Sutapa Das RSS feed

Sutapa Dasএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ভাঙ্গর ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা প্রসঙ্গে
    এই লেখাটা ভাঙ্গর, পরিবেশ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা প্রসঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে নানা স্ট্যাটাস, টুকরো লেখায়, অনলাইন আলোচনায় যে কথাগুলো বলেছি, বলে চলেছি সেইগুলো এক জায়গায় লেখার একটা অগোছালো প্রয়াস। এখানে দুটো আলাদা আলাদা বিষয় আছে। সেই বিষয় দুটোয় বিজ্ঞানের সাথে ...
  • বিদ্যালয় নিয়ে ...
    “তবে যেহেতু এটি একটি ইস্কুল,জোরে কথা বলা নিষেধ। - কর্তৃপক্ষ” (বিলাস সরকার-এর ‘ইস্কুল’ পুস্তক থেকে।)আমার ইস্কুল। হেয়ার স্কুল। গর্বের জায়গা। কত স্মৃতি মিশে আছে। আনন্দ দুঃখ রাগ অভিমান, ক্ষোভ তৃপ্তি আশা হতাশা, সাফল্য ব্যার্থতা, এক-চোখ ঘুগনিওয়ালা, গামছা কাঁধে ...
  • সমর্থনের অন্ধত্বরোগ ও তৎপরবর্তী স্থবিরতা
    একটা ধারণা গড়ে ওঠার সময় অনেক বাধা পায়। প্রশ্ন ওঠে। সঙ্গত বা অসঙ্গত প্রশ্ন। ধারণাটি তার মুখোমুখি দাঁড়ায়, কখনও জেতে, কখনও একটু পিছিয়ে যায়, নিজেকে আরও প্রস্তুত করে ফের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। তার এই দমটা থাকলে তবে সে পরবর্তী কালে কখনও একসময়ে মানুষের গ্রহণযোগ্য ...
  • ভি এস নইপাল : অভিবাসী জীবনের শক্তিশালী বিতর্কিত কথাকার
    ভারতীয় বংশদ্ভূত নোবেল বিজয়ী এই লেখকের জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের ত্রিনিদাদে, ১৯৩২ সালের ১৭ অগস্ট। পরে পড়াশোনার জন্য আসেন লন্ডনে এবং পাকাপাকিভাবে সেতাই হয়ে ওঠে তাঁর আবাসভূমি। এর মাঝে অবশ্য তিনি ঘুরেছেন থেকেছেন আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, ভারত সহ ...
  • আবার ধনঞ্জয়
    আজ থেকে চোদ্দ বছর আগে আজকের দিনে রাষ্ট্রের হাতে খুন হয়েছিলেন মেদিনীপুরের যুবক ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়। এই "খুন" কথাটা খুব ভেবেচিন্তেই লিখলাম, অনেকেই আপত্তি করবেন জেনেও। আপত্তির দুটি কারণ - প্রথমতঃ এটি একটি বাংলায় যাকে বলে পলিটিকালি ইনকারেক্ট বক্তব্য, আর ...
  • সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে এখনো শ্রমদাস!
    "সেই ব্রিটিশ আমল থেকে আমরা অন্যের জমিতে প্রতিদিন বাধ্যতামূলকভাবে মজুরি (শ্রম) দিয়ে আসছি। কেউ মজুরি দিতে না পারলে তার বদলে গ্রামের অন্য কোনো নারী-পুরুষকে মজুরি দিতে হয়। নইলে জরিমানা বা শাস্তির ভয় আছে। তবে সবচেয়ে বেশি ভয় যেকোনো সময় জমি থেকে উচ্ছেদ ...
  • অনুপ্রদান
    শিক্ষাক্ষেত্রে তোলাবাজিতে অনিয়ম নিয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেন শিক্ষামন্ত্রী। প্রসঙ্গত গত কিছুদিনে কলেজে ভর্তি নিয়ে তোলাবাজি তথা অনুদান নিয়ে অভিযোগের সামনে নানা মহল থেকেই কড়া সমালোচনার মুখে পরে রাজ্য সরকার।শিক্ষামন্ত্রী এদিন ...
  • গুজবের সংসার
    গুজব নিয়ে সেই মজা নেওয়া শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু চারটা লাশ আর চারজন ধর্ষণের গুজব কি গুজব ছিল না? এত বড় একটা মিথ্যাচার, যার কারনে কত কি হয়ে যেতে পারত, এই জনপথের ইতিহাস পরিবর্তন হয়ে যেতে পারত অথচ রসিকতার ছলে এই মিথ্যাচার কে হালকা করে দেওয়া হল। ছাত্রলীগ যে ...
  • মহামূর্খের দল
    মূল গল্প : আইজ্যাক আসিমভরাইগেল গ্রহের যে দীর্ঘজীবী প্রজাতির হাতে এই গ্যালাক্সির নথিপত্র রক্ষণাবেক্ষণের ভার, সে পরম্পরায় নারন হল গিয়ে চতুর্থজন ।দুটো খাতা আছে ওনার কাছে । একটা হচ্ছে প্রকাণ্ড জাবদা খাতা, আর অন্যটা তার চেয়ে অনেকটা ছোট । গ্যালাক্সির সমস্ত ...
  • মানুষ মানুষের জন্য?
    স্মৃতির পটে জীবনের ছবি যে আঁকে সে শুধু রঙ তুলি বুলিয়ে ছবিই আঁকে, অবিকল নকল করা তার কাজ নয়। আগেরটা পরে, পরেরটা পরে সাজাতে তার একটুও বাঁধেনা। আরো অনেক সত্যের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনস্মৃতির আরম্ভেই এই ধ্রুব সত্য মনে করিয়ে দিয়েছেন। কথাটা মনে রেখেই ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

মাতৃরূপেণ

Sutapa Das

আমার বাবাকে জীবনকালে , আমার জ্ঞান ও বিশ্বাসমতে, থানায় যেতে হয়েছিলো একবারই। কোনো অপরাধ করায় পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছিলো তা নয়, নিছক স্নেহের আকুল টান বাবাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলো 'মামা'দের মাঝে।
2007 সাল। তখন এপ্রিল মাস। 14ই মার্চ ঘর ছেড়ে মাসতুতো বোনের বাড়ী চলে আসবার পর, 17 তারিখ আমার বড়কন্যেকে তার ইচ্ছাক্রমে আমার কাছেই আনতে , জলপাইগুড়ি যাই বাবার বাড়ীতে, যেখানে তারা দুইবোন অ্যানুয়াল পরীক্ষা শেষে অভয়ারণ্যে বিচরনের আনন্দ উপভোগ করছিলেন। তো, বড়মেয়েকে নিয়ে আমি বেড়োলাম উকিলের সাথে দেখা করতে, আর ছোটোমেয়ে কে বলে গেলাম সাবধানে থাকতে, সে তখন সাড়ে আট মোটে!! ফিরছি যখন কোর্ট থেকে, করলা নদীর ব্রিজের ওপর পাশ কাটিয়ে গেলো এক বাইক আরোহী (মেয়ের বাবা) আর পিছে জাপটে বসা আমার প্রানভোমরা, ছোটমেয়ে। আমার সাময়িক অনুপস্হিতিতে, আমার বাবামায়ের ভদ্রতার সুযোগ নিয়ে, গৃহত্যাগিনী স্ত্রীকে উচিত শিক্ষা দিতে, ছোটমেয়েকে আদর করে ভুল বুঝিয়ে আমারই বাবার বাড়ী থেকে তুলে নিয়ে গেছে তাদের 'বায়োলজিক্যাল ফাদার'।
শুরু যন্ত্রণার, শুরু লড়াইয়ের, শুরু নিজের সহ্যশক্তিকে প্রতিদিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করানোর। ছোট ছিলো এপিলেপ্সির পেশেন্ট, একা উপার্জন করে, এমনকি ধারদেনা করেও তাকে নিয়ে সেসময়েই দুবার চেন্নাই পাড়ি দেওয়া হয়ে গেছে পেডিয়াট্রিক নিউরোলজিস্টের পরামর্শ ও চিকিতসা পেতে, যে বিশেষজ্ঞ তখনো কোলকাতায় অমিল। তার ঔষধ একদিনও বাদ পড়বার যো ছিলো না, আর যে মেয়ে কখনো মা ছেড়ে অথবা উল্টোটাও সত্যি, তাদের পরস্পরকে ছেড়ে থাকার কষ্ট ঠিক কি কি শব্দ সাজালে বোঝানো যায় আমার জানা নেই। মেয়েদের রেজাল্ট মার্চের শেষে, জলপাইগুড়ি বাসস্ট্যান্ডে নেমে শুনলাম ছোটমেয়ে এসেছে মামাবাড়ীতে রেজাল্ট দেখাতে, আমি পৌঁছানোর আগেই তাকে সরিয়ে নেওয়া হলো যাতে দেখা না হয়। আজও, আজও, এটুকুর বেশী,সে সময়কে ফিরে দেখতে গেলে আমার শরীর খারাপ করতে থাকে, সেই রাতের পর রাত এগারোটায় ফোন করে 45 সেকেন্ডের আওয়াজ যেন শুনতে পাই , 'খাইনি এখনো' , আগুন ছড়িয়ে দেয় আমার শিরায় শিরায়। এমন সব শেকড়-ছেড়া অভিজ্ঞতাই পেশাদার খুনী হবার প্রথমপাঠ দেয় মানুষকে, মনে হয় আমার।
কেন আমি খুনীও হয়ে উঠতে পারিনি তবে?
25শে এপ্রিল,বেলা এগারোটা। আমাদের স্কুলগুলোর বার্ষিক পরীক্ষা শেষে অ্যাকাডেমিক ইয়ারএন্ডিং চলছে। আমার সন্তানদের বাবাকে ফোন করে জানতে পারি, ছোটমেয়ে অসুস্হ। তার সাথে কথা বলতে পারা যাবে না। আমি অনুরোধ করলাম, আমার তো ছুটি চলছে কয়েকদিন মেয়ে আমার কাছে এসে থাকুক , সেরে উঠুক আমি ওকে ফিরিয়ে দিয়ে আসবো। বলা দরকার, এর আগেই বুকে পাথর চেপে মিউচুয়াল ডিভোর্সের একটা এগ্রিমেন্ট সই করেছি আমি, যেখানে ছোটমেয়ের কাস্টোডি থাকবে তার বাবার, আর মা ভিজিটিং রাইট পাবে বলা হয়েছে। বেশ কয়েকবার বলেও মেয়েকে কথা বলতে তো দেয়া হলোই না, অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে সেই বছর ষোলো আমার অন্নে প্রতিপালিত জীবটি বললেন, ওকে(মেয়েকে) যেতে টেতে দেওয়া যাবে না!! নিজের শিক্ষা দীক্ষা, রুচিবোধ সব একঝটকায় সরিয়ে ফেলে, ভয়েই থাকা আমার ভেতর থেকে লাফ দিয়ে যেন বেরিয়ে এলো সেই মা বাঘিনী, কেটে কেটে, স্পষ্ট উচ্চারনে শ্লীলতার সব সীমা পার করে ফোনেই বিষাক্ত তীরের মত, তপ্ত শীশার বুলেটের মত, শব্দ গুলো উগরে দিয়েছিলাম মুঠোফোনেই, "আমার মেয়েকে আমার কাছেই নিয়ে আসবো আমি, তোর বাপেরও যদি দম থাকে, আটকে দেখায় যেন"! শ্রাবনজাতার সহ্যের বাঁধ সদর্থেই ভেঙ্গেছিলো সেদিন, প্লাবন তো ছিলো সময়ের অপেক্ষা।
'বলা যত সহজ, কার্যক্ষেত্রে করে দেখানো তার কয়েকগুণ বেশী কঠিন', জীবনের সবক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। শিলিগুড়ির উকিলবাবু বুদ্ধি দিলেন, থানায় গিয়ে তার পরিচিত অফিসারকে অ্যাপ্রোচ করতে, এ ব্যাপারে সাহায্য করবার জন্যে। যদি কাজ না হয় সেজন্যে প্ল্যান 'বি', 'সি' সব ভাবাও হলো। সর্বশেষ বুদ্ধি হিসেবে মিডিয়াকেও ইনভলভ করতে হবে ঠিক হলো। তো, সেদিনই পাড়ি দিলাম জলপাইগুড়ি, সোজা সদর কোতয়ালীতে, যেখানে মাসখানেক আগেই নিজের ও সন্তানদের নিরাপত্তা চেয়ে লিখিত আবেদন জানিয়েছি আমি, ঘর ছেড়ে চলে আসবার ঠিক পরপর। উকিলবাবুর অফিসার বন্ধু সমস্ত সমস্যা মন দিয়ে, সময় নিয়েই শুনলেন। তারপর কার্যকরী সুবুদ্ধি দিলেন। রাজনৈতিক যোগাযোগ থাকায় আমার শ্বশুরবাড়ী পুলিশ দিয়ে বাচ্চাকে নিয়ে আসা রুখে দেবেই, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি পরামর্শ দিলেন এস ডি এম কোর্টে মেয়েকে কাছে চেয়ে আবেদন জানাতে।সেদিন ফিরতে হলো খালিহাতে, কিন্তু মনের জোর রইলো অটুট। রাতেই উকিলবাবু, জলপাইগুড়িতে যে শিখন্ডী উকিলকে দিয়ে ফাইল করা হবে স্যুট তার খোঁজখবর নিলেন। পরদিন বেলা দশটায় বড়কন্যে আর মাসতুতো বোন, যে আমার লড়াইটায় আগাগোড়া নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে গেছে, চললো আমার সাথে জলপাইগুড়ি। সারাবেলা শেষে সে আবেদনের বয়ান সারা হলো, ঠিক হলো পরদিন, 27 তারিখ শুক্রবার তা পেশ হবে এস ডি এম কোর্টে। আপাত-শান্ত মুখে , বাবা মায়ের কাছে সেরাত তিনজনেই থেকে গেলাম আমরা। হালকা হাসির আড়ালে আমার জ্বলতে থাকা তুষ-আগুনের আঁচ বোধহয় সে রাতে টের পেয়েছিলেন এক সত্তরোর্ধ যুবক, আমার বাবা।
পরদিন, আইনি পদক্ষেপ। খুব সাবধানতায় , যাতে প্রতিপক্ষ কোনোভাবে বুঝতে না পারে ঠিক কি করতে চলেছি আমি, তাই অন্যসূত্রে খবর নিচ্ছি মেয়ের, মানে ঐ কিছু স্বজন থাকেন কিনা, যাদের ভালোবাসার সবটুকুতেই থাকে প্রতিপক্ষ, তাদের মাধ্যমে, নিমতিতো ভাবকে লুকিয়ে সুগারকোটেট হয়ে অযাচিত আলাপ বাড়িয়ে। জানা কথা তারা আমায় মেয়ের খবর শুনিয়ে বিমল আনন্দ পাবেন! মহামান্য আদালত অর্ডার দিলেন, পরদিনই মেয়েকে তার বাড়ী থেকে 'উদ্ধার' করে কোর্টে উপস্হিত করবে পুলিশ। সেদিন শুক্রবার, পরেরদিন, পরের কার্যদিবস, মানে সোমবার, 30 শে এপ্রিল।
জানা ছিলো, এবার শিখন্ডী উকিলের সাহায্যে হবে না, আসরে নামতে হবে শিলিগুড়ির উকিলবাবুকেই, কারন স্হানীয় প্রতিপত্তি খাটিয়ে আমার স্হানীয় উকিলকে 'ম্যানেজ' করা তেমন বড় ব্যাপার নয় আমার শ্বশুরবাড়ীর পক্ষে। কিন্তু এই উকিলবাবুর ফী, যাতায়াতের গাড়ীভাড়া!! হাতের নোয়া বাঁধানো, শৃঙ্খলিত বিবাহসম্পর্কের প্রতীক কাজে এলো। বিক্রি করে জোগাড় হলো টাকা, শণিবার, 29শে এপ্রিল। এবার শুধু প্রহর গোনা,অপেক্ষা। রবিবারের শেষ বাস ধরে শিলিগুড়ী থেকে জলপাইগুড়ী । রাতে পিত্রালয়বাস। ভোরবেলা নিজে থেকেই ঘুম ভেঙে গেলো, কেমন এক প্রশান্তির নির্লিপ্তি মনে! আসল লড়াইটা যে এখনি শুরু হবে, এখনই অমন শান্তি অনুভবের সময় নয়। দ্রুত নিজেকে গুছিয়ে নিতে শুরু করি, আমি , বড়মেয়ে, তার মাসি সকলে ছটার মধ্যেই থানায়। বাবা উতকন্ঠিত, কিন্তু প্রকাশ্যে নিরুত্তাপ, অপেক্ষমান বাড়ীতে।

পুলিস সেদিন যে সাহায্য করেছিলো তা না স্বীকার করলে অন্যায় হবে। অর্ডার ছিলো আমার ফেলে আসা ‘নিজের’ বাড়ী থেকে ছোটমেয়েকে নিয়ে এসে কোর্টে তুলতে হবে, বিচারক তার সাথে কথা বলবেন।30 তারিখ সোমবার, এপ্রিল 2007 আমার ছেড়ে আসা বাড়ীতে পুলিস সহ মেয়ে খুঁজতে গিয়ে পাওয়া গেলো না। আমরা জানতাম, পুলিসকেও জানিয়েছিলাম পাওয়া যাবেও না। মেয়ে তো হাকিমপাড়ায় তার বড়পিসির বাড়ী থাকে, তার বাবা জোর করে নিয়ে গেছে বটে, কিন্তু তার দেখভাল , স্কুলের দায়িত্ব তার ঠাকুর্দা ঠাকুমা নেয়নি, বাবার তো সে যোগ্যতাই নেই, তাই মাকে ফিরিয়ে আনতে মেয়েকে অনাথের মত থাকতে হয়েছে পিসির বাড়ীতে। পুলিসভ্যান ঘুরে রওনা হলো পিসির বাড়ী, অর্ডার নেই কিন্তু সেখান থেকেই মেয়েকে তুলে সোজা থানায়। পুলিসকাকুদের অনুমতি নিয়ে জানানো হলো দাদুকে। বাবা , সরভাজা আর পনীরের ঝোল দিয়ে ভাত মেখে টিফিনবক্স নিয়ে জীবনে প্রথমবার, একমাত্রবার, থানায় প্রবেশ করলেন তার ছোট নাতনীকে দেড়মাস পর নিজের হাতে খাইয়ে দেবেন বলে। ছোটমেয়ে কাঁদছে দাদুকে দেখে, দিদিকে পেয়ে সে কি খুশী, কিন্তু এমন মগজধোলাই হয়েছে, মায়ের কাছে আর ঘেঁসে না!! একটি সাড়ে আট বছরের বাচ্চা মেয়ে ,শারীরিকভাবে অসুস্হ, তার মানসিক নির্যাতিত অবস্হা পুরোপুরি ম্যাপ করার মানসিক স্হিরতা আমার সেদিন ছিলো না, স্বীকার করি।
সে পর্ব থাক, পরবর্তী ঘটনাক্রমে ফিরে আসি। বেলা আড়াইটে, এস ডি এম কোর্ট। নিয়মমাফিক পুলিস ‘প্রোডিউস’ করলো মেয়েকে কোর্টে।তার অসুস্হতার সব প্রমাণ দাখিল হোলো, মা তাকে প্রতিপালনে সক্ষম ও ইচ্ছুক প্রমান দাখিল হোলো। তাকে জিজ্ঞেস করা হোলো সে কার সাথে থাকে, মায়ের কাছে সে থাকতে চায় কিনা । মেয়ে নিশ্চুপ, তার বাবা আসন্ন জয়ে উতফুল্ল, আমার শিলিগুড়ির উকিলবাবুর কপালে তিনছড়া গভীর রেখা , আমার হার্টবিট শুধু আমি কেন, সব্বাই শুনছে, বিচারক শেষবার জানতে চাইছেন ‘তবে তুমি কার সাথে থাকবে?’ রিনরিনে স্পষ্ট গলায় এতক্ষন চুপ করে থাকা ‘রোমি’ এবার উত্তর দিলো , ‘আমি দিদির সাথে থাকবো’। দ্রুত সিদ্ধান্ত শোনালেন ম্যাজিস্ট্রেট, মেয়ের শারীরিক অবস্হা বিবেচনায় তাকে একমাস মায়ের কাছে রাখার নির্দেশ দেওয়া হলো।ফিরলাম সে সন্ধ্যায় মেয়ে কোলে প্রথমে পিত্রালয়ে, তারপর শিলিগুড়ির বাসায়।

পরবর্তী গল্পটি আরও মজাদার। মাসশেষে উকিলের পরামর্শে নিউরোলজিস্টের বেটার ট্রীটমেন্টের সার্টিফিকেটসহ কোর্টে গিয়ে শুনি সেদিন তিনি অনুপস্হিত, দিনদশেক পরে উপস্হিতি আবার। পরদিন গিয়ে শুনি মেয়ের বাবা কেসটি ‘পুট আপ’ করে আবার নিজেরাই ‘ড্রপ’ করে গেছে। সন্তানের দায়িত্ব সে বহন করতে অনিচ্ছুক সে আজ, যেমন সন্তান জন্মের আগেই মেয়ে জন্মাবে এই অভিমানে কথা বন্ধ করেছিলো হবু মায়ের সাথে আচমকা, এবারও আচমকাই তার দাবী ছেড়ে দিয়ে আমার জীবন আমায় ফিরিয়ে দিয়ে গেছে সে।
আর ডানা মেলতে দুবার ভাবতে হয়নি আমায়, আমার দুটি মেয়ে, আমার দু ডানা,তাতে ভর করে উড়ানে সামিল আমি আজও, বুক ভরে নিচ্ছি মুক্ত বাতাস।

শেয়ার করুন


Avatar: Sutapa Das

Re: মাতৃরূপেণ

Udan dirghojibi hok !
Avatar: de

Re: মাতৃরূপেণ

দমবন্ধ হয়ে যায় আপনার লেখা পড়লে -
Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: মাতৃরূপেণ

সেল্যুট!

আর কিছু লেখার ভাষা নেই। শুভ ♥
Avatar: T

Re: মাতৃরূপেণ

এই রকম কাছাকাছি অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেলাম সম্প্রতি। এখনও যাচ্ছি। উকিল পুলিশদের পয়সা খাওয়া, কোর্ট কাছারির অসম্ভব ডিলে, বিবিধ মামলা মোকদ্দমা, আত্মীয় পরিজনদের একাংশের ষড়যন্ত্র ইত্যাদি। নিস্তার পেয়েছেন এ এক বিশাল বিজয়।
Avatar: স্বাতী রায়

Re: মাতৃরূপেণ

ওড়ার জন্য সারা পৃথিবী থাক আপনার জন্যে। লেখাটা অনবদ্য। পুরোন কষ্টরা যেন মনেও ফিরে না আসে, এই চাই।
Avatar: dc

Re: মাতৃরূপেণ

অসাধারন। শেষটা পড়ে খুব ভাল্লাগলো।
Avatar: Sutapa Das

Re: মাতৃরূপেণ

ধন্যবাদ সবাইকে, আমার আবেগের ভাগীদার হওয়ার জন্যে। এই লড়াইগুলো আমাকে 'আমি' হয়ে উঠতে শিখিয়েছে, কর্মক্ষেত্রে কুশলী লড়াকু করে তুলেছে। ঘর ছেড়ে না বের হলে তো জানতেও পারতাম না আমি রান্না আর বাচ্চা মানুষ করা ছাড়া একটা সংসারও চালানোর ক্ষমতা রাখি!!
Avatar: kihobejene

Re: মাতৃরূপেণ

khub bhalo laglo ... thank you for sharing ... apnar experience onnoder sahajyo koruk
Avatar: nabanita

Re: মাতৃরূপেণ

বাপরে, কী সাংঘাতিক লড়াই। সাহস আর ক্ষমতা দুই মিলিয়ে সফল উড়ানকে অনেক অনেক অভিনন্দন।
Avatar: Arindam

Re: মাতৃরূপেণ

অজস্র অভিনন্দন আপনাকে! আপনার মেয়েরা ভাগ্যবতী - আপনাকে আদর্শ হিসেবে সামনে পাচ্ছে - তাদের ও অভিনন্দন! আপনার ছোটকন্যার দ্রুত আরোগ্য কামনা করি!
Avatar: দ

Re: মাতৃরূপেণ

অনেক ভালবাসা আর শুভেচ্ছা রইল আপনার জন্য। আগের পরবও পড়েছিলাম, মন্তব্য করা হয় নি। লিখে যান, আপনার লড়াই জানুক সবাই। অন্যায় যে মেনে নিতে নেই এটা অনেকেই বোঝে না। '
আবারও অনেক শুভেচ্ছা।
Avatar: Swati

Re: মাতৃরূপেণ

খুব ভালো থাকুন মেয়েদের নিয়ে..... এই শুভেচ্ছা রইলো।
Avatar: Sutapa Das

Re: মাতৃরূপেণ

দুই ডানায় ভর দিয়ে মনের আনন্দে আপনি উড়ে চলুন সব বাধাকে অতিক্রম করে | সমতলে দাঁড়িয়ে আপনার উড়ানকে কুর্ণিশ জানাই |
Avatar: Sutapa Das

Re: মাতৃরূপেণ

নিজে চোখে এমন লড়াই আমি দেখেছি।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন