কৃষ্ণেন্দু মুখার্জ্জী RSS feed

কৃষ্ণেন্দু মুখার্জ্জীএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • লড়িয়ে দেবেন না, প্লিজ
    পদ্মাবতী ডিবেটের সূত্রে একটা কথা চার পাশে শোনা যাচ্ছে, যে এ সব পদ্মাবতী ইত্যাদি দেশের আসল ইস্যু নয়। এই মুহূর্তে দিল্লির কৃষক বিক্ষোভটাই দেশের সমস্যা, সেখান থেকে নজর ঘোরাতেই রাষ্ট্র ও মিডিয়া পদ্মাবতীর মত উল্টোপাল্টা ফিল্মি ইস্যু বানানোর কারসাজি করছে। আমি ...
  • আজকের নাটক -পদ্মাবতী
    পরের পর নাটক আসতেই থাকে আজকাল। গল্প সাধারণ, একটা জনগোষ্ঠীর গরিষ্ঠ অংশের অহংকে সুড়সুড়ি দেওয়া প্লট। তাদের বোঝান যে বাকিরা ও তাদের পূর্বপুরুষেরা লুঠতরাজ করে তোমাদের লাট করে দিয়েছিল, আজই সময় হয়েছে বদলা নিয়ে নাও, নয়ত কাল আবার ওরা তোমাদের শেষ করে দেবে। এই নাটক ...
  • বেশ্যাদ্বার
    বেশ্যাদ্বার (প্রথম পর্ব)প্রসেনজিৎ বসুরামচন্দ্র দুর্গাপুজো করছেন। রাবণবধের জন্য। বানরসেনা নানা জায়গা থেকে পুজোর বিপুল সামগ্রী জোগাড় করে এনেছে। রঘুবীর পুজো শুরু করেছেন। ষষ্ঠীর বোধন হয়ে গেছে। চলছে সপ্তমীর মহাস্নান। দেবীস্বরূপা সুসজ্জিতা নবপত্রিকাকে একেকটি ...
  • অন্য পদ্মাবতী
    রাজা দেবপালের সহিত দ্বন্দ্বযুদ্ধে রানা রতন সিংয়ের পরাজয় ও মর্মান্তিক মৃত্যুর সংবাদ রাজপুরীতে পঁহুছানোমাত্র সমগ্র চিতোরনগরীতে যেন অন্ধকার নামিয়া আসিল। হায়, এক্ষণে কে চিতোরের গরিমা রক্ষা করিবে? কেই বা চিতোরমহিষী পদ্মাবতীকে শত্রুর কলুষ স্পর্শ হইতে বাঁচাইবে? ...
  • আমার প্রতিবাদের শাড়ি
    আমার প্রতিবাদের শাড়িসামিয়ানা জানেন? আমরা বলি সাইমানা ,পুরানো শাড়ি দিয়ে যেমন ক্যাথা হয় ,গ্রামের মেয়েরা সুচ সুতো দিয়ে নকশা তোলে তেমন সামিয়ানাও হয় । খড়ের ,টিনের বা এসবেস্টাসের চালের নিচে ধুলো বালি আটকাতে বা নগ্ন চালা কে সভ্য বানাতে সাইমানা টানানো আমাদের ...
  • টয়লেট - এক আস্ফালনগাথা
    আজ ১৯শে নভেম্বর, সলিল চৌধুরী র জন্মদিন। ইন্দিরা গান্ধীরও জন্মদিন। ২০১৩ সাল অবধি দেশে এটি পালিত হয়েছে “রাষ্ট্রীয় একতা দিবস” বলে। আন্তর্জাতিক স্তরে গুগুল করলে দেখা যাচ্ছে এটি আবার নাকি International Men’s Day বলে পালিত হয়। এই বছরই সরকারী প্রচারে জানা গেল ...
  • মার্জারবৃত্তান্ত
    বেড়াল অনেকের আদরের পুষ্যি। বেড়ালও অনেককে বেশ ভালোবাসে। তবে কুকুরের প্রভুভক্তি বা বিশ্বাসযোগ্যতা বেড়ালের কাছে আশা করলে দুঃখ লাভের সম্ভাবনা আছে। প্রবাদ আছে কুকুর নাকি খেতে খেতে দিলে প্রার্থনা করে, আমার প্রভু ধনেজনে বাড়ুক, পাতেপাতে ভাত পড়বে আমিও পেটপুরে ...
  • বসন্তবৌরী
    বিল্টু তোতা বুবাই সবাই আজ খুব উত্তেজিত। ওরা দেখেছে ছাদে যে কাপড় শুকোতে দেয়ার একটা বাঁশ আছে সেখানে একটা ছোট্ট সবুজ পাখি বাসা বেঁধেছে। কে যেন বললো এই ছোট্ট পাখিটার নাম বসন্তবৌরী। বসন্তবৌরী পাখিটি আবার ভারী ব্যস্তসমস্ত। সকাল বেলা বেরিয়ে যায়, সারাদিন কোথায় ...
  • সামান্থা ফক্স
    সামান্থা ফক্সচুপচাপ উপুড় হয়ে শুয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়েছিলাম। মাথায় কয়েকশো চিন্তা।হস্টেলে মেস বিল বাকি প্রায় তিন মাস। অভাবে নয়,স্বভাবে। বাড়ি থেকে পয়সা পাঠালেই নেশাগুলো চাগাড় দিয়ে ওঠে। গভীর রাতের ভিডিও হলের চাম্পি সিনেমা,আপসু রাম আর ফার্স্ট ইয়ার কোন এক ...
  • ইংরাজী মিডিয়ামের বাংলা-জ্ঞান
    বাংলা মাধ্যম নাকি ইংরাজী মাধ্যম ? সুবিধা কি, অসুবিধাই বা কি? অনেক বিনিদ্র রজনী কাটাতে হয়েছে এই সিদ্ধান্ত নিতে! তারপরেও সংশয় যেতে চায় না। ঠিক করলাম, না কি ভুলই করলাম? উত্তর একদিন খানিক পরিস্কার হল। যেদিন একটি এগার বছরের আজন্ম ইংরাজী মাধ্যমে পড়া ছেলে এই ...

অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি

কৃষ্ণেন্দু মুখার্জ্জী




পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলার একটা মজার ব্যাপার আছে। অন্য কারুর কথা জানিনা, অন্তত আমার সাথে হয় এমনটি। আজকের ঘটনাটা দিয়েই শুরু করি। প্রোজেক্ট রিপোর্টের দৌলতে সারারাত জেগেই কেটেছে। সকালবেলা বেরিয়েছিলাম একটু ঘোরাঘুরি করতে। ফেরার সময় রিসেপশনে দেখি পেপার দিয়ে গেছে। আনন্দবাজার। খান দুই পাতা ওলটানোর পরেই নজরে এল রঙচঙে বিজ্ঞাপনটা। পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলা। উপরে এক কোনায় লেখা ‘প্রকাশিত'। আমি নির্বিকার। অবাক হইনি একটুও। কয়েকদিন ধরেই এটার ছোটখাটো, মাঝারি, বড়ো প্রভৃতি নানা আকৃতির বিজ্ঞাপন নজরে আসছিল। দু’দিন আগে একখানা আনন্দবাজার পত্রিকার উপর চানাচুর সাজিয়ে বিশাল ভোজ হয়েছে। যেখানে চানাচুর ঢেলেছি, তার নিচেও পূজাবার্ষিকীর বিজ্ঞাপন ছিল একটা। ‘শীঘ্রই আসতে চলেছে’- এই মর্মে। চানাচুর ঢালার সময় সেটা খেয়াল করিনি, খাওয়া শেষ হতে চোখে পড়ে। ফলত বদহজম। সে যাই হোক, ব্যাপারখানা যা দাঁড়াল, এটা প্রকাশিত হওয়ারই ছিল। কয়েকদিনের মধ্যেই হত। আজকে হয়েছে। এবং আমার কিছু এসেও যায় না এতে। আগের বছরগুলোর যা বাজে অভিজ্ঞতা, তাতে করে গতবারের পুজো থেকেই ঠিক করে রেখেছি; যা হওয়ার হয়ে যাক , এবার আর আনন্দমেলা নৈব নৈব চ। এমনকি বাড়ির সবাইকেও বারণ করা আছে। পেপার মুড়ে রিসেপশোনে রেখে চলে এলাম রুমে ! হুঁহ! আনন্দমেলা বেরিয়েছে! যতসব ! পুজোর নামগন্ধ নেই এখনও, তার আবার পূজাবার্ষিকী ! ঢং যত! তাও যদি খুব বিশাল কিছু হত ! আজেবাজে লেখা বাদে যদি কিছু থাকতো ! তা না ! কীসের এত বিজ্ঞাপন ! কারাই বা কেনে কেনে এসব ! মানিব্যাগটা কোথায় ? আনন্দমেলা ! ‘আনন্দ’ না কচু ! টাকা হাতানোর ধান্ধা যত ! আচ্ছা মোবাইলটা ? এইতো। অতঃপর ঘরে চাবি দিয়ে মানিব্যাগ আর মোবাইল নিয়ে সবেগে বেরিয়ে পড়লাম।

আইজার থেকে বেরিয়ে একটা বাস ধরা গেল। গন্তব্য কল্যাণী স্টেশন। নিন্দুকে জিজ্ঞেস করবে, যাচ্ছি কী করতে। আমি আপাতত সেসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাবো। মিনিট কুড়ি বাদে এল ইস্টিশন। স্টেশনে ঢোকার মুখেই একটা পেপারের দোকান। কোনো কথা খরচ না করে আমি ম্যাগাজিন খুঁজতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পর খেয়াল হতে দোকানি জিজ্ঞেস করে,“কী দরকার ? অত খোঁজার কিছু নেই । আমায় বলো”। আমি বলি, “আনন্দমেলা”। দোকানি বলে “কুড়ি টাকা”। আমি অবাক ! এবার বললাম , “পূজাবার্ষিকী”। এবার দোকানি অবাক ! বলল, “সে তো শেষ হয়ে গেছে !” আমি চমৎকৃত ! এত লোকে আনন্দমেলা কেনে ! আজকেই বেরুলো, সকাল সাড়ে সাতটা বাজতে না বাজতেই শেষ ! আমায় হতভম্ভ অবস্থায় দেখে দোকানি খেঁকিয়ে উঠলো , “তা পুজোসংখ্যা বেরিয়েছে তো বছর ঘুরতে চলল, এখনও থাকবে কী করে ! বহুদিন আগেই বিক্কিরি হয়ে খতম। তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে যাও, ওখানে পুরনো ম্যাগাজিন বিক্কিরি হয়”। বুঝলাম। এ পেপারওয়ালা আনকোরা। একেবারেই নভিস ! এখনও আনন্দমেলার ঘাঁতঘোঁত বুঝে উঠতে পারেনি। পুজোর এখনও মাস তিনেক বাকি আছে মানলাম, কিন্তু অত বাস্তববুদ্ধি দিয়ে কী আর আনন্দমেলাকে বিচার করলে চলে ! আমি অবশ্য হতাশ হলাম না। কল্যাণীতে না পাই, অন্তত শেয়ালদায় তো নিশ্চয় পাবো ! ট্রেন ধরে চলে গেলেই হল। স্টেশনে ভিড় কেমন দেখতে ঢুকলাম। আর শেয়ালদা অবধি যেতে হল না। সিঁড়িতে ওঠার নিচেই আরেকটা পেপারের দোকান। এবং সেখানে থরে থরে সাজানো রয়েছে আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী।

কেনা হল একখানি। দোকানি জানাল, আমিই নাকি পূজাবার্ষিকীর প্রথম খদ্দের । বলা বাহুল্য, আমি এটিকে সমবেদনা-জ্ঞাপন বলেই ধরলাম। এবং আমার অদ্ভুত কপাল, বইটা হাতে নিয়ে পাতা ওল্টোতে ওল্টোতে প্রথমেই যে পাতাটি খুলল, সেটি একটি গোয়েন্দা উপন্যাস। পাতার মাঝখানের দিকে লেখা, “গতকাল অ্যারেস্ট হলেন ......বাবু” (‘বাবু’র নাম করলাম না, পাঠকে পেটাবে)। নবম পরিচ্ছেদের প্রথম লাইন এটি। আনন্দমেলায় উপন্যাসের ক্ষেত্রে নবম পরিচ্ছেদ অবধি বিস্তৃতি একটু বাড়াবাড়িই, ফলে সেখানে যিনি গ্রেফতার হয়ে গ্যাছেন, তাঁর আর কোনো নিস্তার নেই। উনিই কালপ্রিট। আর বুঝতে বাকি রইল না যে সেই অভিনব পাতা ওলটানোর সৌজন্যে বই কেনার তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যেই আমি একটি রহস্য উপন্যাসকে ভোগে পাঠিয়ে দিয়েছি। ওটার আর পড়ার কিছু বাকি রইল না।

বইটা বগলদাবা করে বাসে উঠলুম, তারপর ফিরে এলুম আইজারে আবার। মিনিট পনেরো কেটেছে কি কাটেনি, আনন্দমেলা খুলেছি কি খুলিনি, উপন্যাসের সারমর্মগুলো পড়েছি কি পড়িনি; আবার ভীষণ মনখারাপ শুরু হল। ইসস ! এটাও আগেরবারেরগুলোর মতই অখাদ্য হবে রে ! ধুস ! কেন যে কিনলাম! আবার টাকা গেল কতকগুলো ! ওতে দিব্যি দিনকতক চাউমিন রোল-টোল খেয়ে কাটানো যেত। পরে না হয় কারোর কাছ থেকে হাতিয়ে নিলেই হত পূজাবার্ষিকীটা ! কী বোকামি, কী বোকামি !

পরের বছর আর না !



এটা প্রথমবার নয়। আমার এই আনন্দমেলা ‘না-কেনা’র প্রতিজ্ঞা ইত্যাদি শুরু হয়েছিল বছর সাতেক আগের থেকে। তখন ক্লাস সেভেন বা এইট হবে, বাংলা সাল মনে নেই, বর্ষা পড়তেই ঠিক করলাম এ বছর থেকে শারদীয়া আনন্দমেলা আর কিনবো না। আগের কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত খারাপ , অর্ধেকের মতো পড়ার পরেই বোঝা গিয়েছিল এ অত্যন্ত ভাটের পুজোসংখ্যা , শুধুশুধু কতকগুলো টাকার অপচয় বই কিছু না! পূজাবার্ষিকীর দাম আশি থেকে বেড়ে, একশো ছাড়িয়ে একশো কুড়িতে পৌঁছে গেছে ততদিনে। আর গুণমান কমেছে ব্যস্তানুপাতে। আনন্দমেলার থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে সেবারের পুজোর প্রাক-মুহূর্তটা অন্যান্য পূজাবার্ষিকীর হাতে সঁপে দেবো - এরকম একটি প্রায়-প্রতিজ্ঞা নেওয়া হল। তারপর জুলাইয়ের মাঝামাঝি একদিন পেপারে বেরুলো বিজ্ঞাপন, প্রকাশিত হয়েছে নাকি সেবারের আনন্দমেলার পুজোসংখ্যা। ব্যাস ! হঠাৎ করেই কী থেকে কী যেন হয়ে গেল ! প্রতিজ্ঞা-টতিজ্ঞা সব কোথায় গেল উড়ে ! সব গোলমাল ! অনেক গাঁইগুই করে বাবার কাছ থেকে টাকা আদায় করে ছুটলাম। কিনে এনে তবে নিশ্চিন্তি !

তারপর দুদিন আবার কাটল হতাশার মধ্যে। ধুস, অত্যন্ত আজেবাজে সব লেখা ! কী জন্যে কিনলাম ! সেই থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড় ! আবার ঠিক হল, এবার না হয় আবেগের বশে হয়ে গেছে, পরেরবার থেকে আর একদম না !

পরের বছর আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল ! তার পরের বছর আবার ! এভাবে চলতেই থাকল। মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক পেরিয়ে কলেজে চলে আসার পরেও এই চক্র চলে যাচ্ছে। ঠিক যেদিন পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলা বেরুবে, সেদিনেই আমায় সব্বার আগেভাগে গিয়ে বইখানা কিনে আসতে হবেই । নইলে যেন শান্তি নেই ! তারপর সারাবছর চলবে গালাগালি। অনেক প্রতিজ্ঞা-পণ নেওয়া হবে। কিন্তু সেই; পেপারে 'প্রকাশিত' দেখামাত্রই আবার দোকানের দিকে দৌড় !



খুব ছোটবেলায়, বাঁকুড়ায় আসিনি তখনও, গল্পের বইটই সেভাবে চিনতাম না । গ্রামে একটা লাইব্রেরি ছিল। ধাড়া সারদাদেবী পাঠাগার। আমাদের প্রাইমারি স্কুল, যেখানে আমি ক্লাস টু অবধি পড়েছিলাম, তার একেবারে কাছেই লাইব্রেরিটা। রোজই যেতাম প্রায়। বইপত্র বিশেষ কিছু বুঝতাম না , আমার শখ ছিল মূলত বইয়ের নাম্বার ধরে ধরে সেগুলোকে তাকে সাজিয়ে রাখা। এরকম উপকারী প্রবৃত্তি দেখে লাইব্রেরিয়ান সন্তুষ্টই ছিলেন, তার কাজের বেশ সুবিধা হচ্ছে বই তো নয় ! ফলে আমার তুমুল বই ঘাঁটায় আপত্তি করতেন না তিনি। বাবা একবার বলেছিল লাইব্রেরির সব বইয়ে নাকি উনিশ পাতায় স্ট্যাম্প মারা থাকে (উনিশ না একুশ এখন মনে নেই) , শুনে তো আমি খুবই আশ্চর্য। যা বই পেতাম হাতের কাছে, সব খুলে খুলে দেখতাম। ওমা ! সত্যিই তাই ! অবাক ব্যাপারই বটে ! সব বই তাকে রাখতে হত না, কিছুকিছু পড়ে থাকতো লাইব্রেরিয়ানের সামনে টেবিলে। সেগুলোয় নাম্বারিং হত না। সেই টেবিলেই একদিন আবিষ্কার করলাম রঙিন মলাটওয়ালা, কেমন অদ্ভুত ছাঁদের হরফে নাম লেখা বড়সড় দেখতে একটা বই। ক্যালিগ্রাফির রহস্য ভেদ করে জানা গেল সেটাকে বলে আনন্দমেলা।

লোকজনকে জিজ্ঞেস করে আরও জানা গেল, এটা নতুন কিছু না, প্রতিবছর পুজোর আগেভাগে লাইব্রেরিতে আনা হয় এক কপি করে। বেশ মজার জিনিস তো ! খুলে দেখি প্রচুর ছবি, লেখাপত্র, ছবিতে গল্প। তখন লেখা-টেখা বিশেষ মাথায় ঢুকত না। কিন্তু ছবিতে গল্প যেগুলো, মানে কমিকস, সেগুলো বেশ আকর্ষণীয় লাগলো প্রথম দর্শনেই। লাইব্রেরিতে বই গোছানোর সূত্রে যেসব বই আগে দেখেছি সেসবের চেয়ে এই বই একেবারেই আলাদা। কেবল নীরস কালো কালির সারি নেই এতে, বেশ মন ভালো করা ব্যাপারও রয়েছে। পছন্দ হয়ে গেল খুব। একখানা কমিকস পড়েই ঠিক করলাম ,এখন কয়েকদিন বই গোছানোয় বিরতি থাক। এই বইখানি আগে শেষ হোক।

পরদিন গিয়ে দেখি, বই নেই ! কে একজন নিয়ে গেছে। কবে ফেরত দেবে ? কোনো স্পষ্ট উত্তর মিলল না। বরং আকার ইঙ্গিতে যা জানা গেল তা খুবই হতাশাজনক। আনন্দমেলার পুজোসংখ্যাগুলো কেউ একবার লাইব্রেরি থেকে নিয়ে গেলে তা নাকি আর ফেরত আসে না। হাত বদল হয়ে হয়ে লোকজনের মামাবাড়ি, মাসিবাড়ি ঘুরে ঘুরে শেষমেশ হয়তো ভারতের বাইরেই চলে যায়। প্রতি বছর নেওয়া হয়, অথচ আগের সংখ্যাগুলোর একটাও কেন লাইব্রেরিতে নেই - সে প্রশ্নেরও উত্তর মিলে গেল। এই প্রসঙ্গে গ্রামীণ গ্রন্থাগার ব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে একটি ভালো প্রবন্ধ লেখা যায়। কিন্তু আপাতত লিখতে ইচ্ছে করছে না। যা বুঝলাম, এই বছরের সংখ্যাটি পাওয়ার কোনো আশা নেই আর। আর পরের বছরের বইখানা হস্তগত করতে হলেও খুব সাবধানী হতে হবে। যেদিন প্রথম নিয়ে আসবে লাইব্রেরিয়ানকাকু, সেদিনই ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে পালাতে হবে। বইটই গুছিয়ে অনেক উপকার করেছি, এটুকু প্রতিদান কি আমার প্রাপ্য নয় !

আনন্দমেলা এমনিতে পুজোর বহু যুগ আগে বেরোলেও গ্রামের দিকে ওটা মহালয়ার সময়ে সময়েই আসত। আমি ওই সময়টা তাক করে থাকতাম। রোজ লাইব্রেরির খোলার মিনিট দশেক আগের থেকে দাঁড়িয়ে থাকতাম সামনের মাঠে। দূর থেকে সাইকেল দেখা যায় কিনা ! কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর দেখা মিলত। তারপর সেই সাইকেল আস্তে আস্তে ছোট থেকে বড় হত। আমার পাশ দিয়ে পেরিয়ে লাইব্রেরিতে ঢুকত। সাইকেলের হ্যান্ডেলে রাখা ব্যাগ থেকে বেরুচ্ছে গণশক্তি, আনন্দবাজার। কিন্তু আনন্দমেলার দেখা নেই। এদিকে মহালয়াও আসতে চলেছে। শুক্রবার অবধি অপেক্ষা করেও কিছু পাওয়া গেল না। সপ্তাহ শেষ। শনি রবি লাইব্রেরি বন্ধ। আর ওই দু’দিন সাইকেলের অপেক্ষায় যাইনি। গেছি একেবারে সোমবারে। সাইকেল আমায় দেখে বলে, কীসের এত অপেক্ষা ? ওটা আর নেই !

নেই মানে ?

শনিবার এসে গেছিল। ওইদিনই একজন নিয়ে চলে গেছে।

কিন্তু শনিবার তো বন্ধ ! এল কী করে !

তারপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে আমায় মাসের প্রথম-চতুর্থ আর দ্বিতীয়-তৃতীয় নিয়ে জটিল এক অঙ্ক বোঝানোর চেষ্টা চলল। আমার মাথায় যদিও কিছুই ঢুকছিল না। পরের বছর আমি বাঁকুড়া চলে এলাম।



ছোটবেলার এই অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো, আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকীর প্রতি আমার আচরণটা এরম অদ্ভুত হয়ে দাঁড়িয়েছে। যতই বিতৃষ্ণা থাকুক, যতই অখাদ্য লেখা ছাপার রেকর্ড থাকুক, যতই থাকুক আর-কিনবো-না প্রতিজ্ঞা, বিজ্ঞাপনের উপর ওই ‘প্রকাশিত’ দেখতে পেলেই আর স্থির থাকা যায় না। খালি মনে হয়, কেউ নিয়ে চলে যাওয়ার আগেই কিনে আনি একটা। আমাকে সবার প্রথমে কিনতেই হবে। নইলে কী জানি, যদি শেষ হয়ে যায় ! এইরকম একটা অবস্থা।

আমি জানি না আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী এখন বিশুদ্ধ ‘পড়ার’ উদ্দেশ্যে ঠিক কতজন কেনে। আমি অন্তত কিনি না। এখনকার আনন্দমেলায় পড়ার মতো উপাদান অত্যন্ত বিরল। গত কয়েক বছরের পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলায় যে লেখাগুলি বেরিয়েছে, তার মধ্যে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস কয়েকটি, সব্যসাচী সরকারের ‘কোকো বনাম রাহুল দ্রাবিড় টেন’ আর সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের ‘মেঘ ছেঁড়া রোদ’ ব্যতীত কোনো উপন্যাসই আমার মনে সেভাবে দাগ রেখে যাতে পারেনি। এগুলি বাদ দিলে যেগুলি পড়ে থাকছে, তার প্রায় সবকটাই ‘রিড অ্যান্ড ফরগেট’ গোত্রের লেখা (‘প্রায়’- এর ফাঁকফোকর দিয়ে যে লেখাগুলি বেরিয়ে গেল, সেগুলিও মহান কিছু না। ওগুলি আসলে আমি পড়েই দেখিনি। তাই ‘ফরগেট’-এর প্রশ্নই উঠছে না)।

অধিকাংশের ক্ষেত্রে, এখনও এই উচ্ছন্নে যাওয়া আনন্দমেলা কেনার মূল কারণ হয়তো ছোটবেলার স্মৃতি, আবেগ, নস্টালজিয়া প্রভৃতি। আর আমার জন্যে, অবশ্যই, ওই সাময়িক উত্তেজনা আর উদ্বেগটা, যেটা ছোটবেলা থেকে জমে জমে এসে এখন একটা বিরাট ইম্পালসন তৈরি করে দেয়। নিছক 'পূজাবার্ষিকী পড়া’, এসব ক্ষেত্রে, আর আসল উদ্দেশ্য থাকে না।

পুনশ্চঃ এইবারে রাপ্পা রায়ের কমিক্সটা বেশ ভালো লাগলো। ক্ষুব্ভালোই বলা যায়! তবে ওইটুকুই। আর কিছু ভালো লাগেনি এখন অবধি। সে যাই হোক, পরের বছর থেকে আর আনন্দমেলা কিনছি না। গ্যারেন্টি !


Avatar: aranya

Re: অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি

:-)

ভাল লাগল। আমি ৫০+, এখনও কৃষ্ণেন্দুর মতই অবস্থা ..


Avatar: Atoz

Re: অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি

গ্রেফতার হয়ে গ্যছেন!!!!! বলেন কী????? ঃ-)
Avatar:  pi

Re: অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি

আমার অবস্থা এরকম না হলেও ভারি এনজয় করলাম লেখাটা। এরকম লেখাও তো আমাতে বের করতে পারে!

Avatar: Ela

Re: অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি

অরণ্যদা আর কৃষ্ণেন্দুর মত অবস্থা আমারো। শুধু আনন্দমেলা না প্রায় সব পূজাবার্ষিকীর জন্যই। গতবার দেশে ছিলাম না তাই মা কিনে রেখেছিল, এখনও সবকটা শেষ হয়নি। আবার এ বছরেরটা এসে গেল।

সেই সর্দারজীর মত বলি, ফির সে পিসলনা পঢ়েগা!
Avatar: ধুলোখেলা

Re: অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি

২৩০ টা আনন্দমেলা এখনও অবধি আছে এখানে। আসলেই কি এগুলো পড়তে ইচ্ছা করে, এখনো?

https://dhulokhela.blogspot.in/search/label/Anandamela


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন