I RSS feed

Indranil ghosh dastidarএর খেরোর খাতা

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • এতো ঘৃণা কোথা থেকে আসে?
    কাল উমর খালিদের ঘটনার পর টুইটারে ঢুকেছিলাম, বোধকরি অন্য কিছু কাজে ... টাইমলাইনে কারুর একটা টুইট চোখে পড়লো, সাদামাটা বক্তব্য, "ভয় পেয়ো না, আমরা তোমার পাশে আছি" - গোছের, সেটা খুললাম আর চোখে পড়লো তলায় শয়ে শয়ে কমেন্ট, না সমবেদনা নয়, আশ্বাস নয়, বরং উৎকট, ...
  • সারে জঁহা সে আচ্ছা
    আচ্ছা স্যার, আপনি মালয়েশিয়া বা বোর্ণিওর জঙ্গল দেখেছেন? অথবা অ্যামাজনের জঙ্গল? নিজের চোখে না দেখলেও , নিদেনপক্ষে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের পাতায়? একজন বনগাঁর লোকের হাতে যখন সে ম্যাগাজিন পৌঁছে যেত, তখন আপনি তো স্যার কলকাতার ছেলে - হাত বাড়ালেই পেয়ে যেতেন ...
  • ট্রেন লেট্ আছে!
    আমরা প্রচন্ড বুদ্ধিমান। গত কয়েকদিনে আমরা বুঝে গেছি যে ভারতবর্ষ দেশটা আসলে একটা ট্রেনের মতো, যে ট্রেনে একবার উদ্বাস্তুগুলোকে সিটে বসতে দিলে শেষমেশ নিজেদেরই সিট জুটবে না। নিচে নেমে বসতে হবে তারপর। কারণ সিট শেষ পর্যন্ত হাতেগোনা ! দেশ ব্যাপারটা এতটাই সোজা। ...
  • একটা নতুন গান
    আসমানী জহরত (The 0ne Rupee Film Project)-এর কাজ যখন চলছে দেবদীপ-এর মোমবাতি গানটা তখন অলরেডি রেকর্ড হয়ে গেছে বেশ কিছুদিন আগেই। গানটা প্রথম শুনেছিলাম ২০১১-র লিটিল ম্যাগাজিন মেলায় সম্ভবত। সামনাসামনি। তো, সেই গানের একটা আনপ্লাগড লাইভ ভার্শন আমরা পার্টি ...
  • ভাঙ্গর ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা প্রসঙ্গে
    এই লেখাটা ভাঙ্গর, পরিবেশ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা প্রসঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে নানা স্ট্যাটাস, টুকরো লেখায়, অনলাইন আলোচনায় যে কথাগুলো বলেছি, বলে চলেছি সেইগুলো এক জায়গায় লেখার একটা অগোছালো প্রয়াস। এখানে দুটো আলাদা আলাদা বিষয় আছে। সেই বিষয় দুটোয় বিজ্ঞানের সাথে ...
  • বিদ্যালয় নিয়ে ...
    “তবে যেহেতু এটি একটি ইস্কুল,জোরে কথা বলা নিষেধ। - কর্তৃপক্ষ” (বিলাস সরকার-এর ‘ইস্কুল’ পুস্তক থেকে।)আমার ইস্কুল। হেয়ার স্কুল। গর্বের জায়গা। কত স্মৃতি মিশে আছে। আনন্দ দুঃখ রাগ অভিমান, ক্ষোভ তৃপ্তি আশা হতাশা, সাফল্য ব্যার্থতা, এক-চোখ ঘুগনিওয়ালা, গামছা কাঁধে ...
  • সমর্থনের অন্ধত্বরোগ ও তৎপরবর্তী স্থবিরতা
    একটা ধারণা গড়ে ওঠার সময় অনেক বাধা পায়। প্রশ্ন ওঠে। সঙ্গত বা অসঙ্গত প্রশ্ন। ধারণাটি তার মুখোমুখি দাঁড়ায়, কখনও জেতে, কখনও একটু পিছিয়ে যায়, নিজেকে আরও প্রস্তুত করে ফের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। তার এই দমটা থাকলে তবে সে পরবর্তী কালে কখনও একসময়ে মানুষের গ্রহণযোগ্য ...
  • ভি এস নইপাল : অভিবাসী জীবনের শক্তিশালী বিতর্কিত কথাকার
    ভারতীয় বংশদ্ভূত নোবেল বিজয়ী এই লেখকের জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের ত্রিনিদাদে, ১৯৩২ সালের ১৭ অগস্ট। পরে পড়াশোনার জন্য আসেন লন্ডনে এবং পাকাপাকিভাবে সেতাই হয়ে ওঠে তাঁর আবাসভূমি। এর মাঝে অবশ্য তিনি ঘুরেছেন থেকেছেন আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, ভারত সহ ...
  • আবার ধনঞ্জয়
    আজ থেকে চোদ্দ বছর আগে আজকের দিনে রাষ্ট্রের হাতে খুন হয়েছিলেন মেদিনীপুরের যুবক ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়। এই "খুন" কথাটা খুব ভেবেচিন্তেই লিখলাম, অনেকেই আপত্তি করবেন জেনেও। আপত্তির দুটি কারণ - প্রথমতঃ এটি একটি বাংলায় যাকে বলে পলিটিকালি ইনকারেক্ট বক্তব্য, আর ...
  • সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে এখনো শ্রমদাস!
    "সেই ব্রিটিশ আমল থেকে আমরা অন্যের জমিতে প্রতিদিন বাধ্যতামূলকভাবে মজুরি (শ্রম) দিয়ে আসছি। কেউ মজুরি দিতে না পারলে তার বদলে গ্রামের অন্য কোনো নারী-পুরুষকে মজুরি দিতে হয়। নইলে জরিমানা বা শাস্তির ভয় আছে। তবে সবচেয়ে বেশি ভয় যেকোনো সময় জমি থেকে উচ্ছেদ ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

শেষ ঘোড়্সওয়ার

I

সঙ্গীতা বেশ টুকটাক, ছোটখাটো বেড়াতে যেতে ভালোবাসে। এই কলকাতার মধ্যেই এক-আধবেলার বেড়ানো। আমার আবার এদিকে এইরকমের বেড়ানোয় প্রচণ্ড অনীহা; আধখানাই তো ছুটির বিকেল--আলসেমো না করে,না ঘুমিয়ে, বেড়িয়ে নষ্ট করতে ইচ্ছে করে না। তো প্রায়ই এই টাগ অফ ওয়ারে আমি জিতে যাই, কিম্বা সঙ্গীতা আমাকে জিতিয়ে দেয়।
কখনো কখনো ওরও অবশ্য জিততে ইচ্ছে করে। সেইরকম এক রোববার সন্ধ্যায় আমাদের ইকো পার্ক যেতে হল। ইকো পার্ক বাড়ি থেকে তেমন বেশি দূর না, কিন্তু যাতায়াত একটু ঝঞ্ঝাটে।তেঘরিয়া মোড় পৌঁছে সেখান থেকে অটো করে হলদিরাম, সেখানে রাস্তা পেরিয়ে চিনার পার্কগামী যানবাহনের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকা। মনোমত গাড়িঘোড়া কিছুই তেমন আসছে না বেশ খানিকক্ষণ। এমন সময় গাড়িটাড়ি নয়, একখানা ঘোড়া-হ্যাঁ, সত্যি ঘোড়া এসে হাজির হল। বেঁটেমত একটা টাটুঘোড়া একটি ঘোড়ার গাড়িকে টেনে নিয়ে আসছে। আর চালকের আসনে ছপটি হাতে বসে আছেন বেঁটেমত এক ভদ্রলোক, লম্বা দাড়ি, চোখে চশমা, মাথায় টুপি। অনেকটা ছোটবেলায় দেখা স্বপনবুড়োর ছবির মত দেখতে।চেঁচিয়ে বলছেন-রাইড! রাইড ! দেখলেই অভাবে-পড়া প্রাক্তন নকশাল বলে মনে হয় (অবশ্য দাড়ির প্রতি আমার একটা আলাদা দুর্বলতা আছে, সেকথা মানছি। আমার নিজের যদিও দাড়ি রাখা হল না; তবে সে অন্য প্রসঙ্গ)।
এখন, সঙ্গীতার অনেক ইচ্ছের মধ্যে একটা ইচ্ছে হল কলকাতায় ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বেড়ানো। অনেকদিন ধরে সে প্ল্যান করে, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে থেকে ঘোড়ার গাড়িতে চড়বে,গড়ের মাঠের খোলা হাওয়ায় চুল উড়িয়ে কুলফি খেতে খেতে কলকাতার বুকের ওপর দিয়ে টগবগ করে ঘুরে বেড়াবে। আমাদের অজস্র প্ল্যানের মতই এটাও বাক্সবন্দী হয়ে পড়ে আছে। তো, এখন যখন সুযোগ পাওয়া গেছে ঘোড়ার গাড়ি চড়বার, তখন তার সদ্ব্যবহার করলে মন্দ কী ! না হয় এটা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল-গড়ের মাঠ নয়, না হয় সেসব গাড়ির মত এই গাড়ি তেমন বাহারে নয় (খোলা একটা বাক্স প্যাটার্নের জিনিষ, সামনে চালকের বসবার সিট, তার পেছনে রিক্সার মত অংশ, তাতে আরো তিন-চারজনের বসার মত ব্যবস্থা, ব্যাস!), আর কুলফিরও বন্দোবস্ত নেই; তাই বলে দুধের স্বাদ কি ঘোলে মেটে না কারো? মিটতে নেই? বিশেষ করে ঘোড়া দেখে উজানও যখন বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। আমরা আর দেরী না করে উঠে বসলাম। ভদ্রলোক দুশো টাকা চাইলেন, তাও আবার 'কাফে একান্তে' অবধি যেতে পারবেন না বলেই দিলেন(বেশ পষ্ট কথায় কষ্ট নেই ধরণের হাবভাব);টাকাটা একটু গায়ে কড়কড় করতে লাগল, তবে শখ বলে কথা !
গাড়িতে উঠেই উজানের উঁকিঝুঁকি মারা শুরু হয়ে গেল। সে একটু বেশিই ছটফটে, বিশেষ করে জন্তুজানোয়ার দেখলে। ঘোড়া কিভাবে চোখের পাতা ফেলছে, কান নাড়াচ্ছে, কেমন করে চার-পা ফেলে সে চলে,ল্যাজের ঝাপট দিয়ে মাছি তাড়ায়, এসবই তার দেখা চাই। এতে করে সেই অপরিসর গাড়িতে একটা অশান্তি ঘনিয়ে আসে, ব্যাপারটা খুব একটা সেফ থাকে না আর, গাড়ির ভারসাম্য থেকে থেকে বদলে যেতে চায়। বেগতিক দেখে ভদ্রলোক উজানকে বলেন- তুমি সামনে এসো, আমার পাশে এসে বসো। উজানকে আর পায় কে, সে মুখভর্তি হাসি নিয়ে তখুনি সামনে গিয়ে বসে।
চলতে চলতে ভদ্রলোক উজানকে বোঝাতে থাকেন- ঘোড়া কতরকম ভাবে চলে জানো? এই যে টগবগিয়ে ছুটছে, এটা হল গ্যালপ। এই, এই দ্যাখো, আর একটু স্লো হয়ে গেলো, তিনটে বিটে দৌড়োচ্ছে, এর নাম ক্যান্টার। এই যে দু বিটের দুলকি চালে চলা, এর নাম ট্রট। আরো আছে, ওয়াকিং, পেসিং, ফক্সট্রট...। পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে তিনশো রকমের ঘোড়া আছে, জানো তুমি?
আমরা হাঁ হয়ে যাই ভদ্রলোকের জ্ঞানের বহর দেখে। বোঝাই যায়, ইনি সাধারণ ঘোড়ার গাড়ির চালক নন। বাইরে বেরোলে সাধারণতঃ স্পিকটি নট আমি পর্যন্ত উৎসাহিত হয়ে কথা বলতে শুরু করি।
-আপনার এই ঘোড়াটা কী ধরণের ঘোড়া?
-এটা? এ একধরণের মিনিয়েচার হর্স। এ পুরুষ ঘোড়া।
-কোথায় পেলেন একে?
-বেলডাঙা চেনেন? মুর্শিদাবাদ বেলডাঙা? সেখানে গিয়েছিলাম একটা কাজে। সেখানেই দেখি একে। একটা গাছের সঙ্গে বাঁধা ছিল। জিজ্ঞেস করলাম-আমার সঙ্গে যাবি? ও মাথা নেড়ে বলল-হ্যাঁ। তখন নিয়ে এলাম।
-নিয়ে এলেন !!
-হ্যাঁ। ছোটবেলা থেকে আমার পশুপাখির শখ তো। রাজ্যের কুকুর-বেড়াল, সব রাস্তার-বুঝলেন? এনে এনে পুষতাম(উজান এবার উৎকর্ণ হল)। বাসা ভেঙ্গে পড়ে যাওয়া পাখি পুষতাম। পাড়ার লোকেরাও ডেকে ডেকে জন্তুজানোয়ার দিয়ে যেত।
-পালতে পয়সা লাগতো না? অনেক খরচ তো !
-আমরা গরীব মানুষ, অত খরচা কি করে করবো। চেয়েচিন্তে আনতাম।আমি যা খাই, তাই খেতে দিতাম ওদের।
-কিনে এনে রাখলেন কোথায়?
-ঐ ! একটা আস্তাবল মত ছিল। তাতে অন্য পশুপাখিরা থাকতো। সেখানেই রেখেছি। একটা ঘোড়ীও কিনে দিয়েছি। কথায় বলে-কচ্ছপের কামড় আর ঘোড়ার কাম....। তিনটে বাচ্চা হয়েছিল। দুটো মরে গেছে। আগে-আগে ঘোড়ীটাও গাড়ি টানতো। এখন আর টানাই না।
- রোগ-ব্যধি হলে চিকিৎসা করেন কোথায় এদের?
-বেলগাছিয়ার পশু-হাসপাতালে নিয়ে যাই। ওখানে সবাই আমার চেনা। আমায় খুব ভালোবাসে। ছোটখাটো রোগের চিকিৎসা আমি নিজেই করি। দেখতে দেখতে শিখে গিয়েছি।...হ্যাঁ, হাত বের করবেন না বৌদি... মাথা বাইরে বের করবেন না। পেছন থেকে গাড়ি এসে মেরে দেবে।

বস্তুতঃ ব্যাপারটা স্বস্তিদায়ক হচ্ছিল না মোটেই। নিউটাউনের রাস্তায় অজস্র গাড়ি-বাস-অটো; তারা বেশ বিপজ্জনক ভাবে কাছ দিয়ে হুসহাস করে বেরিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যে কোনো মুহূর্তে ধাক্কা লেগে যাবে বুঝি। খোলা গাড়ি, কোনো প্রোটেকশন নেই। ঘোড়া এই বড় রাস্তায় পড়ে একটু বুঝভুম্বুলমত হয়ে গেছে; হয়তো এত গাড়ি কখনো একসঙ্গে দেখে নি। ওর চলায় জট পাকিয়ে যাচ্ছে প্রায়শঃ। যেখানে দাঁড়ানোর কথা , সেখানে একটু এগিয়ে গেলো।যেখানে চলতে হবে, সেখানে কখনো দাঁড়িয়ে পড়ছে। মোড় ঘুরতে গেলে অন্য রাস্তায় ঢুকে পড়ছে। দাড়িবাবু আবার ধমকে তাকে পথে আনছেন।পাতি বাংলায় ধমক। বাংলায় সব নির্দেশ। 'চল', 'দাঁড়া', 'দৌড়ো'-এইসব। ঘোড়া দেখলাম বাংলা বেশ বোঝে। হাতির মত নয় যে বর্মী কিম্বা আর কোনো বিজাতীয় ভাষায় বকতে হবে।

ঘোড়াটিকে দেখে মায়া লাগে খুব। রোগামত। এতগুলো মানুষকে টানতে ওর নিশ্চয়ই কষ্ট হচ্ছে খুব। বেঁটে ঘোড়া। ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। দীর্ঘ আঁখিপল্লব। মনে হয় , নেমে যাই; বলি-থাক আর তোকে টানতে হবে না। এই ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে ঘোড়া চলতে দেখে লোকজন অবাক হয়। যেন পুরনো কলকাতার দৃশ্য দেখছে। সাদা-কালো কিম্বা সিপিয়া টোন। কেউ কেউ যানজটে রাগ করে। দাড়িবাবুর সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। রাস্তার পাশে দাঁড়ানো কোনো চ্যাংড়া ছেলে টিটকিরি দেয় 'এ খচ্চর ! এ খচ্চর ! 'বলে। দাড়িবাবু রেগে বলেন-তোমার মতন নয় ! ঘোড়াকে বেশ ভালোবাসেন, বোঝাই যায়।

চলতে চলতে আমরা রাজারহাটের নিরালা এক রাস্তায় এসে পড়ি। এই স্ট্রেচটা আমার বেশ চেনা লাগে। দুপাশে উঁচুনিচু জমি। কোথাও নলবন; কোথায় চাষ হয়ে যাওয়া মাঠে কাটা খড়ের মাথা জেগে আছে। দূর থেকে ইকো পার্কের আলো দেখা যায়। এইরকম একটা জায়গায় গত শীতে পাখির ছবি তুলতে এসেছিলাম। ওপেন বিল স্টর্কের একটা বড় কলোনি আছে। জিটিং সিস্টিকোলা দেখেছিলাম। মুনিয়া দেখতে পাই নি। চারিদিক নিরালা, নিরিবিলি। গ্রাম্য। এই মুহূর্তে শুধু ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ। আর কিছু না।

নীরবতা ভেঙে আমাদের চালক বলেন-এখানে আগে খুব সাপ বেরোতো,বুঝলেন? বর্ষাকালে ব্যাঙ খেতে বেরোতো। অনেক সোনা ব্যাঙ জন্মাতো। সব চালান করে দিয়েছে। সাপও মেরে ফেলেছে লোকে। গাড়ির চাকার তলায় মারা পড়ে অনেক।
-হ্যাঁ, ওপেন বিল স্টর্কও আছে অনেক।
-কী জিনিষ? (বুঝতে পারেন নি)
-ঐ, শামুকখোল পাখি।
-অ!
-আর শেয়াল আছে না অনেক? আমি একবার দিনের বেলায় শেয়াল দৌড়ে যেতে দেখেছি।
-শেয়াল আর কই? সব শেষ। মানুষ সব মেরে ফেলেছে।
বিষণ্ণ শোনায় ওঁর গলা।

চরাচর-এর সেই পাখমারার কথা মনে পড়ে। বাঁচতে হলে যাকে পাখিদের ধরতে হবে। জাল পেতে, ফাঁদ পেতে, আঠাকাঠি দিয়ে। কিন্তু যে মানুষ পাখিদের ধরতে চায় না। খোলা আকাশে উড়িয়ে দিতে চায় যে পাখিদের। অথচ পাখি না ধরলে যার রোজগার হবে না। খাঁচা ফেলে পাখি উড়ে গেলে যার মুখে অন্ন ওঠে না।পাখি আর মানুষ আর গাছপালা; জন্তুজানোয়ার আর নদীর জল-যে সবাইকে বাঁচাতে চায়। সবাইকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সে বোকা নয়। সেও জানে-পাখি না মারলে, বাঘ-হরিণ না মারলে, গাছ না কাটলে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। এমনই মানুষের বেঁচে থাকার কুহক। বেঁচে থাকার কালো কৌতুক।

মানুষ ফুরিয়ে যাওয়ার পরও পৃথিবী ঘুরে যাবে। মানুষ যখন মরবে তখন তার সাথে বেঁচেবর্তে থাকা বাকি প্রাণী আর উদ্ভিদজগতটুকুকে নিয়েই মরবে। কিন্তু প্রাণের নাকি অসীম ক্ষমতা। আবার নাকি পৃথিবীতে গাছ গজাবে, প্রণীরা ফিরে আসবে একে একে। এই ইকো পার্কের এলাকা জুড়ে জলাভূমি গজাবে, ঝিঁঝিঁ আর ব্যাঙের আওয়াজ রি রি করবে। সাপেরা ফিরবে। শেয়ালরাও।হঠে যাওয়া সুন্দরবন আবার এসে কলকাতা অধিকার করবে। ভাঙা ট্রামের কামরা বাঘ এসে চেটে যাবে।

হয়তো মানুষ আর ফিরবে না। যে রিক্সাচালকটি রাস্তার কুকুরদের চেয়েচিন্তে খাওয়াতেন, এমনকি সপ্তাহে একদিন মাংসও; ডাঁটি-ভাঙা চশমা-পরা তুবড়োনো গালের যে মানুষটি রাগী, ঘেয়ো কুকুরের গলায় হাত বুলিয়ে বলতেন -তোর বুঝি খুব রাগ, বাবু? তিনি আর ফিরবেন না। আমার যে মেদিনীপুরের রোগী পথের জন্তুজানোয়ারদের বাড়িতে এনে রাখেন, তাদের জন্য র‌্যাশনের চাল ভিক্ষা করেন, তাদের জন্য পাড়ার লোকের কাছে মারধোর খান, তিনি আর ফিরবেন না। ফিরবেন না আমাদের ঘোড়ার গাড়ির চালক। চরাচরের সেই পাখমারা আর ফিরবে না।

নিউটাউন যাওয়ার এই রাস্তা তখন হাতিশুঁড় আর বনকলমির লতায়, ল্যান্টানা ঝোপে ঢাকা পড়ে যাবে।উঁচু উঁচু গাছ গজাবে।সমুদ্র তখন কাছে এগিয়ে আসবে। দক্ষিণসমুদ্রের ঝোড়ো হাওয়ায় গাছেরা দুলে দুলে হাসবে।

শুধু কখনো কখনো মাঝরাত্তিরে এক অশরীরী পিচরাস্তায় অশরীরী ঘোড়ার গাড়ির আওয়াজ শুনতে পাওয়া যাবে। ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শোনা যাবে। কখনো গ্যালপ, কখনো ক্যান্টার, কখনো ট্রট।

আর থেকে থেকে একটা মোটা, ভারী,ভাঙা গলা হেঁকে বলবে-রাইড! রাইড !

শেয়ার করুন


Avatar: aranya

Re: শেষ ঘোড়্সওয়ার

বাঃ
Avatar: π

Re: শেষ ঘোড়্সওয়ার

কী চমৎকার "
Avatar: dd

Re: শেষ ঘোড়্সওয়ার

বাঃ বাঃ বাঃ

Avatar: গবু

Re: শেষ ঘোড়্সওয়ার

বড় মায়া রয়ে যাবে !!

শেষের দিকটা প্রফেটিক। তবে বাঘ না হয়ে অন্য কোনো প্রাণী... মানুষ বাকি সবাইকে মেরেই মরবে।
Avatar: স্বাতী রায়

Re: শেষ ঘোড়্সওয়ার

অনবদ্য।
Avatar: Shn

Re: শেষ ঘোড়্সওয়ার

আহা
Avatar: শঙ্খ

Re: শেষ ঘোড়্সওয়ার

বড় মায়া!
Avatar: শিবাংশু

Re: শেষ ঘোড়্সওয়ার

বাহ....
Avatar: anandaB

Re: শেষ ঘোড়্সওয়ার

ভিনটেজ, তবে অতি অল্পই হইলো
Avatar: 0

Re: শেষ ঘোড়্সওয়ার

লেখক আর ঘোড়া এ'দুটো কমন্‌ বলেই বোধ'য় আমার 'নিহ্ত অশ্বের স্বরলিপি' মনে পড়ল।
Avatar: ।

Re: শেষ ঘোড়্সওয়ার


Avatar: Du

Re: শেষ ঘোড়্সওয়ার

হয়তো বা সেবার টূথ
Avatar: i

Re: শেষ ঘোড়্সওয়ার

এই সব লেখা খুব কম পড়তে পাই আজকাল। লেখক একটু ঘন ঘন লিখবেন-আশায় থাকব।
Avatar: avi

Re: শেষ ঘোড়্সওয়ার

সবচেয়ে অনবদ্য লাগলো এ গল্পের পরিমিতি। কতটা সংযম থাকলে এমন জায়গামতো লাগাম টানা যায়, গ্যালপের লোভ সংবরণ করে...
Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: শেষ ঘোড়্সওয়ার

"মানুষ ফুরিয়ে যাওয়ার পরও পৃথিবী ঘুরে যাবে। "

যাবেই তো! আবার সব হবে মানুষ বাদ দিয়ে, অনিবা। এমনকি তার অশরীরী ঘোড়সওয়ারকেও চাই।

লেখাটি স্বনামে এলো না, খেদ রইল। :/
Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: শেষ ঘোড়্সওয়ার

*টাইপো/ অনিবার্য


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন