I RSS feed

Indranil ghosh dastidarএর খেরোর খাতা

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • সাধু কালাচাঁদ, ট‍্যাঁপা-মদনা, পটলা ও রুনু
    'ভালো লাগছে না রে তোপসে' বা 'ডিলাগ্রান্ডি' বললে বাঙালি মননে এক ধরনের রিফ্লেক্স অ্যাকশন কাজ করে যেন। ফেলুদা/তোপসে, টেনিদা, ঘনাদা ইত্যাকার নামগুলি বাঙালির আড্ডার স্বাভাবিক উপাদান। এই অনুষঙ্গগুলি দিয়ে বাঙালি তার হিউমারের অভ্যাস ঝালিয়ে নেয়, কিছুটা আক্রান্ত হয় ...
  • যম-দুয়ারে পড়ল কাঁটা
    অন্য লোকের স্বপ্নে আসে ভগবান, সিনেমা স্টার, ছেলেবেলার বন্ধু নিদেন ইশকুল-কলেজের কড়া মাস্টারমশাই। কবি হলে প্রেমিকা-টেমিকা, একেবারে কবিতাশুদ্ধু। " বাসস্টপে দেখা হলো তিন মিনিট, অথচ তোমায় কাল স্বপ্নে বহুক্ষণ ..." ইত্যাদি। আর আমার স্বপ্নে আসেন যমরাজ। যমরাজ মানে ...
  • আমার বাড়ির বিজয় দিবস...
    মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি প্রভাব আমার পরিবারের ওপরে পড়েনি। বলা যেতে পারে আশপাশ দিয়ে চলে গেছে বিপদ আপদ। কিন্তু আশপাশ দিয়ে যেতে যেতেও একদিন যমদূতের মত বাড়িতে হাজির হয়েছিল পাকিস্তানী সৈন্যরা। আমার বাবা ছিল তৎকালীন পাকিস্তান বিমান বাহিনীর বিমান সেনা। যুদ্ধের সময় ...
  • রান্নাঘর ও রাজ্যপাট
    কিছুদিন যাবৎ চেষ্টা করছিলাম লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবন্টনের চিত্রটা বুঝতে।যত পুরোনো হচ্ছি কাজের বাজারে তত দেখছি ওপরের দিকে মহিলাদের সংখ্যা কমতে থাকছে। কর্পোরেট সেক্টরে প্রায়শই সংখ্যা দিয়ে দেখানো হয় অনেক মেয়ে কেরিয়ার শুরু করলেও মাঝপথে ছেড়ে যাচ্ছেন বা কোনো রকমে ...
  • শকওয়েভ
    “এই কি তবে মানুষ? দ্যাখো, পরমাণু বোমা কেমন বদলে দিয়েছে ওকে সব পুরুষ ও মহিলা একই আকারে এখন গায়ের মাংস ফেঁপে উঠেছে ভয়াল ক্ষত-বিক্ষত, পুড়ে যাওয়া কালো মুখের ফুলে ওঠা ঠোঁট দিয়ে ঝরে পরা স্বর ফিসফাস করে ওঠে যেন -আমাকে দয়া করে সাহায্য কর! এই, এই তো এক মানুষ এই ...
  • ফেকু পাঁড়ের দুঃখনামা
    নমন মিত্রোঁ – অনেকদিন পর আবার আপনাদের কাছে ফিরে এলাম। আসলে আপনারা তো জানেন যে আমাকে দেশের কাজে বেশীরভাগ সময়েই দেশের বাইরে থাকতে হয় – তাছাড়া আসামের বাঙালি এই ইয়ে মানে থুড়ি – বিদেশী অবৈধ ডি-ভোটার খেদানো, সাত মাসের কাশ্মিরী বাচ্চাগুলোর চোখে পেলেট ঠোসা – কত ...
  • একটি পুরুষের পুরুষ হয়ে ওঠার গল্প
    পুরুষ আর পুরুষতন্ত্র আমরা হামেশাই গুলিয়ে ফেলি । নারীবাদী আন্দোলন পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে, ব্যক্তি পুরুষের বিরুদ্ধে নয় । অনেক পুরুষ আছে যারা নারীবাদ বলতে বোঝেন পুরুষের বিরুদ্ধাচরণ । অনেক নারী আছেন যারা নারীবাদের দোহাই পেড়ে ব্যক্তিপুরুষকে আক্রমন করে বসেন । ...
  • বসন্তকাল
    (ছোটদের জন্য, বড়রাও পড়তে পারেন) 'Nay!' answered the child; 'but these are the wounds of Love' একটা দানো, হিংসুটে খুব, স্বার্থপরও:তার বাগানের তিন সীমানায় ক'রলো জড়ো,ইঁট, বালি, আর, গাঁথলো পাঁচিল,ঢাকলো আকাশ,সেই থেকে তার বাগান থেকে উধাও সবুজ, সবটুকু নীল।রঙ ...
  • ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর (পর্ব ৫)
    (সতর্কীকরণঃ এই পর্বে দুর্ভিক্ষের বীভৎসতার গ্রাফিক বিবরণ রয়েছে।)----------১৯৪...
  • শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
    ১৩ ডিসেম্বর শহিদুল্লাহ কায়সার সবার সাথে আলোচনা করে ঠিক করে বাড়ি থেকে সরে পড়া উচিত। সোভিয়েত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের প্রধান নবিকভ শহিদুল্লাহ কায়সারের খুব ভাল বন্ধু ছিলেন।তিনি সোভিয়েত দূতাবাসে আশ্রয় নেওয়ার জন্য বলেছিলেন। আল বদর রাজাকাররা যে গুপ্তহত্যা শুরু করে ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর (পর্ব ৩)

I

পর্ব ৩
------
'৪২ -এর ৮ই অগাস্ট এ আই সি সি-র অধিবেশনে 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের প্রস্তাব পাশ হল। পরদিন ভোরবেলাতেই ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়ে পুলিশ কংগ্রেসের অধিকাংশ প্রথম সারির নেতা ও কর্মীকে গ্রেপ্তার করে ফেলল। এতে দমে যাওয়া তো দূরের কথা, উল্টে ব্যাপক স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ছড়িয়ে গেল উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের তৃণমূল স্তরের মানুষের মধ্যে।এই বিপুল আন্দোলন (যাকে লিনলিথগো ১৮৫৭-র পরে সবচেয়ে ব্যাপক আন্দোলন বলে বর্ণনা করেছেন) দমনে ব্রিটিশ পুলিশ-প্রশাসন-সেনাবাহিনী সেসময় যে বর্বরতা দেখিয়েছিল, তা সম্ভব হত না যদি না তাদের কাজকর্মে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল থেকে শুরু করে ভারতসচিব আমেরি হয়ে ভাইসরয় লিনলিথগো-এঁদের প্রত্যেকের সক্রিয় মদত থাকতো। ২রা সেপ্টেম্বর হাউজ অফ কমন্সে ভারতের পরিস্থিতি নিয়ে বক্তৃতা দেবার প্রাক্কালে ক্ষিপ্ত চার্চিল আমেরির সামনে ফেটে পড়েন-"I hate Indians. They are a beastly people with a beastly religion."(1) তিনটি মহাদেশে যুদ্ধরত ব্রিটেনের সামনে 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলন যেন যুদ্ধের আরেকটি ফ্রন্ট খুলে দিল। নিরস্ত্র মানুষের মিছিলে বিমান থেকে মেশিনগান দিয়ে গুলি চালনা কিংবা 'ডিনায়াল' নীতিকে সামনে রেখে আন্দোলনকারীদের ভুখা মারার চেষ্টা, বন্যার্ত মানুষকে ত্রাণ পাঠাতে অস্বীকার করা-এইজাতীয় বর্বরতাকে এছাড়া আর কী দিয়েই বা ব্যাখ্যা করা যায়!

কলকাতার ওয়ার ইন্ডাস্ট্রি-র জন্য অবশ্য সদাসর্বদা আলাদা ব্যবস্থা। ১লা জুলাই সরকার চালের উর্ধ্বসীমা বেঁধে দিল। আড়তদাররা বিক্ষোভে ফেটে পড়ল, কেননা বাজারের দাম ইতিমধ্যেই এই উর্ধ্বসীমার অনেক ওপরে-সরকারী দামে চাল বেচতে হলে তাদের ডাহা ক্ষতি। অগাস্ট মাসে একশোটি সরকার-অনুমোদিত ব্যক্তিমালিকানাধীন কন্ট্রোল শপ খোলা হল। এই দোকানগুলির জন্য বীরভূম থেকে সরকার স্বয়ং নিজের বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে অনেক বেশী দামে চাল কিনল। ফলে চালের বাজারে আতঙ্ক,আতঙ্কের সুযোগ নিয়ে কালোবাজারী, তার ফলে চালের দরবৃদ্ধি-এই বিষচক্র শুরু হয়ে গেল।

মেদিনীপুর জেলার তমলুকে ততদিনে অজয় মুখার্জি-সুশীল ধাড়া'র নেতৃত্বে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। জাতীয় সরকারের মুখপত্র 'বিপ্লবী'র প্রথম সংখ্যায় খবর বেরোলো-দানিপুর চালকল থেকে চাল বোঝাই করে একটি সরকারী নৌকা যাচ্ছিল; গ্রামবাসীরা সেটি আক্রমণ করে চাল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশ গুলি চালালে তিনজন মারা যায়। দিনাজপুরে দশহাজার মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে সরকারী বাড়ি আক্রমণ করে ও আড়তদারদের কাছ থেকে ধান-চাল ছিনিয়ে নেয়। দু-সপ্তাহ বাদে জলপাইগুড়িতে এরকম এক বিক্ষুব্ধ জনতার জমায়েত হয়-স্থানীয় অফিসাররা আড়তদারের কাছ থেকে চাল নিয়ে খোলা বাজারে তা বেচার বন্দোবস্ত করলে তবে বিক্ষোভ প্রশমিত হয়। পুলিশের ডেপুটি ইনস্পেক্টর জেনারেল জানান-ডাকাতির ঘটনা খুব বেড়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রেই ডাকাতির উদ্দেশ্য শুধু বাসন-কোসন/ জামা-কাপড় কিংবা খাবার-দাবার ছিনিয়ে নেওয়া, মূল্যবান সম্পদ হাতানো নয়-যেটা খুবই অস্বাভাবিক (2)।কাজেই দুর্ভিক্ষের সময় মানুষ যে টুঁ শব্দটি না করে নীরবে মারা গেছে, সেটা সম্পূর্ণ ঠিক নয়। যদিও এটা ঠিক কথাই, কলকাতা শহরে কোনো বড় গোলমাল হয় নি, কেননা দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষেরা যখন কলকাতা শহরে এসে পৌঁছচ্ছে, তখন তারা মৃত্যুর মুখে, ছিনিয়ে খাওয়ার মত শক্তিটুকু তাদের আর অবশিষ্ট ছিল না।

১৬ই অক্টোবর এক ভয়াবহ সাইক্লোন মেদিনীপুর ও চব্বিশ পরগনার উপকূলবর্তী এলাকায় আছড়ে পড়ল। ঝড়ের এমন দাপট ছিল যে কোথাও কোথাও কুড়ি ফুট অবধি ঢেউ উঠে যায়।ঢেউয়ের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় ১২০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা; বন্যার জলে আরো ১০০০ বর্গ কিলোমিটার। প্রবল ঝোড়ো হাওয়া আর মুষলধারে বৃষ্টিতে ধুয়ে যায় ৮৩০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা (3)। ৭৪০০ গ্রাম তছনছ হয়ে যায়। কয়েক হাজার বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে হাজারে হাজারে মৃতদেহ ছড়িয়ে থাকে। সরকারী হিসেবেই মারা যায় প্রায় সাড়ে চোদ্দ হাজার মানুষ; বেসরকারী হিসেবে কমপক্ষে তিরিশ হাজার। মৃত গবাদি পশুর সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১,৯০,০০০। প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষ আত্মীয়্পরিজন-ঘরবাড়ি-গরুছাগল-ধানচাল-চাষের ক্ষেত হারিয়ে পথে বসেন। মেদিনীপুর জেলার মানুষজন '৪২-এর সেই ১৬ই অক্টোবরকেই মন্বন্তরের শুরুর দিন বলে মনে রেখেছেন।

এদিকে সাইক্লোনের আগে থেকেই এক ধরনের ছত্রাক রোগে (ব্রাউন স্পট ডিজিজ) আমন ধানের ক্ষতি হচ্ছিল। সাইক্লোনের সুযোগে এই ছত্রাকের স্পোর আরো বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে; বন্যায় যতটা না ফসলের ক্ষতি হয়েছিল, তার চেয়েও বেশী ক্ষতি হয় এই রোগে।

সাইক্লোনে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তমলুক আর কাঁথি-যে দুই এলাকাতে বিপ্লবী কার্যকলাপ চলছিল তুঙ্গে। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে প্রশাসন সেখানকার রিলিফের কাজ চালু করতে দেয় নি। মেদিনীপুরের জেলা জজ ঘোষণা করেন -যতক্ষণ না চুরি-যাওয়া বন্দুক উদ্ধার হচ্ছে এবং 'ভবিষ্যতে আর কোনো সরকার-বিরোধী কাজকর্ম করা হবে না' বলে গ্রামবাসীরা মুচলেকা দিচ্ছে-ততক্ষণ সরকার সেখানে কোনো রকম ত্রাণকার্য চালাতে দেবে না। কলকাতা থেকে ত্রাণ নিয়ে আসা একটি স্বেচ্ছাসেবী দলকে গ্রেপ্তার পর্যন্ত করা হয়। (4)

সরকার অবশ্য এই বিপর্যয়ের খবর সম্পূর্ণ চেপে দেয়। একজন সেনা প্রধান স্টেটসম্যান-এর সম্পাদক ইয়ান স্টিফেন্সকে ডেকে পাঠিয়ে বলেন-এই খবর যেন ছাপানো না হয়; বাংলার উপকূল যে অরক্ষিত, জাপানী সেনা সে কথা জানতে পারলে সমূহ বিপদ(জাপান যদিও ঝড়ের শুরু থেকেই গোটা ব্যাপারটা পুঙ্খানুপুঙ্খ জানত)।ঝড়ের ১৮ দিন পরে ৩রা নভেম্বর স্টেটসম্যান পত্রিকায় খুব ছোট করে খবরটি বের হয়। অনেক টালবাহানার পর অনেক দেরীতে সরকার ত্রাণের কাজ শুরু করতে রাজী হয়। রাজস্বসচিব বিনয় রঞ্জন সেনকে এই ত্রাণকাজের ভার দেওয়া হয়। চালের জন্য তিনি নবগঠিত বেসামরিক সরবরাহ বিভাগে যোগাযোগ করলে তাঁকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়-চাল তাঁকে নিজেকেই বাজার থেকে কিনে নিতে হবে। সিভিল সাপ্লাই বিভাগ এই চাপ নিতে পারবে না। এত হাজার হাজার মানুষকে বাজার থেকে চাল কিনে খাওয়ানো যে একটি অবাস্তব প্রস্তাব, সরকার সেটি বুঝতে পারে নি, এ কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। মেদিনীপুরের মানুষজনের মতই ইতিহাসবিদ পল গ্রিনো-ও (Paul Greenough) মনে করেন , এই সাইক্লোনই ছিল বাংলার দুর্ভিক্ষের প্রথম ধাপ। (5)

ডিসেম্বর মাসে ক্রিসমাসের ছুটি কাটানোর জন্য বড়লাট লিনলিথগো কলকাতা এসে পৌঁছন (দিল্লীর হাড়-কাঁপানো ঠান্ডার বদলে মনোরম শীতের কলকাতায় ক্রিসমাস কাটানো অবশ্য তিনি বরাবরই পছন্দ করতেন)। আমেরিকে তিনি লেখেন-কলকাতার অবস্থা বেশ ভালো; গাদা গাদা ব্রিটিশ সৈন্য রাজপথে ঘুরে বেড়াচ্ছে... কলকাতা যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত(6)। লিনলিথগো ফিরে যাবার পরের দিনই অবশ্য কলকাতার যুদ্ধপ্রস্তুতির পরীক্ষা নেয় জাপ বোমারু-বিমান। ২০শে ডিসেম্বর কলকাতায় প্রথম জাপানী বোমাবর্ষণ হয়। তারপর ২১,২৩,২৪ ও ২৮শে ডিসেম্বর। এর মধ্যে ২৪শে ডিসেম্বরের বোমাবর্ষণ ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। শহর ছেড়ে পালানোর হিড়িক আবার শুরু হয়ে যায়। ডিসেম্বরের শেষে বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্স হিসেব করে বলে-প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ মানুষ কলকাতা ছেড়ে পালিয়ে গেছে। জনহীন শহর পরিষ্কার করবার লোক পর্যন্ত নেই-'রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দুর্গন্ধময় আবর্জনা - তাই নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে কাক-চিল-কুকুরের দল' (7)। সরকার অবশ্য এই উদ্বাসনের খবর সম্পূর্ণ অস্বীকার করে।

কলকাতা তখন জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মিত্রপক্ষের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি।হাজারে হাজারে ব্রিটিশ, আমেরিকান, অস্ট্রেলিয়ান, আফ্রিকান, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত্যের অন্যান্য প্রদেশের সৈন্য কলকাতায় এসে পৌঁছচ্ছে,থাকছে, রণাঙ্গনে চলে যাচ্ছে। খিদিরপুর বন্দর নিঃশ্বাস ফেলার সময় পাচ্ছে না, কয়লা আর আকরিক লোহা জাহাজে করে চালান যাচ্ছে পশ্চিমের কারখানাগুলিতে। কলকাতার যুদ্ধসামগ্রী তৈরীর কারখানাগুলিতেও তৎপরতা তুঙ্গে। এদিকে চালের অভাবে বাংলা ধুঁকছে। দোকানপাট-গুদাম-আড়ত বন্ধ, মারোয়ারী ব্যবসায়ীরা কলকাতা থেকে ভাগলবা। কিন্তু চাল নেই বলে যুদ্ধ তো আর থেমে থাকতে পারে না! ২৭শে ডিসেম্বর একটি আদেশ জারী করে সিভিল সাপ্লাই দপ্তরকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হল -যে কোনো বন্ধ দোকান-পাট, চালের গুদামের তালা ভেঙে তারা চাল-গম -তেল-নুন-কেরোসিন ইত্যাদি যাবতীয় রসদ বাজেয়াপ্ত করতে পারবে। খোলা বাজার থেকে যত ইচ্ছা চাল বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতাও পেয়ে গেল দপ্তর। কয়েকদিনের মধ্যেই কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার খোলাবাজারের চালের দুই-তৃতীয়াংশ চাল মজুদ করে ফেলল সিভিল সাপ্লাই দপ্তর।

কালোবাজারের কেশাগ্রও অবশ্য স্পর্শ করা গেল না। উল্টে যেসব আড়তদার খোলাবাজারে চাল বিক্রি করছিল, সরকারের ওপর থেকে তাদের যাবতীয় বিশ্বাস উঠে গেল। লাফিয়ে লাফিয়ে কালোবাজারী বাড়তে লাগল। সেইসঙ্গে বাড়তে লাগল সরকারের নাড়ির গতি। সরকারের এই ভীতির আঁচ পেয়ে সাধারণ মানুষ-শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিও ঘাবড়ে গেল। মজুতদারী বাড়তে থাকল;সেই সঙ্গে বাড়তে থাকল চালের দাম। বাড়তে বাড়তে গরীব মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেল।

অবশ্য চালের দাম সাধ্যের মধ্যে থাকলেও তাদের কোনো লাভ ছিল না। খোলাবাজারে কোথাও চাল নেই। কলকাতার প্রায়োরিটি শ্রেণীকে খাওয়ানোর জন্য গোটা গ্রামবাংলা থেকে ঝেঁটিয়ে চাল বাজেয়াপ্ত করা শুরু করল সরকারী এজেন্টরা,আবার। তাদের পেছনে বন্দুক হাতে পুলিশ, কখনো-সখনো মিলিটারি। এদিকে শহরের চটকল-সুতো কল-কাগজকল-পোর্ট ট্রাস্ট -রেল-সেনাবাহিনী- সবাই মিলে পাগলের মত যে যেমন দরে পারছে চাল কিনছে। পরবর্তীকালে ফ্যামিন কমিশনের সামনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে সিভিল সাপ্লাইয়ের ভারপ্রাপ্ত ডিরেক্টর পিনেল জানাবেন, তাঁদের সামনে দুটি রাস্তা খোলা ছিল- 'গ্রামবাংলায় অসংখ্য মানুষের মৃত্যু' অথবা 'কলকাতা শহরে বিশৃংখলা', যার অর্থ যুদ্ধ প্রস্তুতিতে ঘাটতি। "আমরা প্রথমটি বেছে নিলাম"-পিনেল বলবেন।(8)

অবশ্য তাই বলে যেন কেউ না ভাবেন শহর কলকাতার সব খেটে খাওয়া মানুষেরাই দু-বেলা পেট পুরে খেতে পাচ্ছিলেন।বড় বড় শিল্পের শ্রমিকরা 'এসেনসিয়াল' তকমা পেলেও অনেক ছোট ছোট কারখানার মজুর, মেথর-চাকর-কনট্রাক্ট লেবারাররা সরকারী সুরক্ষাবলয়ের বাইরেই থাকলেন। মধ্যবিত্তের দুর্গতিলাঘবের দিকে অবশ্য সরকারের পুরো নজর ছিল।নবগঠিত খাদ্য-বিভাগের পক্ষ থেকে মধ্যবিত্তদের জন্য ক্যান্টিন-ব্যবস্থা চালু হল (বিভাগের সদস্য রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ী নলিনী সরকার ক্যান্টিন চালু করতে এসে জানালেন মধ্যবিত্তরা কী দুর্দশার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে; একে তো খাদ্যাভাব, চালের চড়া দাম, তার ওপর আবার নতুন যন্ত্রনা শুরু হয়েছে-চাকর-বাকররা সব পালিয়ে যাচ্ছে। আহা!) এদিকে গৃহহীন মানুষদের খাওয়ানোর জন্য তৈরী একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ভর্তুকি-দেওয়া দরে চাল কিনবার পারমিট চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হল। (9)

'৪৩ এর জানুয়ারি মাস বরাবর কলকাতার রাস্তাঘাট ভরে যেতে লাগল ভিখারীতে। তপন রায়চৌধুরী লিখেছেন- ' কলকাতার রাস্তায় ভিখারী কিছু নতুন দৃশ্য নয়। কিন্তু এই নবাগতরা অন্য ধরনের মানুষ। এক-এদের দেখলেই বোঝা যেত যে, ভিক্ষাবৃত্তি এদের স্বাভাবিক পেশা না। অনেক সময়েই দেখা যেত মা-বাপ-ছেলেমেয়ে নিয়ে একটা পুরো পরিবার এসে রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছে। কলকাতায় ভিক্ষাবৃত্তির এটা সাধারণ লক্ষণ নয়। দ্বিতীয় কথা-প্রথম প্রথম এরা ভিক্ষা চাইত না, শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত। বোঝা যেত এরা গৃহস্থ মানুষ। সঙ্কোচ কাটিয়ে ভিক্ষা করতে পারছে না। কখনও কখনও শহরবাসীরা এদের দুরবস্থা দেখে নিজের থেকেই কিছু ভিক্ষে দিয়ে যেত। কিন্তু তখন চালের দাম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মন প্রতি তিন/সাড়ে তিন টাকা থেকে বেড়ে মন প্রতি চল্লিশে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং দুঃস্থ পরিবারগুলির সবচেয়ে যা প্রয়োজন সেই চাল দেওয়ার মত অবস্থা বেশী লোকের ছিল না...ক্রমে শহরের পথে সেই অবিস্মরণীয় আবেদন শোনা যেতে লাগল, চাল ভিক্ষা করা বৃথা জেনে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষ অন্য সুর ধরলঃ "ফ্যান দাও গো, ফ্যান দাও।" ' (10)

স্টেটসম্যান পত্রিকার সম্পাদকীয়তে কৌতূহল প্রকাশ করা হল-কলকাতা শহরে এত ভিখারী আসছেটা কোথা থেকে ! উত্তর অবশ্য সহজ ছিল-এরা আসছে সাইক্লোন ও বন্যাবিধ্বস্ত মেদিনীপুর থেকে, সেনাবাহিনীর ক্যাম্পের জন্য ভিটেমাটিহারা ডায়মন্ডহারবার থেকে, চাল-কেড়ে- নেওয়া রংপুর-রাজশাহী থেকে।

জনম মুখার্জী লিখেছেন , ফ্যামিনের বাংলা হল দুর্ভিক্ষ; অর্থাৎ ভিক্ষার অভাব। এমন এক অভাগা দেশ বাংলা, সে কতকাল ধরে না খেয়ে থাকে। যখন ক্ষিদে আর সহ্য হয় না, কাঙাল মানুষগুলো তাদের অবস্থাপন্ন সহনাগরিকদের কাছে হাত পেতে অন্নভিক্ষা নিয়ে কোনোরকমে মৃত্যু ঠেকায়। যুদ্ধের এই ডামাডোলে, সরকার আর পুঁজির চাপে সমাজের উঁচুতলার মানুষ ছাড়া আর সকলেরই ত্রাহি ত্রাহি রব উঠে গেছে। কে আর কাকে সাহায্য করে, কে দান-খয়রাত করে। সবাই বাঁচার দৌড়ে উঠে পড়ে লেগেছে। সহানুভূতি শুকিয়ে গেছে, এই দৌড়ে প্রত্যেকে প্রত্যেকের প্রতিদ্বন্দী। কলকাতা ভিখারীতে ভরে গেছে; তাদের সমবেত আর্তনাদ আর কারো বধির কানে এসে পৌঁছচ্ছে না। দুর্ভিক্ষ, অতএব এসে হাজির হয়েছে। লক্ষ লক্ষ বাঙালী দম্পতি ভয়ে-বিস্ময়ে বিবশ হয়ে দেখছে-'তাহাদের সম্মুখে মন্বন্তর।'

Notes
1.https://www.independent.co.uk/news/uk/politics/not-his-finest-hour-the-dark-side-of-winston-churchill-2118317.html ( The Leo Amery Diaries, p. 832).

2.Janam Mukherjee, p.76 (Nanavati papers, p.1092).

3.https://en.wikipedia.org/wiki/Bengal_famine_of_1943 (Greenough, Paul R. (1982). Prosperity and Misery in Modern Bengal: The Famine of 1943–1944. Oxford University Press. ISBN 978-0-19-503082-2.)
4.Madhushree Mukherjee, p.93 (Brennan, Government Famine Relief in Bengal, p. 549)
5.Janam Mukherjee,p. 79
6.Ibid,p. 82
7.Ibid, p.83 (Stephens,Ian, Monsoon Morning, p.82)
8.Madhushree Mukherjee, p. 99 (Nanavati Papers, file 6B)
9.Janam Mukherjee, p.90 (The Statesman, 10 January, 1942, "No Supplies")
১০.তপন রায় চৌধুরী, বাঙালনামা, আনন্দ পাবলিশার্স, তৃতীয় মুদ্রণ, জুন ২০১২, পৃ ১২৬-১২৭।


474 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: কুশান

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর (পর্ব ৩)

আমার ঠাকুমার কাছে সেই দুর্ভিক্ষের কাহিনী শুনেছি। সব যেন মিলে যাচ্ছে। ওহ। কি ভয়াবহ!!

অসামান্য লিখছেন। শুধু তথ্য নয়। অমানবিক দিকগুলো তুলে ধরছেন।
Avatar: amit

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর (পর্ব ৩)

কি আর বলবো। এই লেখাটা পড়ছি আর মনে হচ্ছে যেন টাইম মেশিনে সেই সময়ে ফেরত গিয়ে সব কিছু জীবন্ত দেখতে পাচ্ছি চোখের সামনে। এই লেখা গুলো নিয়ে পুরোদস্তুর ডকুমেন্টারী বানানো যায়। বই যদি হয় আগে বুক করে রাখলুম।

এবার আর নতুন করে ভালো বললাম না, ভালোর স্টেজ অনেক আগে ছাড়িয়ে ওপরে উঠে গেছে।
Avatar: dd

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর (পর্ব ৩)

উঃ। কী ভয়ংকর। খুব জরুরী লেখা।

একটা প্রশ্ন, "২০শে ডিসেম্বর কলকাতায় প্রথম জাপানী বোমাবর্ষণ হয়। তারপর ২১,২৩,২৪ ও ২৮শে ডিসেম্বর। এর মধ্যে ২৪শে ডিসেম্বরের বোমাবর্ষণ ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। "। এই তথ্যটার কোনো রেফারেন্স আছে?

আমি কোনো তথ্য পাইনি, অব্শ্য আমি ত্যামন খুঁজিও নি। আমার অ্যামনেসিয়া আক্রান্ত স্মৃতি বলে(খুবই আমতা আমতা করে), হাতিবাগানে গোটা তিনেক বোমা পড়েছিলো, সম্ভবতঃ একশো পাউন্ড বা তারো কম ওজনের। মৃত্যু হয়েছিলো একজনের, আহতের সংখ্যা মনে নেই।
Avatar: Du

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর (পর্ব ৩)

এটা পড়ে লেখা যে কতটা কষ্টের সেই জাতির মানুষের পক্ষে আন্দজ করতে পারছি।
Avatar: I

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর (পর্ব ৩)

দীপ্তেনদা,
আমার রেফারেন্স জনম মুখার্জি। তাতে এইরকম লেখা-The third air raid , on Christmas Eve, was the heaviest, coming in two waves of attack, with "sticks" of heavy explosive bombs falling "slap across the middle of the city."( Ian Stephens, Monsoon Morning, p.82)
এখন, ইয়ান স্টিফেন্স-এর বই আমার কাছে নেই। নেটেও তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু পেলাম না। যদিও খুঁজি নি ভালো করে।
সবচেয়ে বড় অ্যাটাক তো হয়েছিল ৫ই ডিসেম্বর, ১৯৪৩ সালে। খিদিরপুর ডকে বোমা পড়ে। আনুমানিক ৩৩৫ জন লোক মারা যায়।

তবে খুব সম্ভবতঃ তুমি ঠিকই বলছ। কেননা জনম মুখার্জি অন্যত্র লিখছেন - Though , by all contemporary accounts, material damage from this first series of Japanese bombings was "SLIGHT " (ক্যাপিটাল লেটার আমার দেওয়া),the ramifications of Japanese attacks on Calcutta in December 1942 were extremely profound. In some sense, it could be argued, these air-raids were among the most devastating of WW II , and can be implicated in the death of as many as 3 million residents in Bengal.
Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর (পর্ব ৩)

উফ! কি চাবুক সময়!

খুবই তথ্যভিত্তিক ও প্রাণোচ্ছল লেখা। মনান্তরের আদ্যপ্রান্ত সংবাদও আছে।

উড়ুক! 👌


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন