Kaushik Ghosh RSS feed

Kaushik Ghoshএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • বাউন্ডুলে পিঁপড়ের গল্প
    *********বাউণ্ডুলে পিঁপড়ের গল্প*******মহারাজ গল্প টল্প লেখেন না, যা দেখেন তাই। তা আমার সাথে সেদিন এক মক্কেলের মুলাকাত হয়েছিলো, নচ্ছারটা যদিও আমায় নানান কু কথা বলেছে, তাও বন্ধুত্বের খাতিরের ওর কথা গুলো বলে গেলাম। 'এই শোন একটা গাড়ি আসছে বুঝলি একটু চমকাবি ...
  • ১৯৪৬, এক ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের বছর
    সদ্য তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে।ফ্যাসিস্ট বাহিনীর চূড়ান্ত পরাজয় ঘটেছে।পৃথিবীর ইতিহাসে এক যুগসন্ধিক্ষণ।পৃথিবী জুড়ে সব মানুষের বাধ ভাঙা উচ্ছ্বাস। যারা যারা যুদ্ধে নিজের প্রিয়জনকে হারিয়েছে, তারাও এই বিভৎসতার শেষে হাপ ছেড়ে বেঁচেছে।সারা পৃথিবীর ...
  • যৌননির্যাতন সম্পর্কে কিছু কথা যা আমি বলতে চাই
    মিডিয়া ট্রায়ালের পর শুরু হয়েছে এক নতুন ফেনোমেনন সোশ্যাল মিডিয়া ট্রায়াল। সবার কী সুন্দর বিচার, ফাঁসি, জেল, সব কিছুর নিদান দিয়ে দেন। নির্ভয়া কান্ডের পর গোটা ফেসবুক জুড়ে ফাঁসির জন্য কী প্রচণ্ড চিৎকার। শিক্ষিত হোক বা অশিক্ষিত, একটা গোটা জাত ফাঁসি চায়, ...
  • ডারউইন
    মশাদের জগতে একটা বেশ মজার ঘটনা ঘটে চলেছে। ধরুন প্রথম যখন মশা মারবার জন্যে মানুষ কোন কীটনাশক আবিষ্কার করলো। সেই সময় যত মশা ছিলো তার মধ্যে ৯৫% এর ওপর এই কীটনাশক কাজ করে। বাকি ৫% এর ওপর করে না। এবার কীটনাশক আবিষ্কারের আগে এই ৫%কে সেই ৯৫% এর সাথে প্রতিযোগীতা ...
  • রংচুগালা: বিপন্ন আদিবাসী উৎসব
    [ওই ছ্যাড়া তুই কই যাস, কালা গেঞ্জি গতরে?/ছেমড়ি তুই চিন্তা করিস না, আয়া পড়ুম দুপুরে/ হা রে রে, হা রে রে, হা রে রে…ভাবানুবাদ, গারো লোকসংগীত “রে রে”।]কিছুদিন আগে গারো (মান্দি) আদিবাসী লেখক সঞ্জিব দ্রং আলাপচারিতায় জানাচ্ছিলেন, প্রায় ১২৫ বছর আগে গারোরা আদি ...
  • মুক্ত বাজার
    নরেন্দ্র মোদী নিশ্চয় খুশি হয়েছেন। হওয়ারই কথা। প্রধানমন্ত্রী’র ঘনিষ্ঠ বন্ধু, ফোর্বস ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ভারতবর্ষের ১০০ জন ধনকুবের’দের ক্রমাঙ্কে টানা দশ বছর শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছেন। গত বছরে, রেকর্ড হারে, ৬৭% সম্পত্তি বাড়িয়ে, আজ তিনি ৩৮০০ কোটি ডলারের মালিক। ...
  • আমরহস্য
    শহরে একজন বড় পীরের মাজার আছে তা আপনি জেনে থাকবেন, পীরের নাম শাহজালাল, আদি নিবাস ইয়ামন দেশ। তিনি এস্থলে এসেছিলেন এবং নানাবিদ লৌকিক অলৌকিক কাজকর্ম করে অত্র অঞ্চলে স্থায়ী আসন লাভ করেছেন। গত হয়েছেন তিনি অনেক আগেই, কিন্তু তার মাজার এখনো জাগ্রত। প্রতিদিন দূর ...
  • সিনেমার ডায়লগ নিয়ে দু চার কথা
    সাইলেন্ট সিনেমার যুগে বাস্টার কিটন বা চার্লি চ্যাপ্লিনের ম্যানারিজমের একটা বিশেষ আকর্ষন ছিল যেটা আমরা অস্বীকার করতে পারিনা। চোখে মুখের অভিব্যক্তি সংলাপের অনুপস্থিতি পূরণ করার চেষ্টা করত। আর্লি সিনেমাতে ডায়লগ ছিল কমিক স্ট্রীপের মত। ইন্টারটাইটেল হিসাবে ...
  • সিঁদুর খেলা - অন্য চোখে
    সত্তরের দশকের উত্তর কলকাতার প্রান্তসীমায় তখনো মধ্যবিত্ততার ভরা জোয়ার. পুজোরা সব বারোয়ারি. তবু তখনো পুজোরা কর্পোরেট দুনিয়ার দাক্ষিণ্য পায় নি. পাড়ার লোকের অর্থ সাহায্যেই মা দুর্গা সেজে ওঠেন তখনো. প্যান্ডাল হপিং তখন শুরু হয়ে গেছে. পুজোর সময় তখনই মহঃ আলি ...
  • অন্য রূপকথা
    #অন্য_রূপকথা পর্ব এক একদেশে এক রানী ছিল। সেই রানীর রাজ্যে কত ধন, কত সম্পত্তি। তাঁর হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া, আর গাড়িশালে খানকয়েক রোল্স রয়েস আর মার্সিডিজ বেন্জ এমনিই গড়াগড়ি যেত। সেই রাজ্যের নাম ছিল সুবর্ণপুর। যেমন নাম, তেমনি দেশ। ক্ষেতে ফলত সোনার ফসল, ...

একটা অর্ধ-সমাপ্ত গল্প

Kaushik Ghosh

পর্ব ১।

ঘুম ভাঙতেই পাশ ফিরে মা, বাবা আর ছোট্ট ভাইটাকে একবার দেখে নিল ডোডো। সবাই ঘুমোচ্ছে। খাট থেকে আস্তে করে নেমে, ঘরের বাইরে চলে এল। ঘরটা থেকে বেরোলে ডান হাতে আরেকটা বেডরুম। এটার দরজা বন্ধ। সেটা পেরোলে একটা খুব ছোট্ট গলি দিয়ে ডাইনিঙ রুম। গলিটার একটা দেওয়াল তৈরি হয়েছে প্যান্ট্রির দেওয়ালে, আরেকটা বন্ধ বেডরুমটার দেওয়াল দিয়ে। তারপরে ড্রয়িং রুম। একটা সোফা টেনে ড্রয়িং রুমের দড়জাটার কাছে নিয়ে এল ডোডো। বেশ ভারি সোফাটা। কার্পেটের ওপর দিয়ে নিয়ে অসতে একটু কষ্টই হচ্ছিল।

ছিটকিনি খুলে বাইরে এল ডোডো। একটা বারান্দা। বেতের চেয়ার টেবিল পাতা রয়েছে। বারান্দাটা থেকে দুটো সিঁড়ি নামলে মাথা ঢাকা একটা গাড়ি বারান্দা। আর গাড়ি বারান্দাটার দু দিকে কি ভীষণ সুন্দর বাগান!

বাগানে চলে এল ডোডো। কত রকমের গাছালি আর ফুল। গোলাপ আর গাঁদা ছাড়া একটারো নাম জানে না ডোডো। আসেপাশে কেউ নেই। ঘুরে ঘুরে বাগানটা দেখতে লাগলো ও। কাল রাতে যখন ওরা এখানে এসে পৌঁছেছে, তখন কিছুই দেখা হয়নি ওর। ভীষণ ঘুম পাচ্ছিলো। কালকের সারাটা দিনই একরকম ঘুমিয়েই কেটেছে ওর। কালকের দিনটার কথা মনে করার চেষ্টা করলো ডোডো।
রাত থাকতে থাকতেই মা ঘুম থেকে তুলে দিয়েছিলো ওকে। ওদের ব্যানার্জী পাড়ার বাড়িটার সামনে বাবার অফিসের জীপটা দেখতে পেয়েছিলো। জীপের ভেতরে দাস কাকু। দাস কাকু রোজ সকালে বাবাকে অফিসে নিতে আসে এই জীপটাকে নিয়ে। সবাই জীপে চাপলে পর ওরা চলে এসেছিলো একটা জায়গায়। বাবা বলেছিলো জায়গাটাকে বলে এয়ারপোর্ট। অনেক লোক। ওদের সাথে মেজো মাসি ও এসেছিলো এয়ারপোর্টে। বাবা কোথা থেকে যেন চা নিয়ে এসেছিলো সবার জন্য। এরকম চা আগে দেখেনি ডোডো। একটা কাপে দুধ আর সাথে সাথে একটা কালো রঙের সুতো বাঁধা ছোট্ট পুটুলি। ওটাকে বলে টি ব্যাগ। বাবা বলেছিলো। ওর হাতে কাপটা দিয়ে বাবা বললো, ম্যাজিক দেখবি? ওই পুটুলিটাকে দুধের মধ্যে ডোবাতেই, কি আশ্চর্য, দুধটা চা হয়ে গেল! ঠিক যেরকমটা মা বানায়। তারপর ছোট্ট একটা সাদা চৌকো মতন জিনিস চায়ের মধ্যে ফেলে দিলো বাবা। ওটার নাম সুগার কিউব। একটা সুগার কিউব চেয়ে নিয়েছিলো ডোডো বাবার কাছ থেকে। প্লেনে ওঠার আগে চেটে চেটে খাচ্ছিলো।

সিঁড়ি দিয়ে প্লেনে ওঠার আগে পে্ছন ঘুরে মেজোমাসি কে টা-টা করে দিয়েছিলো ডোডো। অনেকটা দুরে একটা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলো মেজোমাসি আরো অনেক লোকের সাথে। মেজোমাসি রুমাল দিয়ে চোখ মুছছিলো।
প্লেনে উঠে জানলার পাশের সীটটায় বাবা বসালো ওকে। প্লেনটা আকাশে উঠতেই বাবা বলল, নিচে দেখ। ঘর বাড়ি রাস্তা ঘাট সব হঠাৎ করে ছোটো হতে লাগলো! ঠিক মিতুলদির ডল হাউসের সেটটার মতন। কিছুক্ষণের মধ্যে আর কিছুই দেখা গেল না, চারিদিকে শুধু সাদা সাদা মেঘ। তার কিছুক্ষন পর মাথার ওপরে একটা লাইট জ্বলে উঠতেই বাবা বললো, যাক! ডোডোর আর নিজের পেটে বাঁধা বেল্টটা খুলে দিয়ে সিগারেট খেতে শুরু করলো বাবা। বাবাকে সিগারেট খেতে দেখতে ডোডোর খুব ভালো লাগে। একটা সিগারেট শেষ হলে পর ডোডো বলেছিলো, বাবা আরেকটা সিগারেট খাও।
-তা ঠিকই বলেছিস, এখনি খেয়ে নিই। এরপরে তো আবার নো স্মোকিঙ লাইট জ্বেলে দেবে।
ভাইটা কাঁদতে শুরু করেছিলো। একটা আন্টি এসে ইংলিশে মা কে কিছু একটা বললো। মা ব্যাগ থেকে দুধের বোতল বের করে ভাইয়ের মুখে ধরতেই কিছুক্ষনের মধ্যে চুপ করে গেল ভাই। ডোডোর সামনে এক ট্রে ভর্তি লজেন্স এনে ধরলো আন্টিটা। বাবার দিকে তাকাতে বাবা হেসে বললো নিয়ে নে। দু মুঠোয় লজেন্স তুলে নিয়েছিলো ডোডো। প্যান্টের পকেটে এখনো তার কয়েকটা পরে আছে।

ভালো করে সকাল হয়নি এখনো। কাউকে দেখা যাচ্ছেনা আসেপাশে। বাড়িটাকে ভালো করে দেখতে শুরু করলো ডোডো। দুটো গেট। একটার সামনে লেখা IN, আরেকটার সামনে লেখা OUT।
IN লেখা গেটটা থেকে একটা রাস্তা শুরু হয়ে ধনুকের মতন বেঁকে গাড়ি বারন্দাটায় এসেছে। গাড়ি বারান্দাটা যেন ঠিক ধনুকের মাঝখানটা, যেখানে ধনুকটাকে ধরে তির ছোঁড়ার জন্য। সেখান থেকে আবার ধনুকের মতন বেঁকে রাস্তাটা গিয়ে শেষ হয়েছে OUT লেখা গেটটার সামনে। দুটো গেটের মাঝে গাড়ি বারান্দার লাগোয়া জমিটায় সবুজ ঘাসে ঢাকা। তার মাঝামাঝি জায়গায় আর একটা বিরাট উঁচু লোহার রড মাটিতে পোঁতা আছে - আকাশ ছোঁবে যেন। দুটো সিঁড়িও আছে। কিসের জন্য লাগানো রডটা? বাবাকে জিজ্ঞেস করতে হবে।

বাড়িটার দু দিকে বাগান। পেছনেও। ডান দিকে একটা বাড়ি আছে, বাঁদিকেও। ওদেরও বাগান আছে। প্রত্যেক দুটো বাড়ির মাঝে জবা গাছের ঝোপ দিয়ে তৈরি মোটা ফেন্সিঙ।
ঘুরতে ঘুরতে বাগানের ডানদিকটায় চলে এল ডোডো। এক ধরনের লালচে রঙের গাছের সারি দিয়ে একটা দেওয়াল মতন বানিয়েছে! গাছ গুলোর ভেতর দিয়ে দেওয়ালের ওপারে গেল ডোডো। এদিকটায় সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ নেই। মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে শাক সবজি লাগানো হয়েছে। লাল গাছের দেওয়াল ভেদ করে ওদিকটা দেখা যায়না। ওদিক থেকেও এদিকটা দেখা যায়না। বাড়িটার শেষ প্রান্তে চলে এল ডোডো। একটা খুউব উঁচু গাছ। ভীষন মোটা। অনেক ওপরে লাল লাল ফুল হয়েছে। ডোডোর হাত যাবেনা। বাবারও না। গাছটার নীচে বসে পড়লো ডোডো। এটা বাড়িটার পেছোন দিকটা। একতলা বাড়ি। মাথায় লাল রঙের টিনের ছাউনি। ঠিক যেমনটা H for hut এ দেখা যায়!

পকেট থেকে কালকের একটা লজেন্স বের করলো ডোডো। গোল মতন। কমলা রঙের। অল্প হাওয়া দিচ্ছে। লজেন্স মোড়ার কাগজটা হাওয়াতে ভাসিয়ে দিল ও। দুলতে দুলতে কিছু দুরে গিয়ে মাটিতে পড়লো কাগজটা। কালকে প্লেনটা ওদের যেখানে নাবালো, সেখান থেকে ওদের জন্য গাড়ি এসেছিলো। সেই গাড়ি চড়ে একটা নদী পার হলো ওরা। ব্ৰহ্মপুত্ৰ । কি বিশাল নদী! মা বললো, নদ। নদ মানে কী ?

দুটো নৌকার মাঝে একটা কাঠের পাটাতনের ওপরে গাড়িটাকে নিয়ে পার হচ্ছিলো ওরা। ভয় করছিলো ডোডোর। তার পরে বোধহয় আরেকবারও ওই একই ভাবে আরেকটা নদী পার হতে হয়েছিলো ওদের। ঠিক মনে পড়ছেনা। আসলে প্রথম বার নদী পার হওয়ার পর থেকেই খুব ঘুম পাচ্ছিলো ওর। ঘুমিয়ে পড়েছিলো গাড়িতে বাবার কোলে। মাঝে মাঝে ঘুম ভাঙছিলো, আবার ঘুমিয়ে পড়ছিলো ও। তারপর কালকে রাত্রিবেলায় এসে পৌঁছেছে ওরা এই বাড়িটায়। মা বললো, এবার থেকে ওরা এখানেই থাকবে। বাড়িটা ভীষন সুন্দর। তবে এখানে ওর ব্যানার্জী পাড়ার বন্ধু বুবলা থাকলে আরো ভালো লাগতো। আর জেঠুর বাড়িটাও যদি এখানে থাকতো? জেঠু, জেম্মা, মিতুলদি - ওরা কি এখানে আসবে না?
এত সুন্দর বাড়িতে এর আগে কখনো থাকেনি ডোডো। কিন্তু ওর বুবলার জন্য মন খারাপ করছে। গুড়িয়ার জন্যও। ব্যানার্জী পাড়ার সবার জন্যই ওর একটু একটু মন খারাপ করছে। বাবুজীদা, সুমনদা, সঞ্জয়দারা ডোডো কে খুব ভালো বাসে। রবি কাকু, টনটন কাকু, মুকুল কাকুরাও কত ভালো বাসে ডোডো কে। কিন্তু ওরা কেউ এখানে নেই।

ডোডো। বাড়ির সামনের দিকটা থেকে আবছা একটা ডাক ভেসে আসছে। মা।
উঠে পড়লো ডোডো।


ক্রমশ

পর্ব ২।

দুপুরবেলাটায় একটু আলস্য লাগে বটে, তবু না ঘুমিয়ে বারন্দাটায় এসে বসেছে কিরণ নতুন জায়গা। গত কালই এসে পৌঁছেছে ওরা। বড্ড লম্বা জার্নি ছিলো! ভোর রাতে উঠে এয়ারপোর্ট আসা। ডিব্রুগড়ে নেমে গাড়ি করে ঘন্টা চারেক চলতে হয়েছে ওদের। রাস্তার বেশিরভাগটাই খারাপ। বড্ড ঝাঁকুনি দিচ্ছিলো জীপের পেছনে। সামনে ড্রাইভারের সাথে রতন আর ডোডো। রাস্তায় নাম না জানা অনেক গ্রাম আর চা বাগান। চা বাগানের মধ্যে দিয়ে আসতে গিয়ে একটা ভারি অদ্ভূত জায়গার নাম দেখা গেল - ডুমডুমা। কিলোমিটার স্টোনে লেখা ছিলো। লেখার হরফ দেখে বোঝা গেল, জায়গাটা আসামের মধ্যেই পড়ে। অবশ্য চা বাগান যা আছে সব আসামেই; অরুণাচলে ঢোকার পর থেকে একটাও চা বাগান দেখতে পায়নি কিরন।
রাস্তায় দুবার নদী পেরিয়েছে -ব্রহ্মপুত্র আর নোয়াডীঙ।প্রথমটা আসামের পরেরটা অরুণাচলের। নোয়াডীঙ নদীটা পেরোলেই এই ছোট্ট জনপদ - নামসাই।

দমদমে প্লেনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে চোখে জল চলে আসছিলো। মেজদি ভিজিটর্স ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে যাচ্ছে সমানে। ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিলো কলকাতা শহরটা ওর চোখের সামনে। আজ অবশ্য মন খারাপ লাগছে না। পথশ্রম জনীত ক্লান্তি, নতুন জায়গায় আসার উৎসাহ আর আজানা পরিমন্ডলে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চিন্তা - এই তিনে মিলে ওকে দুখি হতে দিচ্ছেনা ছেড়ে আসা পরিজন আর চেনা শহরটার জন্য।


সকলেই ভীষন ক্লান্ত কিন্তু তবু রতন আজকেই এখানকার অফিসে জয়েন করল। এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রথম দিন। অন প্রোমোশান ট্রান্সফার। বাংলোর পেছন দিকটাতেই অফিস। তবু গাড়ি এসেছিলো নিতে। জীপ। নম্বর প্লেটে লেখা আR ৮০। নামসাই লোহিত ডীস্ট্রিক্ট-এর অন্তর্গত। ড্রাইভারের নাম গণেশ। নেপালি, কিন্তু ভারি সুন্দর বাংলা বলে। পরে একদিন জিজ্ঞেস করতে হবে কোথা থেকে বাংলা শিখল।
কিরণের জীপের চাইতে এম্বাস্যাডর ভালো লাগে। কলকাতাতেও রতন কে জীপ দিতো। ভেবেছিলো এখানে হয়ত এম্বাস্যাডর পাওয়া যাবে। ডিব্রুগড়ের পর বড় শহর পড়েছিলো তিনসুকিয়া। সেখানেও বেশ কিছু অ্যাম্বাস্যাডর চোখে পড়েছিলো কিন্তু অরুণাচলে ঢোকার পর থেকে আর অ্যাম্বাস্যাডর দেখতে পায়নি কিরণ।

চব্বিশ ঘন্টাও পুরো হয়নি এখানে এসেছে ওরা কিন্তু তার মধ্যেই কিরণ বুঝতে পারছে এখানকার ব্যাপার স্যাপার গুলো বড্ড সাহেবি। সাহেবি কেতার বাংলো। প্রায় বিঘা দুই জমির মাঝামাঝি জায়গায় বাংলোটা। তিনটে বেডরুম। বাংলোর সামনে আর দুপাশে বাগান। গাড়ি বারন্দাটার ওপারের লনটায় একটা ফ্লাগ মাস্ট রয়েছে। পেছন দিকে সবজী বাগান। জনা তিনেক কাজের লোক। যে ছেলেটি রান্না করে তার নাম কৈলাশ। বিহারি। ওর খুড়তুতো ভাইও কাজ করে বাংলোতে - সঞ্জয়। রাম নামের নেপালি ছেলেটি মালি। ওরা তিনজন কিরন কে মেমসাহেব মেমসাহেব বলে ডাকছে। কানে লাগছে ডাকটা তবে শুনতে খারাপ লাগছে না।

জিনিশ পত্র কিছুই এখনো এসে পৌঁছোয়নি। আসার আগ দিয়ে রতন সব প্যাক করে লরিতে তুলে দিয়েছিলো, কিন্তু সে সব আসতে এখনো দিন দশেক তো বটেই! জিনিশ গুলো চলে এলে সেগুলো আনপ্যাক করতে, সাজাতে কিছুটা সময় ব্যয় হত। চুপচাপ বারন্দায় বসে এক ঘেয়ে একটা পাখির ডাক শোনা ছাড়া এখন আর কোনো কাজ নেই। হাতের কাছে একটা গল্পের বইও নেই। ড্রয়িঙ রুমে রাখা বুক শেল্ফে কিছু বই আছে বটে, কিন্তু তার মধ্যে বিশির ভাগই ড-র ওয়ার্কস ম্যানুয়াল। আর কিছু দর্শনের বই। সিভি রামন। কলেজে চার বছর ফিলোসফি অনার্স পড়লেও বিষয়টাকে হয়ত মন থেকে কোনো দিন ভালোবাসেনি কিরণ।

কলেজে থাকতে শ্রীপারাবতের লেখার খুব ভক্ত ছিলো ও। সেকেন্ড ইয়ারে ওর হস্টেলের রুমমেট অনিমার কাছ থেকে "আরাবল্লি থেকে আগ্রা" বইটা নিয়ে পড়েছিলো কিরন। তারপর থেকে গোগ্রাসে গিলেছে শ্রীপারাবতের লেখা অনেকদিন অবধি। ধীরে ধীরে কেন যেন সেই মুগ্ধতাটা কেটেও গেছিলো । তারপর সেই জায়গাটা নিয়েছিলেন তারাপদ রায়। ডোডোর নামটা তো ওঁনার লেখা থেকেই নেওয়া!
বাকি ফার্নিচার সবই আছে বাংলোতে কিন্তু ফ্রীজটা না আসা অবধি একটু অসুবিধেই হবে। আর কিছু নয়, ফ্রীজটা না থাকলে ছোটোটার দুধের একটু অসুবিধা। রতন বলছিলো এখানে তেমন গরম পড়ে না, দুধ চট করে খারাপ হওয়ার ভয় কম, তবু সাবধানের মার নেই।

ছোটোটা হওয়ার পরের সপ্তাহেই রতনের প্রোমোশনের খবরটা এসেছিলো দিল্লি থেকে। ওর মাইনে এখন পাঁচ হাজার টাকা হয়েছে। ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন এতদিনে।

কলকাতায় ভাড়া বাড়িতে বেশ কষ্ট করেই দিন গুজরান করেছে কিরণ। ছোটো দুটো ঘর। তার মধ্যে নবদ্বীপ থেকে ওর বা রতনের বাড়ির লোকজন কেউ কলকাতায় কোনো কাজে এলে উঠতেন কিরনদের কাছেই। নিজেদের জন্য একটু সময় বের করাও ছিল অসম্ভব। এত বড় বাংলোটায় এসে থেকে মনটা খুশি খুশি হয়ে রয়েছে কিরনের - ডোডোটা খেলার প্রচুর জায়গা পাবে!

কাল সকালে একবার ডোডোকে নিয়ে এখানকার সেন্ট্রাল স্কুলটায় যেতে হবে। কেজি টু তে পড়ার কথা এখন ওর। কিন্তু এই ছোট্ট জায়গায় কিন্ডারগার্টেন স্কুল আর কোথায়! সরাসরি ক্লাস ওয়ানেই ভর্তী করতে হবে। গতকাল রাতে পাশের বাংলো থেকে মিসেস দে এসেছিলেন। উনি বললেন এখানে পশ্চিমবঙ্গের বোর্ডের মতন স্কুলে নতুন ক্লাস জানুয়ারিতে শুরু হয়না। শুরু হয় মার্চে। মিস্টার দে রতনের সাব অর্ডিনেট। ওদের বাংলোটার দিকে একবার তাকালো কিরন - যথেষ্ঠই বড়।

কলকাতায় এত বড় বাংলোর কথা ভাবাই যায়না। রতন তো পাঁচ বছর ধরে চেষ্টা করে কোয়ার্টারই পায়নি কলকাতায় - সব ভর্তী। অগত্যা ব্যানার্জী পাড়ার ওই খুপড়ি ভাড়া বাড়িই সম্বল। Rা যা পেত, তা দিয়ে কলকাতায় ওর চেয়ে ভালো বাড়ি আর হয় না। তাও ঢাকুরিয়া বলে সস্তায় বাড়ি ভাড়া পাওয়া গেছিলো। প্রপার কলকাতায় হলে ও টাকায় কিছুই পাওয়া যেত না।
বারন্দাটার ডানদিকের লনটায় একটা ব্যাডমিন্টন কোর্টও রয়েছে। একবার একটু বাগানটা ভালো করে দেখা যাক। উঠে পড়লো কিরণ।

পুব দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে আছে বাংলোটা। বাংলোর পেছন দিকে দূরগত পাহাড়ের রেখা। ডানদিকে দে সাহেবদের বাংলো। ওদের বাংলোটার গা ঘেঁসে চলে গেছে রাস্তা। রাস্তা টুকু পেরোলেই জঙ্গল। হিংস্র জানোয়ার থাকে না নিশ্চয়ই!

এখানে এসে যে একজন বাঙালী কে প্রতিবেশী হিসেবে পাওয়া যাবে তা একেবারেই আশা করেনি কিরণ় যাক বাবা‚ একটু প্রাণ খুলে কথা বলা যাবে! নইলে ওই খাতা হ্যায় যাতা হ্যায় করে কতক্ষণ কাটানো যায়! অবশ্য দে সাহেব রা পশ্চিম বঙ্গের বাঙালী নন় সিলেটী় এ অঞ্চলে বাঙালী মাত্রই হয় সিলেটী‚ নয় পূর্ব বঙ্গীয়় মিসেস দে বলেছিলেন় আর বলেছিলেন বাঙালী নাকি এই ছোট্ট জায়গাটাতেও বেশ ভালো সংখ্যায় রয়েছে় দূর্গা পুজো ও হয়় হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলো কিরণ়

বাগানটা রাম সুন্দর সাজিয়েছে। সূর্যমুখী গোলাপ গাঁদা মোরগঝুঁটি ইত্যাদি ফুলে ভরা। পেছন দিকটায় পুরোটাই প্রায় কিচেন গার্ডেন। মাঝে মাঝে পায়ে চলার রাস্তা। বাঁ দিকেও একটা বাংলো। মোটা করে জবা গাছের ঝার দিয়ে টানা ফেন্সিঙ প্রত্যেক দুটো বাংলোর মাঝে। বড় গাছ বলতে পেয়ারা জলপাই আর একটা বিরাট উঁচু গাছ দেখা যাচ্ছে। লাল লাল ফুল গুলো শিমুলের মতন, কিন্তু শিমুল নয়। আর কয়েকটা বেঁটে বেঁটে কলা গাছ। তাতে আবার কলার কাঁদি ঝুলছে! দাঁড়িয়ে থেকে হাত বাড়িয়ে ডোডোও পারবে কলা পাড়তে এ গাছ থেকে!

একটু দুরে রাম খুপরি দিয়ে গাছের আগার মাটি আলগা করছিলো। ওকে ডাকলো কিরণ। ইয়ে কৌন সা কেলা কা পেড় হ্যায়?
-ইসে হাতি কোল বোলতা হ্যায় মেমসাব! অহমিয়া মে কেলা কো কোল বোলতা হ্যায়।
-ইসসে জ্যাদা লম্বা নহি হোগা ইয়ে পেড়?
-নহি মেমসাব! ইসকা উঁচাই তো বস ইতনিহি হ্যায়!

সবজির মধ্যে ফুলকপি আলু আর লাউ দেখা যাচ্ছে। ছোট্ট একটা মাচায় দুটো কচি লাউ। কিন্তু এত ফুলকপি খাবে কে?

-আচ্ছা ঢ্যাঁড়স হোতা হ্যায় ইঁয়হা?
-ও কিয়া হোতা হ্যায় মেমসাব?
- লেডিজ ফিঙ্গার!
-হাঁ হাঁ, বিলকুল হোতা হ্যায়! উগানা হ্যায় কিয়া?
-পারবে? তো কাল বীজ পুঁতে দিও।

দে সাহেবদের বাংলোর দিকে তাকালো কিরণ। ওদের মালিও বাগানে কাজ করছে। বাঁ দিকের বাংলোটা কি খালি? না বোধহয়। কাউকে দেখা যাচ্ছে না যদিও, কিন্তু ফেন্সিঙ টপকে যতটুকু ওদের বাগানটা দেখা যাচ্ছে, তাতে মানুষের আনাগোনার ছাপ স্পষ্ট।

এত খানি জায়গা, রতনকে বলে নিজেদের বাংলোর পেছনে একটা দোলনা টাঙাবে কিরণ। চটিটা খুলে খালি ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটতে থাকলো ও। খুব আরাম লাগছে। ব্যাডমিন্টন কোর্টটায় আলো লাগানোর ব্যবস্থা আছে রাতে খেলার জন্য।
রাম ছুটে এল। মেমসাব, জুতা পহন লিজিয়ে। বহুৎ জোঁক হ্যায় ইঁয়হা।
- ও কিছু হবে না, তুমি যাও।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজের কাজে চলে যায় রাম। আরো কিছুক্ষণ বাগানটায় এলোমেলো ঘুড়ে বারন্দাটায় ফিরে আসে কিরণ। ছোটোটা এখনো ঘুমোচ্ছে় ঘরে ঢোকার আগে পাপোশের পাশে চটিটা খুলতে গিয়ে গিয়ে দেখল বাঁ পাটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল কিরণ। রান্নাঘর থেকে কৈলাশ ছুটে এসেছে। কিয়া হুয়া মেমসাব?

হাত পা ভয়ে কাঁপছে কিরণের। কোনোমতে শাড়িটা পায়ের পাতার ওপরে সামান্য তুলতেই পায়ের গোছের কাছটায় কালচে লাল রঙের প্রাণীটার দেখা মিলল - রক্ত খেয়ে পুরুষ্ট হয়ে আটকে রয়েছে একটা জোঁক।

-ডরিয়ে মৎ মেমসাব। ম্যায় অভি আয়া।
ছুটে চলে যায় কৈলাশ। শরীরে কোনো অস্বস্তি নেই। এতটা রক্ত বেরোলো, কোনো ব্যাথা বেদনাও নেই। কখন ধরলো জোঁকটা?
রান্নাঘর থেকে হাতে করে একটু নুন নিয়ে এসেছে কৈলাশ। জোঁকটার গায়ে দিতেই কিরণের পা ছেড়ে টুপ করে খসে পড়লো মাটিতে।

কিরণের



Avatar: ঝর্না

Re: একটা অর্ধ-সমাপ্ত গল্প

দারুন...


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন