জনগণের বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠা করে প্রকৃত বিজয় আসতে পারে। মাওবাদীদের বিরুদ্ধে মুজিব সরকারের ব্যপক দমন-পীড়ন, হত্যা-নির্যাতনের প্রতিবাদে সর্বহারা পার্টি ঢাকায় হরতাল আহ্বান করলে সন্তোষ থেকে মওলানা ভাসানী বিবৃতি দিয়ে একে সমর্থণ করেন। হরতাল সফল হয়।…সশস্ত্র কার্যক্রমের মুখে মুজিব সরকার নকশাল ও সর্বহারা পার্টি নিধনে ব্যপক তৎপর হয়। সর্বহারা নেতা সিরাজ সিকদার পার্টির অন্তর্দ্বন্দ্বে ধরা পড়েন। মুজিব সরকার তাকে বন্দী অবস্থায় গুলি করে হত্যা করেন। …এটি ছিলো ১৯৭২-৭৫ এ মাওপন্থী নিধনযজ্ঞের একটি ধারাবাহিকতা মাত্র।

৪ জুন ১৯৯২ সালে সিরাজ সিকদারকে হত্যার দায়ে আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ ও মোহাম্মদ নাসিমসহ সাতজনকে আসামি করে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের (সিএমএম) আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। সিরাজ সিকদার পরিষদের সভাপতি শেখ মহিউদ্দিন আহমদ বাদী হয়ে এই মামলা করেন। মামলার আসামিরা হলেন : ১. সাবেক পুলিশ সুপার মাহবুব উদ্দিন আহমেদ, ২. আবদুর রাজ্জাক এমপি, ৩. তোফায়েল আহমেদ এমপি, ৪. সাবেক আইজিপি ই এ চৌধুরী, ৫. সাবেক রক্ষীবাহিনীর মহাপরিচালক কর্নেল (অব.) নূরুজ্জামান, ৭. মোহাম্মদ নাসিম এমপি গং। আসামিদের বিরুদ্ধে ৩০২ ও ১০৯ নম্বর ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

আর্জিতে বলা হয়, আসামিরা মরহুম শেখ মুজিবের সহচর ও অধীনস্থ কর্মী থেকে শেখ মুজিবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও গোপন শলা-পরামর্শে অংশগ্রহণ করতেন এবং ১ নং থেকে ৬ নং আসামি তৎকালীন সময়ে সরকারের উচ্চপদে থেকে অন্য ঘনিষ্ঠ সহচরদের সঙ্গে শেখ মুজিবের সিরাজ সিকদার হত্যার নীলনকশায় অংশগ্রহণ করেন। তাঁরা এ লক্ষ্যে সর্বহারা পার্টির বিভিন্ন কর্মীকে হত্যা, গুম, গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হয়রানি করতে থাকেন। সিরাজ সিকদারকে গ্রেপ্তার ও হত্যার বিবরণ দিয়ে আর্জিতে বলা হয়, মরহুম শেখ মুজিব ও উলি্লখিত আসামিরা তাঁদের অন্য সহযোগীদের সাহচর্যে সর্বহারা পার্টির মধ্যে সরকারের চর নিয়োগ করেন। এদের মধ্যে ই এ চৌধুরীর একজন নিকটাত্মীয়কেও চর হিসেবে নিয়োগ করা হয়। এভাবে ১৯৭৫ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকা থেকে অন্য একজনসহ সিরাজ সিকদারকে গ্রেপ্তার করে ওই দিনই বিমানে করে ঢাকায় আনা হয়। ঢাকার পুরনো বিমানবন্দরে নামিয়ে বিশেষ গাড়িতে করে বন্দিদের পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের মালিবাগস্থ অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সিরাজ সিকদারকে আলাদা করে তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়।

২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় পুলিশ ও রক্ষীবাহিনীর বিশেষ স্কোয়াডের অনুগত সদস্যরা গণভবনে মরহুম শেখ মুজিবের কাছে সিরাজ সিকদারকে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় নিয়ে যায়। সেখানে শেখ মুজিবের সঙ্গে তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মরহুম ক্যাপ্টেন (অব.) মনসুর আলীসহ আসামিরা, শেখ মুজিবের পুত্র মরহুম শেখ কামাল এবং ভাগ্নে মরহুম শেখ মনি উপস্থিত ছিলেন। আর্জিতে আরো বলা হয়, প্রথম দর্শনেই শেখ মুজিব সিরাজ সিকদারকে গালিগালাজ শুরু করেন। সিরাজ এর প্রতিবাদ করলে শেখ মুজিবসহ উপস্থিত সবাই তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। সিরাজ সে অবস্থায়ও শেখ মুজিবের পুত্র কর্তৃক সাধিত ব্যাংক ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপকর্ম, ভারতীয় সেবাদাসত্ব না করার, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শেখ মুজিবের কাছে দাবি জানালে শেখ মুজিব আরো উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। সে সময় ১ নং আসামি মাহবুব উদ্দিন তাঁর রিভলবারের বাঁট দিয়ে মাথায় আঘাত করলে সিরাজ সিকদার মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। শেখ কামাল রাগের মাথায় গুলি করলে সিরাজ সিকদারের হাতে লাগে। ওই সময় সব আসামি শেখ মুজিবের উপস্থিতিতেই তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কিল, ঘুষি, লাথি মারতে মারতে তাঁকে অজ্ঞান করে ফেলেন। এর পর শেখ মুজিব, মনসুর আলী এবং ২ থেকে ৭ নং আসামি সিরাজ সিকদারকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন এবং ১ নং আসামিকে নির্দেশ দেন। ১ নং আসামি মাহবুব উদ্দিন আহমদ আসামিদের সঙ্গে বন্দি সিরাজ সিকদারকে শেরে বাংলানগর রক্ষীবাহিনীর সদর দপ্তরে নিয়ে যান। এর পর তাঁর ওপর আরো নির্যাতন চালানো হয়। অবশেষে ২ জানুয়ারি আসামিদের উপস্থিতিতে রাত ১১টার দিকে রক্ষীবাহিনীর সদর দপ্তরেই সিরাজ সিকদারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে ১ নং আসামির সঙ্গে বিশেষ স্কোয়াডের সদস্যরা পূর্বপরিকল্পনা মতো বন্দি অবস্থায় নিহত সিরাজ সিকদারের লাশ সাভারের তালবাগ এলাকা হয়ে সাভার থানায় নিয়ে যায় এবং সাভার থানা পুলিশ পরের দিন ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মর্গে প্রেরণ করে।

এদিকে বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক অ্যান্থনী মাসকেরেনহাস ১৯৮৬ সালে ‘বাংলাদেশ: আ লিগেসি অব ব্লাড’ নামক প্রামান্য গ্রন্থে তুলে ধরেন সিরাজ সিকদার হত্যার বিস্তারিত দিক। এর আগে মুজিব সরকারের পতনের পর ১৯৭৬ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় এ সংক্রান্ত কিছু সাক্ষাতকারভিত্তিক তথ্য প্রকাশিত হয়।

বলা ভালো, মাসকেরেনহাসই প্রথম সাংবাদিক যিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে গিয়ে লন্ডনের দি সানডে টাইমস পত্রিকায় তখনকার বাংলাদেশ ভূখণ্ডে পাক-বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের চিত্র তুলে ধরে ধরেন। তার সেই নিবন্ধ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক প্রামান্যগ্রন্থ ‘দ্যা রেইপ অব বাংলাদেশ’ সারা বিশ্বে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত তৈরিতে গুরুত্পূর্ণ ভূমিকা রাখে। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এই সাংবাদিকের ছিলো একে ফজলুল হক, খাজা নাজিমুদ্দীন, শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমানসহ শীর্ষ স্থানীয় রাজনীতিবিদদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ।

‘বাংলাদেশ: আ লিগেসি অব ব্লাড’ গ্রন্থে মাসকেরেনহাস মুজিব হত্যা, তিন জাতীয় নেতা হত্যা, জিয়উর রহমান হত্যাসহ যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের নানা নাটকীয় ঘটনা নিজস্ব অনুসন্ধান থেকে বর্ণনা করেন। এ জন্য তিনি শাতাধিক সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলেন।

মাসকেরেনহাস বলছেন:

ঘটনাচক্রে মাওপন্থী সিরাজ সিকদার ১৯৭৪ সালে ডিসেম্বরের শেষ দিকে চট্টগ্রামের কাছাকাছি এক এলাকা থেকে (টেকনাফ) শেষ পর্যন্ত পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হলেন।

জাকারিয়া চৌধুরির (সিরাজ সিকদারের ছোটবোন, ভাস্কর শামীম সিকদারের স্বামী) মতে, তাকে পাহারা দিয়ে ঢাকায় আনা হলো শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করানো জন্য। শেখ মুজিব তাকে তার আয়ত্বে আনতে চাইলেন। কিন্তু সিকদার কোনো রকম আপোষ রফায় রাজী না হলে মুজিব পুলিশকে ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ গ্রহণ করতে বলে দিলেন।

জাকারিয়া বললো, সিরাজ সিকদারকে হাতকড়া লাগিয়ে চোখ-বাঁধা অবস্থায় রমনা রেস কোর্সের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নিয়ে আসা হয়। তারপর (২ জানুয়ারি ১৯৭৫) গভীর রাতে এক নির্জন রাস্তায় নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই সময় সরকারি প্রেসনোটে বলা হয় যে, ‘পালানোর চেষ্টাকালে সিরাজ সিকদারকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

সিকদারের বোন, জাকারিয়ার স্ত্রী শামীম জানায়, সিরাজের দেহের গুলির চিহ্ন পরিস্কার প্রমাণ করে যে, স্টেনগান দিয়ে তার বুকে ছয়টি গুলি করে তাকে মারা হয়েছিলো।

সিরাজ সিকদারকে, শেখ মুজিবের নির্দেশেই হত্যা করা হয়েছে বলে সারাদেশে রটে গেলো।

১৯ বছরের যুবতী শামীম তার ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।

সে আমাকে বলেছিলো, আমি সর্বহারা পার্টির কাছ থেকে একটা রিভলবার পেয়েছিলাম এবং এই হত্যাকারীকে হত্যা করার সুযোগের সন্ধান করছিলাম।

শামীম বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ভাস্করদের একজন। গত বছরই কেবল সে তার ভাস্কর্যের প্রেসিডেন্ট পুরস্কার লাভ করে। তার ধারণা, সে নিশ্চয়ই মুজিবকে গুলি করার দূরত্বে পেয়ে যাবে।

শামীম মুজিবের সঙ্গে দেখা করার জন্য বহুবার আর্জি পেশ করেছে। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। প্রতিবারই প্রত্যাখ্যাত হয়েছে সে। তারপর সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের কলা বিভাগে তার এক প্রদর্শনীতে শেখ মুজিবকে আমন্ত্রণ জানালো। মুজিব আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি সেখানে উপস্থিত হতে ব্যর্থ হলেন।

সে স্মৃতিচারণ করে বললো, আমি ভায়নক বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলাম। আমি শত চেষ্টা করেও তাঁকে (শেখ মুজিব) আমার গুলির আয়ত্বে আনতে পারলাম না।

ভাগ্যই মুজিবকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলো। শামীম জাকারিয়ার প্রেমে পড়ে যায়। শেষে তাদের বিয়ে হলে স্বামীর সঙ্গে শামীম বিদেশে চলে যায়।

এদিকে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদ অধিবেশন বসে। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস করানোর পর তার দ্বিতীয় বিপ্লব, বাকশাল প্রসঙ্গে শেখ মুজিব অধিবেশনে বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হওয়ার পর যারা এর বিরোধীতা করেছে, যারা শত্রুর দালালী করেছে, কোনো দেশেই তাদের ক্ষমা করা হয় নাই। কিন্তু আমরা করেছি। আমরা তাদের ক্ষমা করে দিয়ে বলেছি, দেশকে ভালোবাসো। দেশের স্বাধীনতা মেনে নাও। দেশের কাজ করো। কিন্তু