Malay Bhattacharjee RSS feed

Malay Bhattacharjeeএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • জবা ফুল গাছ সংশ্লিষ্ট গল্প
    সেদিন সন্ধ্যায় দেখলাম একটা লোক গেইটের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। বয়স আনুমানিক পঞ্চাশের উপরে। মাথায় পাকা চুল, পরনে সাধারণ পোষাক। আমার দিকে চোখ পড়তেই লোকটি এগিয়ে এলো।আমি বারান্দায় ছিলাম। নেমে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কাকে চাচ্ছেন?লোকটি নরম কন্ঠে বলল, আমি আপনাদের কয়েক ...
  • আবার কাঠুয়া
    ধর্ষণের মামলায় ফরেন্সিক ডিপার্টমেন্টের মুখ বন্ধ খাম পেশ করা হল আদালতে। একটা বেশ বড় খাম। তাতে থাকার কথা চারটে ছোট ছোট খামে খুন হয়ে যাওয়া মেয়েটির চুলের নমুনা। ঘটনাস্থল থেকে সিট ওই নমুনাগুলো সংগ্রহ করেছিল। সেগুলোর ডি এন এ পরীক্ষাও করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু ...
  • ওই মালতীলতা দোলে
    ২আহাদে আহমদ হইলমানুষে সাঁই জন্ম নিললালন মহা ফ্যারে পড়ল সিরাজ সাঁইজির অন্ত না পাওয়ায়।এক মনে জমিতে লাঙল দিচ্ছিল আলিম সেখ। দুটি জবরজঙ্গী কালো মোষ আর লোহার লাঙল। অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। আজকাল আর কেউ কাঠের লাঙল ব্যবহার করে না। তার অনেক দাম। একটু দূরে আলিম সেখের ...
  • শো কজের চিঠি
    প্রিয় কমরেড,যদিও তুমি আমার একদা অভিভাবক ছিলে, তবুও তোমায় কমরেড সম্মোধন করেই এই চিঠি লিখছি, কারন এটা সম্পূর্নভাবে রাজনৈতিক চিঠি। এই চিঠির মারফত আমি তোমায় শো কজ জানাচ্ছি। তুমি যে রাজনীতির কথা বলে এসেছো, যে রাজনীতি নিয়ে বেচেছো, যে রাজনীতির স্বার্থে নিজের ...
  • ক্যালাইডোস্কোপ ( ১)
    ক্যালাইডোস্কোপ ১। রোদ এসে পড়ে। ধীরে ধীরে চোখ মেলে মানিপ্যান্টের পাতা। ওপাশে অশ্বত্থ গাছ। আড়াল ভেঙে ডেকে যায় কুহু। ঘুমচোখ এসে দাঁড়ায় ব্যালকনির রেলিং এ। ধীরে ধীরে জেগে ওঠা শহর, শব্দ, স্বরবর্ণ- ব্যঞ্জন; যুক্তাক্ষর। আর শুরু হল দিন। শুরু হল কবিতার খেলা-খেলি। ...
  • শেষ ঘোড়্সওয়ার
    সঙ্গীতা বেশ টুকটাক, ছোটখাটো বেড়াতে যেতে ভালোবাসে। এই কলকাতার মধ্যেই এক-আধবেলার বেড়ানো। আমার আবার এদিকে এইরকমের বেড়ানোয় প্রচণ্ড অনীহা; আধখানাই তো ছুটির বিকেল--আলসেমো না করে,না ঘুমিয়ে, বেড়িয়ে নষ্ট করতে ইচ্ছে করে না। তো প্রায়ই এই টাগ অফ ওয়ারে আমি জিতে যাই, ...
  • পায়ের তলায় সর্ষে_ মেটিয়াবুরুজ
    দিল ক্যা করে যব কিসিসে কিসিকো প্যার হো গ্যয়া - হয়ত এই রকমই কিছু মনে হয়েছিল ওয়াজিদ আলি শাহের। মা জানাব-ই-আলিয়া ( বা মালিকা কিশওয়ার ) এর জাহাজ ভেসে গেল গঙ্গার বুকে। লক্ষ্য দূর লন্ডন, সেখানে রানী ভিক্টোরিয়ার কাছে সরাসরি এক রাজ্যচ্যুত সন্তানের মায়ের আবেদন ...
  • ফুটবল, মেসি ও আমিঃ একটি ব্যক্তিগত কথোপকথন (পর্ব ৩)
    ফুটবল শিখতে চাওয়া সেই প্রথম নয় কিন্তু। পাড়ার মোড়ে ছিল সঞ্জুমামার দোকান, ম্যাগাজিন আর খবরের কাগজের। ক্লাস থ্রি কি ফোর থেকেই সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়তাম হি-ম্যান আর চাচা চৌধুরীর কমিকস আর পুজোর সময় শীর্ষেন্দু-মতি নন্দীর শারদীয় উপন্যাস। সেখানেই একদিন দেখলাম ...
  • ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি
    অনেক সকালে ঘুম থেকে আমাকে তুলে দিল আমার ভাইঝি শ্রী। কাকা দেখো “ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি”। একটু অবাক হই। জানিস তুই, কাকে বলে ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি? ক্লাস এইটে পড়া শ্রী তার নাকের ডগায় চশমা এনে বলে “যে বৃষ্টিতে ইলিশ মাছের গন্ধ বুঝলে? যাও বাজারে যাও। আজ ইলিশ মাছ আনবে ...
  • দুখী মানুষ, খড়ের মানুষ
    দুটো গল্প। একটা আজকেই ব্যাংকে পাওয়া, আর একটা বইয়ে। একদম উল্টো গল্প, দিন আর রাতের মতো উলটো। তবু শেষে মিলেমিশে কি করে যেন একটাই গল্প।ব্যাংকের কেজো আবহাওয়া চুরমার করে দিয়ে চিৎকার করছিল নীচের ছবির লোকটা। কখনো দাঁত দিয়ে নিজের হাত কামড়ে ধরছিল, নাহলে মেঝেয় ঢাঁই ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

সুইডেনে সুজি

Malay Bhattacharjee

আঁতুরঘরের শিউলি সংখ্যায় প্রকাশিত এই গল্পটি রইল আজ ঃ

দি গ্ল্যামার অফ বিজনেস ট্রাভেল

সুইডেনে সুজি

#############

পিওন রবি এসে টেবিলে এপ্রুভাল এর কাগজ টা রাখতেই দিল টা খুশ খুশ হয়ে গ্যালো। ভিপি সাহেবের সই করা নোট। সুইডেনে ভলভোর ফ্যাক্টরি দেখতে যাওয়ার সাত দিনের অনুমতি সহ।

কর্ণাটক এর হোসাকোটে তে ভলভো ট্রাক এর নতুন ফ্যাক্টরি হচ্ছে। সেখানে ট্রাক পেইন্ট শপ তৈরি করার অর্ডার টা ধরেছি মাস খানেক হল। ভলভোর দিক থেকে সমস্ত প্রযুক্তিগত কাজ কর্ম দেখছেন ভলভো সুইডেন থেকে ডেপুটেশনে আসা এক ভীষণ খুঁতখুঁতে বুড়ো সাহেব। আমার প্রত্যেক টি ডিজাইন, প্রত্যেক টি অংক সেই ছোট্টবেলার রঞ্জিত মাস্টার মশাইএর মত দেখছেন আর টোনা মারছেন। রঞ্জিত মাস্টার উত্তম মধ্যম স্কেলের বাড়িতে আমার সর্বাংগ সারা বছর লাল করে রাখতেন, আর ইনি কথায় কথায়

" তুমি কি ইঞ্জিনিয়ার না সেক্সপিয়ার ভাই? এটা কি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন না সাহিত্য ? তোমার এই সব অংক দেখে তো আমার চোখ ভরে জল আসছে গো। কি সুন্দর কাব্য করেছো গো, ব্র‍্যাভো,ব্র‍্যাভো !!!

" এইসব বলে কান ফান লাল করে দিচ্ছে প্রত্যেক টা মিটিং এ। আমিও হজম করে যাচ্ছি চুপচাপ। ছোটবেলায় বাবা শিখিয়েছিলেন, যে শিক্ষায় কোন মুল্যই চোকাতে হয় না, সে শিক্ষা কোনদিন সম্পূর্ণ হয় না, হতে পারে না। এই মূল্য অর্থ, সম্মান, সাস্থ্য যা খুশি হতে পারে। যখনি ঝাড় খাচ্ছি, বাবার উপদেশ মাথায় আসছে। এসে বলছে " ওরে গ্যাঁড়া, এই তোর আসল শিক্ষা হচ্ছে। ঢপ ঢাপ দিয়ে অর্ডার তুলেছিস ঠিক আছে, কিন্তু এই যে বিজাতীয় বুড়ো টা রোজ তোকে, একগাদা তামিল, তেলেগু তেঁতুল প্রায় বেগুনী হয়ে গ্যাছে এরকম কৃষ্ণবর্ণ, কিছু ভলভোর ইঞ্জিনিয়ারদের সামনে বসিয়ে চাটছে, এটাই তোর আসল শিক্ষা হচ্ছে। সারাজীবন আর অশ্বশক্তি ক্যালকুলেশন ভুলবি না রে ব্যাটা। শেখ শেখ।"

তা সেই সুইডেনের সাহেবই জবরদস্তি আমার বস কে রাজি করিয়েছেন আমাকে ওদেশে গোথেনবার্গ বলে এক শহরে গিয়ে ওখানকার পেইন্টশপ দেখে আসার জন্য। এতে উপকার সবার। এই দেশে হোসকোটে তে ফ্যাক্টরি টা ঠিক ঠাক বসানো যাবে তাহলে।

ইতিমধ্যে ওরা, সুইডেন থেকে কিছু স্যাম্পেল ট্রাক হোসকোটের ফ্যাক্টরির খালি জমিতে এনে রেখেছেন। যে সমস্ত কোম্পানি ওদের ফ্যাক্টরি টা বানানোর বরাত পেয়েছে, সকলেই যাতে একটা আন্দাজ পায় কি মাল বেরোবে এখান থেকে আর কি কি প্রয়োজনীয় ডিজাইন তাদের আগেই বুঝে নিতে হবে। ওরকম ট্রাক ভারতবর্ষে আমি জীবনে দেখিনি আগে। ওই সুইডিশ বুড়ো, মিটিং এ ঝাড়তো ঠিক ই, কিন্তু মিটিং শেষ হয়ে গেলে সাথে সাথে নিয়ে ঘুরতো, বিদেশি সিগারেট খাওয়াতো, ওই ট্রাক গুলো দেখাতো, ভলভোর ইঞ্জিনিয়ারিং এক্সেলেন্স খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করতো। ভালই লাগতো আমার। তা একদিন উঠে পড়লাম ওইরকম দানবের মত একটা ট্রাক এর কেবিন এ। অনন্য অভিজ্ঞতা এক। মনে হচ্ছিল প্লেনের ককপিটে বসে আছি। কি বিশাল উঁচু কেবিন। নিচের লোক গুলোকেও এট্টু এট্টু লাগছে। এয়ার কন্ডিশন কেবিন, ড্রাইভার এর সিট টা সিংহাসন এর মত। পিছনে দ্বিতীয় ড্রাইভারের শোয়ার জায়গা, একদম ফাইভস্টার হোটেলের সিংগল বেড। সাথে টিভি লাগানো। সে এক হই হই কেস। স্টীয়ারিং টা আমার মেয়ের স্নান করার গামলাটার মত বড়। একদিকে হেব্বি ফুর্তি হচ্ছে, অন্যদিকে মনে মনে ভয়, এই মাল কে রঙ করার ফ্যাক্টরি বানাতে হবে? খাতায় যখন ডিজাইন করেছি তখন তো সব ই এ ফোর পাতার সাইজ। এখন চড়ে বুঝছি কি ভয়ংকর ব্যাপার দাঁড়াবে ফ্যাক্টরি টা, যখন দাঁড়াবে। ভালই হয়েছে সুইডেন যাওয়ার প্ল্যান টা করে। ঘেঁটে দেখে আসবো তারপর চোথা মারবো দেশে ফিরে।

যাই হোক, যাত্রা শুরু হল আমার। দিল্লী হয়ে ওখান থেকে স্টকহোম। তারপর ওখানকার লোকাল এয়ারলাইন্স এ স্টকহোম থেকে গোথেনবার্গ। সেই সময় আমাদের ট্রাভেল এলাউএন্স ছিল ২০ বা ২৫ ডলার প্রতিদিন। সেটা বাঁচানোর চেষ্টা খেয়ে না খেয়ে সব্বাই করতো। বাড়ি থেকেই প্রচুর চিঁড়া, মুড়ি, ম্যাগি, বিস্কুট, চানাচুর এসব নিয়ে যেতাম। বিকেলের টিফিন টা যাতে ফালতু ডলার খসিয়ে করতে না হয়। এই ব্যাপারটা আমার মা আর বউ এর ডিপার্টমেন্ট ছিল। কদিনের জন্য যাচ্ছি জানলেই সেটিং করে দিয়ে দিত গুছিয়ে স্যুটকেস ভরে। তা এবারেও দিয়েছে। ঠোংগা ভরে ভরে, গার্ডার মেরে। কোনরকম উপদ্রব ছাড়াই স্টকহোম ল্যান্ড করেছি। সঠিক সময়। হাতে প্রায় তিন ঘন্টা পরের ফ্লাইটের জন্য। কিন্তু ইমিগ্রেশন আর ব্যাগেজ ক্লিয়ারেন্স স্টকহোমেই করে আবার গোথেনবার্গ এর জন্য ব্যাগেজ চেক ইন করাতে হবে। ফ্লাইট ল্যান্ড করে গড়িয়ে গড়িয়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এয়ারোব্রীজ লাগানো হয়ে গ্যাছে। সবাই আসতে আসতে নেমে হেঁটে যাচ্ছে। উলটো দিক থেকে দেখছি দানবের মত বিশাল বিশাল চেহারার পুলিশ সাথে আরো বড় বড় দানবের মত এলশেসিয়ান কুকুর নিয়ে ওই ব্রীজেই ঘুরছে। কুকুর গুলো প্রত্যেক যাত্রী কে হাঁটতে হাঁটতে হালকা শুঁকে বেরিয়ে যাচ্ছে। হ্যান্ড ব্যাগেজ শুঁকছে, জামা প্যান্ট শুঁকছে। যদিও আমি এই অযাচিত শোঁকাশুঁকি কোনদিন ই পছন্দ করিনা, কিন্তু যে দেশের যা নিয়ম। কুকুর গুলো শুঁকে ড্রাগ জাতীয় জিনিস চট করে ধরে ফ্যালে। তাই এই বন্দোবস্ত। মনে মনে হাসছি। ভাবছি, আমার কলেজের উদো দা, শুনেছি এখনো গাঁজা ছাড়া থাকতে পারে না। লাঞ্চ টাইমে ক্যামাক স্ট্রীটের অফিস থেকে বেড়িয়ে ওই ছোট্ট পার্ক টায় এক কোনে দু টান মেরে আবার অফিস গিয়ে হাম্বা তাম্বা আই টি প্রজেক্ট নামায়, সে শালার কি হোত এই ছোঁকছোঁক করা কুকুর গুলোর সামনে পকেট ভর্তি গাঁজা নিয়ে থাকলে। যাক গে, আমি নির্বিবাদেই পেরিয়ে এলাম সেই শোঁকাশুঁকি। হাড় কন কনে একটা ঠান্ডা লাগছে আমার। ভাবছি ব্যাগেজ থেকে বড় ওভারকোট টা বের করে নেবো স্যুটকেস টা পেলেই।

ইমিগ্রেশন শেষ করে গিয়ে দাঁড়ালাম কনভেয়র বেল্ট এর সামনে। গড়াতে গড়াতে স্যুটকেস আসা শুরু হয়ে গ্যাছে তখন। সেই বেল্ট এর পাশেও দেখি দু তিন টে ওই বাঘের মত এলশেসিয়ান ঘুরছে আর আর মাঝে মাঝেই নাক উঁচু করে হাওয়াতেই গন্ধ শুঁকছে। ওদের দেখে আমার সেই ছোট্ট বেলার ব্ল্যাকির কথা মনে পড়ছে। রবিবার হলেই ব্যাটা কষা মাংসের গন্ধে এরকম নাক উঁচু করে শুকতে থাকতো। আর মাঝে মাঝেই ভুক ভুক করে আওয়াজ মারতো। মনে হয় মা কে আওয়াজ দিতো,

" আর পাতলা কোরনা, আর জল দিও না, আরেকটু শুকনো লংকা ছাড়ো গো, ঝাল ঝাল গন্ধ টা আসছে না। আরেকটু সাঁতলাও, হ্যাঁ, এবার হয়ে গ্যাচে। দাও দেখি একটুকরো এই মেঝেতে ফেলে। এট্টু টেস্ট করে দেখি ঝাল নুন সব ঠিক হল কি না। সাথে একটু কষা আর একটা আলুও দিও গো। "

মা ও দিতো, তারপর ব্ল্যাকির ল্যাজ টা খেয়াল করতো। ল্যাজ নাড়ানোর ঘনঘটায় মা বুঝে যেতো মাল টা ঠিক ঠাক নেমেছে নাকি আরেকটু সাঁতলানো দরকার,ইত্যাদি। খুব জোর পটাং পটাং করে ল্যাজ নাড়লে, জয় দুগগা বলে হাঁড়িতে ঢাকনা দিয়ে মা স্নানে যেতো, আর বাবাও আমাকে আর ব্ল্যাকি দুজনকেই ডাক পাড়তো

" এই কুকুরের বাচ্চা দুটো, উঠোনে আয়। কখন থেকে জল সাবান নিয়ে বসে আছি। তোদের স্নান করিয়ে তারপর আমি যাবো স্নানে।" সেই শুনে আমি আর ব্ল্যাকি দুজনেই লটপট করতে করতে হাজির হতাম উঠানে। তারপর সে কি স্নান। ব্ল্যাকির সাবানে আমায় ঘষছে, আমার লাক্স এ ব্ল্যাকিকে ঘষছে। পুরো গুলিয়ে গ।

তা সেই বিশাল বিশাল এলশেসিয়ান গুলো,হ্যা হ্যা করে এত্ত বড় বড় জিভ বার করে ঘুরছে, শুঁকছে আর আমি শকুনের মত তাকিয়ে আছি বেল্টের দিকে। কখন আসবে আমার স্যুটকেস। খানিক বাদেই দেখা দিলেন উনি। ধড়াস করে আড়াইমনি কাতলার মত বেল্টে পড়েই গুট গুট করে এগোতে লাগলো আমার দিকে। আমিও ট্রলি টা নিয়ে চঞ্চল হয়ে উঠলাম। কিন্তু একি?!! ওই এলশেসিয়ান টা আমার স্যুটকেস টা শুঁকতে শুঁকতে আসছে কেনো? খুব চঞ্চল দেখাচ্ছে ওটাকে। দু বার তিন বার করে শুঁকে হাল্কা গরররর করে উঠছে। ওর গলার চেন ধরা পুলিশ টাও অস্থির হয়ে উঠছে মনে হয়। আমার থেকে হাত দশেক দুরেই, ওই ষন্ডা পুলিশ টা এক ঝটকায় বেল্ট থেকে তুলে নিলো আমার স্যুটকেস টা। নিয়েই পাশের মাটিতে নামিয়ে রাখলো। কুকুরটাও তখন পাগলের মত আমার স্যুটকেস টা শুঁকছে আর হাল্কা হাল্কা ভৌ ভৌ, আওয়াজ করে ডাকা শুরু করে দিয়েছে। আমার তো গলা শুকিয়ে কাঠ। হাত পা কাঁপতে শুরু করে দিয়েছে। কেস টা কি আমি বোঝার আগেই, সেই অফিসার সুইডিশ ভাষায় জোরে কিছু একটা বললো। ভাষা টা কিচ্ছু না বুঝেও আমি বুঝে গেলাম, স্যুটকেসের মালিক কে খুঁজছে ও। সেই ছোটবেলায় হস্টেলে কামরাংগা ঝেড়ে ধরা পড়েছিলাম সুনীল মহারাজের হাতে। লাইন দিয়ে সবাইকে দাঁড় করিয়ে সুনীল দা জিজ্ঞাসা করেছিলেন

" মানিইইইইক, কে গাছ থেইক্যা কামরাংগা ছিড়স, স্বীকার কর, নইলে সব কটারে দিয়া রবিবার বাগান পরিষ্কার করামু।"

ঠিক সেই মুহুর্ত টা মনে পড়ছে আমার। কুঁই কুঁই করে হাত তুলেছি। সেই অফিসার আমাকে আর স্যুটকেস নিয়ে সোজা ওদের অফিসে। সামনে এক্স রে মেশিন। সটাং, তুলে দিল স্যুটকেস টা এক্স রে তে। আমি ওই ঠান্ডা তেও ঘেমেচুমে অস্থির। ওই অফিসারের সাথের কুকুরটা ও আমার দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে আছে "পেঁয়াজি? উলটা সিধা মাল নিয়ে এখানে ঢুকে পড়েছো? দাঁড়াও হচ্ছে তোমার।" টাইপ একটা লুক দিচ্ছে আর “ভুক ভুক” করে চমকেই চলেছে আমাকে।

এক্সরে শেষ। অন্য এক আরো ঘোঁড়েল অফিসার এবার পড়লো আমাকে নিয়ে। যে সময় টার কথা বলছি, সে সময়, তথাকথিত গ্লোবালাইজেশন সদ্য শুরু হয়েছে। ইউরোপের যে কোন শহরে স্বাচ্ছ্যন্দে ইংরাজি তে রাস্তা ঘাটের সাধারণ মানুষের সাথে কথা সম্ভব ছিল না। কর্পোরেট অফিস কলিগ ছাড়া, সেরকম স্বাচ্ছ্যন্দে ইংরাজি তে কথা বলা যেতো না শহরে আম জনতার সাথে। আমার তো মনে আছে, এক কোরিয়ান বা চাইনিস ভদ্রলোক কে জার্মানির রেস্টুরেন্ট এ, মাথায় দু হাতের আংগুল দেখিয়ে প্রথমে শিং, তারপর একটু ঝুঁকে নিজের পিছনে ইংগিতে ল্যাজ আর ফাইনালি দু হাতে দুধ দোয়ানো ক্যারিকেচার করে দেখানোর পর, ওয়েটার বুঝে ছিল ও দুধ চাইছে। তাও বোধহয় গরম দুধের কোন এক্সপ্রেশন দিতে পারেনি, তাই যা চেয়েছিল তার উল্টোটাই পেয়েছিল, এক গ্লাস, ঠান্ডা দুধ। তা এইরকম অবস্থায়, সুইডেনের অফিসারের ইংরেজির অবস্থাও তথৈবচ।

"স্যার, ওয়ান প্যাকেত, টু প্যাকেত, মেনি মেনি প্যাকেত ইনসাইদ।"

"ই ই ই ইয়েস। অল ফুড"

" হোয়াট ফুদ স্যার? "

লাও, আর ইংরেজি মাথায় আসছে না, একে নার্ভাস তারপর এসব খাবার এর ইংরেজি হড়বড়িয়ে মাথায় আসে নাকি ? ....

" সাম মুড়ি, সাম ম্যাগি,সাম চানাচুর, সাম চিঁড়ে মে বি"

" আই নো আন্ডারস্ত্যান্ড স্যার। সাম পাউদার ইনসাইদ স্যার"

আমি আকাশ থেকে পড়েছি। পাউডার কি মাল দিয়েছে এবারে? হ্যাঁ, আসার কিছুদিন আগে বউএর সাথে " তোমার বাবা খাট টা ছোট দিয়েছে, মেয়ে হওয়ার পরেই আর তিনজন একসাথে শোয়া যায় না " এই নিয়ে একটা মিনি দক্ষযজ্ঞ হয়েছে বটে, “তুমি বাপের বাড়ি কেন তুললে ?” কিন্তু তার প্রতিশোধ নিতে আমার স্যুটকেসে হেরোইন, মারিজুয়ানা, ব্রাউন সুগার ভরে দেবে? পাবেই বা কোথায় ও এসব?

" স্যার, উই ওপেন। ফেদারেল ল ইজ টাফ। ইফ ড্রাগ, ইউ গো ইনসাই্দ মেনি মেনি ইয়ারস।"

আমার তো প্যান্টে হিসু হয়ে যায় প্রায়। কি কেলোর কীর্তি রে বাপ।ভয়ে আর ঠান্ডাও লাগছে না ।

চাবি দিয়ে স্যুটকেস খুলে হাট করে দিলাম ওদের সামনে। শুরু হল ঘাঁটা ঘাঁটি।
মিনিট খানেক ঘেঁটে একটা খবরের কাগজের ঠোংগা বের করে টেবিলে রাখলো অফিসার।

" হোয়াত ইজ দিস? "

আমি হাল্কা করে ঠোংগা টা খুলে আকাশ থেকে পড়লাম। হায় ঈশ্বর, এ তো সুজি। শিওর মায়ের কীর্তি।

" স্যার দিস ইস সুজি, ফুড আইটেম"

" হোয়াত সুজি?"

হাসছেন আপনারা? কজন সুজির ইংরেজি জানেন কমেন্ট বক্স এ লিখুন দেখি। খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসলেই হবে? ইল্লি নাকি?

" ইয়েস সুজি। মাই মাদার পুট ওয়াটার, পুট দিস পাউডার, সাম ঘি, সাম সুগার অল ইন সাইড কড়াই, দেন শেক শেক বাই খুন্তি। আফটার সাম টাইম ইট বিকামস সলিড এন্ড আই ইট ইট উইথ আটার রুটি, পাঁউরুটি এটসেট্রা"

নিজেই বলছি, আর নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারছি না, এসব কি বলছি আমি? ভয়ে, ঘাবড়ে হাত পা জিভ সব কিছুর উপর কন্ট্রোল চলে গ্যাছে আমার তখন। কেমন যেনো আব্লা তাব্লা ভাব্লা হয়ে গেছে কথার ধরণ।

সে অফিসার ও গ্যাঁড়া।

" হোয়াত ইস খুন্ঠি, ঘি, কঢাই? "

লাও, জীবনে ভেবেছি খুন্তি, কড়াইএর ইংরাজি ও জানতে হবে?

তা সেই অফিসারের " সুইংলিশ" আর এই বাংগালের "বাংলিশ" আর কতক্ষন চলতো জানি না, যদি না সেই মুহুর্তে সেই মহিলা অফিসার টি সীনে হাজির হতেন। চট করে এক চিমটি সুজি নিয়ে পাশের ঘরে চলে গ্যালেন। একটু পরেই ফিরে এসে ক্লিয়ারেন্স দিয়ে দিলেন আমার।

"নো দেঞ্জারাস আইতেম উই সরি স্যার। "

স্যুটকেস প্যাক করে যখন বেরোচ্ছি, ওই হারামজাদা কুকুর টা তখন ও ভুক ভুক করে চমকাচ্ছে আমায় আর প্রভুদের বলার চেষ্টা করছে, " ওরে, ওর কাছে আছে কিছু উলটা সিধা মাল। আবার দ্যাখ ভালো করে। আমার নাক এত কাঁচা কাজ করতেই পারে না।"

পরের ফ্লাইট ধরে গোথেনবার্গ পৌঁছে কাজ কর্ম সেরে একদিন সন্ধ্যা বেলায় ভলভোর এক সুইডিশ ছোকরা টেকনিশিয়ান, যে আমার সাথে সাথে ফ্যাক্টরি তে থাকতো, হোটেল এপার্টমেন্ট এ সুজি বানিয়ে খাইয়ে ছিলাম। যতটুকু বাকি ছিলো, আসার আগে ওর হাতে সুজির প্যাকেট টা ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলাম হাতের কাছে যখনি কোন এলশেসিয়ান দেখবে, শোঁকাবে। বংশ গুষ্টি ধরে ধরে শোঁকাবে, পারলে সারাদিন সুজির ডায়েটে রেখে দেবে । জানুক, চিনুক মর্কটগুলো সুজি কি। আর কোন বংগসন্তান যেনো সুজি নিয়ে এরকম ফাঁপড়ে না পরে তোমাদের এই সুন্দর দেশে এসে।

যখনি, এই ঘটনা টা মনে পড়ে, তখনি মনে হয়, সত্যি কি সুজির জন্য ওইদিন স্টকহোমে ওই কুকুরটা এরকম করেছিল? নাকি আসল কারণ ছিল আমার ওই স্যুটকেসে রাখা মুখরোচকের টক ঝাল মিস্টি চ্যানাচুর এর প্যাকেটগুলোর ঝাঁঝালো গন্ধ যেটা ছাড়া আমার আজো বিকেলের টিফিনটা সারতে খুব অসুবিধা হয়। সেই কলেজের অভ্যাস আর কি।

মলয় ভট্টাচার্য

শেয়ার করুন


Avatar: kumu

Re: সুইডেনে সুজি

সুজি =semolina
ল্যাবের এক নবাগতা salomonella কাউন্ট মাপতে হবে শুনে ভারি আশ্চর্য হয়ে বলেছিল,সুজি তো ভাল জিনিস,তাকে এত কান্ডমান্ড করে মাপতে হবে?
Avatar: kumu

Re: সুইডেনে সুজি

এই সুজিবাহককেই অমর্ত্য সেন সোজা করে দিয়েছিলেন না?নাকি তিনি অন্য কেউ?
Avatar: Malay Bhattacharjee

Re: সুইডেনে সুজি

ইনি ই তিনি @কুমু
Avatar: ফরিদা

Re: সুইডেনে সুজি

আহা, ঝক্কাস, খাসা।
অমর্ত্য বাবুর গল্পটাও সুন্দর লেগেছিল।
আরও হোক।
Avatar: Malay Bhattacharjee

Re: সুইডেনে সুজি

এখন আর জেনে কি হবে? যারা ওয়ান টু এর পরেই মেনি মেনি প্যাকেত হয়ে যেত, তাদের কে সেমোলিনা বলা আর সুজি বলা এক। @ কুমু
Avatar: dd

Re: সুইডেনে সুজি

"কিন্তু এই যে বিজাতীয় বুড়ো টা রোজ তোকে, একগাদা তামিল, তেলেগু তেঁতুল প্রায় বেগুনী হয়ে গ্যাছে এরকম কৃষ্ণবর্ণ, কিছু ভলভোর ইঞ্জিনিয়ারদের সামনে বসিয়ে চাটছে, এটাই তোর আসল শিক্ষা হচ্ছে।" তো, মলয় বাবু খুব ফর্সা না কি ?
Avatar: sm

Re: সুইডেনে সুজি

আরে ওটাতে মাইন্ড করার কি আছে? কালো কে কালো বলেছে।
আগে বিলেতে কালোদের বলতে হতো আফ্রো ক্যারিবিয়ান। এখনো তাই ই বলি। কিন্তু বর্তমানে ব্ল্যাক বলা একসেপ্টড। কেন কে জানে।
বাঙালি কে নির্দ্বিধায় লোক বঙ্গালি বা বং বলে কিন্তু মাড়োয়ারি কে মেরো বা ওরিশা বাসি কে উড়ে বললে ইনকারেকট হয়ে যায় কেন?
Avatar: amit

Re: সুইডেনে সুজি

দারুন লাগলো পড়ে, আরো হোক। পুরো তারাপদ রায় বা হিমানীশ গোস্বামী লেভেলের হচ্ছে।

@ডিডি, মলয় বাবুর লেখাটা পুরোটাই মজা করে লেখা । অতটা সিরিয়াসলি কিছু ভেবে বলেছেন বলে মনে হয় না, যদিও এই ভাবে বলাটা ঠিক নয়। তবে কোনো কোনো কমেন্ট দেখলে আমাদের রক্তে পরতে পরতে কি ভাবে রেসিজম মিশে আছে , সেটা বোঝা যায়।
Avatar: স্বাতী রায়

Re: সুইডেনে সুজি

প্রাণ ভরে হাসলাম! মুজতবা আলীর একটা রসগোল্লার ইমিগ্রেসন নিয়ে গল্প ছিল না?


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন