Parthasarathi Giri RSS feed

Parthasarathi Giriএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • মানবিক
    এনআরএস-এর ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এরকম ঘটনা বারেবারেই ঘটে চলেছে এবং ভবিষ্যতে ঘটতে চলেছে আরও। ঘটনাটি সমর্থনযোগ্য নয় অথবা ঘৃণ্য অথবা পাশবিক (আয়রনি); এই জাতীয় কোনো মন্তব্য করার জন্য এই লেখাটা লিখছি না। বরং অন্য কতগুলো কথা বলতে চাই। আমার মনে হয় এই ঘটনার ...
  • ডিগ্রি সংস্কৃতি
    মমতার সবৈতনিক শিক্ষানবিস শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগের ঘোষণায় চারপাশে প্রবল হইচই দেখছি। বিশেষ গাদা গাদা স্কুলে হাজার হাজার শিক্ষক পদ শূন্য, সেখানে শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ সংক্রান্ত ব্যাপারে কিছুই না করে এই ঘোষণাকে সস্তায় কাজ করিয়ে নেওয়ার তাল মনে হইয়া খুবই ...
  • বাংলাদেশের শিক্ষিত নারী
    দেশে কিছু মানুষ রয়েছে যারা নারী কে সব সময় বিবেচনা করে নারীর বিয়ে দিয়ে। মানে তাদের কাছে বিয়ে হচ্ছে একটা বাটখারা যা দিয়ে নারী কে সহজে পরিমাপ করে তারা। নারীর গায়ের রং কালো, বিয়ে দিতে সমস্যা হবে। নারী ক্লাস নাইন টেনে পড়ে? বিয়ের বয়স হয়ে গেছে। উচ্চ মাধ্যমিকে ...
  • #মারখা_মেমারিজ (পর্ব ৫)
    স্কিউ – মারখা (০৫.০৯.২০১৮)--------...
  • গন্ডোলার গান
    সে অনেককাল আগের কথা। আমার তখন ছাত্রাবস্থা। রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের টাকার ভরসায় ইটালি বেড়াতে গেছি। যেতে চেয়েছিলাম অস্ট্রিয়া, সুইৎজারল্যান্ড, স্ট্রাসবুর্গ। কারণ তখন সবে ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকাল শুনতে শুরু করেছি। মোৎজার্টে বুঁদ হয়ে আছি। কিন্তু রিসার্চ ...
  • শেকড় সংবাদ : চিম্বুকের পাহাড়ে কঠিন ম্রো জীবন
    বাংলাদেশের পার্বত্য জেলা বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমি অধিগ্রহণের ফলে উচ্ছেদ হওয়া প্রায় ৭৫০টি ম্রো আদিবাসী পাহাড়ি পরিবার হারিয়েছে অরণ্যঘেরা স্বাধীন জনপদ। ছবির মতো অনিন্দ্যসুন্দর পাহাড়ি গ্রাম, জুম চাষের (পাহাড়ের ঢালে বিশেষ চাষাবাদ) জমি, ...
  • নরেন হাঁসদার স্কুল।
    ছাটের বেড়ার ওপারে প্রশস্ত প্রাঙ্গণ। সেমুখো হতেই এক শ্যামাঙ্গী বুকের ওপর দু হাতের আঙুল ছোঁয়ায় --জোহার। মানে সাঁওতালিতে নমস্কার বা অভ্যর্থনা। তার পিছনে বারো থেকে চার বছরের ল্যান্ডাবাচ্চা। বসতে না বসতেই চাপাকলের শব্দ। কাচের গ্লাসে জল নিয়ে এক শিশু, --দিদি... ...
  • কীটদষ্ট
    কীটদষ্টএকটু একটু করে বিয়ারের মাথা ভাঙা বোতল টা আমি সুনয়নার যোনীর ভিতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছিলাম আর ওর চোখ বিস্ফারিত হয়ে ফেটে পড়তে চাইছিলো। মুখে ওরই ছেঁড়া প্যাডেড ডিজাইনার ব্রা'টা ঢোকানো তাই চিৎকার করতে পারছে না। কাটা মুরগীর মত ছটফট করছে, কিন্তু হাত পা কষে বাঁধা। ...
  • Ahmed Shafi Strikes Again!
    কয়দিন আগে শেখ হাসিনা কে কাওমি জননী উপাধি দিলেন শফি হুজুর। দাওরায় হাদিস কে মাস্টার্সের সমমর্যাদা দেওয়ায় এই উপাধি দেন হুজুর। আজকে হুজুর উল্টা সুরে গান ধরেছেন। মেয়েদের ক্লাস ফোর ফাইভের ওপরে পড়তে দেওয়া যাবে না বলে আবদার করেছেন তিনি। তাহলে যে কাওমি মাদ্রাসা ...
  • আলতামিরা
    ঝরনার ধারে ঘর আবছা স্বয়ম্বর ফেলেই এখানে আসা। বিষাদের যতো পাখিচোর কুঠুরিতে রাখিছিঁড়ে ফেলে দিই ভাষা৷ অরণ্যে আছে সাপ গিলে খায় সংলাপ হাওয়াতে ছড়ায় ধুলো। কুটিরে রেখেছি বই এবার তো পড়বোই আলোর কবিতাগুলো।শুঁড়িপথ ধরে হাঁটিফার্নে ঢেকেছে মাটিকুহকী লতার জাল ফিরে আসে ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

বইমেলা বইমেলা

Parthasarathi Giri



বইমেলা বইমেলা

▶️

পরমেশ জোয়ারদারের আমাশা কোনোকালে ছিল না। কখনও কবিতা লেখেননি এবং দুই হাতের দশ আঙুলে সর্বসাকুল্যে আটটি জিএসআই সার্টিফায়েড মহার্ঘ পাথররাজি।
পরমেশ বাবু কোল ইন্ডিয়ার অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্ট থেকে অবসর নেওয়ার কিছুদিন আগে মরিয়া হয়ে ছত্রিশ বছরের বিবাহিত পত্নীর সঙ্গে সেক্স করার চেষ্টা করেছেন। চাহিদা ও জোগানের সূত্র ব্রেকডাউন করে একটু দরকচা টাইপ হলেও, আদতে খুব একটা মন্দ ছিল না কম্মোটি। যদিও পত্নী সংযুক্তা দেবী এর জন্য তাঁকে বিস্তর বকাঝকা করেছেন, 'বুড়ো ভামের নেত্য' বলে কিম্ভুত উপমা দিয়েছেন, কিন্তু তিনিও যারপরনাই আহ্লাদিত হয়েছেন যে কত্তার হার্টসহ অঙ্গপ্রত্যঙ্গাদি বেশ জোরদারই আছে।
পরের দিন বিকেলে সহেলি সখীদের চায়ে নেমন্তন্ন করেছিলেন, আসলে এই পরমাশ্চর্য ঘটনাটি রসিয়ে কষিয়ে জুতসই উদযাপন করবেন বলে। কিন্তু পরমেশ সেদিন দুপুরের পর ভাইয়ের কাছে গেলেন না বলে চা-পার্টি মুলতুবি রাখতে হয়েছিল। কত্তার সামনে কত্তার কুকীর্তির বর্ণনা লাগসই হয় না।

কলকাতার উপকণ্ঠে তাদের বাংলো প্যাটার্ন দোতলা গৃহখানি সতেরো শো স্কোয়ার ফুট কার্পেট এরিয়া সহ গঙ্গার দিকে মুখ ফেরানো। একমাত্র ছেলে পনেরো বছর বিদেশে বসবাসকারী বউ কন্যাসহ। গৃহের কেয়ারটেকার সনাতন বিশ্বস্ত ও চৌখস। গাড়ির ড্রাইভার শিবলাল। পরমেশ গোলাপের টবে ওয়াটারিং করতে করতে নানাবিধ সুদ ডিভিডেন্ড বাবদ মাসিক প্রায় লক্ষাধিক টাকা উপার্জন করেন এখনও।

এহেন পরমেশ বাবু এবং তাঁর পত্নী সংযুক্তা, উভয়ের একটি সুন্দর আলোকোজ্জ্বল সকালে শখ হল লেখক হওয়ার। দুজনেরই ধারণা তাঁদের অভিজ্ঞতার ভান্ডার উপচে পড়েছে জীবন সায়াহ্নে। কাজেই জনগণে সেসবের ভাগ বাঁটোয়ারা করা আবশ্যিক কর্তব্য।
এছাড়াও দুজনেরই ধারণা যে, তাহাদের উইট হিউমরের প্রখরতা বিদ্যমান। লেখাগুলো হবে বটে এই সব রসদে।প্রৌঢ়তার সঙ্গে লেখালিখির জগৎটা সেঁটে গেলে জীবনভর চাকুরীসর্বস্ব ছাপোষা দেখনদার আপন মহল থেকে বেরিয়ে জীবনদর্শন টর্শন নিয়ে দেশ কাল সময় নিয়ে ভাবিত শ্রেণিতে পাখা মেলে দিব্য শ্লাঘা মিলবে।

এই সব নিউ ওয়েভ চিন্তা ভাবনা তারা পরষ্পর আলোচনা করে ঠিক করছেন তা নয়। চায়ের টেবিলে, সান্ধ্য টেলিভিশনের সিরিয়ালে টুকটাক কথাবার্তায় বাসনাটি পাখা মেলেছিল দিনে দিনে।

সংযুক্তা একসময় তার বাবার চাকরির সূত্রে সাউথ আফ্রিকায় কনভেন্ট স্কুলে বাচ্চা পড়িয়েছেন। দেশ বিদেশ ঘুরেছেন। বিদেশি জার্নালে ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন। কাজেই শেষ বয়েসে গপ্পো উপন্যাস লিখতে সাধ হওয়াটা বিসদৃশ কিছু নয়। আর পরমেশ নাইবা যৌবনের কবিতা লিখলেন, আমাশায় ভুগলেন, এই যে কোল ইন্ডিয়ার এতদিনের গুরুপদ চাকরি, বদলি, ফন্দিফিকির প্যাঁচ পয়জার, এই সব অভিজ্ঞতা ফেলনা নাকি?

পরমেশ বাবু ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুললেন। সংযুক্তা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুললেন বেশ ঘটা করে। নিজের পেজ একটি খুললেন। সেদিনও বেশ জমকালো জমায়েত হল রুফ টপ গার্ডেনে। মহিলাদের জন্য ঘোষিত বিউটি পত্রিকা 'ললিতা'র সম্পাদিকা সুরঞ্জনা মুখুটি সহ বাঘা বাঘা অবসরপ্রাপ্ত সরকারী বেসরকারী কর্মীবাবুরা এসেছিলেন।

সুরঞ্জনা মুখুটি ফ্রেঞ্চ ফ্রাই সহযোগে লাইম কর্ডিয়াল জিনে এতটাই প্রফুল্ল হলেন, প্রস্তাব দিয়ে বসলেন প্রতি পাক্ষিকে একটি কলাম এবং একটি অণুগল্প সংযুক্তাকে লিখতেই হবে। কলামের সঙ্গে অণুগল্প আসার কারণটি আর কিছুই না, সংযুক্তা পাইকিরি রেটে কিছুদিন যাবত অণুগল্প লিখছিলেন। একদিন তো গড় রেট ছাড়িয়ে পাঁচটা অত্যাশ্চর্য অণুগল্প লিখে ফেলেছিলেন চারবেলায়। পাঁচটার বিষয়ই ভয়ানক কনটেম্পারারি। সেগুলি যথাক্রমে শিশুশ্রম, এসকর্ট সার্ভিস, স্ত্রীর অধিকার, বিরিয়ানির হ্যাংলামি এবং গৃহ পরিচারিকার বিলুপ্তি।
অণুগল্পমালা তিনি ল্যাপটপে থরে থরে সাজিয়ে বৈকালিক সাহিত্যসভার আয়োজন করেছিলেন। সেদিন প্রভূত খাদ্য পেয় সমারোহে ব্যাপারটা ডিটেলে বলতে পারেননি। আভাসে ইঙ্গিতে সেরে রেখেছিলেন।

সেদিক থেকে দেখলে পরমেশ সংযুক্তার তুল্যমূল্যে হালে পানি পাচ্ছিলেন না। তিনি রোজ একটি স্মৃতিকথা এবং বিকটাণু গল্পে আটকে গেলেন। কমোডে বসে এক সকালে এতটাই বিভোর হয়ে গেছিলেন পায়ে ঝিঁঝি ফিঁঝি ধরে নাস্তানাবুদ। ওয়াশ করতে গেলেই পায়ের ঝিঁঝি ঝনঝন করে উঠছে কথাকলির ঘুঙুরের মতো। একবার ভাবলেন সংযুক্তাকে ডাকবেন। ইগো একটু গা মটকাল। সংযুক্তাকে ডাকলেও অবশ্য তিনি সাহায্য পেতেন না। সংযুক্তা তখন 'কবির ব্রহ্মচর্য' নামক কলামে অথৈ বানভাসি, সংজ্ঞাহত জ্ঞানরহিত।

পরমেশ বাবু প্রথমে একটু ধাক্কা পাড় ধুতির স্টাইলে নিজেকে বয়ান করেছিলেন। 'আমি কী আর এমন লেখক' বা 'পঙতি ভোজনে যদিও আমি শেষ মেম্বার' লিখে তারপর নানাবিধ গপ্পো সপ্পো ফাঁদছিলেন গ্রুপে গ্রুপান্তরে। প্রথমে লাইক ফটাফট পাচ্ছিলেন কেননা তিনি প্রতিদিন গড়ে সাড়ে পাঁচশো লাইক বিলিয়েছেন। কৃতজ্ঞতা বলে তো একটা ব্যাপার আছে নাকি? তিনিও সুড়সুড় করে বেশ লাইক কুড়োচ্ছিলেন। বাঃ, অনবদ্য, দারুণ, খুব ভালোলাগল, এ সব পেতে পেতে কেলো হল যখন কেউ কেউ হঠাৎ বেমক্কা বলে বসলেন, 'একটু কম বললে বেশ হত।' এইখানে পরমেশ বাবু চমতকৃত হতে হতে চমকিয়ে গেলেন। সংযুক্তাকে অবশ্য এই টানাপোড়েনের বিন্দু বিসর্গ টের পেতে দেননি।

তারপর এল গ্রুপে গ্রুপে গেট্টুর হিড়িক। এইটা কিন্তু ব্যাপক সরেস একটা ব্যাপার। সঙ্গলিপ্সু প্রৌঢ় বয়স গেট টুগেদারের জন্য সতৃষ্ণ। খাওয়া দাওয়া আর 'সেভেনটি থ্রিতে আমি একটা অর্থোডক্সকে প্যারাডক্সে আনলাম, সে এক ব্যাপার বটে।' লালরঙের গোল টেবিল ঘিরে চাপা ব্যঙ্গ, গা চিমটোনোর ভিড়ে এইসব রোমন্থন বেশ লেগেছে।

ক্রমে ক্রমে সংযুক্তার দর দহরম বাড়তে লাগল পরমেশের তুলনায়। ফেসবুকে প্রতি আধঘন্টায় স্টেটাস আপডেট। মাটি কাঁপলে 'শেষের দিন কি সমাগত?'। কবি মরলে, 'অমুকের শ্রাদ্ধে আলাপ হয়েছিল। শব্দের অমন অমায়িক কান্ডারীর প্রয়াণে বাঙালি চুপ কেন?' ইত্যাদি প্রভৃতি।
বড় মাঝারি পত্রিকা অফিসে যাতায়াত করতে করতে অমুকের দাদা তমুকের বৌদি পরিচয়ের খাতে আপন মনের মাধুরী দীক্ষিতকে সাজিয়ে গুছিয়ে পেশকাশ করতে লাগলেন। কিন্তু মন পড়ে রইল আসলি লেখক বায়নাতে। দুচারখানি নিজের লেখা বই আহা! ড্রয়িংরুমের শোভা। যেমন গড়িয়াহাট মোড়ের শোভা ট্রেডার্স ফচকেমি।

সংযুক্তা কয়েকদিন ধরে লক্ষ করছিলেন পরমেশ ঠিকমতো যেন দাড়ি শেভ করছেন না। শেভ করার পরেও চিবুকে বিস্তর চুল থাকছে। কত্তার হাত কাঁপছে নাকি আজকাল? ঘরোয়া ডিজিটাল বিপি মেজারিং মেসিনে দেখা গেল ব্লাড প্রেশার ১৭২/৯০। পারিবারিক মিত্র ডাক্তার ত্রিপাঠী ভয়মুক্ত করলেন, এই এজে এটা কোয়ায়েট নর্মাল। একদম ঠিকঠাক। তবে?

সপ্তাহ পেরোতে প্রকাশিত হল পরমেশের ফ্রেঞ্চ কাট সুষমা। সংযুক্তা একটু ফোড়ন কাটলেন, ঘাবড়ে দিয়েছিলে কিন্তু! বেশ লেখক লেখক লাগছে এখন। পরমেশ দাড়িতে হাত বুলিয়ে ভাবছিলেন, কফি হাউসটা মাস্ট এ সব ব্যাপারে।

গুটি গুটি পায়ে শেষ দুপুরে কফি হাউসে উপস্থিত হলেন। এত শব্দ কেন? দেখলেন জানালা টানালা বিশেষ নেই, এমন একটা ফ্লোরে শতাধিক লোক নাগাড়ে বকে চললে এই নাদব্রহ্মই ওঠে। বেশ। তবে তাই হোক।

এক উঠতি প্রকাশকের সঙ্গে আলাপ হল। সৌম্যসুন্দর গুহ। আহা যেন দেবদূতের আগমন। বই বানিয়ে দেবেন। দুশ কপি প্রথমে। চল্লিশ হাজার টাকা মূল্য দেয়। বই বাজারে কাটলে রয়্যালটি দেবে। বাঃ! এ তো দিব্য ব্যাপার! ঈশ্বরের কৃপায় ৪০০০০ টাকা পরমেশের কাছে এক টিপ নস্যতুল্য। আহা! লেখক স্টেটাস! এই অবসরপ্রাপ্ত জীবনে গণ্যিমান্যি কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক মিডিয়া-বোয়ালদের সঙ্গে ওঠাবসা। ভাবা যায় না!
কফি হাউসটা যেন পলকে বাংলা অ্যাকাডেমির হলঘর হয়ে গেল। ডায়াসে পরমেশ নিজেকে দেখছেন, পাশে প্রথিতযশা জনপ্রিয়তম অতিপ্রৌঢ় লেখক। ফিচিক ফিচিক ছবি উঠছে। পরমেশ মৃদু সুললিত ফ্রেঞ্চ কাট হাস্যে ভার্জিন কপিটি বুদ্ধের বরাভয় মুদ্রার মতো ধরে আছেন বুকের ওপর। হাজারদুয়ারি পত্রিকার লেখকশিরোমণি দু চার শব্দে বইটিকে ব্যাখ্যা করলেন, 'মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ গুরুর জাবর যেমতি'। পরমেশের আশ্লেষে ঘুম পেয়ে গেল যেন!

চেতনা ফিরে এলেই ফেসবুকে বোমাটি পাঠালেন। 'আসন্ন আমার সন্তানের শুভমুক্তি।' মুহূর্তে খবর রটি গেল নগর শহরে দেশে দেশে। নোটিফিকেশনের পিং শব্দে মোবাইল নাচতে লাগল লাগাতার। কমেন্ট সমূহ নিম্নরূপ :-
'এ মা! ছ্যাঃ ছ্যাঃ!'
'এই বয়সে?'
'রস কত!'
'বিকলাঙ্গ জন্মাবে।'
'সময়ে অ্যাবরশান করিয়ে নেননি কেন?'
'জন্মিয়েই ফটোতে ঝোলা আপনাকে দেখে তেড়ে অভিশাপ দেবে।'

পরমেশ এই করেন কি ওই করেন! এ কি অর্বাচীনতা! কী কথার কী মানে! অনেক ভেবে স্টেটাস আপডেট এডিট করে 'বইমেলায়' শব্দটি যোগ করলেন। 'আসন্ন বইমেলায় আমার সন্তানের শুভমুক্তি।'
ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল পরমেশের। লাইকে ভেসে যেতে লাগল স্টেটাসবোমা। লাল ফন্টে 'অভিনন্দন' শব্দতে আঙুল ছোঁয়ালে কনফেত্তি ফেটে ফুটে গেল।
বাড়ি ফিরে দেখলেন সংযুক্তা দাঁতে দাঁত চিপে চা খাচ্ছেন আর বিড়বিড়। বলি কান্ডজ্ঞান কি লোপ পাচ্ছে দিনে দিনে? সন্তানের শুভমুক্তি! ছিঃ ছিঃ! বিদেশে বসে ছেলেটা যদি তোমার এইসব কীর্তি দেখে, কী ভাববে বলত?

বইমেলার এক হপ্তা আগেই দুজনের বইয়ের ভার্জিন কপি হাতে এসে গেল। পরমেশের সাবেকহাল প্রকাশনী, সংযুক্তার পরমা প্রকাশনী। নাম হল যথাক্রমে 'পরমেশের পরবাস' এবং 'আজবনগর'। পরমেশের চার ফর্মার ডিমাই সাইজের বইয়ের নীল প্রচ্ছদে একটি মানুষের স্কন্ধোপরে গুলি পাকানো সুতোর মতো চাঁদ। সংযুক্তার অপেক্ষাকৃত স্লিম বইয়ের মেরুন প্রচ্ছদে গাড়ির বাতিল টায়ারের ফাঁক দিয়ে একটি কুকুরের মুখ। দুটির প্রচ্ছদেই বিমূর্ত শিল্পভাবনা। যদিও দুজনের কারোর তেমন একটা ভাললাগেনি, অঙ্কনশৈলীর উচ্চমার্গতার কারণে মেনে নিয়েছেন।



সাবেকসাল প্রকাশনী থেকে সৌম্যসুন্দর স্পেশাল নজর দিয়ে বইমেলায় স্টলে পরমেশের বইয়ের বিজ্ঞাপনে ছয়লাপ করেছে। পরমেশ স্টল তৈরীর সময় হালকা সার্ভে করে এসেছেন। সংযুক্তা অবশ্য নিজে যাননি সরেজমিন দেখভালে, পরমার কর্ণধার মিসেস কাঞ্জিলাল আশ্বস্ত করেছেন বইয়ের বাজারজাতকরণের ব্যাপারে।

শুভদিনে স্টলে লেখক দম্পতি স্টলে স্টলে বসে রয়েছেন। ওদের কাছে অবশ্য পুরো হপ্তাই শুভদিনে ভরপুর। স্টুল থেকে উঠে উঠে শেল্ফে শেল্ফে জনতার ঘেঁটে যাওয়া বই পরমেশ নিজহাতে সোজা টোজা করে দিচ্ছেন। সংযুক্তা পরমার স্টলে বসে ঠোঁটের কোণে অলৌকিক মৃদু একটি হাসি-হাসি হাস্য ছুঁইয়ে রেখেছেন। যেহেতু দুটিই নবীন প্রকাশনা সংস্থা, জনতার পুস্তকক্রয়ের প্রকরণ এ বাটে একটু অন্যরকম, নাজুক টাইপ। বাঘা সংস্থায় কেনাকাটির হৈ চৈ নখরা বাজেট সব উচ্চকোটির।

সংসার নির্বাহকালে এই সব আদাল বাদালের খবর তাদের জানা ছিল না বলে লেখক দম্পতি অত্যন্ত আগ্রহে জনগণমন নিরীক্ষণ করছেন। সংযুক্তা পরের কলামের সাবজেক্ট পেয়ে গেলেন। 'বইমেলার বই-কুণ্ঠ'। তির্যক দৃষ্টিপাতে তিনি ওই লেখায় বইমেলাকে ফালা ফালা করে ধুদ্ধুড়ি নেড়ে দিতে চান। কিন্তু থেকে থেকে পেচ্ছাপের গন্ধ আসছে কেন?

পরমার সাতশ একাশি নম্বর স্টলটি পাবলিক টয়লেটের লাগোয়া বাঁদিকে। জনতা প্রস্রাব সেরে ফটাকসে পরমাতে ঢুকে বই টই দেখে ধাঁ করে বেরিয়ে যাচ্ছে। এ হেঃ! হাত টাত সবাই ঠিকমতো ওয়াশ করছে তো? নাকি এমনি এলেবেলে হাতে তার প্রিয় সৃষ্টির বুকে হাত মারছে?

সংযুক্তার বড্ড দিগদারি এসে গেল দেখে শুনে। আধোয়া হাতে তার বই শত হাতে চটকাচ্ছে? সংযুক্তা বড্ড পিটপিটে মানুষ। সংসারে মাসিক লিক্যুইড হ্যান্ড ওয়াশই বরাদ্দ চার বোতল। হাত ধুয়ে ধুয়ে হাজা লেগে যাওয়ার জোগাড়। এ হেন লেখকের বইয়ে পেচ্ছাপমাখা হাত?

সংযুক্তার মস্তিস্ক ক্রমোত্তপ্ত হল। ঘন ঘন নাক থেকে রিমলেস চশমা হড়কে গেল। গা থেকে থেকে রি রি করে উঠল। পরের বই আর কভু পরমাকে নয়। ছিঃ ছিঃ ছিঃ। তার কপালেই কিনা পাবলিক ইউরিনালের সংসর্গ!

সংযুক্তার রাগ পিছলে গিয়ে পরমেশের ওপর পড়ল। উনি তো দিব্য সাবেকহালে হালে পানি কাটছেন! একবার সতর্ক কথা যেত না তাকে? বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যেত স্টলে। ন্যাপকিন টিস্যু পেপার, ডাস্টার ইত্যাদি হরেক আইটেম ছিল।

রেগে টং হয়ে সংযুক্তা ফোন করলেন পরমেশকে। নট রিচেবল্। ধ্যাৎ গুষ্টির রিচেবল্ পিন্ডেবল্। বইগুলো না জানি কী বিরক্ত হচ্ছে কাঁচা ইউরিয়ার স্পর্শে! সংযুক্তা থম মেরে কিছুক্ষণ বসে থেকে স্টল থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন এবং ফুড কোর্টের উদ্দেশে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেলেন।



আজ বইমেলার শেষদিন। সন্ধ্যা আটটা মতো বাজে। একটু পরেই লাস্ট বেল বাজবে। লোকজন করজোড়ে যেন ক্যারলে প্রভূ যিশুর উদ্দেশে দোয়া প্রার্থনায় লাল প্লাস্টিকের চেয়ার থেকে পাছা তুলে উঠে দাঁড়াবে। তার আগেই পরমেশ এবং সংযুক্তা ড্রাইভার শিবলালকে পার্কিং এরিয়া থেকে গাড়ি বার করতে বললেন।

এবারের বইমেলায় তাদের একটি বইও বিক্কিরি হয়নি। পরমেশের এক কপি বইয়ে চায়ের কাপ উল্টে যাওয়াতে সেটি এখন পরমেশের গাড়ির ডিকিতে। সংযুক্তার একটি বইয়ে একটা ছোঁড়া নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে হাতের পেচ্ছাপ মোছার জন্য অনেকক্ষণ ঘেঁটেছে বলে সেটিও এখন গাড়ির নোংরা ডিকিতে। বাকি একশ নিরানব্বই গুণিতক দুই সংখ্যক বই শেল্পে এবং গাঁটরি বাঁধা ইনট্যাক্ট।

গাড়ি বইমেলার তোরণকে ডানহাতে রেখে বাইপাশ রোডে বেঁকে গেল। শিবলাল দিনকতক ঘ্যান ঘ্যান করছে ছুটি নিয়ে নিজভূম ছাপরায় যাবে। মেজ ছেলের বিয়ের ইন্তেজাম। কিসের ছুটি? অ্যাঁ কিসের ছুটি? ওসব হবে না। বিয়ের দিন যেও। পরমেশ দাবড়ে দুবড়ে দিয়েছেন।

শিবলালের মাথায় বোধহয় রাগ ছিল। রাস্তার পাশের টায়ারের স্তুপে গাড়ি গিয়ে মারল বেমক্কা ধাক্কা। তেমন জোরালো কিছু নয়। গাড়ির ডিকি খুলে বইদুটি রাস্তায় পড়ে গেল। শিবলাল সিট থেকে বেরিয়ে বাইরে ক্ষয়ক্ষতি কিছু হয়নি টয়নি দেখে টেখে গাড়ি নিয়ে প্রবল বেগে বেরিয়ে গেল।

মেরুন টায়ারের স্তুপ থেকে উটকো ঝামেলায় বিরক্ত কুকুরছানাটি বেরিয়ে দেখল পথপরে নীলরঙের কিম্ভুত অজানা বস্তু। গুলি পাকানো সুতো দেখে শিশ্ন সুড়সুড় করে উঠল। জঞ্জাল দেখলেই মার্জার সারমেয়দের হিসু পায়। অগত্যা গুলি পাকানো সুতোর চাঁদে এক ঠ্যাং তুলে চমৎকার হিসুকর্মটি সমাধা করল এবং অপসৃয়মান গাড়ির লাল ব্যাকলাইটটাকে দেখে পরিষ্কার কুকুরের গলায় বলে উঠল, মরণ!
বাইরে অবশ্য শোনা গেল 'ঘেউ।'

424 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: রিভু

Re: বইমেলা বইমেলা

সুখপাঠ্য। সমস্যা অবশ্য প্রাচীন।

Avatar: সিকি

Re: বইমেলা বইমেলা

চমৎকার! আরো বারচারেক পড়ব। অতি উপাদেয়!
Avatar: pi

Re: বইমেলা বইমেলা

:)))


এরকম যে কত দেখার সুযোগ হচ্ছে, গত ক'বছর ধরে!
Avatar: dd

Re: বইমেলা বইমেলা

খুবি মজার লেখা।

আরো চমৎকৃত হলাম লেখকের versatality দেখে।
Avatar: T

Re: বইমেলা বইমেলা

এ লেখা কিশু হয়নি। জাস্ট কিচ্ছু না। এরম মোটাদাগের স্ল্যাপস্টিক লেখা এই লেখকের কাছ থেকে আশা করি না।
Avatar: জি

Re: বইমেলা বইমেলা

চমৎকার লেখা।
Avatar: Tim

Re: বইমেলা বইমেলা

হ্যাঁ এরকম একটু বেশিই দেখা যাচ্ছে। ঃ-)

বিষয় হিসেবে প্রাসঙ্গিক কিন্তু গপ্পোটা পড়ার সময় ভালো লাগছিলো না। তবে শেষ প্যারাটা হেব্বি হয়েছে।
Avatar: দ

Re: বইমেলা বইমেলা

কেমন জাজমেন্টাল বিশ্রিমত লেখা।
Avatar: সুকি

Re: বইমেলা বইমেলা

লেখা খারাপ লাগলে সাধারণত কমেন্ট করি না - এই লেখকের অন্য লেখা পড়ে যেমন ভালো লাগে এবং উনার লেখনী শক্তি যেমন মনে হয়, তার কাছে এই লেখা একদমই পৌঁছয় নি। একদমই ভালো লাগল না।
Avatar: de

Re: বইমেলা বইমেলা

মজা লাগলো পড়ে -

এরকম লোকজন দিব্বি দেখা যায় চারপাশে -
Avatar: শঙ্খ

Re: বইমেলা বইমেলা

আমার আবার দিব্য লাগল। লেখনীর গুণে না, তার দরকারও নেই। চারপাশে এত এত উদাহরণ দেখি, এই লেখাটা একদম সেই পপুলেশনকে টার্গেট করছে। তাও তো পুশ সেল নিয়ে লেখেন নি। আজকাল এত এত ফেসবুক কবি ও লেখক, আর পারা যায় না।
Avatar: Parthasarathi Giri

Re: বইমেলা বইমেলা

প্রিয় পাঠকবন্ধুদের প্রীতি। লেখার বিষয়কে ইচ্ছাকৃতভাবে একটু লঘু করার চেষ্টা করেছিলাম, গুরু করে সুরাহা মেলার নয়(যদি অবশ্য সুরাহা বলে কিছু হয়)।
বিষয়ের সঙ্গে যায় যে ভাষার ধরণ, সেইটি নেওয়ার চেষ্টা করেছি, যদিও এমন ভাষার চলনে আগে কখনও লিখিনি। আমিও কিছুটা নাক কুঁচকেই গপ্পোটা লিখেছি।😊
আমার জঁরের একটি আখ্যান লিখছি। লেবুচোর ও সুধারানীর গল্প। পড়ে বলবেন অবশ্যই।
ভালোবাসা।
Avatar: খ

Re: বইমেলা বইমেলা

আরে যা প্রাণে চায় লিখুন না, আমরা আপনার ফ্যান। নিন্দে করবো মাঝে মাঝে কিন্তু আপনার লেখায় আমরা অনেকেই একেবারে মুগ্ধ। ট এর সমালোচনা একটা লেখাগুলোর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ। ঈশ্বর করুন আপনার যেন কোন একটা নির্দিষ্ট জঁর না হয়, যখন যা তাগিদ অনুভব করবেন লিখে ফেলুন, আমার দুর্দান্ত লাগে আপনার লেখা, জ্জিও গুরু।


Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: বইমেলা বইমেলা

কাগজের এই রকম অপচয় হয় বৈকি, ওতে শেষ পর্যন্ত মুদ্রণ শিল্পেরও উপকার হয় না। লেখাটা আরো সাবলীল হতে পারতো। 😊


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন