Kaushik Ghosh RSS feed

Kaushik Ghoshএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর
    পর্ব ১-------( লালগড় সম্প্রতি ফের খবরের শিরোনামে। শবর সম্প্রদায়ের সাতজন মানুষ সেখানে মারা গেছেন। মৃত্যু অনাহারে না রোগে, অপুষ্টিতে না মদের নেশায়, সেসব নিয়ে চাপান-উতোর অব্যাহত। কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে বোধ হয় বিতর্কের অবকাশ নেই, প্রান্তিকেরও প্রান্তিক এইসব ...
  • 'কিছু মানুষ কিছু বই'
    পূর্ণেন্দু পত্রীর বিপুল-বিচিত্র সৃষ্টির ভেতর থেকে গুটিকয়েক কবিতার বই পর্যন্তই আমার দৌড়। তাঁর একটা প্রবন্ধের বই পড়ে দারুণ লাগলো। নিজের ভালোলাগাটুকু জানান দিতেই এ লেখা। বইয়ের নাম 'কিছু মানুষ কিছু বই'।বেশ বই। সুখপাঠ্য গদ্যের টানে পড়া কেমন তরতরিয়ে এগিয়ে যায়। ...
  • গানের মাস্টার
    আমাকে অংক করাতেন মনীশবাবু। গল্পটা ওনার কাছে শোনা। সত্যিমিথ্যে জানিনা, তবে মনীশবাবু মনে হয়না মিছে কথা বলার মানুষ। ওনার বয়ানেই বলি।তখনও আমরা কলেজ স্ট্রীটে থাকি। নকশাল মুভমেন্ট শেষ। বাংলাদেশ যুদ্ধও শেষ হয়ে গেছে। শহর আবার আস্তে আস্তে স্বভাবিক হচ্ছে। লোকজন ...
  • বিজ্ঞানে বিশ্বাস, চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিশ্বাস বনাম প্রশ্নের অভ্যাস
    এই লেখাটি চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবম্যাগে প্রকাশিত। এইখানে আবারও দিলাম। যাঁরা পড়েন নি, পড়ে দেখতে পারেন। বিজ্ঞানে বিশ্বাস, চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিশ্বাস বনাম প্রশ্নের অভ্যেসবিষাণ বসু“সোমপ্রকাশ। - স্বয়ং হার্বাট স্পেন্সার একথা বলেছেন। আপনি হার্বাট স্পেন্সারকে ...
  • অতীশ দীপংকরের পৃথিবী : সন্মাত্রনন্দের নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা
    একাদশ শতকের প্রথমদিকে অতীশ দীপঙ্কর বৌদ্ধধর্ম ও সংশ্লিষ্ট জ্ঞানভাণ্ডার নিয়ে বাংলা থেকে তিব্বতে গিয়েছিলেন সেখানকার রাজার বিশেষ অনুরোধে। অতীশ তিব্বত এবং সুমাত্রা (বর্তমান ইন্দোনেশিয়া) সহ পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিস্তৃর্ণ ভূভাগে বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শনের ...
  • the accidental prime minister রিভিউ
    ২০০৫ সালের মে মাসে ইউপিএ সরকারের প্রথম বর্ষপূর্তিতে হঠাৎ একটা খবর উঠতে শুরু করল যে প্রধাণমন্ত্রী সব ক্যাবিনেট মিনিস্টারের একটা রিপোর্ট কার্ড তৈরি করবেন।মনমোহন সিং যখন মস্কোতে, এনডিটিভি একটা স্টোরি করল যে নটবর সিং এর পারফর্মেন্স খুব বাজে এবং রিপোর্ট কার্ডে ...
  • উল্টোরথ, প্রসাদ ও কলিন পাল
    ছোটবেলা থেকেই মামাবাড়ির 'পুরোনো ঘর' ব'লে একটি পরিত্যক্ত কক্ষে ঝিমধরা দুপুরগুলি অতিবাহিত হতো। ঘরটি চুন সুরকির, একটি অতিকায় খাটের নীচে ডাই হয়ে জমে থাকত জমির থেকে তুলে আনা আলু, পচা গন্ধ বেরুত।দেওয়ালের এক কোণে ছিল বিচিত্র এক ক্ষুদ্র নিরীহ প্রজাতির মৌমাছির ...
  • নির্বাচন তামসা...
    বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়ে গেছে। এবার হচ্ছে একাদশ তম জাতীয় নির্বাচন। আমি ভোট দিচ্ছি নবম জাতীয় নির্বাচন থেকে। জাতীয় নির্বাচন ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেখার সুযোগ পেয়েছি বেশ কয়েকবার। আমার দেখা নির্বাচন গুলোর মাঝে সবচেয়ে মজার নির্বাচন ...
  • মসলা মুড়ি
    #বাইক_উৎসব_এক্সরে_নো...
  • কাঁচঘর ও ক্লাশ ফোর
    ক্লাস ফোরে যখন পড়ছি তখনও ফেলুদার সঙ্গে পরিচয় হয়নি, পড়িনি হেমেন্দ্রকুমার। কিন্তু, যথাক্রমে, দুটি প্ররোচনামূলক বই পড়ে ফেলেছি। একটির নাম 'শয়তানের ঘাঁটি' ও অপরটি 'চম্বলের দস্যুসর্দার'। উক্ত দুটি বইয়ের লেখকের নাম আজ প্রতারক স্মৃতির অতলে। যতদূর মনে পড়ে, এই ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

যেখানে গাছের মাথায় মেঘ জড়িয়ে থাকে

Kaushik Ghosh

গাছ |

And I don't want the world to see me
Coz I don't think they’d understand
When everything’s meant to be broken,
I just want you to know who I am


ক্যাফের দরজাটা খোলা মাত্র মাঝারি ভল্যুমে চালানো গান কানে ঝাপটা মারলো| রাজপুর রোডটা শেষ হওয়ার কিলোমিটার টাক আগে‚ ডান হাতে রামকৃষ্ণ মিশনটা ছাড়ালেই বাঁ দিকের নেমে যাওয়া রাস্তাটার মোড়েই এই ক্যাফে| ছিমছাম ও পরিপাটি| একটা দেওয়াল শুধুই কাঁচের হওয়ার ফলে‚ দিব্বি দেখা যায় সবুজে মোড়া পাহাড়ের সারি| সাথে উপরি পাওনা হিসেবে রয়েছে এক তাক বই| তার সবকটাই যে পড়তে মন চাইবে তেমনটা নয়; তবু কাঠের আসবাব‚ আবছা আলো আর হাল্কা রক মিউজিকের সাথে সাথে বই গুলো ও যে দোকানটার আকর্ষন বাড়িয়েছে অনেকাংশে‚ সে কথা অস্বীকার করা যায় না| খাবার বলতে অবশ্য পিৎজা‚ স্যান্ডউইচ আর মোমো| সাথে কফি| তবু লোকের ভীড় লেগে থাকে এখানে | ওই কাঁচের দেওয়ালটার জন্য কি? বই আর কেউ তেমন পড়েনা আজকাল|

পিৎজা আর কফি অর্ডার করলো অনল| ব্ল্যাক| দুধ চিনি ছাড়া| তাকটা থেকে একটা বই টেনে নিলো| রাইজ অব থার্ড রাইখ| বাকি গুলোর মধ্যে বেশ কিছু লাইফস্টাইল হ্যাকের বই| কিছু চেতন ভাগত| একটা অশ্বিন সাঙভি আর অল্প কিছু ক্লাসিক| ক্লাসিক গুলোর মধ্যে গ্রেট এক্সপেকটেশানস আছে| প্রথম যেদিন ক্যাফেটায় এসেছিলো অনল‚ সেদিনই বইটা চোখে পড়েছিলো| ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় নভেলটার একটা এক্সসার্পট ছিলো ওদের| পিসটা বড়ুয়া মিস পড়িয়ে ছিলেন| সেই সময়ই ইচ্ছে ছিলো নভেলটা পড়ার| স্কুলের লাইব্রেরি থেকে বইটা খেপে খেপে তুলে শেষ করেছিলো অনল| এখানে এসে প্রথম দিন বইটা দেখে এক অমোঘ আকর্ষনে বইটা টেনে হাতে নিতে ইচ্ছে করেছিলো ওর‚ কিন্তু শেষ মেশ আর নেয়নি| আর এখন যে বইটা তুললো‚ এটা ওর প্রিয় বইদের মধ্যে একটা নয়|

কফি এসে গেছে| পাতা উল্টে কফিটায় একটা চুমুক দিলো অনল| কাঁচের দেওয়ালটার ওপাশে নি:শব্দে বৃষ্টি নেমেছে| ঝরোঝরো বৃষ্টিতে বাইরের প্রকৃতি যেন ষোড়শীটি - দু-হাত দুপাশে মেলে‚ চোখ বুঁজে ঘুরপাক খেতে খেতে হাসি মুখে বৃষ্টি মেখে নিছে নিজের কপালে গালে‚ গলায়‚ বাহুতে‚ শিরায় আর উপশিরায়| বৃষ্টি ধোয়া সবুজ যেন আরো সজীব সতেজ লাগছে| চোখ সরিয়ে নিলো ও|

সামনে রাখা পিৎজার টুকরো গুলো ঠান্ডা হচ্ছে| পাশের টেবিলটায় এক জোড়া ছেলে মেয়ে| কলেজের| অনলের কলেজের কি? বইয়ের পাতায় চোখ রেখে পিৎজাটায় একটা কামড় বসালো ও|

অনল কে প্রথম পিৎজা খাইয়েছিলো মিতুল'দি‚ অনলের জেঠতুতো দিদি| কয়্যামৎ সে কয়্যামৎ তক সিনেমাটা দেখতে গিয়েছিলো মিতুল'দি ওর স্কুলের বন্ধুদের সাথে| ফেরার পথে জলোযোগ থেকে অনলের জন্য নিয়ে এসেছিলো পিৎজা| একটা কোস্টারের মতন পরিধি‚ ছ'টাকা দাম| মিতুল'দি‚ জেঠু, জেঠিমা কেমন আছে কে জানে! ওরা কি এখনো ঢাকুরিয়াতেই থাকে? জেঠু-জেঠিমার সাথে শেষ দেখা হয়েছিলো বোধহয় বছর চোদ্দো আগে| মিতুল'দির সাথে তারও আগে|

ক্যাফের ভেতরের সবকটা আলো জ্বেলে দিয়েছে| পাশের টেবিলের মেয়েটা উচ্ছল হয়ে উঠেছে| পার্কিঙ লট অবধি যেতে গেলে ভীজতে হবে|

কফিটা শেষ করে উঠে পড়লো অনল| গাড়িতে উঠে সীগারেটের প্যাকেটটা হাতড়ে শেষ সিগারেটটা ধরালো| পুরো দমে কাজ করেও ওয়াইপার দুটো বাগে আনতে পারছে না আকাশ ভাঙা বৃষ্টি| রাজপুর রোডের দিকেই গাড়িটাকে ঘোড়ালো ও| ফাউন্টেন সার্কেলের ফোয়ারার ধারা আলাদা করে আর বোঝা যাচ্ছে না| ঘেরাটোপের মধ্যে বিবেকানন্দ পরিচিত ভঙ্গিমায় দন্ডায়মান; ঘাড়টা রামকৃষ্ণ মিশনের উল্টো দিক করে অল্প ঘোড়ানো| মিশনের উল্টো দিকের রাস্তাটায় গাড়িটা তুললো ও| পাঁচশো মিটার মতন এগিয়ে‚ সাঁই মন্দিরটার গা ঘেঁষে যে পাকদণ্ডিটা সহস্ত্রধারা রোডের দিকে চলে গেছে‚ সে দিকেই গন্তব্য ওর|


.................................................................

মেঘ |

সকালের ক্লাশটা কাকে দিয়ে যে এরেঞ্জ করাবো! মেয়েটার কাল রাত থেকে কি যে হলো! এতো সীভিয়ার ডীহাইড্রেশন‚ আজ হসপিটালাইজড করতেই হবে মনে হচ্ছে| নন্হি সি জান! সিঙ্গল মাদার হলে এই অসুবিধা| দায়িত্ব ভাগ করার কেউ নেই| টাইম টেবিলটা একবার দেখি| এ. এম. -এর ক্লাশ আছে পরের পিরিয়ডটা| দেখি ওনাকে রিকুয়েস্ট করে‚ যদি টানা দুটো ক্লাশ নিতে উনি রাজি হন|
ফোন বেজে যাচ্ছে| ফাক! দরকারের সময় যদি একটা কাউকে পাওয়া যায়! ভাড় মে যায়ে; মুন্নি কে নিয়ে এক্ষুণি বেড়িয়ে পড়তে হবে| কালকে এইচ. ও. ডি. কে যা জবাব দেওয়ার‚ তা দেওয়া যাবে| গাড়ির চাবিটাই বা কোথায় গেলো! তারাতারির সময়...যাক‚ পাওয়া গেছে!
চল‚ মুন্নি| অভি ডক্টর অঙ্কল ঠিক কর দেঙ্গে| বিলকুল ঘবড়ানা নহি| মম্মা হ্যায় না আপকে সাথ! মেরি বাহাদুর বেটি!

পাহাড়ী রাস্তা পিছল হয়ে রয়েছে লাগাতার বৃষ্টিতে‚ তবু যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি চালাতে হবে গাড়ি| এ বৃষ্টি চলবে এখন সেপটেম্বরের মাঝামাঝি অবধি| সবে আটটা বাজে‚ হসপিটালে চলে আসবে ডাক্তাররা? দেখাই যাক!
হাঁ‚ ফর্টিস? অভি এমারজেন্সি মে কোই হোঙ্গে কিয়া? ছোটি বচ্চি হ্যায়... চার সাল কি... সীভিয়ার ডীহাইড্রেশন | ঠিক হ্যায়‚ ম্যায় দস মিনট মে পঁহুচ রহি হুঁ| থ্যাঙ্ক ইউ‚ ইউনিভার্স!

কার আবার ফোন আসছে? পরে দেখা যাবে‚ এই হেয়ার পিন বেন্ডটা রিস্কি আছে| বস্' মুন্নি‚ পাঁচ মিনট অওর!

সকাল বেলাটা পার্কিঙ লট ফাঁকা পাওয়া যাবে আশা করি! যাক‚ ঠিকঠাক জায়গা পাওয়া গেছে একটা! থ্যাঙ্ক ইউ‚ ইউনিভার্স! চল বেটা‚ ফটাফট|


-ডক্টর কব তক আয়েঙ্গে?
-বস‚ আধা ঘন্টা অওর| আপ টেনশন না লো ম্যাম‚ হমনে ড্রীপ চড়হা দি হ্যায়| রিসেপশন পে ওয়েট করলো| শী উড বি ফাইন!

ড্রীপটা চড়ে গেছে মানে খানিকটা নিশ্চিন্ত তো বটেই| হে ভগবান‚ ঠিক করে দাও মুন্নি কে| ও ছাড়া আর কেই বা আছে আমার! আকাশের সাথে সেপারেশনের পর থেকে ওই মেয়েকে বুকে জড়িয়েই দিন কেটেছে| ঠিক হয়ে যাবে‚ মুন্নি জরুর ঠিক হো যায়েগী|

সাড়ে আটটা বাজে| কে ফোন করেছিলো দেখা যাক| প্রফেসর মিত্রা| আমার ফোনটা দেখেই করেছেন তার মানে|

- হাঁ মিত্রা স্যর‚ এক এমার্জেন্সি মে ফস গই| আয়াম ইন হস্পিটাল উইথ মাহ ডটার| বাদ মে বতাউঙ্গী সব| ইফ ইউ কুড প্লীজ বি ইন মাই লেকচার... দ্য ওয়ান স্কেডিউল্ড জাস্ট বিফোর ইওর্স|
- শিওর|

যাহ বাবা! শিওর বলে দুম করে কেটে দিলো ফোনটা!! একবারো জিজ্ঞেস করলো না‚ কি হয়েছে| তবে ক্লাশটা যে নিয়ে নেবে বলেছে‚ এই বাঁচোয়া| খুবই কম কথা বলেন ভদ্রলোক| দেমাকি‚ নাকি উদাসীন ? ভাড় মে যায়ে!

তবে ভদ্রলোক এমনিতে নির্বিবাদী | যেচে কারুর সাথে খুব একটা কথা হয়ত বলেন না‚ কিন্তু কেউ কথা বললে ভীষণ ডিসেন্ট ভাবেই কথা বলেন| একদিন তো নিজেই ডেকেছিলেন আমাকে| সিভীল ডীপার্টমেন্টের দিকটা থেকে হেঁটে আসছিলাম‚ পেছন থেকে "মিণাক্ষি" শুনে দেখি উনি| উনি যে আমার নাম জানেন‚ এটা ভেবেই অবাক লেগেছিলো| সেমিনারে ছাত্রদের attendance লিস্টটা এইচ ও ডি আমাকে দিতে বলেছিলেন‚ সেটাই দেওয়ার জন্য ডেকেছিলেন| সেটুকু কথা বলেই লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গেছিলেন ডিপার্টমেন্টের দিকে| তার পরেও টুকটাক কথা হয়েছে‚ তবে সবই সিলেবাস সংক্রান্ত| তাই ব্যক্তিগত ভাবে ভদ্রলোক যে কেমন‚ সেটা জানার তেমন সুযোগ ঘটেনি|

রিসেপশন থেকে ডাকছে‚ ডক্টর সাব আ গয়ে|

.................................................................

গাছ |

হেয়ার পিন বেন্ড’টা থেকে একটু এগিয়ে গেলে রাস্তাটা খানিকটা সোজা হয়েছে| এখানে একটা জায়গায় খাদের পাশের রেলিঙটা ভাঙ্গা| রোজ সকালে এদিকে জগিঙ করতে আসে অনল| নিচে ফিতের মতন দেখা যায় পাথুরে বুকের পাহাড়ী নদী| ভাঙ্গা রেলিঙের ওই টুকু ফাঁক দিয়ে গাড়ি গড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা না থাকলেও‚ মানুষ বা পশু গলে যেতে পারে অনায়াসে|

রোজকার মতন আজো ফাঁকটা পেরিয়ে খাদের দিকে পা ঝুলিয়ে বসলো অনল| দু-দিকে রেলিঙের ভাঙা ইস্পাতের ফলা | একটু দেখে পেরোতে হয় জায়গাটা| ধারালো ফলা আমূল বিঁধে যেতে পারে জঙ্ঘায়| উল্টোদিকের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বসে থাকলো কিছুক্ষণ অনল| ইউক্যালিপটাস গাছ গুলো পাতা ঝরাতে শুরু করেছে অল্প অল্প| একটা বনজ গন্ধ এই রাস্তাটা দিয়ে গেলেই নাকে আসে|

খাদটা সোজা নেমে গেছে নিচে| খাদের গা বেয়ে নিচের দিকে একটাও গাছ নেই| এত ওপর থেকে নদীর শব্দটাও কানে আসে না | এই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে সোজা তাকালে উল্টোদিকের পাহাড়টা ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ে না| পাহাড়টার বুকের কাছে বছরের এই সময়টায় সর্বদাই মেঘ জমে থাকে| পাহাড়টার দিকে তাকালেই উড়তে ইচ্ছে করে অনলের| এই বিন্দুটা থেকে এই পাহাড় নদী আর জঙ্গলের ওপর দিয়ে উড়তে উড়তে নদীটার বুকের দিকে নামতে ইচ্ছে করে ওর| এই শূণ্য থেকে নামতে নামতে নদীটার বুকে বুক ঠেকিয়ে অভিবাদন জানাতে ইচ্ছে করে| নীচের দিকে তাকালো অনল| এই ভরা বর্ষায় নদীটার পাথুরে বুকের প্রায় সবটাই ঢেকে গেছে জলে| শীত কালে পাথর ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না নেচের দিকে তাকালে|

রোদ চড়ছে| রুটিন কাজ গুলো এবার সারতে হবে| বাড়ী ফেরা‚ স্নান করা‚ কলেজ যাওয়া|
দেখতে গেলে‚ সারা জীবনটাই একটা রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে ওর কাছে| এই উনচল্লিশ বছর বয়সে‚ এমন কিছুই করে উঠতে পারেনি অনল‚ যেটাকে ঠিক "অন্যরকম" কিছু একটা বলা চলে| একটা ভীষণ মিডিওকার একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড‚ একটা মিডিওকার চাকরি - এই টুকুই ওর পরিচয়| একটা মিডিওকার জীবন‚ যেটা ভালো বা খারাপ কোনোটাই নয়‚ সেটাই টেনে নিয়ে চলছে লক্ষ্যহীণ ভাবে| এই উনচল্লিশ বছর বয়সে‚ অনল মিত্র শুধু একটা নাম হয়ে রয়ে গেছে|

উঠে পড়ল অনল| বাড়ীর দিকে ফেরার আগে আরেকবার তাকালো নদীটার দিকে|

স্নান সেরে চুল আঁচড়াতে গিয়ে ড্রেসিঙ টেবিলে রাখা ফোনটাকে অভ্যাসবসত তুলে একাবার হাতে নিলো| একটা মিসড কল| মিণাক্ষি মেহতা| কল ব্যাক করে স্পিকারটা অন করে দিয়ে চুল আঁচড়াতে লাগলো অনল| বেজে বেজে কেটে গেলো ফোনটা|
গাড়ীর চাবিটা জিন্সের পকেটে ঢুকিয়ে ফ্ল্যাট থেকে বেড়িয়ে এল ও| গতকাল রাতে খুব বৃষ্টি হয়েছে|আকাশের দিয়ে তাকিয়ে মনে হচ্ছে একটু পরে আবার শুরু হবে হয়ত| জানলার কাঁচ গুলো নামিয়ে দিলো অনল| ভেজা রাস্তায় টায়ারের ঘর্ষণের শব্দটা কানকে আরাম দিচ্ছে|

রাজপুর রোডে গাড়িটা উঠতেই ইউক্যালিপটাসের পাতা আর বাকলের মিশ্র ঘন্ধটা নাকে আসে| ফুসফুসে একটু বেশি করে গন্ধটা ভরে নিলো ও| বৃষ্টির কারনে রাস্তাটা জায়গায় জায়গায় খারাপ হয়েছে| গাড়ির গতিটা অল্প কমালো| ডীয়ার পার্কের উল্টোদিক থেকে খুব জোরে একটা গাড়ি আসছে| হলুদ রঙের ফোর্ড ফিগো| গাড়িটাকে চেনে অনল‚ তবে গাড়িটা আজ উল্টোদিকে ছুটছে‚ গতিটাও অস্বাভাকিক| গাড়িটা মিণাক্ষির|

কলেজের গেটের সামনে পন্থ দাঁড়িয়ে আছে| রোজই থাকে| সিকিউরিটি অফিসার| অনলকে দেখে ডান হাতটা তুললো| অনল ও তুললো| বাঁ হাত| গর্ড়িটা পার্ক করে অন্য দিন সোজা নিজের কেবিনে আসে অনল| আজ গাড়ি থেকে নেমে ফোনটা বের করে শেষ ডায়াল করা নাম্বারটা আবার টিপলো ও|

- হাঁ মিত্রা স্যর‚ এক এমার্জেন্সি মে ফস গই| আয়াম ইন হস্পিটাল উইথ মাহ ডটার| বাদ মে বতাউঙ্গী সব| ইফ ইউ কুড প্লীজ বি ইন মাই লেকচার|
- হুইচ ওয়ান?
- দ্য ওয়ান স্কেডিউল্ড জাস্ট বিফোর ইওর্স|
- শিওর|

ফোনটা কেটে দিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে ডিপার্টমেন্টের দিকে এগিয়ে গেলো অনল|

.................................................................

মেঘ |

এই তিব্বতী রেস্তোরাঁ টা মুন্নির খুব পছন্দের| ছুটির দিনে সকালের ব্রেকফাস্টটা এখানেই করতে চায় ও| ওপেন এয়ার অংশটা জায়গাটার সৌন্দর্যে একটা অন্য মাত্রা দিয়েছে| পাহাড়ের গা চেঁছে অনেকটা সমতল জায়গা বের করে তৈরি হয়েছে রেস্তোরাঁটা| বৃষ্টি পড়লে অবশ্য ভেতরে বসা ছাড়া গতি নেই‚ কিন্তু আজ রোদ উঠেছে ঝলমলে|

এখানকার কর্মীরাও চেনা হয়ে গেছে এতদিনে| ওরা জানে ঠিক কখন কি দিতে হবে - বসার পঁচ মিনিটের মধ্যে আমার কফি আর মুন্নির জন্য জুস দিয়ে যায়| কফিটা শেষ হলে পর আমদের মা-মেয়ে কে বেশ কিছুক্ষণ নিজেদের মতন করে সময় কাটাতে দিয়ে - ঠিক যখন ক্ষিদেটা পেতে শুরু করে‚ সেই সময় - খাবার নিয়ে আসে| আসলে গত তিন বছরে প্রত্যেক উইক এন্ডে আমি আর মুন্নি এসেছি এখানে| সেপারেশনের পর নিজেকে গোছতে যখন সময় লাগছিলো‚ তখন এই রেস্তোরাঁতে এসে বসে থাকতাম চুপচাপ| ওই সামনের পাহাড় গুলোর দিকে তাকিয়ে মনটাকে হাল্কা করার চেষ্টা করতাম| সেই থেকেই ভালো লেগে গেলো জায়গাটা| মুন্নিরও| মুন্নি এসে লনটায় ছুটে বেড়ায় আর আমি বসে থাকি সামনের পাহাড়টার দিকে তাকিয়ে - আমার ওতেই সময়টা কেটে যায় বেশ|

গত সপ্তাহে বেশ ভুগলো মেয়েটা| কেন যে হঠাৎ ডীহাইড্রেশন'টা হলো! শায়দ মুঝ সে হী কুছ চুক হো গয়ী হোগী! আরেকটু সাবধান হতে হবে মুন্নিকে নিয়ে| সেদিন একটু ভয়ই পেয়ে গেছিলাম | কিন্তু সময় মতন হসপিটালে নিয়ে গিয়ে অবস্থা সামাল দেওয়া গেছিলো| প্রফেসর মিত্রা টু হ্যাড বিন রিয়লি কোঅপারেটিভ| শুধু সেদিনের ক্লাশটা নেওয়াই নয়‚ পরের দিন যখন ওনাকে থ্যাক ইউ জানাতে গিয়ে বললাম মুন্নির কথা‚ উনি জিজ্ঞেস করেছিলেন কোনো সাহায্য লাগবে কিনা| হসপিটালে যেতে হবে কিনা‚ তাও জিজ্ঞেস করেছিলেন| সত্যি অবাক হয়েছিলাম| প্রফেসর মিত্রার মতন মানুষ যে কারুর জন্য এতটা ভাবতে পারেন‚ তা বিশ্বাস হয়না| তবে এতদিনে যা বুঝলাম‚ ওঁনার ভাবটাই ওরকম| দেখা হলে হাই তারপর আর কোনো কথা নেই! উদ্বেগ-উত্তেজনা-আনন্দ কিছুই ধরা পরেনা ওঁনার অভিব্যক্তিতে| কিন্তু মানুষটার মধ্যে একটা মন আছে সেটা ওঁনার সাথে কথা বলতে গিয়ে বুঝেছিলাম| শুধু মৌখিক ভদ্রতা প্রকাশ নয়‚ সেদিন ওঁনার চোখে সত্যিকারের কন্সার্ন দেখতে পেয়েছিলাম মুন্নির জন্য | মানুষের চোখের ভাষা মিথ্যে হয় না|

কফিটা বেশ বানিয়েছে! অন্যদিন লাতেই নি‚ কিন্তু আজ কি ভেবে যেন মোকা বলে দিয়েছিলাম| ঠকিনি| মুন্নিটা বড় হচ্ছে| মাঝে মাঝে বাবার কথা জিজ্ঞেস করে| আকাশ অবশ্য প্রতি সপ্তাহেই দেখা করতে আসে‚ কিন্তু তাতে আজকাল আর মুন্নির মন ভরছেনা - এটা বেশ বুঝতে পারি আমি| আখির মা হুঁ উসকি! পাপার অফিস আছে‚ ট্যুরে যায় - এ সব মিথ্যে গুলো মুন্নিকে বলতে ভীষণ খারাপ লাগে| কিন্তু এত ছোটো বাচ্চা কে সব বুঝিয়ে বলা এতটা সোজা নয়| আরেকটু বড় হোক মেয়েটা‚ সব খুলে বলতে হবে তখন ওকে| মুন্নির সামনে এই মিথ্যে স্বামী-স্ত্রী’র অভিনয় আমার নিজের কাছেই নিজের সম্মান হানি করে বারে বারে|

আজ দিনটা খুব ঝলমলে| তবে পাহাড়ের আবোহাওয়াকে বিশ্বাস নেই| আকাশের চেহারা এই ঝলমলে ‚ তো এই গোমড়া! একটা পাখি অনেক্ষণ ধরে ডেকে চলেছে| কৌন সি চিড়িয়া হ্যায়? রেস্তোরাঁর বাইরে দিয়ে রাস্তাটা এঁকে বেকে চলে গেছে সাঁই মন্দিরের দিকে| অল্প কিছু গাড়ি‚ সাইক্লিস্ট আর জগার দেখা যাচ্ছে মাঝে মাঝে| তা বাদে ছুটির দিনে রাস্তা শুনশান| নীল রঙের ট্র্যাক স্যুট পড়া লোকটা কে অনেকটা প্রফেসর মিত্রার মতন লাগছে না? আরেকটু কাছে এলে বোঝা যাবে| ওমা‚ উনিই তো! ডাকার প্রশ্ন ওঠে না| উনি কি এদিকেই কোথাও থাকেন?

ব্রেকফাস্টটা নিয়ে এসেছে|

"মুন্নি‚ জলদি ইধর আও!"

.................................................................

গাছ |

থার্ড ইয়ারের একটা ছেলের আসার কথা আছে বারোটা নাগাদ| একটা পেপারের কাজ চলছে‚ সেটা নিয়েই আলোচনা করতে আসবে| এ সব কাজে খুব একটা আগ্রহ পায় না আজকাল অনল‚ তবু বসবে ছেলেটাকে নিয়ে| বাঁ হাতের কবজি উল্টে সময়টা দেখে নিলো - মিনিট কুড়ি সময় আছে| ইলেক্ট্রিক কেটলিটায় জল চড়িয়ে ড্রয়ার থেকে কফির কৌটোটা বের করলো ও|

জলটা ফুটে গেছে| কড়া কফির নেশাটা প্রফেসর দাসের থেকে পাওয়া| অনলের পি এইচ ডি'র গাইড| কলেজের পর রোজ সন্ধ্যে বেলায় ওঁনার সাথে রিসার্চের কাজের আলোচনা করতে করতে দু-তিন কাপ কফি খাওয়া হয়েই যেত| ব্ল্যাক| দুধ চিনি ছাড়া| স্যর এখন কলকাতায়| গত মাসে দিল্লিতে একটা কন্ফারেন্সে দেখা হয়েছিলো| মাঝে মাঝে ফোনে অবশ্য কথা হয় ওঁনার সাথে| বয়স হয়ে গেছে স্যরের| চুল গুলো সব ধপধপে সাদা হয়ে গেছে| তবে গলার স্বরটা এখনো একই রকম গমগমে| স্যর বাঁচতে ভালোবাসেন|

ছেলেটার আসতে এখনো মিনিট দশেক সময় আছে| মিণাক্ষি কে কি একটা ফোন করবে? গতকাল সকালে জগিঙ করতে গিয়ে "ফ্রী টিবেট" রেস্তোরাঁর লনে মিণাক্ষিকে বসে থাকতে দেখেছে অনল| আগেও দেখেছে কয়েকবার‚ কিন্তু কাল এবার ওর মেয়েটার কুশল জিজ্ঞেস করা উচিৎ ছিলো কি? ফোনটা হাতে তুলে মিণাক্ষির নম্বরটা খুঁজে বের করলো ও| দু পলক নম্বরটার দিকে‚ বা হয়ত নামটার দিকে তাকিয়ে রইল অনল| বাচ্চাটার প্রতি কি মায়া পড়ছে অনলের? টেবিলে ফোনটা নামিয়ে রাখলো ও|


এত দিস্তা দিস্তা পেপার যে লেখা হয়‚ কে পড়ে এ সব? জঞ্জাল| তবু এ জঞ্জাল ঘেঁটে যেতেই হবে| না‚ যেতেই যে হবে তেমন কোনো কথা নেই| উইথড্র করাই যায় যে কোনো সময় - জীবীকা থেকে‚ জীবন থেকে - ওটা কিছু নয়| তবু এতদিন যে উইথড্র করেনি‚ তার কারন এই নয় যে জীবনের কোনো বিষেশ দিক ওকে আজো উদ্বুদ্ধ করে; উইথড্র করেনি কারন‚ এই জীবনটা ওকে বন্ধনে জড়াতে পারেনা আর| এই যে একটা নৈর্বিত্তিক জীবন শৈলী‚ সেটাতে ও বেশ অভ্যস্ত হয়ে গেছে| যদি কোনোদিন দেখে যে এর ব্যত্যয় হচ্ছে‚ সেদিন উইথড্র করতে সমস্যা হবে না অনলের|

ছেলেটা এসে গেছে| শেষ কটা চুমুক মেরে কফির কাপটা টেবিলে নামিয়ে রাখল অনল| রেজাল্টের গ্রাফ গুলো দেখাচ্ছে ছেলেটা| দেখে ঠিক ঠাকই মনে হচ্ছে গ্রাফ গুলো| গ্রাফ গুলো দেখতে দেখতে ছেলেটার মুখের দিকে এক আধ বার চেয়ে দেখে নিলো অনল - চোখে মুখে উৎসাহ ঝিলিক দিচ্ছে| অনলও একসময় ওর মতই উৎসাহী ছিলো|
পেপারটা নিজেকেই লিখতে হবে| ছেলেটা কাজ ঠিকঠাক করলেও‚ লিখতে পারছে না ঠিক করে| ওকে লিখতে বলে শুধু শুধু সময় নষ্ট করার মানে হয়না|

ছেলেটা চলে গেলে পর ফোনটা টেবিল থেকে হাতে তুলে আবার নামিয়ে রাখলো অনল| মোবাইলের ঘড়িতে বারোটা পঞ্চান্ন| লাঞ্চের সময় হতে এখনও মিনিট পাঁচেক আছে| কেবিনের আলোটা নিভিয়ে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচের ফ্লোরে চলে এলো ও|

.................................................................

মেঘ |

মিড-টার্মের খাতা গুলো দেখে নম্বর তুলে ফেলতে হবে পরশুর মধ্যে| পুরো উইক এন্ডটা ওতেই গেলো‚ তবু খাতা শেষ হয়নি|| ঘরের বাকি কাজ গুলো যে কি করে সারাবো বুঝতে পারছি না| রোববারের সকাল| মুন্নিটাকেও বুঝিয়ে বললাম যে এ সপ্তাহে আমার কাজ আছে‚ বাড়ি থেকে বেরোনো যাবে না| ভারি বুঝদার হয়েছে মেয়েটা‚ চুপচাপ নিজের খেলা নিয়ে আছে|

ল্যামপোর্ট'স এলগোরিদম| কী যে হিজিবিজি সব লিখেছে‚ তার ঠিক নেই| গলা ফাড় ফাড় কে বতায়া ইন বচ্চোঁ কো‚ আর কি লিখেছে দেখো! ভালো লাগে না| একটু ওঠা যাক‚ টানা এতক্ষণ বসে থাকাটা সাস্থ্যের পক্ষে ঠিক নয়|

অনেকদিন পরে আজ বেশ রোদ উঠেছে| থ্যাঙ্ক ইউ‚ ইউনিভার্স! বৃষ্টি যে আর কতদিন চলবে কে জানে! এবার যেন একটু বেশিই হচ্ছে বৃষ্টি| অনান্য বছর এতদিনে থেমে যায়‚ কিন্তু এবার যেন থামতেই চাইছে না| আগামী সাতদিনের ফোরকাস্টেও থান্ডার স্টর্ম দেখাচ্ছে| একটু চা নিয়ে বারন্দাটায় বসি| চা খেয়ে আবার খাতা দেখতে বসতে হবে|

আহ! চায়ে চুমুক দিয়ে মাথাটা একটু ছাড়লো| শুক্রবার লাঞ্চের আগে হঠাৎ ই প্রফেসর মিত্রা আমার কেবিনে এসে নক করলেন| সাময়িক বিহ্বলতা কাটিয়ে ওঁনাকে কত করে বসতে বললাম‚ কিন্তু উনি শুধু মুন্নির খবরটুকু জিজ্ঞেস করে চলে গেলেন| ভেরি মাচ লাইক হিম! কিন্তু খুব ভালো লাগলো ওঁনার এই জেস্চারটা| আজকের দিনে কৌন সোচতা হ্যায় দুসরে কে বারে মে| আচ্ছা‚ কে কে আছেন ওঁনার বাড়ীতে? ওঁনার মতন লোককে সেটা জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে কি? সওয়াল হি নহি উঠতা|

মিড-টার্ম গুলো পঞ্চাশে হয়‚ এই এক বাঁচোয়া! তাড়াতাড়ি খাতা দেখা হয়ে যায়| গোটা দশেক খাতা দেখে উঠবো| মুন্নিটাকে স্নান করাতে হবে| আজ বাল ধোনা হ্যায় উসকা| হ্যাঁ‚ এই খাতাটায় সব ঠিকঠাক লিখেছে দেখছি| কার খাতা? মিনল| খুব সিনসিয়ার মেয়েটা| এরকম খাতা দেখতেও ভালো লাগে‚ সময় ও কম লাগে|
তবে মিনলের খাতাটাকে রেফারেন্স ধরলে মুস্কিল আছে‚ অর্ধেক ছেল-মেয়ে পাশ করবে না| অন্যদের খাতা একটু লিনিয়্যান্ট চেক করতে হবে| আরেকটা ছেলে আছে বটে এই ব্যাচে‚ ভালো| তবে মিনলের মতন নয়|

মুন্নিকে স্নান করানোর আগে বরং রান্নাটা একটু সেরে নিই| ছোলে| কাল রাতেই ভিজিয়ে রেখেছিলাম| অল্প কটা সিটি মারলেই সেদ্ধ হয়ে যাবে| ছৌঁক লাগানোর পরে শেষে একটু ধনিয়া পাত্তা ছড়িয়ে দেবো‚ খেতে ভালো লাগবে|

একটা টিফিন বক্সে করে অল্প একটু ছোলে তুলে রাখবো কি প্রফেসর মিত্রার জন্য ?
.................................................................

গাছ |

ডিমটা ভাজতে গিয়ে পুড়ে গেল| একটু অন্য মনস্ক ছিলো কি ও? ফ্রীজ থেকে আরো দুটো ডিম বের করে আনলো অনল| এমনিতে রান্না করতে গিয়ে এরকম বেখেয়াল হয়না ওর| বহু দিন যাবৎ একা থাকার ফলে রান্নাটা গড়পরতা ভারতীয় পুরুষদের তুলনায় অনেকটাই বেশি পরিপাটি করে করতে পারে ও - তার জন্য্য আলাদা ভাবে সচেতন থাকতে হয়না ওকে| চপিঙ বোর্ডটা টেনে নিয়ে নতুন করে আবার শুরু করলো অনল|

মিণাক্ষির টিফিন বক্সটা ফেরৎ দিতে হবে| মা বলতো কাউকে খালি বাটি ফেরৎ দিতে নেই| এই মূহুর্তে ঘরে যা আছে‚ তাতে চীজ অমলেট ছাড়া আর কিছু বানানোর কথা মাথায় আসছে না| গতকাল হঠাৎই মিণাক্ষি ওর কেবিনে এসে দিয়ে গেলো টিফিন বক্সটা| ছোলে| অনলের পছন্দের খাবার গুলোর মধ্যে একটা নয়|

একটা সবুজ রঙের কুর্তী আর জিন্স পরে ছিলো মিণাক্ষি| কানে ঝোলা দুল| মিণাক্ষিকে বারে বারে দেখতে ইচ্ছে করছিলো‚ তাই অনল চোখ সরিয়ে দেওয়ালের দিকে তাকিয়েই কথা বলছিলো ও | মিনিট পাঁচেক‚ কিন্তু ভালো লাগছিলো অনলের| সে জন্যই ভালোলাগাটাকে দ্রুত শেষ করতে টিফিন বক্সটা তাড়াতাড়ি ফেরৎ পাঠাতে চাইছে ও| জীবনটা ভালো বা মন্দে দাগাতে চায় না অনল| জীবনকে ভালোবেসে বাঁচতে চায় না ও| ঘৃণা করেও নয়| কিন্তু এই সব ছোটো ছোটো ভালোলাগা গুলো থেকেই জীবনের প্রতি ভালোবাসা আসে| এটা অনল জানে| এ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে ও আগেও গেছে| আর তাই আজকাল সচেতন থাকে ও - জীবনের রূপ রস স্পর্শ গন্ধ - কোনো কিছুই যেন ওকে অরেকবার বাঁধতে না পারে ‚ জীবনের সাথে|

মিণাক্ষির প্রতি কি করুণা জন্মাচ্ছে অনলের? সিঙ্গল মাদার বলে? না| শী ইজ আ স্ট্রঙ লেডি| আর তা ছাড়া কোনো মানুষকে করুণা করার মতন ইনসেন্সেবল নয় ও| সে ধৃষ্টতাও নেই ওর| তবে?

এবার চানে যেতে হবে| নিজের টিফিন আগেই গুছিয়ে নিয়েছে অনল| অমলেটটা ফ্রায়িঙ প্যান থেকে তুলে টিফিন বক্সে রাখলো| মিণাক্ষির|

.................................................................

মেঘ |

এক একটা দিন বেশ কাটে‚ মানে ঠিক যেমনটি চাইছি‚ তেমনটি| আজকেরদিনটাও সেরকমই ছিলো| সকালে ফোনটা হাতে নিয়ে মেইল চেক করতেই সুখবরটা পেলাম| একটা পেপারের acceptence এসেছে ইউ কে থেকে| খুব জ্বালিয়েছে পেপারটা! দু-বার রিভিশন এসেছিলো| রিভিউয়ারদের সব কটা পয়েন্ট address করার পরেও দুরু দুরু বুকে অপেক্ষায় থেকেছি কতদিন| সাবমিশন আর acceptance-এর মধ্যে সময় গেছে দেড় বছর| কলেজে ভালো লাগাটুকু নিয়ে ঢুকতে না ঢুকতেই এইচ ও ডি'র তলব এসেছিলো| ওঁনার ঘরে ঢুকতেই হাসি মুখে খবরটা দিলেন - প্রোমোশন! খুশি কা ঠিকানা হী নহি রহা| থ্যাঙ্ক ইউ‚ ইউনিভার্স!!!

লাঞ্চের সময় প্রফেসর মিত্রা এসে কনগ্র্যাচুলেট করে গেলেন| অনেক্ষণ গল্পও হল| উনি যেদিন আমার জন্য অমলেট বানিয়ে এনেছিলেন‚ সেদিনই বলেছিলাম‚ অব সে আপ মেরে সাথ হি লাঞ্চ করনা| হী ইন হিজ ইউজুয়াল ওয়ে, "শিওর" বলে চলে গেছিলেন সেদিন| ভেবেছিলাম হয়ত কথার কথা বললেন| কিন্তু পরের দিন সত্যি এসেছিলেন লাঞ্চের সময়| তার পরের দিনও| ইনফ্যাক্ট‚ তারপর থেকে আমরা এক সাথেই লাঞ্চ করি| বিশ্বাস হয়নি যে ওঁনার মতন অমিশুকে মানুষ সত্যিই কারুর সাথে বসে লাঞ্চ করবেন| খুব বেশি কথা অবশ্য বলেন না‚ কিন্তু কথার ফাঁকে ফাঁকে অল্প অল্প হাসেন| হাসলে মানুষকে কত সুন্দর দেখায়| কেনো যে উনি সারাক্ষণ অমন গোমড়া মুখে বসে থাকেন জানি না! অবশ্য এ সব কথা বলার মতন হৃদ্যতা ওঁনার সাথে তৈরি হয়নি| না‚ একসাথে লাঞ্চ করলেও না|

আজকে লাঞ্চের পরে উনি আমাকে কফিতে ইনভাইট করলেন| কলেজ থেকে বেড়িয়ে রাজপুর রোডে ওঠার মুখে একটা ছিমছাম ক্যাফে আছে‚ সেখানেই | আসছে শণিবার|

এক একটা দিন বেশ কাটে‚ মানে ঠিক যেমনটি চাইছি‚ তেমনটি| আজকেরদিনটাও সেরকমই ছিলো|
আমি কি এতদিন মনে মনে এটাই চাইছিলাম?

.................................................................

গাছ |

একটু সময় নিয়েই দাড়িটা কাটলো অনল| আফটার শেভটা দু-হাতের তালুতে ঘষে নিয়ে দুই গালে চেপে বাথরুমের আয়নাটার দিকে চেয়ে রইল খানিকক্ষণ|

ছুটির দিন| আজকে বেশ দেরি করেই উঠেছে ও| দুপুরের খাওয়াটা কোনো মতে সেরে জামাটা ইস্ত্রি করেছে|পোলকা ডটস|
আজকে সকালে জগিঙে যায়্নি ও ইচ্ছে করেই| মিণাক্ষির সাথে দেখা করতে চায়নি সন্ধের আগে| সকালে জগিঙ থেকে ফেরার সময় ওই রেস্তোরাঁয় নিশ্চয়ই বসে থাকতো মিণাক্ষি| ওপেন এয়ার অংশটায়|

সন্ধে বেলায় কফিতে ডেকেছে আজ ও মিণাক্ষি কে| এটা কি ডেট? অনলের উনচল্লিশ‚ মিণাক্ষির চৌঁত্রিশ| এই বয়সে কি মানুষ "ডেটে" যায়? অনলের প্রথম ডেট উনিশ বছর বয়সে|

বসার ঘরের সোফাটায় এসে বসলো অনল| গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাবলি মাথার ভেতর একটু খেলিয়ে নিলো| মুন্নির জন্য উদ্বেগ‚ মিণাক্ষির সাথে একসাথে রোজ লাঞ্চ‚ আজকের "ডেট" - এ সব যদি জীবনের সাথে জড়িয়ে পড়া না হয়‚ তবে আর কাকে বলে জড়িয়ে পরা? জীবনকে আবার ভালোবাসতে শুরু করেছে ও - এটা বুঝতে এতটা দেরি হওয়া উচিৎ ছিলো না ওর| বেটার লেট দ্যান নেভার| দেওয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালো অনল| ক্যাফেতে মিণাক্ষির আসতে এখনো দু-ঘন্টা দেরি আছে| দ্রুত সীদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে ও| ইটস দ্যা রাইট টাইম টু উথড্র‚ ইটস দ্য রাইট টাইম টু ফ্লাই| ওড়ার জন্য এটাই উপযুক্ত সময়| যাওয়ার আগে ক্যাফেটায় শেষ বার কফিটা খেয়ে যাবে অনল| ব্ল্যাক| দুধ চিনি ছাড়া| এখনই বেরোলে পনের মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাবে|


ক্যাফেটার সামনে গাড়িটা পার্ক করে কাঁচের দরজাটার দিকে এগিয়ে গেলো অনল|

And I don't want the world to see me
Coz I don't think they would understand
When everything is meant to be broken,
I just want you to know who I am

ক্যাফের দরজাটা খোলা মাত্র মাঝারি ভল্যুমে চালানো গান কানে ঝাপটা মারলো|


কফিটা শেষ করে উঠে পড়লো অনল| গাড়ীতে উঠে সীগারেটের প্যাকেটটা হাতড়ে শেষ সিগারেটটা ধরালো| পুরো দমে কাজ করেও ওয়াইপার দুটো বাগে আনতে পারছে না আকাশ ভাঙা বৃষ্টি| রাজপুর রোডের দিকেই গাড়িটাকে ঘোড়ালো ও| ফাউন্টেন সার্কেলের ফোয়ারার ধারা আলাদা করে আর বোঝা যাচ্ছে না| ঘেরাটোপের মধ্যে বিবেকানন্দ পরিচিত ভঙ্গিমায় দন্ডায়মান; ঘাড়টা রামকৃষ্ণ মিশনের উল্টো দিক করে অল্প ঘোড়ানো| মিশনের উল্টো দিকের রাস্তাটায় গাড়িটা তুললো ও| পাঁচশো মিটার মতন এগিয়ে‚ সাঁই মন্দিরটার গা ঘেঁষে যে পাকদণ্ডিটা সহস্ত্রধারা রোডের দিকে চলে গেছে‚ সে দিকেই গন্তব্য ওর|

হেয়ার পিন বেন্ডটার কাছে এসে পাহাড়ের দিকে গাড়িটাকে পার্ক করলো| ভাঙা রেলিঙের ফাঁক গলে উল্টোদিকের পাহাড়ের দিকে একবার তাকালো| বৃষ্টি পড়ে চলেছে অবিরত| ওই পাহাড়েও বৃষ্টি হচ্ছে কি? নিচে নদীটা বয়ে চলেছে নি:শব্দে| এবার উড়বে ও| নদীটার বুকে বুক ঠেকিয়ে আজ অভিবাদন জানাবে ও| ওড়ার জন্য শরীরটাকে প্রস্তুত করে নিলো| এক ঝকটায় ওড়ার চেষ্টা করতেই পেছন থেকে আচমকা একটা টানে বেসামাল হয়ে রাস্তার দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়লো অনল| মিণাক্ষি| অনলের জামাটা খিমচে ধরে আছে এখনো| রাস্তায় পড়ে গিয়ে বাঁ চোখের পাসটা ছড়ে গেছে মিণাক্ষির; রক্ত পড়ছে অল্প| যন্ত্রণায় নীল হয়ে যাচ্ছে অনল‚ ইস্পাতের ফলাটা আমূল বীঁধে গেছে ওর ডান জঙ্ঘায়| নিয়মিত ব্যামের ফলে শরীরটা ফীট আছে এখনো| এখনো চাইলে ও মিণাক্ষির হাত ছাড়িয়ে উড়তে পারে ওই নদীটার দিকে| ও পাশে নদী‚ আর এ পাশে বাঁচার আকুতি নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে মিণাক্ষি|

এর আগেও তো এই আকুতি দেখেছে অনল অন্য কারুর চোখে| বাঁচতে চেয়েছে| ভালোবাসতে চেয়েছে জীবনকে|

ডান পা-টা অবশ হয়ে আসছে| খাদের অ-নেক নীচে নদীটা বয়ে চলেছে‚ নি:শব্দে| অনল দেখতে পাচ্ছে না নদীটাকে আর| অঝর বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছে মিণাক্ষির দু চোখের জল|

জীবনকে ভালোবেসে দেখবে কি অনল? আরেকবার?


419 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: b

Re: যেখানে গাছের মাথায় মেঘ জড়িয়ে থাকে

ভালো লাগলো।
Avatar: aranya

Re: যেখানে গাছের মাথায় মেঘ জড়িয়ে থাকে

বাঃ
Avatar: শঙ্খ

Re: যেখানে গাছের মাথায় মেঘ জড়িয়ে থাকে

বাহ। তবে গল্পের পটভূমিকা মালয়েশিয়া করলে আরো জমে যেত 😜😜
Avatar: chanchal

Re: যেখানে গাছের মাথায় মেঘ জড়িয়ে থাকে

বাহ্ খুব ভালো লাগলো কৌশিক ।
Avatar: Kaushik

Re: যেখানে গাছের মাথায় মেঘ জড়িয়ে থাকে

ধন্যবাদ সকলকে!


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন