Ashoke Mukhopadhyay RSS feed

Ashoke Mukhopadhyayএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • মন্দিরে মিলায় ধর্ম
    ১নির্ধারিত সময়ে ক্লাবঘরে পৌঁছে দেখি প্রায় জনা দশেক গুছিয়ে বসে আছে। এটা সচরাচর দেখতাম না ইদানীং। যে সময়ে মিটিং ডাকা হ’ত সেই সময়ে মিটিঙের আহ্বাহক পৌঁছে কাছের লোকেদের ফোন ও বাকিদের জন্য হোয়া (হোয়াটস্যাপ গ্রুপ, অনেকবার এর কথা আসবে তাই এখন থেকে হোয়া) গ্রুপে ...
  • আমাদের দুর্গা পূজা
    ছোটবেলায় হঠাৎ মাথায় প্রশ্ন আসছি্ল সব প্রতিমার মুখ দক্ষিন মুখি হয় কেন? সমবয়সী যাকে জিজ্ঞাস করেছিলাম সে উত্তর দিয়েছিল এটা নিয়ম, তোদের যেমন নামাজ পড়তে হয় পশ্চিম মুখি হয়ে এটাও তেমন। ওর জ্ঞান বিতরন শেষ হলো না, বলল খ্রিস্টানরা প্রার্থনা করে পুব মুখি হয়ে আর ...
  • দেশভাগঃ ফিরে দেখা
    রাত বারোটা পেরিয়ে যাওয়ার পর সোনালী পিং করল। "আধুনিক ভারতবর্ষের কোন পাঁচটা ঘটনা তোর ওপর সবচেয়ে বেশী ইমপ্যাক্ট ফেলেছে? "সোনালী কি সাংবাদিকতা ধরল? আমার ওপর সাক্ষাৎকার মক্সো করে হাত পাকাচ্ছে?আমি তানানা করি। এড়িয়ে যেতে চাই। তারপর মনে হয়, এটা একটা ছোট্ট খেলা। ...
  • সুর অ-সুর
    এখন কত কূটকচালি ! একদিকে এক ধর্মের লোক অন্যদের জন্য বিধিনিষেধ বাধাবিপত্তি আরোপ করে চলেছে তো অন্যদিকে একদিকে ধর্মের নামে ফতোয়া তো অন্যদিকে ধর্ম ছাঁটার নিদান। দুর্গাপুজোয় এগরোল খাওয়া চলবে কি চলবে না , পুজোয় মাতামাতি করা ভাল না খারাপ ,পুজোর মত ...
  • মানুষের গল্প
    এটা একটা গল্প। একটাই গল্প। একেবারে বানানো নয় - কাহিনীটি একটু অন্যরকম। কারো একান্ত সুগোপন ব্যক্তিগত দুঃখকে সকলের কাছে অনাবৃত করা কতদূর সমীচীন হচ্ছে জানি না, কতটুকু প্রকাশ করব তা নিজেই ঠিক করতে পারছি না। জন্মগত প্রকৃতিচিহ্নের বিপরীতমুখী মানুষদের অসহায় ...
  • পুজোর এচাল বেচাল
    পুজোর আর দশদিন বাকি, আজ শনিবার আর কাল বিশ্বকর্মা পুজো; ত্রহস্পর্শ যোগে রাস্তায় হাত মোছার ভারী সুবিধেজনক পরিস্থিতি। হাত মোছা মানে এই মিষ্টি খেয়ে রসটা বা আলুরচপ খেয়ে তেলটা মোছার কথা বলছি। শপিং মল গুলোতে মাইকে অনবরত ঘোষনা হয়ে চলেছে, 'এই অফার মিস করা মানে তা ...
  • ঘুম
    আগে খুব ঘুম পেয়ে যেতো। পড়তে বসলে তো কথাই নেই। ঢুলতে ঢুলতে লাল চোখ। কি পড়ছিস? সামনে ভূগোল বই, পড়ছি মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ। মা তো রেগে আগুন। ঘুম ছাড়া জীবনের কোন লক্ষ্য নেই মেয়ের। কি আক্ষেপ কি আক্ষেপ মায়ের। মা-রা ছিলেন আট বোন দুই ভাই, সর্বদাই কেউ না ...
  • 'এই ধ্বংসের দায়ভাগে': ভাবাদীঘি এবং আরও কিছু
    এই একবিংশ শতাব্দীতে পৌঁছে ক্রমে বুঝতে পারা যাচ্ছে যে সংকটের এক নতুন রুপরেখা তৈরি হচ্ছে। যে প্রগতিমুখর বেঁচে থাকায় আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠছি প্রতিনিয়ত, তাকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, "কোথায় লুকোবে ধু ধু করে মরুভূমি?"। এমন হতাশার উচ্চারণ যে আদৌ অমূলক নয়, তার ...
  • সেইসব দিনগুলি…
    সেইসব দিনগুলি…ঝুমা সমাদ্দার…...তারপর তো 'গল্পদাদুর আসর'ও ফুরিয়ে গেল। "দাঁড়ি কমা সহ 'এসেছে শরৎ' লেখা" শেষ হতে না হতেই মা জোর করে সামনে বসিয়ে টেনে টেনে চুলে বেড়াবিনুনী বেঁধে দিতে লাগলেন । মা'র শাড়িতে কেমন একটা হলুদ-তেল-বসন্তমালতী'...
  • হরিপদ কেরানিরর বিদেশযাত্রা
    অনেকদিন আগে , প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে এই গেঁয়ো মহারাজ , তখন তিনি আরোই ক্যাবলা , আনস্মার্ট , ছড়ু ছিলেন , মানে এখনও কম না , যাই হোক সেই সময় দেশের বাইরে যাবার সুযোগ ঘটেছিলো নেহাত আর কেউ যেতে চায়নি বলেই । না হলে খামোখা আমার নামে একটা আস্ত ভিসা হবার চান্স নেই এ ...

বল ও শক্তি: ধারণার রূপান্তর বিভ্রান্তি থেকে বিজ্ঞানে#1

Ashoke Mukhopadhyay

আধুনিক বিজ্ঞানে বস্তুর গতির রহস্য বুঝতে গেলেই বলের প্রসঙ্গ এসে পড়ে। আর দু এক ধাপ এগোলে আবার শক্তির কথাও উঠে যায়। সেই আলোচনা আজকালকার ছাত্ররা স্কুল পর্যায়েই এত সহজে শিখে ফেলে যে তাদের কখনও একবারও মনেই হয় না, এর মধ্যে কোনো রকম জটিলতা আছে বা এক কালে ছিল। কিন্তু আজ থেকে মাত্র দু চার হাজার বছর আগেকার কথা স্মরণ করুন। সেই ইতিহাসের গুহায় ঢুকলে দেখতে পাবেন, তখন অবধি মানুষ জানতই না, বস্তু যে চলে তা কিসের জোরে। তার নিয়ম কী, তার ভিত্তি কী। বল ও শক্তি--এই দুটো ধারণাই যে আদিম মানুষের ম্যাজিক সংস্কৃতির আঁতুরঘরে জন্ম নিয়েছিল তা অনেক সময়ই আমাদের খেয়াল থাকে না। বিশেষ করে, শক্তির ধারণা নানা রকম ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ও বোধের মধ্যে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। আজ অবধিও। একেবারে বিশ শতকে পা দিয়ে চিন্তার জগতে এই সমস্ত আদিম ধর্মীয় এবং/অথবা জাদু-বিশ্বাসের প্রভাব ও প্রকোপ থেকে ধীরে ধীরে মানুষ বিজ্ঞানের ধারণাগুলিকে মুক্ত করে নিতে পেরেছে।

অথচ, চারদিকে চোখ-কান পাতলেই দেখা এবং শোনা যাবে, যারা একদিন বিজ্ঞানে এই আদিম ধারণাগুলিকে দান করেছিল, বিজ্ঞান এগুলিকে পরিশুদ্ধ করে নেবার পর তাদেরই একালের উত্তরপুরুষদের একদল আজ আবার এগুলো ফেরত নিতে চাইছে। তারা এও দাবি জানাচ্ছে, বিজ্ঞান থেকেই তারা নাকি এদের পেতে পারে।

সেই দাবির যাথার্থ্য বিচারই আপাতত এই নিবন্ধের আলোচ্য।

[১] বল ও শক্তি

বল এবং শক্তি আধুনিক পদার্থ বিজ্ঞানের দুটি অত্যন্ত পরিচিত এবং প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা। পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বলবিদ্যার ক্ষেত্রে এদের বাদ দিয়ে কোনো আলোচনা এমনকি শুরু পর্যন্ত করা যায় না। ইতিহাসের দৃষ্টিতে দেখলে জানা যায়, অনেক প্রাচীন কাল থেকেই এদের নিয়ে মানুষকে মাথা ঘামাতে হয়েছে। যদিও আদিতে এই দুটি ভৌত ধারণা বা সংজ্ঞার মধ্যে খুব সুনির্দিষ্টভাবে পার্থক্য করা যায়নি বা করা সম্ভব হয়নি বলেই মনে হয়। অথচ আজ থেকে অন্তত আট-দশ হাজার বছর আগে, নবপলীয় যুগের সূচনাকাল থেকেই, মানুষ শুধু যে গতিশীল বস্তুকে অবলোকন করে আসছে তা-ই নয়, নিজেরাও কিছু না কিছু বস্তুকে সচল করে তুলে নানা রকম কাজ হাসিল করে যাচ্ছে। কুকুর দিয়ে স্লেজ গাড়ি চালাচ্ছে। গরু মোষ গাধা উট খচ্চর হাতি এবং ঘোড়াকে দিয়ে মাল পরিবহন করাচ্ছে, আবার চাকাওয়ালা গাড়িও চালাচ্ছে। নদীতে বা সমুদ্রে নৌকা বাইছে।

স্বভাবতই, একটা জিনিস সেই কালের মানুষরাও লক্ষ না করে পারেনি। কোনো কিছুকে এক জায়গা থেকে অন্যত্র নিয়ে যেতে হলে তাকে ঠেলতে হয়। ধাক্কা দিতে হয়। টানাটানি করতে হয়। হাল্কা জিনিস হলে কম ঠেলায় কাজ হয়। ভারি বস্তুকে সরাতে গেলে অনেক বেশি জোরে ঠেলা ধাক্কা দিতে হয়। গরু বা মোষ যত পরিমাণ মাল বহন করতে পারে, কুকুর তা পারে না। ইত্যাদি। এর থেকেই তারা সেই আদ্যিকালে বলের ধারণা করেছিল। বল এবং শক্তি প্রয়োগ--একই অর্থে তারা ভেবেছিল এবং কাজে প্রয়োগ করেছিল। কাজের সামর্থ্য, কব্জির জোর, জিনিস বইবার ক্ষমতা, পেশীর ক্ষমতা--সব কিছুরই একই মানে। যা দিয়ে কোনো কিছুর উপর জোর খাটানো যায়, যে কোনো ভারি জিনিসকে নড়ানো যায়, নাড়ানো যায়, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরানো যায়--তাই হচ্ছে বল কিংবা শক্তি।

সেকালে মানুষ সহজে নিজের আচরণের সাথে প্রকৃতির খুব একটা পার্থক্য করতে পারত না। হাতি শুঁড় দিয়ে মোটা মোটা গাছের ডাল ভেঙে দিচ্ছে। কী জোর, বাপ রে! আমার থেকে ও অনেক শক্তিশালী! পাহাড় থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ছে, সামনে যা কিছু পড়ছে ভেঙে-চুরে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে যাচ্ছে। তাহলে এরও বল আছে, এও শক্তি প্রয়োগ করছে। সেই ভারি পাথরটিও একটা শক্তির আধার। কিংবা যে পাহাড় তাকে নামিয়ে দিয়েছে সেও এক বিশাল শক্তির অধিষ্ঠাতৃ পুরুষ। কালক্রমে সেই হাতি, সেই পাহাড় হয়ে উঠল এক একজন দেবতা। তাদের যে শক্তি তা অদৃশ্য দৈব শক্তি। শক্তিটা দেখা যায় না। মানুষের শক্তি দেখা যায় না, হাতির শক্তিও দেখা যায় না, পাহাড়ের শক্তিও দেখা যায় না। কিন্তু শক্তির প্রকাশ সব ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে। যার বা যাদের ক্ষেত্রে শক্তির এই প্রকাশ মানুষের চাইতে অনেক বেশি বলে দেখা যাচ্ছে তারাই ধীরে ধীরে হয়ে উঠল দেবতা। তাদের শক্তি মানেই দৈব ব্যাপার।

তাহলে এই দৈব ব্যাপারের মধ্যে দুটো উপাদান আছে। অদৃশ্য এবং অধিক শক্তির প্রকাশ।

না, ভুল হল।

আরও একটা ঘটনা এর মধ্যে ছিল। এবং সেটাই আসল ব্যাপার। এই শক্তির ক্রিয়া বা প্রকাশ আচমকা ঘটছে। আকস্মিকভাবে। কখন ঘটবে আগে থেকে কেউ বুঝতে পারে না। কুকুর বা বেড়াল যে দুনিয়ার কোথাও ভালো করে দেবতা হতে পারল না, কিন্তু তার থেকে অনেক দুর্বল অনেক নিরীহ প্রাণী হয়েও সাপ বহু দেশেই মানুষের দেবতা হয়ে বসল, তার কারণ এই আকস্মিকতা। অভাবিত আবির্ভাব। সাপের ক্ষেত্রে আরও একটা মজার ঘটনা ঘটে গেল। সে আবার এল মাথায় এক মণি নিয়ে। যা কুকুরের নেই। বেড়ালের নেই। বেশিরভাগ দেবতা যারা হল তাদের নেই। যে সময়কার কথা হচ্ছে, যখন এই সব দেবতাদের জন্ম এবং প্রোমোশন হচ্ছে, তখন মানুষের হাতে নিজস্ব আলোর উৎস নেই বললেই চলে। দিনে সূর্য আর রাতে মাঝে মাঝে চাঁদ। চাঁদ না থাকলে রাতে একেবারে নিকষ কালো অন্ধকার। একটু হয়ত তারাদের বিচ্ছুরিত আলো। সেই আলোয় সাপের মাথায় আঁশের উপরে হাল্কা প্রতিফলনের ফলে চকচক করে ওঠে। বক্রতল বলে সবটা থেকে নয়, একটা মধ্যবর্তী কোনো ছোট জায়গা থেকে। বিশেষ করে সে যদি ফণা তোলা সাপ হয়--গোখরো, কেউটে, শঙ্খচূড়, প্রমুখ--তাহলে ঠিক তার মাথার মাঝখান থেকে চকচকে আলোটা দেখা যাবে। সুতরাং মণি তো বটেই। সবাই সেটা দেখতে পায়। আর তাদের কী ক্ষমতা। একটা ছোবল দিল, যাকে দিল প্রায়শই তার ভবলীলা সাঙ্গ। অতএব সেও দেবতা হয়ে গেল। ওই অদৃশ্য শক্তি আর তার আকস্মিক প্রকাশের ফলে।

সাধে কি আর আমরা আজও আকস্মিক বোঝাতে গিয়ে দৈবাৎ কথাটা ব্যবহার করি?

এখানে আর একটা জিনিসও মাথায় রাখতে হবে। বলের প্রকাশ যেখানে আকস্মিকভাবে ঘটছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেখানে মানুষের বিপদ ঘটছে, ক্ষতি হচ্ছে কিছু না কিছু। মানুষ নিজে যেখানে পশুর বল ব্যবহার করছে, সেখানে সচরাচর এই সমস্যা নেই। সেখানে তা তার কাজেই লেগে যাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতি হোক আর কোনো বন্য প্রাণী হোক, উপরে বর্ণিত যে কোনো রকম আকস্মিক বলের ঘটনা মানেই হল মানুষের কোনো না কোনো ক্ষতি। বেশি বা কম, যেমনই হোক। এই ক্ষতি যে ঘটাচ্ছে তাকে খুশি করে বা ভয় দেখিয়ে--যেভাবেই হোক--বশ মানাতে হবে। শান্ত করতে হবে। যাতে সে আর ক্ষতি না করে, আরও বড় ক্ষতি না করে। মানুষের মতোই তো সব। মানুষের মতো করেই তাদের সামলানোর প্রয়াস।

আবার তার চরিত্রটাও বুঝতে হবে। হ্যাঁ, তখনকার মানুষেরাও জানতে চেয়েছিল, বুঝতে চেয়েছিল। বুঝে তবেই তাকে আর একটু ভালোভাবে সামলানো যাবে। সেই চেষ্টাও মানুষ করেছিল। কেন না সে নিজেও এই রকম অতিরিক্ত ও অপরিমিত শক্তির অধিকারী হতে চেয়েছিল। ভেবেছিল, হাতি যা পারে, পাহাড় যা পারে, একটা মানুষও তা করতে পারবে। সবাই না পারলেও অন্তত কিছু মানুষ পারবে। শুধু হাতি বা পাহাড়ের কাছ থেকে তাদের বলটা আদায় করার কায়দা কৌশল আয়ত্ত করতে হবে।

[২] যাদুবিদ্যা ও মন্ত্র-শক্তি

সেই চেষ্টারই অন্যতম ফসল যাদু বিদ্যা ও মন্ত্র-শক্তির ধারণা।

মানুষের রাগ বা ক্ষোভ হলে তাকে খাবার দিয়ে সন্তুষ্ট করা যায়, শান্ত করা যায়। হাতি বা ঘোড়াকে খাদ্য দিলে তারা মানুষের অনেক কাজই মুখ বুজে করে দেয়। গোলমাল করে না। মানুষেরা নিজেদের মধ্যে কথা বলে। ক্রুদ্ধ বা বিক্ষুব্ধ মানুষকে শান্ত করার জন্য মিস্টি করে কথা বলে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ হাতি বা ঘোড়ার সঙ্গেও কথা বলে, ডাক দেয়, হাঁক দেয়। পিঠে মাথায় লেজে শুঁড়ে হাত বোলায় আর কথা বলে। আবোলতাবোল বকে। মানবশিশুদের শান্ত করা, কান্না থামানো, খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানোর জন্যও মানুষ কত আগডুম-বাগডুম বকে। এই সবেই খানিকটা কাজও যে হয় তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। এ হচ্ছে এক অর্থে কথার শক্তি। বাক্যশক্তি। সুরেলা ছন্দোবদ্ধ শব্দের শক্তি। এই রকম কথাই কোনো মানব গোষ্ঠীর বিশেষ প্রয়োজনে যখন কোনো বড় শক্তিকে শান্ত করা বা বাগে আনার জন্য বিশেষ কায়দায় সুর করে আবৃত্তি ও পুনরাবৃত্তি করা হতে থাকে, তা হয়ে ওঠে মন্ত্র। তা যে কাজ করে তার কারণ তাতেও আছে শক্তি। এইভাবে বাক্যশক্তি এক সময় হয়ে ওঠে মন্ত্রশক্তি।

অর্থাৎ, ব্যাপারটা পরিষ্কার করে বুঝে নেওয়া যাক। শিশুকে ঘুম পাড়ানোটা মন্ত্র নয়। ওটা শিশু ভোলানো ছড়া। সারা পৃথিবী জুড়েই এরকম অসংখ্য ছড়া ছড়িয়ে আছে। সেগুলোর কোনো অর্থ বিশেষ তেমন কিছু নেই। “ছেলে ঘুমাল পাড়া জুড়াল বর্গি এল দেশে,/ বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেব কিসে?”--এরকম পর পর চরণের মধ্যে কোনো অর্থগত পারম্পর্য নেই। ধ্বনি-ছন্দ বা শ্রুতিমাধুর্য থাকলেও বিরাট কোনো কাব্যগুণ হয়ত তাদের নেই। কিন্তু তবুও জনপ্রিয়। হাজার হাজার বছর ধরে লোকেরা বলে আসছে। শুনে শুনে মুখস্থ রেখেছে। প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরে চালু রয়ে গেছে। তথাপি তা মন্ত্র হয়নি। ছড়াই থেকেছে। গরু বা ঘোড়াকে জাবনা খাওয়ানোর সময় বা তাদের নিয়ে পথ চলার সময় বকবক করাটাও কোনো মন্ত্র নয়। বেড়াল বা কুকুরের সঙ্গে গল্প করার মধ্যেও কোনো মন্ত্রের ব্যাপার নেই। কিন্তু ধস যে নামায়, পাথর যে গড়িয়ে ফেলে দেয়, সেই অশান্ত পাহাড়কে খুশি করার উদ্দেশ্যে, কিংবা, পায়ের তলায় মাটি টলিয়ে দেওয়া, ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলা ভূমিকম্পমান পৃথিবীকে রাগ নিবারণ করতে বলার জন্য উচ্চারিত যে ধ্বনি-আবৃত্তি--তা হচ্ছে মন্ত্র। যে নদী ফুলে ফেঁপে উঠে বন্যা ঘটায়, ব্যাপক প্রাণ-হানি এবং সম্পদ হানির কারণ হয়ে ওঠে, তাকে খুশী করতে যে বাক্যবিস্তার--তাই হয়ে ওঠে মন্ত্র। তার কোনো অর্থ বা স্পষ্টতার দরকার নেই। কেউ তা জানতে চাইবেও না।

প্রাচীন কালের মানুষের অনেক কিছু আচার বিচারের পেছনে পাওয়া যাবে এই রকম ভাবে প্রাকৃতিক নানা বিরূপ শক্তিকে খুশি করার চেষ্টা আর তার সাথে সংযুক্ত নানা মন্ত্রপাঠ। নৃতত্ত্ববিদ, সমাজতত্ত্ববিদ, লোকসংস্কৃতিগবেষক ও প্রাচীন ইতিহাসবিশেষজ্ঞ পণ্ডিতরা এই জাতীয় অনেক রকম আচার বিচার প্রথা প্রকরণ এই সমাজবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, তা আর কিছুই নয়, এক ধরনের ম্যাজিক বা যাদুবিদ্যা। আধুনিক অর্থে হাতসাফাইয়ের বা মঞ্চ-সাজানো যাদু নয়, জীবনযুদ্ধের সাংস্কৃতিক আঙ্গিক রূপে যাদু। ঈপ্সিত ফললাভের উদ্দেশ্যে, মানুষের চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান এবং সম্ভাব্য ক্ষতিকারক প্রাকৃতিক শক্তিগুলিকে বশ করা, বাগে আনা, কাজে লাগানো, খুশি রাখা, ক্ষতি করা থেকে বিরত রাখা--ইত্যাদির উদ্দেশ্যে এই সমস্ত ক্রিয়ানুষ্ঠান এবং বাক্যবিস্তার। এই দুইয়ে মিলিয়ে হচ্ছে যাদুমন্ত্র।

এই ম্যাজিক সংস্কৃতি মানব সমাজে সব চাইতে বেশি সময় ধরে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে টিঁকে রয়েছে। পৃথিবীতে বর্তমান হোমো স্যাপিয়েন্স-এর আগমনকালের সময় থেকে তো বলা যেতেই পারে। অন্তত পঞ্চাশ হাজার বছর ধরে। আধুনিক উন্নত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর সমাজও এর প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারেনি। এর উৎপত্তি ধর্মের আবির্ভাবেরও আগে। ধর্মের আবির্ভাবের সময়ে প্রায় সমস্ত ধর্মই একে বিরোধিতা করেছে। বৌদ্ধ ধর্ম, খ্রিস্টধর্ম, ইসলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমস্ত ধর্মই এই সংস্কৃতির অধিকাংশ উপাদানগুলিকে গ্রহণ ও আত্মসাৎ করে নিয়েছে, নিজ নিজ ধর্মীয় প্রথা প্রকরণের অঙ্গীভূত করে নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে ধর্মোত্তর বা ধর্মনিস্পৃহ গণতান্ত্রিক সমাজে। ধর্মবিশ্বাসী সাধারণ মানুষেরা এগুলিকেই আজ বলেন সংস্কার বা ঐতিহ্য বা পরম্পরা। আর যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনস্ক মানুষেরা এগুলিকেই বলেন আচার-বিচার-কুসংস্কার।

বেশ কয়েকটি প্রশ্ন এখানে উঠে আসবেই।

(ক) এই সংস্কার বা কুসংস্কারগুলি এতদিন ধরে মানুষের মনে টিঁকে রইল কী করে?
(খ) ধর্ম প্রথমে এদের বিরোধিতা করেছিল কেন?
(গ) তারপরে আবার ধর্ম এগুলোকে মেনে নিল কেন?
(ঘ) আধুনিক বিজ্ঞান নির্ভর সমাজেই বা এগুলির বেঁচে থাকার কারণ কী?

টিঁকে থাকার প্রশ্নটাই সবচাইতে জরুরি। ঘুরে ঘুরে আসে। আমাদের এই আলোচনায়ও দুবার উঠে এল। এক এবং চার নম্বরে। বহু মানুষ আছেন যাঁরা এখনও এই টিঁকে থাকার ঘটনাকেই এই কুসংস্কারগুলির সপক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি বা যথার্থতা বলে মনে করেন। সমাজে নিতান্ত বিনা কারণে কি আর এগুলি টিঁকে আছে? কোনো লাভ যদি না-ই হবে মানুষ যাবে কেন ওঝা গুণিনের কাছে? হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ শুধু ঠকে এল আবার মেনেও এল? তা হয় নাকি?

তবে শুরুতেই বলে রাখি, এই প্রশ্ন নিয়ে আজকের দিনে আলোচনা করায় প্রচুর অসুবিধা আছে। আমাদের আজকালকার যে আধুনিক মন তাই দিয়ে আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগেকার মানুষের মনের হদিশ নিতে গেলে ভুল হয়ে যাবে। আজ একজন বিশ্বাসীও যতটা প্রশ্ন করতে চান, যুক্তি খোঁজেন, যাথার্থ্য বুঝতে চেষ্টা করেন, চার বা পাঁচ হাজার বছর আগের একজন যুক্তিবাদীও ততটা সংশয়প্রবণ হতেন না। হওয়ার কথাই ছিল না। হওয়া সম্ভবও ছিল না। জ্ঞানবৃদ্ধির সাথে সাথেই মানুষের প্রশ্নশীলতা বা যুক্তিপরায়ণতা বেড়েছে। জিগীষা আর জিজ্ঞাসা সময়ের সমান্তরালে এক সাথে হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলেছে।

আসল কথা, সাফল্য।

ইংরেজি প্রবচনে আছে, সাফল্যের চেয়ে বড় সফল আর কিছু হয় না। মন্ত্রতন্ত্রও যদি সফল হয় কোনো ক্ষেত্রে সে মানুষের মনে দাগ কেটে ফেলবে। নিশ্চয়ই উপরে কথিত যাদুবিদ্যা কোনো না কোনো ক্ষেত্রে সফল হত। হয়ত বেশ কিছু ক্ষেত্রেই হত। ধরুন, একজন ওঝা সাপে কাটা রোগীকে বাঁচানোর জন্য সাপের বিষ নামানোর মন্ত্র পড়ছে। যাঁরা আজকের দিনে এই ধরনের ঘটনা নিয়ে কাজ করেন তাঁরা জানেন, সাপ কামড়ালেই মানুষের মৃত্যু হয় না। তিনটি শর্ত পূরণ করে কামড়াতে হয়। এক, সাপটিকে বিষধর হতে হবে। দুই, সাপটিকে ঠিক মতো দাঁত ফোটাতে হবে। তিন, বিষ থলিতে পর্যাপ্ত বিষ থাকতে হবে। প্রথম প্রশ্নে এখন আমরা জানি, পৃথিবীতে বিষধর সাপের তুলনায় নির্বিষ সাপের সংখ্যা অনেক বেশি। এই কথা দুচার হাজার বছর আগে মানুষ যে ভালো করে জানত না, তা তো বেহুলা-লখিন্দরের পুরা-কাহিনি থেকেই আমরা বুঝতে পারি। কালনাগিনী কামড়েছিল বলেই না বেহুলা বৈধব্যের হাত থেকে সেবার বেঁচে গিয়েছিলেন। কালকেউটে ওই ছোবলটি দিলে কী হত ভাবুন দেখি একবার . . . ! তারা তখন সমস্ত সাপকেই বিষযুক্ত বলে ধরে নিত। ফলে, এখন নিশ্চয়ই বুঝি, পারিসংখ্যানিক বিচারে এমনিতেই সাপে কামড়ালেও বেঁচে যাওয়ার সম্ভাব্যতা যথেষ্ট বেশি। দ্বিতীয়ত, চলাফেরার কারণে বহু সময়ই সাপের দাঁত সোজাসুজি রোগীর গায়ে বসে না, ফলে বিষ শরীরে যায় কম। তৃতীয়ত, সাপটি যদি কিছুক্ষণ আগে অন্য কোনো প্রাণীকে কামড়ে এসে থাকে, তাহলে তার বিষ থলিতে বিষ থাকবে কম। ঠিক মতো কামড়ালেও রোগী মরবে না।

অতএব সাপে কাটা যে রোগীকে গুণিনের কাছে আনা হল, উপরোক্ত তিনটি শর্তই এক যোগে পূরণ না হয়ে থাকলে সে এমনিতেই মরবে না। সেটা তো যারা তাকে নিয়ে এসেছে, বা যার কাছে নিয়ে এসেছে, তারা কেউই সেদিন জানে না। যাকে সাপে কামড়েছে, সেও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে আছে। অথচ তারা দেখছে, সাপে কেটেছে, আর ওঝা মন্ত্র ঝেড়ে ঝেড়ে তাকে বাঁচিয়ে তুলছে। ওঝা এবং মন্ত্র--দুটোরই জয়জয়কার হয়ে যাবে। গ্রামে গ্রামান্তরে প্রচার হয়ে যাবে। ওঝা তো নয়, সাপের একেবারে সাক্ষাত যম! আর মন্ত্রের কী জোর! মা মনসাকেও একেবারে নাচিয়ে ছেড়ে দেয়!

এই শেষ কথাটা পাঠককে লক্ষ করতে বলছি।

দুইয়ের মধ্যে আবার মন্ত্রের জোরটাই আসল। গুণিন যদি ঠিক মতো মন্ত্র আয়ত্ত করতে না পারে, এবং/অথবা, তার মনে যদি কোনো পাপ, অশুচিতা, লোভ, ক্ষমতা জাহিরতা, ইত্যাদি থেকে থাকে তাহলে কাজ হবে না। অর্থাৎ, বিপরীতক্রমে, যদি মন্ত্রে কোনো কাজ না হয়, তাহলে বুঝতে হবে, গুণিনেরই দোষ। মন্ত্রশক্তির গুণ তো আর কদাচ নষ্ট হয় না। প্রাচীনকালে এই যুক্তিটা যে সহজেই মানুষের মনে গেঁথে যাবে তা নিশ্চয়ই আজ কাউকে বুঝিয়ে বলতে হবে না।

তাই এটাও মনে রাখতে হবে, সেই ওঝা-গুনিনরা কেউ ভণ্ড ছিল না। আমজনতা এবং বিশেষজ্ঞ গুনিন—সংশ্লিষ্ট সমস্যার ব্যাপারে উভয়েই ছিল সমান রকম অজ্ঞ।

আর একটা উদাহরণ দিই। ধরুন গ্রীষ্মের গরমে যখন মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত সেই সময়ে বৃষ্টির জন্য যজ্ঞ করা হল। (ভারতের সাপেক্ষে) পবন বরুণ এবং অন্য সমস্ত বিভাগীয় দেবতাদের কাছে জবরদস্ত দরবার করা হল ‘বৃষ্টি দাও’ ‘বৃষ্টি দাও’ বলে। ঋগ-বেদ থেকে নানা অধ্যায় ঘাঁটাঘাঁটি করে উপযুক্ত মন্ত্রও সংশ্লেষণ করা হল এর জন্য। এই যজ্ঞের সাফল্যের সম্ভাবনাটা একবার ভাবুন। তখন পরিবেশ দুষণ বিশ্ব উষ্ণায়ন আজকের মাত্রায় উপস্থিত ছিল না। গ্রীষ্মকালের শেষে বর্ষাকাল আপনিই রুটিন মেনে মোটামুটি চলে আসত। সেই রকম সময়ে সেই বৃষ্টি-যজ্ঞের সাফল্যের তো ষোল আনা সম্ভাবনা। সাধারণ মানুষ তো বটেই, এমনকি যে ওঝা গুণিন পুরোহিত যজ্ঞ করছে তারাও জানে না যে নির্দিষ্ট সময়ে প্রকৃতির নিয়মেই বর্ষা এসে যাবে। ফলে গরমে ঝলসে যেতে যেতে যখন বর্ষা নামল, সকলে ধরেই নেবে, যজ্ঞ সফল। মন্ত্রশক্তির ক্ষমতা প্রমাণিত। আবার এখানেও যদি কোনো কারণে বৃষ্টি না হয়, বর্ষা আসতে দেরি হয়, বেশিরভাগ লোক ধরে নেবে, যজ্ঞের ঋত্বিক পুরোহিত আচার্য প্রমুখর কেউ না কেউ বা একাধিক ব্যক্তি কিছু পাপ-টাপ করেছিল বলেই মন্ত্রের কাজ বিফল হল।

এই রকম আরও বহু উদাহরণ ধরে ধরে আলোচনা করে দেখানো যায়, প্রাকৃতিক নিয়মেই যা ঘটবারই কথা এবং যা প্রায় সময়ই ঘটে যেত, সেই সব ঘটনাই সেকালে ওঝা-গুণিনদের আধিভৌতিক ক্ষমতা এবং তাদের উচ্চারিত মন্ত্রের অন্তর্নিহিত শক্তির পরিচয় বলে গণ্য হত।

অন্যদিকে এও সকলেই জানেন, শুধু সেদিনকার কেন আজও অধিকাংশ মানুষ এই সব মন্ত্রতন্ত্র তুক্‌তাক ভোজবাজি ইত্যাদির ক্ষেত্রে সাফল্য ও ব্যর্থতার আপেক্ষিক পারিসংখ্যানিক বিচার করে না। আধুনিক বিজ্ঞানের এই শিক্ষা এখনও বিজ্ঞানীদেরই সকলে তাঁদের বিশেষ নৈপুণ্যের বাইরে খুব একটা প্রয়োগ করেন না এবং নানা ব্যাপারে বহু যা-তা জিনিস বিশ্বাস করে বসেন। যেমন করে অনেকে আজকাল জ্যোতিষবিদ্যা কিংবা হোমিওপ্যাথির ক্ষেত্রে দু-চারটে ঘটনা মিলে যাওয়ার বা সেরে যাওয়ার উদাহরণ দিয়ে তার বৈজ্ঞানিকতার সমর্থনে বলে থাকেন আর কী। সুতরাং সেকালেও লোকে যে দু একটা সাফল্য দেখলেই বাকি সমস্ত ব্যর্থতার ঘটনা ভুলে যাবে বা অগ্রাহ্য করবে--এ আর বেশি কথা কী? বিশেষ করে যেখানে ব্যর্থতার জন্য ব্যক্তিবিশেষের চরিত্র দোষকে দায়ী করার সহজ ফরমুলার ব্যবহার তখন পুরো দস্তুর বর্তমান।

এইভাবেই ইতিহাসে একদিন মন্ত্রশক্তি এক আধিভৌতিক শক্তি হিসাবে মানুষের কাছে সম্মানের জায়গা পেয়ে গেল।




আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন