Sumit Roy RSS feed

Sumit Royএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • শেষ ঘোড়্সওয়ার
    সঙ্গীতা বেশ টুকটাক, ছোটখাটো বেড়াতে যেতে ভালোবাসে। এই কলকাতার মধ্যেই এক-আধবেলার বেড়ানো। আমার আবার এদিকে এইরকমের বেড়ানোয় প্রচণ্ড অনীহা; আধখানাই তো ছুটির বিকেল--আলসেমো না করে,না ঘুমিয়ে, বেড়িয়ে নষ্ট করতে ইচ্ছে করে না। তো প্রায়ই এই টাগ অফ ওয়ারে আমি জিতে যাই, ...
  • পায়ের তলায় সর্ষে_ মেটিয়াবুরুজ
    দিল ক্যা করে যব কিসিসে কিসিকো প্যার হো গ্যয়া - হয়ত এই রকমই কিছু মনে হয়েছিল ওয়াজিদ আলি শাহের। মা জানাব-ই-আলিয়া ( বা মালিকা কিশওয়ার ) এর জাহাজ ভেসে গেল গঙ্গার বুকে। লক্ষ্য দূর লন্ডন, সেখানে রানী ভিক্টোরিয়ার কাছে সরাসরি এক রাজ্যচ্যুত সন্তানের মায়ের আবেদন ...
  • ফুটবল, মেসি ও আমিঃ একটি ব্যক্তিগত কথোপকথন (পর্ব ৩)
    ফুটবল শিখতে চাওয়া সেই প্রথম নয় কিন্তু। পাড়ার মোড়ে ছিল সঞ্জুমামার দোকান, ম্যাগাজিন আর খবরের কাগজের। ক্লাস থ্রি কি ফোর থেকেই সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়তাম হি-ম্যান আর চাচা চৌধুরীর কমিকস আর পুজোর সময় শীর্ষেন্দু-মতি নন্দীর শারদীয় উপন্যাস। সেখানেই একদিন দেখলাম ...
  • ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি
    অনেক সকালে ঘুম থেকে আমাকে তুলে দিল আমার ভাইঝি শ্রী। কাকা দেখো “ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি”। একটু অবাক হই। জানিস তুই, কাকে বলে ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি? ক্লাস এইটে পড়া শ্রী তার নাকের ডগায় চশমা এনে বলে “যে বৃষ্টিতে ইলিশ মাছের গন্ধ বুঝলে? যাও বাজারে যাও। আজ ইলিশ মাছ আনবে ...
  • দুখী মানুষ, খড়ের মানুষ
    দুটো গল্প। একটা আজকেই ব্যাংকে পাওয়া, আর একটা বইয়ে। একদম উল্টো গল্প, দিন আর রাতের মতো উলটো। তবু শেষে মিলেমিশে কি করে যেন একটাই গল্প।ব্যাংকের কেজো আবহাওয়া চুরমার করে দিয়ে চিৎকার করছিল নীচের ছবির লোকটা। কখনো দাঁত দিয়ে নিজের হাত কামড়ে ধরছিল, নাহলে মেঝেয় ঢাঁই ...
  • পুরীযাত্রা
    কাল রথের মেলা। তাই নিয়ে আনন্দ করার বয়স পেরিয়ে গেছে এটা মনে করাবার দরকার নেই। তবু লিখছি কারণ আজকের সংবাদপত্রের একটি খবর।আমি তাজ্জব কাগজে উকিলবাবুদের কান্ডকারখানা পড়ে। আলিপুর জাজেস কোর্ট ও পুলিশ কোর্টে প্রায় কোন উকিলবাবু নেই, দু চারজন জুনিয়র ছাড়া। কি ...
  • আমার বন্ধু কালায়ন চাকমা
    প্রথম যৌবন বেলায় রাঙামাটির নান্যাচরের মাওরুম গ্রামে গিয়েছি সমীরণ চাকমার বিয়েতে। সমীরণ দা পরে শান্তিচুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ’র সঙ্গে যুক্ত হন। সেই গ্রুপ ছেড়েছেন, সে-ও অনেকদিন আগের কথা। এরআগেও বহুবার চাকমাদের বিয়ের নিমন্ত্রণে গিয়েছি। কিন্তু ১৯৯৩ সালের শেষের ...
  • শুভ জন্মদিন শহীদ আজাদ
    আজকে এক বাঙ্গালি বীরের জন্মদিন। আজকে শহীদ আজাদের জন্মদিন। মাগফার আহমেদ চৌধুরী আজাদ। মুক্তিযুদ্ধে ঢাকার কিংবদন্তীর ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য, রুমির সহযোদ্ধা এবং অবশ্যই অবশ্যই মোসাম্মাৎ সাফিয়া বেগমের সন্তান। শহীদ আজাদ হচ্ছেন এমন একজন মানুষ যার কথা বলতে গেলে ...
  • রামায়ণ, ইন্টারনেট ও টেনিদা (পর্ব ২)
    ঘুগনীটা শেষ করে শালপাতাটা আমার দিকে এগিয়ে টেনিদা বললে, "বলতো, রামায়ণ কাকে নিয়ে লেখা?"আমি অনেকক্ষণ ধরে দেখছিলাম শালপাতায় কোণায় এককুচি মাংস লেগে আছে। টেনিদা পাতাটা এগোতেই তাড়াতাড়ি করে কোণে লেগে থাকা মাংসের কুচিটা মুখে চালান করে দিয়ে বললুম, "কেন, রামচন্দ্রকে ...
  • এক উন্মাদ সময়ের স্মৃতিকথন
    দেশভাগ, বাটওয়ারা, পার্টিশান – উপমহাদেশের চুপচুপে রক্তভেজা এক অধ্যায় নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা, নির্মম কাটাছেঁড়া এই সবই ভারতে শুরু হয় মোটামুটি ১৯৪৭ এর পঞ্চাশ বছর পূর্তির সময়, অর্থাৎ ১৯৯৭ থেকে। তার আগে স্থাবর অস্থাবর সবকিছু ছেড়ে কোনওমতে প্রাণ নিয়ে পালানো মানুষজনও ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

নারীবাদ নিয়ে ইমরান খানের বক্তব্য ও নারীবাদে মাতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক

Sumit Roy

সম্প্রতি একটা খবর পড়লাম। পাকিস্তান তেহরিক ই ইনসাফ এর নেতা ও পাকিস্তান দলের সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খান বলেছেন, তিনি পশ্চিমাদের থেকে আমদানি করা নারীবাদ সমর্থন করেন না। তার নারীবাদকে সমর্থন না করবার কারণও তিনি জানান, তার মতে নারীবাদ মাতৃত্বের মর্যাদাকে ছোট করে। তিনি বলেন, "একজন ব্যক্তির জীবনে তাঁর মায়ের ভূমিকা অনেক। সত্যিকারের মা তিনিই, যিনি এই ভূমিকা কার্যকরভাবে রাখতে পারেন। আমি একেবারেই পশ্চিমাদের নারীবাদী আন্দোলনকে সমর্থন করি না। এটা মাতৃত্বের মর্যাদা খর্ব করে। যখন আমি বেড়ে উঠছিলাম, তখন আমার ওপর আমার মায়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি ছিল।"

ইমরান খানের এই কথার সমালোচনাও আসছে অনেক। আব্বাস নাসির নামে একজন টুইটে বলেন, নারীবাদ নিয়ে ইমরান খানের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রমাণিত হয় যে এই ইস্যুতে তাঁর বোঝাপড়ার অভাব রয়েছে। আমিন বুচা বলেন, নারীবাদীরা মাতৃত্বের মর্যাদা খর্ব করে না বরং তাঁরা মাতৃত্বের অধিকার নিয়ে কথা বলেন। শিশুদের জন্য দিবাযত্নকেন্দ্র, মাতৃত্বজনিত ছুটি, প্রসবোত্তর অধিকার, শিশুদের লালন-পালনের জন্য অধিকার নিয়ে নারীবাদীরা কথা বলেন।

যাই হোক, মাতৃত্ব নিয়ে একজন পলিটিশিয়ানের এরকম অবস্থান নতুন কিছু নয়, রাজনৈতিকভাবে এটার সূত্রপাত আরও অনেক পূর্বে। আর এই মাতৃত্ব নিয়ে নারীবাদেও বিতর্ক কম হয় নি। এই প্রবন্ধে এসব নিয়েই লেখার চেষ্টা করব।

নারীবাদের কিছু ধারা মাতৃত্বকে নারীর স্বার্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে দেখেছে, আবার কিছু ধারা দেখেছে প্রয়োজনীয় হিসেবে। মাতৃত্বের বিপক্ষের নারীবাদ নিয়ে বললে মার্ক্সীয় নারীবাদ, সমাজতান্ত্রিক নারীবাদ নিয়ে কিছু বলতে হয়। ১৮৮৪ সালে প্রকাশিত ফ্রেডরিক এঙ্গেলস এর লেখা গ্রন্থ "দি অরিজিন অফ দ্য ফ্যামিলি, প্রাইভেট প্রোপারটি এন্ড দ্য স্টেট"-এ প্রথম মার্ক্সীয় নারীবাদের ধারণা পাওয়া যায়। এঙ্গেলস বলেন, উৎপাদনের কেন্দ্র যতদিন নারীর হাতে ছিল, ততদিন নারীর প্রাধান্য ছিল। উৎপাদন স্থল পরিবর্তিত হলে নারীর প্রাধান্যও লুপ্ত হল। মাতৃতন্ত্রের অবসানের পর সম্পত্তি ও নারীর উপর পুরুষের ব্যক্তিমালিকানা রীতি প্রতিষ্ঠিত হলে নারী পরাধীন হয়ে পড়ে।

মারগারেট বেনস্টন ও পেগি মরটনদের মত মার্ক্সিস্ট ফেমিনিস্টরা বলেন, ক্যাপিটালিস্ট সিস্টেমে দুই ধরণের শ্রম থাকে- একটি হল প্রোডাক্টিভ বা উৎপাদনশীল, যেক্ষেত্রে ক্যাপিটালিস্ট সিস্টেমে এর উৎপাদিত পণ্য বা সেবার একটা আর্থিক মূল্য থাকে। আরেকটি হল রিপ্রোডাক্টিভ বা পুনরুৎপাদনশীল। এই শ্রমের মধ্যে সেইসব শ্রম পড়বে, যেগুলো মানুষ তাদের নিজেদের জন্যই করে এবং সেখানে মজুরি পাবার কোন আকাঙ্ক্ষা থাকে না (যেমন ঘর পরিষ্কার করা, রান্না করা, সন্তান পালন করা)। দেখা যায়, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় পাবলিক ও প্রাইভেট উভয় ধরণের সংস্থার স্বার্থেই শ্রমশক্তিকে খুব সস্তায় সাপোর্ট করার জন্য নারীর শ্রমকে কোনরকম মজুরি ছাড়াই ব্যবহার করা হয় ও নারীকে শোষণ করা হয়। নিউক্লিয়ার বা একক পরিবারে যে পাওয়ার ডাইনামিক্স দেখা যায় তাতে গৃহস্থালী সমস্ত কাজই নারীর দ্বারা করানো হচ্ছে, আর এর মাধ্যমে পুরুষকে ঘরের কাজকর্ম থেকে মুক্ত রাখা হচ্ছে যাতে তাদের দ্বারা প্রয়োজনীয় উৎপাদনশীল কাজ করা যায়। অধিক মুনাফার আশায় পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা এরকম পাওয়ার ডাইনামিক্সকে নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। মার্ক্সীয় নারীবাদীদের মতে, উৎপাদনশীল শ্রম থেকে নারীদেরকে বঞ্চিত করে প্রাইভেট, পাবলিক উভয় ক্ষেত্রেই পুরুষ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করা হয়। এভাবে নারীদেরকে মাতৃত্ববাদের মতাদর্শে (মার্ক্সিস্ট থিওরিতে আইডিওলজি বা মতাদর্শ একটি নেতিবাচক বিষয়, যা জনগণের মধ্যে একরকম ইনভারটেড রিয়ালিটি তৈরি করে তাদেরকে বিভ্রমের মধ্যে রাখে) রাখা হয় যাতে অধিকতর মুনাফা নিশ্চিত করা যায়।

রেডিকেল ফেমিনিস্টরাও নারীর মাতৃত্বের সংস্কৃতির বিরোধিতা করেন। রেডিকেল নারীবাদ পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান চায়। তারা বলেন পিতৃতন্ত্রিক সামাজিক ব্যবস্থায় নারীদেরকে মা হতেই আশা করা হয়। আশা করা হয় যে তারা সন্তান ধারণ করবেন এবং লালন পালন করবেন। আর এর মাধ্যমে পিতৃতন্ত্র নারীকে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী করে রাখে। তাদের মতে, মাতৃত্বকে পিতৃতন্ত্রের দ্বারা, সমাজের দ্বারা মহিমান্বিত করার ব্যাপারটা পরিবার গঠনের পর থেকেই চলে আসছে। পরিবার প্রথা ছিল পিতৃতন্ত্রের প্রধান ভিত। পিতৃতন্ত্র তাই চেয়েছে যেভাবেই হোক পরিবার যেন স্থিতিশীল থাকে, আর এভাবেই পরিবারের স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির জন্য মাতৃত্বকে মহিমান্বিত করা হয়, এজন্য ব্যবহার করা হয় ধর্ম, আইন ইত্যাদি বিধান, বানানো হয় অনেক গল্প, কাহিনী, পুরাণ যা এই মাতৃত্বকে করে মহিমান্বিত।

এখানে মাতৃত্ব বলতে নারীত্বের কিছু বিশেষ দিক যেমন স্বামীর ইচ্ছায় একটার পর একটা সন্তানের জন্ম দিয়ে নিজের সময়ের একটা বড় অংশ নষ্ট করা, সন্তান প্রতিপালনের জন্য ও তার সাথে সম্পর্কিত সংসার সামলানোর জন্য একটা বড় রকমের এফোর্ট ও সময় দেয়া, বয়স্ক মহিলাকে পরিবারে মাতৃত্বের একটা কালচার মেইনটেইন করা ইত্যাদি বোঝাচ্ছি। তবে একে যদি আরও স্বাভাবিকীকৃত বা জেনারালাইজ করা হয়, তাহলে মাতৃত্বের সাথে কিছু নারীসুলভ বৈশিষ্ট্য যোগ হয়, যেগুলোতে নারীরা পুরুষের থেকে বেশি পারদর্শী হয়। এখানেই আসে আরেক ধারার নারীবাদের প্রসঙ্গ, যার নাম লিবারাল নারীবাদ। লিবারাল নারীবাদী হেরিয়েট টেইলর নারীকে কম সন্তান নিতে বলেছিলেন, যাতে তারা বাইরে কাজ করতে পারে। তিনি মাতৃত্বকে শোষণমূলক বলে মনে করলেও, সাথে সাথে এটাও স্বীকার করেন যে মাতৃত্ব হচ্ছে নারীর একটি প্রাকৃতিক প্রবণতা। আরেকজন লিবারাল নারীবাদী বেটি ফ্রিয়েডান বলেন, নারীরা একই সাথে মা ও একজন চাকুরিজীবী হতে পারেন। সমাজে নারীর মাতৃত্বকে অতিমূল্যায়িত করা হয় যার কারণে নারীরা তাদের পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা দেখাতে পারে না। অবশ্য পরে তিনি তার চিন্তাকে একটু এডিট করেছিলেন। দ্য সেকেন্ড স্টেজ গ্রন্থে তিনি বলেন, নারীদের থেকে যদি একই সাথে মাতৃত্ব ও পেশাদারিত্ব আশা করা হয় তাহলে তাদেরকে নতুন একরকমের শোষণের মুখে ঠেলে দেয়া হবে। এর সমাধান হিসেবে তিনি বলেন, নারীর পুরুষের সাথে পার্টনারশিপ প্রয়োজন, যাতে তারা দুজনে মিলেই একই সাথে পুরুষত্ব ও নারীত্বের ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করতে পারে, এক্ষেত্রে সন্তানের বাবা ও মা উভয়কেই সমানভাবে সন্তান পালনে অংশগ্রহণ করতে হবে, আর এভাবেই নারীর উপর থেকে একই সাথে মা ও পেশা নিয়ে সুপারউইমেন হবার চাপ কমবে।

নারীবাদের আরেকটি ধারা নিয়ে বলা যায়, যার নাম হচ্ছে ম্যাটারনালিস্ট ফেমিনিজম বা মাতৃত্ববাদী নারীবাদ। এই ধারার নারীবাদীগণ মাতৃত্বকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে, এবং তারা মনে করেন, মা ও কেয়ারগিভার হিসেবে একজন নারীর সমাজ ও রাজনীতিতে অবদান রাখবার মত আলাদা ভূমিকা রয়েছে, মাতৃত্বের প্রাকৃতিক প্রবণতার জন্যই নারীরা সমাজে এই বিষয়ে অবদান রাখতে সক্ষম। এটা নিয়ে পরে আসছি।

যাই হোক, এতক্ষণ ধরে মাতৃত্ব সম্পর্কে নারীবাদের বিভিন্ন ধারার কথা বললাম। এবার একটু রাজনীতিতে যাওয়া যাক। মাতৃত্ব নিয়ে পলিটিক্সে দুই ধরণের এপ্রোচ আমরা দেখি, এক হল লিবারাল বা উদারনৈতিক, আরেক হল রক্ষণশীল বা কনজারভেটিভ। এদুটোতে যাবার আগে, মাতৃত্বের পলিটিক্সের ইতিহাসের দিকে একটু যাওয়া দরকার বলে মনে করি।

তখন ঊনবিংশ শতাব্দির শেষের দিক এবং বিংশ শতকের শুরুর দিক। যুক্তরাষ্ট্রে এই সময়টাকে প্রোগ্রেসিভ ইরা বলে। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে এমন একটা পরিবর্তন শুরু হয় যা আগে কখনও দেখা যায় নি। এসময় যুক্তরাষ্ট্রে শিল্পায়ন অনেক বৃদ্ধি পায়, গ্রাম থেকে প্রচুর মানুষ শহরে আসতে শুরু করে। আর এতে গ্রাম থেকে শহরে আসা পরিবারগুলোর কাঠামোও বদলাতে শুরু করে। টিকে থাকার লড়াইয়ের জন্য নারীদেরকে কাজে যোগদান করতে হয়, ব্যস্ত থাকতে হয়, এসবের ফলে দেখা যায় মাতৃত্ব ও নারীত্বের যে চিরাচরিত ভূমিকা ছিল তা আর আগের মত নেই। কৃষিভিত্তিক সমাজে নারী নির্যাতনের ব্যাপারটা আগেও ছিল, শিল্পভিত্তিক সমাজেও সেটা তেমনি আছে, কিন্তু শিল্পভিত্তিক সমাজে নারীর স্বাবলম্বী হবার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেড়ে যাওয়ায় নারীদের কাছে পরিবার ছেড়ে চলে যাবার একটা উপায় তৈরি হয়। কাজ করার ও শহুরে জীবনে সংসার চালানোর জন্য যে এখন বাড়তি চাপ যুক্ত হয় তার জন্য বেশি সন্তান নেবার প্রবণতা কমে যায়। এসব কারণেই সেসময়ে পরিবারের কাঠামোয় অনেক পরিবর্তন দেখা যায়।

দেখা গেল, আগে যেখানে ডিভোর্স রেট ছিল প্রতি ১,০০০ বিবাহে ১.৫টি, সেটা এবার পরিবর্তিত হয়ে আসল প্রতি ১,০০০ বিবাহে ৭.৭টি, ফারটাইলিটি রেট কমে গেল শৎকরা ৫০ ভাগ, প্রতি পরিবারে গড়ে সন্তান সংখ্যা ছিল ৭.৪ জন, এবারে সেটা কমে দাঁড়ালো ৩.৫ জনে। এই স্ট্যাটিস্টিক্সটা দেখেই বোঝা যায়, পরিবর্তন কতটা বৈপ্লবিক ছিল। এখানে এটা বিবেচনায় নিতে হবে যে এটা কেবল শহুরে পরিবারের পরিবর্তনের স্ট্যাটিস্টিক্স না, গোটা যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যাটিস্টিক্স। ১৯০০ সালেও যুক্তরাষ্ট্রে গ্রাম কম ছিল না, এই সব গ্রামের ট্রেডিশনাল ফ্যামিলি স্ট্রাকচার নিয়ে এরকম পরিবর্তন ধরা পরে, কেবল শহরে তৈরি হওয়া নতুন পারিবারিক কাঠামোর অবস্থা তখন কিরকম হতে পারে তা আপনারা এখান থেকে ধারণা করে নিন।

কনজারভেটিজম আর লিবারেলিজম এর মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করলে দেখা যায় কনজারভেটিভরা সমাজের চিরাচরিত অবস্থাটা রক্ষা করার একটা চেষ্টা করে, যেকোন ধরণের পরিবর্তনকে তারা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য একটা হুমকি হিসেবে দেখে। এই আইডিওলজির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা সামষ্টিক মূল্যবোধে একটি বিশেষ মর্যাদা দেয় যা লিবারেলিজমে কম দেখা যায়। এই সমষ্টি বা দল শুধু ধর্মভিত্তিকই যে হতে হবে এমন কোন কথা নেই, সংস্কৃতি, জাতিসত্তা, ক্যাস্ট, বর্ণ, ইথনিসিটি, রেজিওনালিজম, অর্থনীতি সহ আরও অনেক বিষয়ে হতে পারে, এমনকি জেন্ডার বা লিঙ্গের ক্ষেত্রেও এটা কাজ করতে পারে। লিবারেলিজমে দলের চেয়ে ব্যক্তির স্বাধীনতা, ব্যক্তির অধিকার, ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান নিশ্চিত করা, ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করা এগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়, কিন্তু কনজারভেটিভদের কাছে ব্যক্তির চেয়ে যেন সমষ্টি, সমষ্টির চিন্তাধারা, সামষ্টিক অনুভূতি, মূল্যবোধ, ধর্মানুভূতি ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ হয়। লিঙ্গের ক্ষেত্রে এই সমষ্টিবাচকতার কথা বিবেচনা করলে কনজারভেটিজমে নারী ও পুরুষের মধ্যকার সামষ্টিক পার্থক্য, ভিন্নতা তাদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পায়। এই গুরুত্বের কারণে তারা আলাদা আলাদাভাবে নারী পুরুষের সমস্যার দিকে জোড় না দিয়ে সামষ্টিক নারীত্বের ধারণা ও পুরুষত্বের ধারণার উপর জোড় দেয়, সমাজে চিরাচরিত নারীত্ব ও পুরুষত্বের ধারণাকে তারা সংরক্ষণ করতে চায়।

আমি যে সময়টার কথা বলছি, মানে ১৮৮০ থেকে ১৯২০ তখন শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রে লাগাতার রিপাবলিকানরা (কনজারভেটিভ) ভোটে জিতে প্রেসিডেন্ট হয়ে এসেছে। শেষে ১৯১৩ সালে একজন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী (লিবারাল) প্রেসিডেন্টের পদ গ্রহণ করেন। তিনি হচ্ছেন উড্রো উইলসন। যুক্তরাষ্ট্রের নারী অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে উড্রো উইলসনের নামটা উল্লেখযোগ্য, কারণ তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৭ সালের দিকে নারীদের ভোটাধিকার দান করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ব্যাপারটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এই ভোটাধিকার বৈধ করার জন্য যুদ্ধের সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রয়োজনে নারীদের অবদান দেখানোটা তার প্রয়োজন ছিল। যাই হোক, উড্রো উইলসনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের মূল রাজনৈতিক ধারা কনজারভেটিজমই ছিল। এছাড়া রাজনৈতিক ধারা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে অনেক সময়ই বলা হয় যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে পৃথিবীর সকল রাজনৈতিক দলের আইডিওলজিই কম বেশি কনজারভেটিভই ছিল। রাজনৈতিক হাওয়া কনজারভেটিজম থেকে লিবারালিজমের দিকে বইতে শুরু করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রতা, ব্যক্তি পরিচয়ের বিষয়গুলো, এবং লিবারালিজম আরও বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে। এখানে আমি যে সময়টার কথা বলছি তা মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার আগের সময়টা।

উপরে সেই সময়ের রাজনৈতিক ধারার ব্যাপারটি আনার কারণ হল আমি মাতৃত্ব নিয়ে সেইসময়কার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সাথে সেই সময়ের কনজারভেটিভ রাজনৈতিক ধারার একটা সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা করব। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে নারীদের জন্য একমাত্র এক্সেপ্টেবল জব ছিল নার্সিং। তখন ডাক্তারদের মধ্যে নারী ছিল ৫ থেকে ৬ শতাংশ, আইনজীবীদের মধ্যে নারী ছিল মাত্র ১ শতাংশ। তো সেই সময় চাকরির ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণের বেলায় একটা সামাজিক পরিবর্তন দেখা গেল। দেখা গেল, নতুন নতুন সব ফিমেল ওরিয়েন্টেড জব ফিল্ড তৈরি করা হচ্ছে যেখানে নারীদের জন্য কাজ করা সুবিধা, এবং নারীরাই ভাল কাজ করতে পারবে। বলতে গেলে, নারীদের ডোমেস্টিক ও ম্যাটারনাল কোয়ালিটি অনুযায়ীই এই চাকরির সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। ১৮৯০ এর দশকে এমআইটি এবং ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোতে হোম ইকোনমিক্স বা গার্হস্থ্য অর্থনীতি নামে একটি বিভাগ খোলা হয়। ট্রেডিশনাল নার্সিং এর সাথে সাথে পাবলিক হেলথ নারসিং নামে আরেকটি বিভাগ খোলা হয়। ইমিগ্রেন্ট নারী ও শিশুদের সেবার জন্য অনেক সোশ্যাল ওয়ার্কের সুযোগ সৃষ্টি করা হয় তাদের জন্য।

যে সময়টার কথা বলছি যুক্তরাষ্ট্রে তাকে প্রোগ্রেসিভ রিফর্মের যুগ বলা হয়, যার আরেক নাম হচ্ছে প্রোগ্রেসিভ ইরা। যুক্তরাষ্ট্রের কনজারভেটিভ পলিটিক্স সেই প্রোগ্রেসিভিটির সাথে তাল মিলিয়ে একরকম প্রোগ্রেসিভ কনজারভেটিজমের ধারা তৈরি করেছিল, কিন্তু সেটা কনজারভেটিজমের মূল বৈশিষ্ট্যকে রক্ষা করে। সামাজিক ক্ষেত্রে তাই তারা এই প্রগতিশীলতার ক্ষেত্রেও নারীত্ব ও মাতৃত্বের চিরাচরিত ভূমিকাকে অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করেছিল। সেই সময় নারীদেরকে মাতৃত্বের সেবামূলক বৈশিষ্ঠ্যের সাথে সংগতিপূর্ণ কাজেই যোগদান করতে উৎসাহিত করা হয়, কিন্তু পুরুষেরা যেসব কাজ করে সেসব কাজে নারীদের যোগদান করতে কোনরকম উৎসাহ প্রদান করা হয় নি। সমাজে এরকম একটা ভাবধারা ছিল যে, তোমাদের জন্য নতুন নতুন কত জব ফিল্ড তৈরি করা হচ্ছে, তোমরা সেগুলোতেই যাও, পুরুষেরা চাকরিতে যাবার দরকার কী? সমাজে এরকম ধারণাকে স্টেরিওটাইপ বলে, কাজের ক্ষেত্রে নারীদের কাজ, পুরুষের কাজ এরকম একটা স্টেরিওটাইপ তৈরি হয়ে যায় তখন। তবে এর ভাল দিকও ছিল। এর ফলে নারীদের জন্য বাইরে কাজ করার অনেক সুযোগ তৈরি হয়, তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি পায়, স্বাবলম্বী হয়। আর সমাজে তাদের এই অবদানই ১৯১৭ সালে তাদের ভোটাধিকার লাভের জন্য সহায়ক হয়।

নারীরা তাদের ফেমিনিটিকে ব্যবহার করে সমাজের কাজে অংশগ্রহণ করার এই দৃষ্টিভঙ্গিকে ম্যাটারনালিজম বা মাতৃত্ববাদ বলা হয়, অন্য কথায়, নারীরা তাদের ফেমিনিটি ইনস্টিংক্ট ব্যবহার করে যেসব কাজ তাদের জেন্ডারের জন্য বেশি উপযোগী সেইসব কাজ করবে এই দৃষ্টিভঙ্গির নাম হচ্ছে ম্যাটারনালিজম। দেখা গেল এই মাতৃত্ববাদ বা ম্যাটারনালিজম নিয়ে নারীবাদীদের মধ্যেও একটি দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। অনেকে এটাকে গ্রহণ করে বললেন, সমাজে এর প্রয়োজন আছে কারণ এখানে নারীর অগ্রগতির সুযোগ সৃষ্টি হয়, মাতৃত্বকে এখানে নারীর শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পূর্বে যে মাতৃত্ববাদী নারীবাদীদের কথা বললাম, তারা ছিলেন এই পক্ষে। আবার অন্যপক্ষ বা ম্যাটারনালিজমের সমালোচকগণ বললনে, এর ফলে নারীদেরকে মেল ডোমিনেটেড জব থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে, এর ফলে জেন্ডার ফ্লুইডিটির ধারণাটিকে বিবেচনা না করে ফেমিনিটি বা নারীত্বকে নরমালাইজ করা হচ্ছে। মূলকথা হচ্ছে, এগুলো পুরুষের কাজ- নারীরা করবে না, এগুলো নারীর কাজ- পুরুষরা করবে না, কাজ নিয়ে এরকম একটা স্টেরিওটাইপ তৈরি করা হয় এসময়। এর প্রভাব এখনও দেখা যায়, স্টেম ফিল্ড সহ অনেক ক্ষেত্রেই নারী ও পুরুষের যথেষ্ট ডিসক্রিমিনেশনের ছবি চোখে পড়ে। যাই হোক, এসময় আরেকটা জিনিস দেখা যায়, আগে যেখানে এডভার্টাইজাররা নারীদেরকে কাজে উৎসাহ দেবার জন্য স্ট্রং ওয়ার্কিং উইম্যানের ছবি প্রচার করত, ম্যাটারনালিজমের ফলে দেখা গেল এডভার্টাইজাররা ম্যাটারনালিজম নিয়েই ছবি দিচ্ছে আর নারীদেরকে এসব কাজ ছেড়ে দিয়ে বাসায় ফিরে যেতে বলছে। হতে পারে সরকারের একটা প্রভাব এখানে ছিল।

সেসময় যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাটারনালিজম শুরু হওয়ার কারণ অনুসন্ধান করলে মাথায় যা আসে তা হল, এক. কনজারভেটিভরা তাদের আদর্শ অনুযায়ীই সেসময় প্রোগ্রেসিভ রিফর্মের সাথে তাল মিলিয়ে নারীদের নারীত্বকে রক্ষা করে যা করা যায় তাই করেছে, আর দুই. সেই সময়ে সমাজের যে পরিবর্তনের কথা আগে বলা হল, সেখানে পরিবারের স্ট্যাবিলিটি এভাবে কমে যাওয়া, নারীদের "মাতৃত্বসুলভ বৈশিষ্ট্যের" হ্রাস পাওয়া, ডিভোর্স রেট বাড়া, ফারটাইলিটি রেট কমা, কম সন্তান গ্রহণ করা, নারীদের বাইরের কাজে অংশগ্রহণ করা ইত্যাদির ফলে কনজারভেটিভরা এগুলোকে সমাজের জন্য একটা থ্রেট মনে করে। তারা মনে করে এই পরিবর্তনের ফলে সমাজে মাতৃত্বের কাঠামোটা ভেঙ্গে পড়ছে, সমাজ ভেঙ্গে পড়ছে, তাই একে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঠেকাতে হবে। আর তাই তারা ম্যাটারনালিজম কনসেপ্টকে কাজে লাগিয়ে এই সমস্যার সমাধান করার একটা চেষ্টা করে।

মাতৃত্ব নিয়ে কনজারভেটিভ পলিটিকাল এপ্রোচ যেমনটা মাতৃত্বকে সমাজে মহিমান্বিত করে, সমাজের চিরাচরিত মাতৃত্বের ধারণাটিকে রক্ষা করতে চায়, এখান থেকে উঠে আসা কনজারভেটিভ ফেমিনিজম তেমনি নারীদের মাতৃত্বকে তাদের একটি শক্তি হিসেবে উপস্থাপিত করে, তার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করে। অন্যদিকে লিবারাল ফেমিনিজমে মাতৃত্বের ধারণার বলে জেন্ডার ফ্লুইডিটির ব্যাপারে জোড় দেয়া হয়, মেল ডোমিনেটেড ওয়ার্ক ফিল্ডে নারীর অংশগ্রহণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, কাজের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের কাজে যে স্টেরিওটাইপগুলো কাজ করে সেগুলো দূর করতে চায়, মাতৃত্বকে গ্লোরিফাই করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় নারীরা যে বৈষম্যের শিকার হয় সেই বৈষম্যকে দূর করার চেষ্টা করতে চায়। আমার এক বন্ধু একটা মজার কথা বলেছিল, "মাতৃত্বকে মহান বললেও পুরুষের লাভ, না বললেও লাভ।" কথাটা বোধ হয় ঠিকই। মাতৃত্বকে যদি গ্লোরিফাই করা হয়, তাহলে ম্যাটারনালিজমের খারাপ বিষয়গুলো দেখা যাবে, মাতৃত্বকে ব্যবহার করে নারীদের কাজের পরিসরকে ছোট করে দেয়া হবে, ফেমিনিটিকে নরমালাইজ করা হবে, এটা নারীর কাজ, এটা পুরুষের কাজ এভাবে জেন্ডার স্টেরিওটাইপ তৈরি করা হবে। ফলে নারীরা বৈষম্যের শিকার হবে। অন্যদিকে যদি মাতৃত্বকে ডিমোরালাইজ করা হয়, তাহলে সমাজে ফেমিনিটির বিষয়গুলোকে পুরুষেরা যেমন অনেকসময় দুর্বল, অযোগ্য, মূল্যহীন, ইউজলেস হিসেবে দেখে এই প্রবণতাটি আরও বৃদ্ধি পাবে। অনেক পুরুষই ভাবেন, ম্যাসকুলিন বৈশিষ্ট্যগুলো ফেমিনিন বৈশিষ্ট্যগুলোর চেয়ে সুপিরিয়র, পুরুষেরা সুপিরিয়র জেন্ডার, নারীরা মূল্যহীন। এরকম ধারণাও বৃদ্ধি পাবে। কনজারভেটিভ ফেমিনিজম মাতৃত্বকে ডিমোরালাইজ করা থেকে আটকাতে চান, যাতে এর কারণে তৈরি ডিসক্রিমিনেশন বা বৈষম্যের সৃষ্টি না হয়, আর লিবারাল ফেমিনিস্টরা মাতৃত্বকে গ্লোরিফাই করা থেকে আটকাতে চান, যাতে এর ফলে তৈরি ডিসক্রিমিনেশন বা বৈষম্যের সৃষ্টি না হয়।

এবার পলিটিকাল ফিল্ড থেকে একটু দর্শনে যাই। ফেমিনিস্ট থিওরিতে মাতৃত্ব নিয়ে এই দ্বন্দের ব্যাপারটা এসেনশিয়ালিজম বনাম কনস্ট্রাকশনিজম এর আলোচনায় পড়ে। এসেনশিয়ালিজম এর ধারণা দিয়েছিলেন এরিস্টোটল। এই ধারণায় প্রত্যেকটা এনটাইটিতে একটা এসেন্স বা নিজস্বতা থাকে। ফেমিনিস্ট থিওরিতে এসেনশিয়ালিজম নারীদের ভেতরের নারীত্ব, ইনস্টিংক্ট, সহজাত বৈশিষ্ট্য এসবে বেশি জোড় দেয়, নারীদের ভেতরের মাতৃত্বের বৈশিষ্ট্য এখানে প্রাধান্য পায়, মাতৃত্বকে শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টা এখানে সামনে আসে। অন্যদিকে কনস্ট্রাকশনিজম এর ধারণা তৈরি হয় বার্গার, ল্যাকম্যানের ধারণার মধ্য দিয়ে। এই ধারণাটি এন্টি-এসেনশিয়ালিস্ট। এখানে ব্যক্তির মধ্যকার এসেন্স আসলে একটা হিস্টোরিক কনস্ট্রাক্ট। আমাদের মধ্যে থাকা জেন্ডারের ধারণাও সমাজে তৈরি হওয়া বা কনস্ট্রাক্টেড। এই তত্ত্বে জেন্ডারকে স্ট্রিক্ট, সলিড বা কঠিন হিসেবে না দেখে তরল বা গ্যাসীয় (ফ্লুইড) হিসেবে দেখা হয়, যেখানে এটির ধারণা পরিবর্তিত হতে পারে। এই ধারণা অনুসারে আমাদের সমাজে জেন্ডারের যে অবস্থা তা থেকেই আমাদের চিন্তা জগতে জেন্ডার ধারণার সৃষ্টি হয়, এই কাজ পুরুষের, এই কাজ নারীর আমরা এভাবে কাজে জেন্ডার আরোপ করি কারণ এটা সমাজে এভাবেই তৈরি। জেন্ডার ফ্লুইডিটি বিবেচনা করলে এই আরোপিত জেন্ডার স্থির না, পরিবর্তনশীল আর নারী, পুরুষ যেকেউ যেকোন ধরণের কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে। কনস্ট্রাকশনিজমে তাই মাতৃত্বের ধারণা গুরুত্ব পায় না, বরং জেন্ডার ফ্লুইডিটির ধারণা গুরুত্ব পায়।

যাই হোক, আমার সেই বন্ধুটির মতে মাতৃত্বের আলোচনায় নারীরা দুই দিক থেকেই বঞ্চনার শিকার হয়। মাতৃত্বের মহিমান্বিত করার কারণেও নারীরা বঞ্চনার শিকার হয়, আবার মাতৃত্বকে হেয়ো করার কারণেও। অবস্থার পরিবর্তন করতে চাইলে আমি মনে করি এমন একটি অবস্থায় যেতে হবে যেখানে, সমাজের অবস্থা "মাতৃত্বকে মহান বললেও পুরুষের লাভ, না বললেও পুরুষের লাভ" থেকে "মাতৃত্বকে মহান বললেও নারীর লাভ, না বললেও নারীর লাভ" এরকম অবস্থায় যাবে। ক্রিটিকাল থিওরিতে একটা দৃষ্টিভঙ্গি খুব জনপ্রিয়, "আইডিওলজি বা আদর্শই মানব মুক্তির প্রধান সমস্যা" কারণ কোন আদর্শই পূর্ণাঙ্গভাবে সকলের উপকারে আসে না বা পূর্ণাঙ্গভাবে মানুষের মুক্তি নিশ্চিত করে না। এক্ষেত্রে তাই আমার মনে হয়, নির্দিষ্ট আইডিওলজি বা পয়েন্ট অব ভিউর চেয়ে প্রতিটি ব্যক্তি যাতে নিজেদের পছন্দ মত কাজ করতে পারে, কেউই যাতে বাঁধার শিকার না হয়, ব্যক্তির স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্রতা রক্ষিত হয় সে দিকে গুরুত্ব দেয়া বেশি প্রয়োজন। আমাদের সমাজে একেকজনের দৃষ্টিভঙ্গি একেকরকম, একেকজন একেকভাবে সমাজকে দেখে। যাদের কাছে মাতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ, মাতৃত্ব একটি শক্তি, তারা যাতে এই শক্তিকে ব্যবহার করার সুযোগ পায় তাকে সেই সুযোগ দেয়া হোক, আবার যারা মাতৃত্বকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে না, জেন্ডার ফ্লুইডিটি যাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তারা যাতে সমাজটাকে সেভাবে পায়, মেল ডোমিনেটেড ওয়ার্ক ফিল্ডে ডিসক্রিমিনেশনের শিকার যাতে নারীরা না হয়, সেরকম ব্যবস্থার সৃষ্টি করা হোক। মাতৃত্বকে যাতে ওভারগ্লোরিফাই বা ডিমোরালাইজ করা না হয় সেক্ষেত্রে একে নিয়ে অবজেটিভ ট্রুথ বেশি করে প্রচার করা হোক, এক্ষেত্রে বিজ্ঞান সাহায্য করতে পারে।

কিছু বিষয় আছে যেখানে কনজারভেটিভ ফেমিনিজম আর লিবারেল ফেমিনিজম এর দ্বন্দ্ব দূর করা খুবই মুশকিল। যেমন "নো-ফল্ট ডিভোর্স" (পার্টনারের কোন দোষ ছাড়াই ডিভোর্স প্রদান)। এমন কোন কথা নেই যে পার্টনার কোন দোষ করেছে তাই সম্পর্ক টিকছে না, এমনও হতে পারে তাদের মধ্যে আর ভালবাসা কাজ করছে না, তাই একজন ডিভোর্স চাচ্ছে। অনেক লিবারেল ফেমিনিস্টরা এটাকে সাপোর্ট করে, কারণ যেকোন নারীই একটা সময় মনে করতে পারে যে সম্পর্কটা কাজ করছে না, ডিভোর্স দরকার। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এরকম ডিভোর্স নারীর পক্ষে পাওয়া কঠিন হতে পারে, এমন হতে পারে তার অন্য কাউকে পছন্দ। নিজের পছন্দের মানুষের সাথে থাকা, পছন্দ না এমন মানুষের সাথে না থাকা ব্যক্তির ব্যক্তি-অধিকার, তাই এই অধিকার রক্ষায় অনেক লিবারাল ফেমিনিস্ট কাজ করে। অন্যদিকে অনেক কনজারভেটিভ ফেমিনিস্টদের দেখা যায় এই নো ফল্ট ডিভোর্সের বিরুদ্ধে যেতে। কারণ সমাজে সমাজের যে অবস্থা তাতে তারা মনে করে এই নিয়ম চালু হলে পুরুষেরা কিছুদিন পরেই নিজের বউকে ডিভোর্স দিয়ে আরেকজনকে বিয়ে করে আনবে। এতে সমাজে নারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এরকম কিছু কারণে কনজারভেটিভরা পুরোপুরি ব্যক্তিস্বাধীনতা পছন্দ করেনও না। যাই হোক, যেটা বলছিলাম, এরকম পরষ্পরবিরোধী কিছু বিষয় ছাড়া অন্যগুলোর ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রতা বৃদ্ধিতে ভাল সমাধান পাওয়া যাবে বলেই মনে করি।



শেয়ার করুন


Avatar: দ

Re: নারীবাদ নিয়ে ইমরান খানের বক্তব্য ও নারীবাদে মাতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক

অনেক কিছু লিখেছেন বটে, কিন্তু প্রতিপাদ্য বিষয়টা ঠিক কী? ইমরান খান তো অনেক দূর ভারতের বিভিন্ন মন্ত্রী সান্ত্রীর হামেশাই এইসব বলছেন। তো হঠাৎ ইমরান কেন?
Avatar: Sumit Roy

Re: নারীবাদ নিয়ে ইমরান খানের বক্তব্য ও নারীবাদে মাতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক

দ, নারীবাদ, রাজনীতি, দর্শন প্রভৃতি ক্ষেত্রে মাতৃত্বকে কীভাবে দেখা হয় তা আনা হয়েছে, এবং নারীর উপর শোষণের সাথে মাতৃত্ব কিভাবে জড়িয়ে আছে, আর কিভাবে নারী এই শোষণ থেকে মুক্ত হতে পারে এসব নিয়ে লেখা আছে। ইমরান খান এখানে কেবলই একটি উদাহরণ। এটা নিয়ে তার মতাদর্শ কী সেখান থেকে মাতৃত্ব বিষয়ে গভীরে যাওয়া হয়েছে।
Avatar: ঝুমা সমাদ্দার

Re: নারীবাদ নিয়ে ইমরান খানের বক্তব্য ও নারীবাদে মাতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক

অসাধারন পোস্ট। অনেক প্রশ্নের উত্তর পেলাম।
Avatar: Sumit Roy

Re: নারীবাদ নিয়ে ইমরান খানের বক্তব্য ও নারীবাদে মাতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক

ধন্যবাদ :D


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন