কৃষ্ণেন্দু মুখার্জ্জী RSS feed

কৃষ্ণেন্দু মুখার্জ্জীএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ট্রেড ওয়ার ও ট্রাম্প শুল্ক নিয়ে কিছু সাধারণ আলোচনা
    বর্তমানে আলোচনায় আসা সব খবরের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের বিলিয়ন ডলার মূল্যের উপর কঠিন শুল্ক বসিয়ে দিয়েছে, যাদের মধ্যে ডিশ ওয়াশার থেকে শুরু করে এয়ারক্রাফট টায়ার সবই আছে। চায়না অনেক দিন ধরেই এই হুমকির মুখে ...
  • নারীবাদ নিয়ে ইমরান খানের বক্তব্য ও নারীবাদে মাতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক
    সম্প্রতি একটা খবর পড়লাম। পাকিস্তান তেহরিক ই ইনসাফ এর নেতা ও পাকিস্তান দলের সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খান বলেছেন, তিনি পশ্চিমাদের থেকে আমদানি করা নারীবাদ সমর্থন করেন না। তার নারীবাদকে সমর্থন না করবার কারণও তিনি জানান, তার মতে নারীবাদ মাতৃত্বের মর্যাদাকে ছোট ...
  • রেনবো জেলি: যেমন লাগলো দেখে.....
    ইপ্সিতা বলল, রিভিউ লেখ। আমি বললাম, আমি কি সিনেমা বুঝি নাকি? ইপ্সিতা বলল, যা দেখে ভাল লাগল তাই লেখ। আমি বললাম, তবে তাই হোক।সিনেমা র নাম, রেনবো জেলি। ইউটিউবে ট্রেলার দেখেই বড্ড ভাল লাগল। তাই রিলিজ করার পরের দিনই আমার চারবছুরের কন্যে সহ আমি হলমুখী।টাইটেল ...
  • বর্ষা ও খিচুড়ি
    বর্ষাকাল। তিনদিন ধরে ঝমঝম করে বৃষ্টি হয়েই চলেছে। আমাদেরও ইস্কুল টিস্কুল বন্ধ। রাস্তায় এক হাঁটু জল। মায়েরও আজ অফিস যাওয়ার উপায় নেই। কি মজা। যদিও পুরোনো বাড়ির ছাদ চুঁইয়ে জল পড়ছে, ঘরের মেঝেতে ড্যাম্প, জামাকাপড় না শুকিয়ে স্যাঁতস্যাঁত করছে, কিন্তু তাতে আমাদের ...
  • বিজ্ঞাপনের কল
    তত্কালে লোকে বিজ্ঞাপন বলিতে বুঝাইতো সংবাদপত্রের ভেতরের পাতায় শ্রেণীবদ্ধ সংক্ষিপ্ত বিজ্ঞাপন, এক কলাম এক ইঞ্চি, সাদা-কালো খোপে ৫০ শব্দে লিখিত-- পাত্র-পাত্রী, বাড়িভাড়া, ক্রয়-বিক্রয়, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, চলিতেছে (ঢাকাই ছবি), আসিতেছে (ঢাকাই ছবি), থিয়েটার (মঞ্চ ...
  • বিশ্বাস, পরিবর্তন ও আয়ার্ল্যান্ড
    সম্প্রতি আয়ার্ল্যান্ডে আইনসিদ্ধ হল গর্ভপাত । যদিও এ সিদ্ধান্তকে এখনও অপেক্ষা করতে হবে রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের জন্য, তবু সকলেই নিশ্চিত যে, সে কেবল সময়ের অপেক্ষা । এ সিদ্ধান্ত সমর্থিত হয়েছে ৬৬.৪ শতাংশ ভোটে । গত ২৫ মে (২০১৮) এ ব্যাপারে আইরিশ সংসদের ...
  • মব জাস্টিস-মব লিঞ্চিং এর সংস্কৃতি ও কিছু সমাজ-মনোবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
    (আজকে এখানে "জুনেদ-এর চিঠিঃ ঈদের নতুন পোশাকে" আর্টিকেলটি পড়তে গিয়ে একটা নতুন টার্মের সাথে পরিচিত হলাম - "মব লিঞ্চিং এর সংস্কৃতি"। এটা কেবল একটা নতুন টার্মই নয়, একটি নতুন কনসার্নও, তাই এটা নিয়ে লেখা...)মব লিঞ্চিং এর ব্যাপারটা এখন আমরা প্রায়ই শুনি। ...
  • বিশ্ব যখন নিদ্রামগন
    প্রত্যেকটি মানুষের জীবন বদলে দেওয়া কিছু দিন থাকে, থাকে রাত, যার পর আর কিছুতেই নিজের পূর্বসত্বার কাছে ফিরতে পারা যায় না, ওটাই বোধহয় নিজঅস্ত্বিত্বের 'রেস্টোর পয়েন্ট' হয়ে দাঁড়ায় সর্বশক্তিমান প্রোগ্রামারের মর্জিমাফিক।25শে সেপ্টেম্বর, 1992 রাত আনুমানিক পৌনে ...
  • শিক্ষায় সমস্যা এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন
    (সম্প্রতি গুরুচণ্ডালির ফেইসবুক গ্রুপে Gour Adhikary বাবুর শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে একটি অসাধারণ লেখা পড়লাম। বেশ কিছু প্রশ্নের জবাব চেয়েছেন তিনি সেখানে। এরমধ্যে কয়েকটি প্রশ্নকে সাজিয়ে লিখলে এরকম হয়, "যারা ফেইল করে, তারা কেন সামান্য পাশ মার্ক জোগাড় করতে পারে ...
  • পরবাসে পরিযায়ী
    আজকে ভারতে চাঁদরাত। অনেকটা দূরে বসে আমি ভাবছি কি হচ্ছে আমার বাড়িতে, আমার পাড়াতে। প্রতিবারের মতো এবারেও নিশ্চয়ই সুন্দর করে সাজিয়েছে পুরো শহরটা। আমাদের বাড়ির সামনের ক্লাবে সার সার দিয়ে বসে আলুকাবলি, আচার, ফুচকা, আইসক্রীম এবং আরো কতকি খাবারের স্টল! আমি ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

'হারানো সজারু'

কৃষ্ণেন্দু মুখার্জ্জী



এক বৃষ্টির দিনে উল্কাপটাশ বাড়ির পাশের নালা দিয়ে একটি সজারুছানাকে ধেইধেই করে সাঁতার কেটে যেতে দেখেছিল। দেখামাত্রই তার মনে স্বজাতিপ্রীতি ও সৌভ্রাতৃত্ববোধ দারুণভাবে জেগে উঠল এবং সে ছানাটিকে খপ করে তুলে টপ করে নিজের ইস্কুল ব্যাগের মধ্যে পুরে ফেলল। এটিকে সে পুষবে। ব্যাগের মধ্যে সজারুছানাটি কিচকিচ করছিল আর উল্কাপটাশের পিঠে ক্রমাগত চিমটি কেটে যাচ্ছিল। বাড়ির মধ্যে ঢুকে, ঠিক কোন জায়গায় জানোয়ারটিকে রাখা যায় স্থির করতে না পেরে প্রাথমিকভাবে বৈঠকখানার একটা চেয়ারের উপর তাকে নামিয়ে রাখল। জলে ভিজে সুপসুপ করছিল সজারুশাবকটি, কাঁটাগুলি থেকে টুপটুপ শব্দে জল পড়ছিল আর ছোট্ট দেহটি ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে গেছিল। প্রথমে একটি গামছা দিয়ে সজারুটিকে মুছিয়ে দিতে যায় উল্কাপটাশ, কিন্তু প্রবল কাঁটার খোঁচার কারণে অনতিবিলম্বেই সে কাজে নিবৃত্ত হতে হয়। সজারুটিকে ঠাণ্ডার হাত থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আর কিছু না পেয়ে তার সামনে একটি ধূপ জ্বালিয়ে দেয়, ধূপের আগুন থেকে যথেষ্ট উষ্ণতা পাওয়া যাবে বলে তার বিশ্বাস ছিল। এই ঘটনার কিছুক্ষণ পরে একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ভোটের প্রচারে আসেন উল্কাপটাশের বাড়িতে এবং ভুলক্রমে বৈঠকখানায় সেই চেয়ারটির উপরে বসে পড়েন। তিনি সেদিন থেকে আর কখনো কোথাও ভোট চাইতে যাননি। উল্কাপটাশের বাবা কোনও বিশেষ কারণে নেতাটির উপর অত্যন্ত খাপ্পা ছিলেন। এই খবরটি কানে পৌঁছানোর পর তিনি আর ছেলের সজারু পোষায় কোনও আপত্তি তুললেন না।

সুতরাং সজারুটি বহাল তবিয়তে রয়ে গেল। উল্কাপটাশের ঘরেই তার বসবাস। খুব অলস প্রকৃতির প্রাণী, সারাদিন শুয়ে বসে কাটাত আর বিকেলের দিকে আধ ঘণ্টার জন্যে পাড়া ঘুরতে বেরুতো। সন্ধ্যেবেলায় যখন ফিরে আসত তখন সারা গায়ে ধুলোমাখা, পিঠের কাঁটায় নানা প্রকার পাতা গেঁথে আছে – এসেই চ্যাঁইভ্যাঁই ডাক ছেড়ে চৌবাচ্চার মধ্যে ঝাঁপ। সাবান মেখে স্নানটান সেরে সাফসুতরো হয়ে উল্কাপটাশের কোলে একটি লাফ দিয়ে নামত। আদর এক প্রকার অত্যাচার বিশেষ। উল্কাপটাশের আর্তনাদে পাড়া কেঁপে উঠত।

সময়ের সাথে সাথে সজারু, তার কাঁটা আর উল্কাপটাশের পুলক একসঙ্গে বাড়তে থাকল। কত অজানা বৈশিষ্ট্যের বিকাশ ঘটতে থাকল জন্তুটির মধ্যে। দেখা গেল তার খাদ্যরুচি বড়োই উদার। যা পায় তাই খায়। ভাত মুড়ি চকোলেট পাউরুটি চপ কাটলেট প্রভৃতি তো আছেই; তার সঙ্গে খবরের কাগজ, হারিকেন, লণ্ঠন, মোমবাতি, শালগাছ কি হারমোনিয়াম কিছুতেই তার আপত্তি নেই। উল্কাপটাশ একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে, জানোয়ারটা এক মনে তার কান চিবুচ্ছে। বৃহত্তর বিপদের আশঙ্কা করে সেদিন সকাল হতেই সে সজারুটিকে খাদ্য-অখাদ্য ভেদাভেদ বিষয়ে শিক্ষা দিতে লেগে পড়ল। মায়ের রান্নাঘর এবং আরও নানাবিধ জায়গা থেকে অজস্র অখাদ্যের নমুনা জোগাড় করে সে সজারুটিকে শেখায়,

‘এই যে, এগুলো - হাতা, খুন্তি, কোদাল, ফোন... (এইভাবে আরও প্রায় একশোখানা বস্তু)... বেড়াল আর... এটা মানুষ (একটা মানুষের ছবি জোগাড় করেছিল কোত্থেকে) – এগুলো অখাদ্য। এসব খায় না’।

সজারুমহাশয় বাধ্য ছেলের মত ঘাড় নাড়েন। তারপর উল্কাপটাশ আরেকটি স্তূপের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে বলে,

‘আর এদিকেরগুলো – বেগুন, পটল, উচ্ছে, সন্দেশ, আলু, পটল, পরীক্ষার খাতা...। এগুলো খাবার জিনিস। চোখে পড়ামাত্রই খেয়ে ফেলতে হয়।‘

সজারুটি বুদ্ধিমান, খুব তাড়াতাড়ি সব শিখে ফেলল। তারপর থেকে বাড়িতে বাজারপত্র সব গোপনে করতে হত, ব্যাগ থেকে উঁকি দেওয়া ডালপালা শাকসবজি প্রভৃতি একবার সজারুমশায়ের চোখে পড়লে আর রক্ষে থাকত না। তিড়িং তিড়িং করে দৌড়ে চলে আসত খেতে। খেতে না দিলে কাঁটার উপদ্রব তো ছিলই। উল্কাপটাশের ডাকনাম পটল থেকে বদলে ঘেঁচু করতে হয়, নইলে সজ্ঞানে সজারুপ্রাপ্তির আশঙ্কা ছিল। তার উপর নির্দেশ হল সকাল আটটা থেকে ন’টা পর্যন্ত নিজের পোষ্যকে শিকলবন্দি করে রাখার। এ সময়ের মধ্যে সবাই বাজারপত্র সেরে ফেলত। মধ্যাহ্নভোজন যাতে শান্তিতে হয় সেজন্যে দুপুর বারোটার আগে সজারুকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হত। রাত্রিতেও অনুরূপ ব্যবস্থা।

এই বিচিত্র খাদ্যাভ্যাস ছাড়া সজারুটির আর অন্য কোন বদগুণ ছিল না। মোটের উপর সবাই খুশিই ছিল বলা চলে। সজারুটির মধ্যে উল্কাপটাশ নিত্যদিনের সঙ্গী পেয়েছিল, তার বাবা পেয়েছিলেন একটি দারুণ অস্ত্র। পাড়ার বেয়াক্কেলে লোক বাড়িতে এসে চড়াও হলে তার পেছনে সজারু লেলিয়ে দিতেন। বিটকেল আপদ ব্যক্তিবর্গ বাড়িতে ঢুকে বেশি হম্বিতম্বি করলে, সজারুকে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছিল, যেন সে সোজা গিয়ে আপদের কোলে ডাইভ দেয়। এভাবে গৃহের পরিবেশ বেশ শান্তিপূর্ণ হয়ে উঠল।

উল্কাপটাশের মা’ও বেশ উপকৃত হয়েছিলেন। কুঁড়ে সজারু মাঝেমধ্যে যখন হাই তুলে আড়মোড়া ভাঙত, তখন ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ত কাঁটা। সে কাঁটা দিয়ে উনি উল বুনতেন, ছেঁড়া জামাকাপড় সেলাই করতেন। যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকার ফলে মাঝে মাঝে পায়ে কাঁটা ফুটে যেত বটে, কিন্তু এতখানি উপকারের কাছে এটুকু যন্ত্রণা আর এমন কি ! উল্কাপটাশ বড় আশা করে একটি কাঁটা বাগানের মাটিতে পুঁতেছিল, রোজ সার জল দিত। কিন্তু দু-তিনমাস পরেও চারাগাছ গজাল না দেখে সে হতাশ হয়ে রণে ভঙ্গ দ্যায়।

কিন্তু চিরদিন সমান যায় না। কালের নিয়মে সজারুটি গজারু হয়ে গেল। গজারু অর্থে, বখে যাওয়া সজারু। তার আচার-আচরণ ক্রমশ বেয়াদপসুলভ হয়ে উঠতে লাগল। চারদিক থেকে অভিযোগ আসতে শুরু করল। একদিন জানা গেল সে নাকি সন্ধেবেলা শ্যাওড়াগাছে উঠে গিয়ে পথচারীদের ভয় দ্যাখাচ্ছে। পাশের বাড়ি থেকে এক দেড়েল বুড়ো বলে গেল তাদের বেড়ালটিকে সজারু কামড়ে দিয়েছে। সেই থেকে বেড়ালের খুব জ্বর। ভুলভাল বকছে। এর কিছু বিহিত না করলে উনি দেখে নেবেন। নিজের অভিযোগের সপক্ষে তিনি সেই জ্বরাক্রান্ত বেড়ালটিকে দেখালেন, যে মালিকের কোলে বসা অবস্থায় ক্রমাগত ঘেউঘেউ করে যাচ্ছিল। উল্কাপটাশের বাবা অসুস্থ বেড়ালের চিকিৎসার সমস্ত খরচ বহন করতে প্রতিশ্রুত হলেন। খুশি মনে দেড়েল বুড়ো যেই বাড়ির বাইরে পা রেখেছেন, অমনি শ্যাওড়াগাছের মাথা থেকে প্রকান্ড এক ঝাঁপ দিয়ে বদ সজারু তার মাথার উপর এসে পড়ল। অগত্যা বেড়ালের মালিকের চিকিৎসার সব খরচও উল্কাপটাশের বাবাকে দিতে হয়।

কিন্তু এসব ছিল বাইরের সমস্যা। উল্কাপটাশের বাবা এগুলিতে বিশেষ বিচলিত হলেন না। লোকে কত কিছু বলে, অত পাত্তা দিলে চলে না। কিন্তু বাইরের সমস্যা ভেতরে ঢুকে পড়ল অচিরেই। কিছুদিন পর এই সজারুর কারণে নিজের ঘরে এমন একটি কেলেঙ্কারি বাঁধল যা তিনি আগের থেকে আন্দাজও করতে পারেননি। সরকারি দপ্তর থেকে তিনজন গণ্যমান্য ব্যক্তি এসেছিল গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে আলোচনা করতে। পিতৃদেব তাদের বৈঠকখানায় বসিয়েছিলেন।

‘খুব গরম’, রুমালে ঘাম মুছতে মুছতে একজন বললেন, ‘ফ্যানটা একটু...’

‘হ্যাঁ নিশ্চয় নিশ্চয়’, বলে সিলিংফ্যানের সুইচটা অন করলেন। ফ্যান ঘুরতে শুরু করা মাত্রই -

‘বাপ্রে ! ওরে মামারে... কাঁইমাঁই... দাদুগো বাঁচাও !’

ঘরজুড়ে প্রবল আর্তনাদ। দক্ষজজ্ঞ কাণ্ড ! গোটা ঘরে ছররার মতো ছড়িয়ে পড়ল একগাদা কাঁটা। সিলিং ফ্যান থেকে ঝাঁপ দিয়ে যে জীবটি পাঞ্জাবিপরা ভদ্রলোকটির ঘাড়ে নেমে এল তাকে চিনতে উল্কাপটাশের বাবার কোনও অসুবিধে হল না। রক্তারক্তি ব্যাপার। ঘরের মধ্যে কেউ আর অক্ষত রইল না। ত্রাহিত্রাহি রব তুলে তিনজন ভদ্রলোক চম্পট দিলেন। দু’দিন পর বাড়িতে শমন আসে। হিংস্র জন্তু পোষার অভিযোগে উল্কাপটাশের বাবাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল, কিন্তু সেই ‘হিংস্র জন্তু’টিকে খুঁজে কোথাও পাওয়া গেল না। সে তখন শ্যাওড়া গাছের মাথায় বসে নিজের কাঁটা দিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছিল।

দু’দিন পর জামিন পেয়ে উল্কাপটাশের বাবা ঘরে ফিরে এলেন। এসেই সজারুটিকে ডেকে, তাকে বিস্তর গালমন্দ করে, গালে ঠাস করে একটি চড় মেরে, কান ধরে বাড়ির বাইরে বের করে দিলেন। কেঁইকেঁই শব্দে কাঁদতে কাঁদতে সজারু বাঁশবনের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

উল্কাপটাশ কেঁদে ঘর ভাসাল, তার মা গোপনে চোখের জল ফেললেন, রাত বাড়তে বাবাও হালকা দুঃখিত হলেন।

তিন হপ্তা কেটে গেল, সজারু আর ফিরল না।



দেড় মাস পেরোতে চলে, সজারুর কোনও খোঁজ নেই। সজারু-বিরহের শোক তাপ যাতে ছেলেকে না বিঘড়ে দেয় সেজন্য উল্কাপটাশের বাবা তাকে নতুন ইস্কুলে ভর্তি করে দেওয়ার তোড়জোড় শুরু করলেন। ইতিমধ্যে গ্রামের একটি প্রাইমারি ইস্কুল থেকে ক্লাস ফোর পাশ হয়ে গেছিল উল্কাপটাশের। ফাইভে ভর্তির জন্য একটি প্রবেশিকা পরীক্ষা দিতে হত। খুব জটিল পরীক্ষা, জটিলতর তার প্রস্তুতি। প্রতি সকালে বাবার পোষা একটি পায়রাছানার তত্বাবধানে শুরু হত তার পড়াশোনা। সে বড় কঠিন শাসন। পায়রাছানাটি ঠোঁটে একটি কাঠি নিয়ে জুলজুল চোখে পাহারা দিত। একটু ফাঁকি মারলেই ঠুকঠুক করে কাঠিটি মাটিতে ঠুকত আর বকম বকম ডাক ছেড়ে বাবার কাছে বার্তা পাঠিয়ে দিত। বাবা বিছুটির ঝাড় হাতে তেড়ে আসতেন। তারপর অতি দুঃখজনক কিছু মুহূর্ত।

তবে সজারুর সঙ্গদোষে ওই অল্প বয়সেই সেয়ানা কূটনীতিবিদে পরিণত হয়েছিল উল্কাপটাশ। সেই কূটনীতির জন্য, বিস্কুটনীতিও বলা চলে যাকে, অল্পদিনের মধ্যেই এই অপশাসন থেকে মুক্তি পেল সে। সকাল সকাল বইপত্র আর বিস্কুটের কৌটো নিয়ে বসত, বসেই একগাদা বিস্কুট ছড়িয়ে দিত নিজের চারধারে। বিস্কুট খেতে এত ব্যস্ত থাকত নিরীহ পক্ষীটি, ডাক ছাড়তে যেত ভুলে। উল্কাপটাশ বেরিয়ে পড়ত খেলতে। পায়রার অভিযোগ কানে না আসতে থাকায় সকলে ভাবত ছেলে দারুণ পড়ছে। বাবা খুশি, পায়রা খুশি, ছেলেও খুশি।

পাক্কা একমাস এইরকম নিদারুণ পড়াশোনা চালিয়ে পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল উল্কাপটাশ। প্রশ্নপত্র বেশ জটিল ছিল, কিন্তু ভালো প্রস্তুতির কারণে তার কিছুমাত্র অসুবিধে হয়নি। সবগুলি প্রশ্নের উত্তর দিতে পেরেছিল সে। বাংলায় বিপরীত অর্থ লেখার প্রশ্নতে অনর্থ বাঁধিয়ে এসেছিল, বানান সংশোধনে তার কীর্তি দেখে পরীক্ষক আকাদেমির অভিধান মাথায় নিয়ে দোতালা থেকে ঝাঁপ মেরেছিলেন। ট্র্যান্সলেশনে মাস্টারদের একটি কড়া লেসন দিয়ে এসেছিল সে, তার অনুবাদ দেখে একাধিক শিক্ষক বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন। অঙ্কের প্রশ্নগুলিতেও তার উজ্জ্বল প্রতিভার ছোঁয়া লেগেছিল। গুনের অঙ্কে তার গুণপনা দেখে মাস্টার বিস্ময়ে বেগুন (না বেগুনি না, বেগুনি তো সবাই হয়) হয়ে গেছিলেন। ভাগের অঙ্কে তার উত্তর দেখে এক অঙ্কের মাস্টার ইস্কুল ছেড়ে ভাগলেন। এখানেই শেষ না। সরলের অঙ্কগুলিকে রীতিমতো জটিল করে রেখেছিল, উৎপাদকে বিশ্লেষণের অঙ্কগুলির রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে ছেড়েছিল। একটি বহুবিকল্পধর্মী প্রশ্ন ছিল, যেটা কেউ করতে পারেনি উল্কাপটাশ বাদে। পাঁচটা সংখ্যা দিয়ে সেগুলোর গড়মান নির্ণয় করতে দেওয়া হয়েছিল; সঙ্গে খুব কাছাকাছি চারখানি অপশন – প্রজাপতি, আলমারি, শেয়াল, পাঁচ (প্রবেশিকা পরীক্ষাগুলিতে এমন প্রশ্নই এসে থাকে) - একটি উত্তর বাছতে হত এগুলির মধ্যে। বিস্তর কষে রাফ-পাতা ভরানোর পর তার উত্তর এসেছিল শুঁয়োপোকা। কাছাকাছি বিকল্প একমাত্র প্রজাপতি থাকায় সেটিতে দাগ দিয়ে আসে।

বিশেষ কৃতিত্বের সঙ্গে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হল উল্কাপটাশ। ঘরে সকলের আনন্দ আর ধরে না। গোটা পাড়া ছুটে এল অভিনন্দন জানাতে; ফুলের মালা, মিষ্টি আর বাঁদরের মুখোশ নিয়ে। গুরুজনেরা আশীর্বাদ করলেন প্রাণভরে, সমবয়সীরা ঘ্যাঁক করে কামড়ে দিল আনন্দে। এসেছিলেন অনেকে, কিন্তু পাঁচ মিনিটের বেশি কেউ থাকলেন না। বসার তো প্রশ্নই ওঠে না। সজারুকে যে অনেকদিন আগে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, বাড়ি এখন অত্যন্ত নিরাপদ – এ খবর জানানোর কোনও সুযোগ মিলল না। তার আগেই সবাই যে যার উপহার ও আশীর্বাণী প্রদান করে চম্পট দিলেন। ‘আহা আহা বেঁচে থাকো বাছা, বড় হও... (অস্ফুটে) জানোয়ারটা কোথায় লুকিয়ে আছে রে বাবা, ঝাঁপিয়ে এলেই তো গেছি...’। ‘বসুন একটু অন্তত’। ‘(ভয়ে ভয়ে চেয়ারের দিকে তাকিয়ে) না না, বসবো না আর বৌমা। ঘরে অনেক কাজ পড়ে।‘

বাড়িতে খাতির বেশ বেড়ে গেল উল্কাপটাশের। সঙ্গে সেই পায়রাছানাটিরও। তার পাহারায় পড়াশোনা করে ছেলের এই দারুণ রেজাল্ট – উল্কাপটাশের বাবা খুব খুশি হয়ে একটি ফুটবল কিনে দিলেন পায়রাছানাটিকে। ছেলেকে দিলেন একটি পোড়ামাটির ঘোড়া। ওতে চেপে সে সকাল বিকেল চরতে বেরুত মাঠে। পায়রাটির সাথে তার খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেল। রোজ দুপুরে ফুটবল খেলত দুজনে। উল্কাপটাশের বাবা হতেন রেফারি। মোট কথা, সবাই বেশ সুখে আছে। সজারুটির কথা কারোর আর মনে পড়ে না।

এইভাবে শীতকাল চলে এল। উল্কাপটাশের ইস্কুলে একখানি নোটিস পড়ল। প্রতি বছরের মতো এবারেও ইস্কুল থেকে শীতকালীন বনভোজনের আয়োজন করা হয়েছে। উৎসাহী ছাত্রছাত্রীদের বাড়ির অনুমতিপত্রসহ হেডমাস্টারের কাছে আবেদন জানাতে বলা হচ্ছে। এসব ব্যাপারে উল্কাপটাশ খুবই উৎসাহী, আর বাড়ি থেকে আপত্তির কোনো কারণই ছিল না। বাবা, মা,পায়রা – সবার সম্মতিসূচক সইসহ একটি আবেদনপত্র সে ইস্কুলে জমা দিয়ে এল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কুড়িখানি আবেদনপত্র জমা পড়ল। পিকনিকের দিনক্ষণ নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে। ছেলেদের সামলাতে ইস্কুল থেকে কে কে যাবে, না রান্নাবান্নার ব্যবস্থা কীরকম হবে সে নিয়ে একটি মিটিং ডাকা হল ইস্কুলে। বাংলা স্যারের উপর রান্নার দায়িত্ব পড়ল। ইস্কুলের বেয়ারাটি যাবে মুর্গির পাল সামলাতে। বিজ্ঞানের স্যার বাচ্চাদের সামলাবেন। হেডস্যার বিকেলের দিকে একবার গিয়ে মাংসের ঝোল ভাত খেয়ে আসবেন। ইত্যাদি প্রভৃতি।

পিকনিকের আগের দিন বিজ্ঞানের স্যার পাঁচিল থেকে পড়ে ঠ্যাং ভাঙলেন। ছেলের আবদারে সামনের বুড়োবাদুড়গাছ থেকে চড়ুইছানা ধরতে গিয়েছিলেন, কিন্তু উল্টে চড়ুইছানাই তাকে ধরে ফেলে। বেশীক্ষণ ধরে রাখতে না পেরে, ছোটো শরীর তো, কতটুকুই বা ক্ষমতা আর, একসময় ছেড়ে দেয়। মাস্টারবাবু ধুপ্ করে মাটিতে এসে পড়েন ও হাড় ভাঙেন। ইস্কুলের বেয়ারাটি আবার এক কাঠি উপরে। সে পিকনিকের দু’দিন আগেই জেলখানায় চালান হয়ে গেল। পাড়ার একখানি স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবিরের উদ্যোক্তাদলের মধ্যে ছিল সে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেখানে রক্তদান খুব একটা স্বেচ্ছায় হল না। জোরে মাইক বাজানোর অপরাধে পুলিশ শিবিরের সামনে সমবেত সকলকে লাঠিপেটা করে রক্তারক্তি কাণ্ড বাঁধাল, আর যাকে হাতের সামনে পেল তুলে নিয়ে চলে গেল।



একে একে নিভিছে দেউটি। পিকনিকের দিন দেখা গেল বাংলার স্যার একা সবকিছুর দায়িত্বে। তাঁকেই শাকসবজি কাটতে হবে, রাঁধতে হবে, বাচ্চাদের সামলাতে হবে আরও কত কী। তবে বেশি বাচ্চা ছিল না এই যা রক্ষে। কুড়ি জনের মতো নাম লেখালেও হাজির হল মাত্র পাঁচজন। হেডস্যার ফোনে বল্লেন, ‘যে’কজন এসেছে তাদের নিয়েই আপনি মাঠে চলে যান। সব মালপত্র নিয়ে যাবেন আর রান্না-টান্নার দিকটা সামলে নেবেন। বেলা বাড়লে আমি আরও কয়েকজনকে নিয়ে আসব।‘ একটা ঠেলাগাড়ির উপর হাঁড়ি, কড়াই, স্টোভ, শাকসবজি, দড়ি দিয়ে বাঁধা পাঁচখানি মুর্গি ইত্যাদি তুলে দিয়ে তিনি চললেন মাঠের দিকে। পেছনে পেছনে হাঁসবাচ্চার মতো যেতে লাগল পাঁচখানি শিশু। সেই হাঁসবাচ্চার দলের মধ্যে উল্কাপটাশও ছিল। তার পুলকের অন্ত নেই। বাকি চারজন সকলেই নিচু ক্লাসের; তাই সে-ই তাদের নেতা হয়ে বসল।

মাঠে পৌঁছে বাংলা স্যার সবকিছু ঠেলাগাড়ি থেকে নামালেন। তারপর স্টোভ সাজিয়ে, তেরপল মেলে শাকসবজি কাটতে বসে পড়লেন। ‘তোমরা বড় রাস্তায় যেয়ো না। চুপচাপ এখানে বসে থাকো। মাঝেমধ্যে আমায় জিনিসপত্র এগিয়ে দিয়ো‘। বাচ্চাদের হুকুম দিলেন তিনি। ছেলেরা চারপাশে বসে চইচই করতে লাগল। একটানা ঘণ্টাদেড়েক বসে প্রায় কেজিদশেক শাকসবজি কাটা শেষ হলে স্যার আবিষ্কার করলেন তার মাথা তাথৈ তাথৈ করে নাচছে, যেন একটু পরেই ঘাড় ছেড়ে বেরিয়ে আসবে। চোখের সামনে সবকিছু ঘুরছে। তিনি দেখলেন চারপাশে একগাদা আলু-পটল নিয়ে একটি ধু-ধু মরুভূমির মাঝে তিনি বসে আছেন, সামনে পাঁচখানা উট বসে গপ্পো করছে। পেছনে পাঁচখানি মুর্গি দড়ি দিয়ে বাঁধা। গম্ভীর গলায় উটদের আদেশ দিলেন তিনি, ‘গপ্পো না করে যাও গিয়ে মুর্গিগুলির পালক ছাড়িয়ে নিয়ে এসো’।

গুরুবাক্য শিরোধার্য। উল্কাপটাশ ও তার চারজন অনুচর গেল পালক ছাড়াতে। কিন্তু কাজটা দেখা গেল মোটে সহজ না। একটি মুর্গির পালক ধরে টান দিতেই সে খেঁকিয়ে উঠল। বাকি মুর্গিরাও সম্মিলিত খ্যাঁক ধ্বনি তুলে এরকম অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাল। বাচ্চারা ভয়ে স্যারের কাছে অভিযোগ জানাতে এল। সমস্বরে কাতরোক্তি, ‘কামড়াতে আসে যে।’

স্যার বিভোর হয়ে বল্লেন, ‘তোমরাও কামড়াও’।

দু-একবার বিফল চেষ্টা শেষে উল্কাপটাশ জানাল, কামড়ানো যাচ্ছে না। সরে সরে পালাচ্ছে। খুব সেয়ানা।

‘লাগাও দু-চারটে ঘুষি। ব্যাটাদের পিটিয়ে সিধে করে দাও’।

যেই বলা সেই কাজ। ভুলো নামক বালকটি দু-চারটি ঘুষি চালাল তাক করে, সবকটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। তারপর মারল একটি কিল। সে কিল মাটিতে গিয়ে পড়ল। ধুপধাপ শব্দ পেয়ে মন্ত্রমুগ্ধ স্যার ঘুমুঘুমু স্বরে ফের বলে উঠলেন,

‘এই তো। এভাবেই হবে। চালিয়ে যাও সকলে’।

আরও কিছুক্ষণ ব্যর্থ কিল-ঘুষিচর্চার পর ছেলেরা কাঁদোকাঁদো স্বরে বললে, ‘কিছুই হচ্ছে না যে স্যার। মুর্গিগুলো ক্যামন ভেংচি কাটছে।‘

‘তোমরাও কাটো’। পূর্ববৎ সংক্ষিপ্ত জবাব স্যারের।

বিস্তর ভেংচি কাটা চলল, সঙ্গে গালাগালিও চলতে লাগল প্রচুর পরিমাণে। ফোকলা বাদুড়, ল্যাজকাটা পিঁপড়ে, মুর্গিগুলিকে উদ্দেশ করে কত অপবাক্য। স্যার যাতে না শুনতে পায় সেজন্যে আস্তে আস্তেই বলছিল সবাই। মুর্গিগুলি দিব্যি শুনতে পাচ্ছিল, কিন্তু তারা নির্লিপ্ত। পালক বর্জনে কারোর বিন্দুমাত্র উৎসাহ আছে বলে মনে হল না।

‘কই রে, হল তোদের ?’

‘না স্যার। বড় অবাধ্য। পালক ছাড়াতে দিচ্ছে না’।

‘আচ্ছা। ঘড়ররর... একটু অপেক্ষা কর। গালমন্দ দে যেমন দিচ্ছিলি (‘এই রে, স্যার শুনতে পেয়ে গেছে’)। দুঃখে অপমানে কিছুক্ষণ পরেই মরে যাবে। এমনিতে মুর্গির গড় আয়ু কত যেন রে... ঘড়রররর ঘড়ররর...’

স্যারের নাক ডাকতে শুরু করে। ছেলেরা হিসেব কষতে থাকে মুর্গি কদ্দিন বাঁচে, পিকনিক চলাকালীন ওগুলির পরলোকগমনের কোনও সম্ভাবনা আছে কিনা। আর সে সম্ভাবনা যদি না-ই থাকে, তবে আর অন্য কী উপায়ে পালক ছাড়ানো যেতে পারে। পালক না ছাড়িয়ে বুঝি মুর্গি রাঁধা যায় না ? কী সব্বনাশ। অনেক ভেবে-টেবেও কিছু উপায় খুঁজে না পেয়ে সকলে হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করে। সবচেয়ে বাচ্চা ছেলেটি হাতজোড় করে মুর্গিগুলির পায়ের কাছে শুয়ে পড়ে।

‘দয়া করো মুর্গিবাবা...’

‘হালুম !’

পাঁচটি মুর্গি ডেকে উঠল একসঙ্গে। শব্দের তেজে বালক সম্প্রদায় ছিটকে পড়ল এদিক-ওদিক। ধড়মড় করে উঠে বসলেন স্যার। এতক্ষণে তাঁর ঘোর ভাঙল; ফিরে এলেন বাস্তব জগতে।

‘কী রে, কী হল রে। এত চিৎকার কেন ?‘ তারপর চারদিকে তাকিয়ে খুব অবাক হয়ে গেলেন উনি। ‘এ কি ! সবাই ঘুমিয়ে আছিস কেন। আর মুর্গিগুলোর এখনো কিছু ব্যবস্থা করিসনি ! অকর্মণ্যের দল যত!‘

ভূমিশয্যা ছেড়ে পাঁচজন অকর্মণ্য উঠে আসে। গুটি-গুটি পায়ে তারা স্যারের পাশে এসে দাঁড়ায়। উনি মুর্গিগুলির কী ‘ব্যবস্থা’ করেন, বা ঠিক কোন কার্য-পরম্পরায় সেই ‘ব্যবস্থা’ সম্পূর্ণ হয় তা জানার জন্য সকলে খুব উদ্গ্রীব ছিল। স্যার প্রথমেই মুর্গিগুলির পা থেকে দড়ি খুলে দিলেন। আর খোলা মাত্রই –

বিশাল ঝটাপটি। সবচেয়ে ধেড়ে মুর্গিটি ক্যাঁকোর-কোঁ ডাক ছেড়ে প্রবল ডানার ঝাপটায় স্যারকে পাশের কড়াইয়ের মধ্যে ফেলে দিল। বাকি মুর্গিগুলি ছাড়া পেয়ে সোজা তেড়ে গেল বালকগণের দিকে। এতক্ষণ মুখ বুজে ভেংচি গালাগালি সব সহ্য করেছে। এবার তাদের পালা। সে এক দৃশ্য। পাঁচটি অবোধ বালককে সারা মাঠ জুড়ে তাড়া করে চলেছে চারখানি অগ্নিশর্মা মুর্গি। উদ্যত তাদের ঠোঁট। একবার ধরতে পেলেই ঘ্যাঁক করে কামড়ে দেবে। একটি মুর্গি রইল স্যারের দায়িত্বে। তিনি কড়াই থেকে ওঠার সামান্যতম চেষ্টা করলেই সে ডানা ঠোঁট আর রক্তচক্ষু বাগিয়ে তাঁকে নিরস্ত করছে।

এদিকে দৌড়ে দৌড়ে গোটা মাঠ বারচারেক প্রদক্ষিণ হয়ে গেল, ছেলের দল হাঁপিয়ে অস্থির। কিন্তু মুর্গিগুলির বিন্দুমাত্র আলস্য নেই। তারা প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর। ছুটতে ছুটতে মাঠের আলের একটি গর্তে পা পড়ে উল্কাপটাশের গোড়ালি মুচকে গেল। সে ধুলোয় গড়িয়ে গড়িয়ে হাতপাঁচেক এগিয়ে মাটির উপরেই এলিয়ে পড়ল। ধুলোয় ধূসরিত তার গোটা শরীর। যেন ডিপ ফ্রিজ থেকে সদ্য বের করে আনা বরফাবৃত পেঙ্গুইন, এত সাদা। মুর্গির দল মহারথী-প্রথায় বিশ্বাসী। অসহায় ও আত্মসমর্পিত উল্কাপটাশের উপর আর আক্রমণ না শানিয়ে বাকি ছেলেগুলির দিকে মনযোগী হল তারা। কিন্তু উল্কাপটাশের পতনের সুযোগ নিয়ে ততক্ষণে বাকি বালকগুলি মুর্গিদের ফাঁকি দিয়ে মাঠ ছেড়ে বড় রাস্তা ধরে নিজের নিজের ঘরের দিকে দৌড় মেরেছে।

মাঠে আছেন খালি বাংলার স্যার; তাও আবার কড়াইয়ের মধ্যে। পাঁচটি মুর্গি সেই কড়াইয়ের চারপাশে জড়ো হল। উল্কাপটাশ মাটিতে শুয়ে শুয়ে দেখতে লাগল, এ কী অমোরগিক কাণ্ড! মুর্গিগুলি কাটা শাকসবজি ফেলছে কড়াইয়ের মধ্যে। একটি মুর্গি এসে সামান্য নুন ছিটিয়ে দিল। একজন দিল গোলমরিচ। কড়াই থেকে একটি হ্যাঁচ্ছো ধ্বনি ভেসে এল।

এবার কি ওরা স্টোভ জ্বালাবে ! ভেবেই উল্কাপটাশ ভয়ে সিঁটিয়ে গেল। সবকিছু সম্ভব এখন। পিকনিক এখন সম্পূর্ণরূপে মনুষ্যেতর প্রাণীদের অধীনে। তার কিছু করার নেই। বেলা বাড়লে নাকি হেডস্যার আসবেন। উল্কাপটাশ দেখল এখনও দুটি প্রকাণ্ড হাঁড়ি ফাঁকা পড়ে রয়েছে। মুর্গিদের উৎসাহ দেখে তার আর বুঝতে বাকি রইল না, ওর মধ্যে একটি হাঁড়িতে অনায়াসে হেডস্যারের ‘ব্যবস্থা’ হয়ে যাবে। আর শেষ হাঁড়িটায়...

কী বিপদ ! ডাক ছেড়ে কাঁদতে গিয়ে উল্কাপটাশ দেখল তার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরুচ্ছে না। পিকনিকে এসে এ কী ঝঞ্ঝাটে পড়তে হল ! শেষে মুর্গিদের পেটে যেতে হবে নাকি গো। কুঁইকুঁই করে একটি আওয়াজ বেরিয়ে এল তার গলা দিয়ে। আর তখনই –

মাঠের পাশের বাঁশবন থেকে শোনা গেল হাড় হিম করা একটি হুহুঙ্কার ধ্বনি। উল্কাপটাশ চমকে উঠল। মুর্গিগুলিও কাজ থামিয়ে পেছন ফিরে তাকাল। কিন্তু কারোর দেখা নেই। কয়েক সেকেন্ড পর আবার একটি হুঙ্কার আর তার পরেই বন থেকে তীরের মতো ছুটে এল একটি জীব। মাঠের মধ্যে ঢুকেই পালের গোদা মুর্গীটিকে এক ঢুঁসো মেরে উল্টে ফেলে দিল, আর তার বিকট গররর শব্দের গর্জনে মুর্গির দল ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল।

এ কি ! এ যে সেই সজারু ! উল্কাপটাশ চমকে গেল। কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল তার মন। এই চরম সঙ্কটের মুহূর্তে, যখন প্রাণ নিয়ে টানাটানি, তখনই পরিত্রাতা হয়ে এল তার সেই পুরনো দিনের সঙ্গী সজারুটি - যাকে কিনা তার বাবা একদা কান ধরে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন! আবেগে তার গলা বুজে এল। ঠিক করল, আজ এই বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েই সজারুকে সসম্মানে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে সে। বাবা-মাকে শোনাবে এই বীরত্বের কথা। সবাই মুগ্ধ হয়ে যাবে। চারণকবিরা বীর সজারু নিয়ে গান লিখবে। দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পড়বে সেই গান।

মুর্গির দল পুনরায় সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে সজারুটিকে ঘিরে ধরেছে চারধার থেকে। ডানা বাগিয়ে, ঝুঁটি নাড়িয়ে, ঠোঁট উঁচিয়ে তারা একসঙ্গে ঝাঁপ দিল সজারুর উপর। মাঠ জুড়ে আরেকটি দাপাদাপি। ক্যাঁক, ঘেউ, হিঁকহিঁক, কিচকিচ, ধুপধাপ, দড়াম, ধাঁই ধপাধাপ, গদাম, ঘ্যাঁক নানাবিধ শব্দ পরিবেশকে উত্তাল করে তুলল। পাঁচ মুর্গি বনাম এক সজারু। এই প্রবল রোমাঞ্চকর যুদ্ধের সাক্ষী হয়ে থাকল উল্কাপটাশ আর কড়াইয়ে নিমজ্জিত বাংলার স্যার। ধীরে ধীরে মুর্গিদলের পশ্চাদাপসারণ ঘটতে থাকে। কাঁটার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে তারা অনতিবিলম্বে রণে ভঙ্গ দ্যায়।

কিছুক্ষণ পর দেখা যায়, রক্তাক্ত শরীর নিয়ে পাঁচখানি মুর্গি মাঠ ছেড়ে দৌড়ে পালাচ্ছে। বীর সজারু যুদ্ধজয় শেষে আলুর বস্তায় ঠেস দিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। স্যার ভয়েভয়ে কড়াই থেকে মাথা তুলে চারপাশে তাকাচ্ছেন। আর উল্কাপটাশ ততক্ষণে মনে মনে সজারুগর্বে অস্থির।

সজারু উঠে দাঁড়াল। আলুর বস্তা থেকে একটি আলু বের করে কচমচ শব্দে চিবুতে লাগল। খাওয়া শেষ করে একবার তাকাল উল্কাপটাশের দিকে। তার অভিমানী চোখে দু-ফোঁটা জল। কষ্ট করে মুখে একটু হাসির ভঙ্গি ফুটিয়ে তুলে, উল্কাপটাশকে একটি সেলাম ঠুকে সে নিজের ছোট্ট ছোট্ট ডানাদুটি মেলল, তারপর 'আবার আসিব ফিরে' আবৃত্তি করতে করতে উড়ে চলল নীল আকাশের দিকে।

উপরে তাকিয়ে যতক্ষণ দেখা গেল উড়ন্ত সজারুকে, ততক্ষণ তাকে দেখতে থাকল উল্কাপটাশ; তারপর সেই জীব ক্রমে উপর থেকে আরও উপরে উঠে, শেষে যখন একেবারে বিন্দু হয়ে মিলিয়ে গেল আকাশের গায়ে, তখন সে মাথা নামিয়ে নিল।

(শেষ)

শেয়ার করুন


Avatar: cm

Re: 'হারানো সজারু'

দারুণ
Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: 'হারানো সজারু'

বাপ্রে!

একটু রয়েসয়ে ...মানে ধারাবাহিকে লিখতে পারতেন। উড়ুক
Avatar: দ

Re: 'হারানো সজারু'

হা হা হা হা দারুণ!


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন