স্বাতী রায় RSS feed

Swati Rayএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • একটি বই, আর আমার এই সময়
    একটি বই, আর আমার সময়বিষাণ বসুএকটি আশ্চর্য বইয়ে বুঁদ হয়ে কাটলো কিছু সময়। দি রেড টেনডা অফ বোলোনা।প্রকাশক পেঙ্গুইন মডার্ন। দাম, পঞ্চাশ টাকা। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন। মাত্র পঞ্চাশ টাকা।বোলোনা ইতালির এক ছোটো শহর। শহরের সব জানালার বাইরে সানশেডের মতো করে মোটা কাপড়ের ...
  • রবি-বিলাপ
    তামুক মাঙায়ে দিছি, প্রাণনাথ, এবার তো জাগো!শচীন খুড়ার গান বাজিতেছে, বিরহবিধুর।কে লইবে মোর কার্য, ছবিরাণী, সন্ধ্যা রায়, মা গো!এইক্ষণে ছাড়িয়াছি প্রিয়ঘুম, চেনা অন্তঃপুর।তুহু মম তথাগত, আমি আজ বাটিতে সুজাতা।জাগি উঠ, কুম্ভকর্ণ, আমি বধূ, ভগিনী ও মাতা।তামুক সাজায়ে ...
  • ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের শিক্ষা দিবস
    গত ১৭ই সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে ‘শিক্ষা দিবস’ ছিল। না, অফিশিয়ালি এই দিনটিকে শিক্ষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি বটে, কিন্তু দিনটি শিক্ষা দিবস হিসেবে পালিত হয়। সেদিনই এটা নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু ১৭ আর ১৯ তারিখ পরপর দুটো পরীক্ষার জন্য কিছু লেখা ...
  • বহু যুগের ওপার হতে
    কেলেভূতকে (আমার কন্যা) ঘুড়ির কর (কল ও বলেন কেউ কেউ) কি করে বাঁধতে হয় দেখাচ্ছিলাম। প্রথম শেখার জন্য বেশ জটিল প্রক্রিয়া, কাঁপকাঠি আর পেটকাঠির ফুটোর সুতোটা থেকে কি ভাবে কতোটা মাপ হিসেবে করে ঘুড়ির ন্যাজের কাছের ফুটোটায় গিঁট বাঁধতে হবে - যাতে করে কর এর দুদিকের ...
  • ভাষা
    এত্তো ভুলভাল শব্দ ব্যবহার করি আমরা যে তা আর বলার নয়। সর্বস্ব হারিয়ে বা যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে যে প্রাণপণ চিৎকার করছে, তাকে সপাটে বলে বসি - নাটক করবেন না তো মশাই। বর্ধমান স্টেশনের ঘটনায় হাহাকার করি - উফ একেবারে পাশবিক। ভুলে যাই পশুদের মধ্যে মা বোনের ...
  • মুজতবা
    আমার জীবনে, যে কোন কারণেই হোক, সেলিব্রিটি ক্যাংলাপনা অতি সীমিত। তিনজন তথাকথিত সেলিব্রিটি সংস্পর্শ করার বাসনা হয়েছিল। তখন অবশ্য আমরা সেলিব্রিটি শব্দটাই শুনিনি। বিখ্যাত লোক বলেই জানতাম। সে তিনজন হলেন সৈয়দ মুজতবা আলী, দেবব্রত বিশ্বাস আর সলিল চৌধুরী। মুজতবা ...
  • সতী
    সতী : শেষ পর্বপ্ৰসেনজিৎ বসু[ ঠিক এই সময়েই, বাংলার ঘোরেই কিনা কে জানে, বিরু বলেই ফেলল কথাটা। "একবার চান্স নিয়ে দেখবি ?" ]-- "যাঃ ! পাগল নাকি শালা ! পাড়ার ব্যাপার। জানাজানি হলে কেলো হয়ে যাবে।"--"কেলো করতে আছেটা কে বে ? তিনকুলে কেউ আসে ? একা মাল। তিনজনের ঠাপ ...
  • মকবুল ফিদা হুসেন - জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য
    বিনোদবিহারী সখেদে বলেছিলেন, “শিল্পশিক্ষার প্রয়োজন সম্বন্ধে শিক্ষাব্রতীরা আজও উদাসীন। তাঁরা বোধহয় এই শিক্ষাকে সৌখিন শিক্ষারই অন্তর্ভুক্ত করে রেখেছেন। শিল্পবোধ-বর্জিত শিক্ষা দ্বারা কি সমাজের পূর্ণ বিকাশ হতে পারে?” (জনশিক্ষা ও শিল্প)কয়েক দশক পরেও, পরিস্থিতি ...
  • আমি সংখ্যা লঘুর দলে...
    মানব ইতিহাসের যত উত্থান পতন হয়েছে, যত বিপদের সম্মুখীন হয়েছে তার মধ্যে বর্তমানেও যা প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে এমন কিছু সমস্যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শরণার্থী সমস্যা। হুট করে একদিন ভূমিহীন হয়ে যাওয়ার মত আতঙ্ক খুব কমই থাকার কথা। স্বাভাবিক একজন পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচে ...
  • প্রহরী
    [মূল গল্প – Sentry, লেখক – Fredric Brown, প্রথম প্রকাশকাল - ১৯৫৪] .......................


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

পায়ের তলায় সর্ষে - বাংলাদেশ

স্বাতী রায়

#জলছবি-বাংলাদেশ
( সবার যেমন কিছু স্বপ্নের ভ্রমণ থাকে, আমারটা ছিল বাংলাদেশ। বাবা-পিতামো’র চরণধুলি যেখানে পড়েছিল সেই দেশ দেখব। এই ছিল স্বপ্ন। চূড়ান্ত পিতৃতান্ত্রিক ভাবনা। তবুও। গিয়েওছিলাম। অসম্ভব আনন্দ হয়েছিল। আজ প্রায় এক দশক পরে দেখছি স্মৃতিটা ঝাপসা হয়ে আসছে। কিন্তু এই স্মৃতিটা এমন, যাকে আমি একদম ফিকে হয়ে যেতে দিতে চাই না। সেই ধরে রাখার তাগিদে এই লেখা। তবে হয়তো একটু ভালবাসায় বায়াসড, কখনো বা পলিটিক্যালি ভুল লেখা হবে। যারা পড়বেন তাঁরা নিজ গুণে মার্জনা করবেন এই আশা। )

দিন - ১

বাংলাদেশ গিয়েছিলাম বহুবছর আগে, ২০০৯ সালে। প্রচুর চাপ তখন জীবনে, ছেলে মোটে তিন বছরের, মেয়ের কিশোরীবেলা - একটু বেশিই মনোযোগ লাগে, অফিসেও অনেক কাজ - তবু খালি মনে হচ্ছিল সময় চলে যাচ্ছে , আরও বেশী দেরী হওয়ার আগেই যেতে হবে। দরকারটা একেবারে নিজের মনের - বাবার হাত ধরে একবার পিতৃ-পুরুষের ভিটেয় গিয়ে দাঁড়াব, মিলিয়ে নেব ঠাকুমার কাছে শুনে শুনে মনের মধ্যে তৈরি হওয়া ছবিগুলোকে। বাবা তখন মাঝে মাঝেই একটু হাসপাতালে কাটিয়ে আসছেন, তাই তাড়াটা বাড়ছিল। কিন্তু সবার সময় হতে হতে সেই মে মাস। মনের মধ্যে খুঁতখুঁতুনি - ওই ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে মে মাসের গরমে অতখানি ঘোরা - যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাহলে তো আমার গর্দান চলে যাবে। তার উপর আমার ছেলে সেই বয়সেই তাসের দেশের লোকেদের মত নিয়ম-মতে চলে এবং একটি পরিপূর্ণ জ্ঞানের সাগর। দুপুরে ভাতের বদলে শুকনো খাবার দিলে বলে, " এখন কি কেউ সন্দেশ খায়? আমি ভাত খাবো - এখন ভাত খাবার সময়।" এই সব পাবলিক নিয়ে আদৌ বেড়ান যাবে তো! তবু ওই যে, মনের মধ্যে টান পড়েছে। তাই সব খুঁতখঁতুনি চাপা দিয়ে, জয় দুর্গা বলে রওনা দেওয়া হল। সব ব্যবস্থাপনা জেনর্ড ট্রাভেলস এর গৌতম বাবুর, দায়িত্বে রাজীব শিকদার। প্রসঙ্গত বলি, বেড়ানর ব্যবস্থা আমি নিজের হাতে করতে বড্ড ভালোবাসি - প্রতিটা হোটেলের বুকিং, প্রতিটা ট্রেনের টিকিট আমার মনে একটা এক্সট্রা রোমাঞ্চ জাগায়। আজ নাহয় কয়েকটা মাঊস-ক্লিকেই কাজ হয়। যে আমলে সেটা সত্যি ছিল না, চিঠি লিখে, মানিঅর্ডার করে হোটেল বুকিং করতে হত সে আমলেও আমার কাজটা করতে ভারি ভালো লাগত। আমার মতে , সেটাও বেড়ানোর অংশ। আর অন্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে ভরসাও হয় না মোটেই। এবারও প্রথমে জেনর্ডের দ্বারস্থ হয়েছিলাম শুধু ভিসা করিয়ে দেওয়ার জন্য । কিন্তু না, ওঁরা করলে সব ব্যবস্থাই করবেন, না হলে কিচ্ছু নয়। অগত্যা ... তবে রাজীবের মত একটি চৌখস ছেলের হাতে দায়িত্ব দিয়ে ভরসা করা যায়, সেটা অচিরেই বুঝলাম। গন্তব্য "দ্যাশের বাড়ি " আর সেই সঙ্গে এটা- ওটা - সেটা।

সেদিন কলকাতায় ভোট – ভোরবেলায় ফ্লাইট। গাড়ী পাওয়ার সমস্যা হতে পারত – কিন্তু হল না। গৌতম বাবু নিজের গাড়ী পাঠিয়ে দিলেন এয়ারপোর্টে ছেড়ে আসার জন্য। বাড়ী থেকে এয়ারপোর্ট আসতে যে সময় লাগল, কলকাতা এয়ারপোর্ট ছেড়ে ঢাকা পৌঁছাতে বোধহয় তার থেকে কম সময় লাগল। ঢাকা এয়ারপোর্টে নেমে মনে একটা অদ্ভুত আনন্দ হল। পাসপোর্ট দেখিয়ে বিদেশে গেছি যে ক’বার সব ক’বার-ই অফিসের কাজে। ল্যাপটপ নিয়ে ল্যাগর-ব্যাগর করতে করতে, আমার টুটাফাটা ইংরাজীতে কোন মতে কাজ সারতে সারতে। এই প্রথম এয়ারপোর্টে নেমে বাংলায় কিচির মিচির শুনে প্রাণটা ত’র হয়ে গেল। এতই আনন্দ হল যে খেয়ালই হল না যে ল্যাপটপের ব্যাগ না থাকলে কি হবে, কাঁধে রয়েছে পেল্লায় ছেলের সরঞ্জামে ভরা ব্যাগ। এয়ারপোর্টের বাইরে এসে দেখি সব সাইনবোর্ড বাংলায়। ব্যস ঢাকার সঙ্গে লাভ এট ফার্স্ট সাইট হয়ে গেল। আমার মাল্টি-লিঙ্গুয়াল শহর শুধু বাংলায় দোকানের সাইনবোর্ড দেখার চোখের আরামটুকু আমাকে দেয় না। জানি, জানি, যাই চকচক করে তাই সোনার নয় – আমার ঢাকা সুন্দরীর হরেক রকম অব্যবস্থা, তার যানজট, তার আজকের পলিটিক্যাল করাপশন, তার আজকের ধর্মান্ধতা – সবই জানা। আর বর্ডারের এপার ওপার মানুষগুলো তো সব একই – কাজেই আমার শহর কলকাতার থেকে খুব আলাদা হওয়ার কোন কারণ-ও নেই। তবু প্রেম জাগিল পরাণে। কিন্তু প্রেম শিকেয় তুলে এখন ঢাকা ছেড়ে বেরোতে হবে। আমাদের আজকের গন্তব্য নওগাঁ। সেখানে বাবার মামাবাড়িতে আমাদের আজকের আদর-বাস। পদ্মার উপর বিশাল ব্রিজ পেরিয়ে, পথে হরেক রকম মিষ্টি-টিস্টি খেয়ে দেয়ে প্রায় মাঝ দুপুরে যখন তিরতিরে বইতে থাকে আত্রাই নদীর ধারে আধা-ঘুমন্ত শহরটিতে ঢুকলাম, দেশের বাড়ির ভালোবাসা জড়িয়ে ধরল আমাদের।

এই পুরো সিরিজের বেশীর ভাগ ছবিই তুলেছেন সুদীপকল্যাণ দে। আমি ধার নিয়েছি মাত্র। এখানে রইল কিছু ছবি যেগুলো প্রায় সবাই চেনেন, জানেন। তবু দ্যাশের বলে আদেখলাপণা যায় না ।

প্রথম পদ্মা চোখে দেখা

https://s6.postimg.cc/6zpq4hghp/DSC00028.jpg

পাতা উনুন

https://s6.postimg.cc/6zpq4ho7h/DSC00044.jpg

jযে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে সেই ঢেঁকি :D

https://s6.postimg.cc/9h1hbrftp/DSC00038.jpg

ঢেউটিনের বাড়ি

https://s6.postimg.cc/45mkr21gt/DSC00047.jpg

দিন- ২

গত সন্ধ্যে থেকেই শুধু গল্প আর গল্প। নিতান্ত-ই ব্যক্তিগত স্মৃতি দিয়ে ভরে তুলতে চাই না – তবু একটা কথা বলতে পারি। লোকে বলে বোনেতে বোনেতে দেখা হলে গল্প ফুরায় না – ভাইতে ভাইতে দেখা হলেও কম কিছু হয় না। রাতেই ঘুরে এসেছি আমার বোনের বাড়ি। সে একটি ঝমকঝামক বিউটি পার্লার চালায়। স্বামী-পুত্র নিয়ে ভর-ভরন্ত সংসার সামলেও। মেয়েদের স্বয়ং-সম্পূর্ণা রূপটি দেখতে বড় ভালো লাগে – তাই মনটা ভরে গেল। হরেক রকম গল্পের মাঝখানে আমার মাথায় ঘুরছে আমার দিদার কথা। সম্পন্ন ব্যবসায়ীর ঘরে জন্ম। দিদার বাবা আবার লক্ষ্মীর সন্ধানে ঘর ছেড়েছিলেন। ফরিদপুরের খোলাবেড়িয়া থেকে এসে ঠাঁই পেতেছিলেন পাড়-নওগাঁতে। দিদা বাপের আদুরে মেয়ে ছিলেন। সুন্দরী। সাত বছরে বিয়ে। বিয়ের দিনও নাকি গাছ-কোমর বেঁধে গাছে চড়েছিলেন। বিয়ে হয়ে চলে গেলেন আবার সেই ফরিদপুরে। নিজেদের আদি বাড়ী খোলাবেড়িয়া থেকে মাইলখানেক দূরের খানখানানপুর রেল স্টেশন ( এরই কাছে গোয়ালন্দ – রাজবাড়ী ) , তারপর বসন্তপুর, তারপরেই শিবরামপুর। দেশের বাড়ির কাছে, তবু বাবা-মার থেকে কত দূরে। শিবরামপুর থেকে অম্বিকাপুর হয়ে ফরিদপুর – ট্রেন ছুটবে পোড়াদা হয়ে সান্তাহার – সেখান থেকে টমটমে চেপে তবে আসবে বাপের বাড়ির দ্যাশ। কি মনে হত পরে, যখন বাপের বাড়ি আসতেন? পুতুল খেলার বাক্স টেনে নামাতে ইচ্ছে হত কখনো? আনাচে কানাচে জন্মে থাকা গাছগুলোর গায়ে গায়ে খুঁজতেন ফেলে যাওয়া শৈশবের গন্ধ? নাকি দীর্ঘকালের শ্বশুরালয়বাস তাঁকে শৈশব ভুলিয়ে দিয়েছিল? কি জানি!

ভোরবেলা থেকেই শুনছি সবাই বেড়াতে বেরোচ্ছে, আমিও এক ফাঁকে সঙ্গ নিলাম তাঁদের। ব্রীজ পেরিয়ে নাদুস-নাদুস থ্যাবড়া-নাকী হেলেদুলে-হাঁটা হাঁসের দলের পিছন পিছন চলে গেলাম কাকার দোকানে। বড় বাসনের দোকান। ভাই সামলাচ্ছে সেই দোকান। ছোট্ট কুট্টি ভাইটাকে ছোটবেলায় দেখে কখনো মনেই মনে হয় নি সে একটা ভারিক্কি গোছের ব্যবসায়ী হয়ে উঠবে। বেশ মজাই লাগল।

আর কত ধরণের বাসন! মানুষের কত কিছুই না লাগে কাজে। তবে কাকা বাসনের কারবারের সঙ্গে জড়িত হওয়ার জন্যই সেদিন একটা নতুন অভিজ্ঞতা হল। হাতে হাতে বাসন বানান দেখলাম। হাপরের আগুনে ধাতুকে নরম করে তারপর সেই পাতকে একটি উঁচু বেদীর ঊপর রেখে তার চারপাশে অনেক জন মিলে গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে এক দুরবোধ্য সুরের সঙ্গে তালে তালে হাতুড়ির ঘা মারছেন, আর ধাতুর তালটি ধীরে ধীরে বাসনের চেহারা নিচ্ছে। নিখুঁত টিমওয়ার্ক। পুরো পর্বটির ছন্দে বিভোর হয়ে থাকতে পারলেই ভালো – যদি না চোখে ভাসে মানুষগুলোর দড়ি পাকানো ক্ষয়া চেহারা। আসলে শারীরিক শ্রমের জগতের বেশী সংখ্যার মানুষের অল্প আয় আর যন্ত্র দুনিয়ার কম মানুষের হাতে সামান্য বেশী পয়সা কোনটা যে উপমহাদেশের জন্য ভালো সেটা আজও বুঝে উঠি নি। শুধু এইটুকু বুঝি যে তলার ধাপে থাকা মানুষদের এক্সপ্লয়টেসনটা গ্যারান্টিড।

বাসন তৈরি হচ্ছে


https://i.postimg.cc/wjZw4sVg/DSC00053.jpg


https://i.postimg.cc/wBN0CTfJ/DSC00052.jpg

কাকা-কাকীমার আদর খেতে খেতে যাওয়ার ইচ্ছে আর ছিল না – তবু যেতে হবে। গোনা-গুনতি দিন হাতে – তাই সময় সবচেয়ে মুল্যবান এই ক’দিন। তাই ঢিমা তালে তৈরি হতে হতে একসময় এসে গেল বিদায়ের ক্ষণ। ঢেঁকি-ঘর, আমগাছ সব নিয়ে পাড়-নওগাঁ পরে রইল নিজের কোণটিতে। আমরা চলতে শুরু করলাম। আমাদের আজকের পথ অতি দীর্ঘ। পাহাড়পুর যাব প্রথমে। সোমপুর মহাবিহার। সেই কোন কালে ইস্কুলে ইতিহাসের ক্লাসে পালরাজাদের কীর্তিকলাপ পড়েছি। সেই পালরাজ গোপালের ছেলে ধর্মপাল তৈরি করান এই বৌদ্ধ বিহার। আটশ সালে নাগাদ – মানে ১১০০ বছর আগে। ধর্মপালের পরে দেবপাল, আরও পরের পাল রাজাদের দাক্ষিণ্যও পেয়েছিল এই মহাবিহার। বিশাল, ছড়ানো জায়গা নিয়ে তৈরি – অনেক ঘর, চৈত্য আর অনেক বাড়ী। এখন ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইট এটা - খুব সুন্দর ভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা। একটা ছোট খাট মিউজিয়াম-ও আছে। বিক্রমশীলা বা নালন্দা বা ওদন্তপুর বিহার দেখিনি এখনো - সোমপুর বিহার-ই প্রথম দেখলাম। আমার চিরকালই ক্যাম্পাস ইউনিভার্সিটির প্রতি একটা দুর্বলতা আছে। যাদবপুরে যদিও বা আমরা ছোট্ট একটা ক্যাম্পাস পেয়েছি, অনেকের তো সেটুকুও জোটে না। তার উপর আবার অতীশ দীপঙ্করের মতন মহামহিমকে শিক্ষক হিসেবে পাওয়া! তাই আমাদের সেই সব পূর্বপুরুষদের প্রতি বেশ খানিকটা ঈর্ষাই হল। তবে মে মাসের গরমে ওই বিশাল ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ান মোটেই বিশেষ সুখকর স্মৃতি নয়। ছাতা, টুপি, সানগ্লাস সব অস্ত্র সাজিয়েও কিছুতেই সূর্যদেবকে কাবু করা যাচ্ছে না। তাই দেখার শেষপর্ব সারা হল খুব তাড়াতাড়ি। তবু তারই মাঝে সুন্দর টেরাকোটার প্যানেলগুলো চোখ এড়াল না। বিষ্ণুপুরের মন্দিরের মত সূক্ষ্ম কাজ নয়, তবু বেশ সুন্দর। তবে একটা দুঃখ হল যে – এত বড় একটা ঐতিহাসিক জায়গা – তবু কোন গাইডেড ট্যুরের ব্যবস্থা নেই! অথচ একজন সুকথক গাইড যে কিভাবে ইতিহাসকে চোখের সামনে জীবন্ত করে তুলতে পারেন! আর বাংলাদেশে মনে হয় হরিহর রায়’দের অভাব হওয়ার কথা নয়। বাংলাদেশের জায়গায় জায়গায় যেন ইতিহাস বই পাতা খুলে বসে আছে – একটু সরকারী তরফে সচেতনতা থাকলে হয়তো নাগরিক জীবনে ইতিহাস জ্ঞান বাড়ত একটু। আর নিরপেক্ষ ইতিহাসের ধারণা যে কোন মানুষকে সমৃদ্ধতর করে বলে আমার ধারণা।

সোমপুর বিহার


https://i.postimg.cc/Vknt1rwY/DSC00066.jpg

তার টেরাকোটার প্যানেলঃ


https://i.postimg.cc/cJWnJx1f/DSC00062.jpg


পরের গন্তব্য ইতিহাসের আরও গহনে। খৃষ্টজন্মেরও তিনশ বছর আগের এক জায়গা। পৌণ্ড্রবর্ধন। নামটা চেনা চেনা লাগছে তো – হ্যাঁ মহাভারতেও আছে এই জায়গার কথা। এরই আজকের নাম মহাস্থানগড়। করতোয়া নদীর ধারে। প্রায় দুই কিলো মিটার করে লম্বায়, চওড়ায় জায়গা জুড়ে এক বিশাল আরকিওলজিক্যাল সাইট। একেবারে খাঁটি অনার্য রাজ্য ছিল আদতে। তারপর মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন সব রাজারা এসেছেন , গেছেন – জায়গাটার রমরমা ছিল অনেক অনেক দিন ধরে। এই জায়গাটা নিয়ে একটা মজার গল্প পড়েছিলাম। এখানে নাকি শাহ বলখি মাহিসওয়ার বলে একজন ফকির মাছের পিঠে চেপে এসে হাজির হন। পারো’র টাইগার’স নেস্টে ও তো গুরু পদ্মসম্ভব বাঘিনীর পিঠে চেপে এসে নেমেছিলেন। মানুষ চিরকালই গুরুবাদে বিশ্বাসী আর সেই গুরুরাই বেশি বিখ্যাত যাদের নিয়ে এই ধরণের অবাস্তব গল্প চলে বাজারে। সে যাক গে। এদিকে ফকিরের সঙ্গে রাজার যুদ্ধ বাধে। এদিকে মহাস্থানগড়ে একটি কুয়ো ছিল যে কুয়োর জলে স্নান করলে মৃত সৈনিকরাও প্রাণ ফিরে পেত। তাই রাজাকে কিছুতেই হারাতে পারছিল না ফকির। শেষে এক চিলকে দিয়ে একটুকরো গরুর মাংস সেই কুয়োর জলে ফেলানো হয়। ব্যস খেল খতম। রাজার জারিজুরি শেষ। তখন রাজার সেনাপতি ভয় পেয়ে বিশাল দলবল নিয়ে ফকিরের দলে যোগ দেন। রাজা আত্মহত্যা করেন। ফকিরের একটি মাজারও আছে এখানেই। গল্পটা পড়েই মনে হয়েছিল, কি নিদারুণ ভাবে একটা মানবিক বিশ্বাসঘাতকতার গল্পকে চাপা দেওয়া হল একটি অবাস্তবতা আর ধর্মীয় বিভেদের জুজু দিয়ে। এই সব হিজিবিজি গল্প শুনেই আর বিশেষ আগ্রহ ছিল না জায়গাটার প্রতি। তার উপর ড্রাইভার জানালেন এখানেও কোন গাইড নেই। যা দেখার নিজেদের খুঁজে পেতে দেখতে হবে। এ দিকে তার আগে চড়া রোদে সোমপুর বিহারে ঘণ্টা দুয়েক ঘুরে সবাই আধা-বিধ্বস্ত। কারোরই আর বিশেষ দেখার গরজ নেই। অগত্যা বললে বিশ্বাস করবেন না, আমাকে অন্য কেউ বললে আমি হাঁ করে ঘণ্টা দুয়েক তার দিকে তাকিয়েই থাকতাম, আমরা মুল জায়গাটার বাইরে নেমে ঠিক দু মিনিট এপাশ ওপাশ দেখে আবার গাড়ীতে উঠে পড়লাম। একটা তিনশ বিসির জায়গা! আর কোনদিন আসা হবে না তা খুব ভালো করেই জানি। সামনে দিয়ে ফিরে চলে এলাম। কি আর করা! প্রথম দিনেই রোদ লেগে অসুস্থ হয়ে পড়লে পুরো ঘোরাটাই মাটি। বিপদের সময় অর্ধেক ত্যাগ করারই নিয়ম। অগত্যা।

মহাস্থানগড়


https://s6.postimg.cc/iilj5udv5/DSC00034.jpg

চলো, চলো এগিয়ে চলো। যেতে হবে অনেক দূরে। সেই নাটোর হয়ে কুষ্টিয়া। আমাদের যিনি ড্রাইভার ছিলেন, কি লজ্জা, কি লজ্জা – তাঁর নামটা ভুলে গেছি। অসম্ভব সজ্জন, ভদ্র একজন মানুষ। এবং তুমুল ভাবে সার্ভিস ওরিয়েন্টেড। তাঁকে চুপি চুপি বলে রেখেছিলাম, নাটোরের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় একবার দাঁড়াতে। সেই মানুষটি যাকে দিয়ে আমার নিজের আনন্দে বাংলা কবিতা পড়ার শুরু, এবং শেষ – একবার তাঁকে মনে করব নাটোরের মাটিতে দাঁড়িয়ে। কিন্তু বেরোতেই দেরী হয়েছে। পাহাড়পুর দেখতেও অনেকটা সময় লেগেছে। মহাস্থানগড় থেকে বেরন’র পরে যখন আমরা নাটোরের পথে আধাআধি যেতে না যেতেই সূর্যিমামা অস্তাচলে যেতে বসলেন। ছড়ানো মাঠের মধ্যে দিয়ে রাস্তা , কোথাও কোথাও গাছের ছায়া দীর্ঘ হয়ে পথ ঢেকেছে – কখন যেন সেই ছায়া কালো হয়ে চরাচর ঢেকে দিল। অনেক অনেক পথের পরে, দূরে যখন নাটোরের আবছা আলো দেখা দিল, গাড়ীর মধ্যে তাকিয়ে দেখালাম – বাচ্চা বুড়ো সবাই আধো ঘুম, আধো জাগরণে। গাড়ী আর থামাতে বারণ করলাম – বিনা অ্যাপয়েন্টমেন্টে অন্ধকারে বনলতা সেনদের মুখোমুখি বসার সুযোগ কি আর সবাই পায়! এমনি ভাবেই অন্ধকারে পেরিয়ে গেল ঈশ্বরদী – পদ্মার উপরের ব্রীজ পেরিয়ে চলে এলাম দক্ষিণবঙ্গে।

ব্যবস্থাপকরা চেয়েছিলেন আমরা নাটোরেই রাত্রিবাস করি। সেখানে ব্যবস্থাপত্র ভালো। আমিই ভেটো দিই। আমাদের এ দিনের যাত্রাপথ যদি দীর্ঘ হয়, পরের দিনেরটিও তুল্যমূল্য। তাই চেয়েছিলাম যতটা এগিয়ে থাকা যায়। কুষ্টিয়াতেই থাকতে চাই। বলেছিলাম, পরিস্কার টয়লেট-সহ সেফ ঘর পেলেই হবে। অনেক গড়িমসি করে সেই মত ব্যবস্থাই হয়েছিল। প্রায় রাত সাড়ে দশটা নাগাদ এসে পৌঁছালাম সেই রাত- কাটানোর আস্তানাটিতে। এসেই চক্ষু চড়ক গাছ। ঠিক বাজারের মাঝখানের হোটেলটি চার তলায়। এবং তাতে লিফট নেই। আমাদের সঙ্গে ছোট বড় মাঝারি হরেক সাইজের হরেক ধরণের লাগেজ – দলে তিন থেকে তিয়াত্তর বছরের লোক – সবাই হাঁ। তবে দায়ে পড়লে মানুষ কি না করে! আমরাও নিজেরা উঠলাম, সব মালপত্র কিছু আমরা তুললাম, কিছু হোটেলের লোক তুলল।

কিন্তু শেষ হাসি কে হাসল বলুন দেখি? ঘরে সব মালপত্র পৌঁছানর পরে হোটেলের একজন কি একটা দাবী করতে আমি তো তাকে তেড়ে বকুনি দিচ্ছি, এ আবার কি রকম হোটেল- চারতলার উপরে অথচ লিফট নেই – এ রকম ভাবে ব্যবসা হয় নাকি ইত্যাদি ইত্যাদি। হঠাৎ তিনিও সমান তেড়ে উঠে বললেন , এই সব ‘নরমাল’ শহরে আবার লিফট থাকে নাকি! একি ঢাকা নাকি! আমি তাতেও তেড়ে বললাম, ঢাকা কি এবনরমাল শহর নাকি? ততক্ষণে সবাই হেসে উঠেছে। হাসির মধ্যে দিয়েই তফাতটা মাথায় ঢুকল, নিজের-চোখে-জগত-দেখে-অভ্যস্ত আর চাইলেই-পেতে-থাকা আমাদের মত বড় শহরের মানুষেরা যে তফাতগুলো অনেক সময় প্রায় ধরতেই পারি না।

দিন ৩

আমার মায়ের বাপের বাড়ী

বাপের বাড়ীর দ্যাশের গল্প যতটা শুনে শুনে বড় হয়েছি, মায়ের বাপের বাড়ীর গল্প কিন্তু একেবারেই শুনি নি। আমার মা শৈশবে মাতৃহারা। সেটা সে আমলে খুব একটা কিছু আশ্চর্য ঘটনা অবশ্যই নয়। যেটা আশ্চর্য সেটা হল আমার দিদিমা, যিনি পাঁচটি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, কম বেশী পনের বছর সংসার করেছেন একটি মানুষের সঙ্গে, তাঁর একটা ছবি, একটা চিহ্ন নেই কোথাও। মানুষটা খুব সহজেই একেবারে ‘নেই’ হয়ে যেতেন, যদি না তাঁর সন্তানেরা থাকতেন। আমার মা তাঁর চেহারাটুকুও মনে করতে পারেন না। কম-কথার মানুষ দাদুর কাছেও কখনো শুনি নি দিদার কথা। এই নিঃসীম ফাঁকের সামনে দঁড়িয়ে বড্ড জানতে ইচ্ছে করে কেমন ছিলেন তিনি? দাদুর ছিল বদলীর চাকরী। মায়ের ছোটবেলা কেটেছে এ পার বাংলায়। মায়ের সঙ্গে গিয়ে দেখে এসেছি সে সব জায়গা। যে ভাড়াবাড়ীতে মা থেকেছেন, মা’র স্কুল, মায়ের কলেজ - মা'র কিশোরীবেলা কল্পনা করতে খুব আটকায় না।আমার মায়েরও অবশ্য বছর কুড়ি বয়সের আগের কোন ফটো নেই – তবে মায়ের স্কুলের প্রাইজ পাওয়া অনেক বই আছে। সেগুলোতে হাত বুলিয়ে আমি মায়ের ছোটবেলার মা’কে খুঁজে পাই। কিন্তু দিদিমাকে ধরতে পারি না মোটেই। ’৪৭ সালে সরকারী চাকুরে দাদু দেশভাগের সময় ইন্ডিয়ার অপসন দেন। সেই মত এসে পড়েন এ দেশে। মায়ের তখন বছর তিনেক বয়েস। এদেশের মাটিতে দিদিমা বেশীদিন নিঃশ্বাস নেন নি। তাই জানতাম দিদিমাকে ধরতে গেলে যেতে হবে, সেই গ্রামটিতে যেখানে তিনি সংসার পেতেছিলেন। তাঁর বাপের বাড়ীও কাছে পিঠে। আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসেছে।

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই সাজো সাজো রব পড়ে গেছে। আজকের যাত্রা আমাদের উজানে। স্মৃতি, রোমাঞ্চ আর বাস্তবের এক বিন্দুতে মেলার দিন। প্রথম গন্তব্য অবশ্য যাওয়ার পথে পড়া ছেঁঊরিয়ায় লালন ফকিরের মাজার। মূল গেট দিয়ে ঢুকেই সামনে সাদা মাজার এবং মুল দরজার উপরে লেখা লালনের বাণী, “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি” – একদম ঠিক তারে সুরটি বেঁধে দেয়। মাজারের জায়গাটি বিরাট বড়। সামনের চত্ত্বরে বিশিষ্ট ভক্তদের কবর। লালনের সম্বন্ধে কিছুই আর নতুন করে বলার নেই। আমরা যখন মাজারের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, সেদিন কোথা থেকে যেন হালকা বাঊল গানের সুর ভেসে আসছিল। শুনেছি বাউল গান গভীর দ্যোতনার অধিকারী- পরতে পরতে তার ভিন্ন ভিন্ন মানে সঠিক অধিকারীর কাছে উদ্ভাসিত হয় - বাঊলগানের সংকেতবাক্যের গহীন অর্থ বোঝার ক্ষমতা আমার নেই, অধিকারও নেই। আপাতদৃষ্টিতে যেটুকু কানে ভাসে সেটুকুই বুঝি। কিন্তু সুরের সরলতা এবং গায়কের আর্তি দুই-ই মনে এক ঘোর লাগায়। সেদিন ওইখানে দাঁড়িয়ে তো আরোই ভাল লাগছিল। পাশেই আছে লালন আক্যাডেমি। আর মুল গেটের বাইরে ছোট খাটো কয়েকটি দোকান। এখানেই হয় লালন-মেলা। বাউল-গানের আসর বসে তখন। আমাদের বাউল গান অবশ্য থাকবে ইউ টিউবে; ঠিক যেমন লালনশাহী দর্শন বেঁচে থাকবে এই মাজার ছাড়িয়ে সারা বাংলার মরমিয়া মানুষের মধ্যে। (১)

বাউল গানের সুর কানে নিয়ে পৌছালাম শিলাইদহ কুঠিবাড়ী। বেশ সুন্দর সবুজ ঘাসের কার্পেটের মধ্যে একটি ছিমছাম বাড়ী। বিশেষত আর্কিটেকচারটি মনোরম। এখন ওখানে সে আমলের জিনিসপত্র আর রবীন্দ্রনাথের ছবি দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা। তবে সত্যি কথা বলতে যে কোন সৃষ্টিশীল মানুষ আমার চোখে বেঁচে থাকেন তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে – তাঁর পায়ে দেবার খড়ম বা জলের গ্লাস এই সব দেখে আমি বিশেষ আনন্দ পাই না। বাড়ীর বারান্দায় একটি নৌকা রাখা রয়েছে – কেউ একজন বললেন সেটি নিয়ে নাকী রবীন্দ্রনাথ পদ্মায় ভেসে বেড়াতেন। বরং আমি ভাবছিলাম অন্য কথা। শুনেছি আমার দাদু নাকি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার সময় এই শিলাইদহ কুঠিবাড়ীতে এসে ছিলেন। তখনকার দিনে এটাই দস্তুর ছিল। গ্রামের ছেলেরা শহরে বা অন্যত্র গেলে স্থানীয় সম্পন্ন লোকেরা তাঁদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। শুনেছি দাদু দরকারে কলকাতায় এলে থাকতেন কুষ্টিয়ার বিখ্যাত মোহিনী মিলের মালিকদের বাড়িতে। সে রামও নেই, সে অযোধ্যাও নেই - কালের নিয়মে রীতিটি হারিয়ে গেছে।

কুঠিবাড়ীর সামনে অনেক দোকান – একটা মেলাই বলা চলে। সেখানে হরেক জিনিসের সম্ভার। ভারী শখ হল একটা খেলনা একতারা কেনার। কিন্ত আমার বিশ্ববুড়ো ছেলের মোটেই এই সব কাজে কোন সায় নেই। অগত্যা হাতের খেলনা নামিয়ে রেখে গাড়ীতে চাপলাম। বুকের মধ্যে একটু চাপা উত্তেজনা। এবার যাব আমার মায়ের বাপের বাড়ী। উপজেলা কুমারখালি, গ্রাম তেবাড়িয়া।

যাব তো বটে। কিন্তু সম্বল শুধু নামটুকু। মায়ের কিচ্ছু মনে নেই। তবু ভরসা দিলেন আমাদের ড্রাইভার, বললেন একটু তো খুঁজে দেখি। খুঁজতে খুঁজতে পৌঁছে গেলাম কুমারখালি রেলওয়ে স্টেশন। তখন মার মুখে একটু হাসি ফুটল – বোধহয় স্মৃতিতে কোথাও ঘাই মারল। তারপর অবশ্য আর বিশেষ অসুবিধা হল না – দাদুরা ভারতে চলে এলেও দাদুর এক জ্ঞাতি রয়ে গিয়েছিলেন ভিটেতে। তাঁদের নাম করে খুঁজতে সন্ধান মিলল। গড়গড়িয়ে পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে। আমাদের ড্রাইভার-সাহেবের মুখে ফুটল চওড়া হাসি - যাক মাঝপথ থেকে ফিরে যেতে হয় নি অন্তত। মায়ের দিকে তাকালাম - ’৪৭ সাল থেকে ২০০৯ – বাষট্টি বছরের ব্যবধান ঘুচে গেল কি?

কি আশ্চর্য! দাদুর নাম বলাতে একবারেই চিনলেন বাড়ীর সবাই। এখন যিনি গৃহকর্তা, তিনি ডিস্পেন্সারীতে ছিলেন। তাঁকে খবর পাঠান হল। তিনি এসে পৌঁছানর আগেই অবশ্য খবর পেয়ে এলেন আরেকজন প্রতিবেশিনী, তিনি আমার দিদিমার সই ছিলেন। অনেক বয়েস তাঁর, স্মৃতিও যে খুব অটুট এমন না। আমার অজস্র প্রশ্নের খুব কম অংশেরই উত্তর মিলল। তবু তিনি আমার দিদিমার একটি আবছা বিবরণ দিলেন। এই প্রথম চোখের সামনে দেখতে পেলাম অনেক বেলা করে একটি তরুণী বধু এক গোছা বাসন নিয়ে পুকুরপাড়ে চললেন – মাথায় একরাশ চুলের বোঝা, ফর্সা মুখটাতে সিঁদুরের টিপটা ঘামে লেপ্টে গেছে – একটু পরেই ছবিটা আবছা হয়ে গেল, কল্পনার দৌড় এইটুকুই - তবু এটুকুও যে পেলাম এই ঢের। ইতিহাস তো আর কখনোই ঘরের বৌদের হিসেব রাখে না।

কিন্তু তার থেকেও অবাক কান্ড হল আমি দাদুকে কিছুতেই এই টলটলে সবুজ, মায়ায় জড়ানো গ্রামের মাটিতে কল্পনা করতে পারলাম না। কৈশোরে অনাথ, সম্পূর্ণ নিজের জেদে পড়াশোনা চালিয়ে জীবনের প্রথমে মিলিটারীতে চাকরী করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো, প্রখর ধীমান, সংস্কৃতজ্ঞ, তীব্র আত্মসম্মানবোধযুক্ত চির-ঋজু দাদু, যিনি জীবনের শেষ দিন অবধি নিজ সিদ্ধান্তে অচল ছিলেন, তিনি তাঁর সর্ব তীব্রতা ও তীক্ষ্ণতা নিয়ে কিছুতেই এই শ্যামল ছায়ার মাঝখানটিতে ধরা দেবেন না বলে মনস্থ করলেন। দাদু দিদার যৌথ ছবিটি তাই অধরাই থেকে গেল।

(উল্লেখ্য ১- এক বন্ধুর এটা পড়ে বক্তব্য ছিল যে লালনশাহী কথাটির প্রয়োগ অশুদ্ধ। এবং তাঁর মতে লালন শাহ নামটিও অশুদ্ধ, এটি লালন সাঁই। সমস্যা হল আমি বহু জায়গায় এমনকি লালন শাহের মাজারেও তাঁর নামটি লালন শাহ দেখেছি। সাঁই তো তিনি বটেই, সাঁই অর্থে গুরু, মুর্শিদ। শুধু লালন নন, ফকির-বাউলরা তাঁদের গুরুকে অনেক সময়ই সাঁই বলতেন বলে জানি। এবং লালন শাহ’র নামের থেকে লালনশাহী কয়েনেজটাও আমার এমন কিছু অশুদ্ধ মনে হয় নি। সম্রাট অর্থে শাহ ধরলেও যে তিনি ছিলেন হৃদয়-সম্রাট। )

লালন ফকিরের মাজার

https://i.postimg.cc/nrgmC2XW/DSC00077.jpg

শিলাইদহের কুঠিবাড়ী

https://i.postimg.cc/44SVLfW1/DSC00086.jpg
ও আমার দেশের মাটি

If winter comes, can spring be far behind? অবশ্যই না। আজ আমার শিকড় খোঁজার দিন। এক তীর্থদর্শন হল, এবার চলো আরেকখানে। মায়ের বাড়ী থেকে ঘন্টা আড়াই-এর পথ। কুমারখালি থেকে যখন বেরোলাম, তখনই প্রায় সাড়ে এগারটা, বারোটা বাজে। মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ রাখা গেল না। সেদিন আমাদের ফরিদপুর হয়ে ঢাকা যাওয়ার কথা। পদ্মা পেরিয়ে। মনের মধ্যে একটা সুপ্ত বাসনা ছিল যে পদ্মার ঘাটের পাইস হোটেলের এত গল্প শুনেছি, সেখানেই একবার পাত পাড়বো, নাহয় একটু বেলাই হল। এমনিতেই মিষ্টিভোজ যা হল, তা অবশ্য মধ্যাহ্ন ভোজের বাড়া। আর যার মিষ্টিতে সমস্যা থাকে থাকুক, আমার কোন সমস্যা নেই।

দুদিন ধরেই প্রায় গাড়ীতেই সারাসময় কাটছে। খুব ভয় ছিল, ওইটুকু বাচ্চা ছেলেকে কিভাবে গাড়ীতে টানা বসিয়ে রাখবো ! কিন্তু দেখলাম তাতে বিশেষ অসুবিধা হল না। আমার ছেলে হল প্রানীজগতে নিবেদিত প্রাণ। তার ২ বছর বয়সের মন্টেসরী ক্লাসের প্রোগ্রেস রিপোর্ট ছিল, he seems to be obsessed with cows. সেই গরুই আমাদের এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দিল – জানলা দিয়ে মাঠের মধ্যে পালে পালে গরু চড়ে বেড়াচ্ছে দেখে আর সে তুমুল উত্তেজনায় চোখ গোল গোল করে নন-স্টপ “ওই দেখ লাল গোলু, ওই দেখ কালো গোলু” করে যায়। এই পর্ব চলেছিল গোটা ট্রিপ ধরে। এমনি সে উত্তেজনা যে কলকাতায় ফেরার পরেও বহুদিন আমরা গরু দেখলে আতঙ্কে শিউরে শিউরে উঠতাম। মিথ্যে বলব না, গরুকে মাতা বলতে আমার যৎকিঞ্চিত আপত্তি থাকলেও, সে যাত্রায় আমাকে বাঁচিয়ে দেওয়ার জন্য গরুর প্রতি আমার অসীম কৃতজ্ঞতা। তো খানিকক্ষণ গরু-নাম শুনে আমি মানে মানে প্রাণ বাঁচানোর জন্য জানলায় হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে চাইছি, হঠাৎ দেখি বাবা প্রবল উত্তেজনায় সিট খামচে খাড়া হয়ে বসেছেন। বুঝলাম, এসে গেছে।

শিবরামপুর। আগে রেল স্টেশনেরও নাম ছিল শিবরামপুর, এখন অবশ্য সে নাম বদলে হয়েছে আমিরাবাদ। আমরা এসেছি সড়কপথে ঢাকা ফরিদপুর মহাসড়ক ধরে, সে পথ রেলস্টেশনের অল্প পশ্চিমে। তাই স্টেশন অবধি আমাদের যেতে লাগে নি। ফরিদপুরে যখন কলেজে পড়তেন, তখন বাবা রাতের বেলা এই স্টেশন থেকে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ী ফিরতেন। গুগুলে দেখলাম আধ-ঘণ্টার হাঁটা পথ। স্টেশনের থেকে হাইওয়েতে আসার পথে পড়ে শিবরামপুর আরডি আক্যাডেমিও, আমার বাপ জ্যাঠার স্কুল। হাইওয়ের থেকে সামান্য ভিতরে। তাকে ডানহাতে রেখে আমরা চললাম মদনদিয়া গ্রামের দিকে। সহজে চেনার জন্য এই গ্রাম জোড় বেঁধেছে কাছেরই আর একটু বড় গ্রাম চাঁদপুরের সঙ্গে – লোকে তাই একে চেনে চাঁদপুর মদনদিয়া বলে।
গ্রাম অবধি তো চলে গেলাম – এই অঞ্চল্টা নিরবিচ্ছন্ন সবুজ আর জলময়। অবশ্য এ কথাটা শুনে একজন পরে খুব হেসেছিলেন, বলেছিলেন জল আর ওখানে কি দেখলেন। জল দেখতে হলে চলেন খুলনা, বরিশাল – খুব লোভও ছিল। হল না এ যাত্রায়। পরে কবে কোনোদিন ... এতক্ষণ গটগটিয়ে হেঁটে আসা বাবা পুকুড়পাড়ে এসে থমকে দাঁড়ালেন। বাবাদেরই জ্ঞাতিজ্যাঠা ছিলেন গ্রামের জমিদার স্থানীয়। তাঁদের কয়েকজন এখনো ওখানেই থাকেন। পুকুড়পাড়ে কয়েকজন মহিলা বাসন মাজছিলেন। বাবা তাঁদের আত্মীয়দের নাম ধরে জিজ্ঞাসা করতে একজন মাথায় ঘোমটা টেনে উঠে বললেন, সে আমাগর বাড়ী। আপনে? ব্যস মিলে গেছে হদিশ। বাবার পিছনে পিছনে মার্চ করে সবাই মিলে ঢুকলাম সেই বাড়ীতে। বেলা তখন দুটোর আশেপাশে। এটি আমার সম্পর্কে কাকার বাড়ী। এই কাকারই দুই দাদা, বোনেরা থাকেন কলকাতায়, তাঁদের চিনি ছোটবেলা থেকেই।

আমার গোয়ালন্দের পাইস হোটেলে খাওয়ার স্বপ্ন মিলিয়ে গেল। রান্না চেপে গেছে উনুনে। আমার মেয়ের নাকি সকাল থেকে না খেয়ে দেয়ে মুখ শুকিয়ে গেছে। রাশি রাশি চকো-পাই যে সারাক্ষণ গাড়ীতে বসে সাঁটালো সেগুলো তবে কোথায় গেল! তবে আমি ছাড়া আর কারোরই গোয়ালন্দের খাবার নিয়ে বিশেষ আগ্রহ নেই দেখলাম – তাহলে যাকগে! ইতিমধ্যে খবর চলে গেছে পাড়ার পুরোন বাসিন্দাদের কাছে। গ্রামে পুরোন মানুষ খুবই কম জন আছেন যদিও। বেশীর ভাগই স্বাধীনতার পরে পরেই চলে এসেছেন। তাও টিমটিম করে যারা জ্বলছিলেন, তাঁরাও বেশির ভাগই দেশ ছাড়েন ’৭১ এ। যে সব বাড়ীতে তাও এখনো মানুষ আছেন, তাঁদেরও পরিবারের অধিকাংশ মানুষই চলে এসেছেন এপারে। এক আধজন-ই ওখানে বাড়ী আগলে পড়ে আছেন। যাঁরা আছেন তাঁদের কাছে খুব জানতে ইচ্ছে হচ্ছিল, কেমন আছেন তাঁরা। এপাশে সংখ্যালঘুদের আমরা কতটা স্বস্তিতে রেখেছি তার কিছু কিছু খাপচা ছবি জানি। ওপাশে ওঁরা কেমন আছেন? জিজ্ঞেস করতে সাহস হয় নি – কে আর হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে। বরং স্মৃতি-রোমন্থন বেশ নির্দোষ ব্যসন। যারা দেশে আছেন, যারা ভারতে চলে এলেন – তাঁদের সবার গল্প! এপারের এঁদের সব দেখেছি বাড়ীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে – কিন্তু কে যে রক্ততুতো আর কে যে গ্রামতুতো, বাঙ্গালবাড়ীতে বসে সে বোঝার থেকে ডিভ-গস-কার্লের অঙ্ক কষা সহজ। তার উপর আছে কে জ্ঞাতি, কে কুটুম। তাই বেশী মাথা না ঘামিয়ে চুপ করে বসে সেই দু-দফায় exodus এর বিষাদকাহিনী শুনি। তাও বেশি গভীরে না যাওয়াই ভালো – ’৭১ এ নওগাঁর দাদুকে শুনেছি পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় ফেলে রেখে বাড়ীর সবাইকে প্রাণ হাতে করে পালাতে হয়। পরে স্বভাবতই তাঁকে আর পাওয়া যায় নি। স্বাভাবিকতার পরতের তলায় লুকিয়ে থাকে এইসব অনন্ত শোকের উৎস। সাবধানে কথা বলি, যাতে অজান্তে কোথাও ঘা দিয়ে না ফেলি! ’৪৭ র পরে প্রথমদিকে কি তখনকার পুর্ব পাকিস্তানেরর সঙ্গে কোন ড্যুয়াল সিটিজেন্সিপের কোন গল্প ছিল? সঠিক বলতে পারব না, তবে আমাদের বাড়ীতে স্মৃতি হিসেবে আমার চল্লিশের দশকে, বাবার বছর ছয়েক বয়েসে, মারা যাওয়া দাদুর ফটোর সঙ্গে তুলে রাখা বাংলাদেশের পাসপোর্ট দেখেছি ছোটবেলায়। অবশ্য পাসপোর্ট জমা দিয়ে ভারতের সিটিজেনশিপ সার্টিফিকেট নেওয়া হয়েছিল তাও জানি। এই এন সি আরের বাজারে বাংলাদেশের কথা লিখছি, তাই এই কথাটাও অন-রেকর্ড থাকুক।

আমার বাবা, বাড়ীর ও পাড়ার সব ছোটদের সোনাদা, দেশ ছেড়েছেন গ্রাজ্যুয়েশন করে পঞ্চাশের দশকে, ফলে প্রথম যৌবনের সোনালী দিনগুলো কাটিয়েছেন এই গ্রামে। মায়ের যেমন নিজের স্মৃতি কিছুই নেই, বাবার তা নয় – বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে নিয়ে দিন কেটেছে এখানেই। কিছু কিছু গল্প শুনেছি – তবু কতটুকুই বা আর জেনেছি! অন্যের জীবন তো আর বাস করা যায় না। বিয়ের পরে আমরা এক ভাড়াবাড়িতে থাকতাম, জানতাম নিজের বাড়ী না, ছেড়ে চলে যেতে হবে – বেশিদিন থাকিও নি। অনেক দিন পরে একবার বাড়িওয়ালা দাদার সঙ্গে দেখা করতে গেছি, মনে হয়েছিল প্রথম যৌথজীবনবাসের স্মৃতিগুলো এসে যেন আঁকড়ে ধরল! আরও কষ্ট হয়েছিল এই ভেবে যে ইচ্ছে হলেই সেখানে আর ফিরে যেতে পারব না। সেই অনুভূতিটা মনে রেখে বাবার মনের অবস্থাটা অনুভব করার চেষ্টা করলাম।

আমাদের নিজের বাড়ী এখন জবর দখল। বাড়ীটাও বদলে গেছে অনেক, নেই অনেক কিছুই। রয়েছে শুধু সেই দাওয়ায় ওঠার আদি কাঁঠালকাঠের পৈঠা। যার বাড়ী তিনি নাকি লোক সুবিধার নয়, তাই বাড়ীর ছবিও তোলা গেল না। বাড়ীর থেকে অ-নেক দূরে ভাঙ্গাচোরা শৌচাগার। মুল বাড়ির থেকে বেশ দূরে রান্নাঘরটিও নেই – একটা ভাঙ্গাচোরা খন্ডহরের উপর প্রাণের আনন্দে গাছ-পালা-লতারা জাল বুনেছে। আমাদের বাপ-মেয়ে দুজনের-ই যে কোন বাড়ীর প্ল্যান নিয়ে ভারী ইন্টারেস্ট। তাই বাস্তুভিটের প্ল্যানও আমাদের আলোচনায় আসে – বাইরের উঠোনের এক ধারে গদিঘর; তার পাশে খড়িঘর (জ্বালানী কাঠ রাখার ঘর ) উল্টোদিকে এক টানায় দুটো শোয়ার ঘর, সেদিকে মুখ করে দাঁড়ালে ডানহাতে ঠাকুরঘর – তার পিছনে ভিতর বাড়ির উঠোন, ঊঠোনের কুয়ো, আর উঠোন পেরিয়ে রান্নাঘর, নিরামিষ ঘর, ভাঁড়ারঘর, ঢেঁকিঘর – তারও পিছনে গোয়াল – ঢেঁকিঘরের পিছন দিকে হাতদশেক দূরে দাদুর বাবা, আমাদের বাড়ির অক্ষয়কুমারের “টয়লেট এক প্রেমকথা” - একমাত্র পাকা ঘর, সেটাই এখনো খাড়া আছে। বুড়ো-দিদা (দাদুর মা) যে কতখানি হুড়কো দিয়েছিলেন, কে জানে! বাঊন্ডারী বর্জিত বাড়ী – বাইরের ঊঠোনের মাঝখান দিয়ে গ্রামের লোকের যাতায়াতের পথ। এই হল সে আমলের গ্রামের গৃহস্থের আব্রুর নমুনা! বাবা দেখালেন ওই এতখানি জায়গা জুড়ে ছিল আমাদের বাড়ী। বাপরে! এতখানি জায়গা!

স্পষ্ট দেখতে পেলুম কৈলাসচন্দ্র রায় ( আমার দাদুর বাবা) দুই শোয়ার ঘরের মাঝখানের কাঁঠালগাছের তলায় বসে গুড়ুক গুড়ুক থেলো হুঁকো টানছেন, আর দূরে পুকুরের পাড় দিয়ে কিড়িং কিড়িং বেল বাজাতে বাজাতে সাইকেল চেপে আসছেন আমার ছোড়দাদু, গলায় সদ্য দেখা যাত্রার গানের সুর – বাবাকে দেখেই গান বন্ধ হল, সাইকেল থেকে নেমে হেঁটে আসতে লাগলেন। শব্দ শুনে রান্নাঘরের দাওয়ায় বসে হাতের কাজ সারতে থাকা রাশভারী জ্ঞানদাসুন্দরী ( দাদুর মা ) অল্প গলা তুলে ভাঁড়ার ঘরের ভিতরে থাকা বড়বৌমাকে বললেন, সতীশ এলো, বেতের ধামায় করে ওর জন্য জলখাবার বাড়ো। আজ একাদশী, মণি- অমি বায়না ধরেছে তোমার সঙ্গে সাবুমাখা খাবে। জামবাটিতে সবার জন্য সাবু ভিজিয়ে রাখা আছে, বাকী জোগাড়যাত সেরে রাখো। খাওয়ার পাট চুকলে বরং কাগজ-কলম নিয়ে বোস একবার – কনককে আনার জন্য চিঠি পাঠাতে হবে ওর বাপের কাছে । সুবাসিনীর মুখে হাসি ফুটল, ছোটজা এলে তাও একটু কথা বলার লোক জুটবে। ভাঁড়ার ঘরের বাইরে এলেন। মেয়ে আর ছেলের হাত ধরে গিয়ে দাঁড়ালাম দিদার পাশে। দিদা মুখ তুলে অল্প হেসে বললেন, এলি? এত দেরী হল যে?

(উল্লেখ্য ২ – বাঙ্গাল ভাষা আমি বলতে / লিখতে পারি না, বিশেষতঃ তার টানটোন কলমে ফোটান আমার সাধ্যের বাইরে। ছোটবেলায় আসলে বাড়ীতে কলকাত্তাই ভাষাই শুনেছি – কিছু কিছু শব্দের ব্যবহারে শুধু বাঙ্গাল বলে বোঝা যেত। তবে পদ্মাপার না হলে কি আর ঠিক মত বাঙ্গাল হয়! তাই ফরিদপুরিয়া আমার ভাষার ভুল ব্যবহার খ্যামা-ঘেন্না করে মাপ করে দেবেন। )

( চলবে )

48 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: বাউণ্ডুলে বান্দা

Re: পায়ের তলায় সর্ষে - বাংলাদেশ

পরের পর্বগুলো আরও তাড়াতাড়ি আসুক !
Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: পায়ের তলায় সর্ষে - বাংলাদেশ

ব্রেভো! তারপর? 🌷

#

লেখার ভেতরে ছবি দাও কিভাবে? হেল্প প্লিজ।
Avatar: Muhammad Sadequzzaman Sharif

Re: পায়ের তলায় সর্ষে - বাংলাদেশ

অসাধারণ। পুরো অভিজ্ঞতা জানার অগ্রহে থাকলাম। একটু তথ্যগত সাহায্য করি। আপনি যেটাকে পদ্মা বলছেন তা আসলে যমুনা নদী। ভালবাসা থাকল।
Avatar: স্বাতী রায়

Re: পায়ের তলায় সর্ষে - বাংলাদেশ

@বিপ্লব ছবি দিতে হলে সেগুলো postimage.org সাইটে গিয়ে আপলোড করুন। তারপর ওখানেই তোলা ছবির একটা লিঙ্ক দেবে, সেটা এনে লেখার মধ্যে লাগিয়ে দিন। ব্যস।

@Muhammad Sadequzzaman Sharif এম্মা! ওটা পদ্মা নয়! আমি যে গত ন'বছর ধরে ওকেই পদ্মা ভেবে তুমুল আবেগে আবেদাপ্লুত হয়ে আছি! সব আবার রিওয়াইন্ড করতে হবে ! কি বাজে ভুল! ... তবে আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ঠিক টি জানানর জন্য ।
Avatar: Muhammad Sadequzzaman Sharif

Re: পায়ের তলায় সর্ষে - বাংলাদেশ

আচ্ছা, আমার মন হয় এক নজর দেখেই বলে দেওয়া ঠিক হয়নি। কি নদী জানতে হলে আসলে কোন পথে নওগাঁ গিয়েছেন তা জানতে হবে। আপনি যদি ভিন্ন পথে ঘুরে ফিরে গিয়ে থাকেন তাহলে পদ্মা নদী পার হতেও পারেন, কিন্তু যদি সবাই যে পথে যায় বা ঢাকা থেকে সহজ যে পথ সেই পথে যান তাহলে আপনি বড় একটা সেতু পার হয়েছেন, তা হচ্ছে যমুনা নদীর ওপরে বঙ্গবন্ধু সেতু। ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল, সেতু পার হলেন, গেলেন সিরাজগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া, তারপর নওগা।
Avatar: স্বাতী রায়

Re: পায়ের তলায় সর্ষে - বাংলাদেশ

নাঃ আপনিই ঠিক বলেছেন মনে হয়। কারণ আমার আবছা মনে পড়ছে আমি বঙ্গবন্ধু সেতু পেরিয়ে গেছি। আর বগুড়াতে নেমে মিষ্টি খেয়েছি। অতএব ...
Avatar: স্বাতী রায়

Re: পায়ের তলায় সর্ষে - বাংলাদেশ

#জলছবি- বাংলাদেশ
দিন- ২

গত সন্ধ্যে থেকেই শুধু গল্প আর গল্প। নিতান্ত-ই ব্যক্তিগত স্মৃতি দিয়ে ভরে তুলতে চাই না – তবু একটা কথা বলতে পারি। লোকে বলে বোনেতে বোনেতে দেখা হলে গল্প ফুরায় না – ভাইতে ভাইতে দেখা হলেও কম কিছু হয় না। রাতেই ঘুরে এসেছি আমার বোনের বাড়ি। সে একটি ঝমকঝামক বিউটি পার্লার চালায়। স্বামী-পুত্র নিয়ে ভর-ভরন্ত সংসার সামলেও। মেয়েদের স্বয়ং-সম্পূর্ণা রূপটি দেখতে বড় ভালো লাগে – তাই মনটা ভরে গেল। হরেক রকম গল্পের মাঝখানে আমার মাথায় ঘুরছে আমার দিদার কথা। সম্পন্ন ব্যবসায়ীর ঘরে জন্ম। দিদার বাবা আবার লক্ষ্মীর সন্ধানে ঘর ছেড়েছিলেন। ফরিদপুরের খোলাবেড়িয়া থেকে এসে ঠাঁই পেতেছিলেন পাড়-নওগাঁতে। দিদা বাপের আদুরে মেয়ে ছিলেন। সুন্দরী। সাত বছরে বিয়ে। বিয়ের দিনও নাকি গাছ-কোমর বেঁধে গাছে চড়েছিলেন। বিয়ে হয়ে চলে গেলেন আবার সেই ফরিদপুরে। নিজেদের আদি বাড়ী খোলাবেড়িয়া থেকে মাইলখানেক দূরের খানখানানপুর রেল স্টেশন ( এরই কাছে গোয়ালন্দ – রাজবাড়ী ) , তারপর বসন্তপুর, তারপরেই শিবরামপুর। দেশের বাড়ির কাছে, তবু বাবা-মার থেকে কত দূরে। শিবরামপুর থেকে অম্বিকাপুর হয়ে ফরিদপুর – ট্রেন ছুটবে পোড়াদা হয়ে সান্তাহার – সেখান থেকে টমটমে চেপে তবে আসবে বাপের বাড়ির দ্যাশ। কি মনে হত পরে, যখন বাপের বাড়ি আসতেন? পুতুল খেলার বাক্স টেনে নামাতে ইচ্ছে হত কখনো? আনাচে কানাচে জন্মে থাকা গাছগুলোর গায়ে গায়ে খুঁজতেন ফেলে যাওয়া শৈশবের গন্ধ? নাকি দীর্ঘকালের শ্বশুরালয়বাস তাঁকে শৈশব ভুলিয়ে দিয়েছিল? কি জানি!

ভোরবেলা থেকেই শুনছি সবাই বেড়াতে বেরোচ্ছে, আমিও এক ফাঁকে সঙ্গ নিলাম তাঁদের। ব্রীজ পেরিয়ে নাদুস-নাদুস থ্যাবড়া-নাকী হেলেদুলে-হাঁটা হাঁসের দলের পিছন পিছন চলে গেলাম কাকার দোকানে। বড় বাসনের দোকান। ভাই সামলাচ্ছে সেই দোকান। ছোট্ট কুট্টি ভাইটাকে ছোটবেলায় দেখে কখনো মনেই মনে হয় নি সে একটা ভারিক্কি গোছের ব্যবসায়ী হয়ে উঠবে। বেশ মজাই লাগল।

আর কত ধরণের বাসন! মানুষের কত কিছুই না লাগে কাজে। তবে কাকা বাসনের কারবারের সঙ্গে জড়িত হওয়ার জন্যই সেদিন একটা নতুন অভিজ্ঞতা হল। হাতে হাতে বাসন বানান দেখলাম। হাপরের আগুনে ধাতুকে নরম করে তারপর সেই পাতকে একটি উঁচু বেদীর ঊপর রেখে তার চারপাশে অনেক জন মিলে গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে এক দুরবোধ্য সুরের সঙ্গে তালে তালে হাতুড়ির ঘা মারছেন, আর ধাতুর তালটি ধীরে ধীরে বাসনের চেহারা নিচ্ছে। নিখুঁত টিমওয়ার্ক। পুরো পর্বটির ছন্দে বিভোর হয়ে থাকতে পারলেই ভালো – যদি না চোখে ভাসে মানুষগুলোর দড়ি পাকানো ক্ষয়া চেহারা। আসলে শারীরিক শ্রমের জগতের বেশী সংখ্যার মানুষের অল্প আয় আর যন্ত্র দুনিয়ার কম মানুষের হাতে সামান্য বেশী পয়সা কোনটা যে উপমহাদেশের জন্য ভালো সেটা আজও বুঝে উঠি নি। শুধু এইটুকু বুঝি যে তলার ধাপে থাকা মানুষদের এক্সপ্লয়টেসনটা গ্যারান্টিড।

বাসন তৈরি হচ্ছে

https://s6.postimg.cc/VJ99dvpV/DSC00053.jpg


https://s6.postimg.cc/p92f8xtX/DSC00052.jpg

কাকা-কাকীমার আদর খেতে খেতে যাওয়ার ইচ্ছে আর ছিল না – তবু যেতে হবে। গোনা-গুনতি দিন হাতে – তাই সময় সবচেয়ে মুল্যবান এই ক’দিন। তাই ঢিমা তালে তৈরি হতে হতে একসময় এসে গেল বিদায়ের ক্ষণ। ঢেঁকি-ঘর, আমগাছ সব নিয়ে পাড়-নওগাঁ পরে রইল নিজের কোণটিতে। আমরা চলতে শুরু করলাম। আমাদের আজকের পথ অতি দীর্ঘ। পাহাড়পুর যাব প্রথমে। সোমপুর মহাবিহার। সেই কোন কালে ইস্কুলে ইতিহাসের ক্লাসে পালরাজাদের কীর্তিকলাপ পড়েছি। সেই পালরাজ গোপালের ছেলে ধর্মপাল তৈরি করান এই বৌদ্ধ বিহার। আটশ সালে নাগাদ – মানে ১১০০ বছর আগে। ধর্মপালের পরে দেবপাল, আরও পরের পাল রাজাদের দাক্ষিণ্যও পেয়েছিল এই মহাবিহার। বিশাল, ছড়ানো জায়গা নিয়ে তৈরি – অনেক ঘর, চৈত্য আর অনেক বাড়ী। এখন ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইট এটা - খুব সুন্দর ভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা। একটা ছোট খাট মিউজিয়াম-ও আছে। বিক্রমশীলা বা নালন্দা বা ওদন্তপুর বিহার দেখিনি এখনো - সোমপুর বিহার-ই প্রথম দেখলাম। আমার চিরকালই ক্যাম্পাস ইউনিভার্সিটির প্রতি একটা দুর্বলতা আছে। যাদবপুরে যদিও বা আমরা ছোট্ট একটা ক্যাম্পাস পেয়েছি, অনেকের তো সেটুকুও জোটে না। তার উপর আবার অতীশ দীপঙ্করের মতন মহামহিমকে শিক্ষক হিসেবে পাওয়া! তাই আমাদের সেই সব পূর্বপুরুষদের প্রতি বেশ খানিকটা ঈর্ষাই হল। তবে মে মাসের গরমে ওই বিশাল ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ান মোটেই বিশেষ সুখকর স্মৃতি নয়। ছাতা, টুপি, সানগ্লাস সব অস্ত্র সাজিয়েও কিছুতেই সূর্যদেবকে কাবু করা যাচ্ছে না। তাই দেখার শেষপর্ব সারা হল খুব তাড়াতাড়ি। তবু তারই মাঝে সুন্দর টেরাকোটার প্যানেলগুলো চোখ এড়াল না। বিষ্ণুপুরের মন্দিরের মত সূক্ষ্ম কাজ নয়, তবু বেশ সুন্দর। তবে একটা দুঃখ হল যে – এত বড় একটা ঐতিহাসিক জায়গা – তবু কোন গাইডেড ট্যুরের ব্যবস্থা নেই! অথচ একজন সুকথক গাইড যে কিভাবে ইতিহাসকে চোখের সামনে জীবন্ত করে তুলতে পারেন! আর বাংলাদেশে মনে হয় হরিহর রায়’দের অভাব হওয়ার কথা নয়। বাংলাদেশের জায়গায় জায়গায় যেন ইতিহাস বই পাতা খুলে বসে আছে – একটু সরকারী তরফে সচেতনতা থাকলে হয়তো নাগরিক জীবনে ইতিহাস জ্ঞান বাড়ত একটু। আর নিরপেক্ষ ইতিহাসের ধারণা যে কোন মানুষকে সমৃদ্ধতর করে বলে আমার ধারণা।

সোমপুর বিহার

https://s6.postimg.cc/21jy753J/DSC00066.jpg

তার টেরাকোটার প্যানেলঃ

https://s6.postimg.cc/HrSxZCyL/DSC00062.jpg


পরের গন্তব্য ইতিহাসের আরও গহনে। খৃষ্টজন্মেরও তিনশ বছর আগের এক জায়গা। পৌণ্ড্রবর্ধন। নামটা চেনা চেনা লাগছে তো – হ্যাঁ মহাভারতেও আছে এই জায়গার কথা। এরই আজকের নাম মহাস্থানগড়। করতোয়া নদীর ধারে। প্রায় দুই কিলো মিটার করে লম্বায়, চওড়ায় জায়গা জুড়ে এক বিশাল আরকিওলজিক্যাল সাইট। একেবারে খাঁটি অনার্য রাজ্য ছিল আদতে। তারপর মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন সব রাজারা এসেছেন , গেছেন – জায়গাটার রমরমা ছিল অনেক অনেক দিন ধরে। এই জায়গাটা নিয়ে একটা মজার গল্প পড়েছিলাম। এখানে নাকি শাহ বলখি মাহিসওয়ার বলে একজন ফকির মাছের পিঠে চেপে এসে হাজির হন। পারো’র টাইগার’স নেস্টে ও তো গুরু পদ্মসম্ভব বাঘিনীর পিঠে চেপে এসে নেমেছিলেন। মানুষ চিরকালই গুরুবাদে বিশ্বাসী আর সেই গুরুরাই বেশি বিখ্যাত যাদের নিয়ে এই ধরণের অবাস্তব গল্প চলে বাজারে। সে যাক গে। এদিকে ফকিরের সঙ্গে রাজার যুদ্ধ বাধে। এদিকে মহাস্থানগড়ে একটি কুয়ো ছিল যে কুয়োর জলে স্নান করলে মৃত সৈনিকরাও প্রাণ ফিরে পেত। তাই রাজাকে কিছুতেই হারাতে পারছিল না ফকির। শেষে এক চিলকে দিয়ে একটুকরো গরুর মাংস সেই কুয়োর জলে ফেলানো হয়। ব্যস খেল খতম। রাজার জারিজুরি শেষ। তখন রাজার সেনাপতি ভয় পেয়ে বিশাল দলবল নিয়ে ফকিরের দলে যোগ দেন। রাজা আত্মহত্যা করেন। ফকিরের একটি মাজারও আছে এখানেই। গল্পটা পড়েই মনে হয়েছিল, কি নিদারুণ ভাবে একটা মানবিক বিশ্বাসঘাতকতার গল্পকে চাপা দেওয়া হল একটি অবাস্তবতা আর ধর্মীয় বিভেদের জুজু দিয়ে। এই সব হিজিবিজি গল্প শুনেই আর বিশেষ আগ্রহ ছিল না জায়গাটার প্রতি। তার উপর ড্রাইভার জানালেন এখানেও কোন গাইড নেই। যা দেখার নিজেদের খুঁজে পেতে দেখতে হবে। এ দিকে তার আগে চড়া রোদে সোমপুর বিহারে ঘণ্টা দুয়েক ঘুরে সবাই আধা-বিধ্বস্ত। কারোরই আর বিশেষ দেখার গরজ নেই। অগত্যা বললে বিশ্বাস করবেন না, আমাকে অন্য কেউ বললে আমি হাঁ করে ঘণ্টা দুয়েক তার দিকে তাকিয়েই থাকতাম, আমরা মুল জায়গাটার বাইরে নেমে ঠিক দু মিনিট এপাশ ওপাশ দেখে আবার গাড়ীতে উঠে পড়লাম। একটা তিনশ বিসির জায়গা! আর কোনদিন আসা হবে না তা খুব ভালো করেই জানি। সামনে দিয়ে ফিরে চলে এলাম। কি আর করা! প্রথম দিনেই রোদ লেগে অসুস্থ হয়ে পড়লে পুরো ঘোরাটাই মাটি। বিপদের সময় অর্ধেক ত্যাগ করারই নিয়ম। অগত্যা।

মহাস্থানগড়

https://s6.postimg.cc/iilj5udv5/DSC00034.jpg

চলো, চলো এগিয়ে চলো। যেতে হবে অনেক দূরে। সেই নাটোর হয়ে কুষ্টিয়া। আমাদের যিনি ড্রাইভার ছিলেন, কি লজ্জা, কি লজ্জা – তাঁর নামটা ভুলে গেছি। অসম্ভব সজ্জন, ভদ্র একজন মানুষ। এবং তুমুল ভাবে সার্ভিস ওরিয়েন্টেড। তাঁকে চুপি চুপি বলে রেখেছিলাম, নাটোরের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় একবার দাঁড়াতে। সেই মানুষটি যাকে দিয়ে আমার নিজের আনন্দে বাংলা কবিতা পড়ার শুরু, এবং শেষ – একবার তাঁকে মনে করব নাটোরের মাটিতে দাঁড়িয়ে। কিন্তু বেরোতেই দেরী হয়েছে। পাহাড়পুর দেখতেও অনেকটা সময় লেগেছে। মহাস্থানগড় থেকে বেরন’র পরে যখন আমরা নাটোরের পথে আধাআধি যেতে না যেতেই সূর্যিমামা অস্তাচলে যেতে বসলেন। ছড়ানো মাঠের মধ্যে দিয়ে রাস্তা , কোথাও কোথাও গাছের ছায়া দীর্ঘ হয়ে পথ ঢেকেছে – কখন যেন সেই ছায়া কালো হয়ে চরাচর ঢেকে দিল। অনেক অনেক পথের পরে, দূরে যখন নাটোরের আবছা আলো দেখা দিল, গাড়ীর মধ্যে তাকিয়ে দেখালাম – বাচ্চা বুড়ো সবাই আধো ঘুম, আধো জাগরণে। গাড়ী আর থামাতে বারণ করলাম – বিনা অ্যাপয়েন্টমেন্টে অন্ধকারে বনলতা সেনদের মুখোমুখি বসার সুযোগ কি আর সবাই পায়! এমনি ভাবেই অন্ধকারে পেরিয়ে গেল ঈশ্বরদী – পদ্মার উপরের ব্রীজ পেরিয়ে চলে এলাম দক্ষিণবঙ্গে।

ব্যবস্থাপকরা চেয়েছিলেন আমরা নাটোরেই রাত্রিবাস করি। সেখানে ব্যবস্থাপত্র ভালো। আমিই ভেটো দিই। আমাদের এ দিনের যাত্রাপথ যদি দীর্ঘ হয়, পরের দিনেরটিও তুল্যমূল্য। তাই চেয়েছিলাম যতটা এগিয়ে থাকা যায়। কুষ্টিয়াতেই থাকতে চাই। বলেছিলাম, পরিস্কার টয়লেট-সহ সেফ ঘর পেলেই হবে। অনেক গড়িমসি করে সেই মত ব্যবস্থাই হয়েছিল। প্রায় রাত সাড়ে দশটা নাগাদ এসে পৌঁছালাম সেই রাত- কাটানোর আস্তানাটিতে। এসেই চক্ষু চড়ক গাছ। ঠিক বাজারের মাঝখানের হোটেলটি চার তলায়। এবং তাতে লিফট নেই। আমাদের সঙ্গে ছোট বড় মাঝারি হরেক সাইজের হরেক ধরণের লাগেজ – দলে তিন থেকে তিয়াত্তর বছরের লোক – সবাই হাঁ। তবে দায়ে পড়লে মানুষ কি না করে! আমরাও নিজেরা উঠলাম, সব মালপত্র কিছু আমরা তুললাম, কিছু হোটেলের লোক তুলল।

কিন্তু শেষ হাসি কে হাসল বলুন দেখি? ঘরে সব মালপত্র পৌঁছানর পরে হোটেলের একজন কি একটা দাবী করতে আমি তো তাকে তেড়ে বকুনি দিচ্ছি, এ আবার কি রকম হোটেল- চারতলার উপরে অথচ লিফট নেই – এ রকম ভাবে ব্যবসা হয় নাকি ইত্যাদি ইত্যাদি। হঠাৎ তিনিও সমান তেড়ে উঠে বললেন , এই সব ‘নরমাল’ শহরে আবার লিফট থাকে নাকি! একি ঢাকা নাকি! আমি তাতেও তেড়ে বললাম, ঢাকা কি এবনরমাল শহর নাকি? ততক্ষণে সবাই হেসে উঠেছে। হাসির মধ্যে দিয়েই তফাতটা মাথায় ঢুকল, নিজের-চোখে-জগত-দেখে-অভ্যস্ত আর চাইলেই-পেতে-থাকা আমাদের মত বড় শহরের মানুষেরা যে তফাতগুলো অনেক সময় প্রায় ধরতেই পারি না।
Avatar: স্বাতী রায়

Re: পায়ের তলায় সর্ষে - বাংলাদেশ

সব ছবি গুলো আসে নি দেখছি - আবার দিচ্ছি। বাসন তৈরির ছবি -


https://i.postimg.cc/wjZw4sVg/DSC00053.jpg


https://i.postimg.cc/wBN0CTfJ/DSC00052.jpg

সোমপুর বিহারের ছবি

https://i.postimg.cc/Vknt1rwY/DSC00066.jpg

বিহারের টেরাকোটা প্যানেলের ছবি -

https://i.postimg.cc/cJWnJx1f/DSC00062.jpg

Avatar: দ

Re: পায়ের তলায় সর্ষে - বাংলাদেশ

এহে দিন২ এর লেখা আর ছবি কমেন্টে এসে গেছে। ওই আপনার মন্তব্য যোগ করুন বাক্সটা আসলে ড্রপ ডাউন। ওটায় ক্লিকালে নীচে একটা অপশান আসে মূল লেখায় যোগ করুন বা এরকম কিছু। সেটা সিলেক্ট করে তারপর লিখলে মূল লেখায় চলে যাবে
Avatar: Muhammad Sadequzzaman Sharif

Re: পায়ের তলায় সর্ষে - বাংলাদেশ

এইরে! মহাস্থানগড় দেখে ঘুরে গেলেন আর বেহুলার বাসর ঘর দেখে আসেননি? মহাস্থানগড় থেকে অল্প একটু দূরেই ছিল। বাকি গল্প শোনার আশায় থাকলাম।
Avatar: SKM

Re: পায়ের তলায় সর্ষে - বাংলাদেশ

জেনর্ড ট্রাভেলস এর English স্পেলিং কি হবে । ওয়েবসাইট আছে কি ?
কন্টাক্ট ডিটেলস পেলে ভালো হবে ।
Avatar: pepe

Re: পায়ের তলায় সর্ষে - বাংলাদেশ

মহাস্থানগড় নাম শুনলেই আমার বাবা আর পিসির মুখে ছোটবেলা শোনা তাদের ছোটবেলার গল্প মনে পরে। কোনোদিন হয়তো সেই জায়গা গুলো দেখতে পাবো না ঃ(
Avatar: স্বাতী রায়

Re: পায়ের তলায় সর্ষে - বাংলাদেশ

@SKM genord travels এর পুরো নাম

Genord International ( যতদূর জানি নিজের ওয়েবসাইট নেই )
কন্ট্যাক্ট - Gautam Sen
ইমেল genord.international@gmail.com
( ফোন নং আর নেই আমার কাছে - এইটা নেটে পেলাম 9830084317 । ট্রাই করে দেখতে পারেন। )

@দ একসঙ্গে দিন ৩ র প্রথম পর্ব আর আগেই দেওয়া দিন ২ জুড়ে দিলাম মুল লেখায় - যদি না বোঝা যায়, বলবেন একটু।

@Muhammad Sadequzzaman Sharif কত কিছুই দেখা হল না!


Avatar: দ

Re: পায়ের তলায় সর্ষে - বাংলাদেশ

সেই ঘরের বৌ-এর আবার অত বৈশিষ্ট্য কী? লোকে মনে রেখেছে এই ঢের!

আরো পর্ব আসবে আশা করি।


Avatar: দ

Re: পায়ের তলায় সর্ষে - বাংলাদেশ

হ্যাঁ এবারে ঠিকঠাক আছে। থ্যাঙ্কু থ্যাঙ্কু
Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: পায়ের তলায় সর্ষে - বাংলাদেশ

জল ছবি, দিন ২//


বগুড়ার মহাস্থানগড় না দেখাটি সত্যিই এক বড় বিপর্যয়। ফকিরের ঢপের গল্পের কতো যে ভার্সান আছে!

এবার এলে শুধু মহাস্থানগড় দেখার জন্যই অন্তত পুরো একদিন সময় হাতে রেখ। ইউনেস্কো হেরিটেজ। এখন বগুড়ায় অনেক ভাল হোটেল রেস্তোরাঁ আছে। বিশ্রাম নিয়ে আয়েশ করে গড় দেখা যাবে। এখানে খুব সমৃদ্ধ একটি জাদুঘর রয়েছে। গাইডের অভাব পুষিয়ে দেবে প্রচুর বইপত্র।

বগুড়ার আরেকটি জিনিসের আস্বাদ মিস করে গেছ। সেটি হচ্ছে ঘটির দই। বিশ্ব সেরা দই বগুড়াতেই হয়। আধা কেজি ও এককেজির ঘটির দই, সে এক অমৃত।

"নাটোরের বনলতা সেন" জীবনানন্দের কবিতার চরিত্র মাত্র। বাস্তবে কবির জীবনে এই নামে কেউ ছিল না। নাটোরে সেন বংশের কারো বাস কখনো ছিল না, প্রাচীন বইপত্রে এর সাক্ষ্য নেই। কাজেই আবেগটি নেহাতই! তবে কবি জীবনে কোন এক "বনলতা" যে ছিলেন না, তাইই বা নিশ্চিত বলি কী করে?

তবে নাটোরের রাজবাড়ীটি একটি দর্শনীয় স্থান। ইউরোপের অনেক ভাস্কর্য ও নিদর্শন প্যালেসটির পরতে পরতে। নাটোরের কাচা গোল্লা ছেলেবুড়ো সবাই মিস করে গেছ। বিরতিটা সত্যিই দরকার ছিল। আচ্ছা, সে সব পরের বারের জন্য তোলা থাক। 💕
Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: পায়ের তলায় সর্ষে - বাংলাদেশ

জল ছবি, দিন ৩//

স্বাতী, তোমার ব্যাখ্যা মেনেই ফকির লালনকে তার ভক্তরা #সাঁই (গুরু, প্রভু, স্বামী, পথপ্রদর্শক/গাইড) নামে অভিহিত করেন, আর যাই হোক মরমি বাউল সাধক লালন মুঘলজাত "শাহ" বংশীয় নন। তবে তাকে "লালন শাহ" বলা একটি খুবই প্রচলিত ভুল।

যেমন, কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে একটি সেতুর নামকরণ করা হয়েছে, “লালন শাহ সেতু”। বেশকিছু সরকারি নথিপত্র, এমনকি সাইনবোর্ডেও তেমন হতেপারে।

লালনের নামের সঙ্গে “#সাঁই” এর বদলে মুঘল বংশীয় “#শাহ” জুড়ে দেওয়া একটি প্রচলিত ভুল। যেটি লালনের অনেক অনুসারী বাউল নিজের পদবী হিসেবে নিজেই “শাহ” জুড়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

কিন্তু এরমানে এই নয় যে ফকির লালন “#শাহ” হিসেবে পরিচিতি পাবেন।

#

লালন নিজেই তার একটি গানে ভাব গুরুকে প্রতিষ্ঠা করেছেন --

"সিরাজ #সাঁই (মোটেই #শাহ নন) কন, কোথায় রে মন, সোনার পালংক এমন?

লালন কহে, সব অকারণ, মরলে সার হবে মাটির বিছানা"...

Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: পায়ের তলায় সর্ষে - বাংলাদেশ

ও আমার দেশের মাটি//

"এক আধজন-ই ওখানে বাড়ী আগলে পড়ে আছেন। যাঁরা আছেন তাঁদের কাছে খুব জানতে ইচ্ছে হচ্ছিল, কেমন আছেন তাঁরা। এপাশে সংখ্যালঘুদের আমরা কতটা স্বস্তিতে রেখেছি তার কিছু কিছু খাপচা ছবি জানি। ওপাশে ওঁরা কেমন আছেন? জিজ্ঞেস করতে সাহস হয় নি – কে আর হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে।"

ভাষাহীন, স্বাতী। বুকের ভেতরে খচ করে যেন কাঁটা বিঁধে গেল। হায় দ্যাশ! 😥


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন