I RSS feed

Indranil ghosh dastidarএর খেরোর খাতা

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • সাধু কালাচাঁদ, ট‍্যাঁপা-মদনা, পটলা ও রুনু
    'ভালো লাগছে না রে তোপসে' বা 'ডিলাগ্রান্ডি' বললে বাঙালি মননে এক ধরনের রিফ্লেক্স অ্যাকশন কাজ করে যেন। ফেলুদা/তোপসে, টেনিদা, ঘনাদা ইত্যাকার নামগুলি বাঙালির আড্ডার স্বাভাবিক উপাদান। এই অনুষঙ্গগুলি দিয়ে বাঙালি তার হিউমারের অভ্যাস ঝালিয়ে নেয়, কিছুটা আক্রান্ত হয় ...
  • যম-দুয়ারে পড়ল কাঁটা
    অন্য লোকের স্বপ্নে আসে ভগবান, সিনেমা স্টার, ছেলেবেলার বন্ধু নিদেন ইশকুল-কলেজের কড়া মাস্টারমশাই। কবি হলে প্রেমিকা-টেমিকা, একেবারে কবিতাশুদ্ধু। " বাসস্টপে দেখা হলো তিন মিনিট, অথচ তোমায় কাল স্বপ্নে বহুক্ষণ ..." ইত্যাদি। আর আমার স্বপ্নে আসেন যমরাজ। যমরাজ মানে ...
  • আমার বাড়ির বিজয় দিবস...
    মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি প্রভাব আমার পরিবারের ওপরে পড়েনি। বলা যেতে পারে আশপাশ দিয়ে চলে গেছে বিপদ আপদ। কিন্তু আশপাশ দিয়ে যেতে যেতেও একদিন যমদূতের মত বাড়িতে হাজির হয়েছিল পাকিস্তানী সৈন্যরা। আমার বাবা ছিল তৎকালীন পাকিস্তান বিমান বাহিনীর বিমান সেনা। যুদ্ধের সময় ...
  • রান্নাঘর ও রাজ্যপাট
    কিছুদিন যাবৎ চেষ্টা করছিলাম লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবন্টনের চিত্রটা বুঝতে।যত পুরোনো হচ্ছি কাজের বাজারে তত দেখছি ওপরের দিকে মহিলাদের সংখ্যা কমতে থাকছে। কর্পোরেট সেক্টরে প্রায়শই সংখ্যা দিয়ে দেখানো হয় অনেক মেয়ে কেরিয়ার শুরু করলেও মাঝপথে ছেড়ে যাচ্ছেন বা কোনো রকমে ...
  • শকওয়েভ
    “এই কি তবে মানুষ? দ্যাখো, পরমাণু বোমা কেমন বদলে দিয়েছে ওকে সব পুরুষ ও মহিলা একই আকারে এখন গায়ের মাংস ফেঁপে উঠেছে ভয়াল ক্ষত-বিক্ষত, পুড়ে যাওয়া কালো মুখের ফুলে ওঠা ঠোঁট দিয়ে ঝরে পরা স্বর ফিসফাস করে ওঠে যেন -আমাকে দয়া করে সাহায্য কর! এই, এই তো এক মানুষ এই ...
  • ফেকু পাঁড়ের দুঃখনামা
    নমন মিত্রোঁ – অনেকদিন পর আবার আপনাদের কাছে ফিরে এলাম। আসলে আপনারা তো জানেন যে আমাকে দেশের কাজে বেশীরভাগ সময়েই দেশের বাইরে থাকতে হয় – তাছাড়া আসামের বাঙালি এই ইয়ে মানে থুড়ি – বিদেশী অবৈধ ডি-ভোটার খেদানো, সাত মাসের কাশ্মিরী বাচ্চাগুলোর চোখে পেলেট ঠোসা – কত ...
  • একটি পুরুষের পুরুষ হয়ে ওঠার গল্প
    পুরুষ আর পুরুষতন্ত্র আমরা হামেশাই গুলিয়ে ফেলি । নারীবাদী আন্দোলন পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে, ব্যক্তি পুরুষের বিরুদ্ধে নয় । অনেক পুরুষ আছে যারা নারীবাদ বলতে বোঝেন পুরুষের বিরুদ্ধাচরণ । অনেক নারী আছেন যারা নারীবাদের দোহাই পেড়ে ব্যক্তিপুরুষকে আক্রমন করে বসেন । ...
  • বসন্তকাল
    (ছোটদের জন্য, বড়রাও পড়তে পারেন) 'Nay!' answered the child; 'but these are the wounds of Love' একটা দানো, হিংসুটে খুব, স্বার্থপরও:তার বাগানের তিন সীমানায় ক'রলো জড়ো,ইঁট, বালি, আর, গাঁথলো পাঁচিল,ঢাকলো আকাশ,সেই থেকে তার বাগান থেকে উধাও সবুজ, সবটুকু নীল।রঙ ...
  • ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর (পর্ব ৫)
    (সতর্কীকরণঃ এই পর্বে দুর্ভিক্ষের বীভৎসতার গ্রাফিক বিবরণ রয়েছে।)----------১৯৪...
  • শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
    ১৩ ডিসেম্বর শহিদুল্লাহ কায়সার সবার সাথে আলোচনা করে ঠিক করে বাড়ি থেকে সরে পড়া উচিত। সোভিয়েত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের প্রধান নবিকভ শহিদুল্লাহ কায়সারের খুব ভাল বন্ধু ছিলেন।তিনি সোভিয়েত দূতাবাসে আশ্রয় নেওয়ার জন্য বলেছিলেন। আল বদর রাজাকাররা যে গুপ্তহত্যা শুরু করে ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর (পর্ব ৪)

I

'একটা কোনো দেশকে ছাড় দিলেই হয়ে গেল- আর দেখতে হবে না; সবাই মিলে একেবারে 'দাও' দাও' বলে চীৎকার জুড়ে দেবে'- ৪৩'এর ১০ই মার্চ ওয়ার ক্যাবিনেটের এক মেমোতে মন্তব্য করবেন চার্চিল, কলোনিগুলিতে যুদ্ধকালীন খাদ্যসরবরাহ নিয়ে কথা বলছিলেন তখন তিনি-'আমাদের ('ব্রিটেন'-মন্তব্য আমার) দেখে শিখুক সবাই; নিজেদের বন্দোবস্ত নিজেরাই করে নিক গে!' (1)

মাস তিনেক ধরেই লিনলিথগো ভারতের খাদ্য-সংকটের কথা বলে আসছিলেন। ভারতকে খাওয়ানোর মত খাদ্যশস্য যে নেই তা নয়,অস্ট্রেলিয়াতেই যথেষ্ট গম মজুদ আছে। কিন্তু সেখান থেকে ভারতে গম নিয়ে আসার মত জাহাজ অকুলান। জানুয়ারি মাস থেকেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর হুকুমে ভারত মহাসাগর থেকে অধিকাংশ মালবাহী জাহাজ আটলান্টিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ রসদের স্টক বজায় রাখতে হবে; কলোনিকে খাওয়ানোর মত বিলাসিতা দেখাতে চার্চিল রাজী ছিলেন না।

বিশেষ করে যখন কলোনির কাছে রাশি রাশি ধার জমে উঠছে।ভারতের কাছে জমতে থাকা স্টার্লিং ডেট নিয়ে চার্চিলের রাগের সীমা ছিল না। যুদ্ধের সময় ভারতকে রক্ষা করতে হবে, যুদ্ধ শেষ হলে সে দেশ ছেড়ে চলে আসতে হবে, তারপরে আবার গাদা গাদা ধারও মেটাতে হবে-এরকম মামাবাড়ির আব্দারে কান দেওয়ার লোক চার্চিল ছিলেন না।আমেরি তাঁর ডায়েরিতে লিখছেন- "আমার মনে হয় না আমি চার্চিলকে বুঝিয়ে উঠতে পেরেছি যে ভারত তার প্রতিরক্ষার সমস্ত ব্যয় নিজেই বহন করে, এমন কি সে দেশে পাঠানো ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকেও সে খাওয়ায়-পরায়....."। চার্চিলের মত "বিভ্রান্ত, বাক্যবাগীশ আর স্বৈরতন্ত্রী " মানুষকে তিনি সত্যিই কোনোদিন বুঝিয়ে উঠতে পারেন নি- ভারত তার যে পরিমাণ রসদ, যুদ্ধসামগ্রী আর সেনাবাহিনী যুদ্ধে পাঠাচ্ছে তার দাম দিতে গিয়েই এই বিপুল পরিমাণ দেনা জমছে ব্রিটেনের (2)। এবং এই দেনা যে তক্ষুনি মেটাতে হচ্ছিল ব্রিটেনকে, ব্যাপারটা তেমনও নয়-গোটা ধারটাই চলছিল প্রমিসরি নোটের ওপর ভরসা করে, অর্থাৎ যুদ্ধ শেষ হলে কোনো এক শুভদিন দেখে সে ধার শোধ করা হবে বলে কথা দেওয়া আছে। কিন্তু জিনিসপত্র তো টাকা দিয়েই কিনতে হয়, মহামান্য ব্রিটিশ রাজের ভরসা শুনেও তো কেউই বিনা পয়সায় মাল বেচে না, সে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীই হোক কি ভারতীয়। ফলতঃ ভারত সরকারকে রাশি রাশি টাকা ছাপাতে হচ্ছিল। তার ফল হিসেবে মুদ্রাস্ফীতি, মুদ্রাস্ফীতির ফলে বাজারে আগুন, তা থেকে দুর্ভিক্ষ। সেকথাও চার্চিলের জানা ছিল কিনা, কিংবা জানলেও তিনি পরোয়া করতেন কিনা সন্দেহ।

একে তো এইসব রাগক্ষোভ, তার ওপর ভারতকে স্বাধীনতা দেওয়ার জন্য ক্রমবর্ধমান মার্কিন চাপ।'৪২ সালের ১১ই নভেম্বর চার্চিল বিবৃতি দিলেন-'ব্রিটিশ সাম্রাজ্য লাটে উঠবে,আর তারই তদ্বির-তদারক করবো, এর জন্য আমি রাজার প্রধানমন্ত্রী হই নি'। আমেরি লিখছেন-তার পরের দিনটা চার্চিলের কাটল ভয়ংকর ক্ষোভে-দুঃখে-অপমানেঃ জার্মানদের পরেই সবচেয়ে জানোয়ার জাতি যে ভারতীয়, তারাই কিনা ব্রিটেনকে লাথিয়ে দেশ থেকে বের করে দেবে ! (3)

কাজেই ৯ই ডিসেম্বর লিনলিথগো যখন আমেরির কাছে চিঠি লিখছেন ভারতের ভয়াবহ খাদ্যসংকট নিয়ে, সেটা খুব ভুল সময়। চার্চিল তখন ফুটছেন। ওয়ার ক্যাবিনেটের কাছ থেকে ভারতের জন্য কোনো বরাদ্দ অনুমোদন হওয়ার আশা সবচেয়ে কম।চিঠির মূল কথা, এক্ষুনি ৬ লক্ষ টন গম পাঠানো হোক। নইলে কিন্তু-লিনলিথগো বারবার এই একটি বিষয়ের ওপরেই জোর দিচ্ছেন-ভারতের যুদ্ধপ্রস্তুতি মার খাবে। সেনাবাহিনী সংকটে পড়ে যাবে। (4)

যেন ভারতের কোটি কোটি বেসামরিক মানুষের খিদেটা কোনো খিদে নয়। তা যে নয়, অন্ততঃ ওয়ার ক্যাবিনেটের কর্তাব্যক্তিদের চোখে নয়,লিনলিথগো তা বেশ ভালোমতই জানেন। তাই বারে বারে সেনাবাহিনীর কথা বলে, যুদ্ধপ্রস্তুতির কথা বলে খাদ্যশস্যের আবেদন। ৪২-৪৩ সালে এই ছিল ভারত সরকারের একমাত্র 'ফ্যামিন কোড'।

অব্শ্য তাতে লাভের লাভ তেমন কিছু হল না। জাহাজের অভাব। জাহাজ যা আছে, তা ভারতের জন্য পাঠালে ব্রিটেনের কী হবে?ওয়ার ক্যাবিনেট গম পাঠানোর বদলে বরং ভারতে একজন খাদ্যসরবরাহ বিশেষজ্ঞকে পাঠানোর প্রস্তাব দিল-এই ভদ্রলোক জানেন কেমন করে চাষীদের কাছ থেকে লুকনো চাল-গম বের করে আনতে হয় ! ভারত সর্কার জদিও এই অভিনব প্রস্তাবে আদৌ উৎফুল্ল হল না। অবশেষে চার্চিলের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে আমেরি ওয়ার ক্যাবিনেটের একটি মিটিংয়ে ভারতের জন্য ১,৩০০০০ টন গম পাঠানোর সিদ্ধান্ত মঞ্জুর করালেন।

৪ দিন বাদে ভাইসরয় লিনলিথগো প্রাদেশিক গভর্নরদের জানালেন গমের দরের ওপর থেকে উর্ধ্বসীমা প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে; শিগগিরই বাংলায় চালের দরের ওপর থেকেও সরকারী নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া হবে। লিনলিথগো জানাবেন-গম কিছু আসছে বটে, কিন্তু চালের ব্যাপারে কোনো বিদেশী সাহায্যের আশা ভুলে যেতে হবে-যা করবার নিজেদেরই করতে হবে।

মধুশ্রী মুখার্জি লিখছেন, খাদ্যশস্যের দামের বিনিয়ন্ত্রণের এই সিদ্ধন্ত নেওয়ার সময়টি ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ করে যখন বোঝা গেল, খাদ্যশস্য আমদানির জন্য জাহাজ পাওয়া সম্ভব নয়, এদিকে রসদও ফুরিয়ে আসছে, তখন ভারত সরকার হাল ছেড়ে দিয়ে দর বেঁধে দেওয়ার বদলে যে দামে পারে বাজার থেকে চাল-গম নিজেই কিনতে থাকল। জাহাজসংকট মেটাতে (অন্যভাবে বললে খাদ্যবাহী জাহাজের ওপর ব্রিটেনের অগ্রাধিকার বজায় রাখতে) সরকার যে কোনো দামে, যে কোনো উপায়ে বাংলার বাজার থেকে আগ্রাসীভাবে চাল কেনা শুরু করে দিল-যুদ্ধের খিদে মেটাতে হবে, বাদবাকি বাংলা গোল্লায় যাক। অগত্যা শুরু হয়ে গেল বাংলার কুখ্যাত '৪৩-এর দুর্ভিক্ষ।

কিন্তু জাহাজের এই সংকটটা ঘটল কিভাবে? কবে? ১৯৪২ সাল জুড়ে জার্মান ইউ-বোটগুলি(সাবমেরিন) মূলতঃ আটলান্টিক মহাসাগরে অজস্র ব্রিটিশ মালবাহী জাহাজ ধ্বংস করে; বিশেষ করে '৪২ এর শেষ চার মাসে। উত্তর আফ্রিকায় যুদ্ধের জন্যও বেশ কিছু মালবাহী জাহাজের দরকার পড়ে। ফলে ব্রিটেনের নিজস্ব আমদানি রীতিমত চাপে পড়ে যায়।এই সংকট মোকাবিলায় ওয়ার ক্যাবিনেট (আসলে চার্চিল) ভারত মহাসাগর থেকে ৫৬% শতাংশ মালবাহী জাহাজ লম্বা সময়ের জন্য আটলান্টিকে সরিয়ে আনেন, যদিও ব্রিটিশ আমদানি-সংকট মেটানোর জন্য এতগুলি জাহাজ এত দীর্ঘ সময়ের জন্য ধরে রাখবার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এতে করে ভারত মহাসাগরের তীরে তীরে ব্রিটিশ কলোনিগুলির খাদ্য-আমদানি ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলার সঙ্গে সঙ্গে একই সময়ে কেনিয়া,টাংগানাইকা,ব্রিটিশ সোমালিল্যান্ডেও যে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, সেটা, অতএব, আদৌ কোনো কাকতালীয় ঘটনা বা সমাপতন ছিল না।(5)

যুদ্ধকালীন ব্রিটিশ অর্থনীতির ইতিহাস খতিয়ে দেখে যদিও এখন জানা যাচ্ছে যে ব্রিটেনের এই সংকট যথেষ্টই ফুলিয়েফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছিল সেসময়।১৯৪৩-এর মার্চে যখন বলা হচ্ছিল ব্রিটেনের বেসামরিক স্টক তলানীতে এসে ঠেকেছে, তখনো আসলে তা ব্রিটিশ উৎপাদন মন্ত্রকের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪৮ লক্ষ টন বেশী ছিল। সেবছর গ্রীষ্মের শেষে ভারত মহাসাগর এলাকা থেকে জাহাজ সরিয়ে এনে ব্রিটেনের স্টক বাড়ানো হয় আরো ২০ লক্ষ টন, যেটা না হলেও ব্রিটেনের দিব্য চলে যেত। অথচ ঐ কুড়ি লক্ষ টনের মধ্য থেকে ৬ লক্ষ টন খাদ্যশস্য ভারতে পাঠানো গেলেই-ভাইসরয় লিনলিথগো'র কথামত-বাংলার দুর্ভিক্ষ এড়ানো যেত (৬)। তার ওপর সেই গ্রীষ্মে আমেরিকা জাহাজ উৎপাদন এত বাড়িয়ে দেবে, যে যুদ্ধের বাকি সময় জুড়ে জাহাজ-সংকট নিয়ে আমেরিকা-ব্রিটেনকে আর ভাবতে হবে না। সে বছরের বসন্তে তদুপরি মিত্রপক্ষের বোমারু বিমানগুলি বিপুল সংখ্যক জার্মান সাবমেরিনের সলিলসমাধি ঘটিয়ে ছাড়বে।

কিন্তু চার্চিলকে সন্তুষ্ট করা কঠিন কাজ। তিনি ও তাঁর মুখ্য পরামর্শদাতা লর্ড চেরওয়েল কৃচ্ছসাধনকে ঘৃণা করতেন। যুদ্ধের সময় আমেরিকানরা ব্রিটিশদের চেয়ে বেশী বেশী মাংস, ডিম আর ফল খাচ্ছে-এই তথ্য চার্চিলের কাছে অসহ্য ছিল।

তাছাড়া শুধু তো আর পরিমাণ নয়, খাদ্যসামগ্রীর মানও হওয়া চাই এক নম্বর।পাঁউরুটি তৈরীর ময়দার 'এক্সট্র্যাকশন রেট' বাড়িয়ে দিলে গমের পরিমাণ কম লাগে;পুষ্টিও বাড়ে। কিন্তু ব্রিটিশদের চাই নরম তুলতুলে হোয়াইট ব্রেড, এক্স্ট্র্যাকশন রেট বাড়ালে তা আর ততটা মনোমত থাকবে না। ময়দার সঙ্গে বার্লি কিংবা আলুর গুঁড়ো মিশিয়ে নিলেও গম কম লাগে; ফলে গম আমদানি করতে জাহাজও কম লাগে। কিন্তু বার্লি কমে গেলে-কী সর্বনাশ- বীয়ার তৈরীর কী হবে ! সপ্তাহে দুদিন পাব বন্ধ রাখার প্রস্তাবে ব্রিটিশ প্রশাসকরা শিউরে উঠলেন-এতে ব্রিটিশ জনতার 'মনোবল' কী সাংঘাতিক ভাবেই না ধাক্কা খাবে!

২০০৬ সালে প্রকাশিত ওয়ার ক্যাবিনেটের মিটিংয়ের নোট থেকে জানা যাচ্ছে, আভ্যন্তরীন স্টক যথাসম্ভব বাড়িয়ে রাখার আরেকটা বড় কারণ ছিল ভবিষ্যতের ভাবনা। যুদ্ধের শেষে বিধ্বস্ত ইউরোপে খাদ্যসামগ্রীর দামে আগুন লেগে যাবে; ধারদেনা মিটিয়ে ব্রিটেনের আর্থিক অবস্থাও এত ভালো থাকবে না যে সে ঐ চড়া দামে খাবার কিনে খেয়ে সুখেশান্তিতে থাকবে। তখন এই বাড়তি স্টকই হবে ব্রিটেনের চলতি সম্পত্তি ('Liquid asset') (7)।তাছাড়া শিপিং নিয়ে ব্রিটেন ও আমেরিকার মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাস তো ছিলই পুরোদস্তুর। মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতিশ্রুতিমত যথেষ্ট্সংখ্যক জাহাজ আমেরিকা ব্রিটেনের জন্য ছাড়বে কিনা ব্রিটিশ কর্তারা তাই নিয়ে ছিলেন রীতিমত সন্দিহান।

এত কিছু ভাবনাচিন্তার মধ্যে কর্তারা অবশ্য ব্রিটেনের নিজস্ব উৎপাদনকে হিসেবের মধ্যে ধরেন নি;ধরলেও সে হিসেব ছিল নিতান্তই কাঁচা। ১৯৪২ সালে ব্রিটেন রেকর্ড পরিমাণ গম ফলায়, '৪৩ সালে তাকেও ছাপিয়ে যায় (গোপন লক্ষ্যমাত্রার প্রায় দ্বিগুণ ছুঁয়ে ফেলে)। '৪২ সালে আলু উৎপাদন হয় এক কোটি টন, তার একটা বড় অংশই মানুষের কাজে লাগে না-শুয়োরকে খাইয়ে দিতে হয়। খাদ্যসামগ্রী ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের গুদামে জমতে থাকে অনাগত ভবিষ্যতের জন্য- যদিও তখন বাংলার ভুখা মানুষেরা প্রতিদিন হাজারে হাজারে মরছে।

'৪৩ এর মার্চের শেষে বাংলার গভর্নর হার্বার্ট প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হককে বাধ্য করেন পদত্যাগ করতে। ৩১শে মার্চ বাংলায় জরুরী অবস্থা ঘোষিত হয়। ১৩ই এপ্রিল গভর্নরের সঙ্গে তলায় তলায় ব্যব্স্থা করে খাজা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ ক্ষমতায় আসে। এই সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখবে ব্রিটিশ-স্বার্থবাহী ইউরোপীয় বিধায়কদের দল। বাংলার রাজনীতি আরো সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠবে, যদিও বাংলার খাদ্য-সংকট তখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সুরাবর্দিকে নিয়োগ করা হবে বেসামরিক সরবরাহ বিভাগের মন্ত্রীপদে। সুরাবর্দি তোতাপাখির মত ভারত সরকারের শেখানো কথাই আউড়ে যেতে থাকবেন-বাংলায় আসলে খাদ্যসংকট নেই, শুধু একশ্রেণীর অসাধু মজুত্দার কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরীর চেষ্টা করে যাচ্ছে।

এই মজুত্দারদের পালের গোদারা যে আসলে বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠান-সেনাবাহিনী, রেল, পোর্ট ট্রাস্ট প্রমুখ এবং সরকারী আশীর্বাদধন্য ইন্ডাস্ট্রিসমূহ-সেকথা অবশ্য সুরাবর্দি বা তাঁর ব্রিটিশ প্রভু কেউই মুখ ফুটে বলেন নি। খাদ্যসংকট নিয়ে নেতারা রাজনীতির ঘোলাজলে মাছ ধরতে নেমে পড়লেন। হাওড়ার টাউন হলের একটি মিটিংয়ে হক এবং শ্যামাপ্রসাদের উপস্থিতিতে একটি প্রস্তাব নেওয়া হল। তাতে বলা হল-যত শীঘ্র সম্ভব বাংলা থেকে খাদ্য রপ্তানী বন্ধ করা হোক, খাদ্যে স্বয়ম্ভর রাজ্যগুলি থেকে বাংলায় খাদ্য আমদানি করা হোক, একটি অল-পার্টি -ফুড কমিটি তৈরী করা হোক, সরকারী চালের ভাণ্ডার জনতার জন্য খুলে দেওয়া হোক, গোটা বাংলার মানুষের জন্য র‌্যাশনিং চালু হোক ইত্যাদি। এই ব্যবস্থাগুলি তাঁরা নিজেরা সরকারে থাকাকালীন কেন চালু করবার চেষ্টা করেন নি, তার জবাব অবশ্য স্বাভাবিক্ভাবেই তাঁরা দেন নি। (8)

১৮ই মে ভারত সরকার বাংলা ও তার সংলগ্ন রাজ্যগুলির মধ্যে ট্রেড ব্যারিয়ার তুলে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে দলে দলে ক্রেতারা বিহার-ওড়িশা-আসামের বাজারে ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে এইসব রাজ্যে চালের দর আকাশে উঠে গেল; যদিও কলকাতায় চালের দর কমল খুব সামান্যই। বিহার ও ওড়িশা সরকার রেগে আগুন হয়ে গেল। দু দিন বাদে বাংলার লীগ সরকার চাল কেনার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচিত একমাত্র এজেন্টের নাম ঘোষণা করল-ইস্পাহানি লিমিটেড! সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের আগুনে যেন ঘি পড়ল-হিন্দু মহাসভার নেতারা ঝাঁপিয়ে পড়লেন এর বিরোধিতায়। বাংলার সরকারকে বলা হল পাকিস্তান-পন্থী। এদিকে বিহার-ওড়িশা সরকার ভারত সরকারের নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে বাংলায় চাল রপ্তানী বন্ধ করতে নির্দেশ দিলেন-বাংলা আরো একঘরে হয়ে পড়ল। প্রতিবেশী সরকারগুলির পক্ষ থেকে বাংলার এজেন্টের নামে প্রতারণার অভিযোগ আনা হল। সত্যিই কিন্তু ইস্পাহানির এক সাব -এজেন্ট--- পরে জানা গিয়েছিল-সরকারের প্রায় কয়েক লক্ষ টাকা মেরে দিয়েছিল সেসময়।

গ্রাম-মফঃস্বল থেকে তখন হাজারে হাজারে মানুষ কলকাতার রাস্তায় এসে জড়ো হচ্ছে খাবারের আশায়। কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কাছে একমাত্র প্রায়োরিটি যেমন গ্রেট ব্রিটেন, তার কলোনিরা নয়, বাংলার সরকারের কাছেও তেমনি একমাত্র প্রায়োরিটি হল কলকাতা-বাংলার বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চল নয়। সরকার ঘোষণা করল প্রতিটি অনুমোদিত বাজারে একটি করে কন্ট্রোল শপ খোলা হবে কেবলমাত্র কলকাতার "স্থানীয় নাগরিক"দের জন্য।কলকাতার নাগরিকত্বর প্রমাণপত্র হিসেবে 'এ আর পি'-র (এয়ার রেইড প্রোটেকশন দপ্তর) দেওয়া স্লিপই একমাত্র প্রামাণ্য নথি বলে বিবেচিত হবে।

এদিকে আর এক মুশকিল গিয়ে দাঁড়াল এই যে এ আর পি-র লোক আর কন্ট্রোল শপের মালিকরা অধিকাংশই হিন্দু। তাই নিয়ে আরেক সাম্প্রদায়িক সমস্যা পাকিয়ে উঠল। র‌্যাশনিং অ্যাডভাইসর কার্বি'র সঙ্গে লেগে গেল প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের।নাজিমুদ্দিন চাইলেন কন্ট্রোল শপের বদলে সরকারী দোকান থেকে র‌্যাশন বিলোতে; কেননা সরকারী দোকান হলে সেখানে জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে মুসলিম কর্মচারী নিয়োগ করা সম্ভব হবে-আর এদিকে কন্ট্রোল শপের ৯০% মালিকই হিন্দু, সেক্ষেত্রে র‌্যাশন ব্যবস্থা হিন্দুদের হাতে চলে যাবে। সম্ভবতঃ কার্বির যুক্তি ছিল যেহেতু কন্টোল শপগুলি ইতিমধ্যে চালু আছে, সেগুলিকে কাজে লাগালে বেশ খানিকটা সময় ও মানুষের প্রাণ বাঁচতে পারে।(9)

এইসব তুইথুলি-মুইথুলি'র মধ্যে বাংলার অনাহারক্লিষ্ট মানুষেরা অকাতরে মরে যেতে থাকল।

Notes
1.Madhushree Mukherjee, p.106
2.Ibid,p.107
3.Ibid,p.109 (Barnes and Nicholson, Empire at Bay, p. 842)
4.Janam Mukherjee, p.92
5.Madhushree Mukherjee, p. 117
6.Ibid, p.122 (Hancock and Gowing, British War Economy, p.267)
7.Ibid, p.127 (Cherwell Papers, H298/21)
8.Janam Mukherjee, p.111
9.Ibid, p.124


271 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: aranya

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর (পর্ব ৪)

'সেবছর গ্রীষ্মের শেষে ভারত মহাসাগর এলাকা থেকে জাহাজ সরিয়ে এনে ব্রিটেনের স্টক বাড়ানো হয় আরো ২০ লক্ষ টন, যেটা না হলেও ব্রিটেনের দিব্য চলে যেত। অথচ ঐ কুড়ি লক্ষ টনের মধ্য থেকে ৬ লক্ষ টন খাদ্যশস্য ভারতে পাঠানো গেলেই-ভাইসরয় লিনলিথগো'র কথামত-বাংলার দুর্ভিক্ষ এড়ানো যেত ' - ম্যান মেড ফেমিন :-((
Avatar: amit

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর (পর্ব ৪)

একটা প্রশ্ন আসছে। এই দুর্ভিক্ষ এর এতো মেজর এফেক্ট থেকে পাশের সব রাজ্য - বিহার , ওড়িশা, আসাম বেঁচে গেলো কি করে ? মানে এফেক্ট নিশ্চয় হয়েছিলো, কিন্তু এই হারে অনাহারে সেসব জায়গাতে মারা গেছিলো কি ?
Avatar: dd

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর (পর্ব ৪)

হ্যাঁ, অমিতের প্রশ্ন আমারও।

সারা ভারত জুড়েই তো কম বেশী খাদ্য সংকট হওয়ার কথা। কিন্তু আরো অন্য প্রদেশেও কি এরকম দুর্ভিক্ষ হয়েছিলো?

এই লেখা পড়ে মনে হলো একেকটি প্রদেশকে একেবারে ইন্সুলেটেড করে দেওয়া হয়েছিলো, ফলে এক প্রদেশের উদ্বৃত্ত অন্য ঘাটতি প্রদেশে যেতে পারতো না। কিন্তু তাতেও হিসেবটা ঠিক মিলছে না।
Avatar: I

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর (পর্ব ৪)

ডিডি একদমই ঠিক ভেবেছেন। ট্রেড ব্যারিয়ার চাপিয়ে প্রতিটি প্রদেশকে আলাদা করে দেওয়া হয়েছিল।
আর বাদবাকি কথা নিয়ে পরে আসছি।এখন একদম সময় নেই।
Avatar: I

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর (পর্ব ৪)

ওয়াভেলের একটা কথা শুধু শেয়ার করে যাই -Bengal had been deliberately starved out by other provinces’ which refused to permit the export of grain.
Avatar: I

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর (পর্ব ৪)

সন্দেহ নেই, গোটা ভারত জুড়েই খাদ্যসংকট চলছিল। বিহার, ওড়িশা, বোম্বাই, কোচিন ও মাদ্রাজে তো দুর্ভিক্ষ-পরিস্থিতি তৈরী হয়েই গেছিল।শুধু ভারতই বা বলি কী করে, অধিকাংশ ব্রিটিশ কলোনিতে খাদ্যসংকট শুরু হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়া-কানাডা'র মত শ্বেতাঙ্গ কলোনি'র কথা (কলোনি তো নয়, তারা সব ডোমিনিয়ন)জানি না। তারা খাদ্যসংকটে ভুগছিল বলে জানি না। সম্ভবতঃ না।

কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে বেশ কিছু ইউনিক ঘটনা ঘটেছিল। এক এক করে লিখতে চেষ্টা করি। ভুল হলে ধরিয়ে দেবেন।

১। সিঙ্গাপুর-রেঙ্গুনের পতনের পর ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ারে কলকাতা ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর ও যুদ্ধ কেন্দ্র। কলকাতাকে জাপানের হাতে হারালে চলবে না। এদিকে কলকাতা রক্ষার মত সামরিক প্রভিশন ব্রিটিশ সরকার ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় গড়ে তোলে নি। অগত্যা কলকাতার ক্ষেত্রে পোড়ামাটি নীতি। রাইস ডিনায়াল। বোট ডিনায়াল। বাংলার উপকূলের জেলাগুলির অর্থনীতি একদম ধ্বংস করে দিয়েছিল।
২। '৪২-এর সাইক্লোন আর তিনটি টাইডাল ওয়েভ মেদিনীপুর আর চব্বিশ পরগনা জেলাকে ভাসিয়ে দিল। একে সেই বন্যার ধাক্কা, তারপর চালের ছত্রাক রোগে আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি।
৩। রেঙ্গুনের পতনের পর লক্ষ লক্ষ প্রবাসী বাঙ্গালী এসে ধুঁকতে থাকা গ্রামগুলিতে আশ্রয় নেয়। ফলে খাবারের চাহিদা আরো বাড়ে।
৪। কলকাতার জাপানী বোমার ভয়ে আর্থিক ক্ষমতাসম্পন্ন বাঙালী গ্রামে পালিয়ে এল। তাদের সঙ্গে কমপিট করে গরীব গেঁয়ো বাঙালী খাবার জোগাড় করতে পারে নি।

৫। ট্রেড ব্যারিয়ার। একটা খুব জরুরী ব্যাপার বেঙ্গল ফ্যামিনের ক্ষেত্রে। সবকটা প্রদেশ নিজের এলাকার বাইরে খাদ্যশস্য রপ্তানী বন্ধ করে দেয়। পাঞ্জাব খাদ্যে সারপ্লাস প্রদেশ ছিল। কিন্তু ভাই পরমানন্দ প্রমুখ নেতার প্রবল চাপে পাঞ্জাবের গম বাংলায় আনা যায় নি।

৬। বাঙালী সাধারণভাবে ভাত খেয়ে বাঁচে। বাংলা খাদ্যে স্বনির্ভর ছিল না। বার্মা থেকে চাল না আনলে তার ভাঁড়ারে টান পড়বে। সেই বার্মা জাপান নিয়ে নিল। বার্মা থেকে চাল আসাও বন্ধ হয়ে গেল। গমের ক্রাইসিস অতটা তীব্র ছিল না। এদিক-ওদিক থেকে চেয়ে-চিন্তে টুকটাক গমের বন্দোবস্ত সরকার করে ফেলেছিল। অথচ ঐ দুর্ভিক্ষের মধ্যে বাংলায় যতটুকু চাল উৎপাদন হচ্ছে, তার খানিকটা শ্রীলঙ্কায় পাঠাতে হচ্ছিল চার্চিলের চাপে।

৭। বাঙালী ভাত ছাড়া আর কিছু খাবে না- এই স্থির বিশ্বাসে অটল থেকে ব্রিটিশ ভারত সরকার বাংলার জন্য গম আনবার চেষ্টাও করে নি। অথচ গম ঠিকঠাকমত করে খাওয়ানোর চেষ্টা করলে বেশ কিছু প্রাণ বাঁচত-সে প্রসঙ্গে পরে আসবো।

৮। কলকাতা তখন প্রবল থ্রাইভিং। গোটা বিশ্বের সৈন্যরা কলকাতায় এসে হাজির হয়েছে। তাদের যে করে হোক ভালোমন্দ খাওয়াতেই হবে। এবং খাওয়ানো হয়েওছিল। কলকাতায় তখন-প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ পড়লে জানবেন-মদ-মোচ্ছবের বন্যা বয়ে যাচ্ছিল।ভালো খাবার বড়লোকদের জন্য বেশ সস্তায় সহজলভ্য ছিল। এই চাপটা তো কাউকে নিতে হবে, খাদ্যসংকট যখন বাঘের মত গর্জন করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাংলার গ্রামের প্রান্তিক লোকগুলি এই বাঘের পেটে গেল। এ জিনিষ বাংলা ছাড়া আর কোনো প্রদেশে হয় নি।

৯। বাংলার রাজনৈতিক অস্থিরতা আর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ। ১৯৩৭ থেকে ৪৬-এর মধ্যে বাংলায় ৪ বার সরকার বদল হয়েছে। সবচেয়ে কুশ্রী বদলটা হয়েছিল ফজলুল হকের দ্বিতীয় সরকার পতনের সময়। গভর্নর হার্বার্ট ফজলুল হকের সঙ্গে পায়ে পা বাধিয়ে ঝগড়া করে হক সরকার ফেলে দিলেন। করে মুসলিম লীগকে ডেকে এনে ক্ষমতায় বসালেন। ইউরোপীয়ান গ্রুপ সেই সংখ্যালঘু সরকারকে সমর্থন দিয়ে টিকিয়ে রাখল। এই সরকারটি ছিল চরম অপদার্থ ও কম্যুনাল। দুর্ভিক্ষের মধ্যেও সে হিন্দু-মুসলিম করে বেড়িয়েছে।

১০। ভারত সরকার-ব্রিটিশ সরকার-স্থানীয় সরকার-নেতা-প্রশাসকদের অ্যান্টিপ্যাথি-অনীহা-সমস্যাকে অস্বীকার ও এড়িয়ে যাওয়া- একে অন্যের ঘাড়ে দায় চাপানো। বজ্জাত ব্যব্সায়ীদের কালোবাজারী।প্যানিকগ্রস্ত মানুষের হোর্ডিং।

কিন্তু সব তো লিখেই দিলাম। পরে আর লিখবো কী???

Avatar: I

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর (পর্ব ৪)

যাগ্গে, পরে আর না লিখলেও চলবে । কেউ বিশেষ পড়েটড়েও না। অবশ্য প্রজেক্ট শেষ করবার একটা ব্যাপার আছে।
Avatar: Du

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর (পর্ব ৪)

পড়ে না?
Avatar: dd

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর (পর্ব ৪)

এর আগেও একবার লিখেছিলাম।

সেই অমর্ত্য সেনের একটা প্রবন্ধ নিয়ে। উনি নিজের ছোটোবেলার স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন রাস্তা ঘাটে অভুক্ত পরিবারের ভীড়, মাঠে ঘাটে অনশনে মৃতদেহ। এইসব। পরে বড় হয়ে লিখলেন এই যে এতো লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেলেন, তাঁর নিজের পরিবার,স্বজন, বন্ধুবান্ধব - মানে বেসিকেলি ভদ্রলোকেরা অসুবিধেয় পড়লেও না খেয়ে থাকার অবস্থায় ছিলেন না।

যতোটা না খাদ্য সংকট, তার থেকে বেশী ছিলো ক্রয়্ক্ষমতার অভাব। গ্রামের লোকেদের খাবার কেনার পয়সাই ছিলো না।

আর ইন্দোদার লেখার কথায় মনে পড়লো, চীনে আর ভিয়েতনামেও লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে মারা গেছিলো,ঐ জাপানী এবং ফ্রেঞ্চ সাম্রাজ্যের নির্দেশে আর অবহেলায়। প্রায় একই ধরনের কারনে।
Avatar: Tim

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর (পর্ব ৪)

"আপিলা চাপিলা"য় অশোক মিত্র লিখেছেন, সে বছর ফসলের ঘাটতি ছিলোনা। কিন্তু একটা বড়ো অংশ বিদেশী সরকার অন্যত্র পাচার করে দিয়েছিলো। নৌকো বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিলো যাতে ট্রান্সপোর্টেশন না করা যায়। জাপান এসে এসবের দখল নেবে এই ভয়েও ভীত ছিলো সরকার। তার ওপর মজুতদার শ্রেণীর উদ্ভব হলো যারা সমস্যা আরো বাড়িয়ে তুললো। অশোক মিত্রও লিখেছেন, চাকরি করা লোক না খেয়ে মরেনি, বা যাদের অল্পবিস্তর সঞ্চয় ছিলো তারাও না। উচ্চ/মধ্যবিত্ত বাঙালি এইসময় নিজেরটুকু নিয়ে ব্যস্ত ছিলো, অবস্থাপন্ন শ্রেণীও সেভাবে কোনরকম সাহায্য করেনি। এরপর আবার ব্ল্যাকমার্কেটিং শুরু হলো। পৃষ্ঠা ২৬-৩০
Avatar: I

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর (পর্ব ৪)

ফসলের ঘাটতি ছিল, কিন্তু অত মারাত্মক ছিল না যে এভাবে ৩০ লক্ষ মানুষকে মরে যেতে হবে।১৯৪১ এ এর থেকে কম ধান উৎপাদন হয়েছিল।

অবশ্য এ কথাও সত্যি, অনেকদিন ধরেই গ্রামের মানুষ না খেয়ে থাকছিল।দুর্ভিক্ষ একেবারে আকাশ থেকে পড়ে নি।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন