Muradul islam RSS feed

www.muradulislam.me

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • আমার প্রতিবাদের শাড়ি
    আমার প্রতিবাদের শাড়িসামিয়ানা জানেন? আমরা বলি সাইমানা ,পুরানো শাড়ি দিয়ে যেমন ক্যাথা হয় ,গ্রামের মেয়েরা সুচ সুতো দিয়ে নকশা তোলে তেমন সামিয়ানাও হয় । খড়ের ,টিনের বা এসবেস্টাসের চালের নিচে ধুলো বালি আটকাতে বা নগ্ন চালা কে সভ্য বানাতে সাইমানা টানানো আমাদের ...
  • টয়লেট - এক আস্ফালনগাথা
    আজ ১৯শে নভেম্বর, সলিল চৌধুরী র জন্মদিন। ইন্দিরা গান্ধীরও জন্মদিন। ২০১৩ সাল অবধি দেশে এটি পালিত হয়েছে “রাষ্ট্রীয় একতা দিবস” বলে। আন্তর্জাতিক স্তরে গুগুল করলে দেখা যাচ্ছে এটি আবার নাকি International Men’s Day বলে পালিত হয়। এই বছরই সরকারী প্রচারে জানা গেল ...
  • মার্জারবৃত্তান্ত
    বেড়াল অনেকের আদরের পুষ্যি। বেড়ালও অনেককে বেশ ভালোবাসে। তবে কুকুরের প্রভুভক্তি বা বিশ্বাসযোগ্যতা বেড়ালের কাছে আশা করলে দুঃখ লাভের সম্ভাবনা আছে। প্রবাদ আছে কুকুর নাকি খেতে খেতে দিলে প্রার্থনা করে, আমার প্রভু ধনেজনে বাড়ুক, পাতেপাতে ভাত পড়বে আমিও পেটপুরে ...
  • বসন্তবৌরী
    বিল্টু তোতা বুবাই সবাই আজ খুব উত্তেজিত। ওরা দেখেছে ছাদে যে কাপড় শুকোতে দেয়ার একটা বাঁশ আছে সেখানে একটা ছোট্ট সবুজ পাখি বাসা বেঁধেছে। কে যেন বললো এই ছোট্ট পাখিটার নাম বসন্তবৌরী। বসন্তবৌরী পাখিটি আবার ভারী ব্যস্তসমস্ত। সকাল বেলা বেরিয়ে যায়, সারাদিন কোথায় ...
  • সামান্থা ফক্স
    সামান্থা ফক্সচুপচাপ উপুড় হয়ে শুয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়েছিলাম। মাথায় কয়েকশো চিন্তা।হস্টেলে মেস বিল বাকি প্রায় তিন মাস। অভাবে নয়,স্বভাবে। বাড়ি থেকে পয়সা পাঠালেই নেশাগুলো চাগাড় দিয়ে ওঠে। গভীর রাতের ভিডিও হলের চাম্পি সিনেমা,আপসু রাম আর ফার্স্ট ইয়ার কোন এক ...
  • ইংরাজী মিডিয়ামের বাংলা-জ্ঞান
    বাংলা মাধ্যম নাকি ইংরাজী মাধ্যম ? সুবিধা কি, অসুবিধাই বা কি? অনেক বিনিদ্র রজনী কাটাতে হয়েছে এই সিদ্ধান্ত নিতে! তারপরেও সংশয় যেতে চায় না। ঠিক করলাম, না কি ভুলই করলাম? উত্তর একদিন খানিক পরিস্কার হল। যেদিন একটি এগার বছরের আজন্ম ইংরাজী মাধ্যমে পড়া ছেলে এই ...
  • রুশ বিপ্লবের ইতিহাস
    রুশ বিপ্লবের ইতিহাসরাশিয়ায় শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের বিষয়টিকেই বলা হয় রুশ বিপ্লব। ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত ‘দুনিয়া কাঁপানো দশদিন’ সময়পর্বের মধ্যে এই বিপ্লবের চূড়ান্ত পর্বটি সংগঠিত হয়েছিল।অবশ্য দুনিয়া কাঁপানো এই দশ ...
  • হিজিবিজি
    শীত আসছে....মানে কোলকাতার শীত আর কি। কোলকাতার বাইরে সব্বাই শুনে যাকে খিল্লি করে সেই শীত। অবশ্য কোলকাতার সব কিছু নিয়েই তো তামাশা চলে আজকাল, গরীব আত্মীয় বড়লোকের ড্রয়িংরুমে যেমন। তাও কাঁথার আরামের মতোই কোলকাতার মায়া জড়িয়ে রাখে, বড় মায়া হে এ শহর ছাড়িয়ে মাঠ ...
  • আমার কালী....... আমিও কালী
    কালী ঠাকুরে আমার খুব ভয়। গলায় মুন্ডমালা,হাতে একটা কাটা মুন্ডু থেকে রক্ত ঝরে পড়ছে, একটা হাড় জিরজিরে শেয়াল তা চেটে চেটে খাচ্ছে, হাতে খাঁড়া, কালো কুস্টি, এলো চুল,উলঙ্গ দেহ, সেই ছোট বেলায় মন্ডপে দেখে এমন ভয় পেয়েছিলাম সেই ভয় আমার আজও যায়নি। আর আমার এই কালী ...
  • নভেম্বর ২০১৭
    ষাট বা সত্তর সম্পর্কে প্রত্যক্ষজ্ঞান নেই, তবে আশির দশক মোটামুটিভাবে ছিল শ্রেণীসংগ্রামের যুগ। মানে ভারতের বামঘরানার লোকজনের চিন্তনে। ফ্রান্সে ১৯৬৮ সালের বিপ্লব প্রচেষ্টা তখন অতীত। সেসব উত্তাল সময়ে অদ্ভুত তত্ত্বের জন্ম হয়েছে জানা ছিল। কিন্তু সেগুলো খায় না ...

মসলিন চাষী

Muradul islam

ঘুমালে আমি হয়ে যাই মসলিন চাষী, বিষয়টা আপনাদের কাছে হয়ত বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে না, কিন্তু তা সত্য এবং এক অতি অদ্ভুত ব্যবস্থার মধ্যে আমি পড়ে গেছি ও এর থেকে নিস্তারের উপায় কী তা আমার জানা নেই; কিন্তু শেষপর্যন্ত আমি লিখে যাচ্ছি, যা থাকে কপালে, যখন আর কিছু করা সম্ভব না এবং যখন অতি অবাস্তব এক পরিণতির দ্বারপ্রান্তে এসে আমি উপস্থিত হয়েছি তখন এ ভিন্ন আর কিছু আমার মাথায় আসছে না;

ঘটনা হচ্ছে ঘুমালে আমি হয়ে যাই মসলিন চাষী, এবং তা শুরু হয়েছে মাত্র দুয়েকদিন আগে থেকে, আমি দেখলাম আমি একটি রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছি, তখন আমার সাথে একটি লোকের দেখা হয়, তার পোশাক পরিচ্ছদ কেমন ছিল আমার এখন মনে নেই তবে স্পষ্ট মনে আছে তার হাতে একটি জালিবেত ছিল, আর সেই বেতের রঙ ছিল মিশমিশে কালো;

লোকটি আমাকে দেখে বললেন, “ডু ইউ নো সামথিং এবাউট মসলিন?”

আমি তার প্রশ্নে অবাক হয়ে গেলাম কিছুটা এবং ধরতে পারলাম না তিনি আসলে কী জিজ্ঞাসা করছেন, কারণ চিনিনা জানিনা এমন মানুষ হুট করে এরকম প্রশ্ন করে বসবেন তা ঠিক হিসাবের মধ্যে পড়ে না, আমি উত্তরে বললাম, “মাশরুম?”

তিনি বললেন, “না, মসলিন, মলবুস খাস, মলমল খাস...ইউ নো?”

আমি বললাম, “আপনি ইংরাজিতে কথা বলছেন কেন? বাংলায় কথা বলেন। বাংলা আমার সেভেন্টি পার্সেন্ট মাতৃভাষা।”

এই সময় একটা শব্দ হলো যাকে বলা যায় “সপাং”; ভদ্রলোকের হাতের বেত মুহুর্তের মধ্যে লাফিয়ে এসে, অতি দ্রুতবেগে আমাকে আঘাত করল আর যে স্থানে বেত স্পর্শ করেছিল সে স্থানে ব্যথার তীব্র অনুভূতি আমি অনুভব করতে লাগলাম; আমি কিছু বলার আগেই লোকটি বিকৃত মুখে বলে উঠল,
“হারামজাদা ব্লাডি বেঙ্গালি, এখন দেশ চালায় ইংরাজ, ইংরাজি চলবে না কি তর ভাষা চলবে? ইডিয়ট!”

আমি বুঝে নিলাম অবস্থা সঙ্গীন, চারপাশে মানুষজন নাই, আর জায়গাটাও অচেনা, ফলে কী হচ্ছে বা কেন হচ্ছে তা বুঝতে আমাকে ঘটনার সাথে এগিয়ে যেতে হবে, আমি লোকটিকে বললাম, “ইয়েস স্যার!”

লোকটি মুখে অল্প হাসি এনে বলল, “এই তো, ভেরী গুড। এখন আমার কথার উত্তর দে বাছাধন? হোয়ার ইজ মাই মলবুস খাস?”

আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে বললাম, “স্যার, বিশ্বাস করুন, আমি এগুলি সম্পর্কে কিছুই জানি না। আমি একজন নাদান মানুষ, এতসব জটিল শব্দের নাম এর আগে কোনদিন শুনিও নাই।”

লোকটি আমার দিকে অল্পক্ষণ তাকিয়ে তার বেতকে অন্য হাত দিয়ে মালিশ করল, আমি ভেবেছিলাম যে অচিরেই হয়ত আরো কয়েক ঘা বেত্রাঘাত হজম করতে হবে কিন্তু তা হয় নি, লোকটি হঠাৎ বলল, “আই নো, কীভাবে তোদের মত লায়ারদের কাছ থেকে সত্যটা বাইর করে নিতে হয়। এর জন্যই আট বছর ধরে ইংরাজ স্যারদের সাথে কাজ করতে পারছি। প্রথমে ছিলাম দালাল, এখন হইছি গোমস্তা। এইসব কি এমনে এমনে? ভেরি ফানি!”

লোকটি’র কথায় আমি ভয় পেয়ে গেলাম, ভয় পাবার যথেষ্ট কারণও ছিল, লোকটি হঠাৎ আমার ঘাড় ধরে ধাক্কাতে শুরু করল এবং ধাক্কাতে ধাক্কাতে বাঁশের চাটাই দ্বারা নির্মিত দেয়ালযুক্ত একটি ছোট ঘরে আমাকে নিয়ে গেল, সেই ঘরে দেখলাম কয়েকটি ছিকার মধ্যে ঝুলছে হাড়ি, ছিকা হলো দড়ি দিয়ে বানানো এক ধরনের খাচার মত জিনিস, যার মধ্যে গ্রামাঞ্চলে আগেকার দিনে হাড়ি ঝুলিয়ে রাখা হতো; এবং ঘরের মধ্যে ছিল একটি মাটির প্রদীপ, হয়ত কেরোসিনের সাহায্যে জ্বলছে, আগুনের শিখা উপরে উঠছে সাথে নিয়ে কালো ধোঁয়া, প্রদীপের আলো বেশী না, ছড়াচ্ছে অল্প জায়গায়, ঘরের একপাশে রাখা একটি মটকী, তার মুখে বাঁশের একটি ঝাঁকা উলটা করে রাখা আছে;

লোকটা আমাকে নিয়ে একটা চেয়ারের মত টুলে বসাল এবং সে বসল সামনের টেবিলের উপরে, এরপর আমার দিকে তাকিয়ে খিকখিক করে হেসে বললো, “দাদনের মানি ফেরত দে!”

আমি বললাম, “স্যার, আপনি ভুল করছেন, আমি ঐ মানুষ নই যাকে আপনি খুঁজছেন, গ্রেইভ মিস্টেক!”

ঠাশ করে একটা চড় এসে লাগল আমার গালে, আমি চারিদিকে অন্ধকার দেখলাম প্রায়, মাথা ঘুরতে লাগলো, আমি চোখ বন্ধ করে সর্ষে ফুল দেখার প্রানপন চেষ্টা করলাম কারণ আমি শুনেছি এরকম অবস্থায় লোকেরা সর্ষে ফুল দেখেন, যদিও অনেক চেষ্টার পরেও আমি দেখেছিলাম কেবল অন্ধকার;
লোকটি মুখ বিকৃত করে, বিকৃত স্বরে বলল, “হারামজাদা, নো ইংলিশ! তাঁতির বাচ্চা তাঁতি, তুই কেন ইংরাজি বলবি? ইংরাজির একটা সম্মান আছে না!”

তারপর আমার মাথার সামনের দিকের চুলের মুঠি ধরে বলল, “যা বলছি তা বলে দে, তরে ছেড়ে দেই। হোয়ার ইজ মাই মলবুস খাস?”

আমি চোখ দিয়ে জল এলো; চোখ ফেটে এলো জল, এমনি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল, ইস্কুলে পড়া নজরুলের কুলি মজুর কবিতা ভেসে উঠল চোখের সামনে, আমি কী বলব বুঝতে পারলাম না, কারণ আমি যাই বলি না কেন আমার সামনে যিনি উপস্থিত আছেন, আছেন যে একজন স্যার, তিনি আমার কোন কথাই শুনবেন বলে মনে হচ্ছে না;

আমি ঠিক করলাম লোকটির কথা মেনে নিয়ে কথা বলবো, তাতে অন্তত আপাতত তার রোষানল থেকে বাঁচা যাবে; আমি বললাম, “স্যার, মলবুস খান কোথায় আমি জানি না। তবে যেখানেই থাকুক সে, আপনার জন্য আমি তাকে খুঁজে বের করব। ইয়ে মেরি ওয়াদা।”

প্রসন্ন হাসি ফুটে উঠল লোকটির মুখে। সে বলল, “এই তো গুড বাত। ভদ্রলোকের মত কথা বললি। এরকম আগে বললে এত ঝামেলা হতো না। এখন যা, গিয়া মলবুস খাস তৈরী করতে লেগে যা।”

আমি বললাম, “জি স্যার।”

লোকটি বলল, “বইয়া রইছস ক্যা? উইঠা যা হারামজাদা!”

আমি উঠে গেলাম দরজার কাছে, বাইরে তাকিয়ে দেখি ঘুটঘুটে অন্ধকার, এমন অন্ধকারে পা ফেলতেও ভয় হয়, মনে হয় এই বুঝি পা দিলাম পুলসিরাতে, আর আমি যে গুনাগার বান্দা, পা দিলে চিকন চুলের সমান পুলসিরাত ভেঙ্গে সোজা দোজখে পড়ব তাতে কোনই সন্দেহ নাই; ঠিক অজগরের বিরাট হা এর মধ্যে, সে অজগর আবার সাঁতার কাটছে আগুনের সমুদ্রে; সেই বিস্তৃত আগুনের সমুদ্র অতল, অথই আগুন জল, বিরাট বিরাট ঢেউ এসে নিত্য বাড়ি খায় আর হারিয়ে যায়, আগুন আর আগুন, লেলিহান আগুনের ঢেউ, আগুনের জিভ...আর কিছু নেই...

দরজায় দাঁড়িয়ে ভাবছি কীভাবে যাবো আর তখনই অনুভব করলাম পশ্চাতদেশে শক্তিশালী লাথি, এবং তাতে শূন্যে ভাসতে ভাসতে আমার অন্ধকারে গিয়ে পড়ার কথা ছিল কিন্তু আমি পড়ে গেলাম খাট থেকে, মেঝেতে;

মেঝেতে পড়ে মাথায় অল্প ব্যথা পেলাম এবং আমি বুঝতে পারলাম এতক্ষন যেখানে ছিলাম তা নিছকই স্বপ্ন, আমার ধড়ে ফিরে এল প্রিয় প্রাণ, কোনমতে উঠে বসে খাটের পাশের টেবিলে দেখলাম এক গ্লাস পানি পিরিচ দিয়ে ঢাকা আছে কি না, গলা শুকিয়ে গিয়েছিল ফলে তেষ্টা পেয়েছে প্রচুর, কিন্তু নাটক বা ফিল্মে যেমন দেখেছি চরিত্রগুলি দুঃস্বপ্ন দেখে উঠেই তাদের খাটের পাশে পিরিচ ঢাকা গ্লাসে বিশুদ্ধ পানি পেয়ে যায়, তা আমি পেলাম না, ফলে আমাকে অন্যরুমে যেতে হলো, ডাইনিং রুমের টেবিল থেকে একটি গ্লাস নিয়ে টেপ থেকে গ্লাসে পানি নিলাম, পানি বেশ আস্তে আস্তে জমা হলো গ্লাসে, বেশ-অর্ধেক জমা হবার পরে আমি তা পান করতে শুরু করলাম এবং যেহেতু পিপাসার্ত ছিলাম তাই কয়েক ঢোক গিলে ফেললাম দ্রুতই, এবং এরপরই আমি এর স্বাদ বুঝতে পারলাম, এ তো পানি নয়, লেবুর শরবতের স্বাদ...আমি কয়েক সেকেন্ড গ্লাসের পানির দিকে তাকিয়ে রইলাম, পানির গন্ধ শুঁকলাম, সবই স্বাভাবিক কিন্তু তাও পানির স্বাদ লেবুর শরবতের মত, আমি পুনরায় জিহবার অগ্রভাগ পানিতে ছুঁইয়ে পরীক্ষা করে দেখলাম, পানির স্বাদ লেবুর শরবতের মতোই;

আমি গ্লাস হাতে নিয়েই ভাবতে বসলাম, এমন কেন হতে পারে, পানির ট্যাংকির ভেতরে নিশ্চয়ই কেউ লেবু চিপে রেখে দেয় নি, আর খালি লেবু চিপে দিলেই তো হবে না, লবন চিনি ইত্যাদিও দিতে হবে পরিমাণমত, এরপর দিতে হবে ঘুটা, পানির ট্যাংকিতে লেবুর শরবত বানানোর জন্য এ কাজ কে করবে আবার কেনই বা করবে; আমি ভাবছিলাম আর তখনই আমার মনে পড়ল একটি পত্রিকার খবরের কথা যা আমি কিছুদিন আগে পড়েছিলাম, একজন বাড়িওয়ালা তার কাজের মেয়েকে খুন করে পানির ট্যাংকির ভিতরে লুকিয়ে রেখেছিল, অতঃপর পানির স্বাদ বিস্বাদ হয়ে যায় এবং লোকেরা ট্যাংকিতে গিয়ে দেখে মৃতদেহ; আমার মনে হলো এমন জিনিস এখানেও হতে পারে, আমার যারা প্রতিবেশী উপরের ফ্ল্যাটগুলিতে বাস করেন এদের প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতে কাজের মেয়ে আছে, এবং যেহেতু শহরগুলিতে এইসব গৃহস্থালী কাজের মেয়েরা নিরাপত্তাহীন তাই বাড়ির কর্তা পুরুষ প্রায়ই এদের সাথে মিলিত হন স্ত্রীচক্ষুর অন্তরালে, এসব পত্রিকায় ও টিভিতে মাঝে মাঝে উঠে আসে; আমার প্রতিবেশী ফ্ল্যাটের কর্তাদের কেউ একজনের এমন স্বভাব থাকা অস্বাভাবিক না, ফলে তিনি ধরা যাক তা করেছেন, এবং মেয়েটি প্রেগনেন্ট হয়ে গেছে, অতঃপর তিনি হিচককীয়ান স্টাইলে মেয়েটিকে খুন করে পানির ট্যাংকিতে চুবিয়ে রেখেছেন; কিন্তু তাতে পানির স্বাদ লেবু লেবু টক টক হবে কেন, তাহলে কী মরার আগে মেয়েটি ট্যাংকিতে প্রস্রাব করে গেছে, হয়ত সেদিন সে বেশী লেবু খেয়েছিল......আমি আর ভাবতে পারলাম না, আমার মধ্যে বমির উদ্রেক হলো, মনে হলো পেটের ভেতরে ভূমিকম্প চলছে আর সব জিনিস বেরিয়ে আসতে চাইছে, আমি আটকাতে পারলাম না, অল্প বমি করে ফেললাম বেসিনে;

বমি করার পর পরিস্কার হয়ে ফিরে এলাম নিজের বেডরুমে কিছুক্ষণ পর, মাথায় পানি টানি ঢেলে অল্প শান্ত হয়েছে মন, শান্ত মনে ঠিক করেছি পানির ট্যাংকি ও পানি নিয়ে আর ভাবব না, সকালে উঠে দেখব পানির স্বাদ লেবুর শরবতের মত কি না, যদি হয় তাহলে ট্যাংকি চেক করে দেখব, যদি না হয় তাহলে বুঝব জিহবার স্বাদ নির্ধারক ফ্যাকাল্টিতে সমস্যা হয়েছিল রাতে; মনকে শান্ত করে আমি আমার ল্যাপটপ অন করলাম আর ফেইসবুকে প্রবেশ করলাম; দেখলাম সেখানে এক মিডলক্লাসের বাচ্চা আনন্দে গদগদ হয়ে পোস্ট দিয়েছে এমা ওয়াটসন রানা প্লাজা হ্যাশট্যাগে টুইট দিয়েছেন তাতে সে খুশি, আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল মিডলক্লাসের বাচ্চার বাচনে, আমি টুইটারে ঢুকে এর সত্যতা যাচাই করার চেষ্টা করলাম এবং দেখলাম হ্যাঁ সত্যিই রানা প্লাজা ট্রেন্ডে প্রথমে আছে, আর এমা ওয়াটসন সহ অন্য অনেকে রানা প্লাজা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করছেন, আমি ভাবলাম যে এইসব ইউরোপিয়ানরা তাদের পোশাক পরে এবং কখনো ভাবে না তাদের পোশাক তৈরীতে শ্রমিকেরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না, তারা সেইসব বড় কোম্পানিকে কখনো চাপ দেয় না যারা শ্রমিক ঠকিয়ে চলেছে এবং পরোক্ষভাবে এইসব রানা প্লাজার জন্য দায়ী, কিন্তু আবার তারা রানা প্লাজা দিবস পালন করে, শ্রমিকের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে, আমার মনে প্রশ্নের উদয় হলো, তাদের অভিযোগটা আসলে কার প্রতি, তবে একেবারে কিছু না হওয়ার চাইতে এটা হয়ত কোন একদিক দিয়ে ভালো, এই অবস্থা তৈরী করতেই রানা প্লাজার শত শত শ্রমিকদের প্রাণ দিতে হলো, তারা এভাবে প্রাণ না দিলে এরা হয়ত কখনো ভাবতই না তাদের পোশাক আসলে কেউ তৈরী করছে এবং তারাও মানব প্রজাতির অন্তর্গত...
আমি এমা ওয়াটসনের ছবি দেখে দেখে এসব ভাবছিলাম, ইনি একজন অভিনেত্রী, আমি দেখেছি আমার অনেক বন্ধুরা তাকে বেশ যৌনভাবে পছন্দ করে থাকেন কিন্তু আমার তাকে ঐভাবে পছন্দ হয় না, এটাও একটা ইন্টারেস্টিং বিষয় বলে আমার মনে হয় সবার যৌনপছন্দ এক হয় না, তবে আমি দেখলাম তিনি অর্থাৎ এমা ওয়াটসন একজন ফেমিনিস্ট, দেখেও তার প্রতি আমার কোনরূপ যৌন ইচ্ছা জাগ্রত হলো না, যদিও আমার মনে হলো যে ফেমিনিস্ট চোদার খুব ইচ্ছা আমার, এটা এই কারণে না ফেমিনিস্টদের আমি অপছন্দ করি, অপছন্দ করা থেকে যৌন ইচ্ছা জাগ্রত হয় না, পছন্দ থেকেই হয়, তবে এক্ষেত্রে আবার এও বলা যাবে না যে ফেমিনিস্টদের আমি পছন্দ করি, অন্তত আমার তা মনে হলো না, কিন্তু আমার মনে হলো আমার ইচ্ছা কোন ফেমিনিস্টকে রাফলি চোদার, যেরকম আপনারা পর্নোতে দেখে থাকেন, তবে তা সম্ভব হবে কোন ফেমিনিস্ট যদি চোদা প্রক্রিয়ায় সাবমিশিভ হয়ে থাকেন...এসবই আমি ভাবছিলাম, তবে আরো কিছু আছে সেসব আর উল্লেখ করলাম না, কারণ এমনিতেই চ বর্গীয় শব্দটির ব্যবহার হয়ে গেছে কিছু, আমাদের সাহিত্য যে ভিক্টোরিয়ান রুচির, এবং শুদ্ধতাবাদীদের দ্বারা যেভাবে এটির নিয়ন্ত্রণ হয়েছে, এবং এরই ধারাবাহিকতায় পাঠক, লেখক ও সম্পাদকবৃন্দের যে মনন তৈরী হয়েছে তাতে ঐদিকে গেলে আমার লেখাটি কোন সম্পাদক হয়ত ছাপতে দিবেন না, এবং যদি তারা কেউ না ছাপেন তাহলে লোকেরা আমার মানবজীবনের এই শেষ গল্প জীবে জানবে কী করে....ফলে আমি ঐসব দিকে আর যাচ্ছি না, কাজের কথায় আসি;

পরদিন সকালে আমি রাস্তায় বের হলাম এবং আমার সাথে এক পরিচিত ভাইয়ের দেখা হয়, তিনি আমাকে বললেন, “কী ব্যাপার? কোথায় থাকো তুমি? আমাদের শ্রমিক অধিকার দেয়ালচিত্র উদ্বোধনে থাকছো তো?”

আমি বললাম, “জি স্যার, আমি থাকবো।”

তিনি বললেন, “স্যার বলছো কেন?”

আমি বললাম, “এখন থেকে ঠিক করেছি সবাইকে স্যার বলব। আপনাকে দিয়ে শুরু করলাম স্যার।”

তিনি বললেন, “বেশ বেশ। ভালো। স্যার শুনতে ভালোই লাগে। তা তুমি কি সাম্প্রতিক রানা প্লাজা ইস্যুতে এমা ওয়াটসনের টুইট দেখেছ?”

আমি বললাম, “জি স্যার, দেখেছি।”

তিনি বললেন, “আমরা ভাবছি এই টুইট প্রিন্ট করে দেয়ালচিত্রে ঝুলিয়ে দেব। আইডিয়া ভালো না?”

আমি বললাম, “জি স্যার, ভালো আইডিয়া।”

তিনি বললেন, “তবে কপিরাইট নিয়ে কি কোন ঝামেলা হবে? তোমার কী মনে হয়?”

আমি বললাম, “সঠিক বলতে পারছি না স্যার। আপনাকে জেনে জানাব।”

তিনি বললেন, “তাহলে ঠিক আছে। এখন আমি যাই, পরে কথা হবে।”

আমি বললাম, “ওকে স্যার।”

উনি চলে গেলেন, এবং কীভাবে কীভাবে যেন আমার পুরোটা দিন কেটে গেল; সেদিন রাতে ঘুমিয়েছি, আবার দেখি সে স্বপ্ন, স্বপ্নে আমি এক মসলিন চাষী; আমি বসে আছি এক তাঁতখানায় আর আমার অনতিদূরে বসে আছেন একজন মোটাসোটা লোক, তিনি বললেন তিনি হচ্ছেন দারোগা-ই-মলবুস খাস...তার পোশাক আশাক বিচিত্র আর হাতে একটি লাঠি;

তিনি আমার দিকে তাকিয়ে খসখসে গলায় বললেন, “হারামজাদা, কাজ করস না ক্যা? কাজ কর, কাজ কর। মুগল সম্রাটের জন্য এইবার যাবে লাখ টাকার মলবুস খাস।”

আমি বসেছিলাম যে যন্ত্রটির সামনে তা হয়ত কাপড় বোনার যন্ত্র, কিন্তু এটা কীভাবে চালনা করতে হয় তা আমার জানা নেই, আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে ধীরে ধীরে যন্ত্রটি নাড়তে লাগলাম;

দারোগা বললেন, “বাজে সুতা ব্যবহার করবি না, সম্রাটের জন্য বাজে সুতার কাপড় বানাইলে তরে মাইরা উটের পিঠে বাইন্ধা সারা ঢাকা শহর ঘুরান্টি দেয়া হবে।”

আমি বলতে চাইলাম, “কিন্তু...”

দারোগা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “চোপ হারামি, কথা না। সম্রাটের জন্য কাপড়ের কাজ শেষ হলে, কাজ শুরু হবে নবাবের জন্য। নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ’র জন্য বানাবি সরকার-ই-আলা। কথা কইয়া সময় নষ্ট করার ফুসরৎ নেহি।”

এরপরে দেখলাম দুইটা শক্তপোক্ত লোক আমার দুইদিকে ধরে আমাকে তুললো, নিয়ে গেল দারোগার সামনে; দারোগা আমার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, “সম্রাটের পোশাকে বাজে সুতা ব্যবহার করছস? এই দারোগা সিরাজের চউখ ফাঁকি দিতে চাইছস তুই?”

আমি ভয়ে বললাম, “জি না স্যার, কভি নেহি। আমি সুতাই ইউজ করি নাই।”

ভয়ের চোটে মুখ দিয়ে ইংরাজি শব্দ বের হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আমার বুঝা উচিত ছিল তখনো দেশে ইংরাজি চালু হয় নি, মুগলদের রাজকীয় ভাষা ফার্সি, ফলে ইংরাজি বুঝেন নি দারোগা সিরাজ, ঠাশ ঠাশ চড় পড়তে লাগল আমার গালে, একেকটা চড় দশ মণ ওজনের হবে, যদিও দশমণ ওজন কেমন সে সম্পর্কে বর্তমানে আমার কোন ধারণা নাই; চড়ের চোটে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল;

আমার মুখ ও শরীর ঘেমে উঠেছিল; আমি ঘুম থেকে উঠে আজ আর পানি খেতে গেলাম না, কারণ অন্যদিন পানিকে মনে হয়েছিল লেবুর শরবতের মত, কিন্তু সকালে আবার পানিকে সাধারণ পানির স্বাদেই পেলাম, ফলে আমার ধারণা স্বপ্নের চাপে মুখের স্বাদের উলটাপালটা হয়ে যায়, আমি নিশ্চুপ ও নির্ঘুম বসে রইলাম, ভাবলাম পরদিন সকালে যাবো মনরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে, কারণ এরকম স্বপ্ন দেখতে দেখতে বেঁচে থাকা যায় না, এই স্বপ্নের যন্ত্রনায় ঘুমানোই অসম্ভব হয়ে পড়েছে;

আমি পরদিন একজন মনরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গেলাম, তার চেম্বারে গিয়ে অনেকক্ষণ বাইরে বসে অপেক্ষা করতে হলো, তখন আমার চারপাশে অনেক মানসিক ব্যাধীতে আক্রান্ত লোকদের দেখলাম, এর মাঝে একজন সাদা দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ লোক আমার সাথে অদ্ভুত আলাপে লিপ্ত হলেন, আমি বুঝার চেষ্টা করলাম তিনি কী নিয়ে আলাপ করছেন, কারণ একসময় আমি জেনেছিলাম সে শেক্সপিয়রের নাটকগুলিতে যেসব চরিত্র দার্শনিক গুরুত্ববহ গভীর কথাগুলি বলেছে এরা নাকী উন্মাদ ছিল, এবং আগেকার দিনে উন্মাদ লোকদের প্রতি ঈশ্বরের বিশেষ অনুগ্রহ আছে এমন মনে করত লোকে; ফলে আমি এই বৃদ্ধ লোকটিকে ভাবতে লাগলাম একজন দার্শনিক, ঈশ্বরের স্পর্শ আছে তার চিন্তায়, তিনি নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ন কিছু বলছেন আমাকে, আমি তার কথা বুঝার চেষ্টা করতে লাগলাম, আর এদিকে তার পাশে বসা, সম্ভবত তার স্ত্রী তাকে কথা বলা থেকে নিবৃত্ত করতে চাইছিলেন, তিনি বলছিলেন যে, “আপনি কার সাথে কথা কন? আর কেউ কি কথা কয়? কেউ কি আপনার কথা শুনে? বন্ধ করেন।”
একসময় আমার ডাক আসল, আমি দেখলাম ডাক্তারের কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসছেন একজন স্থুল বয়স্ক মহিলা, তার সাথে আরো দু’জন মহিলা যাদের বয়স অপেক্ষাকৃত কম; স্থুল মহিলাটি অন্যদের হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইছেন এবং বলছেন, “আমি পীরানী। ঐ তোমরা জানো না কত বড়ো বড়ো মানুষের ছায়া আছে এই আমার উপরে। আমার উপর বড় পীর আব্দুল কাদির জিলানি সাবের ছায়া আছে, ঐ তোমরা জানো না...” ভদ্রমহিলাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল একরকম, আমি দেখলাম ডাক্তারের সহকারী লোকটিও এগিয়ে এসে তাদের সাহায্য করছে, সম্ভবত কোনরূপ ইনজেকশন দেয়া হবে মহিলাটিকে, তাই মহিলা চিৎকার করছেন, “আমারে ইনজেকশন দিও। এত বড় নাফরমানি...আমার উপর বড়ো বড়ো মানুষের ছায়া আছে, আমি কে তোমরা জানো না...”

এসব দেখতে দেখতে আমি ডাক্তারের কক্ষে প্রবেশ করলাম, ডাক্তার একজন বেটে খাটো মানুষ, তার গোঁফ আছে এবং মাথায় অবৃহৎ টাক বিদ্যমান; তিনি আমাকে দেখে বললেন, “আপনিই কি রোগী?”

আমি বললাম, “জি স্যার।”

তিনি বললেন, “আপনার কী সমস্যা আমাকে বলেন তো?”

আমি বললাম, “স্যার, আমি রাতে ভয়ানক স্বপ্ন দেখি, একই স্বপ্ন বার বার দেখি, বিভিন্ন পর্বে ভাগ করে।”

ভদ্রলোক অল্প হেসে তার প্রেশার মাপার যন্ত্রটি হাতে নিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, “আপনি কি বেশী টিভি সিরিয়াল দেখেন?”

আমি বললাম, “জি না স্যার। আমি টিভি দেখি না।”

ডাক্তার এসে আমার প্রেশার মাপলেন। তারপর আমাকে বললেন, “মনে কোন সন্দেহ আছে, রাগ বা ভয়?”

আমি কিছুক্ষণ ভেবে বললাম, “না স্যার। সেভাবে কিছু নাই, তবে সন্দেহ একটু আছে।”

ডাক্তার বললেন, “আপনার স্বপ্নটা কী নিয়ে?”

আমি বললাম, “স্যার, স্বপ্নে আমি দেখি যে আমি হয়ে গেছি একজন মসলিন চাষী। ইংরাজ দালাল গোমস্তারা, মোগল দারোগারা আমাকে নির্যাতন করে।”

ডাক্তার বললেন, “আপনি কি মসলিন নিয়ে ইদানীং পড়াশোনা করছেন?”

আমি বললাম, “জি না স্যার। মসলিন নিয়ে আমার জানাশোনা নাই বললেই চলে।”

ডাক্তার গম্ভীর হয়ে বললেন, “আপনার সন্দেহটা কী নিয়ে?”

আমি বললাম, “সন্দেহ স্যার আগে ছিল না। তবে সেদিন স্বপ্ন দেখার পরে যখন পানি খেলাম তখন মনে হলো পানির স্বাদ লেবুর শরবতের মত। তখন আমার মনে হলো যে আমার কোন প্রতিবেশী তার কাজের মেয়েকে খুন করে ট্যাংকিতে ফেলে দিয়েছেন।”

ডাক্তার বললেন, “হুম, বুঝেছি।”

তিনি প্রেসক্রিপশনে বেশ বড় করে লেখলেন স্কিজোফ্রেনিয়া। তারপর আমার নাম, বয়স ইত্যাদি জিজ্ঞেস করে নিয়ে লিখলেন। লিখলেন তিনটা ওষুধের নাম। একটা খেতে হবে সকালে ও রাতে। অন্য দুটি কেবল রাতে।

ডাক্তার বললেন, “আপনাকে কিছু ওষুধ দিলাম। এন্টিসাইকোটিক ড্রাগ। এগুলো নিয়ম করে খাবেন আর ঠিক দুই মাস পরে আবার আসবেন।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “স্যার, আমার কী হয়েছে?”

ডাক্তার বললেন, “তেমন কিছু না। সেরে যাবে। দুই মাস পরে আসুন।”

আমি ডাক্তারকে ছয়শো টাকা দিয়ে উনার কক্ষ থেকে বের হলাম। আমি বের হবার পরে দেখলাম ডাক্তারের সহযোগী তার হাতে থাকা রোগীদের সিরিয়াল দেখে সেই বৃদ্ধ লোক, যিনি আমার সাথে কথা বলেছিলেন, তাকে গিয়ে বলছেন, “আপনি কি সিরাজ সাহেব?”

ভদ্রলোকের পাশে বসা ভদ্রমহিলা বললেন, “জি।”

ডাক্তারের সহযোগী বললেন, “এবার আপনারা ভিতরে যান।”

বৃদ্ধ ভদ্রলোক ডাক্তারের কক্ষে প্রবেশ করতে করতে একবার আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন, উনার হাসিটা আমার পরিচিত মনে হলো, ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হতে হতে আমি ভাবলাম স্বপ্নে যে দারোগা সিরাজকে দেখেছিলাম এর সাথে এই বুড়ো লোকের কোন মিল আছে কি...মনরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের ব্যাপারে আমার মেজাজ খারাপ হলো, কারণ ভদ্রলোক লিখেছেন প্রেসক্রিপশনে স্কিজোফ্রেনিয়া, কিন্তু স্বপ্নের সাথে এর কী সম্পর্ক, স্কিজোফ্রেনিয়ার বিষয় আশয় অল্প বিস্তর আমার জানা ছিল, তাই আমি সন্তুষ্ট হতে পারলাম না, ভাবলাম যারা ওষুধ নয়, কনসালটেশনের মাধ্যমে মনরোগের চিকিৎসা করে এদের কাছে যাবো, আমার মনে হলো স্বপ্নের ব্যাপারটা ওষুধের বিষয় নয়, ফলে আমি আরেকজন সাইকিয়াট্রিস্ট খুঁজে বের করলাম, এবং তার এপয়েন্টমেন্ট নিলাম সেদিনই; ভদ্রমহিলা দেখতে সুশ্রী, মাঝারি গড়নের, চেহারার দিকে তাকালে মনে হয় উনার উপর নির্ভর করা যায়;

আমি উনার সামনে বসলাম, তিনি আমার সাথে প্রথমে পরিচিত হলেন, তারপর আমার স্বপ্নটার ব্যাপারে শুনলেন, মনযোগী শ্রোতার মত তার শোনার ভঙ্গী দেখে আমার বলতে ভালো লাগল, তিনি আমার কাছ থেকে শুনলেন আমার ছোটবেলার কথাও; শোনার পর তিনি বললেন, “আপনার স্বপ্নটির একটা ব্যাখ্যা দেয়া যায় ওডিপাস কমপ্লেক্স থেকে। আপনি যেসব দালাল-গোমস্তা ও দারোগা দেখেন এটা হচ্ছে প্যারেন্টাল ফিগার, আসলে আপনার সুপার ইগো। আপনি কাউকে ভালোবাসেন? প্রেম-ট্রেম?”

আমি চিন্তা করলাম, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এ ব্যাপারে কিছুই মনে করতে পারলাম না; কিন্তু একটু ঘুরিয়ে উত্তর দিলাম; আমি বললাম, “ম্যাডাম, সেভাবে হয়ত কাউকে সেভাবে ভালোবাসি না; কিন্তু......”

ভদ্রমহিলা বললেন, “বুঝেছি। আপনি হয়ত কাউকে ভালোবাসেন, এবং আপনাদের মাঝে কোন বাঁধা আছে। সেটা তৃতীয় কোন ব্যক্তি হতে পারে বা অন্য কোন ধরনের সমস্যা হতে পারে। হতে পারে সামাজিক বাঁধাও যেমন আপনি এক ধর্মের এবং মেয়েটি অন্য ধর্মের। অথবা আপনি যাকে ভালোবাসেন সে হতে পারে কোন ছেলে...”

আমি বললাম, “ম্যাডাম আমি স্ট্রেইট।”

ভদ্রমহিলা বললেন, “তাহলে অন্য ধরনের যে বাঁধা আছে এটিই দারোগা-দালাল-গোমস্তা হয়ে আপনার স্বপ্নে হানা দিচ্ছে। আর মলবুস খাস হচ্ছে সেই মেয়ে যাকে আপনি ভালোবাসেন। আপনি কি জানেন মলবুস খাস কী?”

আমি বললাম, “সঠিক জানি না ম্যাডাম।”

ভদ্রমহিলা বললেন, “সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের মসলিন। যা মুগল সম্রাটের জন্যই কেবল তৈরী হত।”

আমি বললাম, “থ্যাংক ইউ ম্যাডাম।”

ভদ্রমহিলা প্রেসক্রিপশনে একটি ওষুধ লিখে দিলেন, বললেন, “রোজ রাতে একটি করে খাবেন ঘুমানোর আগে। আর এক সপ্তাহ পরে আবার আসবেন। পরের সেশনে আপনার ছোটবেলা নিয়ে আরো কিছু কথা বলবো।”

ভদ্রমহিলার চেম্বার থেকে বের হবার পর আমি রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম, তখন সন্ধ্যা হয়ে আসছে, আমার দু’জন মনরোগ বিশেষজ্ঞকে নিয়েই ভাবতে ইচ্ছা হলো, দু’জন দু’ভাবে দেখলেন বিষয়টাকে, ওষুধও দিলেন ভিন্ন, এখন আমি কার কথাটা শুনবো, বিড়ম্ভনায় পরে গেলাম সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে, এবং সব শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম দুইটা প্রেসক্রিপশনে ড্রেইনে ফেলে দিব এবং ফেলে দিলামও; ড্রেইনের মধ্য জমা ছিল অল্প পানি, গত রাতে বৃষ্টি হয়েছিল সম্ভবত, এবং পড়ে ছিল একটি মৃত ইন্দুর;

আমার মনে হলো আসলে আমার কোন সমস্যা হয় নি, স্বপ্ন দেখা স্বাভাবিক ব্যাপার, তাই এ নিয়ে আর দুশ্চিন্তা করে লাভ নেই, আমি যখন বাসায় ফিরছিলাম তখন আমার ঠিক পাশে এসে একটি বড় কালো গাড়ি থামলো, স্টেশন ওয়াগন না কী যেন এর নাম, এবং এর কাচ তুলে একজন গোঁফওয়ালা লোক বললেন, “ব্যাপার কী ভাই? আপনি আজ অফিসে এলেন না, আবার ফোনেও পাচ্ছি না।"

আমি কিছুটা ভ্যাবাচেকা খেলাম এবং দ্রুতই নিজেকে সামলে নিয়ে বড় একটা হাসি দিয়ে বললাম, “নাথিং, এই তো আছি। একটা কাজে আটকা পড়েছিলাম।”

গোঁফওয়ালা বললেন, “তাই বলে ফোনটা অন রাখবেন না?”

আমি পকেটে হাত দিয়ে মোবাইল ফোন আছে কি না দেখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পেলাম না;

লোকটাকে হাসিমুখে বললাম, “ফোন বোধহয় বাসায় ফেলে এসেছি। স্যরি।”

লোকটা বললেন, “ভাই আপনার কি কিছু হয়েছে? আমাকে জানাতে পারেন।”

আমি বললাম, “আরে না! কী আর হবে।”

লোকটা বললেন, “ওকে। তাহলে এখন যাই ভাই। কাল কথা হবে অফিসে।”

আমি হাসলাম, লোকটা তার গাড়ি নিয়ে চলে গেল, কিন্তু আমি অফিসের কথা মনে করতে পারলাম না, মনে করতে পারলাম না এই লোকটি আসলে কে; আমি বাসায় গেলাম, গিয়ে মোবাইল ফোনটা পেলাম, বিছানার এক পাশে পড়ে আছে, চার্জ নেই, ফোন চার্জে লাগিয়ে অন করার পরে কিছু মেসেজ দেখতে পেলাম ইনবক্সে, যে নাম থেকে এসেছে তার নাম অবনী, অদ্ভুত ব্যাপার মেয়েটি আমাকে ফোনে না পেয়ে বেশ বিরক্ত তা মনে হচ্ছে মেসেজ দেখে, এবং মনরোগ বিশেষজ্ঞ মহিলার কথা আমার মনে পড়ল এই মেয়েটির মেসেজ পড়তে পড়তে, মেয়েটির মেসেজ পড়ে এবং আমাদের মেসেজ হিস্টরী দেখে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছিল আমার সাথে তার বা তার সাথে আমার প্রেম আছে, আমি চাইলাম ব্যাপারটা কী আরো জানতে, এবং এই সময়ে আমার মনরোগ বিশেষজ্ঞ মহিলাটির প্রতি একটি আস্থা তৈরী হতে শুরু করলো;

আমি অবনী’র নাম্বারে ফোন দিলাম, ওপাশ থেকে ঝাঁঝের সাথে সে বলল, “এতক্ষণ কোথায় ছিলে? আমি সারাদিন ফোনে পাই না! তোমার বন্ধুরাও কেউ কিছু বলতে পারে না কোথায় তুমি, কী হয়েছে?”

আমি বললাম, “নাথিং।”

ঝাঁঝের পরিমান বাড়িয়ে অবনী বলল, “নাথিং কী? এটা কী ফাজলামি করার সময়, কাল আমাদের প্রোগ্রাম, সব গুছিয়ে এনেছি। এর মাঝে তুমি এভাবে নাই হয়ে যাবে? তোমার কি ন্যুনতম দায়িত্বজ্ঞান বলতে কিছু নেই?”

আমি বললাম, “স্যরি।”

অবনী বলল, “স্যরি কি? লেখা শেষ করেছ?”

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কীসের লেখা?”

অবনী যেন এবার রাগে ফেটে পড়ল। সে বলল, “আমাদের প্রোগ্রামের জন্য লেখা। যে প্রবন্ধ তুমি পাঠ করবে। যা তুমি এক সপ্তাহ আগে আমাদের সাথে বসে ঠিক করেছিলে। এখন কি আমাকে বলতে হবে আমাদের প্রোগ্রামের নাম কী এবং তোমার প্রবন্ধের বিষয় কী?”

আমি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বললাম, “ও ওটা তো শেষই।”

এরপর বুদ্ধি করে জিজ্ঞেস করলাম, “নামটা কী যেন ছিল, ওটা কি বদলে দেব?”

অবনী বলল, “না, ‘জনপ্রিয় মাধ্যমে নারী’র উপস্থাপন ও বর্তমান নারীবাদী আন্দোলনের সমস্যা” এই নামই ঠিক আছে। এটাই হবে মূল প্রবন্ধ, লেখা শেষ হয়ে গেলে আমাকে ইমেল করে দাও। আমি দেখে দেই।”

বুঝলাম অবনী একজন নারীবাদী একটিভিস্ট, এবং তাদের প্রোগ্রামে আমার প্রবন্ধ পাঠের কথা, বিষয়টি গুরুতর, আমি কী বলবো আর বুঝতে পারলাম না, একবার ভাবলাম অবনীকে জিজ্ঞেস করবো আমাদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক হয়েছে কি না বা ও সাবমিশিভ কি না, কিন্তু ভয়ে সেসব প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারলাম না; ওর আরো কিছু কথার উত্তরে হ্যাঁ হু করে ফোন রেখে দিলাম; এবং যে জটিল স্বপ্নজনিত সমস্যায় আমি পড়েছি তাকে আর সাধারণ ভাবতে পারলাম, মানুষের মস্তিষ্ক যে অদ্ভুত এই জিনিসটি ক্রমে আমার কাছে পরিস্কার হতে শুরু করল, এবং আমার ক্ষীণ সন্দেহ হতে শুরু করল আমি কি অবচেতনের পূর্ন নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছি...

সেদিন রাতে আমি দেখি আবার সেই দালাল কাম গোমস্তা লোকটিকে; আমি আবার তার সামনে বসে আছি, বাঁশের চাটাইয়ের দেয়ালযুক্ত ঘরে, লোকটি এবার রাগান্বিত ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, আমি বেশ কাচুমাচু হয়ে বসে ছিলাম, লোকটি আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল, “হোয়ার ইজ মাই মলবুস খাস?”

আমি বললাম, “স্যার, এখনো পাই নি।”

লোকটি বলল, “পাবি না কেন রে হারামজাদা? হোয়াই? দাদনের টাকা নেবার সময় মনে ছিল না? তর বউ কই, হোয়ার ইজ ইওর ওয়াইফ?”

আমি বললাম, “স্যার, আমার বউ নাই, আমি অববাহীত।”

হুংকার দিয়ে উঠল লোকটা, “শাটাপ বেত্তমিজ! বউ নাই তাইলে সুতা কাটে কে? আমার সাথে ফাইজলামি করস? এত বড় সাহস তর, তাঁতির বাচ্চা তাঁতি!”

আমি করুণ ভাবে বললাম, “বিশ্বাস করেন স্যার। আমি ফাইজলামি করছি না। সত্যি বলছি।”
লোকটি রাগে কটমট করে আমার দিকে তাকাল।

তার কোমড়ের কাছে লুকানো একটা জায়গা থেকে চকচকে এক চাকু বের করল, এরপর চাকুটি টেবিলে গেঁথে দিয়ে বলল, “হোয়াট ইজ দিস?”

আমি ভয়ার্ত মুখে বললাম, “স্যার, এটি একটি চাকু।”

লোকটি বলল, “নট অর্ডিনারি চাকু, ইট ইজ চাক্কু। এটা দিয়া তোদের মত দুই পয়সার বেইমান তাঁতিদের আঙ্গুল কাটা হয়। কাটা হবে মিডলফিঙ্গার। হাতটা দে তো দেখি?”

ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে গেল; আমি বললাম, “স্যার, আপনি যা বলবেন আমি তা শুনবো। আমার হাত কাটবেন না।”

লোকটা বলল, “আঙ্গুল যদি বাঁচাইতে চাস, যা তাঁতিপাড়ায় যা। তর বউরে খুইজা বাইর কর। এবং সে যে সুতা কাটছে সেইসব দিয়া কাপড় বুনতে লাইগা যায়। এন্ড নেক্সট টাইম কাম টু মি উইথ মলবুস খাস।”

আমি আঙ্গুল বাঁচাতে গিয়ে বললাম, “জি স্যার, যাচ্ছি।”

আমি ঘরের দরজার সামনে গেলাম, বাইরে অন্ধকার, কিন্তু এবার আমি বেশীক্ষণ দাঁড়ালাম না, কারন বেশীক্ষন দাঁড়ালে পশ্চাতদেশে লাথি খেতে হয়, কিন্তু অন্ধকারে যেতেও ভয় হচ্ছিল, তাই মাথা ঘুরিয়ে লোকটিকে বললাম, “স্যার, আন্ধার, ডার্ক।”

লোকটা গর্জে উঠল, “ইংলিশ চুদাবি না, রান রান।”

যা থাকে কপালে, দিলাম দৌড়, হাঁপাতে হাঁপাতে গিয়ে থামলাম এক গলির মুখে, মনে হলো একটা কোন পাড়া, অল্প অল্প আলো জ্বলছে ঝুঁপড়ির মত ঘরগুলিতে, আমার মনে হলো আমি তাঁতিপাড়ায় এসে গেছি, চারিদিকে তাকিয়ে একজায়গায় দেখলাম তিনটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আমি তাদের কাছে গেলাম, তাদের শরীরে পোশাক পরিচ্ছদের স্বল্পতা চোখে পড়ার মত, ফলে আমি তাদের দিকে তাকাতে পারলাম না, অন্যদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “ম্যাডাম এটা কি তাঁতিপাড়া?”

একজন মেয়ে বলল, “কার সাথে কথা বলেন? আমাদের সাথে কথা বললে আমাদের দিকে তাকিয়ে কথা বলুন। আমাদের শ্রীঅঙ্গে আব-ই-রওয়ানের সাতটি করে জামা, এগুলি যদি লোকে না দেখে তাহলে কী জন্য পরলাম?”

আমি ভ্রু কুঁচকে তাকালাম ওদের দিকে, তখন বুঝতে পারলাম পোষাকের স্বল্পতা নয়, তারা যা বলছে তা হয়ত ঠিক, এত সূক্ষ্ণ কাপড়ের জামা যে সাতটি পরলেও বুঝা যায় না, ভয়াবহ ব্যাপার...আমি এসব না ভেবে তাদের জিজ্ঞেস করলাম, “ম্যাডাম, এটা কি তাঁতিপাড়া?”

মাঝখানের মেয়েটা বলল, “না, এটা মাগিপাড়া।”

আমি বললাম, ও..., আপনারা কি তাঁতিপাড়া কোনদিকে আমাদের বলতে পারবেন?”

এর উত্তরে তিনটি মেয়েই তাদের বুকের কাপড় সরিয়ে ফেলল, আর আমি তৎক্ষণাত অন্যদিকে মুখ ফেরালাম, মুখ ফেরানোর আগে একদৃষ্টিতে যা দেখেছিলাম তাতে বুঝলাম মেয়েগুলির স্তনের আকার বেশ বড়, বিশেষ করে মাঝের মেয়েটিকে দেখে মনে হল সে যেন সুলতানের চিত্রকর্ম থেকে স্তন নিয়ে উঠে এসেছে, আমি অন্যদিকে মুখ রেখেই ওদের বললাম, “এ আপনারা কী করছেন? আমার তাঁতিপাড়ার খোঁজ জানা দরকার। আমার জীবন মরণ নিয়ে টানাটানি চলছে।”

তিনটা মেয়েই বুকের কাপড় উঠিয়ে নিয়ে বলল, “হারামি, তরে তো আমরা তাঁতিপাড়া কোথায় তাই বললাম, তুইই তো মুখ ফিরিয়ে নিলি।”

আমি মুখ ঘুরিয়ে অবাক হয়ে বললাম, “সেটা কীভাবে? আপনারা তো বক্ষ দেখালেন!”

একেবারে বামদিকের মেয়েটি বলল, “না, তোমারে নামতা শেখালাম। দুই একে দুই, দুই দুগোনে চার, তিন দুগোনে ছয়...বাল আমার!”

মেয়েদের গালি আমার গায়ে লাগল না, কারণ তাঁতিপাড়ার খোঁজ আমাকে পেতেই হবে, চারপাশে আর কোন জনমানব নেই, তাই এরাই আমার ভরসা, দরকার হলে পায়ে পড়ব, তবুও তাঁতিপাড়ার খোঁজ নিতে হবে;

আমি দুঃখী মুখে বললাম, “দেখুন, আপনারা আমাকে গালি দিন আর যাই করুন, আমার তাঁতিপাড়ার খোঁজ খুব দরকার, আমার লাইফ ইজ ইন ডেঞ্জার।”

গর্জে উঠল মাঝের মেয়েটি, বললো, “ওই খবরদার! ইংরাজি চুদাবি না, থাবড়াইয়া দাঁত ফেলে দেব বান্দির পোলা।”

আমি বললাম, “জি আচ্ছা। ভুলে বের হয়ে গেছে মুখ দিয়ে, আর ইংরাজি বলব না। মাফ করে দেন।”

মেয়েটি বলল, “ঠিক আছে। যা যা।”

আমি বললাম, “কিন্তু দয়া করে তাঁতিপাড়ার খোঁজ দিয়ে আমাকে সাহায্য করুন।”

ডানপাশের মেয়েটি বিরক্ত ভঙ্গীতে বলল, “আরে দিলাম তো একটু আগে। প্রথমে বামদিকে যাবি দুই মাইল, এরপর পাবি তিনটা রাস্তা, মাঝের রাস্তা দিয়া যাবি দুই মাইল, এরপর পাবি আবার তিন রাস্তা, তখন ডানের রাস্তা দিয়া যাবি দুই মাইল। তবেই পাবি তাঁতিপাড়া।”

আমি তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বামে দিলাম দৌড়, তাদের খিলখিল হাসির শব্দ আসতে লাগল কানে এবং সে হাসির শব্দ পুরোপুরি মিলিয়ে যাবার আগেই আমার পা হড়কে গেল এবং আমার মনে হলো আমি কোন ম্যানহোলের গর্তে পড়ে যাচ্ছি, আমি বেশ কিছক্ষণ শূন্যে ভেসে গিয়ে পড়লাম ঘন এক প্রকার আধা তরল পদার্থে এবং নাকে আসা গন্ধের বরাতে আমি নিশ্চিত হলাম এইসব ঘন অর্ধ তরল পদার্থ মনুষ্য বর্জ্যই...

আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল, কেউ কেউ এটাকে বলে হুমায় ধরা আর কেউ বলে স্লিপ প্যারালাইসিস, কিন্তু আমি জানি আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হবার কারণ ছিল মানুষের গুয়ে নিমজ্জ্বিত হওয়া...সে রাতে আর আমার ঘুম হলো না, আমার কী হচ্ছে বা আমার কী করা উচিত কিছুই আমি ভাবতে পারছিলাম না;

সকালে ভোরের আলো ফুটে উঠলে আমি একটি ফার্মেসীতে যাই এবং গিয়ে জিজ্ঞেস করি, “আপনাদের এখানে কি ইন্দুর মারার ওষুধ আছে? ল্যানিরেট?”

ফার্মেসীর লোকটা আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকাল, হয়ত না ঘুমানোর ফলে আমার লাল চোখ ও ফোলা মুখ দেখে সে আমাকে অপ্রকৃতিস্থ ভেবেছিল, অথবা অন্য কিছুও হতে পারে, লোকটি আমাকে বলল, “না, নেই। মুদি দোকানে দেখেন। এটা ফার্মেসী, এখানে মাইনশের ওষুধ বিক্রি হয়।”

আমি গেলাম এই মুদি দোকানে, গিয়ে কয়েক প্যাকেট ইন্দুরের ওষুধ নিয়ে এলাম বাসায়, এরপর এগুলি পানির সাথে মিশিয়ে খেয়ে ফেললাম, এবং খাওয়ার সময় আমার মনে হলো আমি লেবুর শরবত খাচ্ছি, তবে বিট লবনের পরিমাণ একটু বেশী হয়ে গেছে তাই স্বাদ ভালো না;

ইন্দুরের ওষুধ খাবার পর আমি ভেবেছিলাম যে আমি মরে যাবো, কিন্তু কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও মরার কোন লক্ষণ দেখতে পেলাম না, কিছুটা অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম তখন পশ্চাতদেশে সুড়সুড়ি অনুভব করি, আর সেই সুড়সুড়ির জায়গাটিতে হাত দিয়ে দেখতে পাই আমার লেজ গজিয়েছে, তখন আমি আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি আমার পাও হয়ে যাচ্ছে ইন্দুরের পায়ের মত, আমার সারা শরীরে জন্ম নিচ্ছে ইন্দুরের লোম, তাই আমি খুবই দ্রুত সব লিখে রাখছি, কারণ আমার ধারণা দ্রত আমি পরিণত হবে এক ইন্দুরে, সেই ইন্দুর পাঁচ ফিট আট ইঞ্চির অধিক লম্বা হবে না সাধারণ ইন্দুর সাইজের হবে সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত না, তবে হে পাঠক বৃন্দ, হে আমার ভাই ও বোনেরা; আপনারাই পারেন আমাকে বাঁচাতে, যদি দেখেন কোন বড় সাইজের একটি ইন্দুরকে নিয়ে হইচই শুরু হয়েছে তাহলে নিশ্চিত জেনে রাখুন ওটা আমি, আর আমি যদি কোন ছোট ইন্দুর হই তাহলে কোথাও কোন ছোট ইন্দুর যদি আপনারা দেখেন তাহলে জেনে রাখবেন, ওটা আমি হবার সম্ভাবনা আছে, এই ইন্দুর হবার কালে আমার ভয় হচ্ছে গবেষকেরা আমাকে ল্যাবে নিয়ে কাটাছেড়া, টেস্ট ফেস্ট করবে, নানাবিদ ড্রাগ দিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া কী হয় তা বিচার বিবেচনা করবে, এ বড় কষ্টের শাস্তি, বায়োলজি প্র্যাক্টিক্যালে ব্যাঙ কাটাকুটির সময় বুঝতে পারি নি, এখন ব্যাঙের দুঃখ বুঝতে পারি, বুঝতে পারি যে ঐ ব্যাঙ আমিও হতে পারতাম; তাই আমার ভয় হচ্ছে, এইসব কঠিন শাস্তির ভয়, আপনারা আমাকে বাঁচাবেন, এ আমার অনুরোধ, কারণ আমি তো আসলে ইন্দুর না, আমি মানুষ, হোমো ইরেক্টাস থেকে আগত হোমো সেপিয়েন্স, আপনাদের মতোই......ক্যাক...


Avatar: dd

Re: মসলিন চাষী

এই রকম ফ্যান্টাসী লেখা খুব একটা আজকাল দেখি না।

মানে ফ্যাতাড়ুর মতন এজেন্ডামূলক রূপক নয়, নেহাৎই দিকশুণ্য লেখা। তবে আমার কালেজ বেলায় - সে প্রায় চল্লিশ+ বছরের আগে সে সময় এই ফ্যান্টাসী genre খুব চলত। আমার প্রিয় ছিলো angela Carter। J G Ballardও। আরো অনেক। তখন খুব পড়তাম।

জানি না, এখনো এই স্টাইল সেরকমই জনপ্রিয় আছে না কি। কুলদা রায়ের লেখাও তো বহুদিন চোখে পড়ছে না।

মুরাদুল, আরো লিখুন।


Avatar: দ

Re: মসলিন চাষী

বাপস!
Avatar: মুরাদ কিবরিয়া

Re: মসলিন চাষী

অসাধারণ।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন