Salil Biswas RSS feed

bissal@rediffmail.com
Salil Biswasএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের শিক্ষা দিবস
    গত ১৭ই সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে ‘শিক্ষা দিবস’ ছিল। না, অফিশিয়ালি এই দিনটিকে শিক্ষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি বটে, কিন্তু দিনটি শিক্ষা দিবস হিসেবে পালিত হয়। সেদিনই এটা নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু ১৭ আর ১৯ তারিখ পরপর দুটো পরীক্ষার জন্য কিছু লেখা ...
  • বহু যুগের ওপার হতে
    কেলেভূতকে (আমার কন্যা) ঘুড়ির কর (কল ও বলেন কেউ কেউ) কি করে বাঁধতে হয় দেখাচ্ছিলাম। প্রথম শেখার জন্য বেশ জটিল প্রক্রিয়া, কাঁপকাঠি আর পেটকাঠির ফুটোর সুতোটা থেকে কি ভাবে কতোটা মাপ হিসেবে করে ঘুড়ির ন্যাজের কাছের ফুটোটায় গিঁট বাঁধতে হবে - যাতে করে কর এর দুদিকের ...
  • ভাষা
    এত্তো ভুলভাল শব্দ ব্যবহার করি আমরা যে তা আর বলার নয়। সর্বস্ব হারিয়ে বা যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে যে প্রাণপণ চিৎকার করছে, তাকে সপাটে বলে বসি - নাটক করবেন না তো মশাই। বর্ধমান স্টেশনের ঘটনায় হাহাকার করি - উফ একেবারে পাশবিক। ভুলে যাই পশুদের মধ্যে মা বোনের ...
  • মুজতবা
    আমার জীবনে, যে কোন কারণেই হোক, সেলিব্রিটি ক্যাংলাপনা অতি সীমিত। তিনজন তথাকথিত সেলিব্রিটি সংস্পর্শ করার বাসনা হয়েছিল। তখন অবশ্য আমরা সেলিব্রিটি শব্দটাই শুনিনি। বিখ্যাত লোক বলেই জানতাম। সে তিনজন হলেন সৈয়দ মুজতবা আলী, দেবব্রত বিশ্বাস আর সলিল চৌধুরী। মুজতবা ...
  • সতী
    সতী : শেষ পর্বপ্ৰসেনজিৎ বসু[ ঠিক এই সময়েই, বাংলার ঘোরেই কিনা কে জানে, বিরু বলেই ফেলল কথাটা। "একবার চান্স নিয়ে দেখবি ?" ]-- "যাঃ ! পাগল নাকি শালা ! পাড়ার ব্যাপার। জানাজানি হলে কেলো হয়ে যাবে।"--"কেলো করতে আছেটা কে বে ? তিনকুলে কেউ আসে ? একা মাল। তিনজনের ঠাপ ...
  • মকবুল ফিদা হুসেন - জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য
    বিনোদবিহারী সখেদে বলেছিলেন, “শিল্পশিক্ষার প্রয়োজন সম্বন্ধে শিক্ষাব্রতীরা আজও উদাসীন। তাঁরা বোধহয় এই শিক্ষাকে সৌখিন শিক্ষারই অন্তর্ভুক্ত করে রেখেছেন। শিল্পবোধ-বর্জিত শিক্ষা দ্বারা কি সমাজের পূর্ণ বিকাশ হতে পারে?” (জনশিক্ষা ও শিল্প)কয়েক দশক পরেও, পরিস্থিতি ...
  • আমি সংখ্যা লঘুর দলে...
    মানব ইতিহাসের যত উত্থান পতন হয়েছে, যত বিপদের সম্মুখীন হয়েছে তার মধ্যে বর্তমানেও যা প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে এমন কিছু সমস্যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শরণার্থী সমস্যা। হুট করে একদিন ভূমিহীন হয়ে যাওয়ার মত আতঙ্ক খুব কমই থাকার কথা। স্বাভাবিক একজন পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচে ...
  • প্রহরী
    [মূল গল্প – Sentry, লেখক – Fredric Brown, প্রথম প্রকাশকাল - ১৯৫৪] .......................
  • ইতিহাসের সঙ্কলন, সঙ্কলনের ইতিহাস - একটি বইয়ের প্রেক্ষাপট, উপক্রমণিকা
    ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরামের তরফ থেকে, বেশ কিছু লেখালিখি একসাথে সাজিয়ে, একটা সঙ্কলন প্রকাশিত হলো।নাম, ইতিহাসের সঙ্কলন, সঙ্কলনের ইতিহাস।একটা উদবেগজনক আর দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতিতে আমরা এই বই প্রকাশ করেছি। সত্যি বলতে কি, এই বইয়ের জন্মের কারণই আমাদের উদবেগ, ...
  • সতী
    সতী : প্রথম পর্বপ্রসেনজিৎ বসুমেয়েটা মাসতিনেক হল এসেছে এই পাড়ায়।মেয়ে ? এই হয়েছে শালা এক মুশকিল ! বিয়ের পর মেয়েরা বউ হয়, কিন্তু ডিভোর্সের পর তারা কি বউই থাকে ? নাকি ফের মেয়ে বনে যায় ? জল জমে বরফ হয়। বরফ গললে আবার জল। কিন্তু এক্ষেত্রে ? ডিভোর্সি মহিলারা ঠিক ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ফ্রেইরি চর্চা

Salil Biswas

(‘নিপীড়িতের শিক্ষাবিজ্ঞান’ বইটির ভূমিকা লিখেছিলাম। সেই ভূমিকার নতুন রূপ এই লেখা। আমার ব্যাখ্যা যে সঠিক হবেই, তার মানে নেই। অন্য কেউ অন্য ভাবে ব্যাখ্যা দিতেই পারেন। আলোচনা কথোপকথন যত হবে, ততই ভালো। বিভিন্ন শব্দের বিস্তারিত আলোচনা আগামী দিনে করার ইচ্ছে রইল। এই লেখাটি এই মাসেই 'দুর্বার ভাবনা'-তে ছাপা হবে।
আমার অনুনয়, আসুন তর্ক জুড়ি।)

কোথায় যাবো আমরা আজকের এই নারকীয় পরিস্থিতিতে? সারা দেশের প্রতিটি “সূচ্যগ্র মেদিনী”তেই জারি রয়েছে নরক, রয়েছে শিশুঘাতী নারীঘাতী বিভৎসা। ধিক্কার হানতে পারেন এবং চেষ্টা করেন যে মানুষজন তাঁরা রাষ্ট্রীয় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক পুঁজির লোভাতুর আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। বেচে দেওয়া হচ্ছে গোটা দেশটাকে। সার্বিক আলোচনা আর হাতেকলমে কাজ দরকারি এখন। কিন্তু সে ক্ষমতা বা অধিকার কোনোটাই হয়ত নেই আমাদের। তাই আমরা এখানে কেবল একটা দিকের কথা নিয়ে ব্যাপৃত থাকব। যদিও আমার মনে হয় এই ছোট্ট বিষয়টি সামগ্রিক অন্ধকার কাটাবার চাবিকাঠি বহন করে।
এদেশের শিক্ষার জগত। যেখানে জ্ঞানার্জনের কোনও জায়গা নেই। কোথাও কোথাও ফলাও করে বড় বড় কথার বেসাতী চলে। মুক্ত চিন্তা আর মত প্রকাশের অধিকারের প্রতি সেখানে কেবল মৌখিক সমর্থন বরাদ্দ থাকে। যেখানে পারিপার্শ্বিককে চিনে জেনে বুঝে তার মর্ম-বস্তুকে চেতনায় নিহিত করে, প্রয়োজনে তাতে পরিবর্তন আনার ভাবনা ধাক্কা খায় নানা ধরনের ক্ষমতার প্রাচীরে। যেখানে সব “শিক্ষাদানে”র পিছনে থাকে একটা না একটা আপাত-মহান উদ্দেশ্য। প্রথাগত শিক্ষা দানের কেন্দ্রগুলিতে যেখানে শিক্ষা, সে যেমন ধরনেরই হোক, হয়ে গেছে গৌণ, সেখানে পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছে স্থানীয় মাস্তান। আর যেখানে প্রায় সব কলেজে ভর্তি হতে গেলে গুণ্ডাদের পয়সা দিতেই হবে, ভর্তির জন্য ‘মেধা’ তালিকায় নাম থাকলেও। যেখানে সকলে এই অন্যায়কে মেনে নেয়, “শান্তি” আর নিরাপত্তা কিনতে। যেখানে কলেজের চত্বরে চলে মাদকের চর্চা, চলে আরও বহু রকমের কুৎসিত কাজ। প্রতিবাদীকে মুখোমুখি হতে হয় মিথ্যা “আন্দোলন”-এর। অথবা শারীরিক নির্যাতনের। হোন না তিনি অধ্যক্ষ। যেখানে শিক্ষার হর্তাকর্তারা অনৃতভাষণে পিএইচডি-প্রাপ্ত, যেখানে গুণ্ডাগর্দিকে রক্ষা করাই প্রশাসনের কাজ। সবাই সব জানে, কেউ কিছু বলে না। যখন তাপ্পি মারতে হুংকার ছাড়া হয়, তখনও লুকোনো হাতে থাকে বরাভয়। দলভাই বা দলবোনেরা দাপাদাপি করেও কিছু জায়গায় ঢুকতে পারে না বলে, ভর্তিপরীক্ষা তুলে দেওয়া হয় সেখানে। কিছুতেই কারো কিছু আসে যায় না। সাবেকী লেখাপড়া এখন কেউ করে না। জ্ঞানার্জনের কথা উঠলে লোকে মুচকি হাসে। সেটা আবার কি জিনিস। নতুন রকম পাঠক্রম চালু হচ্ছে, নতুন রকম সময়সূচী। অনেক শিক্ষক চিন্তিত, বেশির ভাগই উদাসীন। পুরো জিনিসটা একটা ঠাট্টা। পরীক্ষা যেমনই হোক, নম্বর বসিয়ে দিলেই তো হয়ে গেল। এটাও সকলের জানা। দুঃস্বপ্নের ফিরিস্তি চালিয়ে যাওয়াই যায়, বিবমিষায় থামতে হয়।
কিন্তু স্বভাব যায় না মরলেও। কিছু লোক এর মধ্যেও স্বপ্ন দেখে যায়। তাদের স্বভাবই এই।
‘দ্য পেডাগজি অব দ্য অপ্রেসড্’ (১৯৬৮/১৯৭০) পুস্তকের সাফল্যের অনেক পরে পাওলো ফ্রেইরি লেখেন “‘দ্য পেডাগজি অব্ হোপঃ রিভিসিটিং ‘দ্য পেডাগজি অব দ্য অপ্রেসড্’’’ (১৯৯২)। এ বই জানায় কেমন করে কোন দিকে এগিয়েছে তাঁর চিন্তা আর কাজ। এই বইতে চিন্তা-মতাদর্শ-কর্মচিন্তা-বাস্তবতাকে ব্যবহার সব মিলে যে ঘনত্ব তা অনেকাংশে ‘দ্য পেডাগজি অব দ্য অপ্রেসড্’ থেকে সহজতর, যদিও মুক্ত আকাশে চিন্তার ডানা মেলার ব্যাপ্তিতে ‘পেডাগজি’-র তুলনা মেলা ভার। ব্রাজিলের সমাজকে অনেকেই বলত (এখনো বলে) ‘সেসপুল’ – আবর্জনার কুণ্ড। সেই আবর্জনার জগতের উত্তরে লিখেছিলেন পাওলো। ‘দ্য পেডাগজি অব দ্য হোপ’। আমরা তো একই নর্দমায় পড়ে আছি। লাভ আছে কিছু, আশার কথা শুনিয়ে? পাওলো যা বলেছিলেন, তার প্রতিধ্বনি করে বলি, আছে বইকি! সত্যি বলতে, এটাই তো আশার কথা বলার জায়গা, এখানেই তো নিয়ে আসতে হবে বিশ্বাসের ছবি। ফ্রেইরি-র শেষ বই 'পেডাগজি অব ফ্রিডম ঃ এথিকস, ডেমক্রেসি, অ্যান্ড সিভিক কারেজ' (১৯৮৫, ইংরেজি অনুবাদ ১৯৯৮)
কিছুদিন আগে কয়েকটি ছেলেমেয়ে আমার কাছে জানতে চায়, প্রথা বহির্ভূত শিক্ষা অথবা যে কোনো রকম শিক্ষা নিয়ে পড়াশুনা করতে হলে কোন কোন বই দিয়ে শুরু করা উচিত। স্বভাবতই পাওলো ফ্রেইরি-র নাম মনে এসেছিল। ইতিপূর্বে ‘মুক্তির জন্য সাংস্কৃতিক প্রয়াস’ নাম দিয়ে পাহাড়ী চৌধুরী অনুবাদ করেছিলেন ‘কালচারাল অ্যাকশন ফর ফ্রিডম’। প্রকাশ করেছিলেন ‘ইন্ডিয়ান পাওলো ফ্রেইরি ইনস্টিটিউট’ যাদের আরো কিছু বই আছে ফ্রেইরি-কে নিয়ে। খুব মৌলিক কোনও কাজ ছিল না সেগুলো। কিন্তু ‘মুক্তির জন্য সাংস্কৃতিক প্রয়াস’ বহুল প্রচার পায়নি।
পরিতাপের বিষয়, পাওলো ফ্রেইরি-কে নিয়ে বিশ্লেষণ-মূলক কাজ এখানে বেশি হয়নি। তাঁর শিক্ষা-তত্ত্বের প্রয়োগও খুব বিস্তারিত ও সংগঠিত ভাবে হয়নি। বিদ্যায়তনের অন্দরে বসে কেউ কেউ কিছু গবেষণা করেছেন নিশ্চয়। কিন্তু পাওলোকে নিয়ে কোনও অর্থপূর্ণ কাজ করতে গেলে চার দেওয়ালের বাইরে তো আসতেই হবে। না হলে মূল ব্যাপারটাই থেকে যাবে অধরা। সমস্যা হল, প্রথা-বহির্ভূত শিক্ষাও এদেশে প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে পড়ে, হয়ে পড়ে চার দেওয়ালে আবদ্ধ। দরকার চিন্তা-ভাবনাকে বাক্সের বাইরে নিয়ে আসা, জানলা দিয়ে বাইরে তাকানো। ‘শিক্ষা ব্যবস্থা’ নামক জরদগবটিকে ভাঙ্গতে হলে, ফ্রেইরি-র শিক্ষা-চিন্তা অধ্যয়ন করা তাই অত্যন্ত জরুরি।
শুভঙ্কর ও তীর্থঙ্কর চন্দ অনুবাদ করেন ‘দ্য পেডাগজি অব দ্য অপ্রেসড’ অল্প দিন আগে। নাম দেন ‘নিপীড়িতের শিক্ষা-বিজ্ঞান’ (শিলচর, তথ্য তক্কো অনু গ্রন্থমালা, ২০১৫)। বইটি, যাকে বলে, পড়তে পায়নি, দ্রুত প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে, শুনেছি দ্বিতীয় সংস্করণের কাজ চলছে। তরুণতর প্রজন্ম আজ ফ্রেইরি-কে নিয়ে ভাবছেন, এটা তারই প্রমাণ। আমি দোকানে বসে নিজের চোখে দেখেছি, বইটি কারা কিনছেন।
১৯৬৭তে প্রকাশিত হয় পাওলোর প্রথম বই ‘এডুকেশন অ্যাজ দ্য প্র্যাকটিস অব ফ্রিডম’ এবং ১৯৬৮তে প্রকাশিত হয় তাঁর সব চাইতে বিখ্যাত বই ‘দ্য পেডাগজি অব দ্য অপ্রেসড’। পাওলো-র শিক্ষা-চিন্তার মূল কথা হল – প্রতিটি মানুষ এক একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন সত্তা যিনি পৃথিবীকে পরিবর্তন করতে পারেন এবং নতুন করে গড়তে পারেন। মানুষের চেতনা রূপ পায় আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি আর তার নিজস্ব পারিপার্শ্বিকের প্রভাবে। বিশ্লেষণী চেতনা মানুষকে ভাবনা থেকে কাজে অগ্রসর হতে শেখায়। শোষকের আরোপিত নৈঃশব্দ্যের সংস্কৃতি নিপীড়ন জারি রাখতে সাহায্য করে এবং মিথ্যা কিছু ভাবনার মধ্যে মানুষকে আটকে রাখে। সেই নৈঃশব্দ্য ভাঙতে পারে একমাত্র শিক্ষা। সেই দিক থেকে শিক্ষাদান একটি নাশকতামূলক কাজ। জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যই হল শিক্ষার্থীর (সেই সঙ্গে শিক্ষকেরও) চেতনায়নের মাধ্যমে বাস্তব জীবনে মুক্তি অর্জনের পথ করে নেওয়া। সমগ্র শিক্ষা-প্রক্রিয়াকে তাই ‘কনশিয়েনটাইজ’ (Conscientize) করতে হবে। শিক্ষার ‘হজমী’ বা ‘ব্যাংকিং’ তত্ত্বকে খারিজ করে কথোপকথন-বিনিময় (ডায়ালজিক বা Dialogic) পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে (শিক্ষাব্রতীকেও) বিশ্লেষণী চেতনা দিয়ে তার বাস্তবকে চিনে নিতে শিখতে হবে। পারিপার্শ্বিকের প্রতিটি উপাদান ও অংশকে ‘সমস্যায়িত’ (Problematize) করে তার ‘সঙ্কেতভেদ’ (Codify / Decodify) করে জানতে হবে কোথায় কী লুকিয়ে আছে। আর এই চিনে নেওয়া মানেই হল বাস্তবকে পাল্টানোর দিকে এক পা এগোনো।
‘কনশিয়েনটাইজ’ শব্দটিকে একটি দীর্ঘ চিন্তন প্রক্রিয়ার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের দিকে এগোনোর পথের সঙ্গে তুলনা করে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। এক দিকে যদি থাকে জ্ঞানার্জন পদ্ধতির (শিক্ষার্থী ও শিক্ষাব্রতী উভয়ে মিলিত ভাবে) চেতনায়ন (Consciousness অর্থে) বা জ্ঞানকে চেতনায় নিহিত করার প্রচেষ্টার আরম্ভ করা ও জারি রাখা, তাহলে অন্য দিকে থাকতে পারে জ্ঞানার্জন পদ্ধতির বিবেকীকরণ (Conscience অর্থে), জ্ঞান ও উপলব্ধিকে বিবেক-এ প্রবিষ্ট করিয়ে নিজেকে ও বাস্তবকে বা বাহ্যিক জগতকে শোষণ ও নিপীড়নের হাত থেকে মুক্ত করার প্রয়াসে ব্রতী হওয়া। একে হয়ত বিবেক-নির্মাণও বলা যায়। শোষণ ও নিপীড়নের কথা বলা হল কারণ তাই সংখ্যা গরিষ্ঠের বাস্তবতা। বাহ্যিক জগত প্রায় সর্বাংশে কোনো না কোনো রকমের শোষণ ও নিপীড়নের করাল ছায়ায় আবৃত। তা যদি নাও হত, জীবনের মৌলিক দ্বন্দ্বকে – যে কোনো ক্ষেত্রে – বুঝতে হলে উল্লিখিত প্রক্রিয়া অবশ্যই অপরিহার্য।
যদিও মূল পর্তুগিজ ভাষায় conscientização শব্দটির মানে to become aware অর্থাৎ সচেতন হয়ে ওঠা। এই ধারণাটিকে বৃহত্তর পরিধি দিয়েছেন ফ্রেইরি তাঁর কথো-বচনে (discourse)। সেই দিক থেকে ‘বিবেক-নির্মাণ’-এর চিন্তা বৈধ। প্রথম প্রান্ত থেকে দ্বিতীয় প্রান্তে আরোহণকে একটি সচেতন, সক্রিয়, চলমান, মতাদর্শগত অগ্রসরতা হয়ে উঠতেই হয়, কোনোভাবেই তা বাইরে থেকে ‘চাপিয়ে’ বা ‘ভরে’ দেওয়া বা ‘আরোপিত’ হতে পারে না। এর মধ্যে কোনও তথাকথিত ‘নৈতিক’ (moralistic) চাপের ব্যাপার নেই, না আছে কোনও ‘পরিচালিত’ (manipulated) হওয়ার সম্ভাবনা। এই প্রক্রিয়া থেকে গঠিত হবে পরিস্থিতির সচেতন মূল্যায়ন করার সক্ষমতা এবং তাকে পরিবর্তন করার তাগিদ সৃষ্টির প্রয়াস। পুরো প্রক্রিয়াটিকে ‘কনশিয়েনটাইজেশন’ বলা যেতে পারে। এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে। ‘পেডাগজি’-তে ‘কনশিয়েনটাইজেশন’-এর ধারণাটি নিয়ে পাওলো যা লিখেছেন, তার আলোতে পাঠক ধারণাটিকে আয়ত্ত করতে পারবেন। তবে মনে রাখতে হবে, পাওলো-র চিন্তা কিন্তু পুরোটাই তত্ত্ব-কর্ম-সমন্বয় (Praxis) নির্ভর, যা কেবল বই পড়ে বোঝা যাবে না।
অনেকে বলতে পারেন পাওলো ফ্রেইরি যেসব কথা বলেছেন, তার কোনটাই সে অর্থে নতুন নয়। তাঁর ভাবনাকে বলা যেতে পারে Syncretic বা সমন্বিত। ফ্রেইরির চিন্তাজগতে মিশেছে সক্রেটিস আর প্লেটো, কার্ল মার্ক্স, ক্যামিলো তোরেস আর চে গেভারা, হুসার্ল আর চোমস্কি প্রভৃতির ভাবনা, মিশে আছে ‘মুক্তির জন্য ধর্মতত্ত্ব’-র মনন। যদিও আমি মনে করি, পাওলো-র চিন্তার মূল ভিত্তি মার্ক্স, এই বহুধার মিশেলই হয়ত পাওলো-র চিন্তাকে অন্যতর শক্তি দিয়েছে। শিক্ষা-ছাত্র-শিক্ষক-জ্ঞানার্জন-মুক্তি সম্পর্কিত ভাবনার ও প্রয়োগ-কর্মের আজ অবধি বহতা স্রোতে যে এক অসামান্য মোড় পাওলো ফ্রেইরি তাঁর চিন্তা দিয়ে নিয়ে এসেছেন, সে বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই।
পাওলো ফ্রেইরি মানুষকে দেখেন স্বাধীন চিন্তাশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবে যিনি তাঁর পারিপার্শ্বিককে ছাড়িয়ে উঠতে পারেন শুধু নয়, তাকে বদলে ফেলে নতুনতর দুনিয়া সৃষ্টি করতেও পারেন। অন্যান্য প্রাণী থেকে মানুষ আলাদা, কারণ যৌক্তিক চিন্তা ও সক্ষম প্রয়াস দ্বারা মানুষ তার দুনিয়ায় এগিয়ে চলতে পারে। চিন্তা মানুষকে জগত সম্পর্কে সচেতন করে বিভিন্ন স্তরের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে। ফ্রেইরি কীভাবে মানুষের চিন্তাস্রোতকে ব্যাখ্যা করেন তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ হবে অনেকটা এই রকম।
প্রথমে মানুষ বিনা প্রতিরোধে জগতের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেন কোনও অধিকতর ক্ষমতাশালী শক্তির চাপে পড়ে, তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী চলতে চলতে গতানুগতিকতার শিকার হয়ে। তখন তাঁরা তাঁদের জীবনে ঘটমান অবিচার প্রসঙ্গে কিছুই বলেন না। নীরব সেই সব মানুষ মাথা নিচু করে থাকেন বিনা প্রতিবাদে। এর পরের ধাপে মানুষ পারিপার্শ্বিকের সমস্যা সম্পর্কে সচেতন হন, কিন্তু সে সব সমস্যার কারণ যে বাইরের জগতে কোনো শক্তিপ্রক্রিয়া থেকে উত্পণ্য সেকথা তাঁরা ধরতে পারেন না। তাঁদের মনে হয় সমস্যাগুলি দেখা দিচ্ছে আচমকা, কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক ছাড়াই। পরের ধাপ বা উচ্চতম পর্যায়ে দেখা দেয় একটি গুণগত পরিবর্তন। মানুষ বুঝতে পারেন যে তাঁদের সমস্যাগুলি বস্তুত সমাজের কাঠামোয় নিহিত। তাঁরা তখন সমাজের আর্থসামাজিক দ্বন্দ্বের সঙ্গে সমস্যাগুলির যোগসূত্র খুঁজে পান, বাস্তবের দিকে খোলা চোখে তাকান, এবং দ্বন্দ্বগুলির বাস্তবতাকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন।
এই পর্যায়ে উপনীত হতে সাহায্য করবে পাওলো ফ্রেইরির শিক্ষা পদ্ধতি। বিস্তারিত পদক্ষেপগুলো কী হবে তা বিভিন্ন জায়গায় পাওলো নিজে লিখে বুঝিয়েছেন এবং বিভিন্ন কথোপকথনে বিধৃত করেছেন।
ফ্রেইরি তাঁর ভাবনা-চিন্তায় জগতের ব্যাখ্যা শ্রেণী-বিশ্লেষণের মাধ্যমে না করে, করেন নিপীড়নের বিভিন্ন ধারা বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে। এই বিশ্লেষণ নানা ধরনের পরিস্থিতিতেই প্রয়োগ করা যেতে পারে। তাঁর বর্ণনায় কোনও বিশেষ দলের রাজনৈতিক চিন্তা প্রাধান্য পায় না। তাঁর চেতনা-উত্তরণের পদ্ধতি বলে যে প্রত্যেক মানুষকে নিজের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জগতের ধারণাকে নিজেই খুঁজে বার করতে হবে; তাই তাঁর কর্তৃত্ববাদ-বিরোধী ভাবনা নতুন কোনও সমাজ ব্যবস্থার একক কোনও চিত্র তুলেও ধরতে দেয় না। এই কারণে কট্টরপন্থী মার্ক্সবাদীরা অনেক ক্ষেত্রে তাঁর বিরোধিতা করেছেন। সমস্ত কিছু পার্টির নেতৃত্বে ঘটবে এই ধরণের যান্ত্রিক চিন্তা থেকে তাই অনেক সময় উদ্ভূত হয়েছে নিপীড়িতের শিক্ষা-চিন্তার ভ্রান্ত ব্যাখ্যা। মনে রাখতে হবে, সাম্যবাদী ভাবনার মূল চিন্তনের সঙ্গে ফ্রেইরি-র চিন্তার কোনও বিরোধ তো নেই-ই, মূলত আছে সাযুজ্য।
পাওলোর শিক্ষা-চিন্তায় ‘নৈঃশব্দ্যের সংস্কৃতি’ ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিপীড়ক তার শোষণ-ভিত্তিক ‘সংস্কৃতি’, মূল্যবোধ আর আদর্শ দিয়ে নিপীড়িতকে এমন অভিভূত করে যে তাকে নীরবতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়তে হয়। এই নৈশব্দের সংস্কৃতিকে ভেঙে ফেলতে হবে, যা ভাঙ্গতে হলে চাই উচ্চতম পর্যায়ে চেতনার উত্তরণ। এই নৈঃশব্দ্যের বিভিন্ন রূপ প্রতিনিয়ত আমাদের চোখে পড়ে, কিন্তু সে বিষয়ে সম্যক ধারণা আমাদের থাকে না। এই নৈঃশব্দ্যে আচ্ছন্ন প্রান্তিক মানুষ হীনমন্যতায় ভুগতে ভুগতে এক সময় মাথা নিচু করে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন এবং মনন ও প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে জীবন ও পারিপার্শ্বিককে বদলে ফেলার ক্ষমতার কথা বিস্মৃত হন। পাওলো এই নৈঃশব্দ্যের বাহ্যিক প্রকাশ, কারণসমূহ এবং তত্ত্বগত সূত্রগুলিকে একত্রে উপস্থাপিত করেছেন। সব চাইতে বড় কথা, তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে এই নৈঃশব্দ্যকে খণ্ডন করা যেতে পারে, কীভাবে ‘মূক’ মুখে ভাষা জোগানো যেতে পারে, অথবা, সাহায্য করা যেতে পারে উচ্চারণ-হীনতা থেকে সরব হয়ে উঠতে।
‘এই ধন কেহ নাহি নিতে পারে কেড়ে’, ‘বিদ্যারত্ন মহাধনম্’, ‘অনেক পড়েছে, কিন্তু হজম করতে পারেনি’, ‘জ্ঞানভাণ্ডার’, প্রভৃতি কথাগুলিকে একত্র করা যায় শিক্ষার ‘হজমী তত্ত্ব’-র আওতায়। এই তত্ত্বকে ভুলে যেতে হবে, ভুলে যেতে হবে শিক্ষার ‘ব্যাংকিং তত্ত্ব’কেও। মনে রাখতে হবে ব্যাংকে শিক্ষকের জ্ঞান জমা রাখার সেভিংস বা কারেন্ট অ্যাকাউন্ট নেই, যেখান থেকে তিনি অল্প অল্প জ্ঞান বিতরণ করবেন শিক্ষার্থীদের মধ্যে। মনে রাখতে হবে শিক্ষার্থীরা থলে নয় যাকে শিক্ষক ‘শিক্ষা’ নামক বস্তুসম্ভার দিয়ে ভরে দেবেন। শিক্ষার্থীরা এক একটি পাকস্থলীও নয় যা ‘শিক্ষা’ নামক খাদ্যদ্রব্য দিয়ে মাস্টার মশাই ঠেসে ভরে দেবেন। এইসব চিরাচরিত, সোজা কথায়, জন-বিরোধী ধারণা নিপীড়কের হাতের ‘অ-নিগ্রহী’ বা ‘নন-কোয়ারসিভ’ (non-coercive) অস্ত্র ছাড়া কিছুই নয়। জ্ঞানার্জন কখনই এই ধরণের শিক্ষাভাবনার অঙ্গ হতে পারে না। কিন্তু আমাদের গোটা বিদ্যায়তন ব্যবস্থাই চলছে এই শিক্ষাভাবনার বশবর্তী হয়ে। স্বভাবতই শিক্ষার্থীরা হাঁ-ও করে না, হুঁ-ও করে না। আর আমরা হা হুতাশ করে চলি, এদেশে কেউ কিছু শিখছে না কেন।
নৈঃশব্দ্যের অবসান ঘটানোর প্রথম পদক্ষেপ হল চেতনার বিকাশ। সেই বিকাশের জন্য বিশ্লেষণী চেতনা দিয়ে বাস্তবকে চিনে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। পারিপার্শ্বিকের প্রতিটি উপাদান ও অংশকে ‘সমস্যায়িত’ (Problematize) করতে হবে। ফ্রেইরি দেখিয়েছেন কেমন করে। দৈনন্দিন কোনও পরিস্থিতিকে, কোনও পরিচিত বস্তুকে, কোনও ঘটনাকে একটি ‘কোড’-এর (Code) আকার দিয়ে, সেই সঙ্কেত-এর পাঠোদ্ধার বা সঙ্কেত-ভেদ বা ‘ডিকোড’ (Decode) করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় কথোপকথনের মধ্য দিয়ে নতুন করে পারিপার্শ্বিককে জানার মাধ্যমে নতুন সমাজ-চেতনা, নতুন জাগরণ, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠবে। এমন যে হতে পারে তা হাতেকলমে করে দেখিয়েছেন ফ্রেইরি। শিক্ষক – যাঁকে এই পরিসরে ‘শিক্ষাব্রতী’ বলাই অধিকতর সমীচীন হবে – সেখানে হবেন সহায়ক, ভাবনাটা তিনি শুধু ধরিয়ে দেবেন, জ্ঞানার্জনের বাকি প্রক্রিয়া থাকবে পুরোপুরি শিক্ষার্থীর মন ও বুদ্ধি সঞ্চালনে জড়িত। ব্যাপক কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে পাওলো এই তত্ত্বকে কাজে পরিণত করেছিলেন, যে কাজের অনুরণন আজও দেশেবিদেশে শিক্ষাব্রতীদের সশস্ত্র করে তোলে।
এই কলকাতাতেই আমরা কয়েকজন মিলে এই পদ্ধতি বাস্তব প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করে অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে দেখেছিলাম কতটা সাফল্যের সঙ্গে জ্ঞানার্জনের পরিস্থিতির সৃষ্টি করা যায়। নানা কারণে আমাদের সেই প্রয়াস ব্যাহত হয়েছিল। কিন্তু সম্পূর্ণ ব্যর্থ যে হয়নি তার প্রমাণ পেয়েছিলাম বেশ কিছুদিন পরে এক ছাত্রের সঙ্গে দেখা হওয়ায়। ছেলেটির কথায় আর কাজের মধ্যে দেখেছিলাম, বিশ বছর পরেও সেই সময় তার মনে জেগে ওঠা ভাবনা অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও হারিয়ে যায়নি।
এই কয়েক সপ্তাহ আগে, একটি সমাগমে বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ এবং চিন্তাশীল শিক্ষাবিদের সাহচর্য পাবার সুযোগ ঘটেছিল। সেখানে আমাকে এক মহা আনন্দের চমক দিয়েছিলেন উদ্যোক্তারা। আমার আশ্চর্য চোখের সামনে মঞ্চে উঠে এসেছিল দুটি কিশোরী তাদের বাবার হাত ধরে, গাইতে শুরু করেছিল ৩৫ বছর আগে সুইনহো লেন শিক্ষাকেন্দ্রে চর্চিত একটি গান। “সবকিছুতে বসায় ভাগ যারা তাদের জন্য / মানুষ নাম রেখো না বন্ধু দাও কোনও নাম অন্য" (কথা ও সুর - সবিতা বিশ্বাস)। আমরা যখন ফ্রেইরি-র ভাবনাকে প্রয়োগ করেছিলাম, তখন আমাদের কাজ ছিল যথেষ্ট অপটু। কিন্তু তৎসত্ত্বেও সেই প্রয়োগের যাথার্থ এই দুই কিশোরী আর তাদের জনকের স্মৃতি আর কাজ থেকেই প্রমাণিত হয়।
‘দ্য পেডাগজি অব দ্য অপ্রেসড্’ বই-তে পাওলো ফ্রেইরি তাঁর শিক্ষা-চিন্তার প্রায় পূর্ণাঙ্গ দার্শনিক প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছেন, যদিও যত দিন গেছে সে চিন্তা বিকশিত হয়ে পূর্ণাঙ্গতর হয়েছে। সেই চিন্তা ও তার প্রসার নিয়ে আলোচনা চলছেই।
সাম্প্রতিক অতীতে আবার আমরা ফ্রেইরি-র পদ্ধতি প্রয়োগ করার সুযোগ পাই অল্প দিনের জন্য। শ্রমজীবী হাসপাতালের উদ্যোগে ২০১৩র মার্চে প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রমজীবী বিদ্যালয়। ফ্রেইরি-র পদ্ধতি পুনরায় প্রয়োগ করার সুযোগ পাবার এবং দীর্ঘমেয়াদী পরীক্ষা চালিয়ে যাবার আশায় আমরা যোগ দিয়েছিলাম সেই প্রয়াসে। “অল্প দিনের জন্য” বললাম, কেননা এই পদ্ধতি প্রয়োগ আর তার ফলশ্রুতি বোঝার জন্য তিন/চার বছর যথেষ্ট নয়। আশা ছিল গড়ে উঠবে শ্রমজীবী শিক্ষার একটা কাঠামো। নানান কারণে তা শেষ অবধি ঘটেনি। আমরা যারা তথাকথিত শিক্ষাব্রতী হিসাবে কাজে লেগেছিলাম, তাদের নিঃসন্দেহে অনেক ত্রুটি ছিল। কিন্তু কেবল নিজেদের কাজ ত্রুটিপূর্ণ ছিল বললে আমরা হয়ত নিজেদের প্রতি অবিচারই করে ফেলব।
একটা কথা এখানে না উল্লেখ করলে শ্রীরামপুরের শ্রমজীবী বিদ্যালয়ের ছাত্রদের (এখানে কোনো লিঙ্গভেদ করা হচ্ছে না) প্রতি অবিচার করা হবে। ফ্রেইরির পদ্ধতির প্রয়োগে প্রার্থিত ফল পাওয়া যায়নি আমাদের ঘাটতির ফলে। কিন্তু কোনো ফল পাওয়া যায়নি এমন কথা বলা যাবে না। ছাত্ররা নীরব থাকার অভ্যাস থেকে মুক্ত হয়েছিল। যুক্তি প্রয়োগ করতে শিখছিল তারা। সব চাইতে বড় কথা, প্রতিযোগিতামূলক ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা শুরু করেছিল। একা কোনো দৌড়ে জেতার চাইতে সাথীদের নিয়ে একত্রে লক্ষ্যে পৌঁছনো যে অধিকতর কাম্য, এই বোধ জন্মাচ্ছিল তাদের ভিতরে। একথা আমি বিশ্বাস করি। কেউ মানুন বা না মানুন। মাধ্যমিকে আরও ভালো ফল তারা কেন করেনি, এই সমালোচনা যাঁরা করবেন, তাঁদের বলব, আমরা কি তাদের মুখস্থবিদ্যা থেকে দূরে থাকতে বলিনি বারে বারে? মুখস্থও করবে না, অথচ গতানুগতিক পরীক্ষায় ভালো করবে, এটা কি খুব যুক্তিযুক্ত দাবী?
মনে রাখা দরকার আছে, এই “মাধ্যমিক” “উচ্চমাধ্যমিক” “জয়েন্ট এনট্রানস” আগড়ম-বাগড়ম যেখানে চলে, সেখানে আর যাই হোক, জ্ঞানার্জন বস্তুটির হদিশ পাওয়া যায় না। সমাজতান্ত্রিক মানুষ গড়ে তুলবার আকাশকুসুম নির্মাণ নয়, শ্রমজীবী চিন্তা-চর্চা আর কৌম-ভাবনায় দীক্ষিত শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনের কেন্দ্র গড়ে তোলার সীমিত আশা নিয়ে আমরা যদি অগ্রসর হতে পারি তাহলেই এখানে সার্থক ফ্রেইরি-চর্চা আপাতত সমাধা হতে পারে।
--------------------------------------------
conscientização (কঁসিচিযাঃসাও বা এই রকম কিছু।) ইন্টারনেটে কানে শুনে এই উচ্চারণ মনে হল।

1 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন