Arin Basu RSS feed

arin.basu@gmail.com
আমি বুদ্ধদেব, বৌদ্ধধর্ম, মনোময়তা, আন্তর্জন, ধ্যান নিয়ে লিখব। যা জানি, যৎকিঞ্চিৎ উপলব্ধি করেছি, সবটুকু দিয়ে।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • #পুরোন_দিনের_লেখক-ফিরে_দেখা
    #পুরোন_দিনের_লেখক-ফি...
  • হিমুর মনস্তত্ত্ব
    সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্যারিশমাটিক চরিত্র হিমু। হিমু একজন যুবক, যার ভালো নাম হিমালয়। তার বাবা, যিনি একজন মানসিক রোগী ছিলেন; তিনি ছেলেকে মহামানব বানাতে চেয়েছিলেন। হিমুর গল্পগুলিতে হিমু কিছু অদ্ভুত কাজ করে, অতিপ্রাকৃতিক কিছু শক্তি তার আছে ...
  • এক অজানা অচেনা কলকাতা
    ১৬৮৫ সালের মাদ্রাজ বন্দর,অধুনা চেন্নাই,সেখান থেকে এক ব্রিটিশ রণতরী ৪০০ জন মাদ্রাজ ডিভিশনের ব্রিটিশ সৈন্য নিয়ে রওনা দিলো চট্টগ্রাম অভিমুখে।ভারতবর্ষের মসনদে তখন আসীন দোর্দন্ডপ্রতাপ সম্রাট ঔরঙ্গজেব।কিন্তু চট্টগ্রাম তখন আরাকানদের অধীনে যাদের সাথে আবার মোগলদের ...
  • ভারতবর্ষ
    গতকাল বাড়িতে শিবরাত্রির ভোগ দিয়ে গেছে।একটা বড় মালসায় খিচুড়ি লাবড়া আর তার সাথে চাটনি আর পায়েস।রাতে আমাদের সবার ডিনার ছিল ওই খিচুড়িভোগ।পার্ক সার্কাস বাজারের ভেতর বাজার কমিটির তৈরি করা বেশ পুরনো একটা শিবমন্দির আছে।ভোগটা ওই শিবমন্দিরেরই।ছোটবেলা...
  • A room for Two
    Courtesy: American Beauty It was a room for two. No one else.They walked around the house with half-closed eyes of indolence and jolted upon each other. He recoiled in insecurity and then the skin of the woman, soft as a red rose, let out a perfume that ...
  • মিতাকে কেউ মারেনি
    ২০১৮ শুরু হয়ে গেল। আর এই সময় তো ভ্যালেন্টাইনের সময়, ভালোবাসার সময়। আমাদের মিতাও ভালোবেসেই বিয়ে করেছিল। গত ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে নবমীর রাত্রে আমাদের বন্ধু-সহপাঠী মিতাকে খুন করা হয়। তার প্রতিবাদে আমরা, মিতার বন্ধুরা, সোশ্যাল নেটওয়ার্কে সোচ্চার হই। (পুরনো ...
  • আমি নস্টালজিয়া ফিরি করি- ২
    আমি দেখতে পাচ্ছি আমাকে বেঁধে রেখেছ তুমিমায়া নামক মোহিনী বিষে...অনেক দিন পরে আবার দেখা। সেই পরিচিত মুখের ফ্রেস্কো। তখন কলেজ স্ট্রিট মোড়ে সন্ধ্যে নামছে। আমি ছিলাম রাস্তার এপারে। সে ওপারে মোহিনিমোহনের সামনে। জিন্স টিশার্টের ওপর আবার নীল হাফ জ্যাকেট। দেখেই ...
  • লেখক, বই ও বইয়ের বিপণন
    কিছুদিন আগে বইয়ের বিপণন পন্থা ও নতুন লেখকদের নিয়ে একটা পোস্ট করেছিলাম। তারপর ফেসবুকে জনৈক ভদ্রলোকের একই বিষয় নিয়ে প্রায় ভাইরাল হওয়া একটা লেখা শেয়ার করেছিলাম। এই নিয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে বেশ কিছু মতামত পেয়েছি এবং কয়েকজন মেম্বার বেক্তিগত আক্রমণ করে আমায় মিন ...
  • পাহাড়ে শিক্ষার বাতিঘর
    পার্বত্য জেলা রাঙামাটির ঘাগড়ার দেবতাছড়ি আদিবাসী গ্রামের কিশোরী সুমি তঞ্চঙ্গ্যা। দরিদ্র জুমচাষি মা-বাবার পঞ্চম সন্তান। অভাবের তাড়নায় অন্য ভাইবোনদের লেখাপড়া হয়নি। কিন্তু ব্যতিক্রম সুমি। লেখাপড়ায় তার প্রবল আগ্রহ। অগত্যা মা-বাবা তাকে বিদ্যালয়ে পাঠিয়েছেন। কোনো ...
  • আমি নস্টালজিয়া ফিরি করি
    The long narrow ramblings completely bewitch me....The silently chaotic past casts the spell... অতীত থমকে আছে;দেওয়ালে জমে আছে পলেস্তারার মত;অথবা জানলার শার্শিতে নিজের ছায়া রেখে গিয়েছে।এক পা দু পা এগিয়ে যাওয়া আসলে অতীত পর্যটন, সমস্ত জায়গার বর্তমান মলাট এক ...

বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

পুরনো পথ সাদা মেঘ - দ্বিতীয় পর্ব

Arin Basu

মোষ চরাণোর কথকতা

সুশীতল দিন। গভীর মনসংযোগ সহকারে দ্বিপ্রাহরিক আহার শেষ করে ভিক্ষুরা যে যার পাত্র ধুয়ে মেজে মাটিতে আসন বিছিয়ে বুদ্ধদেবের দিকে মুখ করে বসলেন। বাঁশবন মঠটিতে অজস্র কাঠবেড়ালি, তারা নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায়, সাধুদের মাঝখান দিয়েই খেলে বেড়াতে লাগল। কয়েকটি কাঠবিড়ালি আবার বাঁশগাছ বেয়ে ওপরে উঠে নীচের সমাবেশ ওপর থেকে দেখতে লাগল। স্বস্তির চোখে পড়ল রাহুল বুদ্ধদেবের একেবারের সামনের সারিতে বসে আছে, সেও পায়ে পায়ে এগিয়ে রাহুলের পাশে তার আসন বিছিয়ে পদ্মাসন হয়ে বসে পড়ল। সে এক শান্ত, রমণীয়, ভাবগম্ভীর পরিবেশ, সেখানে কারো মুখে টুঁ শব্দটি নেই। স্বস্তি নজর করে দেখল প্রতিটি ভিক্ষু একমনে নিজের নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের দিকে নজর রেখে ধ্যান করছেন, বুদ্ধদেব কি বলবেন তার অপেক্ষা করছেন।
বুদ্ধদেব একটি বাঁশের পাটাতনের ওপরে বসতেন। সেটা মাটি থেকে বেশ অনেকটাই উঁচুতে, যাতে তাঁকে অনেক দূর থেকেও দেখতে পাওয়া যায়। পশুরাজ সিংহের যেমন বেশ একটা রাজসিক আলস্য থাকে, বুদ্ধদেবও অনেকটা সেইরকম, গম্ভীর অথচ আলগা আভিজাত্য নিয়ে বসে ছিলেন। তাঁর চোখে প্রেমময় করুণা, সেই করুণাঘন চোখে তিনি সভার দিকে চেয়ে দেখলেন। দৃষ্টি যখন রাহুল আর স্বস্তির দিকে নিবিষ্ট হল, তাদের পানে চেয়ে তিনি হাসলেন। তারপর বললেন,
“আজ আমি তোমাদের মোষ চরানোর কথা বলব। মোষ চরানোর কাজ যে করে সে জানে তাকে কি করতে হয়। মোষ চরানোর রাখাল জানে কোনটি তার মোষ, জানে কোন মোষের কি করে গা ধোয়ানোর কায়দা, তাদের ক্ষত পরিষ্কার করার কায়দাকানুন, গোয়ালে ধুনো দিয়ে মশা তাড়ানোর হাল হকিকৎ, কোন পথ ধরে তাদের হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে হবে, নদীর কোন জায়গায় অগভীর জল যাতে মোষের দলকে সাবধানে নদী পার করিয়ে দেবে, কোথায় টাটকা ঘাস পাওয়া যাবে, কোথায় জল, কোন মাঠে নিয়ে গিয়ে চরাতে হবে, কোন বুড়ো মোষকে কোন বাচ্চা মোষের সঙ্গে যেতে দেবে, যাতে বাচ্চা মোষটি বৃদ্ধ মোষের কাছ থেকে কিছু শেখে।
“ ভিক্ষুগণ, মোষচারণকারী রাখাল বালক যেমন নিজের মোষটিকে চেনে, ভিক্ষুও তেমন আপন শরীরটিকে আপন সত্ত্বাটিকে চিনবেন। রাখাল যেমন তার নিজ নিজ মোষের গতিপ্রকৃতির, চালচলনের খেয়াল রাখে, ভিক্ষুও তেমন শরীর, মন, বাক্যের হদিশ রাখবেন, কোন কাজটি করা উচিৎ, কোনটি উচিৎ নয়। রাখাল যেমন তার পশুদের গা ধুইয়ে পরিষ্কার করে দেয়, ভিক্ষুও তেমন আপন শরীর ও মনের আকাঙ্খা, তনহা, ক্রোধ, হিংসার প্রবৃত্তির কলুষতা মুক্ত করবেন।”
বুদ্ধদেব যতক্ষণ কথা বলে গেলেন, স্বস্তির দিক থেকে তাঁর চোখ নড়ল না। স্বস্তি মনে মনে বেশ অনুভর করছিল সে-ই বুদ্ধদেবের এই বাণীর উৎস। তার বহু বছর আগের স্মৃতি মনে পড়ল, কেমন করে তারা সব মোষচারণকারী রাখালেরা সকলে বুদ্ধদেবের পাশে বসে থাকত, আর বুদ্ধেদেবও তাদের মোষ চরানোর খুটিনাটি জিজ্ঞেস করতেন। তা না হলে রাজার সন্তান, তিনি মোষ চরানোর এতসব ব্যাপার স্যাপার কেমন করে জানবেন?
বুদ্ধদেব তাঁর স্বাভাবিক স্বরেই কথা বলছিলেন, তাতেও কারো যেন শুনতে অসুবিধে না হয়, এতটাই স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল তাঁর গলা,
“রাখাল বালক যেমন মোষের গায়ে ঘা হলে তাকে যত্ন করে চিকিৎসা করে, ভিক্ষুও তেমনি তাঁর ষড়েন্দ্রিয়ের প্রতি তীক্ষ্ন নজর রাখেন — চোখ, কান, নাক, জিভ, শরীর, মন — যাতে বিক্ষিপ্ত না হন। আগুন জ্বেলে ধোঁয়া দিয়ে রাখাল যেমন মোষদের মশার কামড় থেকে বাঁচিয়ে রাখে, ভিক্ষুও তেমন তাঁর শিক্ষাদীক্ষাকে ব্যবহার করেন নিজেকে জাগ্রত করতে, তাঁর চারপাশের মানুষকে শেখাতে কিভাবে শরীর ও মনের অসুস্থতা দূর করতে হয়। রাখাল যেমন নিরাপদে তার মোষেদের চরিয়ে নিয়ে যায়, ভিক্ষুও তেমনি বিপদের পথ — যে পথে যশ, অর্থ, সম্ভোগের উল্লাস, নাট্যশালা, মদিরালয়, সে পথ তিনি পরিহার করেন। রাখাল বালক যেমন তার মোষেদের ভালবাসে, ভিক্ষুও ভালবাসেন ধ্যানের আনন্দ। রাখাল যেমন অগভীর নদীপথে মোষেদের নদী পেরিয়ে নিয়ে যায়, ভিক্ষুও তেমনি চতুরার্য সত্যের পথে জীবনতরী অতিক্রম করেন। রাখাল যেমন তার মোষেদের পুষ্টির জন্য কচি ঘাস আর জল যুগিয়ে যায়, ভিক্ষুও তেমনি নির্বাণ অর্জনের নিমিত্ত মনোময়তা নামক পুষ্টির ব্যবস্থা করেন মনোময়তার চার স্তম্ভ অবলম্বন করে। রাখাল যেমন যাতে ঘাস নষ্ট না হয় তার জন্য মোষেদের অত্যধিক চারণ করায় না, তেমনি ভিক্ষুও লোকালয়ের মানুষজনের সঙ্গে ভিক্ষাকালে সদ্ভাব রাখেন। রাখাল বালক যেমন বৃদ্ধ মোষদের দিয়ে তরুণ মোষদের শেখায় কি করে চলতে হয়, ভিক্ষুও তেমন তাঁর অগ্রজদের মেধা ও অভিজ্ঞতাকে সম্মান করেন। হে ভিক্ষুগণ, যে সমস্ত ভিক্ষু এই এগারটি বিষয় মেনে চলেন, ছ’বছর যদি এইভাবে তাঁরা অতিবাহিত করতে পারেন, তাঁদের অহর্তত্ব লাভ অবশ্যম্ভাবী।”

স্বস্তি তন্ময় হয়ে শুনছিল। সে বুদ্ধদেবকে দশ বছর আগে যা যা বলেছিল, সব তিনি মনে রেখেছেন। শুধু তাই নয়, সে সব তিনি ভিক্ষুদের শিক্ষার কাজে লাগালেন। স্বস্তি বুঝতে পারছিল যে বুদ্ধদেব সমবেত ভিক্ষুমণ্ডলীকে শিক্ষা দিচ্ছেন, তবুও তার স্পষ্ট মনে হচ্ছিল যে বুদ্ধদেব যেন তাকেই সরাসরি কিছু বলতে চাইছেন। বুদ্ধদেবের দিক থেকে সে তাই এক মুহূর্তের জন্য নজর সরায়নি।
তবে এ কথাগুলোও মনে রাখতে হবে। কয়েকটা কথা, যেমন, “ষড়েন্দ্রিয়”, “চতুরার্য সত্য”, “মনোময়তার চতুর্স্তম্ভ”, এসবের মানে স্বস্তি বুঝতে পারেনি। রাহুলকে পরে জিজ্ঞেস করে জেনে নিতে হবে, তবে বুদ্ধদেবের কথা থেকে মোটামুটি যা বোঝবার সে বুঝেছে।
বুদ্ধদেব বলে চললেন। ভিক্ষুমণ্ডলীকে মোষ চরানোর পথের কথা বলছিলেন, যে পথে নিরাপদ ভাবে মোষদের চরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। পথে বেশী কাঁটাগাছ থাকলে মোষেদের গা কেটে যেতে পারে, সেখান থেকে ঘা হতে পারে। রাখাল ঘা সারাতে না জানলে মোষটি যে শুধু অসুস্থ হয়ে পড়বে তাই নয়, মারাও যেতে পারে। ধর্মপথের সাধনাও সেই রকম। ভিক্ষু পথের সন্ধান না জানলে দেহে মনে অসুস্থ হয়ে পড়বেন। ক্রোধ ও লোভ তাতে আরো বিষ ঢালবে, এতে করে বোধি অর্জনের পথে মস্ত অন্তরায়।
বুদ্ধদেব কিছুক্ষণের জন্য থামলেন। স্বস্তিকে তাঁর কাছে এসে দাঁড়াতে নির্দেশ দিলেন। স্বস্তি হাত জোড় করে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে রইল। বুদ্ধদেব স্মিত হেসে স্বস্তিকে সভায় পরিচয় করিয়ে দিলেন:
“আজ থেকে দশ বছর আগে গয়ার কাছে একটি অরণ্যে আমার সঙ্গে স্বস্তির প্রথম দেখা হয়। আমার বোধি প্রাপ্তির অনতিপূর্বে। তার তখন ১১ বছর বয়স। স্বস্তি আমাকে কুশের আসন তৈরী করে দিয়েছিল, যে আসন আমি বোধিবৃক্ষের তলায় পেতে ধ্যান করতে বসি। আজকে মোষ চরানোর ব্যাপারে যা যা বললাম, সব আমি ওর কাছ থেকেই শিখেছি। আমি জানতাম যে রাখাল হিসেবে স্বস্তি খুব ভাল, আমি জানি একদিন সে চমৎকার ভিক্ষু হবে।”
সভাস্থ সকলের নজর এখন স্বস্তির দিকে। স্বস্তির কান ঝাঁঝাঁ করছে, তার গাল লজ্জায় লাল। সভাস্থ সকলে হাত জোড় করে তাকে প্রণাম করলেন, সেও তাঁদের প্রতিনমস্কার করল। তারপর বুদ্ধদেব তাঁর প্রবচন সমাপ্ত করলেন; রাহুলকে ধ্যান চেতনার ১৬ টি উপায় আবৃত্তি করতে নির্দেশ করলেন। রাহুল উঠে দাঁড়াল, হাত জোড় করল, তারপর স্পষ্ট স্বরে প্রতিটি উপায় আবৃত্তি করতে লাগল। তার আবৃত্তি শেষ হলে, সে সমবেত ভিক্ষুমণ্ডলীর দিকে মাথা নত করল। বুদ্ধদেব উঠে দাঁড়ালেন, তারপর ধীরে ধীরে তাঁর কুটিরের দিকে হেঁটে চলে গেলেন। তিনি চলে যাবার পর ভিক্ষুরা যে যার আসন গুটিয়ে বনের বিভিন্ন প্রান্তে চলে গেলেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ কুটিরে বসবাস করতেন, তবে বহু ভিক্ষু বাইরে শুতেন বা বাঁশবনের তলায় ধ্যান করতেন। খুব বৃষ্টিবাদলার দিনে হয়ত ধ্যানকক্ষে কি কুটিরে আশ্রয় নিতেন।
স্বস্তির গুরুদেব সারিপুত্ত তাকে রাহুলের সঙ্গে বাইরে থাকতে বলেছিলেন। রাহুল যখন ছোট ছিল, সে তখন আরেকজন ভিক্ষুর সঙ্গে কুটীরে থাকত, কিন্তু এখন সে গাছের তলায় থাকে। স্বস্তি তো রাহুলের সঙ্গেই থাকতে চায়।
আরেকটু বেলায় স্বস্তি একা একা হাঁটার ধ্যান করতে শুরু করল। একটি ফাঁকা রাস্তা দেখে সে চলতে শুরু করল বটে, কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে নিজের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে মনোনিবেশ করতে তার বেশ অসুবিধে হচ্ছিল। মন তার কেবলই ফেলে আসা গ্রামের বাড়িতে ভাই বোনেদের কাছে ফিরে যাচ্ছিল। নৈরঞ্জনা নদীতীরে যাবার রাস্তাটির ছবি কেবলই তার চোখে ভেসে উঠছিল। সে যেন দেখতে পেল ছোট্ট ভীমা মাথা নীচু করে কান্না চাপার চেষ্টা করছে, রূপক একা একা মোষগুলোকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সে মাথা থেকে এই ছবিগুলো সরিয়ে দেবার চেষ্টা করতে লাগল, শুধু নিজের পদক্ষেপের ও নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতি মনোনিবেশ করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল, তথাপি এই ছবিগুলো যেন তার মনের মধ্যে বন্যার তোড়ের মতন ভেসে আসতে থাকল। মন দিতে পারছে না বলে স্বস্তির রীতিমত লজ্জা লাগল, বুদ্ধদেব তাকে ভালবেসে তার ওপরে যে বিশ্বাস রেখেছেন সে তার যথার্থ যোগ্য হয়ে উঠতে পারছে না। হাঁটার ধ্যান-অভ্যাসের শেষে সে ভাবল রাহুলের সাহায্য চাইবে। দুপুরের ধর্ম-কথার সময়ে বুদ্ধদেব এমন অনেক কিছু বলেছিলেন যার মানে সে ধরতে পারে নি, রাহুল নিশ্চয়ই তাকে বুঝিয়ে দিতে পারবে। রাহুলের কথা মনে হতেই তার মনে সাহসের সঞ্চয় হল, মন অনেকটা শান্তও হল, এবার তার পক্ষে শ্বাস আর পদক্ষেপে মন দেওয়াটা অনেক সহজ মনে হল।
স্বস্তি তখনো রাহুলের খোঁজ করেনি, এমন সময় রাহুলই তার খোঁজে চলে এল। স্বস্তিকে একটি বাঁশগাছের নীচে বসিয়ে বলল, “আজ দুপুরে আনন্দ থেরার সঙ্গে দেখা হল, তিনি তোমার সম্বন্ধে জানতে চাইছিলেন কিভাবে তোমার সঙ্গে বুদ্ধদেবের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল।”
“আনন্দ থেরা কে, রাহুল?”
“তিনি শাক্য বংশের রাজপুত্র ও বুদ্ধদেবের সম্পর্কে ভাই। তিনি সাত বছর আগে সন্ন্যাস নিয়েছিলেন, এখন তিনি বুদ্ধদেবের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিষ্য। বুদ্ধদেব তাঁকে খুবই ভালবাসেন। ইনিই বুদ্ধদেবের শরীরের দেখভাল করেন। আনন্দ থেরা আমাদের দুজনকে কালকে তাঁর কুটীরে ডেকেছেন। আমিও তোমার কাছ থেকে বুদ্ধদেব যখন গয়ায় ছিলেন তখন তাঁর জীবনের কথা জানতে চাই।”
“বুদ্ধদেব তোমাকে বলেন নি?”
“বলেছেন, তবে সব তো আর বলেন নি। আমার মনে হয় তোমার কাছে প্রচুর গল্প আছে।”
“সে তেমন কিছু নয়। আমি যতটুকু মনে করতে পারব বলব। রাহুল, আনন্দ থেরা কেমন মানুষ? আমার একটু সত্যি বলতে কি ভয় লাগছে।”
“ও নিয়ে ভেব না। আনন্দ থেরা খুবই সহজ। আমি তাঁকে তোমার ও তোমাদের ভাইবোনেদের কথা বলেছি। শুনে তো তিনি উচ্ছ্বসিত। কালকে আমাদের ভিক্ষায় বেরোনর আগে তাহলে এইখানে দেখা হচ্ছে কেমন? এখন যাই জামা কাচি গিয়ে, কালকের মধ্যে শুকিয়ে নিতে হবে যে।”
রাহুল উঠতে যাবে, স্বস্তি রাহুলের জামায় আলতো করে টান দিয়ে বলল, “আর একটুখানি বোসই না হয়। তোমাকে কতগুলো ব্যাপার জিজ্ঞেস করার ছিল। আজকে সকালে বুদ্ধদেব ভিক্ষুদের যে ১১ টা নিয়ম মেনে চলার কথা বললেন, আমি তার সবকটা মনে করতে পারছি না। তুমি আরেকবার বলবে?”
“আমি নিজেই নটার বেশী মনে রাখতে পারিনা। ভেবোনা, কাল আনন্দ থেরাকে জিজ্ঞেস করলেই তিনি বলে দেবেন।”
“তুমি নিশ্চিত যে আনন্দ থেরা সবকটা নিয়ম মনে রাখবেন?”
“আলবৎ। এগারটা কেন, একশো এগারোটা হলেও মনে রাখতেন। তুমি তো এখনো আনন্দ থেরাকে চেন না, কিন্তু এখানে সকলে ওনার স্মৃতিশক্তির প্রশংসা করেন। সে এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। বুদ্ধদেব যা যা বলেন, আনন্দ থেরা তার সমস্ত হুবহু মনে রাখেন, খুব সামান্য কিছুও ভোলেন না। এখানে সকলে ওনাকে বুদ্ধদেবের সবচেয়ে জ্ঞানী শিষ্য বলে মনে করেন। তাই কেউ কোন কিছু ভুলে গেলে প্রথমেই আনন্দ থেরার খোঁজ করেন। মাঝে মাঝে অনেকে একসঙ্গে মিলে আনন্দ থেরার কাছ থেকে বুদ্ধদেবের দেওয়া শিক্ষার ক্লাসও করেন।”
“তাহলে তো আমাদের ভাগ্য ভালই বলতে হবে। ওনাকে বরং কালকেই জিজ্ঞাসা করা যাবে। তোমাকে আরো একটা বিষয় জিজ্ঞাসা করার ছিল — হাঁটার সময় মনকে শান্ত কর কি করে?”
“তার মানে তোমার হাঁটার সময় মনে নানা রকমের চিন্তা আসে, তাই তো? বাড়ির কথা মনে পড়ে নিশ্চয়ই।”
স্বস্তি বন্ধুর হাত আঁকড়ে ধরল, “কি করে বুঝলে? একেবারে তাই হয়েছে। আমি কখনো ভাবিনি যে আমি বাড়িকে, ভাইবোনের অভাব কতটা অনুভব করছি! এত খারাপ লাগছে কি বলব, কিছুতেই মন বসাতে পারছি না। তোমার আর বুদ্ধদেবের সামনে এত লজ্জা লাগে কি বলব।”
রাহুল হাসল। “আরে লজ্জা পাবার কিছু নেই। আমি যখন বুদ্ধদেবের সঙ্গে প্রথম এসেছি, আমারো মা’কে, দাদু’কে, মাসীকে খুব মনে পড়ত, ওদের জন্য মন কাঁদত। কত রাত গেছে আমি বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদেছি। আমি তো জানি মা, মাসী, দাদুরও আমার জন্য মন কেমন করত। দিন কয়েক পরে সব সয়ে গেল।”
রাহুল স্বস্তিকে ধরে তুলে জড়িয়ে ধরল।
“তোমার ভাইবোনেরা সত্যি খুব ভালো। খুব স্বাভাবিক যে তোমার মন কেমন করবেই। তবে দেখ, এই নতুন জীবনে সব ধীরে ধীরে সয়ে যাবে। আমাদের এখানে প্রচুর কাজ করার আছে। অধ্যয়ন বিশেষ করে। যাকগে শোন — যখন সময় পাব, তোমাকে আমার পরিবারের গল্প বলব, কেমন?”
স্বস্তি দুহাতে রাহুলের হাত চেপে ধরে মাথা নাড়ল। তারপর রাহুল গেল জামা কাচতে, স্বস্তি একটা ঝাঁটা নিয়ে রাস্তা থেকে বাঁশপাতা সরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।




শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন