সুকান্ত ঘোষ RSS feed

কম জেনে লেখা যায়, কম বুঝেও!

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • আমার ব্যথার পূজা
    ব্যর্থতাকে গ্রহন করতে শেখা জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ন শিক্ষা। অনুভব হয় সেই শিক্ষা আমার অসম্পুর্ন রয়ে গেছে। নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম না করতে পারার মানসিক যন্ত্রনা ছাপিয়ে গেছে শারীরিক যন্ত্রনাকেও.. এই কি সেই " মাঝবয়েসী সংকট"? নাকি, ছোট্টবেলা থেকে ...
  • বইমেলা নোটবই
    উপক্রমনিকাঃ গুরু এবং শুরুষাট সত্তরের দশকের হিন্দি ছবিতে কুম্ভ মেলা অর্থাৎ “কুম কে মেলে”-এর একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ থাকত। ওই ভাইয়ো অর বহেনোরা (মিত্রো নয় কিন্তু) কুম-কে মেলে’তে হারিয়ে যেত আর সিনেমার শেষে ফের দেখা হয়ে যেত, হ্যাপ্পি এন্ডিং আর কি। আর এই আলাদা আর ...
  • ভাসাইলি রে
    মুম্বাই থেকে ট্রেনে কলকাতা ফিরছি,সাল আমার মনে নেই। এক পুণে প্রবাসী বাঙালী পরিবারের সাথে আলাপ। তারা আত্মীয়র বিয়ে উপলক্ষে কলকাতা আসছেন। এনারা নিজেদের বাবার আমল থেকেই প্রবাসী। বহুদিন, বোধহয় প্রায় দশ-পনেরো বছর বাদে কলকাতায় আসছেন। খুবই আগ্রহী, যদি সময় করে ...
  • সংস্কৃত বাংলা ভাষার জননী নয়, সাঁওতালী ভাষার কাঠামোতেই বাংলা ভাষার বিকাশ
    বাংলা ভাষা একটি মিশ্র ভাষা। তার মধ্যে বৈদিক বা সংস্কৃত ভাষার অবদান যেমন আছে, তেমনি আছে খেরওয়াল বা সাঁওতালী সহ বেশ কিছু মুণ্ডা ভাষার অতি গুরূত্বপূর্ণ অবদান। বাংলা ভাষার জননী হিসেবে কেবল সংস্কৃত আর্য ভাষার দাবি সম্বলিত যে মিথটি গড়ে উঠেছিল – সেই দাবিকে ...
  • রক্তকরবী, অল্প কথায়
    মানুষের স্বতস্ফুর্ততা যখন মরে যায় তখন যন্ত্রে আর মানুষে তফাত থাকে কই! একটা ঘোর মেক্যানিক্যাল সিস্টেমের মধ্যে আবর্তিত হয় তার দৈনিক যাপন, বাকি সমাজের সাথে সম্পর্ক হয় অ্যালগোরিদিমিক্যাল। কাজের সূত্রে সে কথা বলে আবার ঢুকে যায় নিজের মৃত চামড়ার খোলসে।ঠিক যেন এই ...
  • একাত্তরের দিন গুলি
    কোন এক পড়ন্ত বিকেলে আমরা ঢাকার রাস্তায় কণিকা নামের একটা বাড়ি খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। অনেকক্ষণ ধরে। আসলে আমরা খুঁজছিলাম একটা ফেলে আসা সময়কে। একটা পরিবারকে। যে বাড়িটা আসলে ব্লাইন্ড লেনের এক্কেবারে শেষ সীমায়। যে বাড়ির গলি আঁধার রাতে ভারী হয়েছিল পাকিস্তানী ...
  • #পুরোন_দিনের_লেখক-ফিরে_দেখা
    #পুরোন_দিনের_লেখক-ফি...
  • হিমুর মনস্তত্ত্ব
    সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্যারিশমাটিক চরিত্র হিমু। হিমু একজন যুবক, যার ভালো নাম হিমালয়। তার বাবা, যিনি একজন মানসিক রোগী ছিলেন; তিনি ছেলেকে মহামানব বানাতে চেয়েছিলেন। হিমুর গল্পগুলিতে হিমু কিছু অদ্ভুত কাজ করে, অতিপ্রাকৃতিক কিছু শক্তি তার আছে ...
  • এক অজানা অচেনা কলকাতা
    ১৬৮৫ সালের মাদ্রাজ বন্দর,অধুনা চেন্নাই,সেখান থেকে এক ব্রিটিশ রণতরী ৪০০ জন মাদ্রাজ ডিভিশনের ব্রিটিশ সৈন্য নিয়ে রওনা দিলো চট্টগ্রাম অভিমুখে।ভারতবর্ষের মসনদে তখন আসীন দোর্দন্ডপ্রতাপ সম্রাট ঔরঙ্গজেব।কিন্তু চট্টগ্রাম তখন আরাকানদের অধীনে যাদের সাথে আবার মোগলদের ...
  • ভারতবর্ষ
    গতকাল বাড়িতে শিবরাত্রির ভোগ দিয়ে গেছে।একটা বড় মালসায় খিচুড়ি লাবড়া আর তার সাথে চাটনি আর পায়েস।রাতে আমাদের সবার ডিনার ছিল ওই খিচুড়িভোগ।পার্ক সার্কাস বাজারের ভেতর বাজার কমিটির তৈরি করা বেশ পুরনো একটা শিবমন্দির আছে।ভোগটা ওই শিবমন্দিরেরই।ছোটবেলা...

বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ক্রিকেট

সুকান্ত ঘোষ

১।

সেলিব্রিটি পাবলিকদের মাঝে মাঝে সাংবাদিকরা ইন্টারভিউ নেবার সময় গুগলি প্রশ্ন দেবার চেষ্টা করে। তেমনি এক অখাদ্য গুগলি টাইপের প্রশ্ন হল, আপনি জীবনে সবচেয়ে বড় কমপ্লিমেন্ট কি পেয়েছেন এবং কার কাছ থেকে। বলাই বাহুল্য আমি বিখ্যাত কেউ নেই, তাই আমাকে এই প্রশ্ন কেউ করে নি। কিন্তু আমি নিজে নিজেকে অনেক করেছি সেই জিজ্ঞাসা।

প্রচন্ড ভেবে ভেবে দেখা গেল - লাইফে কমপ্লিমেন্ট পাবার মতন তেমন কিছু তো করি নি! অবশ্য ক্লাস সেভেন থেকে প্রায় টুয়েলভ পর্যন্ত কার্তিক, চঞ্চল সহ অনেক জনতাকে দায়িত্ব নিয়ে ইংরাজী পরীক্ষার পাস মার্ক সরাবরাহ করার ব্যাপারটা যদি না ধরা হয়। অবশ্য তখন জানতাম না কমপ্লিমেন্ট কি জিনিস!
কোন কমপ্লিমেন্টই জীবনে পাই নি বলে যখন প্রায় স্থির করে ফেলেছি, তখনি মনে পড়ে গেল ক্রিকেট খেলার কথা! সে কি সময় ছিল তখন - টেনিস বল ক্রিকেটই জীবনের ধ্যান-জ্ঞান। হেলমেট পড়ে আন্তর্জাতিক উইকেট কীপাররা স্টাম্পের কাছে দাঁড়িয়ে ফাষ্ট বোলারদের কীপ করা ব্যাপক ভাবে চালু হবার অনেক আগে থেকেই আমি সেই জিনিস করে এসেছি দীর্ঘকাল।

আমাদের দিকে তখন একদিনের টুর্ণামেন্ট ছয়-আট ওভার এবং রানিং টুর্ণামেন্ট ১৪-১৬ ওভার করে হত। একদিনের টুর্ণামেন্টে শীতের দিনে বেলা পড়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ওভারের সংখ্যাও কমে আসত। অনেক অনেক ফাইনাল ম্যাচ খেলেই দুই ওভারের। ব্যাটসম্যান বল দেখতে পাচ্ছে না, আম্পায়ার দেখতে পাচ্ছে না, আমি উইকেটকীপার দেখতে পাচ্ছি না - বোলার আলো আঁধারীতে বল ছুঁড়ছে, এই জিনিস চলে এসেছে বছরের পর বছর। আর কম ওভারের খেলা হবার জন্যই ক্রীজের বাইরে বেরিয়ে ব্যাট হাঁকাবার একটা ডিম্যান্ড ছিল।

তা যাই হোক, আমাদের নিমো গ্রামের সাথে রাই- ভ্যালারি ছিল পাশের গ্রাম বিষ্ণুপুরের। তবে আমাদের অবস্থা সেই আশি-নব্বই দশকের ভারতীয় দলের মত হলে, বিষ্ণুপুর ছিল পাকিস্তান। কি সব প্লেয়ার! তবে ছয় ওভারের খেলায় বেশী ভালো খেলোয়ারের দরকার হত না - চারজন ভালো প্লেয়ার থাকলেই হত - বাকিরা দুধেভাতে। বিষ্ণুপুরের পিঙ্কি আর গোপাল এই দু জনেই বেশীর ভাগ খেলা শেষ করে দিত। পরের দিকে গোপালের ভাই এসে 'চাক' বোলিং শুরু করার পর বিষ্ণুপুর প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়ল।

তেমনি এক সময়ে, কাঁঠালগাছির মাঠে নিমো গ্রামের সাথে সেমি-ফাইন্যাল খেলা হচ্ছে বিষ্ণুপুরের। বিষ্ণুপুর বেশীর ভাগ সময় নিজেদের প্লেয়ায় নিয়েই খেলত - মানে 'হায়ার' তেমন কেঊ খেলত না ওদের হয়ে। তবে সেই বার কেন জানি না এক বাইরের ব্যাটসম্যান ওদের দলে খেলতে এল।
ফুতুদা বল করছে, সেই ব্যাটসম্যান ব্যাট করতে নামল ওয়ান ডাউনে। প্রথমে রানার্স এন্ডে ছিল। উইকেটের পিছনে আমি। এক রান হলে পড়ে এবার সেই ব্যাটসম্যান ক্রীজে এল ফেস করতে ফুতুদাকে। হঠ করে মাঠের বাইরে থেকে বিষ্ণুপুরের খোকনদার নির্দেশ এল নতুন ব্যাটসম্যানের কাছে। খোকনদা ছিল বিষ্ণুপুরের ক্রীকেট টিমের মেন্টর কাম কর্মকর্তা কাম প্রধান উৎসাহী সমর্থক। আমি স্ট্যাম্পের কাছে থাকার জন্য শুনতে পেলাম, সেই নির্দেশ হল, ক্রীজ ছেড়ে সে যেন না বেরিয়ে খেলে। আসলে চেনাশুনা প্লেয়ার হলে তাকে বলতে হত না, আমি কীপিং করলে সবাই ক্রীজেই প্রোথিত থাকত, কিন্তু এ হল নতুন প্লেয়ার আমাদের এলাকায়, তাই সেই নির্দেশ। পরের গল্প সোজা, ফুতুদা বল করল, সেই ব্যাটা এগিয়ে গিয়ে মারতে গেল এবং ফলত বল মিস করে স্ট্যাম্প।

এবার সেই ছেলে ব্যাট বগলে করে মাঠ থেকে বেরুচ্ছে - ভেসে এল খোকানার চিৎকার - "বোকাচোদাকে হাজার বার বললাম ক্রীজ থেকে বেরুস না, বেরুস না! নাই সেই বেরুবে! তুমি বাঁড়া জানো না, কে আছে উইকেটের পিছনে!"

এই এতোদিন পরে আমি খোকনদার সেই বক্তব্যকে কমপ্লিমেন্ট হিসাবেই নিলাম!

বাই দি ওয়ে, গল্পে কোন জল নেই। উত্তর খেলোড়ারী জীবনে ফুতুদা এখন সফল ব্যবসায়ী - মেমারী নিমতলা মার্কেটে 'নিউ লাইট কর্ণার' নামক বিশাল চালু ইলেক্ট্রিক্যাল এর দোকান। সুকান্ত ঘোষের লেজেন্ডারী উইকেট কিপিং-র গল্প তার কাছ থেকে এখনো যাচাই করে নেওয়া যাবে।

খোকন-দার ডায়লগ এখনো আমায় হন্ট করে - "তুই কিপিং ছেড়ে বাঁড়া কেন যে বালের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেলি!"


২।

তেমনি এক শীতের দিনে পড়ন্ত বেলায় নিমো স্টেশনের পাশে কুমারদের জমির আলে লুঙ্গিটা ঠিক করে উবু হয়ে বসে আলম আমাদের বলল, “বুঝলি টনি আর মকসুদকে তুলতে হবে খুব শিগগিরি। ওরা যা শুরু করেছে আজকাল তোরা ভাবতে পারবি না”। টনি আর মকসুদ হল আমাদের পাশের গ্রাম কেজার ছেলে। আলমের প্রস্তাব শুনে আমাদের হালকা টেনশন এসে গেল। বিশেষ করে যখন পাশের গ্রাম থেকে তোলার কোন হিষ্ট্রি তখনো আমাদের ছিল না।
আলম আমার সেই ন্যাংটো বেলার বন্ধু – বাবা মারা যাবার আগের দিন পর্যন্ত মনে এই ধারণা পুষে রেখেছিল যে মাধ্যমিকে আমার নাম্বার আশানুরূপ না হবার মূল কারণ ছিল আলম। তবে বাবার মতে ড্যামেজিং জিনিসটি ছিল আমাদের নিমো গ্রামের শিবতলায় ভ্যাঁটা খেলা। ভ্যাঁটা (বা গুলি খেলা) খেলে খেলে নাকি আমার নাম্বার সেই ক্লাস সিক্স থেকে কমতে শুরু করেছে, মাধ্যমিকে গিয়ে দ্যাট টাচড্‌ দ্যা রক বটম। আলমকে আমি ভ্যাঁটা খেলায় হারাতে পারি নি – সেই প্রশ্নই ওঠে না, শুধু আমি না, নিমো গ্রামেই আলমকে বীট দেবার মত কেউ ছিল না।

আলমের আরেক পরিচয় হল সে পচা মোড়লের নাতি, যে পচা মোড়ল ছিল গিয়ে আমাদের গ্রামে চাল পোড়া, হাঁড়ি চালা, জল পোড়া, বাণ মারা – এই সব ব্যাপারে সাবজেক্ট ম্যাটার এক্সপার্ট।

বি ই কলেজ জনিত আমার এক ক্ষতেও আলম প্রলেপ দিয়েছিল পরোক্ষ ভাবে – তবে তেল পোড়া, জল পোড়া বা তাবিজ দিয়ে নয়। বি ই কলেজ আমার পোটেনশিয়ালকে ঠিক ব্যবহার করতে পারে নি – এ ছাড়া আর বিশেষ লার্জ স্কেলের কিছু অভিযোগ কলেজের প্রতি আছে বলে আমি তো এই মুহুর্তে মনে করতে পারছি না। অনেকে কারপেন্ট্রী ক্লাস, মেসে রান্না হওয়া ৫ দিনের পুরানো মাছ, বা নাকুর গান, চাকুরী না পাওয়া এই সব জিনিস নিয়েও টালাবাহানা করে, কিন্তু আমি সেই সব ক্ষুদ্র জাগতিক জিনিস নিয়ে নাড়াঘঁটা করে নিজের স্ট্যান্ডার্ড নীচে নামাতে পারলাম না।

আসলে বি ই কলেজ জানত না সে কি হারাচ্ছে। আর তা ছাড়া আমার পোটেনশিয়ালকে ঠিক মত ব্যবহার না করতে পারার মূল কারণ তো আর কলেজ নিজে ছিল না, ছিল ন্যাংটো (বিশেষ্য)। ন্যাংটোকে দিয়েই কলেজ কাজ চালালো সেই কত বছর। মানলাম না হয় যে ন্যাংটো বাকি অনেক কিছু আমার থেকে ভালো পারত, কিন্তু তা বলে এটা?

বি ই কলেজ ব্যবহার না করতে পারলেও, আমার বাল্যবন্ধু আলম আমার পোতিভাকে শুষে নিয়ে ব্যবহার করেছিল ক্রিকেট টুর্ণামেন্টে। আলম ক্রিকেটও খেলত ভালোই – ক্লাশ ইলেভেন পর্যন্ত আমাদের সাথে বেশ খেলল – তার ন্যাচার‍্যাল বোলিং অ্যাকশন ছিল অফ কাটার। এটা কেউই জানত না, কেবল আমিই জানতাম উইকেট কিপিং করার দারুণ। তা সেই আলম হট করে ১৬ বছর বয়েসে কম্পিটিটিভ ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে পুরোপুরি ক্রিকেট কর্মকর্তা বনে গেল। এর পর থেকে তার প্রধান কাজই হয়ে দাঁড়ালো ক্রিকেট টিম তৈরী করা এবং টুর্ণামেন্ট ধরা।

এবার আমরা এই সব ব্যাপারে আলমকে চ্যালেঞ্জ করতে পারতাম না – কারণ কে কোথায় ভালো খেলছে, সেটা তার থেকে কেউ আর ভালো জানত না। কারণ ক্রিকেট প্লেয়ার স্কাউটিং আলম শুরু করেছিল সেই হিরো সাইকেলের আমলে (অবশ্য অনেকে অ্যাভন ব্যবহার করত), হিরো হোন্ডা গ্রামের ঘরে ঘরে তখনো ঢোকে নি। ভাঙাচোরা সাইকেল নিয়ে মেমারী ব্লক পুরো চষে ফেলে প্লেয়ারদের ডাটাবেস তৈরী করা সে কাজ চাট্টীখানি ছিল না। আলম সেই কাজ করেছিল বছরের পর বছর প্রধানত সুতপা বিড়ির সাহায্য নিয়ে। তার সেকেন্ডারী সাহায্যে ছিল আমাদের সমবয়সী বা জুনিয়ার কেউ, আলমের সাইকেল চালক হিসাবে।

মোটামুটি আমাদের ‘তোলা’ প্লেয়ার ৩ থেকে ৪ জন থাকত ম্যাক্সিমাম, তবে বেশীর ভাগ সমইয়েই মাত্র ২ জন। যদি আমার স্মৃতি ভুল না করে, তা হলে নিমো গ্রামের হয়ে হায়ার খেলার সূচনা করেছিল আমাদের সময়ে মেমারীর কাত্তিক পোল্লে (কালীতলা পাড়া) এবং ক্রিষ্টির তনুপ। তবে সেই সব ছিল ৫ ফুট ২ এর খেলা। সিনিয়র খেলায় এন্ট্রি পেয়ে এরা আমাদের হয়ে আর কোনদিন খেলে নি, যদিও আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে সিনিয়ার হয়েও তনুপ কোনদিন ৫ ফুট ২ পেরিয়েছিল কিনা! কাত্তিক পোল্লের সাথে আমার সম্পর্ক আবার অন্য রকম, আমাদের হয়ে ফ্রীতে খেলেছিল। ওই ইংরাজী পরীক্ষা আর ক্রিকেট - মিথোজীবিতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমাদের মধ্যে।

তা যা বলছিলাম, সিনিয়র লাইফে নিমো ভারত ক্রিকেট সমাজের টিমে আমাদের ব্যাচে প্রথম ‘তোলা’ (যাকে হায়ার করা বলে আর কি) ওই টনি আর মকসুদ। এবং বলতে নেই, মোহনপুর মাঠে তারা দুই জনেই মান রেখেছিল। মকসুদ দারুণ বল করেছিল, আমি একটা ম্যাচে চারটে স্টাম্প। গোটা একদিনের টুর্নামেন্ট মোট স্ট্যাম্পিং মনে হয় দশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আমরা ভেবেছিলাম সেমিফাইন্যাল পর্যন্ত যেতে পারব না – তাই কেউ বাড়ি থেকে তৈরী হয়ে যাই নি (মানে চান করে, মুড়ি খেয়ে)। সেই ফাইন্যালে ওঠার পর গ্রামের সাপোর্টাররা গামছা বেঁধে মুড়ি নিয়ে গেল বাড়ি থেকে – মোহনপুর মাঠ যাকে বলে একবারে মিডিল অভ নো-হ্যোয়ার। ফাইন্যাল খেলতে গিয়ে আমার কেষ্ট স্যারের কাছে প্রাইভেট মিস – কোন বোকাচোদা আমার ভালোর জন্য সেই খবর আবার আমার বাপের কানে তুলে দেয় – ফলতঃ বাপের হাতে উদুম ক্যালানী – ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে কাপ জিতে ফেরার ফলে নিমোর সিনিয়ররা বাড়ি ঢোকার আগে নিমো বটতলায় কোচোর দোকানে সিঙ্গারা, এবং বাসি দানাদার খাইয়ে বাড়িতে ছেড়ে ছিল। ফলতঃ বাপের ক্যালানী তত বেশী মনে এফেক্ট ফ্যালে নি, পেট ভরা থাকার জন্য।

আলম আমাদের নন-প্লেয়িং ক্যাপ্টেন ছিল না ঠিকই – কিন্তু আমাদের হয়ে টস করতে ওই যেত। কেন না পচা মোড়লের নাতি আলম যে টসে জিতবে প্রতিবার এমনি আমাদের বিশ্বাস ছিল এবং আলম তার মর্যাদা রেখেছিল ৯৫% ক্ষেত্রে। আমরা জোর জবরদস্তি করে আলমকে ওর দাদুর কাছ থেকে টসে জেতার ডার্ক আর্টটা শিখে নিতে চাপ দিয়েছিলাম।

শীতকালে আলমের ফুলটাইম জব ছিল ক্রিকেট কর্মকর্তা, গ্রীষ্মের সময় তখনও ফুটবল খেলা হত, ফলতঃ ফুটবল নিয়ে ব্যস্ত, বর্ষা আর শরতের মাঝের সময়টায় সে ব্যস্ত থাকত মাছ ধরা নিয়ে – আর বছরের বাকি সময়টায় সে বড় ভাইয়ের আন্ডারে জামা কাপড়ের টেলারিং কাজ করত। এবং সমস্ত সময়েই আলমের কনস্ট্যান্ট সাথী ছিল লটারী এবং জুয়া। তবে সেই লটারী এবং জুয়া খেলার গল্প অন্য সময়। ওই বিষয় গুলি জটিল, অনেক গবেষণা এবং অনেক উত্থান-পতন তার মধ্যে জড়িয়ে আছে।

শুধু কর্মকর্তা হিসাবে নয় – আলম আর হাবা, এই দুই পাবলিকের জন্য নিমো ক্রিকেট মাঠে ড্রেস কোড চালু হয়। ড্রেস কোড মানে, লুঙ্গি পরে ব্যাট করতে নামা যাবে না। একে তো টেনিস বলের খেলায় এল বি ডব্লু ছিল না, তার পর এরা দুজন লুঙ্গি ছড়িয়ে ব্যাট করতে নামা চালু করলে, বোল্ড করে প্রায় অসম্ভব হয়ে গেল। বল যতই জোরে যাক, ব্যাট বীট হলে বল গিয়ে জড়াবে সেই দুই পায়ের মাঝে ছড়িয়ে থাকা লুঙ্গির ভাঁজে। তা হলে বাকি রইল ক্যাচ এবং স্টাম্পিং-রান আউট। সে এক জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়াতে, নিমো ভারত সেবক সমাজের কার্যকরী সমিতির মিটিং ঠিক হল – নো লুঙ্গি।

আলম আমাদের অনেক টুর্নামেন্ট দিয়েছিল – আমরা হেরেছিলাম বেশী, জিতেছিলাম ও অনেক। তবে আলম কিন্তু আমাদের গ্রামের সবচেয়ে সফল হায়ারড প্লেয়ার ফুতুদাকে স্কাউট করে আনে নি – সে এসেছিল সঞ্জুর বন্ধু হিসাবে। সঞ্জু ছিল আমাদের গ্রামের বাই ফার দ্যা গ্রেটেষ্ট প্লেয়ার অব অলটাইম। এমনও শুনেছিলাম যে লোকে নিমোর খেলা দেখতে এসেছিল সঞ্জুর ব্যাটিং-বোলিং এবং আমার কিপিং দেখবে বলে। নিমো গ্রামের বুকে ফাষ্ট বোলিং এবং এগিয়ে গিয়ে বুক চিতিয়ে ছয় মারা সঞ্জুই শিখিয়েছিল। একটা সময় পর্যন্ত ফুতুদা প্রায় আমাদের গ্রামের ছেলে হয়ে উঠেছিল – সময় এগুতে এগুতে এক সময় বন্ধু বিচ্ছেদ হয়, পাবলিকেরা স্বাভাবিক ভাবেই ত্রিকোণ প্রেমের ব্যাপার টেনে আনে, তবে সেই সব গল্প এবং একবার টুর্নামেন্ট ফাইন্যালে জেতার জন্য ২৬ না করতে পারার গল্প পরের বার।

অনেক দিন হল শীতকালে বাড়ি যাই না – নিমোর হয়ে ক্রিকেটও অনেকদিন খেলি নি। আগের বার বাড়ি গিয়ে ফুতুদার ইলেকট্রিকের দোকানে একটা ইস্ত্রী কিনতে গেছি। ফুতুদা বলল, কিরে সুকান্ত একবার শীতকালে আয়, একবার বুড়ো হাড়ে একবার নামা যাক – আর আলমকে না হয় টিম বানাতে বলা যাবে। ফুতুদাকে বললাম ক্রিকেট ছাড়ো, “আলম এখন মাছ ধরা নিয়ে ব্যস্ত। এই তো দু-দিন আগে দেবীপুর থেকে মাছ ধরে এলাম”।

[ক্রমশঃ]




শেয়ার করুন


Avatar: dd

Re: ক্রিকেট

সুকান্তের এই লেখাগুলো খুব ভালো। নবী গঞ্জের মতন নিমো গ্রাম, দেবীপাড়া, বিষ্টুপুর - এ সকলই চেনা হয়ে যাচ্ছে। কতো লোকের সাথে আলাপ হয়ে যাচ্ছে। মুখোমুখী কোনোদিন দেখা হলে আড্ডা মারতে কোনো অসুবিধেই হবে না।

আচ্ছা, ওখানে ভুত টুত ছিলো না? আমাদের ছোটোব্যালায় গাঁ গঞ্জে সন্ধ্যে হলেই মশা আর ভুত হাজির হত। তবে সুকান্তদের আমলে বোধহয় আলো দুষণের জন্য ভুতেরা সব বিরক্ত হয়ে চলে গেছিলো। এটা একটা বড়ো লস।
Avatar: সুকি

Re: ক্রিকেট

ডিডিদা,
কে বলল আমাদের ছোটবেলায় ভুত ছিল না? সে গল্প না হয় সময় করে লেখা যাবে। আমাদের গ্রাম এখনও খুব একটা প্রাকৃতিক দুষণের কবলে পড়ে নি। আজকাল কার ছেলে পুলেরা একটু পাকা হয়ে ওঠাতে ভুতেরা আর আনন্দ পাচ্ছে না ভয় দেখিয়ে। ভয় দেখাতে এলে প্রমাণ চাইছে যে সে সত্যি ভুত কিনা - তাই ভুতের আনাগোণা একটু কমেছে। আর তা ছাড়া আমাদের গ্রামের ভুতের প্রধান আস্তানা বাঁশ বাগানটা এখন প্রায় সাফ হয়ে গ্যাছে - ফলে থাকার প্রবলেম। এত চাপ নিয়ে কে আর থাকতে চায়!
Avatar: রোবু

Re: ক্রিকেট

দারুণ দারুণ!!
Avatar: lcm

Re: ক্রিকেট

খাসা !
Avatar: h

Re: ক্রিকেট

সলিড লিখেছে উইকেটকিপার জ্জিও। মনটা ভালো হয়ে গেল।
Avatar: pi

Re: ক্রিকেট

সুকি তো ফুল ফর্মে ব্যাক ঃ)
Avatar: সুকি

Re: ক্রিকেট

সবাইকে ধন্যবাদ লেখা পড়ার জন্য -

সঙ্গের ছবিটা আলমের সাথে দেবীপুরে ৩ কিলো কাতলা ধরার পরঃ


https://s4.postimg.org/mwt5dklr1/DSC1753.jpg


Avatar: aranya

Re: ক্রিকেট

বাঃ, খেলাধুলোর কথা সবসময়েই পড়তে ভাল লাগে, বিশেষতঃ যদি সুকি-র মত সরস কলম/কী বোর্ড হয়
Avatar: T

Re: ক্রিকেট

উলস, দেখেই ওটাকে খেতে ইচ্ছে করছে।
Avatar: দ

Re: ক্রিকেট

হ্যাঁ এই লেখা বেশ ছুটির দুপুরে খেয়ে উঠে আরাম করে পড়ার মত। কিন্তু এত অল্প কেন?
Avatar: শঙ্খ

Re: ক্রিকেট

খাসা হয়েছে। বরাবরের মতোই।
Avatar: ki jeno

Re: ক্রিকেট

ইয়ে, সুপর্ণা মানে ক্রিকেট গল্পের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে তো শীতকাল এসে গেলো, সুপর্ণা কই?


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন