Sakyajit Bhattacharya RSS feed

Sakyajit Bhattacharyaএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • মেডিকেল কলেজঃ গত দুদিনে যেমন দেখলাম
    গতকাল, শুক্রবার দুপুরে গেছিলাম মেডিকেল কলেজ। যখন পৌঁছালাম, ওখানে বেশ কিছু লোক – যদিও সব মিলিয়ে দুশোর বেশী নয় অবশ্যই – পরিচিত মুখও দেখা গেল কিছু। কাবেরী বসু ছিল, অমিত দত্ত দা ছিলেন, কোয়েল, দেবিকা, আরো কয়েকজন। অরিজিত গুহ চলে এল আরেকটু পরেই। শুভদীপ অবশ্য তখন ...
  • জবা ফুল গাছ সংশ্লিষ্ট গল্প
    সেদিন সন্ধ্যায় দেখলাম একটা লোক গেইটের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। বয়স আনুমানিক পঞ্চাশের উপরে। মাথায় পাকা চুল, পরনে সাধারণ পোষাক। আমার দিকে চোখ পড়তেই লোকটি এগিয়ে এলো।আমি বারান্দায় ছিলাম। নেমে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কাকে চাচ্ছেন?লোকটি নরম কন্ঠে বলল, আমি আপনাদের কয়েক ...
  • আবার কাঠুয়া
    ধর্ষণের মামলায় ফরেন্সিক ডিপার্টমেন্টের মুখ বন্ধ খাম পেশ করা হল আদালতে। একটা বেশ বড় খাম। তাতে থাকার কথা চারটে ছোট ছোট খামে খুন হয়ে যাওয়া মেয়েটির চুলের নমুনা। ঘটনাস্থল থেকে সিট ওই নমুনাগুলো সংগ্রহ করেছিল। সেগুলোর ডি এন এ পরীক্ষাও করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু ...
  • ওই মালতীলতা দোলে
    ২আহাদে আহমদ হইলমানুষে সাঁই জন্ম নিললালন মহা ফ্যারে পড়ল সিরাজ সাঁইজির অন্ত না পাওয়ায়।এক মনে জমিতে লাঙল দিচ্ছিল আলিম সেখ। দুটি জবরজঙ্গী কালো মোষ আর লোহার লাঙল। অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। আজকাল আর কেউ কাঠের লাঙল ব্যবহার করে না। তার অনেক দাম। একটু দূরে আলিম সেখের ...
  • শো কজের চিঠি
    প্রিয় কমরেড,যদিও তুমি আমার একদা অভিভাবক ছিলে, তবুও তোমায় কমরেড সম্মোধন করেই এই চিঠি লিখছি, কারন এটা সম্পূর্নভাবে রাজনৈতিক চিঠি। এই চিঠির মারফত আমি তোমায় শো কজ জানাচ্ছি। তুমি যে রাজনীতির কথা বলে এসেছো, যে রাজনীতি নিয়ে বেচেছো, যে রাজনীতির স্বার্থে নিজের ...
  • ক্যালাইডোস্কোপ ( ১)
    ক্যালাইডোস্কোপ ১। রোদ এসে পড়ে। ধীরে ধীরে চোখ মেলে মানিপ্যান্টের পাতা। ওপাশে অশ্বত্থ গাছ। আড়াল ভেঙে ডেকে যায় কুহু। ঘুমচোখ এসে দাঁড়ায় ব্যালকনির রেলিং এ। ধীরে ধীরে জেগে ওঠা শহর, শব্দ, স্বরবর্ণ- ব্যঞ্জন; যুক্তাক্ষর। আর শুরু হল দিন। শুরু হল কবিতার খেলা-খেলি। ...
  • শেষ ঘোড়্সওয়ার
    সঙ্গীতা বেশ টুকটাক, ছোটখাটো বেড়াতে যেতে ভালোবাসে। এই কলকাতার মধ্যেই এক-আধবেলার বেড়ানো। আমার আবার এদিকে এইরকমের বেড়ানোয় প্রচণ্ড অনীহা; আধখানাই তো ছুটির বিকেল--আলসেমো না করে,না ঘুমিয়ে, বেড়িয়ে নষ্ট করতে ইচ্ছে করে না। তো প্রায়ই এই টাগ অফ ওয়ারে আমি জিতে যাই, ...
  • পায়ের তলায় সর্ষে_ মেটিয়াবুরুজ
    দিল ক্যা করে যব কিসিসে কিসিকো প্যার হো গ্যয়া - হয়ত এই রকমই কিছু মনে হয়েছিল ওয়াজিদ আলি শাহের। মা জানাব-ই-আলিয়া ( বা মালিকা কিশওয়ার ) এর জাহাজ ভেসে গেল গঙ্গার বুকে। লক্ষ্য দূর লন্ডন, সেখানে রানী ভিক্টোরিয়ার কাছে সরাসরি এক রাজ্যচ্যুত সন্তানের মায়ের আবেদন ...
  • ফুটবল, মেসি ও আমিঃ একটি ব্যক্তিগত কথোপকথন (পর্ব ৩)
    ফুটবল শিখতে চাওয়া সেই প্রথম নয় কিন্তু। পাড়ার মোড়ে ছিল সঞ্জুমামার দোকান, ম্যাগাজিন আর খবরের কাগজের। ক্লাস থ্রি কি ফোর থেকেই সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়তাম হি-ম্যান আর চাচা চৌধুরীর কমিকস আর পুজোর সময় শীর্ষেন্দু-মতি নন্দীর শারদীয় উপন্যাস। সেখানেই একদিন দেখলাম ...
  • ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি
    অনেক সকালে ঘুম থেকে আমাকে তুলে দিল আমার ভাইঝি শ্রী। কাকা দেখো “ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি”। একটু অবাক হই। জানিস তুই, কাকে বলে ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি? ক্লাস এইটে পড়া শ্রী তার নাকের ডগায় চশমা এনে বলে “যে বৃষ্টিতে ইলিশ মাছের গন্ধ বুঝলে? যাও বাজারে যাও। আজ ইলিশ মাছ আনবে ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

লালন-বৃত্তান্ত

Sakyajit Bhattacharya

তারপর বুড়ো রিকশওয়ালা হারাণ সাঁপুই বিড়িতে টান দিয়ে বলল "তো, লালনের গায়ে ছিল বাঘের মত বল। এমনিতে বেঁটেখাটো। আমাদের রিকশ-স্ট্যান্ডেই বসে থাকত সারাদিন, টাক মাথা, মাঝে মাঝেই সর্দি কাশি জ্বরে ভুগত খুব। কিন্তু যখন রাগ করত, বা মদ খেয়ে মাতলামি, মাইরি বলছি বাবু, ওকে দেখে আমার ভয় হত। এই বুঝি কাউকে খুন করে ফেলবে, অথবা রাগের চোটে মাথার শিরা ছিঁড়েই মরবে বুঝি বা। তখন ওকে থামায় সাধ্য কার। যেন একটা সুন্দরবনের কেঁদো বাঘ সটান দাঁড়িয়ে লেজ আছড়াচ্ছে, পৃথিবী দুভাগ হল বলে!"

ছেলেটার শুনতে ইচ্ছে করছিল না এসব। সে তখন মেয়েটাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে নিজের বাড়ির দিকে হাঁটছে। প্রতি রাত্রের মতই। রাত এগারোটার সময়ে তার ক্লান্ত লাগে খুব। ঘুম পায়। যতক্ষণ মেয়েটা থাকে, তার পাশেপাশে চুপচাপ হাঁটে, অথবা বসে থাকে কোনো কথা না বলে, তার ঘুম পায় না। তারপর, সরু গলির ভেতর দিয়ে মেয়েটা যখন ধীর পা টেনে টেনে তার বাড়ির দিকে হেঁটে যায়, ছেলেটার ঘুম পেতে শুরু করে। সে দেখতে পায় মরে যাওয়া রিকশারা, নিভে যাওয়া বাজারের শেষ হ্যাজাক, কুন্ডলিক্লান্ত কুকুরের দল, মরা মাছের চোখ। কুয়াশামাখা লেভেল ক্রসিং দেখলে তখন মাঝে মাঝে আর পেরতেও ইচ্ছে করে না। মনে হয়, ওখানেই শুয়ে পড়ে। তখন হারাণ সাঁপুই তার পাশে এসে বলেছিল "বাবু, যাবেন তো? জলদি উঠুন। আমার ট্রেনের দেরি হয়ে যাচ্ছে"।

ভাল লাগছে না এই লালন নামের রিক্সাওয়ালা সম্পর্কিত প্যাচাল। কিন্তু হারাণের কী যে হয়েছে, সে বলেই চলেছে, বলেই চলেছে। আজ রাত্রিবেলায় একটা নাম না জানা ব্রিজের ওপর দিয়ে তারা দুজন যখন হাঁটছিল, একটা বেলুনওয়ালাকে দেখেছিল। সে একটার পর একটা বেলুন উড়িয়ে দিচ্ছিল আকাশে। ছেলেটা গিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, বেলুনগুলো উড়িয়ে দিচ্ছে কেন? বেলুনওয়ালা বলেছিল, জন্মদিন। ছেলেটা কয়েকটা বেলুন চেয়েছিল। বেলুনওয়ালা তার হাতের সবকটা বেলুন দিয়ে দিয়েছিল, বলেছিল 'শুভ জন্মদিন'। কার জন্মদিন? উত্তর পায়নি। বেলুনওয়ালা অল্প হেসে হাঁটতে হাঁটতে মিলিয়ে গিয়েছিল জামের খোসার মত পাতলা অন্ধকারের ভেতর। আর হাতের বেলুনগুলো তখন অস্থির হয়ে উঠেছে আকাশে উড়বে বলে। মেয়েটার হাত থেকে দুখানা বেলুন ঠিকরে উঠল আকাশে, কিন্তু ইলেকট্রিকের তারে গোঁত্তা খেয়ে ব্রিজের নিচে রেললাইনে নেমে গেল আবার। সঙ্গে সঙ্গে দুজন বস্তির বাচ্চা ছুটে এসেছিল উল্লাসে। তাদের নাকে শিকনি, চোখে পিচুটি। তারা হি হি করে হাসছিল বেলুন দুখানা পেয়ে। ছেলেটা ব্রিজের ওপর থেকে, কী মনে হল, চেঁচিয়ে বলে উঠল 'হ্যাপি বার্থডে'। বাচ্চাগুলোও হাত তুলে বলল 'হ্যাপি বার্থডে'। তারপর নাচতে নাচতে মিলিয়ে গেল।

" লালন মাহমুদের বাড়ি ছিল হাসনাবাদ। কিন্তু ওখান থেকে পালিয়ে এসেছিল। জমি দখলের লড়াইতে অপোজিশন বলেছিল হাঁসুয়া দিয়ে ওর মাথা ঘাড় থেকে নামিয়ে দেবে। ওকে খুঁজেছিল অনেক। কার একটা বউকে ভাগিয়ে তার সঙ্গে কলকাতায় চলে আসে। শেয়ালদার কাছে থাকত । তারপর একদিন সেই মেয়েটাও অন্য একজনের হাত ধরে পালিয়ে যায়। ও আমাদের পাড়াতে চলে এসে এখানে ওখানে ঘুরতে ঘুরতে একটা রিকশ জোগাড় করে নিয়েছিল। তারপর থেকে এখানেই। এখানেই থাকত, পূর্ণিমা হোটেলে মাসচুক্তিতে ভাত খেত। ঘুমোবার সময়ে কারোর বাড়ির দালান, নাহলে আমাদের কারোর বস্তি, এরকম। এক জায়গায় থাকত না, ঘুরে ঘুরে শুত। ঘর ছিল না নিজের। সে না থাকুক, প্রতি রাত্রে কখনো বাংলার বোতলের অভাব হয়নি লালনের। মদ খেয়ে ওর সেই ভেগে যাওয়া আশিকের জন্য কাঁদত।"

ঘুম তাড়াতে ছেলেটা একটা সিগারেট ধরায়। রিকশ তখন ছুটছে নিস্তব্ধ পাড়ার সারি সারি ঘোর পুরনো বাড়িদের পেছনে ফেলে। তাদের দেওয়ালের গায়ে ময়লা ছোপ, কার্ণিশ ফাটিয়ে গাছের চারা উঁকি দিচ্ছে। হারাণ মণ্ডলের বুক থেকে কেমন সাঁই সাঁই আওয়াজ হচ্ছে। হাঁপানি আছে না কি? ছেলেটার আবার মনে পড়ে মেয়েটার কথা। মাথা নিচু করে একটা একলা চুপচাপ মেয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। হাতে ধরা একগুচ্ছ বেলুন। ছায়াটা কী গেট খোলবার আগে স্থির হয়ে গিয়েছিল একটু? হয়ত ঘুরে দাঁড়াতে চেয়েছিল, বা একবার দেখে নেওয়া? অন্যমনস্কভাবে ছেলেটা বলে ওঠে "তারপর?"

হিমভেজা রাত্রেও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছিল হারাণের গলাতে, ঘাড়ে, গালে। সেগুলো মুছে নিয়ে, একটা নির্জন ক্লাবঘর আর আর তার পাশে পড়ে থাকা ভাঙা মিনিবাসকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে সে বলল "তারপর আর কী ! লালন মরে গেল।"

চটকা ভাঙ্গল ছেলেটার। কেমন শীত করছে। বড্ড জোরে ছুটছে না রিকশটা? চারপাশের ঘুমন্ত রাস্তাঘাট দেখতে দেখতে প্রশ্ন করল "কীভাবে মরল? লিভার পচিয়ে?"

হারাণ সাঁপুই হাসে "না বাবু। লিভার ঠিকই ছিল লালনের। যদিও ভাঙা রিকশর ওপর বসে মদ খেত প্রতিদিন, কিন্তু বললাম না, গায়ে ছিল অসুরের মত শক্তি, আর অমানুষিক সাহস। কতবার রাত্রিবেলা মোদো মাতালের দলকে একা হাতে সামলিয়েছে। তখন সময় কত খারাপ ছিল ! কত ছেলে মরে গেল গুলি খেয়ে! লালন তার মধ্যেও সারারাত ডিউটি মেরেছে। ওর ভয়ে কেউ আমাদের গায়ে হাত দিতে সাহস করত না"।

ছেলেটার আবার ফিরে যেতে ইচ্ছ করছিল মেয়েটার কাছে। সেই যে বেলুনওয়ালা, যে জন্মদিনের বেলুন উড়িয়ে দিয়েছিল আকাশে, আর সেই যে ক্লান্ত কুকুরের দল, ওই সবকিছু তাকে টানছিল। প্রতি রাত্রিবেলা মেয়েটাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে তার ফিরতে ইচ্ছে করে না। ক্লান্তিতে পা পাথরের মত ভারী মনে হয়। মনে হয়, মেয়েটার শান্ত ঘরের একলা টেবিল ল্যাম্পের এককোনায় গুটিসুটি মেরে লুকিয়ে থাকে। ফেলে আসা মেয়ে আর তার ফেলে আসা বাড়ি ভাবতে ভাবতে ছেলেটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় "তাহলে মরল কীভাবে? আর লালন কে?" কোথা থেকে লালনের প্রসঙ্গ শুরু হল সে যেন মনে করতে পারছিল না ঠিক।

"বাবু সব ভুলে গেছেন দেখছি। এই তো যেতে যেতে আপনিই জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সব রিকশ যখন ঘুমিয়ে পড়েছে আমারটা জেগে আছে কেন! তখন আমি বললাম আমি লালনের জন্য জেগে আছি। আপনি জিজ্ঞাসা করলেন লালন কে। আসলে আপনি বড় অন্যমনস্ক আজ। হাতের অতগুলো বেলুন ব্রিজের ওপর থেকে উড়িয়ে দিলেন আনমনাভাবে। বেলুনওলা চলে গেল, ফিরেও তাকালেন না। এখন বেমালুম ভুলেই গেছেন লালনের কথা।"

"ওহ হ্যাঁ," ছেলেটা জোরে জোরে সিগারেটে টান দেয়। সত্যিই আজ মাথাটা কেমন হয়ে আছে। প্রাণপণে কথাবার্তায় নিজেকে ব্যস্ত রাখবার জন্য জিজ্ঞাসা করে "লালন তো মরে গেছে। তুমি জেগে আছ ওর জন্যে, এটা কীরকম হল?"

হারাণ হাসতে থাকে। হাসতে হাসতে কাশি এসে পড়ে, সম্ভবত বিড়ির ধোঁয়ায়। খকখক করে কাশতে কাশতে চোখের জল মুছে বলে "লালন তো মরেই গেছে। ওই একটা স্ট্রাইক হল ইউনিয়ানের। লালন ছিল লিডার। বুক চিতিয়ে স্ট্রাইকব্রেকারদের সামলেছিল। পরদিন ভোরবেলায় মাথায় গুলি নিয়ে খোলা নর্দমার ধারে পড়ে রইল। মাছি ভনভন করছিল খুব।"

"তাহলে তুমি জেগে আছ কেন?"

"কী করব বলুন ! লালন তো লিডার ছিল। যতই মদ খাক, যতই অন্যের বউ ভাগাক, স্ট্রাইকটা তো সামনে থেকে করিয়েছিল ! উত্তেজিত হয়ে গেলে হিন্দি বলত। বলত "হিলা দেংগে, হিন্দুস্তান কো হিলা দেংগে!" তার জন্য না জেগে থাকা যায়?"

"ধুর কী সব আবোল তাবোল !" ছেলেটা বিরক্ত হয়ে সিগারেটের শেষটুকু কালো রাস্তায় ছুঁড়ে মারে। কয়েকটা আগুণের ফুলকি ছিটকে যায় এখানে ওখানে।

"আসলে কী জানেন তো বাবু, আপনি যেমন ওই বাড়িটায় ফিরতে চাইছেন, ওই দিদিমণির কাছে, আমরা অনেকে আবার লালনের কাছে ফিরতে চাইছি। লালন আমাদের কাছে ওই বাড়িটা, বুঝলেন? লালন মরে গেছে। লালন ফিরে আসবে।"

"আমি কোথায় ফিরতে চাইছি তুমি জানলে কীভাবে?" ছেলেটা সচকিত হয়ে ওঠে। তারপর চমকে যায় ভেতরে ভেতরে "তুমি, তুমি বেলুনওয়ালার কথাই বা জানলে কী করে? তুমি তো তখন ছিলে না?"

হারাণ হাসতে হাসতে রিকশ চালায়।

"এই রিকশ থামাও। কে তুমি?" ছেলেটা ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে ।

হারাণ উত্তর না দিয়ে সামনের দিকে আঙুল তুলে দেখায়। দূরে রাস্তার মোড়ে অনেক ভিড় । অনেক মানুষ । রিকশ সেদিকে এগোতে থাকে ।

"এত রাতে এত লোক কেন? এই তুমি কে? উত্তর দিচ্ছ না কেন?"

হারাণ সাঁপুই ওর দিকে মুখ ফেরায়। ছেলেটা দেখে তার একটা হাত নুলো, আর একটা চোখ কানা। অন্ধ দৃষ্টি মেলে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে হাসে, তারপর বলে, "একাত্তর সালে খানসেনারা আমাকে খুন করেছিল ধানমণ্ডীতে । তখন আমি ছিলাম খিজির আলি। এখন হয়েছি হারাণ সাঁপুই। লালন আসছে, দেখুন বাবু। " তারপর মাথা ঘুরিয়ে বুকের সমস্ত দম একত্র করে চিৎকার করে ওঠে "হুই কলকাতা!"

"লালন, লালন, লালন..."

আতংকে জমে যেতে যেতে ছেলেটি দেখে দলে দলে অগণিত ছায়ামুর্তিরা এগিয়ে আসছে রাস্তার মোড়ে। এবং কী আশ্চর্য, কাউকেই আগে না দেখলেও সে বুঝতে পারছে সকলকে সে চেনে। কীভাবে চেনে সে জানে না, কিন্তু তবুও চেনে। সে বুঝতে পারে না স্বপ্ন দেখছে কি না, গায়ে চিমটি কাটবার মত শক্তিটুকুও তার আর নেই। সে দেখে গলায় দড়ি বাঁধা মহারাজা নন্দকুমারের ভূত একপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে অন্ধকার রেলিং ঘেঁষে। একটু দূরে সূর্য্য সেন, প্রফুল্ল চাকি, ভবানী পাঠক, মুনশি বরকতউল্লারা সার বেঁধে পাশাপাশি এগিয়ে আসছে । ডানদিকে ব্যারিকেড করে রয়েছে ঊষা কারখানার গলায় দড়ি দেওয়া লক-আউট শ্রমিকের ভূতেরা। বন্ধ হয়ে যাওয়া চায়ের গুমটি ঘিরে রেখেছে লতিকা প্রতিভা অহল্যা ও রেণুদের দল। ছেলেটা অন্ধকার বাড়িগুলোর দিকে তাকায়। ছাদের মাথায় নিশ্চল প্রহরী হয়ে অপেক্ষা করছে জালিয়ানওয়ালাবাগ, আরওয়াল, জেহানাবাদের মৃত ভূমিহারদের গোষ্ঠীরা। তার পাশে মাথা ফেটে রক্ত ঝরে পরা সুদীপ্ত গুপ্ত, পিঠে গুলি খাওয়া দ্রোণাচার্য্য ঘোষ, গলা কাটা সরোজ দত্ত, কংসারি হালদার, সফদার হাশমী, ইলা মিত্রদের ভূতেরা ছাদের পাঁচিল ধরে তাকিয়ে আছে নিচের দিকে। লোকে লোকারণ্য রাস্তায় ডানদিকের রেলগেটের রোড থেকে মিছিলে যোগ দিতে এগিয়ে আসছে ডানলপ হিন্দমোটরের লেবার ভূতেরা। এবং সকলের ঠোঁট নড়ছে । বীজমন্ত্রের মত আওড়াচ্ছে একটা শব্দ -

"লালন, লালন, লালন, লালন..."

ছেলেটা দেখল হারাণ সাঁপুই অথবা খিজির আলি, যে নামেই তাকে ডাকো না কেন, ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। স্থাণু রিকশতে সে একা। সে নেমে এই প্রেত-মিছিলে যোগ দিতে পারছে না কারণ সে জীবন্ত মানুষ। মিছিল এগিয়ে আসছে তার সামনে। আর মিছিলের একদম মাথায় পা টেনে টেনে এগিয়ে আসছে একটা বেঁটে মত টাকমাথা লোক। তার ছাগুলে দাড়ি, লুঙ্গির ওপর এই শীতকালে একটা ছেঁড়া ওভারকোট জড়িয়েছে। তাতে তাকে দেখাচ্ছে আরো অদ্ভুত। তার মাথা থেকে রক্ত ঝরছে । সারা মুখ রক্তে মাখামাখি, কিন্তু তবুও সে হেঁটে আসছে সোজা।

"লালন, লালন, লালন, লেলিন..."

আর ঠিক তক্ষুনি দুম করে একটা শব্দ হল। ছেলেটা চমকে মাথা উঁচু করে দেখল সারা আকাশ আলোকিত হয়ে আছে এক অপার্থিব আলোতে, আর লক্ষ লক্ষ বেলুন উড়ছে। বহু দূর থেকে এক বেলুনওয়ালা যেন বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে দিয়ে বেলুনগুলোকে পাঠিয়ে দিচ্ছে আকাশের দিকে। সেই ছেলেটি, যে আসলে এক নিশ্চিন্ত শয্যায় তার মেয়েটির কাছে ফিরে যেতে চেয়েছিল, সে বোঝে তার আর ঘরে ফেরা হবে না। সে মেয়েটির বিষণ্ণ কালিমাখা চোখ মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়তে চেয়েছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তে দূরে কোনও এক ভূতুড়ে গির্জার ঘড়িতে বারোটা বেজেছিল , আর ছেলেটির মনে পড়ে গিয়েছিল, আজ ৭ই নভেম্বর !

শেয়ার করুন


Avatar: aranya

Re: লালন-বৃত্তান্ত

১০০ বছর আগের ৭ই নভেম্বর, রোমান্টিকতা, 'বিপ্লব স্পন্দিত বুকে, মনে হয় আমিই লেনিন' - ভাল লাগ শাক্য-র লেখা, অন্তত স্বপ্নটা কেউ কেড়ে নিতে পারে নি
Avatar: aranya

Re: লালন-বৃত্তান্ত

লেনিনের হাতেও কিছু কালো লেগেছিল, কিছু মানুষের রক্ত, স্তালিনের কথা বাদই দিলাম। তবে সে তথ্যগুলো এখানে অপ্রাসঙ্গিক, স্বপ্নের গায়ে কোন দাগ লাগে না।

সমস্যা হয় স্বপ্ন বাস্তবায়নে।
Avatar: পৃথা

Re: লালন-বৃত্তান্ত

স্বপ্ন ফুরিয়ে যাওয়া সময়ে এই লেখা চমৎকার লাগল।
Avatar: pi

Re: লালন-বৃত্তান্ত

নিরুদ্দিষ্ট সম্পর্কে উপাখ্যান আর সেই নিরুদ্দিষ্টকেও মনে পড়ে গেল।

এরকম লেখা পড়ে চেগে উঠতে, স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করে, আর ঠিক ততটাই বা তার থেকেও বেশি ভয় করে। ইতিহাস আর বর্তমান দেখে।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন