Ajit Roy RSS feed

Ajit Royএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • সুর অ-সুর
    এখন কত কূটকচালি ! একদিকে এক ধর্মের লোক অন্যদের জন্য বিধিনিষেধ বাধাবিপত্তি আরোপ করে চলেছে তো অন্যদিকে একদিকে ধর্মের নামে ফতোয়া তো অন্যদিকে ধর্ম ছাঁটার নিদান। দুর্গাপুজোয় এগরোল খাওয়া চলবে কি চলবে না , পুজোয় মাতামাতি করা ভাল না খারাপ ,পুজোর মত ...
  • মানুষের গল্প
    এটা একটা গল্প। একটাই গল্প। একেবারে বানানো নয় - কাহিনীটি একটু অন্যরকম। কারো একান্ত সুগোপন ব্যক্তিগত দুঃখকে সকলের কাছে অনাবৃত করা কতদূর সমীচীন হচ্ছে জানি না, কতটুকু প্রকাশ করব তা নিজেই ঠিক করতে পারছি না। জন্মগত প্রকৃতিচিহ্নের বিপরীতমুখী মানুষদের অসহায় ...
  • পুজোর এচাল বেচাল
    পুজোর আর দশদিন বাকি, আজ শনিবার আর কাল বিশ্বকর্মা পুজো; ত্রহস্পর্শ যোগে রাস্তায় হাত মোছার ভারী সুবিধেজনক পরিস্থিতি। হাত মোছা মানে এই মিষ্টি খেয়ে রসটা বা আলুরচপ খেয়ে তেলটা মোছার কথা বলছি। শপিং মল গুলোতে মাইকে অনবরত ঘোষনা হয়ে চলেছে, 'এই অফার মিস করা মানে তা ...
  • ঘুম
    আগে খুব ঘুম পেয়ে যেতো। পড়তে বসলে তো কথাই নেই। ঢুলতে ঢুলতে লাল চোখ। কি পড়ছিস? সামনে ভূগোল বই, পড়ছি মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ। মা তো রেগে আগুন। ঘুম ছাড়া জীবনের কোন লক্ষ্য নেই মেয়ের। কি আক্ষেপ কি আক্ষেপ মায়ের। মা-রা ছিলেন আট বোন দুই ভাই, সর্বদাই কেউ না ...
  • 'এই ধ্বংসের দায়ভাগে': ভাবাদীঘি এবং আরও কিছু
    এই একবিংশ শতাব্দীতে পৌঁছে ক্রমে বুঝতে পারা যাচ্ছে যে সংকটের এক নতুন রুপরেখা তৈরি হচ্ছে। যে প্রগতিমুখর বেঁচে থাকায় আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠছি প্রতিনিয়ত, তাকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, "কোথায় লুকোবে ধু ধু করে মরুভূমি?"। এমন হতাশার উচ্চারণ যে আদৌ অমূলক নয়, তার ...
  • সেইসব দিনগুলি…
    সেইসব দিনগুলি…ঝুমা সমাদ্দার…...তারপর তো 'গল্পদাদুর আসর'ও ফুরিয়ে গেল। "দাঁড়ি কমা সহ 'এসেছে শরৎ' লেখা" শেষ হতে না হতেই মা জোর করে সামনে বসিয়ে টেনে টেনে চুলে বেড়াবিনুনী বেঁধে দিতে লাগলেন । মা'র শাড়িতে কেমন একটা হলুদ-তেল-বসন্তমালতী'...
  • হরিপদ কেরানিরর বিদেশযাত্রা
    অনেকদিন আগে , প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে এই গেঁয়ো মহারাজ , তখন তিনি আরোই ক্যাবলা , আনস্মার্ট , ছড়ু ছিলেন , মানে এখনও কম না , যাই হোক সেই সময় দেশের বাইরে যাবার সুযোগ ঘটেছিলো নেহাত আর কেউ যেতে চায়নি বলেই । না হলে খামোখা আমার নামে একটা আস্ত ভিসা হবার চান্স নেই এ ...
  • দুর্গা-বিসর্জনঃ কৃষ্ণ প্রসাদ
    আউটলুকের প্রাক্তন এডিটর, কৃষ্ণ প্রসাদ গতকাল (সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৭) একটি লেখা (https://www.faceboo...
  • ছোটবেলার পুজো
    আয়োজন বড় জরুরী। এই যে পুজোর আগের আয়োজন, মাঠে প্যান্ডেলের বাঁশ, রেডিওতে পুজোর অ্যাড, গড়িয়াহাট, হাতিবাগান, নিউমার্কেট হয়ে পাড়ার দোকানগুলোয় মানুষের গুঁতোগুঁতি, ফাঁকা জংলা মাঠে কাশ ফুল, এসব আয়োজন করে দিয়েছে পুজোর। এখন বৃষ্টি আসুক না আসুক কিচ্ছু আসে যায়না, ...
  • কল্প
    ফুলশয্যার রাত অবধি অহনার ধারণা ছিল, সব বাড়িরই নিজস্ব কিছু পুরোনো গল্প আছে। প্রাচীন বালাপোষ আর জরিপাড় শাড়ির সঙ্গে সেইসব কাহিনী মথবল দিয়ে তুলে রাখা থাকে। তারপর যেদিন আত্মীয় বন্ধু বহু বৎসর পরে একত্রিত- হয়ত বিবাহ, কিম্বা অন্নপ্রাশন, অথবা শ্রাদ্ধবাসর- সেই সব ...

রূপকথা মগলা

Ajit Roy


মগলাকে দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যাতে সানথাল, দেখতে শুনতেও মানুষ। কিন্তু মানুষ না। ওর পূর্বপুরুষরা ছিল ম্যাস্টোডন। হাতিদের সঙ্গেই ওঠাবসা। হাতিদের মতই দিনে চার ঘন্টা ঘুমোয়, কুড়ি ঘন্টা দাঁত নাড়ে। অবশ্য, শুধু হাতি নে, জঙ্গল আর জঙ্গলের সমস্ত প্রাণীর জন্যই মন কাঁদে মগলার। জানোয়ার জঙ্গল ছাড়া কিছুই ভাবতে পারে না।
অথচ, এই মগলাকেই কিনা মালখানকে মারতে সুপারি দিয়েছে মোলাম সিং! কে মালখান? আগে মালখানের কথাই বলি। মালখান এখন জঙ্গলের বস। ওর সঙ্গে রাকা, সলোমন, হুরিয়া ----- আরও তিন মাস্তান। মালখানের আবার তিনটে বউ। তাদের ছেলেপুলে, মালখান সর্দারের বিশাল গুরুপ। যখন কলাগাছ অভিযানে বেরোয়, গ্রামকে গ্রাম খালি, কেউ কখনো সড়কি বা বল্লম দেখিয়েছে বলে রিপোর্ট নেই। মগলা লোকমুখে গুজগুজ ফিসফিস শুনে আসছিল ঢের দিন থেকে। যে, মোলাম সিংয়ের লোক মালখানকে ধরার জন্য টাকা ছেড়েছে। মালখানকে ম্যাড ডিকলার করেছে সরকার। ঠিকেদারের কাঠবোঝাই চোরাই লরি উলটে দিয়েছে মালখান, ওর টিম চন্দ্রঢিপায় গিয়ে কলাবাগান তছনছ করেছে, একটা কোলের বাচ্চাকে শুঁড়ে পেঁচিয়ে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়েছে। তারবাদে, একবার মালখানের দ্বিতীয় পক্ষের ছোট ছেলে, মাতি, খিলোনা ভেবে পুলিশের জিপ উলটে দ্যায়।
সেসব তো মাস্তানরা করেই থাকে। কিন্তু এবার অন্য কথা। খোদ মোলাম সিং এবার মালখানের নামে ঢিল বেঁধেছে। মানতের ঢিল। মোলাম সিং এ অঞ্চলের 'রাজা সাহেব'। মোলাম মুতলেও সবাই কান খাড়া করে শোনে, এমন প্রতাপ! এলাকার আধা জমিন, জঙ্গলের কাঠ, খেজুরের রস, মহুয়া, ধানের মাঠ, টুসু মেলা, সুন্দরী যুবতী ----- সবই মোলামের। কাগজপত্র নেই, তবে মোলামের। বিয়ের বিশ বছরের মাথায় প্রথম সন্তান, বয়স চার হতে চলল। এখনো কথা নেই। হেকেম, গুনিন, ডাক্তার সব ফেল। মুরগি, পাঁঠার রক্তে চাটান বিরক্ত। তবে একটা বড় সাইজের পশু বলি দিতে পারলে ছেলে 'বাবা' বলে ডাকবে, মোলামকে এই মর্মে পট্টি পরিয়েছে ভটকা বস্তির শ্রীশ্রী বাবা ১০৮। ফলে মালখান খ্যাপা ডিক্লিয়ার হয়ে মোলামের কেল্লা ফতে। তারবাদে সোয়া দু ফুটের একেকটা ১৪-১৫ কেজির দাঁত, মানে অন্তত দেড় লাখ।
ছেলে কথা বলতে পারে না বলে মোলামও মৌনব্রতী। কথায় শূন্য, কিন্তু কাজ অবিরত। একবার স্থানীয় থানার দারোগা হিম্মত রাম মাঝি মোলামের সামনে চোপা করেছিল, মোলাম তার পোঁদের ছ্যাদায় ছ' সুতোর আস্ত একখানা রড ভুঁকে নিজের ক্রোধ প্রশম করে। নারাজগি, উঁচু গলায় কথা একদম বরদাস্ত নয় মোলামের। এহেন দানবের হুকুম পড়েছে মগলার ওপর। যে, মগলাকেই তীরের ফলায় ঘায়েল করতে হবে মালখানকে। কেননা, মগলা তাতে এসপার্ট।
ফলত মগলার ঘুম একুনে নির্মূল। সাঁইবাবলার কোমর ধরে মগলা হকহকিয়ে বমি করল। চোখে অচেনা আঁধার। গোল কালো আকাশ। নক্ষত্র হাপিস। জোনাকির ঝাঁকও সশঙ্কে দূরে। হঠাৎ হঠাৎই জঙ্গলের ভেতর থেকে ফালা ফালা আর্তনাদ। অরণ্যের আকাট কালোয় চেরা পটলের মধ্যে বেগুনি আলো। মগলার বিষমাখা তীরের ফলা সেই বেগুনি আলো ফুঁড়ে সাঁ করে বেরিয়ে। মুহূর্তে সারা পৃথিবী একজাই কেঁপে, অগোছালো, লণ্ডভণ্ড গাছপালা। তার পরপরই সেই ফালা ফালা চিৎকার। বিশাল দীর্ঘ শুঁড় ফণা হয়ে শূন্যে। গাঢ় কালচে রক্তের ফোয়ারা।
আঁধারিয়া গাছের নিচে নির্জনে, এত রাতে আর কি কেঁদেছে আগে? কোনো মানুষ? সাঁইবাবলার নিঝুম আঁধারতলায়, হাপুস দু-নয়নে, কান্নার পাহাড় ভেঙে ছলছল।। হামি মালখানকে মারতে ব্লারব, মারতে নাই পারব। হে সিংবোঙা, হে গণেশবাবা হামাকে বাঁচা। মালখানকে বাঁচা। উয়াকে বল পাঁলায়ঁ যেতে ----- যিধারে দু চক যায়, চইলে যা মালখান। তু ভাগ ইখান লে .....
ওরা দুজন সারারাত পৌনে দুই হয়ে শুয়ে ছিল। খুব গহীন রাতে ঘুম ভেঙে, বুধনির চার-হাতপায়ের আঁটকপাটির মধ্যে হাঁসফাঁস। রাতভর বুধনি ওকে চেপে শুয়েছিল। সেই থেকে চাপা। হাতে পায়ে বুকে ব্যথা। চোয়ালে শুকনো দাঁতের ঘা। দম বন্ধ। মগলা বুধনির হাতের নিগড় খুলে, সন্তর্পণে উঠে, ততোধিক সন্তর্পণে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। তার তাড়া আছে, তীব্র তাড়া।
ঘন গাছ-গাছালি চিরে সে ছোটে। পাঁচ-সেলি টর্চের তীব্র আলো ধেয়ে আসছে ঈশেন কোণ থেকে। পরপরই জিপের মুখ-ঘোরানো ফোকাস। আর গর্জন। জঙ্গলে সরু রাস্তা বেয়ে ডিজেলের জিপ। উঁচু গাছে দু-চার ডানা ঝাপটে শকুন কি চিল, ঝোপঝাড় পাতা মাড়িয়ে হরিণ কিংবা সম্বর বন্দুকের রেঞ্জের বাইরে। কারণ বন্য জীবের চেতনায় রাতবিরেতে জিপ মানেই খোদ মৃত্যুদূত!
মগলা যা ভেবেছিল। ফরেস ডিপাটের জিপ। রেঞ্জার অভিষেক রুদ্র, অফিসার চ্যাটার্জী, আরও দুজন মদ্যপ বাবু। পেছনের সিটে বন্দুক আর বল্লম হাতে মোলাম সিংয়ের চার লেখেন লেঠেত। টর্চের আলো মুখে পড়তেই, কনুই ঢেকে আড়াল পেতে চাইল মগলা। ভাবল লুকিয়ে পড়ে, এবং ছুটে। কিন্তু না, তাইতেও বিপদ। পালাবার পথ নাই, যম আছে পিছে।
হাঁটতে হাঁটতে, হনহনিয়ে,মগলা জঙ্গলের অনেক ভেতরে চলে এসেছে। নৈঃশব্দ্য তো বটেই, গভীরতাও এদিকে বেশি। গাছে গাছ সেঁটে আলোর ফাটল ভরাটের নৈসর্গিক কর্মযজ্ঞ। ক'টা ঢোঁড় সাপ ঘুম ভেঙে জলের মধ্যে ঢুকে গেল। দূর থেকে ময়ূরের বিশ্রী সাইরেন ----- ক্রেয়ঁ ক্রেয়ঁ ক্রেয়ঁ। প্যাঁচার জবাবি এলার্ম। তরপর সব চুপচাপ। অন্ধকার বুনো নিঝুমতায় আরেক রাশ নিশুতি আছড়ে পড়ল।
সরল দীঘল অর্জুনের গায়ে হাতির গা ঘষার প্ৰথম বুনো গন্ধ। কয়লা-ঘোলা রঙের জলে হাতির ছেড়ে যাওয়া আঁশ, তার বু। মগলা সজাগ, পা শিথিল করে আনল। একটু এগিয়ে গেলে একটা কচুরিপানায় ছাওয়া পুলিপোস্তা। তাকে ঘিরে নানান ঝোপকাঁটা, জঙ্গল। বাঁওড়টা কাঁড়াবোঙার মতো নিথর। ঝিমুচ্ছে, ছলকানি নেই।
মগলা বুঝল, ওর গন্তব্য সমাগত। চারধারে সবুজ-পচা বাস। কলার পাতা, ধানের পরিত্যক্ত গোছ। গাছের অন্ধকার গুহা থেকে কালো ঢেউমতন কেই এগিয়ে। দুটো পাকা নারকেল কুল আলোর ফুটকির মতো জ্বলছে। ক্ৰমে শুঁড় পরিছন্ন। তার বিশাল দোদুল শরীর ও মাথা। এবং তার পরপরই আকাশ খানখান করা বিকট শঙ্খনাদ!
মগলার টনকে ধ্ক করে উমেদের টিংকা বেজে উঠল।
মালখান-গ্রূপের প্রত্যেকে চেনে মগলাকে। তাদেরই কি কেউ অদূর থেকে শিঙা ফুঁকে অভ্যর্থনা জানাল ওকে?
খানিক পরেই একটা মাস্তান চেহারার জোয়ান হাতি, বিনীত কেতায় শুঁড় দুলিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। মগলা দাঁত গিজুড়ে হাসল, ----- 'অ। তাথেই বলি, ইতো রেতে হিরোর মাফিক হুসেল বাজালেক কে! মাতি, তুই বটিস! তুর বাপ কন দিকে?'
শয়তানের নাম নিতেই শয়তান হাজির। মগলা দেখল, গহীন শালবন ফুঁড়ে হেলতে দুলতে খুনি দারিন্দাটা আসছে। পেছনে সুয়োরানী ছমছমিয়া। সুয়োর আদুরে দুলাল, ডিঙা। দলের লেঠেত রাকা, সলোমন, হুরিয়া।
মগলা দু বাহু বিস্তার করে মালখানের শুঁড়টাকে আলিঙ্গনে বাঁধে, ----- 'জোহর জোহর মারাং বুরু, জোহর আতাং মে ----'
মালখন দুটো বড় বড় হাঁ করে হাসল। তদুপরি ডগরা শুঁড় ফুঁকে অভিবাদন। বহুত দিন বাদে দুই স্বজনের দেখা, মুহূর্তে কাঁড়াদুন্দুভি বেজে উঠল জঙ্গল জুড়ে। খোদ মালখান, শুঁড়ে পেঁচিয়ে মগলাকে তুলে নিয়ে গিয়ে কোথায় বসাবে ভেবে পায় না। চতুর্দিকে কলার পাতা, পচা কাঁদি, কাঁঠালের ভুতি। ছত্রখান অবস্থা।
মগলা আগেভাগে হেসে বলল, 'ফাবড়ে দিস না বাপ। ভুঁয়েই বসা।'
ঘাসের আসনে বসতে দেওয়া হল মগলাকে। তারপর ওকে ঘিরে সমস্ত পরিজন। মগলা কথা শুরু করার আগে সবাইকে খানিক জরিপ করে নিল, চোখমুখ, মেজাজ। তরপর একটু মস্করার ছাঁদে বলল, 'ই বাবা, পুরা ফুটবল টিম! সার্কাসের হাতিগিলানকে দেখি, হওয়ায় ফাঁপা বল ঠিকমতন মাইরতে লারে। আর সিবার তুদের মাতি, শিয়ালথানের মোড়ে খিলোনা ভেবে লুলিশের জিপ উলটায়ঁ দিলেক। সিপাইগুলা লুঢ়কায়ঁ গাভরার জলে। হঃ, খিয়াল আছে?'
মগলার কথায় সবাই ভোঁ-ভোঁ শুঁড় তুলে বিগুল বাজল।
------ 'তারবাদে, চন্দ্রঢিপায় যাঁয়ে কলাবাগান তছনছ কইরলি। একটো কোলের নুনাকে পেঁচায় ফাবড়ে দিলি। ছিলা টো সিধা যায়ঁ গিরল হাবু পালের পোখরে। হাবু তখন পোখরে সিনাছিল। কুছু বুইঝতে লারলেক। ডরে ল্যাংটা পঁদেই ওঠে আলি পোখর থিকে। উর বাদে কাগগিলানের কী চিলি-চিৎকার! মনে লেয় উয়াদেরই ছিলা বটে। কাঁও কাঁও কাঁও! দমে চিৎকার।'
আরেক দফা ভোঁ-শুঁড়ের সাপবাজি। ভেঁপু।
মালখানের বড় গিন্নি সোহাগী ততক্ষণে এক কাঁদি কলা আর আধখানা পাকা কাঁঠাল এনে, মগলার সামনে। মগলা বড়বৌদির মুখের দিকের চাইল। বৌদি লাজুক হেসে গ্রীবা মুড়ে নিল। মালখান মাথা হেলায়। অর্থাৎ, খা খা। হেতনা রোজ বাদে আলি। মনে লেয় সারাদিন মুহে কুছু পঢ়ে নাই।
----- তুদের ইমন ভালোবাসা! ঝপ করে চোখে জল এসে গেল মগলার। ফের গপ-গপ করে খেতে লাগল। ----- 'বহুত দিন বাদে ইমন চিনির পারা মিঠা কলা। কার বাগান থিকে চুরালি বাপ? কার অভিশাপ খেচি? তভে হেতনা পাকা কাঁঠাল খেইলে আর দেইখতে হবেক নাই। দু-রোজ আগে সরাই মুর্মুর ছুটু লাতির চাচো-ছঠিয়ারিতে ভূতমুড়ি চালের ভাত আর জিরার ফড়ন দিয়া ডিংলার ঘ্যাট খালি, তাথেই প্যাট ইমন ছাইড়লেক বাপ, হাগে হাগে গাঁড় ফাইটে গেল, তভু হাগার বিরাম নাই .....'
বিপুল হাসির ভোঁ-ভোঁ। শুঁড় তুলে তুলে বিশাল ভেঁপু।
----- 'মালখান, এ মরদ হামার, এ হিরো, এ গুণ্ডা আর শুঁড় নাই বাজা। দুশমনে শুইনতে পাবেক। হামি তুদের বাঁচাতে লারব। উদের হাতে লোটিস, উদের হাতে তাগদ, বন্দুক। থামা, থামা রে বাপ! ঢের হাঁসাহাঁসি নাচাকুদা হল, হঃ, ইবার হামি যোন ফয়সালা লেগে আসেছি উটা শুন।'
'ফয়সালা' কথাটা কানে বাজল। মালখান হাসি নিভিয়ে সিরিয়াস নজরে। সক্কলে একজাই গুঙা।
মগলা অনুমানে চৌকস। ঝটসে বুঝে নিল। বলল, 'বেশ বেশ। হেতনা দিন লে একসঁগে রইয়েছি মালখান, ইখন হামার ফয়সালা কথাটো তুর ভাল নাই লাগলেক। বটে কিনা? ঘুরাঁয় বইললে, সমঝোতা। ইটা মানবি ত? ইটা শুইনতেও বেটার।'
মগলা বলল, 'বাইদের ধানে দুদ আলেই লিশায় পায় তুকে। তুই তখনি জঙ্গলে থাইকতে লারিস। ধানের লিশায় পাগল হঁইয়ে যাস। তারবাদে বাবুদের কলাগাছ, ভিন গাঁয়ে যাঁইয়ে লুটপাট। সবাইকার বস বটিস তুই। তুকে ইসব নাগরালি নাই সাজে। কই, তুর মুহে কথা সইরছে নাই যি! কী, কথা গুলা কানে যাছে, ন কী?'
'আর দোসর বাত।' মগলা বলল, 'গরমিন্ট তুকে ম্যাড ডিকলার কইরেছে। মানে, যেমনি দেখা ডিবি, শালোরা তুকে গুড়ুম কইরে উড়ায়ঁ দিবেক। তখনি তুর গরুপের বাকি হাতিগিলানের কী হবেক? ডিঙা এখনও ঠিকমতন বুলেতে নাই শিখে। তুর তিনটা বউ কান্দে কান্দে পাগল হঁইয়ে যাবেক। তাথেই, হামার শলা মান, ই জঙ্গলের মায়া ছেইড়ে আরও দূরে কুথাও ভাগে যা। তুইও বাঁচবি, তুর ছিলাপুলাও বাঁচবেক।। কী, বুঝলি হামার কথা? নাকি কনহ দোসর বাত দিমাকে ঘাপাং খাচে?'
মালখানের মুখে রা নেই। শুঁড়ের নড়ন বাজেয়াপ্ত। পেছনে সোহাগী, রূপসী। ওঁরাও চুপ। দুধ-নীল জ্যোৎস্নার নিচে এগারোটি ক্ষুদে পাহাড়। চারপাশ গভীর, গম্ভীর। গাছের ডালে রাতচরা পাখিরাও যেন ওয়েট করছে। বিস্ফোরণের। হওয়ায়, ভেজা চিহড়, দোলন রুখে। রুদ্ধশ্বাস, এগারো পাহাড়ের মাঝে খর্বকায় মগলা।
জলে চাঁদের কম্পমান কান্তি। পানার বুকে চুমকি। মালখান ধীরে ওঠে। মন্থর চালে এগিয়ে, জলে। কাদা দিয়ে কপাল ঘষে, গা, হাত-পা, সর্বাঙ্গ। তারপর শুঁড়ভর্তি জল খিঁচে একজাই, হঠাৎই, বিশাল গগন ফাটা বৃংহণ। চিৎকারে দাঁতাল চাদ্ধার ফালা ফালা করে উঠে দাঁড়ায়।



Avatar: dd

Re: রূপকথা মগলা

ভালো লাগলো। এরকম লেখা আরো পড়তে চাই
Avatar: i

Re: রূপকথা মগলা

খুব ভালো লেখা। একদম অন্যরকম সব বিশেষণ, এক্সপ্রেশন।যেমনঃ "গোল কালো আকাশ। নক্ষত্র হাপিস। জোনাকির ঝাঁকও সশঙ্কে দূরে। হঠাৎ হঠাৎই জঙ্গলের ভেতর থেকে ফালা ফালা আর্তনাদ। অরণ্যের আকাট কালোয় চেরা পটলের মধ্যে বেগুনি আলো।"
অতি সম্প্রতি আমার নিজের একটা টেখায় হাতি এসেছে। এলেখা পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছে সে টেখা আবার নতুন করে টিখি।

নমস্কার জানবেন।

Avatar: de

Re: রূপকথা মগলা

খুব ভালো লাগলো -
Avatar: pi

Re: রূপকথা মগলা

খুব ভাল। খুবই অন্যরকম। আরো লিখুন।
Avatar: দোলনচাঁপা দাশগুপ্ত

Re: রূপকথা মগলা

ঝরঝরে বাংলা। বিষয় মনোগ্রাহী। উপস্থাপনা নতুন ধরনের। চলুক এমন লেখা
Avatar: প্রতিভা

Re: রূপকথা মগলা

একেবারে অন্য ধারার লেখা। শুধু ভালো লাগলো বললে এ লেখার প্রতি অবিচার করা। আলোড়িত হলাম।
Avatar: অ

Re: রূপকথা মগলা

অজিতদা বারে বারে চমকে দ্যান। শব্দ প্রয়োগ এভাবেও করা যায় আর বাংলায় করা যায় সেটা মুগ্ধ করে! আরও লেখা শেয়ার করুন অজিতদা।
Avatar: পৃথা

Re: রূপকথা মগলা

চমৎকার লেখা। অন্য স্বাদের।
Avatar: জ

Re: রূপকথা মগলা

সুন্দর

Avatar: aranya

Re: রূপকথা মগলা

খুবই ভাল লাগল। একটু যেন হঠাৎ করে শেষ হল লেখাটা


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন