Arin Basu RSS feed

arin.basu@gmail.com
আমি বুদ্ধদেব, বৌদ্ধধর্ম, মনোময়তা, আন্তর্জন, ধ্যান নিয়ে লিখব। যা জানি, যৎকিঞ্চিৎ উপলব্ধি করেছি, সবটুকু দিয়ে।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • গো-সংবাদ
    ঝাঁ চকচকে ক্যান্টিনে, বিফ কাবাবের স্বাদ জিভ ছেড়ে টাকরা ছুঁতেই, সেই দিনগুলো সামনে ফুটে উঠলো। পকেটে তখন রোজ বরাদ্দ খরচ ১৫ টাকা, তিন বেলা খাবার সঙ্গে বাসের ভাড়া। শহরের গন্ধ তখনও সেভাবে গায়ে জড়িয়ে যায় নি। রাস্তা আর ফুটপাতের প্রভেদ শিখছি। পকেটে ঠিকানার ...
  • ফুরসতনামা... (পর্ব ১)
    প্রথমেই স্বীকারোক্তি থাক যে ফুরসতনামা কথাটা আমার সৃষ্ট নয়। তারাপদ রায় তার একটা লেখার নাম দিয়েছিলেন ফুরসতনামা, আমি সেখান থেকে স্রেফ টুকেছি।আসলে ফুরসত পাচ্ছিলাম না বলেই অ্যাদ্দিন লিখে আপনাদের জ্বালাতন করা যাচ্ছিলনা। কপালজোরে খানিক ফুরসত মিলেছে, তাই লিখছি, ...
  • কাঁঠালবীচি বিচিত্রা
    ফেসবুকে সন্দীপন পণ্ডিতের মনোজ্ঞ পোস্ট পড়লাম - মনে পড়ে গেলো বাবার কথা, মনে পড়ে গেলো আমার শ্বশুর মশাইয়ের কথা। তাঁরা দুজনই ছিলেন কাঁঠালবীচির ভক্ত। পথের পাঁচালীর অপু হলে অবশ্য বলতো কাঁঠালবীচির প্রভু। তা প্রভু হোন আর ভক্তই হোন তাঁদের দুজনেরই মত ছিলো, ...
  • মহাগুণের গপ্পোঃ আমি যেটুকু জেনেছি
    মহাগুণ মডার্ণ নামক হাউসিং সোসাইটির একজন বাসিন্দা আমিও হতে পারতাম। দু হাজার দশ সালের শেষদিকে প্রথম যখন এই হাউসিংটির বিজ্ঞাপন কাগজে বেরোয়, দাম, লোকেশন ইত্যাদি বিবেচনা করে আমরাও এতে ইনভেস্ট করি, এবং একটি সাড়ে চোদ্দশো স্কোয়্যার ফুটের ফ্ল্যাট বুক করি। ...
  • রূপকথা মগলা
    মগলাকে দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যাতে সানথাল, দেখতে শুনতেও মানুষ। কিন্তু মানুষ না। ওর পূর্বপুরুষরা ছিল ম্যাস্টোডন। হাতিদের সঙ্গেই ওঠাবসা। হাতিদের মতই দিনে চার ঘন্টা ঘুমোয়, কুড়ি ঘন্টা দাঁত নাড়ে। অবশ্য, শুধু হাতি নে, জঙ্গল আর জঙ্গলের সমস্ত প্রাণীর জন্যই ...
  • কয়েকটি রঙিন স্যান্ডেল
    সেদিন সন্ধ্যায় সৈয়দ শামসুর রহমানের মনে হল তিনি জীবনে ব্যর্থ হয়েছেন। তার ব্যর্থতার পরিমাণ দেখে তিনি নিজেই বিস্মিত হলেন। তার গলা শুকিয়ে গেল অতীতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ছন্নছাড়া কিছু চিন্তা করে। সৈয়দ শামসুর রহমান বিছানায় শুয়ে ছিলেন। তিনি উঠে বসলেন। বিছানার ...
  • পুরনো পথ সাদা মেঘ, পর্ব ৪
    পুরনো পথ সাদা মেঘ — বুদ্ধদেবের পথে পথ চলা, পর্ব ৪[অন্যত্র: https://medium.com/জ...
  • পুরনো পথ সাদা মেঘ - পর্ব ৩
    [এটি আপনি https://medium.com/জ...
  • পুরনো পথ সাদা মেঘ - দ্বিতীয় পর্ব
    মোষ চরাণোর কথকতাসুশীতল দিন। গভীর মনসংযোগ সহকারে দ্বিপ্রাহরিক আহার শেষ করে ভিক্ষুরা যে যার পাত্র ধুয়ে মেজে মাটিতে আসন বিছিয়ে বুদ্ধদেবের দিকে মুখ করে বসলেন। বাঁশবন মঠটিতে অজস্র কাঠবেড়ালি, তারা নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায়, সাধুদের মাঝখান দিয়েই খেলে বেড়াতে ...
  • ক্রিকেট
    ১।সেলিব্রিটি পাবলিকদের মাঝে মাঝে সাংবাদিকরা ইন্টারভিউ নেবার সময় গুগলি প্রশ্ন দেবার চেষ্টা করে। তেমনি এক অখাদ্য গুগলি টাইপের প্রশ্ন হল, আপনি জীবনে সবচেয়ে বড় কমপ্লিমেন্ট কি পেয়েছেন এবং কার কাছ থেকে। বলাই বাহুল্য আমি বিখ্যাত কেউ নেই, তাই আমাকে এই প্রশ্ন কেউ ...

পুরনো পথ সাদা মেঘ, পর্ব ৪

Arin Basu

পুরনো পথ সাদা মেঘ — বুদ্ধদেবের পথে পথ চলা, পর্ব ৪

[অন্যত্র:
https://medium.com/জেগে-ওঠ/পুরনো-পথ-সাদা-মেঘ-বুদ্ধদেবের-পথে-পথ-চলা-পর্
ব-৪-d75a06065fa4]


আহত রাজহাঁসের কথা
পরের দিন ভোরবেলা স্বস্তি মোষগুলোকে চরাতে নিয়ে গেল। দুপুরের মধ্যেই সে ঝুড়ি-দুয়েক ঘাস কেটে ফেলল। নদীর যে দিকটাতে জঙ্গল, স্বস্তি সেইদিকটায় মোষগুলোকে চরতে ছেড়ে দিত, যাতে করে সে ঘাস কাটা হয়ে গেলে গাছের শীতল ছায়ায় একটু জিরিয়ে নিতে পারে। মোষগুলো নদীর ধারে চরলে কারো ধানের ক্ষেতে গিয়ে উপদ্রব করার সুযোগ পাবে না, আর স্বস্তিকেও এনিয়ে ভাবতে হবে না। স্বস্তির নিজের বলতে শুধু তার হাঁসুলি, সেইটা দিয়ে সে ঘাস ছাঁটত, সেইটাই তার জীবিকা নির্বাহের একমাত্র যন্ত্র । বলা কলাপাতায় মুড়ে স্বস্তিকে একমুঠো ভাত দিয়েছিল, স্বস্তি খুলে দেখল। ভাত খেতে যাবে, এমন সময় তার সিদ্ধার্থর কথা মনে পড়ল।
“ভাতের মণ্ডটা সিদ্ধার্থসাধুর কাছে নিয়ে গেলে হয়,” স্বস্তি মনে মনে ভাবল। “ভাত দিলে তিনি নিশ্চয়ই তাকে তুচ্ছ করবেন না”। স্বস্তি ভাতের মণ্ডটিকে কলাপাতায় মুড়ে, মোষগুলোকে জঙ্গলের ধারে চরতে দিয়ে, যে পথে সে গতকাল সিদ্ধার্থকে দেখতে পেয়েছিল, সেই পথ ধরে আবার যেতে লাগল।
খানিকটা যাবার পর দূর থেকে দেখতে পেল তার নতুন বন্ধুটি অশ্বথ্থ গাছের নীচে বসে আছেন। আজকে সিদ্ধার্থ একা নন। তাঁর সামনে সাদা শাড়ি পরে স্বস্তির বয়সী আরেকটি মেয়েও বসে আছে। সিদ্ধার্থের সামনে কিছুটা খাবার রাখা। স্বস্তি থমকে দাঁড়াল। সিদ্ধার্থ মুখ তুলে চেয়ে দেখলেন, তারপর “এই স্বস্তি!” বলে হাত নেড়ে কাছে ডাকলেন।
সাদা শাড়ি পরা মেয়েটিও মুখ তুলে তাকাল, স্বস্তি তাকে দেখেই চিনতে পারল; একে মাঝে মাঝেই গ্রামের রাস্তা দিয়ে যেতে দেখেছে। স্বস্তি কাছাকাছি এলে মেয়েটি বাঁদিকে সরে গিয়ে স্বস্তিকে বসার জায়গা করে দিল; সিদ্ধার্থ স্বস্তিকে বসতে ঈঙ্গিত করলেন। সিদ্ধার্থের সামনে একটি কলাপাতায় একমুঠো ভাত, একটু তিল আর নুন রাখা। সিদ্ধার্থ ভাতটিকে দুভাগে ভাঙলেন।
“কিছু খেয়েছ বাছা?”
“না বাবু, কিছু খাওয়া হয়নি।”
“বেশ তো, এস, একসঙ্গে খাওয়া যাক।”
সিদ্ধার্থ স্বস্তির হাতে ভাতের অর্ধেকটা অংশ তুলে দিলেন, স্বস্তি হাত জোড় করে রইল, কিন্তু খেতে চাইল না। সে তার কলাপাতায় মোড়া ভাতটিকে বের করে বলল, “আমিও কিছুটা নিয়ে এসেছি।”
বলে তার কলাপাতাটি খুলে ভাতের মণ্ডটি খুলে দেখাল, সিদ্ধার্থের কলাপাতায় ধবধবে দুগ্ধফেননিভ সাদা চালের ভাত, তারটি নেহাতই ঢেঁকি-ছাঁটা মোটা লাল চালের, তায় আবার নুন-তিল কিছুই নেই। সিদ্ধার্থ তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমরা সব ভাতগুলো এক জায়গায় করে ভাগাভাগি করে নিই, কেমন?”
বলে তিনি তাঁর সাদা ভাতের অর্ধেকটা তিল আর নুনের মধ্যে ডুবিয়ে মেখে নিয়ে স্বস্তির হাতে তুলে দিলেন। তারপর স্বস্তির ভাতের মণ্ড থেকে অর্ধেকটা তুলে নিয়ে পরম তৃপ্তি সহকারে খেতে শুরু করলেন। স্বস্তির অস্বস্তি হচ্ছিল, তারপর সিদ্ধার্থকে খেতে দেখে সেও খেতে শুরু করে দিল।
“আপনার ভাতটায় কি সুগন্ধ, বাবু”
“সুজাতা নিয়ে এসেছে”, সিদ্ধার্থ বললেন।
“ও, এর নাম তাহলে সুজাতা”, স্বস্তি ভাবল। মেয়েটি স্বস্তির থেকে বছর-খানেকের বড় হবে। মেয়েটির ঘন কালো চোখে উজ্জ্বল হাসির ঝিলিক। স্বস্তি খাওয়া থামিয়ে বলল, “আমি তোমাকে এর আগে গ্রামের রাস্তা দিয়ে যেতে দেখেছি, অবশ্য তোমার নাম সুজাতা জানতাম না।”
“হ্যাঁ, আমি উরুভেলা গ্রামের মুখিয়ার মেয়ে। তোমার নাম স্বস্তি, তাই না? গুরুদেব একটু আগে তোমার কথা বলছিলেন,” সুজাতা বলল, তারপর গলা নামিয়ে বলল, “স্বস্তি, যাঁরা সাধুসন্ত, তাঁদের বাবু না বলে গুরুদেব বলতে হয়।”
স্বস্তি ঘাড় নাড়ল।
সিদ্ধার্থ হাসলেন। “তাহলে তো আমার আর তোমাদের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার কিছু নেই। বাছারা, তোমরা কি জান কেন আমি খাবার সময় নিঃশব্দে খাই? একটুও কথা বলি না? এই যে ভাতের দানাগুলো দেখছ, এই যে তিল, নুন, এ এতই মূল্যবান, যে, এদের মনপ্রাণ দিয়ে আমি খাবার সময় উপভোগ করি। সুজাতা, তুমি কখনো মোটা লাল চালের ভাত খেয়ে দেখেছ? জানি তোমার খাওয়া হয়ে গেছে, তাও স্বস্তির ভাত থেকে একটু খেয়ে দেখ। বেশ সুস্বাদু। এস, আমরা একসঙ্গে খেয়ে নিই, তারপর খাওয়া হয়ে গেলে তোমাদের একটা গল্প শোনাব।”
(সিদ্ধার্থ, স্বস্তি, ও সুজাতা একাগ্রচিত্তে অন্নগ্রহণ করছেন)
সিদ্ধার্থ লাল ভাত থেকে এক খণ্ড ভেঙে নিয়ে সুজাতাকে দিলেন। সুজাতা হাতদুটিকে পদ্মফুলের মতন করে ভক্তিভরে গ্রহণ করল। অরণ্যের গভীর শান্ত স্তব্ধতায় তাঁরা তিনজন নিঃশব্দে খেয়ে নিলেন।
ভাত, তিল, নুন শেষ হয়ে যাবার পর, সুজাতা কলাপাতা গুলো গুটিয়ে নিল। সে জল আর একটি জলপানের পাত্র নিয়ে এসেছিল, তাতে জল ভর্তি করে সিদ্ধার্থকে দিল। সিদ্ধার্থ দুহাত দিয়ে তা গ্রহণ করলেন ও স্বস্তিকে দিলেন। স্বস্তি যারপরনাই বিব্রত হয়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, “এ কি বাবু, মানে গুরুদেব, ছি ছি, আপনি প্রথমে নিন!”
সিদ্ধার্থ শান্ত, নীচুস্বরে বললেন, “বাছা, তুমিই প্রথম জল পান কর, এই আমি চাই।” এই বলে তিনি আরেকবার স্বস্তির কাছে জলের পাত্রটি তুলে ধরলেন।
স্বস্তি দারুণ ঘাবড়ে গেছে; সে বেচারা জানেনা যে এরকম অযাচিত সম্মানকে কিভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হয়। সে দুহাত জড়ো করে অসীম কৃতজ্ঞতায় জলের পাত্রটি ধরে এক চুমুকে পুরো জল পান করে ফেলল। করেই সে সিদ্ধার্থের হাতে জলের পাত্রটি ফেরত দিয়ে দিল। সিদ্ধার্থ সুজাতাকে পাত্রটি পুনরায় ভরে দিতে বললেন, তারপর তিনি শ্রদ্ধা সহকারে পরমানন্দে জলপান করলেন। সিদ্ধার্থ ও স্বস্তির এই পাত্র বিনিময়ের মাঝে সুজাতার দৃষ্টি তাদের দিক থেকে এতটুকু নড়েনি। সে তাদের দিকে একমনে তাকিয়ে। সিদ্ধার্থ জল পান শেষ করে সুজাতাকে আরেকবার ভরে দিতে বললেন। তিনি এবার সুজাতাকে জল দিলেন। সুজাতা জলের পাত্রটি ধীরে ধীরে মুখে তুলে সিদ্ধার্থ যে ভাবে জল পান করলেন, সেইভাবেই অল্প অল্প করে চুমুক দিয়ে জলপান করল। সুজাতার সজ্ঞানে, তার জীবনে এই প্রথমবার, একজন অস্পৃশ্য যে পাত্র থেকে জল পান করেছে, সেই একই পাত্র থেকে সেও জল পান করল। কিন্তু সিদ্ধার্থ তার গুরুদেব, তিনি যদি এই কাজ করতে পারেন, সেই বা করবে না কেন? সে বেশ টের পেল, তার একবারও মনে হলে না যে সে অশুচি হয়ে গেল। আপনা হতেই সে স্বস্তির চুলে হাত বুলিয়ে দিল। তারপর জল খাওয়া শেষ করে সে পাত্রটি মাটিতে নামিয়ে তার দুই সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে হাসল।
সিদ্ধার্থ ঘাড় নাড়লেন। “বাছারা, তোমরা ব্যাপারটা বুঝেছ। মানুষ বর্ণ নিয়ে জন্মায় না। প্রতিটি মানুষের অশ্রুর স্বাদ লবণাক্ত, প্রতিটি মানুষের রক্তের রঙ লাল। মানুষে মানুষে বর্ণে বর্ণে জাতপাতের ভিত্তিতে বিভেদ সৃষ্টি করা ভারি অন্যায়! ধ্যান করতে করতে আমি এ ব্যাপারটি অনুধাবন করেছি।”
সুজাতা ভাবগম্ভীর হয়ে বলল, “আমরা আপনার শিষ্য, আপনি আমাদের যা শিক্ষা দেন আমরা মানি, বিশ্বাস করি। কিন্তু এই পৃথিবীতে আপনার মতন আর কেউ নেই। সবাই মনে করে শূদ্র আর অস্পৃশ্যরা ভগবানের পা থেকে জন্মেছে; এমনকি আমাদের বেদ উপনিষদও তাই বলে। অন্য রকম ভাবে ভাবতে কেউ সাহস পায় না।”
“আমি জানি। কিন্তু যা সত্যি, তা সত্যিই, কে কি ভাবল বা বিশ্বাস করল তাতে কিছু আসে যায় না। লক্ষ লক্ষ মানুষ মিথ্যায় বিশ্বাস করলেও মিথ্যা মিথ্যাই থেকে যায়। সত্যের পথ ধরে চলতে গেলে তোমাদের খুব সাহসী হতে হবে। শোন, তোমাদের একটা গল্প বলি।
“আমার যখন ন’বছর বয়স, একদিন বাগানে বেড়াতে বেড়াতে দেখি একটা রাজহাঁস আমার সামনে আকাশ থেকে মাটিতে পড়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল। আমি যেই দৌড়ে তাকে গিয়ে তুলেছি, দেখি তার ডানায় একটা তীর বিদ্ধ হয়ে আছে। আমি তীরটিকে মুঠো করে ধরে টেনে বের করে দিতেই তার ডানা থেকে ঝরঝর করে রক্ত ঝরতে লাগল, পাখীটি যন্ত্রণায় চীৎকার করে উঠল। আমি তখন তার ক্ষতস্থানটি আঙুল দিয়ে চেপে ধরে রক্ত বন্ধ করলাম, তারপর পাখীটিকে প্রাসাদে রাজকুমারী সুন্দরীর কাছে নিয়ে গেলাম। সুন্দরী গাছগাছড়া জড়িবুটি নিয়ে এলেন, আমরা তাই দিয়ে পুলটিস বানিয়ে পাখীটির ক্ষতস্থানের সুশ্রুষা করলাম। পাখীটা ঠাণ্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছিল, আমি আমার জামা দিয়ে পাখীটাকে জড়িয়ে ধরে তার গা-টা গরম করে দিলাম। তারপর প্রাসাদের যেখানে আগুন জ্বলে তার ধারে পাখীটাকে রেখে তার যত্ন করতে লাগলাম।”
সিদ্ধার্থ ক্ষণিকের জন্য থামলেন ও স্বস্তির দিকে তাকিয়ে বললেন, “স্বস্তি, আমি তোমাকে এখনো বলিনি, অল্প বয়সে আমি একজন রাজকুমার ছিলাম, আমার বাবা কপিলাবস্তুর মহারাজ শুদ্ধোদন। সুজাতা সব জানে।
“আমি রাজহাঁসটার জন্য খাবার নিয়ে আসতে যাব, এমন সময় দেখি আমার আট বছর বয়সী সম্পর্কিত ভাই, দেবদত্ত, হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ল। তার হাতে তীর ধনুক, সে উত্তেজিত স্বরে বলল, “সিদ্ধার্থ, তুমি একটা রাজহাঁসকে এখানে কোথাও মাটিতে পড়ে যেতে দেখেছ?”
“আমি কিছু বলার আগেই দেবদত্ত রাজহাঁসটিকে আগুনের ধারে দেখতে পেল। সেইদিকে সে দৌড়ে যাবে, আমি তাকে থামিয়ে বললাম, “তুমি পাখীটাকে এখান থেকে নিয়ে যেও না।”
“ভাই বলল, “এই পাখীটা আমার। আমি এটাকে মেরেছি!”
“আমি দেবদত্ত আর রাজহাঁসটির মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইলাম, মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছি দেবদত্তকে কোনমতে এই পাখী আমি পেতে দেব না। আমি তাকে বললাম, “এই পাখীটা আহত। আমি একে রক্ষা করছি। এ এখানেই থাকবে।”
“দেবদত্ত কিছুটা একগুঁয়ে, সে এত সহজে ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। বলল, “শোন ভাই, এই পাখীটা যখন আকাশে উড়ছিল, এ তখন কারো ছিল না। আমি একে আকাশ থেকে তীর মেরে নামিয়েছি, এখন এটা আমার!”
“তার তর্কতে যুক্তি থাকতে পারে, তবে তার কথায় আমার ভারি রাগ হল। আমি বেশ বুঝতে পারছি সে এঁড়ে তর্ক করছে, কিন্তু কোন জায়গায় তাকে খণ্ডন করব, সেইটে কিছুতেই ধরতে পারছি না। সাংঘাতিক রেগে গিয়ে চুপ করে সেখানে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হল দিই ব্যাটাকে এক ঘুঁষি! কেন এমন মনে হল, জানি না। তারপরে একটা জুৎসই উত্তর খুঁজে পেলাম।
“শোন ভাই,” আমি বললাম, “তারাই একসঙ্গে থাকার যোগ্য, যারা পরস্পরকে ভালবাসে; শত্রুরা কখনো একসঙ্গে থাকে না। তুমি রাজহাঁসটাকে মারবার চেষ্টা করেছিলে, তাই তুমি আর ও, তোমরা পরস্পরের শত্রু! পাখীটা কোনমতেই তোমার সঙ্গে থাকতে পারে না। আমি তাকে বাঁচিয়েছি, আমি তার ক্ষত সারিয়ে দিয়েছি, তার শরীরকে উষ্ণ করেছি, তুমি যখন এখানে এলে তখন আমি এর জন্যে খাবার আনতে যাচ্ছিলাম। আমি আর এই পাখী, আমরা একে অপরকে ভালবাসি, তাই আমরা একসঙ্গে থাকব। আমাকে পাখীটার প্রয়োজন, তোমাকে নয়।”
সুজাতা হাততালি দিয়ে বলে উঠল, “একদম! আপনার যুক্তি অকাট্য!”
সিদ্ধার্থ স্বস্তির দিকে তাকালেন, “তুমি কি বল স্বস্তি?”
স্বস্তি ক্ষণকাল চিন্তা করল, তারপর ধীরে ধীরে বলল, “আমারো মনে হয় আপনি যা বলেছেন যথার্থ। অবিশ্যি অনেকেই মানবেন না। বেশীর ভাগ লোকই দেবদত্ত কে সমর্থন করবেন।”
সিদ্ধার্থ মাথা নেড়ে বললেন, “যা বলেছ, বেশীর ভাগ মানুষ দেবদত্ত’র ধারণাই পোষণ করে।”
“তারপর কি হল শোন। আমরা তো নিজেরা একমত হতে পারলাম না কে রাজহাঁসটা পাবে, তখন আমরা বড়দের কাছে গেলাম। সেদিন প্রাসাদে সভা বসেছিল, আমরা হৈ হৈ করে রাজদরবারে, যেখানে বিচারালয়, সেখানে গিয়ে হাজির হলাম। আমি রাজহাঁসটাকে জাপটে ধরে, আর দেবদত্ত তার তীর ধনুক আঁকড়ে। সেখানে সব মন্ত্রীরা বসে ছিলেন, আমরা যে যার মত করে আমাদের যুক্তি তাঁদের বুঝিয়ে বললাম। তাঁদের তো কাজকর্ম পণ্ড, সবাই আমাদের কথা শুনতে ব্যস্ত। প্রথমে দেবদত্ত, তারপর আমার কথা তাঁরা শুনলেন। তারপর তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করতে লাগলেন কি করা যায় কিন্তু কেউ আর একমত হতে পারলেন না। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই দেবদত্তর দিকে ঝুঁকে পড়েন বুঝি, এমন সময় আমার বাবা, যিনি মহারাজ, তিনি বার কয়েক গলা খাঁকরি দিয়ে কেশে উঠলেন। ব্যস, অমনি মন্ত্রী মশাইরা সব চুপ — তোমরাই বল ব্যাপারটা অদ্ভুত কি না — সবাই মিলে একযোগে বলে উঠলেন আমার কথাই মানতে হবে। রাজহাঁসটা আমারই পাওনা। দেবদত্ত তো রেগে আগুন, কিন্তু তার আর কিছুই করার ছিল না।
“আমি পাখীটাকে পেলাম বটে, কিন্তু খুশী হতে পারলাম না। আমার বয়স হয়ত কম, তবুও বুঝতে পারলাম, আমার জয়টা সম্মানজনক নয়। মন্ত্রীরা আমার বাবাকে সন্তুষ্ট করতে চেয়ে পাখীটাকে আমার হাতে তুলে দিয়েছেন, আমার যুক্তি তর্কতে, কি, আমার কথায় তাঁরা যে সত্যিটা বুঝেছেন, তা নয়।”
“ব্যাপারটা খুব দুঃখের,” সুজাতা ভ্রূ কুঁচকে বলল।
“তা তো বটেই; কিন্তু পাখীটার কথা ভেবে দেখলাম, পাখীটা তো অন্তত বেঁচে গেল। আমার এতেই সান্ত্বনা। না হলে বেচারা রান্নার হাঁড়িতে সেদ্ধ হত।
“এই পৃথিবীতে খুব কম মানুষ করুণা কি সহানুভূতির দৃষ্টিতে বিচার করে, তাই আমরা পরস্পর পরস্পরের প্রতি এত নিষ্ঠুর। সবল কেবলই দুর্বলকে যাতনা দেয়। আমার এখনো মনে হয় আমার সেদিনকার সিদ্ধান্ত যথার্থ ছিল, কেননা আমি প্রেম ভালবাসা দিয়ে ভেবেছিলাম। প্রেম ভালবাসা সকলের দুঃখ দূর করে। তবে যা সত্যি, তা সত্যিই, সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক তাকে মানুক আর নাই মানুক। তাই, তোমরা যারা আমার সন্তান, তাদের বলব যে সত্যের পথে স্থির থাকেতে খুব সাহস লাগে।”
“তারপর রাজহাঁসটার কি হল, গুরুদেব?” সুজাতা জিজ্ঞাসা করল।
“চারদিন ধরে আমি খুব করে রাজহাঁসটার সেবা সুশ্রুষা করলাম। তারপর যখন দেখলাম যে তার ক্ষত শুকিয়ে গেছে, তখন তাকে মুক্ত করে দিলাম, তাকে সাবধান করে দিলাম যেন সে বহুদূরে উড়ে যায়, যেন তাকে কেউ আর তীর মারতে না পারে।”
সিদ্ধার্থ দুই বালক বালিকার দিকে তাকালেন। তাদের মুখ থমথমে গম্ভীর।
“সুজাতা, তোমার বাড়ি ফেরার সময় হয়ে গেছে মা, দেরী হলে তোমার মা চিন্তা করবেন। স্বস্তি, তোমার না আরো ঘাস কেটে মোষগুলোকে পৌঁছে দেবার কথা? তুমি কালকে আমাকে যে কুশ ঘাস কেটে দিয়ে গিয়েছিলে তাতে সুন্দর ধ্যান করার আসন হয়েছিল। কাল রাতে আর আজ সকালে তাতে বসে দিব্যি ধ্যান করলাম। অনেক কিছুর দর্শণ হল। তোমাকে পেয়ে খুব সুবিধে হয়েছে স্বস্তি। আমার যেমন যেমন উপলব্ধি গভীর হবে, তোমাদের সঙ্গে সেই সব ভাগ করে নেব। এখন আবার আমার ধ্যানে বসার সময় হয়ে এল।
সিদ্ধার্থ যে ঘাসের কুশাসনের কথা বলছিলেন স্বস্তি তাকিয়ে দেখল। ঘাসগুলো জমাট বেঁধে গেছে হয়ত, তাহলেও মোটামুটি নরম। দিন তিনেক বাদে সে আবার তার গুরুদেবের জন্য ঘাস এনে দেবে নতুন কুশাসন তৈরী করতে। স্বস্তি উঠে দাঁড়িয়ে সুজাতার সঙ্গে একসঙ্গে জোড় হাত করে মাথা নত করে সিদ্ধার্থকে প্রণাম করল। সুজাতা তারপর বাড়ি চলে গেল, আর স্বস্তি মোষগুলোকে নদীর তীরে চরাতে নিয়ে গেল।



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন